Thread Rating:
  • 72 Vote(s) - 2.81 Average
  • 1
  • 2
  • 3
  • 4
  • 5
Erotic Thriller মরীচিকা ও মোহময়ী
You are doing great. Please continue.
[+] 2 users Like enjoreal's post
Like Reply
Do not mention / post any under age /rape content. If found Please use REPORT button.
can we expect an update..
Like Reply
গল্পের ভিতরে কিছু ইরোটি ক স্থাপন করুন যাতে একটু গরম থাকা যায়
Like Reply
Vai apnara onake ektu onar moto kore likhte din na,uni to er age bollen je slow burn golpo jehetu tai romance aste deri lagbe,bengali forum e ei muhurte aro kichu khub khub valo story cholche, diffrent type er,oigulo porte paren,ei golpo take erotic thriller er motoi cholte din,karon forum e eirokom valo thriller story besi nei,

Ar dada character description e Arun er description ta bad pore geche, kindly ektu check kore neben pls.
[+] 1 user Likes Vinsent's post
Like Reply
(05-09-2026, 03:18 PM)Tom420 Wrote: গল্পের ভিতরে কিছু ইরোটি ক স্থাপন করুন যাতে একটু গরম থাকা যায়

তুমি একটা বিয়ে করে ফেল। দুবেলা বউয়ের ঝাঁটাপেটা খেয়ে এমনিই গরম থাকবে।

আমার কাজ গল্পের প্লট, ক্যারেক্টার, ওয়ার্ল্ড এসব নিয়ে চিন্তা করা, রিডারদের গরম রাখা নয়। ভাল নাম লাগলে গল্প পড়বে না।
Like Reply
(03-09-2026, 09:57 PM)rehanarman29 Wrote: can we expect an update..

হ্যাঁ, একটা আপডেট আসবে। পুজোর আগে এটাই শেষ আপডেট।
[+] 1 user Likes RockyKabir's post
Like Reply
(03-09-2026, 01:08 AM)bad_boy Wrote: Those who think the story and its characters are “too complex to digest,” please go away. Don’t discourage the author. There are plenty of people like me who are eagerly waiting for this wonderful story to continue. If you’re looking for explicit stories, there are plenty of them on this website—go read those instead. Spare this story from your nonsensical comments.

পাশে থাকার জন্য অনেক ধন্যবাদ আপনাকে।
Like Reply
(05-09-2026, 03:51 PM)Vinsent Wrote: Vai apnara onake ektu onar moto kore likhte din na,uni to er age bollen je slow burn golpo jehetu tai romance aste deri lagbe,bengali forum e ei muhurte aro kichu khub khub valo story cholche, diffrent type er,oigulo porte paren,ei golpo take erotic thriller er motoi cholte din,karon forum e eirokom valo thriller story besi nei,

Ar dada character description e Arun er description ta bad pore geche, kindly ektu check kore neben pls.

পাশে থাকার জন্য ধন্যবাদ। হ্যাঁ, লক্ষ্য করে দেখলাম অরুণ আর প্রিন্সিপাল সান্যালের ডেসক্রিপশন বাদ পড়েছে। অরুণেরটা যোগ করে দেব।
Like Reply
গল্পের শেষ আপডেট নাকি পুজোর শেষ আপডেট
গল্প তো এখনো কিছুই হলো না শেষ আপডেট মানে বুঝতে পারলাম না
Like Reply
Sesh update bolte lekhok bhojhate cheyechen je erpor je next update ta asbe,tar pore Durga puja obdhi kono update asbe na,lekhok dada biroti neben kichuta,pujar por theke abar jemon 2 week er gap diye ekta kore boro update ase, serokom update aste thakbe.
[+] 1 user Likes Vinsent's post
Like Reply
একটা ছোট সিন বাদ দিলে আমার চ্যাপ্টার লেখা শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু, পুজোর লেখা নিয়ে ব্যস্ততার কারণে আমি ওদিকে নজর দিতে পারছি না। চেষ্টা করব এই উইকএন্ডে সিনটা লিখে পুরো চ্যাপ্টারটা পোস্ট করার।
[+] 1 user Likes RockyKabir's post
Like Reply
ভেবেছিলাম শনিবার রাতে একটা আপডেট পাবে। well go on.
Like Reply
প্রথমেই দেরির জন্য দুঃখপ্রকাশ করছি। আমার গত সপ্তাহেই একটা সিন বাদে পুরো চ্যাপ্টারটা লেখা হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু, পুজোর ব্যস্ততার চোটে এখন আমার কোনদিকে তাকানোর সময় নেই। কোনরকমে অরুণের সিনটা লিখলাম। আবার পুজোর পরে দেখা হবে। 


অধ্যায় ২৮


১

স্বপ্নটা শুরু হয়েছিল একটা দমবন্ধ করা, জমাট বাঁধা অন্ধকারের ভেতর দিয়ে। অয়ন প্রথমে বুঝে উঠতে পারছিল না সে কোথায় আছে। চারপাশের বাতাসটা ভীষণ ভারী, নিঃশ্বাসের সাথে সাথে ফুসফুসে বাতাসটা ঢোকার সাথেই তাতে সে একটা পুরোনো স্যাঁতসেঁতে গন্ধ পাচ্ছিল।

সে হাত-পা নাড়ার চেষ্টা করল, কিন্তু তার মনে হলো তার পুরো শরীরটাকে কেউ যেন অদৃশ্য কোন শিকল দিয়ে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছে।

এমন সময় হঠাৎ করে অন্ধকারটা একটা ধূসর, ধোঁয়াটে আলোয় বদলে গেল। সেই আলোয় অয়ন দেখল, সে একটা লম্বা করিডোরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে। করিডোরের মেঝেটা কালো আর সাদা চেক কাটা, ঠিক দাবার বোর্ডের মতো। কিন্তু করিডরের মেঝের ওপরে গোড়ালি অবধি জল জমে আছে। তার পায়ের গোড়ালি অবধি সেই কনকনে ঠান্ডা জলে ডুবে আছে।

করিডোরের একদম শেষে একটা বিশাল, পুরোনো দরজা। দরজাটা আধখোলা, ঘরের ভেতর থেকে একটা ম্লান, হলুদ রঙের আলো বেরিয়ে আসছে।

অয়নের অবচেতন মন তাকে চিৎকার করে বললো ওই দরজাটার দিকে না এগোতে। কিন্তু তার শরীর নিজের নিয়ন্ত্রণে ছিল না। তার পা দুটো আপনা আপনি, অদৃশ্য সুতোর টানে ওই দরজার দিকে এগোতে শুরু করল। জমাট বাঁধা ঠান্ডা জলে তার প্রতিটা পদক্ষেপে 'ছলাৎ... ছলাৎ' শব্দ হতে লাগল। ফাঁকা করিডোরে সেই শব্দটার প্রতিধ্বনি বেশ জোরে উঠে আসতে লাগল।

দরজার কাছাকাছি পৌঁছোতেই অয়ন ঘরের ভেতরকার দৃশ্যটা দেখতে পেল। ঘরের মধ্যে
একটা বিশাল ডাইনিং টেবিল। টেবিলটা এতটাই লম্বা যে তার শেষ প্রান্তটা দেখা যাচ্ছে না। 

টেবিলের চারপাশের সবকটা চেয়ার ফাঁকা। শুধু কুয়াশার ঠিক আগে, একটা ছায়ামূর্তি বসে আছে।

তার মা। বিদিশা।

বিদিশার পরনে সেই মেরুন রঙের কাঞ্জিভরমটা যেটা তিনি ফেস্টের রাতে পড়েছিলেন, মাথার চুলগুলো নিখুঁতভাবে বাঁধা, সাথে জুঁইফুলের গজরা। কিন্তু তার মুখটা অয়নের দিকে নেই। তিনি সম্পূর্ণ উল্টোদিকে ঘুরে বসে আছেন।

"মা..." 

তাকে দেখে অয়নের গলা দিয়ে একটা অস্ফুট, ভাঙা স্বর বেরিয়ে এল।

কিন্তু সেটা বিদিশা হয় শুনতে পেলেন না অথবা শুনতে পেয়েও না শোনার ভান করলেন। অয়নের মনে হল তার বুকের ভেতরটা কেউ যেন একটা ধারালো কিছু দিয়ে চিরে দিল।

"মা, একবার তাকাও..." 

অয়ন আবার ডাকল। এবার তার গলায় একটা অসহায় আর্তি।

ঠিক সেই মুহূর্তে ডাইনিং রুমের নিস্তব্ধতা খানখান করে দিয়ে একটা তীক্ষ্ণ, শয়তানি হাসি চারপাশ থেকে প্রতিধ্বনিত হতে শুরু করল। অয়নের মনে হতে লাগল যে, হাসিটা দেয়াল ভেদ করে, ছাদ থেকে, এমনকি পায়ের তলার ঠান্ডা জল থেকেও উঠে আসছে।

গলাটা বিক্রম মালহোত্রার। কিন্তু ঘরে বিক্রম কোথাও নেই। 

"তুই একটা জোক, অয়ন! আ কমপ্লিট ফাকিং জোক!" 


বিক্রমের গলাটা সাপের হিসহিসানির মতো ওর কানের কাছে বেজে উঠল।
অয়ন দু'হাত দিয়ে নিজের কান চেপে ধরল। তার মনে হচ্ছিল তার মাথার শিরাগুলো ফেটে যাবে। সে ডাইনিং টেবিলের দিকে এক পা এগোতে চাইল মায়ের কাছে যাওয়ার জন্য, কিন্তু পারল না। তার পায়ের তলার গোড়ালি সমান জলটা চোখের নিমেষে বাড়তে বাড়তে তার হাঁটু, তারপর কোমর, তারপর বুক অবধি উঠে এল।

জলটা এত ঠান্ডা যে অয়নের শরীরের প্রতিটা পেশি আড়ষ্ট হয়ে গেল। সে চিৎকার করার জন্য মুখ খুলল, কিন্তু গলা দিয়ে কোনো আওয়াজ বেরোল না, উল্টে এক গাল বরফগলা জল তার গলায় ঢুকে গেল। তার দমবন্ধ হয়ে আসছে। ফুসফুসটা যেন বাতাসের অভাবে ফেটে যেতে চাইছে। সে হাত-পা ছুঁড়ে বাঁচার চেষ্টা করছে, কিন্তু ঠান্ডা জলটা ক্রমশ তাকে নিচের দিকে অতল অন্ধকারের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে।

সব শেষ। বাঁচার আর কোনো উপায় নেই। অয়ন হাল ছেড়ে দিয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলল।

ঠিক সেই মুহূর্তে, যখন তার ফুসফুসের শেষ অক্সিজেনটুকুও ফুরিয়ে এসেছে, যখন তার চেতনা প্রায় বিলুপ্তির পথে, তখন সে অন্ধকারে একটা স্পর্শ অনুভব করল।

একটা হাত।

অত্যন্ত নরম, কিন্তু অসম্ভব দৃঢ় একটা হাত তার ডান হাতের কব্জিটা শক্ত করে চেপে ধরল। 

সেই হাতের স্পর্শের উষ্ণ ভাব জলের ওই হাড়-কাঁপানো ঠান্ডার সম্পূর্ণ বিপরীত। সেই উষ্ণতা হাতটা থেকে জলে ডুবন্ত অয়নের গোটা শরীরে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করল। সেই উষ্ণতাটা ইলেকট্রিক শকের মতো অয়নের আড়ষ্ট স্নায়ুগুলোকে জাগিয়ে তুলল।

অয়ন অন্ধকারের মধ্যেই চোখ খোলার চেষ্টা করল। জলের ভেতরে সবটাই ঝাপসা, কিন্তু সে বুঝতে পারল তাকে যে হাতটা ধরে আছে, সেটা কোন পুরুষের নয়। একজন নারীর হাত।

হাতটা তাকে প্রবল শক্তিতে ওপরের দিকে টানতে শুরু করল। অয়নের শরীরটা যেন কোনো এক জাদুবলে হালকা হয়ে গেল। সে ক্রমশ ওই অন্ধকার থেকে ওপরের দিকে উঠতে শুরু করল।

ওপরে ওঠার সাথে সাথে অয়ন একটা অদ্ভুত সুবাস অনুভব করল। সেই স্যাঁতসেঁতে গন্ধটাকে ছাপিয়ে একটা তীব্র মোহময়ী সুবাস তার ইন্দ্রিয়গুলোকে আচ্ছন্ন করে ফেলল। 

গন্ধটা জুঁইফুলের মতো মিষ্টি নয়, আবার চন্দনের মতো স্নিগ্ধও নয়। বরং গন্ধটা বুনো, উত্তেজক।

তাকে যে নারী মূর্তিটি ওপরের দিকে টেনে তুলছে, তার মুখটা অয়ন দেখতে পাচ্ছে না। অন্ধকার জলের ভেতর থেকে উপরে তার অবয়বটা
 একটা রহস্যময় ছায়ার মতো মনে হচ্ছে। কিন্তু তার স্পর্শের উত্তাপ ক্রমশ বাড়ছে।

এমন সময় হঠাৎই জলের নিচে নারী মূর্তির শরীরটা অয়নের শরীরের খুব কাছাকাছি এসে পড়ল। অয়ন জলের মধ্য দিয়েই একটা ছিপছিপে, অথচ সুডৌল নারী শরীরের অস্তিত্ব অনুভব করতে পারল। তার নগ্ন উরুর সাথে অয়নের পায়ের একটা আলতো ঘর্ষণ হলো। নারী মূর্তির একটা হাত অয়নের বুকের ওপর এসে স্থির হলো। তার লম্বা, নিখুঁত নখগুলো অয়নের শার্টহীন বুকের পেশির ওপর দিয়ে খুব ধীর, কামুক ভঙ্গিতে একটা রেখা টেনে দিল। অন্য হাতের উষ্ণ, নরম আঙুলগুলো অয়নের ঘাড়ের কাছে, তার পেশিবহুল কাঁধের ওপর খেলা করতে লাগল।

সেই স্পর্শে অয়নের মেরুদণ্ড দিয়ে একটা তীব্র স্রোত নেমে গেল। তার শরীরের জমাট বাঁধা ঠান্ডাটা কোথায় যেন উধাও হয়ে গেল। বুকের ভেতরে একটা আদিম আকাঙ্ক্ষা হঠাৎ করেই জেগে উঠল। সে তার ডুবন্ত, অসহায় অবস্থা ভুলে গিয়ে দু'হাত বাড়িয়ে ওই রহস্যময়ী নারী শরীরটাকে নিজের কাছে টেনে নিতে চাইল।

নারী মূর্তিটা ওর আরও কাছাকাছি এগিয়ে এল। তার মুখটা অয়নের কানের একদম কাছে। তার গরম, ভেজা নিশ্বাসটা অয়নের ঘাড়ের কাছে এসে পড়ল। জলের নিস্তব্ধতার মধ্যে থেকে ফিসফিস করে একটা ভীষণ চেনা, হাস্কি গলার স্বর অয়নের কানের পর্দায় আছড়ে পড়ল।

"ওয়েক আপ, অয়ন..."

২

অয়ন চোখ খুলল।

সাঁৎ করে একটা দমকা হাওয়া যেন তার বুকের ভেতর ঢুকে পড়ল। অয়ন একটা দীর্ঘ, খাবি খাওয়ার মতো শব্দ করে ধড়মড় করে বিছানার ওপর উঠে বসল।

তার চোখদুটো বিস্ময়ে আর আতঙ্কে বিস্ফারিত। বুকের বাঁ দিকটায় হৃদপিণ্ডটা যেন পাগলের মতো আছড়ে পড়ছে,

ধুকপুক! ধুকপুক! ধুকপুক! ধুকপুক!

সে কয়েক সেকেন্ডের জন্য বুঝে উঠতে পারল না সে এখন কোথায় আছে। তার চোখের সামনে এখনও সেই অন্ধকার জল আর ওই রহস্যময়ী নারীর অবয়বটা ভাসছে। তার ঘাড়ের কাছে যেন এখনও সেই উষ্ণ নিশ্বাসের স্পর্শ লেগে আছে।

অয়ন দু'হাত দিয়ে নিজের বিছানার চাদরটা শক্ত করে চেপে ধরল। খসখস করে আওয়াজ হলো। চাদরের চেনা, রুক্ষ টেক্সচারটা তার হাতের তালুতে লাগতেই সে ধীরে ধীরে বাস্তবে ফিরে আসতে শুরু করল।

সাউথ ব্লক বয়েজ ডর্ম। তিনতলার কর্নারের ঘরটা। তার নিজের ঘর।

একত্রিশে ডিসেম্বরের ভোর। ঘড়িতে এখনও বোধহয় পাঁচটা বাজেনি। ঘরের ভেতরটা নীলচে-ধূসর, ম্লান আলোয় ডুবে আছে। জানলার পর্দাটা সামান্য খোলা, সেখান দিয়ে কনকনে উত্তুরে ঠান্ডা হাওয়া ঘরের ভেতর ঢুকছে। জানলার পাল্লাটা হাওয়ার ধাক্কায় মাঝে মাঝে মৃদু 'খট-খট' শব্দ করছে।

এই হাড়-কাঁপানো ঠান্ডার ভোরবেলাতেও অয়নের পুরো শরীর ঘামে ভিজে জবজবে হয়ে আছে। তার পরনের টি-শার্টটা ঘামে ভিজে বুকের সাথে লেপ্টে আছে। কপালের দুই পাশ দিয়ে ঘামের ফোঁটা গড়িয়ে পড়ছে। সে ডান হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে কপালের ঘামটা মুছল।

অয়ন চোখ বন্ধ করে কয়েকবার গভীর, লম্বা শ্বাস নিল। তার বুকের ওঠা-নামাটা ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে শুরু করল।

সে চোখ খুলল। ডর্মের ঘরটা বরাবরের মতোই নিস্তব্ধ। পাশের বেডটা খালি। ওর রুমমেট অর্ধেক দিন রুমে থাকে না। ভালোই হয়েছে। এই মুহূর্তে ওর এই বিপর্যস্ত অবস্থাটা কারোর চোখের সামনে না পড়াই ভালো।

অয়ন বিছানা থেকে পা নামিয়ে ঠান্ডা মেঝের ওপর রাখল। স্লিপারটা পরল না। মেঝের কনকনে ঠান্ডা স্পর্শটা তার এখন দরকার।

সে ধীর পায়ে হেঁটে জানলার কাছে গিয়ে দাঁড়াল।

বাইরে ভোরের আলো ফোটেনি। পুরো ক্যাম্পাস চত্বরটা ঘন, সাদা কুয়াশার চাদরে মোড়া। ঘন কুয়াশার মধ্যে কিছুটা দূরে অবস্থিত বাস্কেটবল কোর্টটা দেখা যাচ্ছে। একটু দূরের গাছগুলোকে কালো, অস্পষ্ট ছায়ার মতো দেখাচ্ছে। চারদিক এমন নিস্তব্ধ যে, বহুদূরের হাইওয়ে দিয়ে চলে যাওয়া একটা ট্রাকের ইঞ্জিনের গোঙানিও খুব স্পষ্টভাবে অয়নের কানে এসে পৌঁছোল।

অয়ন জানলার গ্রিলটা শক্ত করে ধরল। লোহার গ্রিলটা বরফের মতো ঠান্ডা।

একটু আগে দেখা সেই স্বপ্নের প্রতিটা ডিটেইল, প্রতিটা অনুভূতি তার মস্তিষ্কে একদম ফ্রেম-বাই-ফ্রেম গাঁথা হয়ে আছে।

অয়ন জানলার বাইরে কুয়াশার অন্ধকারে তাকিয়ে রইল। তার ডান হাতের কব্জির সেই জায়গাটা, ঠিক যেখানে ওই রহস্যময়ী নারীমূর্তিটা তাকে শক্ত করে ধরেছিল, সেখানটা এখনও অদ্ভুতভাবে তেতে আছে। 

তার মনের ভেতর এখন তিনটে ছবি খুব পরিষ্কারভাবে ভেসে উঠছে, মায়ের ফিরে না তাকানো, বিক্রম মালহোত্রার বিষাক্ত হাসি আর সেই অজানা নারীর প্রবল উপস্থিতি।

বিদিশার বিশ্বাসঘাতকতা আর বিক্রমের শত্রুতা, এগুলোই এতদিন ধরে অয়নকে ভেতর থেকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছিল। কিন্তু, যে আজ সেই অন্ধকার চোরাবালি থেকে তাকে টেনে তুলল, সে কে? 

অয়ন ধীরে ধীরে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। কুয়াশার বুকে তার মুখের উষ্ণ বাষ্প জমা হয়ে এক মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল।

তার জীবনের সবটুকু জুড়ে ছিল মা। ছোটবেলার বিদিশা মানেই অয়নের কাছে এক পশলা রোদ্দুর, একটা নিরাপদ আস্ত জগৎ। অয়ন আর পাঁচটা সাধারণ বাচ্চার মতো ছিল না। সে ছিল একটু বেশিই শান্ত, একটু বেশিই মায়ের আঁচলধরা। 

বেশিরভাগ সময়, যখন পাড়ার ছেলেরা রাস্তায় বল পেটাত, অয়ন তখন মায়ের পাশে রান্নাঘরের মেঝেকে ক্যানভাস বানিয়ে চক খড়ি দিয়ে আঁকিবুঁকি কাটত।

বিদিশা কড়াইয়ে খুন্তি নাড়তে নাড়তেই একটু পর পর নিচু হয়ে ওর কপালে চুলগুলো সরিয়ে দিতেন। আঁচল দিয়ে কপালের ঘাম মুছিয়ে দিতেন।

তাঁর একটা অদ্ভুত ক্ষমতা ছিল। অয়নকে মন খারাপের কথা মুখ ফুটে বলতে হত না। সে একটু মুখ ভার করে বসে থাকলেই তিনি বুঝে যেতেন। তখন সংসারের হাজার ব্যস্ততার মাঝেও বিদিশা এসে ওর গা ঘেঁষে বসতেন। 

অয়নকে নিজের কোলের ভেতর একপ্রকার লুকিয়ে ফেলে, ওর পিঠে আস্তে আস্তে হাত বুলোতে বুলোতে বলতেন, 

"কী ব্যাপার, আজ আমার অয়নবাবুর মনখারাপ?" 

সেই স্পর্শে এমন এক অলৌকিক জাদু ছিল যে, অয়নের ভেতরের সব অভিমান, সব কান্না পলকে ধুয়েমুছে যেত।

কলেজ থেকে ফেরার সময় অয়নের চোখ দুটো শুধু একটা মানুষকে খুঁজত। গেটের কাছে দাঁড়িয়ে থাকা ভিড়ের মধ্যে সুতির শাড়ি আর ছোট্ট টিপ পরা বিদিশাকে দেখলেই ওর সমস্ত ক্লান্তি উবে যেত। বিদিশা হাতটা বাড়িয়ে দিতেন আর অয়ন নিজের পিটপিটে ছোট্ট হাতটা মায়ের হাতের তালুতে সমর্পণ করে যেন গোটা দুনিয়া জয় করে নেওয়ার ভরসা পেত। 

অয়নের মনে পড়ে গেল অনেক বছর আগের এক বিকেলের কথা। বাইরে খেলতে গিয়ে হাঁটুর ছাল ছাড়িয়ে, রক্তাক্ত অবস্থায় কাঁদতে কাঁদতে ঘরে ফিরেছিল সে। দরজায় দাঁড়িয়ে শুধু ফুঁপিয়ে উঠেছিল, 

"মা..."

বিদিশা দৌড়ে এসে এক লহমায় অয়নকে পাঁজকোলা করে কোলে তুলে নিয়েছিলেন। সেদিন তুলো আর অ্যান্টিসেপ্টিক বের করতে গিয়ে তাঁর হাত দুটো কাঁপছিল। ওষুধের বোতল খোলার আগে অয়নের কপালে একটা লম্বা, উষ্ণ চুমু খেয়ে বিদিশা ফুসফুস ভরে একটা শ্বাস নিয়ে ফিসফিস করে বলেছিলেন, 

"লক্ষ্মী সোনা বাবা আমার... খুব লেগেছে, তাই না ?"

কাটার জ্বালাটা নিমেষে কোথায় যেন উবে গিয়েছিল। বিদিশার গায়ের চন্দনের সুবাস আর তাঁর বাহুমূলের নিরাপদ আশ্রয়টুকুই তখন অয়নের গোটা জগৎ ছিল। 

অয়ন জানত, পিছন ফিরে তাকালেই সে দেখতে পাবে একজন দু-হাত বাড়িয়ে তাকে আলিঙ্গন করার জন্য দাঁড়িয়ে আছে।

সেই বিদিশা ওকে সবার সামনে চড় মেরে অপমান করলেন, 'গুণ্ডা' বলে অপমান করলেন, দূর দূর করে তাড়িয়ে দিলেন।

যে হাতটা এতদিন ওকে শুধু আদর করে এসেছে সেই হাতটাই যে মুহূর্তে ওকে আঘাত করল, সেই মুহূর্তে...সেই মায়াময় ঘর, সেই মমতাময়ী মা, সবটা এক লহমায় ঝাপসা হয়ে গেল।

অয়ন জানলার গ্রিলটা চেপে ধরল।

এক অসহ্য শূন্যতায় ওর বুকের ভেতরটা হু-হু করে উঠল। 

যে বিদিশা অয়নের সামান্য সর্দি-জ্বরে সারারাত জেগে ওর মাথার পাশে বসে হাত বুলিয়ে দিতেন, সেই মা প্রিন্সিপালের অফিসে বিক্রমের পক্ষ নিলেন। এই আঘাতটা অয়নের কাছে সব আঘাত-অপমানের জ্বালার চেয়েও অনেক বেশি যন্ত্রণাদায়ক।

অথচ, সে কলেজে পালিয়ে এসেছিল শুধু মাত্র মায়ের প্রতি নিষিদ্ধ অনুভূতিগুলো থেকে মনটা ঘুরিয়ে নিতে। এছাড়া এখানে আসার আর অন্য কোন কারণ ছিল না।

অথচ, সেই মা-ই আজ ওর জীবনে আর নেই। 

মাকে রক্ষা করা ছাড়া ওর জীবনের আর কোন উদ্দেশ্য ছিল না। অয়ন মায়ের প্রতি এতটাই প্রটেকটিভ ছিল, মাকে এতটাই ভালবাসত যে মাকে নির্যাতিত হতে দেখে ইতালিতে বনগানির উপর উন্মাদের মতো প্রাণঘাতী হামলা চালাতে দুবার ভাবেনি। 

তার কী প্রতিদান মা ওকে দিল ?

ভাবতে ভাবতে অয়নের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল।
ফেস্টের দিন ও একটা বড় শিক্ষা পেয়েছিল। কাউকে সবটুকু দিয়ে ভালবাসা একটা দুর্বলতা। সেই ভুল ও আর কখনও করবে না। সেদিনের পর থেকেই অয়নের জীবনের মোড় ঘুরে গিয়েছিল। 

********************************************

অয়ন জানলার গ্রিল থেকে হাত সরিয়ে ঘরে ফিরে এল। টেবিলের ওপর রাখা জলের বোতলটা তুলে নিয়ে ঢকঢক করে কয়েক ঢোক জল খেয়ে ফেলল। মেঝের শীতল স্পর্শের মতোই ঠাণ্ডা জলটা তার শরীরের অসাড়তাটাকে কাটিয়ে দিতে সাহায্য করল। 

সেদিন রাতের স্মৃতিগুলোকে তো ও মন থেকে মুছে ফেলেছিল, সেগুলো আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে কেন ?

অয়নকে খুব বেশিক্ষণ চিন্তা করতে হল না। বৈশালীর সাথে সেদিনের ওই ঘটনাটাই ট্রিগার হিসাবে কাজ করেছে। যখন থেকে ও বুঝতে পেরেছে যে ও আসলে বৈশালীর মাধ্যমে নিজের মাকে শাস্তি দিচ্ছিল, তখন থেকেই না চাইতেও ওর মনে আবার ফেস্টের চেপে রাখা স্মৃতিগুলো মাথাচাড়া দিতে শুরু করেছে।

অয়ন নিজেকে প্রমিস করেছিল যে ও আর কখনো পিছনে ফিরে তাকাবে না। টানা একমাস নিজেকে ঘরবন্দী করে রাখবার সময় ফেস্টের রাতের এই স্মৃতিগুলোই ওর মনে বারে বারে ফিরে আসত। তখন ওর পাগল হবার মতো অবস্থা হয়েছিল।

মিঃ প্রধানের সৌজন্যে স্বাভাবিক জীবনে ফিরলেও অয়ন মানসিকভাবে সেদিন রাতের ঘটনার সাথে আর কখনো ডিল করতে চায়নি। 

কিন্তু, সেটা বোধহয় সম্ভব নয়। স্মৃতি মুছে ফেলা যায় না। একটা না একটা সময় আমাদের সবাইকেই অতীতের মুখোমুখি হতে হয়। যেমন ওকে এখন করতে হচ্ছে। 

আচ্ছা, যদি সত্যিই বিক্রমের সাথে দেখা হয় তবে ও কী করবে ?

