Thread Rating:
  • 18 Vote(s) - 3.06 Average
  • 1
  • 2
  • 3
  • 4
  • 5
কাজলদীঘি, শ্মশান ও পীরসাহেবের থান by Mamun Jafran
#9
পার্টঃঃ০৫
ট্রেন থেকে নেমে টিট সাহেবকে বিদায় জানালাম। স্টেশনের বাইরে এসে দেখলাম। গাড়ি রেডি। আমি ঝিমলি পেছনের সিটে উঠে বসলাম। হোটেলে পৌঁছতে মিনিট দশেক লাগল। হোটেলে চেক ইন করে নিজের রুমে গেলাম। রমাকান্ত আমাদের সঙ্গেই আমাদের রুম পর্যন্ত এল। ঘরেরে মধ্যে লাগেজ রেখে আমাকে বলল স্যার, আমি এখন অফিসে যাচ্ছি। অফিসে খবর দিচ্ছি আপনি চলে এসেছেন। আমি আবার কখন আসবো ? আমি বললাম তুমি এখন যাও। বালচন্দ্রনকে বলবে আমাকে একবার ফোন করতে। আমি আমার ভিজিটিং কার্ডটা ওকে দিলাম। ও সেলাম ঠুকে চলে গেলো। এতোক্ষণ যা কথা হল সব ইংরাজিতে। ঝিমলি আমাকে দেখছিল। রমাকান্ত চলে যেতে আমাকে বললো, আপনি ভালো ইংরাজী বলেনতো। সাউন্ড এবং প্রোনাউনসেসন খুব সুন্দর।
কেনো তুমি পারো না।
পারি কিন্তু ইংরাজী বলার কিছু স্টাইল আছে সেটা মেন্টেইন করা বেশ টাফ।
প্রেকটিস বুঝলে ঝিমলি। তুমিও পারবে। মানুষের অসাধ্য কিছু নেই, যদি তুমি ভালবেসে সেই কাজটা কর।
হোটেলের ঘর দেখে আমার চক্ষু চড়কগাছ। এ তো হোটেল রুম নয়। একটা স্যুইট। বিগ-বসরা এলে ম্যানেজমেন্ট এই ধরনের বন্দোবস্ত করে থাকেন। আমার খুব জানতে ইচ্ছা করছিল। আমি কি তাহলে বিগ বস হয়ে গেছি ? কিন্তু কার কাছ থেকে জানবো। বড়মাকে একটা ফোন করলাম। জানিয়ে দিলাম। হোটেলে পৌঁছেছি। বিগ-বসকে যেন জানিয়ে দেয়। বড়মা জানাল বিগ-বস এরি মধ্যে জেনে গেছেন আমি হোটেলে পৌঁছে গেছি। একটা ম্যাসেজ ঢুকলো দেখলাম। তানিয়ার কাল রাতে ফোন বন্ধ করে রাখার জন্য অভিমান।
ঝিমলি সোফায় গা এলিয়ে বসেছিল। ওর দিকে তাকাতেই দেখলাম চোখ নামিয়ে নিল। ওকে বেশ ক্লান্ত দেখাচ্ছে।
কি ভাবছ ? এ কোথায় এসে পড়লাম।
না।
তাহলে।
ভাবছি এতোটা সৌভাগ্য আমার কপালে লেখাছিল।
কিসের সৌভাগ্য।
এখানে এক্সাম দিতে এসে এরকম হোটেলে থাকব।
ধূস, যত সব আজে বাজে কথা।
নাগো অনিদা সত্যি বলছি। তোমার সঙ্গে দেখা না হলে আমার হয়তো অনেক কিছুই অজানা থেকে যেত।
আমারও ঠিক তাই। কি খাবে।
ফ্রেস হয়ে খাব।
ফ্রেস হবার আগে কিছু গরম গরম খেয়ে নাও। তারপর দেখবে ফ্রেস হতে দারুন মজা।
জানি এ অভিজ্ঞতা তোমার আছে। আমার কাল পরীক্ষা। একবার সিটটা কোথায় জানতে যেতে হবে।
তোমায় চিন্তা করতে হবে না। একটু পরেই বালচন্দ্রন আসবে। ও আমাদের এখানকার ব্যুর চিফ। ওকে বললেই সব ব্যবস্থা করে দেবে।
ঘরের বেলটা বেজে উঠল। লক ঘুরিয়ে খুলতেই একজন ওয়েটার এসে বলল। স্যার কফি আর কিছু স্ন্যাক্স নিয়ে আসি।
