প্রস্তাবনা
(Prologue)
যেখানে শুরু, সেখানে যদি শেষ না হয়, তবে সেই অসম্পূর্ণতা বয়ে বেড়ানোর মতো যন্ত্রণা আর দুটো নেই। মানুষের শরীর বুড়িয়ে যায়, মুখ বদলে যায়, সময় নিজের নিয়মে অনেক কিছু মুছে দেয়; অথচ কিছু অসমাপ্তি কখনও পুরোনো হয় না। তারা নীরবে মানুষের ভেতরে পড়ে থাকে, আর সময় যত এগিয়ে যায়, তাদের ভার তত বাড়তে থাকে।
যৌনতা কি পাপ? নাকি পাপের জন্ম হয় তখন, যখন শরীর আর ভালোবাসার ভাষা থাকে না, যখন একজন মানুষ নিজের সুখের জন্য অন্যের শরীরকে কেবল ভোগের উপকরণ বলে মনে করে? যৌনতা নিজে পবিত্র। একটি স্পর্শ থেকে জীবনের জন্ম হয়, জীবন থেকে সম্পর্ক, আর সম্পর্ককে ঘিরে গড়ে ওঠে একটি পৃথিবী। তাহলে সেই পবিত্রতার ভেতরে অপবিত্রতা আসে কোথা থেকে? চাওয়ার মধ্যে, নাকি নিজের চাওয়াকে অন্যের ওপর অধিকার বলে প্রতিষ্ঠা করার মধ্যে?
অহংকারও অদ্ভুত এক অনুভূতি। মানুষ যত ওপরে ওঠে, তত সহজে ভুলে যায় সে কোথা থেকে উঠে এসেছে। গাছের সৌন্দর্য ছড়িয়ে থাকে আকাশের দিকে, অথচ তার জীবনের ভিত্তি লুকিয়ে থাকে মাটির নিচে। শিকড়ের কোনো অহংকার নেই। গাছ যদি একদিন মনে করে, যে মাটি তাকে এত দিন ধরে রেখেছে, তা তার উচ্চতার যোগ্য নয়, তবে তার পতনের জন্য বড় কোনো ঝড়ের প্রয়োজন পড়ে না। সামান্য বাতাসই যথেষ্ট। গাছ যখন মাটিতে পড়ে যায়, মাটির তাতে কিছুই যায় আসে না। মাটি থেকে যায় নিজের জায়গায়। শুধু গাছটাই তখন বুঝতে পারে, এত দিন যে উচ্চতাকে সে নিজের শক্তি বলে ভেবেছিল, তার পেছনে আসলে অন্য কারও অবদান ছিল।
মানুষও ঠিক তেমন। সে নিজের চারপাশে একটা পৃথিবী তৈরি করে, তারপর একসময় সেই পৃথিবীকেই নিজের যোগ্যতার প্রমাণ বলে মনে করতে শুরু করে। ধীরে ধীরে ভুলে যায়, কোনো মানুষই একা বড় হয়ে ওঠে না।
সম্পর্কও নিঃশব্দে বদলে যায়। সব ভাঙনের আগে ঝড় ওঠে না। কয়েকটি না-বলা কথা, কিছু ভুল স্পর্শ আর নিজের ইচ্ছাকে একটু বেশি গুরুত্ব দেওয়াই কখনও কখনও যথেষ্ট। দুজন মানুষ পাশাপাশি থেকেও একসময় একে অপরের কাছে সম্পূর্ণ অচেনা হয়ে যেতে পারে।
হয়তো মানুষের সবচেয়ে বড় ভুল এখানেই—সে ভাবে, সময় সব ঠিক করে দেয়। অথচ সময় সব ঠিক করে না; সময় শুধু মানুষকে তার ব্যথার সঙ্গে বাঁচতে শেখায়। কিছু ক্ষত শুকিয়ে যায়, কিন্তু কিছু সিদ্ধান্তের পর মানুষের ভেতরে একটি প্রশ্ন চিরকাল থেকে যায়—সেদিন যদি অন্য রকম কিছু করতাম?
