Thread Rating:
  • 9 Vote(s) - 1.89 Average
  • 1
  • 2
  • 3
  • 4
  • 5
Adultery সিনথিয়ার গোপন ডায়েরি
#1
এই গল্পটা সিনথিয়ার। গল্পে ঢোকার আগে তাকে চেনো — ভালো করে চেনো। কারণ এই মেয়েটার শরীরে, মনে, প্রতিটা নিঃশ্বাসে যা ঘটতে চলেছে, তা বুঝতে হলে জানতে হবে সে কে, কোথা থেকে এসেছে, কী স্বপ্ন দেখে।
সিনথিয়ার বয়স আঠারো। এই বছরের জুলাই মাসে সে আঠারোতে পা দিয়েছে — ভোটার হওয়ার বয়স, নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়ার বয়স, অন্তত কাগজে-কলমে। ঢাকার মিরপুরের একটি নামকরা মহিলা কলেজে সে এখন এইচএসসি দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী, মানবিক বিভাগে। পড়াশোনায় সে মোটামুটি ভালোই — এসএসসিতে জিপিএ-৫ পেয়েছিল, যদিও বোর্ড বৃত্তি পায়নি বলে বাবা একটু মন খারাপ করেছিলেন। শিক্ষকরা তাকে চেনেন শান্ত, ভদ্র, মনোযোগী ছাত্রী হিসেবে — যে মেয়ে ক্লাসের পেছনের বেঞ্চে বসে জানলার দিকে তাকিয়ে থাকে, কিন্তু প্রশ্ন করলে ঠিকঠাক উত্তর দেয়।
দেখতে সিনথিয়া কেমন? আয়নার সামনে দাঁড়ালে সে আজকাল নিজেকেই চিনতে পারে না। মাত্র দুই বছর আগেও যে মেয়েটা ছিল রোগা-পাতলা, চ্যাপ্টা বুকের এক কিশোরী, আজ সে এক পরিপূর্ণ যুবতী। তার উচ্চতা পাঁচ ফুট তিন ইঞ্চি, ওজন চুয়ান্ন কেজির মতো — না রোগা, না মোটা, ঠিকঠাক ভরাট। গায়ের রং গমের মতো — না ফর্সা, না কালো, এমন এক উষ্ণ বাদামি আভা যা রোদে পড়লে ঝলমল করে ওঠে। কোমর ছাড়িয়ে যাওয়া লম্বা কালো চুল সে সাধারণত একটা মোটা বেণি করে রাখে, বেণিটা পিঠের ওপর দুলতে থাকে হাঁটার তালে। কিন্তু রাতে ঘরে একা থাকলে সে বেণি খুলে দেয় — তখন চুলগুলো পিঠের ওপর কালো ঢেউয়ের মতো ছড়িয়ে পড়ে।
তার চোখদুটো ডাগর, কালো — আর চোখে হালকা কাজল তার দুর্বলতা। কলেজের নিয়মে সাজগোজ নিষেধ, কিন্তু কাজলটা সে ছাড়তে পারে না — "চোখে কাজল না দিলে মনে হয় মুখটাই অসম্পূর্ণ," সে বান্ধবীদের বলে। ঠোঁটদুটো স্বাভাবিকভাবেই গোলাপি, নরম। হাসলে গালে অল্প টোল পড়ে — এই টোলটার জন্য পাড়ার খালারা বলে, "মেয়েটার হাসি তো মন কেড়ে নেয়!"
আর তার শরীরের গড়ন? এই নিয়ে কলেজের মেয়েরা ঈর্ষা করে, ছেলেরা আড়চোখে তাকায়। বুকের মাপ চৌত্রিশ — স্তনদুটো এখন পুরোপুরি গঠিত, গোল আর ভারী, টাইট কামিজ পরলে স্পষ্ট বোঝা যায়। কোমর আটাশ ইঞ্চির মতো সরু, আর নিতম্ব ছত্রিশ — সালোয়ার পরলেও পেছনের বাঁকটা লুকানো যায় না। পাড়ার দর্জি যখন তার কামিজের মাপ নেয়, লজ্জায় সিনথিয়ার গাল লাল হয়ে যায় — বুকের মাপ নেওয়ার সময় দর্জি খালা বলেন, "মেয়েটার ফিগার তো একদম নায়িকাদের মতো হয়েছে!" খালা-চাচিরা আড়ালে বলেন, "এই মেয়ের বিয়েতে ভালো বরের অভাব হবে না।" এইসব কথা শুনে সিনথিয়া লজ্জা পায়, কিন্তু ভেতরে ভেতরে একটা চাপা গর্বও হয়।
Like Reply
Do not mention / post any under age /rape content. If found Please use REPORT button.
#2
সন্ধ্যা নামছিল ঢাকার মিরপুরে। দশ নম্বর গোলচত্বরের দিক থেকে ভেসে আসছিল গাড়ির হর্ন, রিকশার বেল আর দূরের কোনো ছাদ থেকে ভেসে আসা হালকা গানের সুর। পাঁচতলা বাড়ির চারতলার ছোট্ট ফ্ল্যাটটার বারান্দায় দাঁড়িয়ে সিনথিয়া দেখছিল নিচের রাস্তায় মানুষের ভিড়। সেপ্টেম্বরের শেষ দিক, বাতাসে হালকা শীতের আভাস, কিন্তু দিনের গরমটা তখনও পুরোপুরি যায়নি।

সিনথিয়ার বয়স আঠারো। গত জুলাইয়ে সে আঠারোতে পা দিয়েছে — প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার বয়স, কাগজে-কলমে নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়ার বয়স। মিরপুরের একটি নামকরা মহিলা কলেজে সে এখন এইচএসসি দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী, মানবিক বিভাগে। পড়াশোনায় মোটামুটি ভালোই — এসএসসিতে জিপিএ-৫ পেয়েছিল। শিক্ষকরা তাকে চেনেন শান্ত, ভদ্র, মনোযোগী ছাত্রী হিসেবে।

দেখতে সিনথিয়া কেমন? উচ্চতা পাঁচ ফুট তিন ইঞ্চি, ওজন চুয়ান্ন কেজির মতো — না রোগা, না মোটা, ঠিকঠাক ভরাট। গায়ের রং গমের মতো — না ফর্সা, না কালো, এমন এক উষ্ণ বাদামি আভা যা রোদে পড়লে ঝলমল করে। কোমর ছাড়িয়ে যাওয়া লম্বা কালো চুল সে সাধারণত একটা মোটা বেণি করে রাখে, বেণিটা পিঠের ওপর দুলতে থাকে হাঁটার তালে। চোখদুটো ডাগর, কালো — আর চোখে হালকা কাজল তার দুর্বলতা। কলেজের নিয়মে সাজগোজ নিষেধ, কিন্তু কাজলটা সে ছাড়তে পারে না। ঠোঁটদুটো স্বাভাবিকভাবেই গোলাপি, নরম। হাসলে গালে অল্প টোল পড়ে।

আর তার শরীরের গড়ন? এই নিয়ে কলেজের মেয়েরা ঈর্ষা করে, ছেলেরা আড়চোখে তাকায়। বুকের মাপ চৌত্রিশ — স্তনদুটো এখন পুরোপুরি গঠিত, গোল আর ভারী, টাইট কামিজ পরলে স্পষ্ট বোঝা যায়। কোমর আটাশ ইঞ্চির মতো সরু, আর নিতম্ব ছত্রিশ — সালোয়ার পরলেও পেছনের বাঁকটা লুকানো যায় না। পাড়ার দর্জি যখন তার কামিজের মাপ নেয়, লজ্জায় সিনথিয়ার গাল লাল হয়ে যায় — বুকের মাপ নেওয়ার সময় দর্জি খালা বলেন, "মেয়েটার ফিগার তো একদম নায়িকাদের মতো হয়েছে!" এইসব কথা শুনে সিনথিয়া লজ্জা পায়, কিন্তু ভেতরে ভেতরে একটা চাপা গর্বও হয়। রাস্তায় হাঁটার সময় যখন কোনো ছেলে ঘুরে তাকায়, সিনথিয়া প্রথমে লজ্জা পেত, এখন এক ধরনের অদ্ভুত ভালো লাগা কাজ করে। যেন তার শরীরের মধ্যে কোনো গোপন শক্তি আছে, যা সে নিজেও পুরোপুরি বোঝে না।

গত দুই বছরে তার শরীরে যে পরিবর্তনগুলো এসেছে, সেগুলো সে নীরবে লক্ষ্য করেছে। গোসলের সময় আয়নায় নিজেকে দেখে সে অবাক হয় — স্তনের বোঁটাদুটো এখন গাঢ় বাদামি আর আগের চেয়ে বড়, স্পর্শ করলেই কেমন শিরশির করে। তলপেটের নিচে ঘন কালো লোমের আস্তরণ। উরুদুটো আগের চেয়ে ভারী আর নরম হয়েছে। এইসব পরিবর্তন নিয়ে তার মনে হাজারো প্রশ্ন, কিন্তু জিজ্ঞেস করার মতো কেউ নেই। মা'র সঙ্গে এসব কথা বলা যায় না — মা শুনলেই চোখ পাকিয়ে বলবে, "লজ্জা করে না?"

স্বভাবে সিনথিয়া দুই রকমের মেয়ে। বাইরে থেকে — শান্ত, ভদ্র, বাধ্য। বাবা-মা'র কথা শোনে, শিক্ষকদের সম্মান করে। কিন্তু ভেতরে ভেতরে সে অন্য মানুষ — কৌতূহলী, স্বপ্নালু, প্রশ্নে ভরা। রাতে বিছানায় শুয়ে সে ভাবে — আকাশের ওপারে কী আছে, ভালোবাসা আসলে কেমন হয়। তার সবচেয়ে বড় গুণ — সে গোপন রাখতে পারে। নিজের মনের কথা সে কাউকে বলে না, এমনকি নাবিলাকেও না — অন্তত সবটা না।

তার পরিবারটা মধ্যবিত্ত, ছোট। বাবা মতিউর রহমান — মতিঝিলের একটি বেসরকারি ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার। গম্ভীর, কম কথা বলেন, সকাল আটটায় বেরিয়ে ফেরেন রাত আটটায়। কিন্তু মেয়ের ব্যাপারে তার চোখে আলাদা নরম ভাব — সিনথিয়া জানে, বাবা তাকে চোখে হারান। মা শাহানা বেগম — গৃহিণী। রান্না, ঘর গোছানো, পাড়ার মহিলাদের সঙ্গে গল্প — এই তার পৃথিবী। তবে মেয়ের পড়াশোনা নিয়ে তার স্বপ্ন আকাশছোঁয়া। আর ছোট ভাই সিয়াম — অষ্টম শ্রেণিতে পড়ে, দুষ্টুর শিরোমণি। সারাদিন মোবাইলে গেম, রাতে কোনোমতে পড়া, আর দিদির পেছনে লাগা তার প্রিয় কাজ।

মা'র একটা চোখ সবসময় সিনথিয়ার ওপর — ওড়না ঠিকমতো আছে কি না, কোন ছেলের সঙ্গে কথা বলল, ফোনে কতক্ষণ কী করল। "বড় হচ্ছিস, এখন সাবধানে চলতে হবে," মা প্রায়ই বলেন। একদিন বলেছিলেন, "ভালো মেয়েরা এসব নিয়ে ভাবে না।" সিনথিয়া সেদিন কিছু বলেনি। কিন্তু রাতে বিছানায় শুয়ে ভেবেছিল — তাহলে কি আমি ভালো মেয়ে নই? এই প্রশ্নটা তার বুকের ভেতর কাঁটার মতো বিঁধে আছে — আজও।

ফ্ল্যাটটা তিন বেডরুমের — বাবা-মা'র ঘর, সিয়ামের ঘর, আর সবচেয়ে ছোট ঘরটা সিনথিয়ার। এই ঘরটাই তার দুর্গ — একটা চৌকি, একটা পড়ার টেবিল, একটা আলমারি, দেয়ালে ছোট্ট আয়না। জানলার পাশে টেবিল — পড়তে পড়তে বাইরে তাকানো যায়। সবচেয়ে বড় সুবিধা — দরজায় ছিটকিনি আছে। দরজা বন্ধ করলেই সে নিজের পৃথিবীতে, কেউ ঢুকতে পারে না।

স্মার্টফোনটা সিনথিয়া পেয়েছিল এসএসসির রেজাল্টের পর — জিপিএ-৫ পাওয়ার খুশিতে বাবার উপহার। মাঝারি দামের অ্যান্ড্রয়েড, কিন্তু সিনথিয়ার কাছে তা যেন জাদুর বাক্স। ফেসবুক, টিকটক, মেসেঞ্জার — আর রাতে ঘরের আলো নিভিয়ে গল্প পড়া। ফোনটা ধীরে ধীরে হয়ে উঠেছে তার গোপন জানালা — বাইরের এক বিশাল, অজানা পৃথিবীর দিকে।

তার সবচেয়ে কাছের বান্ধবী নাবিলা। নাবিলা সিনথিয়ার চেয়ে এক বছরের বড়, কিন্তু একই ক্লাসে পড়ে — এক বছর ড্রপ দিয়েছিল অসুস্থতার জন্য। নাবিলা অনেক বেশি সাহসী, অনেক বেশি "মডার্ন"। জিন্স-টপ পরে কলেজে আসে, ছেলেদের সঙ্গে হেসে কথা বলে, আর মাঝে মাঝে এমন সব কথা বলে যে সিনথিয়ার কান গরম হয়ে যায়। নাবিলা যেন সিনথিয়ার ভবিষ্যৎ — যা সে হতে চায়, কিন্তু এখনও হতে পারেনি। আরেক বান্ধবী তানিশা — শান্ত, ভদ্র, পড়ুয়া। এই তিনজনের দলটা কলেজে বেশ পরিচিত।

আর আরিফ? আরিফ পড়ে পাশের ছেলেদের কলেজে, দ্বিতীয় বর্ষে। লম্বা, ফর্সা, চোখে চশমা। প্রথম দেখা গত মাসে — কলেজের সামনের ফুচকার দোকানে। সিনথিয়া বান্ধবীদের সঙ্গে ফুচকা খাচ্ছিল, আরিফ বন্ধুদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে ছিল। হঠাৎ চোখাচোখি — আরিফ হাসল। সেই হাসিটা সিনথিয়ার বুকের ভেতর কোথায় যেন গেঁথে গেল। সারারাত সে ঘুমাতে পারেনি, বারবার মনে পড়ছিল সেই হাসি। নাবিলা ব্যাপারটা ধরে ফেলেছে, আর এখন সুযোগ পেলেই খোঁচা দেয় — "তোর আরিফ ভাইয়া!" সিনথিয়া লজ্জায় লাল হয়, কিন্তু ভেতরে ভেতরে ভালোও লাগে। এটাই কি ভালোবাসা? নাকি শুধুই ভালো লাগা? সে জানে না। কেউ তাকে শেখায়নি।

সেদিন সকালটা শুরু হয়েছিল অন্য সব দিনের মতোই। সকাল সাড়ে ছয়টায় মা'র ডাক — "সিনথিয়া! উঠ, কলেজ আছে!" সে চোখ কচলে উঠে বাথরুমে গেল, তারপর নাস্তার টেবিলে বসল। গরম পরোটা, ডাল আর ডিম ভাজি। বাবা খবরের কাগজ পড়তে পড়তে বললেন, "সামনে টেস্ট পরীক্ষা, মন দিয়ে পড়।" সিনথিয়া মাথা নাড়ল, যদিও তার মন তখন অন্য কোথাও। তৈরি হয়ে সে আয়নার সামনে দাঁড়াল — সাদা-নীল সালোয়ার কামিজ, ওড়নাটা বুকের ওপর সুন্দর করে বিছানো। চুলে বেণি, চোখে হালকা কাজল। রিকশায় কলেজ যাওয়ার পথে সে দেখল রাস্তার ছেলেরা তাকাচ্ছে। কলেজ গেটে ঢোকার মুখে সে দেখল আরিফকে — পাশের ছেলেদের কলেজের গেটে বন্ধুদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে চা খাচ্ছে। সিনথিয়ার বুকটা ধড়াস করে উঠল। সে মাথা নিচু করে হেঁটে গেল, কিন্তু চোখের কোণে দেখল — আরিফ তাকিয়ে আছে! এক সেকেন্ডের জন্য চোখাচোখি হলো, আরিফ হাসল — সেই চেনা, মিষ্টি হাসি। সিনথিয়া দ্রুত চোখ সরিয়ে নিল, কিন্তু সারাদিন ওই হাসিটা তার মাথায় ঘুরল। টিফিনে নাবিলা তার ভাবনা ধরে ফেলল। "তোর আরিফ ভাইয়া আজ তোকে দেখে হাসল, আমি নিজের চোখে দেখেছি!" সিনথিয়া লজ্জায় লাল হলো, "ধুর, এমনি হেসেছে।" "এমনি এমনি কেউ হাসে না, পাগলি," নাবিলা চোখ টিপল।

সেদিনটা ছিল বুধবার। কলেজ থেকে ফিরে সিনথিয়া দুপুরের খাবার খেয়ে ঘরে শুয়ে ফোন ঘাঁটছিল। হঠাৎ ফেসবুকে একটা নোটিফিকেশন এলো — "Nabila Rahman added you to the group ? Only 18+ ?"। সিনথিয়ার ভ্রু কুঁচকে গেল। কিসের গ্রুপ? সে মেসেঞ্জারে নাবিলাকে লিখল, "এটা কী গ্রুপ রে?"

নাবিলার জবাব এলো প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই, সঙ্গে একটা দুষ্টু ইমোজি — "ঢুকে দেখ, মজা পাবি। কিন্তু খবরদার, বাসায় কেউ থাকতে খুলবি না!"

সিনথিয়ার বুকটা ধড়াস করে উঠল। সে লিখল, "কেন? কী আছে ওতে?" নাবিলা: "ঢুকলেই বুঝবি। আর শোন — ভয় পাস না। আমি আছি।" সিনথিয়া ফোনটা রেখে দিল, কিন্তু আঙুলগুলো তখনও কাঁপছিল। কী এমন আছে ওই গ্রুপে, যা বাসায় কেউ থাকতে দেখা যাবে না, আর যার জন্য নাবিলা তাকে "ভয় পাস না" বলছে? তার আঙুলটা গ্রুপের নামের ওপর ঘোরাফেরা করল, কিন্তু সে ঢুকল না। মা পাশের ঘরেই ছিল, সিয়াম ড্রয়িংরুমে টিভি দেখছিল। "পরে দেখব," ভেবে সে ফোনটা রেখে দিল। কিন্তু সারাটা বিকেল তার মনটা ওই গ্রুপের দিকেই পড়ে রইল। পড়ার টেবিলে বসে সে বইয়ের পাতা ওল্টাল ঠিকই, কিন্তু একটা অক্ষরও মাথায় ঢুকল না।

রাতের খাবারের টেবিলে পুরো পরিবার একসঙ্গে বসেছিল — এটা তাদের বাড়ির নিয়ম। মা ভাত বাড়তে বাড়তে বললেন, "শুনলাম পাশের বাসার রুমি মেডিকেলে চান্স পেয়েছে। তুইও তো পারবি, তাই না?" সিনথিয়া ভাত নাড়তে নাড়তে বলল, "আমি তো মানবিকে পড়ি মা, মেডিকেলে যাব কী করে?" বাবা হেসে বললেন, "তোমার মেয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বে, দেখো।" সিয়াম মুখ বেঁকিয়ে বলল, "আপু সারাদিন ফোন টেপে, পড়ে কখন?" সিনথিয়া টেবিলের নিচে ভাইয়ের পায়ে লাথি মারল। "আহ!" সিয়াম চিৎকার করল, মা চোখ পাকালেন, "খাওয়ার সময় মারামারি!" সবাই হেসে ফেলল। এই হাসি-ঠাট্টার মধ্যেও সিনথিয়ার মন ছিল অন্য জায়গায় — ফোনে আসা ওই নোটিফিকেশনটার দিকে। তার বুকের ভেতর কৌতূহলটা পোকামাকড়ের মতো কুটকুট করছিল। সে তাড়াতাড়ি খাওয়া শেষ করে ঘরে চলে গেল।

ঘরে এসে সে বই খুলল ঠিকই, কিন্তু মন বসল না। ড্রয়িংরুম থেকে ভেসে আসছিল টিভির শব্দ — বাবা নাটক দেখছেন, সিয়াম মোবাইলে গেম খেলছে। হঠাৎ টিভিতে নায়ক-নায়িকা কাছাকাছি এলো, পেছনে রোমান্টিক গান। মা দ্রুত চ্যানেল বদলে দিলেন — "ছিঃ, কী অশ্লীল!" সিনথিয়া নিজের ঘর থেকে মনে মনে হাসল। মা যদি জানত — আজ রাতে সে যা দেখতে চলেছে, তার তুলনায় এটা তো কিছুই না! এই ভাবনাটা তাকে একই সঙ্গে অপরাধী আর অদ্ভুতভাবে মুক্ত মনে করাল। মা এসে দরজায় দাঁড়ালেন, "পড়ছিস তো?" সিনথিয়া বলল, "হ্যাঁ মা।" মা চলে গেলেন। সিনথিয়া ফোনটা হাতে নিল, আবার রেখে দিল। "এখন না," সে নিজেকে বলল। "সবাই ঘুমালে।" ঘড়ির দিকে তাকাল — সবে সাড়ে আটটা। আরও আড়াই ঘণ্টা!

রাতের খাবারের পর সবাই যার যার ঘরে চলে গেল। সিনথিয়া দরজার ছিটকিনি লাগিয়ে বিছানায় শুয়ে ফোনটা হাতে নিল। হাতটা অল্প অল্প কাঁপছিল। সে ফেসবুক খুলে গ্রুপটায় ঢুকল।

গ্রুপটার কভার ফটো ছিল কালো ব্যাকগ্রাউন্ডে লাল অক্ষরে লেখা — "শুধুমাত্র প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য"। মেম্বার সংখ্যা দেখে সিনথিয়ার চোখ ছানাবড়া — প্রায় আশি হাজার! পিন করা পোস্টে নিয়ম লেখা — "১৮ বছরের নিচে কেউ ঢুকবেন না, নিজের ছবি দেবেন না, ভদ্রভাবে কমেন্ট করবেন।" সিনথিয়া ভাবল, "আমি তো আঠারো, আমার জন্য ঠিক আছে।" সে স্ক্রল করতে লাগল।

প্রথমে এলো কিছু মিম — স্বামী-স্ত্রীর দুষ্টুমি নিয়ে, বাসর রাত নিয়ে। একটা মিমে লেখা — "বিয়ের প্রথম রাতে বর: তুমি এত লজ্জা পাচ্ছ কেন? বউ: লজ্জা না, ভয় পাচ্ছি!" নিচে শত শত হাসির রিঅ্যাক্ট। সিনথিয়া হেসে ফেলল, কিন্তু হাসির সঙ্গে একটা অস্বস্তিও ছিল — সে এই রসিকতার মানে পুরোপুরি বুঝতে পারছিল না, আবার একটু একটু বুঝতেও পারছিল।

আরও স্ক্রল করল — এবার এলো কিছু ইঙ্গিতপূর্ণ ছবি, অর্ধনগ্ন মডেলদের। তার হাতের তালু ঘামছিল। একটা পোস্টে লেখা ছিল — "নতুনরা প্রথমে মিম দেখো, তারপর ছবি, তারপর ভিডিও। ধীরে ধীরে, তাড়াহুড়ো কোরো না।" সিনথিয়া হেসে ফেলল — যেন কেউ তার জন্যই নির্দেশনা লিখে রেখেছে। সে নির্দেশনা মেনেই এগোল।

হঠাৎ একটা ছবি এলো — একজন বিদেশি মেয়ের, সম্পূর্ণ নগ্ন, এমন ভঙ্গিতে বসে আছে যা দেখে সিনথিয়ার মুখ লাল হয়ে গেল। সে দ্রুত স্ক্রল করে নিচে গেল, কিন্তু পরের পোস্টটা ছিল একটা ভিডিও। থাম্বনেইলে একজন পুরুষ আর একজন নারী — দুজনেই নগ্ন, জড়াজড়ি করে আছে।

সিনথিয়ার হৃৎপিণ্ডটা যেন গলার কাছে উঠে এলো। সে কখনও — কখনওই — এমন কিছু দেখেনি। ছোটবেলায় টিভিতে চুমুর দৃশ্য এলেই মা চ্যানেল বদলে দিত। কলেজের বান্ধবীরা কানাঘুষায় যা বলত, তা ছিল আবছা, অসম্পূর্ণ। কিন্তু এ... এ তো সরাসরি, স্পষ্ট, লুকোছাপা নেই।

তার আঙুল নিজের অজান্তেই ভিডিওটার ওপর চাপ দিল।

ভিডিওটা চলতে শুরু করল। প্রথম কয়েক সেকেন্ডে সিনথিয়া বুঝতেই পারল না কী হচ্ছে — তারপর বুঝল। পুরুষটা মেয়েটার শরীরে মুখ ডুবিয়ে আছে, মেয়েটা কাতরাচ্ছে, অদ্ভুত সব শব্দ করছে। সিনথিয়ার পুরো শরীরে যেন বিদ্যুৎ খেলে গেল। সে দেখল মেয়েটার বুক ওঠানামা করছে, পুরুষটার হাত মেয়েটার শরীরের প্রতিটা ভাঁজে ঘুরছে। কুড়ি সেকেন্ড... তিরিশ সেকেন্ড... সিনথিয়া আর পারল না। কিন্তু বন্ধ করার আগেই তার চোখে পড়ল — ভিডিওর নিচে "সম্পর্কিত ভিডিও"তে আরও থাম্বনেইল সারি সারি। একটায় একজন মেয়ে একা, আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে। সিনথিয়ার আঙুল নিশপিশ করছিল — আরেকটা দেখবে? মাত্র কয়েক সেকেন্ড? সে নিজেকে সামলাল। "না, আজ এটুকুই।" কিন্তু এই সংযমটাই প্রমাণ করছিল — কাল সে আর থামবে না, থামতে পারবে না। সে ভিডিওটা বন্ধ করে ফোনটা বুকের ওপর রেখে চোখ বন্ধ করল।

তার হৃৎপিণ্ডটা এত জোরে ধড়ফড় করছিল যে মনে হচ্ছিল বাইরে থেকে শোনা যাবে। সে কান পেতে শুনল — পাশের ঘরে মা'র নাক ডাকার হালকা শব্দ, ড্রয়িংরুমে বাবা তখনও ফোনে কথা বলছেন। কেউ কিছু জানে না। এই গোপনতাটাই তাকে আরও উত্তেজিত করছিল — যেন সে কোনো নিষিদ্ধ দুর্গে ঢুকে পড়েছে, যেখানে শুধু সে-ই আছে, শুধু তারই অধিকার।

কিন্তু চোখ বন্ধ করলেই সেই দৃশ্যগুলো আরও স্পষ্ট হয়ে ভেসে উঠল। তার শ্বাস ঘন হয়ে আসছিল। আর তখনই সে টের পেল — তার প্যান্টির ভেতরটা ভিজে গেছে। একটা চটচটে, উষ্ণ ভেজা ভাব। সিনথিয়া আতঙ্কে উঠে বসল। এটা কী? তার কি কোনো অসুখ হলো? মাসিক তো সবে শেষ হয়েছে চার দিন আগে। তাহলে?

সে বাথরুমে গিয়ে পরীক্ষা করল। সাদা স্রাবের মতো, কিন্তু আরও পিচ্ছিল, আরও বেশি। ধুয়ে এসে সে ফোনটা হাতে নিল — গুগলে লিখল "মেয়েদের সাদা পিচ্ছিল স্রাব কেন হয়"। যা পড়ল, তাতে তার বুকের ধড়ফড় আরও বাড়ল — "যৌন উত্তেজনার সময় মেয়েদের শরীরে..."। সে পুরোটা পড়তে পারল না, ফোনটা রেখে দিল। তাহলে এটাই সত্যি — সে উত্তেজিত হয়েছিল। ওই ভিডিও দেখে। এই স্বীকারোক্তিটা নিজের কাছেও করতে তার লজ্জা করছিল, কিন্তু শরীর তো মিথ্যা বলে না।

তারপর তার মনে হলো — গুগলে সার্চ করলে হিস্ট্রিতে থেকে যাবে না তো? কেউ যদি ফোনটা হাতে নেয়? সে তাড়াতাড়ি ব্রাউজারের হিস্ট্রি মুছে দিল, তারপর মনে পড়ল — ইনকগনিটো মোড বলে কিছু আছে! নাবিলা একবার বলেছিল। সে খুঁজে খুঁজে শিখে নিল কী করে চালাতে হয়। এই ছোট্ট জয়টাতেও তার আনন্দ হলো — যেন সে কোনো গোপন অস্ত্র হাতে পেয়েছে, যা দিয়ে সে নিজের কৌতূহলের পৃথিবীতে নিরাপদে ঘুরতে পারবে।

ধুয়ে এসে সে বিছানায় শুয়ে রইল, কিন্তু ঘুম এলো না। মাথার ভেতর বারবার ঘুরছিল সেই ভিডিওর দৃশ্য — মেয়েটার কাতরানি, পুরুষটার হাত। আর প্রতিবার মনে পড়লেই তার তলপেটে কেমন একটা মোচড় দিচ্ছিল, উরুর মাঝখানে আবার ভেজা ভাব জমছিল।

সিনথিয়া বুঝতে পারছিল না তার শরীরে কী ঘটছে। শুধু বুঝছিল, কিছু একটা বদলে গেছে। আজ রাতের আগে সে যে মেয়েটা ছিল, কাল সকালে সে আর সেই মেয়েটা থাকবে না।

বালিশে মুখ গুঁজে সে ফিসফিস করে বলল, "হায়, আমি খারাপ হয়ে যাচ্ছি না তো?"

কিন্তু তার মনের গভীরে আরেকটা কণ্ঠস্বর ফিসফিস করে বলছিল — কাল রাতে, সবাই ঘুমিয়ে পড়লে, আবার দেখবি। আরেকটু বেশি করে দেখবি। এই দুই কণ্ঠের যুদ্ধে সে ছটফট করল। একদিকে মা'র শেখানো "ভালো মেয়ে"র সংজ্ঞা, অন্যদিকে তার নিজের শরীরের ডাক। শেষে জিতল শরীরের ডাক — কারণ সেটা ছিল সত্যি, অনুভব করা যায়, আর "ভালো মেয়ে"র সংজ্ঞাটা ছিল শুধুই কথা।

সিনথিয়া চোখ বন্ধ করল। ঘুমের মধ্যে সে স্বপ্ন দেখল — স্বপ্নে আরিফ তার দিকে তাকিয়ে হাসছে, আর তার হাসির পেছনে সেই ভিডিওর পুরুষটার মুখটা মিশে যাচ্ছে। স্বপ্নে আরিফ এগিয়ে আসছে, হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে। সিনথিয়া পিছিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু পেছনে দেয়াল। আরিফের হাত তার গালে — গরম, ভারী। তার মুখ নেমে আসছে... সিনথিয়া ঘুমের মধ্যেই কেঁপে উঠল, আর জেগে গেল। ঘড়িতে রাত তিনটে। তার শরীর ঘামে ভেজা, আর প্যান্টিটা আবার ভিজে গেছে। সে বুঝতে পারল না স্বপ্নে ঠিক কী হয়েছিল, শুধু বুঝল — কিছু একটা ঘটেছিল, খুব ভালো কিছু, যা সে আবার চায়। আর সেই চাওয়াটাই তাকে ভয় পাইয়ে দিল, আবার টানলও। সিনথিয়া পাশ ফিরে শুল। বাইরে তখনও রাত, ঘরে অন্ধকার, কিন্তু তার ভেতরে একটা আলো জ্বলে উঠেছে — যা আর নেভানো যাবে না।

পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে আয়নায় নিজেকে দেখে সিনথিয়ার মনে হলো — সে আর আগের মেয়েটা নেই। চোখের ভেতর কী যেন বদলে গেছে। কলেজে নাবিলা চোখ টিপল — "কী রে, গ্রুপে ঢুকেছিলি?" সিনথিয়া লজ্জায় মাথা নিচু করল। নাবিলা হেসে ফিসফিস করে বলল, "ভয় পাস না। প্রথম প্রথম সবারই এমন লাগে।" টিফিনে ছাদে বসে হঠাৎ গেটের দিকে চোখ গেল — আরিফ! এক সেকেন্ডের চোখাচোখি। কিন্তু এই এক সেকেন্ডে সিনথিয়ার বুকের ভেতর যা হলো, তা আগে কখনও হয়নি — কাল রাতের দৃশ্যগুলো মাথায় ভেসে উঠল, আর তার সঙ্গে আরিফের মুখ। কান গরম হয়ে গেল, তলপেটে সেই চেনা মোচড়। সে তাড়াতাড়ি চোখ সরিয়ে নিল, কিন্তু ভেতরে ভেতরে জানত — আজ রাতে সে আবার ঢুকবে ওই গ্রুপে। আজ আর শুধু দেখবে না — আজ বুঝতে চাইবে।

(চলবে...)
Like Reply
#3
পর্ব ২: নিষিদ্ধ জানালা

সেই রাতের পর সিনথিয়ার ঘুম হলো না। চোখ বন্ধ করলেই ভেসে উঠছিল সেই দৃশ্য — মেয়েটার কাতরানি, পুরুষটার হাত। আর প্রতিবার মনে পড়লেই তলপেটে মোচড়, উরুর মাঝখানে ভেজা ভাব। ভোরের দিকে কখন ঘুমিয়ে পড়েছিল, জানে না। সকালে মা'র ডাকে উঠে আয়নায় দেখল — চোখের নিচে হালকা কালি, গালে অদ্ভুত এক লালচে আভা।

সারাদিন কলেজে তার মন বসল না। বাংলা ম্যাডাম কী পড়ালেন, মনেই রইল না। টিফিনে নাবিলা তার মুখের দিকে তাকিয়ে চোখ টিপল — "কী রে, গ্রুপে ঢুকেছিলি?" সিনথিয়া লজ্জায় মাথা নিচু করল। নাবিলা হেসে ফিসফিস করে বলল, "ভয় পাস না। প্রথম প্রথম সবারই এমন লাগে।"

"সবাই" — শব্দটা সিনথিয়ার বুকের ভেতর কেমন করে উঠল। মানে নাবিলাও দেখে? মানে সে একা নয়? এই ভাবনাটায় অদ্ভুত স্বস্তি হলো — যেন অন্ধকারে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ কারও হাতের ছোঁয়া পেল।

রাতে দরজায় ছিটকিনি লাগিয়ে সে আবার ঢুকল গ্রুপে। আজ আর ভয় লাগছিল না — কৌতূহলটাই বেশি। অনেকক্ষণ স্ক্রল করল। একটা ভিডিওতে দেখল — মেয়েটা একা। কোনো পুরুষ নেই। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে মেয়েটা নিজের শরীরে হাত বোলাচ্ছে — ধীরে, ইচ্ছে করে, যেন প্রতিটা ছোঁয়া উপভোগ করছে। সিনথিয়ার শ্বাস আটকে গেল। মেয়েরা নিজেরাও... পারে? একা একা? এই প্রশ্নটা মাথায় ঘুরতে লাগল, আর ঘোরার সঙ্গে সঙ্গে তার নিজের শরীরেও কেমন স্রোত বয়ে গেল।

ভিডিওটা শেষ করে সে ইনকগনিটো মোড খুলল — কাল রাতে শেখা গোপন অস্ত্র। গুগলে লিখল — "মেয়েরা নিজে নিজে"। যা বেরোল, পড়ে তার গাল জ্বলছিল। একটা শব্দ শিখল — "মাস্টারবেশন"। মানে নিজের শরীরকে নিজে আনন্দ দেওয়া। শব্দটা পড়ে তার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গেল, আবার ভেতরে কেমন গরম স্রোত বয়ে গেল। কমেন্টে একজন লিখেছিল — "তাড়াহুড়ো কোরো না, শরীরকে সময় দাও।" এই কথাটা তার মাথায় গেঁথে গেল।

পরদিন কলেজ থেকে ফিরে সারাটা বিকেল সে ছটফট করল। রাত হওয়ার অপেক্ষায় ছিল — এই সত্যিটা নিজের কাছেও স্বীকার করতে লজ্জা লাগছিল, কিন্তু সত্যি তো সত্যিই। রাতের খাবার শেষে সবাই যার যার ঘরে যেতেই সিনথিয়া দরজা বন্ধ করল, ফোন সাইলেন্ট করল, কান খাড়া রাখল। তারপর গ্রুপে ঢুকে সরাসরি ভিডিওতে গেল — সেই মেয়েটা, যে একা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে। আজ মন দিয়ে দেখল ও কী করে। ওর হাতটা ধীরে ধীরে নামছে — বুক থেকে নিচে। ওর মুখে এমন একটা ভাব, যেন ও অন্য কোনো পৃথিবীতে।

দেখতে দেখতে সিনথিয়ার হাতটা নিজের অজান্তেই কামিজের ওপর দিয়ে বুকের ওপর গেল। কাপড়ের ওপর দিয়েই চাপ দিল। শিরশির করে উঠল সারা গা। ভয় পেয়ে হাত সরিয়ে নিল — তারপর আবার রাখল। এবার একটু বেশি সময়। বোঁটাদুটো কাপড়ের নিচে শক্ত হয়ে উঠল।

সে ফোনটা রেখে চোখ বন্ধ করল। হাতটা কামিজের ভেতরে নিল — সরাসরি ত্বকে। ত্বকের ওপর নিজের হাত — এত নরম, এত গরম! শ্বাস ঘন হয়ে এলো, বুক ওঠানামা করতে লাগল। নিচে নামতে সাহস হলো না আজ। শুধু বুক পর্যন্তই। কিন্তু এটুকুতেই সে ঘেমে গেল। বাথরুমে গিয়ে মুখে পানি দিল। আয়নায় নিজেকে দেখে মনে হলো — সে যেন কোনো নিষিদ্ধ খেলায় নেমেছে, যার নিয়ম সে জানে না, কিন্তু খেলতে ইচ্ছে করছে।

পরদিন গোসলের সময় সে ইচ্ছে করেই একটু বেশি সময় নিল। সাবানের ফেনার মধ্যে হাতটা যখন বুকের ওপর দিয়ে গেল, বোঁটাদুটো শক্ত হয়ে উঠল। সে তাকিয়ে রইল — তারই শরীর, অথচ কেমন অচেনা। হাতটা নিচে নামাতে গিয়েও থামিয়ে দিল — মা পাশের ঘরেই ছিলেন।

পরদিন কলেজে টিফিনের সময় নাবিলা তাকে টেনে নিয়ে গেল দোতলার খালি করিডোরে। চারদিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল, "শোন, গ্রুপে কয়েকটা নিয়ম মেনে চলবি।" সিনথিয়া অবাক — "নিয়ম?" নাবিলা গম্ভীর মুখে বলল, "এক — নিজের ছবি কখনও দিবি না, ভুলেও না। দুই — কেউ ইনবক্সে মেসেজ করলে উত্তর দিবি না, ব্লক করে দিবি। তিন — ভিডিও দেখবি, কিন্তু নিজেকে ওই মেয়েদের সঙ্গে তুলনা করবি না। ওরা অভিনয় করে, বুঝলি?" সিনথিয়া মাথা নাড়ল। নাবিলা তারপর হেসে বলল, "আর চার — যা-ই দেখিস, ভয় পাবি না। ভয় পেলে মজাটাই মাটি।" এই কথাগুলো শুনে সিনথিয়ার বুকের ভেতর কেমন হালকা লাগল — যেন কেউ অন্ধকার ঘরে একটা মোমবাতি জ্বেলে দিল। নাবিলা তার কাঁধে হাত রেখে বলল, "আমি আছি, পাগলি। কিছু জানতে হলে আমাকে জিজ্ঞেস করবি। লজ্জা পাবি না।" সেদিন বাড়ি ফেরার পথে রিকশায় বসে সিনথিয়া ভাবল — নাবিলা শুধু বান্ধবী না, নাবিলা তার গোপন পৃথিবীর দরজার চাবি।

সেদিন রাতেই নাবিলার দ্বিতীয় নিয়মটা কাজে লাগল। গ্রুপে স্ক্রল করতে করতে হঠাৎ মেসেঞ্জারে অচেনা একটা মেসেজ — "হাই সুন্দরী, কথা বলবা?" প্রোফাইলে কোনো ছবি নেই, নামটাও অদ্ভুত। সিনথিয়ার বুকটা ধড়াস করে উঠল। এক মুহূর্ত ভাবল — উত্তর দেবে? তারপর মনে পড়ল নাবিলার গলা — "কেউ ইনবক্সে মেসেজ করলে উত্তর দিবি না, ব্লক করে দিবি।" আঙুলটা এক সেকেন্ড কাঁপল, তারপর ব্লক বোতামে চাপ দিল। হয়ে গেল। সিনথিয়া গভীর শ্বাস নিল। এই ছোট্ট কাজটাতেও একটা জয় আছে — নিজেকে রক্ষা করার জয়। সে শিখছে — কৌতূহল আর বোকামির মধ্যে পার্থক্য। গ্রুপটা তার গোপন বাগান — সেখানে সে ফুল দেখবে, কিন্তু অচেনা লোককে বাগানে ঢুকতে দেবে না।

সেদিন রাতে বিছানায় শুয়ে সিনথিয়া ভাবল — কাল শুক্রবার। বাবা-মা শুক্রবারে তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়েন। সিয়ামও। সে চেষ্টা করবে — নিজেকে ছোঁয়ার চেষ্টা। ভয়ে বুক কাঁপছিল, কিন্তু ভেতরে কোথাও একটা টান — যেন গভীর জলের দিকে কেউ ডাকছে।

শুক্রবার রাত বারোটায় সবাই ঘুমিয়ে পড়ল। সিনথিয়া দরজায় ছিটকিনি লাগিয়ে, ফোনটা সাইলেন্ট করে বিছানায় শুল। প্রথমে গ্রুপে ঢুকে একটা ভিডিও দেখল — মেয়েটা একা, ধীরে ধীরে নিজের শরীরে হাত বোলাচ্ছে। দেখতে দেখতে তার শ্বাস ঘন হয়ে এলো। তারপর ফোনটা রেখে দিল। এবার সে নিজে।

হাতটা কাঁপছিল। প্রথমে বুকের ওপর রাখল — কামিজের ওপর দিয়েই। বোঁটাদুটো শক্ত হয়ে উঠল কাপড়ের নিচে। শিরশির করে উঠল সারা গা। তারপর হাতটা নিচে নামাল। পায়জামার ভেতর দিয়ে।

সেখানে ভেজা। সিনথিয়া ভয় পেয়ে হাত সরিয়ে নিল। আবার রাখল। এবার একটু চাপ দিল — আর বিদ্যুৎ খেলে গেল শরীরে! সে মুখে হাত চাপা দিল, যেন শব্দ না বেরোয়। আঙুলটা ঘুরতে লাগল — ধীরে, তারপর একটু জোরে। প্রতিটা ঘূর্ণনে তলপেটে মোচড়, উরুদুটো কাঁপছে।

কিন্তু সে আনাড়ি। কোথায় কতটা চাপ দিতে হয়, জানে না। কিছুক্ষণ পর হাত ব্যথা করতে লাগল, আর ভয়ও লাগছিল — দরজার বাইরে কোনো শব্দ হলেই সে মরে যাবে। থেমে গেল। পুরোটা হলো না — মানে, ওই চরমটা এলো না। কিন্তু যা হলো, তাতেই সে ঘেমে নেয়ে গেছে, শ্বাস ধড়ফড় করছে।

বাথরুমে গিয়ে ধুয়ে এলো। আয়নায় নিজেকে দেখল — গাল লাল, চোখ চকচক করছে। সিনথিয়া হাসল। নিজের দিকে তাকিয়ে হাসল। মা'র "ভালো মেয়ে" আজ রাতে কোথায় ছিল, জানে না। শুধু জানে — সে তার শরীরকে একটু চিনল।

সেদিন রাতে শুয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ কানে এলো — পাশের ঘর থেকে বাবা-মা'র হাসির শব্দ। চাপা, গোপন এক হাসি — যেন দুজনে কোনো মজার কথা বলছেন, যা শুধু তারাই জানে। সিনথিয়া কান পেতে শুনল। বাবার গম্ভীর গলা আজ নরম, মা'র হাসিতে লজ্জা মেশানো। তারপর নীরবতা — এমন নীরবতা, যার ভেতর কী আছে সে জানে না, কিন্তু আন্দাজ করতে পারে। সিনথিয়ার গাল গরম হয়ে গেল। তাহলে বাবা-মা'রও একটা গোপন পৃথিবী আছে! যেখানে তারা শুধু স্বামী-স্ত্রী না — নারী আর পুরুষ। এই ভাবনাটা তাকে অদ্ভুত সাহস দিল। যদি বাবা-মা পারেন, তাহলে সে কেন পারবে না — নিজের মতো করে, নিজের ঘরে? বড়দের পৃথিবীটা তাহলে এতটাও দূরের না। সে পাশ ফিরে শুল, ঠোঁটে হালকা হাসি।

পরদিন সকালে মা নাস্তার টেবিলে জিজ্ঞেস করলেন, "মুখ এত লাল কেন? জ্বর নাকি?" সিনথিয়া তাড়াতাড়ি বলল, "না মা, গরম লাগছে।" সিয়াম হেসে বলল, "আপু প্রেমে পড়েছে!" সিনথিয়া ওর দিকে চোখ পাকাল, কিন্তু ভেতরে ভেতরে চমকে উঠল। সে প্রেমে পড়েনি — সে নিজের প্রেমে পড়েছে। নিজের শরীরের প্রেমে। এই ভাবনাটায় হাসি পেল, আবার গর্বও হলো।

সেদিন কলেজ গেটে আরিফকে দেখল — পাশের কলেজের গেটে বন্ধুদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে। আরিফ তাকে দেখে হাসল। আগে ওর হাসি দেখলে শুধু বুক ধড়ফড় করত। আজ অন্য কিছু হলো — ওর ঠোঁটের দিকে তাকিয়ে সিনথিয়ার মনে পড়ে গেল কাল রাতের ভিডিওটা। গাল গরম হয়ে গেল, উরুর মাঝখানে কেমন শিরশির করে উঠল। সে দ্রুত চোখ সরিয়ে নিল। টিফিনে নাবিলা কানের কাছে ফিসফিস করে বলল, "কী রে, মুখ এত লাল কেন? আরিফ ভাইয়াকে দেখেছিস?" সিনথিয়া বলল, "ধুর!"

সেদিন রাতে সিনথিয়া আরও এক ধাপ এগোল। শুক্রবারের ভুল থেকে শিখেছে — তাড়াহুড়ো নয়, ধীরে। দরজায় ছিটকিনি, ফোন সাইলেন্ট, কান খাড়া। প্রথমে একটা ভিডিও দেখল — আজ আর লজ্জা লাগেনি, শুধু শিখতে ইচ্ছে করল। মেয়েটা কীভাবে শুরু করে, কোথায় থামে, কখন গতি বাড়ায়।

তারপর নিজে। আজ নাইটিটা একটু ওপরে তুলল — যেন হাতটা সহজে পৌঁছায়। প্রথমে বুকে — ধীরে ধীরে বৃত্ত আঁকল। তারপর নিচে। আজ আর ভয় পেয়ে হাত সরাল না। আঙুলটা রাখল, চাপ দিল, ঘোরাল। অনেক দূর গেল — শরীরটা কাঁপছিল, মনে হচ্ছিল কিছু একটা আসছে, বড় কিছু। কিন্তু ঠিক মুহূর্তে পাশের ঘরে সিয়াম চিৎকার করে উঠল — গেমে হেরেছে বোধহয়। সিনথিয়া চমকে থেমে গেল। ঢেউটা ফিরে গেল।

হতাশ লাগল। খুব কাছে গিয়েও ফিরে আসতে হলো। কিন্তু একটা জিনিস বুঝল — সে পারবে। শুধু দরকার নিরিবিলি সময়। অনেকটা সময়।

সেদিন রাতে ঘুমানোর আগে সিনথিয়া দেয়ালের ক্যালেন্ডারটার দিকে তাকাল। ২৭ তারিখের ঘরে সে মনে মনে একটা তারা আঁকল — অদৃশ্য তারা, যা শুধু সে দেখতে পায়। ক্যালেন্ডারে হাত বোলাতে বোলাতে ভাবল — এই তারিখটা তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তারিখ হতে চলেছে। জন্মদিন না, পরীক্ষার ফল না — তার নিজের তারিখ। নিজেকে দেওয়া উপহারের তারিখ। সে ফিসফিস করে বলল, "আর কয়েকটা দিন।" বাইরে তখন রাতের রিকশার বেল, দূরে কুকুরের ডাক। আর তার বুকের ভেতর — প্রজাপতি।

এরপরের দুই রাতে সিনথিয়া একটা নতুন খেলা শিখল — চোখ বন্ধ করে আরিফকে ভাবা। ওর হাসি, ওর চশমার পেছনের চোখ, ফুচকার দোকানের সেই দুপুর। কল্পনায় আরিফ তার পাশে বসে। ওর হাত তার হাতে। সিনথিয়া চোখ বন্ধ করে ফিরে গেল সেই দুপুরে — ফুচকার দোকান, টক-ঝালের গন্ধ, বান্ধবীদের হাসি। আরিফ দাঁড়িয়ে ছিল তিন হাত দূরে, সাদা শার্টের হাতা গোটানো। হঠাৎ চোখাচোখি। আরিফের ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটল — ধীরে, যেন শুধু তার জন্যই। সিনথিয়ার হাত থেকে ফুচকার বাটি প্রায় পড়ে যাচ্ছিল। নাবিলা কনুই দিয়ে খোঁচা দিয়েছিল — "তাকাস না, পাগলি!" কিন্তু সিনথিয়া তাকিয়েছিল। সেই এক সেকেন্ডের চোখাচোখিতে কী যেন আদান-প্রদান হয়েছিল — কোনো কথা ছাড়াই। এখন, এই অন্ধকার ঘরে, সেই স্মৃতিটা আরও উজ্জ্বল। কল্পনায় আরিফের হাত তার গালে, তার গলায়। কল্পনায় আরিফ যখন তাকে ছোঁয়, তার আসল হাত তখন তার শরীরে। এই দ্বৈততা অদ্ভুত — অর্ধেক কল্পনা, অর্ধেক সত্যি। কিন্তু অনুভূতিটা পুরো সত্যি।

এক রাতে সে প্রায় আধঘণ্টা করল। শরীরটা ঘামে ভিজে গেল। কিন্তু ওই চরমটা আজও এলো না। মনে হলো দরজার কাছে এসে ফিরে গেল। সিনথিয়া ভাবল — এটা কি তার দোষ? নাকি সে এখনও পুরো ছাড়তে পারছে না — ভয়টা এখনও পিছু ছাড়েনি?

আরেক রাতে সে নতুন একটা জিনিস চেষ্টা করল — আয়না। গ্রুপের একটা ভিডিওতে মেয়েটা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখছিল আর ছুঁচ্ছিল। দরজা বন্ধ করে, আলোটা একটু বাড়িয়ে, আয়নার সামনে দাঁড়াল সিনথিয়া। প্রথমে কামিজ পরা। তারপর কামিজটা খুলে ফেলল। শুধু অন্তর্বাস পরে আয়নায় নিজেকে দেখল।

তার বুক — গোল, ভারী, বোঁটাদুটো গাঢ়। সে হাত রাখল। আয়নায় দেখল নিজের হাত নিজের শরীরে — এই দৃশ্যটা তাকে কেমন করে দিল। মনে হলো সে দুজন — একজন ছুঁচ্ছে, একজন ছোঁয়া পাচ্ছে। আয়নার মেয়েটার চোখে সে দেখল এমন এক দৃষ্টি, যা আগে কখনও দেখেনি — নির্লজ্জ না, কিন্তু নির্ভীক। যেন ওই মেয়েটা বলছে — "আমি জানি তুই কী চাস।" সিনথিয়া আয়নার মেয়েটার দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল, "তুই সুন্দর।" প্রথমবার নিজেকে সুন্দর বলল — মা'র বলা "মিষ্টি মেয়ে" না, নাবিলার বলা "হট" না — তার নিজের চোখে সুন্দর। এই স্বীকারোক্তিটা তার বুকের ভেতর উষ্ণতা ছড়িয়ে দিল। অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। তারপর বিছানায় শুয়ে করল — আয়নার স্মৃতিটা মাথায় রেখে। আজও চরমটা এলো না, কিন্তু আজকের আনন্দটা অন্যরকম — গভীর। যেন সে নিজেকে দেখল, সত্যিকারের দেখল।

মা'র "ভালো মেয়ে"রা আয়নায় নিজেকে এভাবে দেখে না, জানে। কিন্তু সে তো খারাপ কিছু করেনি — শুধু নিজেকে দেখেছে। নিজেকে দেখা কি অপরাধ?

তারপর এলো সেই ভয়ংকর রাত। গত কয়েক রাতে সিনথিয়া আরও শিখেছে — কোথায় কীভাবে ছুঁলে ভালো লাগে। দরজা বন্ধ করে শুরু করল। আজ অনেক দূর এগিয়েছিল — শরীরটা কাঁপছিল, মনে হচ্ছিল এবার ওই চরমটা আসবে, আসছে...

ঠিক তখনই দরজায় টোকা — "সিনথিয়া! ঘুমাসনি?"

মা'র গলা! তার রক্ত হিম হয়ে গেল। হাত সরিয়ে, পায়জামা ঠিক করে, কম্বল টেনে নিল এক সেকেন্ডে। "হ্যাঁ মা, ঘুমাচ্ছি!" — গলা কাঁপছিল। মা বললেন, "আলো নিভিয়ে ঘুমা।" পায়ের শব্দ দূরে গেল।

সিনথিয়া বিছানায় শুয়ে থরথর করে কাঁপছিল। যদি মা দরজা খুলে ঢুকে পড়তেন? ছিটকিনি লাগানো ছিল — ভাগ্যিস! কিন্তু আর চালিয়ে যেতে পারল না। ভয়টা আনন্দটাকে গিলে খেল। বাথরুমে গিয়ে অনেকক্ষণ মুখে পানি দিল। আয়নায় নিজেকে দেখে মনে হলো — সে চোর। নিজের ঘরে, নিজের শরীর নিয়ে চোরের মতো লুকিয়ে। কান্না পাচ্ছিল। কিন্তু তারপর ভাবল — সে তো কারও ক্ষতি করেনি। নিজের শরীর, নিজের ঘর। তাহলে লুকোতে হবে কেন?

উত্তরটা জানে — মা'র "ভালো মেয়ে"র সংজ্ঞায় এটা নেই। কিন্তু সে তো খারাপ কিছু করছে না। শুধু নিজেকে চিনছে।

পরদিন সকালে নাস্তার টেবিলে মা তার প্লেটে আরেকটা ডিম তুলে দিলেন। "মুখটা শুকিয়ে গেছে, ঠিকমতো খাস না," মা বললেন। সিনথিয়ার গলায় কেমন দলা পাকিয়ে এলো। এই মা — যে তাকে চোখে হারান, যার হাতের রান্না ছাড়া তার ঘুম আসে না — এই মা'র কাছেই সে এত বড় গোপন রাখছে। অপরাধবোধটা বুকের ভেতর কাঁটার মতো বিঁধল। কিন্তু তারপরই মনে হলো — মা কি কখনও নিজের মা'র কাছে সব বলতে পেরেছিলেন? প্রতিটা মেয়েরই কি এমন একটা গোপন ঘর থাকে, যেখানে মা'রও ঢোকার অনুমতি নেই? এই ভাবনাটায় অপরাধবোধটা একটু হালকা হলো — যেন এটা কোনো পাপ না, এটা বড় হওয়ারই নিয়ম। সিনথিয়া মা'র হাতটা এক মুহূর্ত চেপে ধরল। মা অবাক হয়ে তাকালেন — "কী রে?" সিনথিয়া হাসল — "কিছু না মা।" কিছু কথা বলা যায় না — শুধু অনুভব করা যায়।

সেদিন বিকেলে আকাশ কালো করে বৃষ্টি নামল। সিনথিয়া বারান্দায় দাঁড়িয়ে ভিজতে ভিজতে দেখল — রাস্তায় জল জমছে, ছেলেরা ফুটবল খেলছে কাদায়। বৃষ্টির ফোঁটা তার মুখে, গলায় পড়ছিল। হঠাৎ মনে হলো — তার ভেতরেও এমনই বৃষ্টি হচ্ছে। এতদিন যে শরীরটা শুকনো মাটির মতো পড়ে ছিল, সেখানে এখন বৃষ্টি নেমেছে। ভেজা মাটির গন্ধের মতো একটা গন্ধ তার ভেতর থেকে উঠছে — জীবনের গন্ধ। সে হাত বাড়িয়ে বৃষ্টি ধরল। মা ভেতর থেকে চিৎকার করলেন, "ভিজিস না, ঠান্ডা লাগবে!" সিনথিয়া হাসল — মা জানেন না, এই ভেজাটা তার দরকার।

সেদিন রাতে ঘুমানোর আগে সিনথিয়া একটা সিদ্ধান্ত নিল। আর লুকিয়ে, ভয়ে ভয়ে না। সে শিখবে — ঠিকমতো শিখবে। গ্রুপে একজন লিখেছিল — "নিজের শরীরকে জানো, তাড়াহুড়ো কোরো না।" সে তাড়াহুড়ো করেছে এতদিন — ভয়ে, লুকিয়ে। আজ থেকে ধীরে। শরীরটা কোনো শত্রু না, যাকে জয় করতে হবে — শরীরটা বন্ধু, যাকে চিনতে হবে। এই ভাবনাটা তার মাথায় নতুন আলো জ্বালাল। এতদিন সে নিজের শরীরের সঙ্গে যুদ্ধ করছিল — লজ্জা বনাম কৌতূহল, ভয় বনাম টান। আজ থেকে যুদ্ধবিরতি। আজ থেকে শুধু শোনা — শরীর কী বলে। আর একটা সিদ্ধান্ত — সামনের একটা বিশেষ রাতের আগে আর জোর করে কিছু করবে না। শরীরটাকে জমিয়ে রাখবে — যেন ওই রাতে পুরোটা পায়।

কারণ খবর এসেছে — সামনের শুক্রবার, ২৭ জুন, সন্ধ্যায় বাবা-মা খালার বাসায় যাবেন, দাওয়াত আছে। সিয়ামও যাবে। সিনথিয়া যাবে না — "সামনে পরীক্ষা, পড়তে হবে" বলেছে। মা রাজি হয়েছেন।

ওই রাতটা হবে শুধু তার। পুরো বাসা খালি। কোনো টোকার ভয় নেই, কোনো পায়ের শব্দ নেই। সিনথিয়া ঠিক করল — ওই রাতে সে নিজেকে পুরোটা দেবে। যা শিখেছে, সব কাজে লাগাবে।

সাতটা দিন অপেক্ষা। তার শরীরটা এখনই কাঁপছে ভাবতে গিয়ে। কিন্তু এই অপেক্ষাটা মিষ্টি — এই প্রথম, এই অপেক্ষায় ভয়ের চেয়ে আনন্দ বেশি। বুকের ভেতর একটা প্রজাপতি উড়ছে। ভয় না — উত্তেজনা। সিনথিয়া চোখ বন্ধ করল। বাইরে তখন গভীর রাত — পুরো মিরপুর ঘুমিয়ে। কিন্তু তার ঘরে জেগে আছে একটা মেয়ে, যার বুকের ভেতর সাত দিনের অপেক্ষা প্রজাপতির মতো ডানা ঝাপটাচ্ছে। সে ফিসফিস করে বলল, "শুভরাত্রি, সিনথিয়া।" — নিজেকেই শুভরাত্রি জানাল। এই প্রথম, নিজের নামটা নিজের মুখে শুনে লজ্জা লাগল না — ভালো লাগল।

(চলবে...)
[+] 1 user Likes midnightkalamkar's post
Like Reply
#4
মুখোশ

রাত এগারোটা পেরিয়ে গেছে অনেকক্ষণ। বাসার সব আলো নিভে গেছে — বাবার ঘর থেকে ভেসে আসছে চাপা নাক ডাকার শব্দ, সিয়ামের ঘর অন্ধকার, মা'র ঘরের দরজা বন্ধ। শুধু সিনথিয়ার ঘরে জ্বলছে একটুকরো নীলচে আলো — কম্বলের নিচে লুকিয়ে রাখা ফোনের স্ক্রিনের আলো।

দরজার ছিটকিনিটা সে আজ নিজে লাগিয়েছে, খুব সাবধানে, যেন কোনো শব্দ না হয়। গত রাতের কথা মনে পড়তেই তার গাল গরম হয়ে উঠল — মা'র সেই টোকা, দোরগোড়ায় থেমে যাওয়া সেই ঢেউ, সেই অতৃপ্তি যা সারাদিন তার শরীরে ঘুরে বেড়িয়েছে ছায়ার মতো। কলেজে ক্লাসের ফাঁকে, টিফিনে, বাসায় ফেরার রিকশায় — বারবার তার মনে পড়েছে সেই মুহূর্তটা, যখন সে প্রায় পৌঁছে গেছিল। আর প্রতিবার মনে পড়তেই উরুর মাঝখানে সেই চেনা দপদপানি ফিরে এসেছে, লজ্জায় তার কান লাল হয়ে গেছে।

কিন্তু আজ রাতে তার মাথায় অন্য একটা চিন্তা ঘুরছে। ২৭ জুনের পরিকল্পনাটা তো আছেই — সেদিন বাসা ফাঁকা থাকবে, সেদিন কোনো বাধা থাকবে না। কিন্তু তার আগে, এই অপেক্ষার দিনগুলোতে সে কী করবে? শুধু দেখে যাবে? শুধু পড়ে যাবে?

গত রাতে গ্রুপে সে দেখেছিল — মেয়েরা নিজেদের কথা লিখছে। নিজেদের ভয়, নিজেদের আনন্দ, নিজেদের শরীরের কথা। পড়তে পড়তে তার মনে হয়েছিল — ইস, যদি সেও লিখতে পারত! যদি সেও বলতে পারত — «আমারও এমন হয়»! কিন্তু তার আসল ফেসবুক অ্যাকাউন্ট দিয়ে সে কী করে লিখবে? ওই অ্যাকাউন্টে তার ছবি আছে, পরিবারের মানুষ আছে, আত্মীয়রা আছে, নাবিলা আছে। ওখানে একটা বোল্ড কমেন্ট করলেই খবর ছড়িয়ে পড়বে।

তাহলে?

সিনথিয়া অন্ধকারে শুয়ে শুয়ে ভাবল। আর ভাবতে ভাবতে একটা চিন্তা তার মাথায় এলো — এমন একটা চিন্তা, যা ভাবতেই তার বুকের ভেতর ধড়াস করে উঠল।

একটা নতুন অ্যাকাউন্ট। একটা নকল পরিচয়। একটা মুখোশ।

মুখোশ পরলে কেউ চিনবে না। মুখোশের আড়ালে সে যা খুশি বলতে পারবে, যা খুশি লিখতে পারবে। কেউ জানবে না এই মেয়েটা আসলে মিরপুরের সেই লাজুক কলেজছাত্রী, যাকে সবাই «ভদ্র মেয়ে» বলে চেনে।

তার হাত কাঁপছিল উত্তেজনায়। কিন্তু সাথে সাথে আরেকটা ভয়ও এলো — নাবিলা তো বলেছিল, কেউ ইনবক্সে মেসেজ করলে ব্লক করে দিবি, নিজের ছবি দিবি না। নাবিলা যদি জানতে পারে সে নকল অ্যাকাউন্ট খুলে ছেলেদের সাথে কথা বলছে? নাবিলা রেগে যাবে। নাবিলা বলবে — «তুই পাগল হয়ে গেছিস!»

