02-07-2020, 08:41 PM
## ৩
সুলগ্না বৌদি চলে যাবার পর মানসী একদম ভেঙ্গে পড়ে। ও ওর বড়দাকে একদম সহ্য করতে পারে না। কোন মানুষ সে বন্ধুই হোক বা শত্রু, এইভাবে হটাত করে একদিনের মধ্যে চলে যেতে পারে এটা ও ভাবতেই পারেনি। ওর সব সময়েই মনে হতে থাকে ওর বৌদি সাথেই আছে। ও জানত ওর বৌদির মাঝে মাঝেই এইরকম জ্বর হত আর বড়দা প্যারাসিটামল খাইয়ে দিতেন। কোনদিন কোন ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাননি। শুরু থেকে যদি চিকিৎসা হত তবে নিশ্চয় বৌদি এতো তাড়াতাড়ি চলে যেতেন না।
বৌদির শেষ কাজ মিটে যাবার পরেও সাড়া বাড়ি থমথম। সবাই চুপ চাপ, বেঁচে থাকতে হয় তাই বেঁচে থাকা। হতে পারে বাড়ির সবাই স্বার্থপর। হতে পারে সবাই শুধু নিজের টুকুই বুঝত, সব বিষয়েই একে অন্যের সাথে মতবিরোধ বা তর্ক করত। কিন্তু একজায়গায় সবাই এক মত ছিল। সুলগ্না সবাইকে ভালোবাসতো আর সবাই সুলগ্নাকে চাইত। সংসারে এই রকম চরিত্র বড় বিরল। কিন্তু আজকাল আমার মনে হয় স্বর্গে ভগবানের কাছে ভাল লোক কম পড়ে গেছে। তাই আমাদের মধ্যে থেকে ভাল মানুষদেরই ভগবান তাড়াতাড়ি নিজের কাছে ডেকে নেন। সবাই কোন রকমে খায়। মাছ মাংস খাওয়া ভুলেই গেছে। কোনোরকমে ডাল ভাত দিয়ে খাওয়া সারে। অফিসে বা ব্যবসায় যেতে হয় তাই যাওয়া।
তবু জীবন থেমে থাকবে না। মানসীর কাছে প্রধান দায়িত্ব আসে বৌদির মেয়ে সৃজা কে মানুষ করা। সৃজা তখন ক্লাস থ্রি তে পড়ে। ও সৃজার সব কিছু নিজের কাঁধে তুলে নেয়। সকালে উঠে আগে সৃজাকে রেডি করে, ওর টিফিন বানিয়ে, কলেজে পাঠায়। তারপর নিজে কলেজে যায়। সৃজা কলেজ ছুটির পরে টিচার্স রুমে বসে থাকে। মানসী কলেজ থেকে ফেরার সময় ওকে নিয়ে ফেরে। আগে সুলগ্না নিয়ে আসতো। রাত্রেও সৃজা ওর রাঙ্গাপির কাছে ঘুমায়।
প্রায় মাস খানেক পড়ে একদিন সৃজা বলে – রাঙ্গাপি আমরা আর মাছ খাব না ?
তখন সবার খেয়াল হয় ওরা নিজের দুঃখে বাচ্চা মেয়েটাকেও কষ্ট দিচ্ছে!
