27-02-2019, 05:55 PM
অপ্সরা দেবাঙ্গনার সমাবেশ
অভির সীমানার মধ্যে পরীর পদক্ষেপ অভিকে উমত্ত করে তোলে। পরীর ঠোঁটের মিষ্টি হাসি, চোখের চোরা চাহনি, কোমর দুলিয়ে চলন, মধুর সুরে কথন, সব যেন কেমন স্বপ্ন বলে মনে হয় অভির। কিন্তু শক্ত পরী, নিজেকে অভির দুষ্টু হাতের নাগালের বাইরে রখতে সক্ষম হয়। প্রথম প্রথম পড়াশুনায় মন বসে না, কিন্তু পরীর কড়া শাসনের সামনে শেষ পর্যন্ত অভিকে মাথা নত করতে হয়। মাঝে মধ্যে একটু আলতো ঠোঁটের ছোঁয়া বা একটু নরম আঙ্গুলের স্পর্শ অভির গালে। দৃঢ়সঙ্কলপ পরী, যতদিন না পরীক্ষা শেষ হচ্ছে ততদিন নিজেকে ওর হাতের নাগালের বাইরে রাখবে।
দিন কয়েক পরে, এক সকালে অরুনা অভির বাড়িতে ফোন করে। অভি বসার ঘরে বসে খবরের কাগজ পড়ছিল, আর মা কলেজ যাবার জন্য তৈরি হচ্ছিলেন। পরী ফোন ধরে, অভি কান পেতে ওদের কথা শুনতে চেষ্টা করে কিন্তু শুধু হাসি আর ফিসফিস ছাড়া কিছুই কানে গেল না। মা বেড়িয়ে যাবার আগে পরীকে বাড়ির কি কি করতে হবে সব নির্দেশ দিয়ে গেল আর বলে গেল অভি যেন নিজের ঘর থেকে না বের হয়।
মা বেড়িয়ে যাবার পরে অভি নিজের ঘরে যাবার জন্য পা বাড়াল। পরী সকাল সকাল উঠে স্নান সেরে পুজো দেওয়া হয়ে গেছে। পর্দা সরিয়ে বসার ঘরে ঢুকল পরী, ঘর যেন ওর গায়ের রঙ্গে একটু আলোকিত হয়ে উঠল। সারা চেহারায় এক বিশুদ্ধতার আলোক ছটা বিচ্ছুরিত হচ্ছে। পরনে লাল পাড় হাল্কা হলুদ রঙের শাড়ি আটপৌরে ভাবে পরা গায়ে ছোটো হাতার লাল কাঁচুলি, পরীর সৌন্দর্য যেন শত গুন বর্ধিত করে তুলছে। মাথার চুল হাত খোঁপায় ঘাড়ের ওপরে বাঁধা, সদ্য স্নাত তাই ভিজে চুলের ডগা থেকে কিছু জল ওর শাড়ির পিঠের কিছু অংশ ভিজিয়ে দিয়েছে। সামনে যেন এক দেবী প্রতিমা দাঁড়িয়ে। হাতে কয়েক গাছা সোনার চুরি, হাত নাড়ার সময়ে টুং টাং করে বেজে ওঠে।
পরী অভির দিকে তাকিয়ে মিষ্টি হেসে বলে, "অরুন্ধুতি ফোন করেছিল।"
অভি, "হ্যাঁ তা জানি। তুমি যে রকম ভাবে কথা বলছিলে তাতে অন্য পাশে অরুনা ছাড়া আর কেউ হতে পারে না।"
পরী, "আমার সাথে আজ দেখা করতে চায়।"
অভি, "কোথায়?"
পরী, "আমাকে শুধু বলল যে নাগেরবাজারে যেন আমরা ওদের জন্য অপেক্ষা করি।"
অভি, "দাড়াও আমি ওকে কল করে জেনে নেই কোথায় নিয়ে যেতে চায়।"
পরী, "না তুমি ওকে কল করবে না, ও তোমাকে বলতে বলেছে যে আমাকে নিয়ে নাগেরবাজার যেতে, ব্যাস।"
অভি, "ওকি তোমাকে জানিয়েছে যে আমরা তারপরে কোথায় যাচ্ছি?"
