27-02-2019, 08:45 PM
রিতিকা সুপ্রতিমদার দিকে তাকায়। সুপ্রতিমদা মুখ কাচুমাচু করে কিছু বলতে যাবার আগেই রিতিকা ঝাজিয়ে ওঠে, "আমি জানি তুমি অফিসে কি কাজ কর। মানালি গিয়ে বস কে একটা ফোন করে দেবে যে শরীর খারাপ ব্যাস। আমি তোমার আর কোন কথা শুনতে চাই না, আমি রাতে এখানে টেন্টে থাকব।"
পরী বেঁকে বসে আছে যে রাতে কুঞ্জুম থাকবে। সব মিলিয়ে এক ধন্দের মধ্যে পরে গেল সুপ্রতিমদা আর অভি। দীপঙ্কররা থাকতে চাইছে না আর ওদিকে ওদের প্রেয়সীরা থাকতে চায়।
শেষ পর্যন্ত পরীর মাথায় একটা সুন্দর উপায় আসে। পরী বলে, "আমাদের কাছে দুটো গাড়ি আছে আর দুটো ড্রাইভার আছে। কল্যাণী আর রানীরা, ইনোভা নিয়ে আমজাদ কে নিয়ে চলে যাক, তাহলে আমরা আরও কিছুদিন এই জায়গায় ঘুরতে পারব।"
অভি মাথা নাড়ে, পরীর মাথার বুদ্ধির তারিফ করতে হয়। রিতিকা পরীকে জড়িয়ে ধরে গালে চুমু খেয়ে বলে, "সত্যি তুমি না থাকলে আমাদের টিম হ্যাবা টিমলিডারের যে কি হত ভগবান জানে।"
অরুনার দিকে তাকাল অভি, জানতে চায় ওর অভিপ্রায় কি। অরুনা মৃদু হেসে বলে, "আমার কি কোন উপায় আছে না থেকে?"
অভি মজা করে বলে, "একটা আছে। তোকে এখান থেকে ছুঁড়ে দিচ্ছি, তুই সোজা সমুদ্রনীলের কোলে গিয়ে বসে পড়বি।"
অরুনা হেসে উত্তর দেয়, "ঠিক আছে তাহলে, আমি তৈরি, তুই আমাকে ছুঁড়ে দে দেখি।"
শেষ পর্যন্ত ঠিক হল, কল্যাণীরা ইনোভা নিয়ে চলে যাবে আর অভিরা আরও কয়েকটা দিন এই দুর্গম স্থানে কাটিয়ে বাটি ফিরবে। আমজাদ আর বল্বিন্দারকেও পাঠিয়ে দেওয়া হল, ঠিক হল যে গাড়ি অভি আর সুপ্রতিমদা ভাগ করে চালিয়ে নেবে। কল্যাণীদের বিদায় জানিয়ে সবাই মিলে বৌদ্ধ স্তুপের কাছে মাটিতে বসে পরে।
পরপর তিনটে সাদা বৌদ্ধ স্তুপ, পাশাপাশি সাজান, দেখে মনে হয় যেন শীতল মরুভুমির মাঝে এক মরুদ্যান। কনকনে ঠাণ্ডা হাওয়া বইছে, ভারী জ্যাকেট টাও যেন সেই ঠাণ্ডা হাওয়াকে দমিয়ে রাখতে পারছেনা। জ্যাকেট ফুঁরে যেন হাওয়া ওদের শরীরে তীরের মতন বিঁধছে। রিতিকা সুপ্রতিমদার বুকের কাছে জড়সড় হয়ে বসে। একপাসে অরুনা আরেক পাসে পরীকে জড়িয়ে ধরে বসে থাকে অভি। পৃথিবীর সব থেকে ধনী মানুষ অভিমন্যু, একপাসে ওর হৃদয় আরেক পাসে ওর চোখের মণি।
মাথার ওপরে সূর্য, এবারে এখান থেকে যাত্রা শুর করা উচিত। পরী অভিকে জিজ্ঞেস করে যে কোথায় যাচ্ছে, অ জানায় যে আগে কোন ভালো ক্যাম্পিঙের জায়গা দেখে ওরা তাবু ফেলবে। সুপ্রতিমদা গাড়ি চালাতে শুরু করে। কিছু দূর গিয়ে বাতাল নামে এক জায়গায় একটা ছোটো দোকান দেখতে পেয়ে ওরা অবাক হয়ে যায়। সেখান থেকে কিছু খাবার দাবার কেনা হয়। পরী দোকানের মালিককে জিজ্ঞেস করে যে এখানে লোক জন আসে কি আদৌ? লোকটা জানায় যে গ্রীষ্ম কালে বেশ কিছু পর্যটক এই পথে আসে আর মাঝে মাঝে একটা বাস আসে মানালি থেকে কাজা। লোকটা দুরে একটা পাহাড় দেখিয়ে ওদের বলে যে ওই পাহাড়ের অপাসে একটা ছোটো কিন্তু খুব সুন্দর, চন্দ্রতাল নামে একটা হ্রদ আছে। অভি লোকটাকে জিজ্ঞেস করে রাতের থাকার কোন ভালো জায়গার কথা। লোকটা জানায় যে কিছু দুরে নাকি একটা সরকারি রেস্ট হাউস আছে, তবে সেখানে কেউ থাকবে কিন জানেনা, সেই রেস্ট হাউসের বাগানে ওরা ক্যাম্পিং করতে পারে। সবাই খুব খুশি হয়ে যায় যে শেষ পর্যন্ত একটা নিরাপদ জায়গার খোঁজ পাওয়া গেছে।
ছত্রুর সেই সরকারি রেস্ট হাউসের বাগানে অভিরা তাবু খাটায়। ওখানকার কেয়ার টেকার ওদের সাহায্য করে কাঠ, জল আর কিছু খাবার দাবার যোগাড় করতে। টেন্টের সামনের দৃশ্য মন মুগ্ধকর, পায়ের নিচে খাদ আর সেই খাদের মাঝ দিয়ে বলে চলেছে পাহাড়ি স্রোতস্বিনী চন্দ্রা নদী। নদীর ওপর তীরে কিছু উঁচু পাহাড়, বরফে ঢাকা। কয়েকটা পাহাড়ের গা বেয়ে বরফ নেমে এসেছে নদীর তির পর্যন্ত। সমুদ্রতল থেকে ওরা অনেক উঁচুতে উঠে এসেছে, এখানে বায়ুর ঘনত্ব বেশ কম।
কনকনে ঠাণ্ডা রাতে, আগুন জ্বালিয়ে ওরা পাঁচ প্রান আগুনের চারদিকে বসে গল্প করে। চারপাশে যেন ঠাণ্ডা হাওয়া এক উন্মত্ত যুদ্ধে মেতেছে। হু হু করে হাওয়া যেন ওদের উরিয়ে নিয়ে যাবার জন্য প্রস্তুত, পরী অভির দিকে তাকায়, ওদের মনে পরে যায় চিতকুলের প্রথম রাতের কথা।
রাতের খাওয়া তাড়াতাড়ি সেরে, রিতিকা আর সুপ্রতিমদা একটা বড় টেন্টে ঢুকে পরে। অরুনা ছোটো টেন্টে নিজের স্লিপিং ব্যাগের মধ্যে ঢুকে পরে। খোলা আকাশের নিচে বসে থাকে অভি আর চেয়ে থাকে মাথার ওপরে তারাদের দিকে। পরী ওর পাসে একটা স্লিপিং ব্যাগে নিজেকে বন্দি করে ওরা মেলে ধরা পায়ের ওপরে মাথা রেখে শুয়ে থাকে। কিছু পরে অভি ওর পায়ের ওপরে চুম্বনের স্পর্শ পায়, চেয়ে দেখে পরী ওর জানুর ওপরে ঠোঁট চেপে ধরেছে। পরীর মাথার ওপরে হাত এনে অভি ওর চুল আঁচরে দেয় আর গালে আদর করতে শুরু করে। সামনের দিকে ঝুঁকে পরে পরীর মুখের ওপরে, পরী গভীর চোখে অভির দিকে তাকায়। অভি অল্প ঠোঁট খুলে ঠোঁট নামিয়ে আনে পরীর ঠোঁটের ওপরে।
চুম্বন দেবার আগেই কাঁধের ওপরে আলতো ছোঁয়ায় অভি চমকে ওঠে। পেছন ফিরে দেখে যে অরুনা ওর দিকে তাকিয়ে। পরী উঠে বসে আর অরুনার দিকে জিজ্ঞাসু চোখ নিয়ে তাকায়। অরুনা অভির বাঁ দিকে বসে পড়ে।
অরুনা অভিকে জিজ্ঞেস করে, "সত্যি কথা বলবি আমাকে? তুই আমার বাবা মা কে কি বলে এনেছিস?"
