Thread Rating:
  • 72 Vote(s) - 2.81 Average
  • 1
  • 2
  • 3
  • 4
  • 5
Erotic Thriller মরীচিকা ও মোহময়ী
৬

দুপুর ১২টা 


তারাতলা ফ্লাইওভারের উপর সার দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ডাম্পার, কন্টেনার ট্রেইলার আর গুটিকয়েক প্রাইভেট কার। 

২৫শে ডিসেম্বর মানে কলকাতা শহরের অর্ধেক লোক যখন ভিক্টোরিয়া আর পার্ক স্ট্রিটে টুপি মাথায় দিয়ে ঘুরছে, তখন তারাতলা ক্রসিংয়ে বাতাসে শুধু পোড়া ডিজেল আর ডাম্পারের কালচে ধোঁয়ার চেনা গন্ধ।

পেছনের সিটে বসে কাচটা ইঞ্চিখানেক নামালেন অরুণ চ্যাটার্জী।

হর্নের যন্ত্রণায় কান ঝালাপালা হওয়ার জোগাড়। তারাতলা মোড়ের ঠিক মুখে ট্রাফিক পুলিশ ভারী লোহার ব্যারিকেড টেনে পথ আটকে দিয়েছে। ওপরে নীল-সাদা লাইটগুলো একটানা ফ্ল্যাশ করে যাচ্ছে, যদিও দুপুরবেলা সেগুলোর আলো প্রায় চোখেই পড়ে না।

"স্যাল, আগে তো গাড়ি একদম নড়ছে না।"

ড্রাইভার শিবু বারবার স্টিয়ারিংয়ে হাত চাপড়াচ্ছিল। তার কপালে ঘাম। ডিসেম্বরের শীতের মধ্যে গাড়ির এসি চালিয়েও তার অস্বস্তি কমছে না।

অরুণ ঘড়ি দেখলেন। বারোটা বেজে পাঁচ। তার গাড়ি আধঘন্টার উপর জ্যামে দাঁড়িয়ে আছে। হাতঘড়ির ডায়ালটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে তার মেজাজটা আরও খিঁচড়ে গেল। ভ্যানগার্ড গ্লোবাল ইন্ডিয়ার ইস্টার্ন জোনের হেড হিসেবে কাজ করার একটা মস্ত বড় সমস্যা হলো, সময় জিনিসটাকে সেকেন্ডে মাপার অভ্যাস হয়ে যায়। সিঙ্গাপুর বা রটারড্যামে জাহাজের বার্থিং টাইম যদি চার মিনিট এদিক-ওদিক হয়, তবে লক্ষ ডলারের ডেমারেজ গুনতে হয়। 

আর এখানে, কলকাতায়, চার কিলোমিটারের দূরত্ব পার করতে ঘন্টার পর ঘণ্টা স্রেফ ট্রাফিকের গাড্ডায় হাওয়া হয়ে যায়।

ডিসগাস্টিং !

"গাড়ি ডানদিকে কাটাও তো, শিবু। পুলিশটাকে গিয়ে জিজ্ঞেস করো ঝামেলাটা কীসের।" 

অরুণ ধমকের সুরে বললেন।

শিবু ডাবল ইন্ডিকেটর জ্বালিয়ে গাড়িটা ফুটপাতের দিকে চাপাতে চাপাতে গলা বাড়াল। ঠিক তখনই ব্যাজ পরা এক প্রবীণ পুলিশ, হাতে ওয়্যারলেস সেট নিয়ে, গাড়ির কাচে টোকা দিলেন। পুলিশের মুখটা চেনা চেনা লাগল অরুণের।

জানালার কাচ পুরোটাই নামিয়ে দিলেন তিনি।

তারাতলা থানার সাব-ইনস্পেক্টর সুশীল পাত্র। 

 "সুশীলবাবু ? কী ব্যাপার বলুন তো ? দুপুরবেলা পুরো রোড ব্লক করে ব্যারিকেড কেন ?"

সুশীল পাত্র মুখ থেকে খৈনির লাল রসটা পাশে থুতু ফেলে তোয়ালে দিয়ে গাল মুছলেন। এই পুরনো অভ্যাসটা এত বছরেও বদলালো না।

সুশীল পাত্র চালকের পাশের কাচ দিয়ে ঝুঁকে অরুণের চেহারাটা দেখে চিনতে পারলেন। দরজার ধাতব ফ্রমে কনুই ঠেকিয়ে নিচু গলায় বললেন,

"ওহ, অরুণবাবু! আপনি এই লাইনে ? গার্ডেনরিচের দিকে যাচ্ছেন নাকি?"

"হ্যাঁ, সুভাষ ভবনের দিকে যাওয়ার কথা। হাইড রোড দিয়ে তো গাড়ি এগোচ্ছেই না। সমস্যাটা কী ?"

সুশীলবাবু চারপাশটা একবার দেখে নিয়ে অরুণের গাড়ির দরজার ওপর কনুই ঠেকিয়ে নিচু গলায় বললেন, 

"কাল রাত সাড়ে এগারোটা থেকে ছোটা আকবর আর সানোয়ারের গ্যাং এর মধ্যে ধুন্ধুমার শুরু হয়েছে। এখন র‍্যাফ নেমেছে। চারদিক পুলিশে ছয়লাপ। ক্যানাল রোড থেকে হাইড রোড পর্যন্ত পুরো রাস্তা বন্ধ।"

অরুণের ভুরু কুঁচকে গেল। 

ছোট আকবর আর সানোয়ার ?

"কী নিয়ে গন্ডগোল হয়েছে ?"

"সিন্ডিকেটের পুরনো ক্যাঁচাল বলেই মনে হচ্ছে, কিন্তু এবারের জল অনেক দূর অবধি গড়িয়েছে। পুলিশকে লক্ষ্য করে ইট পর্যন্ত পড়েছে। একটু পরে ডিসি সাউথের স্পটে আসবার কথা। আপনি গাড়ি ঘুরিয়ে সোজা টালিগঞ্জের দিকে বেরিয়ে যান। আজ ওদিকে যাওয়া যাবে না।"

এমন সময় ওয়্যারলেসে কোনো একটা জরুরি কল সুশীলবাবু পেয়ে পিছু হটলেন।

অরুণ সিটে পিঠ ঠেকিয়ে দিলেন। ভ্যানগার্ড গ্লোবালের ইস্টার্ন জোন হেড হিসেবে এই ডক এরিয়ার ঘাঁতঘোঁত আর তার নিয়ন্ত্রণ কার হাতে, সব তার নখদর্পণে। 

ছোট আকবর আর সানোয়ার, দুটোই রাজ্যের মন্ত্রী ববি হাসানের আশ্রিত গুন্ডা। একই পার্টির প্রোটেকশনে থাকায় দুজনের মধ্যে ঝামেলা এক প্রকার বন্ধই ছিল।

হঠাৎ কী হল ?

ঠিক তখনই পকেটে ফোনটা কেঁপে উঠল।

অরুণ ফোনটা বের করে স্ক্রিনে নামটা দেখলেন,

ডেপুটি চেয়ারম্যান, পিপিটি। কলকাতা পোর্ট ট্রাস্টের ডেপুটি চেয়ারম্যান অমিতাভ সেনগুপ্ত।

আজকের মিটিংটা তার সাথেই হওয়ার কথা ছিল।

অরুণ ফোনটা কানে তুললেন। 

"হ্যাঁ, অমিতাভবাবু। আমি তারাতলার মোড়ে আটকে আছি। শুনলাম গার্ডেনরিচে প্রবলেম হয়েছে ?

