22-01-2026, 01:29 AM
৩
অতিথি এবং মাছ নাকি তিন দিনের পর পচতে শুরু করে। এই প্রবাদটা কে আবিষ্কার করেছিলেন জানি না, তবে তিনি নিশ্চিতভাবে তনিমা আন্টিকে দেখেননি। গত তিন দিনে তিনি পচেননি, বরং আমাদের সংসারের ডাল-ভাতের সাথে আচারর মতো মিশে গেছেন। আচার যেমন খাবারের স্বাদ বাড়িয়ে দেয়, আবার বেশি হলে দাঁত টক করে দেয়—আন্টির অবস্থাও অনেকটা সেরকম।
আমার মা, রাশেদা চৌধুরী, একজন অত্যন্ত ধুরন্ধর রমণী। তিনি খুব কৌশলে আমাকে 'বলির পাঁঠা' বানালেন। তিন দিন টানা ছুটি কাটানোর পর আজ রবিবার তার অফিস খোলা। ব্যাংক খোলা মানেই মায়ের যুদ্ধক্ষেত্র প্রস্তুত। সকালবেলা নাশতার টেবিলে মা খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বোমার পিন খুললেন।
মা বললেন, "তন্ময়, শোন। আজ আমার ব্যাংকে অডিট আছে। ফিরতে রাত হবে। তোর বাবাও তো জানেই, মাসের শেষ দিকে তার নিঃশ্বাস ফেলার সময় থাকে না। বাসায় শুধু তনিমা একা। এটা কেমন দেখায় না?"
আমি পরোটা ছিড়ছিলাম। মায়ের কথার ভঙ্গি শুনেই বুঝলাম, সামনে বিপদ। আমি বললাম, "সমস্যা কী? আন্টি তো টিভি দেখতে পারেন। কিংবা মৃন্ময়ের সাথে লুডু খেলতে পারেন। মৃন্ময় তো বাসাতেই থাকে।"
মা চোখ পাকালেন। "মৃন্ময় ছোট মানুষ। ওর কলেজ আছে, কোচিং আছে। ও কি তনিমাকে সময় দিতে পারবে? তাছাড়া তনিমা বিদেশ থেকে এসেছে, ও কি সারাদিন চার দেয়ালের ভেতর বসে থাকার জন্য এসেছে?" আমি আমতা আমতা করে বললাম, "তাহলে কী করতে হবে?"
"তুই আজ ভার্সিটিতে যাবি না। ক্লাস তো রোজই করিস। দুই-একদিন ক্লাস মিস দিলে মহাভারত অশুদ্ধ হবে না। তুই তনিমাকে সময় দিবি। ও যদি কোথাও যেতে চায়, নিয়ে যাবি। আড্ডা দিবি। তোর তো কথার স্টকের অভাব নেই, ওগুলো আজ কাজে লাগা।"
আমার বাবা চুপচাপ ডিম ভাজি খাচ্ছিলেন। তিনি এই আলোচনায় অংশ নিলেন না। তিনি জানেন, এই বাড়িতে মায়ের সিদ্ধান্তের ওপর ভেটো দেওয়ার ক্ষমতা কারো নেই। আমি দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। আমার আজ 'আন্তর্জাতিক সম্পর্ক' এর ক্লাস ছিল, সেখানে স্যার হয়তো 'কোল্ড ওয়ার' বা স্নায়ুযুদ্ধ নিয়ে পড়াতেন। কিন্তু এখন আমাকে বাসায় থেকে 'হট ওয়ার' সামলাতে হবে।
নাশতা শেষ করে মা এবং বাবা বেরিয়ে গেলেন। বাসাটা হঠাৎ করেই শান্ত হয়ে গেল। কিন্তু এই শান্তি বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। তনিমা আন্টি তার রুম থেকে বের হলেন। গত তিন দিনে আন্টির একটা বিশাল পরিবর্তন লক্ষ্য করছি। প্রথম দিন এয়ারপোর্টে তাকে দেখে মনে হয়েছিল তিনি হলিউডের কোনো সেট থেকে পালিয়ে এসেছেন। কিন্তু এখন তাকে দেখে মনে হচ্ছে তিনি এই ঢাকা শহরের আবহাওয়ার সাথে একটা সন্ধি করে ফেলেছেন। তার সেই 'বাংলিশ' টানটা কমে গেছে। ইংরেজি শব্দের তোড় এখন আর আগের মতো নেই। বরং তিনি এখন কথায় কথায় এমন সব খাঁটি বাংলা শব্দ ব্যবহার করছেন যা শুনে আমি চমকে যাচ্ছি।
