09-01-2026, 07:05 PM
সকালে আউটডোর করার তাড়া থাকায় অনীক খুব বেশীক্ষণ অনামিকার কাছে থাকতে পারে নি। আর এতোদিন পর দুজনের এইভাবে দেখা হওয়ার মধ্যে যে জড়তা সেটা অনীকের কাটলেও অনামিকার সেভাবে কাটে নি। অনীকের কথার উত্তরে সামান্য হ্যাঁ না ছাড়া আর কিছুই বলে নি ও। অনীকও জানতো, প্রথম দেখায় একটা মেয়ের এই লজ্জাবোধ কাটতে কিছুটা সময় লাগবে, তাই ও তখনকার মতো চলে যায়। সময় দরকার অনামিকার। হাজার হলেও জীবনের প্রথম যৌনতার স্মৃতি ভোলা একটা নারীর পক্ষে সহজ কাজ না একজন পুরুষের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা অনেকটাই ভিন্ন। আগের কোন কথার রেশ টেনে কিছুই বলে নি অনীক।
বিকালে যখন ঢোকে তখন অনামিকা চুপ করে শুয়ে আছে। পর্দা সরানোতে ঘাড় ঘুরিয়ে অনীককে দেখে সামান্য হাসে। নিজে থেকেই উঠে বসতে যায়। তবে শরীর যে দূর্বল সেটা ওঠার ভাবেই বোঝা যাচ্ছে। বাধা দেয় অনীক, " থাক.....উঠতে হবে না। "
অনামিকা শোনে না, পা ভাঁজ করে বসে বলে, " শুয়ে শুয়ে তো হাত পা অসাড় হয়ে যাচ্ছে...."
" কেমন আছো? " অনীকই কথা শুরু করে।
অনামিকা মাথা নাড়ায়, " ভালো"
" বসতে পারি? " অনীক হাসে।
" আচ্ছা মুশকিল..... এটা তো তোমারই হাসপাতাল " এখন অনেকটা সহজ হয়েছে অনামিকা।
একটা চেয়ার টেনে নিয়ে অনামিকার পাশে বসে অনীক। অনামিকা মুখ নীচু করে হাতের আঙুল দেখছে।
" একটা কথা বলবো? যদি কিছু মনে না করো। " অনীক সামান্য দ্বিধা করে।
অনামিকা সম্মতির দৃষ্টিতে তাকায়। মুখে কিছু বলে না।
" মানে, তোমার শ্বশুর বাড়ি বা বাপের বাড়ির কাউকে দেখছি না......"
অনামিকা জানতো এই প্রশ্ন আসবেই। ও ঠোঁটের কোনে হাসি রেখেই বলে, " আমি তো কারো সাথে থাকি না, একাই থাকি। "
" হ্যাঁ, সেটা জানি, তুমি এখানেই একটা স্কু*লে চাকরী করছো..... কিন্তু কারো সাথে কি কোন সম্পর্ক নেই? মানে তোমার এই অবস্থায় নিকট কেই সাথে থাকলে সুবিধা হতো। " অনীক বলে, এর বেশী কিছু জিজ্ঞেস করা শোভা পায় না। কেন ও একা থাকে সেটার কারন জানতে চাওয়াটা চুড়ান্ত অভদ্রিতামি।
" অসুবিধা নেই...... ফুলমনি আমার বাড়ির লোকেদের থেকে বেশী খেয়াল রাখে আমার, ...... আমি এভাবেই নিজেকে অভ্যস্ত করে নিচ্ছি। " অনামিকা ধীর স্ব্বরে বলে।
" আচ্ছা, ছাড়ো....কটা দিন এখানেই থেকে যাও, বাড়ি ফিরে ওষুধ গুলো ঠিকঠাক খাবে কিনা সেটা তো জানা নেই.... তাছাড়া শরীরটাও খুব দূর্বল তোমার। "
" বিয়ে করোনি? " অনামিকার হঠাৎ প্রশ্নে থতমত খায় অনীক।
" ন....না...... মানে এখনো ভাবি নি। "
" ভাবো এবার..... আর কতদিন একা থাকবে? কেউ আছে? " অনামিকা একটু হেসে বলে। সকালের লজ্জাভাব কাটিয়ে এখন ওর বেশ ভালোই লাগছে অনীকের সাথে কথা বলতে।
" না গো নেই......" অনীক এড়িয়ে যায়।
" একদিন আমার জন্য অনেক অপমান সহ্য করতে হয়েছে তোমায় তাই না? " অনামিকা করুন ভাবে তাকায়। অনীক না চাইলেও অনামিকা নিজেই পুরোনো স্মৃতির রেশ টেনে আনে। সামান্য অস্বস্তি হয় অনীকের। একটু চুপ করে থেকে বলে,
" হয়তো সেটাই শাপে বর হয়েছে, আমি আজ এই জায়গায় আছি সেটার জন্য সেই সন্ধ্যার ঘটনাটা দায়ী। "
অনামিকার মুখ লাল হয়ে আসে লজ্জায়। ও চোখ সরিয়ে নেয়।
অনীক বুঝতে পারে এভাবে বলাটা ঠিক হয় নি। অনামিকা আবার লজ্জা পেয়ে গেছে। ও অনামিকার হাতের উপরে নিজের হাত রাখে, অনামিকা হাত সরায় না।
" দেখো অনামিকা...... চৌদ্দ বছর আগে দুটো নিছক অপ্রাপ্তবয়ষ্ক ছেলেমেয়ের আবেগের বশে ঘটে যাওয়া ঘটনার কথা মনে করে এখন আর লজ্জা পেয়ো না...... ভাবো না, আজ আবার নতুন করে আমাদের বন্ধুত্ব হলো..... আমিও আর সেসব কিছু মনে রাখি নি। "
অনামিকা নিজেও ওইসব ঘটনা আর মনে করতে চায় না। ওর সামনে যে বসে আছে তাকে ও সদ্য কৈশোর্রতীর্ণ অনীকের সাথে মেলাতে পারছে না, যতটা সহজে সেখানে রাজুকে মেলাতে পারে। আজ সেই সময়কার অনীকের কথা ভাবতে গেলেই সেখানে রাজুর চেহারাই ভেসে ওঠে। আসলে অনীককে না, অনীকের ছায়াকে ভালোবেসেছিলো অনামিকা, হয়তো সেটা ভালোবাসাই ছিলো না.... সদ্য যৌবনে যৌনতার রহস্যের প্রতি আগ্রহই ওকে দিকভ্রষ্ট করে ..... আজ সেই ছায়ায় আজ রাজুর প্রবেশ ঘটেছে। তাই আসল অনীককে দেখার পরেও সেখানে রাজুই থেকে যাচ্ছে।
" কি হলো কথা বলছো না যে? " অনীক আবার বলে।
" না ভাবছি.......ছাড়ো, কোথায় থাকছো এখানে? "
" এই তো পাশেই আমার কোয়ার্টার। সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরার আগে তোমাকে নিয়ে যাবো...... এটা কিন্তু অনুরোধ না অধিকার, " অনীক উঠে দাঁড়ায়।
" চলে যাবে? " অনামিকা বলে।
" হুঁ...... কাল আবার নাইট আছে, আমি সন্ধ্যার দিকে আসবো...... আসি তাহলে? " অনীক অনুমতি চায়।
ঘাড় নাড়ে অনামিকা। অনীক পর্দা সরিয়ে বেরিয়ে যায়। খুব একা লাগে অনামিকার। সকালে অনীক বেরিয়ে যাওয়ার পর ফুলমনি এসেছিলো। ঢুকেই চেঁচিয়ে ওঠে,
" ইশ...... একরাতে কতটা খারাপ হয়ে গেছে তোর শরীলটা..... "
" মেলা না বকে এখানে বস। " অনামিকা হেসে ওকে ডাকে।
অনামিকার বেডের এক কোনায় বসে ফুলমনি, " ডাক্তার কি বুললো রে দিদি? ছুটি কবে দেবে? "
" জানি না...... তুই এখন বাড়ি যা, কাল পারলে আবার আসিস? "
" না না..... তুকে একলা রেখে আমি যাবো না... " ফুলমনি মুখ ভার করে।
