28-02-2019, 05:11 PM
বুকভাঙ্গা অশ্রু (#02)
পরী দুঃখে ককিয়ে ওঠে, বেদনায় চিৎকার করে ওঠে গলা ফাটিয়ে, "ছোটমা, আমি মাস্টার্স করতে চাই না, আমি কিছু চাই না, শুধু অভিকে আমার কাছ থেকে দুরে সরিয়ে দিও না ছোটমা। কে কি বলে আমি তার ধার ধারিনা ছোটমা, শুধু ওকে আমার কাছ থেকে দুরে করে দিও না, ছোটমা, আমি বাঁচবও না।"
মায়ের কানে পরীর কান্না ভেজা আর্তনাদ প্রবেশ করে না, চুপ করে বসে থাকেন।
অভি মায়ের দিকে তাকিয়ে রেগে যায়, চিৎকার করে ওঠে, "তুমি তোমার আত্মসন্মান আর স্বভিমান নিয়ে সারা জীবন বেঁচে থাকলে। আমি যদি এই বাড়ি থেকে চলে যাই তাহলে আমি পরীকে সাথে নিয়ে যাবো।"
মা, "না, কারুর ক্ষমতা নেই, ওকে আমার কাছ থেকে আলাদা করে নেওয়ার। পরীর মাথায় হাত রেখে তোকে প্রতিজ্ঞা করতে হবে যে তুই কোনদিন কোলকাতা আসবি না, তুই কোনদিন ওর সামনে আসবি না।"
মায়ের আদেশ শুনে অভি পাথরের মূর্তির মতন ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে। মা ওর হাত টেনে ধরে পরীর মাথায় রাখে, অভির বুক ফেটে যায় হাতের ওপরে পরীর চুলের পরশ পেয়ে। এক ভীষণ ভুমিকম্প এসে যেন ওদের জীবন টুকরো টুকরো করে ভেঙ্গে দিয়ে চলে যায়। পরী ঠোঁট কামড়ে চোখ বন্ধ কয়রে ফেলে, মাথায় অভির হাত। মরমে যেন মরে যায় পরী।
চাপা ককিয়ে ওঠে, "না......"
মায়ের কোলে মাথা গুঁজে কেঁদে ফেলে। মা ওর দিকে তাকায় না।
মা পরীকে বলেন, "তোর মাকে আমি কথা দিয়েছিলাম, যে তোকে আমি আগলে রাখবো। আমার মান সন্মান আজ সমাজের কাঠগোরায় দাঁড়িয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আর সেই জন্যেই অভিকে বাড়ি ছাড়তে হবে, এমনকি কোলকাতা ছেড়ে চলে যেতে হবে ওকে। আমি চাই না ওর ছায়া পর্যন্ত তোর কাছে আসুক।"
মা অভির দিকে তাকিয়ে আদেশ দিলেন, "দাঁড়িয়ে আছিস কেন, নিজের ঘরে গিয়ে ব্যাগ গুছিয়ে নে। আমি তোর বাবা কে এখুনি ফোন করে কাল সকালের দিল্লীর জন্যে প্লেনের টিকিট কাটতে বলে দিচ্ছি। আর এক দিনের জন্যেও তুই এই ছাদের তলায় থাকতে পারবি না। কথা দে, আমি যত দিন না বলব, তত দিন তুই কোলকাতা আসবিনা আর আমাদের বাড়িতে ফোন করবি না। যদি আমার কথা না রাখিস তাহলে তুই পরীর মরা মুখ দেখবি।"
মায়ের কথা শুনে অভির যেন দুই পা কেউ মেঝের সাথে পেরেক দিয়ে গেঁথে দিয়েছে, নড়ার শক্তি টুকু হারিয়ে ফেলে অভি। পরী মুখ নিচু করে কাঁদে, বুকের মাঝে এক বিশাল আগ্নেয়গিরি ফেটে পড়েছে ওর। শক্ত করে হাত চেপে ধরে পরী, হাতের সরু সোনার চুড়ি বেঁকে গিয়ে কবজিতে ফুটে যায় আর রক্ত বের হতে শুরু করে, কিন্তু সেই বেদনা যে মনের বেদনার কাছে খুব কম। অভির চোখের সামনে সারা পৃথিবী বন বন করে ঘুরতে শুরু করে দেয়।
অভিকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মা চিৎকার করে ওঠেন, "দূর হয়ে যা আমার চোখের সামনে থেকে, আমি তোর মুখ দেখতে চাই না।"
কোনোরকমে টলতে টলতে অভি নিজের ঘরে ঢোকে। জানেনা, পরীর কি হবে বা বাবাকে মা কি বলবেন। বাকি সারাদিন নিজেকে নিজের ঘরে বন্ধ করে রাখে। শেষ পর্যন্ত মৈথিলীর অভিশাপের কথা মনে পরে যায়, মৈথিলী যেন ওর দিকে তাকিয়ে হেসে ওঠে, "জীবন যুদ্ধে তুমি শেষ পর্যন্ত হেরে গেলে, অভিমন্যু।"
বিকেলে বাবা ওর ঘরে আসেন। হাতে একটা খাম আর দিল্লীর টিকিট দিয়ে বলেন, "আমরা তোর বাবা মা, আমরা তোর ভালোই চাইব। যতদিন তুই চাকরি না পাস, তত দিনের জন্য আমি সুপ্রতিমের আকাউন্টে কিছু টাকা পাঠিয়ে দেব।"
বাইরে ঝমঝম করে বৃষ্টি শুরু হয়, আকাশ যেন সেদিন জলের বদলে রক্তের বৃষ্টি করে। পরীর আর অভির বুকের রক্ত যেন আকাশ কেঁদে কেঁদে জল করে সারা জায়গায় ছড়িয়ে দেয়, কিন্তু কেউ সেই কান্না শুনতে পায় না।
রাত একটা নাগাদ, জামা কাপড় পরে, ব্যাগ হাতে নিচে নেমে আসে অভি। আসার আগে নিজের ঘরে সেই ডায়রি খোঁজে, কিন্তু পায় না, ভাবে হয়ত পরীর কাছে থাকবে।
শেষ বারের মতন বাড়ি থেকে অরুনাকে ফোন করে। অরুনা অত রাতে ফোন ধরে জিজ্ঞেস করে, "কিরে, কি হয়েছে? এত রাতে ফোন করেছিস কেন?"
অভি, "আমি কোলকাতা ছেড়ে চলে যাচ্ছি, সকালের ফ্লাইট। আমার সাথে পারলে এয়ারপোর্টে দেখা করিস।"
চাপা চিৎকার করে ওঠে অরুনা, "কি হয়েছে?"
অভি, "ফোনে বলতে পারছিনা, সকালে এয়ারপোর্টে বলব।"
শেষ বারের মতন বাড়ির ফোনে কথা বলে রিসিভার রেখে দেয়।
সারা রাত বসার ঘরে চুপ করে বসে থাকে অভি। মায়ের ঘরে মা জেগে, পরীর ঘরে পরী দরজা বন্ধ করে কাঁদে। শেষ বারের মতন পরীর সাথে দেখা করার অবকাশ টুকু পায় না অভি, বুকের মাঝে হুহু করে কেঁদে ওঠে যখন পরীর বন্ধ দরজার দিকে চোখ যায়।
সকাল চারটে নাগাদ মায়ের দরজায় টোকা মারে অভি, জানায় যে এবারে ও চলে যাবে। মা কোন উত্তর দেন না। বাবা বেড়িয়ে এসে জিজ্ঞেস করেন, "প্লেন তো সাত টায়, এখুনি বের হবি কেন?"