পরী খিলখিল করে হেসে ফেলে, "কেন নিজের এত সুন্দরী বান্ধবীর ওপরে এতটুকু বিশ্বাস নেই তোমার?" পরী তখনো পর্দা ধরে দাঁড়িয়ে, অভির দিকে তাকিয়ে হাসছে।
অভি, "তুমি পর্দার পেছনে কেন নিজেকে লুকিয়ে রেখেছ, বেড়িয়ে এস পুরটা।"
পরী, "আমার কি মাথা খারাপ হয়েছে নাকি, যে তোমার সামনে বেড়িয়ে আসব। তুমি কখন কি করে বস তার কোন ঠিক আছে নাকি।"
অভি কপাল চাপড়ে বলে, "যাঃ বাব, একদম বদমাশ মেয়ে তুমি।" কিন্তু অভি উঠে দাঁড়ায়, এবারে সত্যি পরীর দিকে এগোনোর জন্য।
পরী দৌড়ে নিজের ঘরে চলে যায় আর দরজা বন্ধ করে দরজার ফাঁক দিয়ে অভির দিকে দেখতে থাকে।
পরী, "তুমি স্নান সেরে জামা কাপড় পরে আস তাড়াতাড়ি। অরুনা বলেছে দশটা নাগাদ ও নাগেরবাজারে আমাদের জন্য অপেক্ষা করে থাকবে। আমি চাই না তোমার জন্য আমাদের দেরি হোক।"
অভি জিজ্ঞেস করল, "তুমি কি পড়বে।"
পরী উত্তর দিল, "কেন, সবসময়ে যা পরি তাই পড়ব, শাড়ি।"
তাড়াতাড়ি স্নান সেরে বেড়িয়ে এল অভি। পরী শাড়ি পড়বে তাই ওকে তার সাথে সামঞ্জন্স্য রেখে পায়জামা পাঞ্জাবী পরে নিল না হলে ঠিক ভালো দেখাবে না। প্রেয়সীর চলন বলন আর পোশাকের রুচিশীলতায় কেউ বলতে পারবে না যে পরী গ্রাম থেকে আসা এক মেয়ে। পরীর পরনে সবুজ পাড়ের ঘিয়ে রঙের তাঁতের শাড়ি, আঁচলে ছোটো ছোটো ফুল আঁকা। শাড়ির সাথে মিলিয়ে সবুজ রঙের ছোটো হাতার গায়ের কাঁচুলি। চেহারায় প্রসাধনির চিহ্ন নেই তা সত্তেও গোলাপি ঠোঁটে জোড়া বেশ মিষ্টি দেখাচ্ছে আর গালে গোলাপি লালিমা মাখা। কপালে দুই বাঁকা ভুরুর মাঝে একটা ছোট্ট সবুজ রঙের টিপ, চোখের কোলে কাজল। গলায় একটা সরু সোনার হার ঠিক উপরি গলার নিচ পর্যন্ত নেমেছে। ডান দিকের এক চুলের গুচ্ছ গালের ওপরে দোল খায়। পরীর অপরূপ সৌন্দর্যে মোহিত হয়ে তাকিয়ে থাকে অভি, যেন লক্ষ্মী প্রতিমা।
এই বিশুদ্ধতার প্রতিমার রুপ চোখ দিয়ে দেখার। অভি ওর কাছে এসে দাঁড়িয়ে ওর মুখ আঁজলা করে হাতে ধরে মুখে নিজের দিকে তুলে ওর গভীর চোখের দিকে তাকায়। ছোট্ট করে কপালে একটা চুমু খায় অভি, প্রেমের আবেগে নয়, সস্নেহের চুম্বন এঁকে দেয়।
পরী লাজুক হেসে বলে, "আমরা কি যেতে পারি?"
অভি মাথা নাড়ায়, "হ্যাঁ মা ধরিত্রি, সর্বদা আপনার পেছন পেছন আছি।"
অরুনার কথা মতন অভি আর পরী ট্যাক্সি করে নাগেরবাজার পৌঁছে যায়। ওদের জন্য যেন আরও এক চমক অপেক্ষা করে ছিল।
গত তিন বছরে প্রথম বার অভি অরুনাকে শাড়ি পড়তে দেখে। অরুনার পরনে হাল্কা সবুজ রঙের শাড়ি। নাকে সোনার ফ্রেমের চশমা, মুখে কোনদিনই প্রসাধনী করে না, তাই সেদিনও ছিল না বিশেষ। অভি একটু দুরে দাঁড়িয়ে ওর সেই দেবী প্রতিমা দেখতে থাকে। অভি পরীর দিকে তাকায় অরুনা কে দেখে। পরীকে দেখে অরুনা দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরে। এঁকে অপরকে এর আগে কোনদিন দেখেনি তাও কেন জানিনা মনে হল অভির যে দুজন যেন দুজনকে আগে থেকেই চিনত। পরী অরুনাকে জড়িয়ে ধরে কপালে একটা ছোট্ট চুমু খায়। অভি কিছু দুরে দাঁড়িয়ে দেখে ওর জীবনের দুই দেবী সমান প্রতিমা, একজন অভির চোখের মণি আরেক জন ওর হৃদয়। পুবালি চুপ করে দাঁড়িয়ে ওদের দেখে আর মিটিমিটি হাসে। অভি পুবালিকে জিজ্ঞেস করে যে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে অরুনা, পুবালি মাথা নাড়িয়ে হেসে অরুনাকে দেখিয়ে বলে যে সেটা একটা চমক।
অরুনা পরীকে দেখে হেসে বলে, "শুচিদি আমি অভিকে ঈর্ষা করতে ইচ্ছে করছে গো। আমি যদি মেয়ে না হয়ে ছেলে হতাম তাহলে নিশ্চয় তোমার প্রেমে পড়তাম।"
পরী একটু লাজুক হেসে আদর করে ছোট্ট একটা চাঁটি মারে অরুনার গালে। অভি অরুনাকে জিজ্ঞেস করে যে ওরা কোথায় যাচ্ছে। অরুনা উত্তর দেয় যে দক্ষিণেশ্বর কালি মন্দির।
অভি অবাক হয়ে যায়, "কি? শেষ মেশ দক্ষিণেশ্বর? না।"
অরুনা, "তুই যেতে না চাইলে যাস না, কিন্তু আমরা মেয়েরা অখানেই যাবো।" এই বলে পরীর হাত ধরে হাটা দিল।
অগত্যা অভি, পুবালির দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়িয়ে ওদের পেছন পেছন চলতে শুরু করল।
ট্যাক্সির পেছনের সিটে বসে মেয়েরা পাখীর মতন কিচিরমিচির শুরু করে দিল। পুবালি যথারীতি চুপ মাঝে মধ্যে একটু আধটু কথা বলছে, আর অভি অগত্যা চুপ, ওকে কেউ কথা বলতে দিলে ত বলবে।
অরুনা পরীকে জিজ্ঞেস করে, "আচ্ছা শুচিদি, তুমি এই পাগলটার প্রেমে পড়লে কি করে?"