আমি ছেলেটির দিকে তাকালাম। তোমায় কে বলল আমাদের এই সময় এ গুলে লাগবে।
অফিস থেকে হুকুম আছে স্যার। আমার ওপর এই কামরার দেখভালের দায়িত্ব পরেছে।
ঝিমলি এককাত হয়ে সোফায় গা এলিয়ে দিয়েছে। ওর দিকে ছেলেটি একবার তাকাল। তাকানোই উচিত। আমি ওর জায়গায় থাকলে আমিও তাকাতাম।
ঠিক আছে যাও নিয়ে এস।
মনেহচ্ছে কোন অবস্থাপন্ন গেরস্থের ড্রইং রুমে বসে আছি। ঝিমলির দিকে তাকালাম। ও এবার পাদুটে ওপরে তুলে টান টান হয়ে শুয়ে পরেছে। শরীরের চরাই উতরাই দেখলে সত্যি নেশা লেগে যায়। কালকের রাতের কথাটা মনে পরে গেল। সত্যি আমি খুব ভাগ্যবান। না হলে এরকম একটা মেয়ে আমার কপালেই বা জুটবে কেন।
নিজের ব্যাগ থেকে টাওয়েল আর একটা পাজামা পাঞ্জাবী বার করে নিলাম। আর সাবান শ্যাম্পু। ঝমলি চোখ বন্ধ করে পরে আছে। কাছে গিয়ে দেখলাম ঘুমিয়ে পরেছে। ওকে আর বিরক্ত করলাম না। ঘরটা ভাল করে ঘুরে ঘুরে দেখলাম। আবিষ্কার করলাম এই ঘরের ভতরেও আর একটা ঘর আছে। খুলে দেখলাম। ওইটা আরো সুন্দর। দেখে মনে হচ্ছে শোবার ঘর। পলঙ্ক দেখে এখুনি শুয়ে পরতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু না। ঝমলিকে সারপ্রাইজ দিতে হবে। সত্যি ভাগ্য করে জন্মেছিলাম। জানলার পর্দাটা একটু সরাতেই দেখলাম কাছেই একটা ছোট পাহারের মতো দেখাচ্ছে। কি দারুন দৃশ্য। সত্যি আমি ভাগ্যবান।
হ্যাঁ আজ বলছি আমি ভাগ্য করেই জন্মেছি। কিন্তু যেদিন গ্রাম থেকে শহরে পা রাখলাম। একটা অনাথ ছেলে। শুধু স্যারের একটা চিঠি সঙ্গে করে। আর পকেটে স্যারের দেওয়া কিছু টাকা। আসার সময় স্যার খালি বলেছিলেন। কলকাতায় যাচ্ছিস যা। জোয়ারের জলে ভেসে যাস না। নিজের কেরিয়ারটা তৈরি করিস।
কলেজের ছাত্ররা বলতাম মনামাস্টার। নিঃসন্তান মনামাস্টার আমার কারিগর। স্যারের কাছেই শুনেছি। আমার বাবা তাঁর ঘনিষ্ট বন্ধু ছিলেন। তাই দুজনে পাশাপাশি বাড়ি করেছিলেন। জমিজমাও পাশাপাশি কিনতেন। একবছর বন্যায় আমাদের গ্রামে খুব কলেরা হয়েছিল। আমার বাবা-মা সেই সময় একসঙ্গে মারা যান। সেই থেকেই আমি গ্রামের ছেলে। তবে মনামাস্টারের বাড়িতেই বড় হয়েছি। আরো কতো কি যে হয়েছে। তা বলে শেষ করা যাবে না।
আগে বছরে একবার গ্রামে যেতাম। অন্নপূর্ণা পূজের সময়। আমাদের গ্রামে ঘটা করে এই পূজোটা হয়। তবে গত পাঁচ বছর আমি গ্রাম মুখো হই নি। আমার যা কিছু জমি-জিরেত সবি মনামাস্টারের হেপাজতে। ভিটেটা এখনো মনামাস্টার সারিয়ে শুরিয়ে রেখেছে। মাটির দেওয়াল এখনো মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। বন্ধুরা এই অন্নপূর্ণা পূজোর সময় সবাই আসত। দেখা সাক্ষাৎ হত। ঐ দু’চারদিন বেশ ভাল লাগে। মা-বাবা কাউকেই মনে পরে না। আমি যখন কলকাতায় আসছি, মনা মাস্টার আমাকে একটা এ্যালবাম দিয়েছিলেন। জানিনা তোর সঙ্গে আমার আর দেখা হবে কিনা। এটা রাখ। এতে তুই তোর পরিবারকে জানতে পারবি।