বুকের পাঁজর ভেঙ্গে যায় অভির তাও উত্তর দেয় বাবাকে, "এই বাড়িতে আমার থাকার সময় শেষ হয়ে এসেছে।"
মাথা নিচু করে বাবার পায়ে হাত দিয়ে প্রনাম করে অভি, শেষ বারের জন্য মেঝে ছুঁয়ে মাকে শেষ প্রনাম জানায়। ব্যাগ হাতে নিয়ে বেড়িয়ে যায় দরজা দিয়ে। বাবা বাইরের গেট পর্যন্ত ওর সাথে আসেন। গেট থেকে বেড়িয়ে যাবার আগে, শেষ বারের জন্য বাড়ির দিকে তাকায় অভি। দুতলার বসার ঘরের জানালার পর্দা হালকা নড়ে ওঠে। তাকিয়ে দেখে যে পরী জল ভরা চোখে জানালার গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে। কাজল কালো চোখ দুটি রক্ত জবার মতন লাল হয়ে উঠেছে। বুক ফেটে কান্নার সুর অভির কানে এসে বাজে। পরীর বুকের পাঁজর ওর কাছ থেকে দুরে চলে যাচ্ছে, পরী বাঁচবে কি নিয়ে।
অভি নিচু হয়ে বাগানের একটু মাটি তুলে নিয়ে পরীর সেই সিল্কের রুমালে বেঁধে নেয়। ট্যাক্সি তে ওঠার আগে জানালার দিকে শেষ বারের মতন তাকায় অভি। ওর দিকে তর্জনী উঠিয়ে ইশারায় জানায় "আই", ইশারা দেখে পরী নিচের ঠোঁট কামড়ে ধরে। তারপরে তর্জনী আর বুড়ো আঙুল মেলে ধরে ইশারা করে, "এল", পরীর বুকে কেঁপে ওঠে, প্রানপন নিজেকে থামাতে চেষ্টা করে। তারাপরে অভি, মধ্যমা আর অনামিকে মেলে ধরে ওর দিকে ইশারা করে, "ইউ"
পরী জানালার গ্রিল শক্ত করে ধরে থাকে, প্রানপন চেষ্টা করে সেই লোহার গ্রিল ভেঙ্গে অভির কাছে ঝাঁপিয়ে চলে যাওয়ার, কিন্তু লোহার গ্রিল আর সমাজের কঠিন বন্ধন পরীকে ঝাঁপ দিতে দেয় না। পরী আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারেনা, সংজ্ঞা হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পরে। এক বার আগেও পরী সংজ্ঞা হারিয়ে লুটিয়ে পড়েছিল, তখন অভিকে সবাই ডেকে ছিল, কিন্তু সেই সময় আর আজকের সময় অনেক ভিন্ন। সেদিন চেয়েও অভি দৌড়ে পরীর কাছে গিয়ে ওর মাথা নিজের কোলে তুলে নিতে পারে না।
জল ভরা চোখ, ভাঙ্গা বুক নিয়ে অভি ট্যাক্সি চাপে। মনে মনে ভগবানের কাছে প্রার্থনা জানায় যে, পরীকে যেন শান্তি দেয় ওকে যেন সুখে রাখে, নিজের জীবনে ত কিছুই পেলনা শেষ পর্যন্ত। পরীর কাছে হয়ত ওর একমাত্র চিনহ স্বরুপ পর ডায়রি থেকে যাবে আর অভির কাছে ওর রুমাল, তার সাথে পরীর এক বিন্দু রক্ত ওর শিরা উপশিরায় মিশে।
21শে জুলাই, 2001, শনিবার। সকাল চারটে নাগাদ এয়ারপোর্টে পৌঁছে লক্ষ্য করে যে অরুনা আর সমুদ্রনীল উপস্থিত। অরুনা অভির কাছে দৌড়ে এসে কলার ধরে জিজ্ঞেস করে, "কি হয়েছে তোর বাড়িতে? তুই কেন কোলকাতা ছেড়ে চলে যাচ্ছিস? শুচিদির কি হবে?"
অভি, "আমি চিরদিনের জন্য কোলকাতা ছেড়ে চলে যাচ্ছি।"
চাপা চিৎকার করে ওঠে অরুনা, "কেন?"
অভি পুরো ঘটনা জানায় অরুনাকে।
সব শুনে অরুনা কেঁদে ফেলে, "আমাকে আগে কেন জানাস নি তুই?"
অভি, "কি করে জানাতাম রে। সবকিছু কেমন ঝড়ের বেগে এসে আমাদের জীবন তছনছ করে দিয়ে চলে গেল। মা জেগে বসে আমি কি করে তোকে জানাই এই সব কথা।"
অরুনা যেন বিশ্বাস করতে পারছিলনা যে অভিমন্যু কোলকাতা ছেড়ে চলে যাবে। অভির দিকে তাকিয়ে সমানে কেঁদে চলে অরুনা, পেছনে সমুদ্রনীল দাঁড়িয়ে, যেন কিছু বলার ভাষা খুঁজতে চেষ্টা করে।
অরুনা, "আমি কাকিমার সাথে কথা বলব, তুই যাস না।"
অভি, "সেই পথ বন্ধ অরুনা। মা এত খনে ভালভাবে বুঝতে পেরে গেছেন যে তুই আগে থেকে আমার আর পরীর ভালবাসার কথা জানতিস, তাই আমার মা হয়ত তোকে আমাদের বাড়ি ঢুকতে পর্যন্ত দেবে না। পরীর মাথায় হাত রেখে আমাকে প্রতিজ্ঞা করতে হয়েছে যে আমি কোনদিন পরীর সাথে দেখা করতে পারবোনা বা কোনদিন কোলকাতা ফিরতে পারবোনা। আমি মরে যাবো কিন্তু পরীর গায়ে কোন আঁচড় আসুক আমি চাই না, অরুনা।"
অরুনা অভিকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলে। বুকের জামা ভিজে যায় অরুনার চোখের জলে। অভির বুক ফেটে যায় পরীর দুঃখে আর অরুনার কান্না দেখে। দুহাতে শেষ বারের মতন অরুনাকে জড়িয়ে ধরে অভি, মাথার ওপরে ঠোঁট চেপে সমুদ্রনীলের দিকে ঝাপসা চোখ নিয়ে তাকায়।
কাঁপা গলায় বলে সমুদ্রনীলকে, "আমি চেক ইন করার আগে অরুনাকে নিয়ে চলে যা।"
সমুদ্রনীল উত্তর দেয়, "তুই ওকে ভালো ভাবে চিনিস, অভি। ওই বোর্ডে যতক্ষণ না লেখা ফুটবে যে আই সি 264 Departed. ততক্ষণ অরুনা এখান থেকে নড়বে না। আমি জানি না রে অভি, তুই যাবার পরে অরুনার কি হবে। ও শুচিদিকে খুব ভালবাসত রে।"
অভি, "আমাকে কথা দে, তুই ওকে দেখবি, দয়া করে ওর চোখে জল আনিস না রে। আমার হয়ে, পরীর হয়ে ওকে ভালবাসিস তুই, আমি পুবালিকে কথা দিয়েছিলাম, সেই কথা আমি ত আর রাখতে পারলাম না, তুই রাখিস।"
কোনোরকমে জোর করে অরুনাকে ছাড়িয়ে ওর হাত সমুদ্রনীলের হাতে তুলে দেয়। অরুনা কিছুতেই অভিকে ছাড়তে চায় না, প্রাণপণে জামার কলার আঁকড়ে ধরে থাকে। শেষ পর্যন্ত বহু কষ্টে বুকের পাঁজর ভেঙ্গে দিয়ে অভি পেছনে সরে আসে আর জামার একটা বোতাম ছিঁড়ে অরুনার হাতে থেকে যায়। অভি পেছনে না তাকিয়ে সোজা, চেক ইন করার দিকে হাতা দেয়।
পেছন থেকে অরুনা ডুকরে কেঁদে ওঠে, "আজ আমি আমার জীবনের সব কিছু হারিয়ে ফেলেছি অভি।"
সিকুরিটি চেক করার আগে শেষবারের মতন অরুনার জল ভরা চোখের দিকে তাকায়। চোখের মণি, প্রিয় বান্ধবী অরুন্ধতি ব্যানারজির জল ভরা চোখ ওর দিকে এক ভাবে তাকিয়ে থাকে।
প্লেন রানওয়ে দিয়ে দৌড়তে শুরু করে। অভি দাঁতে দাঁত পিষে চোখ বন্ধ করে বসে থাকে। প্লেনের ঝন ঝন আওয়াজ যেন ওর বুকের পাঁজরের ভাঙ্গা আওয়াজ মনে হয়। একটা একটা করে ভাঙ্গে ওর শরীরের হাড়। বারে বারে মাথা পেটায় সিটের পেছনে। আগে এক বার এই প্লেন অভিকে নিয়ে উড়েছিল পরীর সাথে অজানার পানে ভ্রমনে। সেই একই প্লেনে করে উড়ে ও ফিরে পেয়েছিল প্রানের বান্ধবীকে। কিন্তু সেইদিনের উড়ান বাকি দিনের উড়ানের চেয়ে অনেক অনেক আলাদা, এবারে ওকে সবকিছু ছেড়ে যেতে হবে, সাধের প্রান প্রেয়সী আর চোখের মনি দেবী অরুন্ধুতি।
শেষ পর্যন্ত প্লেনের চাকা উঠে গেল প্লেনের দেহে। অভির শরীর যেন এক বিশাল ধাক্কা খেল, যেন এক লোহার শেকল ছিঁড়ে গেছে অবশেষে। মাথার মধ্যে সেই লোহার শেকলের শত সহস্র টুকরো ছড়িয়ে পড়েছে। এতদিন যা যা প্রতিজ্ঞা করেছিল অভি, সব যেন ভেঙ্গে তছনছ হয়ে গেল প্লেনের ওড়ার সাথে সাথে।
অভি প্রতিজ্ঞা করেছিল যে ওর প্রেয়সীর জন্য একটা কুঠির বানিয়ে দেবে।
অভির সুটকেসে ভাঁজ করে রাখা প্রেয়সীর ছবি যেটা শেষ করতে পারেনি।
অভি প্রতিজ্ঞা করেছিল যে বুড়ো হলে ওরা দুজনে মিলে একসাথে বসে ওর ডায়রি পড়বে।
অভি প্রতিজ্ঞা করেছিল যে প্রেয়সীর সাথে দোলনায় বসে বিকেলের চা খাবে সেই পাহাড়ের কুঠিরের সামনে।
অভি প্রতিজ্ঞা করেছিল যে বয়স কালে ওরা কি বৃদ্ধাশ্রমে একসাথে থাকবে।
অভির সব প্রতিজ্ঞা সেইদিন ভেঙ্গে যায়।
ঝাপসা চোখের সামনে তিন খানি চেহারা ভেসে ওঠে।
পরীর জল ভরা লাল চোখ, দু গাল বেয়ে টপ টপ করে জল পড়ছে, হৃদয় ভেঙ্গে সহস্র টুকরো হয়ে ছড়িয়ে গেছে পরীর।
অরুন্ধুতির হৃদয় বিদারক কান্নার আর সেই ডাক।
মায়ের ক্রোধিত নয়ন।
.
..
...
....
.....
......
.......
.........
..........