ওপাশ থেকে অমিতাভ সেনগুপ্তের শান্ত, কিন্তু কিছুটা চাপাস্বরে কথা ভেসে এল, 

"ঠিকই শুনেছেন অরুণবাবু। আমি আজকে সুভাষ ভবনে যাইনি। আজকের মিটিংটা ওখানে হচ্ছে না।"

"তা হলে? প্রেজেন্টেশনের জন্য যে প্রিলিমিনারি রিপোর্টটা রেডি করার কথা ছিল, সেটার কী হবে? মুম্বইয়ের অফিস কিন্তু আজ সন্ধের মধ্যে আপডেট চেয়েছে।" 

অরুণের গলায় বিরক্তি স্পষ্ট।

"হবে। মিটিং আজই হবে। তবে অফিসে নয়।" 

অমিতাভবাবু অল্প সময় নীরব থেকে বললেন, 

"আপনি গাড়ি ঘুরিয়ে নিন। সোজা স্ট্র্যান্ড রোডের দিকে আসুন।"

"স্ট্র্যান্ড রোড? হেড অফিসে?"

"না, হেড অফিস নয়।" 

অমিতাভ সেনগুপ্ত গলা আরও নামালেন, 

"ফেয়ারলি প্লেস ঘাটের কাছে 'ময়ূরাক্ষী' নামে পোর্টের একটা রিভার ভেসেল নোঙর করা আছে। আপনি সোজাসুজি লঞ্চের ওপর উঠে আসুন।"

অরুণ একটু অবাক হলেন। 

"লঞ্চে? হঠাৎ নদীর ওপর মিটিং কেন?"

ওপাশ থেকে একটা ভারী নিঃশ্বাস ছাড়ার শব্দ পাওয়া গেল। 

"অরুণবাবু, আজ আপনার সাথে একজনের কথা বলিয়ে দেব। উনি মিডিয়ার নজর এড়িয়ে আপনার সাথে কথা বলতে চান। আপনি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এখানে চলে আসুন।"

ফোনটা কেটে গেল।

অরুণ কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে ফোনের কালো স্ক্রিনটার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর গম্ভীর গলায় নির্দেশ দিলেন,

"শিবু, গাড়ি ঘোরাও। চেতলা হয়ে আলিপুর রোড ধরো। তারপর রেড রোড হয়ে সোজা ফেয়ারলি প্লেস।"

শিবু দক্ষ হাতে স্টিয়ারিংটা ঘুরিয়ে কায়দা করে গাড়িটা বাঁকিয়ে নিয়ে জ্যাম থেকে বেরিয়ে এসে সোজা ডায়মন্ড হারবার রোড দিয়ে গাড়ি ছুটিয়ে দিল। 

সিটে গা এলিয়ে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে অরুণ তখন কদিনে যা যা ঘটে গেছে সেগুলো পরপর সাজাতে চেষ্টা করছিলেন।

কলকাতায় ফিরে অমৃতার মৃত্যুর খবরটা শোনার পর থেকে অরুণের সব চিন্তাভাবনা ওলটপালট হয়ে গেছে। ওর কোন সন্দেহ নেই যে অমৃতার দুর্ঘটনা আসলে একটা সুপরিকল্পিত মার্ডার।

তার আগে অবধি তিনি বিদিশাকে 'J' বলে সন্দেহ করছিলেন। কিন্তু, এখন অনন্যা ছাড়া আর কারোর কথা তিনি ভাবতেই পারছেন না। 

একজন আউটসাইডার এত সেনসেটিভ ইনফরমেশন পায় কোথা থেকে ?

মুম্বইয়ে "আবার দেখা হবে" বলে অনন্যা চলে যাবার পরেই তিনি 'J' এর থেকে মেসেজটা পেয়েছিলেন। 

অরুণ শিওর যে অমৃতার মার্ডার, অনন্যার সাথে ওর দেখা এবং 'J'-এর মেসেজ সবকটাই এক সুতোয় বাঁধা।

কিন্তু, মুশকিল হল তিনি পুলিশের কাছে দৌড়তে পারবেন না। তাহলে, পুলিশের কাছে ওর সঙ্গে অমৃতার কী সম্পর্ক ছিল সেটা ফাঁস করতে হয়।

তবে তিনি বসে নেই। ইতিমধ্যেই তিনি তার মুম্বইয়ের নেটওয়ার্ককে অনন্যার পেছনে লাগিয়ে দিয়েছেন। তারা অনন্যাকে ট্র্যাক করছে আর অরুণকে খবর পাঠিয়ে যাচ্ছে। 

অনন্যা রজনীশ মালহোত্রার বড় মেয়ে জেনে অরুণ চমকে উঠেছিলেন। এত বড় শিল্পপতির মেয়ে অনন্যা অথচ পারিবারিক ব্যবসার সঙ্গে তার কোন সম্পর্ক নেই। অন্য একটা কোম্পানিতে কাজ করে। পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখে না। এদিকে অরুণের অফিসে কী হচ্ছে তার খোঁজ রাখছে।

কেন ? 

অরুণের কাছে অনন্যার রহস্য আরো বেড়েছে। 

আর একটা মাথাব্যথার বিষয় হল, রাজীব মাথুরের সঙ্গে অনন্যার যোগাযোগের মাধ্যমটা কী সেটা অরুণ এখনও বুঝে উঠতে পারে নি। সিংহানিয়াদের কাছে রাজীব আরো কী কী খবর লিক করেছে কে জানে ?

অরুণ তার হাত দুটো মুখের সামনে জড়ো করে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তার সামনে, একঝাঁক ওভারল্যাপিং ক্রাইসিস। কিন্তু ময়দান ছেড়ে পালিয়ে গেলে চলবে না। লড়তে হবে।

চেতলা অবধি আসতে সমস্যা না হলেও আলিপুর রোডে ঢুকেই জ্যামের মুখে পড়তে হল।চিড়িয়াখানার গেটের আগেই স্পিড কমতে কমতে বিশে নেমে এল, তারপর একেবারে থমকে গেল। 

অরুণের গাড়ির ঠিক সামনেই একটা লাল রঙের মারুতি সুজুকি। 

তার পেছনের কাচে বড় বড় হরফে লেখা, 'সান্টা কামস টু টাউন'। 

গাড়ির ভেতর থেকে চার-পাঁচটা বাচ্চার চেঁচামেচি আর প্লাস্টিকের বাশির ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ একটানা ভেসে আসছে। 

বাঁপাশের ফুটপাত ধরে অজস্র মানুষ হেঁটে চলেছে। অনেকের মাথায় সস্তা ক্রিসমাস হ্যাট, বাচ্চাদের হাতে বেলুন। একটা শহরের মধ্যে যেন দুটো আলাদা আলাদা জীবন, একসাথে আড়াআড়ি ভাবে হেঁটে চলেছে।

অরুণ আবার ঘড়ি দেখলেন। 

বারোটা বেজে পঁয়ত্রিশ।

শিবু নিজের মনে বিড়বিড় করে একটা গালাগাল দিল।

"স্যার, ভিক্টোরিয়ার মোড় না পেরোলে শান্তি নেই। পাবলিক এমন ভাবে মাঝ রাস্তায় নেমে হাঁটছে যেন রাস্তাটা ওদের বাপের।"

অরুণ কোন উত্তর দিলেন না।
[+] 6 users Like RockyKabir's post
Like Reply
Do not mention / post any under age /rape content. If found Please use REPORT button.
৭

রেড রোডে পৌঁছতে পৌঁছতে আরো পনের মিনিট লেগে গেল। আজকে গোটা শহর যেন ভেঙে পড়েছে। ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালে লম্বা লাইন। প্রতি পাঁচ মিটার অন্তর কোন না কোন পরিবার ময়দানে দাঁড়িয়ে সেলফি তুলছে।

রেড রোডের সিগন্যালে যখন গাড়ি দাঁড়াল, অরুণ জানলা দিয়ে বাইরে তাকালেন। আকাশে একঝাঁক পায়রা উড়ছে, আর ময়দানের হালকা ধোঁয়াটে রোদে কেল্লা ফোর্ট উইলিয়ামের উঁচু প্রাচীরটা বেশ আবছা দেখাচ্ছে। 