আন্টি আজ একটা সুতি সালোয়ার কামিজ পরেছেন। হালকা আকাশী রঙ। চুলগুলো একটা ক্লিপ দিয়ে আটকানো। তাকে বেশ স্নিগ্ধ লাগছে। তিনি ডাইনিং টেবিলে এসে বসলেন।
"কিরে তন্ময়, তোর মা তো পালল। তুইও কি পালাবি নাকি?" আমি হাসলাম। "পালাব কোথায় আন্টি? আমাকে তো পাহারাদার হিসেবে রেখে যাওয়া হয়েছে। আমি এখন আপনার বডিগার্ড কাম গাইড।" আন্টি চায়ের কাপে চুমুক দিলেন। তার হাতে একটা ধোঁয়া ওঠা মগ। তিনি বললেন, "বডিগার্ড লাগবে না। তবে গাইড লাগতে পারে। আচ্ছা শোন, আজ আবহাওয়াটা কেমন বল তো?" আমি জানালার দিকে তাকালাম। "টিপিক্যাল ঢাকা ওয়েদার। রোদ আছে, ধুলো আছে, আর বাতাসে হিউমিডিটি আছে। সব মিলিয়ে এক জগাখিচুড়ি অবস্থা।" আন্টি বললেন, "পারফেক্ট! চ, আজ বের হব।"
"কোথায় যাবেন? শপিং মল? যমুনা ফিউচার পার্ক?" আন্টি ভুরু কুঁচকে তাকালেন। "তুই কি আমাকে শপিং ফ্রিক ভাবিস? আমি কি শাড়ি-গয়না কিনতে এসেছি? ওসব তো অনলাইনেও কেনা যায়। আমি এমন জায়গায় যেতে চাই যেখানে প্রাণ আছে।" আমি কৌতুহলী হয়ে তাকালাম। "প্রাণ? চিড়িয়াখানায় যাবেন?" আন্টি শব্দ করে হাসলেন। "তোর সেন্স অফ হিউমার সত্যিই ভালো। না, চিড়িয়াখানায় না। আমি আমার ক্যাম্পাসে যেতে চাই। ঢাকা ইউনিভার্সিটি।" আমি একটু নড়েচড়ে বসলাম। "ক্যাম্পাস? আজ তো রবিবার, প্রচুর ভিড় হবে। তাছাড়া এখন তো সব বদলে গেছে আন্টি। আপনার সময়ের সেই রোমান্টিক ক্যাম্পাস এখন আর নেই। এখন শুধু পলিটিক্স আর মিছিল।" আন্টি মগের দিকে তাকিয়ে একটু আনমনা হলেন। তারপর বললেন, "আমি কি পলিটিক্স দেখতে যাচ্ছি? আমি যাচ্ছি আমার নিজেকে খুঁজতে। বিশ বছর আগে আমি যে মেয়েটা ছিলাম, তাকে হয়তো কার্জন হলের কোনো এক কোণায় বা লাইব্রেরির বারান্দায় ফেলে গিয়েছিলাম। দেখি, খুঁজে পাই কি না।"
তার কথা শুনে আমি চুপ করে গেলাম। এই মহিলার ভেতর একটা অদ্ভুত গভীরতা আছে। তিনি যখন হালকা মেজাজে থাকেন, তখন মনে হয় তিনি পৃথিবীর সবচেয়ে অগভীর মানুষ। আর যখন সিরিয়াস হন, তখন মনে হয় তিনি অনেক কিছুই বোঝেন যা আমরা বুঝি না। আমি বললাম, "ঠিক আছে। আপনি যখন চাইছেন, যাব। আমি উবার ডাকি? এসি গাড়িতে গেলে ধুলোবালি লাগবে না।" আমি পকেট থেকে ফোন বের করতে যাচ্ছিলাম। আন্টি হাত বাড়িয়ে আমাকে থামিয়ে দিলেন। "উবার? ছিঃ! ক্যাম্পাসে কেউ উবার নিয়ে যায়? তুই কি পাগল?"
"তাহলে কীসে যাবেন? বাসে?"