তাই সিনথিয়া সিদ্ধান্ত নিল — কাউকে বলবে না। নাবিলাকেও না। এই গোপন কথাটা শুধু তার থাকবে। তার জীবনে প্রথমবার, সে একটা এত বড় সিদ্ধান্ত নিচ্ছে সম্পূর্ণ একা — কারও পরামর্শ ছাড়া, কারও অনুমতি ছাড়া। এই একাকীত্বটাই তাকে অদ্ভুত একটা শক্তি দিল। সে আর কারও ছোট বোন না, কারও মেয়ে না, কারও বান্ধবী না। সে শুধু সে।

কাঁপা আঙুলে সে ফেসবুক অ্যাপ থেকে লগআউট করল। তারপর «নতুন অ্যাকাউন্ট খুলুন» বোতামে চাপ দিল।

নাম কী দেবে? তার আসল নাম তো দেওয়া যাবে না। এমন একটা নাম চাই, যা শুনলে কেউ সন্দেহ করবে না, যা ভিড়ে হারিয়ে যাবে। সে ভাবল... মিম। হ্যাঁ, মিম। ছোট, মিষ্টি, সাধারণ — হাজারটা মেয়ের নাম। পদবি? আক্তার। সবচেয়ে সাধারণ পদবি। মিম আক্তার — এই নামে ফেসবুকে লাখ লাখ মেয়ে আছে। কেউ খুঁজে পাবে না।

সে টাইপ করল — মিম আক্তার।

বয়স? আঠারো লিখলে... না। আঠারো লিখলে গ্রুপে ঢুকতে দেবে ঠিকই, কিন্তু সে চায় একটু বড় সাজতে। বিশ। হ্যাঁ, বিশ বছর। দুই বছরের মিথ্যে — তার জীবনের প্রথম পরিকল্পিত মিথ্যে, যা সে লিখছে নিজের হাতে। টাইপ করতে গিয়ে তার আঙুল এক মুহূর্ত থমকে রইল। বিশ। সে এখন বিশ। এই ছোট্ট সংখ্যাটা তাকে যেন দুই বছরের বড় করে দিল, দুই বছরের সাহসী করে দিল।

ঠিকানা? মিরপুর তো লেখা যাবে না। সে ভাবল — কোথায়? ধানমন্ডি। হ্যাঁ, ধানমন্ডি। মিরপুর থেকে অনেক দূরে, অন্য একটা জগৎ। কেউ সন্দেহ করবে না।

কলেজ? সে লিখল — «ঢাকার একটা কলেজে পড়ি।» ইচ্ছে করেই অস্পষ্ট রাখল। যত কম তথ্য, তত নিরাপদ।

তারপর এলো ছবির পালা। প্রোফাইল ফটো ছাড়া অ্যাকাউন্টটা মরা মরা লাগবে, কেউ বিশ্বাস করবে না। কিন্তু নিজের মুখের ছবি? কখনো না। নাবিলার প্রথম নিয়ম — নিজের ছবি কখনও দিবি না।

সিনথিয়া উঠে বসল। জানালার পর্দাটা একটু সরাল — বাইরে চাঁদের আলো। সে ফোনটা হাতে নিয়ে জানালার পাশে দাঁড়াল, চুলগুলো খুলে দিল। তারপর ফোনটা উঁচু করে, মুখটা পাশে ঘুরিয়ে, শাটার চাপল।

ছবিটা দেখল — চাঁদের আলোয় তার সিলুয়েট। খোলা চুল, মুখটা অন্ধকারে ডুবে আছে, শুধু গালের একটা রেখা আর কাঁধের বাঁক দেখা যাচ্ছে। মুখ চেনার কোনো উপায় নেই। কিন্তু ছবিটা... সুন্দর। রহস্যময়। ঠিক যেমনটা সে চেয়েছিল।

শাটারের শব্দটা অন্ধকার ঘরে যেন বড় বড় শোনাল। সিনথিয়া দ্রুত জানালা থেকে সরে এলো, বুক ধড়ফড় করছে। সে এইমাত্র নিজের প্রথম নকল ছবি তুলল। সে এইমাত্র একটা মিথ্যে পরিচয়ের প্রথম ইট গাঁথল।

ছবিটা প্রোফাইলে বসাল। তারপর বায়োতে লিখল — «চাঁদ দেখতে ভালোবাসি।» সহজ, নিরীহ, কিন্তু একটু রহস্যময়।

ব্যস। মিম আক্তার জন্ম নিল — রাত বারোটা বাজার কয়েক মিনিট আগে, মিরপুরের একটা অন্ধকার ঘরে, কম্বলের নিচে।

সে প্রোফাইলটা আবার খুলে দেখল — ওপর থেকে নিচে। মিম আক্তার। বিশ বছর। ধানমন্ডি, ঢাকা। চাঁদ-আলোর সিলুয়েট। এই মেয়েটা কে? সিনথিয়া ভাবল। এই মেয়েটা কি সে-ই? নাকি অন্য কেউ — যাকে সে এতদিন ভেতরে লুকিয়ে রেখেছিল, আর আজ রাতে মুক্তি দিল? তার মনে হলো, মিম আসলে নতুন কেউ না। মিম হলো সিনথিয়ার সেই অংশ, যাকে সে কখনো বাইরে আসতে দেয়নি। আজ সে দরজা খুলে দিয়েছে।

সে ছবিটা জুম করে দেখল — কোথাও মুখের কোনো অংশ দেখা যাচ্ছে কিনা। না। শুধু অন্ধকার আর আলোর খেলা। তবু তার ভয় করছিল — যদি কেউ চিনে ফেলে? যদি নাবিলা দেখে? সে দ্রুত মাথা নাড়ল। নাবিলা জানবে না। কেউ জানবে না। এই ছবি, এই নাম, এই মেয়ে — সব শুধু তার।

সিনথিয়া নতুন অ্যাকাউন্টটার দিকে তাকিয়ে রইল। শূন্য বন্ধু, শূন্য পোস্ট, একটা চাঁদ-আলোর সিলুয়েট। কিন্তু এই শূন্যতার ভেতরেই যেন একটা পুরো নতুন জীবন লুকিয়ে আছে। সে অনুভব করল — সে দুজন হয়ে গেছে। একজন সিনথিয়া, যে কাল সকালে উঠে কলেজে যাবে, মা'র কথা শুনবে, ভদ্র মেয়ে সেজে থাকবে। আরেকজন মিম, যে এখন জেগে আছে, যে ভয় পায় না, যে যা খুশি বলতে পারে।

এবার গ্রুপে ঢোকার পালা। সে সার্চ বারে টাইপ করল — «? Only 18+ ?»। গ্রুপটা এলো। «যোগ দিন» বোতামে চাপ দিল।

তিনটে প্রশ্ন এলো। প্রথমটা — «আপনার বয়স কি ১৮ বা তার বেশি?» সিনথিয়া হাসল অন্ধকারে। মিমের বয়স বিশ। সে টিক দিল — হ্যাঁ। দ্বিতীয়টা — «গ্রুপের নিয়ম মানবেন?» — হ্যাঁ। তৃতীয়টা — «নিজের আসল ছবি দিয়ে জয়েন করেছেন?» — এই প্রশ্নে তার হাত এক মুহূর্ত থামল। তারপর সে টিক দিল — হ্যাঁ। আরেকটা মিথ্যে। মিথ্যেগুলো এখন সহজ হয়ে আসছে।

«অনুরোধ পাঠানো হয়েছে। অ্যাডমিন অনুমোদন করলে আপনি যোগ দিতে পারবেন।»

এবার অপেক্ষা। সিনথিয়া ফোনটা বুকের ওপর রেখে সিলিং ফ্যানের দিকে তাকিয়ে রইল। প্রতিটা সেকেন্ড যেন এক মিনিট। সে ভাবল — যদি অ্যাডমিন বুঝে ফেলে এটা নকল অ্যাকাউন্ট? যদি রিজেক্ট করে দেয়? তাহলে এই রাতের সব উত্তেজনা মাটি।

পাঁচ মিনিট... দশ মিনিট... সে প্রায় হাল ছেড়ে দিচ্ছিল। ঠিক তখনই ফোনটা ভাইব্রেট করল।

«অভিনন্দন! আপনি «? Only 18+ ?» গ্রুপে যোগ দিয়েছেন।»

সিনথিয়ার মুখে হাসি ফুটল — এমন হাসি, যা সে অনেকদিন হাসেনি। সে ভেতরে ঢুকল।

গ্রুপটা একই আছে — সেই পোস্ট, সেই কমেন্ট, সেই ভিডিও। কিন্তু আজ সবকিছু অন্যরকম লাগছে। কারণ আজ সে দর্শক না। আজ সে মিম। আজ সে বলতে পারে।

সে একটা পোস্ট খুলল — একটা মেয়ে লিখেছে তার প্রথম ভালোবাসার কথা, কীভাবে একটা ছেলে প্রথমবার তার হাত ধরেছিল। নিচে মেয়েরা নিজেদের গল্প শেয়ার করছে — «আমারও এমন হয়েছিল!», «পড়ে চোখে পানি চলে এলো।» মিম একটা কমেন্টে লাইক দিল — শুধু লাইক, এখনো কথা বলার সাহস হয়নি। আরেকটা পোস্টে একটা মেয়ে মজার একটা ছবি শেয়ার করেছে। মিম হেসে ফেলল অন্ধকারে, মুখে হাত চাপা দিয়ে — যেন কেউ শুনে ফেলবে। এই হাসিটা, এই স্বাধীনতাটা — নিজের আসল নামে সে কখনো পেত না।

সে স্ক্রল করতে লাগল। একটা পোস্টে চোখ আটকে গেল — সেই পোস্টটা, যেটা গত রাতে সে পড়েছিল। «মেয়েরা মাস্টারবেশন করে — এটা স্বাভাবিক। যারা বলে করে না, তারা মিথ্যে বলে।» নিচে শয়ে শয়ে কমেন্ট। মেয়েরা নিজেদের গল্প লিখছে — কেউ লিখেছে প্রথমবারের ভয়, কেউ লিখেছে এখনকার আনন্দ।

সিনথিয়ার আঙুল কমেন্ট বক্সের ওপর ঘুরছিল। লিখবে? লিখবে না? তার আসল পরিচয়ে সে কখনো সাহস পেত না। কিন্তু সে তো এখন সিনথিয়া না। সে মিম।

সে টাইপ করতে শুরু করল। প্রথমে লিখল, মুছল। আবার লিখল। বুকের ভেতর ঢিপঢিপ করছে — যেন সে কোনো উঁচু জায়গা থেকে ঝাঁপ দিতে যাচ্ছে।

অবশেষে সে লিখল — «আমি নতুন। এতদিন ভাবতাম শুধু আমারই এমন হয়, আর আমি খারাপ। আজ বুঝলাম — নিজের শরীরকে চেনা কোনো পাপ না। ধন্যবাদ এই পোস্টটার জন্য।»

পোস্ট বোতামে চাপ দেওয়ার আগে তার হাত কাঁপছিল। তারপর... চাপ দিল।

হয়ে গেল। তার প্রথম বোল্ড কমেন্ট। মিমের প্রথম কথা।

সে ফোনটা রেখে চোখ বন্ধ করল। এক... দুই... তিন... ফোনটা ভাইব্রেট করল। একটা লাইক। তারপর আরেকটা। তারপর কমেন্ট — একটা মেয়ে লিখেছে, «ওয়েলকাম আপু! ঠিক বলেছো।» আরেকজন — «সাহসী মেয়ে!» সিনথিয়ার বুকের ভেতরটা ফুলে উঠল। মিমকে সবাই পছন্দ করছে। মিমকে সবাই বাহবা দিচ্ছে।

কমেন্ট আসতেই থাকল। একটা মেয়ে লিখল — «আমিও প্রথমে ভয় পেতাম আপু। তুমি একা না।» মিম জবাব দিল — «ধন্যবাদ। তোমার কথা শুনে সাহস পেলাম।» এই ছোট্ট আদান-প্রদানেই তার বুকের ভেতরটা উষ্ণ হয়ে উঠল। অচেনা মেয়েরা, অচেনা জায়গা থেকে — তবু যেন সবাই একটা গোপন বোন-সমাজের সদস্য। সিনথিয়া ভাবল — বাইরের জগতে মেয়েরা এত খোলাখুলি কথা বলে না। কিন্তু এই গ্রুপে, এই মুখোশের আড়ালে, সবাই সত্যি।

কিন্তু তার আনন্দ বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। একটা কমেন্ট এলো একটা ছেলের থেকে — «ইনবক্সে আসো, কথা বলি।» সিনথিয়ার মুখ শুকিয়ে গেল। সে দ্রুত ওই ছেলের প্রোফাইলে ঢুকল — জিমের আয়নায় তোলা শার্টখোলা ছবি, বায়োতে লেখা «ব্যাড বয়»। তার বমি পাচ্ছিল। না। এদের থেকে দূরে থাকতে হবে।

আর তখনই শুরু হলো আসল ঝড়। ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট। একটা... দুটো... পাঁচটা... দশটা। নোটিফিকেশন বাজতেই থাকল। মিমের ওই একটা কমেন্ট আর চাঁদ-আলোর ছবি যেন গ্রুপের ছেলেদের পাগল করে দিয়েছে।

সিনথিয়া রিকোয়েস্টের লিস্ট খুলল। নাবিলার নিয়মগুলো তার মাথায় বাজছিল — যেন নাবিলা তার পাশে বসে ফিসফিস করছে। সে প্রতিটা প্রোফাইল খুঁটিয়ে দেখতে লাগল। শার্টখোলা ছবি — বাতিল। বায়োতে «প্লেবয়» লেখা — বাতিল। প্রোফাইলে কোনো ছবিই নেই, শুধু একটা কার্টুন — বাতিল। একটা রিকোয়েস্ট এলো — প্রোফাইলে একটা ফুলের ছবি, নাম «রাজু»। সিনথিয়া ভাবল, ফুলের ছবি মানে ভদ্র? সে প্রোফাইলে ঢুকল — ভেতরে শুধু শেয়ার করা নোংরা রসিকতা। বাতিল। আরেকটা — নাম «অর্ণব», ছবিতে সানগ্লাস পরা সেলফি। মেসেজ — «হাই সুন্দরী, কেমন আছো?» এই সম্বোধনেই তার গা ঘিনঘিন করল। বাতিল। প্রতিটা বাতিলের সাথে সাথে তার আঙুল আরও দ্রুত, আরও নিশ্চিত হচ্ছিল। সে শিখে যাচ্ছে — এই জঙ্গলে কী করে বাঁচতে হয়। নাবিলা যদি দেখত, গর্ব করত। একজনের মেসেজ এলো রিকোয়েস্টের সাথেই — «হাই মাগি, কথা বলবা?» সিনথিয়ার পেটের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। এই ভাষা! এই নোংরামি! সে এক সেকেন্ডও দেরি না করে লোকটাকে ব্লক করে দিল। ব্লক বোতামে চাপ দিতে দিতে তার মনে হলো — সে যেন একটা তলোয়ার চালাচ্ছে। মিম দুর্বল না। মিম নিজেকে রক্ষা করতে জানে।

বেশিরভাগ রিকোয়েস্টই ছিল এমন — নোংরা, তাড়াহুড়ো, লোভী। সে একের পর এক বাতিল করে দিল। কিন্তু তারপর একটা রিকোয়েস্টে তার চোখ আটকে গেল।

তানভীর। বয়স তেইশ। প্রোফাইল ছবিতে একটা ভদ্র ছেলে — কালো পাঞ্জাবি পরা, কোনো একটা অনুষ্ঠানে তোলা ছবি, মুখে হালকা হাসি। চোখদুটো শান্ত। কোনো শার্টখোলা নোংরামি নেই, বায়োতে কোনো «ব্যাড বয়» নেই। শুধু লেখা — «বই পড়তে ভালোবাসি।»

আর রিকোয়েস্টের সাথে একটা মেসেজ — «হ্যালো। আপনার কমেন্টটা পড়লাম গ্রুপে। খুব সুন্দর করে লিখেছেন। আমি তানভীর। কথা বলা যাবে?»

সিনথিয়া মেসেজটা তিনবার পড়ল। «আপনি» — কতদিন কেউ তাকে «আপনি» বলে সম্বোধন করেনি এই জগতে! এই একটা শব্দেই লোকটা অন্যদের থেকে আলাদা হয়ে গেল। ভদ্র। ধীর। তাড়াহুড়ো নেই।

সে আরও দুটো রিকোয়েস্ট বেছে নিল। একটা মেয়ের — প্রিয়া, একুশ বছর, যে তার কমেন্টে «ওয়েলকাম আপু!» লিখেছিল। মেয়েদের সাথে কথা বলা নিরাপদ। আরেকটা ছেলের — সাকিব, যার মেসেজ ছিল সংক্ষিপ্ত আর ভদ্র — «হাই, গ্রুপে নতুনদের সাথে পরিচিত হতে চাই।» প্রোফাইলটা স্বাভাবিক। সে সাবধানে অ্যাকসেপ্ট করল।

তিনজন। মিমের প্রথম তিনজন বন্ধু।

সবার আগে মেসেজ এলো তানভীরের। «ধন্যবাদ অ্যাকসেপ্ট করার জন্য।»

মিম টাইপ করল — «স্বাগতম।» তারপর থামল। সে কী লিখবে? সিনথিয়া হলে এতক্ষণে লজ্জায় ফোন রেখে দিত। কিন্তু মিম লজ্জা পায় না। মিম লিখল — «এত রাতে জেগে আছেন?»

জবাব এলো প্রায় সঙ্গে সঙ্গে — «আপনিও তো জেগে আছেন। রাত জাগা মানুষদের ঘুম কম আসে।»

সিনথিয়ার ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটল। লোকটা কথা বলতে জানে।

«কী করেন?» — তানভীর জিজ্ঞেস করল।

«কলেজে পড়ি,» মিম লিখল। তারপর সাবধানে যোগ করল — «ঢাকার একটা কলেজে। আপনি?»

«আমি চাকরি করি। ছোটখাটো একটা ফার্মে।» সহজ, সত্যি মনে হলো। «থাকি মোহাম্মদপুরে। আপনি?»

সিনথিয়ার আঙুল এক মুহূর্ত থামল। তারপর লিখল — «ধানমন্ডি।» মিথ্যেটা এখন আর কাঁপুনি তোলে না। মিথ্যে এখন তার ভাষা।

«ওহ, কাছেই তো,» তানভীর লিখল। «আপনার নামটা সুন্দর — মিম।»

«ধন্যবাদ।»

«এই নামে কেউ ডাকে?»

মিম লিখল — «এখন আপনি ডাকলেন।»

পাঠানোর পর সিনথিয়া নিজেই চমকে উঠল। এটা সে লিখল? এই ফ্লার্ট, এই খেলা — এটা কোথা থেকে এলো? সিনথিয়া তো এমন না! কিন্তু মিম এমন। মিমের ভেতরে যেন আরেকটা মেয়ে বাস করে — সাহসী, চালাক, যে জানে কী বললে ছেলেদের বুক ধড়ফড় করে।

তানভীরের জবাব এলো — «তাহলে আমি ভাগ্যবান।» সাথে একটা হাসির ইমোজি।

সিনথিয়া কম্বলের নিচে মুখ লুকিয়ে হাসল। তার গাল গরম। তার বুক ধড়ফড় করছে। এটা কী হচ্ছে? একটা অচেনা ছেলের সাথে মাঝরাতে কথা বলছে সে — আর ভালো লাগছে!

তানভীর লিখল — «সত্যি বলতে, আপনার কমেন্টটা পড়ে মনে হলো আপনি ভেতর থেকে খুব সাহসী। কিন্তু বাইরে থেকে হয়তো লাজুক। ঠিক বলছি?»

সিনথিয়ার হাসি থেমে গেল। কী করে বুঝল? সে তো মিমকে চেনে না! সে সিনথিয়াকে চেনে না! তবু এত নির্ভুলভাবে পড়ে ফেলল?

«অনুমান,» তানভীর লিখল, যেন তার মনের কথা পড়ে ফেলেছে। «আমি মানুষ পড়তে পারি। এটা আমার অভ্যাস।»

«ভয়ংকর অভ্যাস,» মিম লিখল।

«ভয় পাবেন না। আমি ভালো মানুষ।»

«ভালো মানুষরা এত রাতে জেগে থাকে না,» মিম লিখল, সাহস করে।

«তাহলে আমিও খারাপ, আপনিও খারাপ,» তানভীরের জবাব। «দুই খারাপ মানুষের আড্ডা।»

মিম হেসে ফেলল। «আমি খারাপ না।»

«এখনো না,» তানভীর লিখল। «কিন্তু রাত এখনো অনেক বাকি।»

সিনথিয়ার গলা শুকিয়ে গেল। এই লোকটা... এই লোকটা কথায় কথায় ফাঁদ পাতে। ভদ্র ফাঁদ। সে টের পাচ্ছে, তবু পা দিচ্ছে।

আর তখনই তানভীরের পরের মেসেজটা এলো — আর এই মেসেজটা পড়ে সিনথিয়ার শ্বাস আটকে গেল।

«এই রাতে, একা ঘরে, ফোনের আলোয়... কী ভাবছেন, মিম?»

সরাসরি প্রশ্ন। ভদ্র ভাষায়, কিন্তু ভেতরে দুষ্টুমি। সিনথিয়া টের পেল তার উরুর মাঝখানে সেই চেনা দপদপানি ফিরে এসেছে। লোকটা জানে। লোকটা বোঝে এই রাতের ভাষা।

সে কী লিখবে? «কিছু না» — এই মিথ্যেটা খুব সহজ। কিন্তু মিম কি মিথ্যে বলবে?

ঠিক তখনই প্রিয়ার মেসেজ এলো — «হাই আপু! আমি প্রিয়া। তোমার কমেন্টটা খুব ভালো লাগল।» মিষ্টি, নিরীহ। মিম জবাব দিল — «হাই প্রিয়া! ধন্যবাদ।» প্রিয়া লিখল — «তুমি কি ঢাকায় থাকো?» — «হ্যাঁ, ধানমন্ডিতে। তুমি?» — «আমি উত্তরা।» মেয়েদের সাথে কথা বলা এত সহজ, এত নির্ভার।

আর সাকিব লিখেছে — «হাই মিম। কী করো?» মিম সংক্ষেপে জবাব দিল — «কলেজে পড়ি।» সাকিব — «কোন কলেজ?» মিম সাবধানে লিখল — «নাম বলতে চাই না, প্রাইভেসি।» সাকিব — «ওহ, ঠিক আছে।» ভালো, বুঝদার ছেলে।

তিনটে চ্যাট, তিন রকম মিম। প্রিয়ার কাছে সে বড় আপু — মিষ্টি, সহজ। সাকিবের কাছে সে সাবধানী — মাপা, দূরত্ব রাখা। আর তানভীরের কাছে... তানভীরের কাছে সে অন্য কেউ। এমন কেউ, যাকে সে নিজেও চেনে না এখনো।

সে এক মুহূর্তের জন্য থামল। এইমাত্র যা ঘটল, তা কি স্বাভাবিক? এক ঘণ্টা আগে সে ছিল শুধু সিনথিয়া — একটা ভদ্র, লাজুক মেয়ে। আর এখন সে তিনজন মানুষের সাথে তিন রকম কথা বলছে, তিনটে মুখোশ পরে। তার মাথা ঘুরছিল — কিন্তু ভালো লাগছিল। যেন সে এতদিন একটা ছোট ঘরে বন্দি ছিল, আর আজ কেউ দরজা খুলে দিয়েছে।

সে তানভীরের প্রশ্নে ফিরে গেল — «কী ভাবছেন, মিম?»

মিম লিখল — «কিছু না।»

জবাব এলো সাথে সাথে — «মিথ্যে বলছেন।»

সিনথিয়ার বুক ধড়ফড় করে উঠল। «কী করে বুঝলেন?»

«কারণ আমিও কিছু ভাবছি,» তানভীর লিখল। «আর আমার মনে হচ্ছে আমরা দুজন একই জিনিস ভাবছি।»

ঘরের অন্ধকারটা হঠাৎ আরও গাঢ় মনে হলো। ফোনের আলোটা আরও নীল। সিনথিয়া টের পেল তার নিঃশ্বাস ঘন হয়ে আসছে। তার একটা হাত নিজের অজান্তেই নিচে নেমে গেছে — সালোয়ারের ওপর দিয়ে, উরুর মাঝখানে। সে চমকে হাতটা সরিয়ে নিল। না। এখন না। এখন সে কথা বলছে।

কিন্তু তানভীর থামল না। «মিম,» সে লিখল, «আপনার সাথে কথা বলে ভালো লাগছে। অনেকদিন এমন কারও সাথে কথা হয়নি, যে বোঝে।»

«আমিও,» মিম লিখল। আর এটা সত্যি ছিল। এই অচেনা ছেলেটা, এই মাঝরাত, এই গোপন পরিচয় — সব মিলিয়ে তার মনে হচ্ছিল সে ভাসছে।

«কাল আবার কথা হবে?» তানভীর জিজ্ঞেস করল।

«হবে,» মিম লিখল। «আমি এখানেই থাকব।»

«গুড নাইট, মিম। স্বপ্নে দেখা হবে।»

«গুড নাইট।»

সে তানভীরের প্রোফাইলটা আবার খুলল। ছবিটা বড় করে দেখল — কালো পাঞ্জাবি, হালকা হাসি, শান্ত চোখ। এই মানুষটা আসলে কে? সত্যিই ভালো, নাকি ভালো সাজার ভান? মিমের মন বলল — যাচাই করার সময় আছে। আজ শুধু কথা। কাল... কাল দেখা যাবে।

চ্যাটটা শেষ হলো। কিন্তু সিনথিয়ার ঘুম এলো না। সে ফোনটা বুকের ওপর রেখে সিলিং ফ্যানের দিকে তাকিয়ে রইল। তার কানে বাজছে তানভীরের শেষ কথাটা — «স্বপ্নে দেখা হবে।» সে চোখ বন্ধ করল। অন্ধকারে ভেসে উঠল একটা মুখ — কালো পাঞ্জাবি পরা, হালকা হাসি, শান্ত চোখ। তানভীর। যাকে সে কখনো দেখেনি, তবু যেন চেনে।

ফোনটা আবার ভাইব্রেট করল। নতুন ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট। আরও তিনটে। তারপর আরও দুটো। ইনবক্সে নতুন মেসেজ — «হাই মিম, কথা বলবা?» অচেনা নাম। সিনথিয়া প্রোফাইলটা দেখল — স্বাভাবিক মনে হলো। সে রিকোয়েস্টটা ঝুলিয়ে রাখল। কাল দেখা যাবে।

নোটিফিকেশন থামছিল না। মিম আক্তার — এক ঘণ্টা আগেও যার অস্তিত্ব ছিল না — এখন তার ইনবক্স ভরে উঠছে, তার নামে মানুষ কথা বলতে চাইছে।

সিনথিয়া ফোনটা পাশে রেখে দিল। অন্ধকারে শুয়ে সে ফিসফিস করে বলল —

«মিম।»

নামটা অন্ধকারে ভেসে রইল। তার নিজের কণ্ঠে, তার নিজের ঘরে — একটা নতুন নাম, একটা নতুন মেয়ে। সিনথিয়া ঘুমিয়ে পড়েছে এই বাসায়। কিন্তু মিম জেগে আছে — ফোনের ভেতর, রাতের ভেতর, তার বুকের ভেতর।

সে চোখ বন্ধ করল। অন্ধকারে মিমের মুখটা ভেসে উঠল — চাঁদ-আলোর সিলুয়েট, খোলা চুল, অদেখা মুখ। এই মেয়েটা কাল কী করবে? কাদের সাথে কথা বলবে? কতদূর যাবে? সিনথিয়া জানে না। সে শুধু জানে — দরজাটা খুলে গেছে। আর বন্ধ করার ইচ্ছে তার নেই।

(চলবে...)
Like Reply
#5
প্রথম কথা

পরদিনটা সিনথিয়ার কাটল এক অদ্ভুত দ্বৈত জীবনে। দিনের আলোয় সে ছিল সেই চেনা সিনথিয়া — ক্লাসে মনোযোগী ছাত্রী, টিফিনে নাবিলার সঙ্গে হাসি-ঠাট্টা, বাসায় মা'র সাহায্যকারী মেয়ে। কিন্তু ভেতরে ভেতরে অন্য একটা মেয়ে জেগে ছিল — মিম। রাতের অন্ধকারে ফোনের স্ক্রিনে যার জন্ম হয়েছিল, দিনের আলোতেও যে ঘুমাচ্ছিল না।

কলেজে নাবিলা তাকে দেখেই ভ্রু কুঁচকাল, "কী রে, আজ এত চুপচাপ কেন?"

"কিছু না," সিনথিয়া ব্যাগের ফিতা নাড়াচাড়া করল। "রাতে ঘুম হয়নি।"

নাবিলা চোখ টিপল, "ঘুম হয়নি, না? গ্রুপে ঘুরে বেড়াচ্ছিলি বুঝি?"

সিনথিয়ার মুখ লাল হয়ে গেল। "তুই কী করে জানলি?"

"তোর চোখ দেখে।" নাবিলা হাসল, তারপর গলা নামিয়ে বলল, "শোন, সাবধানে থাকিস। আর মনে রাখিস আমার কথা — কেউ ইনবক্সে মেসেজ করলে উত্তর দিবি না। ওই ছেলেগুলোর মুখে মধু, মনে বিষ।"

সিনথিয়া গম্ভীর মুখে মাথা নাড়ল। কিন্তু বুকের ভেতরটা ধড়াস করে উঠল। কারণ গত রাতে, মিম আক্তারের ইনবক্সে, ইতিমধ্যে তিনটা মেসেজ জমা হয়েছিল। আর সে সেগুলো পড়েছিল। সবগুলো। একটাও উত্তর দেয়নি — কিন্তু পড়েছিল। আর পড়ার সময় তার হাত কাঁপছিল।

সারাদিন ক্লাসে তার মন ছিল ওই তিনটা মেসেজে। বাংলা ম্যাডাম যখন সন্ধি-সমাস পড়াচ্ছিলেন, সিনথিয়ার চোখ ছিল বোর্ডে, কিন্তু মন ছিল ফোনের স্ক্রিনে — কে লিখেছে? কী লিখেছে? টিফিনে তানিশা যখন গল্প করছিল পাড়ার একটা বিয়ে নিয়ে, সিনথিয়া শুনছিল না। তার ভেতরে মিম ফিসফিস করছিল — "খুলে দেখ... একবার দেখ..."

বাসায় ফিরে সে অপেক্ষা করল রাতের। মা'র সঙ্গে রান্নায় হাত লাগাল, সিয়ামের পড়া দেখিয়ে দিল, বাবার সঙ্গে খবরের শিরোনাম নিয়ে দুটো কথা বলল। সবই যান্ত্রিক। তার আসল জীবন শুরু হবে রাত এগারোটার পর, যখন দরজার ছিটকিনি লাগবে।

অবশেষে রাত হলো। দরজা বন্ধ, লাইট নেভানো, ইয়ারফোন কানে। কাঁপা হাতে সে মিম আক্তারের অ্যাকাউন্টে ঢুকল। ইনবক্সে তিনটা নাম জ্বলজ্বল করছিল। প্রথমটা খুলতেই তার মুখটা কুঁচকে গেল।

রাফি। বয়স ২৪। প্রোফাইল ছবিতে জিম করা শরীর, সানগ্লাস পরা মুখ।

«হাই।»

«কী রে মাল, রিপ্লাই দিস না কেন?»

«ছবি দে একটা। ফিগারটা কেমন দেখি। শরম পাস না, আমি কাউকে দেখাব না।»

সিনথিয়ার গা ঘিনঘিন করে উঠল। ওই শব্দটা — যেন সে মানুষ না, বাজারের পণ্য। তার মনে পড়ল নাবিলার গলা — "কেউ ইনবক্সে মেসেজ করলে উত্তর দিবি না, ব্লক করে দিবি।" এক মুহূর্তও দেরি করল না সে। ব্লক বাটনে আঙুল রাখল, এক সেকেন্ড থমকাল, তারপর চাপ দিল।

হয়ে গেছে। রাফি নামের ছেলেটা তার জগৎ থেকে মুছে গেল।

সিনথিয়ার বুক ধড়ফড় করছিল, কিন্তু সেই ধড়ফড়ানির ভেতরে একটা অদ্ভুত গর্বও ছিল। সে পেরেছে। সে নিজেকে বাঁচিয়েছে। নাবিলা যদি জানত, বলত — "এই তো আমার বান্ধবী।" কিন্তু নাবিলা জানবে না। কারণ নাবিলা জানে না মিমের কথা। এই ভাবনাটা আসতেই গর্বের পাশাপাশি একটা চিনচিনে অপরাধবোধও জাগল। নাবিলা তার সবচেয়ে কাছের বন্ধু — আর সে-ই নাবিলার কাছে মিথ্যে বলছে। প্রতিদিন। প্রতিটা হাসির আড়ালে।

সে মিমের প্রোফাইলটা খুলল। প্রোফাইল ছবিতে একটা সিলুয়েট — মুখহীন এক মেয়ের অবয়ব, ইন্টারনেট থেকে নেওয়া। নিজের কোনো ছবি সে দেবে না — এই একটা নিয়ম সে ভাঙবে না, কখনো না। কভারে একটা উক্তি — «রাত আমাদের উলঙ্গ করে।» বন্ধুর তালিকায় সংখ্যা বাড়ছে — অচেনা নাম, অচেনা মুখ। এই জগতে সে কেউ না — আবার সবাই। আসল জীবনে সে সিনথিয়া — ভদ্র, শান্ত, নিয়ম মানা মেয়ে। এখানে সে মিম — যে ব্লক করতে পারে এক সেকেন্ডে, যে খেলতে জানে কথার খেলা। এই দুটো মেয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে তার মাথা ঘুরছিল — কিন্তু ফিরে যাওয়ার রাস্তা সে আর দেখতে পাচ্ছিল না। আর সত্যি বলতে কী — সে ফিরতে চাইছিলও না।

সে দ্বিতীয় মেসেজটা খুলল। নামটা অচেনা — সুমন, না রানা, কী যেন। ছবিতে একটা ঝাপসা সেলফি।

«Hi.»

«kemon acho?»

«tumi ki Dhaka te thako?»

«reply dao na ken?»

সিনথিয়া পড়ল, আর হাই তুলল। এই ছেলেটার মধ্যে কোনো আগুন নেই — শুধু শুকনো, বিরক্তিকর ভদ্রতা। যেন পরীক্ষার খাতায় লেখা রচনা। সে উত্তর দিল না। ফোনটা একপাশে রেখে পানি খেল। এই ছেলেটাকে সে ভুলেই গেল প্রায় — কিন্তু ইনবক্সে তার নামটা জ্বলতে থাকল, অপেক্ষায়। সিনথিয়া ঠিক করল — কিছু মেসেজের উত্তর না দেওয়াই উত্তর।

তারপর তৃতীয় নামটা। তানভীর।

এই নামটা খুলতে তার আঙুল একটু বেশি কাঁপল। গত রাতে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট অ্যাকসেপ্ট করার সময়ই সে ছেলেটার প্রোফাইলটা দেখেছিল — সাধারণ ছবি, হাসিমুখ, চোখে বুদ্ধির ঝিলিক। বয়স ২৩। আর প্রথম মেসেজটা ছিল অন্যদের মতো না — ভদ্র, প্রায় লাজুক।

«হাই মিম। আমি তানভীর।»

«গ্রুপে তোমার কমেন্টটা পড়লাম — 'প্রথমবার' পোস্টটায় তুমি লিখেছিলে, 'ভয়টা আসলে লজ্জার না, অজানার।'»

«সত্যি কথা। আর সুন্দর করে লিখেছ। তোমার লেখার হাত ভালো।»

সিনথিয়া মেসেজটা আবার পড়ল। তৃতীয়বার। তার গাল গরম হয়ে উঠল — কেউ তার লেখার প্রশংসা করেছে! আসল জীবনে কেউ কখনো তার লেখা পড়েইনি। আর এই অচেনা ছেলেটা — তার একটা সামান্য কমেন্ট মনে রেখেছে, কোট করেছে।

তার আঙুল কিবোর্ডের ওপর ঘুরল। উত্তর দেবে? নাবিলার নিয়ম বলছে — দিবি না। কিন্তু... এ তো রাফির মতো না। এ ভদ্র। এ তার লেখা নিয়ে কথা বলছে, শরীর নিয়ে না। একটা উত্তর দিলে কী এমন ক্ষতি?

"শুধু একটা," সে নিজেকে বলল। "ভদ্রভাবে।"

«ধন্যবাদ।» — পাঠিয়ে দিল। তারপর ফোনটা বুকের ওপর রেখে ছাদের দিকে তাকিয়ে রইল, যেন কোনো বোমা ফাটার অপেক্ষায়।

উত্তর এলো প্রায় সঙ্গে সঙ্গে।

«আরে! রিপ্লাই দিলে! ভাবলাম দেবে না।»

«তুমি কী করো, মিম? পড়ো?»

সিনথিয়ার ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটল। সে লিখল — মিথ্যেটা এখন তার জিভে সহজ হয়ে গেছে।

«পড়ি। কলেজে।»

«কোন কলেজ?»

«নাম বলব না।» সঙ্গে একটা ?।

«হাহা, রহস্যময়ী! ঠিক আছে, জোর করব না।»

«বয়স কত তোমার?»

«বিশ।» — মিথ্যেটা লিখতে তার হাত একটুও কাঁপল না। আঠারো বললে ছেলেটা হয়তো "বাচ্চা" বলে চলে যাবে। বিশ — নিরাপদ, প্রাপ্তবয়স্ক।

«আমি তেইশ। চাকরি করি, একটা প্রাইভেট ফার্মে।»

«থাকো কোথায়?»

«ধানমন্ডি। তুমি?»

«ঢাকাতেই।»

এভাবে কথা এগোল। তানভীর মজার ছেলে — কথায় কথায় হাসায়, কিন্তু কখনো সীমা ছাড়ায় না। সে জিজ্ঞেস করল তার প্রিয় বই, প্রিয় গান। সিনথিয়া অবাক হয়ে দেখল — সে সত্যি কথাও বলছে মাঝে মাঝে। রবীন্দ্রনাথের "শেষের কবিতা" তার প্রিয় — এটা সত্যি। বৃষ্টি ভালো লাগে — সত্যি। মিথ্যে আর সত্যি মিলে মিম যেন একটা আসল মানুষ হয়ে উঠছিল।

«তুমি জানো,» তানভীর লিখল একসময়, «গ্রুপে এত মেয়ে আছে, কিন্তু তোমার মতো করে কেউ লেখে না। তোমার কথায়... কী যেন আছে। সত্যি আছে।»

সিনথিয়ার বুকের ভেতরটা উষ্ণ হয়ে উঠল। এই প্রথম কেউ তাকে দেখল — আসল তাকে না, মিমকে — কিন্তু তবু দেখল। সে লিখল, «তুমি খুব মিষ্টি করে কথা বলো।»

«শুধু মিষ্টি? আর কিছু না?» সঙ্গে একটা ?।

সিনথিয়া হেসে ফেলল — নিঃশব্দে, বালিশে মুখ গুঁজে। «দুষ্টুও।»

«সেটা তো তুমি এখনো দেখোনি।»

এই লাইনটা পড়ে তার শ্বাস এক মুহূর্ত আটকে গেল। দুষ্টু। শব্দটার মধ্যে একটা ইঙ্গিত ছিল — হালকা, কিন্তু স্পষ্ট। তার আঙুল থমকে রইল কিবোর্ডের ওপর। এগোবে? না থামবে?

মিম এগোল।

«দেখাও তাহলে।»

পাঠানোর পরই সে ফোনটা উল্টে রাখল, যেন নিজের সাহস থেকে নিজেই পালাচ্ছে। তার কান গরম, গাল লাল। "আমি এটা লিখলাম? আমি?" — আয়নার মেয়েটা হাসছিল — রহস্যময়, সাহসী হাসি।

তানভীরের উত্তর এলো ধীরে। যেন সেও ভাবছে, মাপছে।

«তুমি সত্যিই অন্যরকম, মিম।»

«গ্রুপের অন্য মেয়েরা... ওরা হয় ভয় পায়, নয়তো শুরুতেই সব দিয়ে দেয়। তুমি... তুমি খেলাটা জানো।»

«কোন খেলা?»

«কথার খেলা। টানার খেলা।»

সিনথিয়ার শরীরে একটা শিরশিরানি বয়ে গেল। টানার খেলা। সে বুঝতে পারছিল — এই ছেলেটা শুধু মজা করছে না। সে তাকে পড়ছে, বুঝছে। আর সেও... সেও তাকে বুঝতে দিচ্ছে।

«তুমি ভয় পাচ্ছ না?» তানভীর জিজ্ঞেস করল।

«কিসের ভয়?»

«আমার। এই কথাগুলোর।»

সিনথিয়া সত্যি কথাটা লিখল — «পাচ্ছি। একটু। কিন্তু ভালোও লাগছে।»

«ভয় আর ভালো লাগা — দুটো একসঙ্গেই থাকে, মিম। যেখানে ভয় নেই, সেখানে মজাও নেই।»

কথা আরও গভীর রাতে গড়াল। ঘড়িতে বারোটা বেজে গেছে, বাসার সব শব্দ থেমে গেছে, শুধু সিনথিয়ার বুকের ধড়ফড়ানি আর ফোনের স্ক্রিনের আলো। তানভীরের মেসেজগুলো আসছিল ধীরে ধীরে — যেন সে প্রতিটা লাইন মেপে মেপে লিখছে।

«একটা কথা জিজ্ঞেস করব?»

«কর।»

«রাগ করবি না তো?»

সিনথিয়ার গলা শুকিয়ে গেল। «কর না।»

«তুই কখনো... নিজেকে ছুঁয়েছিস?»

সময় যেন থেমে গেল। সিনথিয়া ফোনের দিকে তাকিয়ে রইল। এই প্রশ্নটার উত্তর সে জানে। গত রাতে — আয়নার সামনে, বালিশে মুখ গুঁজে, মা'র টোকার আগে। কিন্তু মুখে বলা আর চ্যাটে লেখা — দুটো আলাদা জিনিস। লিখে ফেললে সেটা থেকে যাবে। স্ক্রিনে। তার নামে — মিমের নামে।

তার আঙুল টাইপ করল, মুছল, আবার টাইপ করল। শেষে শুধু একটা শব্দ পাঠাল।

«হুম।»

«কখন?»

«কাল রাতে।»

«আর এখন?»

সিনথিয়ার শ্বাস আটকে গেল। «এখন কী?»

«এখন কি ভিজে আছিস?»

"ভিজে" — শব্দটা পড়ে তার পুরো শরীরে আগুন ধরে গেল। কারণ সত্যিটা হলো — হ্যাঁ। প্যান্টির ভেতরটা ভিজে চপচপ করছে, উরুর মাঝখানে সেই চেনা দপদপানি শুরু হয়ে গেছে। সে এতক্ষণ নিজেকে বোঝাচ্ছিল এটা শুধু কথা — কিন্তু শরীর তো মিথ্যে বলে না।

«তানভীর...»

«বল না। আমি জোর করছি না। শুধু জানতে চাই। বলবি?»

এই "বলবি?" — এই একটা শব্দে সিনথিয়ার ভেতরের সব বাধা ভেঙে গেল। সে জোর করছে না। সে অনুমতি চাইছে। আর এই ভদ্রতাটাই তাকে সবচেয়ে বেশি উত্তেজিত করছিল — একটা ছেলে, যে চাইলে খারাপ হতে পারত, সে ভদ্র থাকছে। তার জন্য।

«হুম। ভিজে আছি।»

পাঠানোর পর সে ফোনটা বুকের ওপর চেপে ধরল, চোখ বন্ধ করল। "আমি এটা লিখলাম। আমি সত্যিই লিখলাম।" লজ্জায় তার কান গরম, কিন্তু লজ্জার নিচে — একটা অদ্ভুত, মিষ্টি উত্তেজনা। যেন সে কোনো উঁচু জায়গা থেকে লাফ দিয়েছে, আর পড়ার বদলে উড়ছে।

তানভীরের উত্তর এলো — «উফফ। তুই জানিস তুই কী করছিস আমার সাথে?»

«কী?»

«আমার ধোনটা এখন শক্ত হয়ে আছে। তোর কথা ভেবে।»

সিনথিয়া বালিশে মুখ গুঁজে চিৎকার করতে চাইল — নিঃশব্দে। ওই শব্দটা সে শুনেছে ছেলেদের মুখে, রাস্তায়, ফিসফিস করে। কিন্তু কেউ কখনো তার জন্য — তার কথা ভেবে — এভাবে বলেনি। তার শরীরের প্রতিটা কোষ যেন জেগে উঠল।

«তানভীর!!»

«সত্যি কথা বললাম। রাগ করলি?»

সে রাগ করেনি। এটাই তো ভয়ের কথা — সে রাগ করেনি। সে লিখল, «না।» আর এই "না" লিখতে গিয়ে তার হাত একটুও কাঁপল না। মিম এখন আর ভয় পাচ্ছে না। মিম উপভোগ করছে।

«তুই দেখতে কেমন, মিম?» তানভীর জিজ্ঞেস করল। «আমি কল্পনা করতে চাই।»

সিনথিয়া ভাবল। ছবি দেওয়া যাবে না — নাবিলার প্রথম নিয়ম। কিন্তু কথায় বর্ণনা? কথায় তো মুখ দেখা যায় না। সে লিখল, খেলার ছলে —

«লম্বা না, খাটোও না। চুল লম্বা — কোমর পর্যন্ত। গায়ের রং শ্যামলা।»

«আর?»

«আর কী?»

«তোর দুধগুলো কেমন?»

সিনথিয়া চমকে উঠল। ওই শব্দটা — তার শরীরের সবচেয়ে গোপন অংশের নাম। এই ছেলেটা এখন তার শরীরের কথা জিজ্ঞেস করছে — সরাসরি, লজ্জা ছাড়া। তার প্রথম ইচ্ছে হলো ফোনটা রেখে দেওয়ার। কিন্তু দ্বিতীয় ইচ্ছেটা — যেটা জিতল — সেটা বলল, "উত্তর দে।"

«কেন? জানতে ইচ্ছে করে?»

«খুব। কল্পনা করতে।»

«বড়।» — সে লিখল, আর সঙ্গে সঙ্গে মুখ ঢাকল হাতে। «তোর ভালো লাগবে।»

«উফফ, মিম। তুই আমাকে মেরে ফেলবি।»

সিনথিয়া হাসল — একটা বিজয়ীর হাসি। এই প্রথম সে বুঝল — শুধু ছেলেরাই চায় না। মেয়েরাও চাওয়াতে পারে। তার একটা "বড়" শব্দে একটা তেইশ বছরের ছেলে পাগল হয়ে যাচ্ছে। এই ক্ষমতাটা — এই অদ্ভুত, গোপন ক্ষমতাটা — তার মাথা ঘুরিয়ে দিল।

«তোর ভোদাটা কেমন?» তানভীর লিখল। «ভিজে তো আছেই, জানি। কিন্তু... কখনো কেউ ছুঁয়েছে?»

«না।» — সত্যি কথা। আরিফের কল্পনা ছাড়া কেউ না।

«তাহলে আমি প্রথম হবো — কল্পনায়।»

«তানভীর...»

«একটা খারাপ কথা বলব? তুই যদি না চাস, বলব না। বলবি?»

সিনথিয়ার হৃৎপিণ্ড গলায় এসে আটকাল। «বল।»

«তোকে চুদতে ইচ্ছে করছে, মিম। এত ইচ্ছে করছে যে হাত কাঁপছে।»

ঘরটা ঘুরতে লাগল। সবচেয়ে নিষিদ্ধ শব্দটা — যেটা শুনলে ভালো মেয়েরা কানে আঙুল দেয়। কিন্তু সিনথিয়া কানে আঙুল দিল না। সে ফোনটা আরও শক্ত করে ধরল। তার উরুর মাঝখানে এখন আগুন জ্বলছে — সত্যিকারের আগুন। তার একটা হাত নিজের অজান্তেই নিচে নেমে গেছিল — সালোয়ারের ওপর দিয়ে চাপ দিচ্ছিল। সে থামাল না নিজেকে।

«আমারও।» — সে লিখল। «আমারও ইচ্ছে করছে।»

«সত্যি?»

«সত্যি।»

«তুই জানিস, তোর এই সাহসটাই আমার সবচেয়ে ভালো লাগে, মিম। তুই লজ্জা পাস, কিন্তু পালাস না।»

এই লাইনটা পড়ে সিনথিয়ার চোখে পানি চলে এলো। কেউ তাকে বুঝেছে। কেউ তার ভয়টাকে সম্মান করেছে, তাকে "নষ্ট" বলেনি। সে লিখল, «তুমি খুব ভালো, তানভীর।»

«ভালো? না দুষ্টু?»

«দুটোই।»

«তাহলে শোন, দুষ্টু তানভীর একটা কথা বলবে — তুই এখন যা করছিস, থামিস না।»

সিনথিয়া চমকে উঠল। "সে কী করে জানল?" — তার হাত তো সত্যিই... সে তাড়াতাড়ি হাতটা সরিয়ে নিল, গাল লাল করে। «তুমি কী করে জানলে?!»

«তোর মেসেজের গতি দেখে।» সঙ্গে একটা ?। «আমি তোকে পড়তে পারি, মিম।»

সিনথিয়া আর পারল না। সে ফোনটা একপাশে রেখে বালিশে মুখ গুঁজল, শরীরটা কুঁকড়ে গেল। লজ্জা, উত্তেজনা, ভয়, আনন্দ — সব একসঙ্গে। তার ভেতরে মিম হাসছিল — "দেখলি? তুই পারিস।"

অনেকক্ষণ পর সে ফোনটা তুলল। তানভীর লিখেছে — «ঘুমিয়ে গেলি?»

«না।»

«তাহলে শোন। আজকের জন্য এতটুকুই। বেশি এগোলে তুই ভয় পাবি, আমি চাই না। ধীরে ধীরে, ঠিক আছে?»

সিনথিয়ার বুকটা ভরে উঠল। এই ছেলেটা থামতে জানে। সীমা জানে। «ঠিক আছে।»

«গুড নাইট, মিম। স্বপ্নে দেখা হবে।»

«গুড নাইট।»

ফোনটা রেখে সিনথিয়া অন্ধকারে শুয়ে রইল। তার শরীর এখনো জ্বলছে, উরুর মাঝখানে এখনো দপদপ করছে — অসমাপ্ত। কিন্তু আজ সে নিজেকে ছোঁবে না। আজকের রাতটা সে শুধু অনুভব করবে — এই নতুন, অচেনা, ভয়ংকর সুন্দর অনুভূতিটা।

আর তখনই — দরজার বাইরে থেকে ভেসে এলো মা'র গলা, "সিনথিয়া? এখনো জেগে আছিস?"

তার রক্ত হিম হয়ে গেল। "হ্যাঁ মা... ঘুমাচ্ছি।"

"ফোনটা রেখে ঘুমা।"

"রাখছি মা।"

পায়ের শব্দ মিলিয়ে গেল। সিনথিয়া ফোনটা বালিশের নিচে লুকিয়ে চোখ বন্ধ করল। কিন্তু ঘুম এলো না। তার মাথায় ঘুরছিল তানভীরের কথাগুলো — সেই নিষিদ্ধ শব্দগুলো, সেই সাহসী স্বীকারোক্তি। যা সে একসময় ঘৃণা করত, ভয় পেত — এখন তাই তার কানে গানের মতো বাজছে।

আর তারপর এলো অপরাধবোধটা। নাবিলার মুখ ভেসে উঠল — "কেউ মেসেজ করলে উত্তর দিবি না।" সে উত্তর দিয়েছে। শুধু দিয়েইনি — সে এমন কথা বলেছে, যা নাবিলা শুনলে... নাবিলা কী বলত? "তুই পাগল হয়ে গেছিস?" নাকি বুঝত?

"ক্ষমা করিস, নাবিলা," সে ফিসফিস করল অন্ধকারে। "এটা তোকে বলতে পারব না। এটা একটা গোপনের ভেতরে আরেকটা গোপন।"

এই ভাবনাটা তাকে কাঁদিয়ে দিল প্রায়। নাবিলা তার সবচেয়ে কাছের মানুষ — আর সে-ই নাবিলার কাছে সবচেয়ে বড় মিথ্যেটা বলছে। কিন্তু তানভীরকে ছাড়তেও পারবে না সে। এই দ্বন্দ্বটা — এই টানাটানিটা — তার বুকের ভেতরটা ছিঁড়ে দিচ্ছিল। তবু... তবু সে জানত, আগামীকাল রাতেও সে ফোনটা খুলবে। মিমকে সে আর বোতলে ভরতে পারবে না।

পরদিন কলেজে সিনথিয়া নিজেকে আয়নায় দেখে চমকে উঠল — চোখের নিচে কালি, কিন্তু ঠোঁটে একটা অচেনা হাসি। যেন রাতে কেউ তার মুখটা বদলে দিয়ে গেছে।

নাবিলা তাকে দেখেই থমকে গেল। "কী রে? তোর চোখে কী যেন..."

"কী?" সিনথিয়া সতর্ক হলো।

"জানি না।" নাবিলা তাকে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখল। "মনে হচ্ছে তুই কিছু লুকাচ্ছিস। প্রেমে পড়লি নাকি?"

সিনথিয়ার হৃৎপিণ্ড এক লাফ দিল। "ধুর! কী যে বলিস!"

"তাহলে ফোনে এত কী করিস আজকাল? গতকালও দেখলাম টিফিনে ফোন নিয়ে হাসছিলি।" নাবিলার চোখ সরু হলো। "গ্রুপে কিছু হচ্ছে? কেউ মেসেজ করেছে?"

এই প্রশ্নটা শুনে সিনথিয়ার গলা শুকিয়ে গেল। নাবিলা — যে তাকে সবচেয়ে ভালো চেনে — সে টের পেয়ে গেছে। কিন্তু সে বলতে পারবে না। মিমের কথা বলা মানে সব বলা — তানভীরের কথা, রাতের কথাগুলো, "ভিজে আছি"। নাবিলার সামনে এই কথাগুলো উচ্চারণ করা অসম্ভব।

"না রে," সে মিথ্যে বলল — আর এই মিথ্যেটা আগেরগুলোর চেয়ে ভারী লাগল। "এমনিই। একটা গল্প পড়ছিলাম।"

নাবিলা কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল, তারপর কাঁধ ঝাঁকাল। "ঠিক আছে। কিন্তু মনে রাখিস — আমি তোর বন্ধু। কিছু হলে আমাকে বলবি।"

"বলব।" — আরেকটা মিথ্যে।

সেদিন সারাদিন সিনথিয়ার মন ছিল অস্থির। ক্লাসে বসে সে ভাবছিল — নাবিলাকে কি বলে দেবে? সব? কিন্তু তারপরই মনে পড়ল তানভীরের মেসেজ — "তোর এই সাহসটাই আমার সবচেয়ে ভালো লাগে।" নাবিলা কি এটা বুঝবে? নাকি বলবে, "ছেলেটা তোকে ব্যবহার করছে"? সিনথিয়া জানত না। আর না জানার ভয়েই সে চুপ করে রইল।

বাসায় ফিরে সে স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করল — কিন্তু পারল না। রাতের খাবারে মা জিজ্ঞেস করলেন, "তোর কী হয়েছে? মুখটা এত লাল কেন?"

"গরম লাগছে," সে বলল, আর তাড়াতাড়ি ভাত শেষ করে উঠে গেল।

সেদিন বিকেলে পড়ার টেবিলে বসে সে তিনবার ফোনটা হাতে নিয়েছিল — শুধু দেখতে, তানভীর কিছু লিখেছে কিনা। প্রতিবারই নিজেকে বকেছে — দিনের বেলায় না, ধরা পড়ে যাবি। কিন্তু মন মানেনি। মা যখন চা নিয়ে এলেন, সে তাড়াতাড়ি ফোনটা বইয়ের নিচে লুকাল। মা কিছু টের পেলেন না — কিন্তু সিনথিয়ার মনে হলো, তার মুখে সব লেখা আছে। রাতের খাবারটা সে প্রায় না চিবিয়েই গিলল। সিয়াম জিজ্ঞেস করল, "আপু, তোর কী হয়েছে?" সে বলল, "কিছু না।" — আজকের দিনে এই দুটো শব্দই তার সবচেয়ে বড় মিথ্যে।

রাত এগারোটা। দরজার ছিটকিনি। ফোনের আলো। মিম জেগে উঠল।

তানভীর ইতিমধ্যে অনলাইন। «এই যে! অপেক্ষা করছিলাম।»

সিনথিয়ার বুকটা উষ্ণ হয়ে উঠল। কেউ তার জন্য অপেক্ষা করে! «সত্যি?»

«সত্যি। সারাদিন তোর কথা ভেবেছি।»

«কী ভেবেছ?»

«বলব? রাগ করবি না?»

«বল।»

«ভেবেছি — তোর চুলগুলো কেমন হবে খোলা অবস্থায়। কোমর পর্যন্ত চুল... আমি যদি তোর পেছনে দাঁড়িয়ে চুলগুলো সরিয়ে ঘাড়ে চুমু খাই...»

সিনথিয়া চোখ বন্ধ করল। কল্পনাটা এত জীবন্ত — তার ঘাড়ে যেন সত্যিই কারো নিঃশ্বাস লাগছে। «তানভীর...»

«হুম?»

«তুমি এত সুন্দর করে কী করে বলো?»

«কারণ তুই সুন্দর করে শুনিস।»

এভাবে কথা এগোল — আরও গভীরে, আরও কাছে। তানভীর আজ আরও সাহসী। সে জিজ্ঞেস করল তার পছন্দ-অপছন্দ, তার ভয়, তার স্বপ্ন। আর প্রতিটা উত্তরের পর বলল — «আরও বল। তোর কথা শুনতে ভালো লাগে।» সিনথিয়া অবাক হয়ে দেখল — সে এমন কথা বলছে, যা সে কাউকে কখনো বলেনি। এমনকি নাবিলাকেও না। যে সে কখনো কাউকে ভালোবাসেনি, কিন্তু ভালোবাসতে চায়। যে সে ভয় পায় — ধরা পড়ার, ভুল করার, হারিয়ে যাওয়ার।

«তুই জানিস, মিম,» তানভীর লিখল, «তুই আমার দেখা সবচেয়ে সত্যি মেয়ে।»

«আমি তো মিথ্যে নামে কথা বলছি।» — সিনথিয়া লিখে ফেলল, তারপর চমকে উঠল। এত সত্যি কথা কেন বলল?

«নামটা মিথ্যে হতে পারে,» তানভীর লিখল, «কিন্তু তুই মিথ্যে না। আমি টের পাই।»

সিনথিয়ার চোখ ভিজে উঠল। এই অচেনা ছেলেটা — যাকে সে কখনো দেখেনি — সে তাকে নাবিলার চেয়েও ভালো বুঝছে। এই ভাবনাটা আসতেই অপরাধবোধটা আবার ফিরে এলো, আরও তীব্র হয়ে। "নাবিলা, আমি তোকে ঠকাচ্ছি।" কিন্তু সে ফোনটা রাখতে পারল না।

রাত একটা বেজে গেল। সিনথিয়ার চোখ জ্বলছে, কিন্তু ঘুমের কথা মনেও হচ্ছে না। তখন তানভীর লিখল —

«মিম।»

«হুম?»

«একটা গেম খেলবি?»

সিনথিয়ার ভ্রু কুঁচকে গেল। «কী গেম?»

«ট্রুথ অর ডেয়ার।»

সময় থেমে গেল। ট্রুথ অর ডেয়ার — সত্যি না সাহস। সিনথিয়া ফোনের দিকে তাকিয়ে রইল। সে জানে এই গেম মানে কী। সত্যি বলতে হবে — নগ্ন সত্যি। আর ডেয়ার মানে — যা বলা হবে, তা করতে হবে। তার হাত কাঁপছিল। তার বুক ধড়ফড় করছিল। ভয় — আর সেই ভয়ের নিচে, চাপা, মিষ্টি উত্তেজনা।

সে টাইপ করল। মুছল। আবার টাইপ করল।

«খেলব।»
Like Reply
#6
ট্রুথ অ্যান্ড ডেয়ার

«খেলব।»

মেসেজটা পাঠিয়ে সিনথিয়া ফোনটা বুকের ওপর চেপে ধরল, যেন স্ক্রিনের আলোটা কেউ দেখে ফেলবে। ঘর অন্ধকার। দরজায় ছিটকিনি। পাশের ঘর থেকে বাবার নাক ডাকার মৃদু শব্দ ভেসে আসছে। মা অনেকক্ষণ ঘুমিয়ে। সিয়ামের ঘর নীরব। আর সে — কম্বলের নিচে, মিম হয়ে, এক অচেনা ছেলের সঙ্গে খেলতে বসেছে এমন এক খেলা, যার নাম শুনলেই বুকের ভেতরটা কেমন করে।

ট্রুথ অ্যান্ড ডেয়ার।

স্ক্রিনে তিনটে ডট নাচছে। তানভীর টাইপ করছে। সিনথিয়ার আঙুলগুলো ঠান্ডা হয়ে গেছে। সে ভাবল — নাবিলা যদি জানত! নাবিলার নিয়ম ছিল স্পষ্ট — ইনবক্সে কারও সঙ্গে কথা বলা যাবে না। আর সে সেই নিয়মটা ভেঙেছে সেই প্রথম দিনই, আর এখন ভাঙছে আরও গভীরে। কিন্তু নাবিলা জানে না মিমের কথা। এই গোপনতাটাই সিনথিয়াকে সাহস দিচ্ছিল — মিম যা করবে, তার দায় সিনথিয়ার নয়। অন্তত আজ রাতে সে নিজেকে এটাই বোঝাল।

তানভীরের মেসেজ এলো।

«নিয়ম শুনবি আগে?»

«বলো।»

«এক — যা-ই জিজ্ঞেস করি, সত্যি বলতে হবে। কিন্তু চাইলে একটা প্রশ্ন স্কিপ করতে পারবি। শুধু একটা। দুই — ডেয়ার দিলে করতে হবে, কিন্তু যদি খুব অস্বস্তি লাগে, বলবি। জোর করব না। তিন —»

একটু থামল। ডটগুলো নাচল আবার।

«তিন — মাঝরাতে এই খেলা খেলার জন্য তুই যে সাহসটা দেখালি, তার জন্য আমার সম্মান।»

সিনথিয়া হাসল অন্ধকারে। এই ছেলেটা — তেইশ বছরের এই অচেনা ছেলেটা — কথা বলতে জানে। ভদ্র, কিন্তু প্রতিটা কথার নিচে একটা দুষ্টু স্রোত। যেন নদীর ওপরের পানি শান্ত, নিচে টান।

«তাহলে শুরু করি?» সে লিখল।

«তুই শুরু কর। ট্রুথ না ডেয়ার?»

সিনথিয়া ভাবল এক মুহূর্ত। ডেয়ার নিলে কী দেবে কে জানে। নিরাপদ দিক থেকে শুরু করা ভালো।

«ট্রুথ।»

«আচ্ছা। সহজ দিয়ে শুরু করি।» একটু বিরতি। «এই মুহূর্তে তুই কী পরে আছিস?»

সিনথিয়ার গাল গরম হয়ে গেল। এটাই সহজ প্রশ্ন? সে নিজের দিকে তাকাল কম্বলের নিচে — পুরনো একটা নরম কামিজ, গলার কাছটা একটু ঢিলে, নিচে সুতির পাজামা। মায়ের পুরনো কামিজ, যেটা এখন তার গায়ে হয়। এতে লজ্জার কী আছে? কিন্তু তানভীরের প্রশ্নের ভঙ্গিতে — «এই মুহূর্তে» — যেন সে তাকে দেখতে পাচ্ছে। যেন অন্ধকার ঘরে কেউ দাঁড়িয়ে তাকে দেখছে।

«পুরনো একটা কামিজ। আর পাজামা।»

«রং?»

«হালকা নীল। কেন, তুমি কি কল্পনা করছ?»

ডট নাচল। তারপর — «হয়তো।»

সিনথিয়ার বুক ধড়ফড় করে উঠল। এই «হয়তো» শব্দটার ভেতর কত কিছু লুকিয়ে! সে কম্বলটা আরও টেনে নিল গায়ে, যেন কল্পনার চোখ থেকে নিজেকে আড়াল করছে। অথচ ভেতরে ভেতরে একটা অদ্ভুত ভালো লাগা — কেউ তাকে কল্পনা করছে। সিনথিয়াকে কেউ কোনোদিন কল্পনা করেনি। মিমকে করছে।

«এবার আমার পালা,» সে লিখল দ্রুত, বিষয় বদলাতে। «ট্রুথ না ডেয়ার?»

«ডেয়ার।»

সিনথিয়া ভাবল। কী ডেয়ার দেবে? সে তো এই খেলায় নতুন। নাবিলার সঙ্গে কখনো খেলেনি। গ্রুপে দেখেছে মেয়েরা ডেয়ার দেয় — কিন্তু সেসব ছিল মেয়েদের মধ্যে। এটা অন্যরকম।

«ডেয়ার — আমাকে একটা মজার ঘটনা বলো। তোমার জীবনের সবচেয়ে বোকার মতো মুহূর্ত।»

তানভীরের উত্তর আসতে দেরি হলো না। «ক্লাস নাইনে থাকতে, কলেজের বার্ষিক অনুষ্ঠানে কবিতা আবৃত্তি করতে উঠেছিলাম। মাঝপথে ভুলে গেলাম। পুরো হল নীরব। আমি মাইকের সামনে দাঁড়িয়ে বললাম — «কবিতাটা এত সুন্দর যে আমি নিজেই মুগ্ধ হয়ে ভুলে গেছি।» পুরো হল হেসে উঠল। শিক্ষকরা পর্যন্ত।»

সিনথিয়া হেসে ফেলল, হাত দিয়ে মুখ চেপে যাতে শব্দ না হয়। «তুমি তো চালাক!»

«বাঁচার জন্য মানুষ কত কী করে। এবার তোর পালা। ট্রুথ না ডেয়ার?»

«ট্রুথ।»

এবার ডটগুলো অনেকক্ষণ নাচল। সিনথিয়া বুঝতে পারল — এবারের প্রশ্নটা সহজ হবে না।

«বলবি?» এলো প্রথমে।

সিনথিয়ার শ্বাস আটকে গেল। এই «বলবি?» — তানভীরের এই ভদ্রতাটাই সবচেয়ে বিপজ্জনক। সে জোর করে না, ঠেলে দেয় না। শুধু দরজাটা খুলে রাখে, আর সিনথিয়া নিজেই ভেতরে ঢুকে পড়ে।

«বলো।»

«তোর... মাপটা কত?»

এক মুহূর্ত সিনথিয়া বুঝতেই পারল না। তারপর বুঝল — আর কান গরম হয়ে গেল। মাপ! শরীরের মাপ! এই প্রশ্নটা তাকে আজ পর্যন্ত কেউ করেনি। দর্জির দোকানেও মা পাশে দাঁড়িয়ে থাকত। আয়নার সামনে সে নিজে মেপেছে একবার — ফিতা দিয়ে, কাঁপা হাতে, দরজা বন্ধ করে।

৩৪-২৮-৩৬।

সংখ্যাগুলো তার মনে গেঁথে আছে। অর্ধেক গর্ব, অর্ধেক লজ্জা। গর্ব — কারণ গ্রুপের মেয়েরা বলে এই মাপটা «পারফেক্ট»। লজ্জা — কারণ এটা বলা মানে নিজের শরীরটাকে কারও সামনে খুলে ধরা, সংখ্যায়।

«স্কিপ করবি?» তানভীর লিখল, তার দ্বিধা টের পেয়ে। «মনে আছে, একটা স্কিপ আছে তোর।»

সিনথিয়া তাকিয়ে রইল স্ক্রিনের দিকে। স্কিপ করবে? এটাই তো খেলা — সত্যি বলা। আর মিম তো সত্যি বলার জন্যই। সিনথিয়া হলে হয়তো পালাত। মিম পালায় না।

তার আঙুল কাঁপছিল। তবু টাইপ করল।

«৩৪-২৮-৩৬।»

পাঠিয়ে দিয়েই সে ফোনটা উল্টে দিল বালিশে, যেন উত্তরটা দেখতে চায় না। বুকের ভেতর হাতুড়ি পিটছে। কী ভাববে ছেলেটা? খুব... বেশি ভাববে? নাকি হাসবে?

ফোনটা তুলল আবার।

«ওয়াও।»

শুধু এই একটা শব্দ। তারপর — «সত্যি বলছি, মিম — এই সংখ্যাগুলো শুনে আমার... আমি জানি না কী বলব। তুই জানিস তুই কতটা...?»

সে শেষ করল না। করতে হলো না। সিনথিয়া বুঝল। আর এই অসমাপ্ত বাক্যটাই তাকে সবচেয়ে বেশি ছুঁল — তানভীর crude হতে পারত। অনেক ছেলে হতো। রাফি হয়েছিল। কিন্তু তানভীর থেমে গেল — যেন সিনথিয়ার সম্মানের সীমানায় এসে দাঁড়িয়ে গেল, ভেতরে ঢুকল না।

«তুমি ভদ্র,» সিনথিয়া লিখল। «এটা তোমার সবচেয়ে বড় দুষ্টুমি, জানো?»

«মানে?»

«মানে — তুমি যদি অভদ্র হতে, আমি ব্লক করে দিতাম। ভদ্র বলেই আটকে গেছি।»

«তাহলে আমার ভদ্রতাই আমার ফাঁদ?»

«তোমার ফাঁদে আমি নিজেই পা দিয়েছি।»

লিখে ফেলেই সিনথিয়া চমকে উঠল। এত সাহসী কথা সে কোথা থেকে বলছে? সিনথিয়া — কলেজের চুপচাপ মেয়েটা, যে ক্লাসে হাত তুলতে ভয় পায় — সে এমন কথা বলতে পারে? পারে না। কিন্তু মিম পারে। মিমের আঙুলে কোনো ভয় নেই।

«এবার আমি,» তানভীর লিখল। «ট্রুথ।»

সিনথিয়া ভাবল — এবার সে একটু সাহসী হবে। «তুমি কি কখনো কাউকে... সত্যিকারের পছন্দ করেছ?»

«একজনকে করেছিলাম।»

«তারপর?»

«সে জানতই না। আমি বলিনি। ভয় পেয়েছিলাম।» একটু থেমে — «তোর মতো।»

সিনথিয়ার বুকটা কেমন করে উঠল। «আমার মতো মানে?»

«মানে — তুইও তো কাউকে পছন্দ করিস, যে জানে না। তাই না?»

সে থমকে গেল। আরিফ। চশমার পেছনের সেই চোখ, কলেজ গেটের সেই হাসি। তানভীর কী করে জানল? নাকি শুধুই আন্দাজ?

«হয়তো,» সে লিখল।

«তার নাম বলবি না, জানি। শুধু এটা বল — সে কি তোকে কখনো ছুঁয়েছে?»

প্রশ্নটা এত সরাসরি এলো যে সিনথিয়ার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে গেল। ছোঁয়া। এই শব্দটা — «ছোঁয়া» — তার শরীরে যেন সত্যিকারের ছোঁয়ার মতো লাগল।

সত্যিটা হলো — না। কেউ তাকে কখনো ছোঁয়নি। মা ছাড়া, বাবা ছাড়া — সেভাবে কেউ না। আরিফ তো দূরের কথা, তার হাতও কখনো ধরেনি। তার শরীরটা এখনো কারও হাতের স্পর্শ পায়নি — শুধু তার নিজের, অন্ধকার ঘরে, কম্বলের নিচে, লজ্জায়।

«না,» সে লিখল। «কেউ না।»

এবার ডটগুলো অনেকক্ষণ নাচল না। শুধু একটা মেসেজ এলো — «তাহলে তুই... একদম...?»

«হ্যাঁ।»

«ওহ, মিম।»

এই «ওহ, মিম» — এর মধ্যে এত কিছু ছিল। অবাক হওয়া, কৌতূহল, আর... একটা নরম সম্মান। যেন সে কোনো দামি জিনিসের সামনে দাঁড়িয়েছে, ছুঁতে ভয় পাচ্ছে।

«তুমি হাসছ না তো?» সিনথিয়া লিখল, হঠাৎ ভয় পেয়ে।

«হাসব কেন? আমি... আমি আসলে খুশি।»

«খুশি কেন?»

«কারণ — তুই আমাকে এই সত্যিটা বললি। এত বড় সত্যি। মানে তুই আমাকে বিশ্বাস করিস।»

সিনথিয়া চোখ বন্ধ করল। বিশ্বাস। এই শব্দটা আজ রাতে প্রথমবার সত্যি মনে হলো। সে তানভীরকে চেনে না। তার মুখ দেখেনি, গলা শোনেনি। অথচ তাকে সে এমন কথা বলছে, যা নাবিলাকেও বলেনি। যা আয়নার মেয়েটাকেও ফিসফিস করে বলতে লজ্জা পায়।

«এবার তোমার পালা,» সে লিখল গলা শুকিয়ে। «ট্রুথ না ডেয়ার?»

«ট্রুথ,» এলো উত্তর।

সিনথিয়া এবার একটু দুষ্টু হতে চাইল। «রাতে ঘুমানোর আগে তুমি কী ভাবো? সত্যি বলবা।»

«তোকে।»

একটাই শব্দ। সিনথিয়ার পুরো শরীরে শিহরন বয়ে গেল। «মিথ্যা!»

«সত্যি। গত কয়েক রাত ধরে। তোর মেসেজের অপেক্ষায় থাকি। তুই অনলাইন এলেই...» সে থামল। «এবার তোর পালা। ট্রুথ না ডেয়ার?»