এই ‘যদি’ শব্দটাই অসম্পূর্ণতার সবচেয়ে দীর্ঘ ছায়া।
আর কখনও কখনও সেই অসমাপ্তির আলো এত অদ্ভুত হয়ে ওঠে যে ভোরকে দুপুর বলে মনে হয়, দুপুরের বুকেও সন্ধ্যার ছায়া নামে, আর বসন্ত এসেও কারও জীবনে বসন্ত হয়ে উঠতে পারে না।
ভোরের দুপুরে বসন্ত
অধ্যায় ১
❝ যে আলোকে ঘর ভেবেছিলাম ❞
The Light I Mistook for Home
বিয়ের সানাইয়ের সুরে চারপাশ তখন উৎসবমুখর। অথচ সেই সুরের প্রতিটি তীব্র টানের নিচে যেন জমাট বেঁধে ছিল এক শ্বাসরুদ্ধ নীরবতা। সুর যত উঁচুতে উঠছিল, পিঁড়িতে বসে থাকা মেয়েটির ততই মনে হচ্ছিল, সানাইটা একবার থেমে গেলেই চারপাশের পৃথিবী চিরকালের মতো নিথর হয়ে যাবে।
মেয়েটির মুখের ওপর লাল বেনারসির চওড়া ঘোমটা নেমে এসেছে। ভারী ঝুমকো, একের পর এক সোনার হার, হাতে চুড়ি আর কপালে নিখুঁত চন্দনের আলপনা—সব মিলিয়ে তাকে অপরূপ করে সাজানো হয়েছে। অথচ নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকানোর সুযোগ পেলে হয়তো সে নিজেকেই চিনতে পারত না। তার মনে হচ্ছিল, তাকে বিয়ে দেওয়ার জন্য নয়, বরং কোনো অদৃশ্য নাটকের দৃশ্যে পুতুলের মতো বসিয়ে রাখা হয়েছে।
মণ্ডপের সামনে ধূপের ধোঁয়া সরু রেখা হয়ে ওপরে উঠছিল। বাতাসে মিশে ছিল গোলাপজল, রজনীগন্ধা আর চন্দনের মিষ্টি সুবাস। তারই মধ্যে কোথা থেকে যেন এক অস্বাভাবিক, বিশ্রী গন্ধ ভেসে এল। প্রথমে ক্ষীণ, তারপর ক্রমশ তীব্র। গন্ধটা এতটাই ঘন, আঁশটে আর লবণাক্ত যে মেয়েটির পেট মোচড় দিয়ে উঠল। সে নাক কুঁচকে চারপাশে তাকাল, কিন্তু কারও মুখে বিরক্তির চিহ্ন নেই। আত্মীয়স্বজনেরা আগের মতোই হাসছে, গল্প করছে, যেন এই পবিত্র আয়োজনের মধ্যে অস্বাভাবিক কিছু ঘটেইনি।
শুধু মেয়েটির মনে হচ্ছিল, বাতাসের প্রতিটি কণা সেই গন্ধে ভারী হয়ে উঠেছে। ঘোমটার নিচে তার শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল।
পুরোহিতের মন্ত্রপাঠ ধীরে ধীরে অস্পষ্ট হয়ে এল।
শব্দগুলোর মাঝখানে অস্বাভাবিক দীর্ঘ বিরতি তৈরি হতে লাগল, যেন সময় এগিয়ে যাওয়ার বদলে বারবার কোথাও আটকে যাচ্ছে। ঠিক তখনই পাশে বসা বর সিঁদুরের কৌটো হাতে তুলে নিল।
মেয়েটির বুকের ভেতর হিমশীতল ভয় ছড়িয়ে পড়ল। সে পিছিয়ে যেতে চাইল, কিন্তু শরীর সাড়া দিল না। পা দুটো যেন পিঁড়ির সঙ্গে পেরেক দিয়ে আটকে রাখা হয়েছে। বরের হাত তার সিঁথির দিকে এগিয়ে আসতেই সানাইয়ের সুর থেমে গেল।
পুরোহিতের ঠোঁট স্থির হয়ে রইল। বাতাসে ভেসে থাকা ধূপের ধোঁয়াও যেন মাঝপথে থমকে গেল। মুহূর্তের মধ্যে গোটা মণ্ডপ এমন নিস্তব্ধ হয়ে পড়ল, যেন পৃথিবীর সমস্ত শব্দ কেউ একসঙ্গে নিভিয়ে দিয়েছে।
মেয়েটি আতঙ্কিত চোখে নিজের সিঁথির দিকে তাকাল।
লাল সিঁদুরের বদলে সেখানে আগে থেকেই কেউ লেপে রেখেছিল ঘন, উষ্ণ বীর্যের আস্তরণ। দৃশ্যটা এতটাই বিকৃত ও অবিশ্বাস্য ছিল যে প্রথম কয়েক মুহূর্ত সে বুঝতেই পারল না, আসলে কী দেখছে। মনে হচ্ছিল, কোনো উগ্র পশু তার কপাল আর সিঁথির খাঁজে নিজের নোংরা চিহ্ন রেখে গেছে।
সে কিছুক্ষণ নির্বাক হয়ে তাকিয়ে রইল। বরের হাত তখনও বাতাসে স্থির হয়ে আছে। সে কি দৃশ্যটা দেখতে পাচ্ছে, নাকি শুধু মেয়েটিই দেখতে পাচ্ছে?