"বাসে ওঠার বয়স আর এনার্জি কোনোটাই নেই। রিকশায় যাব।"
আমি আকাশ থেকে পড়লাম। "রিকশা? ধানমন্ডি থেকে ঢাকা ইউনিভার্সিটি? এই রোদে? আন্টি, আপনার কি সানস্ট্রোক করার ইচ্ছা আছে?" আন্টি দৃঢ় গলায় বললেন, "হোক সানস্ট্রোক। রিকশায় হুড ফেলে যাব। বাতাসের ঝাপটা লাগবে মুখে। শহরটাকে দেখতে হলে, শহরের গন্ধ পেতে হলে রিকশার কোনো বিকল্প নেই। কাঁচঘেরা গাড়িতে বসে শহর দেখা আর টেলিভিশনে ট্রাভেল শো দেখা একই ব্যাপার। আমি রিয়েলিটি চাই।"
আমি বুঝলাম, তর্ক করে লাভ নেই। তনিমা আন্টি যা ধরেন, তা করেই ছাড়েন। তার জেদের কাছে আমার লজিক টিকবে না। "আচ্ছা, ঠিক আছে। রিকশাতেই যাব। কিন্তু একটা রিকশা কি এতদূর যাবে?" আন্টি বললেন, "যাবে না মানে? আমরা পুরো দিনের জন্য রিকশা ভাড়া করব। ও আমাদের নিয়ে যাবে, ঘুরবে, অপেক্ষা করবে, আবার নিয়ে আসবে। টাকা যা লাগে দেব।"
আমি মৃন্ময়ের রুমের দিকে উঁকি দিলাম। ও কানে হেডফোন লাগিয়ে গেম খেলছে। সম্ভবত পাবজি। "মৃন্ময়, আমরা বের হচ্ছি। তুই কি যাবি?" মৃন্ময় হেডফোন নামিয়ে বলল, "কোথায়?"
"ক্যাম্পাসে। রিকশায় করে।"
মৃন্ময় আঁতকে উঠল। "রিকশায়? এই গরমে? ভাইয়া, তোমরা কি সুইসাইড মিশনে যাচ্ছ? আমি নেই। আমার বিকেলে কোচিং আছে। তোমরা এনজয় করো।" সে আবার গেমে মন দিল। আজকের জেনারেশন রিকশার রোমান্টিসিজম বোঝে না। তারা ভার্চুয়াল রিয়েলিটির কয়েদি। আমি তৈরি হওয়ার জন্য রুমে ঢুকলাম। জিন্স আর একটা ফতুয়া পরলাম। রোদে পোড়ার প্রস্তুতি। সানগ্লাসটা নিলাম। আন্টি তার ঘর থেকে বের হলেন। তিনি কাঁধে একটা ঝোলা ব্যাগ নিয়েছেন। পায়ে স্নিকার্স। মাথায় সেই ক্যাপটা নেই। চুলগুলো খোলা রেখেছেন।
"কী রে, রেডি?"
"জি আন্টি। চলুন, অগ্নিকুণ্ডে ঝাঁপ দেই।"
আন্টি হাসলেন। "তুই খুব নেগেটিভ চিন্তা করিস। পজিটিভ হ। ভাব, আজ একটা অ্যাডভেঞ্চারে যাচ্ছি।" আমরা লিফটে করে নিচে নামলাম। সাউথ প্রশান্তি অ্যাপার্টমেন্টের গেটের বাইরে দারোয়ান মোতালেব চাচা টুলে বসে পান চিবুচ্ছে। আমাদের দেখে উঠে দাঁড়াল।
রাস্তায় নামতেই রোদের তেজ টের পেলাম। মাথার ওপর সূর্যটা যেন রেগে আগুন হয়ে আছে। বেশ ঝক্কি পার করে ফাইনালি একটা রিকসা পাওয়া গেলো। আমরা রিকশায় উঠলাম। আন্টি বললেন, "হুড ফেলে দিন চাচা। আকাশ দেখব।" রিকশাওয়ালা হুড ফেলে দিল। আমি আর আন্টি পাশাপাশি বসলাম। রিকশার সিটটা খুব একটা প্রশস্ত না। আন্টির সাথে গা ঘেঁষে বসতে হলো। আমার একটু অস্বস্তি লাগছিল, কিন্তু আন্টির কোনো বিকার নেই। তিনি বেশ উত্তেজিত। রিকশা চলতে শুরু করল। ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ হচ্ছে চাকার। এই শব্দটা ঢাকা শহরের হার্টবিটের মতো।