এরমধ্যে স্বপন অনেকদিন কলকাতায় আসেনি। ও অফিসের ট্রেনিঙে এক মাসের বেশী দিল্লিতে ছিল। দিল্লি থেকে ও নিহারিকার সাথে ফোনে কথা বলেছিল, কিন্তু নিহারিকা ফোনে সুলগ্না বৌদিকে নিয়ে কিছু বলেনি। যেদিন স্বপন কলকাতা আসে আর নিহারিকার সাথে দেখা করে, সব কিছু জানতে পারে। স্বপন গলা ছেড়ে কাঁদতেও পারেনা, চোখের জলও আটকে রাখতে পারে না। নিঃশব্দে চোখের জল ফেলে। চোখ মুছে উঠে বলে মানসীদের বাড়ি যাবে। নিহারিকার মা বলেন একটু চা জল খেয়ে যেতে। কিন্তু স্বপন সেসব শোনে না। বাড়ি থেকে বেড়িয়ে যায়। পেছন পেছন নিহারিকাও যায়। একটা ট্যাক্সি নিয়ে মানসীদের বাড়ি পৌঁছায়।
সৃজা ওকে দেখেই এসে ওর হাত ধরে। ও তখন থেকেই স্বপন কে পিসে বলে ডাকতো। স্বপন আর নিহারিকা ঘরে ঢোকে। সুলগ্না বৌদির মালা দেওয়া ছবির সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। প্রনাম করতেও পারে না। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে টলতে শুরু করে। মানসী গিয়ে স্বপনকে ধরে পাশে সোফাতে বসিয়ে দেয়।
সৃজা – জানো পিসে মা আমাদের ছেড়ে চলে গেছে, আর আসবে না। আমি রাত্রে হাসপাতালে গিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিলাম কিন্তু তার পরদিন আর ঘুম থেকেই উঠল না।
মানসী এসে সৃজাকে কোলে তুলে নেয় আর চুপ করতে বলে।
সৃজা – তোমরা বাড়ীতে কিছু খারাপ হলেই বা কারো কিছু হলেই পিসে কে বল আর পিসে ঠিক করে দেয়। তাই আমি আমার কথা পিসেকে বলছি। পিসে ঠিক মাকে নিয়ে আসবে।
স্বপন আর বসে থাকতে পারে না। ও সৃজা আর মানসীকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলে।
প্রকৃতির কালবৈশাখী একরাত্রি থাকে আর তার ক্ষত থাকে পরের সাত দিন। জীবনের কালবৈশাখীও এক রাতের জন্যই আসে কিন্তু তার ক্ষত আর একটু বেশী সময় ব্যাথা দেয়। কিন্তু কিন্তু একসময় কালবৈশাখীর মেঘ কেটে গিয়ে সূর্য উঠে আসে।
মানসীদের বাড়ীতে সেই সূর্য ওঠে নিহারিকার বিয়েতে। স্বপন আর নিহারিকার বিয়ের দিন সুলগ্নার মৃত্যুর আগেই ঠিক হয়ে গিয়েছিলো। স্বপনের বিয়ে ঠিক ছিল ১৯৮৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে। সুলগ্না বৌদি মারা যাবার পাঁচ মাস পড়ে। স্বপন চাইছিল না বৌদি মারা যাবার এক বছর না হতেই বিয়ে করতে। কিন্তু স্বপনের ওই সিদ্ধান্তে প্রথম আপত্তি জানায় মানসী আর বড়দা।
মানসী – তোমাদের বিয়ে পিছিয়ে দেবার কোনই কারন নেই।
বড়দা – আমাদের শাস্ত্রের নিয়মে এক বছরের মধ্যে আমাদের বাড়ীতে কোন বিবাহ নিষিদ্ধ। কিন্তু তোমার বা নিহারিকার বাড়ীতে সে বাধা নিসেধ নেই।
স্বপন – সুলগ্না বৌদিকে আমি আমার নিজের বৌদি বলেই মানি।
বড়দা – সে আমি বুঝি। কিন্তু তাও আমি বলব তোমরা তোমাদের বিয়ে পিছিয়ে দিও না।
ওনারা তখনও স্বপনকে ঠিক জানত না বা পুরো বিশ্বাস করত না। ওনাদের চিন্তা ছিল স্বপন বাইরে থাকে, কোনদিন যদি অন্য কোন মেয়ে দেখে ওদের নিহারিকাকে বিয়ে করতে না চায়। তাই ওনারা চাইতেন যত তাড়াতাড়ি হোক বিয়েটা দিয়ে দেবার।
মানসী নিজেও জানত না ও কেন চাইছিল না বিয়েটা পিছিয়ে দিতে।
আর স্বপনের পক্ষেও ওর বাড়ীতে এই কারন বোঝানো খুব কঠিন ছিল। নিহারিকার বাড়ি থেকেও বিয়ে পেছোতে চাইল না। তাই ওদের বিয়ে প্ল্যান হিসাবেই হয়ে যায়। সে সময় সবাই দুঃখ ভুলে গিয়ে হাসতে শুরু করে।
বিয়ের সাত দিন আগে স্বপন আর নিহারিকা দক্ষিণেশ্বর যায়। দুজনেরই মনে পড়ে এর আগের বার সুলগ্না বৌদি সাথে ছিল। স্বপনরা পৌঁছানোর একটু পরেই মানসী আর কস্তূরী পৌঁছায়। কস্তূরীর সাথে ওর বয় ফ্রেন্ডও ছিল। ও বলতে ভুলে গেছি এর মধ্যে কস্তূরী মনের মানুষ খুঁজে পেয়ে গিয়েছিলো। স্বপন আলাপ করে ছেলেটার সাথে। বেশ ভালই লাগে। পুজা দেবার পড়ে কস্তূরীকে আলাদা পেয়ে স্বপন জিজ্ঞাসা করে।
স্বপন – কিরে এই ছেলেটা তোর কোন দিকে তাকায় ?