আজ সকালে তিনি ভেবেছিলেন, মিটিংটা সেরে নিয়ে চারটে নাগাদ সিঙ্গাপুরে একটা মেইল পাঠিয়ে লেক ক্লাবে গিয়ে শান্তিতে একটা ড্রিঙ্ক নেবেন। অথচ এখন একজন অজানা লোকের সঙ্গে দেখা করার জন্য ফেয়ারলিতে দৌড়তে হচ্ছে।

মেয়ো রোডের দিকে না ঢুকে শিবু দক্ষ হাতে গাড়িটাকে রেড রোডের চওড়া সরণি ধরে সোজা কিংসওয়ের দিকে কাটাল, এখান থেকে এক টানে স্ট্র্যান্ড রোডে ঢুকে পড়া যায়। স্ট্র্যান্ড রোডে ঢুকলেই ফেয়ারলি প্লেস ঘাট আর বেশি দূরে নয়।

ফেয়ারলি প্লেস ঘাটের মোড়ে পৌঁছতে পৌঁছতে বেলা একটা পনের বেজে গেল। স্ট্র্যান্ড রোডের ওপর লরি আর হলুদ ট্যাক্সির ঘ্যাঁ ঘ্যাঁ শব্দ নিত্যদিনের সঙ্গী হলেও, গঙ্গার দিকটা আজ বেশ নির্জন। ছুটির দিনে লঞ্চ চলাচল কম। হুগলি নদীর ওপর রোদ চিকচিক করছে। গঙ্গার হাওয়ায় মাটির সোঁদা গন্ধ। পাড়ে জেটির লোহায় জং ধরা চেনের ওপর গঙ্গার ঢেউ এসে নিয়মিত ছন্দে ধাক্কা মারছে।

ফেয়ারলি প্লেস ঘাটের পাশেই পোর্টের কাস্টমস ও মেরিন ট্রাফিক কন্ট্রোলের কিছু পুরনো চুনকামে ঢাকা ইটকাঠের দালান। পশ্চিমবঙ্গ পর্যটনের যে লঞ্চগুলো পর্যটকদের জন্য চালানো হয় সেগুলো একটু দূরে বাঁধা।

অরুণ গাড়ি থেকে নেমে পোর্টের নোটিস বোর্ড দেওয়া লোহার ফটকটা পার হলেন। দুজন সিআইএসএফ জওয়ান ভারী বুট পরে দাঁড়িয়ে ছিল। অরুণের হাতের বিশেষ পোর্ট পাসের দিকে তাকিয়ে তারা বিনাবাক্যে রাস্তা ছেড়ে দিল।

জেটির কাঠের তক্তা পার হয়ে তিনি উঠে এলেন 'ময়ূরাক্ষী' ভেসেলের ওপর। এটি পোর্টের পুরনো, ঐতিহ্যবাহী স্টিমার-টাইপ রিভার ক্যাটামারান। সাধারণত বিদেশি প্রতিনিধি বা মন্ত্রী পর্যায়ের ভিজিটরদের নদী পরিদর্শনের জন্য এটি ব্যবহার করা হয়।

ভেসেলের ডেকে পা দিতেই একজন নেভি ব্লু ইউনিফর্ম পরা পোর্ট অ্যাটেনডেন্ট এগিয়ে এল। 

"অরুণ চ্যাটার্জী ? আসুন স্যার। বড় সাহেব লোয়ার লাউঞ্জে অপেক্ষা করছেন।"

অরুণ কাঠের সিড়ি দিয়ে মেহগনি কাঠে বাঁধানো শীতাতপনিয়ন্ত্রিত লোয়ার লাউঞ্জে নেমে গেলেন।

‘ময়ূরাক্ষী’-র এসি ঢাকা লোয়ার লাউঞ্জে নামার ধাতব সিঁড়িটা বেশ খাড়াই।

জেটির ওপর গঙ্গার ঢেউ আছড়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে আস্ত ক্যাটামারানটা হালকা দুলছিল। কাঠের পলিশ আর নোনতা হাওয়ার মিশ্র গন্ধের ভেতরে একটা ভিআইপি মেজাজ থমথম করছে।

লোয়ার লাউঞ্জে পা রাখতেই অরুণের চামড়ার জুতোর শব্দটা মিহি কার্পেট শুষে নিল। ভেতরে ঢুকতেই অরুণের নাকে এল তাজা এসপ্রেসো কফি আর পাইপের নামী তামাকের গন্ধ। 

ডেকোরেশন ব্রিটিশ আমলের মতো। ভারী, চামড়ার সোফা, কাচের ট্রফি কেস আর দেওয়ালে ঝুলছে, পুরনো প্যালকাটা পোর্টের জলরঙের ছবি।

সোফায় বসে ছিলেন অমিতাভ সেনগুপ্ত। পরনে ধবধবে সাদা শার্ট আর ছাইরঙা ব্লেজার। তবে ঘরের একদম কোণে, ভারী রিভলভিং চেয়ারে গা এলিয়ে যিনি বসে আছেন যে মানুষটি বসে আছেন, তাকে দেখে চেনা লাগলেও তার পরিচয় অরুণের কিছুতেই মনে পড়ল না।

অমিতাভ সেনগুপ্ত অরুণকে ঢুকতে দেখে তিনি ঘড়ির দিকে তাকালেন, তারপর মুখে একটা স্বস্তির হাসি ফুটিয়ে তুললেন।

"আসুন অরুণবাবু। জ্যাম কাটিয়ে পৌঁছাতে পারলেন শেষ পর্যন্ত?"

"আজকে আলিপুর রোড পার হওয়া মানে মহাভারতের যুদ্ধ জয় করা।" 

উত্তর দিয়ে অরুণ নিজের ওভারকোটের বোতামটা আলগা করলেন। তার নজর কিন্তু অমিতাভ সেনগুপ্তের পাশের লোকটার ওপর।

মানুষটি বেশ লম্বা চওড়া চেহারার। মাথায় কাঁচা-পাকা পেছনের দিকে ব্যাকব্রাশ করা চুল। চোখে সোনালি ও মোটা ফ্রেমের চশমা। তবে
চোখ দুটো বড্ড বেশি ধারালো। যেন একদম গভীরে নেমে যাচাই করে নিতে অভ্যস্ত। পরনে ধবধবে সাদা খাদি কুর্তা, আর তার ওপর চাপানো গাঢ় নীল রঙের খাদ্দারের জ্যাকেট।

ডান হাতের আঙুলের ফাঁকে জ্বলছে একটা দামি ডমিনিকান সিগার। লাউঞ্জের টেবিলে দুটো অর্ধেক খাওয়া ব্ল্যাক কফির কাপ, আর তার পাশেই রাখা একটা গাঢ় বাদামী চামড়ার পোর্টফোলিও ব্যাগ। 

অমিতাভ সেনগুপ্ত হাত বাড়িয়ে লোকটির দিকে ইঙ্গিত করলেন, 

"অরুণবাবু, আলাপ করিয়ে দিই। ইনি অরবিন্দ জোশী। দিল্লিতে মিনিস্ট্রি অফ শিপিং অ্যান্ড ওয়াটারওয়েজ-এর অ্যাডিশনাল সেক্রেটারি। সেই সঙ্গে পোর্টস সিকিউরিটি রিভিউ কমিটির হেড।"

অরবিন্দ জোশী সিগারটা অ্যাসট্রেতে আলতো করে ঠুকলেন। এক ফোটা ধূসর ছাই ঝরে পড়ল। তিনি চেয়ার ছেড়ে উঠলেন না, কিন্তু অত্যন্ত সংযত ভঙ্গিতে ডান হাতটা এগিয়ে দিলেন। 

"অরুণ চ্যাটার্জী। ভ্যানগার্ড গ্লোবালের ইস্টার্ন জোনের হেড।" 

জোশী সাহেবের গলাটা বেশ ভারী, একটু খাঁজকাটা। 

"আপনার নাম আমি মুম্বইয়ে বোর্ডের ফাইলগুলোতে বেশ কয়েকবার দেখেছি।"

"নমস্কার জোশীজী।" 

অরুণ হাত মেলালেন। তার মনে একটা মৃদু অস্বস্তি গজিয়ে উঠল। দিল্লির লোক, অথচ ভিআইপি গেস্ট হাউসে না এসে, এই ডিসেম্বরের দুপুরে পোর্টের একটা লঞ্চে বসে আছেন?