" উফফ.....,পাগলামী করিস না, কাল থেকে অনেক ধকল গেছে তোর উপর, বাড়ি গিয়ে ভালো করে রেস্ট নে। "
ফুলমনি অনামিকার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে থাকে। অনামিকা আবার বলে,
" ফুলমনি "
" বল.......।"
" আমার পেটে বাচ্চা ছিলো সেটা তুই জানিস? "
ফুলমনি একটু থমকে যায়, চুপ করে থেকে বলে, " হাঁ....., ডাক্তারবাবু বুলছিলো....। "
" তুই বিশ্বাস করবি কিনা জানি না...... আমি জানতাম না, কদিন ধরে খুব গা পাকাতো, শরীর খারাপ লাগতো..... তাছাড়া আমার মাসিক তো নিয়ম মেনে হয় না, আগে ওষুধ খেতাম, এখানে আসার পর সেসব বন্ধ, তাই সেভাবে ভাবি নি...... "
" আমি তুর কথা কোনদিন বিশ্বাস করি নাই এটা হইছে? তুই বল.....। "
অনামিকা সেকথার উত্তর না দিয়ে বলে, " যার জন্য চৌদ্দ বছর হা পিত্যেশ করে গেলাম, আর যখন পেটে এলো বুঝতেই পারলাম না........ কিন্তু আমি ভাবছি....। " অনামিকা চুপ করে যায়। ওর নিজের সন্দেহ ফুলমনির কাছে ভাঙা ঠিক না।
" ওসব বেশী ভাবিস না তো..... আগে নিজের শরীলটা ঠিক কর। " ফুলমনি জোরে বলে ওঠে।
" হুঁ" অনামিকা থেম যায়, " তুই বেলা থাকতে বেরিয়ে যা, আর দেরী করিস না। "
" তুই খেয়াল রাখবি নিজের " ফুলমনি উঠে ধীর পায়ে বেরিয়ে যায়।
অনীক বেরিয়ে যাওয়ার পর অনামিকা নিজের পাশে রাখা ফোনটা তুলে নেয়। একবার রাজুকে ফোন করবে কিনা ভাবে। খুব খুব মনে পড়ছে ওকে। এতোদিন একরকম ছিলো কিন্তু কাল দেখা হওয়ার পর ওকে না দেখে ভালো লাগছে না। রাজু কি আবার রাগ করবে ওর প্রেগ্ন্যান্ট হওয়ার কথা শুনে? বাচ্চা ছেলে...... কোন কিছু তলিয়ে না ভেবেই রাগ করে বসে থাকে। কিন্তু ওকে না জানানো পর্যন্ত অনামিকার মনে স্বস্তি আসছে না। আবার কোন কারনে ওকে ভুল বুঝে রাজু দূরে সরে যাক এটা চায় না অনামিকা। যে ভাবেই হোক রাজুকে বাস্তবটা বোঝাতেই হবে। অন্য কারো কাছ থেকে শুনলে বেশী কষ্ট পাবে ও,, হয়তো আবার অনামিকাকে ব্লক করে দেবে...... এবার হারিয়ে গেলে আর কি পাবে? অনামিকা কাঁপা হাতে রাজুর নম্বরটা ডায়াল করে।
ওপাশ থেকে রাজুর গলা ভেসে আসে, " বলো...... আমিও তোমার কথাই ভাবছিলাম বসে বসে। "
" কি ভাবছিলি? " অনামিকার শরীরে শিহরন জাগছে রাজুর গলার আওয়াজে।
" জানো..... আর মাত্র কদিন পর আমি এখান থেকে চলে যাবো......তার আগে তোমার সাথে দেখা করে আসবো। "
" চলে যাবি? কেনো? " অনামিকা বিস্মিত।
" এ বাবা....., পল্লবীদির কাছে থাকতাম, সে নিজেই তো চলে যাচ্ছে..... আমি কিভাবে থাকবো? তাছাড়া এবার তো পড়াশোনাটা শেষ করতে হবে। "
" আমার কাছে থাকতে পারিস না..... না? " অনামিকার গলা কাঁপে।
রাজু হাসে, " তুমিও না পাগল, এখানে সেভাবে স্কোপ কোথায়? ভাবছি কলকাতাতেই ফিরে যাবো......। "
" ও...... এখানে থেকে পড়া যায় না? ........ দেখ যেটা ভালো বুঝিস? " অনামিকার গলা বুজে আসে।
" চিন্তা নেই...... তোমার কাছে ছুটি পেলেই চলে আসবো....... "
" মনে থাকবে তো আমাকে? "
" না মনে থাকবে না..... সবাইকে ভুলে যাবো.... তোমরা না সবাই পাগল এক একটা। " রাজু হেসে ফেলে।
" একবার আসবি আমার কাছে? "
" এখন? ...... এখন কিভাবে যাবো? কাল যাবো। "
" আমি ডুমুরপাহাড়ী হাসপাতালে ভর্তি..... একবার আয়। " অনামিকার গলার স্বর শ্রান্ত ক্লান্ত..... সেখানে আর্তি ঝড়ে পরে।
" কি!.......কি হয়েছে তোমার? " রাজু প্রায় চেঁচিয়ে ওঠে।
" তেমন কিছু না..... আয় সব জানাবো। "
" আমি এখনী আসছি...... উফফ, তুমি একবার সারাদিনে আমাকে জানালে না..... আচ্ছা রাখো। "
ফোন রেখে চুপ করে বসে অনামিকা। রাজুর সামনা সামনি ওকে করতেই হবে। ভয় পেয়ে লুকিয়ে গেলে হবে না। ওর ঘরের কোনায় একটা বেসিন আর তার সামনে আয়না আছে। অনামিকা খুব ধীরে বিছানা থেকে নেমে বেসিনের আয়নার সামনে আসে। মাত্র একদিনেই চেহারায় রুক্ষতার ছাপ পড়ে গেছে। চোখের নীচে কালি, শুকনো বিবর্ণ ঠোঁট, তেলহীন চুলগুলো একটু এলোমেলো হয়ে আছে। অনামিকা চোখে মুখে জল দিয়ে হাত দিয়ে আগোছালো চুলটা ঠিক করে নেয়। তারপর আবার বিছানায় গিয়ে বসে।
এর মধ্যেই বীনা এসে হাজির, " এ বাবা আমাকে ডাকবে তো, একা একা উঠে কোথায় গেছিলে তুমি গো? "
" ধুর আবার ডাকাডাকি..... আমি যথেষ্ট সুস্থ আছি। " অনামিকা বেড এ বসে বলে।
" হু.... পড়ে গেলে ডাক্তারবাবু আমাকে তাড়াবে এখান থেকে। " বীনা বলে।
" চা খাবে? লিকার চা নিয়ে আসি? " বীনা বেড এর একপাশে বসে বলে।
" দাঁড়া, একটু পরে তিনকাপ আনবি..... একজন আসছে " অনামিকা দরজার দিকে তাকায়, রাজু কতদূরে থাকে জানে না, তবে খুব বেশী দূর মনে হয় না.... প্রায় পনেরো মিনিট হতে চলল।
এর মধ্যেই পর্দা নড়ে ওঠে। নীল পর্দা সরিয়ে রাজু উঁকি মারে।
" যা এবার চা নিয়ে আয় " অনামিকা বীনার পিঠে চাটি মারে।
বীনা একবার অনামিকা আর একবার রাজুর দিকে তাকিয়ে চলে যায়।
রাজু চেয়ার টেনে বসে অনামিকার একেবারে কাছে, " ইশ..... একদিনে কি হাল করেছো নিজের? কি অসুখ বাধালে এই গন্ডগ্রামে পড়ে ত্থেকে? "
অনামিকা রাজুর হাতের উপরে হাত রাখে, রাজুকে সামনে দেখে মনের অস্থিরতা অনেক কমে গেছে " আমার টানে ছুটে চলে আসলি কেনো আগে বল? "
রাজুর উপর থেকে চোখ সরায় না অনামিকা। কৌতুহল নিয়ে তাকিয়ে থাকে। রাজু এই প্রশ্নের কি উত্তর দেবে ভেবে পায় না। ও অনামিকার চোখের দিকে তাকায়।
