Thread Rating:
  • 391 Vote(s) - 3.7 Average
  • 1
  • 2
  • 3
  • 4
  • 5
দেবশ্রী - এক স্বর্গীয় অনুভূতি
পর্ব আঠারো






                                                             II II

 
 
 
আমি অন্যমনস্ক ছিলাম আচমকা তার গলার আওয়াজ শুনে পেছন ফিরলাম, “হুম…… কিকি বললে?”
মা আবার চুপ করে গেলো, যেদিকে চেয়ে ছিল সেদিকেই চোখ মেললো আমি ছাদের ধার থেকে ফিরে তাঁর কাছে এসে দাঁড়ালাম, “হ্যাঁ তুমি ঠিকই বলেছ মা! ভালোবাসার মানুষ গুলো আমাদের ছেড়ে চলে গেলে ভীষণ কষ্ট হয়   
মায়ের মৌন ধারণ দেখে চেয়ারের পেছনে এসে তাঁর দুই কাঁধে হাত রেখে দাঁড়ালামদেখলাম মা নিজের বাম হাত দিয়ে আমার বাম হাতের আঙ্গুল স্পর্শ করল তারপর ধরা গলায় বলল, “কিছু খেয়েছিস বাবু? ব্রেকফাস্ট করেছিস?”
মায়ের এই কথাটা শোনার জন্য আমার মনে হচ্ছিলো যেন কয়েক যুগ ধরে অপেক্ষা করছি নইলে গত বিয়াল্লিশ ঘণ্টা ধরে তাঁর এক আলাদা রুপ দেখতে পাচ্ছিলামএক অজানা চরিত্রের মানুষ যে আমার মা নয়, বরং বছর ছয় সাতের এক মেয়ে, যার প্রিয় জিনিস খোয়া গিয়েছে ফলে সে কান্নায় ভেসে পড়েছে যে রাত দিন দেখে নি সময় পরিস্থিতি দেখে নি আশে পাশের মানুষ জন কেও অগ্রাহ্য করেছেযে কেবল নিজের বায়নার উপর অটল থেকেছে সবকিছু ভুলে পিতৃশোকে দিশেহারা হয়ে পড়েছিল বেচারি টানা দুই দিনের শোকাচ্ছন্ন ভাব কাটিয়ে মা নিজের সন্তানের খোঁজ নিচ্ছে এটা জেনে আমার মনের মধ্যে যে কি পরিমাণ তৃপ্তির অনুভূতি হচ্ছিলো তা বলে বোঝানো সম্ভব নয়   
খুশি মিশ্রিত টলমলে গলায় আমি তাঁর কানের কাছে মুখ এনে বললাম, “মা তুমি কথা বলছো, আমার খোঁজ নিচ্ছ, এতেই আমার খিদে মিটে গেছে নইলে গত দুই দিন ধরে তোমার বড্ড অভাব বোধ করছিলাম গো আমার সেই রাগী স্বভাবের পুরনো মাকে যেন কোথায় হারিয়ে ফেলেছিলাম
 