«ডেয়ার।» সিনথিয়া লিখল — আর সঙ্গে সঙ্গেই ভয় পেল। কেন ডেয়ার নিল? ট্রুথই তো নিরাপদ ছিল!

«ভয় পাচ্ছিস?»

«একটু।»

«তাহলে শোন — ডেয়ারটা কঠিন, কিন্তু খারাপ না। আমি চাই...» ডট নাচল। «আমি চাই তুই নিজেকে বর্ণনা করবি। যেন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আছিস। মাথা থেকে পা পর্যন্ত। ধীরে ধীরে। যেমন দেখছিস, তেমন।»

সিনথিয়ার হাত থেকে ফোনটা প্রায় পড়ে গেল। নিজেকে বর্ণনা করা! আয়নার সামনে দাঁড়ানোর কথা ভাবতেই তার মনে পড়ল দুপুরের সেই মুহূর্তটা — দরজা বন্ধ করে, কামিজ তুলে, নিজেকে প্রথমবার সত্যিকারের দেখা। «তুই সুন্দর» — আয়নার মেয়েটাকে সে বলেছিল।

কিন্তু সেটা ছিল নিজের কাছে। এটা — একজন ছেলেকে লিখে পাঠানো। প্রতিটা শব্দে নিজেকে খুলে ধরা।

«এটা... এটা খুব...» সে লিখল।

«বলবি?» তানভীর লিখল। «যদি না চাস, অন্য ডেয়ার দেবো।»

সিনথিয়া তাকিয়ে রইল অন্ধকার ছাদের দিকে। ফ্যানটা ঘুরছে মৃদু শব্দে। তার শরীরটা কম্বলের নিচে গরম হয়ে উঠেছে। সে ভাবল — মিম কী করবে? মিম লজ্জা পায়, কিন্তু মিম পালায় না। আর... আর ভেতরে ভেতরে, সত্যি কথা হলো — সে চায়। চায় কেউ তাকে দেখুক। শুধু সংখ্যায় নয় — কথায়। চায় কেউ তার শরীরটাকে সুন্দর বলুক, যেভাবে সে আয়নায় নিজেকে বলেছিল।

«আচ্ছা,» সে লিখল। «কিন্তু ধীরে ধীরে। একটা একটা করে।»

«আমি অপেক্ষা করব। যতক্ষণ লাগে।»

সিনথিয়া চোখ বন্ধ করল। কল্পনায় সে দাঁড়াল আয়নার সামনে। আর আঙুল চলতে লাগল।

«আমার চুল... কোমর পর্যন্ত। কালো। ভেজা থাকলে আরও কালো দেখায়।»

«দেখতে পাচ্ছি,» তানভীর লিখল। «তারপর?»

«কপালটা... ছোট। চোখ... বড় বড়। মা বলে হরিণের মতো।»

«হরিণের মতো চোখ... আর?»

সিনথিয়ার গাল জ্বলছে, কিন্তু আঙুল থামছে না। যেন কথাগুলো নিজে নিজে বেরিয়ে আসছে — বহুদিনের জমে থাকা কথা।

«ঠোঁট... নিচেরটা একটু ভারী। হাসলে...» সে থামল। «তুমি হাসছ?»

«একদম না। আমি শুনছি। শুধু শুনছি।»

সে চালিয়ে গেল। «গলা... সরু। গলার নিচে...» তার আঙুল কাঁপল। «বুক... তুমি তো মাপ জানোই।»

«জানি। কিন্তু তোর মুখে শুনতে চাই।»

সিনথিয়া দাঁত দিয়ে নিচের ঠোঁট কামড়াল। «ভারী। গোল।... বোঁটাগুলো...» সে লিখতে পারল না। মুছে দিল। আবার লিখল — «বাদামি।»

«মিম...» শুধু তার নাম। কিন্তু সেই নাম ডাকার ভঙ্গিতে এমন কিছু ছিল যে সিনথিয়ার চোখে পানি চলে এলো। কেউ তাকে এভাবে ডাকেনি — এত... মনোযোগ দিয়ে।

«কোমর সরু। পেটে... একটু মেদ আছে। লজ্জা লাগে।»

«লজ্জার কিছু নেই। আমার ভালো লাগছে — তুই যেমন, তেমন।»

«নিতম্ব... ভারী।» সে লিখল দ্রুত, যেন শব্দটা তাড়াতাড়ি পার করে দিতে চায়। «পা... লম্বা। পায়ের আঙুলগুলো ছোট ছোট।»

«শেষ?»

«শেষ।»

একটু নীরবতা। তারপর তানভীরের মেসেজ — দীর্ঘ।

«মিম, তুই জানিস তুই কী করলি? তুই আমাকে তোর আয়নাটা দেখালি। আর আমি... আমি সারাজীবন এই বর্ণনাটা মনে রাখব। তুই সুন্দর। তোর লজ্জাটাও সুন্দর। তোর সাহসটাও।»

সিনথিয়া ফোনটা বুকে চেপে ধরল। চোখ বন্ধ। এই মুহূর্তে সে অনুভব করল — কেউ তাকে দেখেছে। সত্যিকারের দেখা। সিনথিয়াকে কলেজে কেউ দেখে না — সে ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে যায়। বাড়িতে সে «মেয়ে» — ভালো মেয়ে, শান্ত মেয়ে। কিন্তু মিম — মিমকে একজন দেখল। প্রতিটা বক্ররেখা, প্রতিটা লজ্জা, প্রতিটা গর্ব — সব।

«তুমি কাঁদাচ্ছ আমাকে,» সে লিখল।

«কাঁদিস না। হাস। তোর হাসিটা আমি কল্পনা করতে পারছি — হরিণের মতো চোখে।»

সিনথিয়া হাসল — চোখে পানি নিয়ে। বাইরে রাত গভীর। ঘড়িতে বারোটা বেজে গেছে কখন, টের পায়নি।

«এবার...» সে লিখল। «আমার পালা। ট্রুথ।»

«ডেয়ার,» এলো উত্তর — তানভীর এবার নিজেই ডেয়ার নিল।

সিনথিয়া ভাবল। তার ভেতরের দুষ্টু মিমটা এবার জেগে উঠেছে — সেই মিম, যে আয়নার সামনে নিজেকে «সুন্দর» বলেছিল।

«ডেয়ার — তুমি এখন কী পরে আছো, সেটা বর্ণনা করো। আমার মতো করে।»

তানভীরের উত্তর এলো দ্রুত। «একটা পুরনো টি-শার্ট। আর...» ডট নাচল। «আর শর্টস।»

«শুধু?»

«শুধু। গরম লাগছে।»

সিনথিয়ার কল্পনায় ভেসে উঠল একটা ছবি — অন্ধকার ঘর, একটা ছেলে, পুরনো টি-শার্ট। সে তাড়াতাড়ি চোখ সরাল কল্পনা থেকে। «এবার তুমি। ট্রুথ না ডেয়ার?»

«ডেয়ার।»

এবার তানভীরের ডেয়ার এলো — আর সিনথিয়ার বুকের ভেতরটা থমকে গেল।

«কল্পনা কর — আমি এখন তোর পাশে শুয়ে আছি। কম্বলের নিচে। অন্ধকারে। তুই কী করবি? শুধু বলবি — লিখে। কিছু করতে হবে না। শুধু... বল।»

সিনথিয়া পড়ল বারবার। «শুধু বলবি। কিছু করতে হবে না।» তানভীর জানে — সে বুঝতে পারছে সিনথিয়া কোথায় আছে, কী অবস্থায়। আর সে তাকে নিরাপদ রাখছে — কথার মধ্যে, কাজের বাইরে।

কিন্তু «শুধু বলা»-টাই তো সবচেয়ে কঠিন। কারণ বলতে গেলে কল্পনা করতে হয়। আর কল্পনা করলে শরীর জেগে ওঠে।

তার হৃৎপিণ্ড এত জোরে ধড়ফড় করছে যে মনে হচ্ছে তানভীর শুনতে পাবে — যেন ফোনের ভেতর দিয়ে শব্দটা পৌঁছে যাবে।

«বলবি?» এলো আবার — সেই ভদ্র প্রশ্ন।

সিনথিয়া চোখ বন্ধ করল। কল্পনা করল — পাশে কেউ শুয়ে আছে। গরম নিঃশ্বাস। অন্ধকারে একটা উপস্থিতি।

«প্রথমে...» সে টাইপ করল, মুছল, আবার লিখল। «প্রথমে আমি তোমার দিকে তাকাব। অন্ধকারে তোমার মুখটা দেখার চেষ্টা করব।»

«তারপর?»

«তারপর... তোমার বুকের ওপর মাথা রাখব। তোমার হৃৎপিণ্ডের শব্দ শুনব।»

«শুনতে পাচ্ছিস?»

«হ্যাঁ। খুব জোরে ধড়ফড় করছে। আমারটার মতো।»

ডট নাচল অনেকক্ষণ। «আর?»

সিনথিয়ার আঙুল এবার আর কাঁপছে না। কল্পনাটা তাকে নিয়ে গেছে অন্য কোথাও — যেখানে লজ্জা নেই, শুধু সত্যি আছে।

«তোমার হাতটা... আমার চুলে। তুমি আস্তে আস্তে বুলিয়ে দিচ্ছ। আর আমি... আমি তোমার গলার কাছে মুখ গুঁজে দিয়েছি। তোমার গন্ধ...» সে থামল। «তোমার গন্ধ কেমন, আমি জানি না। কিন্তু কল্পনায়... ভালো।»

«মিম।»

«আর...» সে লিখল, এবার আর থামল না। «আমি চাইব তুমি আমাকে জড়িয়ে ধরো। শক্ত করে। যেন আমি কোথাও পালাতে না পারি। যেন... যেন আমি শুধু তোমার। এই রাতটার জন্য।»

নীরবতা। দীর্ঘ নীরবতা। সিনথিয়া ভাবল — বেশি বলে ফেলল? খুব বেশি?

তারপর এলো — «তুই জানিস তুই কী বললি?»

«জানি।»

«আমি এখন... আমি জানি না কী বলব। শুধু এটা বলি — তুই যদি সত্যি আমার পাশে থাকতিস, আমি তোকে ছাড়তাম না। কিন্তু...»

«কিন্তু?»

«কিন্তু তোর অনুমতি ছাড়া একটা আঙুলও নাড়াতাম না।»

সিনথিয়ার চোখে আবার পানি এলো। এই ছেলেটা — এই অচেনা, তেইশ বছরের ছেলেটা — তাকে এমন সম্মান দিচ্ছে, যা সে বাস্তব জীবনে কখনো পায়নি। বাস্তবে ছেলেরা তাকে দেখেই না। আর এখানে — অন্ধকারে, কল্পনায় — একজন তাকে রানির মতো রাখছে।

«তুমি... তুমি খুব ভালো, তানভীর,» সে লিখল।

«ভালো না। শুধু... তোকে হারাতে চাই না।»

এই কথাটার পর দুজনেই একটু চুপ রইল। শুধু ডটগুলো মাঝে মাঝে নাচছিল — যেন দুজনেই টাইপ করছে, মুছছে, আবার টাইপ করছে।

অবশেষে তানভীর লিখল — «শেষ রাউন্ড। ট্রুথ। আর এটা... এটা সবচেয়ে কঠিন প্রশ্ন।»

«বলবি?»

সিনথিয়ার গলা শুকিয়ে গেল। «বলো।»

«তুই কখনো... নিজেকে ছুঁয়েছিস... কারও কথা ভেবে?»

প্রশ্নটা স্ক্রিনে জ্বলজ্বল করছে। সিনথিয়া পড়ল। আবার পড়ল। তার পুরো শরীরে আগুন ধরে গেল — লজ্জার আগুন, আর... আর অন্য কিছুর।

সত্যিটা — হ্যাঁ। গত রাতে। আরিফের মুখ কল্পনায়। কম্বলের নিচে, অন্ধকারে, মা'র টোকার আগের সেই অসমাপ্ত মুহূর্ত। সে বলবে? এই সত্যিটা বলা মানে নিজের সবচেয়ে গোপন দরজাটা খুলে দেওয়া।

«একটা স্কিপ বাকি আছে তোর,» তানভীর লিখল নরম করে। «চাইলে ব্যবহার কর।»

সিনথিয়া তাকিয়ে রইল ছাদের দিকে। স্কিপ। সে স্কিপ করতে পারে। কিন্তু... কিন্তু আজ রাতে সে যা যা বলেছে — মাপ, আয়নার বর্ণনা, কল্পনার আলিঙ্গন — সব বলার পর এই একটা সত্যি লুকিয়ে কী লাভ? মিম তো সত্যি বলার জন্যই।

«হ্যাঁ,» সে লিখল। শুধু এই একটা শব্দ।

«কাকে ভেবে?»

সিনথিয়া চোখ বন্ধ করল। আরিফের মুখ ভেসে উঠল — চশমা, হাসি। কিন্তু... কিন্তু আজ রাতে, এই মুহূর্তে, আরিফের মুখটা একটু ঝাপসা। তার জায়গায় অন্য একটা মুখ — যার চেহারা সে জানে না, শুধু কথা জানে। ভদ্র কথা, দুষ্টু কথা।

«একজনকে,» সে লিখল। «যাকে আমি চিনি না।»

«আমাকে?»

সিনথিয়া উত্তর দিল না। শুধু লিখল — «হয়তো।»

আর এই «হয়তো»-টাই ছিল আজ রাতের সবচেয়ে সত্যি উত্তর।

সে ফোনটা এক মুহূর্তের জন্য নামিয়ে রাখল বালিশে। বুকের ভেতরটা এমন করছে যেন সে পাহাড়ের কিনারায় দাঁড়িয়ে — এক পা এগোলেই পড়ে যাওয়া, অথচ পেছনে ফেরার ইচ্ছেটাই মরে গেছে। মিম তাকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। আর সিনথিয়া — সিনথিয়া শুধু অনুসরণ করছে, চোখ বন্ধ করে।

অনেকক্ষণ কেউ কিছু লিখল না। সিনথিয়া শুধু তাকিয়ে রইল স্ক্রিনের দিকে — «হয়তো» শব্দটা সেখানে জ্বলছে, আর সে জানে তানভীরও তাকিয়ে আছে।

অবশেষে তানভীর লিখল — «আমার পালা। শেষ প্রশ্ন। ট্রুথ।»

«বলো।»

«তোর একটা গোপন কথা বল — যা পৃথিবীর কেউ জানে না। শুধু আমি জানব।»

সিনথিয়া থমকে গেল। গোপন কথা — যা কেউ জানে না। তার মাথায় একসঙ্গে অনেকগুলো সত্যি ভিড় করল। যে সে আঠারো, বিশ নয়। যে সে মিরপুরে থাকে, ধানমন্ডিতে নয়। যে তার নাম সিনথিয়া, মিম নয়। যে নাবিলাও জানে না এই অ্যাকাউন্টের কথা।

কিন্তু এগুলো বলা যাবে না। এগুলো বললে মিম মরে যাবে। আর মিম মরলে... এই রাতটাও মরে যাবে।

তাহলে কোন সত্যিটা বলবে? কোনটা সেই গোপন কথা, যা বললে মিম বাঁচবে, মরবে না — বরং আরও সত্যি হবে?

সে চোখ বন্ধ করল। আর হঠাৎ বুঝল — সবচেয়ে বড় গোপন কথাটা আসলে মিম নিজেই।

«আমি...» সে টাইপ করল ধীরে ধীরে। «আমি বাস্তবে যেমন, এখানে তেমন নই।»

«মানে?»

«মানে — বাস্তবে আমি চুপচাপ। কেউ আমাকে লক্ষ্য করে না। আমি ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে যাই। কিন্তু এখানে... তোমার সামনে... আমি যা বলতে চাই, বলতে পারি। যা ভাবি, লিখতে পারি।» সে থামল, তারপর লিখল — «মিম আসলে আমি। আসল আমি। আর বাইরের আমি... সেটাই মুখোশ।»

এই কথাগুলো লিখে সিনথিয়ার বুকটা হালকা হয়ে গেল — যেন বহুদিনের একটা পাথর নেমে গেল। এটাই সত্যি। সিনথিয়া — ভালো মেয়ে, শান্ত মেয়ে, পড়ুয়া মেয়ে — সেটা সবার জন্য সাজানো একটা চরিত্র। আর মিম — রাতের অন্ধকারে, কম্বলের নিচে, অচেনা একজনের সামনে নিজেকে খুলে ধরা মেয়েটা — সেটাই সে। আসল সে।

তানভীরের উত্তর এলো দেরিতে — কিন্তু ভারী।

«তাহলে আজ রাতে আমি ভাগ্যবান। কারণ আমি আসল তোকে চিনলাম। যাকে পৃথিবীর কেউ চেনে না।»

সিনথিয়া ফোনটা বুকে চেপে ধরল। চোখের কোণ ভিজে গেছে। «তুমি আমাকে... দেখেছ। সত্যিকারের।»

«প্রতিটা শব্দে।»

ঘড়িতে তখন রাত দেড়টা। দুজনেই জানে — এবার থামতে হবে। কিন্তু কেউ থামতে চাইছে না।

«কাল আবার?» সিনথিয়া লিখল — আর লিখেই লজ্জা পেল। এতটা চাওয়া কি ঠিক?

«প্রতিদিন,» তানভীর লিখল। «যতদিন তুই চাস।»

«শুভরাত্রি, তানভীর।»

«শুভরাত্রি, মিম। স্বপ্নে দেখা হবে — যেখানে তুই চাস।»

সিনথিয়া হাসল। ফোনটা রাখতে যাবে — ঠিক তখনই আরেকটা মেসেজ এলো।

«আর শোন।»

«বলো।»

ডট নাচল। অনেকক্ষণ। তারপর —

«কাল রাতে... একটা ডেয়ার দেবো। মুখ ছাড়া... একটা ছবি।»

সিনথিয়া পড়ল। আবার পড়ল। তার হাতটা থেমে গেল স্ক্রিনের ওপর।

ছবি। মুখ ছাড়া — কিন্তু তবু ছবি। তার শরীরের ছবি। নাবিলার প্রথম নিয়ম — নিজের ছবি কখনও দিবি না, ভুলেও না।

সে উত্তর দিল না। টাইপ করল না। শুধু তাকিয়ে রইল মেসেজটার দিকে — অন্ধকার ঘরে, কম্বলের নিচে, ফোনের নীল আলোয় তার মুখটা ভাসছে।

তারপর ধীরে ধীরে ফোনটা বন্ধ করে দিল।

বালিশের পাশে রাখা ডায়েরিটা টেনে নিল — «গোপন ডায়েরি»। কলমটা হাতে নিয়ে একটা লাইন লিখল, তারপর কলম থামিয়ে রেখে তাকিয়ে রইল অন্ধকারে।

«মিম আজ একটু বেশি সত্যি হয়ে গেল।»
Like Reply
#7
আপুর বাসা

পরিকল্পনাটা এসেছিল দুপুরে, ভাত খাওয়ার টেবিলে। মা ডালের বাটিটা এগিয়ে দিয়ে বললেন, "শিলা ফোন করেছিল সকালে। বলল সিনথিয়াকে এক রাতের জন্য পাঠিয়ে দাও — ওর নাকি খুব একা একা লাগছে, সোহেল অফিসের কাজে ব্যস্ত।"

সিনথিয়ার হাত থেমে গেল ভাতের ওপর। শিলা আপু! মায়ের খালাতো বোনের মেয়ে, তার চেয়ে দশ বছরের বড়, কিন্তু সম্পর্কটা বোনের চেয়েও ঘনিষ্ঠ। তিন বছর আগে বিয়ে হয়েছে, সোহেল দুলাভাইয়ের সাথে সংসার — শহরের অন্য প্রান্তে একটা ছোট ফ্ল্যাটে।

"যাবি?" মা জিজ্ঞেস করলেন।

সিনথিয়া প্রায় লাফিয়ে উঠতে চাইল, কিন্তু নিজেকে সামলে শান্ত গলায় বলল, "যাই। আপুর বাসায় তো অনেকদিন যাওয়া হয় না।"

মনের ভেতর তখন অন্য হিসেব চলছিল। আপুর বাসা মানে — নিজের ঘর, নিজের দরজা, কেউ টোকা দেবে না মাঝরাতে। মানে তানভীরের সাথে খোলাখুলি কথা বলার একটা পুরো রাত। তার বুকের ভেতরটা টিপটিপ করে উঠল।

বিকেলে ব্যাগ গোছাতে গোছাতে সে একটা অদ্ভুত উত্তেজনা টের পেল। দুটো জামা, একটা ওড়না, টুথব্রাশ — আর ফোনের চার্জারটা সে ওড়নার ভাঁজে লুকিয়ে রাখল, যেন কোনো নিষিদ্ধ জিনিস পাচার করছে। চার্জার ছাড়া এক রাত — অকল্পনীয়। মা দেখলে জিজ্ঞেস করতেন, "চার্জার লুকাচ্ছিস কেন?" — তাই লুকিয়েই রাখল।

আলমারি খুলে জামা বাছতে গিয়ে সে থমকে গেল। কোনটা নেবে? আপুর বাসায় কে দেখবে — কিন্তু তানভীরের ডেয়ারের কথা মনে পড়তেই তার গাল গরম হয়ে উঠল। মুখ ছাড়া ছবি... কাঁধের... সে একটা হালকা নীল কামিজ তুলে নিল — গলাটা একটু বড়। আয়নার সামনে ধরে দেখল নিজেকে। "তুই কী ভাবছিস, সিনথিয়া?" আয়নার মেয়েটা হাসল — সেই রহস্যময় হাসি, যা গত কয়েকদিনে তার চেনা হয়ে গেছে।

"শোন," মা দরজায় দাঁড়িয়ে বললেন, "আপুর কথা শুনবি। রাত জাগবি না। আর ফোনে বেশি সময় নষ্ট করবি না।"

"আচ্ছা মা," সিনথিয়া মাথা নাড়ল — মুখে অনুগত মেয়ের ভাব, মনে তখন তানভীরের গত রাতের মেসেজটা বাজছে — «কাল রাতে... একটা ডেয়ার দেবো। মুখ ছাড়া... একটা ছবি।»

ব্যাগ কাঁধে নিয়ে বেরোনোর আগে সে নাবিলাকে মেসেজ করল — "আপুর বাসায় যাচ্ছি, এক রাত থাকব।"

জবাব এলো সাথে সাথে — "ওয়াও! এনজয় কর! আর শোন — আপুর বাসা মানেই ফ্রিডম। ?"

সিনথিয়া হাসল। নাবিলা যদি জানত, এই ফ্রিডমটা সে কী কাজে লাগাতে চায়! কিন্তু মিমের কথা সে নাবিলাকেও বলেনি — এই গোপনটা শুধু তার। মেসেজটা ডিলিট করে দিল সে, অভ্যেসবশত।

মা নিজেই তাকে রিকশায় তুলে দিলেন আপুর বাসা পর্যন্ত। পথে মা বললেন, "শিলা তোকে খুব ভালোবাসে। ওর নিজের তো কোনো বোন নেই।"

সিনথিয়া জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল। বিকেলের আলোয় শহরটা ঝলমল করছিল। তার মনে হচ্ছিল — আজকের রাতটা অন্যরকম হবে। কেন, তা সে জানত না। শুধু বুকের ভেতর একটা চাপা ঢেউ টের পাচ্ছিল।

মা বললেন, "শিলার বাসায় গিয়ে বেশি ফোন ঘাঁটবি না, বুঝলি? ওরা ভাববে মেয়ে সারাদিন ফোনে।"

"আচ্ছা মা," সিনথিয়া বলল — আর মনে মনে হাসল। মা যদি জানতেন, ফোনটাই আজ রাতের সবচেয়ে দরকারি জিনিস।

রিকশা গলি পেরিয়ে বড় রাস্তায় উঠল। দোকানপাট, ভিড়, হর্নের শব্দ। সিনথিয়ার মনে পড়ল গত রাতে তানভীরের শেষ মেসেজ — «কাল রাতে... একটা ডেয়ার দেবো।» সে জানত ডেয়ারটা কী। ছবি। মুখ ছাড়া। ভাবতেই তার পেটের ভেতরটা কেমন করে উঠল — ভয় আর উত্তেজনার মিশেল।

আপুর ফ্ল্যাটটা ছিল তিনতলায়। সিঁড়ি বেয়ে উঠতে উঠতে সিনথিয়ার মনে হলো — এই সিঁড়িটা যেন তার পুরনো জীবন থেকে নতুন কিছুর দিকে নিয়ে যাচ্ছে। মা নিচে দাঁড়িয়ে হাত নাড়লেন।

দরজা খুলতেই শিলা আপু প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়লেন — "আরে! আমার বোন এসেছে!" জড়িয়ে ধরলেন শক্ত করে। আপুর গায়ে রান্নার গন্ধ, চুলে শ্যাম্পুর — চেনা, আপন গন্ধ। "আয় আয়, ভেতরে আয়। মা, আপনি ভেতরে আসবেন না?"

"না রে, বাসায় কাজ আছে," মা হাসলেন। "মেয়েটাকে দেখে রাখিস।"

"চিন্তা করবেন না!" আপু সিনথিয়ার কাঁধ জড়িয়ে ধরলেন।

"মা কেমন আছে? সিয়াম?" আপু একসাথে দশটা প্রশ্ন করলেন।

মা চা খেয়ে চলে গেলেন। যাওয়ার আগে সিনথিয়ার কানে ফিসফিস করে বললেন, "ভদ্রভাবে থাকবি।"

দরজা বন্ধ হতেই আপু তার হাত ধরে টেনে নিয়ে গেলেন ভেতরে। "আয়, তোকে আমার সংসার দেখাই।" ছোট্ট ফ্ল্যাট — দুটো বেডরুম, একটা ড্রয়িং-ডাইনিং, রান্নাঘর। কিন্তু প্রতিটা কোণায় আপুর হাতের ছোঁয়া — পর্দায় ফুলের ছাপ, টেবিলে ছোট্ট মানিপ্ল্যান্ট, দেয়ালে বিয়ের ছবি।

"এই ঘরটা তোর," আপু গেস্ট রুমের দরজা খুলে দিলেন। ছোট্ট ঘর, একটা সিঙ্গেল খাট, আলমারি, জানালা দিয়ে বাইরের গলি দেখা যায়। "বাথরুমটা এই পাশে," আপু দেখিয়ে দিলেন অ্যাটাচড বাথরুম। সিনথিয়ার মনে মনে হিসেব মিলে গেল — দরজা বন্ধ, নিজের বাথরুম। পারফেক্ট।

ব্যাগটা খাটের ওপর রেখে সে জানালায় গিয়ে দাঁড়াল। নিচে গলি, ওপাশে আরেকটা বিল্ডিং। আপু পেছন থেকে জড়িয়ে ধরলেন। "খুশি তো?"

"খুব," সিনথিয়া বলল — আর সত্যিই খুশি ছিল। এই ফ্ল্যাটে একটা উষ্ণতা আছে, যা তাদের বাসায় নেই — হয়তো নতুন সংসারের গন্ধ।

ড্রয়িং রুমের দেয়ালে বিয়ের বড় ছবি — আপু লাল শাড়িতে, দুলাভাই শেরওয়ানিতে। "দুলাভাইকে সেদিন কী লাগছিল!" সিনথিয়া বলল।

"আর এখন দেখ," আপু হাসলেন। "ভুঁড়ি বেরোচ্ছে।" দুজনে হাসল। আপু ছবিটার দিকে তাকিয়ে নরম গলায় বললেন, "তিন বছর হয়ে গেল। মনে হয় সেদিন।" তার চোখে কী যেন একটা ঝিলিক — যা সিনথিয়া তখন বুঝল না।

দুপুরের খাবারটা হলো উৎসবের মতো। আপু রেঁধেছিলেন ইলিশ ভাজি, ডাল, শাক — সিনথিয়ার পছন্দের সব। টেবিলে বসে আপু বললেন, "তোর জন্য স্পেশাল। সোহেল তো ইলিশের কাঁটা বাছতে পারে না, আমি বেছে দিই।"

"আপু তুমি কত ভালো," সিনথিয়া বলল, মুখে ভাত নিয়ে।

"ভালো না হলে সংসার চলে?" আপু হাসলেন। "শোন, বিয়ের পর মেয়েদের একটা নতুন জীবন শুরু হয়। প্রথম প্রথম কষ্ট হয় — নতুন বাসা, নতুন মানুষ। কিন্তু তারপর... তারপর এই বাসাটাই নিজের হয়ে যায়।" তার চোখে কী যেন একটা স্বপ্নিল ভাব।

খেতে খেতে আপু গল্প জুড়লেন — পাশের ফ্ল্যাটের ভাবির কাণ্ড, অফিসের নতুন কলিগ, সোহেল দুলাভাইয়ের ভুলে যাওয়ার অভ্যেস।

"আর তুই?" আপু হঠাৎ চোখ টিপে বললেন, "কলেজে কেউ আছে নাকি? সত্যি করে বল।"

সিনথিয়ার গলায় ভাত আটকে গেল। কাশতে কাশতে বলল, "ধুর আপু! কী যে বলো!"

"আহা, লজ্জা পাচ্ছে!" আপু হাসতে হাসতে বললেন, "তোর বয়সে আমারও..." — থেমে গেলেন, রহস্যময় হাসি হাসলেন। "যাকগে। যখন হবে, আমাকে আগে বলবি। প্রমিস?"

"প্রমিস," সিনথিয়া বলল — আর মনের ভেতর তানভীরের মুখটা ভেসে উঠল। যাকে সে কখনো দেখেনি, যার আসল নাম ছাড়া কিছু জানে না, অথচ যার কাছে সে নিজের শরীরের মাপ পর্যন্ত বলে দিয়েছে।

খাওয়ার পর দুজনে ড্রয়িং রুমে বসল। আপু পান বানিয়ে দিলেন।

"তোর মা ফোনে বলছিল, তুই আজকাল ফোনে বেশি থাকিস," আপু হঠাৎ বললেন, পান মুখে দিয়ে।

সিনথিয়ার বুকটা ছ্যাঁত করে উঠল। "না তো... মানে, পড়ার গ্রুপ আছে।"

"আহা, ধরা পড়ে গেছিস!" আপু হাসলেন। "ভয় পাস না। তোর বয়সে আমিও লুকিয়ে লুকিয়ে..." থেমে গেলেন। "যাকগে। শুধু একটা কথা — যা-ই করিস, নিজেকে বাঁচিয়ে করিস। দুনিয়াটা ভালো না, বোন।"

সিনথিয়া মাথা নিচু করল। আপুর কথাগুলো যেন তার গোপনটার ওপর আলো ফেলছিল। "আপু..."

"বল।"

"তুমি... তুমি কখনো কাউকে লুকিয়ে ভালোবেসেছ?"

আপু একটু চুপ করে রইলেন। তারপর নরম গলায় বললেন, "বিয়ের আগে... তোর দুলাভাইকেই। বাবা-মা জানত না প্রথমে।" হাসলেন। "ভালোবাসা লুকিয়ে রাখা যায় না বেশিদিন। একসময় বেরিয়ে আসেই।" বাইরে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামছিল। আপু তার কলেজের গল্প শুনলেন মন দিয়ে — নাবিলার দুষ্টুমি, তানিশার ভয়, পরীক্ষার চাপ।

"তুই বদলে যাচ্ছিস," আপু হঠাৎ বললেন, তার মুখটা ভালো করে দেখে। "চোখে কী যেন একটা... বড় হয়ে যাচ্ছিস তুই।"

সিনথিয়ার বুকটা ধড়ফড় করে উঠল। "কী যে বলো!"

"মেয়েরা বুঝতে পারে," আপু হাসলেন। "যাক, ভালোই। বড় হওয়া খারাপ না।"

বিকেলে দুজনে বারান্দায় বসল। আপু চা বানিয়ে আনলেন। নিচে গলিতে বাচ্চারা খেলছিল।

"তোর দুলাভাইটা না," আপু হঠাৎ বললেন, "বিয়ের আগে কী লাজুক ছিল জানিস? কথা বলতেই লাল হয়ে যেত।" হেসে ফেললেন। "আর এখন..."

"এখন কী?" সিনথিয়া জিজ্ঞেস করল।

"এখন..." আপু রহস্যময় হাসি হাসলেন। "বড় হলে বুঝবি। বিয়ের পর মানুষ বদলে যায়। ভালোর জন্যই বদলায়।" তার গালে হালকা লালচে আভা।

সিনথিয়ার কৌতূহল হলো, কিন্তু জিজ্ঞেস করতে লজ্জা লাগল। আপু নিজেই বললেন, "শোন, একটা কথা বলি — স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে যা হয়, সেটা নিয়ে লজ্জার কিছু নেই। বাইরের মানুষ বুঝবে না, কিন্তু ভেতরে... ভেতরে একটা আলাদা দুনিয়া থাকে।"

"তুমি দুলাভাইকে ভালোবাসো?" সিনথিয়া ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল।

আপু তার হাতটা ধরলেন। "পাগলের মতো।" একটু থেমে — "তুই যখন কাউকে সত্যিকারের ভালোবাসবি, তখন বুঝবি — ভালোবাসা শুধু হাত ধরা না। অনেক... অনেক গভীর কিছু।"

সন্ধ্যা সাতটার দিকে দরজায় চাবির শব্দ হলো। "এসে গেছে তোর দুলাভাই," আপু উঠে দাঁড়ালেন।

সোহেল দুলাভাই ঢুকলেন — লম্বা, হাসিখুশি মুখ, অফিসের শার্টের হাতা গুটানো। হাতে একটা মিষ্টির প্যাকেট। "শালী এসেছে শুনে মিষ্টি না আনলে চলে?" বলে প্যাকেটটা উঁচু করে দেখালেন। সিনথিয়াকে দেখে চোখ বড় বড় করে বললেন, "আরে! শালী সাহেবা! কবে এলে?"

"আজই দুলাভাই," সিনথিয়া হাসল।

"বাহ! তাহলে তো আজ পার্টি!" দুলাভাই মিষ্টির প্যাকেটটা টেবিলে রেখে বললেন, "তোমার আপু তো সকাল থেকে বলছে — সিনথিয়া আসছে, সিনথিয়া আসছে। আমি তো ভাবলাম প্রধানমন্ত্রী আসছেন!"

সবাই হেসে উঠল। দুলাভাই এমনই — যেখানেই যান, হাসি নিয়ে যান। সিনথিয়ার মনে আছে, বিয়ের সময় এই মানুষটাই তাকে বলেছিলেন, "তুমি আমার ছোট বোনের মতো। কোনো দরকার হলে সবার আগে আমাকে বলবে।"

দুলাভাই ফ্রেশ হয়ে এসে সোফায় বসলেন। "তো শালী সাহেবা, কলেজ কেমন চলছে? কোনো পাগল ছেলে পেছনে ঘুরঘুর করে?"

"দুলাভাই!" সিনথিয়া লজ্জা পেল।

"আরে লজ্জা পাওয়ার কী আছে!" দুলাভাই হাসলেন। "তোমার বয়সে আমিও..." আপু কটমট করে তাকাতেই থেমে গেলেন। "আচ্ছা আচ্ছা, বলছি না।"

আপু চা নিয়ে এলেন। দুলাভাই চায়ে চুমুক দিয়ে বললেন, "তোমার আপুটা জানো, আজ সকালে কী করেছে? আমার অফিসের ফাইল লুকিয়ে রেখেছে, যাতে আমি দেরি করে যাই!"

"মিথ্যে!" আপু প্রতিবাদ করলেন, কিন্তু হাসছিলেন।

"সত্যি! এই মহিলা আমাকে অফিসে যেতে দিতে চায় না।" দুলাভাই সিনথিয়ার দিকে তাকিয়ে চোখ টিপলেন। "বুঝলে শালী, বিয়ে করো না। স্বাধীনতা শেষ।"

"তুমি তো মহাসুখে আছো," আপু তার কাঁধে একটা কিল মারলেন। দুলাভাই হেসে আপুর হাতটা ধরে ফেললেন — এক সেকেন্ডের জন্য, কিন্তু সিনথিয়া দেখল। সেই এক সেকেন্ডে দুজনের চোখে কী যেন একটা খেলা করে গেল — যা সে বুঝল না, কিন্তু টের পেল।

রাতের খাবারটা হলো হইচই করে। দুলাভাই অফিসের মজার গল্প বললেন — বস একবার মিটিংয়ে "I am very confusion" বলেছিলেন, সবাই মুখ চেপে হেসেছিল। আর এক কলিগ প্রেজেন্টেশনে নিজের নামের বানান ভুল লিখে এসেছিলেন। "বস রেগে বললেন, তোমার নামটাও ঠিকমতো লিখতে পারো না? কলিগ বলল, স্যার, টেনশনে ভুল হয়ে গেছে!" আপু মাঝে মাঝে "আহা, বানিয়ে বলছ!" বলে ধমক দিলেন, দুলাভাই "সত্যি বলছি!" বলে হাত তুললেন। সিনথিয়া হাসতে হাসতে পেটে ব্যথা পেয়ে গেল।

"তোমার পড়াশোনা কেমন চলছে?" দুলাভাই জিজ্ঞেস করলেন।

"ভালো," সিনথিয়া বলল।

"কোনো ছেলে টিজ করলে আমাকে বলবে," দুলাভাই চোখ টিপলেন। "শালীর সম্মান রক্ষা করা দুলাভাইয়ের পবিত্র দায়িত্ব!"

"তুমি থামবে?" আপু হেসে তার পিঠে একটা চাপড় মারলেন।

খেতে খেতে আপু বললেন, "ও হ্যাঁ — রনি আজ বাইরে খেয়ে আসবে বলেছে। ওর ভাতটা ঢেকে রেখো।" দুলাভাই সিনথিয়ার দিকে তাকিয়ে বললেন, "আমার ছোট ভাই — রনি। পঁচিশ বছর বয়স, মোবাইলের দোকানে কাজ করে। ছোট ঘরটায় থাকে আমাদের সাথেই।" সিনথিয়া মাথা নাড়ল — নামটা তখন মনে রাখার মতো কিছু মনে হলো না।

খেতে খেতে দুলাভাই বললেন, "শালী, একটা সত্যি কথা বলো তো — তোমার আপু রান্নায় কেমন?"

"খুব ভালো," সিনথিয়া বলল।

"দেখলে?" দুলাভাই আপুর দিকে তাকালেন। "শালী সার্টিফিকেট দিল। এখন থেকে প্রতিদিন ইলিশ রাঁধবে।"

"প্রতিদিন ইলিশ খেলে তোমার পকেট ফাঁকা," আপু হাসলেন।

"পকেট ফাঁকা হলেও মন ভরা," দুলাভাই বললেন — আর আপুর দিকে এমনভাবে তাকালেন, যাতে সিনথিয়ার মনে হলো সে যেন অদৃশ্য হয়ে যাওয়া উচিত। আপু লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করলেন — তিন বছরের বিবাহিতা নারীর গালে লাজুক লালচে আভা। সিনথিয়া অবাক হয়ে দেখল। এতদিনের সংসারেও... এত ভালোবাসা থাকে?

খাওয়ার পর দুলাভাই টিভি দেখতে বসলেন, আপু রান্নাঘর গোছালেন। সিনথিয়া সাহায্য করতে গেলে আপু তাড়িয়ে দিলেন — "যা, তোর ঘরে গিয়ে বিশ্রাম নে। সারাদিন তো ঘুরেছিস।"

ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করতেই সিনথিয়ার বুকের ভেতরটা লাফিয়ে উঠল। এই তো — নিজের একটা রাত। কেউ টোকা দেবে না। কেউ জিজ্ঞেস করবে না।

সে ফোনটা বের করল। তানভীর অনলাইন ছিল।

«এসে গেছি,» সে লিখল। «আপুর বাসায়।»

«কেমন লাগছে?» জবাব এলো সাথে সাথে। «আপু কী বলল?»

«ভালো। আপু আমাকে বয়ফ্রেন্ড নিয়ে টিজ করছিল।»

«আর তুই কী বললি?»

«বললাম কেউ নেই।» সে একটু থেমে লিখল, «মিথ্যে বললাম।»

«ভালো করেছিস।» তানভীর লিখল। «আমি তোর সিক্রেট। সিক্রেটই থাকি।»

সিনথিয়া বিছানায় শুয়ে পড়ল, ফোনটা বুকের ওপর। «তুমি কী করছ?»

«শুয়ে আছি। তোর কথা ভাবছি।»

«মিথ্যুক।»

«সত্যি।» একটু থেমে — «তুই যখন বললি আপু তোকে বয়ফ্রেন্ড নিয়ে টিজ করছে, আমার হিংসে হলো।»

«হিংসে? কেন?»

«কারণ আমি চাই তুই শুধু আমার কথা ভাবিস।»

সিনথিয়ার বুকটা ধড়ফড় করে উঠল। এই অধিকারবোধটা — আগে কেউ তার ওপর দেখায়নি। «তুমি তো আমার কিছুই দেখোনি,» সে লিখল।

«দেখিনি বলেই তো পাগল হয়ে আছি।»

কথা এগোল। দুলাভাইয়ের মজার গল্প, আপুর রান্না — সব শেয়ার করল সে। তানভীর মন দিয়ে শুনল, মাঝে মাঝে হাসির ইমোজি পাঠাল। তারপর একসময় লিখল —

«মনে আছে? কালকের ডেয়ারটা?»

সিনথিয়ার হাতটা থেমে গেল স্ক্রিনের ওপর। বুকের ভেতর ঢিপঢিপ শুরু হলো। «মনে আছে।»

«তাহলে?»

সে বিছানায় উঠে বসল। ঘরের বাতিটা জ্বলছিল। বাথরুমের দরজার দিকে তাকাল। «একটু দাঁড়াও।»

বাথরুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করল। আয়নার সামনে দাঁড়াল। বুকের ভেতর হাতুড়ি পিটছে। মুখ ছাড়া ছবি — কাঁধ, গলা... সে কামিজের গলাটা একটু নামিয়ে দিল। আয়নায় দেখল — ঘাড়ের বাঁক, কাঁধের রেখা, গলার নিচের ছোট্ট তিলটা। মুখটা ফ্রেমের বাইরে রাখল সাবধানে।

প্রথম ছবিটা তুলে দেখল — মুখের একটু অংশ চলে এসেছে। ডিলিট। দ্বিতীয়টা — আলো কম। ডিলিট। তৃতীয়বার সে ফোনটা একটু উঁচু করে ধরল, মাথাটা ফ্রেমের বাইরে রেখে। ক্লিক।

দেখল — নরম হলুদ আলোয় তার ঘাড় আর কাঁধ, গলার নিচে সেই ছোট্ট তিল। রহস্যময়, সুন্দর। তার নিজেরই বিশ্বাস হচ্ছিল না — এটা সে।

হাত কাঁপছিল। পাঠানোর আগে এক মুহূর্ত থমকে গেল — একবার পাঠিয়ে দিলে আর ফেরত নেওয়া যাবে না। তারপর চোখ বন্ধ করে সেন্ড চাপল।

তিন সেকেন্ড নীরবতা। তারপর —

«তুই... এটা তুই?»

«হ্যাঁ।»

«আমার হাত কাঁপছে, মিম।» তানভীর লিখল। «তুই এত সুন্দর... এইটুকু দেখেই আমি...»

সিনথিয়ার গাল গরম হয়ে উঠল। «বেশি বোলো না।»

«সত্যি বলছি।» তারপর একটু থেমে — «তোর এই তিলটা... গলার নিচে... আমি ওখানে...» থেমে গেল। «সরি। বেশি বলে ফেললাম?»

«না,» সিনথিয়া লিখল — অবাক হয়ে নিজের সাহসে। «বলো।»

সে রাতটা কাটল কথায় কথায়। তানভীর আজ অন্যরকম — ছবিটা দেখার পর তার গলায় একটা নতুন অধিকার জন্মেছে, কিন্তু ভদ্রতার সীমা সে পার করল না। শুধু মাঝে মাঝে এমন কথা বলল, যাতে সিনথিয়ার কান গরম হয়ে উঠল।

«তুই জানিস,» তানভীর লিখল, «আজ তুই আমাকে বিশ্বাস করলি। এই ছবিটা... তুই কাউকে দিসনি আগে, তাই না?»

«না। তুমিই প্রথম।»

«তাহলে আমি ভাগ্যবান।» একটু থেমে — «প্রমিস কর, এই ছবিটা শুধু আমার থাকবে।»

«প্রমিস।» সিনথিয়া লিখল — আর মনে হলো, এই প্রমিসটা রাখা সহজ। কারণ ছবিটা তোলার সময় সে শুধু তার কথাই ভেবেছিল।

«আর একটা কথা,» তানভীর লিখল। «একদিন... তোকে সামনে থেকে দেখতে চাই।»

«কবে?»

«যেদিন তুই চাইবি।»

«তোর আপু ঘুমিয়ে গেছে?» তানভীর জিজ্ঞেস করল।

«হ্যাঁ। দুলাভাইও। পুরো বাসা শান্ত।»

«আর তুই জেগে আছিস... আমার জন্য।»

«হয়তো।»

«হয়তো মানে হ্যাঁ। তুই আজকাল হয়তো বলতে শিখেছিস।» তানভীর লিখল। «আমার ভালো লাগে — তোর এই লাজুক সাহস।»

সিনথিয়া হাসল। «তুমি কবি হয়ে যাচ্ছ।»

«তোর জন্য কবি হতেও রাজি।»

সিনথিয়া ফোনটা বুকে চেপে ধরল। বাইরে কোথাও কুকুর ডাকছিল। এই অচেনা ঘরে, অচেনা বিছানায়, সে এক অচেনা ছেলের সাথে কথা বলছে — যাকে সে কখনো দেখেনি। অথচ মনে হচ্ছে, এই মানুষটাই তাকে সবচেয়ে ভালো চেনে।

«ঘুমাবি না?» একসময় তানভীর জিজ্ঞেস করল। রাত তখন একটা।

«ঘুম পাচ্ছে না।»

«আমারও না।» একটু থেমে — «তোর ছবিটা আবার দেখছি।»

সিনথিয়া বালিশে মুখ গুঁজল। «পাগল।»

«তোর জন্য।»

অনেক রাতে কথা থামল। «গুড নাইট, মিম। স্বপ্নে আসিস।»

«গুড নাইট।»

ফোনটা বালিশের পাশে রাখল সে। কিন্তু ঘুম এলো না। চোখ বন্ধ করলেই তানভীরের কথাগুলো কানে বাজছিল — «তোর এই তিলটা...» সে গলার নিচে হাত রাখল, সেই তিলটার ওপর। যেন তার আঙুল নয়, অন্য কারো আঙুল। শিউরে উঠল।

"কী হচ্ছে আমার?" সে ফিসফিস করে বলল অন্ধকারে। এই অনুভূতিটা নতুন — ভয় নয়, লজ্জা নয়। কিছু একটা... জেগে উঠছে ভেতরে। শরীরে একটা অস্থিরতা — ছবিটা পাঠানোর পর থেকে। যেন কিছু একটা শুরু হয়ে গেছে, যা আর থামবে না।

গলা শুকিয়ে আসছিল। পানির তেষ্টা পেল। সে উঠে দরজা খুলল — করিডোরে পা দিতেই থমকে গেল।

অন্ধকার। পুরো ফ্ল্যাট ডুবে আছে নীরবতায়। শুধু ড্রয়িং রুমের জানালা দিয়ে রাস্তার আলোর একটা ফালি এসে পড়েছে মেঝেতে। খালি পায়ে ঠান্ডা মেঝের স্পর্শ। ফ্রিজের গোঁ গোঁ শব্দ ছাড়া আর কিছু নেই।

সে পা টিপে টিপে রান্নাঘরের দিকে এগোল। আর তখনই শুনল —

একটা শব্দ। চাপা, অদ্ভুত। আপুর বেডরুমের দিক থেকে।

সে থেমে গেল। কান পাতল।

আবার — এবার স্পষ্ট। একটা কাতরানি। নারীকণ্ঠ। আপুর গলা!

তারপর — চটাস! যেন কেউ কাউকে চড় মারল। আর সাথে সাথে আপুর গলায় একটা তীব্র শীৎকার — কিন্তু... কিন্তু সেটা ব্যথার নয়। সেটা... আনন্দের?

সিনথিয়ার পা মেঝেতে গেঁথে গেল।

সে বুঝতে পারছিল না কী করবে। ফিরে যাবে? এগোবে? পা দুটো যেন মেঝের সাথে আটকে গেছে।

ভেতর থেকে দুলাভাইয়ের গলা আবার ভেসে এলো — এবার কয়েকটা শব্দ স্পষ্ট শোনা গেল। কর্কশ, অশ্লীল শব্দ — যা সিনথিয়া শুধু ভিডিওতে শুনেছে, বাস্তবে কখনো না। তার কান গরম হয়ে উঠল, গাল জ্বলতে লাগল।

আর আপু — আপু সেই শব্দগুলো শুনে হাসছিলেন! শুধু হাসছিলেন না — উপভোগ করছিলেন, স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল তার গলার সুরে।

দুলাভাইয়ের গলা ভেসে এলো — নিচু, ভারী, কর্কশ। কথাগুলো স্পষ্ট শোনা যাচ্ছিল না, কিন্তু সুরটা... সুরটা সে চিনত। ভিডিওতে শোনা পুরুষদের সুর।

আর আপু — আপু হাসছিলেন। চাপা, কাঁপা হাসি। তারপর আবার সেই শব্দ — চটাস! আর আপুর গলায় দীর্ঘ, কাতর শীৎকার।

সিনথিয়ার হাতটা দেয়ালে ঠেকে গেল। হৃৎপিণ্ডটা বুকের ভেতর এত জোরে ধড়ফড় করছিল যে মনে হচ্ছিল আপুদের ঘর পর্যন্ত শোনা যাবে।

ভেতরে যা হচ্ছে — সেটা ভিডিওর মতো। কিন্তু ভিডিওর চেয়েও... বেশি। বেশি বর্বর, বেশি বন্য। দুলাভাইয়ের গলায় এমন একটা অধিকার, এমন একটা হিংস্রতা — যা দিনের বেলার হাসিখুশি মানুষটার সাথে মিলছিল না।

আর আপু — আপু উপভোগ করছিলেন। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল।

সিনথিয়া নড়তে পারল না। পানির কথা ভুলে গেল। শুধু দাঁড়িয়ে রইল অন্ধকার করিডোরে, দেয়ালে হাত রেখে — আর শব্দগুলো আরও স্পষ্ট হয়ে উঠতে লাগল।

তার মনের ভেতর তখন ঝড়। দিনের বেলার দুলাভাই — হাসিখুশি, মজার মানুষ — আর এই গলার মানুষটা কি একই? আপু — যে তাকে বিকেলে বলেছিলেন "ভালোবাসা অনেক গভীর কিছু" — এই কি সেই গভীরতা?

সে টের পেল, তার নিজের শ্বাস ঘন হয়ে আসছে। লজ্জায়, উত্তেজনায়, ভয়ে — নাকি... নাকি অন্য কিছুতে? সে জানত না। শুধু জানত — সে এখান থেকে নড়তে পারছে না।

পানির গ্লাসের কথা মনেই রইল না। তার কান এখন শুধু ওই দরজার দিকে — যেখান থেকে ভেসে আসছে এমন শব্দ, যা তার সমস্ত জানা দুনিয়াকে উল্টে দিচ্ছে। আপু — তার আদরের আপু — আর দুলাভাই — সেই হাসিখুশি মানুষটা। তাদের এই রূপ সে কল্পনাও করেনি।
Like Reply
#8
দরজার ফাঁক

ছবিটা পাঠানোর পর থেকে সিনথিয়ার হাত কাঁপছিল।

তারপর — অপেক্ষা। ডেলিভার্ড। সিন। টাইপিং...

তানভীরের মেসেজ এলো — «তুই... তুই আজ আমাকে মেরে ফেলবি, মিম।»

সিনথিয়ার গাল জ্বলে উঠল। কম্বলের নিচে সে একা হাসল — লজ্জা, ভয়, আর এক অদ্ভুত গর্ব — সব মিশে একাকার।

তানভীর লিখল — «এই কাঁধটা... আমি যদি এখন তোর পাশে থাকতাম, জানিস কী করতাম?»

«কী?» — সে লিখে ফেলল, তারপর মুছতে গিয়েও মুছল না। পাঠিয়ে দিল।

«প্রথমে ওই আঁচলটা সরাতাম। ধীরে। তারপর... তোর ওই কাঁধে...»

সিনথিয়া আর পড়তে পারল না। ফোনটা বুকের ওপর উল্টে রাখল। এই তানভীর — প্রথম দিন «আপনি» বলে কথা শুরু করেছিল। আর আজ — আজ সে লিখছে এমন কথা, যা পড়ে তার উরুর মাঝখানে দপদপ করছে।

ফোনটা আবার হাতে নিল। তানভীর লিখেছে — «ঘুমাস না। আজ রাতটা আমার।»

সে হাসল — কম্বলের নিচে একা। টাইপ করল — «তোর না। আমার।»

«আচ্ছা বাবা, তোর। কিন্তু আমি ভাড়া নিলাম। সারা রাতের জন্য।»

এই খুনসুটিতে বুকটা হালকা হলো। সে লিখল — «কাল বলবি। আজ ঘুম।»

«মনে আছে। স্বপ্নে আসব। দরজা খোলা রাখিস।»

«ভাগ!»

ফোনটা সাইলেন্ট করে বালিশের পাশে রাখল। চোখ বন্ধ করল। কিন্তু ঘুম এলো না। কাঁধের ছবিটা এখন তানভীরের ফোনে — এই ভাবনায় তার গাল আবার গরম হয়ে উঠল। সে পাশ ফিরল। বালিশে মুখ গুঁজল।

গলা শুকিয়ে গেছিল। পানির তৃষ্ণা।

সে উঠল। পা টিপে টিপে দরজা খুলল। ফ্ল্যাটটা অন্ধকারে ডুবে আছে। ড্রয়িং রুমের জানালা দিয়ে রাস্তার সোডিয়াম আলো এসে পড়েছে মেঝেতে — লম্বা, ফ্যাকাসে একটা ফালি। ফ্রিজের গোঁ গোঁ শব্দ। কোথাও একটা দেয়ালঘড়ির টিকটিক।

রান্নাঘরের দিকে দুই পা এগোতেই সিনথিয়া থমকে গেল।

একটা শব্দ। চাপা, অদ্ভুত। যেন কেউ কাঁদছে — না, কাঁদছে না। সিনথিয়ার শরীরে শীতল স্রোত বয়ে গেল ঘাড় বেয়ে। শব্দটা আসছিল করিডোরের শেষ মাথা থেকে — আপুদের বেডরুম থেকে।

সে নিঃশ্বাস বন্ধ করে শুনল। আবার সেই শব্দ — একটা নারীকণ্ঠের চাপা কাতরানি, গোঙানি। আর তার নিচে চাপা পড়ে — পুরুষের গভীর, কর্কশ গলা। কথা বলছে। আদেশ করছে। থামছে না।

সিনথিয়ার পা মেঝেতে গেঁথে গেল।

এই শব্দ সে চেনে। ভিডিওতে শুনেছে — বহুবার, ইয়ারফোনে, কম্বলের নিচে, অন্ধকারে। কিন্তু এটা ভিডিও নয়। এটা পর্দা নয়। এটা পাশের ঘর। এটা — আপু।

পানির কথা সে ভুলে গেল। তৃষ্ণার কথা ভুলে গেল।

শরীরটা নিজে থেকেই এগিয়ে যাচ্ছিল — যেন কেউ অদৃশ্য সুতো বেঁধে টানছে, আর সে পুতুল। করিডোরটা অন্ধকার। কিন্তু আপুদের বেডরুমের দরজার নিচ দিয়ে — আলোর একটা সরু রেখা, হলদে। দরজাটা পুরো বন্ধ নয়। একটু ফাঁক। হয়তো ভুলে খোলা রয়ে গেছে। হয়তো তাড়াহুড়োয়। হয়তো — ভাগ্য।

সিনথিয়া দরজার পাশে দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়াল। বুকের ভেতর ঢিপঢিপ শব্দ এত জোরে বাজছিল — মনে হলো ঘরের ভেতর থেকে শুনতে পাবে, দুলাভাই বেরিয়ে আসবে। সে ঠোঁট কামড়ে ধরল। একটা লম্বা, কাঁপা নিঃশ্বাস নিল — ছাড়ল ধীরে।

তারপর — ধীরে, খুব ধীরে, যেন সময় থেমে আছে — চোখটা নিয়ে গেল ফাঁকের কাছে।

আলোটা প্রথমে চোখে লাগল — চোখ কুঁচকে গেল। তারপর — দৃশ্যটা স্পষ্ট হলো, একটু একটু করে, যেন কুয়াশা সরছে।

বিছানায় — আপু।

শিলা আপু — যে সন্ধ্যায় এত সুন্দর করে চা বানিয়ে দিয়েছিল, চিনি মেপে মেপে, যে মাথায় আঁচল টেনে হাসিমুখে বলেছিল "খেয়ে যা পাগলি, তোর জন্য স্পেশাল করে বানালাম" — সেই আপু এখন বিছানায় হাঁটু গেড়ে বসে আছে। চুল খোলা, এলোমেলো, ঘামে ভেজা, কপালে লেপ্টে আছে। শাড়িটা মেঝেতে পড়ে আছে — কুঁকড়ে, অবহেলায়, যেন ছুড়ে ফেলা হয়েছে।

আর তার সামনে দাঁড়িয়ে — সোহেল দুলাভাই। সন্ধ্যায় যে মানুষটা হাসতে হাসতে টিভি দেখছিল, যে আপুকে বলেছিল "তুমি বসো, আমি চা নিয়ে আসি" — সেই মানুষটা এখন অন্য মানুষ। চোখে অন্য আগুন।

সিনথিয়ার গলা শুকিয়ে গেল। পা কাঁপছিল — হাঁটু ভাঁজ হয়ে আসতে চাইছিল। কিন্তু চোখ — চোখ সরল না। সরাতে পারল না।

দুলাভাইয়ের গলা শোনা গেল — নিচু, ভারী, আদেশের সুরে, কোনো নরমতা নেই। «এদিকে তাকা। আমার দিকে।»

আপু তাকাল। আর সিনথিয়া দেখল আপুর চোখ — লজ্জা নয়। এক ফোঁটাও লজ্জা নয়। অন্য কিছু। একটা জ্বলজ্বলে, ক্ষুধার্ত দৃষ্টি — যেন শিকারি শিকার দেখছে।

«বল, তুই কী?» দুলাভাই বলল। তার এক হাত আপুর চুলে — আলতো করে নয়, দখলের ভঙ্গিতে, মুঠি করে।

আপু এক মুহূর্ত চুপ। তার ঠোঁট কাঁপছিল। বুক ওঠানামা করছিল দ্রুত। তারপর — ফিসফিস করে, কিন্তু প্রতিটা শব্দ স্পষ্ট — «আমি তোমার... খানকি।»

সিনথিয়ার মাথা ঘুরে গেল। দেয়ালটা না থাকলে সে পড়ে যেত।

এই শব্দ — আপুর মুখে! যে আপু বড়দের সামনে "তুই" বলতেও লজ্জা পায়, "আপনি" বলে! যে আপু সন্ধ্যায় দুলাভাইয়ের প্লেটে নিজে হাতে মাছের বড় টুকরোটা তুলে দিচ্ছিল, মাথা নিচু করে!

দুলাভাই হাসল — একটা জয়ীর, সন্তুষ্ট, পুরুষালি হাসি। «জোরে বল। যেন শুনতে পাই। যেন বিশ্বাস হয়।»

«আমি তোমার খানকি!» — এবার জোরে, কাতরানির সাথে, চোখে পানি নিয়ে, গলা ভেঙে। «আমাকে... আমাকে নাও... প্লিজ... আর পারছি না...»

«কীভাবে নেব?» দুলাভাই আপুর চুলের মুঠি শক্ত করে ধরল — টান দিল হালকা। আপু ব্যথায় নয় — আনন্দে চিৎকার করে উঠল, গলা চিরে। «বল, রান্ডির মতো করে বল — কী চাস তুই? মুখে বল।»

«চোদো আমাকে!» আপু চিৎকার করল। «তোমার ধোনটা... আমার ভোদায় ঢুকাও... জোরে... আরো জোরে... আমাকে ভেঙে ফেলো!»

সিনথিয়ার পুরো শরীরে আগুন ধরে গেল — এক মুহূর্তে, যেন কেউ পেট্রল ঢেলে দেশলাই জ্বালিয়ে দিয়েছে।

সে দেখল — দুলাভাই আপুকে টেনে তুলল, এক ঝটকায় ঘুরিয়ে দিল। আপুর দুই হাত বিছানায় — আঁকড়ে ধরা চাদর। দুলাভাই পেছন থেকে — প্রতিটা ধাক্কায় আপুর শরীর দুলে উঠছে, চুল উড়ছে, পিঠ বেঁকে যাচ্ছে। আর আপু চিৎকার করছে — গলা ফাটিয়ে, কোনো লজ্জা না রেখে — «হ্যাঁ! হ্যাঁ! আরো জোরে! আমাকে শেষ করে দাও! থামবে না!»

«এই তো আমার মাগি,» দুলাভাই হাঁপাতে হাঁপাতে বলল — প্রতিটা শব্দের সাথে আরো জোরে। «দেখি... কত নিতে পারিস... আজ তোকে...»

আপু হাসছিল — কাঁদছিল — চিৎকার করছিল, সব একসাথে, এলোমেলো। «তুমি... তুমি আমাকে... ওহ! ওহ!» তার নখ বিছানার চাদরে গেঁথে গেছিল — সাদা হয়ে গেছে আঙুলের গাঁট। «আরো! থামবে না! আমি তোমার রান্ডি, তোমার খানকি — আমাকে ছিঁড়ে ফেলো! আমি তোমার!»

সিনথিয়া দেখল — দুলাভাই থামল এক মুহূর্ত। আপুকে টেনে নিজের দিকে ঘোরাল — মুখোমুখি। আপুর মুখ ঘামে ভেজা, চোখ লাল, ঠোঁট ফুলে আছে, চুল মুখে লেপ্টে। «নিচে বস,» দুলাভাই বলল — আদেশ, কোনো অনুরোধ নয়।

আপু বাধ্য মেয়ের মতো বসল — হাঁটু গেড়ে, মেঝেতে। «মুখ খোল।»

যা ঘটল তারপর — সিনথিয়া ভিডিওতেও এত কাছ থেকে দেখেনি। এত স্পষ্ট করে নয়, এত বাস্তবে নয়। আপুর মুখ, আপুর চোখের পানি গাল বেয়ে নামছে, আপুর গলার সেই শব্দ — আর দুলাভাইয়ের হাত আপুর মাথায়, চুলের মুঠিতে ধরা — «হ্যাঁ... এইভাবে... তুই আমার... আমার খানকি... আমার মাগি...»

আপু গোঙাচ্ছিল। তার এক হাত দুলাভাইয়ের উরুতে — আঁকড়ে ধরা, নখ বসে যাচ্ছে। অন্য হাত নিজের বুকে।

সিনথিয়ার দম বন্ধ হয়ে আসছিল। বুকের ভেতর হৃৎপিণ্ডটা যেন গলায় উঠে এসেছে। সে বুঝতে পারছিল না — সে কী অনুভব করছে। ভেতরে যেন ঝড় বইছে — একসাথে অনেকগুলো অনুভূতি, একে অপরের সাথে যুদ্ধ করছে।

প্রথমে — ধাক্কা। প্রচণ্ড ধাক্কা।

এটা আপু। শিলা আপু। যে মেয়েটা বিয়ের দিন লাল শাড়িতে লজ্জায় মাথা নিচু করে বসেছিল — সিনথিয়া নিজে দেখেছে, অ্যালবামের ছবিতে, মায়ের ফোনে। যে প্রতিবার ফোনে হাসতে হাসতে বলে "সংসার ভালোই চলছে রে, তুই কবে আসবি বল, তোর দুলাভাই তোর কথা জিজ্ঞেস করে"। যাকে সিনথিয়া চিরকাল দেখেছে — নম্র, ভদ্র, সেবাপরায়ণ, আদর্শ বউ হিসেবে। পাড়ার সবাই বলে — "শিলার মতো মেয়ে হয় না, ভাগ্য করে এমন বউ পেয়েছে সোহেল।"

আর সেই আপু এখন — চিৎকার করছে «আমাকে চোদো!» — চুলের মুঠি ধরে থাকা স্বামীর সামনে হাঁটু গেড়ে!

সিনথিয়ার মাথার ভেতর যেন কেউ হাতুড়ি পিটছিল। এটা কী করে সম্ভব? এই দুটো মানুষ — সন্ধ্যার আপু আর এই আপু — একই মানুষ কী করে হয়? কোনটা আসল? নাকি দুটোই আসল?

তারপর — লজ্জা। নিজের ওপর, তীব্র লজ্জা।

সে লুকিয়ে দেখছে। দরজার ফাঁক দিয়ে। চোরের মতো। এটা অন্যায় — সে জানে, ভালো করেই জানে। আপু যদি জানতে পারে... দুলাভাই যদি দরজা খুলে দেখে ফেলে... ভাবতেই তার পেটের ভেতর মোচড় দিল। তার পা বলছিল — ফিরে যা, এখনই, এই মুহূর্তে। কিন্তু চোখ বলছিল — আরেকটু। শুধু আরেকটু। আরেকটা মুহূর্ত।

সে ঘৃণা করল নিজেকে — আর তবু এক পাও সরল না।

তারপর — তাপ।

শরীরের ভেতরে একটা আগুন জ্বলে উঠল — ধীরে, কিন্তু নিশ্চিতভাবে, যেন কেউ শুকনো খড়ের গাদায় দেশলাই ছুড়ে দিয়েছে। উরুর মাঝখানে সেই চেনা দপদপানি — তানভীরের মেসেজ পড়ে যা হয়েছিল, তার চেয়ে শতগুণ তীব্র, অসহ্য। বুকের ভেতর ভার — যেন পাথর চাপা দিয়ে রেখেছে কেউ। ঠোঁট শুকিয়ে কাঠ। নিঃশ্বাস ঘন, অগভীর। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম।

সে টের পেল — তার শরীর সাড়া দিচ্ছে। এই দৃশ্য দেখে। এই শব্দ শুনে। আপু আর দুলাভাইকে দেখে। তার নিজের শরীর — বিশ্বাসঘাতক শরীর — আনন্দ পাচ্ছে।

এবং এই উপলব্ধিটা তাকে সবচেয়ে বেশি নাড়া দিল — সে চাইছে দেখতে। সে থামতে চাইছে না।

তার হাত — নিজের অজান্তেই, নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধেই — কামিজের নিচে চলে গেছিল। সালোয়ারের ওপর দিয়ে, উরুর মাঝখানে। ঘষছিল। ধীরে, চাপা, দরজার ফাঁকের দৃশ্যের সাথে তাল মিলিয়ে। যখন টের পেল, ততক্ষণে আঙুলগুলো ভিজে গেছে। লজ্জায় গাল পুড়ে গেল — কিন্তু হাত থামল না। থামতে পারল না। ভেতরে আপু কাতরাচ্ছে, আর বাইরে দাঁড়িয়ে সেও — একই আগুনে পুড়ছে।

ভেতরে আপু আবার চিৎকার করছিল — «ওহ! ওইখানে! হ্যাঁ, ওইখানে!» দুলাভাইয়ের গলা — «বল, কার তুই?» — «তোমার! শুধু তোমার! আমি শুধু তোমার খানকি!» — «তাহলে চিৎকার কর। সবাই শুনুক।» — আপু হেসে ফেলল কাতরানির মাঝে, দম নিতে নিতে — «পাগল! মেয়েটা পাশের ঘরে! শুনতে পাবে!»

সিনথিয়ার রক্ত হিম হয়ে গেল। মেয়েটা — সে! তারা তার কথা বলছে!