" বল...... কেনো ছুটে এলি? "
" কি সব যে বলো না, আসবো না? তুমি যে আমার.... " থেমে যায় ও। চোখ সরিয়ে নেয়।
" বল.....থেমে গেলি কেনো? আমি কে?...... তোর কাছের মানুষ তাই তো? "
রাজু মাথা নাড়ে।
" তাহলে কাছের মানুষ সেই হয় যাকে মানুষ বিশ্বাস করতে পারে, আমি যে তোকে খুব ভালোবাসি এটা বিশ্বাস করিস? "
" না করলে এখানে আসতাম? "
" তাহলে আমি যে সব কথা বলবো সেগুলো বিশ্বাস করবি তো? " অনামিকার গলা ভার হয়ে আসে।
" সব সময় করি...... কোনোদিন অবিশ্বাস করি নি, তবে রাগ আর অবিশ্বাস এক না। " রাজুর মাথা নামানো।
এর মধ্যেই বীনা দুই কাপ চা আর দুটো করে মারি বিস্কুট এনে রেখে যায়।
" তোমরা খাও..... আমি ক্যান্টিনে খেয়ে নিচ্ছি। "
বীনা বেরিয়ে যায়। অনামিকা একটা কাপ রাজুকে দিয়ে নিজেও একটা কাপে চুমুক দিয়ে সেটাকে নীচে রাখে।
" আমি তোমার কি হয়েছে সেটা জানতে চেয়েছি, এখানে বিশ্বাস অবিশ্বাসের প্রশ্ন আসছে কেনো? " রাজু একটু বিরক্ত হয়।
" তুইও তো চলে যাবি.....আর ফিরবি কিনা জানি না, তবে যাওয়ার আগে আমার জীবনের সব কিছু তোকে জানাতে চাই " অনামিকার গলা একটু ধরে আসে।
" আমাকে? কি বলছো বুঝতে পারছি না.... রাজু অনামিকার আরো কাছ ঘেষে আসে " আমি কিছু শুনতে চাই না।"
" শুনতে না চাইলেও শুনবি......এমন কথা যেগুলো শোনার পর তোর আর আমাকে ভালো মনে নাও হতে পারে। "
রাজু ভ্রু কুঁচকে অনামিকার মুখের দিকে তাকায়, " এমন কি কথা বলো তো? এসব কেনো আসছে এই সময়? আর আমি কি একবারো বলেছি যে আর ফিরবো না? "
" সব বলছি...... তোর কাছে আজ কিছুই লুকাবো না, হয়তো পুরোটা তোর কাছে গল্পের মতো লাগবে কিন্তু এটাই সত্যি.....অনেক দিন পর তোকে কাছে পেয়েছি, আর হারাতে চাই না..... " অনামিকার চোখ জলে ভরে আসে।
অনামিকা কিছু সময় চুপ থেকে কিভাবে শুরু করবে ভাবে নেয়। তারপর শুরু করে....... নিজের কৈশোর থেকে আজ বিকালে নাটকীয় ভাবে অনীকের সাথে দেখা হওয়া পর্যন্ত কিছুই লুকায় না অনামিকা। যেনো ওর কথা এক দীর্ঘ উপাখ্যান। নিজের জীবনের প্রতিটি পাতা খুলে ধরে রাজুর সামনে। এক গভীর তাগিদ কাজ করছে..... ভালোবাসার তাগিদ, এক নিষিদ্ধ প্রেমকে টিকিয়ে রাখার তাগিদ। ওর কথা যখন শেষ হয় তখন সন্ধ্যা পার হয়ে রাত নেমে এসেছে। মাঝে মধ্যে হাঁ হুঁ ছাড়া আগাগোড়া রাজু ছিলো নীরব শ্রোতা। দীর্ঘ কথা শেষে অনামিকা চুপ করে..... তারপর বার বলে,
" জানিস, বিয়ের পর বারো বছর ধরে সরোজকে আমি ভালোবাসতে পারি নি, যখনি নিজেকে কারো সাথে কল্পনা করেছি সেঝানে অনীক এসে গেছে.......কিন্তু প্রথম যখন তুই আসলি আমার সামনে, সত্যি বলতে আমার মনে হয়েছিলো অনীক এসেছে....... সেই মিস্টি স্বল্পভাষী, মুখচোরা ছেলেটা, যাকে আমি শরীর মন দিয়ে চেয়েছিলাম সে আমার সামনে....... তোর সাথে থাকতে থাকতে কবে যে অনীক মিলিয়ে গেলো, এখন সেই কৈশোরের সন্ধ্যার কথা মনে পড়লে সেখানে অনীকের বদলে তোর মুখ ভাসে........ "
রাজু চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে অনামিকার মাথানিজের বুকে চেপে ধরে।
" তোমার আর আমায়ার মধ্যে তো কোন কমিটমেন্ট নেই যে আমাকে সব কিছু জানাতেই হবে...... কোন দায় ছাড়া তুমি সব আমার সামনে খুলে ধরেছো, এটা থেকে ভালোবাসার আর কোন প্রমাণ হয় না....... তোমার সেই কথায় কথায় ভুল বোঝা রাজু অনেক ম্যাচুওর এখন, বুঝলে? "
অনামিকা এইরূপ প্রতিক্রিয়া আশা করে নি রাজুর থেকে। আবেগে ওর চোখে জল ভরে আসে। রাজুকে চেপে ধরে ওর বুকে নিজের মাথা গুঁজে দেয়। ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলে, " আমাকে একা ছেড়ে চলে যাস না তুই...হয়তো আমি খুব খারাপ, না হলে নিজের থেকে এতো ছোট কাউকে এভাবে ভালোবাসে কেউ? সমাজ মানবে না জেনেও তোকে ভালোবাসি আমি, কিন্তু বিশ্বাস কর, আমি এখনো চৌদ্দ বছর আগের অনামিকা হতে চাই....... আমাকে বাকীদের মত ভুল ভাবিস না। "
রাজু কি বলবে ভেবে পায় না। অনামিকার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে থাকে ও। এতো গভীর ভাবে ভাবতে ও পারে না, কিন্তু এটা বোঝে যে অনামিকার শরীর মন সব ওকেই সঁপে দিয়েছে..... এখানে কোনো ছলচাতুরী নেই।
" অনামিকার সাথে দেখা হল ? " প্রায় সাড়ে আটটা নাগাদ ঘরে ঢুকতে যেতেই পল্লবীর তীক্ষ্ণ কটাক্ষ ধেয়ে আসে রাজুর দিকে।
ঘরে সোফায় বসে আছে পল্লবী। গায়ে ঘরের পোষাক। মনে হচ্ছে অনেক আগেই এসেছে। আর রাজুও কাউকে না জানিয়ে বেরিয়ে গেছিলো।
একটু থমকায় রাজু, " তুমি জানতে যে কাকীমা হাসপাতালে ভর্তি? " রাজু বিস্মিত হয়ে বলে।
" হ্যাঁ..... এটা না জানার তেমন কিছু নেই, আমাকে কাজে মাঝে মধ্যেই সেখানে যেতে হচ্ছে। " পল্লবী ক্যাসুয়ালি বলে।
" তাও একবার আমাকে বললে না? " রাজুর আহত স্বর।
" প্রয়োজন মনে করি নি। কেউ ফুর্তি করে প্রেগ্ন্যান্ট হয়ে আসলে সেটাকে গুরুতর অসুখের পর্যায়ে ফেলা যায় না...... " পল্লবী দাঁত চেপে বলে।
রাজু অবাক হয়ে তাকায়। এই পল্লবীকে ওর কেমন যেনো অচেনা লাগে। সেই লড়াকু অপরের জন্য নিজেকে সঁপে দেওয়া মেয়েটা যেনো অন্য কেউ। সেই মেয়েটার মধ্যে কারো প্রতি এতো বিতৃষ্ণা দেখে নি একমাত্র নিজের পরিবার ছাড়া....... কিন্তু এটা কে?