পরক্ষণেই সেই ঘন তরল সিঁথির খাঁজ বেয়ে ধীরে ধীরে নেমে এল। কপাল পেরিয়ে ভ্রুর পাশ ঘেঁষে নাকের ডগায় পৌঁছল, তারপর ঠোঁটের কোণে গড়িয়ে পড়ল। কিছুটা ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে মুখের ভেতরে ঢুকে গেল, বাকিটা চিবুক বেয়ে গলায় নেমে এল।
সে হাত তুলে মুখ মুছতে চাইল, কিন্তু আঙুলগুলো নড়ল না।
চারপাশের মুখগুলোর দিকে তাকিয়ে সে বুঝতে পারল, সবাই যেন তার দিকেই তাকিয়ে আছে। কিন্তু সেই দৃষ্টিতে সহানুভূতি নেই, বিস্ময় নেই; আছে এক অদ্ভুত, নিষ্ঠুর কৌতূহল। সামনের সারিতে বসা এক বৃদ্ধের ঠোঁটের কোণে প্রথমে হাসি ফুটল। তারপর পাশের মানুষটিও দাঁত বের করে হেসে উঠল। মুহূর্তের মধ্যে একের পর এক পরিচিত মুখ একই বিকৃত হাসিতে ভরে গেল, যেন এতক্ষণ তারা সবাই এই মুহূর্তটারই অপেক্ষা করছিল।
মেয়েটি চিৎকার করতে চাইল। গলা দিয়ে কোনো শব্দ বেরোল না।
লোকগুলো ধীরে ধীরে তার দিকে ঝুঁকে আসছিল। কুয়াশার আবরণ ভেদ করে তাদের মুখ আরও কাছে এগিয়ে এল। হাসির মধ্যে এমন এক পরিচিত নিষ্ঠুরতা ছিল, যা মেয়েটিকে নিজের পরিচিত সম্পর্কগুলোর ওপর থেকে বিশ্বাস হারাতে বাধ্য করছিল। সে চোখ সরাতে পারছিল না, নড়তে পারছিল না, এমনকি নিজের মুখের ওপর গড়িয়ে পড়া সেই নোংরা তরলটুকুও মুছতে পারছিল না।
ঠিক তখনই ঘাড়ের কাছে কারও উষ্ণ নিশ্বাস অনুভব করল সে।
একজন পুরুষের কণ্ঠস্বর তার কানের কাছে ফিসফিস করে উঠল—
“এবার তো সব শেষ।”
মেয়েটির শরীর অবশ হয়ে এল। কথাটা যেন কানের ভেতর দিয়ে ঢুকে সরাসরি মস্তিষ্কে আঘাত করল। লজ্জা আর অপমানে সে চোখ বন্ধ করে ফেলল।
তারপর কোনোমতে উঠে দাঁড়িয়ে অন্ধের মতো দৌড় দিল। অন্ধকারের মধ্যে পথ হারিয়ে ছুটতে ছুটতে সে বুঝতেই পারল না কখন মণ্ডপ থেকে বেরিয়ে এসেছে। পেছনে তখনও যেন সেই হাসির শব্দ তাড়া করে আসছে। একসময় সে সোজা গিয়ে আছড়ে পড়ল অন্ধকার পিচঢালা রাস্তা চিরে দ্রুতগতিতে ছুটে আসা একটি গাড়ির হুডের ওপর।
ধড়ফড় করে বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। শ্বাস যেন গলার কাছে এসে আটকে গেল।
দীর্ঘশ্বাস ফেলে অরুন্ধতীর ঘুম ভাঙল।
বিছানার পাশের টেবিলে রাখা ফোনে অ্যালার্মের সুর ধীরে ধীরে বেজে চলেছে—‘তুমহে কোই অউর দেখ্যে তো জলতা হ্যায় দিল...’
কয়েক সেকেন্ড সে চোখ খুলল না। শুধু নির্জীবের মতো শুয়ে রইল। মনে হচ্ছিল, চোখ খুললেই আবার সেই মণ্ডপ দেখতে পাবে—লাল বেনারসি, কুয়াশা, বিকৃত মুখগুলো আর সেই অসহ্য গন্ধে ভরা পরিবেশ। ধীরে ধীরে চোখ খুলল সে।
সকাল হয়ে গেছে। জানালার পর্দার ফাঁক দিয়ে নরম রোদ ঘরের মেঝেতে এসে পড়েছে। বাইরে পাখির ডাক শোনা যাচ্ছে, দূরের কোনো বাড়িতে জলের কল খুলেছেন কেউ, আর রান্নাঘর থেকে ভেসে আসছে গরম তেলে কিছু ভাজার পরিচিত গন্ধ। সবকিছু স্বাভাবিক, অথচ তার শরীর এখনও স্বপ্নের সেই দমবন্ধ করা অন্ধকারের মধ্যেই আটকে আছে।
সে পাশে তাকাল। রিদু আর অনুপ গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। রিদুর মুখটা ভীষণ শান্ত, একেবারে দেবদূতের মতো। অনুপের এক হাত ছড়ানো রয়েছে ছেলের পিঠের ওপর। অরুন্ধতী ধীরে ধীরে বুকভরা একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল।
ছি! কী বিকৃত, ভয়ংকর একটা স্বপ্ন দেখেছে সে!
ধীরে ধীরে বিছানায় উঠে বসল অরুন্ধতী। ঘামে তার চুল কপালে লেপ্টে আছে, আর বুকের ওপর যেন অদৃশ্য কোনো পাথর চেপে বসে রয়েছে।
একটু নড়তেই সে টের পেল, ঘুমের মধ্যে তার শরীরেও কিছু শারীরিক প্রতিক্রিয়া ঘটেছে। বুকের দুই পাশে সংবেদনশীলতা বেড়েছে, আর নিচের পোশাকটিও ঘামে ভিজে অস্বস্তিকর হয়ে আছে।
স্বপ্নে সে ঘৃণায় চোখ বন্ধ করেছিল, অপমানে পালিয়ে যেতে চেয়েছিল। অথচ ঘুম ভাঙার পর শরীরের অনিচ্ছাকৃত প্রতিক্রিয়াগুলো তাকে আরও অস্বস্তিতে ফেলল। নিজের শরীরের ওপরও যেন মুহূর্তের জন্য তার আস্থা রইল না।
অন্যমনস্কভাবে হাত তুলে কপালের কাছে সিঁথিতে আঙুল ছোঁয়াল সে। শুকনো, পরিষ্কার—কিছুই নেই। তবু আঙুল সরিয়ে নেওয়ার পরও নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে রইল অরুন্ধতী। মনে হচ্ছিল, আঙুলের ডগায় যেন কিছু লেগে আছে—ঠান্ডা, আঠালো, অপবিত্র কোনো অনুভূতি। সে আঙুলগুলো পরস্পরের সঙ্গে ঘষল, কিন্তু মনের সেই অস্বস্তি দূর হলো না। স্বপ্নের স্পর্শ যেন এখনও তার শরীরের কোথাও আটকে রয়েছে।
