Thread Rating:
  • 4 Vote(s) - 2.5 Average
  • 1
  • 2
  • 3
  • 4
  • 5
Fantasy মুমতাহিনা টয়া: দিনের রাণী, রাতের দাসী
#31
 ১২।
গুলশানের ফ্ল্যাটে যখন তারা পৌঁছাল, তখন রাত বারোটা। গ্যারেজে গাড়ি ঢোকানোর সময় দারোয়ান গেট খুলে দিল। সে স্যালুট দিল। টয়া বা ইশতি কেউ তাকাল না। ইশতি গাড়ি পার্ক করল। তার শরীর এখনো কাঁপছে। ব্যথায়, অপমানে।


লিফটে ওঠার সময় টয়া আয়নায় নিজেকে দেখল। চুল উশকোখুশকো, ঠোঁট ফাটা, গালে হাতের ছাপ, গলায় কামড়ের দাগ। শাড়িটা কাদা আর ময়লায় মাখামাখি। নিজেকে তার মনে হলো কোনো ডাস্টবিন থেকে উঠে আসা পচা আবর্জনা।

ফ্ল্যাটের দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল তারা। 
পরিচিত এসি রুমের ঠান্ডা বাতাস, ল্যাভেন্ডার এয়ার ফ্রেশনারের গন্ধ। এই গন্ধটা আজ টয়াকে বিদ্রূপ করল। শাওনের সাজানো সংসার, দামী ফার্নিচার, দেয়ালে টাঙানো তাদের হাসিমুখের ছবিসব কিছু যেন টয়াকে ধিক্কার দিচ্ছে।

ইশতি দরজার কাছে দাঁড়িয়ে রইল। সে ভেতরে ঢুকতে চাইছে না। নিজেকে তার খুব ছোট
, খুব অপবিত্র মনে হচ্ছে। তার মনে হচ্ছে, এই পবিত্র ঘরে ঢোকার অধিকার তার নেই। টয়া ঘুরে দাঁড়াল। সে ইশতির দিকে তাকাল। তার চোখে কোনো ভাষা নেই।

“যা... গোসল করে নে...” টয়ার গলাটা যেন পাতাল থেকে এল। “গরম পানি দিয়ে... ডেটল দিয়ে... ঘষে ঘষে তোল সব... শরীর থেকে ওই জানোয়ারগুলোর গন্ধ তোল...”
ইশতি মাথা নিচু করে চলে গেল সার্ভেন্ট কোয়ার্টারের দিকে। তার পায়ে কোনো জোর নেই। টয়া নিজের বেডরুমে ঢুকল। দরজা লক করল। সে সোজা বাথরুমে গেল। শাওয়ার ছেড়ে দিল। গরম পানি। খুব গরম পানি।সে তার গা থেকে ছেঁড়া শাড়ি, ব্লাউজ সব খুলে ফেললতারপর বডি স্ক্রাবার দিয়ে নিজের শরীর ঘষতে শুরু করল। জোরে। খুব জোরে। চামড়া লাল হয়ে গেল, ছিলে গেল। তবুও সে ঘষতে থাকল। সে ওই লোকগুলোর স্পর্শ মুছে ফেলতে চায়। ওই লালা, ওই বীর্য, ওই নোংরা ঘ্রাণসব ধুয়ে ফেলতে চায়। তার মনে হলো তার শরীরের ভেতরটাও নোংরা হয়ে গেছে। সে আঙুল দিয়ে গলার ভেতর খুঁচিয়ে বমি করার চেষ্টা করল।

কিন্তু চামড়ার ওপরের ময়লা ধোয়া যায়, স্মৃতির ময়লা কি ধোয়া যায়? টয়া বাথটবের ফ্লোরে বসে পড়ল। পানির ধারা তার ওপর পড়ছে। সে তার দুই হাঁটুর মধ্যে মাথা গুঁজে দিল। এতদিন সে ভাবত পাপের মধ্যে একটা আনন্দ আছে। একটা রোমাঞ্চ আছে। আজ সে জানল, পাপ যখন তার আসল রূপ দেখায়, তখন তা কতটা কুৎসিত, কতটা বীভৎস হতে পারে। তার ফ্যান্টাসি তাকে এমন এক খাদে ফেলে দিয়েছে, যেখান থেকে উঠে আসা হয়তো আর সম্ভব নয়।
 