পরী আর অভি একে ওপরের মুখ চাওয়া চায়ি করে। ওরা যেন নিজেদের ভাষা হারিয়ে ফেলছে, কি উত্তর দেবে অরুনার প্রশ্নের। অরুনা কাঁপা গলায় ওদের কে বলে, "তোরা দুজনে আমার বাবা মাকে কিছু একটা বলছিস যেটা আমার কাছ থেকে লুকিয়ে রেখেছিস।"
পরী অরুনাকে জড়িয়ে ধরে আদর করে বলে, "আমরা তোর বাবা মা কে এই টুকু অনুরধ করেছিলাম যে যাতে অনারা আমাদের সাথে তোকে ঘুরতে যেতে দেয়, ব্যাস।"
অরুনার দু’চোখে জল চিকচিক করে আসে, বিশ্বাস করতে পারে না পরীর কথা, "না, তুমি আমাকে মিথ্যে কথা বলছ, শুচিদি।"
পরী অভির দিকে তাকায়। অভি অরুনাকে জিজ্ঞেস করে, "কি জানতে চাস তুই?"
অরুনা চেঁচিয়ে ওঠে, "আমি তোর কাছে সত্যি কথা জানতে চাই। কেন বার বার আমার মা আমকে জিজ্ঞেস করছিল যে তুই আমার ঠিক মতন খেয়াল রাখছিস কি না? কেন জিজ্ঞেস করছিল? বল, কেন?"
অভি মাথা নিচু করে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে, কি উত্তর দেবে অরুনার প্রশ্নের। পরী ঠোঁট চেপে, আলতো হেসে বলে, "সত্যি হচ্ছে যে তুই এখন আমাদের সাথে আছিস আর তুই আবার হাসছিস। তোকে আমরা ফিরে পেয়েছি সেটাই সত্যি।"
অরুনা থাকতে না পেরে কেঁদে ফেলে, "কেন কেন, তোমরা আমাকে সত্যি কথা বলছ না।"
পরীর চোখ ছলছল করে ওঠে, নিচের ঠোঁট কামড়ে ধরে নিজেকে সামলে নেয় বুদ্ধিমতী মেয়ে। অরুনা পরীর জ্যাকেটের কলার শক্ত করে ধরে ওর জল ভরা চোখের দিকে তাকায়।
পরী বুক ভরে লম্বা শ্বাস নিয়ে বলে, "তাহলে তুই সত্যি জানতে চাস। তোর বাবা মা আর অভির বাবা মা তোদের আসল সম্পর্কের কথা জানে না, জানে যে তোরা একে ওপরের খুব কাছের মানুষ। তোর শরীর যখন খারাপ হতে শুরু করে, তুই যখন পাগলের মতন প্রায়, তখন বাড়ির সবাই মিলে অভিকে ধরে তোকে কিছু করে হোক, ফিরিয়ে আনার জন্য। তোর মা ওর হাত ধরে অনুরধ করে যে তাঁর মেয়ের মুখে হাসি ফুটিয়ে দিলে অভি যা চাইবে তাই পাবে। নিরুপায় হয়ে আর তোর মুখের দিকে চেয়ে, অভি কথা দেয়। অভি পুবালি কেও কথা দিয়েছিল যে তোর আর সমুদ্রনীলের ভালোবাসা যেন বৃথা না যায়। ওর অবস্থা, একদিকে খাদ একদিকে পাহাড়, কি করবে কিছু না ভেবেই কথা দিয়ে দিয়েছিল।"
অরুনার দুচোখ বেয়ে অবিরাম ধারায় অশ্রু বয়ে চলে। পরী বলতে থাকে, "আমি জানি না, কি করে ওর মাথায় এক উপায় আসে, তোকে নিয়ে ঘুরতে যাওয়ার। তোর মুখে হসি ফুটে উঠেছে, সেটাই অনেক বড় পাওনা। কোলকাতা ফিরে গিয়ে ও ব্যানারজি কাকুকে তোর আর সমুদ্রনীলের সম্পর্কের কথা জানিয়ে দেবে, কেননা, ব্যানারজি কাকু ওকে কথা দিয়েছেন যে ও যা বলবে ব্যানারজি কাকু তাই মেনে নেবেন।"
অভি চশমা খুলে চোখের কোল মোছে। এমন সময়ে অভির মাথার পেছনে রিতিকা একটা ছোট্ট চাঁটি মারে। মাথা ঘুরিয়ে পেছনে দেখে যে রিতিকা আর সুপ্রতিমদা দাঁড়িয়ে। সুপ্রতিমদা আবেগপ্রবন হয়ে অভিকে বলে, "আমরা অরুনার চিৎকার শুনে বেড়িয়ে এসে এই ট্রিপের আসল উদ্দেশ্য শুনে অবাক হয়ে যাই।"
রিতিকা অভির পিঠের কাছে বসে ওর গলা জড়িয়ে ধরে পরীর দিকে তাকিয়ে বলে, "ভগবান যেন কাউকে এই রুকম হৃদয় না দেয় না হলে তোমার অভি আর তোমার থাকবে না সবার হয়ে যাবে। বড় অমুল্য এই অভি। আমার আর কিছু বলার ভাষা নেই তোমাদের।"
সব কথা শুনে অরুনা আর থাকতে না পেরে পরীর বুকে মাথা গুঁজে কেঁদে ফেলে। বারে বারে কেঁদে উঠে বলে, "তোর এটা করা ঠিক হয়নি রে, তোর এটা করা ঠিক হয়নি। এখন তোর আর শুচিদির কথা সবাই জেনে যাবে। তুই আমার জন্য এত কেন করতে গেলি, অভি।"
অভি, "ভবিষ্যতের কথা ভালো ভাবে দেখতে হবে। এখনো পর্যন্ত আমাদের কথা কেউ জানেনা আর আমাদের সেই রকম করেই থাকতে হবে পরের দুই বছর। এর মাঝে আমাকে একটা ভালো চাকরি পেতে হবে আর পরী ওর মাস্টার্স শেষ করবে। তারপরে বাবা মায়ের সামনে দাঁড়াতে পারব আর কিছু বলতে পারব। অরুনা তুই চিন্তা করিস না।"
সুপ্রতিমদা, "অভি, তুই এক কাজ কর, দিল্লী চলে আয়, এখানে অনেক আই.টি কম্পানি আছে তোর চাকরি আমি করিয়ে দেবো।"
অভি, "নারে, পরী আমাকে ছেড়ে থাকতে পারবে না, আমাকে ওর সাথে থাকতেই হবে। আমাকে কোলকাতায় চাকরি খুঁজতে হবে যতদিন না পরীর পড়াশুনা শেষ হয়।"
সুপ্রতিমদা, "পরী ওর মাস্টার্স দিল্লীতে করতে পারে।"
অভি, "না রে, সেখানেও এক বাধা আছে, সেটা তুই বুঝবি না। আমার মা আর পরী, খুবই এঁকে ওপরের অনুরক্ত, ওদের দুজন কে ছারানো বড় মুশকিল হয়ে যাবে। মা পরীকে কিছুতেই কাছ ছাড়া করবে না। ওর ছোটো মায়ের আর ওর মাঝে এক অদৃশ্য বন্ধন আছে যেটা পৃথিবীর কোন শক্তি খন্ডন করতে পারে না, এমন কি আমিও নয়।"
ছত্রুর সেই রাত বড় আবেগময় রাত হয়ে ওঠে সবার জন্য। কারুর চোখে ভালবাসার জল, কারুর চোখে প্রেমের জল, কারুর চোখে কৃতজ্ঞতার।
পরদিন সকালে অভিরা মানালির উদ্দেশ্যে বেড়িয়ে পড়ে। গ্রীষ্ম কালে মানালি যে খুব ভিড় ভর্তি হবে সেটা ওদের অজানা নয়। সুপ্রতিমদা গাড়ি চালাচ্ছিল। গতকাল রাতের আবেগ ময় সময়ের পড়ে, সবাই আবার আনন্দে মেতে উঠেছে। সবাই উচ্চ হিমালয়ের দৃশ্য দেখতে দেখতে আর এবর খাবর রাস্তার ওপরে দোল খেতে খেতে এগিয়ে চলে। বিকেলের মধ্যে রহটাং পাস পৌঁছে যায় ওরা। বেশ কিছুক্ষণ ওরা রোহতাং পাসে বসে থেকে হিমালয়ের পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে থাকে। অবশেষে রোহতাং পাস পেরিয়ে এসে ওরা মানুষের দর্শন পায়। এতক্ষণ পরে লোকজন দেখতে পেয়ে যেন ওদের ধড়ে প্রান ফিরে আসে। অরুনার দিকে তাকায় অভি, অরুনা যেন লোক দেখে খুব খুশি।
অভি ওকে মজা করে বলে, "কিরে এবারে ভিড় দেখে খুশি ত?"
