04-04-2022, 02:13 PM
(This post was last modified: 04-04-2022, 02:18 PM by bourses. Edited 1 time in total. Edited 1 time in total.)
“ঠিক আছে… আগে তো চলুন বড় রাস্তার দিকে… তারপর দেখছি কি করা যায়…” আমি বলতে বলতে এগোতে থাকি ধীর পায়ে… আর আমার কাঁধে ভর রেখে সেই লোকটা চলতে থাকে পা টেনে টেনে খুব ধীরে ধীরে… চলতে যে যথেষ্টই কষ্ট হচ্ছে, সেটা বলে দিতে হয় না আমায়…
ততক্ষনে সেই টিপটিপে বৃষ্টি পড়াটাও থেমে গিয়েছে… একটা হিমেল হাওয়া বইছে বটে, কিন্তু সেই সময় যেন কোন ঠান্ডাই আর গায়ে লাগছে না আমার… ভাগ্যক্রমে একটা ট্যাক্সি দেখি এই দিকেই আসছে… আমি হাত তুলে সেটাকে দাঁড় করালাম… ভেতর থেকে ড্রাইভার মুখ নামিয়ে দেখার চেষ্টা করল আমাদের…
আমি প্রায় কাতর গলায় ড্রাইভারকে বললাম, “দাদা… আমার কাকার এ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে… একটু প্লিজ সামনে মেডিকাল কলেজে নিয়ে চলুন না…”
এ্যাক্সিডেন্ট কেস শুনে বোধহয় প্রথমে ইতস্ততঃ করছিল ড্রাইভারটা, তারপর কে জানে, কি মনে হলো তার, হয়তো একটা মেয়ে বলেই কি না জানি না… হাত বাড়িয়ে পেছনের দরজাটা খুলে দিয়ে বলল, “আসুন… বসুন উঠে… তবে মিটারে যাবো না… একশ লাগবে…”
অত রাতে ট্যাক্সিতে উঠতে দিচ্ছে, এই যথেষ্ট… আর আমার কাছে তখন ওই একশটা টাকাই আছে… তাই রাজি হয়ে গেলাম কোন রকম বিতণ্ডায় না গিয়ে… এখন আগে মানুষটাকে পরিসেবা দেওয়া প্রয়োজন… টাকার কথা ভাবলে হবে না…
আমি আগে কোনরকমে ট্যাক্সির মধ্যে ঢুকে গিয়ে মাথা ঝুঁকিয়ে কোন রকমে বেঁকে দাঁড়ালাম… তারপর লোকটার হাতটা ধরে ধীরে ধীরে ভেতরে ঢুকে আসতে সাহায্য করলাম… ট্যাক্সি মধ্যে ঢুকে সিটের উপরে নিজের দেহটাকে এলিয়ে দিয়ে বসে পড়ল সে… আমি লোকটার উপর দিয়েই ঝুঁকে দরজাটা টেনে বন্ধ করে দিয়ে ড্রাইভারকে বললাম, “চলুন দাদা… একটু তাড়াতাড়ি…”
বললাম বটে আমি, কিন্তু ড্রাইভার দেখি নড়ে না… এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে আহত লোকটার দিকে… আমি একটু অধৈর্যই হয়ে উঠলাম তার ব্যবহার দেখে… ফের তাড়া লাগালাম, “কি হলো দাদা… চলুন… বললাম না… তাড়াতাড়ি না গেলে একে বাঁচানো যাবে না!”
আমার কথায় মাথা নাড়ে ড্রাইভারটা… “না দিদি… আপনি নেমে যান… এ প্যাসেঞ্জার নিয়ে আমি যেতে পারবো না… ঝামেলার কেস আছে…”
আমি বুঝতে পেরে গিয়েছি যে ড্রাইভার বুঝে গেছে যে এটা কোন এ্যাক্সিডেন্ট কেস নয়… আর তাই বেঁকে বসেছে নিয়ে যেতে…
তখন আমি কাতর গলায় বললাম, “প্লিজ দাদা, এখন এত কিছু ভাববেন না… যদি আরো এক্সট্রা টাকা লাগে, আমি দিয়ে দেবো… এখন দয়া করে তো চলুন…”
আমার অনুরোধেও দেখি চিড়ে ভেজে না… গোঁজ হয়ে বসে থাকে ড্রাইভার… মাথা নাড়ে… “না দিদি… আমি যেতে পারবো না… এ পুলিশ কেস… পরে আমি ঝামেলায় ফেঁসে যাবো…”
এদিকে সময়ও বেরিয়ে যাচ্ছে… আমার শিক্ষা বলছে এখুনি লোকটাকে ওটি না করলে বাঁচানো মুস্কিল… রীতি মত তখন ট্যাক্সির সিটে শুয়ে কাতরাচ্ছে ওই অত বড় দেহের মানুষটা…
“প্লিজ দাদা… আপনি এখন এত কিছু ভাববেন না… কিচ্ছু হবে না আপনার… আমি বলছি তো… আপনি আর সময় নষ্ট না করে চলুন…” ফের অনুরোধ করি ড্রাইভারকে…
কিন্তু কে কার কথা শোনে… না তো না… ড্রাইভার উল্টে আমায় বলে, “আপনি নেবে যাবেন? নাকি পুলিশ ডাকবো?”