পরী আয়নায় অভির দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলে উত্তর দেয়, "ব্যাস যেন হয়ে গেল, যেদিন প্রথম এক দুজনকে দেখেছিলাম সেদিন কেন জানিনা মনে হয়েছিল যে ও শুধু আমার জন্যে এই পৃথিবীতে এসেছে।"
অভি চুপ করে সামনের শিতে বসে ওদের কথা শুনে যায়, পেছন থেকে পরী ওর মাথার পেছনে এক ছোট্ট চাঁটি মারে।
অরুনা খিলখিল করে হেসে বলে, "উম, কি রোম্যান্টিক ব্যাপার। ও পাগলের অনেক সাহস যে তোমাকে নিয়ে একা একা ওই দুর্গম পাহারে ঘুরতে গেছে, বাপরে ভাবলেই যেন গায়ে কাঁটা দেয় আমার। কেউ ত ভাবতেই পারেনা একা একা যাবার কথা, তায় আবার এমন এক জায়গায় যেখান কার নাম আমি আগে ত শুনিনি। তুমি ওই পাগলের সাথে গেলে কি করে?"
পরী হেসে অরুনাকে জিজ্ঞেস করে, "কেন সমুদ্রনীল তোকে কোথাও নিয়ে যায় না?"
অরুনা একটু ম্লান হেসে উত্তর দিল, "না গো শুচিদি, ও পুবালির মতন একটু মুখচোরা স্বভাবের, অভিমন্যুর মতন পাগল বা দুঃসাহসী ছেলে নয়। এ পাগলা ত যেখানে সেখানে ভিড়ে যায়। তুমি ওকে সামলাও কি করে?"
পরী কিছু উত্তর দেয় না, শুধু একটু হাসে অরুনার দিকে তাকিয়ে।
অরুনা, "জানো, যখন কলেজে এসেছিল, তখন যেন পাথরের মূর্তি ছিল। আমরা সবাই ওকে একটু এড়িয়ে চলতাম কেননা খুব গম্ভির ছিল আর আমরা সবাই ওকে নাক উঁচু বলে ভাবতাম। যেদিন আমার বোনকে বাঁচাল সেদিন আসল বিহারী বেড়িয়ে পড়ল ওই গম্ভির মুখোশের পেছন থেকে।"
পরী হেসে অরুনাকে বলে, "তোর মুখে ওই পাগলটার জন্য এত প্রশংসা কেন রে? ওর কথা ছাড় সমুদ্রনীলের কথা বল।"
ওদের কিচিরমিচির চলতে থাকে অনবরত। দক্ষিণেশ্বর পৌঁছে দেখে যে সেদিন মন্দির বেশ খালি। সপ্তাহের মাঝে এসেছে বলে মন্দির প্রাঙ্গনে ভিড় বিশেষ নেই। অভি ভাবল পুজোটা তাহলে একটু ভালো করেই দেওয়া যাবে। পুজো শেষে ওরা সবাই আবার গল্পে মেতে ওঠে।
অভি ওদেরকে পেছন থেকে দেখে, একজন ওর ভালবাসা আরেক জন ওর বান্ধবী। অভি আর পুবালি ওদের পেছন পেছন হাঁটছিল। অভি পুবালিকে ওর নাকের ব্যাথার কথা জিজ্ঞেস করে।
পুবালি অভির মুখের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে পরে, "মাঝে মাঝে জানিস খুব ব্যাথা করে, মাথাটা যেন খুব ভার হয়ে আসে। মাঝে মাঝে মনে হয় যেন আমি মরে যাব।"
অভি, "ডাক্তার কি বলছে।"
এর মাঝে অরুনা ওদের দিকে পেছন ফিরে তাকায়, অভি ওকে দেখে একটু হাসে।
পুবালি, "ডাক্তার আমাকে পরীক্ষা দিতে বারন করেছে, বলেছে মাথায় যেন কোন রকমের চাপ না নেই। একটা এম.আর.আই স্কান করাতেও বলেছে, আমার কিছু যেন মনে হচ্ছে।"
অভি চমকে ওঠে, "এত সব কবে ঘটে গেল? একবারের জন্য আমাকে জানাসনি ত?"
পুবালি, "দুদিন আগে আমি বাথরুমে পরে যাই আর নাক থেকে আবার রক্ত বের হতে শুরু করে।"
অভি, "আমাকে জানাসনি কেন?"
