Thread Rating:
  • 72 Vote(s) - 2.81 Average
  • 1
  • 2
  • 3
  • 4
  • 5
Erotic Thriller মরীচিকা ও মোহময়ী
(21-08-2026, 10:30 PM)All IS WELL Wrote: দাদা আপনার আপডেট দেরির কারণে কাহিনীর হাইপে যথেষ্ট প্রভাব পড়ছে। একটা আপডেটের পর আমাদের তিন সপ্তাহের বেশি অপেক্ষা করতে হয়।যদি আপডেট আগের মতো অন্তত সাপ্তাহিক হতো তবুও বেশ running লাগত।এখন যেন সেই আগের টোন টা হারিয়ে গেছে । জানি আপনি লেখাতে অনেক সময় দেন তবে বলছি আপনি একসাথে পুরো আপডেট না দিয়ে  একটি একট করে 5দিন বা 7দিনের গ্যাপ ছোট করে ভেঙে আপডেট গুলো পোস্ট করুন।তাতে আমাদের এত দীর্ঘ অপেক্ষা করতে হবে না আর কাহিনীটা ডিসকনটিনিউ মনে হবে না। আমার মতে  লম্বা গ্যাপের পর একসাথে অনেকগুলো আপডেটের চেয়ে কম সময়ের ব্যবধানে ছোট বা মাঝারি আপডেট বেশি প্রেফারেবল। এটা যেমন ব্রেকফাস্ট,লাঞ্চ না করে রাতে একসাথে পুরো দিনের খবর খাওয়া। আর মাঝের সময়গুলোতে আপনি কিছু ai post করতে পারেন। ভেবে দেখবেন ব্যাপারটা।

আমি তো শখ করে আপডেটের সময়সীমা বাড়িয়ে দিইনি, কিছু রিডারের ফালতু সমালোচনার কারণে রেগে গিয়ে ওটা করেছিলাম। কিন্তু, আগের মতো আপডেট দেওয়া সত্যিই সমস্যার, তখন চরিত্রের সংখ্যা কম ছিল। এখন অনেক চরিত্র, তাই চ্যাপ্টারের সাইজ বড় হবেই। 

সিন নিয়ে চিন্তা করা, ডায়লগ সাজানো, রিসার্চ করা এসবে আমার যথেষ্ট সময় যায়। তার উপর আছে এডিটিং। এক টানা লেখা সম্ভব নয়, মানসিক ক্লান্তি আসে। তাছাড়া, আমার পার্সোনাল লাইফ বলে তো কিছু আছে নাকি ? সেটা এই গল্পের আশেপাশে revolve করে না।

এখনো এই চ্যাপ্টারের তিনটে সিন লেখা বাকি। আমি দুটো সিন বাদ দিয়ে বাকি চ্যাপ্টারটা কালকেই পোস্ট করে দেব। তার পরের আপডেটের জন্য কী করা যায় ?

আমি দুটো প্রস্তাব করছি, তুমি বেছে নাও। আমি এআই ব্যবহার শুরু করি ? সাতদিন কেন, পাঁচদিনে হয়ে যাবে। আর না হলে ছয় মাসের ব্রেক নিচ্ছি; অনেকটা লেখা হয়ে গেলে তারপর ফিরে এসে প্রতি সপ্তাহে আপডেট দেব। তুমি চিন্তা করে জানাও।
[+] 1 user Likes RockyKabir's post
Like Reply
Do not mention / post any under age /rape content. If found Please use REPORT button.
না ভাই গল্পটা ভাল দুই একজন থাকবেই জারা সমালোচনা করে, দেখবে তারা ভালতেও সমালোচনা করে মন্দতেও। ভাই তুমি লিখ জারা পিওর পাঠক তারা উপভোগ করছে, তুমি থামিও না তোমার মত করে লিখ সপ্তাহে না পারলে ২ সপ্তাহে আপডেট দিও। কেই না থাকলেও তোমার গল্পের পাঠক একজন আমি আছি। গল্পটা প্রথম জখন পড়া শুরু করেছিলাম মনে করেছি ইনচেস্ট গল্প হবে কিন্তু এখনও কিছু বুঝতে পারতেছি না, তুমি চালিয়ে জাও ভাই আমরা সকলে আছি তোমার সাথে।
[+] 1 user Likes সমাপ্তি's post
Like Reply
গল্পটা প্রথম থেকেই বেশ প্রমিজিং ছিলো। কিন্তু পরবর্তীতে নতুন অতিরিক্ত কিছু চরিত্র + তাদেরকে ঘিরে প্লট গল্পের মূল থিমে প্রভাব ফেলছে। যার দরুন মেইন স্টোরিলাইন ধীরে এগোচ্ছে। এখন তাই লেখককে অনেক ভেবেচিন্তে, পরিকল্পনা মাফিক সব চরিত্রের কথা মাথায় রেখে লিখতে হচ্ছে। কিন্তু পাঠকদের বরাবরই ধৈর্য কম। আমার মতো অনেক পাঠকেই দিনশেষে প্লটের অতিরিক্ত বিন্যাস ও আপডেট না পেয়ে সংকায় ভুগছেন।
[+] 1 user Likes rakib6192522's post
Like Reply
(22-08-2026, 11:08 PM)rakib6192522 Wrote: গল্পটা প্রথম থেকেই বেশ প্রমিজিং ছিলো। কিন্তু পরবর্তীতে নতুন অতিরিক্ত কিছু চরিত্র + তাদেরকে ঘিরে প্লট গল্পের মূল থিমে প্রভাব ফেলছে। যার দরুন মেইন স্টোরিলাইন ধীরে এগোচ্ছে।  এখন তাই লেখককে অনেক ভেবেচিন্তে,  পরিকল্পনা মাফিক সব চরিত্রের কথা মাথায় রেখে লিখতে হচ্ছে।  কিন্তু পাঠকদের বরাবরই ধৈর্য কম। আমার মতো অনেক পাঠকেই দিনশেষে প্লটের অতিরিক্ত বিন্যাস ও আপডেট  না পেয়ে সংকায় ভুগছেন।

বুঝতে পারছি, বেশিরভাগ পাঠকের চাহিদা হচ্ছে শুধু মা-ছেলের সেক্স। কিন্তু, এই গল্পটা যে শুধু ইনসেস্ট নিয়ে নয় সেটা তো আমি একশোবার বলেছি। এই অবস্থায় দুটো করণীয় থাকে, এক হল গল্প লেখা বন্ধ করে দেওয়া আর দুই হল পাঠকদের পাত্তা না দিয়ে নিজে যা ঠিক করেছি সেটাই লিখে যাওয়া। আমি দ্বিতীয়টাই করব। যার পড়ার হবে সে পড়বে আর যে পড়তে চাইবে না সে পড়বে না।
[+] 5 users Like RockyKabir's post
Like Reply
অধ্যায় ২৭

১

২৭শে ডিসেম্বর, সকাল পৌনে সাতটা।

কলেজের স্পোর্টস কমপ্লেক্সের বিশাল কাঁচের জানলা দিয়ে ডিসেম্বরের কুয়াশাচ্ছন্ন সকালের আবছা আলো এসে জিমের ম্যাটে ছড়িয়ে পড়েছে। বাইরে তাপমাত্রা প্রায় এগারো ডিগ্রি; শীতের সকালে জিম একদম ফাঁকা। 

কেবল ওপাশে কোণের দিক থেকে ভারী মেটালিক প্লেট ওঠানামার ধাতব ঠনঠন শব্দ আসছে।কলেজের দু-একজন সিনিয়র অ্যাথলিট স্কোয়াট মারছে।

গা গরম করার জন্য, কয়েকটা ড্রিল সেরে নিয়ে নিজের হুডিটা খুলে পাশের বেঞ্চে রাখল অয়ন। শরীর গরম হয়ে ওঠায় শীতের অনুভূতিটা আর আগের মতো তীব্র লাগছে না। 

হুডিটা ছাড়তেই ডার্ক ব্ল্যাক কম্প্রেশন টি-শার্টের নিচে অয়নের পিঠ আর বুকের মাসল লাইনগুলো স্পষ্ট হয়ে উঠল। শরীরে কোথাও বাড়তি মেদের কোন চিহ্ন নেই, প্রতিটা পেশি সুস্পষ্ট। ভারী বডিবিল্ডারের মতো নয়, বরং একজন অ্যাথলিটের মতো; ছিপছিপে অথচ মাসক্যুলার।

চওড়া কাঁধ থেকে ভি-শেপে নেমে আসা পিঠের ল্যাটস আর বুক ও পেটের আপার মাসলের ভাঁজগুলো টি-শার্টের টানটান কাপড়ের ওপর থেকেই বোঝা যাচ্ছে। 

রুটিন মেনে হাল্কা স্ট্রেচিং শুরু করতেই অয়নের মাথায় কাল রাতে দোজোতে মিঃ প্রধানের সাথে হওয়া কথাগুলো ঘুরপাক খেতে শুরু করল...

[ফ্ল্যাশব্যাক]

দোজোর সেই আবছা আলো-ছায়াময় নিস্তব্ধ পরিবেশ। হলঘরের কাঠের মেঝেতে ম্যাটের উপর বসে মিস্টার প্রধান শান্ত গলায় অয়নকে বোঝাচ্ছিলেন, 

"অয়ন, কালকে মাঠে ফুটবল খেলার সময় টার্নিং নেওয়ার সময় তোমার নিজের বডি ব্যালেন্স কেন আগের চেয়ে স্টেডি মনে হচ্ছিল জানো?

তোমার মস্তিষ্ক আর পেশির যুগলবন্দি ঠিকঠাক কাজ করতে শুরু করেছে। স্পোর্টস সায়েন্সের ভাষায় একে নিউরোমাসকুলার কো-অর্ডিনেশন বলে।

তোমার কোমর আর মেরুদণ্ডের ভারসাম্য একদম ঠিকঠাক থাকায় 'সেন্টার অফ গ্র্যাভিটি' বা শরীরের ভরকেন্দ্র এক চুলও নড়েনি। এটা এখানে মার্শাল আর্টের সেন্টার্ড স্ট্যান্স আর ব্যাক স্টেপিং প্র্যাকটিসের ফল।

কিন্তু তোমার ফুটওয়ার্ক যতই ভালো হোক না কেন, কমব্যাট সিচুয়েশন আর হাই-ইন্টেনসিটি ফুটবল ম্যাচ শুধু এই দিয়ে জেতা যায় না। 

তোমার রিফ্লেক্স তৈরি হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু মন শরীরের মুভমেন্টের সাথে পুরোপুরি এক না হলে যখনই তুমি হাই-স্পিডে ডিরেকশন চেঞ্জ করবে, মন সামান্য হলেও এক মুহূর্তের জন্য পিছিয়ে পড়বে।

এই অল্প কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানটাই কিন্তু একজন সাধারণ প্লেয়ার আর একজন এলিট অ্যাথলিটের মধ্যে তফাৎ গড়ে দেয়।"

মিস্টার প্রধান অল্প একটু থেমে অয়নের দিকে তাকালেন। তার চোখে গভীর অভিজ্ঞতার ছাপ।

"শরীরের শক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য মনকে স্থির করা প্রয়োজন। কাল ড্রিল শুরুর আগে নিজের শ্বাস-প্রশ্বাসকে পায়ের তলদেশ পর্যন্ত অনুভব করার চেষ্টা করবে। ফোকাসটা পেশিতে নয়, তোমার কোর আর গ্রাউন্ডের সংযোগস্থলে রাখবে

আর হ্যাঁ, জিমে গিয়ে ভারী ওজন তুলে শুধু মাসল বাড়িয়ে কোন লাভ নেই। তোমার দরকার ফাংশনাল স্ট্রেন্থ আর এক্সপ্লোসিভ পাওয়ার।

কাইনেটিক চেইন বজায় রাখতে রেজিস্ট্যান্স ব্যান্ড নিয়ে ইনটেনসিটি ফাংশনাল ট্রেনিং কর আর উইং চুং স্ট্যান্স প্র্যাকটিস কর।

দেখবে, তোমার স্ট্যামিনা আর পাওয়ার ট্রান্সফার ক্যাপাসিটি ডাবল হয়ে যাবে।"

মিঃ প্রধানের কথা মাথায় রেখেই অয়ন ব্যায়াম শুরু করল।

দেখতে দেখতেই কুড়িটা মিনিট কেটে গেল, একের পর এক ড্রিল করতে করতে ওর শ্বাসের গতি দ্রুত হল, ঘামে ভিজে কালো টি-শার্টটা ওর গায়ে লেপ্টে গেল, টি-শার্টের ওপর দিয়ে বুকের চওড়া ছাতি আর পেটের টোনড পেশি স্পষ্ট হয়ে উঠল। ওর পাঁজরে আর ব্যথা নেই, নয়তো বিপত্তি হতে পারত।

নিজের শেষ সেটটা ফিনিশ করে অয়ন তোয়ালে দিয়ে ঘাড়ের ঘাম মুছতে যাবে, ঠিক এমন সময় পেছনের দিক থেকে পর পর কতকগুলো ভারী, মেটালিক ইমপ্যাক্টের শব্দ ভেসে এল!

ঠাস! ঠাস! থাব!

ঘাড়ের তোয়ালেটা দিয়ে মুখের ঘাম মুছতে মুছতে ঘুরে দাঁড়াল অয়ন।

শব্দগুলো জিমের একদম শেষপ্রান্ত থেকে আসছে। 

ইমপ্যাক্টের তীব্রতা এত বেশি যে প্রতিটা আঘাতের সাথে সাথে ভারী পাঞ্চিং ব্যাগটা রিংয়ের সাথে বাঁধা লোহার চেন সমেত সশব্দে কেঁপে উঠছে!

এটা কোন অ্যামেচারের কাজ নয়।

অয়ন হাতের তোয়ালেটা কাঁধে ফেলে ভ্রূ কুঁচকে লোহার চেনের খড়খড় শব্দটা লক্ষ্য করে এগোলো।

জিমের পেছনের অংশটা আলাদা করে তৈরি করা। এখানে মেঝেতে প্রফেশনাল ব্ল্যাক অ্যান্ড রেড কিকবক্সিং ম্যাট পাতা আর উপর থেকে ঝুলছে ভারী তিনখানা সিন্থেটিক লেদার ব্যাগ।

'কিকবক্সিং জোন।'

সেখানে পৌঁছে অয়ন কয়েক মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল।

সুরঙ্গনা ব্যানার্জী !

তার পরনে হলুদ রঙের স্পোর্টস ব্রা আর ধূসর রঙের জিম টাইটস।

ঘামে ভেজা আঁটসাঁট স্পোর্টস ব্রার মধ্য থেকে ওনার সুডৌল স্তন আর নির্মেদ উন্মুক্ত পেট স্পষ্ট ফুটে উঠেছে। টানটান সুদৃঢ় জিম টাইটসের টানে ওনার নিতম্ব আর সুগঠিত উরুর একদম অনাবৃত দেখাচ্ছে।

সুরঙ্গনার চুল চাবুকের মতো শক্ত করে মাথার ওপর হাই-পনিটেল করা। ঘামে ভেজা কয়েকটা অবাধ্য চুলের গোছা ওনার কপালে আর গালের পাশে সেঁটে আছে। পেশাদার কিকবক্সারদের মতোই ওনার দু-হাতে নিখুঁত পেশাদার কায়দায় বাঁধা লাল রঙের 'রিং-সাইড হ্যান্ড-র‍্যাপস'।

ফিজিক্স ক্লাসের গ্ল্যামারাস শাড়ি, ম্যাচিং স্লিভলেস ব্লাউজ আর হাই হিল পড়া প্রফেসরের আড়ালে যে এমন এক মারাত্মক অ্যাথলেটিক ফিগার লুকিয়ে আছে তা অয়ন স্বপ্নেও কল্পনা করেনি!

দেখতে দেখতেই সুরঙ্গনার ডান পা-টা চাবুকের মতো শূন্যে ঘুরে গিয়ে পাঞ্চিং ব্যাগের ঠিক মাঝখানে আছড়ে পড়ল। 

ইমপ্যাক্টের সাথে সাথে ব্যাগটা প্রায় পঁয়তাল্লিশ ডিগ্রি কোণে পেছনের দিকে হেলে গেল। পরমুহূর্তেই একটুও না পিছিয়ে নিখুঁত লেফট-হুক আর ফায়ার্স রাইট-স্ট্রেট পাঞ্চ!

ঠাস! ঠাস!

সুরঙ্গনার এক্সপ্লোসিভ পাওয়ার, রোটেশন, ফুটওয়ার্ক, টাইমিং আর স্পিড কোন প্রফেশনাল কিকবক্সারের চেয়ে এক চুলও কম নয়।

মারের ধরণটাই বলে দিচ্ছে, দীর্ঘদিনের প্র্যাকটিসের ফল। তার প্রতিটা মুভমেন্ট মিঃ প্রধানের বলা 'কাইনেটিক চেইন'-এর প্রত্যক্ষ প্রমাণ, পায়ের পাতা থেকে শক্তি উৎপন্ন হয়ে কোমর ঘুরে সরাসরি ছিটকে হাতের মুঠো দিয়ে বের হচ্ছে।

আঘাত থামাতেই জিমের সেই অংশে আবার আগের নিস্তব্ধতা ফিরে এল, শুধু সুরঙ্গনার শ্বাসের শব্দ ছাড়া।

নিজের হাই-কিক কম্বিনেশন শেষ করে সুরঙ্গনা পাঞ্চিং ব্যাগটাকে একহাতে ধরে স্থির করলেন।

তারপর, কপাল থেকে ঘেমে যাওয়া ভেজা চুলগুলো আলতো করে পেছনে সরালেন।

সুরঙ্গনা বুক ভরে ঘন ঘন শ্বাস নিচ্ছিলেন। 

টাইট ভেস্টের নিচে ওনার ভারী বুকের ওঠানামা, গোটা শরীরে জমে থাকা পুঁতির মতো স্বচ্ছ ঘামের বিন্দু আর গালের হালকা রক্তিম আভার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে অয়নের মনে হল এই রুমের তাপমাত্রা আগের চেয়ে হঠাৎ করেই অনেকটা বেড়ে গেছে।

"কি ব্যাপার মিঃ চ্যাটার্জী ?

একমাস ধরে ক্লাসে বাঙ্ক মেরে, এখন জিমেও প্রফেসরকে আড়াল থেকে লুকিয়ে লুকিয়ে দেখা হচ্ছে ? এটাকে আমি ডিসিপ্লিনারি অ্যাকশনের মধ্যে ফেলতে পারি।"

তার গলায় সেই আবেদনময়ী হাস্কি কন্ঠস্বর। কথাটা যে তিনি সিরিয়াস টোনে বলেননি সেটা তার ঠোঁটে চেনা, ফ্লার্টি হাসিটা দেখেই বোঝা যাচ্ছিল।

হাঁ করে তাকিয়ে থাকতে থাকতে অয়ন খেয়ালই করেনি, কখন সুরঙ্গনার নজর ওর ওপর এসে পড়েছে।

নিজেকে দ্রুত সামলে নিয়ে সে দ্রুত জবাব দিল, 

"না ম্যাম। আপনার কিকিং ফোর্সের ইমপ্যাক্ট সাউন্ড শুনে এদিকে তাকাতে বাধ্য হলাম। ইউ হ্যাভ আ ভেরি স্ট্রং অ্যান্ড পারফেক্ট ফুটওয়ার্ক।"

সুরঙ্গনার ডান দিকের সরু ভুরুটা সামান্য ওপরের দিকে উঠে গেল। সাথে সাথেই তার মুখে একটা মিটমিটে হাসি ফুটে উঠল।

"তাই নাকি ?"

সুরঙ্গনা আরেক পা এগিয়ে এলেন। 

এক সেকেন্ডের জন্য সুরঙ্গনার উন্মুক্ত পেটের দিকে চোখটা আটকে যেতেই অয়ন দ্রুত নিজেকে সামলে নিল। ওনার শরীর থেকে একটা উগ্র, অদ্ভুত মিষ্টি গন্ধ ভেসে আসছে।

গন্ধটা অয়নের নাকের ভেতর দিয়ে সোজা মস্তিষ্কে গিয়ে ধাক্কা মারল। কেমন যেন একটা মাতাল করা অনুভূতি।

"সো দ্য ব্যাড বয় অফ ফিজিক্স ডিপার্টমেন্ট ইজ অলসো আ স্পোর্টস ক্রিটিক? বাহ্!"

সুরঙ্গনার ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসির রেখাটা আরও একটু স্পষ্ট হয়ে উঠল। 

তিনি হাতের লাল হ্যান্ড-র‍্যাপসের বাঁধনটা ধীরে ধীরে আলগা করতে করতে অয়নের একদম মুখোমুখি এসে দাঁড়ালেন। ওনার শরীর থেকে নির্গত হওয়া সেই সুবাস আর তীব্র উত্তাপ দুটোই অয়ন এখন খুব কাছ থেকে অনুভব করতে পারছে।

সুরঙ্গনার দৃষ্টি এবার অয়নের টানটান টি-শার্টের ওপর দিয়ে নেমে এসে ওর চওড়া কাঁধ, ছাতি আর টানটান ভি-শেপ ল্যাটসের ওপর গিয়ে থামল। 

"নট ব্যাড, নট ব্যাড অ্যাট অল।" 

হালকা গলায় বললেন সুরঙ্গনা।

"ক্লাসে চুপচাপ থাকা ছেলেটার শার্টের নিচে যে এতটা ডেডিকেশন লুকিয়ে আছে, তা বাইরে থেকে দেখে বোঝার উপায় নেই, মিঃ চ্যাটার্জী।"

অয়ন নিজেকে শান্ত রাখার চেষ্টা করল। সুরঙ্গনার খোলামেলা প্রশংসা আর তার শরীরি উপস্থিতির ফলে ওর মনের ভেতরে তৈরি হওয়া অস্থিরতাটুকু সে বাইরে বিন্দুমাত্র ফুটে বেরোতে দিল না।

"থ্যাঙ্কস ,ম্যাম। ফুটবলের জন্য ফিটনেস ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করছিলাম, প্র্যাকটিস না রাখলে শরীর বসে যায়।" 

অয়ন সহজ গলায় বলল।

একহাতে আলতো করে নিজের চুলের হাই-পনিটেলটা ছুঁয়ে আবার বাঁধনটা শক্ত করে নিয়ে একটু হেসে সুরঙ্গনা অয়নের চোখের দিকে সোজা তাকালেন। 

"তাই... শুধুই কি দূর থেকে অন্যের টেকনিক স্ক্যান করা অভ্যাস, নাকি কোন বাস্তব ব্যবহার আছে? 
সত্যি করে বলো তো, তুমি কী কোন কমব্যাট স্পোর্টস প্র্যাকটিস কর ?"

অয়ন এক মুহূর্ত ইতস্তত করল। 

নিজের ব্যাকগ্রাউন্ডের কথা সবটা খুলে বলা অনাবশ্যক।

সে সামান্য মাথা নেড়ে কায়দা করে বলল, 

"আর্ট অফ কমব্যাটের একটা বইয়ে পড়েছিলাম ম্যাম আর ক্লাসে ফিজিক্সের ফোর্সের ভেক্টর ভেলোসিটি তো আপনিই পড়ান। সেটাই মনে মনে মেলাচ্ছিলাম।"

সুরঙ্গনার ঠোঁটের কোণের হাসিটা এবার আরও প্রসারিত হলো। তিনি হাতের হ্যান্ড-র‍্যাপস দুটো একটা কাঠের বেঞ্চের ওপর ছুঁড়ে ফেলে জিমের কোণে রাখা মেটাল র‍্যাকের দিকে এগিয়ে গেলেন। সেখান থেকে এক জোড়া প্রফেশনাল, থিক লেদার গ্রিপের ফোকাস মিট আর থাই-প্যাড তুলে নিলেন।

"ফিজিক্সকে প্র্যাকটিক্যাল কমব্যাটে মেলানো? বেশ তো!" 