রুডি তো কেবল একটা সিঁড়ি মাত্র, ওর আসল টার্গেট তো বিক্রম। যদি আজ ও বিক্রমকে হাতের নাগালে পায় তাহলে...অয়ন জানে না, ও কী করবে।

তবে ওর হারাবার অনেক কিছু আছে। ওর জীবনটা যে কেবল বিদিশার উপর নির্ভর করে চলতে পারে না, সেটা এখন ও জানে। 

বিক্রমকে হাতের কাছে পেয়ে গেলেও কোনরকম হঠকারী কাজ করা চলবে না। প্রয়োজনে ছেড়ে দিতে হবে। এমন কোন কাজ করা যাবে না যেটা ওর কেরিয়ারের ক্ষতি করতে পারে।

তবে বিক্রমকে ভাঙতে হলে কোন একটা জায়গা থেকে তো শুরু করতেই হবে। সেটা না হয় আজ থেকেই শুরু হোক।

বাইরের জানালার দিকে তাকিয়ে অয়ন ফিসফিস করে উঠল। নিজের কানে তার গলার স্বরটা কিছুটা ভাঙা ভাঙা শোনাল,

"দেখা হবে, বিক্রম। খুব শিগগিরই দেখা হবে।"

৩

সকাল পৌনে সাতটা। ৩১শে ডিসেম্বর।

শীতের সকালের ম্লান, ফ্যাকাশে আলোটা জানালার ভারী নীল পর্দার ফাঁক দিয়ে এসে বিছানায় পড়েছে। ঘরের বাতাসটা তামাকের গন্ধে ভারী হয়ে আছে।

খাটের পাশের ছোট মেহগনি সাইড-টেবিলটার ওপর রাখা একটা কাঁচের অ্যাশট্রে উপচে পড়ছে। অন্তত ডজনখানেক আধপোড়া সিগারেটের ফিল্টার সেখানে স্তূপাকার হয়ে আছে, অ্যাশট্রে ছাপিয়ে টেবিলের পালিশ করা কাঠের ওপর ছাই ছড়িয়ে পড়েছে। তার ঠিক পাশেই একটা সিরামিকের মগ; ভেতরে জমে থাকা ব্ল্যাক কফির তলানিটা কাল রাতের, সেটা এখন ঠান্ডা হয়ে কালো কাদার মতো থকথক করছে। মগের গা বেয়ে শুকিয়ে যাওয়া কফির একটা কালচে দাগ নেমে গেছে।

কাল অনেক রাত করে শুতে গেছে অর্জুন। শিশির রায়ের কেসটা হাতে নেবার পর থেকেই এই অবস্থা। আচরণ দেখে তাকে সাংবাদিক কম, গোয়েন্দা বেশি মনে হবে। সুব্রত চক্রবর্তী ঠিকই বলেছিলেন সে খবরের হাড়মাস চিবিয়ে খেতে ভালবাসে।

ওর মগজটা একটানা হাই-ভোল্টেজে চলা ইঞ্জিনের মতো গরম হয়ে আছে। লেপের নিচে আধশোয়া অবস্থায় সে সবেমাত্র একটু তন্দ্রার যাচ্ছিল।

এমন সময় কাঠের টেবিলের ওপর ফোনটা বেজে উঠল। আওয়াজটা সরাসরি অর্জুনের স্নায়ুতে গিয়ে ধাক্কা মারল। সে চোখ না খুলেই হাতড়ে ফোনটা তুলে নিল। ঘাড়ের কাছের পেশিগুলো শক্ত, চোখের ভেতরটা বালির মতো খসখস করছে।

 স্ক্রিনের আলোয় চোখটা কুঁচকে গেল তার।

কলার আইডিতে নাম নেই, শুধু একটা সেভ করা নম্বর। 

প্যারাডিক।

অর্জুন গলার কাছে জমে থাকা কফটা পরিষ্কার করে কলটা রিসিভ করল।

"বলো।" 

অর্জুনের গলাটা ভাঙা, কিন্তু বরফের মতো ঠান্ডা।

"গুড মর্নিং লাহিড়ীদা! ঘুম ভাঙালাম নাকি?" 

ওপাশ থেকে প্যারাডিকের চেনা, খসখসে গলা ভেসে এল। রাস্তায় গাড়ি চলাচলের আওয়াজ শোনা যাচ্ছে।

"কাজের কথা বল প্যারাডিক। খবর কী?" 

অর্জুন বিছানা ছেড়ে উঠে বসল। খালি গায়ে জ্যাকেটটা চাপিয়ে নিল সে। মেঝের ঠান্ডাটুকু পায়ের তলা দিয়ে সোজা শিরদাঁড়ায় গিয়ে উঠল।

"সলিড খবর, লাহিড়ীদা। তুমি শিশির রায়ের স্পট খুঁজছিলে না? লোকটা এক্সিডেন্টের আগে কোথায় কোথায় যেত?" 

প্যারাডিক একটু গলা নামিয়ে ফিসফিস করে বলল। 

"বাইপাসের ধারে একটা হাই-এন্ড জায়গা আছে... 'ভেলভেট লাউঞ্জ'। নাম শুনেছ?"

অর্জুন ঘরের এক কোণে রাখা একটা বিশাল কর্কবোর্ডের দিকে হেঁটে গেল। 

"ভেলভেট লাউঞ্জ? হুম, ওটা একটা প্রাইভেট মেম্বারস অনলি ক্লাব। পলিটিশিয়ান আর কর্পোরেটদের আস্তানা।"

"একদম ঠিক ধরেছ।" 

প্যারাডিক চুকচুক শব্দ করল। 

"শিশির রায় প্রায়ই ওখানে যেত। অ্যাক্সিডেন্টের সাত-আট দিন আগে শেষবার ওই ক্লাবে গেছিল। সন্ধেবেলা ঢুকেছিল, বেরিয়েছিল প্রায় রাত আড়াইটের সময়। লোকাল বাউন্সারদের সাথে আমার একটু খাতির আছে। ওরা কনফার্ম করেছে, ওই রাতে শিশির রায়ের সাথে ভিআইপি কেবিনে আরও কয়েকজন হোমরাচোমরা ছিল।"

অর্জুন কর্কবোর্ডের সামনে এসে দাঁড়াল।

বোর্ডের এমাথা থেকে ওমাথা লাল সুতোর জাল দিয়ে গাঁথা, যেন কোনো মাকড়সার তৈরি করা এক গোলকধাঁধা। পিন দিয়ে আটকানো ছবি আর নিউজ কাটিং।

অর্জুন ডান হাতে একটা লাল মার্কার তুলে নিল।

"আর কিছু?"

"আসল খবরটা তো এখনও দিইনি লাহিড়ীদা!" 

প্যারাডিক একটা চাপা উত্তেজনা নিয়ে বলল। 

"আজকে থার্টি ফার্স্ট নাইট। ভেলভেট লাউঞ্জে আজ বিশাল প্রাইভেট পার্টির আয়োজন হয়েছে। ইনভাইট-অনলি। কিন্তু ভেতরের খবর হলো, ওই পার্টির ভিড়ের আড়ালে আজ রাতে গ্রাউন্ড ফ্লোরের পেছনের সেফ-রুমে একটা মিটিং হওয়ার কথা আছে। কারা আসবে জানি না, তবে গত দু'দিন ধরে ক্লাবের সিকিউরিটি ডাবল করে দেওয়া হয়েছে।"

মার্কারের ডগাটা কর্কবোর্ডের ওপর একটা সাদা কাগজে সজোরে চেপে বসল।

'ভেলভেট লাউঞ্জ - ৩১শে ডিসেম্বর - মিটিং'।


লেখাটা লিখতে লিখতে অর্জুনের চোয়ালের পেশিগুলো শক্ত হয়ে উঠল। শব্দগুলো লেখার সময় মার্কারের ক্যাঁচক্যাঁচ আওয়াজটা ফাঁকা ঘরে জোরে শোনা যাচ্ছিল।

"ঠিক আছে। তোমার অ্যাকাউন্টে আজ বিকেলের মধ্যে টাকা ঢুকে যাবে।"

"সাবধানে থেকো লাহিড়ীদা। জায়গাটা কিন্তু সুবিধের নয়। আজ রাতে ওখানে মাছি গলার জায়গা থাকবে না।"

জবাব না দিয়ে অর্জুন ফোনটা কেটে দিল।

মার্কারটা ছুড়ে ফেলে দিয়ে সে দু-হাত দিয়ে নিজের মুখটা ঘষল। কর্কবোর্ডের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে তার মাথার ভেতরের গিয়ারগুলো আবার দ্রুত ঘুরতে শুরু করল।

লেক গার্ডেনসে অনুসূয়া সেনের ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে আসার পর গত চব্বিশ ঘণ্টায় অনেকগুলো ঘটনা ঘটে গেছে।

অর্জুন স্পষ্ট মনে করতে পারল, সেই গাঢ় ধূসর রঙের হেডলাইট-ঢাকা স্পোর্টস বাইকটার কথা। কালো ভাইজার নামানো হেলমেটের আড়ালে থাকা সেই চোখ জোড়া। অনুসূয়া সেনের ফ্ল্যাট থেকে বেরোনোর পর লোকটা তাকে ফলো করছিল।

কিন্তু অর্জুন যখন সোজা ঘুরে বাইকারটার চোখের দিকে তাকিয়েছিল, তখন সে একটা জিনিস পরিষ্কার বুঝতে পেরেছিল। শিকার যখন বুঝতে পারে যে তাকে শিকার করা হচ্ছে আর সে যখন পালানোর বদলে সরাসরি শিকারির চোখের দিকে তাকায়, তখন মেন্টাল ব্যালেন্সটা পাল্টে যায়।

লোকটা এরপর আর তাকে ফলো করেনি। অর্জুন গত দু-দিন রাস্তায়, অফিসে, বাড়ির নিচে তীক্ষ্ণ নজর রেখেছে। কেউ নেই। ওরা সম্ভবত বুঝে গেছে যে অর্জুন লাহিড়ী সাধারণ কোন রিপোর্টার নয় যে ভয় পেয়ে গুটিয়ে যাবে। ওরা স্ট্র্যাটেজি পাল্টাচ্ছে। আর তার মানেই হলো, ওরা এখন অর্জুনের ওপর সরাসরি আঘাত হানার সুযোগ খুঁজবে।

অর্জুন কিচেনের দিকে হেঁটে গেল। বেসিনের কলটা খুলে চোখে-মুখে ঠান্ডা জলের ঝাপটা দিল কয়েকবার।

জলের ফোঁটাগুলো চিবুক বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে। তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে সে আবার বসার ঘরে ফিরে এল।

গতকাল দুপুরে দেবোত্তমের দেওয়া ইনফরমেশন গুলো অর্জুনের ডেস্কের ওপর পড়ে আছে। অরুণ চ্যাটার্জীর ফাইল।

ভ্যানগার্ড গ্লোবাল ইন্ডিয়ার ইস্টার্ন জোন হেড। অমৃতা রায়ের প্রাক্তন বস। শিশির রায়ের বিয়ের রেজিস্ট্রির প্রধান সাক্ষী।


দেবোত্তম খোঁজ নিয়ে জানিয়েছে, অরুণ চ্যাটার্জী গত পরশু দিন, অর্থাৎ ২৭শে ডিসেম্বর কলকাতা ছেড়ে অফিসের কাজে ভাইজাগ (বিশাখাপত্তনম) উড়ে গেছেন।

লোকটা কি পালাচ্ছে ?

কারণ যাই হোক অরুণ চ্যাটার্জী এখন অর্জুনের ধরাছোঁয়ার বাইরে। আপাতত ওর ফোকাস আজকের রাত।

ভেলভেট লাউঞ্জ।

থার্টি ফার্স্ট নাইটের পার্টি। লোকজনের ভিড়, দামি মদ, হাই-ভলিউম ইডিএম মিউজিক আর হাজার হাজার ওয়াটের লেজার লাইটের নিচে মাতাল হয়ে থাকা একটা এলিট ক্রাউড। তার মধ্যেই, আড়ালে ওই গোপন মিটিংটা হবে। অর্জুনকে যেভাবে হোক আজ রাতে ওই ক্লাবের ভেতরে ঢুকতেই হবে।

কিন্তু কীভাবে?
সাংবাদিকের প্রেস কার্ড দেখিয়ে ওই প্রাইভেট মেম্বারস ক্লাবে ঢোকা যাবে না। বাউন্সাররা সোজা ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দেবে। গেস্ট লিস্টে নাম না থাকলে মাছিও গলতে পারবে না।

অর্জুন কফির খালি মগটা হাতে নিয়ে জানালার কাছে এসে দাঁড়াল। নিচে রাস্তাটা আস্তে আস্তে জেগে উঠছে।

তাকে এমন একটা ছদ্মবেশ নিতে হবে, যা ভিড়ের মধ্যে মিশে যায়, আবার ভিআইপি জোন পর্যন্ত যার অনায়াস অ্যাক্সেস থাকে।

ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের লোক? ক্যাটারিং স্টাফ? নাকি মাতাল কোনো বড়লোকের বখে যাওয়া ছেলে?

ক্যাটারিং বা বারটেন্ডারদের ব্যাকগ্রাউন্ড চেক হয়, হঠাৎ করে আজ গিয়ে সেখানে ঢোকা মুশকিল। 

ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের লোকজনের গলায় আইডি কার্ড থাকে।

অর্জুন ভাবল। তার চেহারায় এমনিতেই গত কদিনের না-ঘুমানো ক্লান্তির ছাপ। গালে কয়েকদিনের না-কাটা রুক্ষ দাড়ি, চোখের নিচে কালি।

যদি সে একজন নেশাগ্রস্ত, ধনী ক্লায়েন্টের ছদ্মবেশ নেয়? দামি লেদার জ্যাকেট, চোখে রোদচশমা, হাতে একটা ফেক ইনভাইটেশন কার্ড বা কারোর রেফারেন্স?

অর্জুন পকেট থেকে ফোনটা বের করে আবার দেবোত্তমকে ডায়াল করল।

"হ্যালো অর্জুনদা! এত সকালে?" 

দেবোত্তমের ঘুমজড়ানো গলা।

"দেব, তোর ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের ওই সোর্সটাকে এখনই লাইন আপ কর।" 

অর্জুন দ্রুত নির্দেশ দিল। 

"আজ রাতে ভেলভেট লাউঞ্জের পার্টির গেস্ট লিস্টের একটা কপি আমার চাই। অন্তত এমন একটা নাম চাই, যে ইনভাইটেড কিন্তু আজ রাতে পার্টিতে আসছে না। আর একটা ফেক কিউআর কোড বা ই-পাস। বিকেলের মধ্যে।"

"ভেলভেট লাউঞ্জ? অর্জুনদা, ওটা তো ফুল টাইট সিকিউরিটি জোন! ধরা পড়লে..."

"সে দায়িত্ব আমার।" 

অর্জুনের গলাটা এবার রূঢ় শোনাল। 


"তুই শুধু লিস্টটা জোগাড় কর।"


ফোনটা কেটে দিয়ে অর্জুন আলমারির দিকে এগোল। আজ রাতে খবরের সন্ধানে তাকে সরাসরি বাঘের গুহায় ঢুকতে হবে। আর একবার সেখানে ঢুকলে, ফেরার পথ হয়তো আর নাও থাকতে পারে।
[+] 5 users Like RockyKabir's post
Like Reply
৪


ডিসেম্বরের ৩১ তারিখ 
সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা।


পার্টি জিনিসটা কোনোদিনই বিদিশার পছন্দের তালিকায় ছিল না। চিরকালই তিনি একটু অন্তর্মুখী, লোকচক্ষুর আড়ালে নিজের নিভৃত জগতে থাকতেই ভালোবাসেন। অথচ একটা সময় ছিল যখন না চাইতেও ওনাকে নিয়মিত পার্টিতে যেতে হতো। এক্সিকিউটিভ গালা, পাঁচতারা হোটেলের ককটেল নাইট কিংবা বিজনেসম্যানদের সাথে লাভিশ গেট-টুগেদারে তাকে উপস্থিত থাকতেই হতো।

কিন্তু ইতালির সেই মর্মান্তিক ঘটনার পরে 'পার্টি' শব্দটাই বিদিশার কাছে একটা আতঙ্কে পরিণত হয়েছিল। বদ্ধ ঘরের ভেতরে উচ্চগ্রামের মিউজিক, থিকথিকে ভিড় আর আলো-আঁধারির খেলা দেখলেই ওনার দমবন্ধ হয়ে আসত। মনে হতো বাতাসের অক্সিজেন যেন কমে আসছে, হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসছে।

আজও তিনি আসতে চাননি। কিন্তু এটা ওনার চাকরির জায়গা, পেশাদার জীবনের প্রথম বছরেই অফিশিয়াল নিমন্ত্রণ এড়িয়ে বাড়িতে বসে থাকা দৃষ্টিকটু দেখায়। তার উপর বিদিশার সিনিয়রিটি বলতে কিছুই নেই, চাকরির ছয়মাসও হয়নি। প্রাতিষ্ঠানিক প্রোটোকল এড়ানো অসম্ভব।

তাই বাধ্য হয়েই তাঁকে আজ এখানে আসতে হয়েছে।

তবে, এখানে পা রাখার পর বিদিশার ভেতরের জমে থাকা আশঙ্কার মেঘটা খানিকটা হলেও হালকা হলো।

পার্টি বলতে সাধারণ মানুষের মনে অনিয়ন্ত্রিত উন্মাদনা বা কানের পর্দা ফাটানো মিউজিকের ছবি ভেসে ওঠে, তার ছিটেফোঁটাও এখানে নেই। 

অবশ্য তার বোঝা উচিত ছিল যে এটা একটা নামী কলেজের নিজস্ব এক্সক্লুসিভ পার্টি, যার নাম 'অফিসিয়াল নিউ ইয়ার্স ইভ গালা'। এখানে প্রবেশাধিকার কেবল ট্রাস্টি বোর্ডের মেম্বার, কলেজের প্রফেসর, বিভাগীয় প্রধান আর হাতে গোনা কয়েকজন আমন্ত্রিত বিশেষ অতিথির।

এখানে ওসব হওয়া অসম্ভব।

মেইন বিল্ডিংয়ে যে এরকম একটা জবরদস্ত হলঘর আছে সেই বিষয়ে বিদিশার কোন ধারণা ছিল না। দেখলেই বোঝা যায় যে এই ঘরটি ঔপনিবেশিক আমলে তৈরি হয়েছিল।

তারা মেন বিল্ডিংয়ে ব্রিটিশ আমলে তৈরি যেসব বৃহৎ রুমে ক্লাস নেন, এই ঘরটির উচ্চতা তার প্রায় দ্বিগুণ। সিলিং জুড়ে সূক্ষ্ম প্লাস্টার অফ প্যারিসের কারুকার্য আর তার ঠিক মাঝখান থেকে ঝুলে রয়েছে সুবিশাল তিনটে বেলজিয়াম কাঁচের ঝাড়বাতি। সেই ঝাড়বাতির সোনালী মোলায়েম আলো পলিশ করা ইতালিয়ান মার্বেলে ঠিকরে পড়ে পুরো ঘর জুড়ে এক রাজকীয় রোশনাই তৈরি করেছে।

দেওয়াল জুড়ে রয়েছে তামাটে ফ্রেমের তেলরঙের পোর্ট্রেট, কলেজের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রাক্তন খ্যাতনামা উপাচার্যদের গম্ভীর মুখগুলো যেন ওপর থেকে পুরো আয়োজনের ওপর নজর রাখছে।

হলের উত্তর দিকে, দীর্ঘ বার্মিজ টিক কাঠের প্যানেল করা দেওয়ালের কোল ঘেঁষে সাজানো রয়েছে ক্যাটারিং টেবিল। সাদা ধবধবে টেবিলক্লথের ওপর রাখা রুপোলি ক্যান্ডেলস্ট্যান্ড। আর তার পাশে রাখা রয়েছে লাইভ ক্যাটেরিং কাউন্টার, নামী কেটারারের এক্সক্লুসিভ কন্টিনেন্টাল আর ইন্ডিয়ান বুফে স্টল।

হলঘরের মাঝখানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রাখা হয়েছে ভারী সেগুন কাঠের রাউন্ড টেবিল, যার ওপর পাতা ধবধবে সাদা রেশমি টেবিল ক্লথ, তার মাঝখানে কাঁচের ফুলদানিতে তাজা রজনীগন্ধা ও লাল গোলাপের তোড়া। কোণের দিকে আর দেওয়াল ঘেঁষে রয়েছে বেশ কিছু লেদারের সোফা।
 
একপাশে কাঠের ব্যুফে কাউন্টারে রুপোলি ক্যাটলারির মৃদু টুংটাং শব্দ আর অন্য পাশে সুদৃশ্য কাট-গ্লাসের ট্রলিতে পরিবেশন করা হচ্ছে হালকা লাল ও সাদা ওয়াইন, শ্যাম্পেন এবং ফ্রুট ককটেল।

বিদিশা আমন্ত্রিত অতিথিদের পোশাক-আশাক দেখে মনে মনে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন।

এখানে, অধ্যাপকেরা প্রায় সবাই ডার্ক স্যুটে সুসজ্জিত, দু-একজন প্রবীণ প্রফেসর আবার সাবেকি বন্ধগলা আর সিল্কের উত্তরীয় জড়িয়ে এসেছেন। শিক্ষিকারা বেশিরভাগই পরেছেন বালুচরী, কাঞ্জিভরম কিংবা মাইসোর সিল্কের সাবেকি শাড়ি। গলার বা কানের অলঙ্কার অত্যন্ত সংযত। ক্যাটারিং বয়রা ধবধবে সাদা শার্ট, কালো ভেস্ট আর বো-টাই পরে নিঃশব্দে কাঁচের গ্লাসে কোল্ড ফ্রুট-পাঞ্চ আর অ্যাপেটাইজার নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

অতিথিদের হাতে ট্রে থেকে তুলে নেওয়া ককটেল বা মকের কাপ, ঠোঁটের কোণে মাপা ডিপ্লোম্যাটিক হাসি। কেউ মাত্রা ছাড়িয়ে যাচ্ছে না। কথা বলছেন নিচু স্বরে, পরিমিত গলায় যাতে কোনো অবস্থাতেই ঘরের ডেকোরাম নষ্ট না হয়।

বিদিশা হলঘরের এক্কেবারে উত্তর-পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত একটা কোণে লেদার সোফায় গা বাঁচিয়ে বসলেন।

আজকের এই সন্ধ্যার জন্য বিদিশা বেছে নিয়েছেন অত্যন্ত মার্জিত এবং রুচিসম্মত একটি পোশাক। ওনার পরনে একটি পেস্তা-সবুজ রঙের 
খাঁটি বেনারসী সুতি-সিল্কের শাড়ি। শাড়ির কোল জুড়ে জরি দিয়ে বোনা ছোট ছোট কলকা আর চওড়া পেতলে-রুপোলি বর্ডার যা হলের বেলজিয়াম ক্রিস্টালের আলোয় এসে এক চমৎকার দ্যুতি ছড়াচ্ছে। শাড়ির সাথে ম্যাচিং করা কনুই-হাতা ব্লাউজ, পিঠের দিকটা শালীনভাবে ঢাকা।

গলায় একছড়া পাতলা প্ল্যাটিনামের চেইনে বসানো একটা মুক্তোর লকেট আর কানে দুটো ছোট্ট সোনার টপ; এছাড়া তাঁর শরীরে বাড়তি কোনো গহনা নেই।

ডান হাতের কবজিতে একটা সরু লেদার-স্ট্র্যাপ ঘড়ি। চুলটা পেছনের দিকে কায়দা করে ফ্রেঞ্চ রোপ বিনুনি করে কাঁধের একপাশে ফেলা। মুখে হালকা মেকআপ আর ঠোঁটে লিপস্টিক।

[Image: Chat-GPT-Image-Sep-6-2026-01-57-10-PM.png]

বিদিশা আলতো করে নিজের কোলের ওপর রাখা পেস্তা-সবুজ ক্লাচ ব্যাগটা চেপে ধরে এদিক-ওদিক চোখ বুলিয়ে ম্যাথ ডিপার্টমেন্টের পরিচিত মুখগুলোকে খুঁজতে লাগলেন। তার সৌন্দর্য হলে উপস্থিত বেশ কয়েকজন প্রফেসর ও আমন্ত্রিত অতিথির দৃষ্টি আকর্ষণ করল ঠিকই, কিন্তু বিদিশা সেটা লক্ষ্য করলেন না। 

নন্দিতাদিকে কোথাও দেখা যাচ্ছে না। নিশ্চয়ই যথারীতি শেষ মুহূর্তে কোনো ঝামেলার কারণে আসতে পারেননি বা হয়তো লেট করছেন। রাহুল বোস এখনও আসেননি মনে হচ্ছে।

হঠাৎ এক জায়গায় চোখ পড়তেই বিদিশার মুখের চামড়া শক্ত হয়ে গেল। হলের পূর্ব দিকে, ক্যাটেরিং টেবিলের পাশে দাঁড়িয়ে সুব্রত সেন একদল লোকের সাথে দাঁড়িয়ে হেসে হেসে কথা বলছেন।

বিদিশার দৃষ্টি অনুভব করেই হয়তো সুব্রত সেন আচমকা ঘাড় ঘোরালেন। দুজনের চোখাচোখি হলো।

মুহূর্তের মধ্যে সুব্রত সেনের চোখে ভয় আর অস্বস্তি মেশানো ভাব খেলে গেল। কিন্তু, বিদিশা সেটার বিন্দুমাত্র তোয়াক্কা না করে অত্যন্ত শীতলভাবে নিজের মুখ ঘুরিয়ে নিলেন।

পার্টির এই টানটান শৃঙ্খলা, ধ্রুপদী আবহ আর গম্ভীর পরিবেশের মাঝেও বিদিশার মনে ধীরে ধীরে অস্বস্তি দানা বাঁধতে লাগল। যতদিন তিনি নিছক একজন গৃহবধূ ছিলেন, গৃহকোণের চার দেওয়ালে বন্দি ছিলেন, ততদিন ওনার মনে হতো এই সংসারটা তিনি একা হাতে আগলাচ্ছেন। 

অথচ, বিনিময়ে না পেয়েছেন ভালবাসা আর পেয়েছেন প্রাপ্য সম্মান। তার স্বামী থেকেও নেই; তার পরম আদরের সন্তান একটিবারও তার কথা না ভেবে বাড়ি ছেড়ে তাকে একা ফেলে হোস্টেলে চলে এল।

বিদিশার মনে সবার ওপর পুঞ্জীভূত অভিমান জমেছিল। তিনি ভেবেছিলেন, এই খাঁচা থেকে বেরিয়ে কাজের জগতে যোগ দেবার পরে এই একাকীত্ব বোধহয় কেটে যাবে।

নিজের একটা জগত তৈরি হবে, মনের শূন্যতাটুকু মুছে যাবে।

কিন্তু বাস্তবে কী হলো? 

তাঁর একাকীত্ব একবিন্দুও কমেনি। কলেজ থেকে ফিরে যখন তিনি নিজের বাড়িতে পা রাখেন, তখন নিঝুম বাড়িখানা তাঁকে গিলতে আসে। কিন্তু, বছরের পর বছর এভাবে থাকতে থাকতে এই অনুভূতির সাথে বিদিশা মানিয়ে নিয়েছেন। 

তার ওপর কলেজে যোগ দেওয়ার পর তিনি যা দেখলেন, তা ওনার কল্পনারও বাইরে ছিল। 

বিদিশা কখনো চাকরি করেননি। তার বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতা কম। তিনি ভাবতেন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মানেই হলো পবিত্র জায়গা, আদর্শের জায়গা। কিন্তু এখানে আসা অবধি তিনি দেখলেন নোংরা পলিটিক্স, রেষারেষি, কাদা ছোড়াছুড়ি, হিংসা আর পেছনে ছুরি মারা। 

তিনি এক বুক আদর্শ নিয়ে কাজে যোগ দিয়েছিলেন। আর এখন তাকে শুনতে হচ্ছে এর আগে এই কলেজের এক্স স্টুডেন্টরা নাকি মার্ডার অবধি করেছে।

তার ওপর এখন যুক্ত হয়েছে ওনার অতীত জীবনের রহস্য।

'দেবাশ্রয়'-এ গিয়ে নিজের মায়ের ইতিহাস খুঁজতে গিয়ে তিনি যে ধাঁধার মুখে পড়েছেন, তাতে বিদিশার মন আরও অস্থির হয়ে উঠেছে। সুচরিতা মুখোপাধ্যায়, তার মা; রাতের অন্ধকারে বাড়ি থেকে পালিয়েছিলেন নিজের সাথে পরিবারের কোনো মহামূল্যবান সম্পদ নিয়ে? কোন সম্পদ?