সেদিন রাতের সেই ভয়াবহ ঘটনার পর টয়া নিজেকে বাথরুমে বন্দি করে রেখেছিল। গরম পানিতে গা ঘষে ঘষে সে তার শরীরের ওপর লেগে থাকা নোংরামি ধুয়ে ফেলতে চেয়েছিল। কিন্তু যতই সে শরীর পরিষ্কার করছিল, তার মনের ভেতরের একটা সন্দেহ ততই গাঢ় হচ্ছিল। সন্দেহটা সাবানের ফেনার মতোপ্রথমে ছোট, তারপর বাড়তে বাড়তে পুরো মস্তিষ্ক দখল করে নিল।

পরের কয়েকটা দিন টয়া ছিল নিশ্চুপ। সে শ্যুটিংয়ে যায়নি
, ঘর থেকে বের হয়নি। শাওন ভেবেছে টয়া অসুস্থ, হয়তো ভাইরাল ফিভার। সে টয়ার সেবা করেছে, কপালে জলপট্টি দিয়েছে। টয়া শুয়ে শুয়ে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে সমীকরণ মিলিয়ে চলেছে। তার মনে পড়ল সেই জঙ্গলের ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ। চার-পাঁচজন লোক। হাতে অস্ত্র। চোখে লালসা। তারা টয়াকে ;., করেছে
, মারধর করেছে। কিন্তু তারা টয়ার পার্স থেকে আইফোন আর কিছু ক্যাশ টাকা ছাড়া আর কিছুই নেয়নি। টয়ার হাতে হীরের আংটি ছিল, গলায় প্লাটিনামের চেইন ছিল। অন্ধকারে হয়তো নজরে পড়েনি, কিন্তু ;., করার সময় তো পড়ার কথা। তারা নেয়নি।

সবচেয়ে বড় কথা
গাড়িটা। ল্যান্ডক্রুজার প্রাডো। কোটি টাকার গাড়ি। চোর-ডাকাত হলে সবার আগে গাড়িটা নিয়ে যেত, অথবা গাড়ির পার্টস খুলে নিত। তারা গাড়িটা অক্ষত রেখে গেছে। বলে গেছে‘দয়া করলাম’। ডাকাতরা দয়া করেআর ইশতি? ইশতিকে তারা গাছের সাথে বেঁধেছিল। ইশতি মার খেয়েছেকিন্তু তার মার খাওয়াটা কি একটু বেশিই নাটকীয় ছিল না? একটা রডের বাড়ি খেয়েই সে জ্ঞান হারাল? আর জ্ঞান ফিরল ঠিক তখনই যখন সব শেষ? টয়ার মনে পড়ল লিডার লোকটার কথা। সে বলেছিল, “ড্রাইভারের লগে শুইতে পারে, আর আমাগো লগে পারে না?” এই কথাটা কি শুধুই অনুমান? নাকি তারা জানত টয়া ড্রাইভারের সাথে কী করতে এসেছিল?

টয়ার মস্তিষ্কে সন্দেহের পোকাটা নড়েচড়ে বসল। ইশতি কি জানত? ইশতি কি এই সেটআপের অংশ? হতে পারে ইশতি তার বন্ধুদের বলেছিল। হয়তো টাকার বিনিময়ে, কিংবা নিজের পৌরুষ জাহির করার জন্য। হয়তো সে বলেছিল, “আমার ম্যাডাম খুব শৌখিন। সে নোংরামি পছন্দ করে। তোরা আয়, একটু ভয় দেখা। ম্যাডাম বুঝবে না। তোরাও মজা পাবি, আমিও হিরো সাজব।” কিংবা এমনও হতে পারে, ইশতি মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে টয়াকে ওই জঙ্গলে নিয়ে গিয়েছিল। ওই লোকগুলো হয়তো টয়াকে চিনত না, কিন্তু ইশতি চিনিয়ে দিয়েছে‘ইনি বড় মাল, ধরলে সমস্যা নাই, মানসম্মানের ভয়ে পুলিশে যাবে না।’

ওরা কয়েকবার ভান করেছে টয়াকে চেনে না। কিন্তু টয়া অভিনেত্রী। সে মানুষের চোখের ভাষা বোঝে। লিডার লোকটা যখন তার শরীরে হাত দিচ্ছিল, তার চোখে এক ধরণের চেনা আক্রোশ ছিল। যেন সে জানে সে কার গায়ে হাত দিচ্ছে। যেন সে কোনো বড় শিকার ধরেছে। এই ভাবনাটা টয়াকে ভিতর থেকে পাথর করে দিল। ;.,ের গ্লানি তাকে যতটা না কষ্ট দিয়েছিল, এই বিশ্বাসঘাতকতার সম্ভাবনা তাকে তার চেয়েও বেশি পুড়িয়ে দিল। ইশতি ছিল তার বিশ্বাসের জায়গা, তার অন্ধকারের সঙ্গী। সেই ইশতি যদি তাকে বিক্রি করে দেয়, তবে টয়া যাবে কোথায়?