«ঘুমিয়ে আছে,» দুলাভাই বলল — গলায় হাসির ছোঁয়া। «আর জাগলেও... ও বড় হচ্ছে। জানুক — স্বামী-স্ত্রীর ভালোবাসা কেমন হয়। লজ্জার কিছু নেই এতে।»

আপু কিছু বলল না — শুধু আবার কাতরে উঠল, আরো জোরে।

সিনথিয়া দেয়ালে আরো সেঁটে গেল — যেন দেয়ালের সাথে মিশে যেতে চায়। তারা জানে — সে পাশের ঘরে। তারা জানে না — সে দরজার বাইরে, দেখছে। এই দ্বৈততা, এই গোপনতা তাকে পাগল করে দিচ্ছিল — ভয়ে আর উত্তেজনায়।

এবং তারপর — সবচেয়ে বড়টা এলো। আবিষ্কার।

আপু উপভোগ করছে।

এটা জোর করে হচ্ছে না। কেউ ভয়ে কাঁদছে না, কেউ বাধ্য হচ্ছে না। আপুর চোখে আনন্দ — খাঁটি, নির্ভেজাল, পূর্ণ আনন্দ। আপু চাইছে। আপু ভিক্ষা করছে — আরো চাইছে, জোরে চাইছে, থামতে নিষেধ করছে। দুলাভাইয়ের কঠোর কথা, গালি, আদেশ, চুলের মুঠি — এগুলো আপুকে কষ্ট দিচ্ছে না। এগুলো আপুকে পাগল করে দিচ্ছে — আনন্দে, সুখে।

সিনথিয়ার মাথার ভেতর কিছু একটা ভেঙে পড়ল — শব্দ করে, যেন কাঁচ ভাঙল।

সারাজীবন সে শুনে এসেছে — ভালো মেয়েরা এসব চায় না। ভালো মেয়েরা লজ্জা পায়, "না" বলে, মুখ ফিরিয়ে নেয়, দরজা বন্ধ করে দেয়। শরীরের আনন্দ চাওয়া — এটা খারাপ মেয়েদের জিনিস। ভিডিওর মেয়েরা — ওরা তো "ওই রকম" মেয়ে, ওদের কথা আলাদা, ওদের জীবন আলাদা। মা বলে — "মেয়েদের শরীর নিয়ে এত ভাবতে নেই।" পাড়ার খালারা বলে — "লজ্জাই মেয়েদের ভূষণ।"

কিন্তু আপু? আপু তো ভালো মেয়ে। আপু তো আদর্শ। আপু তো সবার চোখে আদর্শ বউ — রান্নায় পারদর্শী, শ্বশুরবাড়িতে সবার প্রিয়, মাথায় আঁচল, মুখে হাসি।

আর সেই আপু এখন চিৎকার করছে — «আমি তোমার মাগি! আমাকে ছিঁড়ে ফেলো!»

তাহলে? তাহলে "ভালো মেয়ে" মানে কী? এই শব্দটার মানে কী? যদি আপু — এই আপু, এই আদর্শ আপু — এটা চাইতে পারে, এটা উপভোগ করতে পারে, এটার জন্য ভিক্ষা করতে পারে, তাহলে সিনথিয়ার নিজের ভেতরের আগুনটা? গত কয়েক সপ্তাহে — গ্রুপের ভিডিও দেখে, কম্বলের নিচে নিজেকে ছুঁয়ে, তানভীরের মেসেজ পড়ে তার শরীরে যা হয়েছে, যা হয় — সেটা কি খারাপ? সে কি খারাপ মেয়ে? নষ্ট?

একটা অদ্ভুত, মুক্তির অনুভূতি তার বুকের ভেতর ছড়িয়ে পড়ল — ভয়ের সাথে মিশে, যেন কেউ তার হাতে-পায়ের শেকল খুলে দিচ্ছে, আর সে ভয় পাচ্ছে — খুলে গেলে সে কোথায় যাবে? কতদূর যাবে? ফিরতে পারবে তো?

ঈর্ষাও ছিল। হ্যাঁ — ঈর্ষা, তীব্র ঈর্ষা। আপুর ওই নির্লজ্জ, পূর্ণ, অকুণ্ঠ আনন্দ দেখে সিনথিয়ার ভেতরে একটা কণ্ঠস্বর ফিসফিস করল — "আমিও চাই। আমিও এমন করে চিৎকার করতে চাই। কেউ আমাকে এমন করে চাক। কেউ আমার নাম ধরে..."

সে চমকে উঠল নিজের ভাবনায়। ছি! এটা আপু আর দুলাভাই! তার আপু! কিন্তু শরীরটা যুক্তি শুনছিল না। শরীরটা শুধু দেখছিল — আর জ্বলছিল। আর চাইছিল। আর দপদপ করছিল।

আরো একটা জিনিস সে দেখল — যা কোনো ভিডিওতে কখনো বোঝেনি, কেউ শেখায়নি।

একটা মুহূর্তে দুলাভাই থামল। হঠাৎ, মাঝপথে। আপুর মুখটা দুই হাতে ধরল — আলতো করে, যেন কাঁচের পুতুল, যেন ফুলের পাপড়ি। কপালে চুমু খেল — দীর্ঘ, নরম। ফিসফিস করে বলল — «ভালোবাসি তোকে, পাগলি। খুব ভালোবাসি। তুই আমার সব।»

আপু হাসল — চোখে পানি নিয়ে, হাঁপাতে হাঁপাতে, ঠোঁট কাঁপিয়ে — «আমিও। তুমি ছাড়া... আমি কাউকে... কাউকে চাই না।»

এই একটা মুহূর্তে সিনথিয়ার চোখে পানি চলে এলো — নিজের অজান্তে।

এটা শুধু শরীর নয়। এটা বিশ্বাস — গভীর, অন্ধ বিশ্বাস। আপু দুলাভাইকে এতটা বিশ্বাস করে যে নিজেকে সম্পূর্ণ সঁপে দিতে পারে — এমনকি এইভাবেও, এই ভাষায়ও, এই অবস্থায়ও। আর দুলাভাই — যার মুখে এত গালি, এত কঠোর আদেশ, এত দাপট — সেই মানুষটাই আপুর চোখের পানি মুছে দিচ্ছে আঙুল দিয়ে, কপালে চুমু খাচ্ছে।

তাহলে দাপট মানেই নিষ্ঠুরতা নয়। আদেশ মানেই অত্যাচার নয়। সিনথিয়া এতদিন ভাবত — যে পুরুষ গালি দেয়, সে খারাপ। যে জোর করে, সে পশু। কিন্তু এখানে — এখানে গালির ভেতরে ভালোবাসা। জোরের ভেতরে যত্ন। আপু জানে — দুলাভাই তাকে আঘাত করবে না, সত্যিকারের আঘাত নয়। এই জানাটাই — এই বিশ্বাসটাই — আপুকে মুক্ত করেছে। চিৎকার করতে, চাইতে, নির্লজ্জ হতে।

তাহলে তানভীর... সিনথিয়ার বুক ধড়াস করে উঠল — এত জোরে যে সে ভয় পেল ভেতরে শুনতে পাবে। তানভীর যখন লেখে «তোর ভোদাটা কি ভিজে আছে?» — সেটা কি নোংরামি? ঘৃণা? না কি — এটাই? এই ভাষাতেই ভালোবাসা? এইভাবেই কি পুরুষরা চায় — আর মেয়েরা... এইভাবেই দিতে চায়?

তার মনে পড়ল তানভীরের কথা — «তোর এই সাহসটাই আমার সবচেয়ে ভালো লাগে।» আর মনে পড়ল নিজের উত্তর — লজ্জায়, ভয়ে, তবু লিখেছিল। সে কি... সেও কি একদিন... কারো সামনে... এমন হতে পারবে? চিৎকার করতে পারবে? চাইতে পারবে — মুখ ফুটে, নির্লজ্জ হয়ে?

এই চিন্তাটা তাকে কাঁপিয়ে দিল — ভয়ে নয়, উত্তেজনায়। উরুর মাঝখানে দপদপানি আরো বেড়ে গেল।

তার মনে পড়ল মায়ের কথা। মা — শাহানা বেগম — যে সারাদিন সংসার সামলায়... সিনথিয়ার গাল জ্বলে উঠল। না। এটা ভাববে না। মা-বাবার কথা ভাববে না। সিনথিয়া মাথা ঝাঁকাল — যেন ভাবনাটাকে ঝেড়ে ফেলতে চায়।

কিন্তু আপুকে তো দেখল। নিজের চোখে।

নাবিলার কথা মনে পড়ল। নাবিলা কী বলত এটা দেখলে? নাবিলা হয়তো হাসত — চোখ টিপে বলত "দেখলি? আমি তো বলেছিলাম — সব মেয়ের ভেতরেই আগুন থাকে।" নাবিলা সব জানে — বা জানার ভান করে। কিন্তু নাবিলা কি এটা জানে? এই দৃশ্য? এই সত্য?

আর মিম — মিম তো এই সত্যেরই মেয়ে। আজ রাতে সিনথিয়া বুঝল — মিম কোনো মিথ্যা নয়, মিম তারই একটা অংশ — যে অংশটা এতদিন চাপা পড়েছিল "ভালো মেয়ে"র মুখোশের নিচে। আপুরও দুটো মুখ — দিনের আপু, রাতের আপু। তাহলে তার দুটো মুখ থাকলে দোষ কী?

ভেতরে দুলাভাই আবার শুরু করেছিল। আপুর কাতরানি আবার উঠছিল — ঢেউয়ের মতো, বাড়ছে। «হ্যাঁ... ওইখানে... ওহ! ওহ!» দুলাভাইয়ের গলা — ভারী, হাঁপানো — «বল, কার তুই? জোরে বল।» — «তোমার! শুধু তোমার! আমি শুধু তোমার খানকি!» — «তাহলে দেখা — কতটা আমার...»

সিনথিয়া আরো একটু ঝুঁকল — ফাঁকটা বড় করতে। এই লোভ — এই দেখার লোভ — তাকে গ্রাস করছিল। সে জানত এটা ভুল। সে জানত থামা উচিত। কিন্তু শরীরটা শুনছিল না। চোখটা শুনছিল না।

ঠিক তখনই — ক্যাঁচ।

তার পায়ের নিচে মেঝের একটা তক্তা — সামান্য সরে গেল, শুকনো কাঠের চিৎকার। শব্দটা ছোট — কিন্তু নিস্তব্ধ রাতে, ওই ঘরের নিস্তব্ধতায় — বজ্রের মতো।

ভেতরে সব থেমে গেল। এক মুহূর্তে। যেন কেউ সুইচ বন্ধ করে দিল।

সিনথিয়ার রক্ত হিম হয়ে গেল। নিঃশ্বাস বন্ধ। হৃৎপিণ্ডটা গলায়।

দুলাভাইয়ের গলা — সতর্ক, ঠান্ডা, পুরুষালি — «কে? কে ওখানে?»

আর আপুর চোখ — বিছানা থেকে — সরাসরি দরজার ফাঁকের দিকে। এক সেকেন্ড। মাত্র এক সেকেন্ড। কিন্তু সিনথিয়া দেখল — আপুর চোখে চিনতে পারার ঝিলিক। বিস্ময়। লজ্জা। ভয়। নাকি সে কল্পনা করল? সে জানল না। জানার আগেই সে সরে গেছিল — দেয়াল ঘেঁষে, ছায়ায় মিশে, পা টিপে টিপে, নিঃশ্বাস বন্ধ করে।

কিন্তু সে যা জানল না —

করিডোরের অন্য প্রান্তে, সিঁড়ির মুখের অন্ধকারে, আরেকজন দাঁড়িয়ে ছিল।

রনি — দুলাভাইয়ের ছোট ভাই — মাত্রই ফিরেছিল। দরজা খুলে ঢুকতেই থমকে গেছিল। করিডোরের মাঝখানে, আপুদের বেডরুমের দরজার ফাঁকে ঝুঁকে — একটা ছায়ামূর্তি। প্রথমে বুকটা ধড়ফড় করে উঠেছিল — চোর? তারপর চিনেছিল। দুপুরে দেখা মেয়েটা। শালী। সিনথিয়া।

আর তারপর — সে দেখেছিল। দরজার নিচের হলদে আলোর রেখায় তার সিলুয়েটটা স্পষ্ট। তার একটা হাত — কামিজের নিচে। নড়ছে। ধীরে, ছন্দে, থামছে না। রনি বুঝেছিল ঠিক কী করছে মেয়েটা। কী দেখছে — আর দেখতে দেখতে কী করছে। তার নিজের গলা শুকিয়ে গেছিল।

সে নড়েনি। শব্দ করেনি। শুধু দাঁড়িয়ে দেখেছিল — যতক্ষণ সিনথিয়া দরজার ফাঁকে ছিল। যখন সিনথিয়া সরে গেল — ছায়ার মতো ভেসে গেস্ট রুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করল — রনি তখনো দাঁড়িয়ে ছিল অন্ধকারে। অনেকক্ষণ। তারপর তার ঠোঁটে একটা ধীর, অদ্ভুত হাসি ফুটে উঠেছিল।

সে পা টিপে টিপে নিজের ছোট ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করল। বিছানায় বসে রইল। চোখের সামনে ভাসছিল সেই দৃশ্য — দরজার ফাঁকে ঝুঁকে থাকা মেয়েটা। তার নড়তে থাকা হাত।

সিনথিয়া জানল না — আজ রাতে শুধু সে-ই দেখেনি। তাকেও দেখা হয়েছে। খুব ভালো করে দেখা হয়েছে।

«কেউ না,» আপুর গলা ভেসে এলো — শান্ত করার চেষ্টা, কিন্তু একটু কাঁপা, একটু তাড়াহুড়ো। «বাতাস হবে। দরজাটা... দরজাটা বন্ধ করে দাও।»

দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ। ক্লিক। ছিটকিনির শব্দ।

সিনথিয়া অন্ধকার করিডোরে দাঁড়িয়ে রইল — পাথর হয়ে, দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে। তারপর — দৌড়ে নয়, ভেসে, ছায়ার মতো — গেস্ট রুমে ফিরে এলো। দরজা বন্ধ করল — আস্তে, শব্দ না করে, হাত কাঁপছিল। বিছানায়। কম্বলের নিচে — মাথা পর্যন্ত। পুরো শরীর কাঁপছিল — ঠান্ডায় নয়, অন্য কিছুতে।

পানি খাওয়া হয়নি। তৃষ্ণা আরো বেড়েছিল — কিন্তু এখন সেটা গলার তৃষ্ণা নয়। অন্য তৃষ্ণা। গভীর, অচেনা, ভয়ংকর তৃষ্ণা।

সে শুয়ে রইল — চোখ বন্ধ, কিন্তু দৃশ্যগুলো চোখের সামনে ভাসছিল, পুড়ছিল, যাবে না। আপুর চিৎকার — «আমাকে শেষ করে দাও!» দুলাভাইয়ের গলা — «বল, কার তুই?» আপুর চোখের সেই দৃষ্টি — ক্ষুধার্ত, নির্লজ্জ, পরিপূর্ণ, সুখী। আর সেই শেষ মুহূর্ত — কপালের চুমু, ফিসফিস — «ভালোবাসি তোকে।»

আর আপুর চোখ — দরজার দিকে তাকানো সেই এক সেকেন্ড। আপু কি দেখেছে? আপু কি জানে — সে দেখেছে? কাল সকালে আপু তার দিকে কীভাবে তাকাবে? এই ভাবনায় তার পেটের ভেতর মোচড় দিল — লজ্জায়, ভয়ে। কিন্তু তার নিচে — উত্তেজনা। এখনো।

তার নিজের শরীর ব্যথা করছিল — অসমাপ্ত, অতৃপ্ত ব্যথা, যেন কোনো সুর মাঝপথে থেমে গেছে। দরজার ফাঁকে দাঁড়িয়ে যা শুরু করেছিল — ভয়ে, লজ্জায় হাতটা থামিয়ে দিয়েছিল — সেই আগুন এখনো নিভেনি। উরুর মাঝখানে দপদপানি — থামছে না। বুক ভারী। তার হাত নিজে থেকেই নিচে নামতে চাইল — কম্বলের নিচে, সালোয়ারের দিকে। সে থামাল — হাতটা মুঠো করে বুকের ওপর রাখল। না। আর না, আজ। দরজার ফাঁকের ওই কয়েক মিনিটই অনেক বেশি হয়ে গেছে। আজ রাতটা — এই সত্যিটার, এই আবিষ্কারের। আজ শুধু — এই আগুনটা বয়ে বেড়াবে।

আপুও। আপুর মতো মেয়েও।

তাহলে সে? সে কী? গত কয়েক সপ্তাহে যা যা হয়েছে — গ্রুপ, ভিডিও, মিম, তানভীর, কাঁধের ছবি, রাত জাগা — সব কি তাহলে... স্বাভাবিক? সে কি তাহলে খারাপ নয়? নষ্ট নয়? এই প্রশ্নটা তার বুকের ভেতর ঘুরপাক খাচ্ছিল — ভয় আর মুক্তি একসাথে, যেন দুটো হাত তাকে দুই দিকে টানছে।

ফোনটা হাতে নিল — হাত এখনো কাঁপছে। তানভীরের মেসেজ — «ঘুমিয়ে গেলি, পাগলি? স্বপ্নে আসছি কিন্তু।» সে টাইপ করল — মুছল — আবার টাইপ করল। শেষে লিখল — «তানভীর... তোকে একটা কথা বলতে হবে। আজ রাতে... আমি কিছু দেখেছি। কিছু শুনেছি।»

পাঠানোর আগেই আঙুল থামল।

না। কাল। কাল বলবে — সব বলবে। আজ রাতে এই সত্যটা শুধু তার — একান্ত তার, কারো সাথে ভাগ করবে না। কাল সে তানভীরকে বলবে — আর দেখবে তানভীর কী বলে। তানভীর কি বুঝবে? তানভীর কি হাসবে? না কি... তানভীর কি ওই পথে নিয়ে যাবে তাকে — যেখানে আপু গেছে?

এই চিন্তায় তার শরীর আবার শিউরে উঠল — শীতল স্রোত ঘাড় বেয়ে।

ফোনটা রেখে দিল বালিশের পাশে। ছাদের দিকে তাকিয়ে রইল অন্ধকারে — ফ্যানটা ঘুরছে ধীরে, ছায়া নাচছে দেয়ালে। কানে এখনো বাজছিল — «আরো জোরে!» আর আপুর হাসি — কাতরানির মাঝে হাসি। আর দুলাভাইয়ের ফিসফিস — «ভালোবাসি তোকে।»

সিনথিয়া ফিসফিস করে বলল অন্ধকারে — ছাদকে, নিজেকে, মিমকে —

«আপুও...?»

(চলবে...)
Like Reply
#9
স্বীকারোক্তি

গেস্ট রুমের দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ করে সিনথিয়া কিছুক্ষণ দরজায় হেলান দিয়েই দাঁড়িয়ে রইল। তার হাত কাঁপছিল। বুকের ভেতর হৃৎপিণ্ডটা এমন জোরে ধড়ফড় করছিল যেন বাইরে থেকে শোনা যাবে।

ফ্ল্যাটটা এখন নিস্তব্ধ। শিলা আপু আর দুলাভাইয়ের ঘর থেকে আর কোনো শব্দ আসছে না। কিন্তু সিনথিয়ার কানে এখনো সেই শব্দগুলো বাজছে — দুলাভাইয়ের ভারী গলা, আপুর চাপা কাতরানি, বিছানার ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ। সে চোখ বন্ধ করল। চোখ বন্ধ করলেই দেখতে পাচ্ছে — দরজার ফাঁক দিয়ে যা দেখেছিল।

দুলাভাইয়ের এক হাত আপুর গলায় — চেপে ধরা নয়, শুধু রাখা, কিন্তু সেই স্পর্শেই আপুর পিঠ ধনুকের মতো বেঁকে গেছিল। দুলাভাই ফিসফিস করছিল, «বল, তুই কার?» আর আপু হাঁপাতে হাঁপাতে বলছিল, «তোমার... শুধু তোমার...»। বিছানাটা ক্যাঁচক্যাঁচ করছিল প্রতিটা ধাক্কায়। আপুর পায়ের আঙুল কুঁকড়ে গেছিল, হাত বিছানার চাদর খামচে ধরেছিল। সিনথিয়া নিজের নিঃশ্বাস বন্ধ করে দেখছিল — যেন সে নিজেই ওই ঘরে আছে, যেন ওই হাত তার গলায়।

আর সবচেয়ে অদ্ভুত — দুলাভাইয়ের মুখে কোনো রাগ ছিল না। ছিল অধিকার। যেন আপু তার সম্পত্তি, আর আপুও যেন এতে আপত্তি করছে না — বরং গর্ব করছে। «হ্যাঁ... আমি তোমারই...» — আপুর এই কথাটা শুনে সিনথিয়ার মেরুদণ্ড বেয়ে শিহরণ নেমে গেছিল।

আধঘণ্টা আগে সে শুধু পানি খেতে উঠেছিল। গলা শুকিয়ে গেছিল। রান্নাঘরের দিকে যেতে যেতে করিডোরে থমকে দাঁড়িয়েছিল — আপুদের ঘর থেকে ভেসে আসা অদ্ভুত শব্দে। প্রথমে ভেবেছিল কেউ কাঁদছে। তারপর বুঝেছিল — না, এ কান্না নয়। দরজাটা পুরো বন্ধ ছিল না, এক চিলতে ফাঁক। আর সেই ফাঁক দিয়ে...

সিনথিয়া বিছানায় বসে পড়ল। তার গাল জ্বলছিল।

সে দেখেছিল দুলাভাইকে — লুঙ্গি পরা, ঘামে ভেজা পিঠ, আপুকে বিছানায় চেপে ধরে আছে। আর মুখে যে ভাষা — সিনথিয়া কানে হাত চাপা দিতে চেয়েছিল, কিন্তু পারেনি। দুলাভাই বলছিল, «খানকি, আজ তোকে দেখাচ্ছি...» «রান্ডির মতো কাতরাচ্ছিস কেন, মাগি...» — প্রতিটা শব্দ যেন চাবুক। ভিডিওতে সে এমন ভাষা শুনেছে, কিন্তু এটা ছিল আরও নৃশংস, আরও বন্য — কারণ এটা ভিডিও নয়, এটা তার নিজের আপু, তার নিজের দুলাভাই, পাশের ঘরে, সত্যিকারের।

আর আপু — শিলা আপু, যে তাকে ছোটবেলায় চুল বেঁধে দিত, যে এত ভদ্র, এত শান্ত — সেই আপু কাতরাচ্ছিল, «আরও... আরও জোরে...» বলছিল, «আমাকে... ওভাবেই...»। তার গলায় কোনো ভয় ছিল না, কোনো বাধা ছিল না — ছিল শুধু চাওয়া, নগ্ন, নির্লজ্জ চাওয়া। দুলাভাই আপুর চুলের মুঠি ধরে মাথাটা পেছনে টেনে ধরেছিল, আর আপু... আপু হাসছিল। আনন্দে, তৃপ্তিতে।

সিনথিয়ার পা সেখানেই গেঁথে গেছিল — কিন্তু শরীরের ভেতরে তোলপাড় চলছিল। সে দেয়ালে হেলান দিয়েছিল যেন পড়ে না যায়। হাঁটু কাঁপছিল। নিজের ঠোঁট নিজে কামড়ে ধরেছিল — ভয়ে নয়, যেন কোনো শব্দ বেরিয়ে না যায়। কারণ তার গলা দিয়েও তখন কিছু একটা বেরোতে চাইছিল — একটা চাপা কাতরানি, আপুর মতোই। সে উরু দুটো চেপে ধরেছিল একে অপরের সাথে, কিন্তু তাতে ভেজা অনুভূতিটা আরও তীব্র হয়েছিল। লজ্জায় তার কান গরম হয়ে উঠেছিল — «আমি এখানে দাঁড়িয়ে কী করছি!» — কিন্তু পা সরেনি। চোখ সরেনি। ভেতরের ক্ষুধাটা লজ্জার চেয়ে বড় হয়ে গেছিল।

সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা ছিল অন্য জায়গায়। এতদিন সে ভেবেছিল — ওই ভাষা, ওই নৃশংসতা — এগুলো খারাপ জিনিস, মেয়েদের ওপর জোর করে চাপানো জিনিস। কিন্তু আপু তো জোর করে কিছু সহ্য করছিল না। আপু চাইছিল। ভিক্ষা করছিল। «আমাকে গালি দাও... আরও...» — এই কথাটা শুনে সিনথিয়ার মাথার ভেতর কিছু একটা ভেঙে পড়েছিল। তাহলে মেয়েরা... মেয়েরাও এটা চাইতে পারে? ভালো মেয়েরা? বিবাহিত, সংসারী, ভদ্র মেয়েরা?

সে পানি না খেয়েই ফিরে এসেছিল গেস্ট রুমে। দরজা বন্ধ করে বিছানায় বসে আছে তখন থেকে।

তার মনের ভেতর দুটো সিনথিয়া যুদ্ধ করছিল। একটা বলছিল — «ছি! তুই কী দেখলি! ভুলে যা, এক্ষুনি ভুলে যা।» আরেকটা ফিসফিস করছিল — «কিন্তু তোর ভালো লেগেছিল। স্বীকার কর। তোর শরীর এখনো কাঁপছে।»

সে বালিশে মুখ গুঁজল। শরীরটা সত্যিই কাঁপছিল — উত্তেজনায়, অপরাধবোধে, আর এক অদ্ভুত ক্ষুধায়। আপুর মুখটা মনে পড়ছিল — সেই তৃপ্তির হাসি। দুলাভাইয়ের গলা মনে পড়ছিল — «চুপ! একটা কথা বলবি না, শুধু নিবি...»। এই কথাগুলো মনে পড়তেই তার তলপেটে মোচড় দিয়ে উঠল।

«আমি খারাপ হয়ে যাচ্ছি,» সে ফিসফিস করে বলল অন্ধকারে। «আমি... আমি কেন এটা ভাবছি?»

কিন্তু ভাবনা থামছিল না। নাবিলার কথা মনে পড়ল — «তোর শরীর, তোর ইচ্ছা।» নাবিলা কি এইসব জানে? নাবিলা কি কখনো...? সিনথিয়া মাথা নাড়ল। নাবিলাকে জিজ্ঞেস করা যাবে না। কাউকে জিজ্ঞেস করা যাবে না।

আপুর মুখটা আবার ভেসে উঠল — সেই তৃপ্তির হাসি। আপু তো খারাপ মেয়ে নয়। আপু সংসারী, ভদ্র, সবাই তাকে ভালোবাসে। তাহলে আপু যদি এটা চাইতে পারে, উপভোগ করতে পারে — তাহলে আমি কেন পারব না? এই প্রশ্নটা তার বুকের ভেতর ধক করে বাজল। আর তারপর এলো আরও ভয়ংকর প্রশ্নটা — আমি কি শুধু দেখে উত্তেজিত হয়েছি, নাকি... আমি নিজেও ওই জায়গায় থাকতে চাই?

সে বালিশে মুখ গুঁজে ফিসফিস করল, «না... না...»। কিন্তু শরীরটা বলছিল — হ্যাঁ।

কিন্তু ভাবনা থামছিল না। বরং বাড়ছিল। তার হাত নিজের অজান্তেই পেটের ওপর রাখল, তারপর নিচে নামতে চাইল — সে হাতটা সরিয়ে নিল ঝটকা দিয়ে। «না। এখানে না। আপুর বাসায় না।»

সন্ধ্যার কথা মনে পড়ল — তানভীরের ডেয়ার। «মুখ ছাড়া... একটা ছবি।» সে কতক্ষণ দ্বিধা করেছিল! বাথরুমে গিয়ে দরজা বন্ধ করে, কাঁপা হাতে শাড়ির আঁচলটা কাঁধে তুলে, গলার নিচ থেকে ছবিটা তুলেছিল। পাঠানোর আগে দশবার দেখেছিল — মুখ নেই তো? চেনা যাবে না তো? তারপর চোখ বন্ধ করে পাঠিয়ে দিয়েছিল।

তানভীরের উত্তর ছিল পাগলের মতো। «তুই... তুই এত সুন্দর...» «তোর গলার নিচের তিলটা... আমি ওখানে...» «আজ রাতে এই ছবিটা দেখে আমি...» — সিনথিয়া লজ্জায় ফোনটা রেখে দিয়েছিল, কিন্তু ভেতরে ভেতরে গর্বে ফুলে উঠেছিল। কেউ তাকে এভাবে চায় — এই অনুভূতিটা নেশার মতো।

তখনই ফোনটা ভাইব্রেট করল। বালিশের পাশে রাখা ফোনের স্ক্রিন জ্বলে উঠল — তানভীর।

তার বুকটা ধড়াস করে উঠল। তানভীর এখনো জেগে আছে। রাত প্রায় দেড়টা। সে ফোনটা হাতে নিল।

তানভীর: «ঘুমাসনি?»

সিনথিয়া কিছুক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল। তার আঙুল কাঁপছিল।

কিন্তু এখন — এখন তার ভেতরে যা জমে আছে, তা কাউকে না বললে সে ফেটে পড়বে। নাবিলাকে বলা যাবে না — নাবিলা তাকে মেরেই ফেলবে, আর তার চেয়েও বড় কথা, নাবিলা মিমের কথা জানে না। মাকে? বাবাকে? অসম্ভব। আপুকে? আরও অসম্ভব।

শুধু একজন আছে — যে তাকে চেনে না, যে তাকে বিচার করবে না। মিমের তানভীর।

সে টাইপ করল, মুছল, আবার টাইপ করল। তার মনে হলো — এই একটা মেসেজ পাঠালেই সব বদলে যাবে। তানভীর আর তাকে আগের মতো দেখবে না। কিন্তু না — তানভীর কখনো তাকে বিচার করেনি। গত কয়েক রাতে সে তানভীরকে যা যা বলেছে — তার শরীরের কথা, তার ইচ্ছার কথা — একটাতেও তানভীর তাকে ছোট করেনি। বরং বলেছে — «তোর এই সাহসটাই আমার সবচেয়ে ভালো লাগে।» এই ভরসাটাই তাকে ঠেলে দিল।

মিম: «তোকে একটা কথা বলব? কাউকে বলবি না। প্রমিস কর।»

উত্তর এলো প্রায় সঙ্গে সঙ্গে।

তানভীর: «প্রমিস। কী হয়েছে? তুই ঠিক আছিস তো?»

মিম: «আমি ঠিক আছি। কিন্তু... আমি আজ রাতে একটা জিনিস দেখে ফেলেছি। শুনে ফেলেছি।»

তানভীর: «কী?! কী দেখলি?»

সিনথিয়ার আঙুল থামল। কীভাবে বলবে? কোথা থেকে শুরু করবে? সে গভীর শ্বাস নিল।

মিম: «আমি আমার এক আপুর বাসায় এসেছি আজ। রাতে গলা শুকিয়ে গেছিল, পানি খেতে উঠেছিলাম। করিডোর দিয়ে যাওয়ার সময় আপুদের ঘর থেকে শব্দ শুনলাম।»

তানভীর: «কেমন শব্দ?»

মিম: «প্রথমে ভেবেছিলাম কান্না। তারপর... দরজাটা একটু খোলা ছিল। আমি... আমি তাকিয়ে ফেলেছিলাম।»

কয়েক সেকেন্ড নীরবতা। তারপর —

তানভীর: «তুই দেখলি?! পুরোটা?!»

মিম: «হ্যাঁ।»

তানভীর: «ওহ মাই গড। মিম... তুই... কী দেখলি বল। সব বল।»

সিনথিয়ার গাল জ্বলে উঠল। সে কি সত্যিই বলবে? সব? তার আঙুল কাঁপছিল, কিন্তু ভেতরের চাপটা এত তীব্র ছিল যে না বলে উপায় ছিল না। সে ভাবল — আপু যদি জানত! দুলাভাই যদি জানত! এই ভাবনাটা তাকে আরও উত্তেজিত করল — একটা নিষিদ্ধ সত্যি, যা শুধু সে জানে, আর এখন জানবে তানভীর। এই গোপনীয়তাটাই যেন তাদের দুজনকে আরও কাছে টেনে আনছিল।

মিম: «দুলাভাই... আপুকে... মানে ওরা... করছিল। কিন্তু যেভাবে... আমি ভিডিওতে দেখেছি, কিন্তু এটা ছিল আরও... বন্য। দুলাভাই আপুকে গালি দিচ্ছিল। খুব খারাপ ভাষায়।»

তানভীর: «কেমন ভাষায়? কী বলছিল?»

মিম: «বলছিল... «খানকি, আজ তোর...» ...আমি লিখতে পারছি না।»

তানভীর: «লিখ। প্লিজ। আমি জানতে চাই। তুই তো আমাকে সব বলিস।»

সিনথিয়া চোখ বন্ধ করল। তারপর টাইপ করল — প্রতিটা শব্দ যেন তার গাল পুড়িয়ে দিচ্ছিল।

মিম: «বলছিল «রান্ডির মতো কাতরাচ্ছিস কেন, মাগি...» «চুপ করে শুধু নে...» আরও অনেক কিছু। আমি সব মনে রাখতে পারছি না। কান বন্ধ করে দিতে চেয়েছিলাম, কিন্তু...»

তানভীর: «কিন্তু কী?»

মিম: «কিন্তু আপু... আপু উপভোগ করছিল।»

তানভীর: «মানে?»

মিম: «মানে আপু কাঁদছিল না। আপু বলছিল «আরও... আরও জোরে...» «আমাকে গালি দাও...» — আপু হাসছিল, তানভীর। আনন্দে। দুলাভাই আপুর চুল ধরে টানছিল, আর আপু... আপু আরও চাইছিল।»

তানভীর: «আর কী শুনলি? সব বল। একটাও বাদ দিবি না।»

মিম: «আপুর গলা... «আরও... প্লিজ... থেমো না...» আর দুলাভাই — «চুপ! একটা শব্দ করবি না!» — কিন্তু আপু শব্দ করছিলই। থামতে পারছিল না। বিছানাটা... ক্যাঁচক্যাঁচ করছিল। আর শেষে আপু... আপু এমন একটা শব্দ করল — আমি জানি না ওটাকে কী বলে। যেন... যেন ভেতর থেকে কিছু ভেঙে পড়ল।»

তানভীর: «তুই তখন কী করছিলি?»

মিম: «দাঁড়িয়ে ছিলাম। করিডোরে। নড়তে পারছিলাম না।»

তানভীর: «তোর শরীর? সত্যি বল।»

দীর্ঘ নীরবতা।

মিম: «...কাঁপছিল। আর... আমি ভিজে গেছিলাম।»

তানভীর: «ভালো। সত্যি বলার জন্য — ভালো মেয়ে।»

এবার দীর্ঘ নীরবতা। সিনথিয়া ভাবল — তানভীর কি চলে গেল? সে কি ভাবছে মিম একটা নোংরা মেয়ে? তার বুক ধড়ফড় করছিল।

তারপর মেসেজ এলো।

তানভীর: «তুই এখন কী ভাবছিস, মিম?»

মিম: «জানি না। আমার মাথা ঘুরছে। আমি... আমি ভেবেছিলাম ওই ভাষাগুলো খারাপ। মেয়েদের কষ্ট দেওয়ার ভাষা। কিন্তু আপু...»

তানভীর: «আপু তো কষ্ট পাচ্ছিল না, তাই না?»

মিম: «না। একটুও না।»

তানভীর: «তাহলে?»

মিম: «তাহলে আমি বুঝতে পারছি না — আমি খারাপ, না পৃথিবীটা আমার ভাবনার চেয়ে আলাদা।»

তানভীর: «একটা কথা জিজ্ঞেস করি?»

মিম: «কর।»

তানভীর: «তুই কি আপুকে ঈর্ষা করছিলি?»

সিনথিয়ার আঙুল থেমে গেল। ঈর্ষা? সে কি ঈর্ষা করছিল? সে ভাবল — আপুর তৃপ্ত মুখ, আপুর নির্লজ্জ চাওয়া, আপুর সেই আনন্দ...

মিম: «...হয়তো।»

তানভীর: «কীসের ঈর্ষা? ওই আনন্দটার?»

মিম: «হ্যাঁ।»

তানভীর: «তুই কি চাইতি তুই ওই জায়গায় থাকতে? আপুর জায়গায়?»

এবার সিনথিয়ার হাত কাঁপতে লাগল সত্যিকারের। এই প্রশ্নটা... এই প্রশ্নটার উত্তর দিলে আর ফেরা যাবে না। সে ফোনটা রেখে উঠে বসল। ঘরের অন্ধকারে চারদিক তাকাল — কেউ নেই, কেউ শুনছে না। শুধু সে আর তার সত্যি।

মিম: «জানি না।»

তানভীর: «মিম।»

মিম: «...চাইতাম। হয়তো।»

তানভীর: ««হয়তো» বাদ দে।»

মিম: «চাইতাম।»

তানভীর: «ভালো। এবার আমরা সত্যির জায়গায় এলাম।»

তানভীর: «শোন। তুই খারাপ না। তুই শুধু আজ প্রথমবার সত্যিটা দেখলি।»

মিম: «কোন সত্যি?»

তানভীর: «যে মেয়েরাও চায়। শুধু চায় না — কখনো কখনো ওইভাবেই চায়। জোর করে নেওয়া, গালি দেওয়া, দখল করে নেওয়া। এতে লজ্জার কিছু নেই, মিম। এটা... এটা একটা ধরন।»

সিনথিয়ার শ্বাস আটকে এলো। «একটা ধরন» — এই কথাটা তার মাথায় বাজল। তাহলে সে একা নয়। আপুও এই ধরনের। আর... আর সে নিজে?

তানভীর: «তুই এখনো জেগে আছিস কেন, বল তো?»

মিম: «ঘুম আসছে না।»

তানভীর: «কেন আসছে না?»

মিম: «জানি না।»

তানভীর: «জানিস। বল।»

সিনথিয়া ফোনটা বুকের ওপর রাখল। তার হৃৎপিণ্ডের ধ্বনি ফোনের ভেতর দিয়ে যেন তানভীরের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। সে কি সত্যিটা বলবে? সবচেয়ে গোপন সত্যিটা?

মিম: «ওই দৃশ্যটা... আমার মাথা থেকে যাচ্ছে না।»

তানভীর: «কোন অংশটা? দুলাভাইয়ের ভাষা? নাকি আপুর... চাওয়াটা?»

মিম: «দুটোই।»

তানভীর: «তোর ভালো লেগেছে?»

দীর্ঘ নীরবতা। সিনথিয়া টাইপ করল, মুছল। টাইপ করল, মুছল। শেষে শুধু লিখল —

মিম: «হয়তো।»

তানভীর: ««হয়তো» না। সত্যি বল। আমি তোকে বিচার করব না। তুই জানিস।»

সিনথিয়ার চোখে পানি চলে এলো — কেন, সে জানে না। হয়তো এই প্রথম কেউ তাকে বলছে — সত্যি বল, বিচার করব না। সে টাইপ করল।

মিম: «ভালো লেগেছে। ওই ভাষাগুলো শুনে আমার গা শিউরে উঠেছিল। আর আপুকে দেখে... মনে হয়েছিল, মেয়েরা চাইলে এভাবেও চাইতে পারে। লজ্জা না করে।»

তানভীর: «আর?»

মিম: «আর কী?»

তানভীর: «আর তুই নিজে? তুই কী চাস, মিম?»

সিনথিয়ার আঙুল থেমে গেল। এই প্রশ্নটার উত্তর সে নিজেকেও দেয়নি। সে চোখ বন্ধ করে ভাবল — দুলাভাইয়ের গলা, «চুপ!», আপুর তৃপ্ত মুখ, নিজের কাঁপা শরীর...

মিম: «জানি না।»

তানভীর: «মিথ্যে।»

মিম: «সত্যি জানি না! আমি কখনো... আমি তো কিছুই জানি না।»

তানভীর: «ঠিক আছে। তাহলে আমি জিজ্ঞেস করি, তুই শুধু হ্যাঁ বা না বল।»

মিম: «আচ্ছা।»

তানভীর: «ওই ভাষাটা — দুলাভাই যেভাবে কথা বলছিল — কেউ যদি তোর সাথে ওইভাবে কথা বলে... তোর ভালো লাগবে?»

সিনথিয়ার গলা শুকিয়ে গেল। সে পাশে রাখা পানির গ্লাসে হাত বাড়াল, কিন্তু গ্লাসটা খালি। সে ঠোঁট ভিজিয়ে নিল।

মিম: «...হ্যাঁ।»

শব্দটা পাঠানোর পর তার মনে হলো সে একটা সেতু পুড়িয়ে দিল। ফেরার পথ নেই।

তানভীর: «কেউ যদি তোকে অর্ডার করে? «এটা কর, ওটা কর» — তুই শুনবি?»

মিম: «...হয়তো।»

তানভীর: ««হয়তো» না, মিম। আজ রাতে আর «হয়তো» না।»

সিনথিয়া বালিশে মুখ গুঁজে ফিসফিস করল, «ওহ...»। তারপর টাইপ করল —

মিম: «হ্যাঁ। শুনব।»

তানভীর: «ভালো মেয়ে।»

তানভীর: «এখন একটা কাজ কর।»

মিম: «কী?»

তানভীর: «চোখ বন্ধ কর।»

মিম: «করলাম।»

তানভীর: «এখন কল্পনা কর — আমি তোর পাশে শুয়ে আছি। আমার হাত তোর চুলে।»

সিনথিয়া চোখ বন্ধ করল সত্যিকারের। অন্ধকারে তানভীরের কাল্পনিক উপস্থিতি এত স্পষ্ট লাগল যে তার শ্বাস আটকে এলো। তার কল্পনায় তানভীরের হাতটা ভারী, গরম — চুলের ভেতর দিয়ে আঙুল চালিয়ে দিচ্ছে, মাথাটা ধরে রাখছে। ঠিক দুলাভাইয়ের মতো। এই ভাবনাটা তার তলপেটে মোচড় দিল।

তানভীর: «বল — তুই কার?»

মিম: «...তোমার।»

তানভীর: ««তোমার» না। «তোর» বল। আমি তোর দুলাভাই এখন।»

সিনথিয়ার গাল জ্বলে উঠল, কিন্তু ভেতরে একটা বাঁধ ভেঙে গেল।

মিম: «তোর। আমি তোর।»

তানভীর: «ভালো। আর ভয় লাগলে একটা শব্দ বলবি — «থামো»। বললেই আমি থামব। প্রমিস।»

মিম: «থামো না।»

তানভীর: «কী বললি?»

মিম: «বললাম... থামো না।»

তানভীর: «তাহলে শোন। হাতটা পেটের ওপর রাখ।»

সিনথিয়ার হাত নিজে থেকেই নড়ল। ফোনটা বালিশের পাশে রেখে সে হাতটা পেটের ওপর রাখল।

তানভীর: «এখন ধীরে ধীরে নিচে নামা। আমি বলছি না কোথায় থামবি — তুই জানিস।»

তার আঙুল কাঁপছিল। সে চোখ বন্ধ করেই হাতটা নামাল — পেট পেরিয়ে, আরও নিচে। তার শ্বাস ঘন হয়ে এলো।

তানভীর: «ভালো মেয়ে। এখন শুধু আমার কথা শোন। কিছু করিস না। শুধু শোন।»

মিম: «শুনছি।»

তানভীর: «তুই আমার। তোর এই শরীরটা — আমার। তোর এই কাঁপুনিটা — আমার জন্য। বল, ঠিক কিনা।»

মিম: «ঠিক।»

তানভীর: «জোরে বল।»

মিম: «ঠিক! আমি তোর!»

সিনথিয়া নিজের গলার ফিসফিসানি শুনে নিজেই চমকে উঠল — সে সত্যিই ফিসফিস করে বলেছিল, অন্ধকার ঘরে, একা। তার সারা শরীর ঘামে ভিজে গেছিল। এই সমর্পণে — শুধু শব্দের সমর্পণে — এত আনন্দ! সে বুঝতে পারছিল আপু কেন হাসছিল।

তারপর তানভীরের টোন আরও গভীর হলো — অধিকারীর টোন।

তানভীর: «তাহলে শোন। তুই এখন বিছানায় শুয়ে আছিস, তাই না?»

মিম: «হ্যাঁ।»

তানভীর: «ফোনটা হাতে। অন্ধকার ঘর। আর তোর মাথায় শুধু একটা দৃশ্য ঘুরছে।»

মিম: «হ্যাঁ।»

তানভীর: «বল, তুই কী চাস? স্পষ্ট করে বল।»

সিনথিয়ার শ্বাস ঘন হয়ে এলো। সে টাইপ করল, মুছল। আবার টাইপ করল।

মিম: «আমি চাই... কেউ আমাকে... ওইভাবে...»

তানভীর: «ওইভাবে মানে? পুরোটা বল। লজ্জা করিস না।»

মিম: «কেউ আমাকে অর্ডার করুক। আমাকে... দখল করে নিক। আর আমি... আমি শুধু...»

তানভীর: «তুই শুধু কী?»

মিম: «শুধু মেনে নেব।»

নীরবতা। তারপর —

সিনথিয়া ফোনটা রেখে দুই হাতে মুখ ঢাকল। সে কী লিখল! «শুধু মেনে নেব» — এই কথাটা কি সত্যিই সে পাঠিয়েছে? তার বুক ধড়ফড় করছিল। এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো — মেসেজটা ডিলিট করে দেবে, লিখবে «ভুলে যা, আমি মজা করছিলাম»। কিন্তু ভেতরের কণ্ঠস্বরটা বলল — মিথ্যে বলিস না। আজ রাতে আর মিথ্যে না।

তানভীর: «তুই জানিস তুই কী বললি?»

মিম: «জানি।»

তানভীর: «আর তুই জানিস, এটা বলার পর আমি আর আগের মতো থাকতে পারব না?»

মিম: «জানি।»

তানভীর: «ভয় লাগছে?»

মিম: «লাগছে।»

তানভীর: «তবু চাস?»

সিনথিয়া চোখ বন্ধ করল। আপুর মুখ ভেসে উঠল — তৃপ্ত, নির্লজ্জ, সুখী। দুলাভাইয়ের গলা — «চুপ করে শুধু নে...»। তার নিজের শরীর — কাঁপা, ভেজা, ক্ষুধার্ত। সে টাইপ করল।

মিম: «চাই।»

তানভীর: «এখন আমার একটা অর্ডার শোন।»

মিম: «বল।»

তানভীর: «ভয়েস মেসেজ পাঠা। শুধু দুটো শব্দ।»

মিম: «কোন দুটো?»

তানভীর: ««আমি তোর।» — নিজের গলায় বল।»

সিনথিয়ার হাত থেকে ফোনটা প্রায় পড়ে যাচ্ছিল। ভয়েস মেসেজ! নিজের গলায়! যদি কেউ শুনে ফেলে? কিন্তু ঘর নিস্তব্ধ, দরজা বন্ধ। সে রেকর্ড বোতাম চাপল — «আমি...» — কণ্ঠস্বর কাঁপছিল। মুছে দিল। আবার চাপল। এবার ফিসফিস করে, কিন্তু স্পষ্ট — «আমি তোর।» পাঠিয়ে দিল।

কয়েক সেকেন্ড পর উত্তর এলো — একটা ভয়েস মেসেজ। তানভীরের গলা। প্রথমবার। গভীর, ভারী, একটু ভাঙা — «ভালো মেয়ে।»

সিনথিয়া মেসেজটা তিনবার শুনল। প্রতিবার শরীরে শিহরণ। এই গলা... এই গলাটা এখন তার মাথার ভেতরে বাসা বেঁধেছে। সে ফিসফিস করে বলল অন্ধকারে, «ভালো মেয়ে...» — যেন নিজেকে শোনাচ্ছে।

তার মনে পড়ল দুলাভাইয়ের গলা — দুলাভাই কখনো «ভালো মেয়ে» বলেনি। দুলাভাই বলেছিল «খানকি», «মাগি» — আর আপু তাতেই গলে গেছিল। সিনথিয়ার ভেতরে এক অদ্ভুত কৌতূহল জাগল — ওই শব্দগুলো যদি তানভীর তাকে বলে? শুধু ভাবতেই তার গা শিউরে উঠল। তার আঙুল নিজে থেকেই টাইপ করল —

মিম: «তুই আমাকে ওইভাবে ডাকবি?»

তানভীর: «কীভাবে?»

মিম: «দুলাভাই যেভাবে... আপুকে ডাকছিল।»

দীর্ঘ নীরবতা। সিনথিয়ার মনে হলো সে বেশি বলে ফেলেছে। তারপর —

তানভীর: «তুই সত্যিই চাস, মিম?»

মিম: «...হ্যাঁ।»

তানভীর: «তাহলে তৈরি হ।»

তানভীর: «তাহলে শোন, আমার কথা মন দিয়ে শোন। আজ থেকে আমি তোর সাথে ওইভাবে কথা বলব। দুলাভাইয়ের মতো। তোকে অর্ডার করব। তুই শুধু শুনবি, মেনে নিবি। চাস?»

সিনথিয়ার আঙুল কাঁপছিল এত জোরে যে সে প্রায় টাইপ করতে পারছিল না। তার সারা শরীর জ্বলছিল। সে একবার ভাবল — না বলবে? ফিরে যাবে? কিন্তু ভেতর থেকে একটা কণ্ঠস্বর চিৎকার করে বলছিল — না, ফিরবি না। এই রাতটা তোর। এই সত্যটা তোর।

নাবিলার মুখটা একবার ভেসে উঠল — «সাবধানে থাকবি।» কিন্তু নাবিলা তো জানে না এই রাতের কথা, জানে না মিমের কথা। আর আপু — আপু যদি জানত তার ছোট বোন দরজার ফাঁকে দাঁড়িয়ে সব দেখেছে? আপু কি লজ্জা পেত? নাকি হাসত — সেই তৃপ্ত হাসিটা হাসত আর বলত, «বড় হ, বুঝবি»? সিনথিয়া অনুভব করল — সে আজ রাতে বড় হয়ে গেছে। ফেরার পথটা পুড়ে গেছে।

তার আঙুল «চ» অক্ষরের ওপর থামল এক সেকেন্ড। এই এক সেকেন্ডে তার পুরো জীবনটা চোখের সামনে ভেসে উঠল — ভালো মেয়ে সিনথিয়া, আর এই রাতের মিম। সে বেছে নিল মিমকে।

সে টাইপ করল, প্রতিটা অক্ষর যেন তার বুক চিরে বেরোচ্ছিল —

মিম: «চাই।»

(চলবে...)
Like Reply
#10
বন্য রাত

সকালটা সিনথিয়া কাটাল এমনভাবে, যেন গতরাতের কিছুই ঘটেনি।

শিলা আপু রান্নাঘরে পরোটা ভাজছিলেন, কপালে ঘামের ফোঁটা, মুখে হালকা হাসি। দুলাভাই টেবিলে বসে খবরের কাগজ পড়ছিলেন — একদম স্বাভাবিক, একদম ভদ্র। সিনথিয়া তাঁদের দিকে তাকাতে পারছিল না। চোখ নামিয়ে পরোটা ছিঁড়ছিল, আর ভেতরে ভেতরে পুড়ছিল। এই দুজন মানুষ, যারা এখন এত শান্ত, গতরাতে... সে চোখ বন্ধ করল। দৃশ্যটা আবার ভেসে উঠল — দুলাভাইয়ের ভারী গলা, সেই কথাগুলো, আর আপুর... আনন্দ। তার কান গরম হয়ে উঠল।

"কী রে, মুখ লাল কেন?" শিলা আপু হেসে বললেন। "গরম লাগছে?"

"হ্যাঁ... গরম," সিনথিয়া মিথ্যে বলল। মিথ্যেটা এখন এত সহজে আসে যে সে নিজেই অবাক হয়।

দুলাভাই কাগজ থেকে চোখ তুলে হাসলেন — সেই ভদ্র, মার্জিত হাসি। "তোমার আপুর হাতের পরোটা খেয়ে যাও, তারপর বলো গরম কেমন।" সিনথিয়া হাসার চেষ্টা করল। এই মানুষটা — গতরাতে যে গলায় কথা বলছিলেন — আর এই সকালের ভদ্রলোক — দুজন কি একই মানুষ? হ্যাঁ। আর সেটাই সবচেয়ে অদ্ভুত, সবচেয়ে... আকর্ষণীয় সত্য।

দুপুরে আপু তাকে নিয়ে বসলেন বারান্দায়। "তোর ফোনটা তো সারাক্ষণ বাজছে," আপু চোখ টিপলেন। "কার সাথে এত কথা?"

সিনথিয়ার বুক ধড়ফড় করে উঠল। "বান্ধবী... নাবিলা।"

"হুমম," আপু এমনভাবে বললেন, যেন বিশ্বাস করলেন না, আবার করলেনও। তারপর গলা নামিয়ে বললেন, "শোন, তুই এখন বড় হচ্ছিস। কিছু কথা আমি তোকে বলতে পারি, মা বলতে পারবে না।" সিনথিয়া নিঃশ্বাস বন্ধ করে তাকাল। আপু হাসলেন — সেই রহস্যময় হাসি। "স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে অনেক কিছু হয়, যা বাইরে থেকে বোঝা যায় না। আর সেটা খারাপ না। বুঝলি?"

সিনথিয়ার গলা শুকিয়ে গেল। আপু কি কিছু জানে? না — আপু শুধু বড় বোনের মতো সতর্ক করছেন। "বুঝেছি আপু," সে ফিসফিস করে বলল।

দুপুরে খাবার টেবিলে শিলা আপু গুনগুন করছিলেন — একটা পুরনো গান, সুরটা চেনা। সিনথিয়া তাঁকে দেখছিল চোরের মতো। আপুর মুখে একটা আলো — যা সকালে ছিল না। নাকি ছিল, সে খেয়াল করেনি? গতরাতের পর আপু... বদলে গেছেন? না — আপু তো এমনই ছিলেন। শুধু সিনথিয়া এখন দেখতে শিখেছে। যা আগে চোখে পড়ত না, এখন পড়ে।

"তুই আমার দিকে এভাবে তাকিয়ে আছিস কেন?" আপু হেসে বললেন। "কিছু বলবি?"

"না... কিছু না," সিনথিয়া তাড়াতাড়ি চোখ নামাল। "তোমাকে আজ সুন্দর লাগছে।"

আপু একটু থামলেন। তারপর সেই রহস্যময় হাসিটা হাসলেন — যা সিনথিয়া এখন চেনে, গতরাতের দরজার ফাঁক দিয়ে চেনা হাসি। "সুখী মানুষকে সুন্দর লাগে, পাগলি।" বলে তিনি উঠে গেলেন, আঁচলটা কাঁধে তুলে।

সিনথিয়া বসে রইল। সুখী মানুষ। হ্যাঁ। আপু সুখী — সেই সুখ, যা দরজার ফাঁক দিয়ে পুরোটা দেখা যায় না, কিন্তু মুখে লেখা থাকে সকালে। আর সিনথিয়ার ভেতরে একটা প্রশ্ন ফুটছিল, কাঁটার মতো বিঁধছিল — আমিও কি... আমিও কি ওই সুখটা চাই? উত্তরটা তার উরুর মাঝখানে দপদপ করছিল, লজ্জাহীন। হ্যাঁ। চাই। খুব চাই।

বিকেলে ঘরে ঢুকে সে ফোনটা হাতে নিল। তানভীরের মেসেজ — দুপুরে পাঠানো: «আজ রাতে। দশটার পর। একা থাকবি। ফোন চার্জে দে।»

কমান্ড। প্রশ্ন না, অনুরোধ না — নির্দেশ। সিনথিয়ার পেটের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। গতরাতে সে বলেছিল «চাই।» — আর আজ সেই «চাই»-এর দাম দিতে হবে। সে লিখল: «থাকব।»

জবাব এলো সাথে সাথে: «গুড গার্ল।»

দুটো শব্দ। কিন্তু এই দুটো শব্দ পড়ে তার পুরো শরীরে শিরশিরানি ছড়িয়ে গেল। গুড গার্ল। সে কারও গুড গার্ল হতে চায় — এই চাওয়াটা কোত্থেকে এলো, সে জানে না। শুধু জানে, চায়।

রাতের খাবারটা সে কোনোমতে শেষ করল। আপু বললেন, "তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়, মুখটা শুকনো লাগছে।" সিনথিয়া মনে মনে হাসল — আপু জানেন না, আজ রাতে তার ঘুম আসবে না। ইচ্ছে করেই আসবে না।

গেস্ট রুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করল। ছিটকিনি লাগাল। লাইট নিভিয়ে দিল। শুধু ফোনের আলোয় ঘরটা নীলচে দেখাচ্ছিল। বালিশে হেলান দিয়ে বসল, কম্বলটা টেনে নিল কোমর পর্যন্ত। রাত দশটা বাজতে তখনও কুড়ি মিনিট বাকি। কুড়ি মিনিট যেন কুড়ি ঘণ্টা। সে ফোনটা হাতে নিয়ে গতরাতের চ্যাটটা আবার পড়ল — তানভীরের সেই প্রশ্ন: «আমি তোর সাথে ওইভাবে কথা বলব। দুলাভাইয়ের মতো। চাস?» আর তার উত্তর: «চাই।» একটা শব্দ। কিন্তু এই একটা শব্দ আজ রাতের সবকিছুর দরজা খুলে দিয়েছে।

উঠে দরজার ছিটকিনিটা আবার টেনে দেখল — বন্ধ। জানালার পর্দাটা ভালো করে টেনে দিল। গলা শুকিয়ে আসছিল — টেবিলের জগ থেকে ঢকঢক করে পানি খেল। হাত কাঁপছে। সে নিজের ওপর হাসল — এত ভয়, এত উত্তেজনা, আর এই সবকিছু সে নিজেই চেয়েছে। নিজের ইচ্ছেয়।

নয়টা পঞ্চাশ। সে বালিশে হেলান দিয়ে বসল। কম্বলের নিচে পা দুটো গুটিয়ে নিল। ফোনটা বুকের ওপর রাখল, স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল — যেন তাকিয়ে থাকলেই সময় দ্রুত যাবে, যেন তার চোখের জোরে ঘড়ির কাঁটা এগোবে।

ঠিক দশটায় ফোনটা কেঁপে উঠল।

«মনে আছে কাল কী বলেছিলি?»

সিনথিয়ার আঙুল কাঁপছিল টাইপ করতে: «মনে আছে।»

«কী বলেছিলি, নিজের মুখে বল।»

সে গভীর শ্বাস নিল। লিখল: «বলেছিলাম... চাই।»

«গুড। তাহলে শোন। আজ থেকে, এই চ্যাটে, আমি যা বলব তাই হবে। আমি তোর মালিক। তুই আমার...» — মেসেজটা থামল। তারপর এলো: «বল, তুই আমার কী?»

সিনথিয়া তাকিয়ে রইল স্ক্রিনের দিকে। তার হৃৎপিণ্ড গলায় এসে ধড়ফড় করছে। সে জানে উত্তরটা। গতরাত থেকে এই উত্তরটা তার ভেতরে ফুটছে। তবু লিখতে গিয়ে আঙুল থামছে। শেষে লিখল, একটা শব্দ: «তোমার।»

«শুধু "তোমার" না। পুরোটা বল।»

«আমি... আমি তোমার।»

«গুড গার্ল।» আবার সেই দুটো শব্দ। «এখন থেকে আমি তোর সাথে দুলাভাইয়ের মতো কথা বলব। মনে আছে সে কীভাবে কথা বলছিল?»

সিনথিয়ার শ্বাস বন্ধ হয়ে এলো। «মনে আছে।»

«তাহলে প্রস্তুত হ।»

একটু থামা। তারপর মেসেজের বন্যা নামল:

«শোন খানকি, আজ তোকে আমি শেখাব তুই আসলে কী।»

শব্দটা স্ক্রিনে জ্বলজ্বল করছিল। সিনথিয়ার গাল আগুনের মতো গরম হয়ে উঠল। কেউ তাকে এভাবে কখনো বলেনি। কিন্তু... কিন্তু তার উরুর মাঝখানে একটা দপদপানি শুরু হলো। সে ঘৃণা করছে না। সে... সে চাইছে আরও।

«তুই আমার রান্ডি। আমার মাগি। শুধু আমার। বুঝলি?»

«বুঝেছি,» সে লিখল। তার আঙুল নিজের অজান্তেই চলছে, যেন অন্য কেউ টাইপ করছে।

«"বুঝেছি" না। বল — "আমি তোমার রান্ডি।"»

সিনথিয়া চোখ বন্ধ করল। এটা লিখতে পারবে? এই শব্দগুলো নিজের সম্পর্কে? কিন্তু ভেতর থেকে একটা কণ্ঠ বলল — লিখ। সত্যি তো। আজ রাতে এটাই সত্যি। সে লিখল: «আমি তোমার রান্ডি।»

«আবার বল। নিজেকে শোনা। জোরে।»

সে ফিসফিস করে বলল অন্ধকার ঘরে — «আমি তোমার রান্ডি।» — নিজের কণ্ঠ শুনে সে শিউরে উঠল। এটা তার কণ্ঠ, কিন্তু যেন অন্য কারও — সাহসী, নির্লজ্জ কারও।

«গুড। এখন বল — তুই কী পরে আছিস?»

«পুরনো একটা কামিজ... আর সালোয়ার।»

«ভেতরে?»

«...সব।»

«"সব" মানে কী? পুরোটা বল, খানকি। লজ্জা করলে চলবে না। আজ রাতে লজ্জার কোনো জায়গা নেই।»

সিনথিয়ার মুখ লাল হয়ে উঠল। কিন্তু সে লিখল: «ব্রা আর প্যান্টি।»

«কী রঙ?»

«হালকা গোলাপি।»

«হুম। এখন হাতটা বুকের ওপর রাখ। কামিজের ওপর দিয়ে।»

সে করল। তার নিজের হাত, তার নিজের বুক — কিন্তু মনে হচ্ছিল তানভীরের নির্দেশে চলা অন্য কারও হাত।

«এখন চাপ দে। আস্তে। বল, কেমন লাগছে।»

«ভালো লাগছে,» সে লিখল। «বোঁটাটা... শক্ত হয়ে গেছে।»

«এত তাড়াতাড়ি, খানকি?» — তারপর গলাটা নরম হলো: «আমার মাগিটা শুধু আমার কথায় গরম হয়ে গেছে।»

এই মিশ্রণটা — নোংরা গালি আর «আমার» — সিনথিয়াকে পাগল করে দিচ্ছিল। সে কারও — শুধু একজনের — এই অনুভূতিটা তাকে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল, যেন স্রোতে ভাসা পাতা।

«এখন নিচে নাম। সালোয়ারের ওপর দিয়ে। চাপ দে।»

তার হাত নামল। «ভিজে গেছি,» সে লিখল। লিখতে গিয়ে তার গাল জ্বলছিল।

«জানি। আমার খানকি আমার কথায় ভিজে যায়। এটাই তোর কাজ — ভেজা থাকা। বল, তুই কী?»

«আমি... আমি তোমার...» সে শেষ করতে পারল না।

«পুরোটা বল।»

«আমি তোমার ভেজা খানকি।»

লিখে সে ফোনটা বুকের ওপর চেপে ধরল। তার শ্বাস ঘন, কপালে ঘামের ফোঁটা। সে ভাবল — আমি কী হয়ে যাচ্ছি? — কিন্তু উত্তরটা সে জানত। সে হচ্ছে নিজে। আসল নিজে, যাকে সে এতদিন লুকিয়ে রেখেছিল।

«এখন সত্যি কথা বল,» তার মেসেজ এলো। «গতরাতে, ওদের দেখার পর ঘরে এসে... তুই কী করেছিলি? সত্যি বলবি। মিথ্যে বললে শাস্তি।»

সিনথিয়ার শ্বাস আটকে গেল। সে কী করে জানে? না — সে জানে না, অনুমান করছে। আর অনুমানটা নির্ভুল। সে লিখল, ধীরে, একটা একটা অক্ষর: «...হাত দিয়েছিলাম।»

«কী ভেবে? বল।»

«ওদের... ওদের কথা ভেবে।»

«কার কথা বেশি? দুলাভাইয়ের?»

তার গাল জ্বলছিল, কিন্তু সে থামল না: «...হ্যাঁ।»

«তার গলা? তার সেই কথাগুলো?»

«হ্যাঁ।»

«কল্পনায় সে তোকে কী বলছিল?»

সিনথিয়া চোখ বন্ধ করল। এই সত্যিটা বলা সবচেয়ে কঠিন — আর সবচেয়ে মুক্তির। তার আঙুল কাঁপছিল, তবু লিখল: «সে আমাকে... তোমার মতো করে... গালি দিচ্ছিল। আর আমি... আমি ভিক্ষা করছিলাম। তার কাছে।»

একটু থামা। তারপর তার জবাব এলো: «আমার খানকি... তুই তখনই আমার ছিলি। তুই জানতিস না, কিন্তু ছিলি। তোর শরীর জানত।»

সিনথিয়ার চোখে পানি চলে এলো। «এখন জানি,» সে লিখল। «এখন জানি আমি কার।»

«কার? বল।»

«তোমার। শুধু তোমার। আর কারও না, কোনোদিন না।»

«গুড গার্ল। আমার গুড গার্ল।»

«এখন প্যান্টির ভেতরে হাত ঢোকা।»

«...ঢুকিয়েছি।»

«কী পেলি? বর্ণনা দে।»

«ভেজা... গরম... পিচ্ছিল...»

«আঙুলটা ঘোরা। আস্তে। খুব আস্তে। আমি না বলা পর্যন্ত জোরে করবি না।»

সে করল। ধীর বৃত্ত, একটার পর একটা। প্রতিটা বৃত্তে আনন্দটা বাড়ছিল — যেন সিঁড়ি বেয়ে ওপরে ওঠা। সে লিখল: «আহ... ভালো লাগছে... খুব।»

«তোর ভোদাটা কার? বল।»

«আমার ভোদাটা... তোমার।»

«শুধু?»

«শুধু তোমার! আর কারও না!»

«গুড গার্ল। এখন একটু জোরে ঘোরা। কিন্তু শোন — যখন মনে হবে আর পারছিস না, সহ্য হচ্ছে না, তখন আমাকে বলবি। আমি বলব কখন থামবি, কখন ছাড়বি।»

সিনথিয়ার আঙুল দ্রুত হলো। তার কোমর বিছানা থেকে উঠে আসছিল আপনা-আপনি। অন্য হাতে সে নিজের স্তন চেপে ধরল কামিজের ওপর দিয়ে। চোখ বন্ধ। অন্ধকারে শুধু ফোনের আলো, আর তার ঘন, গরম শ্বাস।

«বল, কী ভাবছিস এখন। সত্যি বলবি।»

«তোমাকে... তুমি...»

«আমি কী করছি?»

«তুমি আমাকে...» — সে লিখতে পারল না। আঙুল থেমে গেল।

«বল, খানকি। নোংরা করে বল। লজ্জা করলে শাস্তি পাবি।»

সে চোখ বন্ধ করে লিখল: «তুমি আমাকে চুদছ।» — লিখেই সে মুখে হাত চাপা দিল। এই শব্দটা — নিজের হাতে লেখা — তাকে ভেতর থেকে কাঁপিয়ে দিল।

«কীভাবে চুদছি? বর্ণনা দে।»

«...জানি না।»

«জানিস। চোখ বন্ধ কর। দেখ। বল।»

সে চোখ বন্ধ করল। আর দেখল — স্পষ্ট, জীবন্ত: «তুমি আমার ওপরে... তোমার ধোনটা... আমার ভেতরে... গভীরে...» — তার আঙুল আবার ঘুরতে শুরু করল, দ্রুত।

«আর তুই কী করছিস?»

«আমি... আমি তোমাকে জড়িয়ে ধরেছি। তোমার পিঠে নখ বসিয়ে দিয়েছি। চিৎকার করছি...»

«কী বলে চিৎকার করছিস? বল।»

«"আরও... আরও জোরে... থেমো না..."»

একটু থামা। তারপর তার মেসেজ এলো — গলাটা হঠাৎ নরম: «আমার রান্ডিটা... তুই জানিস তুই কত সুন্দর? এইভাবে... আমার কাছে... খোলা...»

সিনথিয়ার চোখে পানি চলে এলো — আনন্দে, অবাক হয়ে। কেউ তাকে এভাবে কখনো দেখেনি। নোংরা আর সুন্দর — একসাথে, একই বাক্যে। সে লিখল: «আমি কাঁদছি...»

«কেন? খারাপ লাগছে?» — সাথে সাথে উদ্বেগ। «থামতে চাস? বল, থামব।»

এই প্রশ্নটা — এই একটা প্রশ্ন — সিনথিয়ার বুকটা ভরে দিল। সে চাইলে থামাতে পারে। সে জানে। আর এই জানাটাই তাকে আরও মুক্ত করল। «না,» সে লিখল। «থামব না। এটা... আনন্দের কান্না। কেউ আমাকে এভাবে কখনো... দেখেনি।»

«এখন আমি তোর শরীরটা জানতে চাই,» তার মেসেজ এলো। «পুরোটা। বর্ণনা দে — এমনভাবে, যেন আমি তোর সামনে দাঁড়িয়ে দেখছি। লজ্জা করবি না। একটা শব্দও বাদ দিবি না।»

সিনথিয়ার গাল জ্বলছিল। নিজের শরীরের বর্ণনা — তার ভাষায়? সে কখনো ভাবেনি এটা করবে। কিন্তু আজ রাতে সব «কখনো না» ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে, একটার পর একটা। সে লিখল, ধীরে, প্রতিটা শব্দ ওজন করে:

«আমার চুল... খোলা, বালিশে ছড়ানো। ঠোঁট... নিজেই কামড়ে ধরেছি, ফুলে আছে। গলা... ঘামে ভেজা।»

«আর নিচে? থামবি না।»

«আমার... বুক। কামিজের নিচে ভারী হয়ে আছে। বোঁটাদুটো শক্ত... কাপড়ের ওপর দিয়েই বোঝা যাচ্ছে।»

«তোর দুধগুলো কার?»