বাগবাজারের ঐ বাড়িতে পরের বার ঢুকতে দেবে বলে তো মনে হয় না। 

বিদিশা বুঝতে পারছিলেন, তিনি এক চরম ঘূর্ণাবর্তের মাঝে এসে পড়েছেন। নিস্তরঙ্গ নদী ভেবে যেখানে পা দিয়েছিলেন, সেখানে একটা মারাত্মক চোরাবালি যে অপেক্ষা করছিল সেটা তার জানা ছিল না।

এখন আর পিছিয়ে আসার কোনো রাস্তা নেই। 

"আরে, মিস গাঙ্গুলি! এখানে একা একা বসে কী চিন্তা করছেন?"

চেনা কন্ঠের আওয়াজে বিদিশার চিন্তার সূত্র আচমকা ছিঁড়ে গেল। তিনি মুখ তুলে তাকালেন। সামনে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছেন অনামিকা রায়। 

বিদিশা আশা করেননি এখানে এভাবে অনামিকার দেখা পাবেন। অনামিকার সাথে কথা বলার বিন্দুমাত্র ইচ্ছা ছিল না তাঁর। মনে মনে অপ্রস্তুত হলেও, তিনি নিজের ভেতরের অস্বস্তিটা মার্জিত হাসির আড়ালে ঢেকে সৌজন্যবোধ দেখিয়ে সোজা হয়ে বসলেন।

"নমস্কার মিস রায়। না, বিশেষ কিছু নয়... একটু রিল্যাক্স করছিলাম।"

"রিল্যাক্স?

এরকম মনমরা হয়ে একা একা বসে থাকতে আছে নাকি? আসুন আমার সাথে, আজ আপনাকে আমাদের কয়েকজন ফ্যাকাল্টিদের সাথে আলাপ করিয়ে দিই!"

চেনা আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গিমায় কথাগুলো বলে অনামিকা বিদিশার এক হাত ধরে তাকে একপ্রকার টেনেই দাঁড় করিয়ে দিলেন। 

বিদিশা আমতা আমতা করে কিছু বলার আগেই অনামিকা ওনাকে প্রায় টেনে নিয়ে এলেন হলের মাঝামাঝি একটি সুদৃশ্য রাউন্ড টেবিলের পাশে।

সেখানে ইতিমধ্যেই চার-পাঁচজন কমবয়সী শিক্ষিকা আড্ডায় মগ্ন। বিদিশার দেখে মনে হল এদের সবার বয়স ছাব্বিশ থেকে তিরিশের কোঠায়। 


"গার্লস! মিট মিস বিদিশা গাঙ্গুলি, ম্যাথ ডিপার্টমেন্টের নতুন সেনসেশন!" 

অনামিকা কায়দা করে বিদিশাকে ইন্ট্রোডিউস করলেন। মেয়েরা সবাই বিদিশাকে দেখে মৃদু হেসে সৌজন্য বিনিময় করল। তারপর অনামিকা একে একে সবার সাথে আলাপ করিয়ে দিলেন। কেউ ইতিহাস, কেউ অর্থনীতি, কেউ সমাজতত্ত্ব আবার কেউ বাংলা সাহিত্যের ফ্যাকাল্টি। 

বিদিশার ম্যাথ ডিপার্টমেন্ট মেইন বিল্ডিংয়ে অবস্থিত। সেখানে ম্যাথ বাদ দিয়ে অন্য কোন সাবজেক্টের ক্লাস এখন আর নেওয়া হয় না।

ক্লাসরুম, টিচার্স লাউঞ্জ আর লাইব্রেরী বাদ দিলে বিদিশা নিজের কেবিন ছেড়ে কোথাও বেরোন না। তাই এসব টিচারদের সাথে তাঁর দেখা হবার প্রশ্নই ওঠে না।

বিদিশা টেবিলে বসবার দু-তিন মিনিটের মধ্যেই বুঝতে পারলেন, এদের আলোচনার বিষয়বস্তু অ্যাকাডেমিক্স বা কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স নয়।

এদের আলাপের মূল কেন্দ্রবিন্দু হল কলেজের কমবয়সী, আকর্ষণীয় পুরুষ ছাত্ররা!

"না রে, ফোর্থ সেমিস্টারের রোহনটাকে দেখবি..." 

ইকনমিক্সের তরুণী শিক্ষিকা জ্যুসের গ্লাসে চুমুক দিয়ে বেশ রসিয়ে রসিয়ে বলছিলেন, 

"স্পোর্টস মিটের দিন যখন বাস্কেটবল কোর্টে স্লিভলেস গেঞ্জি পরে ড্রিবল করছিল... ওফ! ওয়াট আ ফিজিক! ক্লাসে যখন অ্যাটেনডেন্সের জন্য ম্যাম বলে তাকায়, মনে হয় যেন সোজাসুজি বুলেটের মতো এসে বিঁধছে!"

"আরে ছাড় তো তোর বাস্কেটবল প্লেয়ার!" 

হিস্ট্রির এক শিক্ষিকা হেসে উঠে যোগ করলেন, 

"ক্রিকেট টিমের ওই নতুন ফার্স্ট বোলারটাকে দেখেছিস? কী যেন নাম... অরিজিৎ? জিম থেকে যখন কম্প্রেশন টি-শার্ট পরে বেরোয়, মাসলগুলো দেখলে মনে হয় যেন প্রফেশনাল মডেল! গত সপ্তাহে অ্যাসাইনমেন্টের নাম করে আমার কেবিনে ২০ মিনিট বসে ছিল, গায়ের আফটারশেভের গন্ধে পুরো রুম ড্রাঙ্ক হয়ে গিয়েছিল!"

কথাগুলো শুনে বিদিশার মার্জিত রুচিবোধ আর নীতিবোধে এক তীব্র ধাক্কা লাগল। ওনার মুখটা মুহূর্তের মধ্যে কঠিন, শক্ত হয়ে উঠল।

শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর মধ্যকার সম্পর্কের একটা নির্দিষ্ট পবিত্রতা ও সীমারেখা থাকা উচিত; এটা বিদিশার জীবনের মূল শিক্ষার অংশ। কমবয়সী ছেলেদের শরীর, মাসল আর তাদের তাকানো নিয়ে প্রফেশনাল টিচারদের এরকম প্রকাশ্য, চটুল রসিকতা বিদিশার মন একবিন্দুও গ্রহণ করতে পারল না।

তিনি বেমালুম ভুলে গেলেন যে কলেজের প্রথম দিন এক তরুণ প্রফেসরকে এক ছাত্রীর সাথে করিডোরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তিনি বেশ রোমাঞ্চিত হয়েছিলেন।

এমন সময় হঠাৎই... বিদিশার মাথায় একটা শব্দ বিদ্যুতের মতো ঝলসে উঠল।

ফুটবল।

"অয়ন তো ফুটবল খেলে!"

এটা মনে আসা মাত্রই বিদিশার বুকের ভেতরটা ছ্যাঁত করে উঠল। 

অয়ন এত সুন্দর ছিল যে, কেউ একবার ওকে কোলে নিলে, সে আর ওকে ছাড়তে চাইতো না। ধবধবে ফর্সা চামড়া, কুচকুচে কালো বড় বড় নিষ্পাপ চোখ, তুলতুলে নরম গাল, মিষ্টি হাসি আর দেবশিশুর মতো মুখ!

কিন্তু , একইসাথে ও আবার ভীষণ স্পর্শকাতর আর লাজুকও ছিল। অচেনা কারো কোলে দু-মিনিটের বেশি টিকতে পারতো না। প্রথমে ছোট্ট দুটো হাত বাড়িয়ে মায়ের দিকে তাকাত, তারপর মায়ের কোলে ফেরার জন্য আঁকুপাঁকু করত। যতক্ষণ না বিদিশা ওকে নিজের কোলে তুলে নিয়ে বুকের সাথে চেপে ধরতেন, ততক্ষণ ওর কান্না থামত না।

বিদিশা কোলে নেবার সাথে সাথেই সে ওঁর কানের কাছে মুখ গুঁজে ছোট ছোট হাত দুটো দিয়ে ওনার গলাটা শক্ত করে জড়িয়ে ধরে থাকত।

আর তারপর? 

অবধারিতভাবে দেখা যেত, তার ছেলেটার উপর কারোর না কারোর হিংসুটে নজর লেগে গেছে। সারা রাত আর ঘুমোত না অয়ন, পেটের যন্ত্রণায় কঁকাত, প্রচণ্ড জ্বর উঠত। বিদিশা সারা রাত জেগে কোল্ড-কমপ্রেস দিতেন, ছেলের কপালে হাত বুলিয়ে দিতেন, নজর কাটানোর জন্য রাতে ওর কানের পেছনে কাজলের ফোঁটা লাগিয়ে দিতেন।

এরকম কত রাত যে জেগে বিদিশা, অয়নের মাথায় জলপট্টি দিয়েছেন, নজরের নজরছাঁট পুড়িয়েছেন!

অথচ, তাকে ত্যাগ করে হোস্টেলে চলে আসতে সেই ছেলে একবারের জন্য ভাবল না।

মনের গোপন কুঠুরি থেকে ভেসে আসা ক্রুদ্ধ কন্ঠস্বরটা সঙ্গে সঙ্গে চাপা দিলেন বিদিশা। 

বড় হলে সবাই নিজের নিজের জগত বেছে নেয়। এতে রাগের কিছু নেই।

আজ অয়ন নিজের আলাদা জগত বেছে নিয়েছে। কিন্তু, সেই জগতের চারপাশটা যে কতটা বিষাক্ত, সেটা কি সে জানে?

চারপাশের হাসির শব্দগুলো বিদিশার কানে তীক্ষ্ণ কাচের টুকরোর মতো বিঁধছিল। তার চোয়াল হঠাৎ করে শক্ত হয়ে এল, শাড়ির নিচে বুকের খাঁচাটা রাগে, উত্তেজনায় দ্রুত ওঠানামা করতে লাগল।

'কী অসভ্য, নোংরা পরিবেশ!' 

বিদিশা নিজের মনে মনে গর্জে উঠলেন।

যে শিক্ষিকারা এখানে বসে অন্য ছাত্রদের শরীর নিয়ে এভাবে নোংরা আলোচনা করছে, সায়েন্স ডিপার্টমেন্টের টিচাররা কখনো তার ছেলেটাকে নিয়ে এভাবে আলোচনা করেনি তো ?

ভাবনাটা মনে আসতেই বিদিশার মুখটা তিতকুটে স্বাদে ভরে গেল। রাগে ওনার রক্ত গরম হয়ে উঠতে লাগল।

নিজের ওপর চরম ক্ষোভ জন্মাল ওনার। তার ছেলেকে এই নোংরা, কালচারলেস কলেজে পড়তে পাঠানোই ওনার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল! প্রেসিডেন্সি কিংবা সেন্ট জেভিয়ার্সের মতো নামী কলেজগুলো কি এমন খারাপ ছিল? 

সেখানেও তো পড়াশোনার পরিবেশ, হেরিটেজ, কালচার সবই আছে!

কিন্তু না! বাবুকে তো হোস্টেল লাইফ কাটাতে হবে! ওনার স্বাধীনতা চাই! আর বিদিশাও ছেলে বড় হয়েছে মনে করে ভীষণ কষ্ট হলেও তার আবদার হাসিমুখে মেনে নিলেন! 

বিদিশার মনে হলো, সেদিন ওনার আরও শক্ত হওয়া উচিত ছিল। মা হিসেবে ওনার অয়নের উপর নিজের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া উচিত ছিল! আজ যদি ওনার শক্ত বাঁধন থাকতো, তবে অয়নকে এই রকম পরিবেশে পড়াশোনা করতে হতো না!

"বিদিশা? কী হলো আপনার? হঠাৎ অমন গম্ভীর হয়ে গেলেন যে?"

অনামিকার কৌতূহলী গলার প্রশ্নে বিদিশার কল্পনার জগত এক ঝটকায় ভেঙে চুরমার হয়ে গেল।

তিনি সজাগ হয়ে দেখলেন, টেবিলের চার-পাঁচজোড়া চোখ ওনার মুখের শক্ত, থমথমে এক্সপ্রেশনের দিকে কৌতূহল নিয়ে তাকিয়ে রয়েছে।

বিদিশা দ্রুত নিজেকে সামলে নিলেন। নিজের মেকি ভদ্রতা মুখোশটা মুখে টেনে এনে একচিলতে অপ্রস্তুত হাসি ফুটিয়ে বললেন,

"না না... তেমন কিছু নয় মিস রায়। জাস্ট ভাবছিলাম, হঠাৎ ওয়েদারটা বেশ ঠান্ডা হয়ে উঠেছে মনে হচ্ছে।"

অনামিকা কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে বিদিশার নজর চলে গেল ব্যাঙ্কোয়েট হলের মূল এন্ট্রান্সের দিকে।

ভারী মেহগনি কাঠের দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করছেন রাহুল বোস। ওনার পরনে একটা গাঢ় নেভি-ব্লু ব্লেজার, ধবধবে সাদা শার্ট আর মার্জিত টাই। 

রাহুলের উপস্থিতিই বিদিশার মনে স্বস্তির হাওয়া বয়ে নিয়ে আনার জন্য যথেষ্ট। এক লহমায় তার মুখ স্বতঃস্ফূর্ত হাসিতে ভরে গেল। তিনি এই নোংরা পরিবেশ থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার এক সুবর্ণ সুযোগ খুঁজে পেলেন।

তিনি অনামিকার দিকে তাকিয়ে হালকা ঘাড় নেড়ে মার্জিত ভাবে বললেন, 

"এক্সকিউজ মি, মিস রায়। আমার ডিপার্টমেন্টের একজন ফ্যাকাল্টি এইমাত্র ঢুকলেন। আমাকে একটু ওনার সাথে কথা বলতে হবে।"

অনামিকা কিছু বলার আগেই নির্জলা মিথ্যা কথাটা বলে বিদিশা তার শাড়ির আঁচলটা সামলে টেবিল থেকে উঠে দাঁড়ালেন।
[+] 9 users Like RockyKabir's post
Like Reply
৫



ঘড়ির কাঁটায় তখন রাত নটা বেজে পনেরো।

অয়ন ক্লাবের মূল কাঁচের দরজার বাইরে আইডি ভেরিফিকেশনের জন্য কয়েক সেকেন্ডের জন্য থমকে দাঁড়াল। ওর পরনে একটা কুচকুচে কালো টার্টলনেক সোয়েটার আর ডার্ক জিন্স, তার ওপর চাপানো একটা সাধারণ কালো লেদার জ্যাকেট। পোশাকটা এমনভাবে বেছে নেওয়া যাতে ভিড়ের মধ্যে খুব সহজেই মিশে যাওয়া যায়, আলাদা করে কারও চোখে না পড়ে।

দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা বাউন্সারকে নিজের ফোনে থাকা কিউ-আর (QR) কোডটা স্ক্যান করাল অয়ন। বাউন্সার মাথা নেড়ে সরে দাঁড়াতেই অয়ন ভারী কাঁচের দরজাটা ঠেলে ভেতরে পা রাখল।

ভেতরে ঢুকতেই তার মনে হলো সে যেন সোজা নরককুণ্ডে এসে পড়েছে।

বিশাল হলঘরটার তাপমাত্রা বাইরের চেয়ে অন্তত দশ ডিগ্রি বেশি। 

বাতাসে সিগারেটের ধোঁয়া, পোড়া গাঁজা আর অ্যালকোহলের বমি-উদ্রেককারী গন্ধ পাক খাচ্ছে। সিলিং থেকে নেমে আসা লেজার লাইটগুলো লাল, নীল আর বেগুনি রঙে পুরো হলঘরটাকে চিরে ফেলছে। স্মোক মেশিন থেকে বেরোনো ঘন ধোঁয়ার চাদরে ফ্লোরের ওপর নাচতে থাকা শ-দুয়েক ছেলেমেয়ের শরীরগুলো কখনো স্পষ্ট হচ্ছে, কখনো আবার অন্ধকারের মধ্যে হারিয়ে যাচ্ছে।

অয়ন ধীর পায়ে, অত্যন্ত সতর্কতার সাথে তাড়াহুড়ো না করে ভিড়ের পাশ কাটিয়ে এগোতে শুরু করল। ও আন্দাজ করেছিল যে 'পার্টি' মানে এরকমই কিছু একটা হতে চলেছে সেজন্যই জিনিয়াকে ঘুরিয়ে 'না' বলে দিয়েছিল। কিন্তু, আজ বাধ্য হয়ে আসতে হল। স্রেফ বিক্রমের জন্য। 

হাঁটতে হাঁটতে মাঝে মাঝেই অয়ন চারপাশটা স্ক্যান করে নিতে লাগল। সিধুর কথা অনুযায়ী আজ বিক্রমের এই পার্টিতে আসার চান্স আছে। 

কিন্তু, ওর মতো ছেলে এত তাড়াতাড়ি পার্টিতে ঢুকবে বলে মনে হয় না। 

অয়ন মনে মনে হিসাব কষতে লাগল। বিক্রম যদি বারোটার পর আসে, তাহলে ওকে অন্তত তিন থেকে চার ঘণ্টা এই বদ্ধ, দমবন্ধ করা পরিবেশে টিকে থাকতে হবে। তার চেয়েও বড় কথা, ওকে এমন একটা জায়গা বেছে নিতে হবে যেখান থেকে পুরো ডান্স ফ্লোর, মূল প্রবেশদ্বার আর ভিআইপি লাউঞ্জটা পরিষ্কার দেখা যায়, অথচ কেউ ওকে দেখতে পাবে না। একদম ছায়ার মতো। 

সবচেয়ে বেশি সতর্ক থাকতে হবে বৈশালীর থেকে।
সে যদি একবার ওকে এখানে দেখে ফেলে, তবে নির্ঘাৎ একটা বড়সড় সিন ক্রিয়েট করবে।বিক্রমকে ধরার জন্য বৈশালীর পার্টিতে আসতে হবে জানলে সেদিন কন্ট্রোল হারিয়ে অমন কাজ অয়ন কখনো করতো না।

আজ কোনভাবেই স্পটলাইটে আসা যাবে না। স্পটলাইটে এলে বিক্রমের ওপর নজর রাখার প্ল্যানটা পুরোপুরি ভেস্তে যাবে।

হলঘরের ডানদিকের বার কাউন্টারটা এড়িয়ে অয়ন বাঁ দিকের একটা আধো-অন্ধকার করিডোরের দিকে এগোল। করিডোরটা গিয়ে মিশেছে একটা চওড়া ব্যালকনিতে, যার একপাশে একটা বিশাল মেকি রোমান পিলার। পিলারের পেছনের জায়গাটা প্রায় অন্ধকার, লেজার লাইটের রশ্মি ওখানে পৌঁছচ্ছে না।

অয়ন নিঃশব্দে পিলারের আড়ালে গিয়ে দাঁড়াল। জায়গাটা পারফেক্ট। এখান থেকে পুরো পার্টির প্যানোরামিক ভিউ ওর চোখের সামনে।

সে পিলারের ঠান্ডা পাথরে পিঠ ঠেকিয়ে চোখ বুজে একবার গভীর শ্বাস নিল।


তারপর চোখ মেলে ডান্স ফ্লোরের দিকে তাকাল। স্টুডেন্টদের একটা বড় অংশ ইতিমধ্যেই আউট অফ কন্ট্রোল। ফ্লোরের এক কোণে একটা সোফার উপর একটা ছেলে একটা মেয়ের গলার কাছে মুখ গুঁজে পড়ে আছে। মেয়েটা বাধাও দিচ্ছে না, আটকাচ্ছেও না; তার হাতের গ্লাস থেকে ছিটকে পড়া রাম কার্পেটের ওপর গড়িয়ে পড়ছে, সেদিকে তার খেয়ালই নেই। আশেপাশের কেউ ফিরেও তাকাচ্ছে না।

স্পিকারের একদম সামনে তিন-চারটে মেয়ে বেসামাল হয়ে নাচছে, হাসতে হাসতে একে অপরের গায়ে ঢলে পড়ছে, কে দেখছে তাতে তাদের কিছু যায় আসে না।

বার কাউন্টারের পাশে একটা ছেলে সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে গ্লাসের পর গ্লাস খালি করে যাচ্ছে, তার চোখ দুটো লাল, ফোকাসে নেই।

জানলার ধারের কার্পেটে একটা ছেলে চিত হয়ে শুয়ে আছে, জুতো পায়েই। পাশ দিয়ে সবাই হেঁটে যাচ্ছে, কেউ তাকে তোলার চেষ্টাও করছে না। এক কোণে দুজন চিৎকার করে ঝগড়া করছে, কী নিয়ে ঝগড়া নিজেরাও জানে না, ঝগড়ার মাঝেই আবার হেসে একে অপরকে জড়িয়ে ধরছে।

এসব দেখে অয়নের মনে হল এই পার্টিগুলো শুধু নাচগানের জায়গা নয়। এখানে আউট অফ কন্ট্রোল হওয়াটা অ্যালাউড। কেউ কিছু বলবে না জেনেই মানুষ নিজের ভেতরের সংস্কারগুলোকে একরাতের জন্য ছুটি দিয়ে দেয়।

হঠাৎ লেজারের একটা তীব্র সাদা আলো ফ্লোরের মাঝখানে পড়তেই অয়নের চোখ দুটো সরু হয়ে এল।

বৈশালী।

ফ্লোরের ঠিক মাঝখানে, ভিআইপি সোফার ঠিক সামনে দাঁড়িয়ে আছে সে। পরনে একটা রক্তবর্ণের বডিকন ড্রেস। শরীরের প্রতিটি বাঁক নিখুঁতভাবে ফুটে উঠেছে। পিঠের দিকটা প্রায় পুরোটাই অনাবৃত। চুলগুলো নিপুণভাবে সেট করা, ঠোঁটে গাঢ় লাল লিপস্টিক। লেজারের আলোয় সুন্দরী বৈশালীকে দেখে মনে হচ্ছে লালরঙা আগুনের শিখা।

ওর পাশে দাঁড়িয়ে আছে দেবমাল্য। দেবমাল্যর হাতে একটা গ্লাস, মুখে আত্মবিশ্বাসী হাসি। হাসিটা দেখে অয়নের ভীষণ মেকি মনে হল।

ছেলেটা প্রাণপণে বৈশালীর দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করছে। সে বারবার ঝুঁকে বৈশালীর কানের কাছে কিছু বলার চেষ্টা করছে। 

বৈশালীর হাতেও একটা গ্লাস, তাতে তরল পানীয়।
দেবমাল্যর কথায় ওর কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। ওর চোখের দৃষ্টি অস্থির। ভিড়ের মধ্যে ক্রমাগত কাউকে খুঁজছে। একটা তীব্র অতৃপ্তি আর বিরক্তি ভাব ওর মুখে স্পষ্ট।

কে জানে হয়তো ওকেই খুঁজছে। সিধু আবার বৈশালীকে কিছু বলে-টলে দিল নাকি ?

অয়ন নিজের অজান্তেই পিলারের আরও একটু আড়ালে সরে গেল।

বৈশালী ওকে এখানে দেখতে পেলেই অকারণে ঝামেলা পাকাবে আর তাতে ওর মূল লক্ষ্যটাই নষ্ট হয়ে যাবে। আজকে ওর মূল লক্ষ্য বিক্রমকে স্টাডি করা।

৬

সময় গড়াচ্ছে।

ডিজে মিউজিকের টেম্পো আরও একধাপ বাড়িয়ে দিয়েছে। বাতাসে কামনার গন্ধটা এখন আরও তীব্র হয়ে উঠেছে।

অয়ন পিলারের আড়ালে একটা মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছে। ওর নিঃশ্বাস একদম স্বাভাবিক, চোখের পলক পড়ছে মেপে মেপে। ওর চারপাশে এতগুলো মানুষ উদ্দামভাবে নড়াচড়া করছে, নাচছে, গাইছে, চিৎকার করছে। কিন্তু, অয়ন একদম স্থির। এই ঘরে থেকেও সে এই ঘরে উপস্থিত নেই। ওর এই স্থিরতা ওকে বাকিদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা করে রেখেছে।

কিন্তু অয়ন জানত না, এটাই ওকে একজনের চোখে ইতিমধ্যেই ধরিয়ে দিয়েছে।

হলঘরের উল্টোদিকে, ভিআইপি লাউঞ্জের একটু ওপরের দিকে একটা ছোট মেজানাইন ফ্লোর রয়েছে। সেখান থেকে পুরো পার্টির উপর নজর রাখা যায়।

সেই মেজানাইন ফ্লোরের রেলিংয়ে কনুই ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল জিনিয়া।

ওর পরনে একটা কালো রঙের স্লিট ড্রেস, হাতে মার্টিনির গ্লাস। জিনিয়া মাতাল হয়নি। 

ওর চোখ প্রথমে ছিল বৈশালীর ওপর। দেবমাল্যর মতো একটা জোকারকে নিয়ে বৈশালী কতক্ষণ থাকতে পারে, সেটাই জিনিয়া দেখছিল।

কিন্তু হঠাৎ জিনিয়ার দৃষ্টি হঠাৎ ডান্স ফ্লোর পেরিয়ে বাঁ দিকের অন্ধকার করিডোরের দিকে চলে গেল।

ভিড়ের মধ্যে একটা নিয়ম আছে। সবাই যখন নড়চড়া করে, তখন যে একদম নড়ে না, তাকে সবার আগে চোখে পড়ে।

রোমান পিলারটার পেছনে কালোরঙের গাঢ় ছায়া। 

প্রথমে তার মনে হয়েছিল হয়তো কোন কাপল অন্ধকার খুঁজছে। কিন্তু তারপর লেজারের একটা নীল আলো এক সেকেন্ডের জন্য ওই করিডোরের ওপর দিয়ে ঘুরে গেল।

সেই এক সেকেন্ডের ভগ্নাংশে জিনিয়া ছায়াটার আসল অবয়বটা দেখতে পেল।

অয়ন চ্যাটার্জী।

কালো লেদার জ্যাকেট আর ডার্ক জিন্স পড়ে এসেছে যাতে অন্ধকারে মিশে যেতে সুবিধা হয়।

জিনিয়ার চোখ সরু হয়ে এল। ওর হাতটা মার্টিনির গ্লাসের ওপর শক্ত হয়ে গেল। বুকের ভেতরটা একটা অদ্ভুত উত্তেজনায় ধক করে উঠল।

অয়ন এখানে!

সেদিন মাঠে ক্যাজুয়ালি ইনভিটেশনটা রিফিউজ করার পরে আজ চুপিচুপি, অন্ধকারের মধ্যে লুকিয়ে এই পার্টিতে চলে এসেছে!

কিন্তু কেন ?

'ও কি বৈশালীর জন্য এসেছে?' 

জিনিয়া মনে মনে ভাবল।

জিনিয়া একভাবে অয়নের দিকে তাকিয়ে রইল। ওর বডি ল্যাঙ্গুয়েজে সেলিব্রেশনের কোন ছাপ নেই। 

ও বারে যাচ্ছে না, কোন মেয়ের দিকে তাকাচ্ছে না। 

শুধু ছায়ার মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে।

জিনিয়ার ঠোঁটের কোণে একটা বুদ্ধিদীপ্ত হাসি ফুটে উঠল।

"প্লেয়িং হাইড অ্যান্ড সিক, মিস্টার চ্যাটার্জী?" 

জিনিয়া নিজের মনে ফিসফিস করে উঠল।

ও গ্লাসের শেষ পানীয়টুকু এক ঢোঁকে শেষ করে গ্লাসটা পাশের টেবিলে নামিয়ে রাখল।

খেলাটা এবার জমবে। 

বৈশালী যদি ঘুণাক্ষরেও টের পায় যে অয়ন এই পার্টিতে আছে আর লুকিয়ে লুকিয়ে ওকে দেখছে, তাহলে আজকের পার্টি একটা কুরুক্ষেত্রে পরিণত হবে।

জিনিয়া রেলিং থেকে সরে দাঁড়াল।

৭

ব্যালকনি থেকে নিচে নেমে এসে জিনিয়া ভিড় ঠেলে সে সোজা ভিআইপি বুথের দিকে এগিয়ে গেল।

সেখানে মখমলের কাউচের ওপর বসে আছে বৈশালী। ওর ঠিক পাশেই বসে আছে দেবমাল্য। সে বৈশালীর হাতে ওয়াইনের গ্লাস তুলে দিচ্ছে, ওর কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে কিছু একটা ফিসফিস করে বলার চেষ্টা করছে আর বৈশালী সেটা সহ্য করছে। ওর চোখমুখ দেখলেই বোঝা যায় সে অত্যন্ত বিরক্ত।

জিনিয়া গিয়ে সোজা বৈশালীর হাত ধরে টান দিল।

"এক্সকিউজ মি দেব, ওকে আমার দু-মিনিটের জন্য একটু দরকার।"

দেবমাল্য কিছু বলার আগেই জিনিয়া বৈশালীকে একপ্রকার টেনে হিঁচড়ে লাউঞ্জের একপাশে লেডিজ ওয়াশরুমের পেছনের তুলনামূলক শান্ত একটা করিডোরে নিয়ে এল। মিউজিকের আওয়াজটা এখানে বেশ কিছুটা কম।

"হোয়াট দ্য হেল জিনিয়া! কী করছিস তুই? আমার ড্রেসটা ছিঁড়ে যেত তো!"