টয়া সিদ্ধান্ত নিল। এই খেলার এখানেই ইতি। সে ইশতিকে কিচ্ছু জিজ্ঞেস করল না। কোনো কৈফিয়ত চাইল না। সে শুধু চুপ হয়ে গেল। এক ভয়াবহ, নিস্তব্ধ পাথর।

ইশতির অবস্থা তখন পাগলের মতো।
সে বুঝতে পারছে না কী হয়েছে। সে ভেবেছিল, এই ট্রমার পর টয়া আরও বেশি করে তাকে আঁকড়ে ধরবে। কারণ এই ভয়াবহ স্মৃতি তো শুধু তাদের দুজনের। এই গোপন ক্ষত তাদের আরও কাছে আনার কথা। কিন্তু টয়া তাকে এড়িয়ে চলছে। ইশতি গাড়ি বের করে গ্যারেজে দাঁড়িয়ে থাকে। টয়া লিফট দিয়ে নামে, ইশতির দিকে না তাকিয়েই পেছনের সিটে উঠে বসে। কালো চশমা পরা। ইশতি মিররে তাকায়, কিন্তু টয়া বাইরের দিকে তাকিয়ে থাকে।


“ম্যাডাম... শরীর কেমন?” ইশতি একদিন সাহস করে জিজ্ঞেস করেছিল।টয়া নির্বিকার গলায় উত্তর দিয়েছিল, “ড্রাইভ।” ব্যাস, ওই একটাই শব্দ। ইশতি ভেবেছিল টয়া হয়তো শকড। সময় লাগবে। কিন্তু এক সপ্তাহ, দুই সপ্তাহ, এক মাস পার হয়ে গেল। টয়া আর স্বাভাবিক হলো না। সে আবার সেই গুলশানের মেমসাহেব হয়ে গেল। সেই গুমোট ভাব, সেই আভিজাত্যের দেয়াল।


ইশতির শরীরের নেশা কাটছে না। সে টয়ার সেই নগ্ন রূপ দেখেছে
, সে টয়ার আর্তনাদ শুনেছে, সে টয়াকে ভোগ করেছে ট্রেনের বার্থে, গাড়ির সিটে। সেই স্মৃতি তাকে রাতে ঘুমাতে দেয় না। সে ছটফট করে। সে চায় টয়া আবার তাকে ডাকুক। আবার বলুক‘ইশতি, আমাকে নোংরা কর।’ কিন্তু ইন্টারকম আর বাজে না। মোবাইল সাইলেন্ট।

ইশতি ডেসপারেট হয়ে উঠল। ক্ষমতার স্বাদ আর নারীর শরীরের স্বাদ
দুটোই বড় মারাত্মক। একবার যে বাঘ মানুষের রক্তের স্বাদ পায়, সে আর শিকার ছাড়া থাকতে পারে না। ইশতি আকার-ইঙ্গিতে বোঝানোর চেষ্টা করল। গাড়ি চালানোর সময় সে ইচ্ছে করে হার্ড ব্রেক করে, যাতে টয়া সামনে ঝুঁকে পড়ে। সে গান বাজায়বিরহের গান। সে মিররে তাকিয়ে থাকে দীর্ঘক্ষণ।

কিন্তু টয়া তাকে এমনভাবে ইগনোর করে যেন ড্রাইভিং সিটে কোনো মানুষ নেই, একটা রোবট বসে আছে। টয়ার এই অবজ্ঞা ইশতিকে অপমানিত করতে লাগল। সে ভাবল, ‘কাজ ফুরালো তো সব ফুরালো? আমারে ব্যবহার কইরা এখন টিস্যুর মতো ফালায়া দিলি?’