মিরপুর রোড ধরে রিকশা এগোচ্ছে। বাতাসের ঝাপটা মুখে লাগছে। যদিও বাতাসটা গরম, তবুও খারাপ লাগছে না। আন্টি গভীর বুকভরে শ্বাস নিলেন। "আহ! এই গন্ধটা পাচ্ছিস তন্ময়?" আমি নাক টানলাম। "পেট্রল আর পোড়া মবিলের গন্ধ আন্টি।"
"না রে গাধা। এটা জীবনের গন্ধ। ঢাকার গন্ধ। এই গন্ধে একটা মায়া আছে। সিডনির বাতাস খুব ফ্রেশ, কিন্তু সেখানে কোনো গন্ধ নেই। সব কেমন যেন স্টেরাইল, হাসপাতালের মতো। আর এখানে দেখ, বাতাসে মশলা, ঘাম, ফুল, আর ধুলোর গন্ধ মিলেমিশে একাকার। ইটস ইনটক্সিকেটিং।"
আমি আন্টির দিকে তাকালাম। তার চোখে পানি চিকচিক করছে। বাতাসের কারণে, নাকি আবেগের কারণে বুঝতে পারলাম না। আমি বললাম, "আন্টি, আপনি তো বললেন ক্যাম্পাসটা আপনার ছিল। এখন আমাদের। এই কথাটা কেন বললেন?" আন্টি একটু হাসলেন। বিষাদমাখা হাসি।
"কারণ সময় কারো জন্য অপেক্ষা করে না রে। ওই করিডোরগুলো, ওই ক্লাসরুমগুলো, ওই শ্যাওলা ধরা দেয়ালগুলো—ওরা আমাদের চেনে না আর। আমরা এখন ওদের কাছে আগন্তুক। আমি যখন ছাত্রী ছিলাম, তখন মনে হতো পুরো পৃথিবীটা আমার পায়ের নিচে। মনে হতো আমরাই ইতিহাস গড়ব। আজ যখন যাব, দেখব নতুন সব মুখ। তাদের চোখে সেই একই স্বপ্ন, একই তেজ। আমি সেখানে শুধুই একজন দর্শক।"
তিনি থামলেন। তারপর আমার কাঁধে হাত রাখলেন। "তোর ক্যাম্পাস এখন তোর। তুই এখন নায়ক। আমি গেস্ট আর্টিস্ট। কিন্তু গেস্ট আর্টিস্ট হয়েও নিজের পুরনো স্টেজটা একবার দেখতে ইচ্ছে করে। দেখতে ইচ্ছে করে, স্টেজটা কি আগের মতোই আছে, নাকি বদলে গেছে।"
আমাদের রিকশা সাইন্সল্যাবের মোড়ে জ্যামে আটকাল। হকাররা চেঁচামেচি করছে। বাসগুলো হর্ন দিচ্ছে। ট্রাফিক পুলিশের বাঁশি। এই বিশৃঙ্খলার মাঝে বসে আমার মনে হলো, আন্টির কথাই ঠিক। এসি গাড়ির কাঁচের ভেতর দিয়ে এই জীবনকে স্পর্শ করা যায় না। এর অংশ হতে হলে এর উত্তাপটা সইতে হয়। আন্টি হুট করে একটা হকারকে ডাকলেন। "এই যে ভাই, আমড়া হবে? কাসুন্দি দিয়ে?"
আমি আঁতকে উঠলাম। "আন্টি! রাস্তার খোলা খাবার খাবেন? পেট খারাপ হবে তো!" আন্টি আমার কথা কানেই তুললেন না। "কিছু হবে না। আমার ইমিউনিটি সিস্টেম স্ট্রং হচ্ছে। তুই খাবি?" "না, আমি খাব না।" আন্টি ঠোঙা ভরে আমড়া কিনলেন। কাসুন্দি মাখানো কাঁচা আমড়া। তিনি বেশ আয়েশ করে কামড় দিলেন। "উফ! কত বছর পর খাচ্ছি! অমৃত!" তার খাওয়ার ভঙ্গি দেখে আমার জিভেও জল চলে এল। আমি বললাম, "দিন তো, এক টুকরো খেয়ে দেখি।" আন্টি হাসতে হাসতে আমার মুখে এক টুকরো আমড়া তুলে দিলেন। ঝাল, টক, আর নোনতা স্বাদে জিভটা অবশ হয়ে গেল। কিন্তু ভালো লাগল। ভীষণ ভালো লাগল।
রিকশা আবার চলতে শুরু করেছে। নীলক্ষেতের বইয়ের দোকানের সারি দেখা যাচ্ছে। সামনেই মুক্তি ও গণতন্ত্র তোরণ। আমরা এগিয়ে যাচ্ছি স্মৃতির শহরে। আমার পাশে বসা এই নারী, যিনি তিন দিন আগেও ছিলেন পুরোদস্তুর মেমসাহেব, এখন তিনি যেন আমার চেয়েও বেশি বাঙালি। তার চোখে এখন আর সানগ্লাস নেই, আছে এক জোড়া তৃষ্ণার্ত চোখ, যা এই শহরটাকে শুষে নিতে চাইছে।