বৈশালী নিজের সিল্কের ড্রেসটা ঠিক করতে করতে খেঁকিয়ে উঠল।

জিনিয়া দেওয়ালে হেলান দিয়ে হাত দুটো বুকের ওপর আড়াআড়িভাবে ভাঁজ করে দাঁড়াল। তার চোখে সেই চেনা, তীক্ষ্ণ দৃষ্টি।

"তোর বর এসেছে।"

জিনিয়া খুব ক্যাজুয়াল গলায়, প্রতিটা শব্দ স্পষ্টভাবে উচ্চারণ করল।

কথাটা শোনামাত্রই বৈশালীর বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। হাতের ওয়াইনের গ্লাসটা কেঁপে যাওয়ায় কয়েক ফোঁটা লাল তরল মেঝেতে ছিটকে পড়ল।

কিন্তু, মুহূর্তের মধ্যে সে নিজেকে সামলে নিয়ে নিজের ওপর একটা বিরক্তির মুখোশ টেনে নিল।

"হোয়াট রাবিশ! কিসের বর? কে এসেছে?"

ওর গলাটা প্রয়োজনের তুলনায় একটু বেশিই চড়া শোনাল।

জিনিয়া তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল। সে হাতের ইশারায় লাউঞ্জের সেই অন্ধকার কর্নারটার দিকে ইঙ্গিত করল।

"ওই দ্যাখ। তোর অ্যাংরি ম্যান। অন্ধকার কোণায় ঘাপটি মেরে বসে আছে। আমি সিওর, ও তোকে ফলো করেই আজ এখানে এসেছে। নাহলে অয়ন চ্যাটার্জীর মতো একটা অ্যান্টিসোশ্যাল ছেলে কোনদিন এসব ক্লাবে পা রাখে?"

বৈশালী করিডোরের আড়াল থেকে উঁকি দিয়ে তাকাল।

অন্ধকারের মধ্যেও ওই চওড়া কাঁধ, হুডের নিচ থেকে বেরিয়ে থাকা ধারালো চোয়াল আর ওই স্থির, শীতল ভঙ্গিটা চিনতে তার এক সেকেন্ডও সময় লাগল না। 

অয়ন!

বৈশালীর চোখের তারা দুটো এক লহমায় প্রসারিত হয়ে গেল। তার শ্বাসপ্রশ্বাস হঠাৎ করেই ভারী হয়ে উঠল।

কদিন আগের স্মৃতিগুলো একটা দমকা হাওয়ার মতো ওর মাথার ভেতর আছড়ে পড়ল। গ্যালারির ঠান্ডা মেটাল নেটিং, ওর শর্টসের ওপর দিয়ে অয়নের পুরুষাঙ্গের ঘর্ষণ আর ওর নিতম্বে আছড়ে পড়া জ্বলন্ত থাপ্পড়গুলো...


বৈশালীর মনে হলো, ওর ড্রেসের নিচে এতদিনে মিলিয়ে যাওয়া নিতম্বের সেই লাল দাগগুলো যেন এই মুহূর্তে আবার দপদপ করে জ্বলতে শুরু করেছে। ওর তলপেটের পেশিগুলো একটা অদ্ভুত কামনায় অবশ হয়ে আসতে চাইল। ওর ইচ্ছে হলো এখনই ছুটে গিয়ে ওই অন্ধকার কোণায় অয়নের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়।

কিন্তু ওর ইগো, ওর আকাশছোঁয়া অহংকার ওর কামনার টুঁটি চেপে ধরল।

"ও এখানে আমাকে ফলো করে এসেছে, তাই না ?"

বৈশালী দাঁতে দাঁত চেপে হিসহিসিয়ে উঠল। ওর চোখে প্রতিশোধের আগুন জ্বলজ্বল করছে।

"দারুণ হয়েছে। আমি তো এটাই চাইছিলাম। ও আমার সাথে যে ব্যবহারটা করেছে, আজ আমি ওকে দেখিয়ে দেব যে বৈশালী কে! আজ আমি ওকে এখানে সবার সামনে পিষে মারব।"

জিনিয়া একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চোখ দুটো ওপরের দিকে ঘোরাল।

"তুই একটা বদ্ধ পাগল, বৈশালী। তোকে আমি বারবার ওয়ার্ন করছি, অয়নকে এড়িয়ে চল।
ওর সাথে আবার ইনভলভড হওয়া মানে নিজের ধ্বংস ডেকে আনা।

কিন্তু, তুই কোন কথাই কানে নিস না। তোর প্রবলেমটা কী ?"

"শাট আপ জিনিয়া!"

বৈশালী ফুঁসে উঠল।

"ও ভেবেছে ও আমাকে যা খুশি তাই করবে আর আমি চুপচাপ বসে থাকব? আজকে রাতের পর ও বুঝতে পারবে..."

"কী বুঝতে পারবে?"

জিনিয়া বৈশালীর কথার মাঝখানেই ওকে থামিয়ে দিল। তার গলার স্বর এবার অত্যন্ত নিচু, কিন্তু ধারালো।

"তুই ওকে শিক্ষা দিবি? তুই নিজে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের চোখদুটো দেখেছিস ? তোর 
চোখ-মুখ দেখে পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে তুই মনে মনে কী চাস!

তুই একা যাবি ওর সাথে ডিল করতে? যা না! খুব তো বড় বড় কথা বলছিস। আমার তো মনে হচ্ছে তুই আজ রাতে ওর বিছানা গরম করার জন্য পাগল হয়ে আছিস!"

"জিনিয়া!"

বৈশালী রাগে কাঁপতে কাঁপতে হাত তুলল, কিন্তু জিনিয়া এক চুলও নড়ল না।

"থাপ্পড় মারবি? মার। কিন্তু সত্যিটা তুইও জানিস।"

জিনিয়া তাচ্ছিল্যের হাসি ধরে রেখেই বলল।

"তুই যা খুশি কর। ওর পায়ের কাছে গিয়ে পড়ে থাক, ওর হাতে আবার মার খা। কিন্তু একটা কথা মাথায় রাখিস... তুই যদি আজ সিন ক্রিয়েট করিস আর তোর দেবমাল্য যদি হিরো সাজতে মাঝখানে নাক গলায়, তুই কিন্তু ওকে বাঁচাতে পারবি না।"

বৈশালী ইগোতে আঘাত পেয়ে ঘাড় বাঁকিয়ে বলল,

"দেবমাল্যর মতো প্রভাবশালী ফ্যামিলির ছেলের গায়ে হাত তোলার সাহস অয়নের নেই। দেবমাল্যর বডিগার্ডরা বাইরেই দাঁড়িয়ে আছে।"

জিনিয়া একটা অদ্ভুত, করুণার হাসি হাসল। আই রোল করে সে দেওয়াল থেকে পিঠ সরিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল।

"বডিগার্ড? দেবমাল্য? তুই কি সত্যিই এত বোকা, নাকি বোকা সাজার অ্যাক্টিং করছিস?"

জিনিয়া বৈশালীর কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল,

"অয়ন চ্যাটার্জী তোর বড়লোক বয়ফ্রেন্ডটাকে আইসিইউ-তে পাঠাতে ঘড়ির কাঁটা ধরে ঠিক দু-মিনিট সময় নেবে। যতক্ষণে ওর বডিগার্ডরা যখন ভেতরে ঢুকবে, ততক্ষণে তোর দেবমাল্যর দাঁতগুলো ফ্লোরে গড়াগড়ি খাবে। তুই যদি আজ ওই কোণায় যাস, তবে পুরো রেসপন্সিবিলিটি তোর। আমি তোকে বাঁচাতে আসব না।"

কথাটা বলে জিনিয়া আর এক সেকেন্ডও দাঁড়াল না। বৈশালীকে ওই অন্ধকার করিডোরে একা দাঁড় করিয়ে রেখে সে আবার মিউজিক আর আলোর ভিড়ে হারিয়ে গেল।

বৈশালী একা দাঁড়িয়ে রইল। ও একবার তাকাল ওই অন্ধকার কোনাটার দিকে আর একবার ফিরে তাকাল ভিআইপি বুথে বসে থাকা দেবমাল্যর দিকে।

ওর শরীরের প্রতিটা রোমকূপ অয়নের স্পর্শের জন্য আর্তনাদ করছে আর ওর ইগো ওকে বলছে প্রতিশোধ নিতে। আগুনের নেশা যে বড় মারাত্মক, সেটা ও বুঝতে পারছে, কিন্তু সেই আগুন থেকে চোখ ফেরানোর ক্ষমতা ওর নেই।
[+] 5 users Like RockyKabir's post
Like Reply
৮

হলঘরের দরজাটা বন্ধ হতেই ভেতর থেকে ভেসে আসা শব্দগুলো এক ধাক্কায় হালকা হয়ে এল। 



রাত নটা বেজে যাবার পরে বিদিশা আর দেরি করা উচিত বলে মনে করেননি। রাত বারোটা পর্যন্ত তার এখানে থাকার কোন ইচ্ছা নেই। তাকে অনেকটা দূরে সেই গড়িয়াতে বাড়ি ফিরতে হবে।



 "একটু বেশি তাড়াহুড়ো হয়ে গেল না, মিস গাঙ্গুলি? বর্ষবরণের কাউন্টডাউন হতে কিন্তু এখনো বেশ খানিকটা দেরি আছে।"



পেছন থেকে রাহুল বোসের চেনা গলা ভেসে এলেও বিদিশা হাঁটা থামালেন না। তিনিও বিদিশার সাথেই পার্টি থেকে বেরিয়ে এসেছেন।



"বর্ষবরণের কাউন্টডাউন ইয়ং স্টুডেন্টদের জন্য। আমাদের মতো প্রফেসরদের জন্য নয়। তাছাড়া,
আমার আর রাত জাগার মতো শারীরিক বা মানসিক অবস্থা নেই, মিস্টার বোস। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বাড়ি পৌঁছলে বাঁচি।"

রাহুল বিদিশার জবাবের কোন উত্তর না দিয়ে মুচকি হেসে এগিয়ে গিয়ে লিফটের স্টেইনলেস স্টিলের বাটনটা চাপলেন। একটা ছোট 'ডিং' শব্দ হলো। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ধাতব দরজা সরে গিয়ে নির্জন সার্ভিস লিফটের ফাঁকা স্পেসটা উন্মুক্ত করে দিল।


ভেতরের দেওয়াল জুড়ে মসৃণ কাঁচ আর অ্যানোডাইজড অ্যালুমিনিয়ামের ফিনিশিং। মেঝে মোড়া ডার্ক গ্রে রাবারাইজড ম্যাট দিয়ে। ছাদে চারটে স্পটলাইটের নরম হলুদ আলোয় ভেতরটা স্নিগ্ধভাবে আলোকিত।


বিদিশা ভেতরে পা রাখলেন। তাঁর শাড়ির আঁচলের রূপোলি সুতোর ঘর্ষণ হলো লিফটের ধাতব দরজার সাথে। রাহুল ঠিক তাঁর পেছনে ভেতরে ঢুকলেন।


রাহুল বাটন প্যানেলে গিয়ে গ্রাউন্ডফ্লোরের কি-তে প্রেস করলেন। 'G' নম্বর বোতামটা নীল আলোয় জ্বলে উঠল। মেটালিক স্লাইডিং ডোর দুটো সশব্দে একে অপরের সাথে মিশে গেল।


প্যাসেঞ্জারের খালি স্থানটুকুতে এখন কেবল বিদিশা আর রাহুল। আর মাঝখানে আটকে থাকা দেড় ঘনমিটারের বদ্ধ বাতাস।


উপরিভাগের এই শান্ত নিঃশব্দতার নিচে লিফটটা নীচের দিকে নামতে শুরু করল। হাইড্রোলিক পাম্পের একটা মৃদু, একঘেয়ে গুনগুন আওয়াজ আর পায়ের তলায় একটা হালকা অভিকর্ষের চাপ।


"আজকের পার্টির আয়োজনটা সত্যিই দারুণ ছিল। কী বলেন, মিস গাঙ্গুলি ?" 


রাহুল বিদিশার থেকে মাত্র দেড় ফুট দূরত্বে দাঁড়িয়ে নিচু গলায় বললেন। 


বিদিশা হালকা হেসে মাথা নাড়লেন, চোখ দুটো হালকা বুজে আবার খুললেন। 


"জাঁকজমক হয়তো ছিল। কিন্তু, আমার জন্য বড্ড বেশি কোলাহলপূর্ণ।"


রাহুল মৃদু হাসলেন। 


"ঠিক বলেছেন। কৃত্রিম হাসি আর অহেতুক আড্ডা দেবার ডিউটি থেকে পালিয়ে বেঁচেছেন বলুন?"


"আপনি কি সব জায়গাতেই এত সূক্ষ্ম নজর রাখেন, প্রফেসর বোস?" 


প্রশ্নটা ছুঁড়ে দিয়ে বিদিশা শাড়ির আঁচলটা সামান্য গুছিয়ে নিয়ে দরজার কাঁচের প্রতিফলনে রাহুলের দিকে তাকালেন।


রাহুল হালকা হাসলেন। চশমার ফ্রেমটা আঙুলের ডগায় সামান্য ওপরে তুলে বিদিশার চোখে চোখ রাখলেন।

"সব জায়গায় নয়, মিস গাঙ্গুলি। তবে কিছু মানুষের চোখের ভেতরের ক্লান্তি টের পেতে খুব বেশি নজরদারির প্রয়োজন হয় না। বিশেষ করে..."

রাহুল কথাটা মাঝপথে থামিয়ে দিলেন।

লঘু কথা চালাচালি থেকে কথোপকথনটা হঠাৎই ভারী দিকে ঘুরে গেল দেখে বিদিশা ঘাড় তুলে রাহুলের চোখের দিকে তাকালেন। 

"সবচেয়ে বড় কথা কী?"

"কিছু না।"

রাহুল একটু ইতস্তত করে নিজের চশমাটা নাকের ওপর একটু ঠেলে দিলেন। 


"কিছু মানুষের ইগো এত বিশ্রী যে, আপনার আত্মসম্মানটা বজায় রেখে চলাফেরা করাটাই তাদের কাছে একটা চ্যালেঞ্জ বলে মনে হয়। কিন্তু আপনি যে রুখে দাঁড়িয়েছেন, সেটাই অদ্ভুত সুন্দর।"


কথাটা শোনামাত্রই বিদিশার বুকের ভেতর একটা হালকা শিরশিরে অনুভূতি খেলে গেল। সিম্পোজিয়ামের সময় সুব্রত সেন আর ডঃ বাগচীর কীর্তিকলাপের কথা যে রাহুল আংশিক ভাবে হলেও টের পেয়েছেন, সেটা তিনি বুঝলেন। 

আজকে পার্টিতে একা একা বসে তিনি তো কলেজের এই বিষাক্ত পরিমণ্ডলের কথাই চিন্তা করছিলেন।


কিন্তু রাহুলের এই প্রশংসায় কোনো ব্যক্তিগত সুবিধা নেওয়ার ইঙ্গিত ছিল না। একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের আরেকজন নারীর প্রতি খাঁটি সম্মানের সুরটা বুঝতে বিদিশার অসুবিধা হল না।


তার ঠোঁটের কোণে একটা নরম হাসি ফুটে উঠল। 


"ধন্যবাদ, রাহুল। আপনার এই সাপোর্টটুকু আমার দরকার ছিল।"


এই প্রথম বিদিশা নিজের মুখে রাহুলকে 'মিস্টার বোস'-এর বদলে শুধুই 'রাহুল' বলে ডাকলেন।


রাহুলের চোখে এক মুহূর্তের জন্য বিদ্যুৎ খেলে গেল। ওনার ঠোঁটের কোণের হাসিটা চওড়া হলো। উনি বিদিশার আরও একটু কাছে ঘেষে দাঁড়াতে যাচ্ছিলেন, ঠিক সেই সময়,


ক্যাঁচচ্যাঁচচচ... বিকট শব্দ!

হঠাৎ পুরো লিফটটা বাতাসে এক ভয়াবহ ধাক্কা খেল! একটা বিশ্রী, কানফাটানো ধাতব ঘর্ষণের আওয়াজ গোটা কেবিনটাকে কাঁপিয়ে দিল!

"আহ!"

বিদিশা নিজের দেহের ভারসাম্য হারিয়ে সোজা পেছনের দিকে হেলে পড়লেন। 

"বিদিশা!"

রাহুল চটজলদি রিফ্লেক্স অ্যাকশনে নিজের ডান হাতটা বিদিশার কোমর আর পিঠের মাঝখানটায় গলিয়ে দিয়ে তাকে শক্ত করে জাপটে ধরলেন। বিদিশার সুডৌল শরীরটা সজোরে রাহুলের বুকের ওপর আছড়ে পড়ল।


পরমুহূর্তেই লিফটটা ফ্রি-ফল দেওয়ার মতো কয়েক ইঞ্চি নিচে নেমে আচমকা একটা ভীষণ ঝটকা দিয়ে একদম থেমে গেল!

ধাতব কেবলগুলোর বিকট টানাটানির শব্দ হলো ওপরের ট্রাস থেকে। তারপর ... সম্পূর্ণ নিস্তব্ধতা।

ছাদের চারটে আলোর দুটো স্পটলাইট দপ করে নিভে গিয়ে একটা ঝিকমিক করে জ্বলে উঠল। এসির সেই একঘেয়ে গুনগুন আওয়াজটা হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেল। সাথে সাথে বন্ধ হয়ে গেল ভেতরের বায়ু চলাচল।


লিফটের কাঁচ আর অ্যালুমিনিয়ামের খাঁচাটা মেঝের থেকে তিনতলা আর চারতলার ঠিক মাঝামাঝি কোনো এক অন্ধকার ফাঁকে সম্পূর্ণ স্তব্ধ হয়ে ঝুলে রইল।

ভেতরের বাতাস শান্ত হতে অন্তত দশ সেকেন্ড সময় লাগল।

তারপর, শুধুই দুজনের দ্রুত, হাপরের মতো ওঠানামা করা শ্বাসের শব্দ।


বিদিশার বুকটা রাহুলের কাস্টম-ফিট করা ব্লেজারের ওপর লেপ্টে ছিল। তাঁর শাড়ির আঁচলটা ধাক্কায় সামান্য সরে গিয়ে গলার নিচের ফর্সা খাঁজটা রাহুলের শার্টের কলারকে স্পর্শ করছিল। বিদিশার চুল থেকে ভেসে আসা সুবাস সরাসরি রাহুলের নাকে গিয়ে ধাক্কা মারছিল।



আর রাহুলের শক্ত, পুরুষালি ডান হাতটা তখনো বিদিশার সরু কোমরের ওপর অত্যন্ত শক্ত করে চেপে বসা। বিদিশার লিনেন শাড়ির ওপর দিয়েই রাহুল বিদিশার কোমরের প্রতিটি খাঁজ, তার উত্তাপ অনুভব করছিলেন।



"আ-আপনি ঠিক আছেন?" 



রাহুলের ফিসফিসানি গলাটা বিদিশার কানের কাছে এসে লাগল।



বিদিশার বুকের ধুকপুকুনি এত দ্রুত চলছিল যে তিনি কিছুক্ষণ কোনো কথা বলতে পারলেন না। তিনি বুঝতে পারলেন, তিনি রাহুলের শরীরের ওপর একদম সেঁটে আছেন।



বিদিশা চট করে নিজেকে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলেন। 



"হ্যাঁ... হ্যাঁ, আই অ্যাম ওকে। থ্যাংক ইউ, রাহুল। আপনি না ধরলে আমি পড়ে যেতাম।"



রাহুলও সাথে সাথে সচেতন হয়ে নিজের হাতটা বিদিশার কোমর থেকে সরিয়ে নিলেন। 


কিন্তু, অনেক দূরে সরে গেলেন না। কারণ এই লিফটে সরার মতো জায়গা খুব একটা ছিল না।



"লিফটটা আটকে গেছে।" 



রাহুল ধাতব দেওয়ালে হাত রেখে সোজা হলেন।

তাড়াতাড়ি বাটন প্যানেলের দিকে এগিয়ে গিয়ে রাহূল 'অ্যালার্ম' আর 'ইমার্জেন্সি কল' বাটনগুলো বারবার চাপতে লাগলেন। কিন্তু কোনো প্রতিক্রিয়া হলো না। সাউন্ড প্যানেল থেকে শুধু একটা বিশ্রী কর্কশ স্ট্যাটিক আওয়াজ এল, তারপর সেটাও নিভে গেল।



"ড্যাম ইট! পাওয়ার ব্যাকআপ সুইচ ওভারহিটেড বা কেবল ট্র্যাপে আটকে গেছে।" 



হতাশ রাহুল বাটন প্যানেলে একটা হালকা চাপড় মেরে বললেন।



বিদিশা নিজের ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে ফোনটা বের করলেন। 



"নেটওয়ার্ক চেক করুন। আমার ফোনে সার্ভিস দেখাচ্ছে না।"



রাহুলও নিজের ফোন বের করলেন। 



"নো সিগন্যাল। এই সার্ভিস শ্যাফটের চারপাশটা ঘন কংক্রিট আর স্টিল দিয়ে ঘেরা। সিগন্যাল পাওয়া মুশকিল।"



দুজন মানুষের চোখই এক মুহূর্তের জন্য একে অপরের ওপর গিয়ে স্থির হলো।



বাইরে থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। বাতাস বন্ধ। ঘরের তাপমাত্রা ইতিমধ্যেই ধীরে ধীরে বাড়তে শুরু করেছে।



"আমাদের প্যানিক করলে চলবে না," 



বিদিশা নিজের গলার স্বরটাকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করলেন। তিনি নিজের ব্যক্তিত্ব ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু, হঠাৎ এই খাঁচার মধ্যে আটকা পড়ে যাওয়া তাঁর মানসিক স্থিরতাকে নাড়া দিয়েছিল। 



"টেকনিশিয়ানরা নিশ্চয়ই নজর রাখবে। অন্য কেউ লিফটে না চড়লেও ওরা অন্তত বিশ-ত্রিশ মিনিটের মধ্যে তো খেয়াল করবেই।"



রাহুল নিজের ব্লেজারটা খুলে ফেললেন। ওনার কপালে সূক্ষ্ম ঘামের ফোঁটা জমতে শুরু করেছে।



"বিশ-ত্রিশ মিনিট?" 



বিদিশার গলায় দুশ্চিন্তার ছাপ।



রাহুল হালকা একটু হাসার চেষ্টা করলেন, যদিও হাসিতে উদ্বেগের ছাপ ছিল। 



"এই ছোট জায়গায় এসি ছাড়া বিশ মিনিট মানে কিন্তু শরীরের তাপমাত্রা অন্তত চার ডিগ্রি বেড়ে যাওয়া। অ্যান্ড উই হ্যাভ ভেরি লিটল অক্সিজেন।"



তিনি তাঁর ব্লেজারটা ভাঁজ করে লিফটের এক কোণে রাখলেন। তারপর বিদিশার দিকে তাকালেন।



বিদিশা দাঁড়িয়ে ছিলেন দেওয়ালের কাঁচের হেলান দিয়ে। ওনার ফর্সা গাল দুটো ইতিমধ্যেই হালকা গোলাপি ছোপ নিতে শুরু করেছে। এসির বাতাস বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে কেবিনের ভেতরের স্যাঁতসেঁতে আর্দ্রতা আর উষ্ণতা হু-হু করে বাড়ছে।



তার পেস্তা-সবুজ শাড়ির ব্লাউজের কলারের কাছে, ঘাড়ের খাঁজে সূক্ষ্ম ঘামের ফোঁটা জমতে শুরু করেছে।



"বিদিশা, আপনি বসুন। দাঁড়িয়ে থাকলে হার্ট রেট বাড়বে, অক্সিজেনের অপচয় বেশি হবে।" 



রাহুল অত্যন্ত শান্তভাবে বিদিশার হাতটা হালকা ছুঁয়ে বললেন।



রাহুলের হাতের স্পর্শে বিদিশা এক মুহূর্তের জন্য শিহরিত হলেন। কিন্তু এই পরিস্থিতিতে আপত্তি করাটা বোকামি। তিনি ধীরে ধীরে লিফটের রাবারাইজড মেঝের ওপর হাঁটু ভাঁজ করে বসলেন। ওনার শাড়ির বহর মেঝের ওপর ছড়িয়ে পড়ল।



রাহুলও ওনার ঠিক উল্টোদিকে, মাত্র কয়েক ইঞ্চি দূরত্বে মেঝের ওপর বসলেন।



দুজনের হাঁটু প্রায় একে অপরকে স্পর্শ করে আছে।



কেবিনের ভেতর নিস্তব্ধতা নেমে এল। শুধু ওদের দুজনের দীর্ঘায়িত শ্বাসের শব্দ আর মাঝেমধ্যে ওপরের কেবল থেকে ভেসে আসা ধাতব 'টিক-টিক' আওয়াজ।



দশ মিনিট কেটে গেল।



বায়ুমণ্ডলীয় আর্দ্রতা যেন বহুগুণ বেড়ে গেছে। বদ্ধ কেবিনের ভেতর বাতাস যেন ভারী হয়ে ঝুলে রয়েছে।



বিদিশা অনুভব করছিলেন, ওনার কাপড়ের নিচ থেকে চামড়া ভিজে উঠছে। ওনার কপালে, ঠোঁটের ওপরে আর ঘাড়ের পেছনের অবাধ্য চুলগুলোর গোড়ায় সূক্ষ্ম ঘামের বিন্দুগুলো জমাট বেঁধে ফোঁটায় পরিণত হচ্ছে।



রাহুল ওনার শার্টের ওপরের দুটো বোতাম খুলে দিয়েছেন। ওনার সুগঠিত, চওড়া বুকে আর গলার খাঁজে ঘাম চকচক করছে।



"আপনি... খুব কষ্ট পাচ্ছেন, তাই না?" 



রাহুল বিদিশার মুখের দিকে তাকিয়ে শোধালেন।



বিদিশার চোখদুটো বোজা ছিল। তিনি চোখ খুলে রাহুলের দিকে তাকালেন। ওনার লিপস্টিক মাখা ঠোঁট দুটো হালকা ফাঁক হয়ে আছে, প্রতিটা শ্বাসে ওনার উন্মুক্ত বুকের ওপরের খাঁজটা তীব্রভাবে ওঠানামা করছে।



"একটু... দমবন্ধ লাগছে।" 



বিদিশা খুব নিচু গলায় বললেন। 



"ছোটবেলা থেকেই আমার বদ্ধ জায়গায় একটু ফোবিয়া আছে।"



"ক্লস্ট্রোফোবিয়া?" 