বিদায় শুচিস্মিতা, বিদায় অরুন্ধতি, বিদায় কোলকাতা।
পরী দুঃখে ককিয়ে ওঠে, বেদনায় চিৎকার করে ওঠে গলা ফাটিয়ে, "ছোটমা, আমি মাস্টার্স করতে চাই না, আমি কিছু চাই না, শুধু অভিকে আমার কাছ থেকে দুরে সরিয়ে দিও না ছোটমা। কে কি বলে আমি তার ধার ধারিনা ছোটমা, শুধু ওকে আমার কাছ থেকে দুরে করে দিও না, ছোটমা, আমি বাঁচবও না।"
মায়ের কানে পরীর কান্না ভেজা আর্তনাদ প্রবেশ করে না, চুপ করে বসে থাকেন।
অভি মায়ের দিকে তাকিয়ে রেগে যায়, চিৎকার করে ওঠে, "তুমি তোমার আত্মসন্মান আর স্বভিমান নিয়ে সারা জীবন বেঁচে থাকলে। আমি যদি এই বাড়ি থেকে চলে যাই তাহলে আমি পরীকে সাথে নিয়ে যাবো।"
মা, "না, কারুর ক্ষমতা নেই, ওকে আমার কাছ থেকে আলাদা করে নেওয়ার। পরীর মাথায় হাত রেখে তোকে প্রতিজ্ঞা করতে হবে যে তুই কোনদিন কোলকাতা আসবি না, তুই কোনদিন ওর সামনে আসবি না।"
মায়ের আদেশ শুনে অভি পাথরের মূর্তির মতন ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে। মা ওর হাত টেনে ধরে পরীর মাথায় রাখে, অভির বুক ফেটে যায় হাতের ওপরে পরীর চুলের পরশ পেয়ে। এক ভীষণ ভুমিকম্প এসে যেন ওদের জীবন টুকরো টুকরো করে ভেঙ্গে দিয়ে চলে যায়। পরী ঠোঁট কামড়ে চোখ বন্ধ কয়রে ফেলে, মাথায় অভির হাত। মরমে যেন মরে যায় পরী।
চাপা ককিয়ে ওঠে, "না......"
মায়ের কোলে মাথা গুঁজে কেঁদে ফেলে। মা ওর দিকে তাকায় না।
মা পরীকে বলেন, "তোর মাকে আমি কথা দিয়েছিলাম, যে তোকে আমি আগলে রাখবো। আমার মান সন্মান আজ সমাজের কাঠগোরায় দাঁড়িয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আর সেই জন্যেই অভিকে বাড়ি ছাড়তে হবে, এমনকি কোলকাতা ছেড়ে চলে যেতে হবে ওকে। আমি চাই না ওর ছায়া পর্যন্ত তোর কাছে আসুক।"
মা অভির দিকে তাকিয়ে আদেশ দিলেন, "দাঁড়িয়ে আছিস কেন, নিজের ঘরে গিয়ে ব্যাগ গুছিয়ে নে। আমি তোর বাবা কে এখুনি ফোন করে কাল সকালের দিল্লীর জন্যে প্লেনের টিকিট কাটতে বলে দিচ্ছি। আর এক দিনের জন্যেও তুই এই ছাদের তলায় থাকতে পারবি না। কথা দে, আমি যত দিন না বলব, তত দিন তুই কোলকাতা আসবিনা আর আমাদের বাড়িতে ফোন করবি না। যদি আমার কথা না রাখিস তাহলে তুই পরীর মরা মুখ দেখবি।"
মায়ের কথা শুনে অভির যেন দুই পা কেউ মেঝের সাথে পেরেক দিয়ে গেঁথে দিয়েছে, নড়ার শক্তি টুকু হারিয়ে ফেলে অভি। পরী মুখ নিচু করে কাঁদে, বুকের মাঝে এক বিশাল আগ্নেয়গিরি ফেটে পড়েছে ওর। শক্ত করে হাত চেপে ধরে পরী, হাতের সরু সোনার চুড়ি বেঁকে গিয়ে কবজিতে ফুটে যায় আর রক্ত বের হতে শুরু করে, কিন্তু সেই বেদনা যে মনের বেদনার কাছে খুব কম। অভির চোখের সামনে সারা পৃথিবী বন বন করে ঘুরতে শুরু করে দেয়।
অভিকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মা চিৎকার করে ওঠেন, "দূর হয়ে যা আমার চোখের সামনে থেকে, আমি তোর মুখ দেখতে চাই না।"
কোনোরকমে টলতে টলতে অভি নিজের ঘরে ঢোকে। জানেনা, পরীর কি হবে বা বাবাকে মা কি বলবেন। বাকি সারাদিন নিজেকে নিজের ঘরে বন্ধ করে রাখে। শেষ পর্যন্ত মৈথিলীর অভিশাপের কথা মনে পরে যায়, মৈথিলী যেন ওর দিকে তাকিয়ে হেসে ওঠে, "জীবন যুদ্ধে তুমি শেষ পর্যন্ত হেরে গেলে, অভিমন্যু।"
বিকেলে বাবা ওর ঘরে আসেন। হাতে একটা খাম আর দিল্লীর টিকিট দিয়ে বলেন, "আমরা তোর বাবা মা, আমরা তোর ভালোই চাইব। যতদিন তুই চাকরি না পাস, তত দিনের জন্য আমি সুপ্রতিমের আকাউন্টে কিছু টাকা পাঠিয়ে দেব।"
বাইরে ঝমঝম করে বৃষ্টি শুরু হয়, আকাশ যেন সেদিন জলের বদলে রক্তের বৃষ্টি করে। পরীর আর অভির বুকের রক্ত যেন আকাশ কেঁদে কেঁদে জল করে সারা জায়গায় ছড়িয়ে দেয়, কিন্তু কেউ সেই কান্না শুনতে পায় না।
রাত একটা নাগাদ, জামা কাপড় পরে, ব্যাগ হাতে নিচে নেমে আসে অভি। আসার আগে নিজের ঘরে সেই ডায়রি খোঁজে, কিন্তু পায় না, ভাবে হয়ত পরীর কাছে থাকবে।
শেষ বারের মতন বাড়ি থেকে অরুনাকে ফোন করে। অরুনা অত রাতে ফোন ধরে জিজ্ঞেস করে, "কিরে, কি হয়েছে? এত রাতে ফোন করেছিস কেন?"
অভি, "আমি কোলকাতা ছেড়ে চলে যাচ্ছি, সকালের ফ্লাইট। আমার সাথে পারলে এয়ারপোর্টে দেখা করিস।"
চাপা চিৎকার করে ওঠে অরুনা, "কি হয়েছে?"
অভি, "ফোনে বলতে পারছিনা, সকালে এয়ারপোর্টে বলব।"
শেষ বারের মতন বাড়ির ফোনে কথা বলে রিসিভার রেখে দেয়।
সারা রাত বসার ঘরে চুপ করে বসে থাকে অভি। মায়ের ঘরে মা জেগে, পরীর ঘরে পরী দরজা বন্ধ করে কাঁদে। শেষ বারের মতন পরীর সাথে দেখা করার অবকাশ টুকু পায় না অভি, বুকের মাঝে হুহু করে কেঁদে ওঠে যখন পরীর বন্ধ দরজার দিকে চোখ যায়।
সকাল চারটে নাগাদ মায়ের দরজায় টোকা মারে অভি, জানায় যে এবারে ও চলে যাবে। মা কোন উত্তর দেন না। বাবা বেড়িয়ে এসে জিজ্ঞেস করেন, "প্লেন তো সাত টায়, এখুনি বের হবি কেন?"