পুবালি, "তোকে কেন আবার জ্বালাতন করা, বাড়িতেই ত ছিলাম সবাই কাছে ছিল তাই আর তোকে জানান হয় নি।"
অভির বুকে থেকে এক দীর্ঘনিঃশ্বাস বেড়িয়ে পরে। পুবালি মাথা নিচু করে মন্দির প্রাঙ্গনের লাল মেঝের দিকে তাকিয়ে থাকে। অভি লক্ষ্য করে যে পুবালির নাকের ওপরে একফোঁটা চোখের জল। অভি চমকে যায় পুবালির চোখে জল দেখে। অভি একবার পরী আর অরুনার দিকে তাকায়, দুজনেই হাঁটতে হাঁটতে অনেকটা দূর এগিয়ে গেছে, দুজনেই গল্পে মশগুল।
পুবালি কান্না ভেজা গলায় অভিকে বলে, "আমাকে একটা কথা দিবি? অরুনাকে বলিস না যেন।"
অভি ওর কাঁধে হাত রাখে, "তোর কি হয়েছে?"
পুবালির গলার আওয়াজ শুনে বুকের ভেতর ককিয়ে এক অজানা ব্যাথা শুরু হয়ে যায় অভির।
পুবালি অভির দিকে জল ভরা চোখ নিয়ে তাকিয়ে বলে, "ডাক্তার জানিয়েছে যে আমার নাকের আর চোখের শিরা গুলো যে গুলো মাথার সামনের দিকের সাথে কানেক্টেড সেগুলোর অবস্থা ভালো নয়।"
ঠোঁট কেঁপে ওঠে পুবালির, "আমার হাতে খুব কম সময়, অভি। আমার কিছু হয়ে গেলে, সমুদ্রনীলকে বলিস অরুনাকে দেখার জন্য।"
পুবালির কথা শুনে মনে হল যেন একটা বিশাল ঢেউ অভির বুকের ওপরে আছড়ে পড়ল আর তছনছ করে দিল ওকে। পরী আর অরুনার দিকে তাকাল অভি, ওরা হাঁটতে হাঁটতে অনেক দুরে চলে গেছে। অভি নিরুপায় হয়ে মন্দির প্রাঙ্গনে দাঁড়িয়ে, ভাগ্য বিধাতার একি পরিহাস। দুহাতে পুবালিকে জড়িয়ে ধরে, মনে হয় যেন ওর সব ব্যাথা বেদনা যদি নিতে পারত তাহলে নিয়ে নিত নিজের বুকে। পুবালি পাথরের মূর্তির মতন দাঁড়িয়ে ওর বুকের ওপর মুখ গুঁজে কেঁদে ফেলে।
অভির সম্বিৎ ফেরে যখন অরুনা ওর পিঠের ওপরে আলতো করে এক চাঁটি মারে।
পরী অভির জল ভরা চোখের দিকে তাকিয়ে বলে, "কি হয়েছে তোমার?"
অভি পুবালিকে কথা দিয়েছে অরুনাকে বলা বারন তাই কথা ঘুরিয়ে বলল, "ও কিছু না, পুবালি সেই প্রথম দিনের কথা মনে করে একটু ইমোসানাল হয়ে পড়েছিল এই যা।"
অরুনা কিছুই বুঝতে পারল না ওদের মনের ব্যাথা, পুবালিকে হেসে বলল, "এই পাগলি, ওই কথা চিন্তা করে তোরা ইমোসানাল হয়ে পড়লি?"
অরুনা অভির দিকে তাকাল কিন্তু ওর মনের মধ্যের যে ঝড় বইছে সেটা অনুধাবন করতে পারল না। পরী অভির চোখে ঝরের পূর্বাভাস দেখে ঠাণ্ডা হয়ে যায়। ওই চোখের আড়ালে যেন অনেক কিছু লুকিয়ে রেখেছে অভি। পরী চোখের ইশারায় ঘটনার কথা জিজ্ঞেস করাতে অভি চোখ টিপে পরীকে চুপ করে যেতে ইশারা করে।
অরুনা, "ওই বারো শিবের মন্দিরের এক কোনায় একটা গাছ আছে। লোকেরা বলে ওখানে গিয়ে যদি সুত বাঁধে তাহলে নাকি মনস্কামনা পূরণ হয়। চল না আমরাও গিয়ে আমাদের মনের কথা চেয়ে ওখানে সুত বাধি?"