রাহুলের গলায় গভীর উদ্বেগ ঝরে পড়ল।



বিদিশা মৃদু মাথা নাড়লেন। 



"পুরোপুরি নয়। তবে... এই আর্দ্রতাটা সহ্য হচ্ছে না।"



বিদিশা স্বতঃস্ফূর্তভাবেই নিজের ডান হাতটা গলার কাছে নিয়ে গেলেন। ওনার নেভি-ব্লু শাড়ির আঁচলটা পিন করা ছিল বাঁ কাঁধে। ওনার মনে হচ্ছিল শাড়ির আঁচলটা ওনার বুকের ওপর এক অতিরিক্ত ভারী পাথর হয়ে চেপে বসে আছে।

তিনি পিনটা খোলার চেষ্টা করলেন, কিন্তু ওনার হাত কাঁপছিল। পিনটা আটকে যাচ্ছিল কাপড়ের খাঁজে।


"আমাকে দেখতে দিন।" 


রাহুল চট করে বিদিশার হাতটার ওপর নিজের হাত রাখলেন।


বিদিশা থামলেন। ওনার চোখদুটো রাহুলের সামনাসামনি।


রাহুলের স্পর্শটা কিন্তু সেদিনের বিক্রমের সেই লোলুপ ছোঁয়ার মতো ছিল না। তিনি খুব সাবধানে, বিদিশার মসৃণ ফর্সা কাঁধের কাছে পিনটা আলগা করলেন। পিন খোলার সময় রাহুলের হাতের উল্টো পিঠ বিদিশার গলার উন্মুক্ত মসৃণ চামড়া আর কলারবোন স্পর্শ করে গেল।


বিদিশার শিরদাঁড়া দিয়ে একটা তীব্র, বিদ্যুতায়িত অনুভূতি খেলে গেল। ওনার শ্বাস আটকে এল।


পিনটা খুলে আসতেই বিদিশা হালকা একটা হাঁফ ছাড়লেন। তিনি শাড়ির আঁচলটা কাঁধ থেকে নামিয়ে নিজের কোলের ওপর সরিয়ে নিলেন।


আঁচলটা সরতেই ওনার শাড়ির ডিপ-নেক ব্লাউজের ওপরের উন্মুক্ত ফর্সা অংশটা সম্পূর্ণ অনাবৃত হয়ে পড়ল।


ব্লাউজের সরু নেকলাইনের ওপর দিয়ে ওনার সুডৌল, মোলায়েম স্তনযুগলের ওপরের অংশ আর গলার গভীর খাঁজে জমা হয়ে থাকা ঘামের স্বচ্ছ বিন্দুগুলো লিফটের মৃদু আলোয় হীরার ফোঁটার মতো ঝলমল করে উঠল।


রাহুল নিজের অজান্তেই এক মুহূর্তের জন্য চোখ সরাতে পারলেন না। ওনার শ্বাসের গতি আটকে গেল।


একজন প্রাপ্তবয়স্কা নারীর পক্ষে এই দৃষ্টি টের পাওয়া খুব কঠিন নয়। বিদিশাও খুব সহজেই রাহুলের মুগ্ধ দৃষ্টি টের পেলেন।



কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, তিনি অস্বস্তি বোধ করলেন না।



"আই অ্যাম সরি... আমি ওভাবে তাকাতে চাইনি।" 



রাহুল চট করে নিজের চোখ সরিয়ে নিয়ে নিচু গলায় বললেন। ওনার গলায় নিজের অনুভূতির ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখার আপ্রাণ চেষ্টা।



বিদিশা নিজের কোলের শাড়ির কাপড়টা একটু মুঠো করে ধরলেন। 



"ইটস ওকে, রাহুল। আই নো... ইউ আর নট লাইক দেম।"



রাহুল বিদিশার দিকে আবার তাকালেন। 



"দেম? দেম মানে?"



বিদিশা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। ওনার পিঠের দিকে ব্লাউজটা ঘামে ভিজে চামড়ার সাথে সেঁটে গেছে।



"আপনার কি মনে হয়, আমি কী পুরুষদের দৃষ্টি বুঝতে পারি না ?" 



বিদিশা এক তাচ্ছিল্যের হাসি হাসলেন। এক সেকেন্ডের জন্য তার চোখের সামনে বনগানির ছবিটা ভেসে উঠল।



"সবাই ভাবে আমি শুধু একটা সুন্দর ট্রফি। একটা দেমাগী মহিলা যাকে জয় করতে পারলে তাদের ইগো শান্ত হয়।"



ইঙ্গিতটা বুঝতে রাহুলের অসুবিধা হল না। তিনিই এ ব্যাপারে বিদিশাকে সবার আগে সাবধান করেছিলেন।



তার মুখটা কঠিন হয়ে উঠল। 



"বিক্রম? ওই ছেলেটা আপনার সাথে অসভ্যতা করেছে?"



বিদিশা স্থির চোখে রাহুলের দিকে তাকালেন। 



"ফেস্টের রাতে অডিটোরিয়ামের ব্যাকস্টেজে... অয়ন হঠাৎ এসে না পড়লে ওই ছেলেটা আমার শরীরে হাত দিয়ে নিজের সীমা পার করে ফেলেছিল।"



রাহুল স্তব্ধ হয়ে গেলেন। ওনার চোখের মণি রাগে ছোট হয়ে এল। 



"মাই গড! অ্যান্ড অয়ন... ও সেটা দেখেছিল?"



"হ্যাঁ।" 



বিদিশার গলার স্বর হঠাৎ একদম নিচু হয়ে গেল। ওনার চোখের কোণে এক চিলতে বিষাদের ছায়া।



 "হ্যাঁ, অয়ন ওটা দেখে ফেলেছিল। সেইজন্য ও নিজেকে ধরে রাখতে পারেনি। তারপরই ও বিক্রমের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে।"



"তাহলে আপনি অয়নকে অত বড় শাস্তি দিলেন কেন? সবার সামনে ওকে চড় মারলেন, গুণ্ডা বললেন?" 



রাহুলের গলায় চরম বিস্ময়।



বিদিশা নিজের দুই হাঁটু আরও একটু বুকের কাছে টেনে নিলেন। ওনার গলার কাছে জমা ঘামের ফোঁটাটা গড়িয়ে ওনার ব্লাউজের নেকলাইনের গভীরে মিলিয়ে গেল।



এই প্রশ্নের উত্তর সৎভাবে দেওয়া তার পক্ষে অসম্ভব। তাহলে অয়ন আর তার আসল সম্পর্ক রাহুলের কাছে ফাঁস করতে হয়। 



"অয়ন নিজের উপর কন্ট্রোল হারিয়ে ফেলেছিল। ও বিক্রমকে যেভাবে মারছিল, সাহিলরা ছুটে না এলে যেকোন সময় একটা বড়সড় দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারত।"



কথাগুলো শুনে রাহুল থমকে গেলেন। সত্যিই তো, বিক্রমের মুখ সেদিন রক্তে ভেসে যাচ্ছিল।



বিদিশা রাহুলকে বলতে পারলেন না যে শিক্ষিকা হিসেবে সেই গুণ্ডামি যেমন তিনি মেনে নিতে পারেননি, তেমনই মা হিসেবে... তিনি ভয় পেয়েছিলেন যে, অয়ন যদি এই হিংস্রতার পথে চলতে থাকে, তবে সে একদিন নিজেকে ধ্বংস করে ফেলবে। তাই তিনি শুরুতেই ওকে আটকাতে চেয়েছিলেন।



না বলা কথাগুলো ভাবতে ভাবতে বিদিশার চোখদুটো জলে ভরে এল।



ফেস্টের পর থেকে যে মানসিক অনুভূতিগুলোকে তিনি বারবার কঠোর শিক্ষিকাসত্ত্বার বর্ম দিয়ে ঢেকে দিতেন, আজকের এই দুর্বল মুহূর্তে সেটা কাঁচের মতো ভেঙে চুরমার হয়ে গেল।

কিন্তু, সত্যিটা না জানায় রাহুল বুঝলেন উল্টো। 

তিনি ভাবলেন বিদিশা বিক্রমের অসভ্যতার ট্রমা, অয়নের কাণ্ডকারখানার অভিঘাত, সহকর্মীদের পলিটিক্স, সবকিছুর চাপ নিজের ভেতরে বহুদিন ধরে বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছেন। আজ সহ্য করতে না পেরে তার সামনে কেঁদে ফেললেন। তার বুকটা সহানুভূতিতে মুচড়ে উঠল।

তিনি আর স্থির থাকতে পারলেন না। হাঁটু গেড়ে বসে বিদিশার আরও কাছে এগিয়ে এলেন। ওনার শক্ত, পুরুষালি হাত দুটো দিয়ে উনি বিদিশার কাঁপা কাঁপা হাত দুটো নিজের হাতের তালুর মধ্যে তুলে নিলেন।

"বিদিশা..." 

রাহুলের গলাটা গভীর আবেগে কঁপে উঠল। 

"ইউ হ্যাভ বিন ক্যারিইং টু মাচ পেইন। আপনি নিজেকে বড্ড বেশি শক্ত করে রাখেন। কিন্তু আপনারও তো শ্বাস নেওয়ার অধিকার আছে।"

রাহুলের হাতের উত্তাপ, ওনার আন্তরিক কণ্ঠস্বর বিদিশার ভেতরের সমস্ত মানসিক বাঁধ ভেঙে দিল।
তার গাল বেয়ে এক ফোঁটা তাজা জল নেমে এল।

রাহুল নিজের ডান হাতটা তুলে আলতো করে ওনার বুড়ো আঙুল দিয়ে বিদিশার গালের জলটুকু মুছে দিলেন। ওনার আঙুলের উষ্ণ স্পর্শে বিদিশা চোখ বুজে ফেললেন।

তিনি রাহুলের হাতের স্পর্শের দিকে নিজের মুখটা একটু কাত করলেন।

"রাহুল..." 

বিদিশা ফিসফিস করে উঠলেন। ওনার শ্বাসের গতি অতি দ্রুত, বুকের তীব্র ওঠানামায় ওনার সুডৌল স্তনের খাঁজ রাহুলের হাতের একদম ইঞ্চি খানেক দূরে কাঁপছে।

রাহুল বিদিশার মসৃণ চিবুকটা নিজের আঙুল দিয়ে ধরে ধীরে ধীরে ওনার মুখটা নিজের দিকে তুললেন।

দুজনের মুখ এখন মাত্র দুই ইঞ্চির দূরত্বে।

রাহুল বিদিশার কপালে নেমে আসা ভিজে চুলের গোছাটা হাত দিয়ে পেছনে সরিয়ে দিলেন। ওনার চোখ আটকে গেল বিদিশার মেরুন লিপস্টিক মাখা, হালকা হাঁ হয়ে থাকা ঠোঁট দুটোর ওপর।

"বিদিশা... আই হ্যাভ ওয়ান্টেড দিস ফর সো লং..." 

রাহুল তীব্র আবেগে ফিসফিস করে বললেন।

বিদিশা কোনো উত্তর দিলেন না। তিনি নিজের চোখ দুটো বন্ধ করে রাহুলের দিকে নিজের মুখটা সামান্য এগিয়ে দিলেন। ওনার মধ্যে আর কোনো প্রতিরোধ রইল না। এই মুহূর্তে তিনি কোনো অধ্যাপিকা নন, কারো মা নন, কারো স্ত্রী নন। তিনি একজন একাকীত্বে ভোগা নারী, যিনি একটু ভালোবাসা, মমতা, সহানুভূতির খোঁজ করছেন।

এমনই সময়, হঠাৎ !

ক্ল্যাঙ্ক! ঘড়ড়ড়ড়!

হঠাৎ শ্যাফ্টের ওপর থেকে ইলেকট্রিক মোটরটা বিকট শব্দে গর্জে উঠল!

সোডিয়াম আলোর দুটো মেইন টিউবলাইটের তীব্র সাদা আলো হঠাৎ লিফটের কেবিনে ফিরে এল! এসি-র ঠান্ডা ফ্যানের ভেন্টিলেটরটা শব্দ করে চালু হয়ে গিয়ে হু-হু করে ঠান্ডা বাতাস কেবিনের ভেতরে পাঠাতে শুরু করল!

ডিং!

লিফটের ভেতরে ডিসপ্লে বোর্ডে নীল আলোয় নম্বর ফুটে উঠল - 'G'।

বিদ্যুৎ ফিরে এসেছে! লিফট সার্ভিস শুরু হয়ে গেছে ! 

আর সাথে সাথেই ওই স্বপ্নের মতো মুহূর্তটা ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। যেন মাথার ওপর কেউ এক বালতি বরফজল ঢেলে দিল।

বিদিশা মুহূর্তের মধ্যে চোখ খুললেন।

রাহুলও এক লহমায় নিজের আত্মনিয়ন্ত্রণ ফিরে পেলেন।

তিনি দ্রুত এক পা পিছিয়ে এলেন। 

"হায় ভগবান..." বিদিশার ফর্সা মুখটা রাগে, লজ্জায় টকটকে লাল হয়ে উঠেছে।

"আই... আই অ্যাম এক্সট্রিমলি সরি, বিদিশা।" 

রাহুলের গলায় চরম অপরাধবোধ আর বিহ্বলতা। 

"আমি... আমি নিজের ওপর থেকে কন্ট্রোল হারিয়ে ফেলেছিলাম। আই ডিড নট মিন টু..."

"চুপ করুন! প্লিজ!" 

বিদিশা কাঁপা কাঁপা হাতে কোলের ওপর পড়ে থাকা শাড়ির আঁচলটা, যেটার পিন খুলতে রাহুল সাহায্য করেছিলেন, সেটা তুলে নিয়ে নিজের গায়ে জড়িয়ে নিলেন।

তিনি একবার দ্রুত আয়নায় নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকালেন। সেই আয়নায় বিদিশা এক রতিক্লান্ত নারীকে দেখতে পেলেন। বিদ্যুত আসতে আর কয়েক সেকেন্ড দেরি হলে এই প্রতিবিম্বে নিজের ওই রূপটাই হয়তো তাঁকে দেখতে হত।

তিনি চটজলদি শাড়ির পিনটা কোনোমতে কাঁধে আটকে সোজা হয়ে দাঁড়ালেন।

লিফটটা ততক্ষণে একতলার ফ্লোরে এসে স্থির হয়েছে।

ডিং!

মেটালিক দরজা দুটো ধীরে ধীরে খুলতে শুরু করল।

বাইরে থেকে আলো আর দুএকজন মানুষের অস্পষ্ট আওয়াজ ভেতরে আসতে শুরু করেছে।

বিদিশার কপালে ঘামের ফোঁটাগুলো এখনো পুরোপুরি শুকায়নি, হাতের আঙুলগুলো কাঁপছে।
কিন্তু উনি কঠিন প্রফেসরের বর্মটা জোর করে ফিরিয়ে আনলেন।

রাহুলও ওনার ব্লেজারটা দ্রুত গায়ে চাপিয়ে নিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ালেন।

লিফটের দরজা পুরোপুরি খুলে যেতেই সামনে দেখা গেল সাহিল আর দুজন লিফট মেকানিক দাঁড়িয়ে আছে। সাহিলের মুখে চরম উৎকণ্ঠা।

"ম্যাম! স্যার ! থ্যাংক গড আপনারা ঠিক আছেন!" 

সাহিল এগিয়ে এল। 

"লিফটটা ১৫ মিনিট ধরে আটকে ছিল। আমরা মেইন পাওয়ার লাইন রিসেট করে চালনা করলাম। আপনারা ঠিক আছেন তো?"

বিদিশা এক সেকেন্ড সময় নিলেন নিজের গলার স্বর ঠিক করতে।

তারপর তিনি অত্যন্ত শান্ত, বরফশীতল গলায় বললেন,

"আই অ্যাম ফাইন, সাহিল। শুধু একটু এসি বন্ধ ছিল। দ্যাটস অল।"

তিনি একবারের জন্যও রাহুলের দিকে ফিরে তাকালেন না।

স্টিলেটোর খটখট শব্দ তুলে বিদিশা লিফট থেকে বেরিয়ে সোজা মেইন গেটের দিকে হেঁটে চলে গেলেন। ওনার হাটার ভঙ্গি একদম সোজা, কিন্তু ওনার বুকের ভেতরটা তখনো তোলপাড় করছে।

রাহুল লিফটের ভেতরে একা দাঁড়িয়ে রইলেন। ওনার হাতের তালুতে এখনো বিদিশার কোমরের স্পর্শের উষ্ণতা আর নাকে ওনার পারফিউমের গন্ধ লেগে আছে।

তিনি বিদিশার দিকে তাকিয়ে মাথা নিচু করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। যে ভয়টা তিনি পেয়েছিলেন সেটাই ঘটল। বিদিশা এবার ভাববে যে তিনি ওর দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে ওকে exploite করতে চাইছিলেন।
[+] 7 users Like RockyKabir's post
Like Reply
৯

একতলা থেকে উঠে আসা ইডিএম-এর ভারী বেস লাইনটা তিনতলার এই ঘরে এসে একটা চাপা কম্পনে পরিণত হয়েছে। ঘরটা অন্ধকার, তবে ঘুটঘুটে অন্ধকার নয়। বরং, অন্ধকারের ছায়াকে আরও বেশি ভয়ংকর করে তোলার জন্য যতটুকু প্রয়োজন ততটুকু আলো আসে।

দক্ষিণের ভেন্টিলেটর চুঁইয়ে বাইরের একফালি ধূসর আলো মেঝেতে এসে পড়েছে। ঘরটা যে খালি নয়, সেটা বোঝানোর জন্য যথেষ্ট।

বিশাল জানলার সামনে, বাইরের নিয়ন আলোর ঠিক উল্টোদিকে মুখ করে রাখা আছে একটা ভারী, চামড়ায় মোড়া উইংব্যাক চেয়ার। এই
অন্ধকারের মধ্যে ওটাকে একটা সিংহাসনের মতো লাগছে। 

চেয়ারের ওপর বসে থাকা মানুষটার মুখ দেখা যাচ্ছে না। আঁধার তাকে এমনভাবে ঢেকে রেখেছে যেন সে অন্ধকারেরই একটা অংশ। 

শুধু ডান হাতটা হাতলের ওপর স্থির হয়ে আছে আর দুটো আঙুলের ফাঁকে ধরা দামি সিগারের ডগাটা অন্ধকারের বুক চিরে লাল হয়ে জ্বলছে। দামি কার্পেটের ওপর ছাই ঝরে পড়ছে। কিন্তু, সেদিকে তার কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। 

তার বয়স হয়তো একুশ কি বাইশ, কিন্তু এই মুহূর্তে ঘরের জমাট নিস্তব্ধতা আর তার শরীরের শিথিল অথচ রাজকয় ভঙ্গিটা বুঝিয়ে দিচ্ছে। এই ছেলেটা কলেজের নিয়ন্ত্রকদের একজন।

হঠাৎ ভারী দরজাটা নিঃশব্দে সামান্য ফাঁক হলো। করিডোরের হলদেটে আলো এক ফালি ছুরির মতো ঘরের মেঝেতে এসে পড়ল। সেই সুযোগে ভেতরে একটা ছায়া প্রবেশ করল। তার জুতোর তলায় একটা চাপা খসখস শব্দ হলো, তারপর ঘরে ঢুকতেই সব আবার আগের মতো স্তব্ধ।

ঘরে ঢুকে সে সন্তর্পণে দরজাটা বন্ধ করে দিল। করিডরের আলোটা আবার হারিয়ে গেল।

সে কয়েক পা এগিয়ে সে চেয়ারটার কয়েক ফুট দূরে এসে দাঁড়াল। 

"বল।" 

অন্ধকার ভেদ করে একটা কন্ঠস্বর ভেসে এল। 

আগন্তুক গলাটা একবার খাঁকারি দিয়ে পরিষ্কার করে নিল। তারপর একটা ঢোঁক গিলে বলল,

"সুরঙ্গনা ব্যানার্জী আসেনি। রয়্যাল ক্লাবের গেটে আমাদের লোক আড়াই ঘণ্টা দাঁড়িয়ে ছিল। আমি মেইন গেটে লোক রেখেছিলাম।"

ছেলেটা যেন নিজের হয়ে সাফাই গাইল, ওর গলার স্বরটা সামান্য কাঁপছে,

"সুরঙ্গনা ওর ফ্ল্যাট থেকেও বেরোয়নি। ইনভিটেশন কার্ডটা দরজার নিচ দিয়ে গলিয়ে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু, ও ওটা ডাস্টবিনে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে।"

চেয়ারে বসে থাকা অবয়বটা একচুলও নড়ল না। সিগারের ধোঁয়াটা শুধু একটা পাতলা কুণ্ডলী পাকিয়ে হাওয়ায় মিলিয়ে গেল।

অন্ধকার থেকে একটা ভারী শ্বাস ছাড়ার শব্দ এল। 

"ওই মাগিটা আমাদের ইনভিটেশন ডাস্টবিনে ছুঁড়ে ফেলে দিল ?"

আগন্তুক ভয়ে এক পা পিছিয়ে গেল।

"আমরা সবরকম চেষ্টা করেছিরাম ... কিন্তু সুরঙ্গনা বলল যে এই সব প্রাইভেট পার্টিতে সে আসবে না।"

"ফিজিক্সের এইচওডি-র আশকারা পেয়ে কুত্তিটার একটু বেশি অহংকার হয়ে গেছে। শালি নিজেকে ধরা-ছোঁয়ার বাইরের জিনিস ভাবে, তাই না?

ভাবছে বুড়োটা ওকে বাঁচিয়ে দেবে। ও জানে না কলেজের সুতো কাদের হাতে বাঁধা থাকে। 
এর শাস্তি ওকে পেতে হবে।" 

আগন্তুক চুপ করে মাথা নিচু করে রইল। এখানে কিছু বলা মানেই নিজের বিপদ ডেকে আনা।

স্টুডেন্ট কাউন্সিলের মাথার মুখের ওপর একটা সাধারণ প্রফেসর 'না' বলার স্পর্ধা দেখিয়ে বেঁচে যাবে, এমনটা হতেই পারে না। এর শাস্তিটা যে কী বীভৎস হতে পারে, তা ভেবে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটারই একবার বুক কেঁপে উঠল।

সুরঙ্গনা তো অনেক লাকি যে কাউন্সিলের একজন লিডারের চোখে পড়েছিল সে। ওকে আজকের এই পার্টিতে অকশনে তোলার জন্য ডাকা হয়নি। কিন্তু, এখন ওর কী হবে কে জানে ?

"রুডি পৌঁছেছে?"

আবার অন্ধকার থেকে প্রশ্ন ভেসে এল।

"হ্যাঁ... মানে... ওর আসার কথা তো ছিল। আমি নিচে গিয়ে চেক করছি।"

আগন্তুক দ্রুত উত্তর দিল, যেন সে এখান থেকে বাঁচার রাস্তা খুঁজছিল।

"চেক করতে হবে না। উইন্ডো ব্লাইন্ডসটা সরা।"

ছেলেটা দ্রুত গিয়ে জানলার ভারী পর্দা আর ব্লাইন্ডসটা এক টানে সরিয়ে দিল। চারতলার এই প্যানোরামিক কাঁচের জানলা দিয়ে পুরো ড্রাইভওয়ে আর নিচের ভিআইপি ড্রপ-অফ জোনটা পরিষ্কার দেখা যায়। 

নিউ ইয়ার্সের রাত। 

গেস্টহাউসটার বাইরে দামি গাড়ির সারি আর রংবেরঙের আলো।

ঠিক সেই মুহূর্তেই ড্রাইভওয়েতে চাকার ঘর্ষণ তুলে একটা চকচকে কালো গাড়ি এসে দাঁড়াল।

"ওই তো, আমাদের সুপারস্টার চলে এসেছে।"

গাড়ির সামনের দরজাটা খুলল। প্রথমে একটা চকচকে অক্সফোর্ড শু পরা পা মাটিতে নামল। 

তারপর বেরিয়ে এল রুডি।

রুডি নামার পর গাড়ির পেছনের দরজাটা খুলে গেল। প্রথমে যে নামল, তাকে দেখে ওপর থেকে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটার চোখ আটকে গেল।
অঙ্কিতা মজুমদার। কলেজের ডিপার্টমেন্ট অফ ইংলিশের অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর। বয়স ছাব্বিশ। 

সে এখন একটা ডিপ-কাট, ব্যাকলেস মেরুন ড্রেস পরে আছে। এই শীতে এত ছোট ড্রেস পড়ে ঠাণ্ডা আর অস্বস্তিতে তার শরীরটা কাঁপছে। রুডি একটা হাত অবলীলায় অঙ্কিতার খোলা পিঠের ওপর দিয়ে পেঁচিয়ে ধরল। অঙ্কিতা বাধা দিল না, বরং বাধ্য মেয়ের মতো রুডির কাঁধের কাছে ঘেঁষে দাঁড়াল। রুডির কঠোর ট্রেনিংয়ের ফল।

এরপর গাড়ির অন্য দিক থেকে আরেকজন নামল। অদ্রিজা গুহ। কেমিস্ট্রির প্রফেসর, সাতাশ বছর বয়স। তার পরনে একটা টাইট ব্ল্যাক ড্রেস, যেটা তার হাঁটু পর্যন্তও পৌঁছায়নি। তার সুগঠিত, ফর্সা পা দুটো চকচক করলেও হাই হিলে অনভ্যস্ত পা টলছে। 

গলায় স্রেফ একছড়া পাতলা প্ল্যাটিনামের চেন, চুলে মার্জিত খোঁপা করা, কিন্তু তার ফাঁক দিয়ে কয়েকটা অবাধ্য কোঁকড়ানো চুল তার ঘাড়ের কাছে সেঁটে রয়েছে।

অদ্রিজার কোমর পেঁচিয়ে, রুডির বাঁ হাতটা নেমে এল। তার কালো ড্রেসের ওপর দিয়ে ওর কড়া আঙুলগুলো সরাসরি তার গোল নিতম্বের ওপর চেপে বসল।

অদ্রিজা টুঁ শব্দটিও করল না।

দু'জন শিক্ষিকা রুডির দুই পাশে দুটো ট্রফির মতো দাঁড়িয়ে আছে। রুডির দুই 'কুত্তি'। 

রুডি একবার ওপরে চারতলার জানলার দিকে তাকাল। তারপর সে অঙ্কিতা আর অনন্যাকে দু-হাতে জড়িয়ে ধরে গেস্টহাউসের এন্ট্রান্সের দিকে এগিয়ে গেল।

ওপরে, সেই অন্ধকার ঘরে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটার ঘোর কাটল ছায়ার লিডারের কথায়।

"দেখলি?"

"হ্যাঁ..."

"আর ফিজিক্সের মালটা ভাবছে, একটা ইনভিটেশন ছুড়ে ফেলে দিয়ে খুব বড় কিছু করে ফেলেছে।

এদিকের ঝামেলা মিটে যাক। তারপর ওই রসে ভরা কুত্তিকে আমি নিজের হাতে সাইজ করব। অদ্রিজার চেয়েও খারাপ অবস্থা করব। এমন চাবকাব যে কুত্তির মতো চার পায়ে সবসময় আমার পায়ের তলায় বসে থাকবে।"

কথা বলতে বলতে ছেলেটা হাতটা সামনে আনল। তার জ্যাকেটের স্লিভ সরে গিয়ে উঁকি দিল একটা মোটা ভারী সোনার ব্রেসলেট।

১০

রাত এগারোটা বত্রিশ।

১৪০ বিপিএম এর হাই-ভোল্টেজ ইডিএম ট্র্যাকের বেসটা ফ্লোরের কাঠের পাটাতন ভেদ করে সরাসরি অর্জুনের জুতোর তলা দিয়ে উঠে বুকের পাঁজরে হাতুড়ির মতো ধাক্কা মারছে। 

ওর মনে হচ্ছে স্ট্রাব লাইটের নীল আর লাল লেজারের ব্লেডগুলো মাতাল হয়ে ডান্স ফ্লোরে নাচানাচি করতে থাকা শরীরগুলোকে যেন টুকরো টুকরো করে কাটছে। 

বাতাসে হাজারো শরীরের গন্ধের সাথে মিশে আছে শ্যানেল নম্বর ফাইভের উগ্র সুবাস, দামী কিউবান সিগারের ভারী ধোঁয়া ও স্পিলড অ্যালকোহলের গন্ধ।

অর্জুনের দুহাতের তালুতে ধরা ভারী মেটালিক ট্রে-টায় রাখা তিনটে ব্লু-লেবেল স্কচের বোতল আর এক বালতি বরফ। 

তার পরনে ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট ক্রু-দের ইউনিফর্ম, গায়ের সাথে সেঁটে থাকা কুচকুচে কালো পোলো টি-শার্ট, কালো কার্গো প্যান্ট, গলায় নীল ফিতের শেষে ঝোলা 'স্টাফ অ্যাক্সেস' লেখা ল্যামিনেটেড আইডি কার্ড। 

ডান কানে গোঁজা ব্লুটুথ ইয়ারপিসের কয়েল করা তারটা শার্টের কলারের ভেতর দিয়ে হারিয়ে গেছে। চোখের চাউনিতে সেই চেনা তীক্ষ্ণ সাংবাদিকের খোলসটা এখন আর নেই; তার বদলে সেখানে এখন জায়গা করে নিয়েছে হাড়ভাঙা খাটুনি খাটা একজন ক্লান্ত, বাধ্য ওয়েটারের নির্লিপ্ত দৃষ্টি।

"এই যে! সুমিত! ট্রে-টা কি ওখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই গলাবি নাকি?"

