Thread Rating:
  • 4 Vote(s) - 2.5 Average
  • 1
  • 2
  • 3
  • 4
  • 5
Fantasy মুমতাহিনা টয়া: দিনের রাণী, রাতের দাসী
#30
১১।
দুজনে ওভাবেই পড়ে রইল কিছুক্ষণ। টয়া উপুড় হয়ে সিটের ওপর, ইশতি তার পিঠের ওপর। শুধু তাদের ভারী নিঃশ্বাসের শব্দ আর বাইরের ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক। জঙ্গলের বাতাস এসে তাদের ঘামে ভেজা শরীর জুড়িয়ে দিচ্ছে।
মিনিট পাঁচেক পর ইশতি টয়ার ওপর থেকে সরে বসল। সে পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করল। লাইটার জ্বালালো। আগুনের শিখায় মুহূর্তের জন্য গাড়ির ভেতরটা আলোকিত হলো। টয়া দেখল ইশতির সারা গায়ে ঘাম, চুল এলোমেলো, চোখে বুনো তৃপ্তি।

টয়া উঠে বসল। সে কোনো কাপড় পরল না। নগ্ন শরীরেই সে ইশতির হাত থেকে সিগারেটটা নিয়ে টান দিল। “উফফ...” টয়া ধোঁয়া ছেড়ে বলল। “জীবনটা যদি এমন হতো রে ইশতি... শুধু তুই, আমি আর এই জঙ্গল।”
ইশতি হাসল। “মশা কামড়াচ্ছে ম্যাডাম। বেশিক্ষণ থাকলে ম্যালেরিয়া হবে।” টয়া ইশতির উরুতে একটা চিমটি কাটল। “রোমান্স নষ্ট করিস না মশা কামড়াক । আমার শরীর এখন বিষাক্ত হয়ে গেছে। মশা আমাকে কামড়ালে মরাই মরে যাবে।” ইশতি টয়ার পিঠে হাত বুলিয়ে দিল। “পিঠটা বোধহয় ছিলে গেছে। লেদারের সিটে ঘষা লেগে।”

“লাগুক। শাওন জিজ্ঞেস করলে বলব শ্যুটিংয়ে অ্যাকশন দৃশ্যে ব্যথা পেয়েছি। আমার এখন ওসব নিয়ে ভাবার সময় নেই।”
টয়া জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল। জঙ্গলের গাছগুলো বাতাসের তালে দুলছে। “ইশতি, একটা কাজ করবি?”
“কী?”
“আমাকে নিয়ে চল। গাড়ির বাইরে। ওই ঘাসের ওপর।” ইশতি অবাক হলো। “পাগল হইছ? সাপখোপ থাকতে পারে। জোঁক থাকতে পারে।”
“থাকুক। আমি তোকে বলেছিলাম না, আমি রিস্ক চাই। গাড়ির ভেতরটা তো তাও নিরাপদ। আমি চাই একদম প্রকৃতির মধ্যে। ওই মাটিতে।”

ইশতি টয়ার পাগলামি দেখে হাসল। এই মেয়েটাকে সে যত দেখছে, ততই অবাক হচ্ছে। এর সাহসের কোনো সীমা নেই।
“চলো। তোমার যখন ইচ্ছা।” দুজনে গাড়ি থেকে নামল। সম্পূর্ণ নগ্ন। চারপাশ ঘুটঘুটে অন্ধকার। পায়ের নিচে ভেজা ঘাস, শুকনো পাতা। তারা সাবধানে পা ফেলে গাড়ির সামনে এল। হেডলাইটের আলোয় এক ফালি ঘাসজমি দেখা যাচ্ছে।

টয়া সেই ঘাসের ওপর শুয়ে পড়ল। মাটিটা ঠান্ডা। ভেজা। পিঠে কাটার মতো কিছু বিঁধল। হয়তো শুকনো ডাল বা পাথর। টয়া পরোয়া করল না। সে আকাশের দিকে তাকাল। গাছের ফাঁক দিয়ে কয়েকটা তারা দেখা যাচ্ছে। 
“আয় ইশতি... আমার ওপর আয়। আকাশ দেখ। আজ আমরা আদিম মানুষ। আমাদের কোনো কাপড় নেই, কোনো পরিচয় নেই।” ইশতি টয়ার ওপর এল। মাটির স্পর্শ, ঘাসের গন্ধ, আর টয়ার শরীরের উত্তাপ—সব মিলে এক আদিম নেশা।