একদিন ধৈর্যর বাঁধ ভাঙল। বিকেলবেলা। টয়া শ্যুটিং থেকে ফিরছে। শাওন বাসায় নেই। গাড়িটা যখন বাড়ির গ্যারেজে ঢুকল
, তখন চারপাশ অন্ধকার। দারোয়ান গেট বন্ধ করে তার রুমে গেছে। গ্যারেজে শুধু টয়া আর ইশতি।টয়া গাড়ি থেকে নামতে যাচ্ছিল। ইশতি দ্রুত নেমে এসে পেছনের দরজাটা আটকে দিল। সে নিজে পেছনের সিটে ঢুকে পড়ল। টয়া চমকে উঠল। “কী করছিস? দরজা খোল!”

ইশতি টয়ার হাত চেপে ধরল। তার চোখে সেই পুরনো কামনার আগুন, কিন্তুতাতে এখন মিশেছে ক্ষোভ।
“কেন ম্যাডাম? কেন এমন করতাছেন? আমি কি দোষ করছি? ওই দিনের ঘটনায় তো আমার কোনো হাত ছিল না। আমিও তো মাইর খাইছি। আপনারে বাঁচাইতে গিয়া আমি রক্ত দিছি। আর আপনি আমারে কুত্তার মতো খেদাইয়া দিতাছেন?” টয়া ঠান্ডা চোখে ইশতির দিকে তাকাল। তার চোখে ভয় নেই, আছে ঘৃণা। “হাত ছাড় ইশতি।”

“ছাড়মু না! আমারে পাওনা বুঝাইয়া দেন। আমার শরীর জ্বলে। আপনে আমারে নষ্ট করছেন। এখন আমারে ঠিক কইরা দেন। আমি আবার চাই। ওই জঙ্গল চাই, ওই ট্রেন চাই।” ইশতি টয়ার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে চাইল। সে টয়ার ঠোঁটে চুমু খেতে গেল জোর করে। “চুপ কর! আমারে আদর কর! আমি তোর ইশতি!”

‘চটাস!’
গ্যারেজের নিস্তব্ধতা ভেঙে একটা চড়ের শব্দ হলো।  টয়া তার সর্বশক্তি দিয়ে ইশতির গালে চড় বসাল। ইশতি থমকে গেল। সে গালে হাত দিয়ে অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে টয়ার দিকে তাকাল। টয়া ফুঁসছে। তার চোখ দিয়ে আগুন বের হচ্ছে। “তোর সাহস কত বড়! তুই আমার গায়ে হাত দিস? তুই একটা ড্রাইভার! সামান্য একটা ড্রাইভার! তোর যোগ্যতা কতটুকু? আমি তোকে করুণা করেছি। আমি তোকে আমার বিছানায় জায়গা দিয়েছি বলে তুই ভাবলি তুই আমার মালিক হয়ে গেছিস?” ইশতি অপমানিত বোধ করল। “আমি ড্রাইভার? তখন তো বলছিলেন আমি আপনার রাজা! তখন তো বলছিলেন আমি আপনার স্বামী!”

“তখন আমি নেশায় ছিলাম। এখন নেশা কেটে গেছে। তুই একটা ছোটলোক। তোর রক্তে ছোটলোকামি। ওই দিন জঙ্গলে যা হয়েছে, সব তোর সাজানো। তুই ভেবেছিস আমি বুঝি না? তুই আমাকে বিক্রি করেছিস ওই জানোয়ারগুলোর কাছে! কত টাকা পেয়েছিস রে? দশ হাজার? বিশ হাজার?” ইশতি আকাশ থেকে পড়ল। “কী কন ম্যাডাম! আমি বেচছি? আমি? আপনারে আমি পূজার মতো ভক্তি করি...”

“চুপ কর! একদম চুপ! আর একটা কথা বলবি না। কাল থেকে তোর চাকরি নেই। গেট আউট!” 
টয়া দরজা খুলে বেরিয়ে এল। সে লিফটের দিকে গটগট করে হেঁটে গেল। ইশতি গাড়ির ভেতরে বসে রইলতার গালে টয়ার আঙুলের দাগ জ্বলছে। কিন্তু তার চেয়েও বেশি জ্বলছে তার বুকের ভেতরটা। সে বুঝতে পারল, তার স্বপ্নের জগতটা ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। টয়া তাকে ছুড়ে ফেলে দিয়েছে।
 