বুকের পাঁজর ভেঙ্গে যায় অভির তাও উত্তর দেয় বাবাকে, "এই বাড়িতে আমার থাকার সময় শেষ হয়ে এসেছে।"
মাথা নিচু করে বাবার পায়ে হাত দিয়ে প্রনাম করে অভি, শেষ বারের জন্য মেঝে ছুঁয়ে মাকে শেষ প্রনাম জানায়। ব্যাগ হাতে নিয়ে বেড়িয়ে যায় দরজা দিয়ে। বাবা বাইরের গেট পর্যন্ত ওর সাথে আসেন। গেট থেকে বেড়িয়ে যাবার আগে, শেষ বারের জন্য বাড়ির দিকে তাকায় অভি। দুতলার বসার ঘরের জানালার পর্দা হালকা নড়ে ওঠে। তাকিয়ে দেখে যে পরী জল ভরা চোখে জানালার গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে। কাজল কালো চোখ দুটি রক্ত জবার মতন লাল হয়ে উঠেছে। বুক ফেটে কান্নার সুর অভির কানে এসে বাজে। পরীর বুকের পাঁজর ওর কাছ থেকে দুরে চলে যাচ্ছে, পরী বাঁচবে কি নিয়ে।
অভি নিচু হয়ে বাগানের একটু মাটি তুলে নিয়ে পরীর সেই সিল্কের রুমালে বেঁধে নেয়। ট্যাক্সি তে ওঠার আগে জানালার দিকে শেষ বারের মতন তাকায় অভি। ওর দিকে তর্জনী উঠিয়ে ইশারায় জানায় "আই", ইশারা দেখে পরী নিচের ঠোঁট কামড়ে ধরে। তারপরে তর্জনী আর বুড়ো আঙুল মেলে ধরে ইশারা করে, "এল", পরীর বুকে কেঁপে ওঠে, প্রানপন নিজেকে থামাতে চেষ্টা করে। তারাপরে অভি, মধ্যমা আর অনামিকে মেলে ধরে ওর দিকে ইশারা করে, "ইউ"
পরী জানালার গ্রিল শক্ত করে ধরে থাকে, প্রানপন চেষ্টা করে সেই লোহার গ্রিল ভেঙ্গে অভির কাছে ঝাঁপিয়ে চলে যাওয়ার, কিন্তু লোহার গ্রিল আর সমাজের কঠিন বন্ধন পরীকে ঝাঁপ দিতে দেয় না। পরী আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারেনা, সংজ্ঞা হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পরে। এক বার আগেও পরী সংজ্ঞা হারিয়ে লুটিয়ে পড়েছিল, তখন অভিকে সবাই ডেকে ছিল, কিন্তু সেই সময় আর আজকের সময় অনেক ভিন্ন। সেদিন চেয়েও অভি দৌড়ে পরীর কাছে গিয়ে ওর মাথা নিজের কোলে তুলে নিতে পারে না।
জল ভরা চোখ, ভাঙ্গা বুক নিয়ে অভি ট্যাক্সি চাপে। মনে মনে ভগবানের কাছে প্রার্থনা জানায় যে, পরীকে যেন শান্তি দেয় ওকে যেন সুখে রাখে, নিজের জীবনে ত কিছুই পেলনা শেষ পর্যন্ত। পরীর কাছে হয়ত ওর একমাত্র চিনহ স্বরুপ পর ডায়রি থেকে যাবে আর অভির কাছে ওর রুমাল, তার সাথে পরীর এক বিন্দু রক্ত ওর শিরা উপশিরায় মিশে।
21শে জুলাই, 2001, শনিবার। সকাল চারটে নাগাদ এয়ারপোর্টে পৌঁছে লক্ষ্য করে যে অরুনা আর সমুদ্রনীল উপস্থিত। অরুনা অভির কাছে দৌড়ে এসে কলার ধরে জিজ্ঞেস করে, "কি হয়েছে তোর বাড়িতে? তুই কেন কোলকাতা ছেড়ে চলে যাচ্ছিস? শুচিদির কি হবে?"
অভি, "আমি চিরদিনের জন্য কোলকাতা ছেড়ে চলে যাচ্ছি।"
চাপা চিৎকার করে ওঠে অরুনা, "কেন?"
অভি পুরো ঘটনা জানায় অরুনাকে।
সব শুনে অরুনা কেঁদে ফেলে, "আমাকে আগে কেন জানাস নি তুই?"
অভি, "কি করে জানাতাম রে। সবকিছু কেমন ঝড়ের বেগে এসে আমাদের জীবন তছনছ করে দিয়ে চলে গেল। মা জেগে বসে আমি কি করে তোকে জানাই এই সব কথা।"
অরুনা যেন বিশ্বাস করতে পারছিলনা যে অভিমন্যু কোলকাতা ছেড়ে চলে যাবে। অভির দিকে তাকিয়ে সমানে কেঁদে চলে অরুনা, পেছনে সমুদ্রনীল দাঁড়িয়ে, যেন কিছু বলার ভাষা খুঁজতে চেষ্টা করে।
অরুনা, "আমি কাকিমার সাথে কথা বলব, তুই যাস না।"
অভি, "সেই পথ বন্ধ অরুনা। মা এত খনে ভালভাবে বুঝতে পেরে গেছেন যে তুই আগে থেকে আমার আর পরীর ভালবাসার কথা জানতিস, তাই আমার মা হয়ত তোকে আমাদের বাড়ি ঢুকতে পর্যন্ত দেবে না। পরীর মাথায় হাত রেখে আমাকে প্রতিজ্ঞা করতে হয়েছে যে আমি কোনদিন পরীর সাথে দেখা করতে পারবোনা বা কোনদিন কোলকাতা ফিরতে পারবোনা। আমি মরে যাবো কিন্তু পরীর গায়ে কোন আঁচড় আসুক আমি চাই না, অরুনা।"
অরুনা অভিকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলে। বুকের জামা ভিজে যায় অরুনার চোখের জলে। অভির বুক ফেটে যায় পরীর দুঃখে আর অরুনার কান্না দেখে। দুহাতে শেষ বারের মতন অরুনাকে জড়িয়ে ধরে অভি, মাথার ওপরে ঠোঁট চেপে সমুদ্রনীলের দিকে ঝাপসা চোখ নিয়ে তাকায়।
কাঁপা গলায় বলে সমুদ্রনীলকে, "আমি চেক ইন করার আগে অরুনাকে নিয়ে চলে যা।"
সমুদ্রনীল উত্তর দেয়, "তুই ওকে ভালো ভাবে চিনিস, অভি। ওই বোর্ডে যতক্ষণ না লেখা ফুটবে যে আই সি 264 Departed. ততক্ষণ অরুনা এখান থেকে নড়বে না। আমি জানি না রে অভি, তুই যাবার পরে অরুনার কি হবে। ও শুচিদিকে খুব ভালবাসত রে।"
অভি, "আমাকে কথা দে, তুই ওকে দেখবি, দয়া করে ওর চোখে জল আনিস না রে। আমার হয়ে, পরীর হয়ে ওকে ভালবাসিস তুই, আমি পুবালিকে কথা দিয়েছিলাম, সেই কথা আমি ত আর রাখতে পারলাম না, তুই রাখিস।"
কোনোরকমে জোর করে অরুনাকে ছাড়িয়ে ওর হাত সমুদ্রনীলের হাতে তুলে দেয়। অরুনা কিছুতেই অভিকে ছাড়তে চায় না, প্রাণপণে জামার কলার আঁকড়ে ধরে থাকে। শেষ পর্যন্ত বহু কষ্টে বুকের পাঁজর ভেঙ্গে দিয়ে অভি পেছনে সরে আসে আর জামার একটা বোতাম ছিঁড়ে অরুনার হাতে থেকে যায়। অভি পেছনে না তাকিয়ে সোজা, চেক ইন করার দিকে হাতা দেয়।
পেছন থেকে অরুনা ডুকরে কেঁদে ওঠে, "আজ আমি আমার জীবনের সব কিছু হারিয়ে ফেলেছি অভি।"
সিকুরিটি চেক করার আগে শেষবারের মতন অরুনার জল ভরা চোখের দিকে তাকায়। চোখের মণি, প্রিয় বান্ধবী অরুন্ধতি ব্যানারজির জল ভরা চোখ ওর দিকে এক ভাবে তাকিয়ে থাকে।
প্লেন রানওয়ে দিয়ে দৌড়তে শুরু করে। অভি দাঁতে দাঁত পিষে চোখ বন্ধ করে বসে থাকে। প্লেনের ঝন ঝন আওয়াজ যেন ওর বুকের পাঁজরের ভাঙ্গা আওয়াজ মনে হয়। একটা একটা করে ভাঙ্গে ওর শরীরের হাড়। বারে বারে মাথা পেটায় সিটের পেছনে। আগে এক বার এই প্লেন অভিকে নিয়ে উড়েছিল পরীর সাথে অজানার পানে ভ্রমনে। সেই একই প্লেনে করে উড়ে ও ফিরে পেয়েছিল প্রানের বান্ধবীকে। কিন্তু সেইদিনের উড়ান বাকি দিনের উড়ানের চেয়ে অনেক অনেক আলাদা, এবারে ওকে সবকিছু ছেড়ে যেতে হবে, সাধের প্রান প্রেয়সী আর চোখের মনি দেবী অরুন্ধুতি।
শেষ পর্যন্ত প্লেনের চাকা উঠে গেল প্লেনের দেহে। অভির শরীর যেন এক বিশাল ধাক্কা খেল, যেন এক লোহার শেকল ছিঁড়ে গেছে অবশেষে। মাথার মধ্যে সেই লোহার শেকলের শত সহস্র টুকরো ছড়িয়ে পড়েছে। এতদিন যা যা প্রতিজ্ঞা করেছিল অভি, সব যেন ভেঙ্গে তছনছ হয়ে গেল প্লেনের ওড়ার সাথে সাথে।
অভি প্রতিজ্ঞা করেছিল যে ওর প্রেয়সীর জন্য একটা কুঠির বানিয়ে দেবে।
অভির সুটকেসে ভাঁজ করে রাখা প্রেয়সীর ছবি যেটা শেষ করতে পারেনি।
অভি প্রতিজ্ঞা করেছিল যে বুড়ো হলে ওরা দুজনে মিলে একসাথে বসে ওর ডায়রি পড়বে।
অভি প্রতিজ্ঞা করেছিল যে প্রেয়সীর সাথে দোলনায় বসে বিকেলের চা খাবে সেই পাহাড়ের কুঠিরের সামনে।
অভি প্রতিজ্ঞা করেছিল যে বয়স কালে ওরা কি বৃদ্ধাশ্রমে একসাথে থাকবে।
অভির সব প্রতিজ্ঞা সেইদিন ভেঙ্গে যায়।
ঝাপসা চোখের সামনে তিন খানি চেহারা ভেসে ওঠে।
পরীর জল ভরা লাল চোখ, দু গাল বেয়ে টপ টপ করে জল পড়ছে, হৃদয় ভেঙ্গে সহস্র টুকরো হয়ে ছড়িয়ে গেছে পরীর।
অরুন্ধুতির হৃদয় বিদারক কান্নার আর সেই ডাক।
মায়ের ক্রোধিত নয়ন।
.
..
...
....
.....
......
.......
.........
..........