«...তোমার। আমার দুধগুলো তোমার।» — লিখে সে নিজেই অবাক হয়ে গেল — এই শব্দটা তার আঙুলে এত সহজে এলো কী করে? যেন সে সবসময় এটাই বলতে চেয়েছে।

«এখন হাতটা ওখানে রাখ। চাপ দে। বল, কেমন লাগে।»

সে করল — নিজের বুক নিজের হাতে, তার নির্দেশে। «গরম... ভারী... ভালো লাগছে...»

«বোঁটাটা চিমটি কাট। হালকা করে।»

«আহ...» — সে প্রায় চিৎকার করে ফেলল, তাড়াতাড়ি মুখে হাত চাপা দিল। পাশের ঘরে আপু-দুলাভাই ঘুমাচ্ছেন — এই ভয়টাই উত্তেজনাটাকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছিল। «ব্যথা লাগছে... কিন্তু... ভালো লাগছে...»

«আমার মাগিটা ব্যথাও উপভোগ করে,» তার মেসেজে যেন একটা হাসি লুকানো। «আর নিচে? কোমরটা?»

«সরু... ঘামে ভেজা... কাঁপছে...»

«আরও নিচে? থামিস না।»

«আমার উরুদুটো... কাঁপছে। আর মাঝখানটা... ভেজা। খুব ভেজা। চপচপ করছে।»

«তোর ভোদাটা কী চায়? বল। সত্যিটা বল, খানকি।»

সিনথিয়া চোখ বন্ধ করল। এই প্রশ্নের উত্তর সে জানে — গত দুই রাত ধরে, দরজার ফাঁক দিয়ে দেখার পর থেকে জানে। তবু বলতে গিয়ে বুক কাঁপছে, হাত কাঁপছে। শেষে লিখল, চোখ বন্ধ করে: «তোমাকে চায়। তোমার... ধোনটা চায়। ভেতরে। গভীরে।»

«কীভাবে চায়? ভিক্ষা করে বল। পুরোটা।»

তার ঠোঁট কাঁপছিল। সে লিখল: «ভিক্ষা চাইছি... আমাকে নাও... পুরোটা নাও... আমি তোমার খানকি... আমাকে চুদো... প্লিজ... থেমো না...»

লিখে সে ফোনটা বালিশের পাশে রাখল। তার পুরো শরীর কাঁপছে, ঘামে ভেজা চুল কপালে লেপ্টে। সে যা লিখেছে, তা ভেবে সে লজ্জায় মরে যাচ্ছে — আবার... আবার একটা অদ্ভুত গর্বও হচ্ছে। এই সাহস, এই নির্লজ্জতা — এটা তার। কেউ জোর করেনি। সে নিজে দিয়েছে।

ফোনটা কেঁপে উঠল: «আমার সাহসী রান্ডি... তুই জানিস না তুই আমার সাথে কী করছিস। আমার ধোনটা এখন... তোর কথা ভেবে...»

«তাহলে শোন, আমার মাগি,» তার গলা আবার কঠিন হলো, আর সিনথিয়ার শরীরে আবার শিরশিরানি ছড়িয়ে গেল। «এখন আঙুলটা ওপরে নে। সেই দানাটায়। যেটার কথা তুই আমাকে বলেছিলি।»

সে করল। ছোঁয়া লাগতেই পুরো শরীরে বিদ্যুৎ খেলে গেল — পায়ের আঙুল কুঁচকে গেল, কোমর ধনুকের মতো বেঁকে উঠল।

«ঘোরা। জোরে। থামবি না। যতক্ষণ না আমি বলি।»

তার আঙুল ঘুরছিল — দ্রুত, নিখুঁত বৃত্তে। তলপেটে সেই চেনা চাপ জমছিল, বাড়ছিল, ফুলে উঠছিল — যেন ভেতরে কিছু একটা ফেটে পড়তে চায়। তার শ্বাস আটকে আসছিল। «আমি... আমি আর পারছি না...» সে লিখল, আঙুল কাঁপছে। «আসছে... প্লিজ...»

«থাম।»

একটা শব্দ। সিনথিয়ার আঙুল থেমে গেল — কিন্তু শরীর থামল না। চাপটা ভেতরে আটকে রইল, দপদপ করছে, চিৎকার করছে মুক্তি পেতে। তার পুরো শরীর কাঁপছিল। «প্লিজ...» সে লিখল। «প্লিজ...»

«না। এখন না। তোর শরীর আমার। কখন ছাড়বি, কখন থামবি — আমি ঠিক করব। তুই শুধু আমার হুকুম মানবি।»

সিনথিয়া বিছানায় মোচড়াচ্ছিল, বালিশে মুখ গুঁজে। এই অসহ্য, মিষ্টি যন্ত্রণা — কেউ তাকে এভাবে কখনো আটকে রাখেনি, কেউ তার শরীরের ওপর এভাবে অধিকার ফলায়নি। সে তার দয়ায় — আর এই অসহায়ত্ব তাকে আরও, আরও ভিজিয়ে দিচ্ছিল।

«প্লিজ... আমি তোমার... সব... প্লিজ আমাকে ছাড়তে দাও...»

«ভিক্ষা কর। ঠিকমতো ভিক্ষা কর।»

তার চোখে পানি, ঠোঁট কাঁপছে। সে লিখল, একটা একটা শব্দ: «ভিক্ষা চাইছি... তোমার কাছে... আমাকে ছাড়তে দাও... প্লিজ... আমি তোমার খানকি... তোমার রান্ডি... তোমার মাগি... প্লিজ...»

দশ সেকেন্ড। নীরবতা। তার শরীর চিৎকার করছে।

বিশ সেকেন্ড। সে আর পারছে না — সত্যিই পারছে না।

তারপর: «এখন। ছাড়।»

সিনথিয়ার আঙুল আবার ঘুরল — আর পৃথিবী ভেঙে পড়ল।

চাপটা ফেটে গেল — ঢেউয়ের পর ঢেউ, তলপেট থেকে উঠে পুরো শরীরে ছড়িয়ে গেল আগুনের মতো। তার পা কাঁপছিল, কোমর বিছানা থেকে উঠে এলো, মুখ বালিশে গুঁজে সে চিৎকার চাপল — একটা দীর্ঘ, কাঁপা, নীরব চিৎকার যা তার গলায় আটকে রইল। তার আঙুল থামছিল না, ঢেউগুলো আসছিল একের পর এক, প্রতিটা আগেরটার চেয়ে গভীর, প্রতিটা তাকে আরও ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। তার চোখে পানি গড়িয়ে পড়ছিল বালিশে। পুরো শরীর ঘামে ভেজা, কাঁপছে।

তারপর — ধীরে ধীরে — শান্তি নামল। গভীর, ভারী, মধুর শান্তি। সে শুয়ে রইল, হাঁপিয়ে হাঁপিয়ে শ্বাস নিচ্ছিল। হাতটা তখনও সেখানে — এখন শুধু আলতো করে ধরে রাখা, আরামে, মমতায়। তার ঠোঁটের কোণে হাসি।

ফোনটা কেঁপে উঠল।

«তুই ঠিক আছিস?»

গলাটা বদলে গেছে। নরম। চিন্তিত। আসল তানভীর ফিরে এসেছে — সেই ছেলেটা, যে «বলবি?» জিজ্ঞেস করে। সিনথিয়ার চোখে আবার পানি এলো — এইবার অন্য কারণে, উষ্ণতায়। সে লিখল, হাত এখনো কাঁপছে: «হ্যাঁ... আমি ঠিক আছি।»

«ভয় পাসনি তো? বেশি হয়ে গেছিল? সত্যি বল।»

সে ভাবল। ভয়? না। এক মুহূর্তের জন্যও ভয় পায়নি। কারণ সে জানত — সে চাইলে একটা শব্দে থামাতে পারত। সে বলেছিল «চাই», আর সে জানত «থামো» বললেও সে শুনত — এইমাত্রই তো শুনল, «থামতে চাস?» জিজ্ঞেস করল। এই জানাটাই, এই বিশ্বাসটাই তাকে মুক্ত করেছিল — ভিক্ষা করতে, নিজেকে সঁপে দিতে।

«ভয় পাইনি,» সে লিখল। «একটুও না। আমি... আমি ভালো আছি। খুব ভালো।»

«সত্যি?»

«সত্যি।» সে একটু থামল। তারপর লিখল জীবনের সবচেয়ে সত্যি কথাটা: «আমার ভালো লেগেছে। খুব ভালো লেগেছে।»

«আমি জানতাম,» তার জবাব এলো। «তোর চোখে আমি অনেক আগেই দেখেছিলাম — তুই চাস কেউ তোকে পুরোটা নিক। তোর লজ্জাটাও নিক, তোর ভয়টাও নিক।»

সিনথিয়া তাকিয়ে রইল স্ক্রিনের দিকে। পুরোটা নিক। হ্যাঁ। এই চাওয়াটা সে দুই রাত আগে আপুর ঘরের দরজার ফাঁক দিয়ে দেখেছিল — আপু ভোগ করছিলেন, আর... আর আপুও চাইতেন। এতে লজ্জার কিছু নেই। এতে মুক্তি আছে। আর আজ রাতে সেই মুক্তিটা তার নিজের শরীরে নেমে এলো।

«তুই সাহসী,» তানভীর লিখল। «আমার সাহসী মাগি।» — এইবার শব্দটা পড়ে সে হাসল, চোখে পানি নিয়ে হাসল। হ্যাঁ। সে শুধু তারই। এই মালিকানাটা তাকে ছোট করেনি — বড় করেছে।

«ঘুমা এখন,» সে লিখল। «অনেক রাত হয়ে গেছে।»

«তুমি ঘুমাবে না?»

«আমি... আমি আরও কিছুক্ষণ জেগে থাকব। তোর কথা ভেবে। আজ রাতের তোর কথা।»

সিনথিয়ার বুকটা ভরে গেল উষ্ণতায়। সে ফোনটা বুকের ওপর রাখল, চোখ বন্ধ করল। অন্ধকার ঘর, বাইরে রাতের নিস্তব্ধতা, পাশের ঘর থেকে আপু-দুলাভাইয়ের ঘুমের নীরবতা — আর তার ভেতরে নতুন কিছু। একটা নতুন মেয়ে জেগে উঠেছে আজ রাতে। যে ভয় পায় না। যে চায়। যে ভিক্ষা করে — আর তাতে গর্ব বোধ করে। যে জানে, সঁপে দেওয়াটাও একটা শক্তি।

ফোনটা শেষবারের মতো কেঁপে উঠল।

«কাল সকালে... আবার।»

সিনথিয়া অন্ধকারে হাসল — ঠোঁটের কোণে সেই চাপা, রহস্যময় হাসি। হ্যাঁ। আবার।

অনেক পরে, ঘুমানোর আগে, সে «গোপন ডায়েরি» খুলল। আজকের তারিখের নিচে লিখল — হাত এখনো অল্প কাঁপছে:

«আজ রাতে আমি জানলাম, আমি কে। আমি সেই মেয়ে, যে ভিক্ষা করতে ভালোবাসে — কিন্তু শুধু তার কাছে, যাকে সে বিশ্বাস করে। আমি সেই মেয়ে, যে নোংরা কথা শুনতে চায় — কিন্তু শুধু তার মুখে, যে তাকে "গুড গার্ল" বলে। দুলাভাই আপুকে যা দেন, তানভীর আজ আমাকে তাই দিল — শুধু কথায়, শুধু চ্যাটে। আর তাতেই আমি ভেঙে পড়লাম, আবার গড়ে উঠলাম। ভয় পাইনি। একটুও না। কারণ আমি জানতাম — আমি চাইলেই একটা শব্দে থামাতে পারতাম। আর এই জানাটাই আমাকে মুক্ত করেছিল। সঁপে দেওয়াটাও একটা শক্তি — আজ বুঝলাম। কাল সকালে আবার। আমি অপেক্ষা করব। — মিম»

সে ফোনটা বন্ধ করে বালিশের পাশে রাখল। অন্ধকারে তার ঠোঁটের কোণে তখনো সেই হাসি — তৃপ্ত, নির্ভয়, নতুন।

(চলবে...)
Like Reply
#11
আরেকটা দিন

ঘুম ভাঙল শরীরের ব্যথায়।

প্রথমে সিনথিয়া বুঝতে পারল না — ব্যথাটা ঠিক কোথায়। তারপর ধীরে ধীরে টের পেল — উরুতে, কোমরের গভীরে, এমন এক জায়গায় যার নাম সে জোরে উচ্চারণ করতে পারে না। সে চোখ বন্ধ করেই শুয়ে রইল কিছুক্ষণ — নড়তে ইচ্ছে করছিল না, ভয়ও করছিল। আর চোখ বন্ধ করতেই — দুটো রাত একসাথে ভেসে উঠল।

গত পরশু রাত — দরজার ফাঁক। হলদে আলোর রেখা। আপুর কাতরানি — «আমাকে শেষ করে দাও!» দুলাভাইয়ের গলা — «বল, কার তুই?» আর তার নিজের হাত — কামিজের নিচে, নড়ছে, থামছে না।

গতকাল রাত — ফোনের স্ক্রিনের নীল আলো। তানভীরের লেখা — «থাম।» — আর তার ভিক্ষা — «প্লিজ... আর পারছি না...» — তারপর «এখন। ছাড়।» — আর সেই বিস্ফোরণ, বালিশে মুখ গুঁজে চাপা চিৎকার।

তার মনে পড়ল — শেষে তানভীরের গলা বদলে গেছিল। নরম হয়ে। «তুই ঠিক আছিস?» — «ভয় পাসনি তো?» — সে লিখেছিল — «না। ভয় পাব কেন? তুমি তো আমার।» — ওপাশে অনেকক্ষণ টাইপিং... তারপর — «ঘুমা এখন। কাল সকালে... আবার।»

আবার। এই শব্দটা তার বুকের ভেতর এখনো ঘুরছে। আবার মানে — আজ। আজ সকাল। আজ রাত।

সে উঠে বসল। শরীরটা ভারী লাগছে — কিন্তু এই ভারটা অচেনা নয় এখন। গতকাল সকালেও এমন লেগেছিল। তার ঠোঁটে হাসি ফুটল — তারপর সে হাসিটা হাত দিয়ে ঢাকল, যেন কেউ দেখে ফেলবে। কেউ নেই — ঘর খালি। তবু লজ্জা।

«দুটো রাত।» — সে ফিসফিস করে বলল খালি ঘরে। «মাত্র দুটো রাতে আমি...» — বাক্যটা শেষ করতে পারল না। শেষ করার দরকারও নেই। সে জানে সে কী হয়ে গেছে।

সিনথিয়া চোখ খুলল। ছাদের দিকে তাকিয়ে রইল। তার ঠোঁটে নিজের অজান্তেই একটা হাসি ফুটে উঠল — তারপর হাসিটা মিলিয়ে গেল লজ্জায়। দুটো রাত। মাত্র দুটো রাতে সে কত কিছু দেখে ফেলেছে, কত কিছু করে ফেলেছে।

পাশে ফোনটা। তুলে নিল। তানভীরের শেষ মেসেজ — রাত তিনটেয় পাঠানো — «কাল সকালে... আবার।»

কাল সকাল। মানে — আজ।

তার বুকের ভেতর ধড়াস করে উঠল। আজ সকাল। আজকের দিনটা। আজকের রাতটা। সে ফোনটা বুকে চেপে ধরল।

বিছানা থেকে উঠে আয়নার সামনে দাঁড়াল — গেস্ট রুমের ছোট্ট আয়না। ভেতরের মেয়েটাকে দেখল। একই মুখ, একই চোখ — কিন্তু চোখের ভেতরে কিছু একটা বদলে গেছে। গত পরশুর মেয়েটা ছিল কৌতূহলী। গতকালের মেয়েটা... জানে। জানে শরীর কী চায়, জানে সমর্পণে কী সুখ।

«আমি কি খারাপ হয়ে যাচ্ছি?» — আয়নার মেয়েটাকে জিজ্ঞেস করল মনে মনে।

আয়নার মেয়েটা হাসল — «নাকি আসল হচ্ছি?»

সে বিছানায় ফিরে এলো। বালিশের নিচে হাত ঢুকাল — তার গোপন ডায়েরি। ছোট্ট নোটবুকটা বের করল, কলম হাতে নিল।

«আজ সকালে ঘুম ভাঙল ব্যথা নিয়ে। ভালো ব্যথা? খারাপ ব্যথা? জানি না। শুধু জানি — আমি আর আগের আমি নেই।

গত পরশু রাতে আমি দরজার ফাঁকে দাঁড়িয়ে ছিলাম। দেখেছি — আপু আর দুলাভাইকে। যা দেখেছি, তা লিখতে পারব না — হাত কাঁপে। শুধু এইটুকু লিখি — আপু সুখী ছিল। খুব সুখী। আর আমি — আমি লজ্জায় মরে যাচ্ছিলাম, কিন্তু চোখ সরাতে পারছিলাম না। আমার হাত... আমার হাত আমার কথা শোনেনি।

আর গতকাল রাতে — তানভীর। ওর কথাগুলো এখনো কানে বাজে। "থাম।" — ওই একটা শব্দে আমার পুরো শরীর কেঁপে উঠেছিল। আমি ওর কথায়... শেষ হয়ে গেছিলাম।

আমি কি খারাপ? আপু তো খারাপ না। আপু যদি এটা চাইতে পারে — তাহলে আমি কেন পারব না?»

সে ডায়েরি বন্ধ করে বালিশের নিচে রেখে দিল। বুকটা হালকা লাগল — যেন কাউকে বলে ফেলেছে, নিজেকেই।

সে তাড়াতাড়ি মুখ ধুয়ে বাইরে এলো। রান্নাঘর থেকে খুন্তির শব্দ, ভাজির গন্ধ। আপু রান্না করছে। ডাইনিং টেবিলে দুলাভাই — ফোনে কী যেন দেখছেন, চায়ের কাপে ফুঁ দিচ্ছেন।

আর — রনি।

সিনথিয়া থমকে গেল দরজায়। রনি — দুলাভাইয়ের ছোট ভাই — টেবিলে বসে, চুল এলোমেলো, চোখে ঘুম। দুদিন আগে রাতের খাবারে দুলাভাই বলেছিলেন — পঁচিশ বছর, মোবাইলের দোকানে কাজ করে, ছোট ঘরটায় থাকে। সিনথিয়া তখন নামটা মনেও রাখেনি। এখন — এই সকালে — প্রথমবার ভালো করে দেখল। লম্বা, রোগা, গালে হালকা দাড়ির ছায়া।

রনি তাকাল। «শালী, গুড মর্নিং।» — হাসল, অলস, বন্ধুসুলভ।

«গুড মর্নিং, ভাইয়া।» — সিনথিয়া বসল।

«রাতে ঘুম হয়েছে?» — রনি জিজ্ঞেস করল, চায়ে চুমুক দিয়ে।

সিনথিয়ার বুক ধড়াস করে উঠল। «হ্যাঁ... হয়েছে।»

«মনে হলো না।» — রনি হাসল। «চোখ লাল। রাত জেগে ফোন ঘাঁটো নাকি?»

«না! মানে... একটু।» — সিনথিয়া তোতলাল।

রনি আর কিছু বলল না। শুধু তাকিয়ে রইল — সেই ধীর হাসিটা ঠোঁটে। সিনথিয়ার মনে হলো — এই ছেলে কি কিছু জানে? না, কী জানবে? সে তো কিছু দেখেনি। দেখার কথাও না। তবু — বুকের ভেতর কেমন কাঁপুনি।

«রনি।» — দুলাভাইয়ের গলা। «শালীকে এভাবে তাকিয়ে দেখছিস কেন? প্রেমে পড়ে গেলি নাকি?»

সবাই হেসে উঠল। রনিও হাসল — «ভাইয়া, তোমার শালী তো দেখছি লাজুক।»

সিনথিয়া প্লেটে মুখ গুঁজল। কান জ্বলছে।

কিন্তু রনির চোখ — তার ওপর এক মুহূর্ত বেশি আটকে রইল। একটা অদ্ভুত, ধীর হাসি ঠোঁটে। সিনথিয়া চোখ নামিয়ে নিল। বুকের ভেতর কেমন একটা অস্বস্তি — যেন কেউ তার ভেতরটা দেখে ফেলেছে, যা সে লুকিয়ে রেখেছে। সে নিজেকে বোঝাল — ধুর, কী ভাবছি।

নাস্তা এলো — পরোটা, ডিম ভাজি, চা। সিনথিয়া খেতে বসল — আর তখনই শুরু হলো যন্ত্রণাটা।

কারণ সে তাকাতে পারছিল না। স্বাভাবিকভাবে তাকাতে পারছিল না।

দুলাভাই চায়ের কাপ তুললেন — সেই হাত। সেই হাত যা গত পরশু রাতে আপুর চুলের মুঠি ধরেছিল। সিনথিয়ার গলা শুকিয়ে গেল। সে চোখ সরিয়ে নিল — আর চোখ পড়ল আপুর গলায়। কলারবোনের ঠিক ওপরে — একটা হালকা লাল দাগ। ছোট্ট, গোল।

সিনথিয়া জানে ওটা কী। এখন জানে।

তার কান গরম হয়ে উঠল। সে তাড়াতাড়ি প্লেটের দিকে তাকাল।

«কী রে, ঘুম হয়নি?» — আপুর গলা। «চোখ লাল।»

«না... মানে... হয়েছে।» — সিনথিয়া তোতলাল।

দুলাভাই ফোন থেকে চোখ না তুলেই বললেন, «রাত জেগে পড়াশোনা, নাকি?»

সিনথিয়ার গলায় পরোটা আটকে গেল। কাশতে কাশতে পানি খেল। রনি হেসে ফেলল। আপু হাসল। দুলাভাই এবার তাকালেন — চোখে মজা — «আরে আস্তে খা, শালী। কেউ কেড়ে নিচ্ছে না।»

«দুলাভাই!» — সিনথিয়া কৃত্রিম রাগ দেখাল।

«আচ্ছা আচ্ছা।» — দুলাভাই হাত তুললেন। «তবে শোন — আজ রনি তোকে শপিংয়ে নিয়ে যাচ্ছে। যা ইচ্ছে কিনবি। শালীর আবদার বলে কথা।»

«আমার কিছু লাগবে না, দুলাভাই।»

«লাগবে না মানে?» — দুলাভাই চোখ বড় করলেন। «মেয়েদের শপিং লাগে না — এটা আমি বিশ্বাস করি না।»

রনি হাসল — «ভাইয়া ঠিক বলেছে। চলো, শালী। আজ তোমাকে ঘুরিয়ে আনি।»

«তোমাকে» — সিনথিয়া লক্ষ্য করল, রনি তাকে «তুমি» বলছে। দুলাভাই «তুই» বলে। এই «তুমি»টা কেমন... দূরের, আবার কাছের। তার কান গরম হয়ে উঠল।

সিনথিয়া হাসার চেষ্টা করল। কিন্তু তার চোখ — বিশ্বাসঘাতক চোখ — আবার চলে গেল আপুর গলার সেই দাগে।

আর ঠিক তখনই আপু তাকাল। সরাসরি।

দুজনের চোখ আটকে গেল। আপু দেখল — সিনথিয়া কোথায় তাকিয়ে আছে। এক সেকেন্ড। দুই সেকেন্ড। তারপর আপুর ঠোঁটে ফুটে উঠল একটা ধীর, গভীর হাসি — জানা হাসি, রাগ নেই, তাড়া নেই। যেন বলছে — আমি জানি তুই কী দেখছিস। আর তুই জানিস আমি জানি।

সিনথিয়ার পেটের ভেতর মোচড় দিল। সে চোখ নামিয়ে নিল। কান দুটো জ্বলছে।

বাকি নাস্তাটা সে প্রায় না তাকিয়েই খেল। প্লেটের দিকে চোখ, কিন্তু মন অন্য কোথাও। দুলাভাইয়ের গলা কানে আসছে — অফিসের গল্প, হাসি। আপুর গলা — নরম, স্বাভাবিক। যেন কিছুই হয়নি। যেন গত পরশু রাতে কিছুই ঘটেনি।

কিন্তু সিনথিয়া জানে। তার শরীর জানে। প্রতিটা হাসির আড়ালে সে শুনতে পাচ্ছে সেই রাতের কাতরানি। প্রতিটা স্বাভাবিক কথার নিচে সে দেখতে পাচ্ছে সেই দৃশ্য।

আর সবচেয়ে ভয়ংকর — সে ঈর্ষা করছে। হ্যাঁ — আপুকে। আপুর ওই নির্লজ্জ, পরিপূর্ণ সুখকে। সে চায় — সেও চায় — কেউ তাকে ওইভাবে চাক। ওইভাবে... ভালোবাসুক।

চা শেষ করে সে উঠল। «আমি প্লেটগুলো নিয়ে যাচ্ছি।»

নাস্তা শেষে আপু রান্নাঘরে টিফিন গোছাচ্ছিল। সিনথিয়া প্লেট নিয়ে ঢুকল — সাহায্যের ভান, আসলে পালানোর জায়গা খুঁজছিল।

আপু তাকাল না। বক্সে ভাত তুলতে তুলতে বলল, «শোন।»

সিনথিয়ার বুক ধড়াস করে উঠল। «হুঁ?»

আপু এবার তাকাল — নরম চোখে। «লজ্জা পাস না।»

রক্ত সিনথিয়ার মুখে উঠে এলো। «আপু, আমি—»

«তোর বয়সে কৌতূহল থাকবেই।» — আপু হাসল, মায়ের মতো, বোনের মতো। «আমি জানি — ওই রাতে তুই জেগে ছিলি।»

সিনথিয়ার হাত থেকে প্লেটটা প্রায় পড়ে যাচ্ছিল। সে সিঙ্ক ধরে দাঁড়াল। «আপু... আমি... আমি ইচ্ছে করে—»

«শশশ।» — আপু তার হাত চেপে ধরল। «শুনেছিস কিছু? দেখেছিস?»

সিনথিয়া মাথা নাড়তে পারল না, না-ও বলতে পারল না। শুধু দাঁড়িয়ে রইল — জ্বলন্ত গাল, নত চোখ।

আপু দীর্ঘশ্বাস ফেলল — কিন্তু হাসিটা রইল। «স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে অনেক কিছু হয়, পাগলি। সেটা খারাপ না। ভালোবাসা শুধু হাত ধরা না — তোকে তো বলেছিলাম, অনেক গভীর কিছু।»

সিনথিয়া ফিসফিস করে বলল, «আপু... তুমি রাগ করোনি?»

«রাগ?» — আপু হেসে ফেলল। «তোর ওপর রাগ করে কী হবে? তুই তো আমার ছোট বোন।» — তারপর চোখ টিপল — «তবে হ্যাঁ — যা দেখেছিস, যা শুনেছিস — সেটা আমাদের মধ্যে থাক। বুঝলি?»

সিনথিয়া জোরে জোরে মাথা নাড়ল। বুকের ভেতর একটা পাথর নেমে গেল — হালকা লাগল, অদ্ভুতভাবে।

আপু একটু চুপ করে রইল। তারপর নরম গলায় বলল, «জানিস, আমারও একসময় ভয় করত। বিয়ের পর প্রথম প্রথম... আমি ভাবতাম — এটা কি ঠিক? ভালো মেয়েরা কি এসব চায়?» — সে হাসল। «তারপর বুঝলাম — চাওয়াটাই স্বাভাবিক। লজ্জার কিছু নেই। শুধু... সঠিক মানুষটার সাথে।»

সিনথিয়া ফিসফিস করে বলল, «দুলাভাই... ভালো?»

«খুব।» — আপুর চোখে একটা নরম আলো। «ও আমাকে বোঝে। আমার সবটুকু জানে — আর ভালোবাসে।» — তারপর সিনথিয়ার গাল টিপে দিল — «তুই যখন বড় হবি, বুঝবি। তাড়াহুড়ো করিস না, পাগলি।»

সিনথিয়া মাথা নিচু করল। «আপু... একটা কথা জিজ্ঞেস করব?»

«কর।»

«তুমি... প্রথমে ভয় পাওনি?» — তার গলা কাঁপছিল। «মানে... ওইসব... কথা...»

আপু হাসল — গভীর, জানা হাসি। «পেয়েছিলাম। খুব।» — সে সিনথিয়ার হাত ধরল। «কিন্তু ভয় আর ভালো লাগা — দুটো একসাথে থাকতে পারে, জানিস? ভয় পেলেই যে খারাপ, তা না।»

সিনথিয়া তাকাল — আপুর চোখে কোনো লজ্জা নেই, কোনো ভান নেই। শুধু সত্যি।

«মনে রাখবি —» আপু বলল, «— যে তোকে ভয় দেখায়, সে ভালোবাসে না। যে তোর ভয়টা বোঝে — সে-ই আসল।»

আপু টিফিন বক্স বন্ধ করল। «আর শোন — আজ আরেকদিন থেকে যা।»

«আপু?»

«কাল সকালে যাস। তোর মাকে আমি ফোন করে দিচ্ছি — বলব আমার শরীরটা ভালো না, তুই থাকলে ভালো লাগবে।» — আপু চোখ টিপল। «কী, থাকবি তো?»

সিনথিয়ার বুকের ভেতর আনন্দে লাফিয়ে উঠল — এত জোরে যে সে ভয় পেল আপু শুনতে পাবে। আরেকটা দিন। মানে — আরেকটা রাত। মানে — তানভীর।

«থাকব!» — বলে ফেলল এত তাড়াতাড়ি, এত উৎসাহে — যে আপু হেসে ফেলল।

«এত খুশি?» — আপু ভ্রু তুলল। «আমাকে এত ভালোবাসিস?»

«হ্যাঁ!» — সিনথিয়া আপুকে জড়িয়ে ধরল — লজ্জা ঢাকার জন্য, আনন্দ ঢাকার জন্য। আপুর গায়ের গন্ধ — রান্নার, সাবানের — আর সেই দাগটা, কলারবোনের ওপরে, এখন খুব কাছে। সিনথিয়া চোখ বন্ধ করল।

আপু ফোন বের করল। «দাঁড়া, তোর মাকে ফোন করে দিই।» — কানে ধরে — «হ্যালো, খালাম্মা... হ্যাঁ, আমি শিলা... শোনো না, সিনথিয়াকে আজ আরেকদিন রাখছি... না না, ওর কোনো দোষ না, আমারই শরীরটা একটু খারাপ লাগছে, ও থাকলে ভালো লাগবে... হ্যাঁ হ্যাঁ, কাল সকালেই পাঠিয়ে দেব... আচ্ছা, রাখছি।»

সিনথিয়া দম বন্ধ করে শুনছিল। আপু ফোন রেখে চোখ টিপল — «ডান।»

সিনথিয়ার বুকের ভেতর একটা অদ্ভুত অনুভূতি — অপরাধবোধ আর উত্তেজনা একসাথে। মা জানে না — মা কোনোদিন জানবে না — এই «আরেকদিন» মানে আসলে কী। মানে — তানভীরের সাথে আরেকটা রাত।

ড্রয়িং রুমে ফিরে এসে সিনথিয়া সোফায় বসল। দুলাভাই জুতো পরছেন, আপু ব্যাগ গোছাচ্ছে। রনি তখনো টেবিলে — চায়ে চুমুক দিচ্ছে, ফোন ঘাঁটছে।

টেবিলের নিচে — সিনথিয়ার ফোন ভাইব্রেট করল।

তানভীর: «ঘুম ভাঙল মহারানির?»

সে ঠোঁট কামড়ে হাসল। টাইপ করল — «ভাঙল। তুই?»

«আমি তো ঘুমাইনি। তোর কথা ভেবে ভেবে রাত পার।»

«মিথ্যুক।»

«সত্যি। কাল রাতে তুই অন্যরকম ছিলি, মিম।»

সিনথিয়ার গাল গরম হয়ে উঠল। টেবিলের ওপর আপু ব্যাগ নিচ্ছে, দুলাভাই দরজার দিকে যাচ্ছে — আর টেবিলের নিচে তার আঙুল চলছে।

«কীরকম?» — লিখল সে।

«আমার। পুরোপুরি আমার।»

সে ফোনটা একটু নামিয়ে রাখল — বুক ধড়ফড় করছে। তারপর আবার তুলল।

«আজ রাতেও আমি আছি। দশটার পর। একা থাকবি।»

সিনথিয়া টাইপ করল — «আজও আপুর বাসায় থাকছি। কাল বাড়ি যাব।»

«তাহলে আজ রাতেও...»

«হুম।»

«লজ্জা পাচ্ছিস?»

সে এক মুহূর্ত ভাবল। তারপর লিখল — «তোর সাথে না।»

ওপাশে — টাইপিং... টাইপিং... তারপর এলো — «এই কথাটা মনে রাখিস। আজ রাতে মনে করিয়ে দেব।»

সিনথিয়া ফোনটা বুকের কাছে নামিয়ে রাখল। বুক ধড়ফড় করছে। টেবিলের ওপর — আপু ব্যাগ গোছাচ্ছে, দুলাভাই জুতোর ফিতে বাঁধছে — আর টেবিলের নিচে — তার গোপন দুনিয়া।

ফোনটা আবার ভাইব্রেট করল।

«দেবরটা দেখতে কেমন?»

সিনথিয়া চমকে গেল। «কেন?»

«এমনি। আমার মিমকে কেউ নিয়ে যাচ্ছে — জানতে হবে না?»

সে হাসল — ঠোঁট কামড়ে। «সাধারণ।»

«মিথ্যা বলছিস।»

«তুই কী করে জানলি?»

«তোর "সাধারণ" মানেই অসাধারণ। আমি তোকে চিনি।»

সিনথিয়ার বুকটা কেমন করে উঠল — এই ছেলে তাকে চেনে। সত্যিই চেনে। মিমকে চেনে।

«শোন।» — তানভীর লিখল। «শপিংয়ে যা। মজা কর। কিন্তু মনে রাখবি — তুই কার?»

«তোর।» — সে লিখল, আঙুল কাঁপছে। «শুধু তোর।»

«ভালো মেয়ে। আজ রাতে পুরস্কার পাবি।»

সিনথিয়ার আঙুল থমকে গেল স্ক্রিনের ওপর। «পুরস্কার?»

«হুম। আজ রাতে দেখবি।»

«এখন বল না...»

«না। অপেক্ষা কর। অপেক্ষায় মজা বেশি — মনে আছে তো?»

তার গাল জ্বলে উঠল। মনে আছে। খুব মনে আছে — গতকাল রাতে «থাম।» বলে তানভীর তাকে কতক্ষণ অপেক্ষা করিয়েছিল। আর সেই অপেক্ষার পর... ওহ।

«তুই খুব খারাপ।» — লিখল সে।

«তোর জন্য। শুধু তোর জন্য।»

সিনথিয়া ফোনটা রেখে দিল — ঠিক তখনই দুলাভাইয়ের গলা — «শালী!»

সে চমকে তাকাল। দুলাভাই দরজায় দাঁড়িয়ে — জুতো পরা, ব্যাগ কাঁধে। «তোর আপু বলল আজ থাকছিস। ভালো করেছিস।» — হাসলেন সেই চেনা, উষ্ণ হাসি। «আর শোন —» — তিনি রনির দিকে তাকালেন — «তুই আজ দোকানে যাস না।»

রনি ফোন থেকে চোখ তুলল। «কেন?»

«শালীকে নিয়ে শপিংয়ে যা। ওর কিছু পছন্দ করে কিনে দে — মেয়ে মানুষ, ঘুরতে ভালোবাসে।» — দুলাভাই সিনথিয়ার দিকে তাকিয়ে চোখ টিপলেন — «যা ইচ্ছে কিনবি। বিল আমি দেব।»

«আরে না না, দুলাভাই—» — সিনথিয়া বলতে গেল।

«চুপ।» — দুলাভাই হাত তুললেন। «দুলাভাইয়ের আদর নিতে হয়।»

রনি কাঁধ ঝাঁকাল। «আচ্ছা, ভাইয়া।»

আর তারপর — রনি তাকাল সিনথিয়ার দিকে। সরাসরি। তার চোখ — এক মুহূর্ত বেশি আটকে রইল। ঠোঁটে সেই অদ্ভুত, ধীর হাসি — সকালের নাস্তার টেবিলের মতো। যেন সে কিছু জানে। যেন সে কিছু দেখেছে।

সিনথিয়ার মেরুদণ্ড বেয়ে একটা শীতল স্রোত নেমে গেল। সে তাড়াতাড়ি চোখ সরিয়ে নিল।

«যা, রেডি হয়ে নে।» — আপু দরজা থেকে বলল। «আর রনি — ওকে ভালো জায়গায় নিয়ে যাস।»

দরজা বন্ধ হলো। আপু আর দুলাভাই অফিসে। ফ্ল্যাটে রইল — সিনথিয়া আর রনি।

গেস্ট রুমে এসে সিনথিয়া দরজা বন্ধ করল। আয়নার সামনে দাঁড়াল।

কী পরবে? হাত বাড়িয়ে দিল আলমারিতে রাখা ব্যাগের দিকে। আঙুল থমকে গেল — নীল কামিজটার ওপর। সেই কামিজ — যেটা পরে সে তানভীরকে কাঁধের ছবি পাঠিয়েছিল। যেটা পরে সে দরজার ফাঁকে দাঁড়িয়ে ছিল।

সে কামিজটা তুলে নিল। গায়ে দিল। আয়নায় দেখল — নিজেকে।

নীল কামিজ। এই কামিজ পরেই সে তানভীরকে ছবি পাঠিয়েছিল — মুখ ছাড়া, শুধু কাঁধ। তানভীর লিখেছিল — «তুই আজ আমাকে মেরে ফেলবি, মিম।» সেই রাতেই সে দরজার ফাঁকে দাঁড়িয়েছিল — এই কামিজ পরেই। কামিজটা যেন সাক্ষী — সবকিছুর।

সে ওড়নাটা ভালো করে গোছাল। চুলে চিরুনি বুলাল। আয়নার মেয়েটাকে দেখল — গাল লাল, চোখ জ্বলজ্বলে।

বুকের ভেতর হাতুড়ি পিটছে। কেন? সে নিজেকে জিজ্ঞেস করল। শপিং তো — সাধারণ শপিং। দুলাভাইয়ের ছোট ভাইয়ের সাথে। কিন্তু হাতুড়িটা থামছে না।

কারণ — রনির সেই হাসি। সেই এক মুহূর্ত বেশি তাকিয়ে থাকা। যেন সে কিছু জানে।

«ধুর।» — সে নিজেকে বকল আয়নায়। «কী ভাবছি আমি? ও তো শুধু...» — শুধু কী? সে জানে না। শুধু এইটুকু জানে — রনির চোখে তাকালে তার অস্বস্তি হয়। এমন অস্বস্তি — যেন কেউ তার গোপন ডায়েরি পড়ে ফেলেছে।

ফোনটা বাজল। তানভীর।

«শপিং? কার সাথে?»

সিনথিয়া থমকে গেল। কী লিখবে? সত্যি? «দুলাভাইয়ের ভাইয়ের সাথে» — এতে দোষ কী? তানভীর তো জানে না এরা কারা, কোথায়।

«আপুর দেবরের সাথে।» — লিখল সে। «দুলাভাই পাঠাচ্ছে।»

«দেবর? কত বড়?»

«বড়। পঁচিশ।»

ওপাশে একটু চুপ। টাইপিং... তারপর — «সাবধানে থাকবি।»

সিনথিয়া হাসল। «ঈর্ষা হচ্ছে?»

«হচ্ছে। তুই আমার। ভুলে যাস না।»

«ভুলব না।» — সে লিখল। তারপর আরেকটা — «আমার জন্য কী কিনবি জিজ্ঞেস করছিলি না? তোর জন্য কিছু কিনব না।»

«মিথ্যুক। আমার মিম মিথ্যুক।»

«যা ভাগ।»

«আচ্ছা শোন।» — তানভীর লিখল। «শপিংয়ে গিয়ে আমার জন্য একটা কিছু কিনবি।»

«বললাম তো — কিনব না।»

«কিনবি। ছোট্ট কিছু। যেটা দেখলে তোর কথা মনে পড়বে।»

সিনথিয়ার বুকটা কেমন করে উঠল। «কীরকম?»

«তুই জানিস কীরকম।»

সে ফোনটা বুকে চেপে ধরল এক মুহূর্ত। তারপর ব্যাগে রাখল। আয়নায় শেষবার দেখল নিজেকে — চুল ঠিক করল, ওড়না গোছাল। বুকের হাতুড়িটা এখনো থামেনি।

«শান্ত হ।» — সে আয়নার মেয়েটাকে বলল। «শুধু শপিং। শুধু... শপিং।»

আয়নার মেয়েটা বিশ্বাস করল না। সিনথিয়াও করল না।

বাইরে এলো। রনি দরজার কাছে দাঁড়িয়ে — চাবি হাতে, ফোন পকেটে। তাকে দেখে তাকাল। আবার — সেই দৃষ্টি। মাথা থেকে পা পর্যন্ত — একবার। ধীরে। তারপর ঠোঁটে হাসি।

«চলো, সিনথিয়া।»

সিনথিয়ার গলা শুকিয়ে গেল। এই প্রথম রনি তার নাম ধরে ডাকল। এত... কাছ থেকে।

সে পা বাড়াল। রনি দরজা খুলে ধরল। সিঁড়ির দিকে এগোল তারা — পাশাপাশি। পেছনে দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ — ক্লিক।

সিঁড়ির মুখে রনি থমকে দাঁড়াল। «শোনো।»

সিনথিয়া তাকাল। «হুঁ?»

রনি একটু ঝুঁকল — গলা নামিয়ে বলল, «তুমি রাতে... ভালো ঘুমাও তো?»

সিনথিয়ার রক্ত হিম হয়ে গেল। «মানে?»

রনি হাসল — সেই ধীর, অদ্ভুত হাসি। «মানে — নতুন জায়গায় অনেকের ঘুম হয় না। তাই জিজ্ঞেস করলাম।» — সে সিঁড়ি বেয়ে নামতে লাগল। «চলো।»

সিনথিয়া দাঁড়িয়ে রইল এক মুহূর্ত। বুকের ভেতর হাতুড়ি। «তুমি রাতে ভালো ঘুমাও তো?» — এটা কি শুধুই একটা প্রশ্ন? নাকি... অন্য কিছু?

সে নিজেকে বোঝাল — ধুর, বেশি ভাবছি। পা বাড়াল সিঁড়ির দিকে।

নিচে রনি দাঁড়িয়ে — তাকিয়ে আছে ওপরের দিকে, তার দিকেই। «আসো।» — হাত বাড়িয়ে দিল, যেন সিঁড়িটা পিচ্ছিল।

সিনথিয়া তার হাত ধরল না — রেলিং ধরল। রনির হাতটা এক মুহূর্ত বাতাসে রইল — তারপর নেমে গেল। তার ঠোঁটে সেই হাসি।

«সাবধানে।» — বলল রনি।

দিনের আলোয় সিঁড়ি বেয়ে নামতে নামতে সিনথিয়া টের পেল — তার হাত কাঁপছে। কেন কাঁপছে, সে জানে না। শুধু জানে — আজকের দিনটা সাধারণ হবে না।

(চলবে...)
Like Reply
#12
শপিং

সকালটা এলো অন্যরকম আলো নিয়ে।

সিনথিয়ার ঘুম ভাঙল গেস্ট রুমের অচেনা বিছানায় — এক মুহূর্তের জন্য বুঝতে পারল না সে কোথায়। তারপর সব মনে পড়ে গেল — আপুর বাসা, দরজার ফাঁক, তানভীরের রাতভর মেসেজ। তার গাল গরম হয়ে উঠল কম্বলের নিচে। ফোনটা হাতে নিল — তানভীরের শেষ মেসেজ: «ঘুমা। স্বপ্নে আমি আসব।» সে হাসল, ফোনটা বুকে চেপে ধরল।

দরজায় টোকা। আপুর গলা — «সিনথিয়া! ওঠ! নাস্তা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে!»

ডাইনিং টেবিলে বসে সিনথিয়া চোখ তুলতে পারছিল না। আপু স্বাভাবিক — পরোটা ভাজছেন, হাসছেন। দুলাভাই অফিসের শার্ট পরে খবরের কাগজে চোখ বুলাচ্ছেন — সেই হাসিখুশি মানুষটা, যাকে দুই রাত আগে দরজার ফাঁক দিয়ে সম্পূর্ণ অন্য রূপে দেখেছে সে। এই দুটো মানুষ কি এক? এই ভাবনায় তার বুকের ভেতর কেমন করল।

আপু তার প্লেটে পরোটা তুলে দিতে দিতে ফিসফিস করে বললেন, «মাকে ফোন করেছিলাম — তুই আজও থাকছিস।»

সিনথিয়া চমকে তাকাল। আপুর চোখে সেই চেনা হাসি — গতকাল সকালের সেই হাসি, যার মানে সে এখন বোঝে। তার গলা শুকিয়ে গেল। «আপু...»

«খা,» আপু চোখ টিপলেন। «আজ তোর দুলাভাইয়ের ছুটি নেই, আমারও অফিস। তুই আর রনি বাসায় থাকবি।»

সিনথিয়া মাথা নিচু করে পরোটা ছিঁড়ল। আপুর এই চোখ টিপ — এর মানে সে জানে। গতকাল সকালের সেই ফিসফিস — «তুই কাল রাতে জেগে ছিলি, তাই না?» — এখনো তার কানে বাজে। আপু রাগ করেনি। আপু হেসেছিল। এই ভাবনায় তার বুকের ভেতর একটা অদ্ভুত সাহস জন্ম নিল — যেন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় গোপনটা কেউ জেনে ফেলার পরেও পৃথিবীটা ভাঙেনি।

দুলাভাই বেরোনোর সময় আপুর কপালে চুমু খেলেন — হালকা, স্বাভাবিক, সবার সামনে। সিনথিয়ার শ্বাস আটকে এলো। দুই রাত আগে দরজার ফাঁকে দেখা সেই দৃশ্য — সেই কপালের চুমু — «ভালোবাসি তোকে।» একই মানুষ। একই হাত। দিনের আলোয় ভদ্র, রাতের অন্ধকারে বন্য। তার গাল গরম হয়ে উঠল। সে তাড়াতাড়ি চোখ নামিয়ে নিল।

দুলাভাই কাগজ থেকে মুখ তুললেন। «রনি!»

ছোট ঘর থেকে রনি বেরিয়ে এলো — চুলে হাত বুলাতে বুলাতে। পঁচিশ বছর বয়স, লম্বা-চওড়া না হলেও টানটান গড়ন, চোখে একটা সহজ হাসি। সিনথিয়া তাকে ভালো করে দেখল এই প্রথম — সেদিন রাতের খাবারে নামটা শুনেছিল শুধু।

«শালীকে নিয়ে একটু শপিং-এ যাস তো,» দুলাভাই বললেন। «মেয়েটা বেড়াতে এসেছে, কিছু কিনে দে। টাকা আমি দিচ্ছি।»

রনির চোখ সিনথিয়ার দিকে এলো — এক সেকেন্ডের জন্য আটকে রইল। তার ঠোঁটের কোণে সেই হাসিটা ফুটল — ধীর, অদ্ভুত হাসি। সিনথিয়ার বুকটা ধড়াস করে উঠল। কেন যেন মনে হলো — এই হাসির পেছনে কিছু আছে।

«ঠিক আছে ভাই,» রনি বলল। «তুমি রেডি হও, সিনথিয়া।»

নিজের নামটা তার মুখে শুনে সিনথিয়ার কেমন লাগল — অচেনা, অথচ ভালো লাগা। সে তাড়াতাড়ি ঘরে ঢুকে গেল।

আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সে দ্বিধায় পড়ল — কোনটা পরবে? নীল কামিজটা — যেটা পরে তানভীরের জন্য ছবি তুলেছিল? নাকি গাঢ় সবুজটা? তার আঙুল থমকে রইল সবুজটার ওপর। কেন যেন আজ সাজতে ইচ্ছে করছে। রনির জন্য? এই ভাবনাটা আসতেই সে আয়নার মেয়েটাকে চোখ রাঙাল — কিন্তু ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল নিজের অজান্তে।

রিকশায় উঠতে গিয়ে বিপত্তি — রিকশাটা ছোট, দুজনে বসতে গায়ে গা লাগে। রনি একপাশে সরে বসল, «আরাম করে বসো।» রিকশা চলতে শুরু করল। বাঁক নেওয়ার সময় রিকশাটা দুলল — রনির বাহু এসে ঠেকল তার বাহুতে। এক সেকেন্ড। দুই সেকেন্ড। কেউ সরল না।

সিনথিয়ার শ্বাস আটকে এলো। বাহুর ওইটুকু ছোঁয়ায় তার সারা গায়ে শিহরণ বয়ে গেল। রনি তাকাল তার দিকে — চোখে চোখ পড়তেই দুজনেই তাকাল সামনে। কিন্তু বাহুটা সরল না।

«এই নীলটা তোমায় মানায়,» রনি বলল হঠাৎ। «মানে... কামিজটা।»

«থ্যাংকস,» সিনথিয়া ফিসফিস করল। তার গাল জ্বলছে — সে টের পাচ্ছে।

«তুমি... কলেজে পড়ো, তাই না?» রনি জিজ্ঞেস করল। «কোন ইয়ার?»

«সেকেন্ড ইয়ার,» সে বলল। নিরাপদ কথা। সহজ কথা। কিন্তু তার বুকের ভেতর ঢিপঢিপ থামছে না।

রনি হাসল। «আমার বোন থাকলে তোমার বয়সীই হতো।» একটু থেমে বলল, «তুমি হাসলে...» — সে থেমে গেল, মাথা নাড়ল। «কিছু না।»

«বলো না,» সিনথিয়া বলল — নিজের গলার আগ্রহ শুনে নিজেই চমকে উঠল।

রনি তাকাল তার দিকে — সরাসরি, গভীর করে। «তুমি হাসলে সুন্দর লাগে। খুব।»

সিনথিয়ার বুকের ভেতর কিছু একটা গলে গেল। সে জানালার বাইরে তাকাল — রাস্তা, দোকান, মানুষ — কিছুই দেখতে পেল না। শুধু শুনতে পেল নিজের হৃৎপিণ্ডের শব্দ। আর বাহুতে লেগে থাকা তার বাহুর উষ্ণতা।

রিকশা জ্যামে আটকাল। রনি ফোন বের করে কী যেন দেখল — হাসল নিজের মনে। «কী?» সিনথিয়া জিজ্ঞেস করল। «বন্ধু মিম পাঠিয়েছে,» রনি ফোনটা ঘুরিয়ে দেখাল — একটা ফানি ভিডিও। দুজনে একসাথে হাসল — মাথা কাছাকাছি এসে গেল স্ক্রিন দেখতে। রনির চুলের গন্ধ পেল সিনথিয়া — শ্যাম্পু আর রোদের গন্ধ। তার বুকটা ধড়াস করে উঠল।

তানভীরের কথা মনে পড়ল হঠাৎ — গতরাতে তার মেসেজ: «তুই শুধু আমার হাতটা ধরে থাকবি।» অপরাধবোধটা ছুঁয়ে গেল তাকে — ঠান্ডা আঙুলের মতো। কিন্তু রনির বাহু তখনো তার বাহুতে লেগে — উষ্ণ, সত্যি, জীবন্ত। ফোনের স্ক্রিনের মানুষটা দূরে — অনেক দূরে। আর এই মানুষটা — এখানে। তার পাশে। সিনথিয়া চোখ বন্ধ করল এক সেকেন্ডের জন্য — অপরাধবোধটাকে ঠেলে সরিয়ে দিল। আজকের দিনটা... আজকের দিনটা শুধু আজকের।

শপিং মলের ঠান্ডা হাওয়া মুখে লাগতেই সিনথিয়ার শরীরটা জুড়িয়ে গেল। ভেতরে ঝলমলে আলো, দোকানের সারি, মানুষের ভিড়। রনি হাঁটছে তার পাশে — একটু কাছে, প্রয়োজনের চেয়ে একটু বেশি কাছে।

«কী কিনবে?» রনি জিজ্ঞেস করল।

«জানি না,» সিনথিয়া বলল। «আপু বলেছে... মানে, দুলাভাই বলেছে...»

«ভাইয়ের টাকায় শপিং — এই সুযোগ ছাড়া যায়?» রনি হাসল। «চলো, ওই দোকানটায় যাই।»

কুর্তির দোকান। সিনথিয়া হ্যাঙারে ঝোলানো রঙিন কুর্তিগুলো দেখতে লাগল — হাত বুলিয়ে কাপড় অনুভব করল। রনি দাঁড়িয়ে দেখছিল তাকে — সে টের পাচ্ছিল পিঠে তার দৃষ্টি। এই অনুভূতিটা — কারো চোখে নিজেকে সুন্দর লাগা — তার বুকের ভেতর অদ্ভুত মিষ্টি ব্যথা তুলল।

«এই মেরুনটা দেখো,» রনি একটা কুর্তি তুলে ধরল। «তোমার গায়ের রঙে...» — সে থামল, হাসল। «ট্রাই করে দেখো।»

ট্রায়াল রুম — আসলে শুধু একটা পর্দা ঘেরা কোণা। সিনথিয়া ভেতরে ঢুকে পর্দা টেনে দিল। কামিজটা খুলতে গিয়ে তার হাত কাঁপছিল। কেন কাঁপছে? পর্দার ওপারে রনি দাঁড়িয়ে — এই ভাবনাটাই তার শ্বাস ঘন করে তুলল। মেরুন কুর্তিটা গলিয়ে নিল। আয়নায় দেখল নিজেকে — চোখে চকচকে ভাব, ঠোঁটে অজানা হাসি।

«হয়েছে?» পর্দার ওপার থেকে রনির গলা।

«এক মিনিট,» সে বলল — গলাটা নিজের কানেই অচেনা লাগল।

পর্দা সরিয়ে বেরিয়ে এলো। রনি তাকাল — আর তাকিয়েই রইল। তার চোখ সিনথিয়ার মুখ থেকে নামল গলায়, কাঁধে — থমকে রইল এক মুহূর্ত বেশি। সিনথিয়ার বুকের ভেতর ঢিপঢিপ শব্দটা এত জোরে — মনে হলো রনি শুনতে পাবে।

«এই রঙটা...» রনি এগিয়ে এলো এক পা। «তোমাকে...» — সে থামল। তার হাত উঠল — সিনথিয়ার শ্বাস বন্ধ হয়ে এলো — কিন্তু সে শুধু কুর্তির হাতাটা ঠিক করে দিল, যেটা উল্টে ছিল। আঙুলের ডগা ছুঁয়ে গেল তার কব্জি। একটা বিদ্যুৎ খেলে গেল সিনথিয়ার শিরদাঁড়া বেয়ে।

«পারফেক্ট,» রনি ফিসফিস করল। তার চোখ তখনো সিনথিয়ার চোখে। «এটা নিচ্ছি।»

«দামটা...» সিনথিয়া ট্যাগটা দেখে চমকে উঠল।

«ভাই দেবে,» রনি হাসল। «আর ভাই না দিলে... আমি দেব।»

«কেন?» সে জিজ্ঞেস করল — গলা কাঁপছে।

রনি উত্তর দিল না। শুধু তাকিয়ে রইল — সেই দৃষ্টিতে, যার মানে সিনথিয়া বুঝতে পারছিল, বুঝতে চাইছিল না। দোকানদার প্যাকেট এগিয়ে দিল।

আরো দুটো দোকান ঘুরল তারা। রনি একটা টপ তুলে ধরল — হালকা গোলাপি। «এটা ট্রাই করো।»

আবার পর্দার ভেতর। এবার সিনথিয়ার হাত আরো বেশি কাঁপছিল। পর্দার ওপারে রনির উপস্থিতি — তার নিঃশ্বাসের শব্দ যেন শুনতে পাচ্ছে সে। টপটা পরে পর্দা সরাল।

«পর্দা খুলে দেখাও না একটু,» রনি বলল — গলায় দুষ্টুমি। «ভেতরে কী হচ্ছে দেখতে দাও।»

«অসভ্য!» সিনথিয়া হেসে ফেলল — কিন্তু তার হৃৎপিণ্ড গলায় এসে আটকে আছে। এই খুনসুটি, এই দুষ্টুমি — তানভীরের মেসেজের মতো, কিন্তু এটা সামনাসামনি, এটা সত্যিকারের মানুষ, সত্যিকারের চোখ।

রনি হাসল — কিন্তু হাসির নিচে কিছু একটা ছিল। গভীর, অন্ধকার কিছু। «সরি,» সে বলল। «মজা করছিলাম।»

«জানি,» সিনথিয়া বলল। কিন্তু তার বুক বলছিল — মজা না। এটা মজা না।

তৃতীয় দোকানটা ছোট — সালোয়ার-কামিজের। সিনথিয়া একটা হালকা সবুজ কামিজ হাতে নিল। রনি দাঁড়িয়ে ছিল দোকানের মুখে — কিন্তু তার চোখ আয়নার দিকে। সিনথিয়া কামিজটা গায়ে ধরে আয়নায় দেখল — আয়নায় রনির প্রতিবিম্ব। সে তাকিয়ে আছে। সরাসরি। তাদের চোখ আয়নায় মিলল — দুজনেই সরিয়ে নিল তাড়াতাড়ি। কিন্তু সিনথিয়ার বুকের ভেতর আগুন জ্বলে উঠল।

«এটা নাও,» রনি বলল — গলা একটু ভারী। «সবুজটা তোমায়... ভালো লাগবে।»

প্যাকেটগুলো হাতে নিয়ে বেরোতে বেরোতে সিনথিয়া টের পেল — রনি ইচ্ছে করে তার হাতের প্যাকেটগুলো নিয়ে নিল। তাদের আঙুল ছুঁয়ে গেল প্যাকেটের হাতলে — এক সেকেন্ডের জন্য। দুজনেই থমকে গেল। তারপর রনি প্যাকেটগুলো নিয়ে হাঁটতে লাগল — যেন কিছু হয়নি। কিন্তু সিনথিয়া দেখল — তার কান লাল হয়ে আছে।

ফুড কোর্টে ভিড়। ছোট্ট একটা টেবিল পেল তারা — মুখোমুখি বসতে গেলে হাঁটুতে হাঁটু লাগে। রনি দুটো কোল্ড কফি নিয়ে এলো।

«খিদে পেয়েছে?» সে জিজ্ঞেস করল।

«একটু,» সিনথিয়া বলল। আসলে তার পেটে খিদে নয় — অন্য কিছু। প্রজাপতির মতো কিছু উড়ছে ভেতরে।

কফিতে চুমুক দিতে দিতে রনি তাকিয়ে রইল তার দিকে। টেবিলের নিচে তার হাঁটু সিনথিয়ার হাঁটুতে ঠেকল — প্রথমে মনে হলো ভুলে। কিন্তু সরাল না। সিনথিয়াও সরাল না। দুটো হাঁটু লেগে রইল — উষ্ণ, চাপা, গোপন। টেবিলের ওপরে সব স্বাভাবিক — কফি, হাসি, কথা। টেবিলের নিচে — অন্য একটা গল্প।

«তুমি খুব সুন্দর, জানো?» রনি বলল হঠাৎ — গলা নিচু, শুধু তার জন্য।

সিনথিয়ার হাত থমকে গেল কফির মগে। «সব মেয়েকেই বলো?»

«না,» রনি মাথা নাড়ল — চোখ সরাল না। «শুধু তোমাকে। সত্যি বলছি।»

তার গাল জ্বলে উঠল। সে চোখ নামিয়ে নিল — কিন্তু হাঁটুটা সরাল না। সরাতে ইচ্ছে করল না।

«সেদিন রাতে খাবার টেবিলে...» রনি বলল, «তুমি হাসছিলে। আমি দেখছিলাম।»

«দেখছিলে?» তার গলা কাঁপল।

«হ্যাঁ।» একটু থেমে। «তোমাকে দেখতে ভালো লাগে।»

সিনথিয়ার ফোনটা বাজল পকেটে — মেসেজ। সে বের করে দেখল — তানভীর: «কী করছিস?» তার বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল। অপরাধবোধ — ঠান্ডা স্রোতের মতো। সে ফোনটা উল্টে টেবিলে রাখল। উত্তর দিল না।

«বয়ফ্রেন্ড?» রনির গলায় কিছু একটা — হালকা, কিন্তু নিচে চাপা।

«না!» সিনথিয়া তাড়াতাড়ি বলল — বেশি তাড়াতাড়ি। «মানে... বন্ধু।»

রনি হাসল — কিন্তু হাসিটা পৌঁছল না চোখে। «বন্ধু, হ্যাঁ?» টেবিলের নিচে তার হাঁটু একটু চাপ দিল তার হাঁটুতে। «তোমার মতো মেয়ের বন্ধু অনেক থাকবে।»

«তুমি...» সিনথিয়া বলতে গিয়ে থেমে গেল। কী বলবে? তুমি ফ্লার্ট করছ? তুমি আমাকে পছন্দ করো? তার ঠোঁট কাঁপল। «তুমি এরকম... সবার সাথে?»

«কীরকম?» রনি ঝুঁকল টেবিলের ওপর দিয়ে — তার মুখ এখন খুব কাছে। সিনথিয়া তার নিঃশ্বাসের গন্ধ পেল — কফি আর কিছু। «বলো। কীরকম?»

সিনথিয়া কিছু বলতে পারল না। তার ঠোঁট শুকিয়ে গেছে। রনির চোখ তার ঠোঁটে নামল এক সেকেন্ডের জন্য — তারপর আবার চোখে। এই এক সেকেন্ডে সিনথিয়ার সারা শরীরে আগুন ধরে গেল।

কফি শেষের দিকে রনি হঠাৎ ঝুঁকল টেবিলের ওপর দিয়ে। সিনথিয়া পিছিয়ে গেল একটু — চমকে। রনির বুড়ো আঙুল এসে ঠেকল তার ঠোঁটের কোণে — মুছে দিল কফির একটা ফোঁটা।

সময় থেমে গেল।

তার আঙুল তার ঠোঁটে — উষ্ণ, এক সেকেন্ডের জন্য। সিনথিয়ার শ্বাস বন্ধ। রনির চোখ তার ঠোঁটে — তারপর চোখে। সে হাতটা সরিয়ে নিল ধীরে — অনিচ্ছায়, যেন সরাতে কষ্ট হচ্ছে।

«সরি,» সে ফিসফিস করল। «ফোঁটা লেগেছিল।»

«ইটস ওকে,» সিনথিয়ার গলা কাঁপছে। তার ঠোঁটের কোণে এখনো তার আঙুলের উষ্ণতা লেগে আছে। সে ঠোঁট কামড়ে ধরল — ঠিক সেই জায়গাটা, যেখানে সে ছুঁয়েছিল।

«খাওয়া শেষ?» রনি জিজ্ঞেস করল — গলা ভারী। «চলো, একটু হাঁটি।»

তারা হাঁটল — দোকানের সারি পেরিয়ে, এসকেলেটরে উঠে। ভিড়ের মধ্যে রনির হাত একবার তার পিঠে ঠেকল — ভিড় সরাতে, হয়তো। কিন্তু হাতটা এক সেকেন্ড বেশি রইল। সিনথিয়া কিছু বলল না। তার কাঁধের ওইটুকু উষ্ণতা সারা গায়ে ছড়িয়ে গেল। এসকেলেটর থেকে নামতে গিয়ে সে একটু টলে গেল — রনি তার হাতটা ধরে ফেলল। ধরেই রইল — নামার পরেও। কয়েক সেকেন্ড। তারপর ছেড়ে দিল — ধীরে, অনিচ্ছায়। দুজনেই তাকাল অন্যদিকে। কিন্তু সিনথিয়ার হাতের তালুতে তখনো তার আঙুলের ছাপ লেগে রইল।

মলের ওপর তলাটা ফাঁকা — কয়েকটা বন্ধ দোকান, একটা সরু করিডোর। রনি হঠাৎ থেমে গেল। সিনথিয়াও থামল।

তার মুখের ভাব বদলে গেছে — সারাদিনের হালকা হাসিটা উধাও, চোখে গভীর কিছু। সিনথিয়ার বুকটা ধড়াস করে উঠল। «কী হয়েছে?» — তার গলা শুকিয়ে গেছে।

«সিনথিয়া,» সে বলল। তার গলা বদলে গেছে — হালকা ভাবটা উধাও। «তোমাকে একটা কথা বলব।»

সিনথিয়ার হাসি মিলিয়ে গেল। «কী কথা?»

রনি তাকাল এদিক-ওদিক — কেউ নেই। তারপর তার চোখ এলো সিনথিয়ার চোখে — গভীর, স্থির।

«সেদিন রাতে... তোমাকে দেখেছি।»

সিনথিয়ার রক্ত হিম হয়ে গেল। «কী... কী দেখেছ?» — ফিসফিস।

«দরজার ফাঁকে।» রনি এক পা এগিয়ে এলো। «তুমি... দেখছিলে। ভাই-ভাবীকে।»

পৃথিবীটা দুলে উঠল। সিনথিয়ার গলা শুকিয়ে কাঠ। «আমি... আমি...»

«আর তোমার হাত...» রনি থামল না — গলা নিচু, কিন্তু প্রতিটা শব্দ ছুরির মতো। «তোমার হাত কামিজের নিচে ছিল। আমি দেখেছি, সিনথিয়া। সব দেখেছি।»

«না...» তার চোখে পানি এসে গেল। «প্লিজ... কাউকে বলবে না... প্লিজ... আপুকে না... দুলাভাইকে না... প্লিজ...» তার গলা ভেঙে যাচ্ছে। লজ্জায় মাটিতে মিশে যেতে ইচ্ছে করছে। ধরা পড়ে গেছে। সব শেষ।

«শশশ...» রনি তার হাত ধরল — শক্ত করে না, নরম করে। «বলব না। কাউকে না। শপথ।»

সিনথিয়া তাকাল তার দিকে — চোখে পানি, ঠোঁট কাঁপছে। «সত্যি?»

«সত্যি।» রনি তার হাতটা ছাড়ল না। «আর... আরেকটা কথা আছে।»

«কী?»

রনি একটা লম্বা নিঃশ্বাস নিল। চোখ নামিয়ে নিল এক মুহূর্তের জন্য — তারপর আবার তাকাল।

«আমিও দেখি।»

«কী?»

«মাঝে মাঝে।» তার গলা ফিসফিসের চেয়ে একটু বেশি। «ভাই-ভাবীকে। দরজার ফাঁক দিয়ে। যেমন তুমি দেখেছিলে... আমিও দেখি।»

সিনথিয়া স্তব্ধ। «তুমি...?»

«হ্যাঁ।» রনির ঠোঁটে তিক্ত হাসি। «আমি খারাপ মানুষ, তাই না? নিজের ভাই-ভাবীকে...» সে মাথা নাড়ল। «কিন্তু থামতে পারি না।»

একটা দীর্ঘ নীরবতা। করিডোরে শুধু এসির শব্দ।

«আমি তোমাকে জাজ করছি না, সিনথিয়া,» রনি বলল — এবার তার গলা নরম। «সেদিন তোমাকে ওইভাবে দেখে...» — সে থামল, চোখ সরিয়ে নিল। «আমার... ভালো লেগেছিল। তোমাকে দেখে। তোমার... ওই রূপটা দেখে।»

সিনথিয়ার বুকের ভেতর ঝড়। লজ্জা — প্রচণ্ড লজ্জা। কিন্তু তার নিচে — অন্য কিছু। একটা অদ্ভুত, নিষিদ্ধ উত্তেজনা। কেউ তাকে দেখেছে — তার সবচেয়ে গোপন মুহূর্তে — আর সেই দেখাটা তাকে... ঘৃণা করেনি। চেয়েছে।

«তুমি... আমার দিকে...?» সে ফিসফিস করল।

«হ্যাঁ,» রনি স্বীকার করল — চোখে চোখ রেখে। «সেদিন রাত থেকে তোমাকে ভুলতে পারছি না। দরজার ফাঁকে ঝুঁকে থাকা তুমি... তোমার হাত...» তার গলা ভারী হয়ে এলো। «আমি জানি এটা ঠিক না। কিন্তু...»

সিনথিয়ার মাথার ভেতর ঝড়। সেদিন রাতের দৃশ্যটা ভেসে উঠল — দরজার ফাঁক, হলদে আলো, তার নিজের হাত কামিজের নিচে। আর পেছনে — অন্ধকারে — রনি দাঁড়িয়ে দেখছিল। তাকে দেখছিল। তার সবচেয়ে গোপন, সবচেয়ে লজ্জার মুহূর্তটা — কেউ দেখে ফেলেছে। তার পেটের ভেতর মোচড় দিল।

কিন্তু তারপর — অন্য ভাবনা। রনি ঘৃণা করেনি। রনি কাউকে বলেনি। দুই দিন ধরে এই গোপনটা একা বয়ে বেড়িয়েছে — আর আজ বলছে — তাকে দেখে তার ভালো লেগেছিল।

লজ্জার নিচে — সেই অদ্ভুত উত্তেজনাটা আবার মাথা তুলল। কেউ তাকে চেয়েছে — তার ওই রূপটাকে চেয়েছে — যে রূপটাকে সে নিজেও ভয় পায়, ভালোবাসে। তানভীর তাকে চায় মিম হিসেবে — ফোনের স্ক্রিনে। রনি তাকে দেখেছে — সত্যিকারের তাকে — দরজার ফাঁকে কাঁপতে থাকা তাকে — আর তাতেও চেয়েছে।

«তুমি...» তার গলা ফিসফিসের চেয়ে বেশি বেরোল না। «তুমি আমাকে... ওইভাবে দেখেও...»