সত্যি কথা বলতে কি গ্রামে থাকা কালীন, মা-বাবা কি জিনিষ জানতে পারি নি। অমিতাভদার বাড়িতে এসে বুঝতে পারলাম মা কি জিনিষ।
কোমল হাতের স্পর্শে চমকে উঠলাম। ঝিমলি পাশে দাঁড়িয়ে আছে। আমার মুখের দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে আছে। হাসলাম। ঝিমলি বুঝতে পারল। আমার হাসির মধ্যে কোন প্রাণ নেই।
কি ভাবছিলে এত।
না।
লুকিয়ে যাচ্ছ।
আমার জন্য তোমার কোন অসুবিধে।
দূর পাগলি।
আমার কথায় ঝিমলি হো হো করে হেসে ফেলল।
আবার বলো।
কি।
ঐ যে বললে।
বার বার বললেও প্রথম বারের মতো মিষ্টি লাগবে না।
ঝিমলি আমার নাকটা ধরে ঝাঁকিয়ে দিল।
এই প্রথম ঝিমলি আমার শরীর স্পর্শ করলো।
বেলটা বেজে উঠল। ঝিমলি গিয়ে দরজা খুললো। ওয়েটার এসেছে। ট্রেতে অনেক কিছু সাজিয়ে নিয়ে।
স্যার ব্রেকফাস্ট কখন করবেন।
ঘন্টা খানেক বাদে একবার এসো।
স্যার রুম সার্ভিসের বেলটা একবার কাইন্ডলি বাজিয়ে দেবেন।
ঠিক আছে।
ওয়েটার চলে যেতেই, ঝিমলি ট্রেটা নিয়ে বসল। স্ন্যাক্স আর কফি। ঝিমলি নিজেই সব নিজে হাতে করলো। আমায় একটা কাপ এগিয়ে দিয়ে বললো, স্ন্যাক্স গুলো নিজে হাতে হাতে নাও। বেশ খিদেও পেয়েগেছিল। দুজনে গোগ্রাসে খেলাম।
কথাপ্রসঙ্গে জানতে পারলাম ঝিমলিরা দুই বোন। ছোট বোন এই বারে মাধ্যমিক দিয়েছে। ওরা থাকে গোলপার্কে। ওরা বেশ অবস্থাপন্ন পরিবার। ওর মা পশ্চিমবঙ্গ সরকারের তথ্য-সংস্কৃতি দপ্তরের একজন বড় অফিসার। ঝিমলির কথামতো উনি আমাকে ভাল মতো চেনেন। তাছাড়া কাগজে আমার লেখাও পরেছেন।
ঝিমলি এখানে মেডিক্যাল পরার জন্য এক্সাম দিতে এসেছে। ওকে কালকের কথা বলতেই ওর মুখ চোখ রাঙা হয়ে উঠল। বললাম আমি হয়তো ভুল করেছি। ঝিমলি কিছুতেই সেই কথা স্বীকার করলো না। ব্যাপারটা এই রকম, এ রকম ঘটনা ঘটতেই পারে।
আমি ওর কথা শুনে একটু অবাক হলাম। ওকে বলার চেষ্টা করলাম। আমিই হয়তো অন্যায় কাজ করেছি। তোমাকে ওইভাবে লুকিয়ে লুকিয়ে দেখেছি। ঝিমলি বললো, না অন্যায় নয় অনিদা। তুমি যদি মেয়ে হতে আমি যদি ছেলে হতাম, তাহলে আমিও এই ঘটনা ঘটাতাম। তবে তোমাকে আমার খুব ভাললাগছে। তুমি সড়াসরি আমাকে বলেফেললে। তাছাড়া আমরা এখন ফ্রি-সেক্স নিয়ে অনেক কথা বলি। কিন্তু কাজের বেলা দেখা যায় শূন্য। আমি আর কথা বারালাম না। ওকে বললাম। তুমি বাথরুমে আগে যাবে না আমি যাব। ও বললো তুমি আগে সেরে নাও। তারপর আমি যাব।