“এখানে কি কেউ আমাদের দেখছে?” টয়া ফিসফিস করল।
“হয়তো দেখছে। গাছের ওপর থেকে বানর দেখছে। ঝোপের আড়াল থেকে শিয়াল দেখছে।” “দেখুক। ওরা জানুক, মানুষের বাচ্চারাও ওদের মতো করতে পারে।”

দ্বিতীয়বার মিলনটা হলো ধীর লয়ে। ক্লান্ত শরীরের শেষ নির্যাসটুকু নিংড়ে নেওয়ার মতো। টয়া মাটির সাথে মিশে গেল। তার চুলে ধুলোবালি লাগল, পিঠে কাদা লাগল। কিন্তু তার মনে হলো সে পৃথিবীর সাথে একাত্ম হয়ে গেছে। ইশতি যখন তার ঠোঁটে চুমু খেল, টয়ার মনে হলো সে কোনো বুনো ফলের স্বাদ পাচ্ছে।

শেষ হওয়ার পর তারা কিছুক্ষণ ঘাসের ওপর শুয়ে রইল। মশা কামড়াচ্ছে সত্যিই। কিন্তু টয়ার সেদিকে খেয়াল নেই। সে ইশতির বুকে মাথা রেখে বলল, “ইশতি, একটা সত্যি কথা বলবি?”
“কী?”
“তুই আমাকে ভালোবাসিস? নাকি শুধু আমার শরীরটা?” ইশতি আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল, “জানি না টয়া। শুরুতে তো শুধু শরীরটাই ছিল। তুমি বড়লোকের বউ, সুন্দরী নায়িকা। তোমারে পাওয়া মানে তো আকাশের চাঁদ পাওয়া। কিন্তু এখন... এখন মনে হয় তুমি আমারই একটা অংশ। তোমার এই পাগলামি, এই নোংরামি—এগুলো ছাড়া আমি আর বাঁচতে পারব না। তুমি আমারে নষ্ট করে দিছ, কিন্তু এই নষ্ট হওয়াটাই আমার ভালো লাগে।”

টয়া হাসল। “আমরা দুজনেই নষ্ট রে। শাওন ভালো, ও পবিত্র। আর আমরা দুজন পচা আপেল। তাই তো আমরা একসাথে আছি।”
 টয়া উঠে দাঁড়াল। তার ফর্সা শরীরে কাদা লেগে আছে। সে হাত দিয়ে ঝাড়ল না।

“চল, এবার ফিরতে হবে। রাত অনেক হয়েছে।”

তারা গাড়িতে উঠল। পানি দিয়ে শরীরটা মোটামুটি পরিষ্কার করল। তারপর কাপড় পরল। টয়া শাড়িটা পরল খুব অগোছালোভাবে। চুলগুলো বাঁধল না।
রাত আটটা বাজার ঠিক আগ মুহূর্ত। জঙ্গলের ভেতর অন্ধকারটা তখন আর রোমান্টিক মনে হচ্ছিল না। হেডলাইটের আলো নিভিয়ে দেওয়ার পর চারপাশের গাছগুলো যেন এক একটা প্রেতাত্মার মতো দাঁড়িয়ে ছিল। টয়া আর ইশতি তখনো গাড়ির পেছনের সিটে। তাদের শরীরের উত্তেজনা সবেমাত্র প্রশমিত হতে শুরু করেছে। টয়া শাড়িটা গায়ে জড়াচ্ছে, ইশতি প্যান্টের জিপারটা টেনেছে। টয়া ইশতির গালে হাত রেখে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল—হয়তো কোনো সোহাগের কথা, কিংবা ফেরার তাড়া।

ঠিক সেই মুহূর্তেই জঙ্গলটা কেঁপে উঠল।
ঝোপঝাড় ভেঙে মড়মড় শব্দ। মনে হলো একপাল বুনো হাতি তেড়ে আসছে। তারপর তীব্র আলো। একযোগে চার-পাঁচটা শক্তিশালী টর্চের আলো এসে পড়ল প্রাডোর জানালার কাঁচ ভেদ করে সোজা তাদের মুখের ওপর। আলোটা এত তীব্র এবং আকস্মিক যে টয়া আর্তনাদ করে চোখ বন্ধ করে ফেলল। “এই! কে ওখানে? গাড়ি থামা! লাইট দে!” কর্কশ, ভাঙা গলার চিৎকার। আঞ্চলিক টান, কিন্তু তাতে এক ধরণের হিংস্রতা মেশানো।