" এসব কি বলছো পল্লবীদি? ভুলে গেছো একদিন তোমার পরিবারও তোমার প্রেগন্যান্সি নিয়ে এমন কথা বলেছিল? তাহলে তুমি তাদের সুরেই আজ কাকিমাকে দোষারোপ করছো? " রাজু গলার স্বর নামিয়ে বলে।
পল্লবী সোফায় বসে ছিলো। উঠে দাঁড়িয়ে কিছু না বলে বাইরে চলে আসে। ওর মুখ থমথমে হয়ে আছে। বাইরে এসে একটা সিগারেট ধরিয়ে টান দেয়। সত্যি তো, এটা কেনো বললো ও? অনামিকার প্রতি ক্ষোভ থেকে? ওর বাবা মাও তাহলে নিজেদের ক্ষোভ উজাড় করে দিয়েছিলো সেদিন। তারা দোষী হলে তো পল্লবী নিজেও একই দোষে দোষী।
রাজু ওর পিছন পিছন বেরিয়ে আসে। পল্লবীর রাগের কারণ রাজু জানে কিন্তু ওর কাছ থেকে এই কথা রাজু আশা করে নি একেবারে।
" আমার জন্য অনেক কিছু করেছো তুমি......কিন্তু প্লীজ এভাবে বোলো না, আমার ভালো লাগে না। "
" সত্যি কথা ভালো না লাগলে সেটা কি আমার দোষ? তুই অন্ধ হয়ে অনেক কিছু বিশ্বাস করতে পারিস সেটা আমি পারি না...... শী ইস এ ব্লাডি হোর, এটাই সত্যি..... " পল্লবী দাঁতে দাঁত চেপে বলে।
" তুমি যতই বলো, আমি কাকিমাকে খারাপ ভাবি না, ভাববোও না....... যেমন যে কেউ এসে তোমার নামে কিছু বলে গেলেই আমি বিশ্বাস করব না...... " রাজু আবেগে কাঁপতে থাকে।
" তুই এবার নিজের জায়গায় ফিরে যা...... নিজের ক্যারিয়ার তৈরী কর...... এসব ভাবার জন্য জীবনে অনেক সময় পাবি।"
সিগারেটটা ছুঁড়ে ফেলে দেয় পল্লবী। ঘুরে দাঁড়িয়ে রাজুকে জড়িয়ে ধরে। পাগলের মতো ওর ঠোঁটে চুমু খেতে থাকে। রাজু বুঝতে পারে না পল্লবীকে। এতো আবেগ কোনোদিন পল্লবী দেখায় নি এর আগে। একসময় শান্ত হয়ে দাঁড়ায়, ওর দুই চোখ জলে ভিযে আছে। কিন্তু মুখে নিজের অসহায়তা প্রকাশ করে না ও।
" তুই চলে যা রাজু....... আর থাকিস না এখানে,,,, আর বেশী কিছু জানতেও চাস না,......প্লীজ...... কাল সকালেই চলে যাবি। "
" তুমি সত্যি চাও আমি চলে যাই? " রাজু বিস্মিত চোখে তাকায়।
" হ্যাঁ চাই..... এমনিতেও আমার অফিস থেকে মেল এসে গেছে, আগামী সপ্তাহে চলে যাবো...... "
কোথায় যাবে তুমি? রাজুর গলা ধরে আসে।
" জানি না...... আপাতত কলকাতার অফিসে, সেখান থেকে যেখানে পাঠাবে সেখানে। " পল্লবী৷ ওখের জল মোছে।
" ঠিক আছে তাই হবে, কাল সকালেই চলে যাবো আমি। " রাজু ঘুরে দাঁড়ায়, " তবে এভাবে তাড়িয়ে না দিলেও পারতে। "
" আর শোন.... " পলবীর ডাকে থমকে দাঁড়ায় রাজু।
" আর কোনদিন আমার সাথে যোগাযোগ করবি না..... মনে থাকবে তো?....... কারো মায়াতে আমি আর বাঁধা পড়তে চাই না "
রাজু উত্তর না দিয়ে ঘরে ঢুকে নিজের জামাপ্যান্ট সব ব্যাগে ভরতে থাকে। লালী এতোক্ষণ দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে এদের কথা শুনছিলো। ওর দুই চোখ বেয়ে জলের ধারা নেমে আসছে। সবাই যে যার মত ভাবছে। ওর কষ্টটা কাকে বোঝাবে ও?
পল্লবী একা বসে থাকে রাত পর্যন্ত বাইরে। আজ সব কিছু ভুলে গিয়ে ভেবেছিলো অনামিকার সাথে দেখা করবে। সেই উদ্দ্যেশ্যেই অফিস ছুটির পর হাসপাতালে অনামিকার রুমের দিকে পা বাড়ায়। কিন্তু জানতো না যে সেখানে আগে থেকেই রাজু উপস্থিত আছে। বাইরে থেকে রাজুর গলার স্বর শুনে ও দাঁড়িয়ে পড়ে। বীনা ওকে দেখে চেল্লেও ইশারায় ওকে কিছু না বলতে বলে। দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে ওদের কথা কানে যায়। এভাবে কারো ব্যাক্তিগত কথা শোনাটা পল্লবীর স্বভাব বিরুদ্ধ হলেও এই ক্ষেত্রে স্বাভাবিক আকর্ষন এড়াতে পারে না। চলে আসতে গিয়ো দাঁড়িয়ে পড়ে। অনামিকার জীবন বৃত্তান্ত সবই শোনে পল্লবী। ওর মনে হতে থাকে রাজু আর অনামিকার এই সম্পর্ক অতল সমুদ্রের মতো। এখানে পল্লবী নিছকই তৃতীয় পক্ষ। রাজুর জীবনে পল্লবীর আলাদা কোন অস্তিত্ব নেই, যেটা অনামিকার আছে। অনামিকার সব কথা সত্য বলে মেনে নিলেও বাচ্চাটা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। রাজু নির্বোধ হতে পারে, কিন্তু পল্লবী না....... একটা মেয়ে জানবে না তার পেটে কার বাচ্চা? অনামিকা শুধু চালাকই না, অত্যন্ত ধূর্তও..... আর রাজু ওর চালাকিতে এমন বশ হয়েছে যে, ওকে আটকানোর সাধ্য কারো নেই.....।
বিকালে যখন ঢোকে তখন অনামিকা চুপ করে শুয়ে আছে। পর্দা সরানোতে ঘাড় ঘুরিয়ে অনীককে দেখে সামান্য হাসে। নিজে থেকেই উঠে বসতে যায়। তবে শরীর যে দূর্বল সেটা ওঠার ভাবেই বোঝা যাচ্ছে। বাধা দেয় অনীক, " থাক.....উঠতে হবে না। "
অনামিকা শোনে না, পা ভাঁজ করে বসে বলে, " শুয়ে শুয়ে তো হাত পা অসাড় হয়ে যাচ্ছে...."