মায়ের আবার ধরা গলায় বলল,“এটা তোর নিজের ঘর নয় বাবু যেখানে তুই নিজের ইচ্ছা মতো যখন তখন  মুখের কাছে খাবার পেয়ে যাবিসবাই সবার কাজে ব্যস্ত থাকবে সুতরাং তাঁদের সুবিধা মতো চলবি কাউকে অর্ডার দিবিনা একদম
মায়ের এই রকম গম্ভীর সতর্কবাণী পেয়ে আমি আবার তাঁর মুখের সামনে এসে দাঁড়ালাম তাঁর ম্লান মুখশ্রীর দিকে তাকিয়ে চাপা হাসি দিয়ে বললাম, “এটা তো আমার নিজেরই ঘর মামনি দাদাইয়ের বাড়ি ছিলতাঁর অবর্তমানে এই বাগানবাড়ি এখন আমার।  
মা আমার কথার কোন উত্তর দিলো নাপুনরায় সে পশ্চিম দিকে চোখ রাখল
আমি তাঁর সামনে থেকে উঠে গিয়ে পুনরায় ছাদের কিনারায় এসে দাঁড়ালাম, “এমনিই মস্করা করছিলাম মাতুমি কিছু মনে কর না
সে এবারও চুপ করে রইলআমি হাফ ছাড়লামতারপর অপর একটা চেয়ার টেনে তাঁর মুখোমুখি বসে পড়লামতাঁর দুহাত আমার হাতের মধ্যে নিয়ে বললাম, “সত্যি কথা বলতে জানো মা?আমি তোমার জন্য চিন্তিতগত দুই দিন ধরে নিজেকে একবার তাকিয়ে দেখেছোচোখে ঘুম নেই তোমারখাবার ঠিক মতো খাচ্ছ কি না জানি না চোখের নীচ দুটো ফুলে উঠেছেমুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেছে তোমার…”
মা আমার কথার কোন উত্তর দিলো না
আমি তাঁর কোমল হাত দুটো শক্ত করে চেপে ধরলামবললাম, “দাদাই আমাদের ছেড়ে চলে গিয়েছেনএটা যেমন সত্য, ঠিক এটাও সত্য যে আমাদেরও জীবন আছেআমারও জীবন আছেতুমি আমার জীবন মা!তুমি তা ভালো করেই জানোতবে তুমি যে ভাবে শোক পালন করছো তাতে আমার ভয় হচ্ছে মাদয়া করে তুমি এমন করো নাতুমি শীঘ্রই ঠিক হয়ে যাওআমি আমার মাকে স্বাভাবিক রূপে  ফিরে পেতে চাই তাড়াতাড়ি   
 
আমার কথা শুনে মায়ের ঠোঁটের কোণে অস্পষ্ট হাসি ফুটল তাতে আমি কিছুটা আশার আলো দেখতে পেলাম সে আমার দিকে চোখ তুলল, “মন মানতে চায় না রে বাবু!”
আমি তাঁর কথায় কিঞ্চিৎ উৎসাহিত হলামতাঁর  দুটো হাত পুনরায় চেপে ধরলাম, “মনকে বোঝাও মামনি এই ভাবে জীবন চলে না তুমি শুধু আমার পুরনো মাকে ফিরিয়ে দাও দ্যাখো দিদামণিকে! তিনি কত সুন্দর আছেন দিব্যি মেনে নিয়েছেন সত্য টাকে
মা আবার ম্লান হাসল তাঁর বাম হাত দিয়ে আমার বাম গাল বুলিয়ে দিলো, “আমাকে কিছুটা সময় দে বাবু সব ঠিক হয়ে যাবে  
 আশ্বস্ত মন নিয়ে উঠে দাঁড়ালাম মনে মনে বললাম, “মা যখন বলছে, তখন মা সত্যিই খুব তাড়াতাড়ি স্বাভাবিক ছন্দে ফিরে যাবে
প্রসঙ্গ বদলানোর জন্য আলাদা কথা বলা শুরু করলাম পশ্চিম দিকের বহুদূরে অবস্থিত আবছা দেখা যাওয়া চিমনীটার দিকে আঙ্গুল দেখিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “আচ্ছা মা! ওই চিমনী টা কিসের?”
মা চোখ মেললো, “ওটা বক্রেশ্বর থার্মাল প্লান্টের চিমনী আকাশ পরিষ্কার বলে এখান থেকেও দেখা যাচ্ছে
আমি মুখ নামালাম, “হুম” !
তারপর পুনরায় মনের একটা কৌতূহল সামনে রাখলাম, “আচ্ছা মা! ওই দিকেই কি সঞ্জয় দের মামারবাড়ি?”
মা একটু আশ্চর্য হয়ে মুখ তুলল, “ কে সঞ্জয়?”   
আমি বললাম, “আঃ ওই যে গো মা সুমিত্রা! তোমার বান্ধবী তোমার ঘর আর ওর ঘর একই জেলায় অবস্থিত হওয়ায় তোমাদের মধ্যে বন্ধুত্ব তৈরি হয়েছিল
মা মুখ নামাল, “ ওহ সুমিত্রা! ওর বাড়ি রামপুরহাটের দিকে বহুদূর উত্তর পশ্চিমে আরও অনেকটা যেতে হবে
মায়ের কথা শুনে আমি দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললাম, সত্যিই শুধু একটি বারই সুমিত্রার সঙ্গে আমার দৃষ্টি বিনিময় হয়েছিলো শুধু একবার তাঁর চোখের সঙ্গে আমার চোখ মিলিত হয়েছিলো সেই চোখের গভীর চাহনি আমি কোনোদিন ভুলবো না 
 সুমিত্রার ঘন বাঁকা ভ্রুর মধ্যিখানের লাল টিপের মধ্যে দিয়ে কোথায় হারিয়ে গিয়েছিলাম এই বাড়ির ছাদের উপরের নীল আকাশে তাঁর অবয়ব দেখতে পাচ্ছিলামযেন আকাশ থেকে মুখ নামিয়ে সে আমাকে দেখছে
  