পরী অরুনার কোথায় হেসে ফেল আর ওরা সবাই মিলে যায় ওই গাছের দিকে। জীবনে প্রথম বার অভির যেন এক ভিখারির মতন নিজেকে মনে হল, ভগবানের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে অভি নিজের জন্য কিছু চাইবে।
অনেকক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকার পরে অভি মনে মনে চাইল, "আমি অরুন্ধুতি আর পুবালিকে আমার আর শুচিস্মিতার বিয়ের সময়ে সবার মাঝে যেন হেসে খেলে বেড়াতে দেখতে পারি।" অভি জানেনা ভগবান ওর মনের কথা শুনলেন কিনা, কিন্তু অভি প্রানপন চাইল যাতে ওর সেই ইচ্ছে পূরণ হোক।
অভির সীমানার মধ্যে পরীর পদক্ষেপ অভিকে উমত্ত করে তোলে। পরীর ঠোঁটের মিষ্টি হাসি, চোখের চোরা চাহনি, কোমর দুলিয়ে চলন, মধুর সুরে কথন, সব যেন কেমন স্বপ্ন বলে মনে হয় অভির। কিন্তু শক্ত পরী, নিজেকে অভির দুষ্টু হাতের নাগালের বাইরে রখতে সক্ষম হয়। প্রথম প্রথম পড়াশুনায় মন বসে না, কিন্তু পরীর কড়া শাসনের সামনে শেষ পর্যন্ত অভিকে মাথা নত করতে হয়। মাঝে মধ্যে একটু আলতো ঠোঁটের ছোঁয়া বা একটু নরম আঙ্গুলের স্পর্শ অভির গালে। দৃঢ়সঙ্কলপ পরী, যতদিন না পরীক্ষা শেষ হচ্ছে ততদিন নিজেকে ওর হাতের নাগালের বাইরে রাখবে।
দিন কয়েক পরে, এক সকালে অরুনা অভির বাড়িতে ফোন করে। অভি বসার ঘরে বসে খবরের কাগজ পড়ছিল, আর মা কলেজ যাবার জন্য তৈরি হচ্ছিলেন। পরী ফোন ধরে, অভি কান পেতে ওদের কথা শুনতে চেষ্টা করে কিন্তু শুধু হাসি আর ফিসফিস ছাড়া কিছুই কানে গেল না। মা বেড়িয়ে যাবার আগে পরীকে বাড়ির কি কি করতে হবে সব নির্দেশ দিয়ে গেল আর বলে গেল অভি যেন নিজের ঘর থেকে না বের হয়।
মা বেড়িয়ে যাবার পরে অভি নিজের ঘরে যাবার জন্য পা বাড়াল। পরী সকাল সকাল উঠে স্নান সেরে পুজো দেওয়া হয়ে গেছে। পর্দা সরিয়ে বসার ঘরে ঢুকল পরী, ঘর যেন ওর গায়ের রঙ্গে একটু আলোকিত হয়ে উঠল। সারা চেহারায় এক বিশুদ্ধতার আলোক ছটা বিচ্ছুরিত হচ্ছে। পরনে লাল পাড় হাল্কা হলুদ রঙের শাড়ি আটপৌরে ভাবে পরা গায়ে ছোটো হাতার লাল কাঁচুলি, পরীর সৌন্দর্য যেন শত গুন বর্ধিত করে তুলছে। মাথার চুল হাত খোঁপায় ঘাড়ের ওপরে বাঁধা, সদ্য স্নাত তাই ভিজে চুলের ডগা থেকে কিছু জল ওর শাড়ির পিঠের কিছু অংশ ভিজিয়ে দিয়েছে। সামনে যেন এক দেবী প্রতিমা দাঁড়িয়ে। হাতে কয়েক গাছা সোনার চুরি, হাত নাড়ার সময়ে টুং টাং করে বেজে ওঠে।
পরী অভির দিকে তাকিয়ে মিষ্টি হেসে বলে, "অরুন্ধুতি ফোন করেছিল।"
অভি, "হ্যাঁ তা জানি। তুমি যে রকম ভাবে কথা বলছিলে তাতে অন্য পাশে অরুনা ছাড়া আর কেউ হতে পারে না।"
পরী, "আমার সাথে আজ দেখা করতে চায়।"
অভি, "কোথায়?"
পরী, "আমাকে শুধু বলল যে নাগেরবাজারে যেন আমরা ওদের জন্য অপেক্ষা করি।"
অভি, "দাড়াও আমি ওকে কল করে জেনে নেই কোথায় নিয়ে যেতে চায়।"
পরী, "না তুমি ওকে কল করবে না, ও তোমাকে বলতে বলেছে যে আমাকে নিয়ে নাগেরবাজার যেতে, ব্যাস।"
অভি, "ওকি তোমাকে জানিয়েছে যে আমরা তারপরে কোথায় যাচ্ছি?"