কস্তূরী – মানে ?
স্বপন – মানে ও তোর মুখ দেখে না বুক দেখে ?
কস্তূরী – আগে মুখ দেখে, তার পর হয়তো একটু বুকের দিকে তাকায়।
স্বপন – তুই সামনে ঝুঁকে পরলে ও কি করে ?
কস্তূরী – ও ভাবে আমি পড়ে যাচ্ছি তাই আমাকে হাত ধরে তুলে ধরে।
স্বপন – খুব ভাল, সত্যি খুব ভাল।
মানসী একসময় স্বপনকে বলে যে ওই ছেলেটা কস্তূরীর বাবার পয়সা দেখে কস্তূরীকে পছন্দ করেছে। স্বপন বলে প্রায় সব ছেলেরই একটা না একটা দিকে দুর্বলতা থাকে। এই ছেলেটার নারীর থেকে নারীর বাড়ি বেশী পছন্দ। তাতে কি আর করা যাবে। হয়তো কস্তূরীও এইরকমই চায়।
মানসী – সবাই কি আর স্বপন কে পায় !
সবাই মোটামুটি হৈচৈ করেই সময় কাটায়। স্বপন একটা জিনিস লক্ষ্য করে যে ও মানসীর হাত ধরলে বা জড়িয়ে ধরলে মানসী আর নিস্তেজ হয়ে যায় না।
স্বপন আর নিহারিকার বিয়ের পড়ে বৌভাতে সবাই মিলে স্বপনের গ্রামের বাড়ীতে যায়। কস্তূরীও গিয়েছিলো। মানসীরা যাবার আগে স্বপন আর নিহারিকার সাথে দেখা করতে যায়।
সৃজা – পিসে সবাই বলছে আজকে তুমি আমার সত্যি সত্যি পিসে হলে। তবে আগে তুমি কি ছিলে ?
স্বপন – আমি আগেও তোমার পিসে ছিলাম, আজকেও তোমার পিসেই আছি।
সৃজা – তবে বিয়ে করলে কি হল
স্বপন – আগে তোর পিসি আমার বৌ ছিল না, আজ থেকে আমার বৌ হল
সৃজা – খুব ভাল।
কে জানে সৃজা কি ভাল বুঝেছিল।
কস্তূরী – নেহা শোন আজ সব শিখে নিবি, আর কিছুদিন পরেই আমার বিয়ে। আমাকে সব বলবি।
নিহারিকা – আমি পারবো না, ওইসব বলতে। তোর স্বপন দাকে জিজ্ঞাসা করবি।
স্বপন – হ্যাঁ হ্যাঁ ঠিক আছে, আমি তো আছি, তোমাকে শিখিয়ে দেব।
নিহারিকা – না তোমাকে আর শেখাতে হবে না। ও নিজে নিজেই শিখে যাবে।
মানসী – কস্তূরীর দুষ্টু বুদ্ধি আর গেল না।
স্বপন – দেখো রাঙা দিদি আমি আগে নিহারিকাকে চুমু খেয়েছিলাম তার পর তোমাকে চুমু খেয়েছিলাম।
মানসী – তাতে কি হল ?