এমন মুহূর্তে আবার মায়ের কথা শুনতে পেলাম, “আচ্ছা বাবু! আমার সঙ্গে একটা জায়গা বেড়াতে যাবি?”
আমি মার দিকে মুখ ঘোরালাম, “কোথায় বেড়াতে যেতে চাও মামণি?”
মা উত্তর দিকে তাঁর ডান হাতের তর্জনী আঙুল বাড়িয়ে দেখাল আমি সেদিকে চোখ রাখলাম বাড়ির পেছনের মোরামের রাস্তার ওপাশে পাকা ধানের খেত বহুদূর অবধি চলে গিয়েছে তাঁর পর ফাঁকা প্রান্তর এবং বাবলা গাছের ছোট মাঝারি ঝোপ
প্রশ্ন করলাম,“ওই দিকে কি আছে মা? জায়গাটা পুরো ফাঁকা মনে হচ্ছে তো
মা বলল, “ না আরও অনেক কিছু দেখবার জিনিস আছে আঁখের বাগান আছে আলুর খেত আছে
আমি এমনিতেই ঘুরতে প্রচুর ভালোবাসি বলেই মার এক কথায় রাজি হয়ে গেলাম  
কখন বেরোবে মা?”
এখন কয়টা বাজে?”
আমি মোবাইল বের করে বললাম, “এইতো সকাল দশটা
মা একটু ভেবে বলল, “বেলা এগারটায় বেরবো
আমি খুশিতে মাথা নাড়লাম
মা বলল, “ আমরা এই বাড়ির পেছন দিকের গেট দিয়ে বেরবো  তোর দিদাকে কিছু বলার প্রয়োজন নেই
আমি বেশি ভাবনা না বাড়িয়ে তাঁকে আশ্বস্ত করলাম
তুমি নিশ্চিন্তে থেকো মা
মা চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “ তুই তৈরি হয়ে নে আমিও শাড়ি পরে আসছি
 
 
 
 
 
 
 
                                                                     II II
 
 
 
মায়ের পেছন পেছন আমিও সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে গেলাম মা নিজের রুমে ঢুকে পড়ল আর আমি আমার রুমে গিয়ে পুরনো পোশাক বদলে ব্লু জিন্স এবং সাদা শার্ট পরে নিলাম এখন শীত কম সেহেতু সোয়েটার পরার প্রয়োজন বোধ করলাম না
আমি তৈরি হয়ে রান্নাঘরের দরজা দিয়ে পেছন দিকে এসে দাঁড়ালাম মায়ের জন্য অপেক্ষা করছিলাম কিছুক্ষণ পর মাকে বেরিয়ে আসতে দেখলাম মা হালকা ঘিয়া রঙের একখানা শাড়ি পরে বেরিয়ে এলোহাতের  ইশারায়  আমাকে ডেকে চুপিচুপি বাঁশের গেট খুলে বেরিয়ে গেলো আমিও মাকে অনুসরণ করলাম মোরামের রাস্তা ক্রস করে পাকা ধানের আল দিয়ে হাঁটতে লাগলাম মা ছেলে মিলে মা শাড়ির কুচি সামলে নিয়ে সযত্নে হাঁটছিল আমি তাঁকে অনুসরণ করছিলাম মনে প্রশ্ন উঠছিল, “মা আমাকে কোনদিকে নিয়ে যেতে চাইছে?”
কিন্তু তার সদুত্তর খুঁজে পাচ্ছিলাম না মনে মনে শুধু বলছিলাম, “ভাঙা মন যেদিকে যেতে চায় যাক না তাতে যদি তাঁর মন ভালো হয় তাহলে তাঁকে সেটাই করতে দেওয়া উচিৎ
 
ধান মাঠের আল পেরিয়ে ফাঁকা মাঠ পেরিয়ে বাবলা গাছের ধার বেয়ে মায়ের পেছন পেছন হেঁটেই চলেছি প্রায় পনেরো মিনিট আমাদের হাঁটা হয়ে গেলো পা ব্যথা করছিলো আমার বিরক্তও লাগছিলো কিন্তু মায়ের মধ্যে কোন ক্লান্তি লক্ষ্য করছিলাম না একবার ভাবলাম মা কি তাঁর ছেলেবেলার কোন পুরনো ঠিকানায় ফিরে যেতে চাইছে? নাকি অন্য কোথাও?  
 
