24-01-2026, 01:43 AM
৪
ঢাকা শহরের রিকশা ভ্রমণ অনেকটা রোলার কোস্টারের মতো। এখানে গতির চেয়ে ঝাঁকুনি বেশি, আর রোমাঞ্চের চেয়ে আতঙ্ক। কিন্তু আজকের ভ্রমণটা আতঙ্ক নয়, বরং এক অদ্ভুত ঘোরলাগা অনুভূতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আমাদের রিকশা শাহবাগ মোড় পার হয়ে চারুকলার উল্টো পাশ দিয়ে ক্যাম্পাসের দিকে ঢুকছে।
তনিমা আন্টি এখন পুরোপুরি আমুদে মুডে আছেন। তার কাঁধের ঝোলা ব্যাগটা কোলের ওপর রাখা। তিনি ডান হাত দিয়ে রিকশার হুডের লোহার রডটা ধরে আছেন, আর বাম হাতটা মুক্ত। তিনি অনর্গল কথা বলছেন। শাহবাগের ফুলের দোকানগুলো দেখে তিনি উচ্ছ্বসিত হয়ে বললেন, "তন্ময়, দেখ দেখ! রজনীগন্ধা! উফ, কতদিন এই ফুলের মালা কিনি না। সিডনিতে তো সব প্লাস্টিকের মতো দেখতে ফুল, কোনো গন্ধ নেই। থাম তো একটু।"
আমি রিকশাওয়ালা চাচাকে থামতে বললাম। আন্টি একগাদা রজনীগন্ধার স্টিক আর বেলী ফুলের মালা কিনলেন। বেলী ফুলের মালাটা তিনি খোপায় জড়ালেন না, হাতে পেঁচিয়ে রাখলেন। রজনীগন্ধার স্টিকগুলো আমার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, "নে, ধর। রোমিওর মতো বসে থাক।" আমি লজ্জিত ভঙ্গিতে ফুলগুলো হাতে নিলাম। শাহবাগের মোড়ে পুলিশের চেকপোস্টের সামনে রজনীগন্ধা হাতে বসে থাকাটা খুব একটা বীরত্বের কাজ নয়।
রিকশা আবার চলতে শুরু করল। আমরা ছবির হাটের সামনে দিয়ে টিএসসির দিকে এগোচ্ছি। আমার বুকের ভেতর একটা মৃদু ধড়ফড়ানি শুরু হলো। এটা প্রেমের ধড়ফড়ানি নয়, এটা হচ্ছে মানসম্মান যাওয়ার ভয়। আমি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের ছাত্র। আমার ডিপার্টমেন্ট সোশ্যাল সায়েন্স বিল্ডিংয়ে। এখান দিয়ে সোজা গেলেই ডিপার্টমেন্ট। কিন্তু আমি চাচাকে বললাম, "চাচা, মল চত্বর দিয়ে যাবেন না। ফুলার রোড দিয়ে ঘুরে কার্জন হলের দিকে যান।"
আন্টি অবাক হয়ে বললেন, "কেন রে? টিএসসি হয়ে মল চত্বর দিয়ে গেলে তো সোজা হতো। তোর ডিপার্টমেন্ট দেখব না?" আমি আমতা আমতা করে বললাম, "না মানে... ওই রাস্তাটা ভাঙা। রিকশায় খুব ঝাঁকুনি হবে। আর আজ রোববার, ডিপার্টমেন্টে ক্লাস হচ্ছে। ওখানে রিকশা থামানো যাবে না।"
আসল কারণটা আন্টিকে বলা যাবে না। ঢাকা ভার্সিটির পোলাপান একেকটা জ্যান্ত সিসিটিভি ক্যামেরা এবং নির্দয় ট্রল-মাস্টার। আমি যদি এই ভরদুপুরে আমার মায়ের বয়সী একজন স্মার্ট, জিন্স-টপস পরা মহিলার সাথে রিকশায় ঘনিষ্ঠ হয়ে বসি, আর সেটা আমার ব্যাচমেট বা জুনিয়রদের চোখে পড়ে—তাহলে রক্ষা নেই। আজ রাতেই 'ডিইউ ক্রাশ অ্যান্ড কনফেশন' বা কোনো ট্রল গ্রুপে আমার ছবিসহ পোস্ট চলে আসবে। ক্যাপশন হবে—"ক্যাম্পাসের ছোট ভাইদের সুগার মমি ভাগ্য! আমরা কি দোষ করলাম?" কিংবা "অসম প্রেমের উপাখ্যান: বড় আপু ও কচি ভাই।" এইসব ভার্চুয়াল বুলিংয়ের হাত থেকে বাঁচার জন্য আমি ইচ্ছে করেই নিজের টেরিটরি এভয়েড করলাম। যাদের বিশ্বাস নেই, তাদের চোখের আড়ালে থাকাই শ্রেয়।
আমরা ফুলার রোড দিয়ে ব্রিটিশ কাউন্সিলের সামনে দিয়ে জগন্নাথ হলের দিকে গেলাম। ছায়াশীতল রাস্তা। কৃষ্ণচূড়া গাছগুলো ডালপালা মেলে আকাশ ঢেকে রেখেছে। আন্টি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। "এই রাস্তাটা... আহ! এই রাস্তায় কত রিকশা রাইড দিয়েছি। তখন অবশ্য রিকশার হুড তোলা থাকত।" আমি কৌতুক করে বললাম, "হুড তোলা থাকত কেন? রোদ ছিল বলে, নাকি অন্য কোনো কারণে?"