«ভয় পেয়ো না,» সে বলল হঠাৎ — যেন তার মনের ভয়টা পড়তে পেরেছে। «আমি জোর করব না। তুমি না চাইলে কিছু হবে না। শুধু...» — তার হাতটা সিনথিয়ার হাতের ওপর রইল — উষ্ণ, ভারী। «শুধু জানতে চাই — তুমিও কি...?»

সিনথিয়া তাকাল তাদের হাতের দিকে — তার ছোট্ট হাতটা তার বড় হাতের নিচে। সে সরাল না। সরাতে পারল না। তার হৃৎপিণ্ড এত জোরে ধড়ফড় করছে — মনে হচ্ছে রনি শুনতে পাচ্ছে।

«আমি জানি না,» সে ফিসফিস করল। সত্যি কথা। সে জানে না। ভয় করছে — কিন্তু ভয়ের নিচে আগুন।

রনির বুড়ো আঙুল তার হাতের পিঠে ঘষল — ধীরে, একবার। সিনথিয়ার শিরদাঁড়া বেয়ে শিহরণ নেমে গেল।

«সিনেমা দেখবে?» রনি জিজ্ঞেস করল হঠাৎ — গলা আবার হালকা, কিন্তু চোখে সেই গভীরতা।

«কোনটা?» সিনথিয়ার গলা কাঁপছে।

রনি হাসল — সেই ধীর হাসি। «যেটায় অন্ধকার বেশি।»

সিনথিয়ার শ্বাস আটকে এলো। সে বুঝল — ঠিক বুঝল — এর মানে কী। তার বলা উচিত না। তানভীরের কথা মনে পড়ল — «তুই শুধু আমার হাতটা ধরে থাকবি।» আপুর কথা মনে পড়ল। মায়ের কথা। সব মনে পড়ল — আর সব ভেসে গেল রনির চোখের দিকে তাকিয়ে।

«আচ্ছা,» সে বলল।

টিকিট কাউন্টারে রনি দুটো টিকিট কাটল — পেছনের সারি। সিনথিয়ার হাত তখনো তার হাতে — কাউন্টার থেকে থিয়েটারের দরজা পর্যন্ত সে ছাড়ল না। অন্ধকার গলি দিয়ে ঢুকতে ঢুকতে সিনথিয়ার বুক ধড়ফড় করছে — সে জানে না সে কী করতে যাচ্ছে। জানে শুধু — ফিরে যেতে ইচ্ছে করছে না।

সিটে বসে রনি পপকর্নের প্যাকেটটা মাঝখানে রাখল। তাদের কাঁধ লেগে আছে — অন্ধকারে, ভিড়ের আড়ালে। সিনথিয়া পপকর্ন নিতে গিয়ে তার আঙুল ছুঁয়ে ফেলল রনির আঙুল — দুজনেই থমকে গেল। রনি প্যাকেটটা সরিয়ে রাখল একপাশে।

থিয়েটারের ভেতর অন্ধকার। ট্রেলার চলছে পর্দায় — আলো-ছায়ার ঝলকানি। তারা বসল একদম পেছনের সারিতে, কোণার দিকে — আশেপাশে কেউ নেই। সিনথিয়ার হাত কোলের ওপর — কাঁপছে।

আলোটা আরো কমে এলো। সিনেমা শুরু হলো।

অন্ধকারে — তার হাতের ওপর আরেকটা হাত এলো। রনির আঙুল তার আঙুল খুঁজে নিল — জড়িয়ে ধরল। শক্ত করে। সিনথিয়া সরাল না।

পর্দায় কী চলছে — সে দেখতে পেল না। শুধু টের পেল — অন্ধকারে তার পাশে বসা মানুষটার নিঃশ্বাস, তার হাতের উষ্ণতা, তার বুড়ো আঙুলের ধীর ঘষা তার তালুতে। তার সারা শরীরে বিদ্যুৎ খেলে যাচ্ছে।

রনি ঝুঁকল তার কানের কাছে — তার নিঃশ্বাস লাগল তার ঘাড়ে। ফিসফিস করে বলল —

«ভয় পাচ্ছ?»

সিনথিয়ার ঠোঁট কাঁপল। «না।»

একটু নীরবতা। তারপর — «মিথ্যে বলো না।»

আর অন্ধকার আরো গভীর হলো।

পর্দায় নায়ক-নায়িকা — সিনথিয়া দেখল না। তার সারা মনোযোগ — কানের কাছে রনির নিঃশ্বাসে, হাতে তার হাতের চাপে। রনির আঙুল এবার তার তালুতে ছোট্ট বৃত্ত আঁকল — ধীরে। সিনথিয়ার ঠোঁট থেকে একটা চাপা শব্দ বেরিয়ে এলো — সে তাড়াতাড়ি ঠোঁট চাপল।

রনি হাসল — অন্ধকারে তার হাসির শব্দ শুনতে পেল সে। তার ঠোঁট এবার তার কানের লতির কাছে — ছুঁল না, কিন্তু এত কাছে যে... «শশশ,» সে ফিসফিস করল। «কেউ শুনতে পাবে।»

সিনথিয়ার সারা শরীর কাঁপছে। ভয় — হ্যাঁ, ভয় করছে। কিন্তু ভয়ের চেয়ে বড় — চাওয়া। সে রনির হাতটা আরো শক্ত করে ধরল। অন্ধকারে — কেউ দেখছে না — সে তার মাথাটা একটু হেলিয়ে দিল রনির কাঁধের দিকে।

(চলবে...)
Like Reply
#13
সিনেমা হল

হলটা প্রায় খালি ছিল।

দুপুরের শো — এই সময়ে কে আর সিনেমা দেখতে আসে? সামনের দিকের কয়েকটা সারিতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে গোটা দশেক মানুষ, মাঝখানে একটা ফাঁকা সমুদ্র, আর পেছনের অন্ধকারে — শুধু তারা দুজন। শেষ সারি। কর্নারের দুটো সিট। রনি টিকিট কাটার সময় ইচ্ছে করেই এই সিট দুটো বেছেছিল — সিনথিয়া তখন বুঝতে পেরেছিল, এখন আরো ভালো করে বুঝছে।

হলে ঢোকার সময় তার পা কাঁপছিল। পপকর্নের বাক্সটা রনি কিনেছিল — বড় সাইজের, দুজনের মাঝখানে রাখার কথা। কিন্তু সিটে বসার পর বাক্সটা রনি রাখল পাশের খালি সিটে। সিনথিয়া বুঝেছিল — মাঝখানে কিছু থাকবে না। কোনো বাধা থাকবে না। তার বুকের ভেতর তখন দুটো কণ্ঠস্বর লড়ছিল — একটা বলছিল, «উঠে যা, এখনো সময় আছে», আরেকটা — মিমের কণ্ঠস্বর — বলছিল, «বসে থাক। দেখ কী হয়।» মিম জিতেছিল। মিম সবসময় জেতে।

আলো নিভে গেল। পর্দা জ্বলে উঠল। আর অন্ধকারে — রনির হাতটা এসে ঢেকে দিল তার হাত।

পর্দায় কী চলছে — সে জানে না। কোনো একটা সিনেমা। গান বাজছে, কেউ কাঁদছে, কেউ হাসছে, পর্দার আলো অন্ধকার হলে ঝিকমিক করে ওঠে। শব্দগুলো কানে আসছে, কিন্তু মাথায় ঢুকছে না। কারণ তার পুরো সচেতনতা এখন একটা জায়গায় আটকে আছে — ডান হাতের আঙুলে। রনির আঙুলের ফাঁকে।

শপিং মলের পর থেকে তার হাতটা সে ছাড়েনি। বা রনি ছাড়েনি। কোনটা — সিনথিয়া জানে না। মলে, ভিড়ের মধ্যে, রনির আঙুল প্রথম যখন তার আঙুলে জড়িয়েছিল — সে চমকে উঠেছিল, হাতটা টেনে নিতে গিয়েছিল। রনি ছাড়েনি। শুধু আস্তে বলেছিল — «থাক।» আর সে — সে রেখে দিয়েছিল।

আর তারপর ক্যাফেতে — সেই স্বীকারোক্তি।

«আমি দেখেছি তোকে। কাল রাতে। দরজার ফাঁকে।»

সিনথিয়ার রক্ত তখন হিম হয়ে গেছিল। হাতের কাপটা কেঁপে উঠেছিল। «কী... কী দেখেছ?» — যদিও সে জানত। সে জানত ঠিক কী দেখেছে রনি।

«সব।» রনির চোখ সরেনি। «তুই দরজার ফাঁকে দাঁড়িয়ে ছিলি। আর তোর হাত...» — সে থেমেছিল, তারপর নিচু গলায় — «তুই নিজেকে ছুঁচ্ছিলি।»

সিনথিয়া উঠে চলে যেতে চেয়েছিল। লজ্জায় মরে যেতে চেয়েছিল। কিন্তু রনি তার হাতটা ধরে রেখেছিল টেবিলের ওপর। «শোন। লজ্জা পাস না। আমি তোকে ব্ল্যাকমেইল করতে আসিনি।»

«তাহলে কেন বলছ?» — তার গলা কেঁপেছিল।

«কারণ...» রনি একটু হেসেছিল — অদ্ভুত, লাজুক হাসি। «কারণ আমিও দেখি। মাঝে মাঝে। ভাইয়া আর ভাবিকে।»

সিনথিয়ার চোখ বড় হয়ে গেছিল। «তুমি...?»

«হ্যাঁ।» রনি চোখ নামায়নি। «আমি জানি এটা খারাপ। কিন্তু... থামাতে পারি না। ওদের দেখলে মনে হয় — এটাই আসল জীবন। বাকি সব অভিনয়।»

সেই মুহূর্তে সিনথিয়ার ভেতরে কিছু একটা গলে গেছিল। ভয়টা — ধরা পড়ার ভয়টা — গলে গিয়ে তার জায়গায় এসেছিল একটা অদ্ভুত স্বস্তি। সে একা নয়। এই বাড়িতে — এই পৃথিবীতে — সে একমাত্র নোংরা মেয়ে নয়।

«আমি তোকে জোর করব না।» রনি বলেছিল। «কোনোদিন না। তুই যা চাইবি — শুধু সেটুকুই হবে। প্রমিস।»

আর এখন — এই অন্ধকার হলে — সিনথিয়া ভাবছে, সে কী চায়?

পর্দার আলোয় রনির মুখটা দেখা যাচ্ছে — আধো আলো, আধো ছায়া। পঁচিশ বছরের মুখ, কিন্তু চোখ দুটো আরো বয়স্ক। সে পর্দার দিকে তাকিয়ে নেই। সে তাকিয়ে আছে তার দিকে। অনেকক্ষণ ধরে।

সিনথিয়ার বুকের ভেতর ঢিপঢিপ শব্দটা এত জোরে — মনে হচ্ছে হলের স্পিকারের বেজের সাথে মিশে যাচ্ছে।

রনির আঙুল তার আঙুলে একটু চাপ দিল। সিনথিয়া তাকাল। রনি কিছু বলল না। শুধু — ধীরে — তার দিকে ঝুঁকল।

সিনথিয়ার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে এলো। সে জানে কী হতে যাচ্ছে। সে জানে — আর সে সরছে না।

রনির ঠোঁট তার ঠোঁটে ছুঁল।

প্রথমে — শুধু ছোঁয়া। নরম, হালকা, প্রশ্নের মতো। যেন জিজ্ঞেস করছে — যাব? সিনথিয়ার ঠোঁট কেঁপে উঠল। তার চোখ বন্ধ হয়ে গেল নিজে থেকেই। আর তারপর — সে নিজেও জানে না কীভাবে — তার ঠোঁট নড়ল। সাড়া দিল।

রনি একটু থামল। তারপর — গভীরে।

এটা আর ছোঁয়া নয়। এটা দাবি। রনির ঠোঁট তার ঠোঁটে চেপে বসল, জিভটা আস্তে করে তার ঠোঁটের ফাঁক খুঁজল। সিনথিয়া চমকে উঠল — এটা নতুন। তানভীরের কথায় সে কল্পনা করেছে বহুবার, কিন্তু সত্যিকারের — কারো জিভ তার মুখে — এই প্রথম। এক মুহূর্তের জন্য তার শরীর শক্ত হয়ে গেল। তারপর — গলে গেল।

সে চুষতে লাগল রনির নিচের ঠোঁট। অপটু, কিন্তু ক্ষুধার্ত। রনির একটা হাত উঠে এলো তার গালে — বুড়ো আঙুলটা তার চোয়ালে ঘষছে, ধীরে। অন্য হাতটা তখনো তার হাতে — আঙুলে আঙুল জড়ানো, শক্ত করে ধরা — যেন ছেড়ে দিলেই সে পালিয়ে যাবে।

পর্দায় তখন নায়ক-নায়িকা দৌড়াচ্ছে ফুলের বাগানে। কেউ দেখছে না। কেউ জানছে না — পেছনের অন্ধকারে একটা মেয়ে প্রথমবার চুমু খাচ্ছে, আর তার পুরো দুনিয়া বদলে যাচ্ছে।

চুমুটা ভাঙল যখন দুজনেরই দম ফুরিয়ে এলো। কপালে কপাল ঠেকে রইল কয়েক সেকেন্ড। অন্ধকারে দুজনের ভারী নিঃশ্বাস মিশে যাচ্ছে।

«ভয় পাচ্ছিস?» রনি ফিসফিস করল — ঠোঁট প্রায় তার ঠোঁটে।

সিনথিয়া মাথা নাড়ল — না। তারপর ফিসফিস করে বলল — «আরো।»

রনি হাসল — অন্ধকারে তার চোখ জ্বলজ্বল করছে। «যা বলবি।»

এবার সিনথিয়া নিজেই এগিয়ে গেল — আর অপেক্ষা করল না। তার ঠোঁট রনির ঠোঁটে চেপে বসল — জোরে, দাবি নিয়ে। রনি একটু চমকে উঠল — তারপর গোঙিয়ে উঠল তার মুখে — হাতটা তার ঘাড়ে রেখে টেনে নিল আরো কাছে। সিনথিয়া তার নিচের ঠোঁটটা দাঁত দিয়ে আলতো করে কামড়ে ধরল — রনির শরীর কেঁপে উঠল। তার জিভ রনির মুখে ঢুকে গেল — অপটু, কিন্তু বেপরোয়া। লবণাক্ত স্বাদ — পপকর্নের, ঘামের, আর কিছু — শুধু রনির। সিনথিয়ার মাথা ঘুরতে লাগল। এই স্বাদটা সে মনে রাখবে — সারাজীবন। প্রথম চুমুর স্বাদ।

আবার ঠোঁট। এবার আর প্রশ্ন নেই — শুধু উত্তর। সিনথিয়া এবার নিজেই এগিয়ে গেল — তার হাত উঠে এলো রনির চুলে, আঙুল ডুবে গেল ঘন চুলের ভেতর। রনি একটা চাপা শব্দ করল গলার ভেতর — আনন্দের, নাকি যন্ত্রণার — সিনথিয়া বুঝল না, বুঝতে চাইল না।

রনির হাতটা তার হাত ছেড়ে দিল। সিনথিয়ার বুকটা এক মুহূর্তের জন্য খালি হয়ে গেল — কিন্তু পরমুহূর্তেই সেই হাতটা এসে বসল তার কোমরে। কামিজের ওপরে। ভারী, গরম। সিনথিয়ার শরীরে একটা স্রোত বয়ে গেল — ঘাড় থেকে পা পর্যন্ত।

হাতটা নড়ছে। ধীরে। কোমর থেকে একটু ওপরে — পাঁজরের দিকে। কামিজের কাপড়ের ওপর দিয়ে আঙুলগুলো হাঁটছে — যেন পথ খুঁজছে। সিনথিয়ার নিঃশ্বাস ঘন হয়ে এলো। সে রনির ঠোঁটে ফিসফিস করল — «কী করছ...»

«যা তুই চাস।» রনির ঠোঁট তার ঠোঁট ছাড়ল না। «থামতে বললে থামব।»

সিনথিয়া থামতে বলল না।

হাতটা কামিজের নিচে ঢুকে গেল।

ঠান্ডা আঙুল — না, গরম। সিনথিয়ার খালি কোমরে যখন রনির আঙুল ছুঁল — সে চমকে উঠল, কেঁপে উঠল পুরো শরীর। তার ত্বক যেন জ্বলে উঠল সেই ছোঁয়ায়। রনির হাতটা থামল এক মুহূর্ত — অনুমতি চাইছে। সিনথিয়া তার বদলে রনির চুল আরো শক্ত করে ধরল। টানল — নিজের দিকে।

বুঝে নিল রনি। হাতটা ওপরে উঠতে লাগল — পাঁজর বেয়ে, ধীরে, প্রতিটা ইঞ্চি জয় করে। সিনথিয়ার বুক ওঠানামা করছে দ্রুত। তার ব্রা-এর নিচের প্রান্তে এসে আঙুল থামল। এক সেকেন্ড। দুই সেকেন্ড।

তারপর — ভেতরে।

সিনথিয়ার গলা থেকে একটা শব্দ বেরিয়ে এলো — চাপা, কাতর — রনির মুখে মিশে গেল। রনির হাত এখন তার স্তনে। ব্রা-এর ওপরে প্রথমে — চাপ দিল, আস্তে, মেপে। সিনথিয়ার পিঠ ধনুকের মতো বেঁকে গেল সিটে। তারপর আঙুলগুলো ব্রা-এর কাপড়ের নিচে ঢুকল — আর সরাসরি — তার খালি ত্বকে।

«আহ...» — শব্দটা বেরিয়ে গেল তার গলা থেকে। রনি দ্রুত তার মুখটা চেপে ধরল নিজের ঠোঁটে — শব্দটা গিলে নিল।

বুড়ো আঙুলটা ঘষছে। বৃত্তে। ধীরে। সিনথিয়ার স্তনের বোঁটাটা শক্ত হয়ে উঠেছে — রনি টের পেল, আরো জোরে ঘষল। সিনথিয়ার উরু দুটো নিজে থেকেই চেপে এলো একে অপরের সাথে। ভেতরে সেই চেনা দপদপানি — কিন্তু এবার শতগুণ তীব্র। কারণ এটা কল্পনা নয়। এটা সত্যি। একটা সত্যিকারের হাত। সত্যিকারের আঙুল।

«তোর...» রনি ফিসফিস করল তার গলায় — «তোর এগুলো... এত নরম...» — তার হাতটা এবার পুরো স্তনটা মুঠোয় নিল — চাপ দিল, ছাড়ল, আবার চাপ দিল — যেন মাপছে, যেন বিশ্বাস করতে পারছে না। সিনথিয়ার মাথা পেছনে হেলে গেল সিটে। তার গলা থেকে একটা দীর্ঘ, কাঁপা শ্বাস বেরিয়ে এলো। রনির ঠোঁট তার গলার সেই জায়গায় — যেখানে ধুকপুক করছে — চুমু খেল। তারপর জিভ বুলাল — লম্বা, ভেজা রেখা — গলা থেকে কানের দিকে। সিনথিয়ার আঙুল রনির শার্ট খামচে ধরল।

রনির ঠোঁট তার ঠোঁট ছেড়ে নেমে এলো — চোয়ালে, গলায়। গরম নিঃশ্বাস তার ঘাড়ে। তারপর জিভ — তার কানের লতিতে। সিনথিয়া শিউরে উঠল। «রনি...» — তার গলা ভেঙে যাচ্ছে।

«চুপ...» রনি ফিসফিস করল তার কানে — «কেউ শুনতে পাবে।» — আর তারপর দাঁত দিয়ে আলতো করে কামড়ে ধরল তার কানের লতি।

সিনথিয়ার হাত — যেটা রনির চুলে ছিল — নেমে এলো। রনির গালে। ঘাড়ে। তারপর — সাহস করে — বুকে। শার্টের ওপর দিয়ে তার বুকের ধুকপুকুনি টের পেল — দ্রুত, বেপরোয়া। তার মতোই। সেও ভয় পাচ্ছে। সেও কাঁপছে। এই ভাবনাটা সিনথিয়াকে সাহস দিল।

তার হাত আরো নিচে নামল। পেটে। শার্টের নিচে ঢুকতে চাইল — রনি নিজেই শার্টটা একটু তুলে দিল। খালি পেট। শক্ত। সিনথিয়ার আঙুল ঘুরল সেখানে — বৃত্তে, নাভির চারপাশে। রনির শরীর কেঁপে উঠল। সে সিনথিয়ার কানে ফিসফিস করল — «তুই... তুই আমাকে মেরে ফেলবি।»

সিনথিয়ার হাত থামল না। পেট থেকে আরো নিচে — বেল্টের কাছে। এক মুহূর্ত দ্বিধা। তারপর — আরো নিচে।

রনির উরু। শক্ত। তার হাতটা উরুর ওপর রাখল — চাপ দিল। রনির নিঃশ্বাস আটকে গেল তার ঘাড়ে। «সিনথিয়া...» — সতর্কবার্তার মতো শোনাল, কিন্তু তার হাত সিনথিয়ার স্তন থেকে সরল না। বরং আরো শক্ত করে চাপ দিল।

আর তখনই — সিনথিয়া টের পেল।

রনির প্যান্টের ভেতর — শক্ত, গরম, স্পষ্ট। তার হাতের ঠিক পাশে। সিনথিয়ার গাল জ্বলে উঠল — কিন্তু হাত সরাল না। বরং — সাহস করে, চোখ বন্ধ করে — হাতটা রাখল সেখানে। ওপরে। কাপড়ের ওপরে।

রনি গোঙিয়ে উঠল — চাপা, গভীর শব্দ — তার মুখ সিনথিয়ার ঘাড়ে গুঁজে। «ওহ...»

সিনথিয়া চাপ দিল। আলতো। পরীক্ষামূলক। রনির পুরো শরীর কেঁপে উঠল। তার হাত সিনথিয়ার স্তনে আরো বেপরোয়া হলো — বোঁটাটা আঙুলের মাঝে নিয়ে আলতো করে টানল, মোচড়াল। সিনথিয়া চিৎকার করতে গেল — রনি দ্রুত তার ঠোঁট চেপে ধরল নিজের ঠোঁটে।

দুজনে এখন একে অপরের মুখে নিঃশ্বাস ফেলছে — দ্রুত, গরম, এলোমেলো। সিনথিয়ার হাত রনির প্যান্টের ওপরে ঘষছে — ছন্দে। রনি তার কোমরটা এগিয়ে দিল — চাপ দিল তার হাতে। সিনথিয়া বুঝল — সে আরো চায়।

«তুমি...» সিনথিয়া ফিসফিস করল — «তুমি এত...»

«তোর জন্য।» রনি হাসল — কষ্টের হাসি। «কাল রাত থেকে। দরজার ফাঁকে তোকে দেখার পর থেকে।»

এই কথায় সিনথিয়ার ভেতরে কিছু একটা ফেটে পড়ল — লজ্জা আর উত্তেজনা একসাথে। সে রনির প্যান্টে আরো জোরে চাপ দিল। রনি তার কাঁধে মুখ গুঁজে গোঙাল।

আর তখন — রনির অন্য হাতটা — যেটা তার কোমরে ছিল — নেমে এলো। উরুতে। সিনথিয়ার উরুতে — কামিজের ওপরে। চাপ দিল। সিনথিয়ার উরু দুটো — যেগুলো চেপে ছিল — একটু আলগা হলো। নিজে থেকেই।

হাতটা ভেতরে ঢুকল — উরুর মাঝখানে। কামিজের ফাঁক দিয়ে। সালোয়ারের ওপরে। চাপ দিল — ঠিক সেখানে — যেখানে দপদপ করছে।

সিনথিয়ার পিঠ বেঁকে গেল। «আহ... রনি...»

«চুপ।» রনি তার ঠোঁটে আঙুল রাখল — নিজের আঙুল। সিনথিয়া সেই আঙুলটা চুষে নিল — নিজে থেকেই, না ভেবেই। রনির চোখ বড় হয়ে গেল অন্ধকারে। «তুই...»

হাতটা নড়ছে। সালোয়ারের ওপর দিয়ে — চাপ, বৃত্ত, চাপ। সিনথিয়ার কোমর নড়তে শুরু করল সিটে — নিজে থেকেই — হাতটার দিকে ঠেলে দিচ্ছে নিজেকে। লজ্জা কোথায় গেল — সে জানে না। শুধু জানে — আরো চায়। আরো।

«থামো না।» সে ফিসফিস করল — ভাঙা গলায়। «প্লিজ... থামো না।»

রনির আঙুল সালোয়ারের দড়ির কাছে গেল। একটু টানল — আলগা করল। তারপর হাতটা ঢুকে গেল ভেতরে। প্যান্টির ওপরে।

ভেজা। সিনথিয়া টের পেল — রনিও টের পেল। প্যান্টিটা ভিজে চপচপ করছে। রনি তার কানে ফিসফিস করল — «তুই তো... পুরো ভিজে গেছিস।» — গলায় বিস্ময়, আনন্দ, ক্ষুধা — সব একসাথে।

সিনথিয়া তার মুখ লুকাল রনির কাঁধে। «চুপ কর...» — কিন্তু তার কোমর থামল না — নড়ছেই।

আঙুলটা প্যান্টির ভেতরে ঢুকল।

সরাসরি। খালি ত্বকে। ভেজা, গরম। সিনথিয়ার পুরো শরীরে বিদ্যুৎ খেলে গেল। তার হাত — যেটা রনির প্যান্টে ছিল — শক্ত করে চেপে ধরল। নখ বসে গেল কাপড়ে।

আঙুলটা ঘষছে। বৃত্তে। ধীরে — তারপর দ্রুত। সিনথিয়ার উরু কাঁপছে। তার পা দুটো সিটে ছড়িয়ে যাচ্ছে নিজে থেকেই — আরো জায়গা করে দিচ্ছে। লজ্জা — কোথায় লজ্জা? এই অন্ধকারে লজ্জার কোনো জায়গা নেই।

«আমার দিকে তাকাও।» রনি ফিসফিস করল।

সিনথিয়া তাকাল — অন্ধকারে তার চোখে চোখ। পর্দার আলোয় রনির মুখ — ঘামে ভেজা, ঠোঁট ফুলে আছে, চোখে আগুন।

আঙুলটা আরো ভেতরে গেল। একটা আঙুল — ঢুকল। সিনথিয়ার দম আটকে গেল। ব্যথা — একটু। তারপর — আনন্দ — ঢেউয়ের মতো। আঙুলটা নড়ছে — ভেতরে, বাইরে, ধীরে। অন্য আঙুলটা বাইরে ঘষছে — বৃত্তে। দুটো একসাথে।

এটা তার নিজের আঙুলের মতো নয়। নিজের আঙুলে সে নিয়ন্ত্রণে থাকে — জানে কোথায়, কতটা, কখন থামতে হবে। এটা — অন্য কারো। অচেনা ছন্দ। অচেনা চাপ। আর সেই অচেনাটাই পাগল করে দিচ্ছে। সিনথিয়ার মনে হলো সে ডুবছে — গভীর পানিতে — আর ডুবতে ডুবতে চাইছে আরো গভীরে। তার উরুর পেশি কাঁপছে। পেটের ভেতর মোচড় দিচ্ছে। প্রতিটা ঢেউ আগেরটার চেয়ে বড়, আগেরটার চেয়ে কাছে।

সিনথিয়া নিজের হাতটা নিজের মুখে চেপে ধরল — চিৎকার আটকাতে। তার কোমর উঠছে-নামছে — রনির হাতের ছন্দে। সিটটা ক্যাঁচক্যাঁচ করছে — সে ভয় পেল — কেউ শুনতে পাবে? কিন্তু থামতে পারল না। থামতে চাইল না।

«আসছে...» সে ফিসফিস করল — নিজেও জানে না কী বলছে — «আমার... আসছে...»

«আসতে দে।» রনির গলা গভীর, ভারী। «আমার হাতে... আসতে দে।»

ঢেউটা এলো।

প্রথমে পায়ের আঙুল থেকে — স্রোতটা ওপরে উঠল — উরু বেয়ে — পেটে — বুকে — মাথায় বিস্ফোরণ। সিনথিয়ার পুরো শরীর কেঁপে উঠল — বারবার — ঢেউয়ের পর ঢেউ। সে রনির কাঁধে মুখ গুঁজে কামড়ে ধরল — শার্টের ওপর দিয়েই — চিৎকারটা আটকাতে। তার নখ রনির পিঠে বসে গেল শার্টের ওপর দিয়ে।

রনির আঙুল থামল না — ধীরে হলো — তাকে পার করে দিল — যতক্ষণ না তার শরীর নরম হয়ে এলো — গলে গেল সিটে।

কয়েক সেকেন্ড — বা কয়েক মিনিট — কেউ নড়ল না।

শুধু দুজনের নিঃশ্বাস। ভারী। এলোমেলো। ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হচ্ছে। রনির হাতটা এখনো সেখানে — ভেতরে — কিন্তু নড়ছে না। শুধু ধরে আছে। যেন ছেড়ে দিলেই এই মুহূর্তটা ভেঙে যাবে।

সিনথিয়ার কপাল রনির কপালে ঠেকে আছে। তার চোখ বন্ধ। তার ঠোঁট কাঁপছে।

«এটা...» তার গলা ভাঙা, ফিসফিসে — «এটা... কী হলো?»

রনি হাসল — নরম, ক্লান্ত হাসি। তার আঙুলটা আস্তে করে বের করে আনল — সিনথিয়া শিউরে উঠল। হাতটা বের করে তার নিজের উরুতে রাখল রনি — ভেজা আঙুল। সিনথিয়া দেখল — অন্ধকারেও দেখল। তার গাল জ্বলে উঠল।

«যা হওয়ার ছিল।» রনি বলল — তার কপালে একটা চুমু খেল। «কাল রাত থেকে যা হওয়ার ছিল।»

সিনথিয়া কিছু বলল না। কী বলবে? তার শরীর এখনো কাঁপছে — ছোট ছোট ঢেউ এখনো বয়ে যাচ্ছে। তার মাথা কাজ করছে না। শুধু একটা অনুভূতি — ভাসছে। হালকা। যেন ওজনহীন।

তখনই — ব্যাগে — ফোনটা বাজল। ভাইব্রেশন।

সিনথিয়া চমকে উঠল। রনি তাকাল। সিনথিয়া ব্যাগ থেকে ফোনটা বের করল — স্ক্রিনের আলোয় দুজনের মুখ ঝলসে উঠল অন্ধকারে।

তানভীর।

«কই তুই?» — «মেসেজ দেখছিস না কেন?» — «মিস করছি।» — «মিম?»

চারটে মেসেজ। একটার পর একটা। শেষটা মাত্র দুই মিনিট আগে। সিনথিয়ার বুকের ভেতর মোচড় দিল। তানভীর — কাল রাতের তানভীর — যে তার জন্য অপেক্ষা করছে, যে লিখেছিল «আজ রাতেও আমি আছি» — আর সে এখানে — অন্ধকার হলে — আরেকটা ছেলের আঙুলে ভিজে —

তার বুড়ো আঙুল মেসেজের ওপরে ঘুরল। টাইপ করতে গেল — «আছি...» — তারপর থামল। কী লিখবে? «শপিংয়ে আছি» — সত্যি। «রনির সাথে সিনেমায়» — সত্যি। «ও আমাকে ছুঁয়েছে» — সত্যি। কোন সত্যিটা লিখবে? কোনটা লিখলে তানভীর ভাঙবে না? কোনটা লিখলে সে নিজে ভাঙবে না?

অপরাধবোধটা এলো ঢেউয়ের মতো। তারপর — তার ঠিক পেছনে — আরেকটা ঢেউ। উত্তেজনার। নিষিদ্ধের। দুটো একসাথে — মিশে — এক অদ্ভুত, মাতাল অনুভূতি। যেন সে দুটো মেয়ে একসাথে — একটা কাঁদছে, একটা হাসছে।

সে ফোনটা সাইলেন্ট করে ব্যাগে ঢুকিয়ে দিল। উত্তর দিল না। আজ রাতে — হয়তো। এখন না। এখন এই অন্ধকারটা শুধু তার — আর রনির।

রনি দেখছিল। «কে?»

«...কেউ না।» সিনথিয়া মিথ্যে বলল — প্রথমবার রনিকে। তার গলা কেঁপে গেল।

রনি কিছু বলল না। শুধু তার হাতটা ধরল — ভেজা হাতটা — আর নিজের ঠোঁটে ছোঁয়াল। সিনথিয়ার শ্বাস আটকে গেল। «রনি...»

«তোর স্বাদ।» রনি ফিসফিস করল — চোখে দুষ্টুমি। «মিষ্টি।»

সিনথিয়া তার বুকে ঘুষি মারল — আলতো। «অসভ্য!» — কিন্তু হাসছে। হাসতে হাসতে তার চোখে পানি চলে এলো — কেন — সে জানে না।

তারা বসল — জামাকাপড় ঠিক করল অন্ধকারে। সিনথিয়া সালোয়ারের দড়ি বাঁধল — হাত কাঁপছে। কামিজটা টেনে ঠিক করল। ব্রা-এর স্ট্র্যাপ — সরে গেছিল — ঠিক করল। চুলে আঙুল চালাল। রনি শার্টটা গুঁজল — তার কাঁধে সিনথিয়ার দাঁতের দাগ — শার্টের ওপর দিয়ে দেখা যাচ্ছে না, কিন্তু দুজনেই জানে — আছে।

পর্দায় তখন শেষ দৃশ্য। নায়ক-নায়িকা আলিঙ্গনে। গান বাজছে — জোরে। হলের আলো জ্বলে উঠল।

সিনথিয়া চোখ কুঁচকে ফেলল — আলোয় চোখ ধাঁধিয়ে গেল। আয়নায় — না, আয়না নেই — কিন্তু সে জানে — তার ঠোঁট ফুলে আছে, গাল লাল, চুল এলোমেলো। রনির অবস্থাও তথৈবচ — শার্ট কুঁচকে আছে, চুলে তার আঙুলের ছাপ।

তারা বেরিয়ে এলো — ভিড়ের সাথে মিশে — কেউ কিছু টের পেল না। কেউ জানল না — শেষ সারির কর্নারে কী হয়েছে।

বাইরে — রোদ। ঝকঝকে দুপুর। সিনথিয়ার চোখে রোদ লাগল — মনে হলো অন্য গ্রহে এসেছে। এক ঘণ্টা আগে সে একটা মেয়ে ছিল। এখন — অন্য কেউ।

রিকশার জন্য দাঁড়াল তারা। রনি তার পাশে — একটু দূরে — ভদ্র দূরত্ব। যেন কিছুই হয়নি।

রিকশা এলো। ওঠার আগে — রনি ঝুঁকল — খুব কাছে — শুধু তার কানে যেন শোনা যায় — ফিসফিস করে বলল —

«আজ রাতে... সবাই ঘুমিয়ে গেলে... আমার ঘরে আসবে?»

সিনথিয়ার হৃৎপিণ্ড থেমে গেল। এক সেকেন্ড। তারপর — ধড়াস ধড়াস — পাগলের মতো।

সে উত্তর দিল না। রিকশায় উঠে বসল। রনি উঠল পাশে। রিকশা চলতে শুরু করল।

সিনথিয়া সামনের দিকে তাকিয়ে রইল — রাস্তা, মানুষ, দোকান — কিন্তু কিছুই দেখছে না। তার কানে বাজছে শুধু একটা বাক্য — «আমার ঘরে আসবে?» — আর তার বুকের ভেতর — হাতুড়ির বাড়ি।

রনি তার দিকে তাকিয়ে আছে। অপেক্ষা করছে। উত্তরের।

সিনথিয়া তাকাল না। তাকাতে পারল না।

(চলবে...)
Like Reply
#14
ভেজা সন্ধ্যা

সন্ধ্যা সাতটা।

দরজায় ছিটকিনির শব্দ হলো — রনি বেরিয়ে গেল। যাওয়ার আগে ড্রয়িং রুমের দিকে একবার তাকিয়ে বলল, «বন্ধুর বাসায় যাচ্ছি, রাতে খাব না।»

আপু রান্নাঘর থেকে গলা বাড়িয়ে বললেন, «বেশি রাত করিস না।»

«আচ্ছা।»

দরজা বন্ধ হলো।

যাওয়ার আগে রনি একবার তাকিয়েছিল তার দিকে — গেস্ট রুমের দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা তার দিকে। সেই দৃষ্টি — দুপুরের সিনেমা হলের অন্ধকার মনে করিয়ে দিল। ঠোঁটের কোণে একটা চাপা হাসি, চোখে একটা প্রশ্ন — «মনে আছে?» সিনথিয়া চোখ নামিয়ে নিয়েছিল। দরজা বন্ধ হওয়ার পরেও সেই দৃষ্টি গায়ে লেগে রইল — গরম হয়ে।

ছিটকিনির ধাতব শব্দটা ফ্ল্যাটের ভেতর এক মুহূর্ত ঝুলে রইল — তারপর মিলিয়ে গেল রান্নাঘরের কড়াইয়ের ছ্যাঁক ছ্যাঁক শব্দে, আপুর গুনগুনে, আর ড্রয়িং রুম থেকে ভেসে আসা টিভির গমগমে আওয়াজে।

সিনথিয়া গেস্ট রুমের দরজায় দাঁড়িয়ে শুনল। ফ্ল্যাটটা হঠাৎ যেন ছোট হয়ে এসেছে — দেয়ালগুলো কাছে সরে এসেছে। এখন এই বাসায় মাত্র তিনজন — রান্নাঘরে আপু, ড্রয়িং রুমে দুলাভাই, আর সে।

সে বিছানায় বসে ফোনটা হাতে নিল। স্ক্রিনে তানভীরের চারটা মেসেজ জ্বলজ্বল করছে — «কই তুই?» «মেসেজ দেখছিস না কেন?» «মিস করছি।» «মিম?» — দুপুরে সিনেমা হলের অন্ধকারে বসে সে একটাও খোলেনি। এখনো খুলল না। আঙুলটা স্ক্রিনের ওপর ঝুলে রইল — তারপর সরে গেল।

বুকের ভেতর মোচড় দিল। অপরাধবোধ — চাপা, কাঁটার মতো। তানভীর — যে গতরাতে তাকে «থাম।» বলে কাঁদিয়েছিল, যে আজ সকালে লিখেছিল «তুই কার?» — সে এখন অপেক্ষা করছে। আর সে — সে আজ দুপুরে আরেকটা পুরুষের ঠোঁটে ঠোঁট রেখেছিল।

রনির মুখ মনে পড়ল — অন্ধকার হলে তার ভারী নিঃশ্বাস কানের কাছে, তার হাত তার কুর্তির নিচে উঠে আসা, তার আঙুলের সেই অচেনা ছন্দ — যা তার নিজের আঙুল কখনো শেখাতে পারেনি। তার দাঁত তার কাঁধে বসে যাওয়া — চাপা চিৎকারটা গিলে ফেলা। সিনথিয়ার গাল গরম হয়ে উঠল। উরুর মাঝখানে সেই চিনচিনে অনুভূতিটা ফিরে এলো — দুপুরের স্মৃতি শরীরে এখনো তাজা, যেন কয়েক ঘণ্টা আগের ঘটনা নয়, কয়েক মিনিট আগের। সে পা দুটো চেপে ধরল, বালিশটা বুকে চেপে ধরল।

আর তানভীর? তানভীর তো কিছু জানে না। তানভীর ভাবে — মিম তার, শুধু তার। «তুই কার?» — «তোর। শুধু তোর।» — গতরাতে লিখেছিল সে। আর আজ দুপুরে সে আরেকজনের হাতে কেঁপেছে, আরেকজনের ঠোঁটে গলেছে। বুকের ভেতর মোচড়টা আরো গভীর হলো। কিন্তু অদ্ভুত — অপরাধবোধের পাশাপাশি একটা উত্তেজনাও, চাপা, নিষিদ্ধ। দুটো পুরুষ। দুটো দুনিয়া। একটা ফোনের স্ক্রিনে — দূরে, নিরাপদ। একটা... বাস্তবে — কাছে, বিপজ্জনক। সে কোনটা? নাকি দুটোই? এই প্রশ্নের উত্তর তার কাছে নেই — শুধু শরীরে একটা অস্থিরতা, যেন ভেতরে কিছু ফুটছে।

না। এখন তানভীর না। এখন রনিও না।

ফোনটা উল্টে রাখল বালিশের পাশে। কিন্তু বিছানায় বসে থাকা গেল না — শরীরে অস্থিরতা, যেন ভেতরে কিছু একটা ফুটছে। সে উঠল। আয়নার সামনে দাঁড়াল এক মুহূর্ত — মেরুন কুর্তিটা গায়ে, রনি আজই কিনে দিয়েছে। আয়নায় নিজেকে দেখল — গাল লাল, চোখ চকচক করছে। «ছি,» — ফিসফিস করে নিজেকেই বলল।

ড্রয়িং রুম থেকে টিভির শব্দ ভেসে আসছে। দুলাভাই সিনেমা দেখছেন।

সে পা টিপে টিপে ড্রয়িং রুমের দিকে গেল। কেন — নিজেও জানত না। হয়তো একা ঘরে বসে থাকলে ভাবনাগুলো আরো গভীরে টানবে। হয়তো... অন্য কিছু।

দুলাভাই সোফায় হেলান দিয়ে বসে — একটা পা টেবিলে তোলা, হাতে পানির গ্লাস। টিভিতে কোনো অ্যাকশন সিনেমা — গোলাগুলি, ধাওয়া, চিৎকার। তাকে দেখে মুখে হাসি ফুটল, «আরে শালী! আয়, বোস। সিনেমাটা জমে উঠেছে।»

সিনথিয়া এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে রইল দরজায়। তারপর এগিয়ে গেল — সোফার অন্য প্রান্তে নয়, মাঝখানে, তার থেকে এক হাত দূরে — বসল। কুর্তিটা টেনে হাঁটু ঢাকল।

দুলাভাই চোখ টিপলেন, «এত দূরে বসলে সিনেমার ডায়ালগ শোনা যাবে?»

«শোনা যাচ্ছে তো।» — সে হাসল। কিন্তু বুকের ভেতর ঢিপঢিপ করছে — কেন, বুঝতে পারছে না। নাকি বুঝতে চাইছে না।

দুলাভাই সিনেমার ডায়ালগের সাথে সাথে মন্তব্য করছিলেন — «এই ভিলেনটা বোকা, এভাবে কেউ গুলি চালায়?», «নায়িকা হিল পরে দৌড়াচ্ছে — হাস্যকর!» সিনথিয়া হাসছিল — কিন্তু হাসির আড়ালে তার সমস্ত স্নায়ু পাশের মানুষটার দিকে। তার গায়ের গন্ধ — সাবান আর হালকা ঘামের মিশ্রণ। সোফার হাতলে রাখা তার হাতের লোম। প্রতিটা নড়াচড়া সে টের পাচ্ছে — যেন শরীরে রাডার বসে গেছে। একবার তার কনুই তার বাহু ছুঁয়ে গেল — বিদ্যুৎ খেলে গেল শিরদাঁড়া বেয়ে। তিনি টের পেলেন কিনা — বোঝা গেল না।

সিনেমা চলছিল। পর্দায় গাড়ি উড়ছে, বোমা ফাটছে। কিন্তু সিনথিয়ার চোখ স্ক্রিনে আটকাচ্ছে না — বারবার আড়চোখে যাচ্ছে পাশের মানুষটার দিকে। এই মানুষটা। দুই রাত আগে দরজার ফাঁক দিয়ে যাকে দেখেছিল — সেই গলা, «বল, তুই কী?», সেই হাত আপুর চুলে, সেই... কপালের চুমু, ফিসফিস — «ভালোবাসি তোকে।» — সব মনে আছে। প্রতিটা শব্দ, প্রতিটা দৃশ্য — চোখ বন্ধ করলেই ভাসে।

দিনের বেলার এই হাসিখুশি মানুষটা আর রাতের ওই মানুষটা — একই শরীরে দুটো মানুষ। আর সে — এই সত্যিটা স্বীকার করতে তার গলা শুকিয়ে এলো — সে দুটোকেই দেখতে চায়। কাছ থেকে।

«কী ভাবছিস?» — দুলাভাইয়ের গলা হঠাৎ।

«কিছু না।» — তাড়াতাড়ি স্ক্রিনের দিকে তাকাল।

«মিথ্যে বলছিস।» — তিনি হাসলেন। «মেয়েদের মুখ দেখলেই বোঝা যায় — ভেতরে কিছু চলছে।»

«আপনি তো মনোবিজ্ঞানী হয়ে গেলেন!»

«দুলাভাই সব জানে।» — তিনি পানির গ্লাসে চুমুক দিলেন। «বল তো — কলেজ কেমন চলছে?»

«ভালো।»

«পড়াশোনা?»

«ভালো।»

«আর...» — তিনি একটু ঝুঁকলেন তার দিকে, গলা নামিয়ে — «বয়ফ্রেন্ড আছে?»

সিনথিয়ার গাল জ্বলে উঠল। «দুলাভাই!»

«কী? জানতে চাওয়া অপরাধ নাকি?» — তার চোখে দুষ্টুমির ঝিলিক। «এই বয়সে তো থাকারই কথা। তোর আপুরও ছিল — আমি। তোর আপুকে পটাতে আমার তিন বছর লেগেছিল, জানিস?»

অজান্তেই সিনথিয়া হেসে ফেলল। «আপু পটেছিল?»

«পটবে না মানে? এই হাসি দেখে কে না পটবে!» — তিনি নিজের দিকে ইশারা করলেন। «তবে তোর আপু তোর মতো লাজুক ছিল না। ও ছিল ডেঞ্জারাস।»

«কীভাবে পটালেন?» — সিনথিয়া জিজ্ঞেস করল — কৌতূহলে, ভুলে গিয়ে লজ্জা।

«প্রথমে বন্ধু হলাম। তারপর রোজ কলেজের গেটে দাঁড়িয়ে থাকতাম — একবার বৃষ্টিতে ভিজে কাকভেজা। তোর আপু ছাতা নিয়ে এলো — নিজে ভিজে আমাকে ছাতা দিল।» — দুলাভাইয়ের চোখে দূরের আলো, ঠোঁটে নরম হাসি। «সেদিনই বুঝেছিলাম — এই মেয়েকে ছাড়া আমার চলবে না।»

সিনথিয়ার বুকটা কেমন করে উঠল। ভালোবাসার গল্প — আর দুই রাত আগে দরজার ফাঁকে দেখা সেই দৃশ্য — একই মানুষ, একই ভালোবাসা — শুধু রূপ আলাদা। দিনে ছাতা, রাতে... তার ভাবনা থেমে গেল — গাল গরম।

«আপু? ডেঞ্জারাস?» — সিনথিয়ার গলা কেঁপে গেল। ডেঞ্জারাস — দরজার ফাঁকে দেখা আপু — «আমাকে ছিঁড়ে ফেলো!» — হ্যাঁ, ডেঞ্জারাসই তো।

«তুই জানিস না তোর আপুকে।» — দুলাভাই চোখ টিপলেন। তিনি হাসতে হাসতে হাতটা তুললেন সোফার পিঠে — তার কাঁধের ঠিক পেছনে। হাতটা তাকে ছোঁয়নি — কিন্তু ছোঁয়ার দূরত্বে। সিনথিয়া কাঁধের পেছনে তার হাতের উষ্ণতা টের পাচ্ছে — না ছুঁয়েও ছোঁয়া। সে সোজা হয়ে বসল, কিন্তু পিছিয়ে গেল না। কেন পিছিয়ে যাবে? দুলাভাই তো... শুধু দুলাভাই।

«আচ্ছা, বয়ফ্রেন্ড বাদ দে। অন্য প্রশ্ন।» — তিনি সোফায় আরেকটু ঘনিয়ে বসলেন। তাদের উরুর মাঝে এখন এক বিঘতও ফাঁক নেই — প্রায় ছুঁয়ে যাচ্ছে। «কিস করেছিস কখনো?»

«দুলাভাই!!» — সিনথিয়া প্রায় লাফিয়ে উঠল। কান পর্যন্ত লাল হয়ে গেছে।

«আহা, লজ্জা পাওয়ার কী আছে!» — তিনি হাসলেন — সেই চিরচেনা, সহজ হাসি। কিন্তু আজ সেই হাসির নিচে কিছু একটা আছে — যা সিনথিয়া চিনতে পারছে, কারণ দুই রাত আগে সে দেখেছে এই মানুষটার অন্য মুখ। «আমি তোর দুলাভাই — ডাক্তারের মতো। ডাক্তারের কাছে লজ্জা কীসের?»

সে মুখ ফিরিয়ে নিল স্ক্রিনের দিকে। কিন্তু সরল না — এক ইঞ্চিও না। উরুর পাশে তার উরুর উষ্ণতা — কুর্তির পাতলা কাপড়ের ওপর দিয়ে টের পাচ্ছে। বুকের ভেতর কিছু একটা দপদপ করছে — জোরে, অসহ্য।

«বল না।» — তার গলা নরম হয়ে এলো, কিন্তু চোখে সেই দুষ্টুমি জ্বলজ্বল করছে। «করেছিস? একবারও?»

সিনথিয়া ঠোঁট কামড়াল। মাথা নাড়ল — না।

মিথ্যে। আজ দুপুরে — রনির ঠোঁট তার ঠোঁটে, তার জিভ... কিন্তু সেটা তো দুলাভাই জানেন না। জানতে পারবেন না।

«সত্যি?» — দুলাভাইয়ের ভ্রু উঠে গেল। «এই যুগের মেয়ে... কলেজে পড়ে... একটা কিসও হয়নি?»

«আমি... আমি ওসবে নেই।» — গলা কাঁপছিল।

«হুম।» — তিনি তাকে দেখলেন — উপর থেকে নিচ, ধীরে। সেই দৃষ্টি — সিনথিয়ার গায়ে কাঁটা দিল। «তাহলে তো তুই...» — তিনি ঝুঁকলেন আরো কাছে, ফিসফিস করে — «ভার্জিন, তাই না? কেউ তোর ভোদায় আঙুলও দেয়নি?»

সিনথিয়ার শ্বাস আটকে গেল। «দুলাভাই, আপনি... আপনি এসব কী জিজ্ঞেস করছেন!»

«আরে, মজা করছি!» — তিনি হেসে উঠলেন। কিন্তু হাসিটা থামার পর তার চোখ রয়ে গেল তার মুখে — ঠোঁটে, তারপর গলায়, তারপর আরো নিচে — মেরুন কুর্তির গলার কাছে, যেখানে ঘাম জমেছে। «তুই তো আমার ছোট বোনের মতো। বোনকে জিজ্ঞেস করা যায় না?» — চোখ আরো নিচে নামল — মেরুন কুর্তির বুকের ওপর। «তবে... দুধগুলো তো বেশ বড় হয়ে গেছে, শালী।»

ছোট বোন। শব্দটা কানে বিঁধল — কিন্তু শরীরে অন্য কিছু ঘটছিল। বিশ্বাসঘাতক শরীর — উরুর মাঝখানে চিনচিনে অনুভূতি, বুক ভারী। সে পা দুটো আরো চেপে ধরল।

ঘরে নীরবতা নামল — টিভির গোলাগুলির শব্দের নিচে চাপা, ভারী। সে চোখ তুলল — দুলাভাই তাকিয়ে আছেন। চোখে চোখ পড়ল। কেউ চোখ সরাল না — এক সেকেন্ড, দুই সেকেন্ড — যেন দুজনেই পরীক্ষা করছে, কে আগে হার মানবে। হার মানল সিনথিয়া — চোখ নামিয়ে নিল। কিন্তু বুকের ভেতর — জয়ীর ঢাক বাজছে।

ঠিক তখনই — দুলাভাইয়ের হাত। সোফার হাতলে রাখতে গিয়ে — নাকি ইচ্ছে করেই — তার উরুর ওপর পড়ল। কুর্তির কাপড়ের ওপর। ভারী, উষ্ণ।

এক সেকেন্ড। দুই সেকেন্ড। তিন সেকেন্ড।

সরল না।

সিনথিয়ার দম বন্ধ হয়ে এলো। হাতটা জ্বলছে — কাপড়ের ওপর দিয়ে তার ত্বকে আগুন ধরিয়ে দিচ্ছে। সে তাকাল তার দিকে। দুলাভাই স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে — মুখে নিরীহ ভাব, যেন হাতটা ওখানে ভুলে রয়ে গেছে, যেন তিনি টেরই পাননি। কিন্তু তার ঠোঁটের কোণে — একটা চাপা, জয়ী হাসি।

তিনি জানেন। তিনি ঠিক জানেন হাতটা কোথায়।

সে সরাল না। সিনথিয়াও «সরান» বলল না। গলা দিয়ে শব্দ বেরোল না — যেন কেউ গলায় হাত চেপে ধরেছে। শুধু বসে রইল — পাথর হয়ে — আর ভেতরে ভেতরে পুড়তে লাগল।

এটা ঠিক না। সে জানে এটা ঠিক না। আপু পাশের ঘরে — কড়াই নাড়ছেন, গুনগুন করছেন — আর এখানে তার স্বামীর হাত তার উরুতে। কিন্তু জানা আর মানা এক নয়। হাতটা ভারী হয়ে আছে — প্রতিটা সেকেন্ডে ভারী হচ্ছে, যেন ওজন বাড়ছে। শরীরের প্রতিটা কোষ চিৎকার করছে — সরে যাও, উঠে যাও, চলে যাও। কিন্তু পা নড়ছে না। কারণ গভীরে, সত্যি গভীরে — সে চায় হাতটা থাকুক। চায় আরো কাছে আসুক। আর এই চাওয়াটাই তাকে সবচেয়ে বেশি ভয় পাইয়ে দিল — নিজের এই চাওয়া।

রান্নাঘর থেকে আপুর গলা ভেসে এলো — «চা খাবে তোমরা?»

দুজনেই চমকে উঠল। দুলাভাইয়ের হাত সরে গেল — স্বাভাবিকভাবে, অবলীলায়, যেন কিছুই হয়নি। «খাব!» — তিনি গলা চড়িয়ে বললেন। তারপর সিনথিয়ার দিকে তাকিয়ে চোখ টিপলেন — «বাঁচা গেল, তাই না?»

সিনথিয়া হাসার চেষ্টা করল — হাসি এলো না। বুকের ভেতর এখনো ঝড় বইছে। আপু রান্নাঘরে ফিরে গেলেন — কড়াইয়ের শব্দ আবার শুরু হলো। কিন্তু সোফায় বসা দুজনের মাঝে বাতাস ভারী হয়ে রইল — যেন কিছু একটা বলা হয়নি, যেন কিছু একটা বাকি রয়ে গেছে।

সিনথিয়ার বুক ধড়াস ধড়াস করছিল। ধরা পড়ার ভয় — এক সেকেন্ডের জন্য আপু যদি বেরিয়ে আসতেন... আর সেই ভয়ের নিচে — একটা অদ্ভুত, নিষিদ্ধ উত্তেজনা। আপু পাশের ঘরে কড়াই নাড়ছেন — আর এখানে, সোফায়...

«তুই ঘামছিস।» — দুলাভাই বললেন, তার কপালের দিকে তাকিয়ে।

«গরম লাগছে।» — গলা শুকনো।

«ফ্যান বাড়িয়ে দিই?» — তিনি উঠতে গেলেন — হাত বাড়ালেন টেবিলের দিকে — আর ঠিক তখনই —

হাতের গ্লাসটা কাত হলো।

পরে সিনথিয়া বহুবার ভেবেছে — এটা কি দুর্ঘটনা ছিল? সত্যিই হাত ফসকেছিল? নাকি... গ্লাসটা কাত হলো, পানি ছলকে উঠল — একটা ঢেউ — সোজা তার গায়ে। ঠান্ডা পানি ছড়িয়ে গেল মেরুন কুর্তির বুকে, গলার নিচে, দুই কাঁধের মাঝখানে। কাপড় ভিজে মুহূর্তে শরীরে লেপ্টে গেল — আঠার মতো।

«ওহ শিট! সরি সরি!» — দুলাভাই লাফিয়ে উঠলেন। হাত বাড়ালেন — যেন মুছে দেবেন — তারপর থেমে গেলেন মাঝপথে। কারণ ভেজা কুর্তির নিচে এখন সব স্পষ্ট — ব্রার আকৃতি, ভেজা কাপড়ে লেপ্টে থাকা বুকের ওঠানামা।

তার চোখ সেখানে আটকে গেল। এক সেকেন্ড — যেটা এক ঘণ্টা মনে হলো সিনথিয়ার। চোখ সরছে না। গিলছে দৃষ্টি দিয়ে।

সিনথিয়া দুই হাতে বুক ঢাকল। গাল পুড়ে যাচ্ছে — লজ্জায়, আর... অন্য কিছুতে। কারণ সেই দৃষ্টিতে লজ্জা ছিল না — ছিল ক্ষুধা। সে চিনতে পারল সেই ক্ষুধা। দরজার ফাঁকে দেখেছিল — এই একই চোখ।

«আমি... আমি বদলে আসছি।» — গলা কাঁপছে।

«হ্যাঁ হ্যাঁ, যা।» — দুলাভাইয়ের গলা অদ্ভুত শোনাল — ভারী, ঘন। «সরি, শালী। হাত ফসকে গেল... তবে ভিজে তোকে... খারাপ লাগছে না দেখতে।»

কিন্তু তার চোখ বলছিল — হাত ফসকায়নি। অন্তত পুরোটা না।

রান্নাঘর থেকে আপুর গলা — «কী হলো? চিৎকার কীসের?»

«কিছু না!» — দুলাভাই তাড়াতাড়ি বললেন, গলা স্বাভাবিক করার চেষ্টা করে। «পানি পড়ে গেছে গ্লাস থেকে। শালীর কুর্তি ভিজে গেছে — বদলাতে গেছে।»

«সাবধানে ধরতে পারো না একটা গ্লাস?» — আপুর ধমক ভেসে এলো, কিন্তু তাতে স্নেহ। «সিনথিয়া, আমার আলমারি থেকে কিছু নিয়ে পর — তোর মাপের সালোয়ার-কামিজ আছে।»

একটু পরে আপু চা নিয়ে এলেন ড্রয়িং রুমে — দুই কাপ। সিনথিয়া তখন গেস্ট রুমে। দুলাভাই একা সোফায় — চায়ের কাপ হাতে, টিভির দিকে তাকিয়ে। কিন্তু আপু দেখলেন — তার কপালে ঘাম জমেছে। «কী হয়েছে? শরীর খারাপ নাকি?»

«না না — গরম।» — তিনি তাড়াতাড়ি চায়ে চুমুক দিলেন।

আপু কাঁধ ঝাঁকিয়ে রান্নাঘরে ফিরে গেলেন। দুলাভাই কাপটা টেবিলে নামিয়ে রাখলেন — হাতটা কাঁপছিল, চা ছলকে উঠল সসারে। তিনি হাতটা মুঠো করলেন। গেস্ট রুমের বন্ধ দরজার দিকে তাকিয়ে রইলেন — অনেকক্ষণ।

«আমার আছে আপু!» — সিনথিয়া প্রায় দৌড়ে গেস্ট রুমের দিকে গেল — ভেজা কুর্তি গায়ে লেপ্টে, দুই হাতে বুক ঢেকে। করিডোরটা পার হতে হতে মনে হলো সবাই তাকিয়ে — যদিও কেউ নেই। রান্নাঘরের দরজা দিয়ে আপুর এক ঝলক দেখা গেল — কড়াইয়ে খুন্তি নাড়ছেন, গুনগুন করছেন। কিছু জানেন না। কিছু টের পাননি। এই না-জানাটাই সিনথিয়ার বুকে ছুরির মতো বিঁধল — আর তার নিচে, লজ্জাজনকভাবে, একটা শিহরণও। যেন সে কোনো গোপন খেলা খেলছে — যেখানে শুধু দুজন খেলোয়াড় জানে নিয়ম।

গেস্ট রুমে ঢুকে দরজাটা ভেজিয়ে দিল — কিন্তু ছিটকিনি তুলতে ভুলে গেল। মাথায় তখন শুধু একটা দৃশ্য ঘুরছে — দুলাভাইয়ের চোখ, তার ভেজা বুকে আটকে থাকা, সরছে না। আর সেই হাত — তার উরুর ওপর — ভারী, উষ্ণ, সরেনি।

সে আয়নার সামনে দাঁড়াল। ভেজা কুর্তিটা টেনে খুলল — ভেজা কাপড় ত্বক থেকে ছাড়াতে হলো, চটচটে। নিচে ব্রা — বুকের ওপর ভেজা দাগ, কাপড় স্বচ্ছ হয়ে এসেছে। সালোয়ারটা অল্প ভিজেছে উরুর কাছে। আয়নায় নিজেকে দেখল — ভেজা চুলের গোছা গলায় লেপ্টে, ব্রা আর সালোয়ারে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটা। গাল লাল। ঠোঁট কামড়ানো। চোখে — ভয়? নাকি অন্য কিছু?

তার হাত নিজে থেকেই উঠল — ভেজা দাগটার ওপর, বুকের ওপর। দুলাভাইয়ের চোখ যেখানে আটকে ছিল — ঠিক সেখানে। আঙুল বুলাল ধীরে। শরীরে শিহরণ বয়ে গেল — ঘাড় বেয়ে নিচে। দুই রাত আগে দরজার ফাঁকে যা দেখেছিল — সেই হাত, সেই গলা, সেই চোখ — এখন সেই মানুষটার চোখ তার শরীরে আটকে ছিল। ভাবতেই উরুর মাঝখানে দপদপ করে উঠল। তার হাত নিচে নামতে লাগল — পেট বেয়ে, সালোয়ারের কোমরের দিকে —

ঠিক তখনই ফোনটা বাজল। তানভীর — «মিম?»

বিছানায় রাখা নীল কামিজটা হাতে নিল — সেই কামিজ, যেটা পরে সে তানভীরকে ছবি পাঠিয়েছিল। পরতে যাবে — ঠিক তখনই ফোনটা বাজল। তানভীর — «মিম?»

আঙুলটা স্ক্রিনের ওপর ঝুলল। খুলবে? এখন? এই অবস্থায়?

ঠিক তখনই —

ক্যাঁচ।

দরজা খুলছে। ধীরে। একটু একটু করে।

সিনথিয়ার রক্ত হিম হয়ে গেল। ফোনটা হাত থেকে পড়ে গেল বিছানায় — «মিম?» জ্বলজ্বল করছে স্ক্রিনে, কিন্তু তার চোখ এখন দরজায়। «কে—» — গলা দিয়ে শব্দ বেরোল না। শুধু বাতাস বেরোল।

দরজার ফাঁকে — প্রথমে একটা ছায়া। তারপর — দুলাভাই।

করিডোরের আলো তার পেছনে — সিলুয়েট হয়ে দাঁড়িয়ে। এক হাত দরজার হাতলে — স্থির। তিনি থমকে গেছেন। তার চোখ — তার শরীরে।

সময় থেমে গেল।

তার চোখ নামছে — ধীরে, যেন প্রতিটা ইঞ্চি গুনছে। ভেজা চুল গলায় লেপ্টে — কাঁধ — ব্রার স্ট্র্যাপ — ভেজা দাগ লেগে থাকা ব্রা — পেট — সালোয়ারের কোমরবন্ধ — উরু। তারপর আবার উপরে — থামছে বুকে। সরছে না।

সিনথিয়ার হাত দুটো অসাড় হয়ে গেছে। বুক ঢাকতে ভুলে গেছে — হাত দুটো পাশে ঝুলছে, নীল কামিজটা এক হাতে ধরা — মেঝেতে পড়তে পড়তে আটকে আছে আঙুলে। সে শুধু তাকিয়ে — তার চোখে।

«আমি...» — দুলাভাইয়ের গলা ভাঙা, অচেনা। «দরজা... খোলা ছিল। আমি শুধু... সরি বলতে এসেছিলাম। পানির ব্যাপারে...»

কিন্তু তিনি সরলেন না। এক পাও পেছালেন না। দরজার হাতলে ধরা হাতটা শক্ত হয়ে আছে — শিরা ফুলে উঠেছে।

সিনথিয়াও নড়ল না। নড়তে পারল না। পা দুটো মেঝেতে গেঁথে গেছে। বুকের ভেতর হৃৎপিণ্ডটা এত জোরে বাজছে — মনে হলো করিডোর পর্যন্ত শোনা যাবে, আপু শুনতে পাবেন রান্নাঘর থেকে।

লজ্জা — হ্যাঁ, লজ্জা ছিল। গাল পুড়ে যাচ্ছে, কান গরম। কিন্তু লজ্জার নিচে — আরো কিছু। যা সে চিনতে পারছে, কারণ দুই রাত ধরে এই অনুভূতির সাথে বাস করছে। উত্তেজনা। তীব্র, নিষিদ্ধ উত্তেজনা।

দুই রাত আগে সে দরজার ফাঁক দিয়ে দেখেছিল — আপুকে, দুলাভাইকে। আজ — দুলাভাই দরজার ফাঁক দিয়ে দেখছেন — তাকে। চক্রটা পূর্ণ হলো। দেখার মানুষটা আজ দেখার বস্তু। আর দেখা হওয়াটা... ভালো লাগছে। ভয়ংকরভাবে ভালো লাগছে।

তার চোখে ভয় নেই — সিনথিয়া দেখল। বিস্ময় আছে, ক্ষুধা আছে — কিন্তু ফিরে যাওয়ার ইচ্ছে নেই। তিনি ভেতরে ঢুকতে চান — শরীরটা সামনে ঝুঁকেছে, অজান্তেই। কিন্তু পা নড়ছে না। যেন কোনো অদৃশ্য দেয়াল আটকে রেখেছে।

তার নিঃশ্বাস শোনা যাচ্ছে এখন — ভারী, অগভীর। দরজার হাতলে ধরা আঙুলগুলো সাদা হয়ে গেছে চাপে। সিনথিয়া দেখল — তার চোখে একটা যুদ্ধ চলছে। একটা মানুষ ফিরে যেতে চায় — ভদ্র, সংযত, হাসিখুশি দুলাভাই। আরেকটা মানুষ — দরজার ফাঁকের ওই রাতের মানুষটা — থাকতে চায়। দেখতে চায়। আরো দেখতে চায়।

«তুমি...» — তিনি ফিসফিস করলেন। আর কিছু বলতে পারলেন না।

ঘরে শুধু দুজনের নিঃশ্বাসের শব্দ — ভারী, অগভীর, একে অপরের সাথে তাল মিলিয়ে। বাইরে রান্নাঘরে কড়াইয়ের শব্দ, আপুর গুনগুন — অন্য এক দুনিয়ার শব্দ। এই ঘরে — এই মুহূর্তে — শুধু তারা দুজন।

সিনথিয়ার আঙুল থেকে নীল কামিজটা খসে পড়ল মেঝেতে — নিঃশব্দে।

তার গলায় কিছু একটা নড়ল — ঢোক গিললেন তিনি। সিনথিয়া দেখল — তার চোখের পাতা কাঁপছে। এই শক্ত, নিশ্চিত মানুষটা — দরজার ফাঁকের ওই রাতের রাজা, যার এক কথায় আপু কেঁপেছিল — এখন কাঁপছে। তার সামনে দাঁড়িয়ে — প্রায় নগ্ন একটা মেয়ের সামনে — কাঁপছে। এই দৃশ্যটা সিনথিয়ার ভেতরে কিছু একটা জাগিয়ে দিল — কী, সে জানে না। শক্তি? নাকি আরো গভীর, আরো অন্ধকার কিছু?

কেউ নড়ল না।

(চলবে...)
Like Reply
#15
খোলা দরজা

দরজার ক্যাঁচ শব্দটা থেমেছিল — কিন্তু সিনথিয়া আর নড়তে পারেনি।

আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল সে — ভেজা মেরুন কুর্তিটা কোমরের কাছে ধরা, হাতে ধরা, যেন এই মুহূর্তে নড়াচড়া বন্ধ করে দিলেই সময়ও থেমে যাবে। আর দরজার ফাঁকে — দুলাভাইয়ের সিলুয়েট। সোহেল দুলাভাই। থমকে গেছিলেন তিনিও। দুজনেই পাথর। দুজনেই বুঝেছিল — এই দৃশ্য আর মুছে ফেলা যাবে না।

তারপর দুলাভাই কথা বললেন — গলা একটু বসা, তাড়াহুড়ো — «সরি... সরি, আমি ভেবেছিলাম... দরজা খোলা ছিল, আমি...»