পরের কয়েকদিন ইশতি উন্মাদের মতো আচরণ করতে লাগল। সে চাকরি হারায়নি, কারণ টয়া তাকে হুট করে বের করে দিলে শাওন সন্দেহ করতে পারে। টয়া চেয়েছিল ধীরে ধীরে তাকে বিদায় করতে। কিন্তু ইশতি এই সুযোগটা নিল। সে টয়াকে একা পাওয়ার চেষ্টা করতে লাগল। সুযোগ পেলেই সে টয়াকে হুমকি দিতে শুরু করল।

একদিন সকালে। শাওন জিমে গেছে। টয়া ব্যালকনিতে বসে কফি খাচ্ছে। ইশতি এসে দাঁড়াল।
“ম্যাডাম, কথা আছে।” টয়া কফির মগ নামিয়ে রাখল। “কী কথা? তোকে না বলেছি আমার সামনে আসবি না?” ইশতি বাঁকা হাসল। এই হাসিটা টয়ার চেনা নয়। এটা ব্ল্যাকমেইলারের হাসি। “আসতে তো হইবোই। ম্যাডাম, আমারে বিদায় করা অত সহজ না। আমি অনেক কিছু জানি।”

“কী জানিস তুই?”
“সব জানি। ট্রেনের ঘটনা জানি। বাথরুমের ঘটনা জানি। জঙ্গলের ঘটনা জানি। শাওন স্যাররে যদি কইয়া দেই? যদি মিডিয়ারে ডাইকা কইএই যে সতী-সাধ্বী টয়া ম্যাডাম, ইনি আসলে কী জিনিস? প্রমাণ লাগবো? আমার কাছে ভিডিও নাই, কিন্তু আমার শরীরের দাগ আছে। আপনার শরীরের তিল কোথায় আছে, আমি জানি। আদালত বিশ্বাস করব।” টয়া স্থির হয়ে বসে রইল। তার বুক কাঁপছে, কিন্তু সে চেহারায় প্রকাশ করল না। সে জানে, ইশতি এখন কোণঠাসা পশুর মতো। সে মরণ কামড় দেবে। “তুই আমাকে ব্ল্যাকমেইল করছিস?”

“ব্ল্যাকমেইল না, হক্কের পাওনা চাই। আমারে আবার আগের মতো আদর করেন। আমার লগে চলেন। তাইলে সব চুপ।” টয়া কফিতে চুমুক দিল। তার মস্তিষ্কে দ্রুত চিন্তা খেলছে। ইশতিকে বাঁচিয়ে রাখা আর নিরাপদ নয়। এই ছেলে এখন টাইম বোমা। সে যেকোনো সময় ব্লাস্ট হবে। আর এবার ব্লাস্ট হলে টয়ার ক্যারিয়ার, সংসার, সম্মানসব ধুলোয় মিশে যাবে। ইশতিকে থামাতে হবে। চিরতরে

টয়া হাসল। সেই পুরোনো, মায়াবী হাসি। সে উঠে এসে ইশতির কাঁধে হাত রাখল। “পাগল ছেলে! তুই ভাবলি আমি তোকে ভুলে গেছি? আমি তো শুধু তোকে পরীক্ষা করছিলাম। দেখছিলাম তোর ধৈর্য কতটুকু।” ইশতি বিভ্রান্ত হলো। “পরীক্ষা?”

“হ্যাঁ। আমি দেখতে চেয়েছিলাম তুই আমাকে কতটা চাস। তুই পাস করেছিস ইশতি। তোর এই রাগ, এই জেদ
এটাই তো আমি চেয়েছিলাম।”ইশতির চোখ চকচক করে উঠল। “তাইলে? তাইলে কেন দূরে সরায়া দিছিলেন?”

“কাছে টানার জন্যই তো দূরে সরাতে হয়। শোন, শাওন পরশুদিন আবার শ্যুটিংয়ে যাবে। তুই রেডি থাক।”
“কোথায় যামু? জঙ্গল?”
“না। জঙ্গল তো পুরনো হয়ে গেছে। আর ওখানে রিস্ক। এবার আমরা যাব তোর সেই স্বপ্নের জায়গায়। মনে আছে? সেই যে বলেছিলিট্রেনের লাইনের পাশে বস্তিতে?”