কানের ইয়ারপিসে ইভেন্ট সুপারভাইজারের কর্কশ, রাগী গলাটা খড়খড় করে উঠতেই অর্জুন মাথা নিচু করে ভিড়ের মধ্যে দিয়ে এগোতে শুরু করল। তার চোয়াল শক্ত হয়ে আছে। একজন ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিস্ট হিসেবে সে অভ্যস্ত প্রশ্ন করতে, মানুষের চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে সত্যটা খুঁড়ে বের করতে। 

কিন্তু আজ তাকে মাথা নিচু করে এই মাতাল, উচ্ছৃঙ্খল বড়লোকদের রূঢ় ব্যবহার হজম করতে হচ্ছে। একটু আগে ভিড়ের মধ্যে একজন মাতাল তার কাঁধে ধাক্কা দিয়ে হাতের ড্রিঙ্ক ছলকে দিয়েছিল, অর্জুনকে নিচু হয়ে "সরি স্যার" বলতে হয়েছে। 

এই নৈকট্য, এই দমবন্ধ করা বাধ্যবাধকতা তার স্নায়ুর ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করছে। কিন্তু, সে জানে, এই কালো ইউনিফর্মটাই আজ তার সবচেয়ে বড় বর্ম। স্যুট পরে বারে বসে থাকলে ভিআইপি লাউঞ্জের ভারী কাঁচের ওপারে কী হচ্ছে তার বিন্দুবিসর্গও জানা যেত না।

ওর প্রাথমিক লক্ষ্য একদম স্থির। লাউঞ্জের বাঁ-দিকের অন্ধকার শেষ মাথায় থাকা 'ভিআইপি জোন'-এর তিন নম্বর কেবিন। প্যারাডিকের দেওয়া ইনফরমেশন যদি ঠিক হয়, তবে আজ রাতের ডিলটা ওই কেবিনের ভেতরেই হবে।

অর্ডার সার্ভ করে এসে ঘড়ির দিকে আড়চোখে তাকাল অর্জুন। দশটা চল্লিশ, আরো এক ঘন্টা কুড়ি মিনিট।

পুরো ক্লাব যখন রাত বারোটার কাউন্টডাউন আর নিউ ইয়ারের আতশবাজির শব্দে পাগল হয়ে উঠবে, তখন ওই তিন নম্বর ভিআইপি রুমের ভেতর কী হবে জানার জন্য অর্জুনকে বারোটা বাজার ঠিক আগে ওই ঘরে ঢুকতেই হবে।

কেবিনের আশেপাশে হালচাল দেখার উদ্দেশ্যে ভিড় ঠেলে ভিআইপি সেকশনের করিডোরের দিকে এগোতেই অর্জুনের বুকের ভেতরটা হঠাৎ ছ্যাঁত করে উঠল।

পাগলের মতো নাচতে থাকা ভিড়ের ঠিক পেছনে, বারের কর্নারে যেখানে আলো প্রায় পৌঁছায় না বললেই চলে, সেখানে স্ট্রাব লাইটের একটা লাল ঝলক মুহূর্তের জন্য গিয়ে পড়ল একটা চওড়া কাঁধের ওপর। কালো লেদার জ্যাকেট। লোকটার মুখটা স্পষ্ট দেখা গেল না। কিন্তু, বারের কাউন্টারের ওপর রাখা আছে একটা কালো রঙের ফুল-ফেস ভাইজার ওয়ালা হেলমেট।

অর্জুনের পা দুটো মেঝের সাথে যেন আঠার মতো আটকে গেল। ওর বুকের ধুকপুকানির স্পিড এবার ইডিএম ট্র্যাকের বেস-কেও ছাপিয়ে গেল। 

লেক গার্ডেনসের সেই বাইকার না ? 

লোকটা এক হাতে মদের গ্লাস ধরে খুব শান্তভাবে নাচের ফ্লোরটা স্ক্যান করছে। তার ঘাড়টা ধীরে ধীরে অর্জুনের দিকটায় ঘুরে আসছে। অর্জুন আর এক সেকেন্ডও সময় নষ্ট করল না। হাতের স্টিলের ট্রে-টা সামান্য ওপরে তুলে নিজের মুখের একটা পাশ আড়াল করে সে বিদ্যুৎগতিতে ভিআইপি করিডোরের দিকে বাঁক নিল।

এটা কি ওর অবচেতন মনের প্যারানয়া, নাকি সত্যি ওরা ওকে ট্র্যাক করে এই ক্লাবের ভেতর পর্যন্ত পৌঁছে গেছে? 

শিকারী নিজে কখন যে শিকারে পরিণত হয়ে যায়, তা বোঝার উপায় থাকে না। ঘাড়ের পেছনের রোমকূপগুলো খাড়া হয়ে আছে অর্জুনের। যেন এক্ষুনি কেউ পেছন থেকে ওর কাঁধে একটা বরফশীতল হাত রাখবে।

ভিআইপি করিডোরের মুখে দাঁড়ানো দুজন পেল্লায় সাইজের বাউন্সার অর্জুনের আইডি কার্ডটার দিকে একবার তাকিয়ে নীরবে সরে দাঁড়াল।

করিডোরের ভেতরটা বাইরের তুলনায় অনেক শান্ত। বাইরের ক্লাবের কান ফাটানো আওয়াজটা এখানে একটা ভারী, চাপা গুমগুম শব্দে পরিণত হয়েছে। এখানকার কার্পেটটা এতটাই পুরু যে জুতোর কোনো শব্দ হয় না। 

অর্জুন সরাসরি তিন নম্বর রুমের দিকে না গিয়ে সার্ভিস প্যান্ট্রির দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল। প্যান্ট্রিটা ছোট, স্টিলের কাউন্টার আর বরফের মেশিনে ঠাসা। সেখানে কেউ নেই। অর্জুন ট্রে-টা কাউন্টারের ওপর নামিয়ে রেখে একটা গভীর শ্বাস নিল। কপালে জমে ওঠা ঠান্ডা ঘামটা হাতের উল্টোপিঠ দিয়ে মুছে ফেলল।

পকেট থেকে অত্যন্ত সাবধানে বের করল একটা ম্যাট-ব্ল্যাক রঙের মাইক্রো-অডিও ট্রান্সমিটার। জিনিসটা একটা ছোট বোতামের চেয়েও আকারে ছোট, পেছনের দিকে একটা স্ট্রং অ্যাডেসিভ স্টিকার লাগানো। সেটার সাথে পেয়ার করা আছে ওর পকেটে থাকা ফোনটা।

সময় এগারোটা পঞ্চাশ। আর মাত্র দশ মিনিট।

অর্জুন ট্রান্সমিটারটা নিজের ডান হাতের তর্জনী আর মধ্যমার খাঁজে এমনভাবে লুকিয়ে রাখল যাতে বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে হাতটা খালি। ট্রে-টা আবার দুহাতে তুলে নিয়ে সে প্যান্ট্রি থেকে বেরিয়ে তিন নম্বর ভিআইপি রুমের সামনে গিয়ে দাঁড়াল।

দরজার পাশে দাঁড়ানো সিকিউরিটি গার্ডটা ওর ট্রে-র দিকে তাকিয়ে একটা ইশারা করতেই ভারী, সাউন্ডপ্রুফ মেহগনি কাঠের দরজাটা ভেতর থেকে খুলে গেল।

অর্জুন মাথা নিচু করে ভেতরে পা রাখল।

ঘরের ভেতরের আবহাওয়া বাইরের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। আবছা মায়াবী আলো, চামড়ার সোফা, আর এক অদ্ভুত থমথমে নিস্তব্ধতা। বাইরের মিউজিক এখানে প্রায় শোনাই যায় না। ঘরের ভেতর তিনজন মানুষ বসে আছে। বাতাসে দামী মদের আর তীব্র কিউবান সিগারের কটু ধোঁয়া।

অর্জুন কারোর মুখের দিকে তাকাল না। সে জানে, এই মুহূর্তে চোখের দিকে তাকানো মানেই সন্দেহ তৈরি করা। সে সোজা ঘরের মাঝখানে রাখা ভারী মেহগনি কাঠের টেবিলটার দিকে এগিয়ে গেল।

"আপনারা যে ব্র্যান্ডটা অর্ডার করেছিলেন, স্যার।"

অর্জুনের গলাটা নিখুঁত ওয়েটারের মতো বিনীত, কাঁপা কাঁপা।

টেবিলের উল্টোদিকে বসা লোকটার মুখটা অন্ধকারের জন্য স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না, শুধু তার ডান হাতের আঙুলে একটা বড় সোনার আংটি আলোয় চিকচিক করছে।

"বরফের বালতিটা বদলাও" 

একটা খসখসে ভারী গলা নির্দেশ দিল।

"ইয়েস স্যার।"

অর্জুন ট্রে থেকে নতুন বরফের বালতিটা নামানোর জন্য সামান্য ঝুঁকল। ওর পেশিগুলো তখন ইস্পাতের মতো শক্ত হয়ে আছে। চোখের কোণ দিয়ে সে খেয়াল করল, সোফায় বসা অন্য দুজন লোক ফিসফিস করে কিছু একটা বলছে। তাদের সামনে রাখা একটা লেদার পোর্টফোলিও ব্যাগ।

টেবিলের ওপর থেকে পুরনো বালতিটা তোলার সময় অর্জুন ডান হাতের দুটো আঙুল টেবিলের ভেতরের দিকের খাঁজে সামান্য স্লাইড করে দিল। মাত্র এক সেকেন্ডের ভগ্নাংশ। আঠালো মাইক্রো-ট্রান্সমিটারটা মেহগনি কাঠের নিচটায় নিখুঁতভাবে সেঁটে গেল। কোনো শব্দ হলো না, কেউ কিছু টেরও পেল না।

"হয়ে গেলে বেরিয়ে যাও। আর কেউ ডাকলে তবেই আসবে।" সোনার আংটি পরা লোকটার বিরক্তিভরা গলা।

"অফকোর্স স্যার।"

অর্জুন পুরনো বালতি আর খালি গ্লাসগুলো ট্রে-তে তুলে নিয়ে পিছন ফিরে দরজার দিকে হাঁটা দিল। দরজা দিয়ে বেরোনোর ঠিক আগের মুহূর্তে সে নিজের ইয়ারপিসে শুনতে পেল, ক্লাবের ডিজে মাইকে চিৎকার করে উঠেছে।

"লেডিজ অ্যান্ড জেন্টলমেন! উই আর জাস্ট ফাইভ মিনিটস অ্যাওয়ে ফ্রম দ্য নিউ ইয়ার! লেটস মেক সাম নয়েজ!"

বাইরের ভিড়টা বুনো জন্তুর মতো হুঙ্কার দিয়ে উঠল।

অর্জুন সার্ভিস প্যান্ট্রিতে ফিরে এসে দরজাটা লক করে দিল। হাত-পা কাঁপছে তার। সে পকেট থেকে ফোনটা বের করে রেকর্ডিং অ্যাপটা অন করল। মাইক্রো-ট্রান্সমিটারের সিগন্যাল একদম ক্লিয়ার। ইয়ারপিসে এখন ভিআইপি রুমের ভেতরের ফিসফিসানি স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে।

"...শিশির রায় মরে গিয়ে আমাদের একটা বড় ফেভার করেছে।"

ইয়ারপিসে সোনার আংটি পরা লোকটার ভারী গলাটা ভেসে এল।

"কিন্তু অমৃতা যে ডেটাগুলো লিক করেছিল, সেগুলোর কী হবে?" 

দ্বিতীয় জনের গলা।

"আমাদের আজকের কাজটা হলো 'মাস্টার কী' টার পজেশন চেঞ্জ করা। ঠিক রাত বারোটায়, যখন বাইরে কাউন্টডাউন শুরু হবে, ব্যাকডোর এক্সেসটা ফায়ারওয়াল থেকে শিফট হয়ে আমাদের অফশোর সার্ভারে চলে যাবে। কেউ টেরও পাবে না।"

অর্জুনের কানের পর্দায় শব্দগুলো আছড়ে পড়তেই তার শিরদাঁড়া দিয়ে বরফের স্রোত নেমে গেল। 'মাস্টার কী' কোনো ফিজিক্যাল চাবি নয়; ওটা কোনরকম অ্যাক্সেস কোড! আর সেটা আজ রাত বারোটায় হাতবদল হচ্ছে!

বাইরে ডিজের গলা ফেটে পড়ছে স্পিকারে।

"টেন! নাইন! এইট!"

"ল্যাপটপটা খোলো," 

ইয়ারপিসে ভেসে এল নির্দেশ। 

"ট্রান্সফার ইনিশিয়েট করো।"

"সেভেন! সিক্স! ফাইভ!"

পুরো ক্লাব এখন এক স্বরে কাউন্টডাউন করছে। ফ্লোরের কম্পনে প্যান্ট্রির স্টিলের কাউন্টার থরথর করে কাঁপছে।

"ফোর! থ্রি!"

অর্জুন ফোনের স্ক্রিনে রেকর্ডিংয়ের ওয়েভলেংথগুলোর দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। তার সাংবাদিক জীবনের সবচেয়ে বড় প্রমাণটা এখন ডিজিটালি রেকর্ড হচ্ছে।

"টু! ওয়ান!"

"হ্যাপি নিউ ইয়ার!"

ভিড়ের গর্জনের সাথে সাথে ক্লাবের ভেতরে কনফেটি আর ফ্লেয়ার গান ফেটে উঠল। বাইরের ওই কান ফাটানো উৎসবের শব্দের ঠিক আড়ালে, ইয়ারপিসের ভেতর অর্জুন স্পষ্ট শুনতে পেল একটা ছোট্ট কি-বোর্ডের এন্টার বোতাম টেপার 'ক্লিক' শব্দ।

"ট্রান্সফার কমপ্লিট। মাস্টার কী এখন আমাদের কন্ট্রোলে।"

অর্জুন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে রেকর্ডিংটা সেভ করল। কাজ শেষ। এবার এখান থেকে বেরোতে হবে।

সে প্যান্ট্রির দরজাটা খুলতে যাবে, ঠিক তখনই তার কানের ইয়ারপিসে সুপারভাইজারের গলাটা হিসহিস করে উঠল।

"সুমিত! তুই কি ভেতরে ঘুমোচ্ছিস? ভিআইপি রুমের বাইরে বাউন্সাররা একটা লোককে খুঁজছে... কালো জ্যাকেট পরা একটা লোক নাকি সার্ভিস করিডোরে ঢুকে পড়েছে! তুই কি কাউকে দেখেছিস?"

অর্জুনের রক্ত জল হয়ে গেল।

কালো জ্যাকেট। বাইকারটা।

সে প্যান্ট্রির দরজার নবটা ঘোরাতে গিয়ে থেমে গেল। দরজার উল্টোদিকের ফ্লোর থেকে ভারী বুটের শব্দ আস্তে আস্তে প্যান্ট্রির দিকেই এগিয়ে আসছে। ভিআইপি করিডোরের নিস্তব্ধতায় সেই পায়ের আওয়াজটা অর্জুনের বুকের ভেতর হাতুড়ির মতো বাজতে শুরু করল। শিকারী এখন তার দরজার ঠিক ওপাশেই দাঁড়িয়ে আছে।
[+] 6 users Like RockyKabir's post
Like Reply
১১

রাত ঠিক একটা।

গত সাড়ে তিন ঘণ্টায় ধরে অয়ন পিলারের পিছনে নিজের অবস্থান এক চুলও পরিবর্তন করেনি।

পিলারের যেখানে ওর পিঠটা ঠেকে ছিল, সেটা এখন শরীরের উত্তাপে গরম হয়ে উঠেছে। আগে হলে ও এতক্ষণ অপেক্ষা করতে পারতো না। কিন্তু, মার্শাল আর্টসের ট্রেনিং বিশেষ করে কিবাদাচি প্র্যাকটিস করে করে ঘণ্টার পর ঘণ্টা একভাবে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থাকাটা ওর অভ্যাস হয়ে গেছে।

পুরো সময়টা অয়ন প্রায় একভাবে দাঁড়িয়ে কাটিয়েছে। ওর অবস্থান থেকে এক ইঞ্চিও সরেনি, কেবল শরীরের ভারটা মাঝে মাঝে, অত্যন্ত নিঃশব্দে ডান পা থেকে বাঁ পায়ে শিফট করেছে।

এই সাড়ে তিন ঘণ্টায় ওর চোখের সামনে দিয়ে হাজার একটা ঘটনা ঘটে গেছে। ক্লাব প্রাঙ্গণটার রূপ কয়েকবার পালটেছে। মাঝে দু-একবার বৈশালী আর দেবমাল্য ওর দৃষ্টিসীমায় এসেছিল। দেবমাল্যর বডি ল্যাঙ্গুয়েজ একটু ঢিলে হয়ে এসেছিল। কিন্তু, অয়ন লক্ষ্য করেছিল বৈশালীর অস্থিরতা কমেনি। সে বারবার, বার কাউন্টার, ভিআইপি বুথ আর নাচতে থাকা ভিড়ের দিকে চোখ মেলাচ্ছিল। যতবার অয়ন সেটা দেখেছে ততবারই পিলারের ছায়ার সাথে সে নিজেকে আরও গভীরভাবে লেপ্টে নিয়েছে। 

উন্মাদনা শীর্ষে পৌঁছে এখন একটা বিশৃঙ্খল ঢিলেঢালা ভাব এসেছে। কিন্তু যার জন্য এতক্ষণ ধরে এসব সহ্য করা, সেই বিক্রম মালহোত্রা এখনও অনুপস্থিত।

অয়ন ঘড়ির দিকে তাকাল, একটা বেজে গেছে। বিক্রম যদি আসার হতো, সে এতক্ষণে এসে পড়তো। নিজের দলবল নিয়ে ভিআইপি লাউঞ্জ কাঁপিয়ে ঢুকতো। সাড়ে তিন ঘণ্টা পর অয়ন চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাল: বিক্রম আজকে আর আসবে না।

অয়ন ভুরু দুটো সামান্য কুঁচকাল। পিলারের অন্ধকার থেকে বেরিয়ে না এসেও ও চোখ জোড়া সরু করে পুরো লাউঞ্জটা আর একবার স্ক্যান করল।

সিধু বলেছিল আজ এখানে শুধু বিক্রম নয়, স্টুডেন্ট কাউন্সিলের আরও হেভিওয়েট মেম্বার আসবে। কিন্তু সাড়ে তিন ঘণ্টা ধরে এই ক্লাবের প্রতিটি মুখের ওপর দিয়ে লেজারের আলো চলে গেছে, অয়ন কাউকেই দেখতে পায়নি। এখানে যারা নাচছে বা ঢুলছে, তারা সবাই বড়লোকের বখাটে সন্তান, যাদের কাজ নাচগান আর নেশা করা। প্রতিটা নতুন মুখ যতবার ক্লাবের দরজা ঠেলে ঢুকেছে, অয়ন তাদের হাঁটার ধরণ আর বডি ল্যাঙ্গুয়েজ স্টাডি করেছে। কাউন্সিলের কোর মেম্বারদের বডি ল্যাঙ্গুয়েজ থাকার কথা, তার ছিটেফোঁটাও কারোর মধ্যে নেই।

তাহলে সিধু ওকে পুরো ভুল ইনফরমেশন দিল?

অয়নের চোয়ালটা শক্ত হয়ে এল।

সিধু ইচ্ছা করে ওকে ভুল পথে চালনা করল?

যাতে ও সারা রাত এই ক্লাবে সময় নষ্ট করে আর বিক্রম অন্যদিকে নিজের চাল চালতে পারে। 

সিধুর ধারণা ছিল অয়ন ক্লাবের চাকচিক্য আর ভিড়ে আটকে গিয়ে কোনো কিছু আঁচ করতে পারবে না।

'ভুল করলি সিধু।' 

অয়ন মনে মনে উচ্চারণ করল। 

'কাল সকালে তোকে এই মিথ্যের মাশুল কড়ায়-গণ্ডায় মেটাতে হবে। মার কাকে বলে কাল বুঝবি।'

এখন আর এক সেকেন্ডও এই ক্লাবে থাকা মানে নিজের এনার্জি নষ্ট করা। কাল সকাল থেকেই সিধুর ওপর ট্র্যাক বসাতে হবে।

অয়ন ধীরে ধীরে পিলার থেকে গা সরিয়ে নিল। মিঃ প্রধান ঠিক যেভাবে শরীরকে শিথিল রাখতে শিখিয়েছেন, ঠিক সেটাই সে ফলো করেছে।

কিন্তু এতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার একটা ক্লান্তি তো আছেই। অয়নের গলার ভেতরের শুষ্কতা আর ব্লাডারের চাপ ওকে জানান দিল এবার জায়গা ছাড়তেই হবে।

সে পিলারের আড়াল থেকে বেরোল। 

বেরিয়ে যাওয়ার আগে একবার ওয়াশরুমে যাওয়া দরকার। মুখের ওপর সামান্য ঠান্ডা জল ছেটানো প্রয়োজন। 

নিজের মুখটা সামান্য নিচের দিকে রেখে, অত্যন্ত সতর্কতার সাথে সে করিডোরের সবচেয়ে অন্ধকার দিকটা ধরে ওয়াশরুমের চিহ্নিত দরজার দিকে এগোতে লাগল।

ও খেয়াল করল না, অথবা বলা ভালো, খেয়াল করার প্রয়োজন বোধ করেনি, লাউঞ্জের একটা স্তম্ভের আড়াল থেকে এক জোড়া চোখ ওকে অনুসরণ করছে। 

বৈশালী।

বৈশালী পুরো সাড়ে তিন ঘণ্টা ধরে নিঃশব্দে গ্লাস হাতে এক কোণে দাঁড়িয়ে লক্ষ্য করে গেছে কখন অয়ন বেরিয়ে আসবে। দেবমাল্য কতবার ওর কাঁধে হাত দিয়েছে, কতবার ওয়াইন অফার করেছে; বৈশালীর মাথার ভেতর তার কিছুই পৌঁছায়নি। একটা অদ্ভুত, অনুভূতি বৈশালীর পেটের ভেতর কামড় বসাচ্ছিল। জিনিয়ার ওয়ার্নিং ধোঁয়ার মতো উড়ে গেছে।

অয়নকে ও একলা পেতে চায়।

১২

ক্লাবের ওয়াশরুমটা বেশ বড়, চকচকে মার্বেল আর মেটালিক ফিনিশে তৈরি। কিন্তু মেঝের কোণে কোণে জলের ওপর চাপ চাপ মদের দাগ। বাইরের মিউজিকের বেসটা এখানে এসে একটা ভোঁতা 'ধপ ধপ' শব্দের রূপ নিয়েছে।

অয়ন ভেতরে ঢুকে বেসিনের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। বেসিনের ওপরের বিশাল আয়নায় নিজের ছায়াটা ফুটে উঠল। টার্টলনেক সোয়েটারের কলারটা একটু নামিয়ে ও ট্যাপটা পুরোটাই খুলে দিল।

বরফ-ঠান্ডা জল অয়ন দু-হাতে তুলে নিয়ে মুখে ছিটিয়ে দিল। একবার, দু-বার, তিন-বার।
চোখের কোণে আর গালে জমে থাকা অবসাদটুকু নিমেষে উবে গেল। মুখ মুছে তোয়ালেতে হাত মোছার সময় অয়ন আয়নার দিকে তাকাল। 

হঠাৎই বাইরে, ওয়াশরুমের বাইরে করিডোরের শেষ মাথায় একটা চাপা, দমবন্ধ করা চিৎকার ভেসে এল।

একটা মেয়েলি গলার আর্তনাদ। যেটা স্পষ্টতই চেপে রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে, কিন্তু ভয়ের চোটে ছিটকে বেরোচ্ছে।


অয়নের হাতটা তোয়ালের ওপর স্থির হয়ে গেল। ওর ভেতরের সেন্সরি অর্গানগুলো সব সময় টিউন করা থাকে। বাইরের কোনো শব্দই ওর নজর এড়ায় না।

এই চিৎকারটা তো সাধারণ মদ্যপের চিৎকার নয়। 

অয়ন মুহূর্তের মধ্যে ভেজা তোয়ালেটা বেসিনের ওপর ফেলে দিল। ওর চোখের সতর্ক ভাবটা বদলে গিয়ে সেখানে ফুটে উঠল অ্যালার্টনেস।

সোয়েটারের হাতাটা সামান্য গুটিয়ে ও নিঃশব্দে ওয়াশরুমের দরজার দিকে এগোল।

দরজাটা একটুখানি ফাঁক করতেই সাউন্ড সিস্টেমের বেস ওর কানে ধাক্কা মারল। কিন্তু অয়ন সেদিকে কান দিল না। ওর চোখ চলে গেল করিডোরের বাঁ দিকের একটা সার্ভিস এক্সিটের গলির দিকে যেখান আলো প্রায় নেই।  সেই আঁধার গলিটায় একজন লোক কাউকে দেওয়ালের সঙ্গে চেপে ধরেছে। অয়ন আর সময় নষ্ট করল না। সে ওই গলির দিকে ছুটে গেল।

কিন্তু ও খেয়াল করল না ওয়াশরুমের দরজার ঠিক উল্টোফুটে, দেওয়ালের আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকা বৈশালীকে যে অয়নের ওয়াশরুম থেকে বেরোনোর অপেক্ষায় ছিল। সে হঠাৎ অয়নকে এভাবে ওদিকে ছুটে যেতে দেখে চমকে উঠল।

তার বুকের ভেতরটা এক মুহূর্তে হিম হয়ে গেল। 

অয়ন কোথায় যাচ্ছে? 

এক মুহূর্তের জন্যও নিজের সুরক্ষার কথা না ভেবে, লাল ড্রেসের কুঁচি সামলে বৈশালীও পিলারের আড়াল ধরে ধরে নিঃশব্দে অয়নের পিছু পিছু ধাওয়া করল।
[+] 6 users Like RockyKabir's post
Like Reply
১৩

রাত তখন পৌনে দুটো।

"হ্যান্ডস আপ! যে যেখানে আছিস একদম সেভাবে দাঁড়িয়ে থাক্ ! কেউ নড়বে না!"

বাইপাসের ধারে অবস্থিত নির্জন প্রাইভেট ক্লাবে পার্টির উন্মাদনা হঠাৎ করে চোখের পলকে বিশৃঙ্খলায় বদলে গেল। 

নিষিদ্ধ প্রমোদকাননের মোহময়ী ভাবটা কেটে গিয়ে একটা কুৎসিত রূপ নিল।

সোফায় বসে থাকা নামীদামী ঘরের ছেলেরা যাদের কারোর হাতে মদের গ্লাস, কারোর কোলে মেয়ে, আবার কেউ টেবিল রাখা থালা থেকে ড্রাগস টানছিল, তারা হঠাৎ চোখের সামনে পুলিশের টিমকে দেখে বিহ্বল হয়ে পড়ল। অনেকেই ভয়ে হাঁটু মুড়ে মেঝেতে বসে পড়ল।
কোন অভিজাত ক্লাবে পুলিশ সচরাচর এভাবে পা ফেলে না। বিশেষ করে যেসব জায়গায় শহর কলকাতার ডাকসাইটে ব্যবসায়ী, রিয়েল এস্টেট প্রমোটার আর আমলাদের বখে যাওয়া বাছাধনরা প্রাইভেট পার্টি করে।

কিন্তু, আজ রাতে তার ব্যতিক্রম ঘটল।

এর মধ্যেই মাদকাচ্ছন্ন অবস্থায় সোফা থেকে তেড়ে উঠতে গিয়ে সপাসপ দুটো লাঠির বাড়ি খেয়ে একজন সোজা মেঝেতে বসে পড়ল।

বিপদ দেখে রকি ততক্ষণে পেছনের ইমার্জেন্সি দরজার দিকে দৌড় লাগিয়েছে। বিক্রম অবশ্য এখানে উপস্থিত ছিল না তাই তার জানা ছিল না যে কী ঘটছে। সে জাস্ট একটু আগে মেধাকে চুল ধরে টানতে টানতে ভিআইপি স্যুটের দিকে নিয়ে গেছে।

সেটা দেখে তখন যারা হাসাহাসি করছিল, শিস দিচ্ছিল তারাই এখন পুলিশের ভয়ে ঠকঠক করে কাঁপছে।

১৪

বিছানার সিল্কের চাদরটা মেধার থাইয়ের কাছে দলা পাকিয়ে আছে। তার গায়ের ব্যাকলেস ড্রেসের ওপরের অংশটা ছিঁড়ে ঝুলছে, উন্মুক্ত বুকের ওপর লালা জমেছে। বিক্রম ওর একটা স্তনের বোঁটা মুখে নিয়ে চুষছিল তখন ওর মুখ থেকে গড়িয়ে গড়িয়ে পড়েছে।

বাইরে থেকে হট্টগোলের আওয়াজ আসতেই মেধার ওপর ঝুঁকে থাকা বিক্রমের শরীরটা শক্ত হয়ে গেল।


বিক্রম মালহোত্রা মাথা তুলল। ফর্সা মুখটা মদের নেশায় লাল, শার্টের বোতামগুলো ছেঁড়া, নিঃশ্বাসে মদের গন্ধ

"হোয়াট দ্য ফাক...?" সে বিড়বিড় করে উঠল।

বিক্রমের লাল চোখ দুটো এক মুহূর্তের জন্য দরজার দিকে ঘুরে গেল, কিন্তু তার চোখে-মুখে ভয়ের কোন চিহ্ন ফুটে উঠল না। বরং সে জায়গায় ফুটে উঠল আক্রোশ।


"হোয়াট দ্য ফাক ইজ দিস?"

বিক্রমের কন্ঠস্বর জড়িয়ে আসছে, কিন্তু হিংস্র ভাবটা স্পষ্ট। সে তখনও মেধার ডান হাতের কবজিটা চিমটের মতো চেপে ধরেছিল।

মেধা ভীতু চোখে বিক্রমের মুখের দিকে তাকাল। 

সে কোনোক্রমে গলা থেকে আওয়াজ বের করল, 

"বিক্রম... ছ-ছাড়ো... পুলিশ এসেছে... প্লিজ আমায় ছেড়ে দাও..."