মানালির দিকে রোহতাং পাসে গাড়ি থেকে আবার নামে। মেয়েদের চেহারায় যেন আনন্দ আর ধরে না। মানালির দিকের রোহতাং পাসে লোকজনের সাথে কথা বলে জানা গেল যে মানালিতে খুব ভিড়, হোটেল পাওয়া একটু মুশকিল হতে পারে। অভির মুখ শুকিয়ে এল, কি করা যায় এবারে। একটা ফেরিওয়ালা ওদের জানাল যে, মানালি থেকে কিছু দুরে নাগর নামে একটা জায়গা আছে, ছোটো আর সুন্দর, মানালি থেকে বেশি দুরেও নয়, সেখানে কিছু হোটেল ওরা পেয়ে যাবে। অভি ভেবে দেখল, যেহেতু ওদের কাছে গাড়ি আছে সুতরাং নাগরে হোটেলে থেকে ওরা সহজেই মানালি ঘুরে যেতে পারে। এই পর্যন্ত যত জায়গায় ওরা ঘুরে এসেছে, তাঁর তুলনায় মানালিতে অনেক গরম। সবাই গায়ের থেকে গরম জামা কাপড় খুলে ফেলে।
নাগর পৌঁছতে ওদের একটু দেরি হয়ে যায়, তাঁর কারন মানালিতে খুব ভিড় ছিল। তবে নাগরে হোটেল পেতে ওদের বিশেষ অসুবিধে হয় না। নাগর, কুলু এবং মানালির মাঝে খুব ছোটো এক শান্তি পূর্ণ জায়গা। কিছু হোটেল আর কিছু দোকান পসার আছে সেখানে। হোটেলে নিজেদের ব্যাগ রেখে রাতের খাওয়া তাড়াতাড়ি সেরে ফেলে ওরা।
পরী আর অরুনা বলে যে ওদের বাড়িতে ফোন করতে হবে। অভি পরীকে বলে যে ছোটমায়ের সাথে ওর কথা বললেই হবে। পরী বিরক্ত হয়ে ওঠে কেননা বেড়াতে আসা পর্যন্ত ওই ছোটমায়ের সাথে কথা বলে গেছে, অভি একবারও বাড়ির সাথে কথা বলেনি।
পরী ওর ছোটমাকে ফোন করে জানায় যে ওরা ভালো ভাবে ঘুরে এসেছে আর নাগর নামে এক জায়গায় পৌঁছে গেছে। মা মনে হয় পরীকে জিজ্ঞেস করে যে কবে ফিরবে, পরী অভির দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে সেই প্রশ্ন। অভি জানায় যে সম্ভবত রবিবারের মধ্যে ওরা কোলকাতা ফিরে যাবে। মা পরীকে অনুরধ করে অভির স্তাহে কথা বলার জন্য। পরী অভিকে ফোন ধরিয়ে দেয়।
মা, "হ্যালো, কেমন আছিস?"
অভি, "ভালো আছি, তোমাদের কি খবর?"
মা, "আমরা সবাই ভালো। অরুন্ধুতির কি খবর?"
অভি, "ও খুব ভালো আছে, বেশ আনন্দে আছে আর মজা করছে। আমাদের এই বেড়ানটা ওর পক্ষে বেশ ভালোই হয়েছে। ব্যানারজি কাকুকে জানিও যে অরুনা ঠিক আছে।"
মা, "অরুন্ধুতিকে ফোন দে।"
অভি অরুনাকে ফোন দেয়, মা অরুনার সাথে কিছুক্ষণ কথা বলার পড়ে অরুনা আবার ফোন অভির হাতে ধরিয়ে দেয়।
মা, "আমার কিছু বলার আছে।"
অভি, "কি বলো?"
মা, "তুই তো বলেছিলি যে তোদের বেড়ান বারো দিনের, তাহলে তোরা রবিবার কেন ফিরবি?"
অভি, "আমার, অরুনার বা পরীর বাড়িতে কোন কাজ নেই তাই আমি ভাবলাম একটু ঘুরে বেড়িয়ে ফিরি, কেন দেরি করে ফিরলে কি কোন অসুবিধে আছে?"
মা, "না মানে, তোর ইন্দ্রানি মাসি কয়েক দিন আগে ফোন করেছিল, আমাদের বম্বে ডেকেছে। তাই আমি ভাবছিলাম যে পরীকে নিয়ে বম্বে যাবো।"
অভি, "তুমি যাবে বম্বে পরীকে নিয়ে তা আমাকে কেন জিজ্ঞেস করছ, পরীকে সোজা জিজ্ঞেস করে নাও ও যেতে চায় কিনা।"
মা, "তুই যদি শুক্রবার ফিরে আসিস তাহলে নিয়ে যেতে পারি না হলে নয়। সেই জন্যেই তোকে জিজ্ঞেস করা। আমি ভালো করে জানি যে পরীর যাওয়ার হয়ত ইচ্ছে নেই কিন্তু যদি তুই শুক্রবার ফিরিস তাহলে হয়ত আমি বলে কয়ে রাজি করাতে পারব। আমরা শনিবারের রাতের প্লেনে বম্বে যাচ্ছি।"
অভি পরীকে জিজ্ঞেস করে যে ও বম্বে যেতে চায় কিনা, পরী মাথা নাড়িয়ে জানিয়ে দেয় যে বম্বে যাবে না ও।
অভি, "না ও বম্বে যেতে চাইছে না। তোমরা কত দিনের জন্য বম্বে যাচ্ছও?"
মা, "আগামি সাত দিনের জন্য। পরীকে ফোন দে।"
অভি পরীকে ফোন ধরিয়ে দেয়, বেশ কিছুক্ষণ কথা বলার পরে পরী ফোন রেখে দেয়। তারপরে অরুনা ওর বাড়িতে ফোন করে কুশল জানিয়ে দেয়।
হোটেলের ঘরে ঢুকে পরীকে অভি জিজ্ঞেস করে যে ওর ছোটমা কি বলল। পরী জানায়, "আমরা সময় মতন পৌঁছাবো না শুনে ছোটমা মনঃক্ষুণ্ণ। আমি ভাড়াটের কাছে চাবি রেখে যেতে বলে দিয়েছি। ছোটমা বলছিল যে গ্রামের বাড়ি চলে যেতে, সেটাই ভালো হবে, এপ্রিলের পড়ে মায়ের সাথে দেখা হয়নি আর তুমিও অনেকদিন আমাদের বাড়ি যাওনই। ছোটমা মনে হয় চায় না যে আমরা একা একা বাড়িতে থাকি। আমরা রবিবারের মধ্যে যদি কোলকাতা ফিরে যাই তাহলে সোমবার সকালে বসিরহাট চলে যাবো।"
অভি, "কেন বসিরহাট কেন যেতে হবে? আমরা বাড়িতেই ত দুজনে থাকতে পারি, তাতে অসুবিধে কোথায়?"
পরী, "ছোটমা নিশ্চয় মাকে আগে থেকে জানিয়ে দেইয়ে থাকবে যে আমরা আসব।"
অভি একটু গম্ভির হয়ে যায় গ্রামের বাড়ি যাওয়ার কথা ভেবে, "তুমি বুঝতে পারছ না পরী, গ্রামের বাড়ি গেলে কি হবে।"
পরী, "কি হবে, অসুবিধে কোথায় আমার বাড়িতে যাওয়ার? আমি আমার মায়ের বাড়ি যাবো, তুমি তোমার দিদার বাড়ি যাবে তাতে অসুবিধে কি?"