ইশতি বিদ্যুৎগতিতে সামনে তাকাল। চার-পাঁচজন লোক। তাদের অবয়ব অন্ধকারের কারণে স্পষ্ট নয়, কিন্তু টর্চের আলোয় তাদের হাতের লাঠি, লোহার রড আর রামদা ঝিলিক দিয়ে উঠল। এরা হাইওয়ে পুলিশ নয়, এরা স্থানীয় সিকিউরিটি গার্ড কিংবা হাইওয়ের ডাকাত—যারা জঙ্গলের এই নির্জনতার সুযোগ নেয়।

ইশতি বুঝে গেল বিপদ আসন্ন। সে ড্রাইভিং সিটে বসার জন্য লাফ দিল, কিন্তু দেরি হয়ে গেছে। দুজন লোক দৌড়ে এসে ড্রাইভিং সিটের লক করা দরজাটা লাঠি দিয়ে বাড়ি মারল। কাঁচটা ঝনঝন করে ভেঙে গেল। ইশতিকে কলার ধরে জানালার ফাঁক দিয়ে টেনে ধরার চেষ্টা করল একজন। 
“হারামজাদা! জঙ্গলের ভেতর ফুর্তি মারতে আইছস? বাইর হ! গাড়ি থেইকা বাইর হ!”

টয়া পেছনের সিটে ভয়ে কুঁকড়ে গেল। তার শাড়িটা এখনো অগোছালো। ব্লাউজের হুক লাগানো হয়নি, বুকের অনেকটা অংশ অনাবৃত। সে দ্রুত শাড়িটা দিয়ে নিজেকে ঢাকার প্রাণপণ চেষ্টা করল। কিন্তু লাভ হলো না। পেছনের দরজাটাও হ্যাঁচকা টানে খুলে ফেলা হলো।

“ওরে বাবা! মাগীও আছে সাথে! নাম নিচে, নাম!”

ইশতিকে দুজন ধরে টেনেহিঁচড়ে বাইরে বের করল। ইশতি গ্রামের ছেলে, তার গায়ে শক্তি আছে। সে দেখল টয়াকে ওরা অপমান করছে। তার রক্ত মাথায় উঠে গেল। সে হ্যাঁচকা টানে নিজেকে ছাড়িয়ে নিল। তারপর হাতের কাছে যাকে পেল, তার নাকে সজোরে এক ঘুষি বসাল।

“ম্যাডামের গায়ে হাত দিবি না শুয়োরের বাচ্চারা! আমি তোদের খুন করব!” ইশতি গর্জন করে উঠল।
শুরু হলো এক অসম লড়াই। ইশতি একাই বাঘের মতো লড়তে লাগল। তার ঘুষিতে একজন ছিটকে পড়ল কাঁটাঝোপের মধ্যে, আরেকজনের হাত থেকে লাঠি পড়ে গেল। ইশতি সেই লাঠিটা কুড়িয়ে নিয়ে পাগলের মতো ঘোরাতে লাগল। তার চোখে তখন খুন। সে তার মালিককে, তার প্রেমিকাকে বাঁচাতে চায়। এই মুহূর্তে সে আর ড্রাইভার নয়, সে একজন যোদ্ধা।

“ম্যাডাম, আপনি গাড়ির লক লাগান! লক লাগান!” ইশতি চিৎকার করল। 
কিন্তু টয়া নড়তে পারল না। ভয়ে তার হাত-পা অবশ হয়ে গেছে। সে শুধু দেখল ইশতি মারছে এবং মার খাচ্ছে। টর্চের আলো এদিক-ওদিক নড়ছে, আর তার মধ্যে দেখা যাচ্ছে ইশতির রক্তাক্ত মুখ।

পাঁচজনের সাথে একজন বেশিক্ষণ পারে না। পেছন থেকে একজন লোহার রড দিয়ে ইশতির মাথায় সজোরে বাড়ি মারল। একটা ভোঁতা শব্দ হলো। 
“আহ্!” ইশতি আর্তনাদ করে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। মুহূর্তের মধ্যে বাকি চারজন তার ওপর হায়েনার মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল। লাথি, ঘুষি, লাঠির বাড়ি। ইশতিকে তারা মাটিতে মিশিয়ে ফেলল। 