তিনি ভেতরে এক পা বাড়ালেন — দরজাটা পেছনে টেনে বন্ধ করার জন্য। কাঠের পাল্লাটা আস্তে করে লাগল। ক্লিক। ছিটকিনি তোলার শব্দ হলো না — হাতটা ছিটকিনির কাছে গিয়ে থেমে গেল, ফিরে এলো — যেন নিজের সাথেই যুদ্ধ করছেন। তিনি দরজার কাছেই দাঁড়িয়ে রইলেন। যাননি।

ঘরে নীরবতা নামল — ভারী, ঘন। বাইরে ড্রয়িং রুমে টিভির শব্দ — মুভি চলছে, কেউ দেখছে না। রান্নাঘর থেকে ভেসে আসছে কড়াইয়ের ছ্যাঁক ছ্যাঁক, আপুর গুনগুন — সুরেলা, অজান্ত। সিনথিয়ার বুকের ভেতর সেই সুরটা ছুরির মতো বিঁধল। আপু — যে তাকে নিজের বোনের মতো ভালোবাসে — মাত্র কয়েক মিটার দূরে। আর এখানে, এই ঘরে — তার স্বামী, দরজা বন্ধ করে, তার সামনে দাঁড়িয়ে — তাকে দেখছে।

«আমি... আমি দুঃখিত,» দুলাভাই আবার বললেন — এবার ধীরে। «আমার ঢোকা উচিত হয়নি। কিন্তু...» — তিনি থামলেন। চোখ নামালেন না। «কিন্তু আমি যেতে পারছি না।»

এই সত্যটা — এই স্বীকারোক্তি — সিনথিয়ার ভেতরে কিছু একটা নাড়িয়ে দিল। তিনিও চান। তিনিও আটকে গেছেন।

সিনথিয়ার হাত কুর্তিটা বুকের ওপর তুলে ধরল — আধা-ঢাকা, আধা-খোলা। তার চোখ দুলাভাইয়ের চোখে আটকে গেছিল। সেই চোখ — সন্ধ্যায় যে চোখ হেসেছিল, মজা করেছিল — এখন আর হাসছে না। এখন সেই চোখে অন্য কিছু। সেই রাতের চোখ। দরজার ফাঁকের রাতের চোখ।

«ভয় পাচ্ছিস?» — তার গলা নিচু, ভারী।

সিনথিয়া মাথা নাড়ল। তারপর থামল। মাথা নাড়াটা থেমে গেল মাঝপথে। কারণ সত্যিটা শুধু ভয় ছিল না। সত্যিটা আরো জটিল, আরো অন্ধকার, আরো গভীর। সে ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল — এবার অন্য দিকে। না। শুধু ভয় পাচ্ছে না।

«ভয়... করছে,» সে ফিসফিস করে বলল। গলা শুকিয়ে কাঠ। «কিন্তু... শুধু ভয় না।»

দুলাভাইয়ের ঠোঁটে একটা ধীর হাসি ফুটল — সেই হাসি, জয়ীর হাসি নয়, অন্য কিছু — যেন তিনি জানতেন। যেন তিনি এই উত্তরটাই শুনতে চেয়েছিলেন।

তিনি তখনো ছুঁলেন না। এক পাও এগোলেন না। শুধু দাঁড়িয়ে রইলেন — আর কথা বললেন। তার গলা এখন সেই গলা — দরজার ফাঁকের রাতের গলা, আদেশের গলা, কিন্তু এখন নরম, ধীর, যেন প্রতিটা শব্দ বেছে বেছে — «তুই জানিস, সেদিন রাতে... তুই কী দেখেছিলি?»

সিনথিয়ার বুক ধড়াস করে উঠল। «আমি... আমি দেখিনি... আমি...»

«মিথ্যে বলিস না।» — নরম, কিন্তু দৃঢ়। «তোর আপু বলেছে। তুই জেগে ছিলি। দরজার ফাঁকে ছিলি।»

তার গাল পুড়ে গেল। মাটি ফেটে গেলে ঢুকে যেত। «আমি... সরি... আমি চাইনি...»

«কী দেখলি, বল তো?»

সে চুপ। ঠোঁট কাঁপছে।

«বল।»

«আপনি... আপুকে...» — তার গলা ভেঙে গেল। «আপনি আপুকে গালি দিচ্ছিলেন। আর আপু... আপু খুশি ছিল।»

দুলাভাই ধীরে ধীরে মাথা নাড়লেন। «আর তুই? তুই কী করছিলি, দেখতে দেখতে?»

সিনথিয়ার শ্বাস বন্ধ হয়ে গেল। «আমি...»

«তোর হাত কোথায় ছিল, সিনথিয়া?»

এই প্রথম — তিনি তার নাম ধরে ডাকলেন। সিনথিয়া। শালী নয়। মেয়ে নয়। সিনথিয়া। তার পুরো শরীর শিউরে উঠল।

«আমি জানি,» তিনি বললেন, এগিয়ে এলেন এক পা। «কারণ আমিও একবার তোর বয়সে ছিলাম। জানিস, কৌতূহল কোনো পাপ না।»

আরেক পা। এখন তিনি আয়নার সামনে, তার থেকে মাত্র দুই হাত দূরে। তার গায়ের গন্ধ — সাবান, ঘাম, পুরুষ — সিনথিয়ার নাকে এসে লাগল। তার হাঁটু কাঁপছিল।

«তুই সুন্দর,» তিনি বললেন। সহজভাবে, যেন সত্যি কথা বলছেন। «সেদিন রাতে দরজার ফাঁকে তোকে দেখে... আমি তখন থেকে ভাবছি।»

«কী... ভাবছেন?»

«এইটাই।» — তার চোখ তার শরীরের ওপর দিয়ে নেমে গেল — ধীরে, লুকিয়ে নয়, খোলাখুলি — কুর্তির ভেজা কাপড়, তার নিচে ব্রা-এর রেখা, সালোয়ার। «তুই চাস। আর আমি চাই।»

সিনথিয়ার বুকের ভেতর যুদ্ধ চলছিল — ভয় আর চাওয়া, লজ্জা আর ক্ষুধা, আপু আর এই মুহূর্ত। আপু রান্নাঘরে — মাত্র কয়েক মিটার দূরে, কড়াইয়ের শব্দ আসছে। আর এখানে —

«আপু...» সে ফিসফিস করল।

«আপু জানবে না,» দুলাভাই বললেন। «কেউ জানবে না। এটা শুধু আমাদের। তুই যদি চাস।»

তিনি হাত বাড়ালেন — কিন্তু ছুঁলেন না। হাতটা বাতাসে থেমে রইল, তার গালের কাছে। অপেক্ষা। «বল। মুখে বল। চাস?»

সিনথিয়ার মাথার ভেতর ঝড়। দরজার ফাঁকের রাত — আপুর চিৎকার, দুলাভাইয়ের গলা — «বল, তুই কার?» — সেই দৃশ্য যা তাকে বদলে দিয়েছিল। তানভীরের মেসেজ — «তুই কার?» — একই প্রশ্ন, ফোনের স্ক্রিনে। মিম — যে মেয়ে লজ্জা পায় না। আর সিনথিয়া — ভালো মেয়ে, আপুর আদরের বোন।

কিন্তু এই মুহূর্তে — এই ঘরে, এই পুরুষের সামনে, অর্ধনগ্ন — ভালো মেয়েটা কোথায়? সে খুঁজল — পেল না। শুধু পেল একটা সত্যি — গভীর, কাঁপা, অনস্বীকার্য সত্যি।

এই মুহূর্তটা — সিনথিয়া পরে বহুবার মনে করবে। এই মুহূর্তে সে ফিরে যেতে পারত। দরজা খুলে বেরিয়ে যেতে পারত। চিৎকার করতে পারত। কিন্তু সে যা করল —

«আমি... চাই।» — তার গলা কাঁপছিল, চোখে পানি। «ভয় করছে, কিন্তু চাই।»

দুলাভাইয়ের হাতটা তার গালে নামল। গরম। ভারী। «ভয় পাস না। আমি আছি।»

তারপর তিনি তাকে চুমু খেলেন।

প্রথম চুমুটা নরম ছিল — ঠোঁটে ঠোঁট, প্রশ্নের মতো। সিনথিয়া জমে গেছিল — ঠোঁট কাঁপছিল, শ্বাস বন্ধ। তারপর দুলাভাইয়ের এক হাত তার ঘাড়ে উঠল — আলতো চাপ — আর দ্বিতীয় চুমুটা গভীর হলো। তার জিভ — সিনথিয়া চমকে উঠল, কিন্তু সরল না। বরং — বরং তার নিজের ঠোঁট খুলে গেল, নিজের অজান্তেই।

দুলাভাইয়ের হাত তার পিঠে — খালি পিঠে, কুর্তি নেই — গরম তালু। তিনি তাকে কাছে টানলেন — বুকের সাথে বুক। তার হৃৎপিণ্ডের ধড়াস — দুলাভাইয়ের বুকেও টের পেল সে। দুটো হৃৎপিণ্ড — একই ছন্দে। সিনথিয়া শিখছিল — চুমু খেতে শিখছিল — তার জিভ তার জিভের সাথে। অদ্ভুত — লজ্জার — কিন্তু থামতে ইচ্ছে করছিল না। তার হাত উঠল — দুলাভাইয়ের ঘাড়ে — আঁকড়ে ধরল — যেন পড়ে যাবে।

কুর্তিটা তার হাত থেকে খসে পড়ল মেঝেতে। ভেজা কাপড়ের ছপাৎ শব্দ। এখন সে শুধু ব্রা আর সালোয়ারে — দুলাভাইয়ের সামনে। লজ্জায় সে হাত দিয়ে ঢাকতে গেল — দুলাভাই তার হাতদুটো ধরে সরিয়ে দিলেন — নরম করে, কিন্তু দৃঢ়ভাবে।

«ঢাকিস না,» তিনি বললেন। «তোর দুধগুলো দেখতে দে আমাকে।»

তার চোখ — সেই রাতের চোখ — তার শরীরের ওপর ঘুরছিল। সিনথিয়ার গাল, গলা, বুক — সব জ্বলছিল। কিন্তু সেই দৃষ্টিতে কোনো ঘৃণা ছিল না। ছিল ক্ষুধা। আর — প্রশংসা।

«ব্রা-টা খুলে ফেল,» তিনি বললেন। আদেশ নয় — অনুরোধের মতো আদেশ।

সিনথিয়ার আঙুল কাঁপছিল। পেছনের হুক — একবার, দুবার — খুলল না। দুলাভাই হাসলেন — নরম হাসি — এগিয়ে এসে নিজেই খুলে দিলেন। এক টান। ব্রা-টা মেঝেতে পড়ল।

সে এখন খালি বুকে — প্রথমবার কোনো পুরুষের সামনে। তার হাত আবার উঠতে গেল — দুলাভাই ধরে ফেললেন। «না।»

তিনি তাকিয়ে রইলেন। তারপর — ধীরে — নত হলেন। তার মুখ তার বুকে নামল।

সিনথিয়া চিৎকার করে উঠত — মুখ চেপে ধরল নিজের হাতে। দুলাভাইয়ের জিভ — গরম, ভেজা — তার স্তনের বোঁটায়। চুষছে। আলতো কামড়। তার পুরো শরীরে বিদ্যুৎ খেলে গেল — পায়ের আঙুল বেঁকে গেল, পিঠ ধনুকের মতো বেঁকে গেল।

দুলাভাইয়ের অন্য হাত — তার অন্য স্তনে — আলতো চাপ, বোঁটা আঙুলের মাঝে — ঘোরাচ্ছে। দুই দিক থেকে — মুখ আর হাত — সিনথিয়া পাগল হয়ে যাচ্ছিল। তার হাত দুলাভাইয়ের চুলে — আঁকড়ে ধরা — টানছে, নিজের অজান্তেই। «আরো...» — সে ফিসফিস করল — লজ্জায় মরে যাচ্ছিল, কিন্তু থামতে পারছিল না।

«আহ...» — ফিসফিস, হাতের ফাঁক দিয়ে।

«চুপ,» দুলাভাই ফিসফিস করলেন, মুখ না তুলে। «আপু শুনতে পাবে।»

এই নিষেধ — এই গোপনীয়তা — তাকে আরো পাগল করে দিল। সে বিছানার চাদর আঁকড়ে ধরল। দুলাভাইয়ের হাত এখন তার পেটে — নাভির চারপাশে ঘুরছে — নিচে নামছে। সালোয়ারের দড়ি।

«এটা... খুলব?»

সিনথিয়া মাথা নাড়ল — হ্যাঁ। দড়িটা খুলে গেল। সালোয়ারটা নেমে গেল — পায়ের গোড়ালিতে জমা হলো। এখন সে শুধু প্যান্টিতে। দুলাভাই এক মুহূর্ত থামলেন — দেখলেন। তারপর হাঁটু গেড়ে বসলেন তার সামনে।

«পা-টা তোল।»

সে তুলল — কাঁপতে কাঁপতে। সালোয়ারটা খুলে গেল পুরো। প্যান্টিটা — সাদা, ভেজা, স্পষ্ট ভেজা — দুলাভাইয়ের চোখ সেখানে আটকাল। তিনি তাকালেন ওপরে — তার চোখে।

«তোর ভোদাটা পুরো ভিজে গেছে,» তিনি বললেন — গলায় সন্তুষ্টি।

সিনথিয়া মুখ লুকাল হাতে। দুলাভাই হাত সরিয়ে দিলেন। «লজ্জা পাস না। এটা সুন্দর।»

তারপর — তার মুখ নিচে নামল।

সিনথিয়া বুঝতে পারল কী হতে যাচ্ছে — আতঙ্কে, উত্তেজনায় — «না... ওখানে... নোংরা...»

«চুপ।» — প্যান্টিটা এক টানে নামিয়ে দিলেন। «বালগুলোও ভিজে লেপ্টে গেছে...» — আর তার জিভ —

সিনথিয়ার পৃথিবী উল্টে গেল।

এটা তার নিজের আঙুল নয়। এটা অন্য কিছু — গরম, ভেজা, জোরালো, জানা — যেন এই জিভ ঠিক জানে কোথায়, কতটা, কীভাবে। তার পা কাঁপছিল — দাঁড়িয়ে থাকতে পারছিল না। দুলাভাইয়ের হাত তার উরু ধরে রেখেছিল — শক্ত করে।

«আহ... আহ... প্লিজ...» — সে জানত না কী চাইছে। শুধু জানত — থামতে বলবে না।

তারপর — তার জিভ ভেতরে ঢুকল। সিনথিয়া দেয়াল আঁকড়ে ধরল। তার চোখে পানি — আনন্দে, অবিশ্বাসে। এতদিন সে নিজে যা করেছে — এটা তার চেয়ে হাজার গুণ।

«দুলাভাই... আমি... আমি...»

«আসতে দে,» তিনি ফিসফিস করলেন — মুখ না সরিয়ে। «ভয় পাস না। আসতে দে।»

আর এলো — ঢেউয়ের মতো, পায়ের আঙুল থেকে মাথা পর্যন্ত — তার প্রথম চরমসুখ, কোনো পুরুষের মুখে। সে চিৎকার চেপে ধরল বালিশে মুখ গুঁজে — বিছানায় পড়ে গেছিল কখন, টের পায়নি। পুরো শরীর কাঁপছিল — অনেকক্ষণ।

দুলাভাই এক মুহূর্ত তার পাশে এলেন — তার কপালে চুমু খেলেন। «তুই...» — গলায় বিস্ময়। «তুই এত...» — তিনি শেষ করলেন না। সিনথিয়া চোখ বন্ধ করেছিল — চোখের কোণে পানি। আনন্দে। মুক্তিতে। এতদিন সে একা যা করেছে — কম্বলের নিচে, লুকিয়ে, লজ্জায় — আজ প্রথমবার কেউ তাকে দিল। কোনো পুরুষ। এই ভাবনায় তার বুক মোচড় দিল — কিন্তু শরীরটা তখনো কাঁপছিল আনন্দে — শরীর মিথ্যে বলে না।

দুলাভাই উঠে এলেন — মুখ ভেজা, চোখ জ্বলজ্বলে। তিনি নিজের শার্ট খুললেন। এক বোতাম, দুই বোতাম। প্যান্ট। সিনথিয়া দেখল — প্রথমবার, এত কাছ থেকে, সত্যিকারের পুরুষাঙ্গ। ভিডিওর মতো নয়। বড়। জীবন্ত। তার বুক ধড়ফড় করছিল।

«ধর,» তিনি বললেন — নরম করে। «ভয় নেই।»

সে হাত বাড়াল — কাঁপা হাতে ছুঁল। গরম। শক্ত। শিরা ফুলে আছে। দুলাভাইয়ের শ্বাস ভারী হলো। «মুখে নিবি?» — তিনি ফিসফিস করলেন। «একটু... শুধু একটু। আমার ধোনটা...»

সিনথিয়া তাকাল ওপরে — তার চোখে। তারপর ঝুঁকল। ঠোঁট ছোঁয়াল। জিভ বোলাল। দুলাভাইয়ের হাত তার চুলে — «আহ... এই তো...» — তার গলা ভেঙে যাচ্ছিল। সে আরো নিল — মুখে, যতটা পারে। লবণাক্ত স্বাদ। গাল ভরে গেল। «ব্যাস... ব্যাস, পাগলি...» — তিনি তাকে টেনে তুললেন — ঠোঁটে গভীর চুমু। «একদিন... আমার মালটা তোর মুখেই দেবো। আজ না। আজ... এবার আসলটা।»

তিনি বিছানায় উঠলেন — তার ওপরে। তার ওজন — গরম, ভারী — তাকে চাপা দিল। তার ঠোঁট তার ঠোঁটে — এবার সে নিজেই চুমু খেল, ক্ষুধার্তভাবে। তার হাত দুলাভাইয়ের পিঠে — নখ বসে যাচ্ছিল।

«রেডি?» — দুলাভাই ফিসফিস করলেন।

«আমি... আমি কখনো...»

«জানি।» — তার হাত নিচে — আঙুল — ভেতরে। একটা। সিনথিয়া শিউরে উঠল। «ব্যথা করছে?»

«না... অদ্ভুত... ভালো...»

দ্বিতীয় আঙুল। এবার একটু ব্যথা — চিনচিনে। «আহ।»

«সহ্য কর,» তিনি বললেন — নরম করে। «এটা প্রস্তুতি। নইলে ব্যথা বেশি হবে।»

তার আঙুল ভেতরে-বাইরে — ধীরে, ছন্দে। সিনথিয়ার শরীর আবার জ্বলতে শুরু করল — সেই চেনা আগুন, কিন্তু এবার অন্য কারো হাতে। সে নিজের অজান্তেই কোমর নাড়ছিল — আঙুলের সাথে।

দুলাভাইয়ের বুড়ো আঙুল — বাইরে, সেই জায়গায় — ঘষছিল — ছন্দে। ভেতরে দুই আঙুল। সিনথিয়া বুঝল — তিনি জানেন। সব জানেন। কোথায়, কীভাবে — যেন তার শরীরের মানচিত্র তার মুখস্থ। «তুমি... কীভাবে...» — সে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল। দুলাভাই হাসলেন — «অভিজ্ঞতা, পাগলি।» — আর আঙুলের গতি বাড়ালেন।

«প্লিজ...» সে ফিসফিস করল।

«কী চাস? বল।» — সেই গলা। দরজার ফাঁকের গলা।

«আপনার ধোনটা... চাই...»

দুলাভাই থামলেন এক মুহূর্ত — তার দিকে তাকালেন — সত্যিকারের তাকানো। «তুই নিশ্চিত? এখনো ফিরে যেতে পারিস। আমি জোর করব না — কোনোদিন না।»

এই প্রশ্ন — এই সম্মান — সিনথিয়ার চোখে পানি এনে দিল। তিনি চাইলে জোর করতে পারতেন। কিন্তু করছেন না। চাইছেন — তার মুখে শুনতে।

সে তার বুকে হাত রাখল — তার হৃৎপিণ্ডের ধড়াস — দ্রুত, জোরালো। «আমি নিশ্চিত,» সে বলল — এবার গলা স্থির। «আমি চাই। তোমাকে চাই।»

দুলাভাই নিজেকে স্থির করলেন — তার মুখ তার মুখের কাছে। «বল, তুই কার?»

সিনথিয়ার শ্বাস আটকে গেল। এই প্রশ্ন — সেই রাতে আপুকে করা প্রশ্ন। এখন তাকে। তার উত্তর —

«তোমার,» সে ফিসফিস করল। «আমি তোমার।»

«জোরে বল।»

«আমি তোমার!» — বালিশে মুখ গুঁজে, কাঁপতে কাঁপতে।

আর তখন — তিনি ঢুকলেন।

ব্যথা — তীব্র, ছিঁড়ে যাওয়ার মতো — সিনথিয়া চিৎকার করে উঠল — দুলাভাইয়ের হাত সাথে সাথে তার মুখ চেপে ধরল — «শশশ...» — তিনি থেমে গেলেন। পুরো থেমে। নড়লেন না। তার কপালে ঘাম।

«ব্যথা করছে?» — গলায় উদ্বেগ, সত্যিকারের।

সিনথিয়া মাথা নাড়ল — হ্যাঁ। চোখে পানি। «থামবেন... না... প্লিজ... থামবেন না...»

«বললে থামব,» তিনি বললেন। «একটা কথা বললেই। কথা দিচ্ছি।»

সে তার পিঠ আঁকড়ে ধরল — নখ বসিয়ে। «না। চালিয়ে যান।»

তিনি আবার নড়লেন — খুব ধীরে, একটু একটু। প্রতিটা নড়নে ব্যথা — কিন্তু ব্যথার নিচে অন্য কিছু জন্ম নিচ্ছিল — চাপ, পূর্ণতা, এক অদ্ভুত আনন্দ। তার শরীর শিখছিল। মানিয়ে নিচ্ছিল। যেন তার শরীরই জানত — এটাই হওয়ার ছিল। ব্যথার ভেতর দিয়ে আনন্দের জন্ম — ঠিক যেমন ভয়ের ভেতর দিয়ে চাওয়ার জন্ম হয়েছিল আজ সন্ধ্যায়।

«ভালো লাগছে?» — তিনি ফিসফিস করলেন।

«হ্যাঁ...» — অবাক হয়ে সে টের পেল — সত্যিই ভালো লাগছে। ব্যথা কমছে। জায়গা নিচ্ছে অন্য কিছু।

তারপর গতি বাড়ল। দুলাভাইয়ের শ্বাস ভারী হচ্ছিল — তার কানে। «এই তো... এই তো আমার মাল...» — তার হাত তার চুলে — আলতো টান। «বল, কেমন লাগছে?»

«ভালো... খুব ভালো... আহ...»

«আরো জোরে চাস?»

«হ্যাঁ... প্লিজ...»

গতি আরো বাড়ল। বিছানা ক্যাঁচ ক্যাঁচ করছিল — সিনথিয়া আতঙ্কে ফিসফিস করল — «আপু শুনতে পাবে...»

«তাহলে চুপ করে থাক,» দুলাভাই বললেন — গলায় সেই দাপট, সেই রাতের দাপট — «চুপ করে আমার ধোনটা নে।»

এই কথায় — এই গলায় — সিনথিয়ার ভেতরে কিছু একটা ফেটে গেল। সেই রাতের দৃশ্য — আপু, দুলাভাই, «বল, তুই কার?» — এখন সে নিজে সেই জায়গায়। সে আপুর জায়গায়। আর সে বুঝল — আপু কেন চিৎকার করেছিল। কেন ভিক্ষা চেয়েছিল।

«আমাকে... গালি দাও...» — সে ফিসফিস করল — নিজেই অবাক হয়ে। «ওইভাবে... যেভাবে আপুকে...»

দুলাভাইয়ের চোখ জ্বলে উঠল। «বল, তুই কী?»

«আমি তোমার... খানকি... আমার ভোদাটা তোমার...» — শব্দগুলো তার মুখে অদ্ভুত লাগল — নোংরা, নিষিদ্ধ, মুক্ত।

«জোরে।»

«আমি তোমার খানকি!» — বালিশে মুখ গুঁজে। «আমাকে... শেষ করে দাও...»

«এই তো আমার মাগি,» দুলাভাই হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন — প্রতিটা ধাক্কায়। «তোর ভোদাটা... এত গরম... এই তো...»

সিনথিয়া আর মানুষ ছিল না — শুধু শরীর, শুধু অনুভূতি। তার পা দুলাভাইয়ের কোমরে জড়িয়ে গেছিল। তার নখ তার পিঠে লাল দাগ কাটছিল। প্রতিটা ধাক্কা — গভীর, ভেতরে, ঠিক জায়গায়।

দুলাভাই তার এক পা তুলে নিলেন — কাঁধে। নতুন কোণ — গভীরতর। সিনথিয়া চিৎকার চেপে ধরল — «আহ!» — এত গভীরে — যেন তার ভেতরের সব ছুঁয়ে যাচ্ছে। «এই তো... এই তো...» — দুলাভাইয়ের গলা ভেঙে যাচ্ছিল। «তোর ভোদাটা... এত টাইট...» — তিনি থামলেন এক মুহূর্ত — নিজেকে সামলাতে — তারপর আবার — আরো জোরে। বিছানার মাথা দেয়ালে ঠুকছিল — টক... টক... টক... — সিনথিয়া আতঙ্কে ফিসফিস করল — «দেয়াল... আপু...» — «চুপ,» — দুলাভাই তার মুখ চুমুতে বন্ধ করে দিলেন — গভীর, দাবিদার চুমু — আর নিচে থামলেন না।

«আমি... আমি আসছি...» — সে টের পেল — সেই চেনা ঢেউ, কিন্তু এবার অন্যরকম — গভীর, ভেতর থেকে — «আহ... আহ...»

«আসতে দে,» দুলাভাই ফিসফিস করলেন। «আমার মালটা তোর ভেতরে... আসতে দে...»

আর এলো — তার প্রথমবার, কোনো পুরুষের ভেতরে থেকে — এত তীব্র যে সে কেঁদে ফেলল — বালিশ ভিজে গেল চোখের পানিতে — শরীর কাঁপছিল, কাঁপছিল, থামছিল না। দুলাভাই থামলেন না — চালিয়ে গেলেন — তার চরমসুখের মাঝখান দিয়ে — যতক্ষণ না তিনিও —

«আহ...» — গভীর, পশুর মতো শব্দ — তিনি শক্ত হয়ে গেলেন — তার ভেতরে — গরম ঢেউ।

তারপর — নীরবতা। শুধু দুজনের হাঁপানো। ঘড়ির টিকটিক। দূরে রান্নাঘরে কড়াইয়ের শব্দ — আপু এখনো রান্না করছে। কিছু জানে না।

দুলাভাই তার ওপর থেকে সরে পাশে শুলেন। এক হাত তার বুকের ওপর। দুজনেই ঘামে ভেজা। সিনথিয়া ছাদের দিকে তাকিয়ে রইল — মাথা ফাঁকা, শরীর ভারী, অদ্ভুত শান্তি।

দুলাভাইয়ের আঙুল তার চুলে — আলতো — জট ছাড়াচ্ছে। এই কোমলতা — এই যত্ন — সিনথিয়ার চোখে আবার পানি এনে দিল। সেই রাতে দরজার ফাঁকে তিনি আপুকেও এভাবে... কপালে চুমু... «ভালোবাসি তোকে...» — এই মানুষটা দুজনকে ভালোবাসে? নাকি... সে ভাবতে পারল না। ভাবনা থেমে গেছিল। শুধু শরীর — ব্যথা, ভারী, তৃপ্ত। সে চাদরটা সরিয়ে দেখল — হালকা রক্তের দাগ, সাদা চাদরে। তার কুমারীত্বের দাগ। সে তাকিয়ে রইল — এই দাগ আর মুছে যাবে না। সেও আর আগের মেয়ে নয়।

তারপর ভয় এলো — ধীরে, ঠান্ডা। «আমি... আপুর...» — তার গলা ভেঙে গেল। «আমি আপুর স্বামীর সাথে... আমি কী করলাম...»

দুলাভাই তার দিকে ফিরলেন। তার কপালে চুমু খেলেন — নরম, দীর্ঘ। «শশশ।»

«আপু জানতে পারলে... আমাকে মেরে ফেলবে...»

«কেউ জানবে না,» তিনি বললেন — দৃঢ়ভাবে। «এটা শুধু আমাদের। তোর আর আমার। কেউ কোনোদিন জানবে না।»

«কিন্তু... এটা ভুল... তাই না?»

তিনি এক মুহূর্ত চুপ। তারপর — «তুই কি খারাপ বোধ করছিস? ভেতরে?»

সিনথিয়া ভাবল। সত্যি ভাবল। লজ্জা ছিল। ভয় ছিল। কিন্তু তার নিচে — «না,» সে ফিসফিস করল — নিজেই অবাক হয়ে। «খারাপ... লাগছে না।»

দুলাভাই হাসলেন — সেই নরম হাসি। «তাহলে এটা তোর সত্যি।» তিনি উঠলেন — প্যান্ট পরলেন, শার্ট। দরজার কাছে গিয়ে থামলেন। ফিরে তাকালেন — বিছানায়, চাদরে জড়ানো, এলোমেলো চুলের মেয়েটার দিকে।

«তুই... অসাধারণ,» তিনি বললেন। তারপর দরজা খুললেন — একটু ফাঁক — বাইরে তাকালেন — করিডোর খালি — বেরিয়ে গেলেন। দরজা বন্ধ।

সিনথিয়া শুয়ে রইল। নড়তে পারছিল না। তার শরীর ব্যথা করছিল — ভেতরে, গভীরে — মিষ্টি ব্যথা। চাদরে — সে দেখল — হালকা রক্তের দাগ। তার প্রথমবারের দাগ। সে তাকিয়ে রইল — অদ্ভুত গর্বে, অদ্ভুত শোকে।

তারপর — সে শুনল।

করিডোরের দূর প্রান্ত থেকে — খুব হালকা — একটা শব্দ। যেন কেউ সরে গেল — পা টিপে, তাড়াহুড়োয়। অথবা — ফোনের স্ক্রিনের আলো নিভে যাওয়ার মতো — একটা ক্ষীণ ঝিলিক, চোখের কোণে। অথবা সদর দরজার — খুব আস্তে বন্ধ হওয়ার — ক্লিক।

সে উঠে বসল — হৃৎপিণ্ড গলায়। দরজার দিকে তাকাল। কিছু নেই। করিডোর খালি। কিন্তু —

রনি? রনি তো বন্ধুর বাসায়। আপু? আপু রান্নাঘরে — কড়াইয়ের শব্দ এখনো আসছে। তাহলে কে? নাকি সে কল্পনা করল — ভয়, অপরাধবোধ — মাথার ভেতরের শব্দ? সে কান পেতে রইল — নিঃশ্বাস বন্ধ করে। কিছু নেই। শুধু টিভির শব্দ। শুধু কড়াই। শুধু তার নিজের হৃৎপিণ্ডের ধড়াস।

দরজার বাইরে... কেউ ছিল।

কে?

সে জানত না — এই প্রশ্নের উত্তর তার জীবন বদলে দেবে।

(চলবে...)
Like Reply
#16
রাতের খাবার

ছায়াটা সরে গেছিল। ফোনের আলোটা নিভে গেছিল। আর সেই হালকা ক্লিক শব্দটা — প্রায় শোনা যায় না, তবু সিনথিয়ার কানে বাজছিল বারবার।

দুলাভাই দরজার দিকে তাকালেন। এক সেকেন্ড। দুই সেকেন্ড। তারপর ধীরে ধীরে উঠে গিয়ে দরজাটা টেনে দিলেন — ভেতর থেকে। ছিটকিনি লাগালেন না, শুধু ভেজিয়ে দিলেন। ফিরে এসে বিছানায় বসলেন। তার মুখে ঘাম।

«কে ছিল?» — সিনথিয়ার গলা ফিসফিসের চেয়েও নিচু, কাঁপা।

«জানি না।» — দুলাভাইয়ের চোখে অস্থিরতা। «হয়তো... তোর আপু। রান্নাঘর থেকে বেরিয়েছিল হয়তো। পানি নিতে।»

সিনথিয়ার বুক ধড়ফড় করছিল — এত জোরে যে মনে হচ্ছিল দুলাভাই শুনতে পাচ্ছেন। আপু। শিলা আপু। দেখে ফেলেছে? সবকিছু? তার গা শিউরে উঠল — লজ্জায়, ভয়ে, আতঙ্কে। চোখে পানি এসে গেল। «আমি... আমি মরে যাবো... আপু যদি...»

«শোন,» — দুলাভাই তার মুখটা দুই হাতে ধরলেন, চোখে চোখ রাখলেন — «যা হয়েছে, হয়েছে। আমি সামলাবো। আমি তোর দুলাভাই — এই বাড়ির কর্তা। তুই ভয় পাস না।» — তার কপালে চুমু খেলেন, দীর্ঘ। «নে, ওঠ। জামা পর। মুখ ধুয়ে আয়। আপু ডাকার আগেই আমাদের বাইরে যেতে হবে — স্বাভাবিকভাবে।»

সিনথিয়া বাথরুমে গেল। আয়নায় তাকাল — আর চমকে উঠল। এই মেয়েটা কে? চোখ দুটো ভেজা, কিন্তু জ্বলজ্বলে। ঠোঁট ফোলা — কামড়ানোর দাগ। গলায় লালচে ছাপ — দুলাভাইয়ের মুখের ছাপ। সে পানি ছিটাল মুখে — ঠান্ডা পানি — কিন্তু ভেতরের আগুন নিভল না। শরীরের ভেতরটা এখনো টনটন করছিল — প্রতিটা নড়াচড়ায় মনে পড়িয়ে দিচ্ছিল — এক ঘণ্টা আগে সে আর কুমারী নেই। এই ভাবনায় তার বুক মোচড় দিল — ভয়, লজ্জা, আর... আর একটা অদ্ভুত গর্ব। সে কিছু করেছে — নিষিদ্ধ, ভয়ংকর — কিন্তু নিজের ইচ্ছেয়। কেউ জোর করেনি।

কিন্তু আপু দেখে ফেলেছে। এই ভাবনাটা ফিরে এলো — ঠান্ডা স্রোতের মতো। আপু কী ভাবছে? ঘেন্না করছে? মাকে বলে দেবে? তার হাত কাঁপছিল তোয়ালে ধরতে গিয়ে। «শান্ত হ,» — সে নিজেকেই বলল আয়নায় — «শান্ত হ, সিনথিয়া।»

সে ফিরে এসে দেখল দুলাভাই প্যান্ট-শার্ট পরে নিয়েছেন — চুল আঁচড়ে, এমন ভান যেন ঘুম থেকে উঠলেন। তিনি সিনথিয়ার দিকে তাকালেন — চোখে অপরাধবোধ আর আদর, একসাথে। «শোন,» — তিনি ফিসফিস করলেন — «আপু যদি কিছু জিজ্ঞেস করে — তুই কিছু জানিস না। সব দোষ আমার। বুঝেছিস?»

«কিন্তু—»

«কোনো কিন্তু না।» — তিনি তার হাত চাপ দিলেন এক সেকেন্ডের জন্য — গরম, শক্ত। «আমি আছি।»

সিনথিয়া উঠল। পা কাঁপছিল। শরীরের ভেতরটা এখনো ব্যথা করছিল — মিষ্টি ব্যথা, গভীর ব্যথা — প্রতিটা নড়াচড়ায় মনে পড়িয়ে দিচ্ছিল কী ঘটেছে। সে সালোয়ারটা তুলে পরল, কুর্তিটা — ভেজা কুর্তিটা বাথরুমে ধুয়ে নিংড়ে বারান্দায় মেলে দিল। অন্য একটা কুর্তি পরল — হালকা সবুজ। আয়নায় নিজেকে দেখল — চোখ লাল, ঠোঁট ফোলা, গলায়... গলায় একটা লাল দাগ। দুলাভাইয়ের দাঁতের দাগ। সে ওড়নাটা ভালো করে গলায় পেঁচিয়ে নিল।

বেরিয়ে দেখল দুলাভাই ড্রয়িংরুমে বসে আছেন — টিভি চালিয়ে, এমন ভান যেন কিছুই হয়নি। কিন্তু তার হাত কাঁপছিল — রিমোটটা ধরা হাতে। সিনথিয়া সোফার এক কোণে বসল — দূরে, নিরাপদ দূরত্বে। দুজনের মধ্যে তিন হাত জায়গা — যেন দেয়াল।

তখনই রান্নাঘর থেকে আপুর গলা — «খাবার রেডি! আয়, সবাই!»

সিনথিয়ার পেট মোচড় দিল। খাবার? এই অবস্থায়? কিন্তু না গেলে সন্দেহ হবে। সে উঠল। দুলাভাইও উঠলেন। দুজনে ডাইনিং টেবিলে গিয়ে বসল — পাশাপাশি নয়, মুখোমুখি।

শিলা আপু খাবার বাড়ছিল — ভাত, ডাল, মাছ ভাজি, আলু ভর্তা। তার মুখ স্বাভাবিক। খুব স্বাভাবিক। সিনথিয়া তাকে দেখল — চুরি করে। আপুর চোখে কিছু ছিল? রাগ? ঘৃণা? কিছুই বোঝা যাচ্ছিল না। আপু হাসল — «কী রে, মুখটা এমন শুকনো কেন? শরীর খারাপ?»

«না... না আপু।» — সিনথিয়া ভাতে হাত দিল। হাত কাঁপছিল। «গরম লাগছিল।»

«এসি চালিয়ে দিই?»

«না না, ঠিক আছে।»

দুলাভাই চুপচাপ খাচ্ছিলেন — মাথা নিচু। এত চুপ যে আপু একবার তাকালেন — «তোমার কী হলো? মুখে কথা নেই?»

«কী আবার হবে।» — দুলাভাই জোর করে হাসলেন। «খিদে পেয়েছে। খাচ্ছি।»

«রনি ফোন করেছিল,» — আপু বললেন, ডাল ঢালতে ঢালতে — «আজ রাতে ফিরবে না। বন্ধুর বাসায় থাকবে। কাল সকালে আসবে।»

সিনথিয়ার বুকটা ধক করে উঠল। ভালো না খারাপ — বুঝতে পারল না। রনি নেই — মানে বাড়িতে শুধু তিনজন।

«তুই কাল কখন যাবি?» — আপু জিজ্ঞেস করল — স্বাভাবিক গলায়।

«কাল... দুপুরে। মা ফোন করেছিল।» — সিনথিয়া মিথ্যে বলল — আধা মিথ্যে। মা ফোন করেনি, কিন্তু কাল যাওয়ার কথা ছিল।

«আরেকদিন থাক না।» — আপু বলল — «তোর তো কলেজ ছুটি।» — সে সিনথিয়ার দিকে তাকাল — চোখে কী যেন। «নাকি... থাকতে ইচ্ছে করছে না?»

সিনথিয়ার গলা শুকিয়ে গেল। «না... মানে... থাকতে পারি।»

«থাক।» — আপু হাসল। «আমার ভালো লাগে তুই থাকলে।»

দুলাভাই হঠাৎ কাশলেন — জোরে, অস্বাভাবিক। পানির গ্লাস তুলতে গিয়ে হাত কেঁপে পানি ছলকে পড়ল টেবিলে। «সরি,» — তিনি তোয়ালে টানলেন।

আপু তাকে দেখল — ভ্রু কুঁচকে। «তোমার হাত কাঁপছে কেন?»

«কাঁপছে না।» — দুলাভাই জোর গলায় বললেন — কিন্তু হাতটা টেবিলের নিচে লুকালেন। «গরম লাগছে।»

«এসি তো চলছে।» — আপু ঠান্ডা গলায় বলল। তারপর সিনথিয়ার দিকে ফিরল — «তোর গরম লাগছে না?»

«না... ঠিক আছি।»

«হুম।» — আপু খেতে লাগল — কিন্তু তার চোখ দুজনের ওপর ঘুরছিল — শিকারি চোখ। «আচ্ছা সিনথিয়া, তোর বয়ফ্রেন্ড আছে?»

সিনথিয়া বিষম খেল। «কী!»

«বয়ফ্রেন্ড।» — আপু নির্বিকার। «তোর বয়সে তো থাকে। লুকাস না।»

«না আপু! নেই!» — সিনথিয়ার মুখ লাল।

«সত্যি?» — আপু ঝুঁকল সামনে — «কেউ পছন্দ করে না? কলেজে? পাড়ায়?»

«আপু!» — সিনথিয়া পানি খেল — গলা ভেজাতে।

«আরে, লজ্জা পাস কেন?» — আপু হাসল — «আমি তোর আপু। আমাকে বলা যায়।» — সে এক মুহূর্ত থামল। «নাকি... কেউ আছে, যার কথা আমাকে বলা যায় না?»

ঘরে নীরবতা। দুলাভাইয়ের চামচ থেমে গেল মাঝপথে। সিনথিয়ার হৃৎপিণ্ড গলায় এসে আটকাল।

«আমি... আমি বুঝতে পারছি না তুমি কী বলছ,» — সিনথিয়া ফিসফিস করল।

আপু তাকিয়ে রইল — দীর্ঘ, গভীর। তারপর হঠাৎ হেসে উঠল — «আরে! মজা করছি! তোর মুখটা দেখ — সাদা হয়ে গেছে!» — সে দুলাভাইয়ের দিকে তাকাল — «দেখেছো? কেমন ভয় পেয়ে গেল!»

দুলাভাই জোর করে হাসলেন — «হ্যাঁ... হ্যাঁ।» — কিন্তু তার কপালে ঘাম।

খাওয়া চলছিল। আপু গল্প করছিল — পাড়ার খবর, অফিসের খবর। স্বাভাবিক গল্প। কিন্তু সিনথিয়ার মনে হচ্ছিল প্রতিটা কথার নিচে কিছু লুকিয়ে আছে। আপু যখন তার দিকে তাকাচ্ছিল — সেই দৃষ্টিতে কি... জানা? সে বুঝতে পারছিল না। হয়তো তার মনের ভুল। হয়তো আপু কিছুই দেখেনি। হয়তো ছায়াটা ছিল... অন্য কিছু।

কিন্তু ফোনের আলোটা? ক্লিক শব্দটা?

«সিনথিয়া,» — আপু হঠাৎ বলল — «তুই আজ সারাদিন কী করলি?»

«কী... কী আবার। শুয়েছিলাম। ফোন দেখছিলাম।» — গলা শুকিয়ে গেছিল।

«হুম।» — আপু তাকে দেখল — দীর্ঘ, স্থির। তারপর হাসল — অদ্ভুত হাসি। «বড় হচ্ছিস।»

সিনথিয়ার হাত থেকে চামচটা পড়ে যাওয়ার জোগাড় হলো। «মানে?»

«মানে...» — আপু উঠে পানি নিল — «মানে, কলেজে পড়িস, বড় তো হবিই।» — সে ফিরে তাকাল — চোখে ঝিলিক। «তাই না?»

দুলাভাই কাশলেন — জোরে। «পানি দাও।»

খাওয়া শেষ হলো। আপু প্লেট গোছাতে লাগল। সিনথিয়া সাহায্য করতে উঠল — হাত-পা ব্যস্ত রাখতে চাইছিল। রান্নাঘরে দুজনে — আপু বাসন ধুচ্ছিল, সিনথিয়া মুছছিল। নীরবতা। শুধু পানির শব্দ।

তারপর আপু বলল — নিচু গলায়, না তাকিয়ে — «সিনথিয়া।»

«হ্যাঁ আপু?»

«তুই আমাকে ভয় পাস?»

সিনথিয়ার হাত থেমে গেল। «কী... কী বলছ আপু?»

আপু তাকাল — এবার সরাসরি। চোখে চোখ। «আমি জিজ্ঞেস করছি — তুই আমাকে ভয় পাস কিনা।»

«না... না তো। কেন ভয় পাবো?»

আপু এক মুহূর্ত তাকিয়ে রইল। তারপর বাসনের দিকে ফিরল। «কিছু না। এমনিই।»

কিন্তু সিনথিয়া জানত — কিছু। নিশ্চয়ই কিছু।

হঠাৎ আপুর হাত তার হাতে লাগল — বাসন নিতে গিয়ে। আপু থামল না, কিন্তু এক সেকেন্ডের জন্য তার আঙুল সিনথিয়ার কবজিতে চাপ দিল — ইচ্ছে করে। সিনথিয়া তাকাল — আপু তাকায়নি, বাসন ধুচ্ছিল। কিন্তু তার ঠোঁটে হালকা হাসি।

«আপু,» — সিনথিয়া সাহস করে বলল — «তুমি... তুমি কি আমার ওপর রেগে আছো?»

আপু থামল। পানির কল বন্ধ করল। ধীরে ধীরে তাকাল। «তুই কী করেছিস যে আমি রাগ করব?»

«আমি... জানি না।» — সিনথিয়ার গলা কাঁপছিল। «তোমার... তোমার ব্যবহার... অন্যরকম লাগছে।»

আপু এক মুহূর্ত তাকিয়ে রইল। তারপর হাত বাড়িয়ে সিনথিয়ার গাল ছুঁল — ভেজা হাতে। «পাগলি।» — নরম গলায়। «আমি তোর আপু। আমি তোর ওপর রাগ করতে পারি?» — সে হাত সরিয়ে নিল। «নে, বাসন শেষ কর।»

কিন্তু যাওয়ার আগে — দরজার কাছে দাঁড়িয়ে, না ফিরে — আপু বলল — «আর হ্যাঁ। লুকিয়ে কিছু করলে... ধরা পড়ে যাওয়ার ভয় থাকে। মনে রাখিস।»

সিনথিয়ার রক্ত হিম হয়ে গেল। সে দাঁড়িয়ে রইল — হাতে ভেজা বাসন, বুক ধড়ফড়। আপু চলে গেল — কিন্তু কথাটা রয়ে গেল — বাতাসে, দেয়ালে, তার বুকে।

বাসন শেষ। আপু হাত মুছল। ড্রয়িংরুমে দুলাভাই টিভি দেখছিল — অথবা দেখার ভান করছিল। আপু দরজায় দাঁড়াল — «তুমি ঘরে যাও।»

দুলাভাই তাকাল — «কেন?»

«যাও।» — আপুর গলায় এমন কিছু ছিল যে দুলাভাই উঠে গেলেন — একবার সিনথিয়ার দিকে তাকিয়ে, চোখে সতর্কবার্তা। তিনি বেডরুমের দিকে গেলেন।

আপু সিনথিয়ার দিকে ফিরল — «তুইও আয়। আমার ঘরে।»

সিনথিয়ার পা জমে গেল। «আপু, আমি... আমার ঘুম পাচ্ছে...»

«আয়।» — একটাই শব্দ। নরম, কিন্তু অনড়।

সিনথিয়া গেল। পা টেনে টেনে। বেডরুমের দরজা খোলা ছিল। ভেতরে দুলাভাই বিছানায় বসে — মুখ সাদা। আপু ভেতরে ঢুকে দরজাটা বন্ধ করল। ছিটকিনি লাগাল। ক্লিক।

সেই শব্দ — ছিটকিনির ক্লিক — সিনথিয়ার বুকে বাজল।

«বোস।» — আপু বিছানার দিকে ইশারা করল। «দুজনেই।»

তারা বসল — পাশাপাশি, আপুর মুখোমুখি। আপু দাঁড়িয়ে রইল এক মুহূর্ত। তারপর ফোনটা বের করল। সিনথিয়ার রক্ত হিম হয়ে গেল।

«আপু...» — তার গলা ভেঙে গেল।

«চুপ।» — আপু ফোনটা তুলে ধরল। স্ক্রিনে — একটা ভিডিওর থাম্বনেইল। অন্ধকার ঘর। বিছানা। দুটো অস্পষ্ট শরীর। «চিনতে পারছিস?»

সিনথিয়া কাঁদতে শুরু করল — নিঃশব্দে, চোখের পানি গাল বেয়ে। «আপু... আমি... আমি দুঃখিত... আমি...»

«কাঁদিস না।» — আপুর গলা নরম হলো — আশ্চর্য নরম। সে বিছানায় বসল — সিনথিয়ার পাশে। তার হাত সিনথিয়ার পিঠে। «শোন। আমি রাগ করিনি।»

সিনথিয়া তাকাল — অবিশ্বাসে। «কী...?»

«আমি রাগ করিনি, পাগলি।» — আপু হাসল — এবার সত্যিকারের হাসি। «আমি...» — সে থামল, দুলাভাইয়ের দিকে তাকাল, তারপর সিনথিয়ার দিকে। «আমি করিডোর দিয়ে যাচ্ছিলাম — পানি নিতে। তোদের ঘর থেকে শব্দ আসছিল। আমি... দরজার ফাঁক দিয়ে দেখলাম।»

দুলাভাই মুখ নিচু করলেন — «শিলা, আমি...»

«তুমি চুপ করো।» — আপু তাকে থামাল — কিন্তু গলায় রাগ নেই। «আমি দেখলাম। অনেকক্ষণ দেখলাম।» — তার গলা নামল — প্রায় ফিসফিস। «তুই... তুই কাঁদছিলি না। তুই...» — আপু থামল, তারপর সত্যি গলায় — «তোর মুখে... আনন্দ ছিল। আমি দেখেছি। আর আমি...» — সে দুলাভাইয়ের দিকে তাকাল — «আমি দাঁড়িয়ে থাকতে পারছিলাম না। আমার পা কাঁপছিল। আমি রান্নাঘরে ফিরে গেলাম — কিন্তু রান্না করতে পারছিলাম না। আমার হাত কাঁপছিল। আমার...» — সে নিজের বুকের দিকে ইশারা করল — «এখানে আগুন জ্বলছিল।»

«শিলা...» — দুলাভাই ফিসফিস করলেন।

«তুমি জানো না,» — আপু তার দিকে ফিরল — চোখে জল আর আগুন, একসাথে — «তুমি জানো না আমি কতদিন ধরে...» — সে থামল। «তিন বছর। তিন বছর ধরে আমি তোমার বউ। আমি তোমাকে ভালোবাসি। কিন্তু...» — তার গলা ভাঙল — «কিন্তু আমি কখনো... আমি কখনো ভাবিনি আমি এটা চাইব। আজ... আজ দরজার ফাঁক দিয়ে দেখে... আমি বুঝলাম — আমি চাই। আমি...» — সে সিনথিয়ার দিকে তাকাল — «আমি তোকে ঘেন্না করি না, পাগলি। আমি তোকে... আমি তোর জায়গায় নিজেকে দেখছিলাম।»

সে একটু থামল — শ্বাস নিল। «আর আমি... আমি ভিডিও করলাম। চল্লিশ সেকেন্ড। জানি না কেন — হাত নিজে নিজে চলছিল। তারপর ফোন লক করলাম — সেই ক্লিকটা শুনেছিস তোরা।»

সিনথিয়া মুখ ঢাকল হাতে — «আপু, প্লিজ... ডিলিট করে দাও... প্লিজ...»

আপু ফোনটা তুলল। সবার সামনে — গ্যালারি খুলল, ভিডিওটা সিলেক্ট করল, ডিলিট চাপল। «ডিলিট।» — সে ফোনটা ঘুরিয়ে দেখাল — খালি গ্যালারি। «ট্র্যাশ থেকেও ডিলিট। দেখ।» — সে ট্র্যাশ খুলে দেখাল — খালি। «শেষ। কেউ কোনোদিন দেখবে না।»

সিনথিয়া তাকিয়ে রইল — «কেন... কেন ডিলিট করলে?»

«কারণ,» — আপু ফোনটা পাশে রাখল — «আমি তোদের শত্রু না। আমি...» — সে গভীর শ্বাস নিল। «আমি সত্যি কথাটা বলি? দেখে... আমার... আমার শরীর গরম হয়ে গেছিল। আমি রান্নাঘরে ফিরে গিয়ে... আমি নিজেকে...» — সে থামল, লাজুক হাসি। «বুঝতেই পারছিস।»

দুলাভাই তাকাল — চমকে। «শিলা!»

«কী শিলা?» — আপু তার দিকে ফিরল — চোখে আগুন। «তুমি ভাবো আমি জানি না তুমি কী চাও? তিন বছর ধরে তোমার সাথে আছি। তোমার চোখ আমি পড়তে পারি।» — সে সিনথিয়ার দিকে ফিরল। «আর তুই। তুই ভাবছিস আমি তোকে ঘেন্না করব? তুই জানিস আমি কেমন?» — আপু হাসল — দুষ্টু হাসি। «তোর দুলাভাই আমাকে বিছানায় কী কী বলে — শুনতে চাস?»

সিনথিয়ার মুখ লাল হয়ে গেল। «আপু!»

«শুনেছিস তো — দরজার ফাঁক দিয়ে।» — আপু চোখ টিপল। «ওই রাতে। মনে আছে?»

সিনথিয়া মাথা নিচু করল। হ্যাঁ — মনে আছে। সেই রাত — দুলাভাইয়ের গলা, আপুর চিৎকার, নোংরা কথা। সেই রাতেই তার ভেতরে কিছু ভেঙেছিল — কিছু জেগেছিল।

«শোন,» — আপু তার হাত ধরল — «আমি ঘুরিয়ে কথা বলব না। আমি যা চাই, সরাসরি বলছি।» — সে দুলাভাইয়ের দিকে তাকাল, তারপর সিনথিয়ার দিকে। «আমি চাই — তিনজন। একসাথে। আজ রাতে।»

ঘরে নীরবতা নামল — ভারী, ঘন।

সিনথিয়ার মাথা ঘুরছিল। «আপু... এটা... এটা কী বলছ...»

«আমি জানি এটা পাগলামি শোনাচ্ছে।» — আপু শান্ত গলায় বলল — «কিন্তু আমি সারাজীবন ভদ্র মেয়ে সেজে থেকেছি। আজ... আজ আমি ভদ্র থাকতে চাই না।» — সে সিনথিয়ার হাত চাপ দিল। «আর শোন — আমি তোকে জোর করছি না। একদম না। তুই না বললে — এই মুহূর্তে সব শেষ। আমি কোনোদিন এই রাতের কথা তুলব না। তোর দুলাভাইও তুলবে না।» — সে দুলাভাইয়ের দিকে তাকাল — «তাই না?»

দুলাভাই গভীর শ্বাস নিলেন — «শিলা, তুমি... তুমি সত্যি চাও?»

«আমি চাই।» — আপুর চোখে কোনো দ্বিধা নেই। «তুমি চাও না?»

দুলাভাই তাকিয়ে রইলেন — তার মুখে যুদ্ধ। «শিলা, এটা... এটা ঠিক না। তুমি আমার বউ। ও... ও বাচ্চা মেয়ে।»

«বাচ্চা?» — আপু হাসল — তীক্ষ্ণ। «যে মেয়ে এক ঘণ্টা আগে তোমার বিছানায় ছিল — সে বাচ্চা? তুমিই তো...» — সে থামল, সিনথিয়ার দিকে তাকিয়ে — নরম হলো। «সরি। আমি ওকে ছোট করছি না। আমি বলছি — ও জানে ও কী চায়। তাই না, সিনথিয়া?»

সিনথিয়া মাথা নাড়ল — ধীরে।

«দেখো,» — আপু দুলাভাইয়ের দিকে ফিরল — «আমি তোমাকে দোষ দিচ্ছি না। আমি জানি — পুরুষের... চাহিদা থাকে। আমি তিন বছর ধরে তোমাকে খুশি করার চেষ্টা করছি। কিন্তু আজ আমি বুঝলাম — আমিও কিছু চাই। আমিও...» — তার গলা নামল — «আমিও চাই — নতুন কিছু। ভয়ংকর কিছু।» — সে উঠে দুলাভাইয়ের পাশে বসল — তার হাত ধরল। «তুমি আমাকে ভালোবাসো?»

«পাগলের মতো।» — দুলাভাই ফিসফিস করলেন।

«তাহলে আমার এই ইচ্ছেটা পূরণ করো।» — আপু তার চোখে চোখ রাখল। «আমি তোমাকে কোনোদিন কিছু চাইনি। আজ চাইছি।»

দুলাভাই সিনথিয়ার দিকে তাকালেন — চোখে প্রশ্ন, ভয়, আকাঙ্ক্ষা — সব একসাথে। «আমি... আমি শুধু চাই — কেউ কষ্ট না পাক।»

«কেউ কষ্ট পাবে না।» — আপু বলল। «নিয়ম থাকবে।» — সে সিনথিয়ার দিকে ফিরল — «শোন পাগলি। নিয়ম এক — যেকোনো সময়, যেকেউ "থামো" বললে — সব থেমে যাবে। সাথে সাথে। কোনো প্রশ্ন না। নিয়ম দুই — এটা আমাদের তিনজনের গোপন। কেউ কোনোদিন জানবে না — রনি না, তোর মা-বাবা না, কেউ না। নিয়ম তিন —» — সে হাসল — «কেউ লজ্জা পাবে না। যা হবে, আমরা তিনজন মিলে করব।»

সিনথিয়া তাকিয়ে রইল আপুর দিকে। তার মাথায় ঝড়। ভয় — প্রচণ্ড ভয়। লজ্জা — গা পুড়ে যাওয়া লজ্জা। কিন্তু তার নিচে... আরেকটা কিছু। কৌতূহল। সেই কৌতূহল যেটা তাকে দরজার ফাঁকে টেনেছিল। যেটা তাকে দুলাভাইয়ের ঘরে টেনেছিল। যেটা এখনো জ্বলছিল — নিভেনি।

«আমি...» — তার গলা কাঁপছিল। «আমি ভয় পাচ্ছি, আপু।»

«আমিও পাচ্ছি।» — আপু সত্যি গলায় বলল। «প্রথমবার সবাই পায়।» — সে সিনথিয়াকে জড়িয়ে ধরল — বোনের মতো, উষ্ণ। «তুই আমার বোনের মতো, সিনথিয়া। আমি তোকে কখনো কষ্ট দেবো না। বিশ্বাস কর।»

সিনথিয়ার চোখে পানি — এবার অন্যরকম। সে আপুকে জড়িয়ে ধরল শক্ত করে। আপুর গায়ের গন্ধ — রান্নার মশলা, সাবান, আর কিছু — নারীর গন্ধ। সিনথিয়ার মাথায় চিন্তা ছুটছিল — মা কী বলবে? সমাজ কী বলবে? কিন্তু তারপর মনে পড়ল — দুলাভাইয়ের হাত, তার মুখ, সেই ঢেউ — পায়ের আঙুল থেকে মাথা পর্যন্ত। শরীর মিথ্যে বলে না। শরীর চায়। আর আপু — আপু তাকে ঘেন্না করছে না। আপু তাকে বোন বলছে। আপু নিজে চাইছে।

«থামো» বললে সব থেমে যাবে। এই নিয়মটা তাকে সাহস দিচ্ছিল। সে ফাঁদে পড়ছে না। সে বেছে নিচ্ছে।

সে ছাড়ল আপুকে। তারপর ফিসফিস করে বলল — «আমি... চাই।»

আপু ছাড়ল তাকে — চোখে আনন্দ। «সত্যি?»

«সত্যি।» — সিনথিয়া মাথা নাড়ল — গাল লাল, কিন্তু চোখে আলো। «আমি চাই।»

দুলাভাই তাকিয়ে রইলেন দুজনের দিকে — অবিশ্বাসে, কৃতজ্ঞতায়। «তাহলে...»

«তাহলে,» — আপু উঠে দাঁড়াল। ঘরের আলোটা কমিয়ে দিল — ডিম লাইট জ্বালাল। দরজার ছিটকিনি পরীক্ষা করল — বন্ধ। ফোনটা সাইলেন্ট করে ড্রয়ারে রাখল। তারপর বিছানার দিকে ফিরল — «তাহলে... শুরু করি?»

সিনথিয়া আর দুলাভাই তাকিয়ে রইলেন। আপু হাসল — সেই হাসি যেটা সিনথিয়া আগে কখনো দেখেনি — মুক্ত, দুষ্টু, ক্ষুধার্ত। সে নিজের কুর্তির প্রথম বোতামটা খুলল। ধীরে। তারপর দ্বিতীয়টা।

দুলাভাইয়ের শ্বাস আটকে গেল। «শিলা...»

«চুপ।» — আপু তার দিকে তাকাল — চোখে সেই দাপট যেটা সিনথিয়া দরজার ফাঁক দিয়ে দেখেছিল — সেই রাতে, যখন দুলাভাই আপুকে... — «আজ রাতে তুমি আমার কথা শুনবে। দুজনেই শুনবে।» — সে সিনথিয়ার দিকে হাত বাড়াল। «এসো।»

সিনথিয়া কাঁপা হাতে আপুর হাত ধরল। আপু তাকে টেনে তুলল — বিছানার মাঝখানে। দুলাভাইও উঠল — অন্য পাশে। তিনজন — বিছানায়। এত কাছে যে তিনজনের শ্বাস এক হয়ে যাচ্ছিল।

আপু সিনথিয়ার মুখটা ধরল — দুই হাতে, আলতো। «ভয় পাস না,» — ফিসফিস করে — «আমি আছি।» — তারপর — ধীরে ধীরে — আপু তার ঠোঁট সিনথিয়ার ঠোঁটে ছোঁয়াল।

সিনথিয়ার পৃথিবী থেমে গেল। নারীর ঠোঁট। নরম। উষ্ণ। মিষ্টি। দুলাভাইয়ের চুমুর মতো নয় — অন্যরকম। আপু চুমু খেল — প্রথমে আলতো, তারপর গভীর। সিনথিয়ার হাত নিজে নিজে উঠে আপুর চুলে ডুবল।

পাশে — দুলাভাইয়ের ভারী শ্বাস। তার হাত সিনথিয়ার পিঠে — কাঁপা। আপু এক হাতে তাকেও টানল — «এসো।» — তিনটে শরীর — একসাথে। তিনটে হৃৎপিণ্ড — এক ছন্দে।

আর বাইরে — করিডোরে — নীরবতা। রনি নেই। পৃথিবী নেই। শুধু এই ঘর — এই বিছানা — এই তিনজন।
Like Reply
#17
তিনজনের রাত

আপুর ঠোঁট সিনথিয়ার ঠোঁটে — নরম, দাবিদার। সিনথিয়ার হাত আপুর চুলে — ঘন, লম্বা চুল — আঙুল ডুবে যাচ্ছিল। পাশে দুলাভাই — তার হাত সিনথিয়ার পিঠে, কাঁপছিল। আপু তাকে টানল — «এসো।» — আর দুলাভাইয়ের ঠোঁট নামল সিনথিয়ার ঘাড়ে — গরম, ভারী।

তিনটে শরীর। এক বিছানা। সিনথিয়ার মাথা ঘুরছিল — এটা কি সত্যি? আপু — তার শিলা আপু — তাকে চুমু খাচ্ছে? আর দুলাভাই... দুজনে... একসাথে?

«ভয় পাস না,» — আপু ফিসফিস করল তার ঠোঁটে — «শুধু... অনুভব কর।»

আপুর হাত নামল — সিনথিয়ার কুর্তির বোতামে। একটা। দুটো। ধীরে — যেন সময় থামিয়ে। প্রতিটা বোতামের সাথে সিনথিয়ার শ্বাস ভারী হচ্ছিল। দুলাভাইয়ের হাতও এলো — পেছন থেকে — তার কাঁধে, তার পিঠে — গরম হাত — কাঁপা হাত। কুর্তিটা খুলে গেল — মেঝেতে পড়ল নিঃশব্দে। তারপর সালোয়ার — ধীরে নামিয়ে দিল আপু নিজে — হাঁটু গেড়ে বসে — চোখ তুলে তাকিয়ে।

সিনথিয়া কেঁপে উঠল — কিন্তু আপু তাকে ধরল — «দেখি তোকে।» — আপুর চোখে মুগ্ধতা — খাঁটি মুগ্ধতা। «এত সুন্দর...» — আপুর আঙুল তার পাঁজরে — হালকা — «তোর বয়সে আমি...» — সে থামল, হাসল — «আমি কখনো এত সাহসী ছিলাম না।»

«আপু...» — সিনথিয়া ফিসফিস করল — লজ্জায় মুখ ঢাকতে গেল।

«ঢাকিস না।» — আপু তার হাত সরিয়ে দিল — আলতো। «আজ রাতে কোনো লজ্জা না। মনে আছে নিয়ম?»

সিনথিয়া মাথা নাড়ল।

«তাহলে,» — আপু নিজের কুর্তি খুলল — এক টানে। তারপর নিজের সব। সিনথিয়া দেখল — আপুর শরীর — পূর্ণ, নারীসুলভ — বুক ভারী, কোমর সরু। আপু লজ্জা পেল না — সোজা দাঁড়াল, হাসল — «দেখ। আমি তোর সামনে লজ্জা পাচ্ছি না। তুইও পাস না।»

দুলাভাই তাকিয়ে রইলেন — দুজন নারী — তার বউ, আর... — তার শ্বাস ভারী হচ্ছিল। তিনি নিজের শার্ট খুললেন। প্যান্ট।

«এসো,» — আপু বিছানায় উঠল — মাঝখানে। «দুজনেই।»

তারা উঠল। আপু সিনথিয়াকে টানল — তার কোলে — যেন ছোট বোনকে কোলে নিচ্ছে। কিন্তু এটা বোনের আদর নয় — আপুর হাত সিনথিয়ার কোমরে — দাবিদার। «শোন,» — আপু ফিসফিস করল — তার ঠোঁট সিনথিয়ার কানে — «আমি তোকে দেখাবো — মেয়েরা কীভাবে...» — সে থামল, হাসল — গরম শ্বাস কানে — «তুই শুধু চোখ বন্ধ করে অনুভব কর।»

আপুর ঠোঁট নামল — সিনথিয়ার গলায় — সেই জায়গায় যেখানে দুলাভাই দাগ বসিয়েছিল। আপু সেই দাগে চুমু খেল — «এটা...» — ফিসফিস করে — «এটা আমার স্বামীর কাজ।» — তারপর নিচে — কাঁধে — বুকে। সিনথিয়া চমকে উঠল — «আপু!» — কিন্তু আপু থামল না। নারীর জিভ — নরম, ভেজা, অভিজ্ঞ — তার বুকে — বৃত্ত আঁকছিল। সিনথিয়ার পিঠ বেঁকে গেল। «আহ...» — শব্দ বেরিয়ে এলো নিজে নিজে — গভীর থেকে।

আপুর হাত নামছিল — পেটে — আরো নিচে। সিনথিয়া তার কবজি চেপে ধরল — «আপু...»

«ছাড়,» — আপু নরম গলায় — «বিশ্বাস কর।»

সিনথিয়া ছাড়ল। আর আপুর আঙুল... — সিনথিয়ার চিৎকার বেরিয়ে এলো — «আপু!» — তার হাত আপুর চুলে — টানছে। «আমি... আমি...»

পাশে — দুলাভাই দেখছিল — চোখ জ্বলজ্বলে। তার হাত নিজের... — সে থামল না। «শিলা...» — তার গলা ভাঙা।

«দেখো,» — আপু তাকাল — ঠোঁট ভেজা — «দেখো তোমার বউ কী করে।» — সে আবার নামল।

সিনথিয়ার হাত আপুর চুলে — টানছে, ছাড়ছে। তার শরীরে ঢেউ — একটার পর একটা। «আপু... আমি... আমি পারছি না...»

«পারবি।» — আপু ফিসফিস করল — «আসতে দে।»

আর এলো — তীব্র, অন্ধকার — সিনথিয়া চিৎকার চেপে ধরল বালিশে। তার শরীর কাঁপছিল — অনেকক্ষণ — ঢেউয়ের পর ঢেউ। আপু থামল না — ধীরে ধীরে — তাকে নামিয়ে আনল — নরম করে। তারপর উঠে এলো — তার মুখে হাসি — ঘামে ভেজা — «দেখলি? মেয়েরা জানে — মেয়েদের শরীর।» — সে সিনথিয়ার কপালে চুমু খেল — «তুই এত... এত সুন্দর করে...»

সিনথিয়া হাঁপাচ্ছিল — চোখে পানি — আনন্দে। «আপু... তুমি... আমি কখনো ভাবিনি...»

«আমিও না,» — আপু হাসল — «আজ সকালে যদি কেউ বলত — আমি হাসতাম।» — সে সিনথিয়ার চুল সরিয়ে দিল মুখ থেকে — «কিন্তু জীবন... জীবন অদ্ভুত, তাই না?»

সিনথিয়া হাঁপাচ্ছিল — «আপু... তুমি...»