আমায় ঘুরিয়ে চোখ দেখাতেই যেন আমার মাথার মধ্যে আগুন জ্বলে ওঠে… আমি ঝট করে ব্যাগের মধ্যে থেকে ওই ছেলেগুলোর ফেলে যাওয়া একটা রিভলভার বের করে ড্রাইভারের মাথায় ঠেঁকিয়ে ধরি, তারপর দাঁতে দাঁত চেপে গর্জে উঠি, “শালা খানকির ছেলে, যাবি? নাকি এখানেই দানা ভরে দেবো?”
এটা বোধহয় আশা করেনি ড্রাইভারটা… পুরো হকচকিয়ে গেলো মাথায় বন্দুকের নলের স্পর্শ পেতেই… যেন মন্ত্রের মত কাজ হলো সাথে সাথে… আমাকে আর দ্বিতীয়বার কিছু বলতেই হলো না… হাত বাড়িয়ে সাথে সাথে গাড়িতে চাবি ঘোরালো ড্রাইভার… তারপর প্রায় ঝড়ের বেগে সোজা নিয়ে গিয়ে হাজির মেডিকাল কলেজের ইমার্জেন্সিতে…
আমি চট করে গাড়ির অন্য দরজা খুলে আগে নেমে দাঁড়ালাম… আমায় নামতে দেখে ওয়ার্ডবয় এগিয়ে এলো… সামনে এসে আমায় দেখেই চিনতে পেরে গেলো সে… “একি কান্তাদি… আপনি… কি হয়েছে?”
আমি আঙুল তুলে সিটের অন্য পাশে কাত হয়ে শুয়ে থাকা লোকটার দিকে দেখি বললাম, ‘হরিদা, শিগগির একটা ট্রলি এনে ওনাকে নামাও, আর নিয়ে ইমার্জেন্সিতে যাও… আর হ্যা… এখন ডিউটিতে সিনিয়র কে আছে?”
“ডিউটিতে আজকে সাগরিকাদি আছে…” আমার প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতেই একটা ট্রলি দেখি জোগাড় করে ফেলেছে হরিদা, আর সেই সাথে আরো একজনকে জুটিয়েও ফেলেছে… ততক্ষনে সিটের উপরেই জ্ঞান হারিয়েছে লোকটি… ওরা তাকে ধরাধরি করে ট্রলির উপরে কোন রকমে টেনে তুলে ফেললো… ওই অত বড় দেহটা তুলতেও তো দম বেরিয়ে যাবার জোগাড়…তাও যা হোক, তাকে তুলে নিয়ে ছুটলো ইমার্জেন্সির দিকে… আমিও চললাম পেছন পেছন…
সাগরিকাদি আমায় দেখে এগিয়ে এলো… “একি রে কান্তা, কি হয়েছে… তোর গায়ে এত রক্ত লেগে কেন?”
আমি হাত তুলে কোন রকম তাকে থামিয়ে বললাম, “সে সব পরে বলছি, তুমি আগে একে দেখো…”
মুখ ফিরিয়ে লোকটার দিকে তাকিয়ে বলল, “এ কি তোর চেনা?”
আমি মাথা নাড়ি… “না… কিন্তু এর যা কন্ডিশন, তাতে এখুনি মনে হচ্ছে ওটি করে ওর পা থেকে গুলি বের করতে হবে…”
আমার কথার সায়ে মাথা নাড়ে সাগরিকাদি… “হ্যা… সে তো করতেই হবে… পায়ে তো একটা নয়… দেখে মনে হচ্ছে প্রায় চার পাঁচটা গুলি ঢুকেছে… এখুনি না ওটি করলে বাঁচানো যাবে না…” তারপর আমার দিকে ফিরে বলল, “আচ্ছা, এক কাজ কর, আমি ওটি করে দিচ্ছি, কিন্তু তুই একবার বাইরে পুলিশ আউট পোস্টে একটা খবর পাঠিয়ে দে… যতই হোক, এটা পুলিস কেস হবেই… কিছু করার নেই…”
আমিও সাগরিকাদির কথার সমর্থনে মাথা নাড়াই… “জানি গো… তোমরা যা করার শুরু করো, আমি হরিদাকে বলছি খবর পাঠাতে…” বলে আর দাঁড়াই না ওখানে… তাড়াতাড়ি রুম থেকে বেরিয়ে এসে হরিদাকে খুঁজি, তারপর ওকে পেলে বলি পুলিশ আউটপোস্টে খবর পাঠাবার জন্য… সেটা বলেই ফের দৌড়াই অফিসে, ওখানে গিয়ে একটা ফোন লাগাই হোস্টেলে… ওখানে নিরাদি আছে আমি জানি, তাকেই খবর পাঠাই আসার জন্য…
নিরাদি, সুমিদি, শর্মিষ্ঠাদিদের সাথে আউট পোস্টের এস আই ও প্রায় এক সাথেই চলে আসে সেখানে… এস আই ঘরে ঢুকে লোকটাকে দেখেই প্রায় চমকে ওঠে… তারপর আমার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে… “এনাকে কোথায় পেলেন আপনি?”
আমি এস আইকে এই ভাবে প্রশ্ন করতে দেখে একটু অবাক হই… “কেন? কে ইনি?”