আন্টি আমার পিঠে একটা মৃদু থাপ্পড় দিলেন। "তোর ফাজলামি আর গেল না। সব কিছুতেই রোমান্স খুঁজিস। হুড তোলা থাকত কারণ তখন আমরা লাজুক ছিলাম। এখনকার মতো এত ওপেন ছিলাম না।"
ঘুরতে ঘুরতে দুপুর হয়ে এল। খিদে পেয়েছে। আন্টিকে বললাম, "মধুর ক্যান্টিনে যাবেন? ওখানের পরিবেশ কিন্তু খুব একটা হাই-ফাই না। তবে খাবারটা ইমোশন।" আন্টি বললেন, "অবশ্যই যাব। মধুর ক্যান্টিনে না গেলে তো ক্যাম্পাস ট্যুর কমপ্লিট হবে না। ওখানে কি এখনো সেই লম্বা টেবিলগুলো আছে?"
"আছে। সাথে বোনাস হিসেবে আছে পলিটিক্যাল স্লোগান আর ধোঁয়া ওঠা চা।"
আমরা মধুর ক্যান্টিনে ঢুকলাম। প্রবল হট্টগোল। একপাশে ছাত্রদলের মিছিলের প্রস্তুতি চলছে, অন্যপাশে ছাত্র ইউনিয়নের জটলা। মাঝখানে সাধারণ ছাত্ররা নির্বিকার ভঙ্গিতে শিঙাড়া খাচ্ছে। আন্টি ঢুকেই কেমন যেন থমকে গেলেন। তার চোখেমুখে একটা নস্টালজিয়ার ছায়া। তিনি চারপাশটা দেখলেন। দেওয়ালের ছবিগুলো, পুরনো চেয়ার-টেবিল। আমরা এক কোণায় জায়গা পেলাম। আমি শিঙাড়া, মোগলাই আর চা অর্ডার করলাম। আন্টি শিঙাড়াটা হাতে নিয়ে ভেঙে ধোঁয়াটা দেখলেন। তারপর মুখে দিলেন। তার চোখ বন্ধ হয়ে এল। "উহ! সেইম টেস্ট! বিলিভ মি তন্ময়, পৃথিবীর কোথাও এই টেস্ট পাবি না। এটার মধ্যে ঘাম আর বিপ্লবের স্বাদ আছে।" আমি হাসলাম। "ঘামের স্বাদটা একটু বেশিই মনে হয় আন্টি।"
খাওয়া শেষে আমরা আবার রিকশায়। এবার গন্তব্য রমনা পার্ক আর শিল্পকলা একাডেমি। রিকশা মৎস্য ভবনের মোড় পার হয়ে রমনার পাশ দিয়ে যাচ্ছে। রাস্তাটা ফাঁকা। দুপাশে বিশাল সব গাছ। আন্টি হঠাৎ বললেন, "তন্ময়, সত্যি করে বল তো, তোর কি কোনো প্রেমিকা নেই?" আমি মাথা নাড়লাম। "না আন্টি। সত্যি নেই।" আন্টি অবিশ্বাসীর মতো তাকালেন। "এত বড় ছেলে, ভার্সিটিতে পড়িস, গিটার বাজাস, ফিলোসফি ঝাড়িস—তোর প্রেমিকা নেই? হাউ ইজ দ্যাট পসিবল? মেয়েরা কি অন্ধ নাকি?" আমি বললাম, "মেয়েরা অন্ধ না আন্টি, তারা অত্যন্ত দূরদর্শী। তারা আমার ভবিষ্যৎ দেখে ফেলেছে—একটা বেকার, উদাসীন দার্শনিক, যার পকেটে টাকার চেয়ে বাতাস বেশি থাকে। তাই তারা নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখে।"
আন্টি শব্দ করে হাসলেন। হাসলে তার গালের পাশে টোল পড়ে। এই বয়সেও টোল পড়াটা বেশ আকর্ষণীয়। তিনি আমার কাঁধে হাত রেখে হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ার ভঙ্গি করলেন। "তুই নিজেকে খুব আন্ডারএস্টিমেট করছিস। প্রেমে না পড়লে জীবন বৃথা। লাইফ ইজ নট আবাউট ক্যারিয়ার অ্যান্ড মানি। ইটস আবাউট মোমেন্টস। কারো হাত ধরে চুপচাপ বসে থাকার নামই জীবন।" তার কথার রেশ ধরে আমি জিজ্ঞেস করলাম, "আন্টি, আপনার কি মনে আছে টিএসসির ওই দাস চত্বরের কথা? যেখানে আমরা একটু আগে পাশ কাটিয়ে এলাম?" আন্টির হাসিটা হঠাৎ ম্লান হয়ে গেল। তিনি দৃষ্টি সরিয়ে নিলেন। তাকিয়ে রইলেন রাস্তার পাশের রেলিংয়ের দিকে। "মনে থাকবে না কেন? ওখানেই তো আমার জীবনের প্রথম বড় ভুলটা করেছিলাম।" আমি অবাক হলাম। "ভুল বলছেন কেন? ওখানেই তো সৌরভ আঙ্কেলের সাথে আপনার পরিচয়, তাই না?"