“শালা, তেজ দেখাস? আমাদের মারস? কার এলাকায় আইছস জানস না?”
ওদের লিডার গোছের লোকটা—যার গায়ের রঙ মিশমিশে কালো, মুখে বসন্তের দাগ, আর পান খেয়ে দাঁতগুলো রক্তবর্ণ—সে ইশতির পেটে বুট জুতো দিয়ে লাথি মারল। ইশতি ব্যথায় কুঁকড়ে গেল, মুখ দিয়ে গ্যাঁজলা বেরোতে লাগল। “এইটারে বাঁধ। ওই আকাশমনি গাছের লগে বাঁধ। আইজ ওর চোখের সামনেই ওর মাগীর ইজ্জত মারমু। দেখুম কেমনে বাঁচায়।”

ইশতিকে টানতে টানতে একটা বড় আকাশমনি গাছের সাথে নিয়ে যাওয়া হলো। ইশতির নিজের গায়ের ছেঁড়া গেঞ্জি আর ওদের কাছে থাকা মোটা নাইলনের দড়ি দিয়ে ইশতিকে শক্ত করে বাঁধা হলো গাছের সাথে। ইশতির মুখ ফুলে গেছে । সে গোঙাতে গোঙাতে টয়ার দিকে তাকাল। তার চোখে জল। অক্ষমতার জল। তার চোখের সামনে তার ভালোবাসার মানুষটিকে ছিঁড়ে খাওয়ার আয়োজন চলছে, আর সে কেবল দর্শক।

এবার ওরা টয়ার দিকে ফিরল। টয়া গাড়ির সিটের কোণায় জড়সড় হয়ে বসে আছে। টর্চের আলো তার মুখের ওপর। ভয়ের চোটে তার ফর্সা মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। তার চুল এলোমেলো, শাড়িটা কোনোমতে গায়ে জড়ানো। সে থরথর করে কাঁপছে। 
ভাগ্যক্রমে, বা দুর্ভাগ্যক্রমে—ওরা টয়াকে চিনল না। টয়া এখন মেকআপ ছাড়া। তার চুল উশকোখুশকো। পরনে সাধারণ সুতি শাড়ি। আর এই অন্ধকারে, জঙ্গলের ভেতরে ওরা ভাবতেই পারেনি যে দেশের অন্যতম জনপ্রিয় অভিনেত্রী এখানে আসতে পারে। ওদের কাছে টয়া শুধুই এক ‘বড়লোকের বখে যাওয়া বউ’ কিংবা ‘দামী কলগার্ল’, যে ড্রাইভারের সাথে ফুর্তি করতে এসেছে।

লিডার লোকটা এগিয়ে এল। তার হাতে টর্চ। সে আলোটা টয়ার সারা শরীরে ঘোরাতে লাগল। টয়ার অনাবৃত কাঁধ, এলোমেলো শাড়ির ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে থাকা পা—সবকিছু সে খুঁটিয়ে দেখল।
“মালটা তো জবর! দেখছিস শরীরটা? মাখনের মতো।” আরেকজন বলল, “ওস্তাদ, ড্রাইভারের লগে ফুর্তি করতে আইছে। নিশ্চয়ই নিসাস (নেশা) করছে। বেশ্যার জাত। এইগুলানরে ছাইড়া দেওয়া ঠিক হইবো না। বিচার করা লাগবো।” ‘বিচার’ মানে কী, তা বুঝতে টয়ার বাকি রইল না। তার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। সে আজ ইশতিকে বলেছিল তাকে ‘নোংরা’ করতে, ‘;.,’ করার ভান করতে। কিন্তু সেটা ছিল খেলা, সেটা ছিল নিয়ন্ত্রণ। আর এখন যা হতে যাচ্ছে, তা বাস্তব। এবং বাস্তব সব সময় কল্পনার চেয়েও ভয়ংকর।
লিডার টয়ার হাত ধরে হ্যাঁচকা টানে গাড়ি থেকে নামাল। টয়া মাটিতে পড়ে গেল। ভেজা ঘাস আর কাদা লাগল তার শরীরে। “ছেড়ে দিন... প্লিজ ছেড়ে দিন... যা টাকা আছে নিয়ে যান... গাড়িটা নিয়ে যান... পায়ে পড়ি...” টয়া কাঁদতে কাঁদতে বলল। সে তার অভিনেত্রী সত্তা ভুলে গেছে, সে এখন শুধুই এক অসহায় নারী। সে হাত জোড় করে ভিক্ষা চাইল। “টাকা তো নিমুই। গাড়িও রাইখা দিমু। কিন্তু আগে তোরে নিমু। এত সুন্দর মাল জঙ্গলে আইসা ফিরায়া দিলে পাপ হইবো।”