"চুপ কর, ছেনাল!"

বিক্রম একটা হুংকার ছেড়ে মেধার গালে সপাটে এক চড় বসাল।

ঠাস!

মেধার মাথাটা বালিশের ওপর ঘুরে গেল। শক্ত হাতের থাপ্পড়ের চোটে তার নরম ঠোঁটটা কেটে গিয়ে এক ফোঁটা রক্ত গড়িয়ে পড়ল।

"কী হচ্ছেটা কী এসব? কার পারমিশনে ঢুকেছে ওরা এখানে? ডোন্ট দে নো হু দ্য হেল আই অ্যাম?" 

ওর চোয়াল পাথরের মতো শক্ত , চোখ দুটো হিংস্র পশুর মতো লাল।

এমন সময় বাইরে থেকে ভারী কিছু ছিটকে পড়ার আওয়াজ এল। দরজার ওপাশে হুলস্থুলটা কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে আরও দ্বিগুণ হয়ে উঠল। মেঝের ওপর বুটের শব্দটা খুব স্পষ্ট, বাইরে করিডর থেকে আসছে। তার সাথে একতলা থেকে
নানা কণ্ঠের চিৎকার।

বিক্রম নিঃশ্বাস ফেলার সময় নিল না। মেধার শরীরটাকে একটা আবর্জনার মতো এক ধাক্কায় বিছানার উল্টোদিকে ফেলে দিল সে। মেধার মাথাটা গিয়ে লাগল কাঠের সাইড-টেবিলের কোণায়। একটা অস্ফুট কুঁকড়ে যাওয়া শব্দ ছাড়া সে আর কিছু করে উঠতে পারল না। শুধু অসাড় আঙুল দিয়ে ভাঙা জামার অংশটা বুকের ওপর টেনে নেওয়ার চেষ্টা করল। 

বিক্রমের মদের নেশাটা কিন্তু ততক্ষণে হঠাৎ করে এক ঝটকায় বেশ খানিকটা পাতলা হয়ে এসেছে। তবে ভয় নয়, তার মাথার ভেতর তখন কাজ করছে এক ধরনের জেদ। 

কলকাতার কোন থানার ওসির ঘাড়ের ক-টা মাথা যে তার পার্টিতে রেড চালায় ?

ওর বাবা চাইলে কাল সকাল ন-টার মধ্যে এই রেডের দায়িত্বে থাকা পুরো ব্যাচটার ইউনিফর্ম থেকে ব্যাজ খুলে নিতে পারে। কিন্তু এই মুহূর্তে... এই মুহূর্তে পুলিশের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যাওয়াটা বোকামি। 

মিডিয়া যদি ক্লাবের বাইরে উপস্থিত থাকে, তবে স্ক্যান্ডালটা সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়তে খুব বেশি হলে বিশ মিনিট সময় নেবে। 

"হারামজাদা রকিটা পালাল নাকি?" 

বিক্রম দাঁতে দাঁত চেপে নিজের মনে বিড়বিড় করল।

কামরার সিলিংয়ে ছোট ছোট ট্র্যাক-লাইট জ্বলছিল। মেঝের কার্পেটের ওপর নিজের বহুমূল্য রোলেক্স ঘড়িটা পড়ে থাকতে দেখেও সেদিকে নজর দিল না বিক্রম। ড্রেসিং টেবিলের ওপর রাখা গাড়ির চাবি আর নিজের পার্সোনাল সেটের আইফোনটা পকেটে গলিয়ে নিল সে। তার হাতদুটো হালকা কাঁপছিল বটে তবে সে নিজেকে সামলে নিল।

এমন সময়...
"তিন নম্বর রুমটা চেক করো! জলদি!" 

ওপাশের গলার আওয়াজটা খুব বেশি দূরে নয়। অনেকগুলো বুটের আওয়াজ আসছে। কমসে কম তিন-চারজন এই স্যুইটের দিকে এগোচ্ছে।

বিক্রম মেধার দিকে একবার শেষ নজর বুলাল। মালটা খাটের এক কোণে সিঁটিয়ে আছে। চোখ দুটো ফোলা, ঠোঁটের পাশ দিয়ে সরু সুতোর রক্ত গড়িয়ে নামছে চোয়াল পর্যন্ত।

"একদম মুখ খুলবি না," 

বিক্রম ওর দিকে ঝুঁকে বরফের মতো ঠাণ্ডা গলায় বলল, 

"একটা কথা যদি মিডিয়া বা পুলিশের কাছে বের করেছিস, তোর বাপকে কালকে দুনিয়া থেকে গায়ের করে দেব। মনে থাকে যেন।"

উত্তরে মেধা কিছু বলল না। শুধু চোখ দুটো বন্ধ করে কাঠের মেঝের ওপর কপাল ঠেকিয়ে পড়ে রইল।

বিক্রম আর এক সেকেন্ডও দাঁড়াল না। 

১৪

ঘরটার উত্তর-পশ্চিম কোণে, ভারী ভেলভেটের পর্দার আড়ালে একটা ফ্রেঞ্চ উইন্ডো আছে। ফ্রেমটা কাঠের, লকটা পুরোনো, অনেকদিন তেল পড়েনি। বিক্রম হাতলটা ধরে হ্যাঁচকা টান মারতেই কিঁচকিঁচ শব্দ করে পাল্লাটা খুলে গেল, বাইরের ঠাণ্ডা বাতাসের ঝাপটা ওর মুখের ওপর আছড়ে পড়ল।

বাথরুমে বা বাইরের বারান্দায় লুকোনোর জায়গা নেই সেটা ও ভালো করেই জানে। ক্লাবের এই ভিআইপি উইংটার নকশা ওর নখদর্পণে। সে বহুবার এখানে সারা রাত কোন মেয়ের শরীর নিয়ে খেলেছে।


"দেরি করছ কেন? লকটা ভাঙো!"

বাইরে থেকে একজন চড়া গলার অফিসারের হাঁক ভেসে এল।

বিক্রম এক সেকেন্ডের জন্য থমকাল। নিচে তাকাল সে। 

দোতলা থেকে সোজা নিচে নামার কোনো ফায়ার এস্কেপ নেই এখানে। 

ফ্রেঞ্চ উইন্ডোর বাইরে দেওয়াল ঘেঁষে নেমে গেছে চার ইঞ্চির মোটা একটা পিভিসি পাইপ আর তার পাশে ক্লাবের ডেকোরেশনের জন্য লাগানো বেশ কিছু লতা-ঝোপের ঝালর। পাইপটা সোজা গিয়ে নেমেছে ক্লাবের পেছনের সার্ভিস প্রাঙ্গণ আর সীমানা প্রাচীরের মাঝামাঝি একটা নিচু, অন্ধকার ঝোপের মধ্যে।

মেঝের ওপর পড়ে থাকা মেধার দিকে আর একবারও ফিরে তাকাল না সে। পকেটে আইফোন আর চাবিটা ভালোভাবে চেপে ধরে সে জানলার কার্নিশে পা দিল।

মাথাটা এক মুহূর্তের জন্য চক্কর দিয়ে উঠল। মদ একটু বেশি টানা হয়ে গেছে। ইএম বাইপাসে দ্রুতগামী লরির হেডলাইটের আলো এক চিলতে আলোর রেখা ফেলে চলে যাচ্ছে। 

"শিট..."

দাঁতে দাঁত চেপে বিড়বিড় করল বিক্রম। দরজায় তখন প্রথম কোপের আওয়াজ পাওয়া গেল।

আর ভাবার সময় ছিল না। বিক্রম ঝাঁপ দিল না, বরং জানলার বাইরের সরু কার্নিশটা দু-হাতে আঁকড়ে ধরে দেওয়াল ঘেঁষে নিজেকে ঝুলিয়ে দিল। হাত দুটো ঠকঠক করে কাঁপছে। কার্নিশের ধারালো প্লাস্টার ওর হাতের তালুর চামড়া চেঁচে বের করে নিল। রোলেক্স ঘড়িটা বেডরুমে ফেলে আসার আফসোসটা চামড়া-ছাড়ানো যন্ত্রণায় মিলিয়ে গেল।

পাইপটা ধরল সে। ভেজা, শেওলা ধরা পাইপ। বিক্রমের পা দুটো শূন্যে দু-একবার হাতড়ে পেল দেয়ালের খাঁজ। নামতে শুরু করল সে। তড়িঘড়ি নামতে গিয়ে ওর ডান পা-টা পিছলে যাচ্ছিল।
"উফ!"

হাত থেকে পাইপের গ্রিপ প্রায় পিছলে যাচ্ছিল। কনুইয়ের চামড়া ঘষে গিয়ে জামার হাতা ছিঁড়ে গেল। হাড়ের ভেতর পর্যন্ত একটা তীব্র কনকনানি ছড়িয়ে পড়ল। কিন্তু, বিক্রম সেসব অনুভব করছিলাম না। ভয়ের ধাক্কায় ওর পেটের ভেতরটা কেমন যেন খালি হয়ে আসছিল। পুলিশ যদি উপরে ঘরে ঢুকে পড়ে আর জানলা দিয়ে আলো ফেলে, তবে সব শেষ।

নিজের পুরো শরীরের ওজনটা কায়দা করে ডান কনুই আর বাঁ হাতের ওপর ছেড়ে দিয়ে সে তরতর করে নিচের দিকে নামতে থাকল। নিচে যখন পৌঁছাল, তখন ওর দু-হাতের চেটো কেটে রক্ত বেরোচ্ছে, দামি শার্টের অর্ধেক অংশ ছিঁড়ে ঝুলছে আর জুতো জোড়া কাদা-জলে প্যাচপ্যাচ করছে।

ক্লাবের পেছনের দিকটা ভীষণ অন্ধকার। ঘন ঝোপ। পাশে বড় বড় দুটো ড্রাবের নীল জঞ্জাল ফেলার ড্রাম রাখা। বাইপাসের মূল রাস্তা থেকে জমি অনেকটা নিচু।

বিক্রম সোজা গিয়ে পড়ল সেই জঞ্জালের স্তূপের পাশটিতে। ঝোপের কাঁটা ওর গালে আঁচড় কেটে দিল। কাদার ভেতর শুয়ে পড়ে সে হাঁপাতে লাগল। বুকের ছাতিটা ফুঁসফুঁস করে উঠছে, রক্তের মধ্যে ড্রাগস আর অ্যাড্রেনালিনের তীব্র লড়াই চলছে।

"ওপরটা সব ক্লিয়ার করো! ব্যাটা কোনদিক দিয়ে পালাল দেখ!"

উপর থেকে, অর্থাৎ তিনতলার জানলা দিয়ে টর্চের আলো এসে পড়ল নিচের ঝোপের কিছু অংশে।

বিক্রম সঙ্গে সঙ্গে ঝোপের একদম গভীরে, কাদা আর পচা পাতার স্তূপের মধ্যে নিজেকে সিঁটিয়ে নিল। নিঃশ্বাস বন্ধ করে রাখল সে। টর্চের সাদা আলোটা ওর মাথার মাত্র ফুটচারেক ওপর দিয়ে বারকয়েক ঘুরে গিয়ে আবার ওপরে উঠে গেল।
'বেঁচে গেছি...' ভাবল বিক্রম।

ওর মাথায় তখন একটাই ছক কাজ করছে। এই ঝোপের ভেতরে কিছুক্ষণ চুপচাপ শুয়ে থাকতে হবে। পুলিশ যখন মেইন গেট আর ভেতরটা সার্চ করতে ব্যস্ত থাকবে, তখন আস্তে আস্তে দেওয়াল টপকে সোজা বাইপাসের উল্টো দিকের সার্ভিস রোডে উঠতে হবে। সেখান থেকে কোনো অ্যাপ-ক্যাব কিংবা লিফট নিয়ে সল্টলেকের ফ্ল্যাটে চলে যাওয়া যাবে। কাল সকালে বাবা যখন জানতে পারবে, ততক্ষণে সব আইনি ব্যবস্থা হয়ে যাবে।


কিন্তু বিক্রম হিসেব করতে ভুল করেছিল।
সে ভেবেছিল পুলিশ টিমটা শুধু সামনের গেট দিয়ে রেড করতে এসেছে। সে জানত না, পুলিশ এই ক্লাবের চারপাশ ঘিরে ফেলেছে।

ঝোপের ভেজা মাটিতে পেট ঠেকিয়ে বিক্রম যখন ইঞ্চি ইঞ্চি করে পেছনের সীমানা দেওয়ালের দিকে সরছিল, ঠিক তখনই ওর খুব কাছে, মাত্র কয়েক গজ দূরে শুকনো পাতার ওপর ভারী বুটের শব্দ পাওয়া গেল।

"এদিকটা সার্ভিস এরিয়া। পেছনের জানলা দিয়ে কেউ স্লাইড করে নামতে পারে। লাইটটা নিয়ে এসো তো।"

কথাটা শুনেই বিক্রমের হৃদপিণ্ডের গতি যেন থমকে গেল।

সে আরও চেপে বসল ঝোপের কাদায়। প্যান্টের ভেতর আইফোনটা ভাইব্রেট করে উঠল, কিন্তু সে হাত বাড়াতে পারল না।

কাদাজলে ওর ব্র্যান্ডেড ট্রাউজার ভিজে ঢোল হয়ে গেছে। গালে যেখানটায় কাঁটার আঁচড় লেগেছিল সে জায়গাটা কেটে গিয়ে জ্বালা করছে। কিন্তু এখন ব্যথার চেয়েও বড় হয়ে উঠেছে ভয়ের অনুভূতিটা।

দু-জন পুলিশ কনস্টেবল টর্চের চওড়া আলো ফেলতে ফেলতে এগোচ্ছে ঝোপের দিকে। আলোর বৃত্তটা এদিক-ওদিক ঘুরছে।

একটা সাদা আলো সোজা এসে পড়ল বিক্রমের মাথার ওপরের বোগেনভিলিয়া ডালটায়।

"ওদিকে কিছু আছে নাকি?"

"না স্যর, জঞ্জাল আর কাদা... দাঁড়া, ওই ড্রামটার পেছনটা একবার দেখি।"

বিক্রম নিজেকে আর ধরে রাখতে পারল না। নেশার চোটে এমনিতেই স্নায়ুর ওপর নিয়ন্ত্রণ কমে এসেছিল, তার ওপর পুলিশের গলার আওয়াজ এত কাছে শুনে ওর ভেতরের প্যানিকটা মাথা চাড়া দিয়ে উঠল। সে যদি চুপচাপ শুয়ে থাকত, হয়তো অন্ধকারের সুবাদে ছাড় পেয়েও যেতে পারত। কিন্তু ভয়ের চোটে সে ভুলটা করে বসল।

সোজা হয়ে দাঁড়ানোর জন্য সে যেই না কনুইয়ে ভর দিয়ে একটু উঠতে গেল, অমনি পাশে থাকা এক গাদা শুকনো মরা ডাল মটমট করে ভেঙে গেল।

"কোথাও কেউ একটা আছে! এই যে! কে ওখানে? বেরোও!"

টর্চের আলোটা এক মুহূর্তের মধ্যে এসে স্থির হলো বিক্রমের ভেজা, কাদা-মাখা মুখের ওপর।
আলোর তীব্রতায় বিক্রম চোখ দুটো কুঁচকে ফেলল। হাত দিয়ে মুখ ঢাকার চেষ্টা করল সে।

"হ্যান্ডস আপ! নড়বে না একদম!"

কাদা থেকে ঝেড়ে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করতেই বিক্রমের পা পিছলে গেল। 

ততক্ষণে ঝোপের আড়াল ঠেলে দু-জন রিভলভার উঁচানো সার্জেন্ট আর চারজন লাঠিধারী কনস্টেবল বেরিয়ে এসেছে।

"ওরে বাবা! এ তো সেই স্যুটের মালটা রে! ঝোপের ভেতর লুকিয়ে আছে!"

একজন সার্জেন্ট চেঁচিয়ে উঠল।

"নো! ডোন্ট টাচ মি! ইউ নো হু আই অ্যাম? তোদের সাহস কী করে হয়?" 

বিক্রম একজন সার্জেন্টের দিকে আঙুল উঁচিয়ে তারস্বরে চেঁচিয়ে উঠল। তার গলার রগগুলো ফুলে উঠেছে। 

"তোরা জানিস আমি কে? আমি বিক্রম মালহোত্রা! রজনীশ মালহোত্রার ছেলে! এক মিনিটে তোদের সবার ইউনিফর্ম খুলিয়ে রাস্তায় দাঁড় করিয়ে দেব! ড্যাম ইট!"

"শাট আপ বাস্টার্ড! তোর বাপের নাম ভাঙানো আজ রাতে বের করে দিচ্ছি!"

উত্তরে বিক্রম এক কনস্টেবলের জামার কলার আঁকড়ে ধরে তাকে ঠেলে ফেলে দেওয়ার চেষ্টা করল।

কিন্তু এটা ওর বাবার চাটুকারদের জায়গা নয়।

পরের মুহূর্তেই একটা মোটা কাঠের লাঠি সোজা এসে পড়ল বিক্রমের উরুর পেশিতে।

"আআআহ্!"

একটা আর্তনাদ করে হাঁটু মুড়ে কাদাতেই বসে পড়ল সে।

"বাপের নাম ভাঙাচ্ছিস? অনেক ক্ষ্যামতা না? চল, থানায় চল, তোর বাপের নামটাও ডায়েরিতে তুলছি!"

দ্বিতীয় লাঠির বাড়িটা পড়ল ওর পিঠের ওপর। 

বিক্রমের দামি শার্টের বাঁ দিকটা ছিঁড়ে কাদার সাথে এক হয়ে গেল। একজন কনস্টেবল বিক্রমের কলার ধরে হ্যাঁচকা টানে ওকে কাদা থেকে তুলে দাঁড় করাল।

বিক্রমের মাথার ভেতরটা তখন যন্ত্রণায় ভোঁ-ভোঁ করছে। গালে লাগা রক্ত আর কাদা মিশে চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে। যে আক্রোশ এতক্ষণ ওর রগে রগে ছুটছিল, লাঠির মারের চোটে বেলুনের মতো ফুটো হয়ে হাওয়ায় মিলিয়ে গেল।

ওর হাত দুটোকে জোর করে পেছনের দিকে টেনে এনে কষে চেপে বসল ইস্পাতের ঠাণ্ডা হাতকড়াটা।

'ক্লিক।'

শব্দটা বিক্রমের কানের কাছে খুব স্পষ্ট শোনাল।

"হাঁটো! সোজা হাঁট!"

পেছন থেকে কলার আর চুল ধরে একটা বিশ্রী ধাক্কা দেওয়া হলো। বাইপাসের ধার ঘেঁষে দাঁড় করানো লাল-নীল আলো জ্বলা পুলিশের ভ্যানের দিকে টেনে নিয়ে যাওয়া হতে লাগল বিক্রমকে।

যে বিক্রম মালহোত্রা আধ ঘণ্টা আগেও একটা মেয়ের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলছিল, শহরের একটা দামি ক্লাবে বসে ক্ষমতার দম্ভ দেখাচ্ছিল, সে এখন কাদা মাখা জামাকাপড়ে, হাঁটুতে রক্ত নিয়ে, কলার ধরে টেনে নিয়ে যাওয়া একটা অপরাধী ছাড়া আর কিছুই নয়।

বিক্রম মাথা নিচু করার চেষ্টা করল, কিন্তু সার্জেন্টের কড়া হাতের মুঠো ওর ঘাড়টা শক্ত করে সোজা সামনের দিকে ধরে রাখল।

গাড়ির পেছনের খাঁচার মতো দরজাটা দড়াম করে খুলে গেল। আর বিক্রমকে ভেতরে ছুঁড়ে ফেলার মতো করে ধাক্কা মেরে তুলে দেওয়া হলো। 

ভেতরের লোহা র মেঝেয় কপাল ঠুকে যেতেই বিক্রম এক পলকের জন্য মেধার চোখের সেই আতঙ্কিত রূপটা মনে করতে পারল, যা সে একটু আগেও ওই তিনতলার ভিআইপি স্যুটে রেখে এসেছে। পার্থক্য শুধু একটাই, তখন মেধা কাদায় পড়েছিল, আর এখন কাদা বিক্রমের নিজের মুখে।
[+] 4 users Like RockyKabir's post
Like Reply
১৫

সার্ভিস এক্সিটের সরু, স্যাঁতসেঁতে গলিটায় আলো প্রায় পৌঁছোয় না বললেই চলে। গলিটা চওড়ায় বড়জোর চার ফুট হবে।

গলির বাঁকটা ঘুরতেই দৃশ্যটা অয়নের চোখে পড়ল।

মাথার ওপরে থাকা মাত্র একটা হলুদ বাল্ব থেকে ম্লান, টিমটিমে আলো ঠিকরে পড়ছে। সেই আলোয় অয়ন দেখল হলুদ ইটের দেওয়ালটার সাথে একটা মেয়েকে গায়ের জোরে চেপে ধরে তাকে চুমু খাওয়ার চেষ্টা করছে লম্বা চওড়া চেহারার একটা ছেলে। 

মেয়েটা পাগলের মতো মাথা ঝাঁকাচ্ছে, নিজের সমস্ত শক্তি দিয়ে ছেলেটার বুকটা ঠেলে তাকে দূরে সরিয়ে নিজেকে ছাড়ানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছে। কিন্তু, পিঠটা দেয়ালে লেপ্টে থাকা অবস্থার কারণে সে নড়চড়া করতে পারছে না। তাছাড়া, শক্তির লড়াইয়ে সে ছেলেটার কাছে বারবার হেরে যাচ্ছে। 

অয়ন চোখের পলক ফেলতে ভুলে গেল।

চন্দ্রিমা সেন ! 

কখন এল ? 

একে তো ও একবারের জন্যও ডান্স ফ্লোরে দেখেনি।

এই মুহূর্তে চন্দ্রিমাকে কলেজের 'কুইন বি' মনে হচ্ছে না। তার পরনে থাকা ডার্ক সি-গ্রিন কালারের ককটেল ড্রেসটার একপাশের সরু সিল্কের স্ট্র্যাপ ছিঁড়ে গেছে। ধস্তাধস্তির ফলে দামি পোশাকটায় বেশ কয়েকটা কুৎসিত টান ধরা দাগ। তার বাঁদিকের কাঁধ আর বুকের উপরিভাগের মসৃণ, ফর্সা ত্বক এখন অনাবৃত আর উন্মুক্ত ক্লিভেজে ঘামের বিন্দু এতদূর থেকেও স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। ড্রেসের নিচের অংশটা ঊরু অবধি উঠে গেছে আর ফর্সা চামড়ায় লালচে দাগ।

"ছাড়... ছাড় আমাকে রোহিত ! লেট মি গো ! ইউ ব্লাডি বাস্টার্ড!" 

চন্দ্রিমা ফুঁসে ওঠার চেষ্টা করল, কিন্তু আতঙ্কে ওর গলার স্বর কেঁপে উঠছে।

ছেলেটা, রোহিত, তার মুখের খুব কাছে নিজের মুখটা নিয়ে গিয়ে হাসছিল। চন্দ্রিমার ছটফটানিটাকে সে তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করছিল। ঠিক যেভাবে একটা হিংস্র প্রাণী কোণঠাসা শিকারের ছটফটানি উপভোগ করে সেইরকম।

তার একটা হাত চন্দ্রিমার হাত দুটোকে দেওয়ালে খামচে ধরে আছে আর অন্য হাতটা দিয়ে সে চন্দ্রিমার মুখটা দেওয়ালে চেপে ধরেছে।

"সেদিন পার্কিং লটে খুব দেমাগ দেখাচ্ছিলি না ?" 

রোহিতের গলার স্বরে মদের প্রভাব স্পষ্ট। 

"আমাকে ল্যাম্পপোস্ট বলিস? অবজেক্ট বলিস? আজ তোকে আমি নর্দমায় টেনে আনব মাগী! এই নোংরা গলিটা তোর জন্য পারফেক্ট!"

বলতে বলতে রোহিত নিজের মুখটা চন্দ্রিমার খোলা নগ্ন কাঁধ আর ঘাড়ের খাঁজে নামিয়ে আনার চেষ্টা করল। সে এর আগেই অসভ্যের মতো চন্দ্রিমার ককটেল ড্রেসের পাতলা স্ট্র্যাপটা একটানে ছিঁড়ে দিয়েছে। 

চন্দ্রিমার ছটফটানি বেড়ে গেল। ঘেন্নায় আর আতঙ্কে সে জোর করে নিজের মুখটা অন্যদিকে ঘোরাতে গেল। তার চোখ ছলছল করছে, সেখানে রাগ আর যন্ত্রণার ছাপ, সে দাঁতে দাঁত চেপে সে চেষ্টা করে যাচ্ছে মুখটা অন্যদিকে ঘুরিয়ে রাখতে। কিন্তু রোহিত শক্ত হাতে তাকে স্থির ভাবে ধরে রাখল।

"অসভ্য শুয়োরের বাচ্চা! রোহিত, আই উইল কিল ইউ !" 

চন্দ্রিমা চিৎকার করে উঠল। চিৎকার না বলে আর্তনাদ বলাই ভাল, তাতে রাগের বদলে কান্নার সুর। চন্দ্রিমা আসলে বাঁচতে চাইছিল। কিন্তু, এই নির্জন জায়গায় সেটা শোনবার মতো কেউ ছিল না।

"আরে এত নখরা দেখাস না তো! কলেজে তো খুব গ্ল্যামার কুইন সেজে থাকিস, আজ তোর কত দম সেটা চেখে- "

রোহিতের কথাটা শেষ হলো না।

ধপ!

ভোঁতা ভারী কিছু একটা ঘাড়ে এসে পড়লে যেমন একটা চাপা শব্দ হয়। ঠিক তেমনই একটা শব্দ চন্দ্রিমার কানে এলো। পরমুহূর্তেই সে টের পেল, তার মুখ আর হাতের ওপর রোহিতের চেপে ধরা হাতটা আর নেই।


রোহিত কিছু বুঝে ওঠার আগেই অয়ন নিঃশব্দে এগিয়ে এসে তার কলারের পিছনটা বাঁ হাতে শক্ত করে ধরে এক হেঁচকায় ওকে চন্দ্রিমার ওপর থেকে তুলে নিয়ে পেছনের দেয়ালটায় আছাড় মারল।

রোহিতের পিঠ ছিল অয়নের দিকে। সে ঘুণাক্ষরেও টের পায়নি পেছনের অন্ধকারের ভেতর থেকে তার দিকে কে ধেয়ে আসছে।

"উফফ .... এত বড় সাহস! তুই কে রে মাদারচোদ?" 

রোহিত দেওয়ালে পিঠ ঘষে কোনমতে সোজা হওয়ার চেষ্টা করতে করতে অয়নকে গালি দিল।

"তুই জানিস আমি কে? আমি স্টুডেন্ট কাউন্সিলের ইনার মেম্বার ... বিক্রমের লোক! আমি তোকে আর তোর গোটা বংশকে জেল খাটাব!"

রোহিতের মুখ থেকে 'স্টুডেন্ট কাউন্সিল' শব্দটা বেরোনো মাত্রই অয়নের মস্তিষ্কের সবকটা সার্কিট একসাথে শর্ট করে গেল।

'স্টুডেন্ট কাউন্সিল'!

সিধু তাহলে মিথ্যে বলেনি। স্টুডেন্ট কাউন্সিলের একজন কোর মেম্বার সত্যিই পার্টিতে এসেছে। শুধু আসল মাস্টারমাইন্ড নিজে না এসে চ্যালাদের পাঠিয়েছে।

নিমেষের মধ্যে অয়নের চোখের সামনে ভেসে উঠল বিক্রম মালহোত্রার সেইদিনের ফাটা ঠোঁটের শয়তানি হাসি। তার সাথে পরপর ভেসে উঠল সেদিনের ফেস্টের রাতের ঘটনা, তার মায়ের হাতের সেই সপাটে চড় আর প্রিন্সিপালের অফিসে বসে থাকা বিক্রমের সেই ভণ্ড মুখখানা।

এইসব কুত্তার বাচ্ছারা কী বাবার টাকা, পাওয়ারের দম্ভে যা ইচ্ছা তাই করে বেড়াবে? যাকে ইচ্ছা তার জীবন ছারখার করে দেবে? বাকিরা শুধু তাদের জুতো চেটে যাবে?