অভি মাথা নাড়ায়, "পরী পরী পরী, অসুবিধে দিদাকে নিয়ে বা বাড়ি নিয়ে নয়, সোনা। অসুবিধে সুব্রত আর মৈথিলী কে নিয়ে।"
পরী বেমালুম ভুলে গেছিল সেই ঘটনা। কপালে করাঘাত করে বলে, "উফ ভগবান, আমি একদম ভুলে গেছিলাম সেই কথা। যাই হোক, আমি জানি তুমি কি করেছ আর তুমি কোন ভুল করনি। যদি কেউ কিছু করে থাকে তাহলে ওরা করেছে। ভয় ওদের পাওয়া উচিত।"
হেসে বলে পরী, "আর বেশি কিছু হলে আমার কাছে তুরুপের তাস রাখা আছে, সেই ক্যাসেট টা।"
অভি গম্ভির হেসে উত্তর দেয়, "বেশ দারুন খেলা জমবে তাহলে।"
পরী ওকে সাবধান করে বলে, "মনে রেখো, আমি কিন্তু এই সব বিষয়ে কিছু জানিনা, সুতরাং ওদের সামনে আমি তোমার পাশে দাঁড়াতে পারবো না। যদিও আমি মার্চের পরে ওদের সাথে বিশেষ কথা বলিনি।"
অভি পরীর টোপা গাল টিপে আদর করে বলে, "মিষ্টি সোনা।"
পরী ঠোঁট গোল করে চুমুর ইশারা করে বলে, "অনেক আদর হয়েছে, তাড়াতাড়ি হাত মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে শুতে এস।"
অভি মাথা নুইয়ে বলে, "যথাআজ্ঞা মহারানী।"
পরের দিন অভিরা মানালি ঘুরে বেরাল। মানালি বিয়াস নদীর তীরে এক ছোটো উপত্যকা, চার পাসে উঁচু উঁচু পাহাড়ে ঘেরা। মানালি খুব সুন্দর এক পাহাড়ি জায়গা, কিন্তু অভির আর পরীর মানালি দেখে ঠিক পছন্দ হল না, যে জায়গা থেকে ঘুরে এসেছে সেই জায়গার পরে মানালি ঠিক মনে ধরল না। হাডিম্বা মন্দির আর একটা শিবের মন্দির ঘুরে দেখল।
বিকেলবেলা মেয়েরা কেনাকাটা করতেই ব্যাস্ত হয়ে যায়। জুন মাসে কলেজ কলেজের ছুটি তাই মানালিতে পর্যটকের ভিড়। পরী বাড়ির সবার জন্য কিছু কিনে নেয়, ছোটমার আর দিদার জন্য শাল, ওর বউদিদের জন্য স্টোল। ওকে জিজ্ঞেস করে যে কি কিনতে চায়, অভির সেই রেকং পিওর কথা মনে পরে গিয়ে হাসি পেয়ে যায়। কেনাকাটা সেরে সন্ধের দিকে নাগর ফিরে আসে ওরা।
পরী আর অরুনা কাসেলের কাছে গাড়ি থেকে নেমে পরে, ওদের বলে যে ওরা কিছু কেনাকাটা করে ফিরবে। অগত্যা অভি একা একা হোটেলের ঘরে বসে ওদের জন্য অপেক্ষা করে।
অনেক ক্ষণ হয়ে যায়, কিন্তু পরী আর অরুনাকে ফিরতে না দেখে অভি সুপ্রতিমদার ঘরে গিয়ে ঢোকে। ঘরে ঢুকে দেখে যে সুপ্রতিমদা বিয়ার সাথে সিগারেট টানছে। বিছানার ওপরে বসে পরে অভি, সুপ্রতিমদা ওকে এক ক্যান বিয়ার দেয় আর একটা সিগরেট জ্বালায় অভি। রিতিকার কথা জিজ্ঞেস করাতে সুপ্রতিমদা বলে যে বউ স্নান করতে ঢুকেছে।
সুপ্রতিমদা, "তোর বউ কোথায়?"
অভি্, "শপিং শপিং আর শপিং..." দুজনেই হেসে ফেলে।
সুপ্রতিমদা জিজ্ঞেস করে অভিকে, "কালকের কি প্লান?"
অভি উত্তর দেয়, "কাল, মান্ডি স্বারঘাট হয়ে দিল্লী ফিরে যাওয়া। বেশি দেরি হলে মান্ডি না হয় স্বারঘাটে থেকে যাবো আমরা।"
সুপ্রতিমদা, "শেষ পর্যন্ত আমাদের বেড়ান শেষ হল বল। বাপরে তুই যে যে জায়গা ঘুরিয়ে দেখালি মাইরি। আমি অনেক পাহাড় ঘুরেছি, মানালি, ফাগু, চায়েল, ডালহউসি, সব ঘুরেছি, ওদিকে নইনিতাল বল কউসানি বল, আবার পুবে দারজিলিং বা সিকিম বল, সব জায়গা ঘুরেছি কিন্তু শালা এই জায়গার মতন কোন জায়গা দেখিনি। সব জায়গায় হাজার হাজার লোক আর আমরা এই জায়গায় কোন লোকজন খুঁজে পেলাম না। সত্যি অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতা।"
বুক ভরে সিগারেটের ধোঁয়া টেনে একটু দার্শনিক উত্তর দেয় অভি, "গুরু, যে কোন জায়গা ভালো লাগে, যদি মনের মতন সাথি থাকে পাশে।"
সুপ্রতিমদা হেসে বলে, "বাঃবা তোর মধ্যে যে কবি কবি ভাব আর একটা দার্শনিক লুকিয়ে আছে জানতাম না ত।"
অভি, "রাতের খাওয়ার কি ব্যাবস্থা।"
সুপ্রতিমদা, "আমি মানালি আগেও এসেছি..."
চোখ টিপে অভি জিজ্ঞেস করে, "ওয়ান ডে পিচ নিয়ে খেলতে এসেছিলি?"
সুপ্রতিমদা অভিকে চুপ করতে বলে, "আরে জোরে বলিস না, রিতিকা কিছু জানে না কিন্তু ওইসব ব্যাপারে।"
অভি, "ছাড় না, টি.ভি র আওয়াজে কিছু শুনতে পাবে না।"
সুপ্রতিমদা টি.ভি’র আওয়াজ একটু জোর করে দিয়ে ওকে বলে, "গুরু, অয়ান ডে পিচে খেলে মজা আছে আনন্দ বাঁ শান্তি নেই। তুই বল হাঁকালি, ক্যাচ হবে না ছয় হবে জানিস না। আসল খেলা হচ্ছে টেস্ট পিচে।"
অভি, "কটা পিচে খেললি তুই?"
সুপ্রতিমদা হেসে বলে, "দুটো অয়ান ডে খেলেছি রে, তারপরে টেস্ট ম্যাচ।"
অভি, "রিতিকা কে জানাস নি কেন? যাকে ভালবাসিস তার কাছে হৃদয় খুলে রাখতে হয় রে।"
সুপ্রতিমদা, "ছাড় না পুরানো কথা।"
অভিকে একবার পরী বলেছিল, সেই কথা অভি সুপ্রতিমদাকে বলে, "অতীত ঠিক অতীত নয়। আমাদের অতীতকে ভুলে যাওয়া উচিত নয়, অতীতের কাছ থেকে আমরা অভিজ্ঞতা অর্জন করি, ভবিষ্যতের সিঁড়ি তৈরি করি। বর্তমান যদি সঠিক না হয় তাহলে কোন এক সময়ে কিন্তু আমাদের অতীত আমাদের তাড়িয়ে বেড়াবে।"
সুপ্রতিমদা বিরক্ত হয়ে ওঠে, "বোকা... জ্ঞান মারতে যাস না, দারু গেল শালা। তুই কি মদ ঢাললেই দার্শনিক হয়ে যাস নাকি?"
কথা অন্য খাতে বয়ে যায়, গল্পে দুজনে মেতে ওঠে।
হটাত বাথরুমের দরজা খুলে রিতিকা তোয়ালে দিয়ে মাথা মুছতে মুছতে বেড়িয়ে আসে। ওকে দেখে সুপ্রতিমদার আর অভির মুখ হাঁ হয়ে যায়। দুজনের চোখ বড় বড় হয়ে যায়, নিস্পলক চোখে তাকিয়ে থাকে রিতিকার দিকে।
সাদা তোয়ালে দিয়ে মাথা মুছতে থাকে রিতিকা, সর্বাঙ্গে একটি সুতা পর্যন্ত নেই। সারা গায়ে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জলের ফোঁটা। দেখে মনে হয় যেন এক মৎস্যকন্যে সবে সাগরজল থেকে উঠে এসে ওদের সামনে নিজেকে মেলে ধরেছে। অভি বিস্ফুরিত নয়নে রিতিকার নধর পেলব দেহের অপরূপ রুপ সুধা পান করে।
মুখখানি দেখে মনে হচ্ছে যেন সদ্যস্নাত ম্যাগ্নলিয়া ফুল, সূর্যের আলোয় উজ্জ্বল হয়ে ফুটে উঠেছে। মাথার চুল পরীর মতন লম্বা নাহলেও ঘাড় পর্যন্ত নেমে এসেছে। ভিজে চুলের থেকে ফোঁটা ফোঁটা জল ঝরে পড়ছে। ছোটো গোল কাঁধ, ঢেউ খেলে উঠেছে উন্নত বক্ষ জোড়ায়। দেহের অবয়াব যেন অতি প্রাচিন বালির ঘড়ির মতন। ত্রুটিহীন নিটোল বক্ষ যুগলের ওপরে দুটি গাড় বাদামি নুড়ি সাজানো। কিছু ক্ষুদ্র জলের ফোঁটা ওই বৃন্তের কাছে লেগে তারপরে গড়িয়ে পড়েছে নিচের দিকে। পীনোন্নত বক্ষ যুগল যেন ঠেলে বেড়িয়ে এসেছে ওর শরীরের থেকে আর হাতছানি দিচ্ছে সামনে বসে থাকা দুই বুভুক্ষু হায়নার দিকে।
মধ্যচ্ছদা যেন স্পিতি নদী, বুকের নিচ থেকে নেমে গেছে ছোটো গোল পেটের দিকে, হারিয়ে গেছে সুগভীর নাভির ভেতরে। পাতলা কোমর আর তাঁর নিচে ফুলে উঠেছে সুডৌল নিতম্ব। নিতম্ব জোড়া বেশ পুরুষ্টু আর তলপেট টাও বেশ মান্সল আর ফোলা। ঠিক তলপেটের নিচের দিকে অভির দৃষ্টি যায়, দুই নমনীয় নধর জানু, সদ্য স্নাত হওয়ার ফলে ত্বকের ওপরে ঘরের আলো পিছল খেয়ে যায়। তলপেটের বাম দিকে বেশ নিচে একটা ছোটো কালো তিল। নাভিদেশ থেকে বেশ কয়েকটা সরু জলের ধারা নেমে এসেছে তলপেটের ওপরে দিয়ে গড়িয়ে হারিয়ে গেছে জানুমাঝের উপদ্বীপে।
পরী বেঁকে বসে আছে যে রাতে কুঞ্জুম থাকবে। সব মিলিয়ে এক ধন্দের মধ্যে পরে গেল সুপ্রতিমদা আর অভি। দীপঙ্কররা থাকতে চাইছে না আর ওদিকে ওদের প্রেয়সীরা থাকতে চায়।
শেষ পর্যন্ত পরীর মাথায় একটা সুন্দর উপায় আসে। পরী বলে, "আমাদের কাছে দুটো গাড়ি আছে আর দুটো ড্রাইভার আছে। কল্যাণী আর রানীরা, ইনোভা নিয়ে আমজাদ কে নিয়ে চলে যাক, তাহলে আমরা আরও কিছুদিন এই জায়গায় ঘুরতে পারব।"
অভি মাথা নাড়ে, পরীর মাথার বুদ্ধির তারিফ করতে হয়। রিতিকা পরীকে জড়িয়ে ধরে গালে চুমু খেয়ে বলে, "সত্যি তুমি না থাকলে আমাদের টিম হ্যাবা টিমলিডারের যে কি হত ভগবান জানে।"
অরুনার দিকে তাকাল অভি, জানতে চায় ওর অভিপ্রায় কি। অরুনা মৃদু হেসে বলে, "আমার কি কোন উপায় আছে না থেকে?"