আমি ওর সামনেই জামাটা খুলে ফেললাম। তারপর লজ্জাপেয়ে আবার পরতে গেলাম। ও হেসে ফেললো। এতগুলো ঘন্টা পার হবার পর এখনো লজ্জা যায় নি। আমি হেসে ফেললাম।
টাওয়েলটা কাঁধে নিয়ে বাথরুমে চলে গেলাম।।
মিনিট পনেরো পরে হাত দিয়ে চুলটা ঝারতে ঝারতে বেরিয়ে এলাম।
ঝিমলি একটা ছোট সর্টস পরেছে আর একটা সেন্ডো গেঞ্জি। আমি একঝলক ওর দিকে তাকিয়েই মাথা নীচু করলাম। এই পোষাকে ওর দিকে তাকান খুব মুস্কিল। চোখ সরিয়ে নিলাম।
তোমার একটা ফোন এসেছিল।
কে করেছিল।
নাম বলেনি। বললো অফিস থেকে বলছি।
ও।
আবার করবে বলেছে। আধঘন্টা পরে।
ঠিক আছে। আসতে না আসতেই কাজের তারা।
আমি আমার ব্যাগটা টেনে নিয়ে চেনটা খুললাম। পাজামা পাঞ্জাবী আর পরা যাবে না। ব্যাটারা হয়তো এখুনি এসে পড়বে। আমি একটা জিনসের প্যান্ট আর গেঞ্জি বার করলাম।
ঝিমলি বাথরুমে। দরজায় নক করার আওয়াজ। খুললাম। ব্রেকফাস্ট নিয়ে চলে এসেছে। আমি বললাম, সেন্টার টেবিলে রাখো। ছেলেটি সেন্টার টেবিলে রেখে চলে গেলো। আমি জামা পেন্ট পরে রেডি হয়ে গেলাম।
ঝিমলি বেরিয়ে এলো। টেবিলের ওপর খাবার দেখে বললো কি গো অনিদা এটা আবার কখন এলো।
এই তো।
ঝিমলি আমি একটু বেরিয়ে যাবো। তুমি একটু রেস্ট নাও তারপর বেরিয়ো। আমি অফিস থেকে গাড়ি পাঠিয়ে দেবো।
ঠিক আছে।
তোমার কোনো অসুবিধে হবে নাতো।
না না।
দুজনে একসঙ্গে খেলাম। আলুপরটা মাখন পনির স্যালড বেশ ভালো লাগলো। অফিসের গাড়ি চলে এলো ঠিক সময়ে। আমি বেরিয়ে গেলাম। রাতে আর ফিরতে পারলাম না। ঝিমলিকে জানিয়ে দিলাম। পরেরদিন ওকে নিয়ে ওর কলেজে পৌঁছে দিয়ে আমার কাজ সারলাম। বিকেলের ট্রেনে ঝিমলি ফিরলো।
ঝিমলি চলে গেল। এর পর কাজ আর কাজ। কাগজের অফিসে কাজ করা তো নয়। ঘন ঘন ফোন। নানা রকমের ফাই ফরমাস। আর কতো কি। যাক এই কদিনে চুটিয়ে কাজ করলাম। যাওয়ার দিন ঝিমলি ট্রেনে বসে একটা কথা বলেছিল। অনিদা আমি জীবনে এমন পুরুষ প্রথম পেলাম। যে হাতের কাছে সাজিয়ে দেওয়া খাবার দেখেও খেতে ইচ্ছে করলনা। তোমার প্রতি শ্রদ্ধায় আমার মাথা নত হয়ে আসছে। এই দুদিনে তোমার কাছ থেকে অনেক কিছু শিখলাম। একটা প্রণাম করব তোমায়।
আমি ওর হাতটা ধরে ফেললাম। না জীবনে বড় হতে গেলে অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে হয়। আমি সেই ত্যাগ স্বীকারের ব্রত পালন করছি। তোমার মতো একজন আমার পরিচিতা আছেন। তবে আমি তাকে জীবনে পাব না। ওই আর কি। গলাটা কেমন ধরে এল।