অমিতাভ সেনগুপ্ত পাশে রাখা টি-পয় থেকে কফির পটটা তুলে অরুণের দিকে তাকালেন, 

"কফি নেবেন অরুণবাবু?"

"না অমিতাভবাবু, থ্যাংকস। আমি সোজাসুজি কাজের কথায় আসতে চাই। আপনি আমাকে যেভাবে এখানে ডাকলেন... ব্যাপারটা কী? আজ ইভনিং-এর মধ্যে আমার মুম্বইয়ে ইস্টার্ন জোনের প্রিলিমিনারি ডক-অডিট রিপোর্ট পাঠানোর কথা।"

অরবিন্দ জোশী মৃদু হাসলেন। সেই হাসিতে একটা সূক্ষ্ম অবজ্ঞার ভাব ছিল। সেটা অরুণের চোখ এড়াল না। তবে উনি খোঁচাটা হজম করে নিলেন।

অরবিন্দ জোশী সিগারে একটা লম্বা টান দিয়ে ধোঁয়াটা পোর্টের লাউঞ্জের এসি বাতাসের মধ্যে ছেড়ে দিলেন। ধোঁয়াটা ধীরে ধীরে ওপরের দিকে ভেসে গেল।

"মুম্বই..." 

জোশী সাহেব স্বগতোক্তির মতো বললেন, 

"আপনাদের বার্থিং টাইম আর ডেমারেজের হিসাব। খুব ভালো। কিন্তু মিঃ চ্যাটার্জী, আজ আপনাকে রিপোর্টটা কয়েক ঘণ্টা হোল্ডে রাখতে হবে।"

অরুণ ভুরু কুঁচকে অমিতাভ সেনগুপ্তের দিকে তাকালেন। তিনি কফির কাপে একটা চামচ নাড়ছেন, কিন্তু কোন শব্দ হচ্ছে না। পুরো পরিবেশটাতে একটা ভারী রহস্যের গন্ধ।

জোশী সাহেব সামনে রাখা কাঠের ডেক্সটপ ফাইলটার ফিতে আলগা করলেন। তারপর সোজা অরুণের চোখে চোখ রাখলেন।

"আপনার কি ধারণা মিস্টার চ্যাটার্জী, সেন্ট্রাল গভর্নমেন্ট হুট করে আমাকে বিনা নোটিশে কলকাতায় পাঠাল কেন? স্রেফ রুটিন ইন্সপেকশনের জন্য?"

অরুণ একটু থামলেন। নিজেকে সামলে নিয়ে শান্তভাবে বললেন,

"আমার কাজ অপারেশনাল ডোমেইনে। সিকিউরিটি আর পলিটিক্যাল প্রবলেম দেখা তো আমাদের কাজ নয়।"

"পুলিশ আর পোর্ট অথরিটি দেখে, ক্রাইম আর কার্গো এন্ট্রি।"

জোশী চশমাটা খুলে পকেট থেকে একটা ছোট তোয়ালে দিয়ে সেটা মুছতে মুছতে বললেন। 

"আর সেন্ট্রাল এজেন্সি যেটা দেখে, সেটা হলো মানি ট্রেইল আর ডেটা ট্রেইল।"

জোশী সাহেব একটু থামলেন। ক্যাটামারানের তলায় গঙ্গার জল আছড়ে পড়ার একটা ভারী ‘ছপ’ শব্দ হলো।

"এক মাস আগে," 

জোশী বলতে শুরু করলেন, তাঁর প্রতিটি শব্দ স্পষ্ট, কাটা কাটা,

"NTRO থেকে একটা কনফিডেনশিয়াল অ্যালার্ট আসে। তারা ফ্ল্যাগ করে, মুম্বই বন্দরের কেন্দ্রীয় 'কার্গো ট্র্যাকিং' এবং 'মেরিন ট্রাফিক ডেটা' কাস্টমসের এনক্রিপ্টেড সার্ভার থেকে বাইপাস হয়ে একটা বেআইনি ফরেন সার্ভারে রিয়েল-টাইমে লিক হচ্ছে।"

অরুণের মেরুদণ্ড দিয়ে যেন বরফজল নেমে গেল। তিনি সোজা হয়ে বসলেন। 

"হ্যাক করা হয়েছে?"

"নো" জোশী হাত নাড়লেন। 

"হ্যাকিং হলে আমাদের সিস্টেম ধরে ফেলত। ব্যাকডোর এন্ট্রি। একদম ইনসাইডার জব। একটা প্যারালাল সার্ভার মিররিং করা হয়েছে। অর্থাৎ মুম্বই ডকে কোনো জাহাজ কখন ঢুকছে, তার কন্টেনারে কী মাল আছে, তার বিওএল-এর বিবরণ কী, কারগো কার কাছে ডেলিভারি হবে, এমনকী কাস্টমস স্নাইফারের রেন্ডম ইনস্পেকশন লিস্টে কোন গাড়িটা পড়েছে। সবকিছু লাইভ চলে যাচ্ছে ওই থার্ড-পার্টি সার্ভারে।"

জোশী আবার থামলেন। অরুণের মুখের ভাব পর্যবেক্ষণ করলেন কিছুক্ষণ।

"আর গত সপ্তাহে,"
 
জোশী গলাটা আরও এক ধাপ নামিয়ে আনলেন, 

"আমাদের ন্যাশনাল সাইবার সিকিউরিটি কো-অর্ডিনেটর কনফার্ম করেছে, মুম্বইয়ের ওই একই প্যাটার্ন এখন বিশাখাপত্তনম পোর্টেও শুরু হয়েছে। দ্য সেম মিরর সার্ভার ইজ অ্যাক্টিভ হেয়ার ইজ দেয়ার টু।"

কথাটা অরুণের কান দিয়ে ঢুকে সোজা মাথার ভেতরে একটা বিস্ফোরণ ঘটাল।

বিশাখাপত্তনম! মিরর সার্ভার! কার্গো ডেটা লিক!

অরুণের চোখের সামনে মুহূর্তের মধ্যে অনন্যার মুখটা ভেসে উঠল।

অরুণের বুকটা ধক করে উঠল। তার হাতের তালু ঘেমে উঠছে। অনন্যা মুম্বইয়ে বসে তাকে যে তথ্যগুলো দিয়েছিল, অরুণ ভেবেছিলেন সেগুলো অনন্যা হয়তো কোনোভাবে রাজীব মাথুরের থেকে পেয়েছে বা সিংহানিয়াদের হয়ে কর্পোরেট স্পাইগিরি করছে। কিন্তু ব্যাপারটা এখন আর স্রেফ একটা কোম্পানির চুরির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই! এরা একটা বিশাল চক্রের অংশ যারা ন্যাশনাল ডেটা নেটওয়ার্কের ওপর ডিরেক্ট অ্যাটাক করছে !