পরী খিলখিল করে হেসে ফেলে, "কেন নিজের এত সুন্দরী বান্ধবীর ওপরে এতটুকু বিশ্বাস নেই তোমার?" পরী তখনো পর্দা ধরে দাঁড়িয়ে, অভির দিকে তাকিয়ে হাসছে।
অভি, "তুমি পর্দার পেছনে কেন নিজেকে লুকিয়ে রেখেছ, বেড়িয়ে এস পুরটা।"
পরী, "আমার কি মাথা খারাপ হয়েছে নাকি, যে তোমার সামনে বেড়িয়ে আসব। তুমি কখন কি করে বস তার কোন ঠিক আছে নাকি।"
অভি কপাল চাপড়ে বলে, "যাঃ বাব, একদম বদমাশ মেয়ে তুমি।" কিন্তু অভি উঠে দাঁড়ায়, এবারে সত্যি পরীর দিকে এগোনোর জন্য।
পরী দৌড়ে নিজের ঘরে চলে যায় আর দরজা বন্ধ করে দরজার ফাঁক দিয়ে অভির দিকে দেখতে থাকে।
পরী, "তুমি স্নান সেরে জামা কাপড় পরে আস তাড়াতাড়ি। অরুনা বলেছে দশটা নাগাদ ও নাগেরবাজারে আমাদের জন্য অপেক্ষা করে থাকবে। আমি চাই না তোমার জন্য আমাদের দেরি হোক।"
অভি জিজ্ঞেস করল, "তুমি কি পড়বে।"
পরী উত্তর দিল, "কেন, সবসময়ে যা পরি তাই পড়ব, শাড়ি।"
তাড়াতাড়ি স্নান সেরে বেড়িয়ে এল অভি। পরী শাড়ি পড়বে তাই ওকে তার সাথে সামঞ্জন্স্য রেখে পায়জামা পাঞ্জাবী পরে নিল না হলে ঠিক ভালো দেখাবে না। প্রেয়সীর চলন বলন আর পোশাকের রুচিশীলতায় কেউ বলতে পারবে না যে পরী গ্রাম থেকে আসা এক মেয়ে। পরীর পরনে সবুজ পাড়ের ঘিয়ে রঙের তাঁতের শাড়ি, আঁচলে ছোটো ছোটো ফুল আঁকা। শাড়ির সাথে মিলিয়ে সবুজ রঙের ছোটো হাতার গায়ের কাঁচুলি। চেহারায় প্রসাধনির চিহ্ন নেই তা সত্তেও গোলাপি ঠোঁটে জোড়া বেশ মিষ্টি দেখাচ্ছে আর গালে গোলাপি লালিমা মাখা। কপালে দুই বাঁকা ভুরুর মাঝে একটা ছোট্ট সবুজ রঙের টিপ, চোখের কোলে কাজল। গলায় একটা সরু সোনার হার ঠিক উপরি গলার নিচ পর্যন্ত নেমেছে। ডান দিকের এক চুলের গুচ্ছ গালের ওপরে দোল খায়। পরীর অপরূপ সৌন্দর্যে মোহিত হয়ে তাকিয়ে থাকে অভি, যেন লক্ষ্মী প্রতিমা।
এই বিশুদ্ধতার প্রতিমার রুপ চোখ দিয়ে দেখার। অভি ওর কাছে এসে দাঁড়িয়ে ওর মুখ আঁজলা করে হাতে ধরে মুখে নিজের দিকে তুলে ওর গভীর চোখের দিকে তাকায়। ছোট্ট করে কপালে একটা চুমু খায় অভি, প্রেমের আবেগে নয়, সস্নেহের চুম্বন এঁকে দেয়।
পরী লাজুক হেসে বলে, "আমরা কি যেতে পারি?"
অভি মাথা নাড়ায়, "হ্যাঁ মা ধরিত্রি, সর্বদা আপনার পেছন পেছন আছি।"
অরুনার কথা মতন অভি আর পরী ট্যাক্সি করে নাগেরবাজার পৌঁছে যায়। ওদের জন্য যেন আরও এক চমক অপেক্ষা করে ছিল।
গত তিন বছরে প্রথম বার অভি অরুনাকে শাড়ি পড়তে দেখে। অরুনার পরনে হাল্কা সবুজ রঙের শাড়ি। নাকে সোনার ফ্রেমের চশমা, মুখে কোনদিনই প্রসাধনী করে না, তাই সেদিনও ছিল না বিশেষ। অভি একটু দুরে দাঁড়িয়ে ওর সেই দেবী প্রতিমা দেখতে থাকে। অভি পরীর দিকে তাকায় অরুনা কে দেখে। পরীকে দেখে অরুনা দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরে। এঁকে অপরকে এর আগে কোনদিন দেখেনি তাও কেন জানিনা মনে হল অভির যে দুজন যেন দুজনকে আগে থেকেই চিনত। পরী অরুনাকে জড়িয়ে ধরে কপালে একটা ছোট্ট চুমু খায়। অভি কিছু দুরে দাঁড়িয়ে দেখে ওর জীবনের দুই দেবী সমান প্রতিমা, একজন অভির চোখের মণি আরেক জন ওর হৃদয়। পুবালি চুপ করে দাঁড়িয়ে ওদের দেখে আর মিটিমিটি হাসে। অভি পুবালিকে জিজ্ঞেস করে যে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে অরুনা, পুবালি মাথা নাড়িয়ে হেসে অরুনাকে দেখিয়ে বলে যে সেটা একটা চমক।
অরুনা পরীকে দেখে হেসে বলে, "শুচিদি আমি অভিকে ঈর্ষা করতে ইচ্ছে করছে গো। আমি যদি মেয়ে না হয়ে ছেলে হতাম তাহলে নিশ্চয় তোমার প্রেমে পড়তাম।"
পরী একটু লাজুক হেসে আদর করে ছোট্ট একটা চাঁটি মারে অরুনার গালে। অভি অরুনাকে জিজ্ঞেস করে যে ওরা কোথায় যাচ্ছে। অরুনা উত্তর দেয় যে দক্ষিণেশ্বর কালি মন্দির।
অভি অবাক হয়ে যায়, "কি? শেষ মেশ দক্ষিণেশ্বর? না।"
অরুনা, "তুই যেতে না চাইলে যাস না, কিন্তু আমরা মেয়েরা অখানেই যাবো।" এই বলে পরীর হাত ধরে হাটা দিল।
অগত্যা অভি, পুবালির দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়িয়ে ওদের পেছন পেছন চলতে শুরু করল।
ট্যাক্সির পেছনের সিটে বসে মেয়েরা পাখীর মতন কিচিরমিচির শুরু করে দিল। পুবালি যথারীতি চুপ মাঝে মধ্যে একটু আধটু কথা বলছে, আর অভি অগত্যা চুপ, ওকে কেউ কথা বলতে দিলে ত বলবে।
অরুনা পরীকে জিজ্ঞেস করে, "আচ্ছা শুচিদি, তুমি এই পাগলটার প্রেমে পড়লে কি করে?"