ইশতির মনে পড়ল। সে একবার বলেছিল তার খালাত ভাইয়ের ঘরের কথা। কিন্তু টয়া বলল অন্য প্ল্যান। “আমরা ট্রেনে যাব না। আমরা যাব তেজগাঁও রেললাইনের স্লিপারের ওপর। রাতের বেলা। ট্রেন আসবে, চলে যাবে। আর আমরা লাইনের পাশে ঘাসের ওপর... একদম খোলা আকাশের নিচে। ট্রেনের চাকার শব্দের সাথে আমাদের শব্দ মিশে যাবে।” ইশতি রোমাঞ্চিত হলো। “রেললাইন? মারাত্মক রিস্ক!”

“রিস্কই তো চাই। তুই বলেছিলি না আমার জন্য মরতে পারিস? দেখা যাক।”


রাত এগারোটা।
ঢাকা শহর তখনো পুরোপুরি ঘুমায়নি, কিন্তু তেজগাঁওয়ের রেললাইন এলাকাটা অন্যরকম। একপাশে বস্তি, অন্যপাশে অন্ধকার। ড্রাগ এডিক্ট আর ভাসমান মানুষদের আনাগোনা। মাঝে মাঝে ট্রেনের হুইসেল শোনা যায়।


টয়া আর ইশতি গাড়ি রেখে অনেকটা পথ হেঁটে এসেছে। টয়ার পরনে *
, ইশতির পরনে লুঙ্গি আর শার্ট। টয়া ইশতিকে বলেছে, “গাড়িটা দূরে রাখ। কেউ যেন না দেখে।” তারা রেললাইনের ধার ঘেঁষে হাঁটছে। পাথর আর স্লিপারের ওপর দিয়ে হাঁটা কষ্টকর। টয়া হোঁচট খাচ্ছে, ইশতি তাকে ধরে ফেলছে।

“আর কত দূর ম্যাডাম?” ইশতি জিজ্ঞেস করল।
“আরেকটুওই যে সামনে সিগন্যাল বাতি দেখা যাচ্ছে, ওটার নিচে।”

জায়গাটা নির্জন। দুই পাশে ঝোপঝাড়। দূরে বস্তির আলো টিমটিম করছে। এখান দিয়ে ট্রেন যাওয়ার সময় গতি কম থাকে না
, বেশ জোরেই যায়। টয়া থামল। “এখানে। এই জায়গাটা পারফেক্ট।”

ইশতি এদিক-ওদিক তাকাল। “এখানে তো বসারও জায়গা নাই। সব পাথর।”

টয়া তার *র পকেট থেকে একটা ছোট বোতল বের করল। দামী স্কচ। সে ইশতির দিকে বাড়িয়ে দিল।
“নে, আগে একটু সাহস করে নে। এটা শাওনের বোতল থেকে চুরি করেছি। এক টানে শেষ করবি।” ইশতি বোতলটা নিল। সে মহাখুশি। ম্যাডাম তার জন্য মদ এনেছে। সে ছিপি খুলে এক চুমুকে অনেকটা গিলে ফেলল। কড়া মদ। ইশতির গলা জ্বলে গেল, কিন্তু শরীরটা গরম হয়ে উঠল।

“উফফ! জবর জিনিস!”
টয়া ইশতির কাছে ঘেঁষে দাঁড়াল। সে ইশতির শার্টের বোতাম খুলতে লাগল। “ইশতি... ট্রেন আসছে। শব্দ পাচ্ছিস?” দূরে ট্রেনের হুইসেল শোনা যাচ্ছে। ঝিক-ঝিক শব্দটা ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে। মাটির নিচে কম্পন অনুভূত হচ্ছে। “হ, শুনতাছি। ট্রেন আইলে কী করমু?” ইশতি নেশাগ্রস্ত গলায় বলল। মদের নেশা আর টয়ার শরীরের নেশা তাকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছে। “ট্রেন যখন একদম কাছে আসবে, তখন তুই লাইনের ওপর দাঁড়াবি। আমি দেখব তোর সাহস। ট্রেন তোর গা ঘেঁষে চলে যাবে, আর তুই নড়বি না। এটা হলো আমাদের ‘ডেথ গেম’। যদি পারিস, তবে আজ রাতে আমি তোর।”