অরুণ নিজের মনের এই মারাত্মক আলোড়নটা বাইরে প্রকাশ না করার প্রাণপণ চেষ্টা করলেন। কিন্তু, তার মুখের ভাবের সূক্ষ্ম পরিবর্তন অরবিন্দ জোশীর মতো অভিজ্ঞ আমলাদের চোখ এড়ানোর কথা নয়।

জোশী সিগারের ছাই ঝেড়ে অত্যন্ত ঠান্ডা গলায় বললেন, "দেখছি খবরটা শুনে আপনি বেশ শকড হলেন, মিঃ চ্যাটার্জী।"

অরুণ দ্রুত নিজেকে সামলে নিলেন। গলার খসখসে ভাবটা দূর করতে একবার কেশে নিয়ে বললেন, 

"শকড হওয়াটাই স্বাভাবিক, জোশীজী। সেন্ট্রাল কাস্টমস আর পোর্ট অথরিটির সার্ভারের ডেটা যদি লিক হতে শুরু করে, তবে তো ভারতের পুরো লজিস্টিকস আর মেরিটাইম সিকিউরিটি কোলাপ্স করবে! ভ্যানগার্ডের মতো মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিগুলো লাখ লাখ ডলার বিনিয়োগ করে ভারতের পোর্টে। এই ডেটা যদি ফরেন কম্পিটিটরদের হাতে যায়..."

"কম্পিটিটর?" 

অরবিন্দ জোশী মৃদু হাসলেন। সেই হাসিতে একটা মারাত্মক শ্লেষ ছিল। 

"আপনার কি মনে হয় এই ডেটা স্রেফ কিছু বিজনেস রাইভালদের হাতে যাচ্ছে? মিঃ চ্যাটার্জী বিষয়টা এত সরলভাবে নেবেন না।"

এবার অমিতাভ সেনগুপ্ত মুখ খুললেন। 

অরুণের দিকে তাকিয়ে নিচু গলায় বললেন, 

"অরুণবাবু, জোশীজী যা বলেছেন তা অত্যন্ত গুরুতর বিষয়।

গত পনেরো দিনে আরব সাগরের আন্তর্জাতিক সীমানায় তিনটে কন্টেনার ভেসেল তাদের নির্ধারিত কোর্স থেকে সামান্য সরে যায়। স্রেফ কয়েক ঘণ্টার জন্য। কাস্টমস বা কোস্ট গার্ডের কাছে কোনো স্যাটেলাইট অ্যালার্ট পৌঁছায়নি, কারণ সিস্টেমে দেখানো হয়েছিল জাহাজগুলো একদম ঠিক ট্র্যাকে স্বাভাবিক গতিতেই চলছে। আসল ট্র্যাকিং ডেটা যখন ম্যানুয়ালি মেলানো হলো, দেখা গেল বিশাখাপত্তনমের দিকে আসা একটা প্যানামেক্স ভেসেলের পজিশন রিয়েল-টাইমে প্রায় ত্রিশ নটিক্যাল মাইল দূরে ফেক করা হয়েছিল।"

অরুণ স্থির হয়ে শুনলেন। এর ভয়াবহতা বুঝতে তাঁর এক সেকেন্ডও বেশি সময় লাগল না। পোর্টের ডেটাবেস লিক হওয়া মানে শুধু বিষয়টা শুধু আর্থিক ক্ষতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; জলপথে নজরদারির রাডারকে অন্ধ করে দেওয়া। এর পরিণাম ভয়াবহ। জলপথ দিয়ে কোনরকম অ্যাটাক হলে কোস্টগার্ড সেটা লাস্ট মোমেন্টের আগে বুঝতেই পারবে না।

জোশীজী ফাইলটা বন্ধ করে সেটি ফিতে শক্ত করে বাঁধলেন।

"এবার বলুন মিস্টার চ্যাটার্জী, আপনার ভ্যানগার্ড গ্লোবালের ইস্টার্ন জোনের লজিস্টিক সার্ভার কি সম্পূর্ণ নিরাপদ? "

অরুণ সোজা অরবিন্দ জোশীর চোখের দিকে তাকালেন।

"আমাদের ইস্টার্ন জোনের সার্ভারে এখনও পর্যন্ত কোনো ইন্টারনাল ব্রিচ ধরা পড়েনি।" 

অরুণ নিজের গলার আওয়াজ স্বাভাবিক রেখে বললেন। 

"তবে মুম্বই হেড অফিসের কার্গো-লজিস্টিক ডেটাবেস সম্পূর্ণ আলাদা এআই-প্রোটেক্টড ফায়ারওয়ালের অধীনে চলে। আজ বিকেলে যে প্রিলিমিনারি ডক-অডিট রিপোর্ট পাঠানোর কথা ছিল, তাতে আমরা ইস্টার্ন জোনের ডেমারেজ আর বার্থিং ডিলে নিয়েই রিপোর্ট করছিলাম। কিন্তু আপনারা যা বলছেন..."

অরুণের মাথার ভেতরে এখন হাজারটা চিন্তা এক সঙ্গে ধাক্কাধাক্কি করছে।

রাজীব মাথুর!

তিনি এতদিন ভেবেছিলেন রাজীব স্রেফ প্রফেশনাল জেলাসি থেকে অনন্যা বকলমে সিংহানিয়াদের কাছে ভ্যানগার্ডের ইনফো লিক করছে।

কিন্তু, এখন পুরো বিষয়টা তার কাছে পরিষ্কার হয়ে আসছে!

রাজীব তাহলে একটা বিশাল চক্রের অ্যাসেট হিসাবে কাজ করছে ! তাহলে কী মুম্বইতে ইতিমধ্যেই ভ্যানগার্ডের ডাটা লিক হয়েছে ?

কলকাতাতেও কী অলরেডি পোর্ট সার্ভার আর ভ্যানগার্ডের প্রাইভেট ইন্টারনাল নেটওয়ার্কের মধ্যে এরকম লিঙ্ক তৈরি হয়ে গেছে ?

কিন্তু, রাজীব এত সাহস পায় কীভাবে ? তার মাথার উপর কী অফিসের আরো বড় কারোর হাত আছে ?

অরুণ টেবিলের ওপর রাখা কফির ঠান্ডা কাপটার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তিনি আর চিন্তা করতে পারছেন না। তাঁর নিঃশ্বাস ভারী হয়ে আসছে।

কিন্তু...কিন্তু প্রমান কোথায়?

অরুণ মনে মনে চিৎকার করে উঠলেন। তাঁর কাছে রাজীবের বিরুদ্ধে কোন প্রমাণ নেই। অনন্যা তাঁকে যা যা বলেছিল, তার একটা শব্দও তো লিখিত নয়! সব মৌখিক!

আজ যদি অরুণ এখানে জোশীকে বা দিল্লিতে সেন্ট্রাল এজেন্সির সামনে গিয়ে বলেন, 

"আমার মনে হয় রাজীব মাথুর এর পিছনে আছে।"

জোশী প্রথম প্রশ্নটাই করবেন, 

'আপনি জানলেন কীভাবে?'

অরুণ কী উত্তর দেবেন? বলবেন যে এক অনন্যা মালহোত্রা তাকে এই খবর দিয়েছে? যে নিজের ফ্যামিলি বিজনেস ছেড়ে অন্য সংস্থায় কাজ করে, অন্য কোম্পানির ভেতরের খবর রাখে!

নাকি বলবেন যে 'J' নামের এক অচেনা আইডি থেকে তাঁকে নিয়মিত ব্ল্যাকমেইল মেসেজ পাঠানো হচ্ছে? 

তা বললেই অমৃতা হত্যার প্রসঙ্গ উঠে আসবে। পুলিশ আর এজেন্সিগুলো জানতে চাইবে, অরুণের সাথে অমৃতার সম্পর্ক কী ছিল? 

না! অরুণ এখানে মুখ খুলতে পারবেন না। অবস্থা এমন যে, মুখ খুললেই অরুণ নিজে ফাঁদে জড়িয়ে যাবেন!

অরবিন্দ জোশী সিগারের শেষ অংশটা অ্যাসট্রেতে ভালো করে পিষে নিভিয়ে দিলেন। তারপর সোজা হয়ে বসে অরুণের দিকে তাকালেন।

"চ্যাটার্জী সাহেব? আপনি খুব বেশি গম্ভীর হয়ে গেলেন। কিছু মনে পড়ছে নাকি ?"