লিডার লোকটা কুৎসিতভাবে হাসল। তার পচা দাঁতের ফাঁক দিয়ে লালা বের হচ্ছে। বাতাসের গন্ধে মদের ঝাঁঝ। এরা সস্তা দেশি মদ, তাড়ি কিংবা চোলাই খেয়ে আছে। সেই গন্ধে টয়ার বমি আসার উপক্রম হলো। 
টয়া পেছনের দিকে সরতে চাইল। সে ঘাসের ওপর দিয়ে পিছিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু পেছনের পথ বন্ধ। চারপাশ ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে চারজন ক্ষুধার্ত হায়েনা। তাদের চোখে কামনার চেয়েও বেশি আছে হিংস্রতা। তারা ইশতির কাছে মার খেয়েছে, সেই রাগের শোধ তারা তুলবে টয়ার ওপর। তাদের হাতে লাঠি, চোখে লালসা।

“না... প্লিজ না...” টয়া চিৎকার করল। “ইশতি! ইশতি! আমাকে বাঁচা!”
ইশতি গাছের সাথে বাঁধা। সে ছটফট করছে। দড়ি ছিঁড়তে চাইছে। তার হাতের চামড়া ছিলে রক্ত বের হচ্ছে। “ছেড়ে দে ওরে! খবরদার! আমি তোদের খুন করব! ওরে ছুইস না!”

ইশতির চিৎকারে ওরা হাসল। একজন গিয়ে ইশতির মুখে আবার লাথি মারল। ইশতি জ্ঞান হারানোর মতো হয়ে গেল।
এরপর যা ঘটল, তা টয়ার জীবনের সবচেয়ে ভয়াবহ দুঃস্বপ্নকেও হার মানায়। লিডার লোকটা টয়ার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। কোনো ফোরপ্লে নয়, কোনো সম্মতি নয়, এমনকি কোনো কামনার খেলাও নয়। এটা শুধুই দখল। এটা শুধুই ছিঁড়ে খাওয়া।

টয়া আজ বিকেলে ইশতিকে বলেছিল, “আমাকে নোংরা কর, আমাকে ভোগ কর।” সে চেয়েছিল ‘রেপ ফ্যান্টাসি’। সে চেয়েছিল ইশতি তাকে জোর করবে, কিন্তু সেই জোরের পেছনে থাকবে ভালোবাসা, থাকবে টয়ার নিজের সুপ্ত সম্মতি। ইশতির ঘামের গন্ধে সে মাদকতা খুঁজে পেয়েছিল, কারণ সেই ঘাম ছিল তার পরিচিত, তার আকাঙ্ক্ষিত। ইশতির ঘামে ছিল পরিশ্রমের গন্ধ, পৌরুষের গন্ধ।

কিন্তু এই লোকগুলো? 
এদের গায়ের গন্ধে টয়ার নাড়িভুঁড়ি উল্টে আসার জোগাড় হলো। পচা মদ, বহুদিন না মাজা দাঁতের দুর্গন্ধ, অপরিচ্ছন্ন শরীরের বিকট ঘ্রাণ, আর বিড়ি-সিগারেটের পোড়া ছাইয়ের গন্ধ। লিডার যখন তার ওপর চেপে বসল, টয়ার মনে হলো এক বস্তা পচা আবর্জনা তার ওপর ঢেলে দেওয়া হয়েছে। লোকটার ত্বক খসখসে নয়, চটচটে। মনে হচ্ছে কোনো বিষাক্ত সরীসৃপ বা কাদা মাখা শূকর তার গায়ের ওপর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে।

টয়া বাধা দেওয়ার চেষ্টা করল। নখ দিয়ে খামচে দিল লোকটার মুখ। “হারামজাদী! নখ মারস?” লোকটা সজোরে টয়ার গালে থাপ্পড় মারল। চটাস করে শব্দ হলো। ইশতির থাপ্পড়ে টয়া সুখ পেত, কারণ সেটা ছিল খেলার অংশ। কিন্তু এই থাপ্পড়টা টয়ার কান ভোঁ ভোঁ করে দিল। তার ঠোঁট ফেটে রক্ত বের হলো। চোয়ালটা মনে হলো ভেঙে গেছে। মাথাটা চক্কর দিয়ে উঠল।