বিছানা থেকে নেমে দাঁড়াল সে। খালি পা মেঝেতে পড়তেই শিরদাঁড়া বেয়ে অস্বস্তির একটা শীতল স্রোত বয়ে গেল। ভেজা পোশাকের স্পর্শে প্রতিটি পদক্ষেপে তার বিরক্তি আরও বাড়ছিল। জানালার কাছে পৌঁছেও সেই অস্বস্তি থেকে মুক্তি পেল না সে।
পর্দা সরিয়ে দিতেই সকালের আলোয় বাইরের পৃথিবীটা চোখে পড়ল। আকাশ পরিষ্কার, গাছের পাতায় সোনালি রোদের ছোঁয়া। পৃথিবীটা যেন অস্বাভাবিক রকম সুন্দর। অথচ কেউ জানে না, কয়েক মিনিট আগেও তার অবচেতনের ভেতরে একটা নরকীয় দৃশ্য কী ভয়ংকর তাণ্ডব চালিয়ে গেছে।
আর দেরি না করে ওয়াশরুমে ঢুকল অরুন্ধতী।
আয়নার সামনে দাঁড়াতেই চোখে পড়ল ক্লান্তির হালকা ছাপ আর সিঁথিতে একটি সরু, লালচে রেখা।
কলের নব ঘুরিয়ে ঠান্ডা জল দিয়ে হাত ভিজিয়ে সে সিঁথিটা মুছল। একবার, দুবার, তিনবার। কিন্তু রেখাটা মিলিয়ে গেল না; বরং ভেজা চুলের ফাঁকে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল, যেন তাজা রক্তের সরু দাগ।
শরীরের ভেতরের অস্বস্তি আর সহ্য করতে না পেরে সে দ্রুত পোশাক বদলে শাওয়ারের নিচে গিয়ে দাঁড়াল। গরম জলের ধারা মাথায় পড়তেই শরীরটা সামান্য কেঁপে উঠল। চোখ বন্ধ করে মুখটা জলের দিকে তুলে ধরল সে। সিঁথির সেই লাল রেখা ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে এল। জল কপাল বেয়ে নেমে নাকের পাশ ঘেঁষে ঠোঁটের কোণে পৌঁছল।
অরুন্ধতী হঠাৎ চোখ খুলে ফেলল। চমকে মুখটা সরিয়ে নিল জলের ধারা থেকে।
অনেকক্ষণ পর শাওয়ার বন্ধ করল সে। তোয়ালে দিয়ে চুল মুছতে মুছতে আয়নার সামনে এসে আবার সিঁথির দিকে তাকাল। এবার সেখানে কোনো লাল রেখা নেই। ভেজা চুলের ফাঁকে আয়নায় ফুটে উঠেছে তার পরিচিত মুখ। অরুন্ধতী গভীর শ্বাস নিয়ে ঘরে ফিরে এল।
কাঠের ওয়ারড্রব খুলে ধবধবে সাদা সুতির সালোয়ার-কামিজ বের করে পরে নিল সে। চুল আধা-শুকনো রেখেই ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসল। হেয়ার ড্রায়ার চালু করতেই তার তীক্ষ্ণ গুঞ্জনে শান্ত ঘরটা ভরে উঠল।
বিছানায় শুয়ে থাকা অনুপ নড়েচড়ে উঠল। একবার চোখ খুলে আবার বন্ধ করে বালিশে মুখ গুঁজে বিরক্তির ভান করে বলল, “অরু, বাইরে গিয়ে করো না। একটু ঘুমোতে দাও!”
অরুন্ধতী ড্রায়ারের শব্দ কমিয়ে আয়নার কাচে চোখ রেখে পেছনে তাকাল। অনুপের চুল এলোমেলো, এক হাত বালিশের নিচে আর অন্য হাতটা রিদুর পিঠের ওপর আগলে রাখা। রিদু তখনও নিষ্পাপ ঘুমে ডুবে আছে। অরুন্ধতী কিছুক্ষণ চুপ করে ওদের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর শান্ত গলায় বলল, “মশাই, ইতিমধ্যে আটটা বেজে গেছে। সাতটা থেকে ফোনে অ্যালার্ম বাজছে, খেয়াল আছে?”
অনুপ চোখ না খুলেই ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটিয়ে বলল, “আরে, ঘুম তো ভেঙেই গেছে। এমনি শুয়ে শুয়ে গানটা শুনছিলাম।”
অরুন্ধতী ড্রেসিং টেবিলের ওপর রাখা সিঁদুরের কৌটোটা হাতে তুলে নিল। কাঁপতে থাকা আঙুলের ডগায় সামান্য সিঁদুর নিয়ে আয়নায় নিজের মুখের দিকে তাকাল। আয়নায় ফুটে ওঠা অবয়বটায় তার পরিচিত সৌন্দর্যই ধরা পড়ছিল—টানা চোখ, উজ্জ্বল মুখ আর ভেজা চুলের মাঝখানে সিঁথির রক্তিম ছোঁয়া। স্বপ্নে দেখা সেই বিকৃত দৃশ্যটা যেন মুহূর্তের জন্য দূরে সরে গেল।
সিঁথিতে সিঁদুর ছুঁইয়ে অনুপের দিকে তাকিয়ে বলল, “অনুপ, এবার অন্তত ঘুম থেকে ওঠো। রিদুকে তুলে ব্রাশ করিয়ে দাও তো। মালতী মাসি এখনও এল না! আমি ব্রেকফাস্ট তৈরি করছি, সঙ্গে তোমার চা-টাও বসিয়ে দিচ্ছি। মালতী মাসির এটাই সমস্যা—ব্রেকফাস্টের সময় এলেই দেরি করবে।”
বিছানায় শুয়েই অনুপ হালকা হেসে বলল, “অরু, দাঁড়াও না। একটু বসো এখানে। আজ আমি নিজেই তোমাকে ধোঁয়া ওঠা চা বানিয়ে খাওয়াব।”
অরুন্ধতী আয়না থেকে মুখ ঘুরিয়ে চোখে মেকি বিরক্তি এনে বলল, “মশাই অনুপ, চা বানানোর আগে বিছানা থেকে উঠতে হয়। তারপর চা বানানো যায়!”