ইশতি হাসল। “এইডা কোনো ব্যাপার? আমি ইশতি। আমি ট্রেনের লগেও পাল্লা দিতে পারি।” মদটা তার মস্তিষ্কে কাজ করছে। হিতাহিত জ্ঞান লোপ পেয়েছে। সে টয়ার কথা মতো লাইনের স্লিপারের ওপর গিয়ে দাঁড়াল। ট্রেনটা কাছে আসছে। হেডলাইটের তীব্র আলো অন্ধকারের বুক চিরে এগিয়ে আসছে। দানবীয় শব্দ। মাটি কাঁপছে। হুইসেল বাজছে একটানা‘পোঁওওওওওও...’ টয়া লাইন থেকে কয়েক হাত দূরে দাঁড়িয়ে আছে। অন্ধকারে তার চোখ জ্বলছে। “দাঁড়িয়ে থাক ইশতি! নড়বি না! আমাকে তোর সাহস দেখা!” টয়া চিৎকার করে বলল। শব্দের কারণে তার গলা শোনা যাচ্ছে কি না সন্দেহ।

ইশতি লাইনের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। সে হাত দুপাশে ছড়িয়ে দিয়েছে। সে ভাবছে সে সিনেমার হিরো। সে ভাবছে এই ট্রেন তাকে মারবে না, বরং তাকে স্যালুট দিয়ে চলে যাবে। টয়া দেখছে। টয়া তার প্রেমিকা, তার দাসী। সে টয়াকে ইম্প্রেস করবে। ট্রেনটা এখন মাত্র একশ গজ দূরে। আলোয় ইশতির চোখ ধাঁধিয়ে যাচ্ছে। শব্দটা এখন কানের পর্দা ফাটিয়ে দিচ্ছে। ইশতি হঠাৎ ভয় পেল। সে নড়তে চাইল। সে সরে আসতে চাইল। “ম্যাডাম! সরি! আমি পারমু না!”

কিন্তু ইশতি নড়তে পারল না। তার পা যেন পাথরের সাথে আটকে গেছে। মদের নেশায় তার রিফ্লেক্স কমে গেছে। সে টলছে। টয়া দৌড়ে এল না। টয়া হাত বাড়াল না। সে অন্ধকারের আড়ালে দাঁড়িয়ে রইল। তার ঠোঁটে এক নিষ্ঠুর হাসি। সে মনে মনে বলল
, “গুডবাই, ইশতি। তোর পাপের শাস্তি এটাই।”

মুহূর্তের মধ্যে দানবটা এসে পড়ল। বাতাসের ঝাপটা। আলোর ঝলকানি। আর একটা বিকট শব্দ
‘ধপাস!’

ইশতির শরীরটা ট্রেনের ইঞ্জিনের ধাক্কায় ছিটকে পড়ল লাইনের পাশে। কোনো সিনেমার দৃশ্য নয়, নির্মম বাস্তব। রক্তমাংসের শরীর লোহার সাথে পেরে উঠল না। 
ট্রেনটা চলে গেল। ঝড় তুলে, ধুলো উড়িয়ে। পেছনের লাল আলোটা অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।

টয়া এগিয়ে এল। ইশতি পড়ে আছে লাইনের পাশে, ঝোপের মধ্যে। তার শরীরটা দুমড়েমুচড়ে গেছে। মুখটা চেনার উপায় নেই। অদ্ভুত ভঙ্গিতে হাত-পা বেঁকে আছে। 
টয়া ইশতির দিকে তাকাল। তার কোনো ভাবান্তর হলো না। না কান্না, না হাসি, না ভয়। সে শুধু দেখলএকটা সমস্যা শেষ হলো। একটা টাইম বোমা নিষ্ক্রিয় হলো সে নিচু হয়ে ইশতির পকেট থেকে তার মোবাইলটা বের করে নিল। এটাই একমাত্র প্রমাণ। তারপর সে মদের বোতলটা ইশতির হাতের কাছে ফেলে দিল। যাতে পুলিশ ভাবে মাতাল অবস্থায় এক্সিডেন্ট।

টয়া ফিরল একা। অন্ধকার পথ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে সে একবারও পেছনে তাকাল না। তার মনে হলো, আজ সে সত্যিই মুক্ত। শাওনের ওই ‘পবিত্র’ ভালোবাসা আর ইশতির ‘নোংরা’ ব্ল্যাকমেইলদুটোর মাঝখানে সে তার নিজের রাস্তা খুঁজে পেয়েছে। রাস্তাটা কঠিন, একাকী, কিন্তু নিরাপদ।

পরদিন খবরের কাগজে ছোট করে খবর এল
‘তেজগাঁও রেললাইনে কাটা পড়ে অজ্ঞাত যুবকের মৃত্যু। পুলিশের ধারণা মদ্যপ অবস্থায় দুর্ঘটনা।’ শাওন সকালে নাস্তার টেবিলে কাগজ পড়ছিল। “আরে দেখো টয়া, তেজগাঁওয়ে একটা এক্সিডেন্ট হয়েছে। আমাদের ড্রাইভার ইশতি না? ও তো কাল থেকে নিখোঁজ। ওর ফোনের সুইচ অফ। খবরটা দেখো তো?”