স্বপন – আজ আমি নিহারিকার সাথে যা যা করবো, কাল তোমার সাথে ঠিক তাই করবো।
নিহারিকা – আমার কোন আপত্তি নেই তাতে
মানসী – ইঃ খায় কত। তোমার সাথে ওইসব করতে আমার বয়েই গেছে।
মানসী মুখে এই কথা বললেও মনে মনে ভাবে হলে খুব একটা খারাপ হবে না।
স্বপন আর নিহারিকা বিয়ের পরে রাঁচি চলে যায়। ওদের জীবনের কথা কখনও অন্য গল্পে শোনাবো। এই কাহিনী মানসীকে নিয়ে তাই আমরা মানসীকে দেখি ও কি করছে।
তৃতীয় পরিচ্ছদ সমাপ্ত
সুলগ্না বৌদি চলে যাবার পর মানসী একদম ভেঙ্গে পড়ে। ও ওর বড়দাকে একদম সহ্য করতে পারে না। কোন মানুষ সে বন্ধুই হোক বা শত্রু, এইভাবে হটাত করে একদিনের মধ্যে চলে যেতে পারে এটা ও ভাবতেই পারেনি। ওর সব সময়েই মনে হতে থাকে ওর বৌদি সাথেই আছে। ও জানত ওর বৌদির মাঝে মাঝেই এইরকম জ্বর হত আর বড়দা প্যারাসিটামল খাইয়ে দিতেন। কোনদিন কোন ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাননি। শুরু থেকে যদি চিকিৎসা হত তবে নিশ্চয় বৌদি এতো তাড়াতাড়ি চলে যেতেন না।
বৌদির শেষ কাজ মিটে যাবার পরেও সাড়া বাড়ি থমথম। সবাই চুপ চাপ, বেঁচে থাকতে হয় তাই বেঁচে থাকা। হতে পারে বাড়ির সবাই স্বার্থপর। হতে পারে সবাই শুধু নিজের টুকুই বুঝত, সব বিষয়েই একে অন্যের সাথে মতবিরোধ বা তর্ক করত। কিন্তু একজায়গায় সবাই এক মত ছিল। সুলগ্না সবাইকে ভালোবাসতো আর সবাই সুলগ্নাকে চাইত। সংসারে এই রকম চরিত্র বড় বিরল। কিন্তু আজকাল আমার মনে হয় স্বর্গে ভগবানের কাছে ভাল লোক কম পড়ে গেছে। তাই আমাদের মধ্যে থেকে ভাল মানুষদেরই ভগবান তাড়াতাড়ি নিজের কাছে ডেকে নেন। সবাই কোন রকমে খায়। মাছ মাংস খাওয়া ভুলেই গেছে। কোনোরকমে ডাল ভাত দিয়ে খাওয়া সারে। অফিসে বা ব্যবসায় যেতে হয় তাই যাওয়া।
তবু জীবন থেমে থাকবে না। মানসীর কাছে প্রধান দায়িত্ব আসে বৌদির মেয়ে সৃজা কে মানুষ করা। সৃজা তখন ক্লাস থ্রি তে পড়ে। ও সৃজার সব কিছু নিজের কাঁধে তুলে নেয়। সকালে উঠে আগে সৃজাকে রেডি করে, ওর টিফিন বানিয়ে, কলেজে পাঠায়। তারপর নিজে কলেজে যায়। সৃজা কলেজ ছুটির পরে টিচার্স রুমে বসে থাকে। মানসী কলেজ থেকে ফেরার সময় ওকে নিয়ে ফেরে। আগে সুলগ্না নিয়ে আসতো। রাত্রেও সৃজা ওর রাঙ্গাপির কাছে ঘুমায়।
প্রায় মাস খানেক পড়ে একদিন সৃজা বলে – রাঙ্গাপি আমরা আর মাছ খাব না ?
তখন সবার খেয়াল হয় ওরা নিজের দুঃখে বাচ্চা মেয়েটাকেও কষ্ট দিচ্ছে!