অনুপ একগাল হেসে দুটো হাত মাথার পেছনে রেখে বলল, “প্রতিদিন সকালে ঘুমজড়ানো চোখে তোমাকে এভাবে তৈরি হতে দেখতে যে কী ভালো লাগে! ইস, আমার বউটা কী সুন্দরী!”
অরুন্ধতী খুব ভালো করেই জানে, বিছানা ছেড়ে উঠতে চাইছে না বলেই অনুপ সকাল সকাল এত প্রশংসা করছে। ঠোঁটের কোণে হাসি চেপে রেখে সে শুধু বলল, “হ্যাঁ, অনুপ, আমি জানি। অনেক হয়েছে, এবার ওঠো!”
কথাটা বলে ঘর থেকে বেরিয়ে রান্নাঘরে চলে গেল সে। রান্নাঘর সবসময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা তার পুরোনো অভ্যাস। এই পরিচ্ছন্নতা নিয়েই মালতী মাসির সঙ্গে প্রায় প্রতিদিন তার কথাকাটাকাটি হয়।
চায়ের সসপ্যানটা গ্যাসের ওপর বসিয়ে অরুন্ধতী ফোনটা বের করল। তারপর মালতী মাসিকে ফোন করল।
ফোন কানে ধরে খানিকটা অনুযোগের সুরে বলল, “মালতী মাসি, বাড়িতে আসবে কখন? আর তো এখানে মাত্র কয়েকটা দিন আছি। এখন অন্তত সময়মতো এসো!”
ওপাশ থেকে উত্তর শুনে অরুন্ধতী একটু থামল। তারপর শান্ত গলায় বলল, “আচ্ছা, ঠিক আছে, এসো।”
‘আর কিছু দিন আছি’—কথাটা রান্নাঘরের পাশ দিয়ে ওয়াশরুমের দিকে যেতে যেতে অনুপের কানে এল। সে মনে মনে ভাবল, আজ যে করেই হোক, একটা নতুন ফ্ল্যাটের খোঁজ নিতেই হবে। আর দেরি করা চলে না। অরুন্ধতী কয়েক মাস ধরেই এ বিষয়ে তাকে অনুরোধ করছে।
ওয়াশরুমে তখন বাপ-ছেলের খুনসুটি চলছে। অনুপ ব্রাশে পেস্ট লাগিয়ে বলল, “রিদু, হা করো তো বাবা। আরেকটু বড় করে হা করো!”
রিদু মুখ হাঁ করতেই অনুপ চটপট তার দাঁত মেজে দিল।
রিদু বাবাকে একটু ভয় পায় বলে লক্ষ্মী ছেলের মতো চুপচাপ সব কথা শুনছিল। অরুন্ধতী থাকলে এতক্ষণে রিদুর জল ছিটানোর চোটে দুজনের জামাকাপড়ই ভিজে একাকার হয়ে যেত!
দাঁত মাজানো শেষ করে অনুপ রিদুকে শাওয়ারের নিচে দাঁড় করিয়ে স্নান করাতে শুরু করল। অরুন্ধতী ডাইনিং হল থেকে ওয়াশরুমের দরজার সামনে এসে ফোনের ক্যামেরা চালু করে হেসে বলল, “না, না, এই দৃশ্যগুলো রেকর্ড করে রাখা দরকার! ছেলে বড় হলে দেখে বুঝবে, তার বাবা তাকে কত কষ্ট করে স্নান করাত!”
অনুপ হেসে বলল, “অরু, আমিই তো রোজ ছেলেকে স্নান করাই। এটা আবার নতুন কী?”
অরুন্ধতী হেসে ফেলল। সত্যিই তো, সে নিজে ছেলেকে স্নান করাতে গেলে আদর করতে করতেই যা অবস্থা করে!
ভিডিও রেকর্ড করতে করতে অরুন্ধতী হাসছিল। অনুপ আর রিদুও হাসছিল তার সঙ্গে।
তোয়ালে দিয়ে রিদুর শরীর মুছিয়ে দিতে দিতে অনুপ বলল, “আহা, অরু! ভিডিও কোরো না তো! ছেলের বান্টু এখনও অনেক ছোট। তুমি আবার এই ভিডিও তুলে নির্ঘাত ফ্যামিলি গ্রুপে শেয়ার করে দেবে! ইস, নিজের ছেলের এই অপমান! ছোট বান্টুটার সঙ্গে এটা মোটেই ঠিক হচ্ছে না!”
অরুন্ধতী খিলখিল করে হেসে উঠল।
তারপর হাসতে হাসতেই বলল, “যেমন বাপ, তেমনই তার ছেলে!”