" কেমন আছো? " অনীকই কথা শুরু করে।
অনামিকা মাথা নাড়ায়, " ভালো"
" বসতে পারি? " অনীক হাসে।
" আচ্ছা মুশকিল..... এটা তো তোমারই হাসপাতাল " এখন অনেকটা সহজ হয়েছে অনামিকা।
একটা চেয়ার টেনে নিয়ে অনামিকার পাশে বসে অনীক। অনামিকা মুখ নীচু করে হাতের আঙুল দেখছে।
" একটা কথা বলবো? যদি কিছু মনে না করো। " অনীক সামান্য দ্বিধা করে।
অনামিকা সম্মতির দৃষ্টিতে তাকায়। মুখে কিছু বলে না।
" মানে, তোমার শ্বশুর বাড়ি বা বাপের বাড়ির কাউকে দেখছি না......"
অনামিকা জানতো এই প্রশ্ন আসবেই। ও ঠোঁটের কোনে হাসি রেখেই বলে, " আমি তো কারো সাথে থাকি না, একাই থাকি। "
" হ্যাঁ, সেটা জানি, তুমি এখানেই একটা স্কু*লে চাকরী করছো..... কিন্তু কারো সাথে কি কোন সম্পর্ক নেই? মানে তোমার এই অবস্থায় নিকট কেই সাথে থাকলে সুবিধা হতো। " অনীক বলে, এর বেশী কিছু জিজ্ঞেস করা শোভা পায় না। কেন ও একা থাকে সেটার কারন জানতে চাওয়াটা চুড়ান্ত অভদ্রিতামি।
" অসুবিধা নেই...... ফুলমনি আমার বাড়ির লোকেদের থেকে বেশী খেয়াল রাখে আমার, ...... আমি এভাবেই নিজেকে অভ্যস্ত করে নিচ্ছি। " অনামিকা ধীর স্ব্বরে বলে।
" আচ্ছা, ছাড়ো....কটা দিন এখানেই থেকে যাও, বাড়ি ফিরে ওষুধ গুলো ঠিকঠাক খাবে কিনা সেটা তো জানা নেই.... তাছাড়া শরীরটাও খুব দূর্বল তোমার। "
" বিয়ে করোনি? " অনামিকার হঠাৎ প্রশ্নে থতমত খায় অনীক।
" ন....না...... মানে এখনো ভাবি নি। "
" ভাবো এবার..... আর কতদিন একা থাকবে? কেউ আছে? " অনামিকা একটু হেসে বলে। সকালের লজ্জাভাব কাটিয়ে এখন ওর বেশ ভালোই লাগছে অনীকের সাথে কথা বলতে।
" না গো নেই......" অনীক এড়িয়ে যায়।
" একদিন আমার জন্য অনেক অপমান সহ্য করতে হয়েছে তোমায় তাই না? " অনামিকা করুন ভাবে তাকায়। অনীক না চাইলেও অনামিকা নিজেই পুরোনো স্মৃতির রেশ টেনে আনে। সামান্য অস্বস্তি হয় অনীকের। একটু চুপ করে থেকে বলে,
" হয়তো সেটাই শাপে বর হয়েছে, আমি আজ এই জায়গায় আছি সেটার জন্য সেই সন্ধ্যার ঘটনাটা দায়ী। "
অনামিকার মুখ লাল হয়ে আসে লজ্জায়। ও চোখ সরিয়ে নেয়।
অনীক বুঝতে পারে এভাবে বলাটা ঠিক হয় নি। অনামিকা আবার লজ্জা পেয়ে গেছে। ও অনামিকার হাতের উপরে নিজের হাত রাখে, অনামিকা হাত সরায় না।
" দেখো অনামিকা...... চৌদ্দ বছর আগে দুটো নিছক অপ্রাপ্তবয়ষ্ক ছেলেমেয়ের আবেগের বশে ঘটে যাওয়া ঘটনার কথা মনে করে এখন আর লজ্জা পেয়ো না...... ভাবো না, আজ আবার নতুন করে আমাদের বন্ধুত্ব হলো..... আমিও আর সেসব কিছু মনে রাখি নি। "
অনামিকা নিজেও ওইসব ঘটনা আর মনে করতে চায় না। ওর সামনে যে বসে আছে তাকে ও সদ্য কৈশোর্রতীর্ণ অনীকের সাথে মেলাতে পারছে না, যতটা সহজে সেখানে রাজুকে মেলাতে পারে। আজ সেই সময়কার অনীকের কথা ভাবতে গেলেই সেখানে রাজুর চেহারাই ভেসে ওঠে। আসলে অনীককে না, অনীকের ছায়াকে ভালোবেসেছিলো অনামিকা, হয়তো সেটা ভালোবাসাই ছিলো না.... সদ্য যৌবনে যৌনতার রহস্যের প্রতি আগ্রহই ওকে দিকভ্রষ্ট করে ..... আজ সেই ছায়ায় আজ রাজুর প্রবেশ ঘটেছে। তাই আসল অনীককে দেখার পরেও সেখানে রাজুই থেকে যাচ্ছে।
" কি হলো কথা বলছো না যে? " অনীক আবার বলে।
" না ভাবছি.......ছাড়ো, কোথায় থাকছো এখানে? "
" এই তো পাশেই আমার কোয়ার্টার। সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরার আগে তোমাকে নিয়ে যাবো...... এটা কিন্তু অনুরোধ না অধিকার, " অনীক উঠে দাঁড়ায়।
" চলে যাবে? " অনামিকা বলে।
" হুঁ...... কাল আবার নাইট আছে, আমি সন্ধ্যার দিকে আসবো...... আসি তাহলে? " অনীক অনুমতি চায়।
ঘাড় নাড়ে অনামিকা। অনীক পর্দা সরিয়ে বেরিয়ে যায়। খুব একা লাগে অনামিকার। সকালে অনীক বেরিয়ে যাওয়ার পর ফুলমনি এসেছিলো। ঢুকেই চেঁচিয়ে ওঠে,
" ইশ...... একরাতে কতটা খারাপ হয়ে গেছে তোর শরীলটা..... "
" মেলা না বকে এখানে বস। " অনামিকা হেসে ওকে ডাকে।
অনামিকার বেডের এক কোনায় বসে ফুলমনি, " ডাক্তার কি বুললো রে দিদি? ছুটি কবে দেবে? "
" জানি না...... তুই এখন বাড়ি যা, কাল পারলে আবার আসিস? "
" না না..... তুকে একলা রেখে আমি যাবো না... " ফুলমনি মুখ ভার করে।
" উফফ.....,পাগলামী করিস না, কাল থেকে অনেক ধকল গেছে তোর উপর, বাড়ি গিয়ে ভালো করে রেস্ট নে। "
ফুলমনি অনামিকার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে থাকে। অনামিকা আবার বলে,
" ফুলমনি "
" বল.......।"
" আমার পেটে বাচ্চা ছিলো সেটা তুই জানিস? "
ফুলমনি একটু থমকে যায়, চুপ করে থেকে বলে, " হাঁ....., ডাক্তারবাবু বুলছিলো....। "
" তুই বিশ্বাস করবি কিনা জানি না...... আমি জানতাম না, কদিন ধরে খুব গা পাকাতো, শরীর খারাপ লাগতো..... তাছাড়া আমার মাসিক তো নিয়ম মেনে হয় না, আগে ওষুধ খেতাম, এখানে আসার পর সেসব বন্ধ, তাই সেভাবে ভাবি নি...... "
" আমি তুর কথা কোনদিন বিশ্বাস করি নাই এটা হইছে? তুই বল.....। "