ঝিমলি আমাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলল। আমি ওর মাথায় হাত দিলাম কেঁদো না। পারলে যোগাযোগ রেখো। তোমার মা-বাবার সঙ্গে আলাপ করার ইচ্ছে রইল। ঝিমলি আমাকে ওর মোবাইল নম্বরটা দিল।
সত্যি আমার দ্বারা যে এরকম কিছু হবার নয় তা আমি জানি। শৈশব কৈশোর কেটেছে গ্রামের পাঠশালা আর কলেজে। এরপর কলকাতায় চলে আসি। কলেজ লাইফ আর ইউনিভার্সিটি লাইফ কেটেছে কলকাতায়। তারপর চাকরি জীবন। অনেকটা ভাসামানিকের মতো। আমি এখনো ভাসছি। ভেসে বেড়াচ্ছি।
গ্রামে উনামাস্টারের কাছে টিউসন পরতে যেতাম। আমাদের গ্রামের থেকে সেটা প্রায় ২ মাইল দূরে। প্রত্যেক দিন হেঁটে যাওয়া আসা করতে হতো। আমাদের গ্রাম থেকে আমরা দুজন যেতাম আমি আর ভানু। ভানু চারবার ফেল করে এখন আমার সঙ্গে একসঙ্গে মাধ্যমিক দেবে। স্বভাবতই ও আমার বস। আমার থেকে অনেক কিছু ও বেশি জানে। তাছাড়া বিড়ি খায়। বাবার বিড়ির বান্ডিল থেকে প্রত্যেক দিন ও দু-তিনটে করে বিড়ি গেঁড়াবেই গেঁড়াবে। আর আমাদের বন্ধুদের সামনে এমন করে খাবে যে আমরাও ওর কথাবার্তায় মহিত হয়ে যেতাম। ও আমাদের দলের পালের গোদা।
আমি মাঝে মাঝে ওর ফাই ফরমাস খাটতাম। মনামাস্টার আমার গার্জেন। মাঝে মাঝে আমাকে আড়ালে ডেকে নিয়ে গিয়ে বলতো, ভানুর সঙ্গে বেশি মিসিস না। ছেলেটা ভালো নয়। আমি মাথা নীচু করে থাকতাম।
সেদিন উনামাস্টারের কাছে পরতে যাওয়ার কথা। সকাল ৬ টার সময়। আমি রেডি হয়ে ভানুর বাড়িতে গেছি। ভানুর মা বলল, ভানু চলে গেছে। অগত্যা আমি একা একাই গেলাম উনামাস্টারের কাছে। গিয়ে দেখি সকলেই এসেছে। কিন্তু ভানু নেই। কেমন যেন লাগলো। সৌমিলি আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে পূর্ণিমাকে বললো, পুনি দেখ বাবু আজ একা একা জোরিদার নেই। আমি এমনিতে খুব কম কথা বলি। মেয়েদের সঙ্গে তো কথাই বলতাম না। ওদের দিকে তাকালাম। ওরা এমন ভাবে আমাকে চোখ মারলো যে আমার বুকটা কেঁপে উঠলো। উনামাস্টার আমার দিকে তাকাল। আর একটা হনুমান গেল কোথায় অনি। আমি মাথা নীচু করে বললাম জানিনা।
মিথ্যা কথা বলছিস।
না। সত্যি বলছি। ভানুর মা বললো ও আমার আগে চলে এসেছে।
ও। দেখ গিয়ে কার বাড়ির আঁখ খেতে ধ্বংস করছে।
গুডবয় বলে আমার একটা সুনাম ছিল। তাই মাঝে মাঝে পাল্লায় পরে দোষ করলেও সাতখুন মাপ। অনি এটা করতেই পারে না।
পড়তে পড়তে অনেক দেরি হয়ে গেলো। বইখাতা গুছিয়ে বেরোতেই দেখি বাঁশঝারের কাছে পুকুর পারে সৌমি আর পুনি দাঁড়িয়ে আছে। কাছে আসতেই সৌমি বললো, কোন দিক দিয়ে যাবি অনি।
দীঘাআড়ি দিয়ে যাব।
দীঘাআড়ি!