আমি একটা বিরক্তিভাব প্রকট করলাম, “উফ! আর কতক্ষণ লাগবে বলতো? পা ব্যথা করছে আমার
সামনে তাকিয়ে মা উত্তর দিলো, “ এই তো চলে এসেছি বাবু
লক্ষ্য করলাম ধানক্ষেত, ফাঁকা মাঠ অতিক্রম করে  এখন ঢালু মেঠো পথ দিয়ে হেঁটে চলেছি কিছু কিছু ধানের মাঠ থেকে ধান কেটে নেওয়া হয়েছে আর কিছু মাঠে এখনও চাষি মহিলারা ধান কাটছেন  
 
মাকে অনুসরণ করতে করতে একটা নতুন জায়গায় পৌঁছে গেলাম নদীর ধার তার চারপাশে সোনাঝুরি গাছ আমার একটু অবাক লাগল হঠাৎ মা আমাকে এই খানে কেন নিয়ে এলো এই ঝোপঝাড়ে ঘেরা নদীর ধারে কৌতূহল ধরে না রাখতে পেরে তাঁকে জিজ্ঞেস করে ফেললাম, “ মা তুমি আমাকে কোথায় নিয়ে এলে বলতো?”
মা আবার আঙুলের ইশারায় আমাকে নদীর ধারের দিকে দেখাল
বিনতিসুলভ আচরণ তাঁর, “বাবু এই নদীর ধার বেয়েই যাওয়া হয় তুই আমায় নিয়ে চল না রে?”
আমি নদীর ধারে তাকালাম নাহ এখানে তো কোন সুস্পষ্ট রাস্তা নেই যেখান দিয়ে হাঁটা যায় এতো শুধুই জংলী গাছে ঘেরা মা কি পাগল হয়ে গেলো নাকি?
বললাম, “কোথায় যেতে চাও বলতো মামণি?”
মা বলল, “কঙ্কালীতলা!”
আশ্চর্য হলাম, “কঙ্কালীতলা? ওটা আবার কিসের জায়গা মা?”
মা বলল, “ওটা এখানকার শ্মশান তুই আমায় নিয়ে চল বাবু তোর দাদাই এখন ওখানেই আছেন
মায়ের করুণ আর্জির মধ্যে তাঁর চোখের কোণায় অশ্রু লক্ষ্য করলাম অসহায় নিবেদন আর আমি অপারক তাঁর সিক্ত চোখ দুটো আমার উত্তরের জন্য অপেক্ষা করছিলো মায়ের কান্না আমাকে দুর্বল করে তুলছিল
আমাকে নীরব থাকতে দেখে এগিয়ে এসে আমার ডান হাত টেনে ধরল, “নিয়ে চল না আমায়…”
হতভম্ব হয়ে মাকে আশ্বস্ত করি, “থামো মাথামো আমি মোবাইলে সার্চ করি দেখি তোমার কঙ্কালীতলা কোন দিকে অবস্থিত।  
আমার কথায় মা খানিক শান্ত হল আমার মুখের দিকে চেয়ে রইল মোবাইল বের করে মনে মনে বলতে লাগলাম, “মা আমাকে বেজাই ঠকালো ভেবেছিলাম এক আর হল এক মায়ের মন থেকে এখনও দাদাইয়ের শোক নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়নি
 