অভি মজা করে বলে, "একটা আছে। তোকে এখান থেকে ছুঁড়ে দিচ্ছি, তুই সোজা সমুদ্রনীলের কোলে গিয়ে বসে পড়বি।"
অরুনা হেসে উত্তর দেয়, "ঠিক আছে তাহলে, আমি তৈরি, তুই আমাকে ছুঁড়ে দে দেখি।"
শেষ পর্যন্ত ঠিক হল, কল্যাণীরা ইনোভা নিয়ে চলে যাবে আর অভিরা আরও কয়েকটা দিন এই দুর্গম স্থানে কাটিয়ে বাটি ফিরবে। আমজাদ আর বল্বিন্দারকেও পাঠিয়ে দেওয়া হল, ঠিক হল যে গাড়ি অভি আর সুপ্রতিমদা ভাগ করে চালিয়ে নেবে। কল্যাণীদের বিদায় জানিয়ে সবাই মিলে বৌদ্ধ স্তুপের কাছে মাটিতে বসে পরে।
পরপর তিনটে সাদা বৌদ্ধ স্তুপ, পাশাপাশি সাজান, দেখে মনে হয় যেন শীতল মরুভুমির মাঝে এক মরুদ্যান। কনকনে ঠাণ্ডা হাওয়া বইছে, ভারী জ্যাকেট টাও যেন সেই ঠাণ্ডা হাওয়াকে দমিয়ে রাখতে পারছেনা। জ্যাকেট ফুঁরে যেন হাওয়া ওদের শরীরে তীরের মতন বিঁধছে। রিতিকা সুপ্রতিমদার বুকের কাছে জড়সড় হয়ে বসে। একপাসে অরুনা আরেক পাসে পরীকে জড়িয়ে ধরে বসে থাকে অভি। পৃথিবীর সব থেকে ধনী মানুষ অভিমন্যু, একপাসে ওর হৃদয় আরেক পাসে ওর চোখের মণি।
মাথার ওপরে সূর্য, এবারে এখান থেকে যাত্রা শুর করা উচিত। পরী অভিকে জিজ্ঞেস করে যে কোথায় যাচ্ছে, অ জানায় যে আগে কোন ভালো ক্যাম্পিঙের জায়গা দেখে ওরা তাবু ফেলবে। সুপ্রতিমদা গাড়ি চালাতে শুরু করে। কিছু দূর গিয়ে বাতাল নামে এক জায়গায় একটা ছোটো দোকান দেখতে পেয়ে ওরা অবাক হয়ে যায়। সেখান থেকে কিছু খাবার দাবার কেনা হয়। পরী দোকানের মালিককে জিজ্ঞেস করে যে এখানে লোক জন আসে কি আদৌ? লোকটা জানায় যে গ্রীষ্ম কালে বেশ কিছু পর্যটক এই পথে আসে আর মাঝে মাঝে একটা বাস আসে মানালি থেকে কাজা। লোকটা দুরে একটা পাহাড় দেখিয়ে ওদের বলে যে ওই পাহাড়ের অপাসে একটা ছোটো কিন্তু খুব সুন্দর, চন্দ্রতাল নামে একটা হ্রদ আছে। অভি লোকটাকে জিজ্ঞেস করে রাতের থাকার কোন ভালো জায়গার কথা। লোকটা জানায় যে কিছু দুরে নাকি একটা সরকারি রেস্ট হাউস আছে, তবে সেখানে কেউ থাকবে কিন জানেনা, সেই রেস্ট হাউসের বাগানে ওরা ক্যাম্পিং করতে পারে। সবাই খুব খুশি হয়ে যায় যে শেষ পর্যন্ত একটা নিরাপদ জায়গার খোঁজ পাওয়া গেছে।
ছত্রুর সেই সরকারি রেস্ট হাউসের বাগানে অভিরা তাবু খাটায়। ওখানকার কেয়ার টেকার ওদের সাহায্য করে কাঠ, জল আর কিছু খাবার দাবার যোগাড় করতে। টেন্টের সামনের দৃশ্য মন মুগ্ধকর, পায়ের নিচে খাদ আর সেই খাদের মাঝ দিয়ে বলে চলেছে পাহাড়ি স্রোতস্বিনী চন্দ্রা নদী। নদীর ওপর তীরে কিছু উঁচু পাহাড়, বরফে ঢাকা। কয়েকটা পাহাড়ের গা বেয়ে বরফ নেমে এসেছে নদীর তির পর্যন্ত। সমুদ্রতল থেকে ওরা অনেক উঁচুতে উঠে এসেছে, এখানে বায়ুর ঘনত্ব বেশ কম।
কনকনে ঠাণ্ডা রাতে, আগুন জ্বালিয়ে ওরা পাঁচ প্রান আগুনের চারদিকে বসে গল্প করে। চারপাশে যেন ঠাণ্ডা হাওয়া এক উন্মত্ত যুদ্ধে মেতেছে। হু হু করে হাওয়া যেন ওদের উরিয়ে নিয়ে যাবার জন্য প্রস্তুত, পরী অভির দিকে তাকায়, ওদের মনে পরে যায় চিতকুলের প্রথম রাতের কথা।
রাতের খাওয়া তাড়াতাড়ি সেরে, রিতিকা আর সুপ্রতিমদা একটা বড় টেন্টে ঢুকে পরে। অরুনা ছোটো টেন্টে নিজের স্লিপিং ব্যাগের মধ্যে ঢুকে পরে। খোলা আকাশের নিচে বসে থাকে অভি আর চেয়ে থাকে মাথার ওপরে তারাদের দিকে। পরী ওর পাসে একটা স্লিপিং ব্যাগে নিজেকে বন্দি করে ওরা মেলে ধরা পায়ের ওপরে মাথা রেখে শুয়ে থাকে। কিছু পরে অভি ওর পায়ের ওপরে চুম্বনের স্পর্শ পায়, চেয়ে দেখে পরী ওর জানুর ওপরে ঠোঁট চেপে ধরেছে। পরীর মাথার ওপরে হাত এনে অভি ওর চুল আঁচরে দেয় আর গালে আদর করতে শুরু করে। সামনের দিকে ঝুঁকে পরে পরীর মুখের ওপরে, পরী গভীর চোখে অভির দিকে তাকায়। অভি অল্প ঠোঁট খুলে ঠোঁট নামিয়ে আনে পরীর ঠোঁটের ওপরে।
চুম্বন দেবার আগেই কাঁধের ওপরে আলতো ছোঁয়ায় অভি চমকে ওঠে। পেছন ফিরে দেখে যে অরুনা ওর দিকে তাকিয়ে। পরী উঠে বসে আর অরুনার দিকে জিজ্ঞাসু চোখ নিয়ে তাকায়। অরুনা অভির বাঁ দিকে বসে পড়ে।
অরুনা অভিকে জিজ্ঞেস করে, "সত্যি কথা বলবি আমাকে? তুই আমার বাবা মা কে কি বলে এনেছিস?"