অরুণ জোর করে মুখে একটা শান্ত, পেশাদারভাব ফুটিয়ে তুললেন। 

"না জোশীজী। আমি ভাবছিলাম, আপনারা যা বলছেন, তাতে তো আমাদের মতো কোম্পানিগুলোর সার্ভারও সেফ নয়। কিন্তু আপনারা কি শিওর যে কলকাতা পোর্টেও এভাবে ডেটা লিক হচ্ছে? "

জোশী হালকা হাসলেন।

"প্রুফ যদি একশো শতাংশ থাকত চ্যাটার্জী সাহেব, তবে এতক্ষণে পোর্টের কয়েকজন অফিসার সিবিআই-এর কাস্টডিতে থাকতেন। আমরা প্রসেসে আছি।"

অরুণ একটা দীর্ঘশ্বাস চেপে জিজ্ঞেস করলেন, 

"তা হলে আপনারা আমাকে এখানে কেন ডেকেছেন? ভ্যানগার্ড তো স্রেফ একটা ক্লায়েন্ট।"

অমিতাভ সেনগুপ্ত এবার অরুণের মুখোমুখি বসলেন। 

"অরুণবাবু, আপনাকে ডাকার দুটো কারণ। প্রথমত, ভ্যানগার্ড ইস্টার্ন জোনের অন্যতম বড় শিপিং প্লেয়ার। আপনাদের জাহাজের গতিবিধি খবর যদি এসব লোকদের হাতে চলে যায়, তবে পোর্টের রেপুটেশন নষ্ট হবে। শুধু ভ্যানগার্ড নয়। আমরা পোলারিস, চোগলে, গ্রেট ইস্টার্ন, এমএসসি, সিএমএ, মায়েরস্ক গ্রুপ সবার সাথেই কন্ট্যাক্ট করব।

দ্বিতীয়ত... আমরা জানতে চাইছি, আপনার ওপর বা ভ্যানগার্ডের ওপর কি সম্প্রতি কোনো রাজনৈতিক চাপ এসেছে? কোন লোকাল পলিটিক্যাল লিডারের লোক বা কোনো 'থার্ড-পার্টি মিডলম্যান' কি আপনার কাছে 'ইলেকশন ডোনেশন' বা প্রটেকশন মানির জন্য অ্যাপ্রোচ করেছে?"

অরুণ এক মুহূর্ত চিন্তা করলেন। রাজীবের নাম তিনি নিতে পারবেন না, কিন্তু এখনকার পরিস্থিতিটা তাঁকেই সামলাতে হবে।

"এখনও অবধি সরাসরি কেউ কোন টাকা দাবি করেনি অমিতাভবাবু।" 

অরুণ কৌশলগতভাবে বললেন। 

"তবে হ্যাঁ, গত দু-তিন মাস ধরে আমি একটা অস্বাভাবিক প্যাটার্ন খেয়াল করছি। কাস্টমস ক্লিয়ারেন্সে ছোটখাটো টেকনিক্যাল ইস্যু দেখিয়ে আমাদের কিছু কন্টেনার আটকে রাখা হচ্ছিল। আমরা সেটাকে টেকনিক্যাল প্রবলেম ছাড়া আর কিছু মনে করিনি।"

জোশী তাঁর ব্যাগ থেকে একটা পাতলা প্লাস্টিকের ফোল্ডার বের করলেন। ভেতরে গোটা তিনেক ফটো। তিনি ফটো তিনটে টেবিলের ওপর দিয়ে অরুণের দিকে ঠেলে দিলেন।

"এদের চেনেন?"

অরুণ ফটোগুলোর দিকে তাকালেন।

প্রথম ছবিটা কাস্টমসের এক প্রবীণ অফিসারের। দ্বিতীয় ছবিটা শিশির কুমার রায়ের। আর তৃতীয় ছবিটা দেখে অরুণের বুকের ভেতরটা ছ্যাঁৎ করে উঠল। অমৃতা !

"শিশির রায়!" অরুণের মুখ দিয়ে অস্ফুট শব্দ বের হলো।

"হ্যাঁ, শিশিরবাবু।" 

অমিতাভ সেনগুপ্ত একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। 

"ওনার অ্যাক্সিডেন্টার কথা আপনার নিশ্চয়ই জানা আছে অরুণবাবু।"

অরুণ ঘাড় নাড়লেন।

অরুণ বিলক্ষণ জানেন শিশিরের দুর্ঘটনার কথা, তার চেয়ে ভাল আর কে জানবে। তবু তিনি ফটোটার দিকে তাকিয়ে থেকে জিজ্ঞেস করলেন,

"আপনারা কি মনে করছেন শিশিরবাবুর ওই অ্যাক্সিডেন্টটা স্রেফ অ্যাক্সিডেন্ট ছিল না? ইট ওয়াজ আ মার্ডার?"

"সেন্ট্রাল এজেন্সির কাজ অনুমান করা নয়, মিঃ চ্যাটার্জী। তথ্য প্রমাণ ছাড়া আমরা কাউকে অভিযুক্ত করি না। শিশির রায়ের মৃত্যু নিয়ে পুলিশের রিপোর্টে লেখা আছে, 'ড্রাইভিং আন্ডার দ্য ইনফ্লুয়েন্স অফ অ্যালকোহল অ্যান্ড র‍্যাশ ড্রাইভিং'। আমরা এখনো অবধি ওটা নিয়ে কাউকেই সন্দেহ করছি না। কারণ ওটাকে মার্ডার সাব্যস্ত করার মতো কোন ফরেন্সিক বা ডিজিটাল এভিডেন্স আমাদের হাতে আসেনি।"

অরবিন্দ জোশীর গলার স্বর অত্যন্ত নিরপেক্ষ শোনালো।

জোশী সামান্য থেমে অরুণের চোখের দিকে তাকালেন, 

"তবে...কয়েক সপ্তাহ আগে, দিল্লিতে শিপিং মিনিস্ট্রিতে একটা বেনামী চিঠি এসেছিল। তাতে লেখা ছিল, কলকাতা পোর্টের কিছু বড় কর্তা মিলে পোর্টের জমি বেআইনিভাবে বিক্রি করে দিচ্ছেন।"

অরুণের মনে হলো লাউঞ্জের ভেতর বাতাস যেন ভারী হয়ে এসেছে। শিশির রায়! 

তবে কী তিনি এই চক্রের কথা জেনে ফেলেছিলেন? নাকি তিনি নিজেই এই চক্রের অংশ ছিলেন এবং পরে সরে আসতে চেয়েছিলেন বলে তাঁকে সরিয়ে দেওয়া হলো? আর অমৃতা? 

অনেক বছর পর অরুণের নিজেকে অসম্ভব একা মনে হতে লাগল। তিনি নিজেকে এক গভীর কুয়োর কিনারে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলেন। 

একদিকে জোশী এবং সেন্ট্রাল এজেন্সি আর অন্যদিকে সিংহানিয়া ও রাজীব মাথুর, আর তারও পেছনে ছায়ার মতো দাঁড়িয়ে থাকা 'J' এবং অনন্যা মালহোত্রা।

অরবিন্দ জোশী ফটো তিনটে আবার ফোল্ডারে পুরে নিলেন। তারপর চেয়ারে ব্যাক হেলান দিয়ে অরুণের দিকে তাকালেন।

"চ্যাটার্জী সাহেব, আমাদের আজ আপনাকে এখানে ডাকার মূল উদ্দেশ্য ভয় দেখানো নয়। আমরা আপনাকে অ্যালার্ট করতে চেয়েছিলাম।"

"তা হলে ভ্যানগার্ডের কী করা উচিত?" অরুণ প্রশ্ন করলেন।

"আপনি আপনার ইনভেস্টমেন্ট আর কন্টেনার ট্রাফিক বাঁচান।" 

জোশী ঠান্ডা গলায় বললেন। 

"আর সবচেয়ে বড় কথা, আপনার নিজের অফিসের ভেতরের লোকগুলোর ওপর নজর রাখুন। ডাটা যদি লিক হয়ে থাকে, তবে বাইরে থেকে কেউ এসে করেনি।"

অরুণের মাথার ভেতরে আবার রাজীব মাথুরের মুখটা ফুটে উঠল।

কিন্তু অরুণ চুপ করে রইলেন। তিনি এখনো কোনো কার্ড টেবিলে ফেলবেন না।

অমিতাভ সেনগুপ্ত উঠে দাঁড়ালেন। 

"অরুণবাবু, ময়ূরাক্ষী আর কিছুক্ষণ পর ফেয়ারলি প্লেস ছাড়বে। আমরা দক্ষিণেশ্বরের দিকে যাব। আপনার গাড়ি তো বাইরে দাঁড়িয়ে আছে, তাই না ?"