আর একবার ভালো করে ট্রলিতে শায়িত লোকটাকে আপদমস্তক দেখে নিয়ে এস আই বলেন, “এতো জাকির ভাই…”
নামটা আমারও শোনা… কোথাও হয়তো কখনও শুনেছিলাম কানাঘুষোয়… জাকির খান… কলকাতার মুকুটহীন বাদশা… আন্ডার ওয়ার্লড ডন… শুধু পুলিশ কেন, পার্টির নেতা মন্ত্রীরাও এনার পকেটের লোক… আমি তখন কি বলবো বুঝে উঠে পারছিলাম না… আমি এস আই এর দিকে তাকালাম মুখ তুলে…
মাথা নাড়লেন এস আই… “ঠিক আছে… আপনারা তো আগে ওটি করুন, আমি এদিকটা সামলাচ্ছি…” সাগরিকাদির দিকে তাকিয়ে বললেন উনি… তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “আপনাকে একটা বয়ান দিতে হবে…”
আমি মাথা নাড়লাম… “ঠিক আছে, চলুন… লিখে দিচ্ছি বয়ান…”
আউট পোস্টএ এসে বয়ান লিখলাম, পড়িয়ে ফেরার পথে রাস্তায় ওনাকে ওই অবস্থায় দেখে তুলে নিয়ে এসেছি বলে… আসল ঘটনাটা ইচ্ছা করেই চেপে গেলাম আমি… পুলিশের সামনে আর সেটা বললাম না…
আমি ফের ফিরে এলাম ইমার্জেন্সিতে… শুনলাম ভেতরে ওটি চলছে… তবে এখনও জ্ঞান ফেরেনি ওনার… নিরাদিরা এসে আমার পাশে দাঁড়ালো… জিজ্ঞাসা করলো, “তুই খেয়েছিস কিছু?”
আমি ঘাড় নাড়লাম… তাতে ওরা বলল, “যা, তুই এবার গিয়ে একটু ফ্রেস হয়ে মুখে কিছু দে, আমরা তো আছি এখানে, তোর আর কিছু ভাবতে হবে না…”
ভাবতে হবে না, সেটা নিরাদিরা বলছে, কিন্তু আমি তো জানি, কি ঘটেছিল সেখানে… আর সবচেয়ে বড় কথা, গুলি আমিও চালিয়েছিলাম… সেটা জানাজানি হলে আর একটা সমস্যার সৃষ্টি হবে… তাই ওদেরকে বললাম, “ঠিক আছি আমি… আমায় নিয়ে ভেবো না…” তারপর ওখান থেকে বেরিয়ে ফের ইমার্জেন্সি অফিস রুমে গিয়ে ঢুকলাম, দেখি অফিস ফাঁকা… কেউ নেই ওই সময়টা ওখানে… আমি ফোনে কাকাকে ধরলাম… যা যা ঘটেছে সব খুলে বললাম এক এক করে ঠান্ডা মাথায়…
কাকা শুনেই তো প্রায় লাফিয়ে উঠল, “তুই করেছিস কি? জাকির ভাইকে বাঁচিয়েছিস?”
আমি কাকার কথায় বললাম, “সেটা তো ঠিক আছে, কিন্তু আমিও যে গুলি চালিয়েছিলাম, সেটা আর এখানে আউট পোস্টে আমার বয়ানে লিখি নি… ওটা তুমি সামলিও…”
কাকা শুনে আস্বস্থ করে, বলল, “তুই ওটা নিয়ে কিছু ভাবিস না… যা করেছিস একদম ঠিক কাজ করেছিস… আমি লালবাজারের সাথে কন্টাক্ট করছি… এবার যা করার ওরাই করবে…”
মিনিট পনেরোও হয় নি সম্ভবত, একটা কোলকাতা পুলিশের জিপ ঢুকলো কম্পাউন্ডে… ভেতর থেকে দুজন হোমড়া চোমড়া কোন অফিসার নামলো… বোধহয় ক্রাইম ব্রাঞ্চের হবে… তাদের দেখে তো দেখি আউট পোস্টের ডিউটি অফিসারের হিসি করে ফেলার অবস্থা… দেখেই স্যাটাস্যাট সালুট ঠুকলো… তারা তার স্যালুট ঠোকার দিকে পাত্তাই দিলো না… সোজা ঢুকে এলো ইমার্জন্সিতে… একেবারে আমার সামনে…
আমার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলো, “তুমি চন্দ্রকান্তা?”