সুরঙ্গনা হঠাতই ঘুরে অয়নের দিকে মিটজোড়া দুটো ছুঁড়ে দিলেন।

অয়ন কুইক রিফ্লেক্সে ডানহাত বাড়িয়ে শূন্যেই ওদুটো অনায়াসে ক্যাচ ধরল।

"প্যাড দুটো হাতে গলে সোজা হয়ে দাঁড়াও তো চ্যাটার্জী। আমাকে পনেরো মিনিট ওয়ান-টু কম্বিনেশন আর হাই-মিডল কিক স্পারিংয়ের জন্য কুশন দাও। দেখি তোমার ফিজিক্সের লজিক কতটা গ্রাউন্ডে কাজ করে! ক্যান ইউ হ্যান্ডেল দ্যাট? নাকি পিছু হটবে?"

সুরঙ্গনা হয়তো ধরে নিয়েছিলেন, একজন ফার্স্ট ইয়ারের সাধারণ ছাত্র হয়তো পিছু হটবে। 

কিন্তু অয়ন বিন্দুমাত্র দ্বিধা করল না।

সে হাতের ফোকাস মিট দুটো নিখুঁত কায়দায় দুই কবজিতে গলিয়ে নিল। শক্ত করে স্ট্র্যাপগুলো টেনে বেঁধে নিয়ে, সে নিজের পা দুটো সামান্য চওড়া করে, হাঁটু আলতো বাঁকিয়ে, সোজা স্পাইন ধরে একটা নিখুঁত, 'কিকবক্সিং বেস' তৈরি করে দাঁড়াল। ওর সেন্টার অফ গ্র্যাভিটি এক ধাক্কায় নিচে নেমে মাটির সাথে সেঁটে গেল।

"আই অ্যাম রেডি, ম্যাম।" অয়নের গলা নিচু, কিন্তু ধাতব পাতের মতো ভারী ও স্থির।

অয়নের এতটা কনফিডেন্স দেখে মনে মনে সুরঙ্গনা বেশ কিছুটা অবাকই হলেন।

"স্মার্ট অ্যাস!" 

সুরঙ্গনা আলতো করে একটা শীতল হাসি উপহার দিয়ে আচমকা কোনো ওয়ার্নিং ছাড়াই সোজা অয়নের মুখের সামনে থাকা মিট লক্ষ্য করে এক মারাত্মক 'লেফট-জ্যাব' মারলেন!

ঠাস!

সুরঙ্গনা আশা করেছিলেন, কোনো প্রস্তুতি ছাড়া হুট করে আসা এই দ্রুত গতির জ্যাবের ইমপ্যাক্টে অয়ন অন্তত এক পা পিছিয়ে যাবে। কিন্তু অয়ন এক ইঞ্চিও নড়ল না! 

সুরঙ্গনার মুখের সেই চেনা হাসির রেখাটা একদম অদৃশ্য হয়ে গেল। ওনার চোখ জোড়া সরু হয়ে এল।

তার ভেতর ঘুমিয়ে থাকা একজন ফাইটারের জেদ হঠাৎ করে জেগে উঠল। তিনি এবার নিজের গতি আর শক্তি দুটোই এক ধাক্কায় দ্বিগুণ বাড়িয়ে দিলেন!

লেফট-জ্যাব! রাইট-স্ট্রেট! রাইট-হুক! অ্যান্ড আ ফায়ার্স লেফট মিডল-কিক!

ঠাস! ঠাস! থাব! ঠাস!

সুরঙ্গনার প্রতিটি কিক চাবুকের মতো সপাটে আছড়ে পড়ল। কিকবক্সিং ম্যাটের ওপর ওনার দ্রুত নড়াচড়ার শব্দে চারপাশের পুরো বাতাস যেন গরম হয়ে উঠল। 

কিন্তু, ওনাকে অবাক করে দিয়ে অয়ন অটল রইল।

সে মিস্টার প্রধানের নির্দেশ -'ফোকাসটা পেশিতে নয়, তোমার কোর আর গ্রাউন্ডের সংযোগস্থলে রাখবে'; সম্পূর্ণভাবে মেনে চলছে।

অয়ন সুরঙ্গনার প্রতিটি কিক সঠিক অ্যাঙ্গেল ফলো করে নিজের ফোকাস আর টাইমিং অ্যাডজাস্ট করছে আর পাশাপাশি মিটের পজিশন ঠিক করে নিচ্ছে। 

সুরঙ্গনা এবার সম্পূর্ণ ব্যাক-রোটেশন ব্যবহার করে একটি ঘূর্ণায়মান 'রাউন্ডহাউস কিক' মারলেন অয়নের বামদিকের থাই-প্যাড লক্ষ্য করে!
বোম!

এবার ইমপ্যাক্টের ধাক্কায় অয়নের বাম পা-টা সামান্য পেছনে পিছলে গেলেও সে পড়ে গেল না। চটজলদি নিজের কোর মাসল টাইট করে আবার নিজের স্ট্যান্স সামলে নিল সে।

এভাবে দশ মিনিট চলল। সুরঙ্গনা পনের মিনিট বললেও এর মধ্যেই ওনার স্পোর্টস ব্রা ঘামে ভিজে উঠেছে, কপাল আর বুক বেয়ে গলগল করে ঘামের বিন্দু গড়িয়ে পড়ছে।

এমন সময় হঠাৎ করেই সুরঙ্গনা একটি কিক মারার ভান করে অয়নের ডিফেন্সে ফাঁক তৈরি করলেন। 

অয়ন ভেবেছিল কিক আসবে, তাই সে প্যাডটা সামান্য নিচে নামিয়েছিল, কিন্তু সুরঙ্গনা তা না করে এক ঝটকায় অয়নের অনতিদূরে একদম মুখোমুখি এসে থমকে দাঁড়ালেন!

দুজনের ব্যবধান শূন্যে নেমে এল।

সুরঙ্গনার ঘামে ভেজা অনাবৃত পেট অয়নের ছাতির খুব কাছে। সে তার তীব্র স্পন্দন অনুভব করতে পারছে। 

সুরঙ্গনার হাই-পনিটেল থেকে ছিটকে আসা কয়েকটা ভেজা চুলের গোছা অয়নের খালি ঘাড় আর টি-শার্টের কলারের ওপর আছড়ে পড়ল।

সুরঙ্গনার শরীর থেকে ভেসে আসা সেই মিষ্টি গন্ধ অয়নের রন্ধ্র দিয়ে সোজা মস্তিষ্কে গিয়ে একটা মাতাল করা বিদ্যুৎ তরঙ্গ ছুঁড়ে দিল। 

তার শরীরের রগগুলো মুহূর্তের মধ্যে টানটান হয়ে উঠল। 

সুরঙ্গনা ঘন শ্বাস নিতে নিতে নিজের মাথাটা সামান্য তুললেন। ওনার ভেজা গাল আর লালচে ঠোঁট দুটো অয়নের মুখের একদম কাছে।

সুরঙ্গনা অয়নের কানের কাছে সামান্য ঝুঁকে, অত্যন্ত নিচু গলায় ফিসফিস করে বললেন,

"নট ব্যাড, অয়ন... তোমার স্ট্রাইকিং গ্রিপ আর কোর অ্যালাইনমেন্ট অসম্ভব রকমের ভালো। তুমি তো দেখছি আমায় অবাক করে দিলে!"

ওনার ঠোঁট থেকে বেরিয়ে আসা গরম নিঃশ্বাস অয়নের কানের লতিতে এসে আছড়ে পড়ল। তার মেরুদণ্ড দিয়ে একটা হালকা শিহরণ বয়ে গেল, সে দাঁতে দাঁত চেপে নিজের শ্বাসের গতি স্বাভাবিক রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করল।

সুরঙ্গনা দু-পা পিছিয়ে এসে দুই হাত হাঁটুতে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে গভীর শ্বাস নিতে লাগলেন। 

"হু দ্য হেল আর ইউ, চ্যাটার্জী?" সুরঙ্গনা হাঁফাতে হাঁফাতে বললেন। 

"তোমার এই ইমপ্যাক্ট অ্যাবসরপশন আর সিনক্রোনাইজেশন... এটা কোন ফিজিক্সের বই পড়ে তৈরি হওয়া সম্ভব নয়! তুমি কোথাও মার্শাল আর্ট শেখ, রাইট?"

অয়ন দুই হাত থেকে ফোকাস মিট দুটো খুলে নিয়ে ধীরেসুস্থে পাশের বেঞ্চে নামিয়ে রাখল। তারপর তোয়ালেটা নিয়ে নিজের গলার ঘাম মুছতে মুছতে বলল,

"আপনাকে তো আগেই বললাম ম্যাম, একটু-আধটু অভ্যাস করি। আর আপনিই তো ক্লাসে শিখিয়েছেন, 'এভরি অ্যাকশন হ্যাজ অ্যান ইকুয়াল অ্যান্ড অপোজিট রিয়্যাকশন'। 

একটা ১২০ পাউন্ড ফোর্সের কিক বা পাঞ্চ থামানোর সবচেয়ে সহজ রাস্তা হলো তার ভেক্টরটাকে সরাসরি নিজের বডি দিয়ে গ্রাউন্ডে পাঠিয়ে দেওয়া। রিজিড হলে ভেঙে যাবেন, ফ্লেক্সিবল হলে সারভাইভ করবেন।"

সুরঙ্গনা কয়েক সেকেন্ড অয়নের দিকে হা করে তাকিয়ে রইলেন। তারপর ওনার ঠোঁটের কোণে আবার সেই মনোহারী হাসিটা আবার ফুটে উঠল।


"ফিজিক্সকে এভাবে রিয়েল-লাইফ স্পারিংয়ে অ্যানালাইজ করতে শুধু তুমিই পারো, মিঃ চ্যাটার্জী।" 

সুরঙ্গনা তোয়ালে দিয়ে নিজের মুখ আর কপাল মুছতে মুছতে অয়নের আরও একধাপ কাছাকাছি এলেন।

ওনার ভেজা চুলের সুবাস আবার অয়নের নাকে ধাক্কা মারল। এবার সে গন্ধটা আইডেন্টিফাই করতে পারল। গন্ধটা সুরঙ্গনার চুল থেকে আসছিল।

সুরঙ্গনা তাঁর সেই মাদকতাময়, নিচু গলায় বললেন, 

"তোমার এই 'একটু-আধটু' জ্ঞানটা কিন্তু দারুণ বিপজ্জনক! তবে আমার লাভই হলো... এতদিন এই ছাঁইপাশ ক্যাম্পাসে মনের মতো কোনো প্রফেশনাল স্পারিং পার্টনার পাচ্ছিলাম না। কাল সকালে কী করছ?"

কথাটা বলে সুরঙ্গনা জলের বোতলটা তুলে নিয়ে লম্বা এক চুমুক দিলেন। গলার মসৃণ চামড়া বেয়ে জলের দুটো ফোঁটা গড়িয়ে ওনার ট্রেনিং ভেস্টের খাঁজে হারিয়ে গেল। না চাইতেও অয়নের চোখ সেদিকে চলে গেল।

যাওয়ার জন্য পা বাড়িয়েও সুরঙ্গনা একবার আড়চোখে ঘুরে অয়নের দিকে তাকালেন, ওনার চোখে আবার সেই পরিচিত, ফ্লার্টি ভাব ফিরে এসেছে।

"আমি প্রতিদিন এইসময় জিমে থাকি। পার্টনার হিসেবে তোমার কুশন দেওয়ার ক্ষমতা বেশ চমৎকার। কাল থেকে একদম সময়ে চলে এসো, চ্যাটার্জী। লেট হলে কিন্তু প্র্যাক্টিক্যালের নম্বর কেটে নেব!"

কথাটা শেষ করে হালকা চালে সুরঙ্গনা জিমের লেডিজ রুমের দিকে হেঁটে চলে গেলেন।


অয়ন কিছুক্ষণ নিঃশব্দে সুরঙ্গনার চলে যাওয়া পথের দিকে তাকিয়ে রইল। বাতাসে তখনও সেই মাতাল করা মিষ্টি গন্ধটা ভেসে বেড়াচ্ছে।

অয়নের বুকের ভেতর পেশির স্পন্দন এখনও পুরোপুরি শান্ত হয়নি। ফিজিক্সের লেকচার হলে যে গ্ল্যামারাস প্রফেসরকে সে দেখেছে, আজ এই জিমে তার এই সম্পূর্ণ বিপরীত রূপ অয়নের মনে এক অদ্ভুত টানাপোড়েন তৈরি করে দিয়ে গেল।

প্রফেসর সুরঙ্গনা সুন্দরী, আড়ালে সবাই তাকে সেক্সি ব্যানার্জী বলে ডাকে কিন্তু সবার মতো তিনি কখনো অয়নকে আলাদা আকর্ষিত করেনি।

কিন্তু, আজ জিমে তার রূপ ওর মনে একটা স্থায়ী ছাপ ফেলে দিয়ে গেল।

তবে অয়ন এটাও জানে, কলেজের প্রথম সেমিস্টারের পরীক্ষার ভয়াবহ চাপ, ফুটবল টিমের বেঞ্চ থেকে ফার্স্ট ইলেভেনে ফেরার লড়াই, এই অবস্থায় ফোকাস ধরে রাখাটা ভীষণ দরকার।

মাথা নাড়তে নাড়তে অয়ন তোয়ালেটা কাঁধে ফেলে ডর্মের দিকে পা বাড়াল। কোন অবস্থাতেই সে নিজের ফোকাস হারাতে দেবে না। 

২

২৭শে ডিসেম্বর, সাড়ে পাঁচটা

যোধপুর পার্কের বারো তলার হাই-রাইজ অ্যাপার্টমেন্টের ব্যালকনির কাঁচের স্ল্যাবের ওপারে ডিসেম্বরের শেষ বেলার আবছা আলো। মিহি কুয়াশার চাদর নামতে শুরু করেছে, সাথে ডিসেম্বরের কনকনে ঠাণ্ডা হাওয়ার দাপাদাপি। ব্যালকনি চত্বরটা রিমোট-কন্ট্রোলড থার্মাল ব্লাইন্ডস দিয়ে ঘেরা। হালকা ধূসর মার্বেলের মেঝের উপর পাতা দামি পার্সিয়ান কার্পেটের ওপর বসে আছে বৈশালী।

তার পরনে একটা আলগা, নেভি-ব্লু সিল্কের রেশমি হাউজ-গাউন। কোল্ড-কাট স্লিভের ফাঁক দিয়ে তার মসৃণ কাঁধ উন্মুক্ত, খোলা চুলগুলো কাঁধের ওপর অযত্নে ছড়িয়ে আছে। গাউনের সামনের বেল্টটা আলগা হয়ে বুকের ওপরের গভীর খাঁজটাকে অনাবৃত করে রেখেছে, অথচ সেদিকে তার কোনো খেয়াল নেই।

To be continued...
[+] 4 users Like RockyKabir's post
Like Reply
ডান হাতের লম্বা আঙুল দুটো দিয়ে চেপে ধরা একটা ক্রিস্টালের ফ্লুট গ্লাস, ভেতরে চিল্ড স্পার্কলিং ওয়াইন। গাঢ় গোলাপি তরলে থেকে সূক্ষ্ম বুদ্বুদগুলো অবিরাম উপরে উঠে আসছে। ডান হাতের লম্বা আঙুল দুটো গ্লাসের ডাঁটিটা সে এমন শক্ত করে চেপে ধরেছে যে, নখগুলোর চারপাশ একদম রক্তশূন্য, ধবধবে সাদা দেখাচ্ছে।

বৈশালী আধবোজা চোখে কাঁচের ওপারে বহুদূরে আবছায়া হয়ে আসা সাউথ সিটি টাওয়ারের ঝাপসা রেখার দিকে তাকিয়ে আছে। কিন্তু তার মন সেখানে নেই। তার পুরো শরীর জুড়ে তীব্র অস্বস্তি কাজ করছে।

প্রতিবার যখনই সে সিটে বসার চেষ্টা করছে কিংবা গাউনের পাতলা কাপড়টা তার কোমরের নিচের ত্বকে আলতো করে ঘষা খাচ্ছে, তখনই তার নিতম্ব জুড়ে তীব্র আগুনের ফুলকি জ্বলে উঠছে।

ঠাস! ঠাস!

সেদিনের ওই শব্দগুলো যেন এখনও এই নিস্তব্ধ বাতাসে প্রতিধ্বনি তুলছে। বৈশালী অনিচ্ছাসত্ত্বেও নিজের চোখ দুটো সজোরে বন্ধ করল। 

গতকাল সকালের সেই দৃশ্য। ফাঁকা মাঠ, গ্যালারির ধাতব নেট। অয়নের হিংস্র, দয়ামায়াহীন চোখের চাউনি আর ওর ডেনিম শর্টসের ওপর সশব্দে আছড়ে পড়া হাতের এক একটা থাপ্পড়।

তার রেশমি গাউনের নিচে, নিটোল পাছার চামড়ায় জমে থাকা হালকা লালচে দাগগুলো দপদপ করছে। অয়নের হাতের ছাঁচটা যেন চিরকালের জন্য তার শরীরে খোদাই হয়ে গেছে।

বৈশালী গ্লাসে এক চুমুক দিল। ওয়াইনের তিতকুটে মিষ্টি স্বাদটা তার গলা দিয়ে নামতেই সে নিজের ডান হাতটা শক্ত করে মুঠো পাকালো, লম্বা আঙুলের নখগুলো বসে গিয়ে হাতের চেটোতে লাল দাগ বসে গেলো।

"ওয়াইনটা বেশ ভালো, কিন্তু তোর গেলার স্পিড দেখে মনে হচ্ছে, বাংলা খাচ্ছিস। একটু আস্তে, এত তাড়াতাড়ি মানুষ বিষও খায় না।"

খোঁচাটা শুনে বৈশালী ধীরগতিতে মাথা তুলে জিনিয়ার দিকে মুখ তুলে তাকাল। এক মুহূর্তের জন্য তার দৃষ্টিতে আগুনের ঝলক খেলে গেল।

বৈশালীর উল্টোদিকে পাতা নিচু লেদার কাউচের ওপর গা এলিয়ে বসেছে জিনিয়া আর একটা পা আলতো করে ছড়িয়ে দিয়েছে পাশে থাকা অটোম্যানটার ওপর।

জিনিয়ার পরনে একটা কাট-আউট ফিটেড ক্রপ-টপ আর থাই-হাই স্লিট দেওয়া কালো স্কার্ট। তার আঙুলের ফাঁকে সরু মেভিস স্মোক-সিগারেট থেকে নীলচে ধোঁয়ার রিং উঠছে। জিনিয়ার চোখ দুটো কুঁচকে আছে, তাতে গভীর পর্যবেক্ষণ আর একধরনের শয়তানি মেজাজ।

বৈশালী ফ্ল্যাট গলায় বলল, 

"আমার জ্ঞান শুনতে ইচ্ছে করছে না জিনিয়া। তোর যদি ড্রিঙ্ক করা হয়ে গিয়েছিল থাকে, তা হলে চুপচাপ বসে থাক। নাহলে গেট ইজ দ্যাট ওয়ে। এমনিতেও আমাকে একটু পরে বেরোতে হবে। দেবমাল্য আমার জন্য পার্ক স্ট্রিটের ক্লাবে ওয়েট করবে।"

কথাটা শুনে জিনিয়ার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে তাচ্ছিল্যের হাসি খেলে গেল।

"ওহ, সেই ভোঁদরটা ? যে সবসময় তোর জুতো খোলার জন্য বসে থাকে?"

সে সিগারেটের ছাইটা টেবিলে রাখা ক্রিস্টালের অ্যাসট্রেতে ঝেড়ে শরীরটা একটু সামনের দিকে হেলিয়ে দিল।

জিনিয়ার চোখ দুটো সরু হয়ে এল।

"খুব চিল্লাচ্ছিস, তাই না? পরশুদিন যখন মাঠের গ্যালারির পেছন থেকে টলতে টলতে বেরিয়ে এলি, তখন তোর একটা ছবি তুলে রাখা উচিত ছিল।

সেদিন প্র্যাকটিস গ্রাউন্ডের গ্যালারির ফেন্সিংয়ের কাছে অতক্ষণ ধরে অয়ন তোকে নিউ ইয়ার্সের জন্য কী গিফট দিচ্ছিল সেটা একবার দেখাবি না?"

কথাটা শোনা মাত্রই বৈশালী সটান সোজা হয়ে বসল। গ্লাসের তরলটুকু এক ঝটকায় কার্পেটের ওপর ছিটকে পড়ল। তার মুখটা মুহূর্তের মধ্যে রক্তবর্ণ রূপ ধারণ করল। 

"শাট আপ জিনিয়া! জাস্ট শাট আপ! তুই কাল থেকে যা তা বকে যাচ্ছিস! অয়ন আর আমার মধ্যে ঝগড়া হয়েছিল, দ্যাটস ইট! ও একটা বাস্টার্ড, একটা কালচারলেস গুন্ডা! ও আমাকে ম্যানহ্যান্ডেল করার চেষ্টা করেছিল আর সেজন্য আমি ওর গালে থাপ্পড় মেরেছি!"

"ওহ, রিয়্যালি?"

"তুই ওকে থাপ্পড় মেরেছিলি আর ও তোর থাপ্পড় খেয়ে চুপচাপ বসে ছিল। তুইও থাপ্পড় মেরে ওর সাথে পৌনে এক ঘন্টা ধরে বসে রইলি বল ?"

জিনিয়া আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়াল। সে বৈশালীর একদম কাছে এসে, হাত বাড়িয়ে বৈশালীর গাউনের কাঁধের অংশটা সামান্য সরিয়ে দিল। বৈশালীর ফর্সা কলারবোনের পাশে, ঘাড়ের ওপর দুটো কালশিটে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

বৈশালীর পুরো শরীর যেন এক অদৃশ্য বিদ্যুতের ঝটকায় আড়ষ্ট হয়ে গেল। শ্বাসের গতি দ্রুত হতে লাগল। সে চমকে উঠে গাউনটা টেনে ঢাকা দিতে গেল, কিন্তু জিনিয়া তার কবজিটা শক্ত করে ধরে ফেলল।

"আমাকে মিথ্যে বলবি বৈশালী? আমি তোর বেস্টফ্রেন্ড, তোর পুরো হিস্ট্রি আমার জানা।"

জিনিয়া বৈশালীর চোখের দিকে সরাসরি তাকাল।

"তোকে ওখানে রেখে মাঠের বাইরে যাবার পৌনে এক ঘন্টা পরে দেবমাল্য আমায় মেসেজ করেছিল, ও তোকে বারবার কল করে পায়নি। আমি ওকে বানিয়ে বানিয়ে গ্যারেজের গল্প দিয়ে বিষয়টা কভার করেছি। কী করছিলি তুই ?"

"জিনিয়া! তুই লিমিট ক্রস করছিস!"

বৈশালী গলার সবটুকু জোর দিয়ে চেঁচিয়ে উঠল। 

"তুই জানিস না কী হয়েছিল! ও আমাকে প্রভোক করেছিল! ও বলছিল আমি নাকি ইগোইস্টিক, ও নাকি আমার সাথে জাস্ট টাইম পাস করেছিল!"

তার চোখ দুটো দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ার উপক্রম।

"আর তুই?" 

জিনিয়া ঠান্ডা গলায় জিজ্ঞেস করল, 

"তুই কী করছিলি ?

তুই যখন মাঠ থেকে বেরিয়ে এলি, তখন তোর হাঁটার গতি স্বাভাবিক ছিল না। মেকআপটা পুরো ঘেঁটে গিয়েছিল, তোর নিচের ঠোঁটটা ফুলে লাল হয়ে উঠেছিল। তোর হাই-পনিটেলটা খোলা ছিল, চুলগুলো পেছনে জট পাকিয়ে গিয়েছিল আর তোর ডেনিম শর্টসের পেছনে যে লোহার মরচের ছাপ লেগেছিল, সেটা আমি দেখিনি ভাবছিস ? তুই কি গ্যালারির লোহা আঁকড়ে ধরে কঁকাচ্ছিলি, বৈশালী?"