অনামিকা সেকথার উত্তর না দিয়ে বলে, " যার জন্য চৌদ্দ বছর হা পিত্যেশ করে গেলাম, আর যখন পেটে এলো বুঝতেই পারলাম না........ কিন্তু আমি ভাবছি....। " অনামিকা চুপ করে যায়। ওর নিজের সন্দেহ ফুলমনির কাছে ভাঙা ঠিক না।
" ওসব বেশী ভাবিস না তো..... আগে নিজের শরীলটা ঠিক কর। " ফুলমনি জোরে বলে ওঠে।
" হুঁ" অনামিকা থেম যায়, " তুই বেলা থাকতে বেরিয়ে যা, আর দেরী করিস না। "
" তুই খেয়াল রাখবি নিজের " ফুলমনি উঠে ধীর পায়ে বেরিয়ে যায়।
অনীক বেরিয়ে যাওয়ার পর অনামিকা নিজের পাশে রাখা ফোনটা তুলে নেয়। একবার রাজুকে ফোন করবে কিনা ভাবে। খুব খুব মনে পড়ছে ওকে। এতোদিন একরকম ছিলো কিন্তু কাল দেখা হওয়ার পর ওকে না দেখে ভালো লাগছে না। রাজু কি আবার রাগ করবে ওর প্রেগ্ন্যান্ট হওয়ার কথা শুনে? বাচ্চা ছেলে...... কোন কিছু তলিয়ে না ভেবেই রাগ করে বসে থাকে। কিন্তু ওকে না জানানো পর্যন্ত অনামিকার মনে স্বস্তি আসছে না। আবার কোন কারনে ওকে ভুল বুঝে রাজু দূরে সরে যাক এটা চায় না অনামিকা। যে ভাবেই হোক রাজুকে বাস্তবটা বোঝাতেই হবে। অন্য কারো কাছ থেকে শুনলে বেশী কষ্ট পাবে ও,, হয়তো আবার অনামিকাকে ব্লক করে দেবে...... এবার হারিয়ে গেলে আর কি পাবে? অনামিকা কাঁপা হাতে রাজুর নম্বরটা ডায়াল করে।
ওপাশ থেকে রাজুর গলা ভেসে আসে, " বলো...... আমিও তোমার কথাই ভাবছিলাম বসে বসে। "
" কি ভাবছিলি? " অনামিকার শরীরে শিহরন জাগছে রাজুর গলার আওয়াজে।
" জানো..... আর মাত্র কদিন পর আমি এখান থেকে চলে যাবো......তার আগে তোমার সাথে দেখা করে আসবো। "
" চলে যাবি? কেনো? " অনামিকা বিস্মিত।
" এ বাবা....., পল্লবীদির কাছে থাকতাম, সে নিজেই তো চলে যাচ্ছে..... আমি কিভাবে থাকবো? তাছাড়া এবার তো পড়াশোনাটা শেষ করতে হবে। "
" আমার কাছে থাকতে পারিস না..... না? " অনামিকার গলা কাঁপে।
রাজু হাসে, " তুমিও না পাগল, এখানে সেভাবে স্কোপ কোথায়? ভাবছি কলকাতাতেই ফিরে যাবো......। "
" ও...... এখানে থেকে পড়া যায় না? ........ দেখ যেটা ভালো বুঝিস? " অনামিকার গলা বুজে আসে।
" চিন্তা নেই...... তোমার কাছে ছুটি পেলেই চলে আসবো....... "
" মনে থাকবে তো আমাকে? "
" না মনে থাকবে না..... সবাইকে ভুলে যাবো.... তোমরা না সবাই পাগল এক একটা। " রাজু হেসে ফেলে।
" একবার আসবি আমার কাছে? "
" এখন? ...... এখন কিভাবে যাবো? কাল যাবো। "
" আমি ডুমুরপাহাড়ী হাসপাতালে ভর্তি..... একবার আয়। " অনামিকার গলার স্বর শ্রান্ত ক্লান্ত..... সেখানে আর্তি ঝড়ে পরে।
" কি!.......কি হয়েছে তোমার? " রাজু প্রায় চেঁচিয়ে ওঠে।
" তেমন কিছু না..... আয় সব জানাবো। "
" আমি এখনী আসছি...... উফফ, তুমি একবার সারাদিনে আমাকে জানালে না..... আচ্ছা রাখো। "
ফোন রেখে চুপ করে বসে অনামিকা। রাজুর সামনা সামনি ওকে করতেই হবে। ভয় পেয়ে লুকিয়ে গেলে হবে না। ওর ঘরের কোনায় একটা বেসিন আর তার সামনে আয়না আছে। অনামিকা খুব ধীরে বিছানা থেকে নেমে বেসিনের আয়নার সামনে আসে। মাত্র একদিনেই চেহারায় রুক্ষতার ছাপ পড়ে গেছে। চোখের নীচে কালি, শুকনো বিবর্ণ ঠোঁট, তেলহীন চুলগুলো একটু এলোমেলো হয়ে আছে। অনামিকা চোখে মুখে জল দিয়ে হাত দিয়ে আগোছালো চুলটা ঠিক করে নেয়। তারপর আবার বিছানায় গিয়ে বসে।
এর মধ্যেই বীনা এসে হাজির, " এ বাবা আমাকে ডাকবে তো, একা একা উঠে কোথায় গেছিলে তুমি গো? "
" ধুর আবার ডাকাডাকি..... আমি যথেষ্ট সুস্থ আছি। " অনামিকা বেড এ বসে বলে।
" হু.... পড়ে গেলে ডাক্তারবাবু আমাকে তাড়াবে এখান থেকে। " বীনা বলে।
" চা খাবে? লিকার চা নিয়ে আসি? " বীনা বেড এর একপাশে বসে বলে।
" দাঁড়া, একটু পরে তিনকাপ আনবি..... একজন আসছে " অনামিকা দরজার দিকে তাকায়, রাজু কতদূরে থাকে জানে না, তবে খুব বেশী দূর মনে হয় না.... প্রায় পনেরো মিনিট হতে চলল।
এর মধ্যেই পর্দা নড়ে ওঠে। নীল পর্দা সরিয়ে রাজু উঁকি মারে।
" যা এবার চা নিয়ে আয় " অনামিকা বীনার পিঠে চাটি মারে।
বীনা একবার অনামিকা আর একবার রাজুর দিকে তাকিয়ে চলে যায়।
রাজু চেয়ার টেনে বসে অনামিকার একেবারে কাছে, " ইশ..... একদিনে কি হাল করেছো নিজের? কি অসুখ বাধালে এই গন্ডগ্রামে পড়ে ত্থেকে? "
অনামিকা রাজুর হাতের উপরে হাত রাখে, রাজুকে সামনে দেখে মনের অস্থিরতা অনেক কমে গেছে " আমার টানে ছুটে চলে আসলি কেনো আগে বল? "
রাজুর উপর থেকে চোখ সরায় না অনামিকা। কৌতুহল নিয়ে তাকিয়ে থাকে। রাজু এই প্রশ্নের কি উত্তর দেবে ভেবে পায় না। ও অনামিকার চোখের দিকে তাকায়।
" বল...... কেনো ছুটে এলি? "
" কি সব যে বলো না, আসবো না? তুমি যে আমার.... " থেমে যায় ও। চোখ সরিয়ে নেয়।
" বল.....থেমে গেলি কেনো? আমি কে?...... তোর কাছের মানুষ তাই তো? "
রাজু মাথা নাড়ে।
" তাহলে কাছের মানুষ সেই হয় যাকে মানুষ বিশ্বাস করতে পারে, আমি যে তোকে খুব ভালোবাসি এটা বিশ্বাস করিস? "