আমি মাথা নাড়লাম…
“দিকে এসো…” বলে ওরা দুজনে হাঁটা দিল দেখি অফিস রুমের দিকে… নিরাদিরা দেখি মুখ চাওয়া চাওয়ি করছে… আমি ওনাদের পেছন পেছন এসে ঢুকলাম অফিস রুমে… আমায় একটা চেয়ারে বসতে বলে নিজেরাও আমার উল্টো দিকে চেয়ার টেনে বসলেন, “এবার বলো তো… ঠিক কি হয়েছিল…” বলেই ওদের একজন একটু হাসলেন, “ভয় পেয়ো না… আমাদের কাছে যা বয়ানে লিখেছ সেটা বলার দরকার নেই… ঠিক যা যা ঘটেছিল, সেটাই বলো…”
আমি বুঝে গেছি ততক্ষনে যে কাকা যা বলার আগে থেকেই বলে রেখেছে এঁনাদের কে… তাই আমিও নির্দিধায় সবটা, প্রায় প্রথম থেকে এখানে আনা অবধি পুরো ঘটনাটাই একেবারে বিস্তারিত ভাবে বলতে থাকলাম… আমার বলার সময় ওনারা একটি কথাও উচ্চারণ করলেন না… চুপ চাপ শুনতে থাকলেন… তারপর আমার কথা শেষ হতে দুজনে দুজনের দিকে একবার তাকালেন, তারপর আমার দিকে ফিরে বললেন, “ঠিক আছে মা… তুমি এবার গিয়ে ফ্রেস হয়ে নাও… আর তোমার কোন চিন্তা নেই… এবার যা করার আমরাই ব্যবস্থা করে ফেলবো…” বলে আর আমার উত্তরের কোন অপেক্ষা করলেন না… উঠে অফিস রুম থেকে বেরিয়ে সোজা ওটির দিকে হাঁটা লাগালেন… আমিও বেরিয়ে চলে এলাম হোস্টেলে, আমার রুমে… ততক্ষনে যেন আমার গলা শুকিয়ে কাঠ… এতক্ষনে একবারও জল তেষ্টা পায় নি… কিন্ত ঘরে আসতেই যেন জলের জন্য হাহাকার করে উঠল শরীরটা… আমি বোতল খুলে ঢকঢক করে প্রায় পুরো জলটাই খেয়ে হাঁফ ফেললাম…
পরদিন ফের ফিরে এলাম ইমার্জেন্সিতে… খোঁজ নিলাম জাকির ভাইয়ের… শুনলাম যে ওটি সাকসেসফুল হয়েছে… ওনাকে শিফট করা হয়েছে মেল ব্লকের একটা স্যুটে… ওখান থেকে স্যুট নাম্বারটা নিয়ে গিয়ে হাজির হলাম জাকির ভাইয়ের ঘরে…
ঘরে ঢুকে থমকে গেলাম… দেখি জাকির ভাইয়ের বেড এর পাশে এক ভদ্রমহিলা বসে আছেন… দেখে আমার মনে হল যেন আরব্য উপন্যাস থেকে উঠে এসেছেন ভদ্রমহিলা… *ে ওনার মাথা ঢাকা থাকলেও নাক চোখ মুখ দেখে রীতিমত সম্ভ্রম জাগে… টকটকে গায়ের রঙ, টিকালো নাক… আর চোখদুটো অদ্ভুত রকমের বাদামী আর সবুজের মিশেলের ছোঁয়া যেন… হাতের আঙুলগুলো যেন শিল্পীর সৃষ্টি… ফর্সা সুডৌল হাতে সরু সরু লম্বা লম্বা… অনামিকায় জ্বলজ্বল করছে একটা বিশাল হিরে…
আমায় ঘরে ঢুকতে দেখে স্মিত হাসেন জাকির ভাই… তারপর ভদ্রমহিলার দিকে ফিরে তাকিয়ে বলে ওঠেন… “ইয়ে লেড়কি কাই বাত কার রাহা থা ম্যায় বিলকিস… এহি হ্যায় উও ফরিস্তে কা নূর… যো কাল হামে বাঁচায়া থা…”
জাকির ভাইয়ের কথা শুনে আমি কিছু বলার আগেই দেখি ভদ্রমহিলা তাড়াতাড়ি চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন… তারপর দ্রুত পায়ে এগিয়ে এলেন আমার দিকে… জড়িয়ে ধরলেন নিজের বুকের মধ্যে… তারপর ঝরঝর করে কেঁদে ফেললেন আমায় বুকে জড়িয়ে ধরে রেখেই… আমি তখন কি বলবো, কি করবো বুঝে উঠতে পারছি না… বোকার মত একবার ওনার দিকে, একবার জাকির ভাইয়ের দিকে তাকাতে থাকলাম…
একটু নিজেকে সামলে নিয়ে ভদ্রমহিলা আমার মাথায় পীঠে হাত বুলিয়ে দিয়ে বলতে লাগলেন, “বেটি, তু উনকো দুবারা জনম দে দিয়া হ্যায়… বহুত বহুত মেহেরবানি তেরে কো… আল্লাহ তেরা ভালা কারে গা জরুর…”
হটাৎ করে দেখি জাকির ভাই উঠে বসার চেষ্টা করছেন আমাদের দিকে দেখতে দেখতে… আমি ওখান থেকেই দাঁড়িয়ে দিলাম এক ধমক… “একদম উঠবে না তুমি বিছানা ছেড়ে…”
আর তাতে কি বলবো, জাকির ভাইয়ের মত ওই রকম একটা দর্দোন্ড প্রতাপ লোকও যেন একটা বাচ্ছা ছেলের মত সেই ধমকে শুরশুর করে ফের শুয়ে পড়লেন বিছানায়… তা দেখে চোখে জল নিয়েও হেসে ফেললেন বিলকিস বেগম… আমার গালে হাত রেখে বলে উঠলেন, “দেখা বেটি… তেরা ডাটনে সে ও ভি সিধা হো গেয়ে…” তারপর একটু থেমে হাতের আঙুলে আমার চিবুকটা ধরে বলে ওঠেন, “বেটি… আজসে কভিভি কিসি জরুরত পড়েগি, তো একবার হামসে খবর ভেজ দেনা… বাকি হাম সামাল লুগি… ইয়াদ রাখনা জরুর এ বাৎ… যাবতক্ হাম দোনো জিন্দা হ্যায়… তেরা এহেসান মন্দ রহুঙ্গি… দুবারা সোচনা ম্যাত মুঝসে পৌছনে কে লিয়ে…”
আমি শুধু মাথা নেড়ে সমর্থন জানাই ওনার কথায়… বেশ… তাই হবে…
.
.
.