আন্টি ম্লান হাসলেন। "হ্যাঁ। পঁচিশ বছর আগে। তখন আমি ফার্স্ট ইয়ারে। সৌরভ থার্ড ইয়ারে। টিএসসিতে কবিতা উৎসব হচ্ছিল। আমি ভলান্টিয়ার ছিলাম। সৌরভ এসে বলল, 'আপা, একটা ব্যাজ হবে?' আমি ব্যাজ পরিয়ে দিতে গিয়েছিলাম, পিনটা ওর আঙুলে ফুটে গেল। রক্ত বের হলো। ও হেসে বলল, 'রক্ত যখন নিলেন, তখন হৃদয়টাও নিয়ে নিন।' কী চিপ ডায়লগ! কিন্তু তখন ওটাই শেক্সপিয়রের সনেট মনে হয়েছিল।"
আমি মুগ্ধ হয়ে শুনছিলাম। সিনেমার মতো কাহিনী। "তারপর?" "তারপর প্রেম। তুমুল প্রেম। ক্লাস ফাঁকি দিয়ে ঘোরাঘুরি, রিকশায় হুড তুলে বসে থাকা, হাত ধরে কার্জন হলে হাঁটা। তিন বছর পর বিয়ে। ফ্যামিলির অমতে বিয়ে করেছিলাম। তারপর ও স্কলারশিপ পেল, আমরা আমেরিকা চলে গেলাম। মনে হলো রূপকথার গল্প। হ্যাপিলি এভার আফটার।"
"তারপর সেই রূপকথা ভাঙল কেন?" আমি খুব সাবধানে প্রশ্নটা করলাম। আন্টি চুপ করে রইলেন কিছুক্ষণ। রিকশা একটা স্পিডব্রেকার পার হলো। ঝাঁকুনিতে আন্টি আমার ওপর এসে পড়লেন। তিনি সরে গেলেন না। বরং আমার হাতটা ধরলেন। তার হাতটা ঠান্ডা। "কেন ভাঙল? সত্যি বলতে কি, আমি নিজেও জানি না তন্ময়। কোনো বড় ঝগড়া হয়নি। কোনো মারামারি, পরকীয়া—কিছুই না। জাস্ট একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে মনে হলো, আমরা দুজন একই ছাদের নিচে থাকি, কিন্তু আমরা দুজন দুই গ্রহে বাস করি। আমাদের কথা বলার কিছু নেই। ও ওর ক্যারিয়ার নিয়ে বিজি, আমি আমার জগত নিয়ে। আমরা একে অপরের দিকে তাকাতাম, কিন্তু দেখতাম না।"
তনিমা আন্টি থামলেন। একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, "আসলে কী জানিস? আমাদের কোনো বাচ্চা ছিল না। তোর বাবা-মা, মানে রাশেদা আর জামিল ভাই—ওদের মধ্যেও হয়তো অনেক অমিল ছিল। হয়তো ওরাও অনেকবার ভেবেছে আলাদা হয়ে যাবে। কিন্তু তোরা ছিলি। তুই আর মৃন্ময়। তোরা হলি সেই সিমেন্ট, যা একটা নড়বড়ে দেয়ালকে ধসতে দেয় না। স্বামী-স্ত্রী যখন নিজেদের মুখের দিকে তাকিয়ে বিরক্তি বোধ করে, তখন তারা সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে সব ভুলে যায়। কম্প্রোমাইজ করে। আমাদের সেই কম্প্রোমাইজ করার রিজনটা ছিল না। আমাদের শুধু একে অপরের ভুলগুলো চোখে পড়ত। একটা সময় মনে হলো, এভাবে থাকার চেয়ে আলাদা থাকাই ভালো। উই জাস্ট ড্রিফটেড অ্যাপার্ট।"