"হ্যাঁ।" 

অরুণ উঠে দাঁড়ালেন। 

"ধন্যবাদ সেনগুপ্তবাবু, ধন্যবাদ জোশীজী, ইনফরমেশনগুলোর জন্য।"

অরবিন্দ জোশী হাত মেলালেন না, স্রেফ মাথা নাড়লেন।

"সতর্ক থাকবেন। গঙ্গার জল দেখতে শান্ত লাগে, কিন্তু তলার টানটা খুব বিপজ্জনক আর মিঃ চ্যাটার্জী, এই ইনফরমেশনগুলো যেন লাউঞ্জের বাইরে না যায়।"

অরুণ কোন কথা না বলে, ঘাড় নেড়ে লাউঞ্জের সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে এলেন।

ডেকে পা দিতেই ডিসেম্বরের কনকনে সোঁদা হাওয়ায় অরুণের মুখটা ঠান্ডা হয়ে গেল। গঙ্গার ওপর রোদ এখন অনেকটাই ঢলে পড়েছে। সাড়ে তিনটা বাজে। দূরে হাওড়া ব্রিজের ধোঁয়াটে কাঠামোটা আবছা দেখাচ্ছে।

জেটির কাঠের তক্তা পার হয়ে অরুণ যখন নিজের গাড়ির দিকে হেঁটে যাচ্ছেন, তখন তাঁর মাথার ভেতরটা অদ্ভুতভাবে নীরব।

তিনি এখন নিশ্চিত, এসব একই মাফিয়া নেটওয়ার্কের প্ল্যানিং আর কাজের নমুনা।

অনন্যা তাঁকে মুম্বইয়ে ডেকের উপর দাঁড়িয়ে যা বলেছিল, তা এখন পরিহাসের মতো লাগছে।

আর রাজীব মাথুর... রাজীবকে যেভাবে হোক ফাঁদে ফেলতে হবে। পুলিশ বা সেন্ট্রাল এজেন্সির ওপর ভরসা করে লাভ নেই। কারণ জোশী সাহেব নিজেই বলেছেন।

'প্রমাণ ছাড়া আমরা কাউকে অভিযুক্ত করি না'।

প্রমাণ অরুণকেই জোগাড় করতে হবে।

কিন্তু, কীভাবে ?

অরুণ গাড়ির পেছনের সিটে গিয়ে বসলেন। শিবু স্টার্ট দিল।

"কোথায় যাবেন স্যার? অফিস না বাড়ি ?" শিবু জিজ্ঞেস করল।

অরুণ জানালার কাচটা নামিয়ে দিলেন। বাইরের পোড়া ডিজেল আর গঙ্গার সোঁদা হাওয়ার গন্ধটা তাঁর ফুসফুসে ঢুকে পড়ল।

"না শিবু।" 

অরুণ খুব নিচু গলায় বললেন, তাঁর গলার স্বর পাথরের মতো শক্ত। 

"অফিসে নয়। ক্যামাক স্ট্রিটের দিকে চল।"
[+] 6 users Like RockyKabir's post
Like Reply
বৈশালী চৌধুরী 

[Image: image-(2).jpg]
[+] 3 users Like RockyKabir's post
Like Reply
৮

বিকেল তিনটে।

উত্তর কলকাতার সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউ ধরে উবেরটা যখন শোভাবাজার মোড়ের দিকে বাঁক নিল, বিদিশা জানলার কাচটা এক ইঞ্চি নামিয়ে দিলেন।

আকাশটা নীলচে ভাব হারিয়ে কেমন যেন একটা ধূসর, বিবর্ণ রূপ ধারণ করেছে। 

বড়দিনের উৎসবে মাতোয়ারা পুরো শহর যখন ময়দান, পার্ক স্ট্রিট, আলিপুর চিড়িয়াখানা মুখী তখন বিদিশা চলেছেন নিজের উৎসের খোঁজে, এক সম্পূর্ণ অচেনা অতীতের সন্ধানে।

ট্যাক্সির সিটে বসে বিদিশা কোলে রাখা চামড়ার হ্যান্ডব্যাগটা অনবরত শক্ত হাতে চেপে ধরছিলেন। ব্যাগের ভেতরে সযত্নে রাখা আছে তার মায়ের পুরানো কয়েকটা সাদা-কালো ছবি। এগুলো সেদিনের অ্যালবাম থেকে পাওয়া ছবিগুচ্ছের অংশ। ছবিতে ওনার মা যে বিশাল বারান্দায় নক্সাদার লোহার রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে ছিলেন, বিদিশার অনুমান ওটা ওনার মামারবাড়ি।

কিন্তু সমস্যা হলো, বিদিশা তার মামারবাড়িতে পা রাখেননি। বিদিশার মা নাকি বেঁচে থাকতে কখনো বাবার বাড়ির নাম মুখে আনতেন না। 

বিদিশার বাবাও এককালে জেদ করে, পরিবারকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে বিদিশার মাকে ভালোবেসে বিয়ে করেছিলেন। সেই প্রেম দুজনের সাথেই তাদের পরিবারের সম্পর্কের সাঁকোটা ভেঙে দিয়েছিল। দুই পরিবারই বিদিশার মা ও বাবাকে ত্যাজ্য করেছিল।

বিদিশার শৈশব কিংবা কৈশোরে কোনদিন 'মামারবাড়ি' বা 'দাদুরবাড়ি'র অস্তিত্ব ছিল না।

আজ ছুটির দিনে তিনি খানিকটা বাধ্য হয়েই মামারবাড়ির খোঁজে বেরিয়ে পড়েছেন। 

ছুটির শেষ কয়েকদিন তার তদন্তের বিশেষ কোন অগ্রগতি হয়নি। হঠাৎ করে পাওয়া ছবিগুলোর পেছনে যেসব অদ্ভুত শব্দ, ভৌগোলিক অবস্থান, ফাইল নং তিনি পেয়েছিলেন সেগুলোর কোন অর্থই তিনি বের করতে পারেননি।

ইন্টারনেটে সার্চ করে শুধু বোঝা গেল যে ফাইল নম্বরটি কারোর ব্যক্তিগত ফাইল ক্যাবিনেটের কোড নম্বর। সরকারি মহাফেজখানায় খুঁজে লাভ নেই। তাছাড়া, গবেষিকা ছাড়া ওখানে ঢুকতেই দেবে না।

তবে উপায় ?

ছোটবেলায় বিদিশা বাবার মুখে আবছা শুনেছিলেন, উত্তর কলকাতার কোনো একটা রাস্তার নাম, 'দুর্গাচরণ...'