এর মধ্যে একবারের জন্যও উঠতে পারে নি পর্ণা বিছানা ছেড়ে… অনেকক্ষন ধরেই হিসি পেয়েছিল… কিন্তু এই রকম রোমহর্ষক পর্বটা ছেড়ে ওঠেই বা কি ভাবে?... পাতার শেষ হতেই তাড়াতাড়ি করে দৌড় দেয় বাথরুমের উদ্দেশ্যে… কখন যে ছোট্ট সায়ন উঠে বসেছে, খেয়ালই করেনি পর্ণা… মাকে এই ভাবে দৌড়াতে দেখে পেছনে খিকখিকিয়ে হেসে ওঠে সে…
ক্রমশ…
ততক্ষনে সেই টিপটিপে বৃষ্টি পড়াটাও থেমে গিয়েছে… একটা হিমেল হাওয়া বইছে বটে, কিন্তু সেই সময় যেন কোন ঠান্ডাই আর গায়ে লাগছে না আমার… ভাগ্যক্রমে একটা ট্যাক্সি দেখি এই দিকেই আসছে… আমি হাত তুলে সেটাকে দাঁড় করালাম… ভেতর থেকে ড্রাইভার মুখ নামিয়ে দেখার চেষ্টা করল আমাদের…
আমি প্রায় কাতর গলায় ড্রাইভারকে বললাম, “দাদা… আমার কাকার এ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে… একটু প্লিজ সামনে মেডিকাল কলেজে নিয়ে চলুন না…”
এ্যাক্সিডেন্ট কেস শুনে বোধহয় প্রথমে ইতস্ততঃ করছিল ড্রাইভারটা, তারপর কে জানে, কি মনে হলো তার, হয়তো একটা মেয়ে বলেই কি না জানি না… হাত বাড়িয়ে পেছনের দরজাটা খুলে দিয়ে বলল, “আসুন… বসুন উঠে… তবে মিটারে যাবো না… একশ লাগবে…”
অত রাতে ট্যাক্সিতে উঠতে দিচ্ছে, এই যথেষ্ট… আর আমার কাছে তখন ওই একশটা টাকাই আছে… তাই রাজি হয়ে গেলাম কোন রকম বিতণ্ডায় না গিয়ে… এখন আগে মানুষটাকে পরিসেবা দেওয়া প্রয়োজন… টাকার কথা ভাবলে হবে না…
আমি আগে কোনরকমে ট্যাক্সির মধ্যে ঢুকে গিয়ে মাথা ঝুঁকিয়ে কোন রকমে বেঁকে দাঁড়ালাম… তারপর লোকটার হাতটা ধরে ধীরে ধীরে ভেতরে ঢুকে আসতে সাহায্য করলাম… ট্যাক্সি মধ্যে ঢুকে সিটের উপরে নিজের দেহটাকে এলিয়ে দিয়ে বসে পড়ল সে… আমি লোকটার উপর দিয়েই ঝুঁকে দরজাটা টেনে বন্ধ করে দিয়ে ড্রাইভারকে বললাম, “চলুন দাদা… একটু তাড়াতাড়ি…”
বললাম বটে আমি, কিন্তু ড্রাইভার দেখি নড়ে না… এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে আহত লোকটার দিকে… আমি একটু অধৈর্যই হয়ে উঠলাম তার ব্যবহার দেখে… ফের তাড়া লাগালাম, “কি হলো দাদা… চলুন… বললাম না… তাড়াতাড়ি না গেলে একে বাঁচানো যাবে না!”
আমার কথায় মাথা নাড়ে ড্রাইভারটা… “না দিদি… আপনি নেমে যান… এ প্যাসেঞ্জার নিয়ে আমি যেতে পারবো না… ঝামেলার কেস আছে…”
আমি বুঝতে পেরে গিয়েছি যে ড্রাইভার বুঝে গেছে যে এটা কোন এ্যাক্সিডেন্ট কেস নয়… আর তাই বেঁকে বসেছে নিয়ে যেতে…
তখন আমি কাতর গলায় বললাম, “প্লিজ দাদা, এখন এত কিছু ভাববেন না… যদি আরো এক্সট্রা টাকা লাগে, আমি দিয়ে দেবো… এখন দয়া করে তো চলুন…”
আমার অনুরোধেও দেখি চিড়ে ভেজে না… গোঁজ হয়ে বসে থাকে ড্রাইভার… মাথা নাড়ে… “না দিদি… আমি যেতে পারবো না… এ পুলিশ কেস… পরে আমি ঝামেলায় ফেঁসে যাবো…”
এদিকে সময়ও বেরিয়ে যাচ্ছে… আমার শিক্ষা বলছে এখুনি লোকটাকে ওটি না করলে বাঁচানো মুস্কিল… রীতি মত তখন ট্যাক্সির সিটে শুয়ে কাতরাচ্ছে ওই অত বড় দেহের মানুষটা…
“প্লিজ দাদা… আপনি এখন এত কিছু ভাববেন না… কিচ্ছু হবে না আপনার… আমি বলছি তো… আপনি আর সময় নষ্ট না করে চলুন…” ফের অনুরোধ করি ড্রাইভারকে…
কিন্তু কে কার কথা শোনে… না তো না… ড্রাইভার উল্টে আমায় বলে, “আপনি নেবে যাবেন? নাকি পুলিশ ডাকবো?”
আমায় ঘুরিয়ে চোখ দেখাতেই যেন আমার মাথার মধ্যে আগুন জ্বলে ওঠে… আমি ঝট করে ব্যাগের মধ্যে থেকে ওই ছেলেগুলোর ফেলে যাওয়া একটা রিভলভার বের করে ড্রাইভারের মাথায় ঠেঁকিয়ে ধরি, তারপর দাঁতে দাঁত চেপে গর্জে উঠি, “শালা খানকির ছেলে, যাবি? নাকি এখানেই দানা ভরে দেবো?”