কথাটা বলার সময় অরুন্ধতী আর অনুপের চোখাচোখি হয়ে গেল। সে তাড়াতাড়ি চোখ সরিয়ে পরিস্থিতি সামলে বলল, “আচ্ছা শোনো, চা হয়ে গেছে। আমি কাপে ঢেলে টেবিলে দিচ্ছি। তুমি চা খেয়ে নাও, আমি ততক্ষণে ওকে কলেজের জন্য তৈরি করে দিচ্ছি।”
অরুন্ধতী ছেলেকে কোলে তুলে শোওয়ার ঘরের দিকে এগিয়ে গেল। রিদু বয়সে ছোট হলেও তার পাকা পাকা কথার শেষ নেই। আধো-আধো গলায় আমতা আমতা করে বলল, “মা, তাড়াতাড়ি রেডি করিয়ে দাও না। কলেজের ফ্রেন্ডরা মনে হয় আমার আগেই পৌঁছে যাবে!”
অরুন্ধতী আলতো করে ছেলের গালে চুমু খেয়ে বলল, “হ্যাঁ রে বাবা, তৈরি করে দিচ্ছি। শুনছ অনুপ, তোমার ছেলের কথা? বাড়ির চেয়ে নাকি কলেজ বেশি ভালো লাগে!”
ডাইনিং হলের জানালাটা আধখোলা। সকালের নরম রোদ এসে পড়েছে সোফার ওপর। সেখানে বসে ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছিল অনুপ। স্ত্রীর কথা শুনে হেসে বলল, “কার ছেলে দেখতে হবে তো! কলেজের প্রতি এই ভালোবাসাটা ও আমার থেকেই পেয়েছে।”
অরুন্ধতী ঘর থেকে জবাব দিল, “সবকিছুর কৃতিত্ব নিজে নেওয়াটা কিন্তু ঠিক নয়, বুঝলে?”
চা শেষ করে অনুপ কাপটা নিয়ে রান্নাঘরে গেল। ঠিক তখনই শোওয়ার ঘর থেকে অরুন্ধতীর কণ্ঠ ভেসে এল, “কাপটা দয়া করে ধুয়ে রেখো কিন্তু!”
অনুপ হেসে বলল, “তোমার কি সব জায়গাতেই চোখ আছে নাকি?”
“হ্যাঁ, আছে। কাপটা ধুয়ে রেখে দাও। মালতী মাসি কখন আসবে, তার তো কোনো ঠিক নেই!” অরুন্ধতী স্পষ্ট গলায় জানিয়ে দিল।
অনুপ লক্ষ্মী ছেলের মতো কাপটা ধুয়ে সিঙ্কে রেখে দিল। তারপর গামছা দিয়ে হাত মুছতে মুছতে শোওয়ার ঘরে এসে দাঁড়াল।
“কী ব্যাপার, রিদু? সময় হয়ে এসেছে। জলদি তৈরি হয়ে নাও। সকাল নটা বেজে গেল যে!”
রিদু মুখটা সামান্য নিচু করে আমতা আমতা করে বলল, “বাবা, কলেজ ভালো। কিন্তু সেখানকার কয়েকজন ছেলেকে আমার একদম ভালো লাগে না।”
অনুপ ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল, “কেন বাবা? কী হয়েছে?”
“এমনি...” ছোট্ট করে উত্তর দিল রিদু।
অরুন্ধতী ছেলের শার্টের বোতাম লাগাতে লাগাতে স্নেহের সঙ্গে বলল, “রিদু সোনা, প্লে-কলেজে তো সবাইকে বন্ধু বানাতে হয়। সবার সঙ্গে ভালো করে মিশবে আর সবসময় বাবা-মায়ের কথা শুনবে, কেমন? ব্যস, আমাদের রিদু একদম তৈরি!”
অনুপ হাত বাড়িয়ে বলল, “চল বাপ, তোমাকে কলেজে দিয়ে আসি।”
বাবার হাত ধরে রিদু যখন দরজার দিকে এগোচ্ছিল, অরুন্ধতী পেছন থেকে বলে উঠল, “অনুপ, কোলে তুলে নাও ওকে। হেঁটে হেঁটে ক্লান্ত হয়ে যাবে।”
রিদু সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করল, “না! আমি কোলে যাব না। আমি তো এখন বড় হয়ে গেছি, হেঁটেই যাব!”
ছেলের এমন গম্ভীর মুখ দেখে অনুপ আর অরুন্ধতী দুজনেই হেসে ফেলল। অনুপ রিদুর মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, “ঠিক বলেছিস বাপ, চল এবার।”
রিদুকে কলেজে পৌঁছে দিয়ে ফেরার পথে প্রয়োজনীয় কিছু বাজার ও মুদিখানার জিনিসপত্র কিনে বাড়ি ফিরল অনুপ। ততক্ষণে অরুন্ধতী ডাইনিং টেবিলে প্রাতরাশ আর তাজা ফলের রস সাজিয়ে রেখেছে।
ওয়াশরুমে গিয়ে হাত-মুখ ধুয়ে বেরিয়ে অনুপ দেখল, বিছানার ওপর তার ইস্ত্রি করা শার্ট-প্যান্ট, হাতঘড়ি আর ওয়ালেট গুছিয়ে রাখা। অরুন্ধতী সবকিছু যথাস্থানে সাজিয়ে দিয়েছে। অনুপ আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে পোশাক পরতে শুরু করল।
অরুন্ধতী ঘরে ঢুকে কিছুক্ষণ চুপচাপ তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ইতস্তত করে শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করল, “অনুপ, তুমি কোনোদিন এমন কোনো বাজে স্বপ্ন দেখেছ, যেটা দেখার পর মনটা ভয়ে একেবারে আচ্ছন্ন হয়ে যায়?”