মোবাইল বের দশ মিনিট ধরে গুগুল ম্যাপে কঙ্কালীতলা সার্চ করলাম কিন্তু ইন্টারনেটের পরিষেবা দুর্বল হওয়ার কারণে কোন ফলাফল পেলাম না
বেশ দুবিধায় পড়লাম মনে হল এই মুহূর্তে কি করবো ভেবে পাচ্ছিলাম না ওই দিকে মায়ের ধৈর্যের সীমা অতিক্রম হচ্ছিলো সে শুধু বায়না করে যাচ্ছিলো আমাকে সেখানে নিয়ে যাবার জন্য
মাকে বোঝানোর চেষ্টা করলাম তাঁর দুই কাঁধ চেপে ধরে বললাম, “নিজেকে শক্ত কর মা দাদাই আর এই দুনিয়ায় নেই সেখানে গেলে ছাইয়ের অবশিষ্ট ছাড়া আর কিছুই দেখতে পাবে না
মা হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করে দিলো কোপাই নদীর সন্নিকটে বেলা সাড়ে এগারোটা নাগাদ আমরা দুই জন মিলে এই নির্জন এলাকায় দাঁড়িয়ে আছি চারিদিকে ঝোপঝাড়,সোনালি ফুলের গাছ, বাবলা গাছ এবং চোখের সামনে শুকনো নদী
দুই হাতের বুড়ো আঙুল দিয়ে মায়ের চোখের জল মুছিয়ে দিচ্ছিলাম মা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিল এই পরিস্থিতিতে হাল আমাকেই ধরতে হল
মায়ের চোখের জল মুছতে মুছতে বললাম, “মা দাদাই মারা যাননি…”
আমার কথা শুনে মা চোখ তুলল
বললাম, “হ্যাঁ মা দাদাই মারা যাননি বরং তিনি পঞ্চতত্ত্বে মিশে গেছেন আর আত্মা নাকি মরে না সেহেতু তিনি মারা যাননি মা
মা আমার মুখের দিকে গভীর ভাবে চেয়ে ছিল হয়তো কিছু ভাবছিল
আমি তাঁর চোখের দিকে চেয়ে বললাম, “হ্যাঁ মা দাদাই হয়তো অন্য কোন রূপে পরিবর্তিত হয়ে গেছেন হয়তো এই শীতল বাতাস রূপে আমাদের শরীরকে স্পর্শ করছেন অথবা দূরের কোন পাখির রূপ ধারণ করে ভিন দেশে উড়ে চলেছেন
মায়ের গভীর চোখের কালো মণি দুটোর মধ্যে আমার চোখ স্থির হল মা কাঁদা থামিয়ে দিয়েছে আমি তাঁর কপালে একখানা চুমু খেলাম তারপর তাঁর সিক্ত ঠোঁটে আমার ঠোঁট স্পর্শ করালাম সঙ্গে সঙ্গে মা মুখ ঘুরিয়ে নিলো আমি তাঁকে বুকে জড়িয়ে নিলাম চারিদিক নিস্তব্দ শুধু হিমেল বাতাস সোঁ সোঁ শব্দ করে আমাদের গায়ে আছড় মারছে আর দূরে পাখি দের কলরব শুনতে পাচ্ছিলাম মানুষজনের কার্যকলাপের ধ্বনি কানে আসছিলো না নইলে কলকাতার গাড়ির হর্নের শব্দ এবং মানুষের চেঁচামেচিতে এতক্ষণ অতিষ্ঠ হয়ে উঠতাম এই সময় উপভোগ করার মতো শোক পালন করার জন্য নয়
শীতের রোদের মধ্যেও একটা মাঝারী উত্তাপ অনুভব করছিলাম মায়ের কপালে তেলচা ঘাম জমেছে আমি তাঁর কাঁধ জড়িয়ে ধরে পাশের একটা সোনাঝুরি গাছের নীচে সবুজ ঘাসের উপর বসে পড়লাম মা আমার ডান পাশে বসে ছিল দুজনের চোখ ছিল নদীর চিকমিকি বালির উপর আমি মায়ের মুখের দিকে  তাকালাম মায়ের চোখ অশ্রুশূন্য থাকলেও মনের অন্তরে বেদনাভাব স্পষ্ট অনুভব করছিলাম তাতে আমার মন ব্যথিত হচ্ছিলো
আমি ডান হাত বাড়িয়ে তাঁর ডান বাহু জড়িয়ে আমার কাঁধের কাছে টেনে নিলাম এখানকার নীরবতা কিছু  একটা যেন বলছিল মায়ের একমনা হয়ে বসে থাকা দেখে প্রশ্ন করলাম, “এই ভাবে চুপ করে কী ভাবছো মামণি?”
 