পরী আয়নায় অভির দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলে উত্তর দেয়, "ব্যাস যেন হয়ে গেল, যেদিন প্রথম এক দুজনকে দেখেছিলাম সেদিন কেন জানিনা মনে হয়েছিল যে ও শুধু আমার জন্যে এই পৃথিবীতে এসেছে।"
অভি চুপ করে সামনের শিতে বসে ওদের কথা শুনে যায়, পেছন থেকে পরী ওর মাথার পেছনে এক ছোট্ট চাঁটি মারে।
অরুনা খিলখিল করে হেসে বলে, "উম, কি রোম্যান্টিক ব্যাপার। ও পাগলের অনেক সাহস যে তোমাকে নিয়ে একা একা ওই দুর্গম পাহারে ঘুরতে গেছে, বাপরে ভাবলেই যেন গায়ে কাঁটা দেয় আমার। কেউ ত ভাবতেই পারেনা একা একা যাবার কথা, তায় আবার এমন এক জায়গায় যেখান কার নাম আমি আগে ত শুনিনি। তুমি ওই পাগলের সাথে গেলে কি করে?"
পরী হেসে অরুনাকে জিজ্ঞেস করে, "কেন সমুদ্রনীল তোকে কোথাও নিয়ে যায় না?"
অরুনা একটু ম্লান হেসে উত্তর দিল, "না গো শুচিদি, ও পুবালির মতন একটু মুখচোরা স্বভাবের, অভিমন্যুর মতন পাগল বা দুঃসাহসী ছেলে নয়। এ পাগলা ত যেখানে সেখানে ভিড়ে যায়। তুমি ওকে সামলাও কি করে?"
পরী কিছু উত্তর দেয় না, শুধু একটু হাসে অরুনার দিকে তাকিয়ে।
অরুনা, "জানো, যখন কলেজে এসেছিল, তখন যেন পাথরের মূর্তি ছিল। আমরা সবাই ওকে একটু এড়িয়ে চলতাম কেননা খুব গম্ভির ছিল আর আমরা সবাই ওকে নাক উঁচু বলে ভাবতাম। যেদিন আমার বোনকে বাঁচাল সেদিন আসল বিহারী বেড়িয়ে পড়ল ওই গম্ভির মুখোশের পেছন থেকে।"
পরী হেসে অরুনাকে বলে, "তোর মুখে ওই পাগলটার জন্য এত প্রশংসা কেন রে? ওর কথা ছাড় সমুদ্রনীলের কথা বল।"
ওদের কিচিরমিচির চলতে থাকে অনবরত। দক্ষিণেশ্বর পৌঁছে দেখে যে সেদিন মন্দির বেশ খালি। সপ্তাহের মাঝে এসেছে বলে মন্দির প্রাঙ্গনে ভিড় বিশেষ নেই। অভি ভাবল পুজোটা তাহলে একটু ভালো করেই দেওয়া যাবে। পুজো শেষে ওরা সবাই আবার গল্পে মেতে ওঠে।
অভি ওদেরকে পেছন থেকে দেখে, একজন ওর ভালবাসা আরেক জন ওর বান্ধবী। অভি আর পুবালি ওদের পেছন পেছন হাঁটছিল। অভি পুবালিকে ওর নাকের ব্যাথার কথা জিজ্ঞেস করে।
পুবালি অভির মুখের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে পরে, "মাঝে মাঝে জানিস খুব ব্যাথা করে, মাথাটা যেন খুব ভার হয়ে আসে। মাঝে মাঝে মনে হয় যেন আমি মরে যাব।"
অভি, "ডাক্তার কি বলছে।"
এর মাঝে অরুনা ওদের দিকে পেছন ফিরে তাকায়, অভি ওকে দেখে একটু হাসে।
পুবালি, "ডাক্তার আমাকে পরীক্ষা দিতে বারন করেছে, বলেছে মাথায় যেন কোন রকমের চাপ না নেই। একটা এম.আর.আই স্কান করাতেও বলেছে, আমার কিছু যেন মনে হচ্ছে।"
অভি চমকে ওঠে, "এত সব কবে ঘটে গেল? একবারের জন্য আমাকে জানাসনি ত?"
পুবালি, "দুদিন আগে আমি বাথরুমে পরে যাই আর নাক থেকে আবার রক্ত বের হতে শুরু করে।"
অভি, "আমাকে জানাসনি কেন?"