আমি বললাম, "আন্টি, ওয়েলকাম টু মাই ক্যাম্পাস।" আন্টি বললেন, "থ্যাঙ্ক ইউ। বাট লেটস কারেক্ট ইট—ওয়েলকাম টু আওয়ার ক্যাম্পাস।"
অতিথি এবং মাছ নাকি তিন দিনের পর পচতে শুরু করে। এই প্রবাদটা কে আবিষ্কার করেছিলেন জানি না, তবে তিনি নিশ্চিতভাবে তনিমা আন্টিকে দেখেননি। গত তিন দিনে তিনি পচেননি, বরং আমাদের সংসারের ডাল-ভাতের সাথে আচারর মতো মিশে গেছেন। আচার যেমন খাবারের স্বাদ বাড়িয়ে দেয়, আবার বেশি হলে দাঁত টক করে দেয়—আন্টির অবস্থাও অনেকটা সেরকম।
আমার মা, রাশেদা চৌধুরী, একজন অত্যন্ত ধুরন্ধর রমণী। তিনি খুব কৌশলে আমাকে 'বলির পাঁঠা' বানালেন। তিন দিন টানা ছুটি কাটানোর পর আজ রবিবার তার অফিস খোলা। ব্যাংক খোলা মানেই মায়ের যুদ্ধক্ষেত্র প্রস্তুত। সকালবেলা নাশতার টেবিলে মা খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বোমার পিন খুললেন।
মা বললেন, "তন্ময়, শোন। আজ আমার ব্যাংকে অডিট আছে। ফিরতে রাত হবে। তোর বাবাও তো জানেই, মাসের শেষ দিকে তার নিঃশ্বাস ফেলার সময় থাকে না। বাসায় শুধু তনিমা একা। এটা কেমন দেখায় না?"
আমি পরোটা ছিড়ছিলাম। মায়ের কথার ভঙ্গি শুনেই বুঝলাম, সামনে বিপদ। আমি বললাম, "সমস্যা কী? আন্টি তো টিভি দেখতে পারেন। কিংবা মৃন্ময়ের সাথে লুডু খেলতে পারেন। মৃন্ময় তো বাসাতেই থাকে।"
মা চোখ পাকালেন। "মৃন্ময় ছোট মানুষ। ওর কলেজ আছে, কোচিং আছে। ও কি তনিমাকে সময় দিতে পারবে? তাছাড়া তনিমা বিদেশ থেকে এসেছে, ও কি সারাদিন চার দেয়ালের ভেতর বসে থাকার জন্য এসেছে?" আমি আমতা আমতা করে বললাম, "তাহলে কী করতে হবে?"
"তুই আজ ভার্সিটিতে যাবি না। ক্লাস তো রোজই করিস। দুই-একদিন ক্লাস মিস দিলে মহাভারত অশুদ্ধ হবে না। তুই তনিমাকে সময় দিবি। ও যদি কোথাও যেতে চায়, নিয়ে যাবি। আড্ডা দিবি। তোর তো কথার স্টকের অভাব নেই, ওগুলো আজ কাজে লাগা।"
আমার বাবা চুপচাপ ডিম ভাজি খাচ্ছিলেন। তিনি এই আলোচনায় অংশ নিলেন না। তিনি জানেন, এই বাড়িতে মায়ের সিদ্ধান্তের ওপর ভেটো দেওয়ার ক্ষমতা কারো নেই। আমি দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। আমার আজ 'আন্তর্জাতিক সম্পর্ক' এর ক্লাস ছিল, সেখানে স্যার হয়তো 'কোল্ড ওয়ার' বা স্নায়ুযুদ্ধ নিয়ে পড়াতেন। কিন্তু এখন আমাকে বাসায় থেকে 'হট ওয়ার' সামলাতে হবে।