" না করলে এখানে আসতাম? "
" তাহলে আমি যে সব কথা বলবো সেগুলো বিশ্বাস করবি তো? " অনামিকার গলা ভার হয়ে আসে।
" সব সময় করি...... কোনোদিন অবিশ্বাস করি নি, তবে রাগ আর অবিশ্বাস এক না। " রাজুর মাথা নামানো।
এর মধ্যেই বীনা দুই কাপ চা আর দুটো করে মারি বিস্কুট এনে রেখে যায়।
" তোমরা খাও..... আমি ক্যান্টিনে খেয়ে নিচ্ছি। "
বীনা বেরিয়ে যায়। অনামিকা একটা কাপ রাজুকে দিয়ে নিজেও একটা কাপে চুমুক দিয়ে সেটাকে নীচে রাখে।
" আমি তোমার কি হয়েছে সেটা জানতে চেয়েছি, এখানে বিশ্বাস অবিশ্বাসের প্রশ্ন আসছে কেনো? " রাজু একটু বিরক্ত হয়।
" তুইও তো চলে যাবি.....আর ফিরবি কিনা জানি না, তবে যাওয়ার আগে আমার জীবনের সব কিছু তোকে জানাতে চাই " অনামিকার গলা একটু ধরে আসে।
" আমাকে? কি বলছো বুঝতে পারছি না.... রাজু অনামিকার আরো কাছ ঘেষে আসে " আমি কিছু শুনতে চাই না।"
" শুনতে না চাইলেও শুনবি......এমন কথা যেগুলো শোনার পর তোর আর আমাকে ভালো মনে নাও হতে পারে। "
রাজু ভ্রু কুঁচকে অনামিকার মুখের দিকে তাকায়, " এমন কি কথা বলো তো? এসব কেনো আসছে এই সময়? আর আমি কি একবারো বলেছি যে আর ফিরবো না? "
" সব বলছি...... তোর কাছে আজ কিছুই লুকাবো না, হয়তো পুরোটা তোর কাছে গল্পের মতো লাগবে কিন্তু এটাই সত্যি.....অনেক দিন পর তোকে কাছে পেয়েছি, আর হারাতে চাই না..... " অনামিকার চোখ জলে ভরে আসে।
অনামিকা কিছু সময় চুপ থেকে কিভাবে শুরু করবে ভাবে নেয়। তারপর শুরু করে....... নিজের কৈশোর থেকে আজ বিকালে নাটকীয় ভাবে অনীকের সাথে দেখা হওয়া পর্যন্ত কিছুই লুকায় না অনামিকা। যেনো ওর কথা এক দীর্ঘ উপাখ্যান। নিজের জীবনের প্রতিটি পাতা খুলে ধরে রাজুর সামনে। এক গভীর তাগিদ কাজ করছে..... ভালোবাসার তাগিদ, এক নিষিদ্ধ প্রেমকে টিকিয়ে রাখার তাগিদ। ওর কথা যখন শেষ হয় তখন সন্ধ্যা পার হয়ে রাত নেমে এসেছে। মাঝে মধ্যে হাঁ হুঁ ছাড়া আগাগোড়া রাজু ছিলো নীরব শ্রোতা। দীর্ঘ কথা শেষে অনামিকা চুপ করে..... তারপর বার বলে,
" জানিস, বিয়ের পর বারো বছর ধরে সরোজকে আমি ভালোবাসতে পারি নি, যখনি নিজেকে কারো সাথে কল্পনা করেছি সেঝানে অনীক এসে গেছে.......কিন্তু প্রথম যখন তুই আসলি আমার সামনে, সত্যি বলতে আমার মনে হয়েছিলো অনীক এসেছে....... সেই মিস্টি স্বল্পভাষী, মুখচোরা ছেলেটা, যাকে আমি শরীর মন দিয়ে চেয়েছিলাম সে আমার সামনে....... তোর সাথে থাকতে থাকতে কবে যে অনীক মিলিয়ে গেলো, এখন সেই কৈশোরের সন্ধ্যার কথা মনে পড়লে সেখানে অনীকের বদলে তোর মুখ ভাসে........ "
রাজু চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে অনামিকার মাথানিজের বুকে চেপে ধরে।
" তোমার আর আমায়ার মধ্যে তো কোন কমিটমেন্ট নেই যে আমাকে সব কিছু জানাতেই হবে...... কোন দায় ছাড়া তুমি সব আমার সামনে খুলে ধরেছো, এটা থেকে ভালোবাসার আর কোন প্রমাণ হয় না....... তোমার সেই কথায় কথায় ভুল বোঝা রাজু অনেক ম্যাচুওর এখন, বুঝলে? "
অনামিকা এইরূপ প্রতিক্রিয়া আশা করে নি রাজুর থেকে। আবেগে ওর চোখে জল ভরে আসে। রাজুকে চেপে ধরে ওর বুকে নিজের মাথা গুঁজে দেয়। ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলে, " আমাকে একা ছেড়ে চলে যাস না তুই...হয়তো আমি খুব খারাপ, না হলে নিজের থেকে এতো ছোট কাউকে এভাবে ভালোবাসে কেউ? সমাজ মানবে না জেনেও তোকে ভালোবাসি আমি, কিন্তু বিশ্বাস কর, আমি এখনো চৌদ্দ বছর আগের অনামিকা হতে চাই....... আমাকে বাকীদের মত ভুল ভাবিস না। "
রাজু কি বলবে ভেবে পায় না। অনামিকার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে থাকে ও। এতো গভীর ভাবে ভাবতে ও পারে না, কিন্তু এটা বোঝে যে অনামিকার শরীর মন সব ওকেই সঁপে দিয়েছে..... এখানে কোনো ছলচাতুরী নেই।
" অনামিকার সাথে দেখা হল ? " প্রায় সাড়ে আটটা নাগাদ ঘরে ঢুকতে যেতেই পল্লবীর তীক্ষ্ণ কটাক্ষ ধেয়ে আসে রাজুর দিকে।
ঘরে সোফায় বসে আছে পল্লবী। গায়ে ঘরের পোষাক। মনে হচ্ছে অনেক আগেই এসেছে। আর রাজুও কাউকে না জানিয়ে বেরিয়ে গেছিলো।
একটু থমকায় রাজু, " তুমি জানতে যে কাকীমা হাসপাতালে ভর্তি? " রাজু বিস্মিত হয়ে বলে।
" হ্যাঁ..... এটা না জানার তেমন কিছু নেই, আমাকে কাজে মাঝে মধ্যেই সেখানে যেতে হচ্ছে। " পল্লবী ক্যাসুয়ালি বলে।
" তাও একবার আমাকে বললে না? " রাজুর আহত স্বর।
" প্রয়োজন মনে করি নি। কেউ ফুর্তি করে প্রেগ্ন্যান্ট হয়ে আসলে সেটাকে গুরুতর অসুখের পর্যায়ে ফেলা যায় না...... " পল্লবী দাঁত চেপে বলে।
রাজু অবাক হয়ে তাকায়। এই পল্লবীকে ওর কেমন যেনো অচেনা লাগে। সেই লড়াকু অপরের জন্য নিজেকে সঁপে দেওয়া মেয়েটা যেনো অন্য কেউ। সেই মেয়েটার মধ্যে কারো প্রতি এতো বিতৃষ্ণা দেখে নি একমাত্র নিজের পরিবার ছাড়া....... কিন্তু এটা কে?