বৈশালী এক লহমায় ভেঙে পড়ল। তার সমস্ত অহংকার, আভিজাত্যের দেয়াল এক মুহূর্তে ধসে মাটিতে মিশে গেল। সে দুই হাতে মুখ ঢেকে অটোম্যানের ওপর বসে পড়ল। তার পাতলা রেশমি গাউনটা একটু আলগা মেঝেতে হয়ে ছড়িয়ে পড়ল।

"ও একটা সাইকো জিনিয়া... ও একটা ব্লাডি অ্যানিমাল..." বৈশালীর গলা কাঁপছিল। 

"আমি চেয়েছিলাম ওকে অপমান করতে। আমার অপমানের প্রতিশোধ নিতে ... কিন্তু, কিন্তু ... 

বৈশালী মুখ তুলল। তার চোখে ভয়ার্ত ভাব। সে জোরে নিজের ঠোঁটখানা কামড়ে ধরল। চোখ দুটো জলে ভিজে উঠলেও সেখানে ভেঙে পড়ার কোন চিহ্ন ছিল না, তার বদলে মেয়েলি লজ্জা আর অবদমিত কামনার একটা মিশ্রণ কাজ করছিল।

"ও যখন আমাকে ওই লোহার জালে উল্টে ধরল... ওর বুকের চাপটা যখন আমার পিঠে এসে লাগল... জিনিয়া, আই সোয়ের, আমার মনে হয়েছিল আমি মরে যাব! কিন্তু... কিন্তু একই সাথে..."

জিনিয়া স্থির চোখে বৈশালীর দিকে তাকিয়ে রইল। 

বৈশালীর শরীর তখনও এক অদ্ভুত অনূভূতির কাঁপনে শিউরে উঠছে।

"তোর শরীরের ভেতরের আগুনটা জ্বলে উঠেছিল, তাই তো?" 

জিনিয়া ঠোঁটের কোণে এক চিলতে বিষাক্ত হাসি ঝুলিয়ে বলল। 

বৈশালী নিজের ঠোঁটটা এত জোরে কামড়ে ধরল যে রক্তের স্বাদ পেল। 

"আমার মনে হচ্ছিল যেন চামড়া চিরে আগুন বেরিয়ে আসছে ... আমি ... আমি চেয়েছিলাম ওকে থামাতে, ওর হাত দুটো চেপে ধরে চিৎকার করে বলতে যে আমি আর সহ্য করতে পারছি না, কিন্তু আমার গলা দিয়ে কোনো আওয়াজই বেরোচ্ছিল না; সব কথা আমার গলার কাছে এসে আটকে যাচ্ছিল। শুধু চোখ ফেটে জল আসছিল আর আমি মনে মনে ওর কাছে মিনতি করছিলাম যেন ও এবার থেমে যায়। কিন্তু ও থামেনি! মাথার চুল ধরে টেনে পেছনে এনে কানের কাছে ফিসফিস করে বলল, 'ইটস পানিশমেন্ট টাইম!'..."

"তুই বিশ্বাস করবি ?"

বৈশালী অস্ফুট স্বরে, প্রায় ফিসফিস করে বলল, 

"প্রতিটা থাপ্পড়ের সাথে সাথে আমার তলপেট থেকে কেমন যেন একটা অদ্ভুত ফিলিংস উঠে আসছিল। পা দুটো কেমন অবশ হয়ে আসছিল... 
আমার মনে হচ্ছিল... অয়ন যদি ওই মুহূর্তে আমায় ওই মাঠেই আমাকে শেষ করে ফেলে... তাহলেও আমি ওকে কোন বাধা দেব না..."

বৈশালী চুপ করে গেল। 

জিনিয়া সোফায় হেলান দিয়ে এক দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

অয়নের মতো ছেলেরা এরকমই হয় আর মেয়েরা সব জেনেশুনে বারবার এদের কাছে ফিরে গিয়ে নিজের জীবনটা নষ্ট করে।

সে বিরক্ত ভাবে বলে, 

"তোর অয়নের সাথে ইনভলভড হওয়াটাই ভুল ছিল, বৈশালী।"

"শুরুটা কিন্তু এমন ছিল না..." 

কথাটা বলে, বৈশালী ব্যালকনির দিকে চুপ করে তাকিয়ে রইল। তার দৃষ্টি ওদিকে থাকলেও মন ফিরে গেছে অতীতে।

পাঁচ মাস আগের কথা।

তখন সবে একমাস কলেজ শুরু হয়েছে। অয়ন চ্যাটার্জী তখন একজন শান্ত, চুপচাপ, কিন্তু প্রচণ্ড আকর্ষণীয় একজন স্টুডেন্ট।

বৈশালী ক্লাসের প্রথম দিন থেকেই অয়নকে খেয়াল করেছিল। অয়নের হ্যান্ডসাম ফেস, তার চালচলন, স্পোর্টসম্যান বডি আর সবচেয়ে বড় কথা, তার উদাসীনতা। অনেক মেয়ে ওর প্রতি অ্যাট্রাক্টেড ছিল কিন্তু সে মেয়েদের দিকে চোখ তুলে তাকাত না। ক্লাসে এসে চুপচাপ থাকত, কারোর সাথে বেশি কথা বলতো না।

তখন ওকে দেখে বৈশালীর মনে হতো শান্ত, গোছানো একটা স্টুডেন্ট। ওর উদাসীনতাকে মনে হতো কেয়ারলেসনেস।

দু-একজন মেয়ে অলরেডি ওকে ডেটে যাবার অফার দিয়েছে শুনে বৈশালী দেরি করেনি। ও ভেবেছিল অয়নের মতো শান্ত একটা ছেলেকে নিজের আঙুলের ডগায় নাচাতে অসুবিধা হবে না। ইচ্ছে হলে রাখবে, না হলে ছুঁড়ে ফেলে দেবে।

সেদিনও পার্ক স্ট্রিটের একটা ক্লাবে পার্টি ছিল। অয়ন অবশ্য ক্লাবিং পছন্দ করত না, কিন্তু ওর ফুটবল টিমের সিনিয়রদের চাপে নতুন রিক্রুটদের মতো ওকেও সেখানে বাকিদের মতো বাধ্য হয়ে যেতে হয়েছিল।

বৈশালী সেদিন একটা রেড ড্রেস পরেছিল। ক্লাবের ধোঁয়াটে আলো আর লাউড মিউজিকের মাঝে বৈশালী ইচ্ছে করেই অয়নের গায়ের ওপর গিয়ে পড়েছিল।

"ওহ, সরি! আমি খেয়াল করিনি..." 

সে তার মোহময়ী হাসিটা ছড়িয়ে বলেছিল।

অয়ন ওকে ধরে সোজা করে দিয়েছিল। তার স্পর্শে শুধু সতর্কতা ছাড়া আর কিছু ছিল না।

"ইটস ওকে। সাবধানে হাঁটো।" 

স্রেফ এটুকু বলে অয়ন আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছিল।

সেই ছুতো ধরে বৈশালী অয়নকে ড্রিংক অফার করেছিল। অয়ন ড্রিংক নেয়নি, স্রেফ ডায়েট কোক ধরে রেখেছিল। কিন্তু বৈশালী হাল ছাড়েনি। সে অয়নের পাশে বসে ক্রমাগত ফিসফিস করে কথা বলে গেছে, নিজের শরীরটাকে অয়নের বাহুর সাথে লেপ্টে রেখে দিয়েছিল।

পরের দু-সপ্তাহে তাদের পরিচয়টা সম্পর্কের দিকে মোড় নেয়। অয়ন তখন প্রচণ্ড অপরাধবোধে ভুগছে। নিজের মায়ের প্রতি নিষিদ্ধ আকর্ষণ তাকে তাড়িয়ে বেরাচ্ছে। সে বাড়ি যাওয়া বন্ধ করেছে। পড়াশোনার পাশাপাশি নিজেকে স্পোর্টসে ডুবিয়ে দিয়েছে।

ওই সময় অয়ন একটা আউটলেট খুঁজছিল। সে বৈশালীর সাথে ঘুরতে শুরু করে। ওরা ক্যাফেতে যেত, বৈশালীর গাড়িতে লং ড্রাইভে গেছে, রেস্টুরেন্টে গেছে, সিনেমা দেখেছে। চুমু খেয়েছে।

তারা শুধু আর কখনো ক্লাবে যায়নি, অয়ন ক্লাবিং পছন্দ করতো না।

বৈশালী যথেষ্ট অহংকারী মেয়ে, আর রাগীও। সে ভেবেছিল সহজেই অয়নকে নিজের মুঠোবন্দী করে ফেলবে। কিন্তু, অয়ন তো বৈশালীর প্রেমে পড়েনি। 

সে বৈশালীর ডমিনেশন মানতে যাবে কেন ?

দুজনের মধ্যে ঝামেলা শুরু হল। ঝগড়া, কথা কাটাকাটি লেগেই থাকত। বৈশালী বুঝতে পারল অয়নকে বাইরে থেকে যতটা শান্তশিষ্ট মনে হয় আসলে সে তেমন নয়।

প্রজেক্ট ফেলিওর বুঝে তার সরে আসাটাই সঠিক হত। কিন্তু, তার ইগো তাকে বাধা দিল।

একদিন রাতে, যখন ডর্মে কেউ ছিল না, বৈশালী ওর কাছে এসে হাজির হয়। সে ভেবেছিল আজকে অয়নকে সহজেই ফাঁসানো যাবে। কিন্তু, অয়ন ওকে বিছানায় ফেলে রেখে সোজা বাথরুমে ঢুকে যায়। 

দশ মিনিট পর বাথরুম থেকে বেরিয়ে এসে, সম্পূর্ণ ঠান্ডা গলায়, বৈশালীর দিকে না তাকিয়ে ওকে বলে

'তুমি বাড়ি চলে যাও বৈশালী। দিস ইজ নট ওয়ার্কিং। আই কান্ট ডু দিস টু ইউ।'..."

স্বভাবতই বৈশালী সেটা মেনে নেয়নি। রেগে গিয়ে সে চিৎকার করে উঠলে অয়ন তাকে ঘর থেকে ধাক্কা মেরে বের করে দেয়।

বৈশালীর হাতে ওর ড্রেস, পরনে ব্রা আর প্যান্টি। 

এরপর অয়ন ওকে ইগনোর করা শুরু করে।তারপর থেকে বৈশালীর কোন ফোন ও তোলেনি, মেসেজের রিপ্লাই দেয়নি। 

সেদিনের অপমানের জ্বালা বৈশালী আজ পর্যন্ত ভুলতে পারেনি। এই যন্ত্রণা তাকে রোজ রাতে কুরে কুরে খায়।

এরপর অয়ন অন্য মেয়েদের সাথে ক্যাজুয়ালি ঘুরতে শুরু করে, কিন্তু ওর দিকে আর ফিরে তাকায় নি। বৈশালী ওর সামনে গিয়ে দাঁড়ালে অয়ন স্রেফ পাশ কাটিয়ে হেঁটে চলে যেত, এই সেদিনও সুরঙ্গনা ব্যানার্জীর ক্লাসে এমন বিহেভ করল যেন বৈশালী একটা হাওয়া, যার কোন অস্তিত্বই নেই।

বর্তমান

"কিরে, কী ভাবছিস ?"

জিনিয়ার গলার আওয়াজে বৈশালী বর্তমানে ফিরে এল।

ব্যালকনির ছায়া এখন আরো ঘন হয়ে এসেছে। সানসেটের শেষ লাল আভাটুকু মুছে গিয়ে রাতের নীলচে অন্ধকার নেমে এসেছে।

বৈশালী ওয়াইনের গ্লাসটা সশব্দে কাঁচের টেবিলের ওপর নামিয়ে রাখল।

"ও আমাকে আবর্জনার মতো ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিল জিনিয়া! ও আমাকে বুঝিয়ে দিয়েছিল যে আমার কোনো ভ্যালু নেই! আমি অয়ন চ্যাটার্জীকে ঘৃণা করি! আই হেট হিম!"

"তুই ওকে ঘৃণা করিস না বৈশালী," 

জিনিয়া সোজা হয়ে বসে কড়া গলায় বলল। 

"তুই ওর ওপর অবসেসড।"

"নোট অ্যাট অল!" বৈশালী গর্জে উঠল।

 "তাহলে কাল মাঠে যখন ও তোকে মেটাল ফেন্সিংয়ে চেপে ধরল, তুই চিৎকার করে লোক ডাকলি না কেন?" 

জিনিয়া এক পা এগিয়ে এল, তার চোখ দুটো বৈশালীর মুখে আটকে আছে।

"মাঠের ওপাশে গ্রাউন্ডসম্যানরা কেউ না কেউ থাকে। তুই একটা চিৎকার করলে ওরা ছুটে আসত! অয়ন কলেজ থেকে পার্মানেন্টলি রাস্টিকেট হয়ে যেত! তুই চেঁচালি না কেন?"

বৈশালী কোনো উত্তর দিতে পারল না। তার গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল।

"তুই চেঁচাসনি কারণ..." 

জিনিয়া বৈশালীর কানের একদম কাছে এসে ফিসফিস করে বলল, 

"...কারণ তুই চাসনি কেউ তোদের মাঝখানে আসুক। তুই চেয়েছিলি অয়ন তোকে ওইভাবে স্পর্শ করুক। তুই চেয়েছিলি ও তোকে চাবকাক, তোকে পেষণ করুক!"

"স্টপ ইট জিনিয়া! শাট আপ!" 

বৈশালী দুই হাতে কান চেপে ধরল। তার চোখ দিয়ে অঝোরে জল গড়িয়ে পড়তে লাগল।

জিনিয়া পিছু হটলো না। সে বৈশালীর হাত দুটো কান থেকে টেনে সরিয়ে দিল।

"আয়নায় নিজের মুখটা দেখ বৈশালী! কত ছেলে তোর জন্য পাগল। দেবমাল্য তোকে ভালোবাসে, তোর আবদার সহ্য করে, তোকে রানি বানিয়ে রাখতে চায়। কিন্তু তুই ওকে মনে মনে সম্মান করিস না। তুই চাস অয়নকে, যে তোকে অ্যানিমালের মতো ট্রিট করে ছেড়ে চলে যায়!"

বৈশালী ধপ করে চেয়ারে বসে পড়ল। সে আর নিজের সাথে যুদ্ধ করতে পারছে না।

হ্যাঁ, জিনিয়া সত্যি বলছে।

পরশুদিন যখন অয়নের শক্ত পুরুষাঙ্গ ওর শর্টসের ওপর দিয়ে ওর নিতম্বে ঘষা খাচ্ছিল, যখন অয়নের সশব্দ থাপ্পড় ওর নিতম্বে আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়ছিল, তখন এক মুহূর্তের জন্য বৈশালী ভুলে গিয়েছিল যে ও আসলে কে। সে স্রেফ একজন কামাতুর নারী হয়ে উঠেছিল।

"আমি এখন কী করব জিনিয়া?" 

বৈশালীর গলায় অসহায়তার সুর।

জিনিয়া এবার সোজা হয়ে বসল। সে বৈশালীর চোখের দিকে সরাসরি তাকাল। তার গলার স্বর এবার অত্যন্ত গম্ভীর এবং সতর্কতামূলক।

"বৈশালী, ভালো করে শোন।"

বৈশালী চোখ তুলে জিনিয়ার দিকে তাকাল।

"তুই একটা মারাত্মক সাইকোলজিক্যাল ট্র্যাপে পা দিয়েছিস।" 

জিনিয়া কেটে কেটে বলল। 

"তুই ভাবছিস তুই অয়নের ওপর প্রতিশোধ নিচ্ছিস। কিন্তু রিয়্যালিটি হলো, তুই অয়নের সাথে আরও বেশি করে জড়িয়ে যাচ্ছিস। দিস ইজ নট গুড ফর ইউ। তুই অয়নের কোল্ড, ডমিন্যান্ট আর ভায়োলেন্ট রূপটার ওপর অ্যাডিক্টেড হয়ে পড়ছিস।"

"না! আমি ওর ওপর অ্যাডিক্টেড নই! আই হেট হিম!" 

বৈশালী চিৎকার করে উঠতে গেল।

"স্টপ লায়িং টু ইউরসেলফ!"

জিনিয়া হাত তুলে ওকে থামিয়ে দিল।

"অয়ন একটা চোরাবালি বৈশালী।"

সে আরও নিচু গলায় বলল।

"অয়ন চ্যাটার্জীর থেকে দূরে থাক। দেবমাল্যকে ইউজ করছিস কর, কিন্তু অয়নের দিকে পা বাড়াস না।

কারণ পরের বার যদি ও তোকে শাস্তি দেয় বৈশালী... এবার হয়তো শুধু স্প্যাঙ্কিংয়ে শেষ হবে না।

তুই যদি নিজেকে বাঁচাতে চাস, তা হলে ওর থেকে দূরে থাক। আর যদি নিজেকে পুরোপুরি ধ্বংস করতে চাস... তা হলে পার্টির রাতে অয়নের সামনে আবার গিয়ে দাঁড়া।"

কথাটা বলে জিনিয়া আর এক সেকেন্ডও দাঁড়াল না। কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে সে ঘর থেকে বেরোনোর জন্য পা বাড়াল।

ও একটা বিষয়ে সিওর। বৈশালী ওর কথা শুনবে না। যদি অয়ন পার্টিতে আসে তবে ও আবার অয়নের সামনে গিয়ে দাঁড়াবে। আগুনের নেশা এমনিই। 

ও নিজেও সেটাই চায়।

যাক গে, বৈশালীকে এখন কেবল বাঁচাতে পারে অয়ন। এটা বোঝাই যাচ্ছে সে কোনদিন বৈশালীকে ভালোবাসেনি। অয়ন যেই দেখেছে বৈশালী তার ওপর আধিপত্য বিস্তার করতে চাইছে, তখনই সে পিছিয়ে গেছে। 
পার্টিতে অয়ন আসবে বলে মনে হয় না। সেদিন তো ঘুরিয়ে বলেই দিল।
[+] 3 users Like RockyKabir's post
Like Reply
৩

২৮শে ডিসেম্বর 

বিকেল পৌনে চারটে।

বড় বড় কাঁচের জানলা গলে করিডোরে শেষ বিকেলের ম্লান আলো এসে পড়েছে।

মেইন বিল্ডিংয়ের তিনতলায় ম্যাথ উইংয়ের করিডোরটা এই সময় প্রায় নিস্তব্ধ হয়ে এসেছে। এমনিতেই এখানে ম্যাথ ছাড়া আর কোন সাবজেক্টের ক্লাস হয় না তাই ছাত্রছাত্রীদের সংখ্যা সীমিত থাকে। আজকের ক্লাস মোটামুটি শেষ।

করিডরে স্টুডেন্টদের গলার আওয়াজ, হাঁটাচলা করার শব্দও কমে এসেছে। 

বিদিশা ধীর পায়ে করিডোর দিয়ে হাঁটছিলেন। তার পরনে হালকা পিচ রঙের সুতির শাড়ি। সারাদিনের পরিশ্রমের পর তার চোখেমুখে ক্লান্তির ছাপ থাকলেও, চোখের দৃষ্টি অত্যন্ত সজাগ। 

তার মন নানা কারণে চিন্তায় আচ্ছন্ন। তার উপর, সোমবার দিন ডক্টর বাগচীর দেওয়া অফারটা পাবার পর থেকে তার মনে অস্থিরতা বেড়েছে।

যিনি মাত্র ক'দিন আগে তাকে সবার সামনে অপদস্থ করার জন্য সিম্পোজিয়ামের ফান্ডিং আটকে দেবার জঘন্য চক্রের মাস্টারমাইন্ড ছিলেন তিনি আজ নিজে থেকে তাকে এত বড় একটা প্রশাসনিক দায়িত্ব দিতে চাইছেন ? ড. বাগচীর উদ্দেশ্যটা কী? 

বিদিশা অঙ্কের লোক। 

একটা সমীকরণ না মিললে ধরে নিতে হবে কোথাও একটা ভুল আছে। সেই ভুলটা খুঁজে বের করতে সাহায্য করতে পারেন কেবল একজন।

সেজন্যই তিনি এখন ম্যাথ ডিপার্টমেন্টের সিনিয়র ফ্যাকাল্টি নন্দিতা দাশগুপ্তের কাছে যাচ্ছেন। 

নন্দিতার কেবিনের দরজাটা অর্ধেক ভেজানো ছিল। বিদিশা দরজায় মৃদু টোকা মেরে ভেতরে ঢুকলেন।

"আসতে পারি, নন্দিতাদি?"

ভেতরে নন্দিতা দাশগুপ্ত নিজের ডেস্ক গুছিয়ে তার চামড়ার টোট-ব্যাগটায় জলের বোতল ভরছিলেন। সাধারণত এই সময় তিনি বাড়ি যাওয়ার প্রস্তুতি নেন। বিদিশার গলা শুনে তিনি মুখ তুলে তাকালেন। প্রথমে তার চোখেমুখে সামান্য বিস্ময় ফুটে উঠলেও, পরক্ষণেই সেটা একটা আন্তরিক, উষ্ণ হাসিতে পরিণত হলো।

"আরে বিদিশা! এসো, এসো। বোসো," 

নন্দিতা হাতের বোতলটা টেবিলে নামিয়ে রেখে চেয়ারে বসলেন। বিদিশা ডেস্কের সামনের চেয়ারটায় বসলেন। 

কেবিনটা বেশ গোছানো। বাতাসে নন্দিতার চুলে মাখা জুঁইফুলের তেলের একটা খুব চেনা, ঘরোয়া সুবাস মিশে আছে।

"কী ব্যাপার বলো তো ? সিম্পোজিয়ামের গ্র্যান্ড সাকসেসের পর তোমাকে তো আর স্টাফরুমে দেখাই যায় না। আমি ভাবছিলাম কাল একবার তোমার সাথে দেখা করব।"

নন্দিতা হাসিমুখে বললেন। 

"প্রিন্সিপাল স্যার তো তোমার প্রশংসায় পঞ্চমুখ। উনি নাকি ডক্টর বাগচীকে বলেছেন, 'আপনার ডিপার্টমেন্ট একটা খাঁটি হীরে পেয়েছে।' গোটা ডিপার্টমেন্ট তোমার ম্যানেজমেন্ট স্কিল নিয়ে আলোচনা করছে। 

ফান্ডিংয়ের প্রবলেম তুমি যেভাবে নিজের পকেট থেকে টাকা দিয়ে, একার হাতে সামলেছ... আনবিলিভেবল বিদিশা! আই অ্যাম রিয়েলি প্রাউড অফ ইউ।"

নন্দিতার উচ্ছ্বাসে কোনো খাদ ছিল না। 

বিদিশা একটু হাসলেন, কিন্তু হাসিটা তার চোখ অবধি পৌঁছল না। ফেস্টের পর নন্দিতাদি নিজে থেকে তার ঘরে এসেছিলেন। আজ তিনি নন্দিতাদির ঘরে এসেছেন। 

মাঝের একমাসে বিদিশার মনোভাবের অনেক পরিবর্তন ঘটেছে। তিনি এখন অনেক বেশি সতর্ক, সজাগ। একমাস আগের বিদিশা ড. বাগচীর ঘরে বিনা প্রশ্নে অফারটা গ্রহণ করে নিত।

নন্দিতা অবশ্য এসব লক্ষ্য করলেন না।

"থ্যাংক ইউ, নন্দিতাদি। সবই আপনাদের সাপোর্ট। পরিস্থিতিটাই এমন ছিল যে, ইভেন্টটা বাঁচানো ছাড়া আমার কাছে আর কোনো অপশন ছিল না। তবে আজ আপনার কাছে অন্য একটা বিষয়ে পরামর্শ নিতে এসেছি।"

নন্দিতা একটু অবাক হলেন, 

"পরামর্শ? আমার কাছে ? বলো কী ব্যাপার ?"