«এবার তোর পালা।» — আপু শুয়ে পড়ল — হাত বাড়াল — চোখে আমন্ত্রণ। «আয়। আমাকে...» — সে থামল — চোখে লাজুক আগুন। «তুইও পারবি।»

সিনথিয়া কাঁপছিল। সে কখনো... — কোনো মেয়েকে... — কিন্তু আপুর চোখে উৎসাহ — কোনো চাপ নেই, শুধু আমন্ত্রণ। সে ঝুঁকল — আলতো — প্রথমে আপুর ঠোঁটে। তারপর নিচে — আপুর গলায় — যেখানে ঘাম জমেছে। আপু শিউরে উঠল — «আহ... হ্যাঁ... এই তো...» — তার হাত সিনথিয়ার চুলে — গাইড করছিল — নরম করে, ধৈর্য ধরে। «এই তো... পাগলি... তুই... তুই তো শিখে গেছিস...»

সিনথিয়ার ভেতরে কিছু খুলে যাচ্ছিল — লজ্জার দেয়াল — একটার পর একটা ভাঙছিল। সে আপুর শরীরে হাত বোলাল — কাঁপা হাতে — আবিষ্কারের আনন্দে। আপুর শ্বাস ভারী হচ্ছিল — «আরো... আরো নিচে...» — সিনথিয়া গেল — আপু চিৎকার চেপে ধরল — «আহ! সিনথিয়া!»

«দেখো,» — আপু হাঁপাতে হাঁপাতে তাকাল দুলাভাইয়ের দিকে — «দেখো তোমার শালী কী শিখেছে!»

আর তখন — দুলাভাই আর পারলেন না। তিনি ঝাঁপিয়ে পড়লেন — আপুকে টানলেন — «এবার আমি।» — গলায় সেই দাপট — সেই রাতের দাপট — দরজার ফাঁকের রাতের দাপট। তিনি আপুকে ঘুরিয়ে দিলেন — পেছন থেকে — এক টানে। আপু হাসল — বন্য হাসি — «এই তো... আমার স্বামী... এই তো...»

সিনথিয়া দেখছিল — চোখ বড় বড় — নড়তে পারছিল না। দুলাভাই আপুর সাথে — বন্য, দ্রুত, নির্মম। আপুর চিৎকার — «আহ! আরো! আরো জোরে!» — সেই চিৎকার যেটা সিনথিয়া দরজার ফাঁক দিয়ে শুনেছিল — ফিসফিস, চাপা। আজ — খোলা, বন্য — সামনে থেকে। আপুর হাত বিছানার চাদর আঁকড়ে ধরেছিল — তার পিঠ বেঁকে যাচ্ছিল প্রতিটা ধাক্কায়।

«বল শিলা,» — দুলাভাই গর্জালেন — তার হাত আপুর চুলে — টান — «বল তুই কী!»

«আমি তোমার...» — আপু হাঁপাচ্ছিল — চিৎকার করছিল — «তোমার খানকি! তোমার মাগি! তোমার ধোনের দাসী!»

সিনথিয়ার গায়ে কাঁটা দিল। আপু — তার শান্ত, ভদ্র, রান্নাঘরের আপু — এই কথা বলছে? চিৎকার করে? কিন্তু আপুর মুখে... আনন্দ। লজ্জা নেই। ভয় নেই। শুধু আনন্দ — খাঁটি, বন্য আনন্দ।

«এই তো,» — দুলাভাইয়ের হাত আপুর পিঠে — চাপ — «এই তো আমার মাগি।» — তিনি সিনথিয়ার দিকে তাকালেন — চোখে আগুন — «দেখলি? দেখলি তোর আপু কেমন?» — তিনি থামলেন না — গতি আরো বাড়িয়ে — আপু চিৎকার করছিল — «আয়। এদিকে আয়।»

সিনথিয়া গেল — কাঁপতে কাঁপতে — বিছানায় হামাগুড়ি দিয়ে। আপু তাকে দেখল — হাঁপাতে হাঁপাতে — হাত বাড়াল — «আয়...» — সিনথিয়া আপুর কাছে গেল — আপু তাকে টানল — তার ঠোঁটে চুমু খেল — গভীর — দুলাভাইয়ের ধাক্কার তালে তালে কাঁপতে কাঁপতে। সিনথিয়ার হাত আপুর বুকে — আপুর হাত সিনথিয়ার চুলে। তিনজন — একসাথে — এক ছন্দে।

«তুই...» — আপু হাঁপাল সিনথিয়ার ঠোঁটে — «তুই এত...» — আর এলো — আপুর চিৎকার — তীব্র — «আমি... আমি আসছি!» — তার শরীর কেঁপে উঠল — দুলাভাই তাকে ধরে রাখলেন — «এই তো... এই তো...»

আপু এলিয়ে পড়ল — হাঁপাচ্ছে। দুলাভাই থামলেন না — তিনি সিনথিয়ার দিকে তাকালেন — «এবার তুই।»

সিনথিয়া গেল — কাঁপতে কাঁপতে। দুলাভাই তাকে টানলেন — তার ঠোঁটে গভীর চুমু — বন্য। «তোর পালা,» — তিনি ফিসফিস করলেন — «শুয়ে পড়।»

সিনথিয়া শুলো। আপু এলো — তার পাশে — তার হাত ধরল। «আমি আছি,» — ফিসফিস করে। «ভয় নেই।»

দুলাভাই তার ওপরে এলেন — ভারী, গরম। তার চোখে — ক্ষুধা আর আদর, একসাথে। «রেডি?»

সিনথিয়া মাথা নাড়ল — «হ্যাঁ।» — এবার ভয় কম — শরীর মনে রেখেছে।

তিনি ঢুকলেন — ধীরে। এবার ব্যথা কম — টান, চাপ — তারপর... আনন্দ — গভীর, পূর্ণ। «আহ...» — সিনথিয়া আপুর হাত চেপে ধরল — শক্ত করে। আপু তার আঙুলে আঙুল ডুবিয়ে দিল।

«এই তো,» — দুলাভাই ফিসফিস করলেন — গতি বাড়িয়ে — ধীরে ধীরে — «এই তো আমার মাল... তোর ভোদাটা... এত গরম... এত টাইট...» — প্রতিটা শব্দে তার গলা ভারী হচ্ছিল।

আপু দেখছিল — তার হাত সিনথিয়ার বুকে — আলতো — বৃত্ত আঁকছে। «কেমন লাগছে?» — ফিসফিস করে — চোখে আদর।

«ভালো...» — সিনথিয়া হাঁপাচ্ছিল — «খুব ভালো... আপু... তুমি... তুমি পাশে আছো বলে...»

«আমি আছি,» — আপু তার কপালে চুমু খেল — «আমি কোথাও যাচ্ছি না।» — সে সিনথিয়ার চুলে হাত বোলাল — «জানিস, তোকে এভাবে দেখে...» — তার গলা নামল — «আমার... আমারও ইচ্ছে করছে।»

«তাহলে আয়,» — দুলাভাই হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন — থামেননি — «তুইও আয়।»

আপু সিনথিয়ার পাশে শুলো — দুজন নারী — পাশাপাশি। দুলাভাই তাকালেন — দুজনের দিকে — চোখে পাগলামি। «তোরা... তোরা দুজন...» — তিনি একবার সিনথিয়ায়, একবার আপুতে — «আমি... আমি স্বপ্ন দেখছি না তো?»

«স্বপ্ন না,» — আপু হাসল — তার হাত সিনথিয়ার হাতে — «সত্যি।»

«বল,» — দুলাভাইয়ের গলা — দাপট — হঠাৎ জোরে — «বল তুই কী চাস!»

«আপনার ধোনটা!» — সিনথিয়া চিৎকার করল — লজ্জা ভেঙে গেছে — চুরমার — «আরো! আরো জোরে! আমাকে...»

«এই তো!» — দুলাভাই হাসল — বন্য — গতি বাড়িয়ে — বিছানা কাঁপছিল — দেয়ালে মাথা ঠুকছিল — «এই তো আমার খানকি! এই তো আমার মাগি!» — প্রতিটা ধাক্কায় — «তোর আপু দেখছে — দেখছে তুই কেমন মাগি! বল — বল তুই কার!»

«তোমার!» — সিনথিয়া চিৎকার করল — «আমি তোমার! আমার ভোদাটা তোমার!»

«আর আমি?» — আপু হাসল — দুষ্টু — তার ঠোঁট সিনথিয়ার কানে — «আমি কার?»

«তোমারও!» — সিনথিয়া হাসল — কাঁদল — একসাথে — «আমি তোমাদের দুজনের!»

«এই তো!» — দুলাভাই গর্জালেন — «এই তো আমার কথা!» — তিনি আরো জোরে — আরো গভীরে — সিনথিয়ার নখ তার পিঠে — দাগ বসিয়ে দিচ্ছিল। আপু তার পাশে — তার ঠোঁট সিনথিয়ার ঠোঁটে — তার হাত সিনথিয়ার হাতে। তিনজন — এক শরীর যেন।

«আমি... আমি আসছি...» — সিনথিয়া চিৎকার করল — পিঠ বেঁকে গেল ধনুকের মতো।

«আসতে দে!» — দুলাভাই গর্জাল — «দুজনেই! একসাথে! এখন!»

আর এলো — সিনথিয়ার চিৎকার — আকাশ ফাটিয়ে — আপুর হাত তার হাতে — শক্ত করে ধরা — দুলাভাইয়ের গর্জন — গভীর থেকে — একসাথে। ঘর কাঁপছিল — বিছানা কাঁপছিল — দেয়াল কাঁপছিল। সিনথিয়ার পায়ের আঙুল বেঁকে গেল — চোখে অন্ধকার — তারপর আলো — সাদা আলো।

আপু হাসছিল — চোখে পানি — আনন্দে। সে ঝুঁকে সিনথিয়ার ঠোঁটে চুমু খেল — গভীর — দুলাভাইয়ের ধাক্কার তালে তালে। তিনজন — এক ছন্দে।

«আমি... আমি আসছি...» — সিনথিয়া চিৎকার করল।

«আসতে দে!» — দুলাভাই গর্জাল — «দুজনেই! একসাথে!»

আর এলো — সিনথিয়ার চিৎকার — আপুর হাত তার হাতে — দুলাভাইয়ের গর্জন — একসাথে। ঘর কাঁপছিল।

তারপর — নীরবতা। শুধু তিনজনের হাঁপানি — ভারী, গভীর। সিনথিয়ার শরীরে এখনো ঢেউয়ের রেশ — হালকা কাঁপন। আপুর হাত এখনো তার হাতে — ঘামে ভেজা। দুলাভাইয়ের মাথা তার কাঁধে — ভারী।

«ও মা...» — আপু ফিসফিস করল — হাসি — «এটা... এটা কি সত্যি হলো?»

«সত্যি,» — দুলাভাই বললেন — তার গলায় ক্লান্তি আর তৃপ্তি। «তুমি... তুমি অবিশ্বাস্য। দুজনেই।»

দুলাভাই সরে এলেন — পাশে শুলেন — সিনথিয়াকে টানলেন বুকে।

«কেমন?» — আপু ফিসফিস করল।

সিনথিয়া হাসল — ক্লান্ত, তৃপ্ত। «আপু... আমি... আমি ভাষা হারিয়ে ফেলেছি।»

তিনজনে হাসল — নরম, উষ্ণ।

কিন্তু দুলাভাইয়ের চোখে এখনো আগুন। তিনি সিনথিয়ার দিকে তাকালেন — «মনে আছে আমি কী বলেছিলাম?»

সিনথিয়া তাকাল — «কী?»

«একদিন...» — তিনি ফিসফিস করলেন — «আমার মালটা তোর মুখেই দেবো।»

সিনথিয়ার বুক ধড়ফড় করল। আপু তাকাল — কৌতূহলে। «কী বলছো?»

«কিছু না,» — দুলাভাই হাসলেন — «শুধু...» — তিনি সিনথিয়ার দিকে তাকালেন — চোখে প্রশ্ন। «চাস?»

সিনথিয়া এক মুহূর্ত তাকিয়ে রইল — দুলাভাইয়ের চোখে — আপুর চোখে। তার বুক ধড়ফড় করছিল। মুখে... — সে আগে একবার করেছে — একটু — কিন্তু এটা... এটা অন্য। কিন্তু তার ভেতরে — সেই কৌতূহল — সেই আগুন — যেটা আজ সারাদিন তাকে টেনেছে — এক নিষিদ্ধ থেকে আরেক নিষিদ্ধে।

«আমি...» — সে থামল। আপু তার হাত চাপ দিল — «তুই না চাইলে — না। মনে আছে নিয়ম?»

সিনথিয়া আপুর দিকে তাকাল — তারপর দুলাভাইয়ের দিকে। তারপর — ধীরে — মাথা নাড়ল। «হ্যাঁ।» — তার গলা পরিষ্কার। «আমি চাই।»

আপু বুঝল — তার চোখ বড় হলো — তারপর হাসল — «ওহো! তাহলে দেখি!» — সে উঠে বসল — দেখতে।

সিনথিয়া নামল — ধীরে — হাঁটু গেড়ে। দুলাভাইয়ের শ্বাস ভারী হলো — হঠাৎ। তার হাত সিনথিয়ার চুলে — আলতো — «আহ...» — সিনথিয়া নিল — মুখে — প্রথমে আলতো — জিভ বোলাল — তারপর গভীর — যতটা পারে। লবণাক্ত স্বাদ — পরিচিত এখন। তার গাল ভরে গেল। আপু দেখছিল — শ্বাস আটকে — বিছানায় উঠে বসে — «ও মা...» — ফিসফিস করে — চোখ বড় বড় — «তুই... তুই তো...»

«চুপ করে দেখ,» — দুলাভাই হাঁপালেন — «দেখ তোর বোন কী পারে... আহ...» — তার হাত সিনথিয়ার চুলে — টানছিল — ছাড়ছিল। «এই তো... এই তো...»

সিনথিয়ার চোখে পানি — কিন্তু সে থামল না। তার হাতও কাজ করছিল — ছন্দে। দুলাভাইয়ের পা কাঁপছিল — «আসছে...» — তিনি গর্জালেন — «আসছে... সিনথিয়া...» — তার হাত সিনথিয়ার চুলে — শক্ত — «নে... সবটা নে... আমার মালটা... সবটা...»

আর এলো — গরম, তীব্র — সিনথিয়ার মুখে — ঢেউয়ের মতো। সে নিল — সবটা — এক ফোঁটাও ফেলল না। গিলল। তারপর উঠে এলো — ঠোঁট ভেজা — চোখে... গর্ব — লজ্জা নেই।

«দেখলি?» — সে আপুর দিকে তাকাল — হাসি — বুক ফুলিয়ে।

আপু তাকিয়ে রইল — তারপর হঠাৎ সিনথিয়াকে জড়িয়ে ধরল — «পাগলি! তুই তো...» — সে হাসছিল, কাঁদছিল — একসাথে। «আমার বোন...»

তিনজন শুলো — একসাথে। দুলাভাই মাঝখানে — দুই পাশে দুজন নারী। তার দুই হাত — দুজনের ওপর — এক হাত আপুর কোমরে, এক হাত সিনথিয়ার চুলে। নীরবতা — উষ্ণ, নিরাপদ — শুধু তিনজনের শ্বাস — ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হচ্ছে।

«এটা...» — আপু ফিসফিস করল — সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে — «এটা আমাদের গোপন। তিনজনের। কেউ জানবে না।»

«তিনজনের,» — দুলাভাই বললেন — তার হাত সিনথিয়ার চুলে — আলতো। «তুই... তুই ঠিক আছিস তো?»

সিনথিয়া মাথা নাড়ল — আপুর বুকে। «আমি... আমি ভালো আছি।» — সে থামল — «আসলে... আমি কখনো এত ভালো ছিলাম না।»

আপু হাসল — তার হাত সিনথিয়ার পিঠে — বৃত্ত আঁকছে — মায়ের মতো, বোনের মতো। «জানিস,» — সে ফিসফিস করল — «আমি ভয় পাচ্ছিলাম — তুই আমাকে ঘেন্না করবি।»

«ঘেন্না?» — সিনথিয়া তাকাল — «আপু, তুমি আমাকে... তুমি আমাকে সবচেয়ে সুন্দর উপহার দিলে।» — তার চোখে পানি — «তুমি আমাকে লজ্জা থেকে মুক্তি দিলে।»

«পাগলি,» — আপু তাকে জড়িয়ে ধরল — শক্ত করে।

দুলাভাই দেখছিলেন দুজনকে — চোখে কিছু — কৃতজ্ঞতা, ভালোবাসা। «আমি...» — তিনি বললেন — «আমি ভাগ্যবান।»

«ভাগ্যবান?» — আপু হাসল — «দুজন মেয়ে পেয়ে?»

«দুজন...» — দুলাভাই থামলেন — «দুজন অসাধারণ মেয়ে পেয়ে।» — তিনি দুজনকেই টানলেন — কাছে।

অনেকক্ষণ — কেউ কথা বলল না। শুধু শ্বাস। শুধু হৃৎপিণ্ড। ঘড়ির টিকটিক। বাইরে রাত — গভীর। সিনথিয়ার চোখ বন্ধ হয়ে আসছিল — ক্লান্তি, তৃপ্তি — শরীরের প্রতিটা কোষ শান্ত।

তখনই — তার মনে পড়ল। হঠাৎ। বিদ্যুৎচমকের মতো।

সে উঠে বসল — চোখ বড় বড়। «আপু!»

«কী? কী হলো?» — আপু উঠল।

«তোমার ফোন...» — সিনথিয়ার গলা কাঁপছিল — «তুমি ভিডিওটা ডিলিট করেছো — গ্যালারি থেকে, ট্র্যাশ থেকেও। কিন্তু...» — সে আপুকে দেখল — ভয়ে — চোখ বড় বড় — «তোমার ফোনে... অটো ব্যাকআপ চালু নেই তো? গুগল ফটোসে? আমার ফোনে তো... আমার ফোনে তো সব ছবি অটো আপলোড হয়...»

ঘরে নীরবতা নামল — ঠান্ডা, ভারী — আগের উষ্ণতা মুহূর্তে উধাও।

আপুর মুখ সাদা হয়ে গেল। «আমি... আমি জানি না...» — সে উঠল — ড্রয়ার থেকে ফোন বের করল — হাত কাঁপছিল। «আমি... আমি কখনো চেক করিনি...»

দুলাভাইও উঠে বসলেন — «দেখো। এখনই দেখো।»

আপু ফটোস অ্যাপ খুলল — হাত কাঁপছিল এত যে দুবার ভুল অ্যাপ খুলল। সিনথিয়া আর দুলাভাই তার দুই পাশে — শ্বাস আটকে — তিনটে মুখ এক স্ক্রিনে। আপু সার্চ করল — «ভিডিও» — তারিখ — আজ।

স্ক্রিনে — লোডিং। ঘুরছে। ঘুরছে। ঘুরছে।

«লোড হচ্ছে না কেন?» — দুলাভাই ফিসফিস করলেন।

«নেট স্লো,» — আপু ফিসফিস করল — «অপেক্ষা করো...»

সিনথিয়ার হৃৎপিণ্ড গলায়। যদি... যদি ভিডিওটা ক্লাউডে উঠে গিয়ে থাকে... — কেউ দেখে ফেললে... — তার মা... — সে ভাবতে পারছিল না।

আর তখন — ফোনটা বাজল। রনির নাম — স্ক্রিনে ভেসে উঠল — লোডিং ঢেকে গেল।

তিনজনেই তাকাল — একে অপরের দিকে।

আপু ফোনটা ধরল — স্পিকারে। «হ্যাঁ রনি?»

«আপু,» — রনির গলা — উত্তেজিত — «আমি কাল সকালে না... আমি এখনই ফিরছি। বন্ধুর বাবা হাসপাতালে — ওদের বাসায় থাকা যাবে না। আমি রাস্তায় — বিশ মিনিটে পৌঁছে যাবো।»

ফোন কাটল। এক সেকেন্ড — নীরবতা।

তিনজন — বিছানায় — নগ্ন — ঘামে ভেজা — একে অপরের দিকে তাকিয়ে।

«বিশ মিনিট,» — দুলাভাই ফিসফিস করলেন — «বিশ মিনিটে...»

«ওঠো!» — আপু ফিসফিস করল — বিছানা থেকে লাফিয়ে উঠে — «এখনই! জামা পর! সবাই!»

সিনথিয়া উঠল — পা কাঁপছিল — মেঝেতে ছড়িয়ে থাকা জামা খুঁজতে লাগল — কুর্তি কোথায়? সালোয়ার? আপু বাতি জ্বালাল — «তাড়াতাড়ি!» — তিনজন — হুড়োহুড়ি — জামা পরা — চুল ঠিক করা — বিছানার চাদর টানটান করা।

«ফোন!» — সিনথিয়া ফিসফিস করল — «আপু, তোমার ফোন — ব্যাকআপ চেক...»

«পরে!» — আপু ফোনটা ড্রয়ারে ছুঁড়ে দিল — «আগে রনি!»

দরজার ছিটকিনি খুলল। তিনজন বেরিয়ে এলো — স্বাভাবিক মুখে — স্বাভাবিক ভাবে। কিন্তু তিনজনেরই চোখে — একই আগুন — একই গোপন।

আর ড্রয়ারের ভেতরে — আপুর ফোনে — ফটোস অ্যাপে — লোডিং এখনো ঘুরছিল।
Like Reply
#18
osadharon suru
Like Reply
#19
বিশ মিনিট

«বিশ মিনিট,» — দুলাভাই ফিসফিস করলেন — «বিশ মিনিটে...»

«ওঠো!» — আপু বিছানা থেকে লাফিয়ে উঠল — «এখনই! জামা পর! সবাই!»

ঘরে হুড়োহুড়ি শুরু হলো। সিনথিয়া উঠল — পা কাঁপছিল — মেঝেতে ছড়িয়ে থাকা জামা খুঁজতে লাগল। কুর্তি কোথায়? বিছানার পাশে। সালোয়ারটা বিছানার নিচে — টেনে বের করল। ওড়না? চেয়ারের ওপর। দুলাভাই প্যান্ট খুঁজছিলেন — «আমার শার্ট?» — «ওই তো, চেয়ারে!» — আপু বাতি জ্বালাল — উজ্জ্বল আলোয় তিনজনেই চমকে উঠল — ঘামে ভেজা শরীর, এলোমেলো চুল, লাল চোখ।

«চাদর!» — আপু ফিসফিস করল — বিছানার দিকে তাকিয়ে। চাদরে দাগ — স্পষ্ট — তিনজনের রাতের সাক্ষী। «বদলাতে হবে। এখনই।» — সে আলমারি খুলে নতুন চাদর বের করল — তিনজনে মিলে চাদর বদলাল — দশ সেকেন্ডে — হাত হাতে লেগে যাচ্ছিল। ভেজা চাদরটা বাথরুমে — বালতিতে — পানি ঢেলে দিল আপু — «সকালে ধুবো।»

«বালিশের কভার?» — দুলাভাই জিজ্ঞেস করলেন।

«ঠিক আছে।» — আপু পরীক্ষা করল — «শুধু চাদর।»

«চুল!» — আপু সিনথিয়ার দিকে তাকাল — «তোর চুল — বেঁধে নে। ঠোঁট —» — সে থামল — সিনথিয়ার ফোলা ঠোঁটের দিকে তাকিয়ে — «কিছু করার নেই। অন্ধকারে বোঝা যাবে না।»

সিনথিয়া তাড়াহুড়ো করে খোঁপা করল — হাত কাঁপছিল। আপু নিজের চুল আঁচড়াল — খোঁপা করল শক্ত করে। দুলাভাই মুখে পানি ছিটালেন — বাথরুম থেকে বেরিয়ে এলেন — শার্টের বোতাম লাগাতে লাগাতে। তিনজনেই আয়নায় নিজেদের দেখল — পাশাপাশি দাঁড়িয়ে — তিনটে মুখ — তিনটে গোপন।

«শোনো,» — আপু ফিসফিস করল — «স্বাভাবিক থাকবি। কেউ কাউকে... ওভাবে দেখবি না।» — সে সিনথিয়ার দিকে তাকাল — «তুই গেস্ট রুমে যা। বই নিয়ে বোস। আমি চা বসাচ্ছি।» — সে দুলাভাইয়ের দিকে — «তুমি টিভি দেখো।»

«আর ফোন?» — সিনথিয়া জিজ্ঞেস করল।

আপু ড্রয়ারের দিকে তাকাল — «পরে।» — তার গলা নামল — «প্রথমে রনি।»

দরজার ছিটকিনি খুলল। তিনজন বেরিয়ে এলো — ড্রয়িংরুমে। দুলাভাই টিভি চালালেন — খবর — ভলিউম কম। আপু রান্নাঘরে গেল — চা বসাল — যদিও কেউ চা চায়নি। সিনথিয়া গেস্ট রুমে গিয়ে বই নিয়ে এলো — ড্রয়িংরুমে বসল — পড়ার ভান।

দশ মিনিট — অসহ্য দশ মিনিট। ঘড়ির কাঁটা যেন থেমে গেছে। আপু রান্নাঘরে বাসন নাড়ছিল — অকারণে। দুলাভাই চ্যানেল বদলাচ্ছিল — একটার পর একটা — কিছুই দেখছিল না। সিনথিয়া একই পাতা তিনবার পড়ল — একটা শব্দও মাথায় ঢুকল না।

«শোনো,» — আপু ফিসফিস করল — রান্নাঘরের দরজায় — «ও এলে — স্বাভাবিক। কেউ...» — সে সিনথিয়ার দিকে তাকাল — «তুই ওর দিকে ওভাবে তাকাস না।»

«কীভাবে?» — সিনথিয়া ফিসফিস করল।

«যেভাবে তাকাচ্ছিলি।» — আপু বলল — «ভয়ে।»

«আমি ভয় পাচ্ছি, আপু।»

«আমিও।» — আপু সত্যি গলায় — «কিন্তু ভয় দেখালে সন্দেহ হবে।» — সে রান্নাঘরে ফিরে গেল।

তখনই — কলিং বেল। তিনজনেই চমকে উঠল।

আপু দরজা খুলল — «রনি!» — গলায় উচ্ছ্বাসের ভান — কিন্তু সিনথিয়া শুনতে পেল — ভানের নিচে টান। রনি দাঁড়িয়ে — ক্লান্ত, চোখে ঘুম নেই, শার্টে ভাঁজ। «আয়, ভেতরে আয়।» — আপু তাকে জড়িয়ে ধরল — এক সেকেন্ড বেশি — যেন নিজেকে সামলাচ্ছে।

রনি ঢুকল — ব্যাগটা সোফায় ফেলল — ধপ করে বসল — মাথা পেছনে হেলিয়ে। «বন্ধুর বাবা...» — সে মাথা নিচু করল — «হাসপাতালে। স্ট্রোক। অবস্থা... স্থিতিশীল, ডাক্তার বলল। কিন্তু ওদের বাসায় সবাই হাসপাতালে — আমি থেকে কী করবো। ও বলল — তুই যা, রনি।»

«ইস,» — আপু তার পাশে বসল — হাত রাখল তার কাঁধে — «খেয়েছিস?»

«হ্যাঁ, ওখানেই — হাসপাতালের ক্যান্টিনে।» — রনি হাত দিয়ে মুখ ঢাকল — «ভয় পেয়ে গেছিলাম, আপু। ওর বাবা... আমার চোখের সামনে...» — সে থামল — গলা ধরে এলো — «আমরা বসে আড্ডা দিচ্ছিলাম — হঠাৎ উনি পড়ে গেলেন। মুখ বেঁকে গেল। আমরা... আমরা ধরাধরি করে হাসপাতালে নিলাম। ডাক্তার বলল — স্ট্রোক। আরেকটু দেরি হলে...» — সে মাথা নাড়ল — «ভাবতেও পারছি না।»

«শান্ত হ,» — আপু তাকে জড়িয়ে ধরল — বোনের মতো — শক্ত করে — «ডাক্তার তো বলল স্থিতিশীল। তুই যা করেছিস — অনেক করেছিস। ওর মা কী বলল?»

«কাঁদছিল।» — রনি বলল — «আমি বললাম — আন্টি, চিন্তা কোরো না। কিন্তু...» — সে চায়ের কাপে চুমুক দিল — «মৃত্যু... এত কাছে থেকে দেখিনি কখনো।»

ঘরে নীরবতা — ভারী। দুলাভাই টিভির ভলিউম কমিয়ে দিলেন। «তুই ভালো ছেলে, রনি,» — তিনি বললেন — গম্ভীর — «বন্ধুর বিপদে পাশে ছিলি।»

«হ্যাঁ।» — রনি হাসল — ক্লান্ত — «সকালে আবার যাবো।» — তখনই তার ফোন বাজল — সে চমকে তুলল — «হ্যাঁ? ... হ্যাঁ, আমি। ... কী বলল ডাক্তার? ... আচ্ছা... আচ্ছা।» — সে ফোন রাখল — মুখে স্বস্তি — «জ্ঞান ফিরেছে। কথা বলছে।» — সে ফোন রাখল — মুখে স্বস্তি।

«যাক,» — আপু বলল — হাত বুকে — «ভালো খবর। খুব ভালো খবর।»

«হ্যাঁ,» — রনি হাসল — এবার সত্যিকারের — «ভালো খবর।» — সে চা শেষ করল — «আচ্ছা, আমি...»

দুলাভাই বললেন — টিভির দিকে তাকিয়ে — কিন্তু গলা নরম — «তুই ঠিক করেছিস ফিরে এসে। ওখানে থেকে কী করতি।»

«হ্যাঁ।» — রনি উঠে হাত-মুখ ধুয়ে এলো — তোয়ালে দিয়ে মুছতে মুছতে বসল। «তোরা খেয়েছিস?»

«হ্যাঁ।» — আপু বলল — «চা খাবি?»

«দে। খুব মাথা ধরেছে।»

আপু চা আনতে গেল — সিনথিয়াও বেরিয়ে এলো গেস্ট রুম থেকে — বই হাতে — ভান। «রনি ভাই...» — তার গলা কাঁপছিল কি? সে নিজেই বুঝতে পারল না — «বন্ধুর বাবা... এখন কেমন?»

রনি তাকাল — তার দিকে — দীর্ঘ — সেই দৃষ্টি। «স্থিতিশীল।» — সে থামল — «তুই... তুই ঠিক আছিস তো?»

«হ্যাঁ। কেন?» — সিনথিয়া বসল — সোফার এক কোণে — বইটা কোলে।

«তোর চোখ লাল,» — রনি বলল — চা নিতে নিতে — আপুর হাত থেকে — «কাঁদছিলি?»

সিনথিয়ার বুক ধক করে উঠল। «না... ঘুম পাচ্ছে। সারাদিন শুয়েছিলাম তো।»

«হুম।» — রনি তাকে দেখছিল — চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে — চোখ কাপের ওপর দিয়ে। «আচ্ছা।» — সে থামল — «তো... তোরা কী করছিলি?»

সিনথিয়ার হাত কেঁপে উঠল — বইটা প্রায় পড়ে গেল। «মানে?»

«মানে —» — রনি কাঁধ ঝাঁকাল — «আমি ফোন করেছিলাম — আধঘণ্টা আগে। কেউ ধরেনি।»

ঘরে নীরবতা। আপুর হাত থেমে গেল — চায়ের কাপ ধরা হাতে। দুলাভাইয়ের চোখ টিভিতে — স্থির।

«আমি... আমি বাথরুমে ছিলাম,» — আপু তাড়াতাড়ি বলল — «ফোন ড্রয়িংরুমে ছিল।»

«আর দুলাভাই?»

«আমি...» — দুলাভাই কাশলেন — «আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। টিভি চলছিল।»

«হুম।» — রনি মাথা নাড়ল — ধীরে। «আর তুই?» — সিনথিয়ার দিকে।

«আমি...» — সিনথিয়ার গলা শুকিয়ে গেল — «আমি গান শুনছিলাম। কানে... ইয়ারফোন ছিল।»

«তিনজন — তিন জায়গায়,» — রনি হাসল — কিন্তু হাসিটা চোখে পৌঁছাল না — «কী কাকতালীয়।» — সে সিনথিয়ার দিকে তাকাল — «তুই তো ফোনে... গান শুনছিলি। কী গান?»

সিনথিয়ার মাথা ফাঁকা হয়ে গেল। «কী... কী গান মানে?»

«কোন গান শুনছিলি?» — রনি নির্বিকার।

«আমি...» — সিনথিয়া হাতড়াল — «মনে নেই।»

«মনে নেই।» — রনি মাথা নাড়ল — ধীরে। «আচ্ছা।» — সে উঠল — চায়ের কাপটা টেবিলে রাখল — «আমি যাই।» — কিন্তু দাঁড়িয়ে রইল এক মুহূর্ত — তিনজনের দিকে তাকিয়ে — «তোরা... আজ কেমন যেন...» — সে থামল — «যাক। গুড নাইট।» — সে তার ঘরে গেল — দরজা বন্ধ — কিন্তু আলো জ্বলতেই রইল।

ঘরে নীরবতা। সিনথিয়ার রক্ত হিম।

«মানে?» — দুলাভাইয়ের গলা — সতর্ক।

«জানি না।» — রনি কাঁধ ঝাঁকাল — «কেমন... অদ্ভুত।» — সে হাসল — ক্লান্ত হাসি। «ঘুম দরকার আমার। গুড নাইট।» — সে তার ঘরে গেল — দরজা বন্ধ।

তিনজন বসে রইল — নড়ল না — যতক্ষণ না রনির ঘরের দরজা বন্ধ হলো। তারপর — একসাথে — তিনজনে শ্বাস ছাড়ল।

আপু দুলাভাইয়ের দিকে তাকাল — চোখে প্রশ্ন — «ও সন্দেহ করছে?» — দুলাভাই মাথা নাড়লেন — «জানি না।» — তিনি সিনথিয়ার দিকে তাকালেন — «তুই... তুই ঠিক আছিস?»

সিনথিয়া মাথা নাড়ল — «হ্যাঁ।» — কিন্তু তার হাত কাঁপছিল — কোলে রাখা।

«শোন,» — আপু ফিসফিস করল — «কাল সকালে — আমি ফোনটা দেখবো। আর রনি... রনি কিছু জানে না। ও শুধু... ক্লান্ত।» — কিন্তু তার নিজের গলায়ও বিশ্বাস নেই। «ঘুমা। সবাই ঘুমা। সকালে কথা হবে।»

দুলাভাই উঠলেন — যাওয়ার আগে — সিনথিয়ার পাশ দিয়ে যেতে যেতে — এক সেকেন্ডের জন্য — তার হাত সিনথিয়ার কাঁধে — চাপ — «ভয় পাস না,» — ফিসফিস করে — কেউ শুনল না। তারপর বেডরুমে।

আপুও গেল — কিন্তু দরজায় দাঁড়িয়ে — সিনথিয়ার দিকে তাকাল — চোখে... কিছু — যা শুধু তারা দুজন বোঝে। তারপর ভেতরে।

সিনথিয়া গেস্ট রুমে গেল। দরজা বন্ধ করল — ছিটকিনি লাগাল। বিছানায় শুলো — কিন্তু ঘুম এলো না। চোখ বন্ধ করলেই — সেই রাত। আপুর ঠোঁট তার ঠোঁটে — নরম, দাবিদার। আপুর হাত... — তার বুকে — বৃত্ত আঁকছে। দুলাভাইয়ের গলা — «বল তুই কী চাস!» — তার নিজের চিৎকার — «আমি তোমাদের দুজনের!» — তার গাল গরম হয়ে গেল মনে পড়ে — কান গরম।

সে পাশ ফিরল। তার শরীর এখনো কথা বলছিল — প্রতিটা পেশিতে সেই রাতের স্মৃতি — টান, ব্যথা, আনন্দ। সে ভাবল — আজ সকালে সে কে ছিল? আর এখন কে? একদিনে... এত কিছু? তার হাত নিজে নিজে নামছিল — পেটে — আরো নিচে — সে থামাল — «না,» — ফিসফিস করে — অন্ধকারে — «আজ না। আজ... অনেক হয়েছে। শরীরকে বিশ্রাম দে।» — কিন্তু শরীর শুনছিল না — শরীর এখনো জ্বলছিল — ধিকধিক। সে বালিশে মুখ গুঁজল — «ঘুমা, সিনথিয়া। ঘুমা।»

তার হাত নিজে নিজে নামছিল — সে থামাল — «না,» — ফিসফিস করে — অন্ধকারে — «আজ না। আজ... অনেক হয়েছে।» — কিন্তু শরীর শুনছিল না — শরীর এখনো জ্বলছিল — প্রতিটা কোষে সেই রাতের স্মৃতি। সে পাশ ফিরল — বালিশে মুখ গুঁজল — «ঘুমা, সিনথিয়া। ঘুমা।»

তখনই — দরজায় টোকা — হালকা — দুবার।

সিনথিয়া উঠল — হৃৎপিণ্ড গলায় — «কে?»

«আমি।» — আপুর গলা — ফিসফিস।

সিনথিয়া দরজা খুলল — আপু ঢুকল — নাইটিতে — চুল খোলা — মুখে ক্লান্তি। দরজা বন্ধ করল — ছিটকিনি লাগাল। দুজনে বিছানায় বসল — পাশাপাশি — অন্ধকারে।

«ঘুম আসছে না?» — আপু জিজ্ঞেস করল।

«না।» — সিনথিয়া হাসল — «তোমার?»

«আমারও না।» — আপু হাসল — ক্লান্ত হাসি। «শোন — ফোনটা নিয়ে ভাবিস না। সকালে দেখবো — ঠান্ডা মাথায়। নেট এখন এত স্লো যে...» — সে সিনথিয়ার হাত ধরল — অন্ধকারে — «আর শোন —» — তার গলা নামল — গম্ভীর — «আজ রাতে যা হলো... তুই... তুই ঠিক আছিস তো? সত্যি করে বল। কোনো... কোনো খারাপ লাগা? কোনো অনুশোচনা?»

সিনথিয়া তাকাল — অন্ধকারে আপুর চোখ — উদ্বেগ — খাঁটি উদ্বেগ। «আপু,» — সে ফিসফিস করল — «আমি... আমি ভালো আছি। সত্যি।» — সে থামল — আপুর হাত চাপ দিল — «তুমি... তুমি আমার সাথে যা করলে... আমি কখনো ভাবিনি — কোনো মেয়ে...» — তার গলা আটকে গেল — «আমি ভাবছিলাম — আমি খারাপ মেয়ে হয়ে গেছি। কিন্তু তুমি যখন... তুমি যখন আমাকে বোন বললে...» — তার চোখে পানি — «আমি... আমি মুক্তি পেলাম।»

«পাগলি,» — আপু তাকে জড়িয়ে ধরল — শক্ত করে — «তুই খারাপ মেয়ে না। তুই... তুই সবচেয়ে সাহসী মেয়ে।» — সে ছাড়ল — কিন্তু হাত ছাড়ল না — «শোন —» — তার গলা গম্ভীর হলো — «আমি তোকে একটা কথা বলি? আজ... আজকের আগে — আমি নিজেকে চিনতাম না। তিন বছর ধরে বউ — রান্না, সংসার — আমি ভাবতাম এটাই আমি। কিন্তু আজ...» — সে থামল — «আজ আমি বুঝলাম — আমার ভেতরে আরেকজন আছে। যে... যে চায়।» — সে হাসল — লাজুক — «তুই আমাকে মুক্তি দিলি, সিনথিয়া।»

«আমি?» — সিনথিয়া অবাক।

«তুই।» — আপু তার গাল ছুঁল — «তুই না এলে — আমি কখনো...» — সে মাথা নাড়ল — «যাক। ঘুমা।» — সে কপালে চুমু খেল — «ঘুমা। আমি আছি। কাল সকালে — ফোনটা দেখবো। সব ঠিক হয়ে যাবে।» — সে উঠল — দরজার কাছে — ফিরে তাকাল — অন্ধকারে হাসি — «আর হ্যাঁ —» — «তুই অসাধারণ।»

দরজা বন্ধ হলো — ছিটকিনির শব্দ। সিনথিয়া শুলো — হাসি মুখে — চোখে পানি। কিন্তু ঘুম এলো না। সে ফোনটা হাতে নিল — স্ক্রিন জ্বালাল — অন্ধকারে আলো চোখে লাগল। তানভীরের মেসেজ — পাঁচটা। ভয়েস মেসেজ — তিন মিনিটের।

তার আঙুল প্লে বোতামের ওপরে ঘুরল — কিন্তু চাপল না। মিম... মিম আক্তার... — সেই মেয়েটা এখন কত দূরে মনে হচ্ছিল। ধানমন্ডির মিম — যে তানভীরের সাথে রাতভর গল্প করত — সে কি এই সিনথিয়া? যে আজ... — সে ফোনটা নামিয়ে রাখল।

«তানভীর,» — সে ফিসফিস করল — অন্ধকারে — «তুমি আমাকে চেনো না। তুমি মিমকে চেনো। আর মিম... মিম আজ মরে গেছে।» — তার চোখে পানি — কিন্তু হাসি — অদ্ভুত হাসি। «কাল। কাল তোমাকে... কিছু বলবো।»

তখনই — আবার টোকা। হালকা — দুবার।

সিনথিয়া উঠল — «আপু?» — দরজা খুলল — রনি।

সিনথিয়ার বুক ধড়ফড় করল। «রনি ভাই! তুমি... এত রাতে...»

«ঘুম আসছে না,» — রনি বলল — নিচু গলায় — করিডোরে তাকিয়ে। «তোর আলো জ্বলছিল — ভাবলাম...» — সে ভেতরে তাকাল — «আসতে পারি? একটু?»

সিনথিয়া ইতস্তত করল — আপু এইমাত্র গেল — যদি ফিরে আসে? — কিন্তু রনির চোখে ক্লান্তি — খাঁটি ক্লান্তি। সে দরজা ছাড়ল। রনি ঢুকল — বিছানায় বসল না — চেয়ারে বসল — হাত মুখে। «বন্ধুর বাবার কথা ভাবছি,» — সে বলল — «চোখের সামনে ভাসছে — হাসপাতালের বেড —» — সে থামল — «ঘুম আসছে না।»

«ডাক্তার তো বলল স্থিতিশীল,» — সিনথিয়া বলল — বিছানায় বসে — ওড়না ঠিক করে — দূরত্ব রেখে। «তুমি... তুমি চিন্তা কোরো না।»

«হ্যাঁ।» — রনি তাকাল — তার দিকে — অন্ধকারে। «তুই... তুই ঠিক আছিস তো? সত্যি করে বল।»

«হ্যাঁ। কেন বারবার জিজ্ঞেস করছো?» — সিনথিয়ার গলায় বিরক্তির ভান — কিন্তু ভেতরে ভয়।

«কারণ...» — রনি উঠল — জানালার কাছে গেল — বাইরে তাকাল — «কারণ তোর চোখে...» — সে ফিরল — «তুই কাঁদছিলি — তাই না? সত্যি করে বল, সিনথিয়া।»

সিনথিয়া তাকিয়ে রইল। তার মাথায় ঝড় — কী বলবে? সত্যি? মিথ্যে? «না,» — সে বলল — দৃঢ় গলায় — «আমি কাঁদিনি। ঘুম পাচ্ছে শুধু। তুমি যাও — ঘুমাও।»

রনি এক মুহূর্ত তাকিয়ে রইল — তারপর ধীরে ধীরে দরজার দিকে গেল। দরজায় দাঁড়াল — ফিরল না — হাত হাতলে। «সিনথিয়া,» — নিচু গলায় — প্রায় ফিসফিস — «তুই কিছু লুকাচ্ছিস।»

সিনথিয়ার শ্বাস আটকে গেল। রক্ত হিম।

«আমি জানি না কী,» — রনি বলল — এখনো না ফিরে — «কিন্তু তোর চোখে... আজ রাতে... কিছু আছে।» — সে ফিরল — চোখে... কিছু — উদ্বেগ? ঈর্ষা? আকাঙ্ক্ষা? — «শোন —» — সে এক পা এগিয়ে এলো — «যদি... যদি কোনো সমস্যা হয় — যদি কেউ... তোকে...» — সে থামল — «আমাকে বলিস। আমি আছি।»

সে বেরিয়ে গেল — দরজা বন্ধ — নিঃশব্দে। করিডোরে তার পায়ের শব্দ মিলিয়ে গেল।

সিনথিয়া বসে রইল — বুক ধড়ফড় — হাত কাঁপছিল। রনি জানে? কী জানে? কতটা জানে? সে কি... সে কি বুঝতে পেরেছে — তিনজনের...? নাকি শুধুই... সন্দেহ — ভাইয়ের সন্দেহ? তার মনে পড়ল — শপিং মলে রনির কথা — «তোমাকে দেখেছি» — রনি সব দেখে। রনি সব বোঝে। এই ভাবনায় তার গা শিউরে উঠল।

কিন্তু রনির চোখে... — সে ভাবল — উদ্বেগ ছিল। খাঁটি উদ্বেগ। «আমাকে বলিস। আমি আছি।» — এই কথাটায়... আন্তরিকতা ছিল। রনি তাকে... — সে থামল — ভাবতে চাইল না।

তখনই — ফোনটা বাজল — ভাইব্রেশন — বালিশের পাশে। তানভীরের নাম। আবার। ভয়েস মেসেজ। তিন মিনিটের।

সিনথিয়া তাকিয়ে রইল স্ক্রিনের দিকে — অনেকক্ষণ — আঙুল প্লে বোতামের ওপরে — কিন্তু চাপল না। তার বুক ধড়ফড় করছিল — তানভীরের গলা শুনলে... — সে ভয় পাচ্ছিল। ভয় — যে সে কেঁদে ফেলবে। ভয় — যে সে সব বলে দেবে। মিমের মুখোশ... — আজ রাতের পর — সেই মুখোশ আর পরে থাকা যায়?

সে ফোনটা উল্টে রাখল — না শুনে — অন্ধকারে — বালিশের নিচে।

«কাল,» — সে ফিসফিস করল — সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে — অন্ধকারে — «কাল সব। তানভীর... কাল।»
Like Reply
#20
নতুন সকাল

ভোর পাঁচটা। সিনথিয়ার ঘুম ভাঙল — পাখির ডাকে। জানালার ফাঁক দিয়ে হালকা আলো। সে চোখ খুলল — এক মুহূর্ত — কোথায়? তারপর মনে পড়ল — আপুর বাসা। গেস্ট রুম। আর গত রাত... — তার গাল গরম হয়ে গেল। শরীরে এখনো ব্যথা — মিষ্টি ব্যথা — প্রতিটা পেশিতে রাতের স্মৃতি।

সে উঠল — মুখ ধুলো — আয়নায় নিজেকে দেখল — চোখে কালি, ঠোঁট ফোলা — কিন্তু চোখে... কিছু — যা আগে ছিল না। «তুই বদলে গেছিস,» — সে ফিসফিস করল আয়নায় — «তুই আর আগের সিনথিয়া না।» — সে হাসল — ভয় আর আনন্দ একসাথে।

করিডোরে বেরিয়ে দেখল — আপুর বেডরুমের দরজা খোলা — ভেতরে কেউ নেই — বিছানা গোছানো। রান্নাঘর থেকে শব্দ — খুটখাট। সে গেল। সে উঠল — মুখ ধুলো — করিডোরে বেরিয়ে দেখল — আপুর বেডরুমের দরজা খোলা — ভেতরে কেউ নেই। রান্নাঘর থেকে শব্দ — খুটখাট।

সে গেল। আপু রান্নাঘরে — চা বসিয়েছে — চুলে খোঁপা, মুখে রাত জাগার ছাপ। «উঠেছিস?» — আপু তাকাল — হাসল — ক্লান্ত।

«তুমি ঘুমাওনি?» — সিনথিয়া জিজ্ঞেস করল।

«ঘুম এলো না।» — আপু চায়ের কাপ এগিয়ে দিল — «নে।» — তারপর নিচু গলায় — «ফোনটা দেখবি?»

সিনথিয়ার বুক ধড়ফড় করল। «এখন?»

«এখন। কেউ ওঠেনি।» — আপু ড্রয়ার থেকে ফোন বের করল — হাত কাঁপছিল। গুগল ফটোস খুলল। সার্চ — «ভিডিও» — আজকের তারিখ।

লোডিং। ঘুরছে। ঘুরছে।

দুজনে তাকিয়ে রইল — শ্বাস আটকে — রান্নাঘরের নীরবতায় শুধু ফ্রিজের গুঞ্জন। সিনথিয়ার হাত আপুর হাত চেপে ধরল।

তারপর — স্ক্রিনে — একটা থাম্বনেইল। অন্ধকার ঘর। বিছানা। দুটো অস্পষ্ট শরীর — তিনটে।

সিনথিয়ার রক্ত হিম হয়ে গেল। «আপু...» — তার গলা বেরোল না।

«আপলোড হয়ে গেছে,» — আপুর গলা ফিসফিস — সাদা মুখ — «ব্যাকআপ চালু ছিল। ওয়াইফাই...» — তার হাত কাঁপছিল — «আমি... আমি ডিলিট করছি। এখনই।» — সে ভিডিওটা খুলল না — সরাসরি ডিলিট চাপল — «ডিলিট ফ্রম অল ডিভাইসেস» — কনফার্ম — আঙুল কাঁপছিল কনফার্ম চাপতে। তারপর ট্র্যাশ — «ডিলিট ফরএভার» — কনফার্ম।

দুজনে তাকিয়ে রইল — খালি স্ক্রিনে — «নো আইটেমস»।

«শেষ?» — সিনথিয়া ফিসফিস করল — বিশ্বাস হচ্ছিল না।

«শেষ।» — আপু ফোনটা টেবিলে রাখল — হাত এখনো কাঁপছিল। «ক্লাউড থেকেও গেল।» — সে সিনথিয়ার দিকে তাকাল — «কিন্তু...»

«কিন্তু কী?» — সিনথিয়ার বুক আবার ধড়ফড়।

«কেউ...» — আপুর গলা আটকে গেল — «কেউ দেখে ফেলেনি তো? শেয়ার... নোটিফিকেশন... গুগল তো কখনো কখনো...» — সে আবার ফোন তুলল — অ্যাক্টিভিটি চেক করল — শেয়ার হিস্ট্রি — খালি। পার্টনার শেয়ারিং — অফ। «কেউ দেখেনি।» — সে শ্বাস ছাড়ল — দীর্ঘ — কাঁপা। «কেউ দেখেনি।»

সিনথিয়া আপুকে জড়িয়ে ধরল — শক্ত করে — স্বস্তিতে। «শেষ, আপু। শেষ।» — তার চোখে পানি — এবার স্বস্তির।

«শেষ।» — আপু তাকে জড়িয়ে ধরল — «আমাদের গোপন — শুধু আমাদের তিনজনের।» — সে ছাড়ল — কিন্তু হাত ছাড়ল না — «শোন —» — তার চোখে দৃঢ়তা — «আজ থেকে — ব্যাকআপ বন্ধ। চিরকালের জন্য।» — সে সেটিংসে গেল — ব্যাকআপ অ্যান্ড সিংক — টগল অফ — সিনথিয়াকে দেখিয়ে — «দেখ। অফ।» — তারপর গ্যালারি — ট্র্যাশ — খালি। «দেখ — কিছু নেই।»

দুজনে হাসল — ক্লান্ত, স্বস্তির হাসি — কিন্তু হাসির নিচে — এখনো ভয়। «আপু,» — সিনথিয়া ফিসফিস করল — «যদি... যদি কেউ...»

«কেউ না,» — আপু তার মুখ ধরল — «শোন — ভয় পেলে চলবে না। ভয় দেখালে — রনি বুঝবে। স্বাভাবিক থাক।» — সে সিনথিয়ার কপালে চুমু খেল — «স্বাভাবিক।»

তখনই — পেছনে শব্দ। দুজনে চমকে ফিরল — রনি। দরজায়।

«তোরা...» — রনি তাকাল — দুজনের দিকে — «এত সকালে?»

সিনথিয়ার বুক ধক করে উঠল। «চা... চা খাচ্ছিলাম।»

«হুম।» — রনি ভেতরে এলো — চায়ের কাপ নিল — «আমিও ঘুমাইনি।» — সে দুজনের দিকে তাকাল — এক এক করে — «তোরা... ঠিক আছিস তো?»

«হ্যাঁ,» — আপু বলল — তাড়াতাড়ি — «তুই হাসপাতালে যাবি না?»

«যাবো। আটটায়।» — রনি চায়ে চুমুক দিল — চোখ দুজনের ওপরে — «তোরা দুজন...» — সে থামল — «কেমন... কাছাকাছি হয়ে গেছিস।»

«মানে?» — আপুর গলা — সতর্ক।

«মানে —» — রনি কাঁধ ঝাঁকাল — «ভালো। ভালো তো।» — সে চা শেষ করে বেরিয়ে গেল।

দুজনে তাকিয়ে রইল — একে অপরের দিকে।

«ও...» — সিনথিয়া ফিসফিস করল — «ও সন্দেহ করছে, আপু।»

«জানি।» — আপুর মুখ গম্ভীর — «কিন্তু ও কিছু জানে না। জানতে পারবে না।» — সে সিনথিয়ার হাত চাপ দিল — «তুই আজ দুপুরে চলে যাবি। তারপর... সব স্বাভাবিক হয়ে যাবে।»

রনি চলে যাওয়ার পর — রান্নাঘরে — শুধু দুজন। আপু সিনথিয়ার দিকে তাকাল — দীর্ঘ। তারপর — হঠাৎ — তাকে জড়িয়ে ধরল — শক্ত করে। «আমি ভয় পাচ্ছি,» — সে ফিসফিস করল — সিনথিয়ার কানে — «রনি যদি...»

«ও জানে না,» — সিনথিয়া বলল — কিন্তু নিজের গলায়ও বিশ্বাস নেই — «ও শুধু... সন্দেহ করছে।»

«সন্দেহই যথেষ্ট।» — আপু ছাড়ল — তার মুখ ধরল দুই হাতে — «শোন — তুই চলে যাওয়ার পর — আমি সামলাবো। তুই চিন্তা করিস না।» — তারপর — ধীরে — আপু তার ঠোঁটে চুমু খেল — নরম — ভোরের আলোয় — «তুই... তুই আমার...»

«আপু,» — সিনথিয়া ফিসফিস করল — «কেউ দেখে ফেলবে।»

«দেখুক।» — আপু হাসল — কিন্তু চোখ করিডোরে — কান খাড়া। কেউ নেই। শুধু ভোরের নীরবতা। সে আবার চুমু খেল — এবার গভীর — ধীরে — সিনথিয়ার হাত আপুর চুলে — আপুর হাত তার কোমরে — এক মুহূর্ত — দুই মুহূর্ত — ভোরের আলো জানালায় — দুটো ছায়া এক হয়ে —

পায়ের শব্দ — করিডোরে। দুজনে ছিটকে সরে গেল — আপু চুলার দিকে — সিনথিয়া টেবিলে — হাতে চায়ের কাপ — ভান। দুলাভাই — দরজায় — ঘুম চোখে — চুল এলোমেলো। «তোরা উঠে গেছিস?» — সে থামল — দুজনের দিকে তাকাল — «তোরা... ঠিক আছিস?»

«চা খাবি?» — আপু তাড়াতাড়ি বলল — গলা স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা — কিন্তু কান লাল।

«দে।» — দুলাভাই ভেতরে এলো — সিনথিয়ার দিকে তাকাল — এক সেকেন্ড — চোখে... — রাতের স্মৃতি। সিনথিয়া চোখ নামিয়ে নিল — গাল গরম।

«আজ দুপুরে যাবি?» — দুলাভাই জিজ্ঞেস করলেন — চায়ে চুমুক দিয়ে।

«হ্যাঁ।» — সিনথিয়া বলল — «মা... মা অপেক্ষা করছে।»

«হুম।» — দুলাভাই মাথা নাড়লেন — «ভালো।» — কিন্তু তার চোখে... — «তুই...» — সে থামল — আপুর দিকে তাকিয়ে — «তুই ভালো থাকিস।»

সকাল আটটা। নাস্তা — পরোটা, ডিম ভাজি, চা। চারজন — টেবিলে। স্বাভাবিক — অভিনয়। কিন্তু টেবিলের নিচে — তিনজনের পা — কেউ কারোটা ছুঁল না — সাবধানে।

রনি তাড়াহুড়ো করে খাচ্ছিল — «হাসপাতালে যাবো।» — «খেয়ে যা,» — আপু বলল — পরোটা এগিয়ে দিয়ে। «খাচ্ছি তো।» — রনি সিনথিয়ার দিকে তাকাল — «তুই কখন যাবি?»

«দুপুরে। বারোটায়।» — সিনথিয়া চায়ে চুমুক দিল — চোখ নামিয়ে।

«আমি পৌঁছে দেবো?» — রনি জিজ্ঞেস করল — «হাসপাতাল থেকে ফিরে? বারোটার মধ্যে ফিরতে পারবো মনে হয়।»

«না না,» — আপু তাড়াতাড়ি বলল — একটু বেশি তাড়াতাড়ি — «আমি রিকশা ডেকে দেবো। তুই হাসপাতালে যা — ওখানেই থাক।»

রনি তাকাল — আপুর দিকে — ভ্রু কুঁচকে। «আপু, তুই...» — সে থামল — «তুই ঠিক আছিস তো? কাল থেকে... কেমন অস্থির লাগছে।»

«আমি ঠিক আছি,» — আপু হাসল — «তুই যা।»

«আচ্ছা।» — রনি উঠল — ব্যাগ নিল — দরজার কাছে — ফিরে তাকাল — সিনথিয়ার দিকে — দীর্ঘ — «তাহলে... পরে দেখা হবে।» — তার চোখে... — কিছু — যা সিনথিয়া পড়তে পারল না। সে বেরিয়ে গেল — দরজা বন্ধ।

তিনজন বসে রইল। আপু শ্বাস ছাড়ল — «যাক।» — দুলাভাই চায়ে চুমুক দিলেন — «ও সন্দেহ করছে।» — «জানি,» — আপু বলল — «কিন্তু প্রমাণ নেই।» — সে সিনথিয়ার দিকে তাকাল — «তুই চলে গেলেই... সব ঠান্ডা হয়ে যাবে।»

নাস্তা শেষ। সিনথিয়া ব্যাগ গোছাল — গেস্ট রুমে — ধীরে — প্রতিটা জিনিস তুলতে তুলতে — এই ঘর... — এই ঘরে কত কিছু। আপু এলো — দরজা বন্ধ করল — ছিটকিনি। দুজনে বিছানায় বসল — পাশাপাশি — নীরব।

«তাহলে...» — আপু বলল — «যাচ্ছিস।»

«হ্যাঁ।» — সিনথিয়ার গলা ধরে এলো — «মা ফোন করেছিল — সকালে।»

«শোন,» — আপু তার হাত ধরল — দুই হাতে — «যা হলো — তা আমাদের। তিনজনের। কেউ জানবে না — কখনো না। তুই... তুই ভুলে যাস না —» — সে থামল — চোখে পানি — «আমাকে ভুলে যাস না।»

«তোমাকে ভুলবো?» — সিনথিয়ার চোখে পানি — «আপু, তুমি... তুমি আমার জীবন বদলে দিলে। আমি... আমি আগে নিজেকে চিনতাম না। এখন...» — সে হাসল — চোখে পানি — «এখন আমি জানি — আমি কে।»

«পাগলি।» — আপু তাকে জড়িয়ে ধরল — দীর্ঘ — শক্ত — «আবার আসবি? শিগগির? কথা দে।»

«কথা দিলাম।» — সিনথিয়া ফিসফিস করল — «খুব শিগগির।»

আপু তাকে চুমু খেল — কপালে — দীর্ঘ — গালে — ঠোঁটে — ধীরে — বিদায়ের চুমু — প্রতিটায়... কিছু। «যা।» — সে ফিসফিস করল — «দেরি হলে মা চিন্তা করবে। আর...» — সে থামল — «মেসেজ করিস। রোজ।»

ড্রয়িংরুমে — দুলাভাই দাঁড়িয়ে — হাতে সিনথিয়ার ব্যাগ — «নে।» — সিনথিয়া ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে এলো — গেস্ট রুম থেকে — শেষবারের মতো তাকাল — ঘরটার দিকে। «দুলাভাই...»

«ভালো থাকিস,» — দুলাভাই বললেন — তার হাত বাড়াল — হ্যান্ডশেকের ভান। সিনথিয়া হাত মেলাল — কিন্তু হাত মেলানোর সময় — এক সেকেন্ড — চাপ — গোপন চাপ — চোখে... — রাতের স্মৃতি — «আবার আসিস।» — তার গলা নামল — «শিগগির।»

«আসবো।» — সিনথিয়া বলল — তার হাত ছাড়ল না এক মুহূর্ত বেশি — চোখে চোখ — তারপর ছাড়ল — «আপনি... আপনি ভালো থাকবেন।»

আপু রিকশা ডাকল — গেটের বাইরে। সিনথিয়া উঠল — ব্যাগ কোলে। আপু হাত নাড়ল — চোখে পানি — হাসি — «ফোন করিস!» — দুলাভাই দরজায় — হাত তুলল। রিকশা চলল — মোড় ঘুরল — আপু মিলিয়ে গেল।

সিনথিয়া পেছনে তাকিয়ে রইল — যতক্ষণ দেখা গেল। তারপর সামনে — বাতাস মুখে।

সিনথিয়া ফোনটা বের করল — রিকশার ঝাঁকুনিতে। তানভীরের ভয়েস মেসেজ — তিন মিনিটের — গত রাতের। সে প্লে চাপল — কানে ইয়ারফোন — বাতাসের শব্দে।

«মিম...» — তানভীরের গলা — ক্লান্ত, ভাঙা — «তুমি কোথায়? তিনদিন... তিনদিন কোনো খবর নেই। আমি... আমি পাগল হয়ে যাচ্ছি।» — সে থামল — শ্বাস — «তুমি ঠিক আছো তো? প্লিজ... একটা মেসেজ দাও। শুধু... শুধু জানাও — তুমি আছো। আমি...» — তার গলা ভেঙে গেল — «আমি তোমাকে...» — মেসেজ শেষ।

সিনথিয়ার চোখে পানি — বাতাসে শুকিয়ে যাচ্ছে। মিম... — সেই মেয়েটা — ধানমন্ডির মিম — যে তানভীরকে হাসাত, যে রাতভর গল্প করত। সেই মিম কি এখনো আছে? নাকি... — সে চোখ বন্ধ করল — আপুর মুখ ভাসল — দুলাভাইয়ের গলা — রনির চোখ।

তারপর টাইপ করল — ধীরে — «আমি আছি। ব্যস্ত ছিলাম — বাসায় মেহমান। রাতে কথা হবে।» — সেন্ড।

সাথে সাথে — টাইপিং... — রিপ্লাই। «তুমি আছো! আমি... আমি কত খুশি! কত ভয় পেয়েছিলাম! ভাবলাম — তুমি আমাকে ব্লক করে দিলে!»

সিনথিয়া হাসল — চোখে পানি — টাইপ করল — «ব্লক কেন করবো? ভয় পেও না। আমি কোথাও যাচ্ছি না।»

«প্রমিস?» — সাথে সাথে।

«প্রমিস।» — সে থামল — তারপর লিখল — «তানভীর... তুমি আমার জন্য... এত ভাবো?»

এক মুহূর্ত নীরবতা। টাইপিং... — «ভাবি। খুব ভাবি। তুমি... তুমি আমার রাতের...» — সে থামল — «যাক। রাতে বলবো।»

সিনথিয়ার বুক ধড়ফড় করল — মিমের জন্য? নাকি... — সে টাইপ করল — «রাতে।»

তারপর আপুর মেসেজ — «পৌঁছে ফোন করিস। আর শোন — ব্যাকআপ ডিলিট। আমরা সেফ।»

«সেফ,» — সিনথিয়া ফিসফিস করল — বাতাসে — «আমরা সেফ।» — সে রিপ্লাই করল — «পৌঁছে ফোন করবো।»

তখনই — আরেকটা মেসেজ। রনি। «তুই কিছু লুকাচ্ছিস। আমি জানি। একদিন বলবি — নিজে থেকে। আমি অপেক্ষা করবো।»

সিনথিয়া তাকিয়ে রইল স্ক্রিনের দিকে — বুক ধড়ফড় — রিকশা চলছিল — বাতাসে তার চুল উড়ছিল — শহর পেরিয়ে — আর তার মনে — একটাই প্রশ্ন — ঘুরপাক — রনি কী জানে? কতটা জানে? আর... — সে ফিসফিস করল — «ও কি... ও কি সত্যিই অপেক্ষা করবে?»

বাসা। গেট। সিনথিয়া ভাড়া দিয়ে নামল — ব্যাগ কাঁধে। দরজায় বেল — মা খুলল — «এলি!» — জড়িয়ে ধরল — «কতদিন... মানে — তিনদিন! কেমন কাটল?»

«ভালো, মা।» — সিনথিয়া হাসল — ভেতরে ঢুকল — চেনা গন্ধ — নিজের বাসা।

«তোর চোখ...» — মা তাকাল — «লাল। ঘুমাসনি?»

«ঘুমিয়েছি।» — সিনথিয়া তাড়াতাড়ি বলল — «বাসে... রিকশায় বাতাস লেগেছে।»

«আচ্ছা।» — মা তার দিকে তাকিয়ে রইল — এক মুহূর্ত বেশি — মায়ের চোখ — «তুই...» — সে থামল — «তুই কেমন বড় হয়ে গেছিস।»

সিনথিয়ার বুক ধক করে উঠল। «মানে?»

«মানে...» — মা হাসল — «কেমন... অন্যরকম লাগছে।» — সে সিনথিয়ার গাল ছুঁল — «যা, ফ্রেশ হ। খাবার গরম করছি। সিয়াম তোকে মিস করছিল।»

«সিয়াম কোথায়?»

«কোচিংয়ে। সন্ধ্যায় ফিরবে।» — মা রান্নাঘরে গেল।

বাবা ড্রয়িংরুমে — পেপার পড়ছিল — «এলি?» — চশমার ওপর দিয়ে তাকাল — «কেমন কাটল?»

«ভালো, বাবা।»

«হুম।» — বাবা পেপারে ফিরল — «পড়াশোনা... কলেজ কবে খুলবে?»

«পরশু।»

«আচ্ছা।» — বাবা মাথা নাড়ল — কথোপকথন শেষ।

সিনথিয়া নিজের ঘরে গেল — দরজা বন্ধ করল — ব্যাগটা ফেলল — বিছানায় বসল। নিজের ঘর — নিজের বিছানা — পোস্টার — বই — টেবিলে ডায়েরি। সব আগের মতো — কিন্তু সে... — সে আয়নায় তাকাল — «তুই বদলে গেছিস,» — ফিসফিস করে — «তুই আর আগের সিনথিয়া না।»

সে ডায়েরিটা তুলল — খুলল — নতুন পাতা। কলম হাতে — এক মুহূর্ত ভাবল — তারপর লিখল — «আজ আমি ফিরলাম। তিনদিন... তিনদিনে আমি যা দেখলাম, যা করলাম — তা কেউ জানবে না। আপু, দুলাভাই — আর আমি। আমাদের গোপন। আমি ভয় পেয়েছিলাম — কিন্তু আমি... আমি মুক্ত।» — সে থামল — কলম কামড়াল — তারপর লিখল — «আর রনি... রনি কিছু সন্দেহ করছে। আমি জানি না — ও কী জানে।» — ডায়েরি বন্ধ করল — বালিশের নিচে।

ফোনটা বাজল — আপু। «পৌঁছেছিস?»

«হ্যাঁ, আপু।»

«ভালো। শোন —» — আপুর গলা নামল — «আমি... আমি তোকে মিস করছি।»

সিনথিয়ার চোখে পানি — হাসি — «আমিও।»

«রাতে ফোন করবো।» — «আচ্ছা।» — ফোন রাখল।

সিনথিয়া শুলো — সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে। তিনদিন। তিনদিনে... — দরজার ফাঁক — আপুর বেডরুম — দুলাভাই — রনি — সিনেমা হল — খোলা দরজা — তিনজন — ভোর। তার জীবন... — সে হাসল — চোখে পানি — «আমার গোপন ডায়েরি,» — সে ফিসফিস করল — «তুই... তুই সব জানিস।»

তখনই — ফোনে মেসেজ। তানভীর। «রাতে কথা হবে তো?»

সিনথিয়া টাইপ করল — «হবে।» — তারপর থামল — আরেকটা লাইন যোগ করল — «আজ... আজ তোমাকে একটা কথা বলবো।»

«কী কথা?» — সাথে সাথে।

সিনথিয়া তাকিয়ে রইল স্ক্রিনের দিকে — আঙুল টাইপিংয়ে — কিন্তু পাঠাল না। সে ফোনটা নামিয়ে রাখল — চোখ বন্ধ করল।

বাইরে — বিকেলের আলো — জানালায়। আর তার মনে — তিনটে মুখ — আপু, দুলাভাই, রনি — আর একটা নাম — তানভীর।

«কাল,» — সে ফিসফিস করল — ঘুমের অতলে তলিয়ে যেতে যেতে — «কাল... নতুন গল্প।»
Like Reply




Users browsing this thread: mr.green9788, nil-002