নাশতা শেষ করে মা এবং বাবা বেরিয়ে গেলেন। বাসাটা হঠাৎ করেই শান্ত হয়ে গেল। কিন্তু এই শান্তি বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। তনিমা আন্টি তার রুম থেকে বের হলেন। গত তিন দিনে আন্টির একটা বিশাল পরিবর্তন লক্ষ্য করছি। প্রথম দিন এয়ারপোর্টে তাকে দেখে মনে হয়েছিল তিনি হলিউডের কোনো সেট থেকে পালিয়ে এসেছেন। কিন্তু এখন তাকে দেখে মনে হচ্ছে তিনি এই ঢাকা শহরের আবহাওয়ার সাথে একটা সন্ধি করে ফেলেছেন। তার সেই 'বাংলিশ' টানটা কমে গেছে। ইংরেজি শব্দের তোড় এখন আর আগের মতো নেই। বরং তিনি এখন কথায় কথায় এমন সব খাঁটি বাংলা শব্দ ব্যবহার করছেন যা শুনে আমি চমকে যাচ্ছি।
আন্টি আজ একটা সুতি সালোয়ার কামিজ পরেছেন। হালকা আকাশী রঙ। চুলগুলো একটা ক্লিপ দিয়ে আটকানো। তাকে বেশ স্নিগ্ধ লাগছে। তিনি ডাইনিং টেবিলে এসে বসলেন।
"কিরে তন্ময়, তোর মা তো পালল। তুইও কি পালাবি নাকি?" আমি হাসলাম। "পালাব কোথায় আন্টি? আমাকে তো পাহারাদার হিসেবে রেখে যাওয়া হয়েছে। আমি এখন আপনার বডিগার্ড কাম গাইড।" আন্টি চায়ের কাপে চুমুক দিলেন। তার হাতে একটা ধোঁয়া ওঠা মগ। তিনি বললেন, "বডিগার্ড লাগবে না। তবে গাইড লাগতে পারে। আচ্ছা শোন, আজ আবহাওয়াটা কেমন বল তো?" আমি জানালার দিকে তাকালাম। "টিপিক্যাল ঢাকা ওয়েদার। রোদ আছে, ধুলো আছে, আর বাতাসে হিউমিডিটি আছে। সব মিলিয়ে এক জগাখিচুড়ি অবস্থা।" আন্টি বললেন, "পারফেক্ট! চ, আজ বের হব।"
"কোথায় যাবেন? শপিং মল? যমুনা ফিউচার পার্ক?" আন্টি ভুরু কুঁচকে তাকালেন। "তুই কি আমাকে শপিং ফ্রিক ভাবিস? আমি কি শাড়ি-গয়না কিনতে এসেছি? ওসব তো অনলাইনেও কেনা যায়। আমি এমন জায়গায় যেতে চাই যেখানে প্রাণ আছে।" আমি কৌতুহলী হয়ে তাকালাম। "প্রাণ? চিড়িয়াখানায় যাবেন?" আন্টি শব্দ করে হাসলেন। "তোর সেন্স অফ হিউমার সত্যিই ভালো। না, চিড়িয়াখানায় না। আমি আমার ক্যাম্পাসে যেতে চাই। ঢাকা ইউনিভার্সিটি।" আমি একটু নড়েচড়ে বসলাম। "ক্যাম্পাস? আজ তো রবিবার, প্রচুর ভিড় হবে। তাছাড়া এখন তো সব বদলে গেছে আন্টি। আপনার সময়ের সেই রোমান্টিক ক্যাম্পাস এখন আর নেই। এখন শুধু পলিটিক্স আর মিছিল।" আন্টি মগের দিকে তাকিয়ে একটু আনমনা হলেন। তারপর বললেন, "আমি কি পলিটিক্স দেখতে যাচ্ছি? আমি যাচ্ছি আমার নিজেকে খুঁজতে। বিশ বছর আগে আমি যে মেয়েটা ছিলাম, তাকে হয়তো কার্জন হলের কোনো এক কোণায় বা লাইব্রেরির বারান্দায় ফেলে গিয়েছিলাম। দেখি, খুঁজে পাই কি না।"
তার কথা শুনে আমি চুপ করে গেলাম। এই মহিলার ভেতর একটা অদ্ভুত গভীরতা আছে। তিনি যখন হালকা মেজাজে থাকেন, তখন মনে হয় তিনি পৃথিবীর সবচেয়ে অগভীর মানুষ। আর যখন সিরিয়াস হন, তখন মনে হয় তিনি অনেক কিছুই বোঝেন যা আমরা বুঝি না। আমি বললাম, "ঠিক আছে। আপনি যখন চাইছেন, যাব। আমি উবার ডাকি? এসি গাড়িতে গেলে ধুলোবালি লাগবে না।" আমি পকেট থেকে ফোন বের করতে যাচ্ছিলাম। আন্টি হাত বাড়িয়ে আমাকে থামিয়ে দিলেন। "উবার? ছিঃ! ক্যাম্পাসে কেউ উবার নিয়ে যায়? তুই কি পাগল?"
"তাহলে কীসে যাবেন? বাসে?"