সেদিন ও বিক্রমকে তার অপরাধের উপযুক্ত শাস্তি দিতে পারেনি। উল্টে তার বদলে সে বাকি পৃথিবীর কাছে অপরাধী হয়ে উঠেছে। তার জীবনটা তছনছ করে দিয়ে, বিক্রম তার হাতের নাগালের বাইরে চলে গেছে। তার নিজের মা পর্যন্ত তাকে ত্যাগ করেছে।

বিক্রমের উপর তার জমে থাকা সব ঘৃণা আর প্রতিশোধের আগুন সোজা এসে রোহিতের ওপর
আছড়ে পড়ল।

তবে আজকে সে নিজের উপর থেকে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলল না। আফটারঅল, সেদিনের অয়ন আর আজকের অয়নের মধ্যে অনেক তফাত।

অয়ন অস্ফুটে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ওর চোয়ালের পেশিগুলো পাথরের মতো শক্ত হয়ে উঠেছে।

"বিক্রম এখানে নেই..." অয়নের গলার স্বরটা বরফের চেয়েও ঠান্ডা শোনাল,
"কিন্তু তুই তো আছিস।"

কথাটা বলে অয়ন একটুও সময় নষ্ট করল না। ও রোহিতের চুলটা ওপরের দিকে তুলে এক টানে ওকে সোজা করে দাঁড় করাল, তারপর নিজের ডান হাঁটুটা তুলে সোজাসুজি রোহিতের পেটে ভরে দিল।

আঃ!

রোহিত হাত-পা ছেড়ে দিয়ে কুকুরের মতো কোঁকাতে কোঁকাতে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। কিন্তু অয়ন থামল না। ও রোহিতের লেদার জ্যাকেটের কলার ধরে টেনে ওকে আবার তুলল, আর তারপর পরপর ওর ডান চোয়ালে দুটো ঘুঁষি বসিয়ে দিল।

১৬

এদিকে চন্দ্রিমা দেওয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে ধুঁকছিল। তার ড্রেস ছেঁড়া, অনাবৃত বুকটা ঘন ঘন ওঠানামা করছে, সে ড্রেসের ছেঁড়া স্ট্র্যাপটা বাঁ হাতে বুকের কাছে চেপে ধরে হাঁপাচ্ছে।

এক মুহূর্তের জন্য তার মনে হয়েছিল বুঝি সে জ্ঞান হারিয়ে ফেলবে। কিন্তু হঠাৎ করে রোহিতের ভারী শরীরটা ওর উপর থেকে সরে যাওয়া আর তারপর দেওয়ালে আছাড় খাওয়ার ভারী শব্দ শুনে সে চমকে চোখ খুলল।

তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে একটা খুব পরিচিত মূর্তি। অল্প আলোয় তাকে দেখে চন্দ্রিমার চোখের মণি বিস্ময়ে বড় বড় হয়ে গেল।

অয়ন চ্যাটার্জী !

অয়নের পরনে একটা কালো টার্টলনেক সোয়েটার আর ডার্ক জিন্স। সোয়েটারের হাতা কনুই অবধি গোটানো, যার ফলে তার হাতগুলোর পেশি আর রগগুলো টানটান হয়ে বাইরে বেরিয়ে এসেছে। 

এই নিভৃত, নির্জন গলির ভেতর অয়ন যে হঠাৎ এভাবে উদয় হয়ে তাকে উদ্ধার করবে চন্দ্রিমা তা স্বপ্নেও ভাবেনি। যে রোহিত একটু আগে চন্দ্রিমার ওপর জোর খাটাচ্ছিল, তাকে নোংরা হুমকি দিচ্ছিল, সে এখন মাটিতে পড়ে কাতরাচ্ছে!

চন্দ্রিমা এক সেকেন্ডের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল।

ফেস্টের রাতে অয়ন কেন বিক্রমকে মেরেছিল সেটা ও জানে না। কিন্তু, বিদিশা যখন অয়নকে চড় মারলেন তখন ও সেখানেই উপস্থিত ছিল।

কাকতালীয় ভাবে চন্দ্রিমা না জানলেও সে আজ বিদিশার জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। শুধু বিক্রমের জায়গা নিয়েছে রোহিত। দুজনেই স্টুডেন্ট কাউন্সিলের সদস্য। দুজনেই অয়নের হাতে শাস্তি পাচ্ছে।

চন্দ্রিমা কিন্তু বিদিশার পথে হাঁটল না। মুহূর্তের নীরবতা ভেঙে সে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে উঠল, অয়নের পক্ষ নিয়ে।

"মারো ! আরো মারো, অয়ন!"

রোহিতকে ওভাবে মার খেতে দেখে চন্দ্রিমার চোখে-মুখে পৈশাচিক আনন্দ ফুটে উঠেছে। ঠোঁটের কোণে উন্মাদ হাসি। সে হাত দিয়ে ছেঁড়া ড্রেসটা কোনরকমে নিজের অনাবৃত সুডৌল স্তনের ভাঁজের উপর চেপে ধরে অয়নের দিকে একধাপ এগিয়ে এল।

"এই শুয়োরের বাচ্চাটার মুখটা চুরমার করে দাও অয়ন! কাল থেকে যেন এ আর কারোর দিকে মুখ তুলে তাকাতে না পারে!"

রোহিত তখন মাটিতে পড়ে হাঁপাচ্ছে। ঠোঁট কেটে রক্ত চিবুক বেয়ে নিচে গড়িয়ে পড়ছে। তার উঠে দাঁড়ানোর ইচ্ছা বা সাহস কোনটাই নেই।

তার ডান চোখের ওপরের চামড়া কেটে রক্ত চিবুক বেয়ে নিচে গড়িয়ে পড়ছে, ওপরের পাটির একটা দাঁত ভেঙে রক্তের সাথে মুখে জমা হয়েছে। সে উঠতে পারছে না। সে হাত উঁচিয়ে আত্মরক্ষার চেষ্টা করল, তার গলায় এবার কোন দম্ভ নেই, তার বদলে আছে আতঙ্ক।

"প্লি... প্লিজ... ছেড়ে দে ভাই... আমি... আমি তোকে অনেক টাকা দেব... তুই জানিস না... আমার বাবা..." 

রোহিত তোতলে উঠল।

অয়ন উত্তর দিল না।

"অয়ন... প্লিজ... কিল হিম!"

ওপাশ থেকে চন্দ্রিমার আবেদন অয়ন কানে তুলল না। সে কোনমতেই পাগলামি করবে না। নিজের উপর কন্ট্রোল হারানো আর পরাজয় এক জিনিস।

সে একদম স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। 

চন্দ্রিমা তখনও উত্তেজনায় ধুঁকছে, তার চোখে রোহিতকে ধ্বংস হতে দেখার প্রবল বাসনা। কিন্তু অয়ন সেদিকে কান দিল না। অন্ধ আক্রোশ আর রাগের মাথায় মারপিট করে নিজের জীবনটা ও ইতিমধ্যেই একবার ঝালাপালা করেছে; একই ভুলের পুনরাবৃত্তি করার মতো মনস্তত্ত্ব ওর মধ্যে কাজ করে না। 

এটাকে মেরে হাত-পা ভেঙে দিলে কাল সকালে হয় একটা পুলিশ কেস হবে। সেখানে ভিকটিম হয়ে উঠবে রোহিত, আর অপরাধী সাব্যস্ত হবে অয়ন।

চালবাজি কীভাবে সামলাতে হয়, বিক্রম সেটা অয়নকে নির্মমভাবে শিখিয়ে দিয়েছে।

অয়ন ধীর পায়ে রোহিতের একদম কাছে এগোল। তারপর পকেট থেকে নিজের স্মার্টফোনটা বার করে ভিডিও ক্যামেরা অন করল। ফোনের ফ্ল্যাশলাইটের এক ঝলক তীব্র সাদা আলো গিয়ে পড়ল রোহিতের রক্তাক্ত, ফুলে ওঠা মুখের ওপর। আকস্মিক আলোর তীব্রতায় রোহিত চোখ বুজে গালি দিতে যেতেই অয়ন ওর হাঁটুতে বুটের শক্ত সোল দিয়ে একটা মোচড় দিল।
"আআআআহ!" গলার নলনালী ফেটে যাওয়ার মতো একটা বুকফাটা চিৎকার করে উঠল রোহিত।

"চুপ," অয়ন ভিডিও রেকর্ডিং চালু রেখেই বরফশীতল গলায় বলল। 

"একদম চুপ। একটা ডেসিবলও যদি বাড়ে, তোর হাঁটুটা আজকের পর থেকে আর সোজা হবে না।"

রোহিত যন্ত্রণা আর আতঙ্কে কাঁপতে কাঁপতে অয়নের দিকে চাইল। ফ্ল্যাশের আলোয় অয়নের চোখ দুটো একদম স্থির, ঠাণ্ডা, আবেগহীন। মণিদুটোয় এতটুকু নড়চড়া ছিল না। সেদিকে তাকিয়ে রোহিতের শিরদাঁড়া দিয়ে একটা হিমশীতল স্রোত নেমে গেল।

অয়ন ফোনটা রোহিতের চোখের সামনে ধরে ক্যামেরা অ্যাঙ্গেলটা একটু ঠিক করে নিল, যাতে রোহিতের রক্তাক্ত মুখ, ছেঁড়া জামা আর পেছনের হলদেটে ইটের দেওয়ালটা পরিষ্কার ফ্রেমে আসে।

"বল।" 

অয়ন একদম মেপে মেপে বলল, "তোর পুরো নাম কী, কোন কলেজে পড়িস, কলেজে তোর পোস্ট কী আর এই মাত্র তুই চন্দ্রিমা সেনের সাথে কী করছিলি?"

"তু-তুই... তুই কী বলছিস? আমি এসব... উফফ!" 

রোহিত অস্বীকার করার চেষ্টা করতেই অয়ন বাঁ হাতের এক আঙুলে রোহিতের কাটা ঠোঁটের ওপর আলতো চাপ দিল। যন্ত্রণায় রোহিত কুকড়ে গেল।

"আমার ধৈর্যের একটা লিমিট আছে রোহিত," অয়ন ফিসফিস করে বলল, 

"ভিডিওতে পুরো সত্যিটা বলবি, নাকি আমি এই গলিটা থেকেই তোর বডিটা বাইরে পাঠাব? বিশ্বাস কর, কেউ তোকে বাঁচাতে আসবে না।"

রোহিতের চোখের ভেতরের শেষ প্রতিরোধটুকু সম্পূর্ণ নিভে গেল। 

রোহিত হাঁপাতে হাঁপাতে, ভাঙা দাঁতের ফাঁক দিয়ে জমে থাকা রক্ত আর লালা থুতু করে ফেলে ধুঁকতে ধুঁকতে বলতে শুরু করল, "আ-আমি রোহিত রাজ... ইমপেরিয়াল কলেজের স্টুডেন্ট ... স্টুডেন্ট কাউন্সিলের মেম্বার..."

"তারপর ?" 

অয়ন ফোনের ক্যামেরাটা ওর মুখের আরও কাছে আনল।

"আমি... আমি নিউ ইয়ার্সের পার্টিতে চন্দ্রিমা সেনকে ফলো করে এখানে এসেছিলাম," রোহিত যন্ত্রণায় চোখ বন্ধ করে ফেলল, তার গলায় স্বর এখন প্রায় শোনা যাচ্ছে না। 

"আমি... আমি ওকে ফোর্স করে... চুমু খাওয়ার আর মলেস্ট করার চেষ্টা করছিলাম... ওর জামা ছিঁড়ে দিয়েছি... আই ওয়াজ ট্রাইং টু... অ্যাসল্ট হার..."

"কারোর নির্দেশে? নাকি তোর নিজস্ব কুকীর্তি?" 

অয়ন প্রশ্ন ছুঁড়ল।

"না না! কেউ কিছু বলেনি! আমি... আগের দিন পার্কিং লটের অপমানের শোধ নিতে চাইছিলাম এটা আমার প্ল্যান ছিল... আই অ্যাম সরি! প্লিজ, ভিডিওটা বন্ধ কর..." 

রোহিত ডুকরে কেঁদে উঠল।

অয়ন ভিডিও রেকর্ডিং বন্ধ করল না। সে বাঁ হাত বাড়িয়ে চন্দ্রিমাকে ইশারা করল,

"এদিকে এসো।"

চন্দ্রিমা দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়িয়েছিল। উত্তেজনা আর আতঙ্কের রেশ পুরোপুরি কাটেনি। অয়নের ডাকে সে দ্বিধাগ্রস্ত পায়ে এগিয়ে এল। 

ডার্ক সি-গ্রিন ড্রেসের ছেঁড়া অংশটা সে তখনও বাঁ হাত দিয়ে বুকের ওপর চেপে ধরে রেখেছে।

"ক্যামেরার দিকে তাকাও," অয়ন শান্ত গলায় বলল।

চন্দ্রিমা ভিডিওর ফ্রেমে এল। ফোনের কড়া আলোয় তার অনাবৃত কাঁধের লালচে ছোপ, ছেঁড়া পোশাক, আর চোখেমেখে থাকা আতঙ্ক ও ক্ষোভ পরিষ্কার ফুটে উঠল।

অয়ন বলল, "চন্দ্রিমা, ভিডিওতে স্পষ্ট করে বলো, এই মাত্র রোহিত বিরুদ্ধে যা যা বলল, তা সত্যি কি না ? আর তুমি এর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা বা কলেজ অথরিটির কাছে যাওয়ার অধিকার রাখো কি না?"

চন্দ্রিমা এক মুহূর্ত অয়নের মুখের দিকে তাকাল। অয়নের চোখে কোনো কৌতূহল নেই, কোনো সহানুভূতি দেখানোর চেষ্টা নেই। সে বুঝতে পারল, অয়ন শুধু তাকে বাঁচায়নি, যাতে ভবিষ্যতে ওরা কোন ঝামেলার মুখে না পড়ে, সেজন্য আইনি অস্ত্রও ওর হাতে তুলে দিচ্ছে। চন্দ্রিমা ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে চিবুক শক্ত করল। তার গলার কম্পন কেটে গিয়ে সেখানে ফিরে এল সেন বাড়ির মেয়ের পরিচিত তেজ।

"হ্যাঁ।" 

চন্দ্রিমা স্পষ্ট গলায় বলল, 

"রোহিত রাজ আমার অমতে আমাকে ফলো করে ওয়াশরুম অবধি এসেছে। তারপর গায়ের জোরে আমাকে এই নির্জন গলিতে টেনে এনে আমাকে মলেস্ট করার চেষ্টা করেছে। অয়ন সময়মতো না এলে রোহিত আমার সর্বনাশ করত। এই ভিডিওটা আমার বয়ান, আর আমি ওর বিরুদ্ধে যেকোন স্টেপ নেওয়ার অধিকার রাখছি।"

অয়ন ভিডিও রেকর্ডিং স্টপ করল। ফাইলটা সেভ করে সাথে সাথে নিজের ক্লাউড ড্রাইভ আর একটা এনক্রিপ্টেড ফোল্ডারে ব্যাকআপ পাঠিয়ে দিল। পুরো প্রক্রিয়াটা করতে ওর সময় লাগল মাত্র কুড়ি সেকেন্ড।
তারপর সে ফোনটা পকেটে রেখে রোহিতের দিকে তাকাল। রোহিত তখন মাটিতে একদম নিস্তেজ হয়ে পড়ে আছে, চোখ দুটো জলে চিকচিক করছে।

"শোন রোহিত," 

অয়ন হাঁটু গেড়ে বসে রোহিতের কানের কাছে মুখ নিয়ে গেল,

"এই ভিডিওর একটা কপি আমার ক্লাউড ড্রাইভে অলরেডি সেভ হয়ে গেছে। যদি পুলিশের কাছে যাস বা আমার পেছনে তোর কোনো লোক লাগে তবে এই ভিডিও ক্লিপটা সোজা সবকটা মিডিয়া চ্যানেল আর সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে পৌঁছে যাবে।

কেউ তোকে বাঁচাতে পারবে না। তুই নিজেই নিজের জীবন আর স্টুডেন্ট কেরিয়ার শেষ করবি। বুঝলি?"

রোহিত কোনোমতে মাথা নাড়াল। এবার ওর চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়তে শুরু করল।

"গুড। যা, এখান থেকে ভাগ। পেছনে ফিরে তাকাবি না।"

অয়ন উঠে দাঁড়াল। রোহিত কোনোমতে হাতের ওপর ভর দিয়ে, দেয়ালে ঠেস দিয়ে খসে পড়া পুতুলের মতো টলতে টলতে গলির উল্টো দিকের অন্ধকার মুখটার দিকে হাঁটা দিল। ওর প্যান্টে ধুলো, জামার কলারে রক্তের ছিটে; কিন্তু সবচেয়ে বড় কথা, ওর সমস্ত দম্ভ ততক্ষণে নর্দমার জলে ভেসে গেছে।

গলিটায় এখন শুধু দুজন অবশিষ্ট। হলুদ আলোয় অয়ন আর চন্দ্রিমা।

অয়ন নিজের পরনের কালো লেদার জ্যাকেটটা গা থেকে খুলে নিল। ভেতরের কালো টার্টলনেক সোয়েটারে ওর শারীরিক গঠন আর সুগঠিত ছাতি স্পষ্ট। সে জ্যাকেটটা চন্দ্রিমার দিকে বাড়িয়ে দিল।

"এটা পরে নাও। বাইরে অনেক লোক আছে, এই অবস্থায় বেরোনো যাবে না।"

চন্দ্রিমা অয়নের দিকে তাকাল। যে অয়নকে সে এতদিন মেজাজী আর অহংকারী ভেবে এসেছে।তার এই শান্ত দায়িত্ববোধটা ওকে স্তব্ধ করে দিল। চন্দ্রিমা কাঁপতে কাাঁপতে জ্যাকেটটা নিল এবং গায়ে জড়িয়ে জিপারটা গলা পর্যন্ত টেনে দিল। জ্যাকেটের ভেতর থেকে অয়নের গায়ের একটা মৃদু, উষ্ণ গন্ধ ভেসে আসছে।

"থ্যাঙ্ক ইউ..." চন্দ্রিমা খুব নরম সুরে বলল। 

অয়ন কোনো উত্তর দিল না। সে শুধু একবার গলির বাইরের দিকে তাকাল, তারপর খুব সাধারণ গলায় বলল, "পেছনের গেট দিয়ে বেরিয়ে যাও। আজকের পর রোহিত আর তোমার সামনে আসার সাহস পাবে না।"

কথাটা শেষ করে অয়ন ঘুরে ওয়াশরুমের দিকে হেঁটে চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়াল। কিন্তু চন্দ্রিমা আজ কিছুতেই তাকে এভাবে যেতে দেবে না।

"অয়ন!"

চন্দ্রিমা দৌড়ে এসে পেছন থেকে অয়নের হাতটা ধরে ফেলল। অয়নের রক্তমাখা ঠান্ডা হাতটার স্পর্শে চন্দ্রিমার শরীরের ভেতর দিয়ে এক বিদ্যুতের ঝটকা বয়ে গেল। সে এক ঝটকায় অয়নকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে আনল।

ওর সি-গ্রিন ড্রেসের বাঁদিকের অংশটা পুরোটাই ছেঁড়া, তার সুডৌল বাঁ স্তনের অর্ধেকটা ব্লাউজের মতোই উন্মুক্ত হয়ে বাইরে বেরিয়ে আসছে, ফর্সা কাঁধে লালচে আঙুলের দাগ। চুলগুলো উস্কোখুস্কো হয়ে মুখের ওপর পড়ে আছে, চোখে গাঢ় কাজলের কালো দাগ গাল বেয়ে নেমে এসেছে।

কিন্তু তার চোখে না আছে লজ্জা আর না আছে কোন দ্বিধা। সে একদৃষ্টে অয়নের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।

"তুমি ভাবছ আমি তোমাকে থ্যাংক ইউ বলব, তাই না অয়ন চ্যাটার্জী ?"  

বলতে বলতে চন্দ্রিমা এক পা এগিয়ে এল। তার গলার স্বরটা কাঁপা কাঁপা। 

অয়ন ভুরু কুঁচকে ওর দিকে তাকাল। 

"হাতটা ছাড়ো, চন্দ্রিমা।"

"ছাড়ব না!"

চন্দ্রিমা প্রায় আর্তনাদ করে উঠল। সে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না।

সে এক ঝটকায় এগিয়ে এসে নিজের দুটো ফর্সা, মসৃণ হাত অয়নের ঘাড়ের দু-পাশে ছুঁড়ে দিল। তার উন্মুক্ত বুক সজোরে অয়নের শক্ত, চওড়া ছাতির ওপর এসে আছড়ে পড়ল। 

অয়ন চন্দ্রিমাকে ঠেলে সরিয়ে দেওয়ার জন্য হাত বাড়াতে গেল, "চন্দ্রিমা, ছেড়ে দাও- "

কিন্তু কথা শেষ করার সুযোগ চন্দ্রিমা দিল না। চন্দ্রিমা নিজের পা উঁচিয়ে, অয়নের ঘাড়টা দু-হাতে শক্ত করে নিজের দিকে টেনে আনল।

তারপর সরাসরি অয়নের ঠোঁটের ওপর নিজের উষ্ণ ঠোঁট দুটো সজোরে চেপে ধরল।

চোখের নিমেষে পুরো ঘটনাটা ঘটে গেল। আচমকা এই আক্রমণে অয়ন এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল।

চন্দ্রিমার ঠোঁট দুটো যখন ওর ঠোঁটের ওপর আছড়ে পড়ল, অয়নের শরীরটা রিফ্লেক্স অ্যাকশনে এক মুহূর্তের জন্য পাথরের মতো শক্ত হয়ে গেল।

চন্দ্রিমা শান্তভাবে চুমু খাচ্ছিল না, ওর ঠোঁটে এক চরম তৃষ্ণা ছিল। যেন সে বহুদিন ধরে এই দিনটার জন্য অপেক্ষা করছিল।

চন্দ্রিমা নিজের দাঁত দিয়ে অয়নের নিচের ঠোঁটের ফাটা অংশটা আলতো করে কামড়ে ধরল। অয়ন একটা অস্ফুট শব্দ করতেই, চন্দ্রিমা তার জিভটা অয়নের মুখের ভেতর চালান করে দিল। সে অত্যন্ত আগ্রাসীভাবে, পাগলের মতো অয়নের মুখের ভেতরের স্বাদ চেটেপুটে নিতে লাগল।

"উফফ... অয়ন..." 

চুমুর ফাঁকেই চন্দ্রিমার মুখ দিয়ে এক আকুল গোঙানি বেরিয়ে এল।

তার দুটো হাত অয়নের ঘন চুলে ঢুকে গেল। সে অয়নের মাথাটা নিজের দিকে চেপে ধরে রাখল, যেন একবিন্দু দূরত্বও তাদের মাঝে না থাকে। 

চন্দ্রিমার ছেঁড়া ড্রেসের কাপড়টা সরতে সরতে তার সম্পূর্ণ উন্মুক্ত স্তনের উষ্ণতা অয়নের সোয়েটার ভেদ করে যেন তার বুকের চামড়ায় এসে বিঁধছিল।

অয়ন প্রথমে চন্দ্রিমাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিতে চেয়েছিল। তার শক্ত হাত দুটো চন্দ্রিমার কোমর খামচে ধরেছিল ওকে ঠেলে দেওয়ার জন্য। কিন্তু চন্দ্রিমার আত্মসমর্পণ, তার শরীরের অতল উত্তাপ আর এই নিস্তব্ধ গলির পরিবেশ অয়নের ভেতরের অবশিষ্ট সংযমটুকু আলগা করে দিল।

অয়ন চ্যাটার্জী কোনো সাধু নয়। সে একজন রক্ত-মাংসের ১৯ বছরের যুবক, তার ভেতরে যথেষ্ট ক্ষিদে আছে। তার পক্ষে কী দিনের পর দিন শরীরের চাহিদা অগ্রাহ্য করা সম্ভব ?

অয়ন ঠেলে সরিয়ে দেওয়ার বদলে চন্দ্রিমার সরু কোমরটা নিজের দুটো হাতের মুঠোয় শক্ত করে পেঁচিয়ে ধরল।

তার আঙুলগুলো চন্দ্রিমার পাছার নরম মাংসে গেঁথে গেল।

অয়ন নিজের কোমরটা এক ঝটকায় এগিয়ে এনে চন্দ্রিমাকে সোজা পেছনের দেওয়ালে আবার চেপে ধরল। 

কামনার পুরুষ তাকে দেওয়ালে গেঁথে ফেলতে চন্দ্রিমা সুখে চোখ বন্ধ করে ফেলল।

"আহ্..."

একটু আগে রোহিত ঠিক এভাবেই ওকে দেওয়ালে পিন করেছিল। চন্দ্রিমার রিঅ্যাকশন ছিল ঠিক এর উল্টো।

অয়ন এবার চন্দ্রিমার ঠোঁট দুটোকে নিজের আয়ত্তে নিয়ে নিল। সে কোনো দয়া দেখাল না। অয়ন চন্দ্রিমার নরম ঠোঁট দুটোকে চুষতে আর কামড়াতে শুরু করল। চন্দ্রিমা যন্ত্রণায় আর সুখে আঁকুপাঁকু করে উঠল।

অয়নের একটা হাত চন্দ্রিমার কোমর থেকে উঠে এসে তার পিঠের খোলা অংশের ওপর দিয়ে বোলাতে বোলাতে তার ছেঁড়া ড্রেসের সিল্কের প্রান্ত ধরে এক টানে আরও খানিকটা নামিয়ে দিল।

চন্দ্রিমার নিটোল, ফর্সা স্তন দুটি এখন অয়নের উন্মুক্ত হাতের ছোঁয়ায় এসে পড়ল। অয়ন নিজের রুক্ষ, ছড়ে যাওয়া শক্ত আঙুলগুলো দিয়ে চন্দ্রিমার স্তনের ভারী মাংস খামচে ধরল।

"উফফ... অয়ন! ইয়েস... টেক মি!" 

চন্দ্রিমা অয়নের ঘাড়ে নিজের নখ বসিয়ে দিয়ে ফিসফিস করে উঠল। তার শ্বাস-প্রশ্বাস তখন প্রচণ্ড দ্রুত, চোখ দুটো সুখে আর উত্তেজনায় বুজে আসছে।

অয়ন, চন্দ্রিমার ফর্সা গলার উন্মুক্ত চামড়ায় নিজের দাঁত বসাল। অয়নের প্রতিটি কামড়ে, প্রতিটি স্পর্শে ভালোবাসার বদলে তীব্র ক্ষিদে আর অধিকারবোধটাই স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। তবে তাতে চন্দ্রিমার কোন আপত্তি ছিল না।

সে অস্ফুট স্বরে কঁকিয়ে উঠল, "উম্মম... অয়ন..."

১৭

গলির মুখে, ছায়ার আড়ালে লুকিয়ে ছিল বৈশালী। ওর দু-হাতে দামী ড্রেসের কুঁচিগুলো শক্ত করে চেপে ধরা। 

চিৎকার শুনে অয়ন ছুটে যাবার পরে ও অয়নকে পেছন পেছন ধাওয়া করে এই নির্জন গলির মুখে এসে দাঁড়িয়েছিল। 

সে ভেবেছিল, অয়ন হয়তো কোনো ঝামেলায় জড়িয়ে পড়তে চলেছে। 

কিন্তু, তারপর যা যা ঘটল, তা দেখতে বৈশালী মানসিকভাবে বিন্দুমাত্র প্রস্তুত ছিল না। অয়ন কীভাবে একটা সিনিয়র ছেলেকে পিটিয়ে দিল। ওই মেয়েটা কীভাবে ওকে উস্কানি দিল।

আর তারপর...

তারপরের দৃশ্যটা বৈশালীর বুকের ভেতর যেন এক বালতি ফুটন্ত অ্যাসিড ঢেলে দিল!

ওরা দুজনে এখন গভীর চুম্বনে আবদ্ধ!

বৈশালীর মনে হল ওর বুকের ভেতরটা যেন কেউ একটা ধারালো ছুরি দিয়ে ফালাফালা করে কেটে দিচ্ছে। তীব্র ইর্ষা, বিষাক্ত হিংসা আর চূড়ান্ত অপমানের এক বিকৃত মিশ্রণ ওর তলপেট থেকে উঠে এসে ওর গলা অবধি সবটুকু আঁকড়ে ধরল। 

রাগে বৈশালী তার নিচের ঠোঁটখানা সজোরে চেপে ধরল। বৈশালী নিজের ডান হাতের লম্বা নখগুলো ড্রেসে খামচে ধরল। ওর নখগুলো দেবে গিয়ে ড্রেস ছিঁড়ে যাওয়ার উপক্রম হলো।

যে অয়ন চ্যাটার্জী একদিন ওকে আবর্জনার মতো নিজের ঘর থেকে ছুড়ে ফেলে দিয়েছে। এক সপ্তাহ আগেই পরশুদিন প্র্যাকটিস গ্রাউন্ডের মেটাল ফেন্সিংয়ে বৈশালীকে কুত্তির মতো থাবড়েছে। সেই আজ এই মেয়েটার সামনে একজন হিরোর মতো দাঁড়িয়ে আছে! আর মেয়েটা তাকে উপহার হিসেবে নিজের শরীর সঁপে দিচ্ছে!

"ইউ ব্লাডি বাস্টার্ড..."
[+] 3 users Like RockyKabir's post
Like Reply




Users browsing this thread: 4 Guest(s)