আন্টির কথাগুলো কানে বাজছিল। আমাদের সমাজে ডিভোর্সকে খুব বড় কোনো ট্র্যাজেডি বা স্ক্যান্ডাল হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু মাঝেমধ্যে এটা কেবল দুটো মানুষের ক্লান্তির ফলাফল। আমি আমার বাবা-মায়ের কথা ভাবলাম। তাদের ঝগড়া আমি দেখেছি। মায়ের চিৎকার, বাবার নীরবতা। কিন্তু পরক্ষণেই তারা আমার বা মৃন্ময়ের রেজাল্ট বা অসুখ নিয়ে এক হয়ে গেছেন। আমাদের অস্তিত্বই তাদের সম্পর্কটাকে টিকিয়ে রেখেছে। আন্টির সেই আঠাটা ছিল না।
রিকশা এখন রমনা পার্কের পাশ দিয়ে মগবাজারের দিকে যাচ্ছে। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হচ্ছে। আকাশের রং ধূসর থেকে কালচে নীল হচ্ছে। রাস্তার ল্যাম্পপোস্টগুলো জ্বলে উঠেছে। এই পুরোটা সময় রিকশার সিটে আমাদের শরীর বারবার পরস্পরের সাথে স্পর্শ লাগছিল। ঢাকা শহরের রিকশার সিটগুলো খুব একটা প্রশস্ত হয় না। দুজন স্বাস্থ্যবান মানুষ বসলে নড়াচড়ার জায়গা থাকে না। আন্টি যদিও স্লিম, কিন্তু আমিও খুব রোগা নই। রিকশা যখন গর্তে পড়ে বা ব্রেক কষে, তখন ফিজিক্সের নিয়মেই আমরা একে অপরের গায়ে এসে পড়ি।
প্রথমদিকে আমার খুব অস্বস্তি হচ্ছিল। আমাদের সমাজে বয়সে বড় কোনো নারীর সাথে, বিশেষ করে মায়ের বয়সী কারো সাথে এভাবে গা ঘেঁষে বসাটা 'স্বাভাবিক' নয়। আমার অবচেতন মন আমাকে বারবার সতর্ক করছিল—"তন্ময়, একটু সরে বোস। তন্ময়, হাতটা সরা।" কিন্তু আন্টি ছিলেন সম্পূর্ণ নির্লিপ্ত। তিনি কথা বলতে বলতে উত্তেজনায় আমার উরুতে হাত রাখছেন, হাসতে হাসতে আমার কাঁধে মাথা ঠেকিয়ে দিচ্ছেন, কিংবা রিকশার ঝাঁকুনিতে আমার শরীরের ওপর হেলে পড়ছেন। তার মধ্যে কোনো আড়ষ্টতা নেই। কোনো সংকোচ নেই। তার স্পর্শে কোনো যৌনতা ছিল না, ছিল এক ধরণের নির্ভরতা। এক ধরণের আপনবোধ।
তিনি যখন হাসতে হাসতে আমার হাত চেপে ধরছিলেন, তখন মনে হচ্ছিল তিনি আমাকে 'ছেলে' বা 'ভাইপো' হিসেবে দেখছেন না, তিনি আমাকে দেখছেন একজন সঙ্গী হিসেবে। একটা মানুষ, যে তার কথাগুলো শুনছে। তার একাকীত্বের ভাগীদার হচ্ছে। ধীরে ধীরে আমার অস্বস্তিটা কাটতে শুরু করল। আমি বুঝতে পারলাম, সমস্যাটা আন্টির না, সমস্যাটা আমার এবং আমার সমাজের। আমরা সব স্পর্শের মধ্যে পাপ খুঁজি। সব সম্পর্কের মধ্যে নাম খুঁজি। কিন্তু কিছু মুহূর্ত থাকে যখন কোনো নাম বা সম্পর্কের চেয়ে পাশে থাকাটা বেশি জরুরি। আন্টি এখন একা। এই বিশাল শহরে, এই জ্যামের মধ্যে, তার পাশে আমি ছাড়া কেউ নেই। এই সামান্য স্পর্শটুকু হয়তো তাকে সাহস জোগাচ্ছে। তাকে মনে করিয়ে দিচ্ছে যে তিনি অদৃশ্য নন।
আমিও একসময় নিজেকে ছেড়ে দিলাম। রিকশা যখন জোরে ব্রেক কষল, আমি আন্টিকে ধরে সামলালাম। তিনি আমার দিকে তাকিয়ে হাসলেন। "থ্যাঙ্কস। তোর রিফ্লেক্স ভালো।" আমি বললাম, "আপনার বডিগার্ড, ভুলে গেলেন?"