" এসব কি বলছো পল্লবীদি? ভুলে গেছো একদিন তোমার পরিবারও তোমার প্রেগন্যান্সি নিয়ে এমন কথা বলেছিল? তাহলে তুমি তাদের সুরেই আজ কাকিমাকে দোষারোপ করছো? " রাজু গলার স্বর নামিয়ে বলে।
পল্লবী সোফায় বসে ছিলো। উঠে দাঁড়িয়ে কিছু না বলে বাইরে চলে আসে। ওর মুখ থমথমে হয়ে আছে। বাইরে এসে একটা সিগারেট ধরিয়ে টান দেয়। সত্যি তো, এটা কেনো বললো ও? অনামিকার প্রতি ক্ষোভ থেকে? ওর বাবা মাও তাহলে নিজেদের ক্ষোভ উজাড় করে দিয়েছিলো সেদিন। তারা দোষী হলে তো পল্লবী নিজেও একই দোষে দোষী।
রাজু ওর পিছন পিছন বেরিয়ে আসে। পল্লবীর রাগের কারণ রাজু জানে কিন্তু ওর কাছ থেকে এই কথা রাজু আশা করে নি একেবারে।
" আমার জন্য অনেক কিছু করেছো তুমি......কিন্তু প্লীজ এভাবে বোলো না, আমার ভালো লাগে না। "
" সত্যি কথা ভালো না লাগলে সেটা কি আমার দোষ? তুই অন্ধ হয়ে অনেক কিছু বিশ্বাস করতে পারিস সেটা আমি পারি না...... শী ইস এ ব্লাডি হোর, এটাই সত্যি..... " পল্লবী দাঁতে দাঁত চেপে বলে।
" তুমি যতই বলো, আমি কাকিমাকে খারাপ ভাবি না, ভাববোও না....... যেমন যে কেউ এসে তোমার নামে কিছু বলে গেলেই আমি বিশ্বাস করব না...... " রাজু আবেগে কাঁপতে থাকে।
" তুই এবার নিজের জায়গায় ফিরে যা...... নিজের ক্যারিয়ার তৈরী কর...... এসব ভাবার জন্য জীবনে অনেক সময় পাবি।"
সিগারেটটা ছুঁড়ে ফেলে দেয় পল্লবী। ঘুরে দাঁড়িয়ে রাজুকে জড়িয়ে ধরে। পাগলের মতো ওর ঠোঁটে চুমু খেতে থাকে। রাজু বুঝতে পারে না পল্লবীকে। এতো আবেগ কোনোদিন পল্লবী দেখায় নি এর আগে। একসময় শান্ত হয়ে দাঁড়ায়, ওর দুই চোখ জলে ভিযে আছে। কিন্তু মুখে নিজের অসহায়তা প্রকাশ করে না ও।
" তুই চলে যা রাজু....... আর থাকিস না এখানে,,,, আর বেশী কিছু জানতেও চাস না,......প্লীজ...... কাল সকালেই চলে যাবি। "
" তুমি সত্যি চাও আমি চলে যাই? " রাজু বিস্মিত চোখে তাকায়।
" হ্যাঁ চাই..... এমনিতেও আমার অফিস থেকে মেল এসে গেছে, আগামী সপ্তাহে চলে যাবো...... "
কোথায় যাবে তুমি? রাজুর গলা ধরে আসে।
" জানি না...... আপাতত কলকাতার অফিসে, সেখান থেকে যেখানে পাঠাবে সেখানে। " পল্লবী৷ ওখের জল মোছে।
" ঠিক আছে তাই হবে, কাল সকালেই চলে যাবো আমি। " রাজু ঘুরে দাঁড়ায়, " তবে এভাবে তাড়িয়ে না দিলেও পারতে। "
" আর শোন.... " পলবীর ডাকে থমকে দাঁড়ায় রাজু।
" আর কোনদিন আমার সাথে যোগাযোগ করবি না..... মনে থাকবে তো?....... কারো মায়াতে আমি আর বাঁধা পড়তে চাই না "
রাজু উত্তর না দিয়ে ঘরে ঢুকে নিজের জামাপ্যান্ট সব ব্যাগে ভরতে থাকে। লালী এতোক্ষণ দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে এদের কথা শুনছিলো। ওর দুই চোখ বেয়ে জলের ধারা নেমে আসছে। সবাই যে যার মত ভাবছে। ওর কষ্টটা কাকে বোঝাবে ও?
পল্লবী একা বসে থাকে রাত পর্যন্ত বাইরে। আজ সব কিছু ভুলে গিয়ে ভেবেছিলো অনামিকার সাথে দেখা করবে। সেই উদ্দ্যেশ্যেই অফিস ছুটির পর হাসপাতালে অনামিকার রুমের দিকে পা বাড়ায়। কিন্তু জানতো না যে সেখানে আগে থেকেই রাজু উপস্থিত আছে। বাইরে থেকে রাজুর গলার স্বর শুনে ও দাঁড়িয়ে পড়ে। বীনা ওকে দেখে চেল্লেও ইশারায় ওকে কিছু না বলতে বলে। দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে ওদের কথা কানে যায়। এভাবে কারো ব্যাক্তিগত কথা শোনাটা পল্লবীর স্বভাব বিরুদ্ধ হলেও এই ক্ষেত্রে স্বাভাবিক আকর্ষন এড়াতে পারে না। চলে আসতে গিয়ো দাঁড়িয়ে পড়ে। অনামিকার জীবন বৃত্তান্ত সবই শোনে পল্লবী। ওর মনে হতে থাকে রাজু আর অনামিকার এই সম্পর্ক অতল সমুদ্রের মতো। এখানে পল্লবী নিছকই তৃতীয় পক্ষ। রাজুর জীবনে পল্লবীর আলাদা কোন অস্তিত্ব নেই, যেটা অনামিকার আছে। অনামিকার সব কথা সত্য বলে মেনে নিলেও বাচ্চাটা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। রাজু নির্বোধ হতে পারে, কিন্তু পল্লবী না....... একটা মেয়ে জানবে না তার পেটে কার বাচ্চা? অনামিকা শুধু চালাকই না, অত্যন্ত ধূর্তও..... আর রাজু ওর চালাকিতে এমন বশ হয়েছে যে, ওকে আটকানোর সাধ্য কারো নেই.....।
আমি বৃষ্টি হয়ে
তোমার
নগ্ন শরীর বেয়ে নামতে চাই


![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)