বিদায় শুচিস্মিতা, বিদায় অরুন্ধতি, বিদায় কোলকাতা।
পরী দুঃখে ককিয়ে ওঠে, বেদনায় চিৎকার করে ওঠে গলা ফাটিয়ে, "ছোটমা, আমি মাস্টার্স করতে চাই না, আমি কিছু চাই না, শুধু অভিকে আমার কাছ থেকে দুরে সরিয়ে দিও না ছোটমা। কে কি বলে আমি তার ধার ধারিনা ছোটমা, শুধু ওকে আমার কাছ থেকে দুরে করে দিও না, ছোটমা, আমি বাঁচবও না।"
মায়ের কানে পরীর কান্না ভেজা আর্তনাদ প্রবেশ করে না, চুপ করে বসে থাকেন।
অভি মায়ের দিকে তাকিয়ে রেগে যায়, চিৎকার করে ওঠে, "তুমি তোমার আত্মসন্মান আর স্বভিমান নিয়ে সারা জীবন বেঁচে থাকলে। আমি যদি এই বাড়ি থেকে চলে যাই তাহলে আমি পরীকে সাথে নিয়ে যাবো।"
মা, "না, কারুর ক্ষমতা নেই, ওকে আমার কাছ থেকে আলাদা করে নেওয়ার। পরীর মাথায় হাত রেখে তোকে প্রতিজ্ঞা করতে হবে যে তুই কোনদিন কোলকাতা আসবি না, তুই কোনদিন ওর সামনে আসবি না।"
মায়ের আদেশ শুনে অভি পাথরের মূর্তির মতন ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে। মা ওর হাত টেনে ধরে পরীর মাথায় রাখে, অভির বুক ফেটে যায় হাতের ওপরে পরীর চুলের পরশ পেয়ে। এক ভীষণ ভুমিকম্প এসে যেন ওদের জীবন টুকরো টুকরো করে ভেঙ্গে দিয়ে চলে যায়। পরী ঠোঁট কামড়ে চোখ বন্ধ কয়রে ফেলে, মাথায় অভির হাত। মরমে যেন মরে যায় পরী।
চাপা ককিয়ে ওঠে, "না......"
মায়ের কোলে মাথা গুঁজে কেঁদে ফেলে। মা ওর দিকে তাকায় না।
মা পরীকে বলেন, "তোর মাকে আমি কথা দিয়েছিলাম, যে তোকে আমি আগলে রাখবো। আমার মান সন্মান আজ সমাজের কাঠগোরায় দাঁড়িয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আর সেই জন্যেই অভিকে বাড়ি ছাড়তে হবে, এমনকি কোলকাতা ছেড়ে চলে যেতে হবে ওকে। আমি চাই না ওর ছায়া পর্যন্ত তোর কাছে আসুক।"
মা অভির দিকে তাকিয়ে আদেশ দিলেন, "দাঁড়িয়ে আছিস কেন, নিজের ঘরে গিয়ে ব্যাগ গুছিয়ে নে। আমি তোর বাবা কে এখুনি ফোন করে কাল সকালের দিল্লীর জন্যে প্লেনের টিকিট কাটতে বলে দিচ্ছি। আর এক দিনের জন্যেও তুই এই ছাদের তলায় থাকতে পারবি না। কথা দে, আমি যত দিন না বলব, তত দিন তুই কোলকাতা আসবিনা আর আমাদের বাড়িতে ফোন করবি না। যদি আমার কথা না রাখিস তাহলে তুই পরীর মরা মুখ দেখবি।"
মায়ের কথা শুনে অভির যেন দুই পা কেউ মেঝের সাথে পেরেক দিয়ে গেঁথে দিয়েছে, নড়ার শক্তি টুকু হারিয়ে ফেলে অভি। পরী মুখ নিচু করে কাঁদে, বুকের মাঝে এক বিশাল আগ্নেয়গিরি ফেটে পড়েছে ওর। শক্ত করে হাত চেপে ধরে পরী, হাতের সরু সোনার চুড়ি বেঁকে গিয়ে কবজিতে ফুটে যায় আর রক্ত বের হতে শুরু করে, কিন্তু সেই বেদনা যে মনের বেদনার কাছে খুব কম। অভির চোখের সামনে সারা পৃথিবী বন বন করে ঘুরতে শুরু করে দেয়।
অভিকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মা চিৎকার করে ওঠেন, "দূর হয়ে যা আমার চোখের সামনে থেকে, আমি তোর মুখ দেখতে চাই না।"
কোনোরকমে টলতে টলতে অভি নিজের ঘরে ঢোকে। জানেনা, পরীর কি হবে বা বাবাকে মা কি বলবেন। বাকি সারাদিন নিজেকে নিজের ঘরে বন্ধ করে রাখে। শেষ পর্যন্ত মৈথিলীর অভিশাপের কথা মনে পরে যায়, মৈথিলী যেন ওর দিকে তাকিয়ে হেসে ওঠে, "জীবন যুদ্ধে তুমি শেষ পর্যন্ত হেরে গেলে, অভিমন্যু।"
বিকেলে বাবা ওর ঘরে আসেন। হাতে একটা খাম আর দিল্লীর টিকিট দিয়ে বলেন, "আমরা তোর বাবা মা, আমরা তোর ভালোই চাইব। যতদিন তুই চাকরি না পাস, তত দিনের জন্য আমি সুপ্রতিমের আকাউন্টে কিছু টাকা পাঠিয়ে দেব।"
বাইরে ঝমঝম করে বৃষ্টি শুরু হয়, আকাশ যেন সেদিন জলের বদলে রক্তের বৃষ্টি করে। পরীর আর অভির বুকের রক্ত যেন আকাশ কেঁদে কেঁদে জল করে সারা জায়গায় ছড়িয়ে দেয়, কিন্তু কেউ সেই কান্না শুনতে পায় না।
রাত একটা নাগাদ, জামা কাপড় পরে, ব্যাগ হাতে নিচে নেমে আসে অভি। আসার আগে নিজের ঘরে সেই ডায়রি খোঁজে, কিন্তু পায় না, ভাবে হয়ত পরীর কাছে থাকবে।
শেষ বারের মতন বাড়ি থেকে অরুনাকে ফোন করে। অরুনা অত রাতে ফোন ধরে জিজ্ঞেস করে, "কিরে, কি হয়েছে? এত রাতে ফোন করেছিস কেন?"
অভি, "আমি কোলকাতা ছেড়ে চলে যাচ্ছি, সকালের ফ্লাইট। আমার সাথে পারলে এয়ারপোর্টে দেখা করিস।"
চাপা চিৎকার করে ওঠে অরুনা, "কি হয়েছে?"
অভি, "ফোনে বলতে পারছিনা, সকালে এয়ারপোর্টে বলব।"
শেষ বারের মতন বাড়ির ফোনে কথা বলে রিসিভার রেখে দেয়।
সারা রাত বসার ঘরে চুপ করে বসে থাকে অভি। মায়ের ঘরে মা জেগে, পরীর ঘরে পরী দরজা বন্ধ করে কাঁদে। শেষ বারের মতন পরীর সাথে দেখা করার অবকাশ টুকু পায় না অভি, বুকের মাঝে হুহু করে কেঁদে ওঠে যখন পরীর বন্ধ দরজার দিকে চোখ যায়।
সকাল চারটে নাগাদ মায়ের দরজায় টোকা মারে অভি, জানায় যে এবারে ও চলে যাবে। মা কোন উত্তর দেন না। বাবা বেড়িয়ে এসে জিজ্ঞেস করেন, "প্লেন তো সাত টায়, এখুনি বের হবি কেন?"