এটা বোধহয় আশা করেনি ড্রাইভারটা… পুরো হকচকিয়ে গেলো মাথায় বন্দুকের নলের স্পর্শ পেতেই… যেন মন্ত্রের মত কাজ হলো সাথে সাথে… আমাকে আর দ্বিতীয়বার কিছু বলতেই হলো না… হাত বাড়িয়ে সাথে সাথে গাড়িতে চাবি ঘোরালো ড্রাইভার… তারপর প্রায় ঝড়ের বেগে সোজা নিয়ে গিয়ে হাজির মেডিকাল কলেজের ইমার্জেন্সিতে…
আমি চট করে গাড়ির অন্য দরজা খুলে আগে নেমে দাঁড়ালাম… আমায় নামতে দেখে ওয়ার্ডবয় এগিয়ে এলো… সামনে এসে আমায় দেখেই চিনতে পেরে গেলো সে… “একি কান্তাদি… আপনি… কি হয়েছে?”
আমি আঙুল তুলে সিটের অন্য পাশে কাত হয়ে শুয়ে থাকা লোকটার দিকে দেখি বললাম, ‘হরিদা, শিগগির একটা ট্রলি এনে ওনাকে নামাও, আর নিয়ে ইমার্জেন্সিতে যাও… আর হ্যা… এখন ডিউটিতে সিনিয়র কে আছে?”
“ডিউটিতে আজকে সাগরিকাদি আছে…” আমার প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতেই একটা ট্রলি দেখি জোগাড় করে ফেলেছে হরিদা, আর সেই সাথে আরো একজনকে জুটিয়েও ফেলেছে… ততক্ষনে সিটের উপরেই জ্ঞান হারিয়েছে লোকটি… ওরা তাকে ধরাধরি করে ট্রলির উপরে কোন রকমে টেনে তুলে ফেললো… ওই অত বড় দেহটা তুলতেও তো দম বেরিয়ে যাবার জোগাড়…তাও যা হোক, তাকে তুলে নিয়ে ছুটলো ইমার্জেন্সির দিকে… আমিও চললাম পেছন পেছন…
সাগরিকাদি আমায় দেখে এগিয়ে এলো… “একি রে কান্তা, কি হয়েছে… তোর গায়ে এত রক্ত লেগে কেন?”
আমি হাত তুলে কোন রকম তাকে থামিয়ে বললাম, “সে সব পরে বলছি, তুমি আগে একে দেখো…”
মুখ ফিরিয়ে লোকটার দিকে তাকিয়ে বলল, “এ কি তোর চেনা?”
আমি মাথা নাড়ি… “না… কিন্তু এর যা কন্ডিশন, তাতে এখুনি মনে হচ্ছে ওটি করে ওর পা থেকে গুলি বের করতে হবে…”
আমার কথার সায়ে মাথা নাড়ে সাগরিকাদি… “হ্যা… সে তো করতেই হবে… পায়ে তো একটা নয়… দেখে মনে হচ্ছে প্রায় চার পাঁচটা গুলি ঢুকেছে… এখুনি না ওটি করলে বাঁচানো যাবে না…” তারপর আমার দিকে ফিরে বলল, “আচ্ছা, এক কাজ কর, আমি ওটি করে দিচ্ছি, কিন্তু তুই একবার বাইরে পুলিশ আউট পোস্টে একটা খবর পাঠিয়ে দে… যতই হোক, এটা পুলিস কেস হবেই… কিছু করার নেই…”
আমিও সাগরিকাদির কথার সমর্থনে মাথা নাড়াই… “জানি গো… তোমরা যা করার শুরু করো, আমি হরিদাকে বলছি খবর পাঠাতে…” বলে আর দাঁড়াই না ওখানে… তাড়াতাড়ি রুম থেকে বেরিয়ে এসে হরিদাকে খুঁজি, তারপর ওকে পেলে বলি পুলিশ আউটপোস্টে খবর পাঠাবার জন্য… সেটা বলেই ফের দৌড়াই অফিসে, ওখানে গিয়ে একটা ফোন লাগাই হোস্টেলে… ওখানে নিরাদি আছে আমি জানি, তাকেই খবর পাঠাই আসার জন্য…
নিরাদি, সুমিদি, শর্মিষ্ঠাদিদের সাথে আউট পোস্টের এস আই ও প্রায় এক সাথেই চলে আসে সেখানে… এস আই ঘরে ঢুকে লোকটাকে দেখেই প্রায় চমকে ওঠে… তারপর আমার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে… “এনাকে কোথায় পেলেন আপনি?”
আমি এস আইকে এই ভাবে প্রশ্ন করতে দেখে একটু অবাক হই… “কেন? কে ইনি?”