বিদিশা গলার স্বরটাকে ক্যাজুয়াল রেখে সরাসরি কাজের কথায় এলেন।

"নন্দিতাদি, আপনাকে কি স্টুডেন্ট ওয়েলফেয়ার কমিটির মেম্বারশিপের অফার দেওয়া হয়েছিল? ড. বাগচী আজ সকালে আমাকে ডেকে ওই পোস্টের জন্য কনসিডার করার কথা বললেন..."

কথাটা শেষ হওয়ার আগেই নন্দিতা দাশগুপ্তের মুখের উষ্ণ হাসিটা যেন কেউ একটা সুইচ টিপে নিভিয়ে দিল। কেবিনের ভেতরের পরিবেশটা মুহূর্তের মধ্যে ভারী হয়ে উঠল। বিদিশা স্পষ্ট দেখলেন, নন্দিতাদির চোখেমুখে একটা মিশ্র অনুভূতি। সতর্কতা, বিরক্তি এবং এক ধরনের অজানা আশঙ্কা।

নন্দিতা আর একটা কথাও না বলে তড়িঘড়ি করে নিজের চেয়ার ছেড়ে উঠলেন। তিনি দ্রুত পায়ে দরজার কাছে গিয়ে করিডোরের এদিক-ওদিক একবার ভালো করে দেখে নিলেন। তারপর দরজাটা সজোরে বন্ধ করে, ছিটকিনিটা ভেতর থেকে আটকে দিলেন। তারপর জানালার ব্লাইন্ডসগুলোও টেনে দিলেন যাতে বাইরে থেকে ভেতরের কিছু দেখা না যায়।

বিদিশা ভ্রু কুঁচকে গোটা ব্যাপারটা লক্ষ্য করছিলেন। এত লুকোচুরি করার কী আছে ?

নন্দিতা ফিরে এসে নিজের চেয়ারে বসে ডেস্কের ওপর ঝুঁকে পড়লেন। তার চোখেমুখের ভাবে এখন সতর্কতা আর ভয়। 

"আশা করি তুমি এখনো ডক্টর বাগচীকে হ্যাঁ বলোনি?" 

তার গলার স্বর এখন ফিসফিসানিতে নেমে এসেছে।

বিদিশা নিজের মেরুদণ্ড সোজা করে বসলেন।

"না, আমি ডিসিশন নেওয়ার জন্য একটু সময় চেয়ে নিয়েছি। আগামী সপ্তাহে জানাব বলেছি", 

বিদিশা শান্ত গলায় উত্তর দিলেন।

"কিন্তু, আপনি এভাবে চমকে উঠলেন কেন ? আর, অফারটা রিফিউজই বা করলেন কেন ?"

নন্দিতা একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে চেয়ারে হেলান দিলেন। তার কপালে চিন্তার ভাঁজ, চোখ দুটো কুঁচকে গেছে।

"বিদিশা আমি এখানে অনেকদিন আছি। আমি ঝামেলা এড়িয়ে নিজের কাজটুকু করে বাড়ি ফিরতে ভালবাসি। অন্য কমিটির পোস্ট হলে হয়তো আমি রিফিউজ করতাম না। কিন্তু, তুমি জান এই ওয়েলফেয়ার কমিটির কাজ কী ? এই কমিটিকে সরাসরি স্টুডেন্ট কাউন্সিলের সাথে কাজ করতে হয়। আরো স্পষ্ট করে বললে এই ক্যাম্পাসের আন্ডারগ্রাউন্ড পলিটিক্সের সাথে নিয়মিত ইন্টারঅ্যাক্ট করতে হয়।"

বিদিশার চোখের সামনে এক লহমায় গতমাসে ঘটে যাওয়া অনেকগুলো দৃশ্য ভেসে উঠল।

" আমি তোমাকে আগেই বলেছিলাম না, যে এই কাউন্সিলে এমন অনেক স্টুডেন্ট আছে, যারা অত্যন্ত প্রভাবশালী পলিটিক্যাল আর বিজনেস পরিবার থেকে আসা ? এদের প্রোটেকশন দেবার মতো প্রভাবশালী লোকের অভাব নেই। বিক্রম মালহোত্রার চেয়েও অনেক বড় বড় মাথা স্টুডেন্ট কাউন্সিলে বসে আছে।

ওয়েলফেয়ার কমিটিতে থাকার মানেই হল এদের অন্যায় আবদার আর প্রেশার ফেস করা। সায় দিলে নিজের এতদিনকার এথিক্স, নিজের প্রফেশনাল ইন্টিগ্রিটি বিসর্জন দিতে হবে আর নাহলে এরা মিথ্যা অপবাদ দিয়ে তোমার জীবন অতিষ্ঠ করে তুলবে। আমি এই বয়সে এসে ওই উটকো ঝামেলা আর ঘাড়ে পেতে নিতে চাইনি।"

বিদিশা এক মুহূর্ত চুপ করে রইলেন। ডক্টর বাগচীর সেই হুমকিটা তার মনে পড়তে লাগল - 'আপনি আপনার সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছেন, মিস গাঙ্গুলি।'

"কিন্তু নন্দিতাদি...একটা কথা আমার মাথায় ঢুকছে না। বিদিশা একটু সামনের দিকে ঝুঁকে এলেন। "আমি এই কলেজে জয়েন করেছি সবে মাত্র আড়াই মাস হলো। এই অবস্থায় ডক্টর বাগচী আমার মতো একজন জুনিয়রকে এত বড় গুরুত্বপূর্ণ আর ক্রুশিয়াল একটা দায়িত্ব দিতে চাইছেন কেন ? ডিপার্টমেন্টে তো আরো অনেকেই আছেন।"

নন্দিতা একটা ম্লান হাসি হাসলেন।

"কে আছে, বিদিশা? তুমি একবার আমাদের ডিপার্টমেন্টের দিকে তাকিয়ে দেখো। ডঃ বাগচী নিজে তো আর স্টুডেন্টদের সাথে গিয়ে মাঠে নামবেন না। ডক্টর ঘোষ সামনের বছর রিটায়ার করবেন, তিনি কোনো ফাইলে সই পর্যন্ত করতে চান না। ডক্টর বোস এই হসপিটাল থেকে ছাড়া পেয়েছেন। ডক্টর দাস পিওর অ্যাকাডেমিক লোক, সবসময় পড়ানো আর নিজের বই লেখা নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। তাছাড়া উনি অলরেডি সিলেবাস কমিটিতে আছেন।"

বিদিশা মাথা নাড়লেন, "ডক্টর লাহিড়ী বা সুব্রত সেন তো ছিলেন?"

"লাহিড়ীবাবু নিজের রিসার্চ আর পেপার পাবলিশের বাইরে দুনিয়ার খবর রাখেন না। তার রিসার্চ আর পেপার পাবলিকেশন নিয়ে তিনি এতটাই আচ্ছন্ন যে কোনরকম প্রশাসনিক দায়িত্বের নাম শুনলেই দশ হাত দূরে পালান। মাঝে মাঝে ডিপার্টমেন্টের মিটিংয়েই আসেন না। " 

"আর সুব্রত সেন?" 

নন্দিতার মুখে একটা চরম বিতৃষ্ণার ভাব ফুটে উঠল। 

"উনি এ ধরনের 'স্টুডেন্ট হ্যান্ডলিং' বা ওয়েলফেয়ারের কাজকে তার সম্মানের অনুপযুক্ত মনে করেন। ওনার নজর সবসময় ওপরতলার ফান্ডিং কমিটির দিকে। আর অরিন্দমকে তো তুমি দেখেছ, একটা ফাইল সই করতে গেলে যার হাত কাঁপে, সে স্টুডেন্ট কাউন্সিল সামলাবে? সুমনা তো কারোর সাথেই কথা বলে না। আর মিসেস মিত্র? চারটে বাজতে না বাজতেই যিনি বারবার ঘড়ির দিকে তাকাতে শুরু করেন তিনি কলেজের ঝামেলা মেটাবেন ?"

নন্দিতা থামলেন। তিনি বিদিশার চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে বললেন, "এখন তুমিই বলো, ডিপার্টমেন্টে আর কে পড়ে রইল? 

তুমি। 

তুমি নতুন এসেছ, তোমার মধ্যে একটা আগুন আছে। 

প্রথমত, তুমি ফেস্ট আর ইমার্জেন্সি সেমিনার দুটোতেই তোমার ম্যানেজমেন্ট স্কিল প্রমাণ করে দিয়েছ। এত ভালো কাজ করার পর, প্রশাসনিক পদের জন্য তুমি তো অটোমেটিক চয়েস হবেই। কিন্তু বিদিশা..."

নন্দিতা গলাটা আরও নামিয়ে ফেললেন, 

"এটা একটা ট্র্যাপও হতে পারে। তুমি প্রবেশনারি পিরিয়ডে আছো। তোমার চাকরি এখনও অবধি পার্মানেন্ট নয়। তুমি যদি ওই বজ্জাত ছেলেমেয়ে গুলোর টার্গেট হয়ে যাও আর তারা যদি তোমার নামে একটা ছোটখাটো এলিগেশন ম্যানেজমেন্টের কাছে জমা দেয়, তোমার ক্যারিয়ার কিন্তু শেষ হয়ে যাবে। আমি তোমায় বড় বোনের মতো বলছি, তুমি কাল সকালে ড.বাগচীর অফিসে গিয়ে কোনো একটা অজুহাত দেখিয়ে এই অফারটা ফিরিয়ে দাও।"
 
চুপ করে পুরোটা শুনে বিদিশা চেয়ারে হেলান দিয়ে বসলেন। তার চোখের দৃষ্টি এখন জানলার বাইরে নিভু নিভু আলোর দিকে স্থির।

নন্দিতাদি এ পর্যন্ত যা যা বলেছেন, তার প্রতিটা কথা খুবই যুক্তিসঙ্গত। সমস্ত দ্বিধা-দ্বন্দ্ব এতেই পরিষ্কার হয়ে যাবার কথা। 

কিন্তু, নন্দিতাদি পুরো ছবিটা দেখতে পাচ্ছেন না। বিদিশা পাচ্ছেন।

তিনি নিশ্চিত যে সিম্পোজিয়ামের ফান্ডিংয়ের ক্রাইসিসটা ডক্টর বাগচীরই প্ল্যান ছিল। ডক্টর বাগচী তাকে ফেল করা স্টুডেন্টদের পাস করানোর জন্য চাপ দিয়েছিলেন, বিদিশা তাকে মুখের ওপর না করে এসেছিলেন। তিনি সেই অপমানের বদলা নেবার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। 

সিম্পোজিয়ামের ফান্ডিংয়ের প্ল্যানটা ভেস্তে যাওয়ার পর উনি এখন ভীষণ খেপে আছেন। সেমিনারটা অনুষ্ঠিত হওয়া আটকাতে ব্যর্থ হবার পর উনি বুঝতে পেরেছেন যে বিদিশাকে অ্যাকাডেমিক বা ম্যানেজমেন্টের দিক থেকে আটকানো অসম্ভব। 

তাই এখন বিদিশাকে তাড়ানোর জন্য তিনি 'প্ল্যান বি' অ্যাপ্লাই করছেন। তিনি বিদিশাকে এমন একটা খাদের ধারে নিয়ে গিয়ে দাঁড় করাতে চাইছেন, যেখান থেকে বিদিশা নিজেই পড়ে যাবেন।

স্টুডেন্ট ওয়েলফেয়ার কমিটি।

ডক্টর বাগচী নিজে কিছু করবেন না, তিনি শুধু ঘুঁটি সাজিয়েছেন। বিদিশাকে এই কমিটিতে বসানো মানেই তাকে স্টুডেন্ট কাউন্সিলের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেওয়া। 

ড. বাগচী খুব ভালো করেই জানেন বিদিশা যখন কাউন্সিলের প্রভাবশালী স্টুডেন্টদের অন্যায় আবদার মানতে চাইবেন না, তখন স্টুডেন্ট কাউন্সিল নিজে থেকেই বিদিশার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে।

তারপর খুব সহজেই 'ইনকম্পিটেন্স' বা 'স্টুডেন্ট কনফ্লিক্ট'-এর দায়ে দেখিয়ে বিদিশাকে কলেজ থেকে বের করে দেওয়া যাবে।
ডক্টর বাগচীর হাত একদম পরিষ্কার থাকবে।সাপও মরবে, লাঠিও ভাঙবে না। খুব নিখুঁত, ঠান্ডা মাথার একটা প্ল্যান।

কিন্তু, বিদিশা এসব কথা নন্দিতাকে বলতে পারলেন না। নন্দিতা ভালো মানুষ হতে পারেন, কিন্তু তিনি এই কলেজের পলিটিক্সেরই একটা অংশ। এখানে কাউকে পুরোপুরি বিশ্বাস করা বোকামি।

"নন্দিতাদি।" 

বিদিশা শান্ত গলায় বললেন, যেন খুব সাধারণ একটা কথা জিজ্ঞেস করছেন, এমনভাবে বললেন,

"ডক্টর বাগচী মানুষ হিসেবে আসলে কেমন?"

নন্দিতা একটু অস্বস্তিতে পড়লেন। এদিক-ওদিক তাকিয়ে বললেন,

"দেখো, এইচওডি-র নামে তো আর এভাবে কথা বলা যায় না। তবে... লোক খারাপ নন, যদি তুমি ওনার গুডবুকে থাকতে পারো। ওনার কথার বাইরে গেলে বা ওনার সাথে ইগো ক্ল্যাশ হলে এই কলেজে চাকরিতে টিকে থাকা মুশকিল। গত দুবছরে ম্যাথের দুজন ফ্যাকাল্টি বাগচীবাবুর সাথে ঝামেলা করে কলেজ ছেড়ে দিয়েছেন।"

"তাই নাকি?" বিদিশা ভুরু কুঁচকালেন।

"হ্যাঁ। মিস্টার অধিকারী বলে একজন খুব এফিসিয়েন্ট টিচার ছিলেন। কিন্তু বাগচীবাবুর সাথে তার প্রায়ই পলিসি নিয়ে ঝামেলা লাগত। শেষে এমন পরিস্থিতি তৈরি হলো যে তিনি নিজে রেজিগনেশন দিয়ে চলে গেলেন।"

বিদিশার চোখের তারা সামান্য প্রসারিত হলো।

"প্রিন্সিপাল স্যার কিছু বললেন না?" বিদিশা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন। 

"উনি তো যথেষ্ট কড়া মানুষ বলে মনে হয়।"

নন্দিতা একটা শুকনো, অসহায় হাসি হাসলেন।

"বিদিশা, এটা অনেক ওপর লেভেলের খেলা। প্রিন্সিপাল স্যার কলেজের মুখ হতে পারেন, কিন্তু আসল ক্ষমতা ম্যানেজমেন্ট, ট্রাস্টি বোর্ড, গভর্নিং বডি আর ডোনারদের হাতে থাকে। প্রিন্সিপাল স্যারকে হয়তো কলেজের বৃহত্তর স্বার্থের দোহাই দিয়ে অনেক কিছুই এড়িয়ে যেতে হয়।"

বিদিশার মনে হল, নন্দিতাদি হয় এই নোংরা পলিটিক্সের ভেতরের খবর পুরোপুরি জানেন না, অথবা জানার উপায় থাকলেও নিজের সেফটির জন্য জানতে চান না।

এই কলেজের পলিটিক্সের শেকড় অনেক গভীরে।

"আচ্ছা, ওয়েলফেয়ার কমিটির আসল কাজগুলো কী কী?" 

বিদিশা প্রসঙ্গটা ঘোরালেন।

নন্দিতা একটু রিল্যাক্স হলেন।

"কমিটির রুলবুক অনুযায়ী তো অনেক কাজ। প্রথম কাজ হলো, কোন মেরিটোরিয়াস স্টুডেন্ট যেন অর্থাভাবে পড়াশোনা না ছাড়ে, সেটা দেখা। স্কলারশিপের টাকা ঠিকমতো ডিস্ট্রিবিউট হচ্ছে কি না, দুঃস্থ ছাত্রছাত্রীদের টিউশন ফি মকুবের অ্যাপ্লিকেশন ভেরিফাই করা, লাইব্রেরি থেকে তাদের স্পেশাল স্টাডি মেটেরিয়াল দেওয়া, এসব।"

শুনে বিদিশার একটু ভালো লাগল। এই একটা জায়গা যেখানে সত্যিই কিছু পজিটিভ কাজ করার সুযোগ আছে।

"আর কী কাজ থাকে?" 

বিদিশার গলায় প্রচ্ছন্ন কৌতূহল।

"দ্বিতীয় কাজ," নন্দিতা আঙুল গুনে বলতে লাগলেন,

"ক্যাম্পাসের জীবনযাত্রার মান। ক্যান্টিনের খাবারের কোয়ালিটি ঠিক আছে কি না, ফিল্টারড জলের ব্যবস্থা, মেডিকেল ইউনিটের ওষুধপত্র, স্টুডেন্ট ইন্স্যুরেন্স, সফট স্কিল ট্রেনিং এসবের তদারকি করা।"

বিদিশা মাথা নাড়লেন। কাজগুলো বিশাল, একটা আস্ত প্রশাসনিক বিভাগের সমান। কিন্তু তিনি চ্যালেঞ্জ নিতে ভালোবাসেন।

"এতে তো সমস্যার কিছু দেখছি না," বিদিশা বললেন।

"সমস্যাটা কাজে নয়, কন্ট্রাক্ট যে পাবে তাকে নিয়ে।" 

নন্দিতা ফিসফিস করে বললেন। 

"ক্যান্টিনের টেন্ডার কে পায় জানো? লোকাল পলিটিক্যাল পার্টির দাদাদের নিজের লোকেরা। তুমি খাবারের মান নিয়ে প্রশ্ন তুললে পরের দিন ক্যাম্পাসে সাপ্লাই বন্ধ হয়ে যাবে। তোমার দিকে আঙুল উঠবে যে তুমি স্টুডেন্টদের খাবার বন্ধ করে দিয়েছ।"

কথাটা শুনে বিদিশার বুকের ভেতরটা উত্তেজনায় টানটান হয়ে উঠল। তিনি বিপদের গভীরতাটা বুঝতে পারলেন।

"আর তৃতীয় কাজ?" 

বিদিশা প্রশ্ন করলেন।

নন্দিতা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। 

"তৃতীয় কাজটাই সবচেয়ে ঝামেলার।", 

নন্দিতা কপালে হাত দিলেন।

"হোস্টেল ওয়েলফেয়ার।"

বিদিশার চোখের পলক পড়া বন্ধ হয়ে গেল।

'হোস্টেল ওয়েলফেয়ার!' 

কথাটা শোনার সাথে সাথে তার হার্টবিট হঠাৎ করেই একটু বেড়ে গেল।

অয়ন!

অয়ন তো কলেজের বয়েজ ডর্মেই থাকে! যদি তিনি এই কমিটির দায়িত্ব নেন, তাহলে নিশ্চয়ই সবকটা ডর্মের ভেতরে তার সরাসরি অ্যাক্সেস থাকবে। তিনি সম্পূর্ণ লিগ্যাল এবং প্রফেশনাল গ্রাউন্ডে বয়েজ হোস্টেল পরিদর্শনে যেতে পারবেন।

কোন কারণ ছাড়া তিনি বয়েজ হোস্টেলে গিয়ে অয়নের খোঁজ নিতে পারেন না! সেটা কলেজের ডেকোরামের বাইরে আর তার নিজের আত্মসম্মানেরও পরিপন্থী।

এক্ষেত্রে দূর থেকে হলেও, তিনি অফিশিয়াল ক্যাপাসিটিতে জানতে পারবেন সে ডর্মে কেমন আছে! কেউ কোনো প্রশ্ন তুলবে না। নিজের আত্মসম্মান বজায় রেখেই দূর থেকে তিনি...

এদিকে নন্দিতা বলে চলেছেন,

"এই কলেজের আন্ডারে ছেলেদের এবং মেয়েদের, মিলিয়ে অনেকগুলো বড় বড় হোস্টেল বা ডর্ম আছে। সেই হোস্টেলগুলোর থাকা-খাওয়ার মান, সেখানে স্টুডেন্টদের সিকিউরিটির বিষয়ে তদারকি করা আর যদি কোনো শিক্ষার্থীর কোনো অভিযোগ থাকে, সেটা র‍্যাগিং হোক অথবা অন্য কোন সমস্যা, সেটার সমাধান করা। এই হোস্টেলগুলোর এত স্টুডেন্টের উপর নজর রাখা, তাদেরকে কন্ট্রোল করা মুখের কথা নয় বিদিশা। এটা একজনের কাজও নয়। রাত-বিরেতে কোন সমস্যা হলে সবার আগে এই কমিটির মেম্বারদের কাছেই ফোন আসে। রাত দুটোর সময় হোস্টেলে যদি দুটো গ্রুপের মধ্যে মারপিট হয়, পুলিশ ডাকার আগে তোমাকে গিয়ে সেখানে দাঁড়াতে হতে পারে। তুমি সামলাতে পারবে এই হিউজ টাস্ক?"

কেবিনের ভেতর কয়েক সেকেন্ডের জন্য একটা পিন-ড্রপ সাইলেন্স নেমে এল। শুধু দেয়ালঘড়ির টিকটিক শব্দটা ছাড়া আর কোনো আওয়াজ নেই।

কেবিনের ভেতরটা এখন প্রায় অন্ধকার হয়ে এসেছে। 

কথা বলতে বলতে নন্দিতা বুঝতে পারেননি যে কখন বিদিশা নিজের চিন্তার জগতে তলিয়ে গিয়েছিলেন। নন্দিতা বিদিশার চুপ করে থাকা দেখে একটু ভয় পেলেন। 

তিনি একটু চিন্তিত গলায় ডাকলেন, 

"বিদিশা ?"

বিদিশার সম্বিৎ ফিরল। 

নন্দিতা গলাটা আরও নামিয়ে, প্রায় একটা ভূতের গল্প বলার মতো ফিসফিস করে বললেন, 

"বিদিশা, হোস্টেলের দায়িত্বে তুমি যেয়ো না। স্পেশালি নর্থ-ব্লকের বয়েজ হোস্টেলটা। ওটা স্টুডেন্ট কাউন্সিলের ডেন। ওখানে হোস্টেল সুপাররাও ইনস্পেকশনে যেতে ভয় পায়।"

নন্দিতা চেয়ারটা একটু এগিয়ে নিয়ে এলেন। আবছা আলোয় তার মুখটা অদ্ভুত রহস্যময় দেখাচ্ছে।

"তুমি হয়তো জানো না, আজ থেকে ঠিক দশ বছর আগে... ওই নর্থ-ব্লক হোস্টেলের থার্ড ফ্লোরে একটা মারাত্মক ঘটনা ঘটেছিল।"

"কী ঘটনা?"

"একটা ফার্স্ট ইয়ারের ছেলে... নামটা আমার ঠিক মনে নেই, ছাদ থেকে পড়ে মারা যায়" 

নন্দিতার গলাটা কাঁপছে।

"তখন অফিশিয়াল পুলিশ রিপোর্টে বলা হয়েছিল, ছেলেটা ডিপ্রেশন থেকে সুইসাইড করেছিল।"

কথাটা শেষ করে তিনি একটা শুকনো ঢোঁক গিললেন। 

"কিন্তু, ক্যাম্পাসের ভেতরে সবাই ফিসফিস করে বলত, ওটা আসলে মার্ডার ছিল। স্টুডেন্ট কাউন্সিলের তখনকার লিডারদের সাথে ছেলেটার কোন একটা বিষয় নিয়ে ঝামেলা হয়েছিল তাই ওকে ছাদ থেকে ধাক্কা মেরে ফেলে দেওয়া হয়েছিল।"

বিদিশার শিরদাঁড়া বেয়ে একটা বরফের টুকরো যেন নিচে নেমে গেল। অয়ন! অয়নের যা রাগ ! যা জেদ ! ও তো যেকোনো দিন এই কাউন্সিলের ছেলেদের সাথে ঝামেলায় জড়িয়ে পড়তে পারে! 