"বাসে ওঠার বয়স আর এনার্জি কোনোটাই নেই। রিকশায় যাব।"
আমি আকাশ থেকে পড়লাম। "রিকশা? ধানমন্ডি থেকে ঢাকা ইউনিভার্সিটি? এই রোদে? আন্টি, আপনার কি সানস্ট্রোক করার ইচ্ছা আছে?" আন্টি দৃঢ় গলায় বললেন, "হোক সানস্ট্রোক। রিকশায় হুড ফেলে যাব। বাতাসের ঝাপটা লাগবে মুখে। শহরটাকে দেখতে হলে, শহরের গন্ধ পেতে হলে রিকশার কোনো বিকল্প নেই। কাঁচঘেরা গাড়িতে বসে শহর দেখা আর টেলিভিশনে ট্রাভেল শো দেখা একই ব্যাপার। আমি রিয়েলিটি চাই।"
আমি বুঝলাম, তর্ক করে লাভ নেই। তনিমা আন্টি যা ধরেন, তা করেই ছাড়েন। তার জেদের কাছে আমার লজিক টিকবে না। "আচ্ছা, ঠিক আছে। রিকশাতেই যাব। কিন্তু একটা রিকশা কি এতদূর যাবে?" আন্টি বললেন, "যাবে না মানে? আমরা পুরো দিনের জন্য রিকশা ভাড়া করব। ও আমাদের নিয়ে যাবে, ঘুরবে, অপেক্ষা করবে, আবার নিয়ে আসবে। টাকা যা লাগে দেব।"
আমি মৃন্ময়ের রুমের দিকে উঁকি দিলাম। ও কানে হেডফোন লাগিয়ে গেম খেলছে। সম্ভবত পাবজি। "মৃন্ময়, আমরা বের হচ্ছি। তুই কি যাবি?" মৃন্ময় হেডফোন নামিয়ে বলল, "কোথায়?"
"ক্যাম্পাসে। রিকশায় করে।"
মৃন্ময় আঁতকে উঠল। "রিকশায়? এই গরমে? ভাইয়া, তোমরা কি সুইসাইড মিশনে যাচ্ছ? আমি নেই। আমার বিকেলে কোচিং আছে। তোমরা এনজয় করো।" সে আবার গেমে মন দিল। আজকের জেনারেশন রিকশার রোমান্টিসিজম বোঝে না। তারা ভার্চুয়াল রিয়েলিটির কয়েদি। আমি তৈরি হওয়ার জন্য রুমে ঢুকলাম। জিন্স আর একটা ফতুয়া পরলাম। রোদে পোড়ার প্রস্তুতি। সানগ্লাসটা নিলাম। আন্টি তার ঘর থেকে বের হলেন। তিনি কাঁধে একটা ঝোলা ব্যাগ নিয়েছেন। পায়ে স্নিকার্স। মাথায় সেই ক্যাপটা নেই। চুলগুলো খোলা রেখেছেন।
"কী রে, রেডি?"
"জি আন্টি। চলুন, অগ্নিকুণ্ডে ঝাঁপ দেই।"
আন্টি হাসলেন। "তুই খুব নেগেটিভ চিন্তা করিস। পজিটিভ হ। ভাব, আজ একটা অ্যাডভেঞ্চারে যাচ্ছি।" আমরা লিফটে করে নিচে নামলাম। সাউথ প্রশান্তি অ্যাপার্টমেন্টের গেটের বাইরে দারোয়ান মোতালেব চাচা টুলে বসে পান চিবুচ্ছে। আমাদের দেখে উঠে দাঁড়াল।
রাস্তায় নামতেই রোদের তেজ টের পেলাম। মাথার ওপর সূর্যটা যেন রেগে আগুন হয়ে আছে। বেশ ঝক্কি পার করে ফাইনালি একটা রিকসা পাওয়া গেলো। আমরা রিকশায় উঠলাম। আন্টি বললেন, "হুড ফেলে দিন চাচা। আকাশ দেখব।" রিকশাওয়ালা হুড ফেলে দিল। আমি আর আন্টি পাশাপাশি বসলাম। রিকশার সিটটা খুব একটা প্রশস্ত না। আন্টির সাথে গা ঘেঁষে বসতে হলো। আমার একটু অস্বস্তি লাগছিল, কিন্তু আন্টির কোনো বিকার নেই। তিনি বেশ উত্তেজিত। রিকশা চলতে শুরু করল। ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ হচ্ছে চাকার। এই শব্দটা ঢাকা শহরের হার্টবিটের মতো।
মিরপুর রোড ধরে রিকশা এগোচ্ছে। বাতাসের ঝাপটা মুখে লাগছে। যদিও বাতাসটা গরম, তবুও খারাপ লাগছে না। আন্টি গভীর বুকভরে শ্বাস নিলেন। "আহ! এই গন্ধটা পাচ্ছিস তন্ময়?" আমি নাক টানলাম। "পেট্রল আর পোড়া মবিলের গন্ধ আন্টি।"