পরী আর অভি একে ওপরের মুখ চাওয়া চায়ি করে। ওরা যেন নিজেদের ভাষা হারিয়ে ফেলছে, কি উত্তর দেবে অরুনার প্রশ্নের। অরুনা কাঁপা গলায় ওদের কে বলে, "তোরা দুজনে আমার বাবা মাকে কিছু একটা বলছিস যেটা আমার কাছ থেকে লুকিয়ে রেখেছিস।"
পরী অরুনাকে জড়িয়ে ধরে আদর করে বলে, "আমরা তোর বাবা মা কে এই টুকু অনুরধ করেছিলাম যে যাতে অনারা আমাদের সাথে তোকে ঘুরতে যেতে দেয়, ব্যাস।"
অরুনার দু’চোখে জল চিকচিক করে আসে, বিশ্বাস করতে পারে না পরীর কথা, "না, তুমি আমাকে মিথ্যে কথা বলছ, শুচিদি।"
পরী অভির দিকে তাকায়। অভি অরুনাকে জিজ্ঞেস করে, "কি জানতে চাস তুই?"
অরুনা চেঁচিয়ে ওঠে, "আমি তোর কাছে সত্যি কথা জানতে চাই। কেন বার বার আমার মা আমকে জিজ্ঞেস করছিল যে তুই আমার ঠিক মতন খেয়াল রাখছিস কি না? কেন জিজ্ঞেস করছিল? বল, কেন?"
অভি মাথা নিচু করে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে, কি উত্তর দেবে অরুনার প্রশ্নের। পরী ঠোঁট চেপে, আলতো হেসে বলে, "সত্যি হচ্ছে যে তুই এখন আমাদের সাথে আছিস আর তুই আবার হাসছিস। তোকে আমরা ফিরে পেয়েছি সেটাই সত্যি।"
অরুনা থাকতে না পেরে কেঁদে ফেলে, "কেন কেন, তোমরা আমাকে সত্যি কথা বলছ না।"
পরীর চোখ ছলছল করে ওঠে, নিচের ঠোঁট কামড়ে ধরে নিজেকে সামলে নেয় বুদ্ধিমতী মেয়ে। অরুনা পরীর জ্যাকেটের কলার শক্ত করে ধরে ওর জল ভরা চোখের দিকে তাকায়।
পরী বুক ভরে লম্বা শ্বাস নিয়ে বলে, "তাহলে তুই সত্যি জানতে চাস। তোর বাবা মা আর অভির বাবা মা তোদের আসল সম্পর্কের কথা জানে না, জানে যে তোরা একে ওপরের খুব কাছের মানুষ। তোর শরীর যখন খারাপ হতে শুরু করে, তুই যখন পাগলের মতন প্রায়, তখন বাড়ির সবাই মিলে অভিকে ধরে তোকে কিছু করে হোক, ফিরিয়ে আনার জন্য। তোর মা ওর হাত ধরে অনুরধ করে যে তাঁর মেয়ের মুখে হাসি ফুটিয়ে দিলে অভি যা চাইবে তাই পাবে। নিরুপায় হয়ে আর তোর মুখের দিকে চেয়ে, অভি কথা দেয়। অভি পুবালি কেও কথা দিয়েছিল যে তোর আর সমুদ্রনীলের ভালোবাসা যেন বৃথা না যায়। ওর অবস্থা, একদিকে খাদ একদিকে পাহাড়, কি করবে কিছু না ভেবেই কথা দিয়ে দিয়েছিল।"
অরুনার দুচোখ বেয়ে অবিরাম ধারায় অশ্রু বয়ে চলে। পরী বলতে থাকে, "আমি জানি না, কি করে ওর মাথায় এক উপায় আসে, তোকে নিয়ে ঘুরতে যাওয়ার। তোর মুখে হসি ফুটে উঠেছে, সেটাই অনেক বড় পাওনা। কোলকাতা ফিরে গিয়ে ও ব্যানারজি কাকুকে তোর আর সমুদ্রনীলের সম্পর্কের কথা জানিয়ে দেবে, কেননা, ব্যানারজি কাকু ওকে কথা দিয়েছেন যে ও যা বলবে ব্যানারজি কাকু তাই মেনে নেবেন।"
অভি চশমা খুলে চোখের কোল মোছে। এমন সময়ে অভির মাথার পেছনে রিতিকা একটা ছোট্ট চাঁটি মারে। মাথা ঘুরিয়ে পেছনে দেখে যে রিতিকা আর সুপ্রতিমদা দাঁড়িয়ে। সুপ্রতিমদা আবেগপ্রবন হয়ে অভিকে বলে, "আমরা অরুনার চিৎকার শুনে বেড়িয়ে এসে এই ট্রিপের আসল উদ্দেশ্য শুনে অবাক হয়ে যাই।"
রিতিকা অভির পিঠের কাছে বসে ওর গলা জড়িয়ে ধরে পরীর দিকে তাকিয়ে বলে, "ভগবান যেন কাউকে এই রুকম হৃদয় না দেয় না হলে তোমার অভি আর তোমার থাকবে না সবার হয়ে যাবে। বড় অমুল্য এই অভি। আমার আর কিছু বলার ভাষা নেই তোমাদের।"
সব কথা শুনে অরুনা আর থাকতে না পেরে পরীর বুকে মাথা গুঁজে কেঁদে ফেলে। বারে বারে কেঁদে উঠে বলে, "তোর এটা করা ঠিক হয়নি রে, তোর এটা করা ঠিক হয়নি। এখন তোর আর শুচিদির কথা সবাই জেনে যাবে। তুই আমার জন্য এত কেন করতে গেলি, অভি।"
অভি, "ভবিষ্যতের কথা ভালো ভাবে দেখতে হবে। এখনো পর্যন্ত আমাদের কথা কেউ জানেনা আর আমাদের সেই রকম করেই থাকতে হবে পরের দুই বছর। এর মাঝে আমাকে একটা ভালো চাকরি পেতে হবে আর পরী ওর মাস্টার্স শেষ করবে। তারপরে বাবা মায়ের সামনে দাঁড়াতে পারব আর কিছু বলতে পারব। অরুনা তুই চিন্তা করিস না।"
সুপ্রতিমদা, "অভি, তুই এক কাজ কর, দিল্লী চলে আয়, এখানে অনেক আই.টি কম্পানি আছে তোর চাকরি আমি করিয়ে দেবো।"
অভি, "নারে, পরী আমাকে ছেড়ে থাকতে পারবে না, আমাকে ওর সাথে থাকতেই হবে। আমাকে কোলকাতায় চাকরি খুঁজতে হবে যতদিন না পরীর পড়াশুনা শেষ হয়।"
সুপ্রতিমদা, "পরী ওর মাস্টার্স দিল্লীতে করতে পারে।"
অভি, "না রে, সেখানেও এক বাধা আছে, সেটা তুই বুঝবি না। আমার মা আর পরী, খুবই এঁকে ওপরের অনুরক্ত, ওদের দুজন কে ছারানো বড় মুশকিল হয়ে যাবে। মা পরীকে কিছুতেই কাছ ছাড়া করবে না। ওর ছোটো মায়ের আর ওর মাঝে এক অদৃশ্য বন্ধন আছে যেটা পৃথিবীর কোন শক্তি খন্ডন করতে পারে না, এমন কি আমিও নয়।"
ছত্রুর সেই রাত বড় আবেগময় রাত হয়ে ওঠে সবার জন্য। কারুর চোখে ভালবাসার জল, কারুর চোখে প্রেমের জল, কারুর চোখে কৃতজ্ঞতার।
পরদিন সকালে অভিরা মানালির উদ্দেশ্যে বেড়িয়ে পড়ে। গ্রীষ্ম কালে মানালি যে খুব ভিড় ভর্তি হবে সেটা ওদের অজানা নয়। সুপ্রতিমদা গাড়ি চালাচ্ছিল। গতকাল রাতের আবেগ ময় সময়ের পড়ে, সবাই আবার আনন্দে মেতে উঠেছে। সবাই উচ্চ হিমালয়ের দৃশ্য দেখতে দেখতে আর এবর খাবর রাস্তার ওপরে দোল খেতে খেতে এগিয়ে চলে। বিকেলের মধ্যে রহটাং পাস পৌঁছে যায় ওরা। বেশ কিছুক্ষণ ওরা রোহতাং পাসে বসে থেকে হিমালয়ের পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে থাকে। অবশেষে রোহতাং পাস পেরিয়ে এসে ওরা মানুষের দর্শন পায়। এতক্ষণ পরে লোকজন দেখতে পেয়ে যেন ওদের ধড়ে প্রান ফিরে আসে। অরুনার দিকে তাকায় অভি, অরুনা যেন লোক দেখে খুব খুশি।
অভি ওকে মজা করে বলে, "কিরে এবারে ভিড় দেখে খুশি ত?"