কেবিনের এসি-র ঠান্ডা হাওয়াটা হঠাৎ করেই বিদিশার গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল।

"তারপর কী হলো?" বিদিশা রুদ্ধশ্বাসে জিজ্ঞেস করলেন।

"কিছুই হয়নি।", 

নন্দিতা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। 

"ম্যানেজমেন্ট, পুলিশ আর পলিটিক্যাল পাওয়ার দিয়ে পুরো কেসটা ধামাচাপা দিয়ে দিল। কিন্তু তারপর থেকে নর্থ-ব্লকের থার্ড ফ্লোরের ওই দিকটা পুরোপুরি পরিত্যক্ত। ওখানে কোনো স্টুডেন্টকে অ্যালটমেন্ট দেওয়া হয় না। সবসময় দরজায় তালা মারা থাকে। স্টুডেন্টরা বলে ওটা নাকি ভূতের আড্ডা; ওখানে নাকি রাতের বেলায় অদ্ভুত সব শব্দ শোনা যায়। কিন্তু সত্যিটা হলো, নর্থ ব্লকটা হল স্টুডেন্ট কাউন্সিলের ছেলেদের একটা সেফ-হাউস। তাই বলছি, তুমি কখনও এই দায়িত্ব নেওয়ার মতো ভুল কাজ কোর না বিদিশা।"

কেবিনের ভেতরে একটা হিমশীতল নিস্তব্ধতা নেমে এল। বাইরের করিডোর দিয়ে কেউ একজন হেঁটে গেল, তার জুতোর শব্দটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল।

বিদিশা নিজের কোলের ওপর রাখা হাতের আঙুলগুলো শক্ত করে মুঠি পাকালেন।

"বিদিশা? কী ভাবছ এত? আমি যা বললাম, সেটা মাথায় রেখো।"

নন্দিতা বোধহয় ভেবেছিলেন এই দশ বছর আগের পুরোনো, অমীমাংসিত খুনের রহস্যের কথা শুনে বিদিশা ভয় পাবে।

কিন্তু বিদিশার চোখের দিকে তাকিয়ে তিনি অবাক হয়ে গেলেন।

বিদিশার চোখে ভয়ের কোন চিহ্ন নেই বরং সেখানে জ্বলজ্বল করছে ইস্পাত-কঠিন জেদ।
এই কলেজ সম্পর্কে এতদিন তিনি যা যা ভেবে এসেছেন তার সবটাই মিথ্যে।

আর, এর পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান ডক্টর বাগচীর। তার দেওয়া হুমকি, সেমিনার সাবোতাজ করার চেষ্টা আর এবার স্টুডেন্ট ওয়েলফেয়ার কমিটিতে জয়েন করার প্রস্তাব।

প্রত্যেকটা ঘটনা বিদিশাকে কিছু না কিছু শিক্ষা দিয়েছে। আজকে তিনি যা শুনলেন তাতে অন্য কোন সাধারণ শিক্ষিকা হলে একেবারে গুটিয়ে যেত।

কিন্তু, বিদিশা গাঙ্গুলি সাধারণ নন। ইতালিতে একজন মাফিয়ার সাথে ডিল করা বিদিশা স্টুডেন্ট কাউন্সিলের এই পাতি গুন্ডাদের ভয় পাবে?

তারপর সবচেয়ে বড় কথা, ওই হোস্টেল চত্বরেরই কোন একটা ঘরে তার ছেলেটা একা পড়ে থাকে।

বিদিশা ধীরেসুস্থে নিজের চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। তার চোখের দৃষ্টিতে হিমালয়ের মতো অটল দৃঢ়তা।

"আমি সবকিছু বুঝতে পারছি, নন্দিতাদি। ইনফরমেশনগুলো দেওয়ার জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। এগুলো ডিসিশন নিতে আমায় খুব হেল্প করল।"

বিদিশা নিজের শাড়ির আঁচলটা কাঁধের ওপর ঠিক করে নিতে নিতে অত্যন্ত শান্তভাবে বললেন।

"তুমি... তুমি ডক্টর বাগচীকে 'না' বলছ তো?"

নন্দিতাদি একটু কনফিউজড হয়ে জিজ্ঞেস করলেন।

বিদিশা দরজার লকটা আনলক করতে করতে নন্দিতার দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে একটা অদ্ভুত হাসি হাসলেন।

"না, নন্দিতাদি। আমি কাল সকালেই আমি ডক্টর বাগচীকে 'হ্যাঁ' জানিয়ে দেব।"

"বিদিশা! তুমি পাগল হলে নাকি ?"

নন্দিতা প্রায় চিৎকার করে ওঠার উপক্রম করলেন।

"আমি এতক্ষণ ধরে তোমাকে কী বোঝালাম?"

"আপনি যা বুঝিয়েছেন, আমি তার সবটাই বুঝেছি, নন্দিতাদি।"

বিদিশার গলার স্বরটা এমনিতে শান্ত আর নরম কিন্তু এখন পাথরের মতো শক্ত শোনাচ্ছে।

"কিন্তু আমি ভয় পেয়ে পিছিয়ে যাওয়ার মতো মেয়ে নই। ডক্টর বাগচী যদি আমাকে উনুনের মধ্যে ঠেলতে চান, তবে সেই উনুনের আগুনটা নেভানো থেকে আমায় কে আটকায়, সেটা আমি দেখে নেব। আসি।"

কথাটা বলে বিদিশা এক সেকেন্ডও দাঁড়ালেন না।

তিনি দরজা খুলে করিডোরে বেরিয়ে গেলেন। তার হিলের খটখট শব্দটা দ্রুত করিডোরে মিলিয়ে যেতে লাগল।

কেবিনের ভেতর একা বসে রইলেন নন্দিতা দাশগুপ্ত। তিনি হতাশায় নিজের কপালে হাত দিলেন। একটা গভীর, দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল তার বুক চিরে।

বিদিশা এমন একটা জেদের ঘোরে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল যে, তিনি তাকে আসল কথাটা বলার সুযোগই পেলেন না। নর্থ ব্লক তো স্টুডেন্ট কাউন্সিলের জায়গা, ওটা নিয়ে পলিটিক্স আছে। কিন্তু আসল ভয়ংকর জায়গাটা তো ওটা নয়!

নন্দিতাদি বিড়বিড় করে উঠলেন,

"পাগল মেয়ে! নর্থ ব্লকের কথা শুনেই এমন রিঅ্যাক্ট করলে যে, সাউথ ব্লকের কথাটা আমি তুলতেই পারলাম না।"

নন্দিতার চোখের সামনে ভেসে উঠল দক্ষিণ দিকের হোস্টেল কমপ্লেক্সের একদম শেষ প্রান্তে থাকা সেই পুরোনো, স্যাঁতসেঁতে হোস্টেল ব্লকটার ছবি। ক্যাম্পাসের আক্ষরিক অর্থেই 'ডেড এন্ড'। ওই পরিত্যক্ত ডরমিটরির দিকে দিনের বেলাতেও কেউ পা বাড়াতে চায় না। ওই সাউথ ব্লকের আড়ালে যে কী মারাত্মক অন্ধকার লুকিয়ে আছে, সেটা বিদিশাকে কীভাবে জানাবেন তিনি?

বিদিশা তো কিছুই জানে না।

নন্দিতাদি একটা অজানা আশঙ্কায় শিউরে উঠে কেবিনের লাইটটা অফ করে দিয়ে সেখান থেকে দ্রুত বেরিয়ে এলেন। বাইরে তখন গোধূলির আলো নিভে গিয়ে ক্যাম্পাসের ওপর সন্ধ্যার জমাট অন্ধকার নামতে শুরু করেছে।
[+] 6 users Like RockyKabir's post
Like Reply
সুরাঙ্গানার চরিত্রতা মনোযোগ দিযে লিখুন আকর্ষণীয় একজন ব্যক্তিত ।
[+] 2 users Like All IS WELL's post
Like Reply
৪

২৮শে ডিসেম্বর, বিকেল পৌনে চারটে

কম্পিউটার সায়েন্স বিল্ডিংয়ের দোতলার করিডোরটা দিনের বেলাতেও বেশ অন্ধকার। সেন্ট্রাল সার্ভার রুমের এক্সহস্ট ভেন্টগুলো থেকে আসা হালকা গরম বাতাসের সাথে সাথে ভারী কুলিং ইউনিটের চাপা গর্জন পুরো করিডোরে ছড়িয়ে পড়ছে।

এর ফলে নিস্তব্ধতার বদলে একটা চাপা, যান্ত্রিক গুঞ্জন চারপাশের আবহাওয়াকে আরও থমথমে করে তুলেছে। বাতাসে কেবল এসি থেকে আসা শুষ্ক কৃত্রিম হাওয়া আর রিমোট সার্ভার র‍্যাকগুলোর তপ্ত সার্কিটের চেনা গন্ধ।

করিডোরের একদম শেষ প্রান্তে, একটা অব্যবহৃত লেকচার হলের দরজার আড়ালে, অন্ধকারের ভেতর মিশে দাঁড়িয়ে আছে অয়ন। আধা অন্ধকার করিডরে একবার ওকে দেখলে ঠাহর করা মুশকিল। 

তার চোখ শিকারীর মতো ল্যাব-রুমের দরজার দিকে স্থির হয়ে আছে। 

কিন্তু, এই সময় ক্লাসে না গিয়ে এখানে কী করছে সে ?

অয়ন সিধু আগরওয়ালের জন্য অপেক্ষা করছে।

সিধু এমন একটা ছেলে, যাকে এই কলেজের আন্ডারওয়ার্ল্ডের উইকিপিডিয়া বলা যায়। ফার্স্ট ইয়ারে কে কার সাথে প্রেম করছে, পরীক্ষার কোন হলে কোন টিচারের গার্ড পড়বে, সাজেশন, কার দুর্বলতা কোথায়, এসব ইনসাইডার ইনফরমেশন এই ক্যাম্পাসে সিধুর চেয়ে ভালো কেউ জানে না।

টাকা দিলেই সেগুলো কিনতে পাওয়া যায়। 

সিধু সুরঙ্গনার ক্লাসেও আছে তবে ওর সাথে অয়নের সরাসরি কোনদিন কথা হয়নি। সিধুও যেচে এগিয়ে এসে অয়নের সাথে কখনো আলাপ করার চেষ্টা করেনি। সে ঝামেলা থেকে একশো হাত দূরে থাকে।

তবে আজ অয়ন নিজেই ওকে খুঁজতে বেরিয়েছে। ওর সিধুকে দরকার।

এরকম নির্জন মুহূর্তগুলোতেই আমাদের মস্তিষ্ক অতীতের চিন্তায় ডুব দেয় সবচেয়ে বেশি। অয়নের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হলো না। গত দু'দিন ধরে ওর অবচেতন মন যে চিন্তাটাকে সযত্নে এড়িয়ে চলতে চাইছিল, সেটা এখন এই নির্জনতায় সিধুর জন্য অপেক্ষা করতে করতে সেগুলো ওর সামনে সাপের মতো ফণা তুলে দাঁড়াল।

পঁচিশ তারিখ সকালের ঘটনার পরের দিন থেকে অর্থাৎ পরশু দিন থেকে বৈশালী ফিজিক্স ক্লাসে আসছে না। আজ নিয়ে তিনদিন হল।

অয়ন করিডোরের অন্ধকার দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে একটা গভীর শ্বাস নিল। সেদিনের ঘটনাটা বাড়াবাড়ি হয়ে গেছে। 

বৈশালী কমপ্লেন করলে আবার প্রিন্সিপাল সান্যালের অফিস ভিজিট করতে হবে।

অয়ন চোখ বন্ধ করল।

ওর মনের আয়নায় ভেসে উঠল সেদিন সকালের কথা। বৈশালীর নরম শরীরটার কথা। মেটাল নেটের সাথে ওর শরীরটাকে পিষে ফেলার সেই মুহূর্তগুলো। ডেনিম শর্টসের ওপর দিয়ে ওর নিতম্বে একটার পর একটা থাপ্পড়, বৈশালীর যন্ত্রণাকাতর অথচ কামার্ত শীৎকার...

সে অনুভব করল প্যান্টের ভেতর ওর লিঙ্গখানা শক্ত হয়ে আসছে।

কিন্তু সে নিয়ন্ত্রণটা হারালো কখন ?

ভাবতেই ওর চোখের সামনে ভেসে উঠল বৈশালীর রাগে-ক্ষোভে লাল হয়ে ওঠা মুখটা আর কানে বেজে উঠল,

'কোন মায়ের গর্ভে তোমার মতো একটা কোল্ড, সেলফিশ দানব তৈরি হয়, আমার জানতে ইচ্ছে করে!'

মুহূর্তের মধ্যেই অয়নের শরীর শক্ত হয়ে গেল। মাথাটা দপদপ করে উঠল।

মুখে সে যাই বলুক, বৈশালী যখন ওকে গালি দিচ্ছিল, তখন ওর অতটা রাগ হয়নি। কিন্তু যেই ও অয়নের 'মা'-কে টেনে আনল, অমনি নিজের অজান্তেই ওর মনের ভেতরে একটা অন্ধকার প্রকোষ্ঠের দরজা খুলে গিয়েছিল।

অয়ন নিজের মনেই থমকে গেল। সে সেদিন বৈশালীকে শাস্তি দিচ্ছিল ঠিকই, কিন্তু সেই তীব্র আক্রোশ, সেই ডমিনেশন... ওগুলো কি সত্যিই বৈশালীর জন্য ছিল?

না।

অয়নের শ্বাস হঠাৎ করেই ভারী হয়ে এল। বুকের ভেতরটা এক অজানা আতঙ্কে ছ্যাঁৎ করে উঠল।

সে স্পষ্ট বুঝতে পারল সেদিন ও বৈশালীর ওপর নিজের যে রাগের বোঝা চাপিয়ে দিয়েছিল, তার লক্ষ্য বৈশালী ছিল না। 

তার অবচেতন মন আসলে অন্য কাউকে শাস্তি দিতে চাইছিল। 

সেই নারীকে, যে ওকে জন্ম দিয়েছে, যে ওর সাথে চরম বিশ্বাসঘাতকতা করেছে, ওকে একার হাতে অন্ধকারে ঠেলে দিয়েছে।

সেদিনের শাস্তিটা সে আসলে বিদিশাকে দিতে চেয়েছিল। সে বিদিশাকে ওইভাবে নিজের নিচে পিষে ফেলতে চেয়েছিল, তাকে নিজের আয়ত্তে আনতে চেয়েছিল।

সে নিজের মায়ের শরীরের প্রতি জমে থাকা ক্ষোভ আর আদিম কামনা মেটানোর জন্য বৈশালীকে একটা প্রক্সি হিসেবে ব্যবহার করেছে!

সত্যিটা উপলব্ধি করার সাথে সাথে অয়নের মনে হল ওর শ্বাসনালীতে যেন কেউ একটা বরফের টুকরো গুঁজে দিয়েছে। ওর শ্বাস আটকে গেছে।

অয়ন নিজের হাতটা তুলে বুকের বাঁ দিকে রাখল। হার্টবিট পাগলের মতো ছুটছে। 

সে কি ধীরে ধীরে একটা সাইকোপ্যাথে পরিণত হচ্ছে?

নিজেকে হঠাৎ করেই খুব অচেনা আর খুব নোংরা মনে হলো ওর।

ঠিক সেই মুহূর্তে ল্যাব-রুমের দরজাটা খুলল।

অয়নের চিন্তার সুতোটা এক ঝটকায় ছিঁড়ে গেল। 

সে নিজেকে সামলে নিয়ে দ্রুত বর্তমানের মাটিতে ফিরে এল। পেশিগুলো আবার শিকারির মতো টানটান হয়ে উঠল।

সে চোখ খুলে সামনের দিকে তাকাল।

করিডোরের মাঝামাঝি একটা ল্যাব রুমের দরজা খুলে বেরোচ্ছে সিধু আগরওয়াল।

একটু মোটা, চোখে বড় ফ্রেমের চশমা, কাঁধে একটা ব্যাকপ্যাক। হাঁটার ধরনে একটা নার্ভাস, সতর্ক ভাব। সিধু কখনো সোজা পথে হাঁটে না, সব সময় দেওয়াল ঘেঁষে, চারদিক স্ক্যান করতে করতে হাঁটে। 

সিধু করিডোর ধরে এগিয়ে এসে সোজা গিয়ে বাঁ দিকের ওয়াশরুমের ভেতর ঢুকল।

অয়ন আর এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে নিঃশব্দে, দ্রুত পায়ে করিডোর ধরে এগোতে শুরু করল। করিডোরের মেঝেতে জুতোর কোন শব্দ হলো না।

৫

ওয়াশরুমের ভেতরটা স্যাঁতস্যাঁতে, ফিনাইলের উগ্র গন্ধের সাথে ভিজে ভাব, পরিবেশটাকে গুমোট করে তুলেছে। মাথার ওপরের টিউবলাইটটা ভোল্টেজ ফ্লাকচুয়েশনের কারণে একনাগাড়ে একটু পর পর জ্বলছে নিবছে, যা এই কলেজের সাথে বেমানান। এর ওপর বেসিনের একটা কল থেকে একটানা জল পড়ে যাচ্ছে, টিপ... টিপ...টিপ

সিধু বেসিনে ঝুঁকে মুখে জল দিচ্ছিল। এমন সময়...

'ক্লিক!'

দরজা লক হওয়ার শব্দটা ফাঁকা ওয়াশরুমের ঘরে ছড়িয়ে পড়লো। বদ্ধ বাথরুমে শব্দটা বেশ
জোরালো শোনাল।

আওয়াজ শুনে সিধু চমকে ঘাড় ঘোরাল। অয়নকে দেখে ওর কপালের ভাঁজ গভীর হলো। 

অয়নের রেকর্ড ক্যাম্পাসে সবার জানা।

অয়ন কোন তাড়াহুড়ো করল না। সে খুব ক্যাজুয়াল ভঙ্গিতে বেসিনের দিকে এগিয়ে এল। তারপর, পকেট থেকে মানিব্যাগটা বের করে একটা কড়কড়ে পাঁচশো টাকার নোট সিধুর দিকে বাড়িয়ে ধরল। 

"আমার একটা ইনফরমেশন দরকার সিধু।"

অয়নের গলা একদম স্বাভাবিক।

সিধু চোখ পিটপিট করল। হাতের জলটা প্যান্টে মুছে নিয়ে নোটটার দিকে একবার তাকাল, তারপর অয়নের দিকে।

"কী ইনফরমেশন ভাই? আমার কাছে এখন কোন অ্যাসাইনমেন্টের সল্যুশন নেই।"

"অ্যাসাইনমেন্ট নয়। রুদ্রপ্রতাপ। তোদের রুডি। ওর সম্পর্কে জানতে চাই। ওর মুভমেন্ট, হ্যাংআউট, উইক পয়েন্ট।"

রুডির নামটা শোনামাত্র সিধুর মুখের রঙ কাগজের মতো সাদা হয়ে গেল। ওর গলার কন্ঠাটা একবার ওঠানামা করল। সে পাঁচশো টাকার নোটটার দিক থেকে চোখ সরিয়ে এক পা পিছিয়ে গেল।
 
সিধু ঢোক গিলে বলল, 

"ভাই... তুই ভুল দরজায় নক করছিস। আমি কিছু জানি না। তুই তোর টাকা নিয়ে যা।"

অয়ন মানিব্যাগ থেকে আরও একটা পাঁচশো টাকার নোট বের করল।

"হাজার টাকা। জাস্ট কয়েকটা বেসিক ডিটেইলস। কেউ জানবে না তুই বলেছিস।"

সিধু এবার রীতিমতো কাঁপতে শুরু করেছে। টাকার লোভ ওর আছে, কিন্তু রুডির ভয় তার চেয়েও বেশি।

"তুই বুঝছিস না অয়ন!" 

সিধু ফিসফিস করে বলল, 

"রুডি কলেজের সাধারণ গুন্ডা নয়। টাকার জন্য আমি নার্সিংহোমে শুয়ে থাকতে পারব না ভাই। আমাকে যেতে দে।"

সিধু পাশ কাটিয়ে দরজার দিকে যাওয়ার জন্য পা বাড়াল।

অয়নের চোখের মণি দুটো এবার সরু হয়ে এল। সে নোট দুটো পকেটে ঢুকিয়ে রাখল।

সে বুঝতে পারল, সিধুর মনে টাকার লোভের চেয়ে রুডির ভয় অনেক বেশি। এমন কিছু করতে হবে যাতে সিধু মুখ খুলতে বাধ্য হয়।

অয়ন আর কথা বলল না। 

সিধু কিছু বুঝে ওঠার আগেই অয়নের ডান হাতটা সাপের মতো ছিটকে এসে সিধুর কলারটা মুঠো করে ধরল। তারপর সে এক হেঁচকায় সিধুকে পেছনের টাইলসের দেওয়ালে সজোরে চেপে ধরল।

সিধুর পিঠটা ঠান্ডা মার্বেলে আছড়ে পড়ল। অয়ন নিজের ডান হাতের কনুইটা সিধুর গলার ঠিক নিচে, কলারবোনের ওপর চেপে ধরল।

"উঁহ!" 

সিধুর মুখ দিয়ে একটা যন্ত্রণাকাতর অস্ফুট শব্দ বেরিয়ে এল। ওর পা মেঝে থেকে এক ইঞ্চি ওপরে ভাসছে।

অয়ন নিজের মুখটা সিধুর মুখের একদম কাছে নিয়ে গেল। দুজনের মাঝখানে মাত্র কয়েক ইঞ্চির ব্যবধান। 

অয়নের চোখ দুটো কুচকুচে কালো, গলার স্বর ফিসফিসে, বরফের মতো ঠান্ডা।

"তুই ঠিকই বলেছিস, সিধু। রুডি হয়তো কাল সকালে তোর হাত-পা দুটোই ভেঙে দেবে..." 

অয়ন কনুইয়ের চাপটা সামান্য বাড়াল, সিধুর শ্বাস আটকে আসতে শুরু করেছে।

"কিন্তু আমি এখন, এই মুহূর্তে তোর সামনে দাঁড়িয়ে আছি। তুই যদি আমাকে খবর না দিস, তবে কাল সকাল পর্যন্ত তোর হাত-পা, রুডির ভাঙার জন্য আস্ত থাকবে, তার গ্যারান্টি তুই দিচ্ছিস কীভাবে?"

সিধুর চোখ দিয়ে জল বেরিয়ে আসার জোগাড়। সে অয়নের কীর্তিকলাপের সাথে পরিচিত। ফেস্টের দিন যা হয়েছিল, সেটা কেউ ভোলেনি।

"ব...বলছি! বলছি ভাই, ছেড়ে দে!" 

সিধু হাঁপাতে হাঁপাতে দুই হাত তুলে সারেন্ডার করল।

অয়ন কলারের গ্রিপটা সামান্য আলগা করল, কিন্তু ওকে দেওয়াল থেকে ছাড়ল না।

"বল।"

"রুডি... রুডি এমনিতে ক্যাম্পাসে খুব একটা থাকে না।" 

সিধু দ্রুত শ্বাস নিতে নিতে বলতে শুরু করল,

"কিন্তু প্রতি বছর নিউ ইয়ার্সের পার্টিগুলোতে ও আসে। একটু রাত করে... দশটার পর। সাথে পার্সোনাল সিকিউরিটি আর মেয়ে থাকে।"

"কোন পার্টি ?" অয়ন ভুরু কুঁচকালো।

"আমি... আমি জানি না ভাই। স্টুডেন্ট কাউন্সিল অফিশিয়ালি কোনো পার্টি অর্গানাইজ করে না। কাউন্সিলের মেম্বাররা ক্যাম্পাসের পপুলার স্টুডেন্টদের থ্রো করা প্রাইভেট পার্টিগুলোতে ঘোরে।"

"এরকম কটা পার্টি হচ্ছে এবার?"