এরমধ্যে স্বপন অনেকদিন কলকাতায় আসেনি। ও অফিসের ট্রেনিঙে এক মাসের বেশী দিল্লিতে ছিল। দিল্লি থেকে ও নিহারিকার সাথে ফোনে কথা বলেছিল, কিন্তু নিহারিকা ফোনে সুলগ্না বৌদিকে নিয়ে কিছু বলেনি। যেদিন স্বপন কলকাতা আসে আর নিহারিকার সাথে দেখা করে, সব কিছু জানতে পারে। স্বপন গলা ছেড়ে কাঁদতেও পারেনা, চোখের জলও আটকে রাখতে পারে না। নিঃশব্দে চোখের জল ফেলে। চোখ মুছে উঠে বলে মানসীদের বাড়ি যাবে। নিহারিকার মা বলেন একটু চা জল খেয়ে যেতে। কিন্তু স্বপন সেসব শোনে না। বাড়ি থেকে বেড়িয়ে যায়। পেছন পেছন নিহারিকাও যায়। একটা ট্যাক্সি নিয়ে মানসীদের বাড়ি পৌঁছায়।
সৃজা ওকে দেখেই এসে ওর হাত ধরে। ও তখন থেকেই স্বপন কে পিসে বলে ডাকতো। স্বপন আর নিহারিকা ঘরে ঢোকে। সুলগ্না বৌদির মালা দেওয়া ছবির সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। প্রনাম করতেও পারে না। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে টলতে শুরু করে। মানসী গিয়ে স্বপনকে ধরে পাশে সোফাতে বসিয়ে দেয়।
সৃজা – জানো পিসে মা আমাদের ছেড়ে চলে গেছে, আর আসবে না। আমি রাত্রে হাসপাতালে গিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিলাম কিন্তু তার পরদিন আর ঘুম থেকেই উঠল না।
মানসী এসে সৃজাকে কোলে তুলে নেয় আর চুপ করতে বলে।
সৃজা – তোমরা বাড়ীতে কিছু খারাপ হলেই বা কারো কিছু হলেই পিসে কে বল আর পিসে ঠিক করে দেয়। তাই আমি আমার কথা পিসেকে বলছি। পিসে ঠিক মাকে নিয়ে আসবে।
স্বপন আর বসে থাকতে পারে না। ও সৃজা আর মানসীকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলে।
প্রকৃতির কালবৈশাখী একরাত্রি থাকে আর তার ক্ষত থাকে পরের সাত দিন। জীবনের কালবৈশাখীও এক রাতের জন্যই আসে কিন্তু তার ক্ষত আর একটু বেশী সময় ব্যাথা দেয়। কিন্তু কিন্তু একসময় কালবৈশাখীর মেঘ কেটে গিয়ে সূর্য উঠে আসে।
মানসীদের বাড়ীতে সেই সূর্য ওঠে নিহারিকার বিয়েতে। স্বপন আর নিহারিকার বিয়ের দিন সুলগ্নার মৃত্যুর আগেই ঠিক হয়ে গিয়েছিলো। স্বপনের বিয়ে ঠিক ছিল ১৯৮৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে। সুলগ্না বৌদি মারা যাবার পাঁচ মাস পড়ে। স্বপন চাইছিল না বৌদি মারা যাবার এক বছর না হতেই বিয়ে করতে। কিন্তু স্বপনের ওই সিদ্ধান্তে প্রথম আপত্তি জানায় মানসী আর বড়দা।
মানসী – তোমাদের বিয়ে পিছিয়ে দেবার কোনই কারন নেই।
বড়দা – আমাদের শাস্ত্রের নিয়মে এক বছরের মধ্যে আমাদের বাড়ীতে কোন বিবাহ নিষিদ্ধ। কিন্তু তোমার বা নিহারিকার বাড়ীতে সে বাধা নিসেধ নেই।
স্বপন – সুলগ্না বৌদিকে আমি আমার নিজের বৌদি বলেই মানি।
বড়দা – সে আমি বুঝি। কিন্তু তাও আমি বলব তোমরা তোমাদের বিয়ে পিছিয়ে দিও না।
ওনারা তখনও স্বপনকে ঠিক জানত না বা পুরো বিশ্বাস করত না। ওনাদের চিন্তা ছিল স্বপন বাইরে থাকে, কোনদিন যদি অন্য কোন মেয়ে দেখে ওদের নিহারিকাকে বিয়ে করতে না চায়। তাই ওনারা চাইতেন যত তাড়াতাড়ি হোক বিয়েটা দিয়ে দেবার।
মানসী নিজেও জানত না ও কেন চাইছিল না বিয়েটা পিছিয়ে দিতে।
আর স্বপনের পক্ষেও ওর বাড়ীতে এই কারন বোঝানো খুব কঠিন ছিল। নিহারিকার বাড়ি থেকেও বিয়ে পেছোতে চাইল না। তাই ওদের বিয়ে প্ল্যান হিসাবেই হয়ে যায়। সে সময় সবাই দুঃখ ভুলে গিয়ে হাসতে শুরু করে।
বিয়ের সাত দিন আগে স্বপন আর নিহারিকা দক্ষিণেশ্বর যায়। দুজনেরই মনে পড়ে এর আগের বার সুলগ্না বৌদি সাথে ছিল। স্বপনরা পৌঁছানোর একটু পরেই মানসী আর কস্তূরী পৌঁছায়। কস্তূরীর সাথে ওর বয় ফ্রেন্ডও ছিল। ও বলতে ভুলে গেছি এর মধ্যে কস্তূরী মনের মানুষ খুঁজে পেয়ে গিয়েছিলো। স্বপন আলাপ করে ছেলেটার সাথে। বেশ ভালই লাগে। পুজা দেবার পড়ে কস্তূরীকে আলাদা পেয়ে স্বপন জিজ্ঞাসা করে।
স্বপন – কিরে এই ছেলেটা তোর কোন দিকে তাকায় ?