অনুপ শার্টের বোতাম লাগাতে লাগাতে হালকা হেসে বলল, “স্বপ্নে আবার ভয় কীসের? না, আমি ওসব নিয়ে কোনোদিন ভাবিনি। কিন্তু হঠাৎ এমন প্রশ্ন কেন? তুমি আবার কোনো স্বপ্ন দেখেছ নাকি?”
অরুন্ধতী চোখ সরিয়ে নিয়ে এড়িয়ে যাওয়ার সুরে বলল, “না, তেমন কিছু নয়। এমনিই জিজ্ঞেস করলাম।”
“আচ্ছা...” অনুপ হাতঘড়ির স্ট্র্যাপ বাঁধতে বাঁধতে বলল, “মালতী মাসি আজ আসবে না নাকি?”
“কী জানি! তুমি বসো, আমি ডাইনিংয়ে ব্রেকফাস্ট সাজিয়ে দিয়েছি। খেয়ে নাও,” বলে অরুন্ধতী ডাইনিংয়ের দিকে এগিয়ে গেল।
দেওয়ালঘড়িতে তখন সকাল দশটা।
অনুপ তাড়াহুড়োয় প্রাতরাশ শেষ করতে পারল না। টেবিল থেকে উঠে ওয়াশবেসিনে গিয়ে হাত ধুয়ে নিল সে।
অরুন্ধতী অনুযোগের সুরে বলল, “আরেকটু খেয়ে যাও। এভাবে অর্ধেক খেয়ে উঠে গেলে হয়?”
“না অরু, আজ আর সময় নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌঁছেই একটা মিটিং আছে। ওখানে ক্যান্টিন থেকে কিছু একটা খেয়ে নেব,” ঘড়ির দিকে আরেকবার তাকিয়ে বলল অনুপ।
দরজার দিকে এগিয়ে জুতো পরতে পরতে হঠাৎ তার কিছু একটা মনে পড়ল। পেছন ফিরে অরুন্ধতীর চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, “আর শোনো, আজ ওই নতুন ফ্ল্যাটের ব্যাপারটা আমি যেভাবেই হোক খোঁজ নিয়ে আসব। কথা দিলাম।”
অরুন্ধতী তার দিকে তাকিয়ে মিষ্টি হেসে বলল, “You better...”
একটু থেমে চোখে দুষ্টুমির ছাপ এনে যোগ করল, “নাহলে কিন্তু...”
অনুপ ভ্রু তুলে মুচকি হেসে বলল, “নাহলে? নাহলে কী করবেন, ম্যাডাম?”
অরুন্ধতী হালকা হেসে মাথা নাড়ল। “কিছু না। তুমি যাও তো এখন! দেরি হয়ে যাচ্ছে।”
অনুপও ঠোঁটের কোণে হাসি চেপে দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে গেল।
নিচে নেমে গাড়ির কাছে দাঁড়িয়ে এক মুহূর্তের জন্য থামল সে। সকালের সোনালি রোদ তখন আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। কিছুক্ষণ রোদ গায়ে মেখে গাড়ির দরজা খুলে চালকের আসনে বসল অনুপ। ইঞ্জিন চালু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্দেশে রওনা দিল।
অনুপ বেরিয়ে যাওয়ার পর দরজাটা বন্ধ করে কিছুক্ষণ সেখানেই দাঁড়িয়ে রইল অরুন্ধতী।
বাড়িটা হঠাৎ অদ্ভুত রকম চুপচাপ হয়ে গেছে।
কয়েক মিনিট আগেও রিদুর হাসি, অনুপের গলার স্বর আর বাথরুমে জলের শব্দে সকালটা ছিল প্রাণবন্ত। এখন সেখানে শুধু দেওয়ালঘড়ির টিকটিক শব্দ।
সে আর দেরি করল না। শোওয়ার ঘরে ফিরে বিছানার চাদর আর বালিশের কভার একে একে খুলে ফেলল। বিছানার কোথাও সামান্য ভাঁজ পড়ে থাকাও সে সহ্য করতে পারে না। সবকিছু নিখুঁত ও পরিপাটি রাখার এই বাতিক তার দীর্ঘদিনের। ব্যবহৃত চাদর-কভারগুলো গুছিয়ে ওয়াশরুমের বাইরে রেখে দিল সে। তারপর ডাইনিং টেবিল থেকে প্রাতরাশের উচ্ছিষ্ট প্লেটগুলো সরিয়ে কাউন্টারটা ভালো করে মুছে পরিষ্কার করল।
রান্নাঘর আর শোওয়ার ঘরের কাজ সেরে ডাইনিং হলের লম্বা সোফায় এসে বসল অরুন্ধতী। সারা শরীরে তখন ক্লান্তি জমেছে।
রান্নাঘরের ঘড়িতে প্রায় এগারোটা বাজতে চলেছে। মালতী মাসির দুপুরের রান্না করতে আসার সময় হয়ে এসেছে। অরুন্ধতী ফোনটা হাতে নিয়ে আবার তাকে কল করল। কিন্তু রিং হতে থাকলেও ওপাশ থেকে কোনো সাড়া এল না। মালতী ফোন তুলল না। অরুন্ধতী মৃদু দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাবল, মাসি আজও হয়তো দেরি করেই পৌঁছাবে।
একাকী ঘরের নীরবতা কাটাতে কফি টেবিল থেকে নিজের ইংরেজি উপন্যাসটা তুলে নিল সে—Dream is Subconscious।
বইটার নাম যেন অদ্ভুত এক ইঙ্গিত নিয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল। পাতা খুলতেই ভোরের সেই বিদঘুটে স্বপ্নটা আবার বিদ্যুতের গতিতে তার মনে ফিরে এল। বইয়ের পাতা থেকে চোখ সরিয়ে নিল অরুন্ধতী। সারা শরীরে ঘৃণা আর অস্বস্তির অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ল।