"অনেকগুলো, তবে মেইন পার্টি তিন-চারটেই হয়। সব ইনভাইট-অনলি। প্রচুর মদ, ড্রাগস থাকে... আর, ওসব পার্টিতে শুধু স্টুডেন্টরা যায় না।"

"আর কে যায়?" অয়ন তীক্ষ্ণ চোখে তাকাল।

সিধু ঢোক গিলল। 

"আমাদের কলেজের কালচার তো জানিসই। অনেক লেডি প্রফেসরও এই পার্টিগুলোতে আসে। বয়ফ্রেন্ডদের সাথে নাচাগানা করে, ড্রিঙ্ক করে। ওপেন সিক্রেট।"

কথাটা সিধু হয়তো নিজেকে বাঁচানোর জন্য একটা বাড়তি ইনফরমেশন হিসেবে দিয়েছিল। কিন্তু শব্দগুলো অয়নের কানে পৌঁছতেই ও একটা তীব্র ঝাঁকুনি খেল।

'লেডি প্রফেসররাও আসে।'

মুহূর্তের মধ্যে অয়নের চোখের সামনে গতকাল সকালের জিমের দৃশ্যটা ভেসে উঠল।

সুরঙ্গনা।

হলুদ স্পোর্টস ব্রায়ের খাঁজ থেকে উঁকি দেওয়া ভারী বুক, ঘামে ভেজা নির্মেদ উন্মুক্ত পেট, গোটা শরীরে জমে থাকা পুঁতির মতো স্বচ্ছ ঘামের বিন্দু, তার শরীর থেকে ভেসে আসা মাতাল করা মিষ্টি গন্ধ, গালের হালকা রক্তিম আভা, ওর একদম কাছে দাঁড়িয়ে ফিসফিস করে কথা বলা।

অয়নের মনে হচ্ছিল জিমের স্পেসে একান্তই তাদের দুজনের একটা প্রাইভেট এক্সক্লুসিভ জোন তৈরি হয়েছে।

কিন্তু এখন, সিধুর কথা শুনে অয়নের মাথায় অন্য একটা কল্পনা দানা বাঁধল।

নিউ ইয়ার্সের পার্টি। আবছা আলো, কান ফাটানো মিউজিক, অ্যালকোহলের গন্ধ। আর সেখানে সুরঙ্গনা ব্যানার্জী... একটা রিভিলিং পার্টি ড্রেস পরে কোন বারে বা ডান্স ফ্লোরে দাঁড়িয়ে আছে। তার হাতে মদের গ্লাস। সে মদ্যপ অবস্থায় অন্য কোন কলিগ বা কোন স্টুডেন্টের সাথে হাসাহাসি করছে, ঘনিষ্ঠ ভাবে নাচছে। কেউ ওর সরু কোমরে হাত রাখছে, ওর ঘাড়ের কাছে মুখ নিয়ে চুমু খাচ্ছে।

দৃশ্যটা চোখের সামনে ভাসতেই অয়নের চোয়াল পাথরের মতো শক্ত হয়ে গেল। বুকের ভেতরটা একটা তীক্ষ্ণ, জ্বালা ধরানো যন্ত্রণায় মোচড় দিয়ে উঠল। 

ঈর্ষা? পজেসিভনেস?

অয়ন নিজের এই অনুভূতিটাকে তীব্রভাবে অপছন্দ করল, কিন্তু সেটাকে অস্বীকার করতে পারল না। 

সুরঙ্গনা স্বাধীনচেতা, প্রচণ্ড আনপ্রেডিক্টেবল একজন মহিলা। সে যা খুশি করতে পারে।

নিজের অজান্তেই অয়নের হাতের মুঠো সিধুর কলারের ওপর আরও শক্ত হয়ে চেপে বসল।

"আহ! অয়ন... লাগছে ভাই!" 

সিধু কঁকিয়ে উঠল।

অয়ন ঘোর থেকে বেরিয়ে এল। নিজের দুর্বলতাটাকে সে মনের ভেতর তালাবন্ধ করে ফেলল।

"রুডি কোন পার্টিতে যাবে, তার কোন গ্যারান্টি নেই বলছিস ?"

অয়ন ঠান্ডা গলায় আবার জেরায় ফিরল।

"না... তবে..." 

সিধু ঢোক গিলল। ওর চোখ দুটো ভয়ে এদিক-ওদিক ঘুরছে। 

"তবে... আমার কাছে একটা উড়ো খবর আছে। বিক্রম হয়তো বৈশালীর নিউ ইয়ার্স পার্টিতে যেতে পারে। বৈশালী এবার বিশাল প্রাইভেট স্পেস ভাড়া করেছে।"

সিধু কাঁপা কাঁপা গলায় বলল। 

"আমি গ্যারান্টি দিচ্ছি না ভাই, তবে কাউন্সিলের কিছু কোর মেম্বার ওখানে ফর শিওর হাজির থাকবে।"

অয়নের ভ্রূ কুঁচকে গেল। 

"বিক্রম বৈশালীর পার্টিতে যাবে কেন? বৈশালী তো ওর সার্কেলের কেউ নয়।"

"সেটাই তো পয়েন্ট!"

সিধু একটু সাহস পেয়ে বলল, 

"ও বৈশালীদের পার্টিতে যেতে পারে মানে... হয়তো বিক্রমকে কেউ ইনভাইট করে এসেছে, অথবা... ওখানে এমন কেউ আসছে যাকে বিক্রম টার্গেট করেছে।

এর বেশি আমি কিচ্ছু জানি না ভাই, ভগবান কসম!"

অয়ন আস্তে আস্তে সিধুর কলারটা ছেড়ে দিল।

সিধু টলতে টলতে বেসিনের ধার ঘেঁষে দাঁড়িয়ে হাঁপাতে লাগল।

অয়ন আর সিধুর দিকে তাকাল না। ওর চিন্তার মোড় এখন সম্পূর্ণ অন্য দিকে ঘুরে গেছে।

বৈশালী আর জিনিয়ার পার্টি। জিনিয়া ওকে সেদিন মাঠেই ইনভাইট করেছিল। ও ঘুরিয়ে 'না' বলে দিল।

কিন্তু এখন পরিস্থিতি পালটে গেছে।

বিক্রম যদি ওই পার্টিতে আসে, তবে বিক্রমের আসল মোটিভ বোঝার জন্য এর চেয়ে ভালো সুযোগ আর পাওয়া যাবে না। 

অয়ন ধীরেসুস্থে পকেট থেকে পাঁচশো টাকার একটা নোট বের করে সিধুর পকেটে গুঁজে দিল।

"কিপ ইট। এই কনভারসেশনটার কথা যেন তৃতীয় কেউ না শোনে। যদি শোনে..."

"কেউ জানবে না ভাই! কেউ না!" 

সিধু টাকাটা খামচে ধরে জোরে জোরে মাথা নাড়ল।

অয়ন পিছন ঘুরে দরজার দিকে পা বাড়াল। ছিটকিনিটা খুলে দরজাটা সামান্য ফাঁক করে সে একবার ঘাড় ঘোরাল সিধুর দিকে।

অয়ন আর কোনো কথা না বলে ঘুরে ওয়াশরুম করিডোরের আবছা অন্ধকারে বেরিয়ে এল।

পরিস্থিতি খুব অদ্ভুতভাবে অন্যদিকে বাঁক নিয়েছে। ওকে ওই পার্টিটায় যেতেই হবে।

আবার ওকে বৈশালীর মুখোমুখি দাঁড়াতে হবে।
[+] 6 users Like RockyKabir's post
Like Reply
৬

২৯শে ডিসেম্বর, বিকেল সাড়ে তিনটে

লেক গার্ডেনসের নির্জন গলিটায় রোদের আলো ফিকে হয়ে এসেছে। রাস্তার সামনে অবস্থিত প্রাচীন রাধাচূড়া গাছটার ছায়াতে সামনের ফুটপাথের অংশটা ঢাকা পড়েছে, শীতল বাতাসে শুষ্ক ভাব। উঁচু উঁচু পুরনো গাছপালার ফাঁক দিয়ে নেমে আসা শীতের মিহি রোদটায় এক ধরণের থমথমে আলস্য।

দক্ষিণ কলকাতার এই অঞ্চলটায় ঢুকলে শহরের কোলাহল যেন কয়েক ডেসিবেল কমে যায়। পুরোনো দিনের ফ্ল্যাটবাড়ি, ড্রেনের ওপর জং ধরা লোহা দিয়ে বাঁধানো পথ আর রাস্তায় পড়ে থাকা নিম আর কৃষ্ণচূড়া গাছের ঝরা পাতার ওপর চালকের চাকার পেষণ, সব মিলিয়ে একটা ভারাক্রান্ত পরিবেশ।

হলুদ ট্যাক্সি থেকে নেমে ভাড়াটা মিটিয়ে দেওয়ার পর কয়েক সেকেন্ড রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে রইল অর্জুন। 

জ্যাকেটের পকেটে দু-হাত গুঁজে সে মাথা তুলে চেয়ে রইল সামনে দাঁড়িয়ে থাকা পুরোনো তিনতলা ফ্ল্যাটবাড়িটার দিকে। মুখে ক্লান্তি আর রাত জাগার ছাপ স্পষ্ট, কিন্তু চোখের তারায় শার্পনেস অক্ষুণ্ণ।

গত পঁচিশ তারিখ রাতেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন পোর্ট ট্রাস্টের চেয়ারম্যান শিশির কুমার রায়।

উডল্যান্ডসের আইসিইউ-তে তার ভেন্টিলেশন সাপোর্ট খোলার পর ডাক্তাররা সরকারিভাবে মৃত্যু ঘোষণা করতেই নবান্নের একটা বড় অংশ নাকি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছে। 

লালবাজার অত্যন্ত তড়িঘড়ি করে কেস ফাইল বন্ধ করে দিয়েছে, ‘ড্রাইভিং আন্ডার দ্য ইনফ্লুয়েন্স অফ অ্যালকোহল অ্যান্ড র‍্যাশ ড্রাইভিং’। 
মিডিয়া ব্যস্ত হয়ে পড়েছে ওনার সম্পত্তি কে পাবে আর পোর্ট ট্রাস্টের ভবিষ্যৎ চেয়ারম্যান কে হবে তা নিয়ে।

কিন্তু অর্জুন সেই স্রোতে গা ভাসায়নি। গত দু-দিনে একের পর এক ধাঁধার টুকরো জোড়া লেগে যে ছবিটা তৈরি হচ্ছে, সেটা কোন সাধারণ দুর্ঘটনার ইঙ্গিত দেয় না।

হাঁটতে হাঁটতে বিগত তিন দিনের ঘটনাক্রমটা অর্জুনের মনের ভেতর মাইন্ড-ম্যাপের মতো খুলে যেতে লাগল। এই বিষয়টা তার কাছে একটা অবশেসনে পরিণত হয়েছে।

সুব্রত চক্রবর্তীর দেওয়া হিন্ট আর প্যারাডিকের কথার সূত্র ধরে সে প্রথমে যোগাযোগ করেছিল ট্রাফিক সার্জেন্ট দেবাশীষের সাথে। বাইপাসের সেই বিটে ডিউটিতে থাকা দেবাশীষের সাথে দেখা করার পর অর্জুন জানতে পেরেছিল, অ্যাক্সিডেন্টের দিন দুপুর তিনটে থেকে রাত আটটা পর্যন্ত বাইপাসের ওই এরিয়াতে কেএমডিএ-র চার-চারটে হাই-রেজোলিউশন সিসিটিভি ক্যামেরা সম্পূর্ণ 'অফ' ছিল। এই পাঁচ ঘণ্টার লাইভ ফিড লালবাজার কন্ট্রোল রুমের সার্ভারে পৌঁছায়নি।

পুলিশের খাতায় এবং কেএমডিএ-র অফিসিয়াল লগে যা লেখা রয়েছে, তা শুনে অর্জুনের হাসি পেয়েছিল, 'এমার্জেন্সি মেইনটেন্যান্স অ্যান্ড অপটিক্যাল ফাইবার কেবিল রিপেয়ারিং'।

অর্জুনের এক নিজস্ব আইটি ফ্রিল্যান্সার বন্ধু, যে ডার্কওয়েব ও ট্রাফিক সার্ভারের পেছনের চিপ ট্র্যাকিংয়ে পারদর্শী, সে সায়েন্স সিটির মোড়ের একটা পেট্রোল পাম্পের সিসিটিভির ফুটেজ থেকে একটা অদ্ভুত জিনিস খুঁজে বার করে। 

প্যারাডিক বলেছিল সিলভার ফরচুনারের কথা, কিন্তু এই হ্যাকার বন্ধু ফুটেজের ডিজিটাল পিক্সেল ক্লিন করে দেখায় যে শিশির রায়ের কালো স্কোডাটাকে অনুসরণ করছিল এক কুচকুচে কালো রঙের নম্বরপ্লেটহীন স্করপিও।

সবচেয়ে মারাত্মক তথ্য যেটা অর্জুন পেয়েছে সেটা হল, সায়েন্স সিটির মোড় ঘুরেই এক্সিডেন্টের স্পটের আড়াইশো মিটার আগে সেই স্করপিও হাওয়ায় মিলিয়ে যায়নি। ওটা মেটিকুলাসলি সার্ভিস রোডে নেমে একটা পে-অ্যান্ড-পার্কিংয়ের ভিড়ে ঢোকে, ঠিক চার মিনিটের মাথায় ওখান থেকে অন্য একটা নম্বরপ্লেট চড়িয়ে বের হয়ে যায় !

এরকম নিখুঁত সময় মেপে রাস্তা ব্ল্যাকআউট করা কোনো স্থানীয় গুন্ডার পক্ষে আর এরকমভাবে ট্রাফিক লগ ম্যানিপুলেট করা নিচুতলার ট্রাফিক কনস্টেবল-সার্জেন্টের পক্ষে অসম্ভব। এর পেছনে বড় ক্ষমতার হাত জড়িত।

সাধারণ কোন পুলিশ অফিসারের নির্দেশে এভাবে সিসিটিভি ফিড বন্ধ হওয়া সম্ভব নয়। এরকম নির্দেশ কেবল আসতে পারে কেবল লালবাজারের অত্যন্ত ওপর তলা থেকে, নয়তো সরাসরি নবান্ন থেকে!

গতকাল বিকেলে দেবোত্তম ওর ডেস্কে এনে ফেলেছিল বহু প্রতীক্ষিত সিডিআর এবং এনক্রিপ্টেড ব্যাংক স্টেটমেন্টের এক সুবিশাল ফাইল।

দেবোত্তমের আনা সিডিআর চেক করতে গিয়ে অর্জুনের চোখে পড়েছিল সেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটা।

দুর্ঘটনার ঠিক তিন ঘণ্টা আগে, অর্থাৎ বিশে ডিসেম্বর বিকেল সাড়ে চারটে নাগাদ, শিশির রায় তাঁর বোন অনুসূয়া সেনকে ফোন করেছিলেন। কলটা আট মিনিট সাত সেকেন্ড স্থায়ী হয়েছিল। শিশির রায় অ্যাক্সিডেন্টের পরে ভেন্টিলেশনে চলে যাবার পর থেকে সেই আট মিনিটের কথোপকথন এখন এই খুনের রহস্যের একমাত্র প্রত্যক্ষ স্বাক্ষী।

পকেটে থাকা চিরকুটটায় চোখ বোলাল অর্জুন। লেক গার্ডেনস প্রেস ক্লাব লেন। সি-ব্লক, বিল্ডিং নম্বর ৪৭বি।

একটা চারতলা পুরোনো ইটের ফিনিশিং দেওয়া ফ্ল্যাটবাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল। দেয়ালের গায়ে লালচে নোনা ধরা ছোপ, এক কোণে জং ধরা পাইপ দিয়ে ড্রেনের জল ফোঁটা ফোঁটা করে পড়ছে এক পুরোনো সিমেন্টের গামলায়। সিঁড়ির মুখের নেমপ্লেটগুলোর ওপর ধুলোর আস্তরণ।

৭

তিনতলায় ওঠার সিঁড়িটা বেশ খাড়াই, গোটা বিল্ডিংয়েই থমথমে নির্জনতা বিরাজ করছে।

প্রতিটি ধাপে অর্জুনের বুটের আওয়াজ প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল। তিনতলার ল্যান্ডিংয়ে পৌঁছে বাঁদিকের ভারী কাঠের দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়াল সে। দরজার একপাশে পেতলের একটা ছোট্ট ফলকে লেখা: 'অরূপ সেন / অনুসূয়া সেন'।

অর্জুন বেল বাজাল।

ভেতর থেকে কোন শব্দ এল না। 

কয়েক সেকেন্ড পর আবার কলিং বেল টিপল সে। এবার ভেতর থেকে কাঠের দরজার ভেতরের ইন্টারলক খোলার একটা ধাতব 'ক্লিক' শব্দ পাওয়া গেল।

দরজাটা ইঞ্চি তিনেক ফাঁক হলো। নিরাপত্তা চেনের আড়াল থেকে উঁকি দিল এক মাঝবয়সী নারীর মুখ।

বয়স পঞ্চাশের কোঠায়। পরনে একটি অতি সাধারণ সুতির ছাপা শাড়ি, চুলে কোনো যত্ন ছাড়া খোঁপা করা, চোখে চশমা। 

কিন্তু ওনার চেহারায়, চোখের কোণে জমে থাকা কালচে ছোপে শোাকের চেয়েও অনেক বেশি যা স্পষ্ট ফুটে উঠছিল, তা হল তীব্র আতঙ্ক।

"কাকে চাই?" ওনার কণ্ঠস্বর খসখসে, থমথমে।

"নমস্কার। ম্যাডাম অনুসূয়া সেন?" 

অর্জুন নিজের স্বভাবসুলভ মার্জিত ভঙ্গিতে ঘাড় নাড়ল। 

"আমার নাম অর্জুন লাহিড়ী। আমি 'দ্য স্টেটসম্যান' পত্রিকা থেকে আসছি..."

কথাটা শেষ হতে পারল না। 'স্টেটসম্যান' আর 'পত্রিকা' শব্দ দুটো শোনামাত্রই অনুসূয়া সেনের মুখখানা মুহূর্তে ঘৃণায় ও রাগে বিকৃত হয়ে উঠল। তিনি এক হেঁচকায় দরজাটা পুরোপুরি বন্ধ করে দিতে গেলেন।

"বেরিয়ে যান এখান থেকে! আপনাদের কোনো লজ্জা নেই? একটা মানুষ মারা গেল, পোস্টমর্টেমের পর বডি সৎকার হলো, আর আপনারা শকুনদের মতো এখনও মাংস ছিঁড়ে খেতে পেছনে লেগে আছেন? সংবাদমাধ্যমের এই নোংরামির জন্যই আমার দাদার এই অবস্থা হয়েছে! কোনো উত্তর দেব না আমি। জাস্ট গেট আউট!"

দরজা বন্ধ হওয়ার ঠিক আগের মুহূর্তে অর্জুন নিজের ডান হাতটা কাঠের ফ্রেমের খাঁজে আটকে দিল। সজোরে আঘাতটা ওর হাতে এসে পড়লেও ও মুখে কোন ব্যথার ভাব ফুটতে দিল না। অর্জুন এক চুলও নড়ল না।

সে খুব শান্ত, কিন্তু খাদে নামানো বরফশীতল গলায় উচ্চারণ করল,

"ম্যাডাম, আমি আপনার দাদার মৃত্যুর খবর বেচে খবর বিক্রি করতে আসিনি। আমি জানি ওনার রক্তে অ্যালকোহল ছিল না। আমি এখানে এসছি কারণ শিশির কুমার রায়কে কোনো অ্যাক্সিডেন্টে মারা হয়নি... ওনাকে নিখুঁত পরিকল্পনায় খুন করা হয়েছে। আর আপনিও সেটা জানেন।"

কথাগুলো থমথমে বাতাসে যেন চাবুকের মতো আছড়ে পড়ল।

অনুসূয়া সেনের হাতটা হঠাৎ অবশ হয়ে আটকে গেল। 

ওনার চোখের মণিতে এক মারাত্মক শিহরণ খেলে গেল। তিনি কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে অর্জুনের চোখের দিকে তাকিয়ে রইলেন, সেখানে সাংবাদিকের কৌতূহল নেই, বরং এক অদ্ভূত জেদ কাজ করছে।

ধীরে ধীরে দরজার সিকিউরিটি চেনটা খুলে দিলেন অনুসূয়া দেবী।

"ভেতরে আসুন। তবে বেশিক্ষণের জন্য নয়। আমার স্বামী বাইরে গেছেন।" 

ওনার গলাটা এবার কাঁপছে।

বসার ঘরটা ছোট, ছিমছাম। জানলাগুলোতে গাঢ় নীল রঙের ভারী পর্দা ফেলা, ফলে দুপুরের রোদ সেভাবে ঘরে প্রবেশ করতে পারছে না। সেজন্য ভেতরটা বেশ অন্ধকার। দেওয়ালঘড়ির সশব্দ টিকটিক আওয়াজ ছাড়া চারপাশ নিঝুম।

বসার ঘরে সাধারণ বেতের আসবাবপত্র, একপাশে বইয়ের তাক আর দেওয়ালে টাঙানো এক বয়স্ক দম্পতির পুরনো সাদা-কালো ছবি।

অনুসূয়া দেবী অর্জুনকে বসতে না বলে নিজেই উল্টোদিকে সোফায় গিয়ে বসলেন। হাত দুটো কোলের ওপর শক্ত করে ভাঁজ করা।

"আপনি কী করে জানলেন যে দাদাকে খুন করা হয়েছে?" 

তিনি সোজা অর্জুনের চোখে চোখ রেখে প্রশ্ন করলেন।

অর্জুন অনুমতি না নিয়ে সোফায় বসে পড়ল। বসেই নিজের জ্যাকেটের ভেতর থেকে একটা পকেট ডায়েরি বার করল।

"কারণ সেদিন বাইপাসের পাঁচ ঘণ্টার সিসিটিভি ফুটেজ নেই, উধাও করে দেওয়া হয়েছে, শিশিরবাবুর ব্লাড রিপোর্ট ম্যানিপুলেট করার চেষ্টা হয়েছিল আর ওনার পেছনে যে নম্বরপ্লেটহীন গাড়িটা ছিল, তার খবর ধামাচাপা দেওয়া হচ্ছে। 

ম্যাডাম, আপনার দাদা শিশির রায় কোন ধোয়া তুলসী পাতা ছিলেন না। পোর্টের হাজার কোটি টাকার লিজিং, প্রোটোকল লিক আর ব্যাকডোর ডিলিংয়ের সাথে উনি যুক্ত ছিলেন। কিন্তু উনি একা একাজে যুক্ত ছিলেন না।"

অনুসূয়া দেবী একটা তেতো হাসি হাসলেন।

"জানি। সেজন্যই আমি ওর সাথে সম্পর্ক শেষ করে দিয়েছিলাম। দাদা শেষের দিকে ক্ষমতার দম্ভে অন্ধ হয়ে গিয়েছিল। ওই ডাইনিটা ওকে গিলে খেল।"

অনসূয়া দেবীর চোখ দিয়ে একফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল। 

"মিডিয়া আর পুলিশ ওকে মাতাল বানিয়ে দিল! ও অত্যন্ত দায়িত্বশীল মানুষ ছিল।"

অর্জুন ভ্রূ কুঁচকাল। 

"ডাইনি? আপনি ওনার স্ত্রী অমৃতা রায়ের কথা বলছেন?"