টয়া কফিতে চুমুক দিয়ে নির্বিকারভাবে বলল
, “হতে পারে। আজকালকার ছেলেপেলেরা যা নেশা করে! আমি তো আগেই বলেছিলাম ওকে বের করে দাও। নেশাখোর ড্রাইভার রাখা রিস্কি।”

শাওন দীর্ঘশ্বাস ফেলল। “বেচারা! অল্প বয়স ছিল। ভালো গাড়ি চালাত।”
“বাদ দাও তো। নতুন ড্রাইভার খুঁজতে হবে। এজেন্সিতে বলে দাও।”


মাসখানেক পর।
গুলশানের ফ্ল্যাটের গ্যারেজে নতুন ড্রাইভার এসেছে। নাম মতলব মিয়া। বয়স পঁয়তাল্লিশ-ছেচল্লিশ হবে। মাথায় টাক, মুখে কাঁচাপাকা দাড়ি। মানুষটা অত্যন্ত নিরীহ, ভীতু প্রকৃতির। পান খায়, কিন্তু ম্যাডামের সামনে মুখ খোলে না। গাড়ি চালায় খুব সাবধানে, চল্লিশের ওপরে স্পিড তোলে না।


টয়া পেছনের সিটে বসে। তার চোখে কালো চশমা। সে মিররে তাকায়। মতলব মিয়া একবারও পেছনের সিটে তাকায় না। সে শুধু রাস্তা দেখে। টয়া দীর্ঘশ্বাস ফেলে। এই নিরাপত্তা তার দরকার ছিল। কিন্তু মাঝে মাঝে
, খুব গভীর রাতে, যখন শাওন পাশে ঘুমিয়ে থাকে, টয়ার নাকে একটা গন্ধ এসে লাগে। সস্তা তামাক আর ঘামের গন্ধ। সে ধড়মড় করে উঠে বসে। ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়ায়।

নিচে রেললাইনের শব্দ শোনা যায় না গুলশান থেকে। কিন্তু টয়া শুনতে পায়। ঝিক-ঝিক... ঝিক-ঝিক... সে জানে
, ইশতি মরে গেছে। কিন্তু টয়ার ভেতরের সেই অন্ধকার কামরাটা? ওটা কি মরেছে? নাকি ওটা নতুন কোনো শিকারের অপেক্ষায় আছে?

টয়া আয়নায় নিজের প্রতিবিম্ব দেখে। চৌত্রিশ বছরের টয়া। সুন্দরী
, সফল, সুখী। কিন্তু তার চোখের গভীরে একটা ছায়া। সেই ছায়াটা ইশতির। কিংবা হয়তো তার নিজের পাপের।

সে লিপস্টিক দিয়ে ঠোঁট রাঙায়। লাল টকটকে রং। রক্তের মতো লাল। “জীবন সুন্দর,” টয়া নিজের মনে বলে। “যতক্ষণ পর্যন্ত তুমি জানো লাশটা কোথায় লুকিয়ে রেখেছ।” 
গাড়ি স্টার্ট হয়। মতলব মিয়া বিনীত গলায় বলে, “ম্যাডাম, কই যামু?” টয়া জানালা দিয়ে বাইরে তাকায়। “সোজা চলো। একদম সোজা। কোথাও থামবে না।”

গাড়ি চলতে থাকে। টয়ার জীবনও চলতে থাকে। শুধু তেজগাঁওয়ের রেললাইনের পাশে একটা আকাশমনি গাছ হয়তো মনে রেখেছেএক রাতে এখানে এক রানীর সাথে এক গোলামের দেখা হয়েছিল, আর সেই গোলাম তার স্পর্ধার দাম দিয়েছিল জীবন দিয়ে।
সমাপ্ত
[+] 4 users Like Orbachin's post
Like Reply


Messages In This Thread
RE: মুমতাহিনা টয়া: দিনের রাণী, রাতের দাসী - by Orbachin - 12-01-2026, 01:06 AM



Users browsing this thread: 1 Guest(s)