টয়া অনুভব করল তার শাড়িটা শরীর থেকে ছিঁড়ে ফেলা হচ্ছে। ব্লাউজটা টান দিয়ে ছিঁড়ে ফেলল। সে এখন সম্পূর্ণ উলঙ্গ। জঙ্গলের এই অন্ধকারে, চারজন অপরিচিত, হিংস্র পুরুষের সামনে সে নগ্ন। এই নগ্নতায় কোনো গ্ল্যামার নেই, কোনো ক্ষমতা নেই। আছে শুধু লজ্জা আর ঘৃণা। টয়ার মনে হলো তার চামড়াটাই কেউ তুলে ফেলছে।

লিডার যখন তার শরীরে প্রবেশ করল, টয়ার মনে হলো কেউ গরম লোহা ঢুকিয়ে দিয়েছে। কোনো লুব্রিকেন্ট নেই, কোনো দয়া নেই। লোকটা তাকে পিষছে। টয়ার আর্তনাদ জঙ্গলের বাতাসে মিলিয়ে গেল। সে ইশতির দিকে তাকাল। ইশতি চোখ বন্ধ করে ফেলেছে। সে এই দৃশ্য সহ্য করতে পারছে না। নিজের ভালোবাসার মানুষকে, নিজের মালকিনকে এভাবে চোখের সামনে ছিঁড়ে খেতে দেখে ইশতি হয়তো মরেই যেতে চাইল।

টয়া চোখ বন্ধ করল। সে তার মস্তিষ্ককে নির্দেশ দিল—‘শরীর থেকে বেরিয়ে যাও। তুমি এখানে নেই। তুমি শ্যুটিং স্পটে আছ। এটা একটা দৃশ্য। কাট বললেই সব ঠিক হয়ে যাবে। ডিরেক্টর এখনই কাট বলবে।’ 
কিন্তু কেউ ‘কাট’ বলল না। দৃশ্যটা চলতেই থাকল।

লিডারের কাজ শেষ হলে দ্বিতীয়জন এল। তারপর তৃতীয়জন।
প্রতিটা স্পর্শ টয়ার কাছে মনে হলো বিষাক্ত সাপের ছোবল। এরা তাকে মানুষ ভাবছে না, ভাবছে ব্যবহারের বস্তু। তারা গালাগাল করছে, হাসছে, আর নিজেদের মধ্যে অশ্লীল মশকরা করছে। “বড়লোকের মাগী... দেখছিস চামড়াটা কেমন নরম? মাখনের লাহান।”

“ড্রাইভারের লগে শুইতে পারে, আর আমাগো লগে পারে না? ড্রাইভারের কি সোনা দিয়া বাঁধানো?” 
একজনের পর আরেকজন এল। তাদের শরীরের ওজন, তাদের নখ, তাদের দাঁত—সব কিছু দিয়ে তারা টয়াকে ক্ষতবিক্ষত করল। কেউ তার স্তনে কামড় দিল, কেউ তার উরুতে খামচি দিল। টয়ার সারা শরীরে কালশিটে পড়ে গেল। টয়ার যোনিপথ ছিঁড়ে যাওয়ার মতো অবস্থা। সে আর চিৎকার করতে পারছে না, তার গলা দিয়ে শুধু ঘড়ঘড় শব্দ বের হচ্ছে।

টয়ার শরীর পাথর হয়ে গেল। সে আর কাঁদল না, আর নড়ল না। সে শুধু মড়ার মতো পড়ে রইল। তার ফ্যান্টাসির জগতটা কাঁচের মতো চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেল। সে চেয়েছিল নোংরামি, কিন্তু এই নোংরামি তাকে ভেতর থেকে মেরে ফেলল। সে চেয়েছিল ‘সস্তা’ হতে, কিন্তু এরা তাকে নর্দমার কীট বানিয়ে দিল। সম্মতির অভাব যে যৌনতাকে কতটা বীভৎস, কতটা যন্ত্রণাদায়ক করে তুলতে পারে—টয়া আজ তা হাড়হাড় টের পেল। তার মনে হলো, শাওনের সেই ‘পবিত্র’ আদর আর ইশতির ‘বুনো’ আদরের মাঝখানে এই ;.,ের অভিজ্ঞতা এক বিশাল কালো গর্ত তৈরি করে দিল।