"স্ত্রী?" 

অনুসূয়া সেন হঠাৎ সোজা হয়ে বসলেন। ওনার গলার স্বর এবার উঁচুতে উঠে গেল।

"অমৃতা সাক্ষাৎ কালনাগিনী! আপনারা সংবাদপত্রে লেখেন অমৃতা রায় নাকি প্রেম করে বিয়ে করেছিল! অ্যাক্সিডেন্টে মরে গিয়ে অমর হয়ে গেল ! সব মিথ্যে! বাজে কথা!"

"মানে? ওদের বিয়ের পেছনে অন্য গল্প ছিল?"

"শুনুন তবে," অনুসূয়া দেবী নিজের চশমাটা খুলে সশব্দে টি-পয়ের ওপর রাখলেন। 

"দাদা আর অমৃতার বিয়ে ভালোবাসার টানে হয়নি। ওটা একটা ব্ল্যাকমেইল। অমৃতা কাস্টমস আর পোর্টের বেশ কিছু গোপন ফাইলের ক্লাসিফাইড কপি এবং কিছু এনক্রিপ্টেড পেনড্রাইভ নিজের কব্জায় নিয়েছিল। এমন কিছু ডেটা, যা বাইরে প্রকাশ পেলে দাদার চাকরি তো যেতই, সাথে ওকে জীবনের বাকি সময়টা জেলে পচতে হতো। অমৃতা সেই ফাইলগুলো দেখিয়ে বাধ্য করেছিল ওকে বিয়ে করতে!"

অর্জুন সোজা হয়ে বসল।

"আমার দাদাটা লোভী ছিল ঠিকই, কিন্তু এতটা নীচ ছিল না। অমৃতা ওর জীবনে ঢোকার পর থেকেই ও নিজের অস্তিত্ব হারাতে শুরু করে। বিয়েটা হবার পর পোর্টের গোপন সব ফাইল, টেন্ডারের ভিতরের খবর, সব অমৃতার হাত দিয়ে বাইরে পাচার হতো।"

অর্জুন একটু থেমে প্রশ্নটা ছুঁড়ল, 

"ম্যাডাম, অমৃতা রায় তো শিশিরবাবুকে বিয়ের আগে একটা লজিস্টিকস কোম্পানিতে এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টরের পিএ হিসেবে কাজ করতেন?"

অনুসূয়া দেবী একটা তেতো হাসি হাসলেন। 

"পিএ? শুধু পিএ ছিল ভাবছেন আপনি? এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টরের সাথে অমৃতার সম্পর্ক শুধু পেশাদারি চাকরির ছিল না! ওই ডিরেক্টর ভদ্রলোক নিজেই অমৃতাকে শিশিরের পেছনে লাগিয়েছিলেন! উনিই তো একটা বিজনেস পার্টিতে প্রথম দাদার সাথে অমৃতার পরিচয় করিয়ে দেন ।"

অর্জুন সোজা হয়ে বসল। 

"তার মানে অমৃতা রায় আগেই ছক কষে শিশিরবাবুর কাছে এসেছিল?"

"একদম!" 

অনসূয়াদেবী ফুঁসে উঠলেন। 

"অমৃতা সাধারণ মেয়ে ছিল না। বড় বড় প্লেয়ারদের সাথে ওর ওঠাবসা ছিল।"

অর্জুনের অভিজ্ঞ ব্রেন হিসাব কষতে শুরু করল।

যেই ডিরেক্টরের কথা বলা হচ্ছে... সেই অরুণের কথা অর্জুন আগে থেকেই জানে। অরুণের পুরো নাম অরুণ চ্যাটার্জী। সে অমৃতা চাকরি ছাড়ার বহু আগেই পুরনো লজিস্টিকস কোম্পানির পদ ছেড়ে বিশ্বখ্যাত ভ্যানগার্ড গ্লোবালে যোগ দেয় এবং এখন তাদের ইস্টার্ন জোনের সর্বেসর্বা!

"ম্যাডাম।"

অর্জুন জিজ্ঞেস করল, 

"আপনি কি অরুণ চ্যাটার্জীর কথা বলছেন?" 

অর্জুন নিচু, কড়া গলায় শুধাল।

অনুসূয়া দেবী এক মুহূর্ত থমকালেন। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

"হ্যাঁ! অরুণ চ্যাটার্জী। ব্যবসায়িক সূত্রে দাদার সাথে অরুণের বহু বছরের ওঠাবসা। বিজনেস সার্কেলে ওরা একে অপরকে ক্ষমতার চাবিকাঠি হিসেবে ব্যবহার করত। আপনি বিশ্বাস করবেন না, শিশির আর অমৃতার যখন রেজিস্ট্রি বিয়ে হয়, এই অরুণ চ্যাটার্জী নিজে দাঁড়িয়ে থেকে সেই ম্যারেজ রেজিস্টারে প্রধান সাক্ষী হিসেবে সই করেছিল!"

অর্জুনের মাথার ভেতরে মুহূর্তের মধ্যে একাধিক সংযোগ জোড়া লেগে গেল!

চাকরির বাইরেও অমৃতা আর শিশির রায়ের সাথে অরুণের একটা বোঝাপড়া ছিল!

কিন্তু কেন? অরুণ চ্যাটার্জী নিজের সাবেক পিএ-কে শিশির রায়ের ঘাড়ে চাপিয়ে দিতে যাবে কেন?

"দুর্ঘটনার কদিন আগে..." 

অনুসূয়া দেবীর গলা হঠাৎ কাঁপতে শুরু করল, ওনার চোখে চরম আতঙ্কের মায়াজাল।

"দাদা হঠাৎ আমার এখানে এসেছিল। খবর না দিয়েই এসেছিল। আমি বহুবছর ওর সাথে সম্পর্ক রাখি না।

ওকে ভীষণ আতঙ্কিত দেখচ্ছিল। আমি এত বছরে আমার দাপুটে দাদাকে কখনও ওভাবে ভয়ে তোতলাতে শুনিনি। ওর গলা কাঁপছিল। 

ও আমাকে স্পষ্ট বলেছিল, 'অনু, আমি আর পারছি না... এরা আমাকে মেরে ফেলবে অনু... এরা আমাকে বাঁচতে দেবে না!'"

অর্জুনের চোখের পাতা পড়ে থমকে গেল।

এই কারণেই কি বাইপাসে সেই নৃশংস দুর্ঘটনা? একই সাথে অমৃতাকে নিশ্চিহ্ন করা আর শিশিরকে চিরতরে ভেন্টিলেশনে পাঠিয়ে মুখ বন্ধ করে দেওয়া?

"আপনার কাছে কি কোনো লিখিত প্রমাণ আছে ম্যাডাম?" 

অর্জুন নিজেকে সামলে নিয়ে দ্রুত প্রশ্ন করল। 

"শুধু মুখে বললে আইনের চোখে এটা টিকবে না। কোনো প্রমাণ... কোনো মেসেজ বা কাগজ?"

অনুসূয়া দেবী কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইলেন। ওনার মুখের অবয়বে এক মারাত্মক দ্বন্দ্ব চলছে। একদিকে নিজের প্রাণের ভয়, অন্যদিকে সত্য প্রকাশের ইচ্ছা।

অবশেষে তিনি উঠে দাঁড়ালেন। 

ঘরের কোণে রাখা একটা পুরোনো কাঠের আলমারির কাছে গেলেন। পকেট থেকে চাবি বের করে ড্রয়ারটা খুললেন। সেখান থেকে একটা ভাঁজ করা, হলদেটে হয়ে যাওয়া কাগজের টুকরো আর একটা প্রিন্টআউট বের করে নিয়ে আসলেন।

তিনি কাগজ দুটো অর্জুনের হাতে তুলে দিলেন।

"এটা শিশিরের হাতে লেখা শেষ নোটের টুকরো, যা সে গত মাসে আমার কাছে একটা সীল করা খামে পাঠিয়ে রেখেছিল। আর নিচেরটা হলো মৃত্যুর দু-দিন আগে শিশিরের ফোনে আসা একটা এনক্রিপ্টেড মেসেজের স্ক্রিনশট, যা ও আমাকে ড্রপবক্স লিঙ্কে পাঠিয়েছিল।"

অর্জুন চোখের পলক না ফেলে কাগজ দুটোর ওপর নজর বুলাল।

হাতে লেখা নোটটায় শিশির রায়ের নিজের সই করা মেসেজ: 'If anything happens to me, look into the cross-docking servers. The Master Key has been sold.'

আর পেছনের প্রিন্টআউটটায় একটা মেসেজের স্ক্রিনশট, যা পাঠানো হয়েছে এক আন-ট্রেসেবল ভার্চুয়াল আইডি থেকে: 

'Your time is up, Roy. The files have shifted. Clean up your tracks or no place will be safe for you.'

অর্জুনের শিরদাঁড়া দিয়ে একটা তীব্র বিদ্যুত তরঙ্গ বয়ে গেল!

সে ধীরেসুস্থে নিজের স্মার্টফোন বের করে কাগজ দুটোর স্পষ্ট হাই-রেজোলিউশন ছবি তুলে নিল। তারপর অত্যন্ত যত্নের সাথে মূল কাগজ দুটো অনুসূয়া দেবীর হাতে ফেরত দিল।

"এগুলো নিজের কাছে খুব সাবধানে লুকিয়ে রাখুন আর চেষ্টা করবেন কিছুদিন কলকাতার বাইরে পরিচিত কারো বাড়িতে গিয়ে থাকতে। এই ফ্ল্যাটটা নিরাপদ নয়।" 

অর্জুন গম্ভীর গলায় সতর্ক করল।

অনুসূয়া দেবী ক্লান্তভাবে হাসলেন। 

"আমার হারানোর আর কিছু নেই, অর্জুনবাবু। তবে আপনি সাবধানে থাকবেন। এরা কেউ মানুষ নয়।"

অর্জুন নিজের ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে উঠে দাঁড়াল।

"অনেক ধন্যবাদ, অনুসূয়াদেবী। আপনার এই সাহায্য একটা বিশাল বড় অন্ধকারকে আলোয় আনতে সাহায্য করবে।"

দরজা খুলে সিঁড়িঘরের অন্ধকারে পা বাড়াল অর্জুন।

ভারী কাঠের দরজাটা আবার পেছনে 'ঠাস' শব্দে বন্ধ হয়ে গেল।

তিনতলার সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামার সময় অর্জুনের মনের ভেতরে ঝড় বইছে।

অরুণ চ্যাটার্জী,  আগে অমৃতার বস আর একটা প্রাইভেট লজিস্টিকস কোম্পানির এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর ছিল। 
অমৃতা শিশিরকে ব্ল্যাকমেইল করে বিয়ে করে এবং পোর্টের গোপন খবর বাইরে পাচার করত।
অতি সম্প্রতি, "মাস্টার কী" বিক্রি হয়ে গেছে। কিন্তু, এই মাস্টার কী-টা কী জিনিস ?

চার: হতে পারে এই মাস্টার কী হাতবদল হওয়ার অপরাধেই বাইপাসের বুকে সায়েন্স সিটির মোড়ে নিখুঁত মার্ডার! শিশির ও অমৃতা, উভয়কেই পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেওয়া!

ফ্ল্যাটবাড়ির নিচে গ্রিলের গেটটা ঠেলে ফাঁকা রাস্তায় এসে দাঁড়াল অর্জুন। হিমশীতল হাওয়াটা এসে ওর মুখে আছড়ে পড়ল। শীতের সূর্যটা আকাশ থেকে ধূসর এক আলো ছড়াচ্ছে।

রাস্তায় নেমেই অর্জুনের ভেতরের ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় হঠাৎ তীব্র সতর্কতায় টানটান হয়ে উঠল। একজন পোড় খাওয়া ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিস্টের এই ইনস্টিনক্ট কখনোই ভুল হয় না।

সে পকেটে হাত গুঁজে খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে দাঁড়াল। ডানপাশের একটা বন্ধ দোকানের কাঁচের ডিসপ্লেতে পড়া প্রতিফলনে চোখ রাখল।

রাস্তার উল্টোদিকে, প্রায় পঞ্চাশ গজ দূরে, মেহগনি গাছের ছায়ায় স্টার্ট দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে একটা গাঢ় ধূসর রঙের হেডলাইট-ঢাকা স্পোর্টস বাইক।

বাইকের ওপর যে লোকটা বসে আছে, তার মাথায় চড়ান একটা কুচকুচে কালো রঙের ফুল-ফেস ভাইজার ওয়ালা হেলমেট। গাঢ় চামড়ার জ্যাকেট পরা। সে একদম স্থির হয়ে অর্জুনের প্রতিটি মুভমেন্ট লক্ষ্য করছে।

অর্জুন খেয়াল করল, বাইকের পেছনের নম্বরপ্লেটটা কাদার চটে এমনভাবে ঢাকা যে একটা অক্ষরও পড়া যাচ্ছে না!

অর্জুনের বুকটা হালকা ধক করে উঠল। সে লেক গার্ডেনসের এই ফ্ল্যাটে এসেছে মাত্র আধঘণ্টা আগে, আর ইতিমধ্যেই তার ওপর সার্ভেল্যান্স বসিয়ে দেওয়া হয়েছে!

তার মানে একটা অদৃশ্য হাত অর্জুনের প্রতিটি পদক্ষেপের ওপর ছায়ার মতো নজর রাখছে!

অর্জুন বিন্দুমাত্র আতঙ্কের চিহ্ন প্রকাশ করল না। সে ঠোঁটের কোণে এক চিলতে কঠিন, তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটিয়ে তুলল।

সে জ্যাকেটের পকেট থেকে সিগারেট বের করার ছলে পিছন ঘুরে সোজা বাইকারটার দিকে দু-সেকেন্ড তাকাল, তারপর খুব ধীরে সুস্থে হাঁটা দিল মেন রোডের দিকে, যেখানে ট্যাক্সি পাওয়া যায়।

হাঁটতে হাঁটতে অর্জুন পকেট থেকে নিজের এনক্রিপ্টেড ফোনটা বের করল। দ্রুত ডায়াল করল দেবোত্তমের নম্বর।

দ্বিতীয় রিংয়েই দেবোত্তম ফোন তুলল। 

"হ্যাঁ অর্জুনদা! বল।"

"দেবোত্তম," 

অর্জুনের গলার স্বর সাবধানী কিন্তু পাথরের মতো শক্ত।

"তোর কাজ আরও বেড়ে গেল। এক্ষুনি আমাদের প্রাইভেট ডেটাবেস খুলে অরুণ চ্যাটার্জীর একটা কমপ্লিট পার্সোনাল ব্যাকগ্রাউন্ড প্রোফাইল বের কর।"

"অরুণ চ্যাটার্জী কে?" 

দেবোত্তম অবাক হয়ে শুধাল।

"ভ্যানগার্ড গ্লোবাল ইন্ডিয়ার ইস্টার্ন জোন হেড।" 

অর্জুন ট্যাক্সির জন্য হাত বাড়াতে বাড়াতে বলল।

"ওনার পাস্ট হিস্ট্রি, আগে কোন কোন কোম্পানিতে ছিলেন, অমৃতা রায়ের সাথে ওনার অফ-দ্য-রেকর্ড লেনদেন, আর সবচেয়ে বড় কথা,
ভ্যানগার্ডের প্রাইভেট সার্ভারের সাথে পোর্ট ট্রাস্টের কী কী চুক্তি সম্প্রতি সই হয়েছে, সব চাই। কাল সকালের মধ্যে।"

"হয়ে যাবে অর্জুনদা। কিন্তু তুমি কোথায় এখন?"

"আমি এইমাত্র একটা বিষাক্ত সাপকে লেজ ধরে টেনে গর্ত থেকে বের করেছি।" 

অর্জুন হেঁয়ালিভরা উত্তর দিল। বলতে বলতেই একটা হলুদ ট্যাক্সি এসে ওর সামনে দাঁড়াল।

ট্যাক্সির দরজা খোলার আগে অর্জুন আবার আড়চোখে পিছন ফিরে দেখে নিল। সেই গাঢ় ধূসর বাইকটা ধীর গতিতে ওর ট্যাক্সির পিছন পিছন এগোতে শুরু করেছে।

অর্জুন ট্যাক্সির পেছনের সিটে উঠে বসে দরজাটা সশব্দে বন্ধ করল।

"সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউ চল।" 

ড্রাইভারকে নির্দেশ দিল অর্জুন।

ট্যাক্সিটা লেক গার্ডেনসের গলি ছেড়ে মেন রোডে পড়তেই অর্জুন সিটে গা এলিয়ে দিল।
[+] 3 users Like RockyKabir's post
Like Reply
৮

২৯শে ডিসেম্বর 

বিকেল পাঁচটা বেজে গেছে।

জোকা-বিষ্ণুপুর ছাড়িয়ে দক্ষিণে আমতলায় দিকের বাইপাসে পৌঁছানোর আগেই ডিসেম্বরের ফ্যাকাশে, ম্লান রোদটুকু ছাইরঙা শীতের ধোঁয়াশায় ঝাপসা হয়ে আসছিল। 

দু-পাশে মেহগনি, ইউক্যালিপটাস আর ঝাউগাছের দীর্ঘ সারি। কলকাতার ব্যস্ত, কোলাহলমুখর কেন্দ্রস্থল থেকে প্রায় পঁচিশ কিলোমিটার দূরের এই নির্জন রাস্তায় ট্রাফিকের হর্ন বা শহরের চেনা হাঁকডাক, কোনটাই পৌঁছায় না।

একটি গাঢ় কালচে-ধূসর রঙের মার্সিডিজ-বেঞ্জ সি-ক্লাস সেডান এসে থামল তিন-মানুষ-সমান উঁচু, সুদৃঢ় পেটা লোহার কালো গেটটার সামনে। গাড়ির পেছনের দরজাটা খোলার সাথে সাথেই ভেতরে কনকনে ঠাণ্ডা উত্তরের হাওয়া এসে ঢুকল। 

গাড়ি থেকে নামল অনন্যা মালহোত্রা।

তার পরনে একটা নিখুঁত কাটের ডার্ক চকোলেট-ব্রাউন ওভারকোট, ভেতরে হাই-নেক ক্যাশমেয়ার সোয়েটার আর ডার্ক ব্লু ট্রাউজার্স। চোখে বড় ফ্রেমের কালো রোদচশমা। কাঁধে ঝোলানো ইতালিয়ান লেদারের সাধারণ একটা শোল্ডার ব্যাগ। পায়ে উঁচু হিলের ব্ল্যাক লেদার বুট।

গাড়ির চাকা মাটির রাস্তায় থামতে যেটুকু শব্দ হয়েছিল, সেটা মিলিয়ে যাওয়ার পর চারপাশটা আবার এক অদ্ভুত, থমথমে নীরবতায় ডুবে গেছে।

অনন্যা গাড়ি থেকে নেমে সেই নিস্তব্ধতার মাঝে কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। শ্বাস নিতেই তার নাকে এসে লাগল ভিজে ঘাস আর স্যাঁতসেঁতে মাটির সোঁদা গন্ধ। 

ওভারকোটের পকেটে দুটো হাত পুরে দিয়ে সে মাথা তুলে একবার ওপরের দিকে তাকাল। আজ দুপুরে ফ্লাইট ধরে মুম্বই থেকে কলকাতায় এসে ল্যান্ড করার পরে সে এয়ারপোর্ট থেকে সে কাউকে ফোন করেনি, কোন হোটেলে ওঠেনি, আলিপুরের 'মালহোত্রা ম্যানশন'-এর ধারেকাছে ঘেঁষা তো দূরের কথা। 

একটা প্রাইভেট কার ছুটিয়ে সে সোজা এই নির্জন প্রান্তরে এসে হাজির হয়েছে।

কালো লোহার বিশাল গেটটির পাশে বড় বড় হরফে পেতলের বোর্ডে নাম খোদাই করা রয়েছে-

'হরাইজন সাইকিয়াট্রিক এন্ড নিউরোলজিক্যাল কেয়ার'

গেট পেরিয়ে ভেতরে পা রাখলেই যেন এক অন্য জগৎ। যার সাথে কলকাতার চেনা কোলাহলের কোন মিল নেই। প্রায় পনেরো একর জমি জুড়ে বিস্তৃত এই প্রাঙ্গণটিকে বাইরে থেকে দেখলে প্রথমে কোন বিলাসবহুল রিসর্ট বলে ভুল হতে পারে।

গেট থেকে সোজা মেন বিল্ডিংয়ের দিকে চলে গেছে দীর্ঘ ড্রাইভওয়ে। তার দু-পাশে নিখুঁতভাবে ছাঁটা মেহগনি ও দেবদারু গাছের সারি। ইতালিয়ান মার্বেলে তৈরি ফোয়ারাটার চারপাশে পাতা ঝরার শব্দ ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই।

তবে, এই রাজকীয় আভিজাত্যের ঠিক নিচেই জড়িয়ে আছে এক নিষ্ঠুর সত্য।

খুঁটিয়ে দেখলেই বোঝা যায় প্রকৃতপক্ষে এটি ভারতের অন্যতম ব্যয়বহুল প্রাইভেট সাইকিয়াট্রিক ফেসিলিটি।

পুরো চত্বরটাই দশ ফুট উঁচু সীমানা প্রাচীর দিয়ে ঘেরা। তার ওপর বসানো সূক্ষ্ম কাঁটাতারের জাল। প্রতি পঞ্চাশ মিটার অন্তর সিসিটিভি ক্যামেরা বসানো রয়েছে, যেগুলোর প্রত্যেকটি ৩৬০ ডিগ্রিতে অনবরত ঘুরছে। মেহগনি গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকা সিকিউরিটি গার্ডদের পরনে গাঢ় নীল রঙের পেশাদার ইউনিফর্ম, তাদের কানে ওয়ারলেস ইয়ারপিস। 

এরা সবাই বিশেষভাবে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত, যেকোন ধরণের জরুরি অবস্থা বা হিংস্র রোগী সামলাতে অভ্যস্ত।

এখানকার খরচ সাধারণ মানুষের কল্পনার বাইরে। 

মাসে লাখ লাখ টাকা গুনতে হয় স্রেফ একট রুমের পেছনে। শহরের উঁচুতলার মানুষজন- শিল্পপতি, অভিনয় জগতের লোকজন কিংবা এলিট পরিবারের যেসব সদস্যরা মানসিক সমস্যায় ভোগের অথবা নিজেদের মনস্তাত্ত্বিক ভারসাম্য পুরোপুরি হারিয়ে ফেলেন, যাদের কথা মিডিয়াতে প্রকাশ পাওয়া মানেই ফ্যামিলি বা ব্র্যান্ড ইমেজের চিরতরে ধস নামা; তাদেরকেই অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে এনে এখানে রাখা হয়।

গোপনীয়তাই এখানকার সবচেয়ে বড় পণ্য। কারা এখানে ভর্তি আছে, তাদের কী চিকিৎসা হচ্ছে, তারা বেঁচে আছে না মরে গেছে, সেসব খবর এই দশ ফুটের বিশাল প্রাচীর ডিঙিয়ে বাইরের আসবার কোনো রাস্তা নেই।

৯

অনন্যা ধীর পায়ে মূল ভবনের ইতালিয়ান মার্বেলে বাঁধানো সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে এল।

সে সামনে দাঁড়াতে স্বচ্ছ কাঁচের স্লাইডিং ডোরটা স্বয়ংক্রিয়ভাবে দু-পাশে সরে গেল। ভেতরে ঢোকার সাথে সাথে বাইরের ঠান্ডা হাওয়াটা এক লহমায় উধাও হয়ে গেল, তার জায়গা নিল সেন্ট্রাল হিটিংয়ের কৃত্রিম উষ্ণ হাওয়া। হাওয়ায় কড়া অ্যান্টিসেপ্টিক আর ক্লোরিনের গন্ধ, চারপাশে একটা থমথমে ভাব।

রিসেপশনে বসে থাকা তরুণী এক্সিকিউটিভ অনন্যাকে দেখেই সোজা হয়ে দাঁড়াল। অনন্যার মুখের রোদচশমাটা ততক্ষণে ক্যাশমেয়ার সোয়েটারের কলারের ওপর নেমে এসেছে।

মেয়েটি অনন্যাকে চেনে। সে এর আগে অনন্যাকে অনেকবার দেখেছে। 

"গুড আফটারনুন, মিস মালহোত্রা।" 

তরুণী খুব নিচু স্বরে বলল। তার গলায় যেমন কোন উচ্ছ্বাস নেই, তেমনই অতিরিক্ত কোন সতর্কতার সুর অনুপস্থিত। 

"ডক্টর বোস ওনার কেবিনে আছেন। আমি কি ওনাকে খবর দেব?"