"না রে গাধা। এটা জীবনের গন্ধ। ঢাকার গন্ধ। এই গন্ধে একটা মায়া আছে। সিডনির বাতাস খুব ফ্রেশ, কিন্তু সেখানে কোনো গন্ধ নেই। সব কেমন যেন স্টেরাইল, হাসপাতালের মতো। আর এখানে দেখ, বাতাসে মশলা, ঘাম, ফুল, আর ধুলোর গন্ধ মিলেমিশে একাকার। ইটস ইনটক্সিকেটিং।"
আমি আন্টির দিকে তাকালাম। তার চোখে পানি চিকচিক করছে। বাতাসের কারণে, নাকি আবেগের কারণে বুঝতে পারলাম না। আমি বললাম, "আন্টি, আপনি তো বললেন ক্যাম্পাসটা আপনার ছিল। এখন আমাদের। এই কথাটা কেন বললেন?" আন্টি একটু হাসলেন। বিষাদমাখা হাসি।
"কারণ সময় কারো জন্য অপেক্ষা করে না রে। ওই করিডোরগুলো, ওই ক্লাসরুমগুলো, ওই শ্যাওলা ধরা দেয়ালগুলো—ওরা আমাদের চেনে না আর। আমরা এখন ওদের কাছে আগন্তুক। আমি যখন ছাত্রী ছিলাম, তখন মনে হতো পুরো পৃথিবীটা আমার পায়ের নিচে। মনে হতো আমরাই ইতিহাস গড়ব। আজ যখন যাব, দেখব নতুন সব মুখ। তাদের চোখে সেই একই স্বপ্ন, একই তেজ। আমি সেখানে শুধুই একজন দর্শক।"
তিনি থামলেন। তারপর আমার কাঁধে হাত রাখলেন। "তোর ক্যাম্পাস এখন তোর। তুই এখন নায়ক। আমি গেস্ট আর্টিস্ট। কিন্তু গেস্ট আর্টিস্ট হয়েও নিজের পুরনো স্টেজটা একবার দেখতে ইচ্ছে করে। দেখতে ইচ্ছে করে, স্টেজটা কি আগের মতোই আছে, নাকি বদলে গেছে।"
আমাদের রিকশা সাইন্সল্যাবের মোড়ে জ্যামে আটকাল। হকাররা চেঁচামেচি করছে। বাসগুলো হর্ন দিচ্ছে। ট্রাফিক পুলিশের বাঁশি। এই বিশৃঙ্খলার মাঝে বসে আমার মনে হলো, আন্টির কথাই ঠিক। এসি গাড়ির কাঁচের ভেতর দিয়ে এই জীবনকে স্পর্শ করা যায় না। এর অংশ হতে হলে এর উত্তাপটা সইতে হয়। আন্টি হুট করে একটা হকারকে ডাকলেন। "এই যে ভাই, আমড়া হবে? কাসুন্দি দিয়ে?"
আমি আঁতকে উঠলাম। "আন্টি! রাস্তার খোলা খাবার খাবেন? পেট খারাপ হবে তো!" আন্টি আমার কথা কানেই তুললেন না। "কিছু হবে না। আমার ইমিউনিটি সিস্টেম স্ট্রং হচ্ছে। তুই খাবি?" "না, আমি খাব না।" আন্টি ঠোঙা ভরে আমড়া কিনলেন। কাসুন্দি মাখানো কাঁচা আমড়া। তিনি বেশ আয়েশ করে কামড় দিলেন। "উফ! কত বছর পর খাচ্ছি! অমৃত!" তার খাওয়ার ভঙ্গি দেখে আমার জিভেও জল চলে এল। আমি বললাম, "দিন তো, এক টুকরো খেয়ে দেখি।" আন্টি হাসতে হাসতে আমার মুখে এক টুকরো আমড়া তুলে দিলেন। ঝাল, টক, আর নোনতা স্বাদে জিভটা অবশ হয়ে গেল। কিন্তু ভালো লাগল। ভীষণ ভালো লাগল।
রিকশা আবার চলতে শুরু করেছে। নীলক্ষেতের বইয়ের দোকানের সারি দেখা যাচ্ছে। সামনেই মুক্তি ও গণতন্ত্র তোরণ। আমরা এগিয়ে যাচ্ছি স্মৃতির শহরে। আমার পাশে বসা এই নারী, যিনি তিন দিন আগেও ছিলেন পুরোদস্তুর মেমসাহেব, এখন তিনি যেন আমার চেয়েও বেশি বাঙালি। তার চোখে এখন আর সানগ্লাস নেই, আছে এক জোড়া তৃষ্ণার্ত চোখ, যা এই শহরটাকে শুষে নিতে চাইছে।
আমি বললাম, "আন্টি, ওয়েলকাম টু মাই ক্যাম্পাস।" আন্টি বললেন, "থ্যাঙ্ক ইউ। বাট লেটস কারেক্ট ইট—ওয়েলকাম টু আওয়ার ক্যাম্পাস।"


![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)