ঘন্টাখানেক পর নরকযন্ত্রণা শেষ হলো। 
ওরা টয়াকে ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। টয়া কাদার মধ্যে পড়ে আছে। তার শরীরে কাদা, রক্ত, আর চার-পাঁচজন পুরুষের বীর্যের আঠালো ভাব। এই বীর্য তার কাছে এখন অ্যাসিডের মতো মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছে তার শরীরটা পচে যাচ্ছে।

লিডার লোকটা প্যান্ট ঠিক করতে করতে ইশতির কাছে গেল। ইশতির পকেট থেকে মানিব্যাগটা বের করে নিল। টয়ার পার্স থেকে টাকা, ক্রেডিট কার্ড আর দামী আইফোনটা নিল। 
“মোবাইলটা নিয়া গেলাম। যাতে পুলিশরে খবর না দিতে পারস। আর শোন, যদি থানায় যাস, তাইলে কিন্তু ভিডিওটা ইন্টারনেটে ছাইড়া দিমু। বুঝছিস? আমাগো লোক সব জায়গায় আছে।”

ওরা ভিডিও করেছে কি না টয়া জানে না। হয়তো টর্চের আলোয় কিছু ফুটেজ নিয়েছে, কিংবা শুধুই ভয় দেখানোর জন্য বলল। কিন্তু এই ভয়টাই যথেষ্ট টয়াকে সারাজীবন বোবা করে রাখার জন্য। 
“গাড়িটা রাইখা গেলাম। দয়া করলাম। ভাগ এখান থেইকা। আর যদি এই এলাকায় দেখি, জ্যান্ত পুঁইতা ফালামু।”

ওরা হাসতে হাসতে অন্ধকারের মধ্যে মিলিয়ে গেল। তাদের পায়ের শব্দ মিলিয়ে যাওয়ার পরও জঙ্গলে এক ভয়াবহ নিস্তব্ধতা বিরাজ করতে লাগল। ঝিঁঝিঁ পোকার ডাকগুলো এখন বিদ্রূপের মতো শোনাচ্ছে। মনে হচ্ছে প্রকৃতিও টয়াকে দেখে হাসছে।

টয়া কিছুক্ষণ ওভাবেই পড়ে রইল। তার নড়তে ইচ্ছে করছে না। তার মনে হচ্ছে সে মরে গেছে। তার আত্মাটা শরীর ছেড়ে চলে গেছে। শুধু পড়ে আছে একতাল মাংসপিণ্ড। তার পেটের ভেতরটা গুলিয়ে আসছে। সে বমি করল। পিত্তি উগড়ে দেওয়া বমি। 
কিন্তু তাকে উঠতে হবে। ইশতি। ইশতি বাঁধা আছে।
টয়া কোনোমতে উঠে বসল। তার সারা শরীরে ব্যথা। হাঁটতে পারছে না। সে তার ছেঁড়া শাড়িটা কোনোমতে গায়ে জড়াল। তারপর হামাগুড়ি দিয়ে ইশতির কাছে গেল। ভেজা ঘাস আর কাঁটার ওপর দিয়ে সে নিজেকে টেনে নিয়ে গেল।

 “ইশতি...” টয়ার গলা দিয়ে কোনো শব্দ বের হলো না। শুধু একটা ফিসফিসানি। “ওরা চলে গেছে... ইশতি...”
ইশতি চোখ খুলল। সেই চোখে এখন আর কোনো কামনার আগুন নেই। আছে এক আকাশ শূন্যতা, অপমান আর আত্মগ্লানি। সে টয়ার দিকে তাকাতে পারছে না। তার ম্যাডাম, তার প্রেমিকাকে সে রক্ষা করতে পারেনি। টয়া কাঁপতে কাঁপতে ইশতির বাঁধন খোলার চেষ্টা করল। তার আঙুলগুলো অবশ হয়ে আছে। নখগুলো ভেঙে গেছে। অনেক কসরত করে সে গিঁটটা খুলল।