"না।" 

অনন্যা বরফ-শীতল গলায় অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত জবাব দিল। রিসেপশনিস্টের সাথে কথা বলার সময় তার চোখ ছিল ডানে প্রান্তের করিডোরের দিকে। 

"কারো আসার দরকার নেই। আমি একাই যাচ্ছি।"

"ইয়েস, ম্যাম। সুইট ১০৪ একদম রেডি।"

অনন্যা কোন উত্তর দিল না। মার্বেল পাথরের পালিশ করা মেঝেতে হিলের 'ঠক, ঠক' শব্দ তুলে সে ডানদিকের ভিআইপি উইংয়ের লম্বা, নিঝুম করিডোরে মিলিয়ে গেল।

এই করিডোরটা সাধারণ হাসপাতালের করিডোরগুলোর মতো নয়। এখানে লোকজনের যাতায়াত নেই। দেওয়ালে প্যাস্টেল শেডের দামি প্যানেলিং, মেঝেতে পুরু কার্পেট পাতা। গোটা করিডরে একনাগাড়ে নরম, হলুদরঙা এলইডি স্ট্রিপ লাইট জ্বলছে। পুরো পরিবেশটাই এমনভাবে তৈরি, যে এখানে সকাল কোনটা আর রাত কোনটা, তা বাইরে থেকে বোঝার কোনো উপায় নেই।

প্রতিটা ঘরের বন্ধ মেহগনি দরজার পাশে একটি করে ছোট ডিজিটাল মনিটর, যাতে রোগীর পালস, হার্ট রেট আর ইলেকট্রনিক লক স্ট্যাটাস দেখা যাচ্ছে। বাইরে থেকে ভিজিটর এলেও ভেতর থেকে দরজা লক করে রাখা নিয়ম।

অনন্যা একটার পর একটা বন্ধ দরজা পার হয়ে এগিয়ে চলল। প্রতিটা সুদৃশ্য, ঝকঝকে ঘরের ভেতরে যারা বন্দি হয়ে আছে, তারা সবাই আসলে 'উধাও হয়ে যাওয়া' কিছু আত্মা। শহরের এলিট সমাজে অথবা খবরের কাগজের পাতায় এদের কারোর খোঁজ মিলবে না।

করিডোরের একদম শেষ মাথায়, সাউথ-ওয়েস্ট কর্ণারে শেষ দরজাটার সামনে এসে অনন্যা থেমে গেল।

দরজার ওপর পিতলের পাতের ওপর খোদাই করা, '104'।

অন্যান্য ঘরগুলোর মতো এই ঘরের দরজার পাশে কোনো ডিজিটাল বোর্ড নেই। অনন্যা পকেট থেকে একটা এনক্রিপ্টেড কার্ড বের করে দরজার পাশে সেন্সরে স্পর্শ করালো।

সাথে সাথেই একটা 'বীপ' শব্দ হলো। ভারী, সাউন্ডপ্রুফ মেহগনি কাঠের দরজাটা নিঃশব্দে খুলে গেল।

অনন্যা এক মুহূর্ত দরজাটার হ্যান্ডেল আঁকড়ে ধরে করিডরে দাঁড়িয়ে রইল। তার মেদহীন চোয়ালটা ক্ষণিকের জন্য ভীষণ শক্ত হয়ে উঠল, কপালে দুটো সূক্ষ্ম রগ ফুটে উঠল। সে একটা দীর্ঘ, গভীর শ্বাস টানল। অ্যান্টিসেপ্টিক আর ঘরের ভেতরের এক অদ্ভুত পুরনো বন্ধ হাওয়ার মিশ্রণ তার বুকের ভেতরটা ভারী করে দিল।

এতবার এখানে আসার পরেও এই ঘরে পা রাখতে গেলে সে স্থবির হয়ে যায়। 

তারপর অত্যন্ত আলতো ভাবে দরজাটা ঠেলে সে ভেতরে পা রাখল আর পেছন থেকে দরজাটা নিঃশব্দে ভেজিয়ে দিল।

১০

রুম 104 একটি সাধারণ মানসিক হাসপাতালের সাইকিয়াট্রিক ওয়ার্ডের মতো নয়। আটশো স্কোয়ার ফিটের এই সুইটটি অত্যন্ত সুসজ্জিত হলে কী হবে, বীভৎস রকমের প্রাণহীন।

ঘরের একদিকের দেওয়ালে প্রকাণ্ড একজোড়া সুউচ্চ ফ্রেঞ্চ উইন্ডো, কিন্তু তার কাঁচগুলো ইমপ্যাক্ট-রেজিস্ট্যান্ট। 

জানালাগুলোর বাইরে লোহার মজবুত গ্রিলগুলো সুন্দর কাঠের জাফরির আড়ালে এমনভাবে লুকোনো যে বাইরে থেকে দেখলে স্থাপত্যের নকশা বলে মনে হবে। জানালার ভারী, গাঢ় নীল রঙের ভেলভেটের পর্দাগুলো অর্ধেক টানা। সেই ফাঁক দিয়ে বিকেলের ম্লান আলো এসে পড়েছে ঘরের একপাশে।

ঘরের মধ্যিখানে পাতা রয়েছে একটি চওড়া, আরামদায়ক সেমি-মেডিকেটেড বেড। তার ধবধবে সাদা চাদরে কোথাও এক ফোঁটা ভাঁজ নেই। ঘরে কোনো কাঁচের টেবিল বা ধাতব ভাস্কর্য রাখা হয়নি, কারণ তা ভেঙে সহজেই ধারালো কিছু বানিয়ে নেওয়া সম্ভব।
সব আসবাবপত্রের কোণগুলো গোল করে তৈরি, অত্যন্ত নরম ফোম আর দামি লেদারে মোড়ানো।

ঘরের এক কোণে রাখা একটা নিচু সোফা আর অন্য কোণে একটি বড় ভিক্টোরিয়ান স্টাইলের আর্মচেয়ার জানালার দিকে মুখ করে রাখা।
সেই আর্মচেয়ারটিতে নিশ্চল হয়ে বসে আছেন এক প্রৌঢ়া মহিলা।

প্রথম দর্শনেই ওনাকে দেখলে মনে হতে পারে, উনি কোনো জীবিত মানুষ নন। ওনার পরনে একটি ধবধবে সাদা, অত্যন্ত নরম সুতির লিনেন হাউজ-গাঢ় গাউন, যার কলারটা গলার কাছে পরিপাটি করে বোতাম দেওয়া। কাঁধের ওপর আলতো করে ফেলা একটি হালকা ছাইরঙা দামী শাল।

এক নজরে দেখে মহিলার বয়স আন্দাজ করা কঠিন। শুধু এটাই বোঝা যাচ্ছে ভাঙা স্বাস্থ্য আর বয়সের ছাপ মিলে ওনাকে আসল বয়সের চেয়ে অনেকটাই বেশি বয়স্ক দেখাচ্ছে। এককালে তিনি যে সুন্দরী ছিলেন সেটা তার মুখের হাড়ের গঠনে স্পষ্ট ফুটে উঠেছে।

ওনার গায়ের রং রক্তশূন্যতার কারণে আর বছরের পর বছর রোদ না পেয়ে ফ্যাকাশে, নিস্তেজ। চোখের নিচে গাঢ়, কালচে গর্ত। গালের হাড় দুটো চামড়া ঠেলে বাইরে বেরিয়ে আসতে চাইছে। ঠোঁট দুটো শুকিয়ে পাতলা, খসখসে রেখার মতো হয়ে গেছে।

মাথার কাঁচা-পাকা দীর্ঘ চুল অত্যন্ত যত্নে আঁচড়ে একটা আলগা খোঁপা করে কাঁধের ওপর ফেলে রাখা হয়েছে। অথচ সেই চুলের বেশির ভাগ জুড়ে জেঁকে বসেছে অকাল বার্ধক্যের নিষ্ঠুর, ধবল ছাপ।

কিন্তু সবচেয়ে হৃদয়বিদারক অংশ হলো ওনার চোখ দুটো। আধ-বোজা, ঘোলাটে, ধূসর মণি দুটি এক্কেবারে স্থির। জানালার কাঁচ পেরিয়ে বাইরে মেহগনি গাছের পাতার ওপর নেমে আসা শীতের কুয়াশার দিকে তিনি একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন।

চোখের সামনে অনন্যা এসে দাঁড়ালেও ওকে দেখে ওনার চোখের মণি এক মিলিমিটারও নড়ল না। যেন ওনার চেতনার শেষ সলতেটুকু বহু আগে কেউ এক ফুঁয়ে নিভিয়ে দিয়ে চলে গেছে।

ওনার বুকের খাঁচাটা শাল আর লিনেন গাউনের নিচ থেকে খুব ধীর ছন্দে, অতি কষ্টে ওঠানামা করছে। উনি শ্বাস নিচ্ছেন। কিন্তু, তার মধ্যে জীবনের কোনো স্পন্দন নেই।

উনি এই পৃথিবীতে শারীরিকভাবে উপস্থিত আছেন ঠিকই; কিন্তু, ওনার মন, ওনার আত্মা বহু আগেই এক অসীম অন্ধকারে তলিয়ে গেছে। উনি বেঁচে থাকা এক অনুভূতিহীন লাশ।

অনন্যা ঘরের কাঠের মেঝের ওপর নিঃশব্দে কয়েক পা এগিয়ে এল। তার প্রতিটা পদক্ষেপে সাথে সাথে শান্ত, ক্ষুরধার, কর্পোরেট অনন্যা মালহোত্রার শক্ত বর্মটা একটু একটু করে খসে পড়তে শুরু করল।

আর্মচেয়ারটার খুব কাছে এসে দাঁড়াতেই, অনন্যার হাত থেকে ব্যাগটা কার্পেটের ওপর খসে পড়ল।

অনন্যা কিছুক্ষণ থমকে দাঁড়িয়ে প্রৌঢ়া মহিলার দিকে তাকিয়ে রইল। 

বাইরে থেকে আসা সেই ম্লান আলোয় মহিলার ফ্যাকাশে, রক্তহীন গাল আর ঘোলাটে চোখের মণি দুটো স্পষ্ট হয়ে উঠতেই অনন্যার ভেতরে শক্ত করে বেঁধে রাখা আবেগের দেয়ালগুলো যেন এক লহমায় চুরমার হয়ে যেতে লাগল।

সে কোনো কথা বলল না। সে ধীরে ধীরে হাঁটু মুড়ে আর্মচেয়ারটির ঠিক পাশে, মেঝের ওপর বসে পড়ল।

তার দু-হাতে দামী ডার্ক চকোলেট-ব্রাউন ওভারকোটের হাতা গুটানো। সে অত্যন্ত সযত্নে, যেন একটু জোরে ছোঁয়া লাগলেই সামনের মানুষটি কাঁচের পুতুলের মতো ভেঙে যাবে, এমন আশঙ্কা নিয়ে, নিজের কাঁপতে থাকা ডান হাতটা বাড়িয়ে দিল।

তার হাতটা গিয়ে স্পর্শ করল প্রৌঢ়া মহিলার ডান হাতকে।

মহিলার হাতটি বরফের মতো ঠান্ডা। চামড়া আলগা হয়ে এসেছে, চামড়ার নিচ দিয়ে নীলচে রক্তনালীগুলো স্পষ্ট ফুটে উঠে মার্বেল পাথরের নকশার মতো দেখাচ্ছে। অনন্যার উত্তপ্ত হাতের স্পর্শ পেয়েও ওনার শরীরের পেশিতে কোনো প্রতিক্রিয়া হলো না। তার হাতের আঙুলগুলো একটুও নড়ল না, একদম স্থির রইল। 

অনন্যা আলতো করে ওনার ঠাণ্ডা, শীর্ণ হাতটি নিজের দু-হাতের মুঠোর মধ্যে টেনে নিল। সে তার গরম তালু দিয়ে ওনার জমে যাওয়া হাতটায় একটু উষ্ণতা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করতে লাগল। কিন্তু প্রৌঢ়া মহিলার দৃষ্টি আগের মতোই জানালার বাইরের ফাঁকা আকাশের দিকে স্থির রইল।

অনন্যার ঠোঁট থরথর করে কেঁপে উঠল। কিন্তু, গলার বাতাস চিরে কোন শব্দ বের হলো না। স্রেফ ঠোঁটের কোণে এক থরথর কম্পন তৈরি হয়ে তা আবার ঘরের থমথমে বাতাসের মধ্যে মিলিয়ে গেল।

অনন্যা অন্য হাতটা তুলে প্রৌঢ়া মহিলার মাথার কাঁচা-পাকা চুলে রাখল। তার লম্বা, সুগঠিত আঙুলগুলো দিয়ে সে অত্যন্ত সাবধানে, অপার মমতায় ওনার চুলে হাত বুলাতে লাগল। চুলে হাত বোলাতে বোলাতে অনন্যা নিজের শরীরটাকে আরেকটু ওপরের দিকে তুলে ওনার ফ্যাকাশে গালের খুব কাছে নিয়ে এল।

অনন্যা কোনোদিন কারোর সামনে নিজের দুর্বলতা দেখায় না। ঝানু কর্পোরেট প্লেয়ারদের চোখে চোখ রেখে কথা বলার সময় হোক বা মিটিংয়ে কোনরকম ডিল করার সময়, অনন্যার মুখ পাথরের মতো ভাবলেশহীন থাকত।

কিন্তু আজ, এই নির্জন ঘরের ভেতরে, এই প্রৌঢ়া মহিলার হাঁটুতে মাথা ছোঁয়াতেই অনন্যার সেই পাথুরে মুখোশটা ভেঙে সম্পূর্ণ চুরমার হয়ে গেল।

তার চোখ দুটো ভিজে উঠল। কপালের চারপাশের রগগুলো ফুলে উঠলো। চোখের পাতা বেয়ে টপ টপ করে প্রৌঢ়া মহিলার লিনেন গাউনের কোলের ওপর গরম অশ্রুজল ঝরে পড়তে লাগল। কিন্তু অনন্যার কান্নায় ফুঁপিয়ে ওঠার কোন আওয়াজ ছিল না।

যে কান্না গলার ভেতর আটকে রেখে কোন মানুষ ভেতরে ভেতরে নিজেকে প্রতি মুহূর্তে তিলে তিলে জ্বালিয়ে মারে, এটা সেই প্রকৃতির নীরব আত্মদহন।

অনন্যা এবার ওনার কপালে নিজের কপালটা ঠেকালো। প্রৌঢ়া মহিলার ত্বক ঠান্ডা, কোনো উত্তাপ নেই। 

অনন্যার চিবুক কাঁপছিল।

একসময় তার ভিজে যাওয়া চোখের মণির ভেতরে কান্নার জলের নিচে, হিংস্রতা ফুটে উঠল। অনন্যা আবার ওনার হাত দুটো নিজের গালের সাথে চেপে ধরল।

প্রৌঢ়া মহিলার ঘোলাটে চোখের মণি তখনও স্থির। উনি জানেন না ওনার কোলে কে মাথা রেখে নিঃশব্দে অশ্রু ফেলছে। উনি জানেন না ওনার জীবনের কোন অভিশাপ এই মেয়েটির রগে রগে বিষ হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে।

উনি স্রেফ অপলক চোখে জানালার অসীম শূন্যতার দিকে তাকিয়ে রইলেন। অনন্যা নিচু গলায় ফিসফিস করে ওনার কানে কান ঠেকিয়ে বলে উঠল,

"আর বেশি দিন নয়...। আর বেশি দিন নয়।"

ওর গলার স্বর থমথমে ঘরের জমাট বাতাসকে যেন এক লহমায় চাবুকের মতো কেটে বেরিয়ে গেল।

কে এই প্রৌঢ়া মহিলা?

যার নাম, পরিচয়, উপস্থিতি সবকিছু এই পনেরো একরের সুরক্ষিত প্রাচীরের নিচে বন্দি করে রাখা হয়েছে?

অনন্যা মালহোত্রা, যে নিজের পরিবার আর ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু থেকে নিজেকে গুটিয়ে রেখে বাইরের দুনিয়ায় ঘুরে বেড়ায়, তার সাথে এই রহস্যময় মহিলার কী সম্পর্ক?

উত্তরগুলো অধরাই রইল।

শুধু বিকেলের ম্লান আলোটুকু জানালার কাঁচ থেকে মুছে গিয়ে রুম 104-এর ভেতরে ধীরে ধীরে জায়গা করে নিতে শুরু করল সন্ধ্যার অন্ধকার। আর সেই অন্ধকারের ভেতর নিঃশব্দে বসে রইল দুটি নারী।
[+] 10 users Like RockyKabir's post
Like Reply
অসাধারণ আপডেট দাদা | অয়ন vs স্টুডেন্ট কাউন্সিলের action scene এর অপেক্ষায় রইলাম |
[+] 1 user Likes bad_boy's post
Like Reply
ভাই আপনার গল্পের লেখার ধরন অসাধারণ। এটা নিয়ে কোন সন্দেহ নেই ৯/১০। কিন্তু ভাই গল্পের চরিত্রগুলো যেভাবে বাড়তেছে, তাতে হয়তো গল্পের মান কমে যেতে পারে। এত এত চরিত্র ভাই একসাথে মিলানো খুব কঠিন কাজ।
[+] 2 users Like Green6520's post
Like Reply
ভালো লাগছে গল্প টা... এতো চরিত্রের আগমন আমার মতে গল্প টাকে আরো আকর্ষণীয় করছে.. সুরঙ্গনার সাথে অয়নের রসায়ন চোখে পড়ার মত... পরবর্তী পর্বের অপেক্ষায় থাকলাম
[+] 2 users Like Aragon's post
Like Reply
আপনার প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই বলছি,গল্পেের এতো চরিত্র মনে রাখা কঠিন!! আপনি অনেক কষ্ট করে লিখছেন, অন্যদিকে আমরা গল্পের চরিত্র গুলিয়ে ফেলছি, স্যার
[+] 1 user Likes Monika Rani Monika's post
Like Reply
অসাধারণ গল্পটা বুঝতে খুব কস্ট হচ্ছে। আপনি চালিয়ে জান নতুন আপডেটের অপেক্ষায়।
Like Reply
Darun darun ak kotha outstanding.. But aktai problem character khub besi... Onek character ke bujtei parchilam na 1st 1st mane mone nai.. Boddo besi character.. But update is awasome
Like Reply
সব পাঠকের মতো আমারো নতুন নতুন চরিত্র গুলোকে বুঝতে গিয়ে, পুরোনো সব চরিত্র ও তাদের ঘিরে প্লট সব গুলিয়ে ফেলেছি। কোন চরিত্রের কি রোল, কি মটিভ, সব মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে। হযবরল অবস্থা ?
Like Reply
বেশিরভাগ পাঠক-পাঠিকা সম্প্রতি গল্পে বহু চরিত্রের সমাবেশ নিয়ে অভিযোগ জানিয়েছেন। আমি একসাথে সবাইকে উত্তর দিচ্ছি।

রিডার গল্পটা পড়ে রিভিউ করে। কিন্তু, লেখক হিসাবে আমি জানি গল্প লেখার সময় আমার মাথায় কী চলছে। এগুলো আমি আগেও লিখেছি।



আমি যখন গল্পটা লিখতে বসি তখন আমি গেম অফ থ্রোনস দ্বারা inspired ছিলাম। আমি ওইধরনের এপিক কাহিনী লিখতে চেয়েছিলাম যেটা একটা বৃহৎ জায়গা জুড়ে ঘটবে, যেখানে অনেক চরিত্র থাকবে। সেটা আমি একেবারে না করে ধাপে ধাপে করেছি।

এই গল্পটার মোট তিনটে পার্ট।

অধ্যায় ৮ থেকে ১৭ ফেস্টিভাল আর্ক, অধ্যায় ১৮ থেকে ২৩ সিম্পোজিয়াম আর্ক আর তারপর থেকে এই সিজনের লাস্ট আর্ক শুরু হয়েছে। তার আগের যে দুটো চ্যাপ্টার আমি লিখেছি, সেদুটোকে ধরছি না কারণ ওগুলো আমি ইতালির কাহিনী, যা আমার নয়, সেইটা শেষ করব বলে লিখেছিলাম। গল্প শুরু হচ্ছে আট নম্বর চ্যাপ্টার থেকে, ইতালির ঘটনার চার-সাড়ে চার বছর পরে,

অয়ন কলেজে ভর্তি হবার চার মাস পরে যখন বিদিশা কলেজে চাকরিতে জয়েন করছে। আমি ইচ্ছে করেই টাইম স্কিপ করে গেছি আর চেষ্টা করেছি গল্পটা যতটা সম্ভব নির্মেদ থাকে। এজন্য বর্তমান আর্কে মিঃ প্রধানকে আর বক্সিং ক্লাবকে আনিনি।

প্রথম আর্কটা মূলত অয়ন-বিদিশা-বিক্রমের ত্রিভুজ নিয়ে শুরু। শুধু এই আর্কটা পড়লে রিডারদের মনে হবে গল্পটা কেবল এই নিয়েই।

কিন্তু, আমি তখনই ভেবে নিয়েছিলাম যে গল্পটি এদের তিনজনকে নিয়ে লিমিটেড থাকবে না।

তাই, প্রথম আর্কের শেষে অয়ন আর বিদিশার মুখ দেখাদেখি বন্ধ হবার পরে সিম্পোজিয়াম আর্কে তাদের আলাদা জীবন দেখিয়েছি।

বর্তমান যে আর্ক চলছে সেখানে এই গল্পের বিশাল ক্যানভাস আস্তে আস্তে উন্মোচিত হতে শুরু করেছে। ক্যানভাস বড় হলে নতুন নতুন চরিত্র আসবেই। গল্পটার মূল দুটো চরিত্র বিদিশা আর অয়ন হলেও গল্পটা কেবল এদের ঘিরে আবর্তিত হবে না। ভবিষ্যতে গল্পের জগত আরো বড় হবে এবং আরো অনেক চরিত্রের আগমন হবে।

আবার বলছি সবার সমান গুরুত্ব আছে।

প্রথম আর্কে আমি অয়ন-বিদিশা-বিক্রম বাদে ইচ্ছে করেই আর কোন মেজর চরিত্রে ফোকাস করিনি। তখন গল্পের জগতটাও খুব ছোট ছিল।

কিন্তু, বর্তমানে এসে আর এটা করা সম্ভব নয় কারণ গল্পের ওয়ার্ল্ড অনেক বড় হয়ে গেছে আর কলেজ ছাড়িয়ে বাইরের জগতে কী ঘটছে সেটা দেখানো হচ্ছে কারণ কাহিনী এগোনোর জন্য এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ।
[+] 1 user Likes RockyKabir's post
Like Reply
(24-08-2026, 07:45 AM)bad_boy Wrote: অসাধারণ আপডেট দাদা | অয়ন vs স্টুডেন্ট কাউন্সিলের action scene এর অপেক্ষায় রইলাম |

লাইক আর রেপুর জন্য ধন্যবাদ। সঙ্গে থাকুন।
Like Reply




Users browsing this thread: 4 Guest(s)