বুকের পাঁজর ভেঙ্গে যায় অভির তাও উত্তর দেয় বাবাকে, "এই বাড়িতে আমার থাকার সময় শেষ হয়ে এসেছে।"
মাথা নিচু করে বাবার পায়ে হাত দিয়ে প্রনাম করে অভি, শেষ বারের জন্য মেঝে ছুঁয়ে মাকে শেষ প্রনাম জানায়। ব্যাগ হাতে নিয়ে বেড়িয়ে যায় দরজা দিয়ে। বাবা বাইরের গেট পর্যন্ত ওর সাথে আসেন। গেট থেকে বেড়িয়ে যাবার আগে, শেষ বারের জন্য বাড়ির দিকে তাকায় অভি। দুতলার বসার ঘরের জানালার পর্দা হালকা নড়ে ওঠে। তাকিয়ে দেখে যে পরী জল ভরা চোখে জানালার গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে। কাজল কালো চোখ দুটি রক্ত জবার মতন লাল হয়ে উঠেছে। বুক ফেটে কান্নার সুর অভির কানে এসে বাজে। পরীর বুকের পাঁজর ওর কাছ থেকে দুরে চলে যাচ্ছে, পরী বাঁচবে কি নিয়ে।
অভি নিচু হয়ে বাগানের একটু মাটি তুলে নিয়ে পরীর সেই সিল্কের রুমালে বেঁধে নেয়। ট্যাক্সি তে ওঠার আগে জানালার দিকে শেষ বারের মতন তাকায় অভি। ওর দিকে তর্জনী উঠিয়ে ইশারায় জানায় "আই", ইশারা দেখে পরী নিচের ঠোঁট কামড়ে ধরে। তারপরে তর্জনী আর বুড়ো আঙুল মেলে ধরে ইশারা করে, "এল", পরীর বুকে কেঁপে ওঠে, প্রানপন নিজেকে থামাতে চেষ্টা করে। তারাপরে অভি, মধ্যমা আর অনামিকে মেলে ধরে ওর দিকে ইশারা করে, "ইউ"
পরী জানালার গ্রিল শক্ত করে ধরে থাকে, প্রানপন চেষ্টা করে সেই লোহার গ্রিল ভেঙ্গে অভির কাছে ঝাঁপিয়ে চলে যাওয়ার, কিন্তু লোহার গ্রিল আর সমাজের কঠিন বন্ধন পরীকে ঝাঁপ দিতে দেয় না। পরী আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারেনা, সংজ্ঞা হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পরে। এক বার আগেও পরী সংজ্ঞা হারিয়ে লুটিয়ে পড়েছিল, তখন অভিকে সবাই ডেকে ছিল, কিন্তু সেই সময় আর আজকের সময় অনেক ভিন্ন। সেদিন চেয়েও অভি দৌড়ে পরীর কাছে গিয়ে ওর মাথা নিজের কোলে তুলে নিতে পারে না।
জল ভরা চোখ, ভাঙ্গা বুক নিয়ে অভি ট্যাক্সি চাপে। মনে মনে ভগবানের কাছে প্রার্থনা জানায় যে, পরীকে যেন শান্তি দেয় ওকে যেন সুখে রাখে, নিজের জীবনে ত কিছুই পেলনা শেষ পর্যন্ত। পরীর কাছে হয়ত ওর একমাত্র চিনহ স্বরুপ পর ডায়রি থেকে যাবে আর অভির কাছে ওর রুমাল, তার সাথে পরীর এক বিন্দু রক্ত ওর শিরা উপশিরায় মিশে।
21শে জুলাই, 2001, শনিবার। সকাল চারটে নাগাদ এয়ারপোর্টে পৌঁছে লক্ষ্য করে যে অরুনা আর সমুদ্রনীল উপস্থিত। অরুনা অভির কাছে দৌড়ে এসে কলার ধরে জিজ্ঞেস করে, "কি হয়েছে তোর বাড়িতে? তুই কেন কোলকাতা ছেড়ে চলে যাচ্ছিস? শুচিদির কি হবে?"
অভি, "আমি চিরদিনের জন্য কোলকাতা ছেড়ে চলে যাচ্ছি।"
চাপা চিৎকার করে ওঠে অরুনা, "কেন?"
অভি পুরো ঘটনা জানায় অরুনাকে।
সব শুনে অরুনা কেঁদে ফেলে, "আমাকে আগে কেন জানাস নি তুই?"
অভি, "কি করে জানাতাম রে। সবকিছু কেমন ঝড়ের বেগে এসে আমাদের জীবন তছনছ করে দিয়ে চলে গেল। মা জেগে বসে আমি কি করে তোকে জানাই এই সব কথা।"
অরুনা যেন বিশ্বাস করতে পারছিলনা যে অভিমন্যু কোলকাতা ছেড়ে চলে যাবে। অভির দিকে তাকিয়ে সমানে কেঁদে চলে অরুনা, পেছনে সমুদ্রনীল দাঁড়িয়ে, যেন কিছু বলার ভাষা খুঁজতে চেষ্টা করে।
অরুনা, "আমি কাকিমার সাথে কথা বলব, তুই যাস না।"
অভি, "সেই পথ বন্ধ অরুনা। মা এত খনে ভালভাবে বুঝতে পেরে গেছেন যে তুই আগে থেকে আমার আর পরীর ভালবাসার কথা জানতিস, তাই আমার মা হয়ত তোকে আমাদের বাড়ি ঢুকতে পর্যন্ত দেবে না। পরীর মাথায় হাত রেখে আমাকে প্রতিজ্ঞা করতে হয়েছে যে আমি কোনদিন পরীর সাথে দেখা করতে পারবোনা বা কোনদিন কোলকাতা ফিরতে পারবোনা। আমি মরে যাবো কিন্তু পরীর গায়ে কোন আঁচড় আসুক আমি চাই না, অরুনা।"
অরুনা অভিকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলে। বুকের জামা ভিজে যায় অরুনার চোখের জলে। অভির বুক ফেটে যায় পরীর দুঃখে আর অরুনার কান্না দেখে। দুহাতে শেষ বারের মতন অরুনাকে জড়িয়ে ধরে অভি, মাথার ওপরে ঠোঁট চেপে সমুদ্রনীলের দিকে ঝাপসা চোখ নিয়ে তাকায়।
কাঁপা গলায় বলে সমুদ্রনীলকে, "আমি চেক ইন করার আগে অরুনাকে নিয়ে চলে যা।"
সমুদ্রনীল উত্তর দেয়, "তুই ওকে ভালো ভাবে চিনিস, অভি। ওই বোর্ডে যতক্ষণ না লেখা ফুটবে যে আই সি 264 Departed. ততক্ষণ অরুনা এখান থেকে নড়বে না। আমি জানি না রে অভি, তুই যাবার পরে অরুনার কি হবে। ও শুচিদিকে খুব ভালবাসত রে।"
অভি, "আমাকে কথা দে, তুই ওকে দেখবি, দয়া করে ওর চোখে জল আনিস না রে। আমার হয়ে, পরীর হয়ে ওকে ভালবাসিস তুই, আমি পুবালিকে কথা দিয়েছিলাম, সেই কথা আমি ত আর রাখতে পারলাম না, তুই রাখিস।"
কোনোরকমে জোর করে অরুনাকে ছাড়িয়ে ওর হাত সমুদ্রনীলের হাতে তুলে দেয়। অরুনা কিছুতেই অভিকে ছাড়তে চায় না, প্রাণপণে জামার কলার আঁকড়ে ধরে থাকে। শেষ পর্যন্ত বহু কষ্টে বুকের পাঁজর ভেঙ্গে দিয়ে অভি পেছনে সরে আসে আর জামার একটা বোতাম ছিঁড়ে অরুনার হাতে থেকে যায়। অভি পেছনে না তাকিয়ে সোজা, চেক ইন করার দিকে হাতা দেয়।
পেছন থেকে অরুনা ডুকরে কেঁদে ওঠে, "আজ আমি আমার জীবনের সব কিছু হারিয়ে ফেলেছি অভি।"
সিকুরিটি চেক করার আগে শেষবারের মতন অরুনার জল ভরা চোখের দিকে তাকায়। চোখের মণি, প্রিয় বান্ধবী অরুন্ধতি ব্যানারজির জল ভরা চোখ ওর দিকে এক ভাবে তাকিয়ে থাকে।
প্লেন রানওয়ে দিয়ে দৌড়তে শুরু করে। অভি দাঁতে দাঁত পিষে চোখ বন্ধ করে বসে থাকে। প্লেনের ঝন ঝন আওয়াজ যেন ওর বুকের পাঁজরের ভাঙ্গা আওয়াজ মনে হয়। একটা একটা করে ভাঙ্গে ওর শরীরের হাড়। বারে বারে মাথা পেটায় সিটের পেছনে। আগে এক বার এই প্লেন অভিকে নিয়ে উড়েছিল পরীর সাথে অজানার পানে ভ্রমনে। সেই একই প্লেনে করে উড়ে ও ফিরে পেয়েছিল প্রানের বান্ধবীকে। কিন্তু সেইদিনের উড়ান বাকি দিনের উড়ানের চেয়ে অনেক অনেক আলাদা, এবারে ওকে সবকিছু ছেড়ে যেতে হবে, সাধের প্রান প্রেয়সী আর চোখের মনি দেবী অরুন্ধুতি।
শেষ পর্যন্ত প্লেনের চাকা উঠে গেল প্লেনের দেহে। অভির শরীর যেন এক বিশাল ধাক্কা খেল, যেন এক লোহার শেকল ছিঁড়ে গেছে অবশেষে। মাথার মধ্যে সেই লোহার শেকলের শত সহস্র টুকরো ছড়িয়ে পড়েছে। এতদিন যা যা প্রতিজ্ঞা করেছিল অভি, সব যেন ভেঙ্গে তছনছ হয়ে গেল প্লেনের ওড়ার সাথে সাথে।
অভি প্রতিজ্ঞা করেছিল যে ওর প্রেয়সীর জন্য একটা কুঠির বানিয়ে দেবে।
অভির সুটকেসে ভাঁজ করে রাখা প্রেয়সীর ছবি যেটা শেষ করতে পারেনি।
অভি প্রতিজ্ঞা করেছিল যে বুড়ো হলে ওরা দুজনে মিলে একসাথে বসে ওর ডায়রি পড়বে।
অভি প্রতিজ্ঞা করেছিল যে প্রেয়সীর সাথে দোলনায় বসে বিকেলের চা খাবে সেই পাহাড়ের কুঠিরের সামনে।
অভি প্রতিজ্ঞা করেছিল যে বয়স কালে ওরা কি বৃদ্ধাশ্রমে একসাথে থাকবে।
অভির সব প্রতিজ্ঞা সেইদিন ভেঙ্গে যায়।
ঝাপসা চোখের সামনে তিন খানি চেহারা ভেসে ওঠে।
পরীর জল ভরা লাল চোখ, দু গাল বেয়ে টপ টপ করে জল পড়ছে, হৃদয় ভেঙ্গে সহস্র টুকরো হয়ে ছড়িয়ে গেছে পরীর।
অরুন্ধুতির হৃদয় বিদারক কান্নার আর সেই ডাক।
মায়ের ক্রোধিত নয়ন।
.
..
...
....
.....
......
.......
.........
..........