পুবালি, "তোকে কেন আবার জ্বালাতন করা, বাড়িতেই ত ছিলাম সবাই কাছে ছিল তাই আর তোকে জানান হয় নি।"
অভির বুকে থেকে এক দীর্ঘনিঃশ্বাস বেড়িয়ে পরে। পুবালি মাথা নিচু করে মন্দির প্রাঙ্গনের লাল মেঝের দিকে তাকিয়ে থাকে। অভি লক্ষ্য করে যে পুবালির নাকের ওপরে একফোঁটা চোখের জল। অভি চমকে যায় পুবালির চোখে জল দেখে। অভি একবার পরী আর অরুনার দিকে তাকায়, দুজনেই হাঁটতে হাঁটতে অনেকটা দূর এগিয়ে গেছে, দুজনেই গল্পে মশগুল।
পুবালি কান্না ভেজা গলায় অভিকে বলে, "আমাকে একটা কথা দিবি? অরুনাকে বলিস না যেন।"
অভি ওর কাঁধে হাত রাখে, "তোর কি হয়েছে?"
পুবালির গলার আওয়াজ শুনে বুকের ভেতর ককিয়ে এক অজানা ব্যাথা শুরু হয়ে যায় অভির।
পুবালি অভির দিকে জল ভরা চোখ নিয়ে তাকিয়ে বলে, "ডাক্তার জানিয়েছে যে আমার নাকের আর চোখের শিরা গুলো যে গুলো মাথার সামনের দিকের সাথে কানেক্টেড সেগুলোর অবস্থা ভালো নয়।"
ঠোঁট কেঁপে ওঠে পুবালির, "আমার হাতে খুব কম সময়, অভি। আমার কিছু হয়ে গেলে, সমুদ্রনীলকে বলিস অরুনাকে দেখার জন্য।"
পুবালির কথা শুনে মনে হল যেন একটা বিশাল ঢেউ অভির বুকের ওপরে আছড়ে পড়ল আর তছনছ করে দিল ওকে। পরী আর অরুনার দিকে তাকাল অভি, ওরা হাঁটতে হাঁটতে অনেক দুরে চলে গেছে। অভি নিরুপায় হয়ে মন্দির প্রাঙ্গনে দাঁড়িয়ে, ভাগ্য বিধাতার একি পরিহাস। দুহাতে পুবালিকে জড়িয়ে ধরে, মনে হয় যেন ওর সব ব্যাথা বেদনা যদি নিতে পারত তাহলে নিয়ে নিত নিজের বুকে। পুবালি পাথরের মূর্তির মতন দাঁড়িয়ে ওর বুকের ওপর মুখ গুঁজে কেঁদে ফেলে।
অভির সম্বিৎ ফেরে যখন অরুনা ওর পিঠের ওপরে আলতো করে এক চাঁটি মারে।
পরী অভির জল ভরা চোখের দিকে তাকিয়ে বলে, "কি হয়েছে তোমার?"
অভি পুবালিকে কথা দিয়েছে অরুনাকে বলা বারন তাই কথা ঘুরিয়ে বলল, "ও কিছু না, পুবালি সেই প্রথম দিনের কথা মনে করে একটু ইমোসানাল হয়ে পড়েছিল এই যা।"
অরুনা কিছুই বুঝতে পারল না ওদের মনের ব্যাথা, পুবালিকে হেসে বলল, "এই পাগলি, ওই কথা চিন্তা করে তোরা ইমোসানাল হয়ে পড়লি?"
অরুনা অভির দিকে তাকাল কিন্তু ওর মনের মধ্যের যে ঝড় বইছে সেটা অনুধাবন করতে পারল না। পরী অভির চোখে ঝরের পূর্বাভাস দেখে ঠাণ্ডা হয়ে যায়। ওই চোখের আড়ালে যেন অনেক কিছু লুকিয়ে রেখেছে অভি। পরী চোখের ইশারায় ঘটনার কথা জিজ্ঞেস করাতে অভি চোখ টিপে পরীকে চুপ করে যেতে ইশারা করে।
অরুনা, "ওই বারো শিবের মন্দিরের এক কোনায় একটা গাছ আছে। লোকেরা বলে ওখানে গিয়ে যদি সুত বাঁধে তাহলে নাকি মনস্কামনা পূরণ হয়। চল না আমরাও গিয়ে আমাদের মনের কথা চেয়ে ওখানে সুত বাধি?"
পরী অরুনার কোথায় হেসে ফেল আর ওরা সবাই মিলে যায় ওই গাছের দিকে। জীবনে প্রথম বার অভির যেন এক ভিখারির মতন নিজেকে মনে হল, ভগবানের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে অভি নিজের জন্য কিছু চাইবে।
অনেকক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকার পরে অভি মনে মনে চাইল, "আমি অরুন্ধুতি আর পুবালিকে আমার আর শুচিস্মিতার বিয়ের সময়ে সবার মাঝে যেন হেসে খেলে বেড়াতে দেখতে পারি।" অভি জানেনা ভগবান ওর মনের কথা শুনলেন কিনা, কিন্তু অভি প্রানপন চাইল যাতে ওর সেই ইচ্ছে পূরণ হোক।