মা মুখ নামিয়ে বলল, “পাখীর ডাক শুনছি বাবু   
আমি আশ্চর্য হলাম মনে মনে হাসলাম, “পাখীর ডাক শুনছো মানে?”
মা বলল, “হ্যাঁ তুইও শোন দ্যাখ ভালো লাগবে
এই মুহূর্তে মায়ের মন ঠিক রাখার জন্য আমি সবকিছুই করতে রাজিতাই মায়ের কথা মতো আমিও পাখীর ডাকের দিকে মনোযোগ দিলাম  
মা জিজ্ঞেস করলো, “শুনছিস বাবু?”
আমি বললাম, “হ্যাঁ মা শুনছি
কতগুলো পাখীর ডাক শুনতে পাচ্ছিস বলতো?”
আমি মনোযোগ দিয়ে শুনে বললাম, “দুই রকম! দুই রকম পাখীর ডাক শুনতে পাচ্ছি মা
মা হাসল মায়ের মুখে হাসির ঝলক দেখে আমারও মন উছলে উঠল
জিজ্ঞেস করলাম, “হাসলে কেন মা?”
মা বলল, “আরও ভালো করে মন দিয়ে শোন, দিয়ে আমায় বল কয়টা পাখী?”
তাঁর কথা মতো আমিও তাই করলাম বাতাসে ভেসে আসা কিচিরমিচির শব্দ গুলোকে বিশ্লেষণ করতে লাগলাম হ্যাঁ খুব সম্ভবত আরও একটা নতুন পাখীর ডাক শুনতে পেলাম তারমানে মোট তিনটে
মাকে বললাম, “তিন রকমের পাখীর ডাক শুনতে পেলাম মা 
মা আবার হেসে বলল, “চার রকমের চার ধরণের পাখী রয়েছে আমাদের চারপাশে
আমি অবাক হলাম, “ওমা সত্যি! কিন্তু আমি তো তিনটেই শুনতে পাচ্ছি মা
মা আবার হেসে বলল, “ওই পাখী কলকাতার পরিবেশে থাকেনা বলে তার ডাক কোনোদিন শুনিসনি তাই কানে ধরছে না
আমি হাসলাম
যাইহোক মাকে স্বাভাবিক রূপে ফিরিয়ে আনতে আমি ব্যর্থ হলেও পাখীরা তা করে দেওয়াতে একপ্রকার খুশিই হলাম ভালো লাগছিলো পাখীর কলরবে এই জায়গাটা উপভোগ করতে শীতল বাতাসের অবিরাম প্রবাহে সোনাঝুরি গাছের হলুদ ফুল ঝিরঝির করে খসে পড়ল আমাদের চোখের সামনে
দ্যাখো মা সোনাঝুরি গাছের ফুল গুলো ঝরে কেমন হাওয়ার সঙ্গে বাতাসে মিশে যাচ্ছে  
আমি আঙুল দিয়ে তা মাকে দেখাতে মা আবার বলে উঠল, “জানিস বাবু সোনাঝুরি গাছের নামকরণ কে করেছিলেন?”
আমি ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলাম, “এটা আবার কেমন প্রশ্ন মা? কোন বস্তুর কোন বিশেষ ব্যক্তি নামকরণ করেন নাকি? এটা নাম তো প্রচলিত হয়ে আসছে তাই না?”
মা আবার হালকা হাসল, “রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর! তিনিই এই গাছের নাম রেখেছিলেন সোনাঝুরি যার ফুল সোনার মতো ঝরে পড়ে
আমার খেয়াল হল, “হ্যাঁ সত্যিই তো এই গাছের উজ্জ্বল হলুদাভ ফুলের রং কিছুটা সোনার মতোই
আমি মায়ের দিকে চাইলাম, “ মা তুমি ঠিকই বলেছ এখন আমি বুঝতে পারছি এই গাছের নামকরণের সার্থকতা
মা শুধু, “হুমবলে চুপ করে রইল
 
 




Like Reply
Do not mention / post any under age /rape content. If found Please use REPORT button.


Messages In This Thread
RE: দেবশ্রী - এক স্বর্গীয় অনুভূতি - by Jupiter10 - 13-02-2022, 10:44 PM



Users browsing this thread: 9 Guest(s)