আমাদের দুটো গ্রামের মাঝে একটা বিরাট ঝিল। মাঝে মাঝে আমি একা একা ওখানে গিয়ে বসি। কতো পাখি আসে ওই ঝিলে। আমি বসে বসে দেখি। চারিদিকে গাছ গাছ আর গাছ। জঙ্গলে ভর্তি। উনামাস্টারের বাড়ি থেকে বেরিয়ে প্রথমে পরবে বীরকটার শিবমাড়ো। একটু এগোলেই পুরীকুন্ডী শ্মশান। শ্মশানকে বাঁহাতে রেখে এগিয়ে গেলে কামার ঘর। তারপর বড়বিল রামপুরার বাঁধে উঠে বাঁধ বরাবর দীঘাআড়ি। লোকে ভয়ে ওই পাশে যায় না। বলে ওখানে নাকি ভূতেরা খেলা করে। আমি বহু দিন একা একা ওই খানে গিয়ে বসেছি। কিন্তু ভূত দেখতে পাই নি। তাই আমাকে অনেকে সাহসী বলেও ডাকে। বাড়ির সকলে জানে কোথাও না পেলেও অনিকে দীঘাআড়িতে পাওয়া যাবেই। আমাদের গ্রামে যারা মারা যান। তাদের ওই শ্মশানে পোড়ান হয়। আমার মা-বাবাকেও ওখানে পোড়ান হয়েছিল।
বোঁচকুল খাবি। পুনি বললো।
না।
আমাদের সঙ্গে আজ বাঁধে বাঁধে চল না।
অনেক ঘোরা হয়ে যাবে।
তাতে কি হয়েছে ? একসঙ্গে গল্প করতে করতে যাবো।
ওরা থাকে আমাদের গ্রামের পশ্চিম পাশে মানিকড়া বলে একটা গ্রামে। ওই গ্রামের সকলেই বেশ পয়সা ওয়ালা লোক। সৌমি আগে আমি মাঝখানে পুনি পেছনে। হাঁটতে হাঁটতে ওরা আমাকে নিয়ে হাসি ঠাট্টা করছিল। তুই একটা গবেট বুঝলি আনি।
কেনো।
তুই মেয়েদের সঙ্গে কথা বলতে জানিস না।
আমি চুপ করে থাকলাম।
ভানুকে দেখেছিস, আজকে একটা মেয়েকে পটাচ্ছে। আবার কালকে আর একটা মেয়েকে পটাচ্ছে। আর তুই ওর সঙ্গে থেকে কি শিখলি।
ভানু ভালছেলে।
এঃ । ভানুর কলাটা দেখেছিস।
ভানু কি কলাগাছ যে ওর কলা থাকবে।
হি হি হি তুই সত্যি একটা গাধা।
যা তোদের সঙ্গে আমি যাবনা। আমি ফিরে দাঁড়ালাম।
পুনি, সৌমি দুজনে আমার দুহাত ধরলো।
আচ্ছা আচ্ছা তোকে গাধা বলবো না। কিন্তু গাধী বললে রাগ করবি না।
আমি সৌমির দিকে তাকালাম। ওর চোখের ভাষা সেইদিন সেই বয়সে বুঝতে পারি নি। কিন্তু ছবির মতো আমার চোখে আজও চিপকে আছে। এখন এই ভরা যৌবনে আমি চোখ বন্ধ করে একমনে চিন্তা করলেই সেই চোখ দেখতে পাই। ভাষাও বুঝতে পারি।
তিনজনে হাঁটতে হাঁটতে একেবারে গ্রামের শেষ প্রান্তে এলাম। সামনের বড়ো মাঠটাকে কাশিঘরের ডাঙা বলে। এখন ওটা সবুজ। সবে মাত্র রোয়া শেষ হয়ে গাছগুলো সামান্য বেড়ে উঠেছে। ওটা পেরলেই সৌমিদের বাড়ি। আর আমাকে ডানদিক দিয়ে আবার ছিনার বাঁধে বাঁধে কিছুটা হেঁটে নদী পেরিয়ে আসতে হবে।
সামনে বিশাল বাঁশ বন। এই দিনের বেলাতেও সেখানে শেয়ালের আনাগোনা।
এই পুনি তুই বলনা অনিকে।
আমি ! না না তুই বল।
কেন আমি কি শুধু একা ভাগ নেবো ? তুই নিবি না।
Like Reply


Messages In This Thread
RE: কাজলদীঘি, শ্মশান ও পীরসাহেবের থান by Mamun Jafran - by sagor69 - 24-06-2019, 11:37 PM



Users browsing this thread: 1 Guest(s)