বিদায় শুচিস্মিতা, বিদায় অরুন্ধতি, বিদায় কোলকাতা।
পরী দুঃখে ককিয়ে ওঠে, বেদনায় চিৎকার করে ওঠে গলা ফাটিয়ে, "ছোটমা, আমি মাস্টার্স করতে চাই না, আমি কিছু চাই না, শুধু অভিকে আমার কাছ থেকে দুরে সরিয়ে দিও না ছোটমা। কে কি বলে আমি তার ধার ধারিনা ছোটমা, শুধু ওকে আমার কাছ থেকে দুরে করে দিও না, ছোটমা, আমি বাঁচবও না।"
মায়ের কানে পরীর কান্না ভেজা আর্তনাদ প্রবেশ করে না, চুপ করে বসে থাকেন।
অভি মায়ের দিকে তাকিয়ে রেগে যায়, চিৎকার করে ওঠে, "তুমি তোমার আত্মসন্মান আর স্বভিমান নিয়ে সারা জীবন বেঁচে থাকলে। আমি যদি এই বাড়ি থেকে চলে যাই তাহলে আমি পরীকে সাথে নিয়ে যাবো।"
মা, "না, কারুর ক্ষমতা নেই, ওকে আমার কাছ থেকে আলাদা করে নেওয়ার। পরীর মাথায় হাত রেখে তোকে প্রতিজ্ঞা করতে হবে যে তুই কোনদিন কোলকাতা আসবি না, তুই কোনদিন ওর সামনে আসবি না।"
মায়ের আদেশ শুনে অভি পাথরের মূর্তির মতন ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে। মা ওর হাত টেনে ধরে পরীর মাথায় রাখে, অভির বুক ফেটে যায় হাতের ওপরে পরীর চুলের পরশ পেয়ে। এক ভীষণ ভুমিকম্প এসে যেন ওদের জীবন টুকরো টুকরো করে ভেঙ্গে দিয়ে চলে যায়। পরী ঠোঁট কামড়ে চোখ বন্ধ কয়রে ফেলে, মাথায় অভির হাত। মরমে যেন মরে যায় পরী।
চাপা ককিয়ে ওঠে, "না......"
মায়ের কোলে মাথা গুঁজে কেঁদে ফেলে। মা ওর দিকে তাকায় না।
মা পরীকে বলেন, "তোর মাকে আমি কথা দিয়েছিলাম, যে তোকে আমি আগলে রাখবো। আমার মান সন্মান আজ সমাজের কাঠগোরায় দাঁড়িয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আর সেই জন্যেই অভিকে বাড়ি ছাড়তে হবে, এমনকি কোলকাতা ছেড়ে চলে যেতে হবে ওকে। আমি চাই না ওর ছায়া পর্যন্ত তোর কাছে আসুক।"
মা অভির দিকে তাকিয়ে আদেশ দিলেন, "দাঁড়িয়ে আছিস কেন, নিজের ঘরে গিয়ে ব্যাগ গুছিয়ে নে। আমি তোর বাবা কে এখুনি ফোন করে কাল সকালের দিল্লীর জন্যে প্লেনের টিকিট কাটতে বলে দিচ্ছি। আর এক দিনের জন্যেও তুই এই ছাদের তলায় থাকতে পারবি না। কথা দে, আমি যত দিন না বলব, তত দিন তুই কোলকাতা আসবিনা আর আমাদের বাড়িতে ফোন করবি না। যদি আমার কথা না রাখিস তাহলে তুই পরীর মরা মুখ দেখবি।"
মায়ের কথা শুনে অভির যেন দুই পা কেউ মেঝের সাথে পেরেক দিয়ে গেঁথে দিয়েছে, নড়ার শক্তি টুকু হারিয়ে ফেলে অভি। পরী মুখ নিচু করে কাঁদে, বুকের মাঝে এক বিশাল আগ্নেয়গিরি ফেটে পড়েছে ওর। শক্ত করে হাত চেপে ধরে পরী, হাতের সরু সোনার চুড়ি বেঁকে গিয়ে কবজিতে ফুটে যায় আর রক্ত বের হতে শুরু করে, কিন্তু সেই বেদনা যে মনের বেদনার কাছে খুব কম। অভির চোখের সামনে সারা পৃথিবী বন বন করে ঘুরতে শুরু করে দেয়।
অভিকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মা চিৎকার করে ওঠেন, "দূর হয়ে যা আমার চোখের সামনে থেকে, আমি তোর মুখ দেখতে চাই না।"
কোনোরকমে টলতে টলতে অভি নিজের ঘরে ঢোকে। জানেনা, পরীর কি হবে বা বাবাকে মা কি বলবেন। বাকি সারাদিন নিজেকে নিজের ঘরে বন্ধ করে রাখে। শেষ পর্যন্ত মৈথিলীর অভিশাপের কথা মনে পরে যায়, মৈথিলী যেন ওর দিকে তাকিয়ে হেসে ওঠে, "জীবন যুদ্ধে তুমি শেষ পর্যন্ত হেরে গেলে, অভিমন্যু।"
বিকেলে বাবা ওর ঘরে আসেন। হাতে একটা খাম আর দিল্লীর টিকিট দিয়ে বলেন, "আমরা তোর বাবা মা, আমরা তোর ভালোই চাইব। যতদিন তুই চাকরি না পাস, তত দিনের জন্য আমি সুপ্রতিমের আকাউন্টে কিছু টাকা পাঠিয়ে দেব।"
বাইরে ঝমঝম করে বৃষ্টি শুরু হয়, আকাশ যেন সেদিন জলের বদলে রক্তের বৃষ্টি করে। পরীর আর অভির বুকের রক্ত যেন আকাশ কেঁদে কেঁদে জল করে সারা জায়গায় ছড়িয়ে দেয়, কিন্তু কেউ সেই কান্না শুনতে পায় না।
রাত একটা নাগাদ, জামা কাপড় পরে, ব্যাগ হাতে নিচে নেমে আসে অভি। আসার আগে নিজের ঘরে সেই ডায়রি খোঁজে, কিন্তু পায় না, ভাবে হয়ত পরীর কাছে থাকবে।
শেষ বারের মতন বাড়ি থেকে অরুনাকে ফোন করে। অরুনা অত রাতে ফোন ধরে জিজ্ঞেস করে, "কিরে, কি হয়েছে? এত রাতে ফোন করেছিস কেন?"
অভি, "আমি কোলকাতা ছেড়ে চলে যাচ্ছি, সকালের ফ্লাইট। আমার সাথে পারলে এয়ারপোর্টে দেখা করিস।"
চাপা চিৎকার করে ওঠে অরুনা, "কি হয়েছে?"
অভি, "ফোনে বলতে পারছিনা, সকালে এয়ারপোর্টে বলব।"
শেষ বারের মতন বাড়ির ফোনে কথা বলে রিসিভার রেখে দেয়।
সারা রাত বসার ঘরে চুপ করে বসে থাকে অভি। মায়ের ঘরে মা জেগে, পরীর ঘরে পরী দরজা বন্ধ করে কাঁদে। শেষ বারের মতন পরীর সাথে দেখা করার অবকাশ টুকু পায় না অভি, বুকের মাঝে হুহু করে কেঁদে ওঠে যখন পরীর বন্ধ দরজার দিকে চোখ যায়।
সকাল চারটে নাগাদ মায়ের দরজায় টোকা মারে অভি, জানায় যে এবারে ও চলে যাবে। মা কোন উত্তর দেন না। বাবা বেড়িয়ে এসে জিজ্ঞেস করেন, "প্লেন তো সাত টায়, এখুনি বের হবি কেন?"