মানালির দিকে রোহতাং পাসে গাড়ি থেকে আবার নামে। মেয়েদের চেহারায় যেন আনন্দ আর ধরে না। মানালির দিকের রোহতাং পাসে লোকজনের সাথে কথা বলে জানা গেল যে মানালিতে খুব ভিড়, হোটেল পাওয়া একটু মুশকিল হতে পারে। অভির মুখ শুকিয়ে এল, কি করা যায় এবারে। একটা ফেরিওয়ালা ওদের জানাল যে, মানালি থেকে কিছু দুরে নাগর নামে একটা জায়গা আছে, ছোটো আর সুন্দর, মানালি থেকে বেশি দুরেও নয়, সেখানে কিছু হোটেল ওরা পেয়ে যাবে। অভি ভেবে দেখল, যেহেতু ওদের কাছে গাড়ি আছে সুতরাং নাগরে হোটেলে থেকে ওরা সহজেই মানালি ঘুরে যেতে পারে। এই পর্যন্ত যত জায়গায় ওরা ঘুরে এসেছে, তাঁর তুলনায় মানালিতে অনেক গরম। সবাই গায়ের থেকে গরম জামা কাপড় খুলে ফেলে।
নাগর পৌঁছতে ওদের একটু দেরি হয়ে যায়, তাঁর কারন মানালিতে খুব ভিড় ছিল। তবে নাগরে হোটেল পেতে ওদের বিশেষ অসুবিধে হয় না। নাগর, কুলু এবং মানালির মাঝে খুব ছোটো এক শান্তি পূর্ণ জায়গা। কিছু হোটেল আর কিছু দোকান পসার আছে সেখানে। হোটেলে নিজেদের ব্যাগ রেখে রাতের খাওয়া তাড়াতাড়ি সেরে ফেলে ওরা।
পরী আর অরুনা বলে যে ওদের বাড়িতে ফোন করতে হবে। অভি পরীকে বলে যে ছোটমায়ের সাথে ওর কথা বললেই হবে। পরী বিরক্ত হয়ে ওঠে কেননা বেড়াতে আসা পর্যন্ত ওই ছোটমায়ের সাথে কথা বলে গেছে, অভি একবারও বাড়ির সাথে কথা বলেনি।
পরী ওর ছোটমাকে ফোন করে জানায় যে ওরা ভালো ভাবে ঘুরে এসেছে আর নাগর নামে এক জায়গায় পৌঁছে গেছে। মা মনে হয় পরীকে জিজ্ঞেস করে যে কবে ফিরবে, পরী অভির দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে সেই প্রশ্ন। অভি জানায় যে সম্ভবত রবিবারের মধ্যে ওরা কোলকাতা ফিরে যাবে। মা পরীকে অনুরধ করে অভির স্তাহে কথা বলার জন্য। পরী অভিকে ফোন ধরিয়ে দেয়।
মা, "হ্যালো, কেমন আছিস?"
অভি, "ভালো আছি, তোমাদের কি খবর?"
মা, "আমরা সবাই ভালো। অরুন্ধুতির কি খবর?"
অভি, "ও খুব ভালো আছে, বেশ আনন্দে আছে আর মজা করছে। আমাদের এই বেড়ানটা ওর পক্ষে বেশ ভালোই হয়েছে। ব্যানারজি কাকুকে জানিও যে অরুনা ঠিক আছে।"
মা, "অরুন্ধুতিকে ফোন দে।"
অভি অরুনাকে ফোন দেয়, মা অরুনার সাথে কিছুক্ষণ কথা বলার পড়ে অরুনা আবার ফোন অভির হাতে ধরিয়ে দেয়।
মা, "আমার কিছু বলার আছে।"
অভি, "কি বলো?"
মা, "তুই তো বলেছিলি যে তোদের বেড়ান বারো দিনের, তাহলে তোরা রবিবার কেন ফিরবি?"
অভি, "আমার, অরুনার বা পরীর বাড়িতে কোন কাজ নেই তাই আমি ভাবলাম একটু ঘুরে বেড়িয়ে ফিরি, কেন দেরি করে ফিরলে কি কোন অসুবিধে আছে?"
মা, "না মানে, তোর ইন্দ্রানি মাসি কয়েক দিন আগে ফোন করেছিল, আমাদের বম্বে ডেকেছে। তাই আমি ভাবছিলাম যে পরীকে নিয়ে বম্বে যাবো।"
অভি, "তুমি যাবে বম্বে পরীকে নিয়ে তা আমাকে কেন জিজ্ঞেস করছ, পরীকে সোজা জিজ্ঞেস করে নাও ও যেতে চায় কিনা।"
মা, "তুই যদি শুক্রবার ফিরে আসিস তাহলে নিয়ে যেতে পারি না হলে নয়। সেই জন্যেই তোকে জিজ্ঞেস করা। আমি ভালো করে জানি যে পরীর যাওয়ার হয়ত ইচ্ছে নেই কিন্তু যদি তুই শুক্রবার ফিরিস তাহলে হয়ত আমি বলে কয়ে রাজি করাতে পারব। আমরা শনিবারের রাতের প্লেনে বম্বে যাচ্ছি।"
অভি পরীকে জিজ্ঞেস করে যে ও বম্বে যেতে চায় কিনা, পরী মাথা নাড়িয়ে জানিয়ে দেয় যে বম্বে যাবে না ও।
অভি, "না ও বম্বে যেতে চাইছে না। তোমরা কত দিনের জন্য বম্বে যাচ্ছও?"
মা, "আগামি সাত দিনের জন্য। পরীকে ফোন দে।"
অভি পরীকে ফোন ধরিয়ে দেয়, বেশ কিছুক্ষণ কথা বলার পরে পরী ফোন রেখে দেয়। তারপরে অরুনা ওর বাড়িতে ফোন করে কুশল জানিয়ে দেয়।
হোটেলের ঘরে ঢুকে পরীকে অভি জিজ্ঞেস করে যে ওর ছোটমা কি বলল। পরী জানায়, "আমরা সময় মতন পৌঁছাবো না শুনে ছোটমা মনঃক্ষুণ্ণ। আমি ভাড়াটের কাছে চাবি রেখে যেতে বলে দিয়েছি। ছোটমা বলছিল যে গ্রামের বাড়ি চলে যেতে, সেটাই ভালো হবে, এপ্রিলের পড়ে মায়ের সাথে দেখা হয়নি আর তুমিও অনেকদিন আমাদের বাড়ি যাওনই। ছোটমা মনে হয় চায় না যে আমরা একা একা বাড়িতে থাকি। আমরা রবিবারের মধ্যে যদি কোলকাতা ফিরে যাই তাহলে সোমবার সকালে বসিরহাট চলে যাবো।"
অভি, "কেন বসিরহাট কেন যেতে হবে? আমরা বাড়িতেই ত দুজনে থাকতে পারি, তাতে অসুবিধে কোথায়?"
পরী, "ছোটমা নিশ্চয় মাকে আগে থেকে জানিয়ে দেইয়ে থাকবে যে আমরা আসব।"
অভি একটু গম্ভির হয়ে যায় গ্রামের বাড়ি যাওয়ার কথা ভেবে, "তুমি বুঝতে পারছ না পরী, গ্রামের বাড়ি গেলে কি হবে।"
পরী, "কি হবে, অসুবিধে কোথায় আমার বাড়িতে যাওয়ার? আমি আমার মায়ের বাড়ি যাবো, তুমি তোমার দিদার বাড়ি যাবে তাতে অসুবিধে কি?"
অভি মাথা নাড়ায়, "পরী পরী পরী, অসুবিধে দিদাকে নিয়ে বা বাড়ি নিয়ে নয়, সোনা। অসুবিধে সুব্রত আর মৈথিলী কে নিয়ে।"
পরী বেমালুম ভুলে গেছিল সেই ঘটনা। কপালে করাঘাত করে বলে, "উফ ভগবান, আমি একদম ভুলে গেছিলাম সেই কথা। যাই হোক, আমি জানি তুমি কি করেছ আর তুমি কোন ভুল করনি। যদি কেউ কিছু করে থাকে তাহলে ওরা করেছে। ভয় ওদের পাওয়া উচিত।"
হেসে বলে পরী, "আর বেশি কিছু হলে আমার কাছে তুরুপের তাস রাখা আছে, সেই ক্যাসেট টা।"
অভি গম্ভির হেসে উত্তর দেয়, "বেশ দারুন খেলা জমবে তাহলে।"
পরী ওকে সাবধান করে বলে, "মনে রেখো, আমি কিন্তু এই সব বিষয়ে কিছু জানিনা, সুতরাং ওদের সামনে আমি তোমার পাশে দাঁড়াতে পারবো না। যদিও আমি মার্চের পরে ওদের সাথে বিশেষ কথা বলিনি।"
অভি পরীর টোপা গাল টিপে আদর করে বলে, "মিষ্টি সোনা।"
পরী ঠোঁট গোল করে চুমুর ইশারা করে বলে, "অনেক আদর হয়েছে, তাড়াতাড়ি হাত মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে শুতে এস।"
অভি মাথা নুইয়ে বলে, "যথাআজ্ঞা মহারানী।"
পরের দিন অভিরা মানালি ঘুরে বেরাল। মানালি বিয়াস নদীর তীরে এক ছোটো উপত্যকা, চার পাসে উঁচু উঁচু পাহাড়ে ঘেরা। মানালি খুব সুন্দর এক পাহাড়ি জায়গা, কিন্তু অভির আর পরীর মানালি দেখে ঠিক পছন্দ হল না, যে জায়গা থেকে ঘুরে এসেছে সেই জায়গার পরে মানালি ঠিক মনে ধরল না। হাডিম্বা মন্দির আর একটা শিবের মন্দির ঘুরে দেখল।
বিকেলবেলা মেয়েরা কেনাকাটা করতেই ব্যাস্ত হয়ে যায়। জুন মাসে কলেজ কলেজের ছুটি তাই মানালিতে পর্যটকের ভিড়। পরী বাড়ির সবার জন্য কিছু কিনে নেয়, ছোটমার আর দিদার জন্য শাল, ওর বউদিদের জন্য স্টোল। ওকে জিজ্ঞেস করে যে কি কিনতে চায়, অভির সেই রেকং পিওর কথা মনে পরে গিয়ে হাসি পেয়ে যায়। কেনাকাটা সেরে সন্ধের দিকে নাগর ফিরে আসে ওরা।
পরী আর অরুনা কাসেলের কাছে গাড়ি থেকে নেমে পরে, ওদের বলে যে ওরা কিছু কেনাকাটা করে ফিরবে। অগত্যা অভি একা একা হোটেলের ঘরে বসে ওদের জন্য অপেক্ষা করে।
অনেক ক্ষণ হয়ে যায়, কিন্তু পরী আর অরুনাকে ফিরতে না দেখে অভি সুপ্রতিমদার ঘরে গিয়ে ঢোকে। ঘরে ঢুকে দেখে যে সুপ্রতিমদা বিয়ার সাথে সিগারেট টানছে। বিছানার ওপরে বসে পরে অভি, সুপ্রতিমদা ওকে এক ক্যান বিয়ার দেয় আর একটা সিগরেট জ্বালায় অভি। রিতিকার কথা জিজ্ঞেস করাতে সুপ্রতিমদা বলে যে বউ স্নান করতে ঢুকেছে।
সুপ্রতিমদা, "তোর বউ কোথায়?"