আর একবার ভালো করে ট্রলিতে শায়িত লোকটাকে আপদমস্তক দেখে নিয়ে এস আই বলেন, “এতো জাকির ভাই…”
নামটা আমারও শোনা… কোথাও হয়তো কখনও শুনেছিলাম কানাঘুষোয়… জাকির খান… কলকাতার মুকুটহীন বাদশা… আন্ডার ওয়ার্লড ডন… শুধু পুলিশ কেন, পার্টির নেতা মন্ত্রীরাও এনার পকেটের লোক… আমি তখন কি বলবো বুঝে উঠে পারছিলাম না… আমি এস আই এর দিকে তাকালাম মুখ তুলে…
মাথা নাড়লেন এস আই… “ঠিক আছে… আপনারা তো আগে ওটি করুন, আমি এদিকটা সামলাচ্ছি…” সাগরিকাদির দিকে তাকিয়ে বললেন উনি… তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “আপনাকে একটা বয়ান দিতে হবে…”
আমি মাথা নাড়লাম… “ঠিক আছে, চলুন… লিখে দিচ্ছি বয়ান…”
আউট পোস্টএ এসে বয়ান লিখলাম, পড়িয়ে ফেরার পথে রাস্তায় ওনাকে ওই অবস্থায় দেখে তুলে নিয়ে এসেছি বলে… আসল ঘটনাটা ইচ্ছা করেই চেপে গেলাম আমি… পুলিশের সামনে আর সেটা বললাম না…
আমি ফের ফিরে এলাম ইমার্জেন্সিতে… শুনলাম ভেতরে ওটি চলছে… তবে এখনও জ্ঞান ফেরেনি ওনার… নিরাদিরা এসে আমার পাশে দাঁড়ালো… জিজ্ঞাসা করলো, “তুই খেয়েছিস কিছু?”
আমি ঘাড় নাড়লাম… তাতে ওরা বলল, “যা, তুই এবার গিয়ে একটু ফ্রেস হয়ে মুখে কিছু দে, আমরা তো আছি এখানে, তোর আর কিছু ভাবতে হবে না…”
ভাবতে হবে না, সেটা নিরাদিরা বলছে, কিন্তু আমি তো জানি, কি ঘটেছিল সেখানে… আর সবচেয়ে বড় কথা, গুলি আমিও চালিয়েছিলাম… সেটা জানাজানি হলে আর একটা সমস্যার সৃষ্টি হবে… তাই ওদেরকে বললাম, “ঠিক আছি আমি… আমায় নিয়ে ভেবো না…” তারপর ওখান থেকে বেরিয়ে ফের ইমার্জেন্সি অফিস রুমে গিয়ে ঢুকলাম, দেখি অফিস ফাঁকা… কেউ নেই ওই সময়টা ওখানে… আমি ফোনে কাকাকে ধরলাম… যা যা ঘটেছে সব খুলে বললাম এক এক করে ঠান্ডা মাথায়…
কাকা শুনেই তো প্রায় লাফিয়ে উঠল, “তুই করেছিস কি? জাকির ভাইকে বাঁচিয়েছিস?”
আমি কাকার কথায় বললাম, “সেটা তো ঠিক আছে, কিন্তু আমিও যে গুলি চালিয়েছিলাম, সেটা আর এখানে আউট পোস্টে আমার বয়ানে লিখি নি… ওটা তুমি সামলিও…”
কাকা শুনে আস্বস্থ করে, বলল, “তুই ওটা নিয়ে কিছু ভাবিস না… যা করেছিস একদম ঠিক কাজ করেছিস… আমি লালবাজারের সাথে কন্টাক্ট করছি… এবার যা করার ওরাই করবে…”
মিনিট পনেরোও হয় নি সম্ভবত, একটা কোলকাতা পুলিশের জিপ ঢুকলো কম্পাউন্ডে… ভেতর থেকে দুজন হোমড়া চোমড়া কোন অফিসার নামলো… বোধহয় ক্রাইম ব্রাঞ্চের হবে… তাদের দেখে তো দেখি আউট পোস্টের ডিউটি অফিসারের হিসি করে ফেলার অবস্থা… দেখেই স্যাটাস্যাট সালুট ঠুকলো… তারা তার স্যালুট ঠোকার দিকে পাত্তাই দিলো না… সোজা ঢুকে এলো ইমার্জন্সিতে… একেবারে আমার সামনে…
আমার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলো, “তুমি চন্দ্রকান্তা?”
আমি মাথা নাড়লাম…
“দিকে এসো…” বলে ওরা দুজনে হাঁটা দিল দেখি অফিস রুমের দিকে… নিরাদিরা দেখি মুখ চাওয়া চাওয়ি করছে… আমি ওনাদের পেছন পেছন এসে ঢুকলাম অফিস রুমে… আমায় একটা চেয়ারে বসতে বলে নিজেরাও আমার উল্টো দিকে চেয়ার টেনে বসলেন, “এবার বলো তো… ঠিক কি হয়েছিল…” বলেই ওদের একজন একটু হাসলেন, “ভয় পেয়ো না… আমাদের কাছে যা বয়ানে লিখেছ সেটা বলার দরকার নেই… ঠিক যা যা ঘটেছিল, সেটাই বলো…”