বুকের পাঁজর ভেঙ্গে যায় অভির তাও উত্তর দেয় বাবাকে, "এই বাড়িতে আমার থাকার সময় শেষ হয়ে এসেছে।"
মাথা নিচু করে বাবার পায়ে হাত দিয়ে প্রনাম করে অভি, শেষ বারের জন্য মেঝে ছুঁয়ে মাকে শেষ প্রনাম জানায়। ব্যাগ হাতে নিয়ে বেড়িয়ে যায় দরজা দিয়ে। বাবা বাইরের গেট পর্যন্ত ওর সাথে আসেন। গেট থেকে বেড়িয়ে যাবার আগে, শেষ বারের জন্য বাড়ির দিকে তাকায় অভি। দুতলার বসার ঘরের জানালার পর্দা হালকা নড়ে ওঠে। তাকিয়ে দেখে যে পরী জল ভরা চোখে জানালার গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে। কাজল কালো চোখ দুটি রক্ত জবার মতন লাল হয়ে উঠেছে। বুক ফেটে কান্নার সুর অভির কানে এসে বাজে। পরীর বুকের পাঁজর ওর কাছ থেকে দুরে চলে যাচ্ছে, পরী বাঁচবে কি নিয়ে।
অভি নিচু হয়ে বাগানের একটু মাটি তুলে নিয়ে পরীর সেই সিল্কের রুমালে বেঁধে নেয়। ট্যাক্সি তে ওঠার আগে জানালার দিকে শেষ বারের মতন তাকায় অভি। ওর দিকে তর্জনী উঠিয়ে ইশারায় জানায় "আই", ইশারা দেখে পরী নিচের ঠোঁট কামড়ে ধরে। তারপরে তর্জনী আর বুড়ো আঙুল মেলে ধরে ইশারা করে, "এল", পরীর বুকে কেঁপে ওঠে, প্রানপন নিজেকে থামাতে চেষ্টা করে। তারাপরে অভি, মধ্যমা আর অনামিকে মেলে ধরে ওর দিকে ইশারা করে, "ইউ"
পরী জানালার গ্রিল শক্ত করে ধরে থাকে, প্রানপন চেষ্টা করে সেই লোহার গ্রিল ভেঙ্গে অভির কাছে ঝাঁপিয়ে চলে যাওয়ার, কিন্তু লোহার গ্রিল আর সমাজের কঠিন বন্ধন পরীকে ঝাঁপ দিতে দেয় না। পরী আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারেনা, সংজ্ঞা হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পরে। এক বার আগেও পরী সংজ্ঞা হারিয়ে লুটিয়ে পড়েছিল, তখন অভিকে সবাই ডেকে ছিল, কিন্তু সেই সময় আর আজকের সময় অনেক ভিন্ন। সেদিন চেয়েও অভি দৌড়ে পরীর কাছে গিয়ে ওর মাথা নিজের কোলে তুলে নিতে পারে না।
জল ভরা চোখ, ভাঙ্গা বুক নিয়ে অভি ট্যাক্সি চাপে। মনে মনে ভগবানের কাছে প্রার্থনা জানায় যে, পরীকে যেন শান্তি দেয় ওকে যেন সুখে রাখে, নিজের জীবনে ত কিছুই পেলনা শেষ পর্যন্ত। পরীর কাছে হয়ত ওর একমাত্র চিনহ স্বরুপ পর ডায়রি থেকে যাবে আর অভির কাছে ওর রুমাল, তার সাথে পরীর এক বিন্দু রক্ত ওর শিরা উপশিরায় মিশে।
21শে জুলাই, 2001, শনিবার। সকাল চারটে নাগাদ এয়ারপোর্টে পৌঁছে লক্ষ্য করে যে অরুনা আর সমুদ্রনীল উপস্থিত। অরুনা অভির কাছে দৌড়ে এসে কলার ধরে জিজ্ঞেস করে, "কি হয়েছে তোর বাড়িতে? তুই কেন কোলকাতা ছেড়ে চলে যাচ্ছিস? শুচিদির কি হবে?"
অভি, "আমি চিরদিনের জন্য কোলকাতা ছেড়ে চলে যাচ্ছি।"
চাপা চিৎকার করে ওঠে অরুনা, "কেন?"
অভি পুরো ঘটনা জানায় অরুনাকে।
সব শুনে অরুনা কেঁদে ফেলে, "আমাকে আগে কেন জানাস নি তুই?"
অভি, "কি করে জানাতাম রে। সবকিছু কেমন ঝড়ের বেগে এসে আমাদের জীবন তছনছ করে দিয়ে চলে গেল। মা জেগে বসে আমি কি করে তোকে জানাই এই সব কথা।"
অরুনা যেন বিশ্বাস করতে পারছিলনা যে অভিমন্যু কোলকাতা ছেড়ে চলে যাবে। অভির দিকে তাকিয়ে সমানে কেঁদে চলে অরুনা, পেছনে সমুদ্রনীল দাঁড়িয়ে, যেন কিছু বলার ভাষা খুঁজতে চেষ্টা করে।
অরুনা, "আমি কাকিমার সাথে কথা বলব, তুই যাস না।"
অভি, "সেই পথ বন্ধ অরুনা। মা এত খনে ভালভাবে বুঝতে পেরে গেছেন যে তুই আগে থেকে আমার আর পরীর ভালবাসার কথা জানতিস, তাই আমার মা হয়ত তোকে আমাদের বাড়ি ঢুকতে পর্যন্ত দেবে না। পরীর মাথায় হাত রেখে আমাকে প্রতিজ্ঞা করতে হয়েছে যে আমি কোনদিন পরীর সাথে দেখা করতে পারবোনা বা কোনদিন কোলকাতা ফিরতে পারবোনা। আমি মরে যাবো কিন্তু পরীর গায়ে কোন আঁচড় আসুক আমি চাই না, অরুনা।"
অরুনা অভিকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলে। বুকের জামা ভিজে যায় অরুনার চোখের জলে। অভির বুক ফেটে যায় পরীর দুঃখে আর অরুনার কান্না দেখে। দুহাতে শেষ বারের মতন অরুনাকে জড়িয়ে ধরে অভি, মাথার ওপরে ঠোঁট চেপে সমুদ্রনীলের দিকে ঝাপসা চোখ নিয়ে তাকায়।
কাঁপা গলায় বলে সমুদ্রনীলকে, "আমি চেক ইন করার আগে অরুনাকে নিয়ে চলে যা।"
সমুদ্রনীল উত্তর দেয়, "তুই ওকে ভালো ভাবে চিনিস, অভি। ওই বোর্ডে যতক্ষণ না লেখা ফুটবে যে আই সি 264 Departed. ততক্ষণ অরুনা এখান থেকে নড়বে না। আমি জানি না রে অভি, তুই যাবার পরে অরুনার কি হবে। ও শুচিদিকে খুব ভালবাসত রে।"
অভি, "আমাকে কথা দে, তুই ওকে দেখবি, দয়া করে ওর চোখে জল আনিস না রে। আমার হয়ে, পরীর হয়ে ওকে ভালবাসিস তুই, আমি পুবালিকে কথা দিয়েছিলাম, সেই কথা আমি ত আর রাখতে পারলাম না, তুই রাখিস।"
কোনোরকমে জোর করে অরুনাকে ছাড়িয়ে ওর হাত সমুদ্রনীলের হাতে তুলে দেয়। অরুনা কিছুতেই অভিকে ছাড়তে চায় না, প্রাণপণে জামার কলার আঁকড়ে ধরে থাকে। শেষ পর্যন্ত বহু কষ্টে বুকের পাঁজর ভেঙ্গে দিয়ে অভি পেছনে সরে আসে আর জামার একটা বোতাম ছিঁড়ে অরুনার হাতে থেকে যায়। অভি পেছনে না তাকিয়ে সোজা, চেক ইন করার দিকে হাতা দেয়।
পেছন থেকে অরুনা ডুকরে কেঁদে ওঠে, "আজ আমি আমার জীবনের সব কিছু হারিয়ে ফেলেছি অভি।"
সিকুরিটি চেক করার আগে শেষবারের মতন অরুনার জল ভরা চোখের দিকে তাকায়। চোখের মণি, প্রিয় বান্ধবী অরুন্ধতি ব্যানারজির জল ভরা চোখ ওর দিকে এক ভাবে তাকিয়ে থাকে।
প্লেন রানওয়ে দিয়ে দৌড়তে শুরু করে। অভি দাঁতে দাঁত পিষে চোখ বন্ধ করে বসে থাকে। প্লেনের ঝন ঝন আওয়াজ যেন ওর বুকের পাঁজরের ভাঙ্গা আওয়াজ মনে হয়। একটা একটা করে ভাঙ্গে ওর শরীরের হাড়। বারে বারে মাথা পেটায় সিটের পেছনে। আগে এক বার এই প্লেন অভিকে নিয়ে উড়েছিল পরীর সাথে অজানার পানে ভ্রমনে। সেই একই প্লেনে করে উড়ে ও ফিরে পেয়েছিল প্রানের বান্ধবীকে। কিন্তু সেইদিনের উড়ান বাকি দিনের উড়ানের চেয়ে অনেক অনেক আলাদা, এবারে ওকে সবকিছু ছেড়ে যেতে হবে, সাধের প্রান প্রেয়সী আর চোখের মনি দেবী অরুন্ধুতি।
শেষ পর্যন্ত প্লেনের চাকা উঠে গেল প্লেনের দেহে। অভির শরীর যেন এক বিশাল ধাক্কা খেল, যেন এক লোহার শেকল ছিঁড়ে গেছে অবশেষে। মাথার মধ্যে সেই লোহার শেকলের শত সহস্র টুকরো ছড়িয়ে পড়েছে। এতদিন যা যা প্রতিজ্ঞা করেছিল অভি, সব যেন ভেঙ্গে তছনছ হয়ে গেল প্লেনের ওড়ার সাথে সাথে।
অভি প্রতিজ্ঞা করেছিল যে ওর প্রেয়সীর জন্য একটা কুঠির বানিয়ে দেবে।
অভির সুটকেসে ভাঁজ করে রাখা প্রেয়সীর ছবি যেটা শেষ করতে পারেনি।
অভি প্রতিজ্ঞা করেছিল যে বুড়ো হলে ওরা দুজনে মিলে একসাথে বসে ওর ডায়রি পড়বে।
অভি প্রতিজ্ঞা করেছিল যে প্রেয়সীর সাথে দোলনায় বসে বিকেলের চা খাবে সেই পাহাড়ের কুঠিরের সামনে।
অভি প্রতিজ্ঞা করেছিল যে বয়স কালে ওরা কি বৃদ্ধাশ্রমে একসাথে থাকবে।
অভির সব প্রতিজ্ঞা সেইদিন ভেঙ্গে যায়।
ঝাপসা চোখের সামনে তিন খানি চেহারা ভেসে ওঠে।
পরীর জল ভরা লাল চোখ, দু গাল বেয়ে টপ টপ করে জল পড়ছে, হৃদয় ভেঙ্গে সহস্র টুকরো হয়ে ছড়িয়ে গেছে পরীর।
অরুন্ধুতির হৃদয় বিদারক কান্নার আর সেই ডাক।
মায়ের ক্রোধিত নয়ন।
.
..
...
....
.....
......
.......
.........
..........
বিদায় শুচিস্মিতা, বিদায় অরুন্ধতি, বিদায় কোলকাতা।