স্বপ্নটা কেবল অশ্লীল বা কুরুচিপূর্ণ ছিল না; তার চেয়েও বড় কথা, সেই স্বপ্নের প্রতিটি স্তরে লুকিয়ে ছিল অপমান, ভয় আর অসহায়তার অনুভূতি। সেগুলো এখনও তার স্নায়ুকে অস্থির করে রাখছিল। সে দ্রুত বইটা বন্ধ করে টেবিলে রেখে দিল।
এই ভয়ংকর স্বপ্নের কথা চাইলেও কাউকে বলতে পারবে না সে। এর আগেও অরুন্ধতী এমন অদ্ভুত স্বপ্ন দেখেছে, কিন্তু আজকের মতো গভীর অপমানের অনুভূতি কখনও হয়নি। একবার অনুপকে সামান্য ইঙ্গিত দিয়ে কিছু বলতে চেয়েছিল। অনুপ তখন হালকা হেসে কথাটা উড়িয়ে দিয়েছিল—“ছোটদের মতো কোরো না তো, অরু! স্বপ্ন দেখে আবার কেউ ভয় পায় নাকি? স্বপ্ন তো ভালো জিনিস। ওসব নিয়ে ভেবো না।”
অনুপের সেই হাসির আড়ালে থাকা উদাসীনতা অরুন্ধতীকে আরও গুটিয়ে দিয়েছিল। এরপর আর কখনও নিজের এই ভয় নিয়ে তার সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করেনি সে।
বিয়ের পর প্রায় ছয় বছর কেটে গেছে। এই সময়ের মধ্যে ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রামের মতো কোনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও ব্যবহার করে না অরুন্ধতী। অনুপের অপছন্দের কথা মাথায় রেখে এবং ডিজিটাল জগতের ওপর তার একধরনের নীরব নিয়ন্ত্রণের কারণে সে নিজেকে এসব থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছে।
সোফায় একটু নড়েচড়ে বসে ফোনের স্ক্রিন জ্বালাল অরুন্ধতী। কোনো সাধারণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নয়, ব্রাউজার খুলে সরাসরি প্রবেশ করল একটি চ্যাটরুমে।
সেখানে সবাই বেনামী; কারও আসল পরিচয় কেউ জানে না। এই ভার্চুয়াল জগতে নির্দিষ্ট কোনো নিয়ম বা সেন্সরশিপ নেই। যে যার মতো নিজের ফ্যান্টাসি, অবদমিত ইচ্ছা কিংবা ভয় নিয়ে লিখে যায়। প্রায় চার-পাঁচ বছর ধরে গোপনে এই ফোরামের সঙ্গে যুক্ত অরুন্ধতী।
সে সচরাচর কারও সঙ্গে ব্যক্তিগত কথোপকথনে জড়ায় না। তবে অন্য সদস্যদের অদ্ভুত সব স্বপ্ন এবং সেগুলোর মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা মনোযোগ দিয়ে পড়ে। নিজের ক্ষেত্রে সে কেবল তার ভয়ংকর ও অস্বাভাবিক স্বপ্নগুলো ‘Dream Queen’ ছদ্মনামে পোস্ট করে।
অদ্ভুত ব্যাপার হলো, এই ভার্চুয়াল জগতের কয়েকজন সদস্য তার স্বপ্নগুলোকে শুধু বিকৃত দৃষ্টিতে দেখে না; বরং কেউ কেউ সেগুলোর গভীরে গিয়ে সূক্ষ্ম মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করে। সেই ব্যাখ্যাগুলো অনেক সময় অরুন্ধতীর নিজের কাছেও যুক্তিসংগত বলে মনে হয়।
আর দেরি করল না সে। ভোরের সেই মণ্ডপের নরকীয় দৃশ্য, সিঁথিতে অস্বাভাবিক তরলের উপস্থিতি আর চারপাশের মানুষগুলোর পৈশাচিক হাসি—সবকিছু গুছিয়ে একটি ছোট পোস্ট লিখল। তারপর সেটি চ্যাটরুমের ওয়ালে প্রকাশ করতে গেল।
পোস্ট বাটনে আঙুল ছোঁয়ানোর ঠিক মুহূর্তে তার হাত সামান্য কেঁপে উঠল। অচেনা অপরাধবোধ আর তীব্র সংকোচে বুকটা ছ্যাঁৎ করে উঠল তার। সে কি ঠিক করছে?
কিন্তু পরমুহূর্তেই মনের ভেতরে জমে থাকা অস্বস্তি কিছুটা কমানোর তাগিদে আর দ্বিধা করল না। আঙুল দিয়ে ‘Send’ বাটনটি টিপে দিল।
ঠিক সেই মুহূর্তেই ড্রয়িংরুমের দরজায় বেজে উঠল ডোরবেল—টিং-টিং-টং!
আচমকা শব্দে অরুন্ধতী কয়েক সেকেন্ডের জন্য শিউরে উঠল। বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠলেও দ্রুত নিজেকে সামলে নিল সে। এতক্ষণে মালতী মাসি ছাড়া আর কারও আসার কথা নয়।
ভারী শ্বাস কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এনে সোফা থেকে উঠে দাঁড়াল অরুন্ধতী। তারপর সামান্য বিরক্ত মুখে দরজাটা এক টানে খুলে বলে উঠল, “মাসি! আজ এত দেরি করলে যে?”