আমি বুঝে গেছি ততক্ষনে যে কাকা যা বলার আগে থেকেই বলে রেখেছে এঁনাদের কে… তাই আমিও নির্দিধায় সবটা, প্রায় প্রথম থেকে এখানে আনা অবধি পুরো ঘটনাটাই একেবারে বিস্তারিত ভাবে বলতে থাকলাম… আমার বলার সময় ওনারা একটি কথাও উচ্চারণ করলেন না… চুপ চাপ শুনতে থাকলেন… তারপর আমার কথা শেষ হতে দুজনে দুজনের দিকে একবার তাকালেন, তারপর আমার দিকে ফিরে বললেন, “ঠিক আছে মা… তুমি এবার গিয়ে ফ্রেস হয়ে নাও… আর তোমার কোন চিন্তা নেই… এবার যা করার আমরাই ব্যবস্থা করে ফেলবো…” বলে আর আমার উত্তরের কোন অপেক্ষা করলেন না… উঠে অফিস রুম থেকে বেরিয়ে সোজা ওটির দিকে হাঁটা লাগালেন… আমিও বেরিয়ে চলে এলাম হোস্টেলে, আমার রুমে… ততক্ষনে যেন আমার গলা শুকিয়ে কাঠ… এতক্ষনে একবারও জল তেষ্টা পায় নি… কিন্ত ঘরে আসতেই যেন জলের জন্য হাহাকার করে উঠল শরীরটা… আমি বোতল খুলে ঢকঢক করে প্রায় পুরো জলটাই খেয়ে হাঁফ ফেললাম…
পরদিন ফের ফিরে এলাম ইমার্জেন্সিতে… খোঁজ নিলাম জাকির ভাইয়ের… শুনলাম যে ওটি সাকসেসফুল হয়েছে… ওনাকে শিফট করা হয়েছে মেল ব্লকের একটা স্যুটে… ওখান থেকে স্যুট নাম্বারটা নিয়ে গিয়ে হাজির হলাম জাকির ভাইয়ের ঘরে…
ঘরে ঢুকে থমকে গেলাম… দেখি জাকির ভাইয়ের বেড এর পাশে এক ভদ্রমহিলা বসে আছেন… দেখে আমার মনে হল যেন আরব্য উপন্যাস থেকে উঠে এসেছেন ভদ্রমহিলা… *ে ওনার মাথা ঢাকা থাকলেও নাক চোখ মুখ দেখে রীতিমত সম্ভ্রম জাগে… টকটকে গায়ের রঙ, টিকালো নাক… আর চোখদুটো অদ্ভুত রকমের বাদামী আর সবুজের মিশেলের ছোঁয়া যেন… হাতের আঙুলগুলো যেন শিল্পীর সৃষ্টি… ফর্সা সুডৌল হাতে সরু সরু লম্বা লম্বা… অনামিকায় জ্বলজ্বল করছে একটা বিশাল হিরে…
আমায় ঘরে ঢুকতে দেখে স্মিত হাসেন জাকির ভাই… তারপর ভদ্রমহিলার দিকে ফিরে তাকিয়ে বলে ওঠেন… “ইয়ে লেড়কি কাই বাত কার রাহা থা ম্যায় বিলকিস… এহি হ্যায় উও ফরিস্তে কা নূর… যো কাল হামে বাঁচায়া থা…”
জাকির ভাইয়ের কথা শুনে আমি কিছু বলার আগেই দেখি ভদ্রমহিলা তাড়াতাড়ি চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন… তারপর দ্রুত পায়ে এগিয়ে এলেন আমার দিকে… জড়িয়ে ধরলেন নিজের বুকের মধ্যে… তারপর ঝরঝর করে কেঁদে ফেললেন আমায় বুকে জড়িয়ে ধরে রেখেই… আমি তখন কি বলবো, কি করবো বুঝে উঠতে পারছি না… বোকার মত একবার ওনার দিকে, একবার জাকির ভাইয়ের দিকে তাকাতে থাকলাম…
একটু নিজেকে সামলে নিয়ে ভদ্রমহিলা আমার মাথায় পীঠে হাত বুলিয়ে দিয়ে বলতে লাগলেন, “বেটি, তু উনকো দুবারা জনম দে দিয়া হ্যায়… বহুত বহুত মেহেরবানি তেরে কো… আল্লাহ তেরা ভালা কারে গা জরুর…”
হটাৎ করে দেখি জাকির ভাই উঠে বসার চেষ্টা করছেন আমাদের দিকে দেখতে দেখতে… আমি ওখান থেকেই দাঁড়িয়ে দিলাম এক ধমক… “একদম উঠবে না তুমি বিছানা ছেড়ে…”
আর তাতে কি বলবো, জাকির ভাইয়ের মত ওই রকম একটা দর্দোন্ড প্রতাপ লোকও যেন একটা বাচ্ছা ছেলের মত সেই ধমকে শুরশুর করে ফের শুয়ে পড়লেন বিছানায়… তা দেখে চোখে জল নিয়েও হেসে ফেললেন বিলকিস বেগম… আমার গালে হাত রেখে বলে উঠলেন, “দেখা বেটি… তেরা ডাটনে সে ও ভি সিধা হো গেয়ে…” তারপর একটু থেমে হাতের আঙুলে আমার চিবুকটা ধরে বলে ওঠেন, “বেটি… আজসে কভিভি কিসি জরুরত পড়েগি, তো একবার হামসে খবর ভেজ দেনা… বাকি হাম সামাল লুগি… ইয়াদ রাখনা জরুর এ বাৎ… যাবতক্ হাম দোনো জিন্দা হ্যায়… তেরা এহেসান মন্দ রহুঙ্গি… দুবারা সোচনা ম্যাত মুঝসে পৌছনে কে লিয়ে…”
আমি শুধু মাথা নেড়ে সমর্থন জানাই ওনার কথায়… বেশ… তাই হবে…
.
.
.
এর মধ্যে একবারের জন্যও উঠতে পারে নি পর্ণা বিছানা ছেড়ে… অনেকক্ষন ধরেই হিসি পেয়েছিল… কিন্তু এই রকম রোমহর্ষক পর্বটা ছেড়ে ওঠেই বা কি ভাবে?... পাতার শেষ হতেই তাড়াতাড়ি করে দৌড় দেয় বাথরুমের উদ্দেশ্যে… কখন যে ছোট্ট সায়ন উঠে বসেছে, খেয়ালই করেনি পর্ণা… মাকে এই ভাবে দৌড়াতে দেখে পেছনে খিকখিকিয়ে হেসে ওঠে সে…
ক্রমশ…