কস্তূরী – মানে ?
স্বপন – মানে ও তোর মুখ দেখে না বুক দেখে ?
কস্তূরী – আগে মুখ দেখে, তার পর হয়তো একটু বুকের দিকে তাকায়।
স্বপন – তুই সামনে ঝুঁকে পরলে ও কি করে ?
কস্তূরী – ও ভাবে আমি পড়ে যাচ্ছি তাই আমাকে হাত ধরে তুলে ধরে।
স্বপন – খুব ভাল, সত্যি খুব ভাল।
মানসী একসময় স্বপনকে বলে যে ওই ছেলেটা কস্তূরীর বাবার পয়সা দেখে কস্তূরীকে পছন্দ করেছে। স্বপন বলে প্রায় সব ছেলেরই একটা না একটা দিকে দুর্বলতা থাকে। এই ছেলেটার নারীর থেকে নারীর বাড়ি বেশী পছন্দ। তাতে কি আর করা যাবে। হয়তো কস্তূরীও এইরকমই চায়।
মানসী – সবাই কি আর স্বপন কে পায় !
সবাই মোটামুটি হৈচৈ করেই সময় কাটায়। স্বপন একটা জিনিস লক্ষ্য করে যে ও মানসীর হাত ধরলে বা জড়িয়ে ধরলে মানসী আর নিস্তেজ হয়ে যায় না।
স্বপন আর নিহারিকার বিয়ের পড়ে বৌভাতে সবাই মিলে স্বপনের গ্রামের বাড়ীতে যায়। কস্তূরীও গিয়েছিলো। মানসীরা যাবার আগে স্বপন আর নিহারিকার সাথে দেখা করতে যায়।
সৃজা – পিসে সবাই বলছে আজকে তুমি আমার সত্যি সত্যি পিসে হলে। তবে আগে তুমি কি ছিলে ?
স্বপন – আমি আগেও তোমার পিসে ছিলাম, আজকেও তোমার পিসেই আছি।
সৃজা – তবে বিয়ে করলে কি হল
স্বপন – আগে তোর পিসি আমার বৌ ছিল না, আজ থেকে আমার বৌ হল
সৃজা – খুব ভাল।
কে জানে সৃজা কি ভাল বুঝেছিল।
কস্তূরী – নেহা শোন আজ সব শিখে নিবি, আর কিছুদিন পরেই আমার বিয়ে। আমাকে সব বলবি।
নিহারিকা – আমি পারবো না, ওইসব বলতে। তোর স্বপন দাকে জিজ্ঞাসা করবি।
স্বপন – হ্যাঁ হ্যাঁ ঠিক আছে, আমি তো আছি, তোমাকে শিখিয়ে দেব।
নিহারিকা – না তোমাকে আর শেখাতে হবে না। ও নিজে নিজেই শিখে যাবে।
মানসী – কস্তূরীর দুষ্টু বুদ্ধি আর গেল না।
স্বপন – দেখো রাঙা দিদি আমি আগে নিহারিকাকে চুমু খেয়েছিলাম তার পর তোমাকে চুমু খেয়েছিলাম।
মানসী – তাতে কি হল ?
স্বপন – আজ আমি নিহারিকার সাথে যা যা করবো, কাল তোমার সাথে ঠিক তাই করবো।
নিহারিকা – আমার কোন আপত্তি নেই তাতে
মানসী – ইঃ খায় কত। তোমার সাথে ওইসব করতে আমার বয়েই গেছে।
মানসী মুখে এই কথা বললেও মনে মনে ভাবে হলে খুব একটা খারাপ হবে না।
স্বপন আর নিহারিকা বিয়ের পরে রাঁচি চলে যায়। ওদের জীবনের কথা কখনও অন্য গল্পে শোনাবো। এই কাহিনী মানসীকে নিয়ে তাই আমরা মানসীকে দেখি ও কি করছে।
তৃতীয় পরিচ্ছদ সমাপ্ত
""পৃথিবীটা রঙ্গমঞ্চ আমরা সবাই অভিনেতা"" !!