"হুঁ, হ্যান্ডসাম বডিগার্ড।"
রাত সাতটার দিকে আমরা ধানমন্ডির দিকে ফিরছিলাম। সাতাশ নম্বর মোড় পার হয়ে বত্রিশ নম্বরের দিকে ঢুকছে রিকশা। ধানমন্ডি লেকের ওপরের ব্রিজটায় হালকা বাতাস দিচ্ছে। নিচে লেকের পানিতে সোডিয়াম বাতির ছায়া কাঁপছে। আন্টি চুপ করে আছেন অনেকক্ষণ। তার হইচই করা ভাবটা কমে গেছে। তাকে খুব ক্লান্ত দেখাচ্ছে। শরীরের ক্লান্তি নয়, মনের ক্লান্তি। পুরনো স্মৃতি ঘাঁটাঘাঁটি করলে মানুষ ক্লান্ত হয়ে পড়ে।
ব্রিজের ওপর রিকশা উঠতেই আন্টি বললেন, "তন্ময়, আজকের দিনটার জন্য থ্যাঙ্ক ইউ।" আমি বললাম, "থ্যাঙ্ক ইউ কেন আন্টি? আমিও তো ঘুরলাম। ভালোই লাগল।" আন্টি আমার দিকে তাকালেন। আবছা আলোয় তার চোখ দুটো চকচক করছে। "শুধু ঘোরার জন্য না। আমার বকবক শোনার জন্য। আমাকে জাজ না করার জন্য। আর..." তিনি বাক্যটা শেষ করলেন না। হাতটা আলতো করে আমার হাতের ওপর রাখলেন। "তোর মা খুব লাকি রে। খুব লাকি।" আমি বুঝতে পারলাম, তিনি শুধু আমাকে নিয়ে বলছেন না। তিনি আমার মায়ের সংসারের কথা বলছেন। স্বামী, সন্তান, সংসার—এই যে একটা বৃত্ত, যা মাকে আগলে রেখেছে, সেটা আন্টির নেই। তিনি স্বাধীন, তিনি ধনী, তিনি আধুনিক—কিন্তু দিনশেষে তিনি একা। এই রিকশার সিটে আমার পাশে বসেও তিনি আসলে একা।
রিকশা ৩২ নম্বরের গলি দিয়ে সাউথ প্রশান্তির দিকে এগোচ্ছে। রাস্তার দুপাশে বড় বড় অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিং। প্রতিটি জানালায় আলো জ্বলছে। প্রতিটা আলোর পেছনে একটা করে গল্প আছে। কোনোটা পূর্ণতার, কোনোটা শূন্যতার। আমার পাশে বসা তনিমা আন্টি সেই শূন্যতার গল্পটা বহন করে নিয়ে চলেছেন। আমি শুধু আজকের বিকেলের জন্য সেই গল্পের শ্রোতা হলাম। আমাদের অসম ভ্রমণ শেষ হলো। কিন্তু আমার মনে হলো, এই ভ্রমণের রেশটা সহজে কাটবে না। আমার কাঁধে এখনো আন্টির মাথার স্পর্শ লেগে আছে। আর নাকে লেগে আছে শাহবাগ থেকে কেনা সেই রজনীগন্ধার ঘ্রাণ, যা এখন আন্টির কোলের ওপর নেতিয়ে পড়েছে।


![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)