অভি্, "শপিং শপিং আর শপিং..." দুজনেই হেসে ফেলে।
সুপ্রতিমদা জিজ্ঞেস করে অভিকে, "কালকের কি প্লান?"
অভি উত্তর দেয়, "কাল, মান্ডি স্বারঘাট হয়ে দিল্লী ফিরে যাওয়া। বেশি দেরি হলে মান্ডি না হয় স্বারঘাটে থেকে যাবো আমরা।"
সুপ্রতিমদা, "শেষ পর্যন্ত আমাদের বেড়ান শেষ হল বল। বাপরে তুই যে যে জায়গা ঘুরিয়ে দেখালি মাইরি। আমি অনেক পাহাড় ঘুরেছি, মানালি, ফাগু, চায়েল, ডালহউসি, সব ঘুরেছি, ওদিকে নইনিতাল বল কউসানি বল, আবার পুবে দারজিলিং বা সিকিম বল, সব জায়গা ঘুরেছি কিন্তু শালা এই জায়গার মতন কোন জায়গা দেখিনি। সব জায়গায় হাজার হাজার লোক আর আমরা এই জায়গায় কোন লোকজন খুঁজে পেলাম না। সত্যি অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতা।"
বুক ভরে সিগারেটের ধোঁয়া টেনে একটু দার্শনিক উত্তর দেয় অভি, "গুরু, যে কোন জায়গা ভালো লাগে, যদি মনের মতন সাথি থাকে পাশে।"
সুপ্রতিমদা হেসে বলে, "বাঃবা তোর মধ্যে যে কবি কবি ভাব আর একটা দার্শনিক লুকিয়ে আছে জানতাম না ত।"
অভি, "রাতের খাওয়ার কি ব্যাবস্থা।"
সুপ্রতিমদা, "আমি মানালি আগেও এসেছি..."
চোখ টিপে অভি জিজ্ঞেস করে, "ওয়ান ডে পিচ নিয়ে খেলতে এসেছিলি?"
সুপ্রতিমদা অভিকে চুপ করতে বলে, "আরে জোরে বলিস না, রিতিকা কিছু জানে না কিন্তু ওইসব ব্যাপারে।"
অভি, "ছাড় না, টি.ভি র আওয়াজে কিছু শুনতে পাবে না।"
সুপ্রতিমদা টি.ভি’র আওয়াজ একটু জোর করে দিয়ে ওকে বলে, "গুরু, অয়ান ডে পিচে খেলে মজা আছে আনন্দ বাঁ শান্তি নেই। তুই বল হাঁকালি, ক্যাচ হবে না ছয় হবে জানিস না। আসল খেলা হচ্ছে টেস্ট পিচে।"
অভি, "কটা পিচে খেললি তুই?"
সুপ্রতিমদা হেসে বলে, "দুটো অয়ান ডে খেলেছি রে, তারপরে টেস্ট ম্যাচ।"
অভি, "রিতিকা কে জানাস নি কেন? যাকে ভালবাসিস তার কাছে হৃদয় খুলে রাখতে হয় রে।"
সুপ্রতিমদা, "ছাড় না পুরানো কথা।"
অভিকে একবার পরী বলেছিল, সেই কথা অভি সুপ্রতিমদাকে বলে, "অতীত ঠিক অতীত নয়। আমাদের অতীতকে ভুলে যাওয়া উচিত নয়, অতীতের কাছ থেকে আমরা অভিজ্ঞতা অর্জন করি, ভবিষ্যতের সিঁড়ি তৈরি করি। বর্তমান যদি সঠিক না হয় তাহলে কোন এক সময়ে কিন্তু আমাদের অতীত আমাদের তাড়িয়ে বেড়াবে।"
সুপ্রতিমদা বিরক্ত হয়ে ওঠে, "বোকা... জ্ঞান মারতে যাস না, দারু গেল শালা। তুই কি মদ ঢাললেই দার্শনিক হয়ে যাস নাকি?"
কথা অন্য খাতে বয়ে যায়, গল্পে দুজনে মেতে ওঠে।
হটাত বাথরুমের দরজা খুলে রিতিকা তোয়ালে দিয়ে মাথা মুছতে মুছতে বেড়িয়ে আসে। ওকে দেখে সুপ্রতিমদার আর অভির মুখ হাঁ হয়ে যায়। দুজনের চোখ বড় বড় হয়ে যায়, নিস্পলক চোখে তাকিয়ে থাকে রিতিকার দিকে।
সাদা তোয়ালে দিয়ে মাথা মুছতে থাকে রিতিকা, সর্বাঙ্গে একটি সুতা পর্যন্ত নেই। সারা গায়ে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জলের ফোঁটা। দেখে মনে হয় যেন এক মৎস্যকন্যে সবে সাগরজল থেকে উঠে এসে ওদের সামনে নিজেকে মেলে ধরেছে। অভি বিস্ফুরিত নয়নে রিতিকার নধর পেলব দেহের অপরূপ রুপ সুধা পান করে।
মুখখানি দেখে মনে হচ্ছে যেন সদ্যস্নাত ম্যাগ্নলিয়া ফুল, সূর্যের আলোয় উজ্জ্বল হয়ে ফুটে উঠেছে। মাথার চুল পরীর মতন লম্বা নাহলেও ঘাড় পর্যন্ত নেমে এসেছে। ভিজে চুলের থেকে ফোঁটা ফোঁটা জল ঝরে পড়ছে। ছোটো গোল কাঁধ, ঢেউ খেলে উঠেছে উন্নত বক্ষ জোড়ায়। দেহের অবয়াব যেন অতি প্রাচিন বালির ঘড়ির মতন। ত্রুটিহীন নিটোল বক্ষ যুগলের ওপরে দুটি গাড় বাদামি নুড়ি সাজানো। কিছু ক্ষুদ্র জলের ফোঁটা ওই বৃন্তের কাছে লেগে তারপরে গড়িয়ে পড়েছে নিচের দিকে। পীনোন্নত বক্ষ যুগল যেন ঠেলে বেড়িয়ে এসেছে ওর শরীরের থেকে আর হাতছানি দিচ্ছে সামনে বসে থাকা দুই বুভুক্ষু হায়নার দিকে।
মধ্যচ্ছদা যেন স্পিতি নদী, বুকের নিচ থেকে নেমে গেছে ছোটো গোল পেটের দিকে, হারিয়ে গেছে সুগভীর নাভির ভেতরে। পাতলা কোমর আর তাঁর নিচে ফুলে উঠেছে সুডৌল নিতম্ব। নিতম্ব জোড়া বেশ পুরুষ্টু আর তলপেট টাও বেশ মান্সল আর ফোলা। ঠিক তলপেটের নিচের দিকে অভির দৃষ্টি যায়, দুই নমনীয় নধর জানু, সদ্য স্নাত হওয়ার ফলে ত্বকের ওপরে ঘরের আলো পিছল খেয়ে যায়। তলপেটের বাম দিকে বেশ নিচে একটা ছোটো কালো তিল। নাভিদেশ থেকে বেশ কয়েকটা সরু জলের ধারা নেমে এসেছে তলপেটের ওপরে দিয়ে গড়িয়ে হারিয়ে গেছে জানুমাঝের উপদ্বীপে।