ইশতি ধপাস করে মাটিতে পড়ে গেল। তার হাত-পা অবশ।
টয়া ইশতির মাথাটা নিজের কোলে তুলে নিল। কিন্তু সে কাঁদল না। তার চোখের পানি শুকিয়ে গেছে। সে তার ছেঁড়া শাড়ি দিয়ে ইশতির কপালের রক্ত মুছে দিল। “চল... আমাদের যেতে হবে... ওরা আবার আসতে পারে...” টয়ার গলাটা যান্ত্রিক শোনাল।

ইশতি কোনো কথা বলল না। সে টলতে টলতে উঠে দাঁড়াল। টয়াকে ধরল। দুজনে দুজনার অবলম্বন হয়ে গাড়ির দিকে গেল। 
গাড়ির ভেতরে তখনো সেই ভ্যাপসা গন্ধ। কিন্তু এখন সেই গন্ধটা টয়ার কাছে মৃত্যুর গন্ধের মতো লাগছে। সিটের ওপর ইশতির গেঞ্জিটা পড়ে আছে, যেটা একটু আগে তারা কামনার ঝোঁকে ছিঁড়েছিল। এখন সেটা দেখে মনে হচ্ছে কোনো লাশের কাপড়। সিটের চামড়ায় লেগে আছে ধস্তাধস্তির চিহ্ন।
ইশতি ড্রাইভিং সিটে বসল। তার হাত কাঁপছে। স্টিয়ারিং ধরতে তার কষ্ট হচ্ছে। এক চোখ ফুলে বন্ধ হয়ে গেছে। টয়া পেছনের সিটে বসল। যেখানে একটু আগে সে স্বর্গের সন্ধান করছিল, এখন সেই জায়গাটা নরক। সে জানালার কাঁচ তুলে দিল। এসিটা ছাড়ল না। তার শীত করছে। হাড়কাঁপানো শীত। সে সিটের কোণায় নিজেকে গুটিয়ে নিল। সে তার যোনিপথ দুই উরু দিয়ে চেপে ধরল, যেন ভেতরের ব্যথাটা কমানো যায়।

গাড়ি স্টার্ট নিল। হেডলাইটের আলোয় জঙ্গলটা আবার দৃশ্যমান হলো। কিন্তু এই জঙ্গল এখন আর রোমান্টিক নয়। এটা একটা বধ্যভূমি।
গাড়িটা যখন মেইন রোডে উঠল, তখন রাত দশটা। হাইওয়েতে ট্রাক আর বাসের হেডলাইটগুলো চোখের ওপর এসে পড়ছে। মনে হচ্ছে প্রতিটা আলো তাকে ধিক্কার দিচ্ছে। সারা রাস্তায় কেউ কোনো কথা বলল না।

ইশতি শুধু ড্রাইভ করে গেল। তার চোখ রাস্তার দিকে স্থির, কিন্তু সে রাস্তা দেখছে না। সে দেখছে সেই দৃশ্যটা—চারটা লোক তার টয়াকে ছিঁড়ে খাচ্ছে, আর সে গাছের সাথে বাঁধা। তার পৌরুষ আজ ধুলায় মিশে গেছে। সে নিজেকেই নিজে চড় মারতে চাইল।

টয়া পেছনের সিটে মূর্তির মতো বসে রইল। সে তার শরীরটাকে অনুভব করার চেষ্টা করল। ব্যথা আছে, জ্বালা আছে। কিন্তু তার মনটা অসাড় হয়ে গেছে। সে ভাবল—আমি তো এটাই চেয়েছিলাম। নোংরামি। অপমান। জোরজবরদস্তি। কিন্তু কেন এত খারাপ লাগছে? কেন মনে হচ্ছে মরে যাই? উত্তরটা তার জানা। কারণ ওটা ছিল অভিনয়, আর এটা বাস্তব। ওটা ছিল নিয়ন্ত্রণ, আর এটা অসহায়ত্ব। ওটা ছিল ইশতি—যাকে সে ভালোবাসে, আর এরা ছিল জানোয়ার। টয়া বুঝতে পারল, ফ্যান্টাসির জগত আর বাস্তবতার জগতের মাঝখানে একটা অদৃশ্য দেয়াল আছে, যা আজ ভেঙে চুরমার হয়ে গেল।
[+] 3 users Like Orbachin's post
Like Reply


Messages In This Thread
RE: মুমতাহিনা টয়া: দিনের রাণী, রাতের দাসী - by Orbachin - 05-01-2026, 12:56 AM



Users browsing this thread: 1 Guest(s)