সেই অস্পষ্ট স্মৃতির সূত্র ধরেই আজ পঁচিশে ডিসেম্বরের ছুটির দিনে বিদিশার এই অভিযান।


"ম্যাডাম, আর তো গাড়ি ঢুকবে না। সামনের রাস্তাটা বড্ড সরু। এখানেই নামতে হবে", ড্রাইভার আয়নায় বিদিশার দিকে তাকিয়ে বলল।

বিদিশার চিন্তার সূত্র ছিঁড়ে গেল। ক্যাব রাস্তার একটা মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে। সামনের রাস্তাতে সত্যিই গাড়ি ঢুকবে না। তবে, একজন মানুষ স্বচ্ছন্দে হেঁটে যেতে পারে।

ক্যাব থেকে নেমে বিদিশা পার্স থেকে ড্রাইভারের টাকাটা মিটিয়ে দিলেন। ওনার পরনে একখানা পেস্তারঙা সুতি-সিল্কের শাড়ি, তার উপরে জড়ানো হালকা একটি কালো শাল।

দুর্গাচরণ মিত্র স্ট্রিট। 

দর্জিপাড়ার এই রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে বিদিশা কপাল কুঁচকে নিজের চারপাশে চেয়ে দেখলেন।

বিদিশার আভিজাত্য আর চলাফেরার মধ্যে এমন এক আলগা গাম্ভীর্য ছিল যে, অচেনা দু-একজন পথচারীও অজান্তেই থমকে দাঁড়িয়ে ওনার দিকে নজর না দিয়ে পারল না।

বিদিশা অবশ্য কারও কৌতূহলী চাউনিকে পাত্তা দিলেন না; শালটা গায়ে আর একটু শক্ত করে জড়িয়ে নিয়ে এক পলক চারপাশটা দেখে নিলেন।

মোড়ের মাথায় নীল-সাদা কার্বস্টোনের পাশে দাঁড় করানো একটা সাবেকি হাতে টানা রিকশো; তার কাঠের হাতলে বসে অলস চোখে বিড়ি টানছে এক রিকশাওয়ালা। 

ঠিক তার পেছনেই এক বিশাল বাড়িতে লেডিজ হোস্টেল’-র সাইনবোর্ড, আর তার ঠিক পাশ দিয়ে চলে গেছে আরেকটা সংকীর্ণ পিচঢালা গলি।

কিছুটা এগোতেই একপাশে ‘স্বাধীন চক্র ক্লাব’-এর নীল সাইনবোর্ডওয়ালা শতাব্দীর পুরোনো চুনকাম-খসে-পড়া নীল দালান। তার লোহার পিলারে লাগানো জাতীয় পতাকাটা বাতাসে দুলছে। মাথার ওপর ঝুলন্ত কেবলের কালো জটলা যেন পুরো আকাশটাকে টুকরো টুকরো করে কেটে রেখেছে। তারই ফাঁক দিয়ে ডিসেম্বরের শেষ বিকেলের রোদ ছিটকে এসে পড়েছে রাস্তার উপর। নির্জন পিচঢালা রাস্তার বুক চিরে একটা কালো কুকুর হেলতে দুলতে পার হয়ে গেল, যেন এই পাড়ার আসল মালিক সে-ই। 

দু’পাশে প্রাচীন সব বাড়ি। তলায় দালান আর উপরের ঝুলন্ত বারান্দায় আদ্যোপান্ত সেকেলে কাঠের জাফরি। কোন কোন বাড়িতে পুরোনো দিনের সবুজ কাঠের খড়খড়ি দেওয়া জানালা আর তার নিচে বাড়ির দেওয়ালে কোনো এক পুরোনো রাজনৈতিক দলের অস্পষ্ট হয়ে যাওয়া দেওয়াল লিখন, সব মিলিয়ে এখানে সময় যেন থমকে আছে। চারপাশে অদ্ভুত, নির্জন নীরবতা।

বিদিশা বুঝে উঠতে পারলেন না কাকে জিজ্ঞেস করবেন। কিছুটা থমকে দাঁড়িয়ে, ইতস্তত করে গলির মুখে একটু ভেতরে একটা দোকানের সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন তিনি।

দোকানদার লোকটির বয়স সত্তরের কাছাকাছি। চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা, পরনে সাদা ফতুয়া আর ধুতি। কাঁচের বয়াম থেকে কয়েকটা লজেন্স গুছিয়ে এক খুদে খদ্দেরের হাতে তুলে দিচ্ছিলেন।

বিদিশা একটু দ্বিধা নিয়ে এগিয়ে গিয়ে বললেন, 

"জ্যাঠাবাবু, একটু শুনবেন?"

বৃদ্ধ চশমাটা নাকের ডগায় নামিয়ে বিদিশার দিকে তাকালেন। ওনার রুচিশীল পোশাক আর আভিজাত্য আর কথা বলার ধরন তাকে বুঝিয়ে দিল যে এই মহিলা এই পাড়ার কেউ নন।

"হ্যাঁ মা, বলুন? কী চাই?"

বিদিশা ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে ভাঁজ করা একটা টুকরো কাগজ বের করে বৃদ্ধের দিকে বাড়িয়ে দিলেন। সেখানে গোটা গোটা অক্ষরে লেখা, ‘মুখার্জীবাড়ি, দুর্গাচরণ মিত্র স্ট্রিট’।

"এই পাড়ায় মুখার্জীদের একটা বেশ পুরোনো ভিটে আছে বলতে পারেন? শুনেছি বেশ নামডাক ছিল, আর ওদের বাড়িতে নাকি দুর্গাপুজোও হতো..."

বিদিশার গলায় প্রত্যাশার সুর।

বৃদ্ধ কাগজটার দিকে কয়েক সেকেন্ড চশমার ওপর দিয়ে তাকিয়ে রইলেন। তারপর মাথা নেড়ে একগাল হেসে বললেন, 

" না মা! আপনি ভুল জায়গায় চলে এসেছেন। দুর্গাচরণ মিত্র স্ট্রিটে মুখার্জীবাড়ি নামে কোন প্রাচীন বাড়িই নেই, দুর্গাপুজো তো অনেক পরের কথা। এ পাড়ায় মিত্রদের নামকরা পুজো আছে বটে। কিন্তু মুখুজ্জেদের কোন পুজো আমি আমার সত্তর বছরের জীবনে দেখিনি মা।"

বিদিশার বুকের ভেতরটা যেন এক মুহূর্তে খালি হয়ে গেল। হাত থেকে কাগজটা নামিয়ে নিয়ে একটু কুঞ্চিত কপালে শুধোলেন, 

"এখানে কোন মুখার্জীবাড়িই নেই? হয়তো পুজোটা অনেক বছর ধরে বন্ধ হয়ে গেছে...একটু ভেবে দেখুন না ? বিশাল বড় বারান্দা আর লোহার নক্সাদার রেলিং আছে...।"

" ধুর! অমন ঝুলন্ত বারান্দা আর লোহার রেলিংওয়ালা বাড়ি তো উত্তর কলকাতার মোড়ে মোড়ে আছে, মা।" 

প্রবীণ দোকানদার কাউন্টারে রাখা ওপরে রাখা টিনের কোটোটা সরাতে সরাতে বললেন। 

"আপনি নিশ্চিত যে নামটা দুর্গাচরণ মিত্র স্ট্রিট-ই শুনেছিলেন? হতে পারে আপনি একেবারে ভুল রাস্তায় এসে পড়েছেন।"

"রাস্তার নাম আর কী-ই বা হতে পারে?" 

বিদিশা কিছুটা হতাশার সুরেই বললেন, 

‘দুর্গাচরণ’ নামটা তো আমার স্পষ্ট মনে আছে..."

বৃদ্ধ এবার হাতের কাজ থামিয়ে একটু চিন্তায় পড়লেন। তারপর কপালে হাত দিয়ে কিছুক্ষণ ভেবে বললেন, 

"মা, উত্তর কলকাতার ইতিহাস অত সহজ নয়। 'দুর্গাচরণ' নামে এই অঞ্চলে অনেক রাস্তা আছে। আপনি দর্জিপাড়ার 'দুর্গাচরণ মিত্র স্ট্রিট'-এ ঢুকে পড়েছেন। অথচ আপনি যে ঐতিহ্যবাহী মুখার্জিবাড়ির কথা বলছেন, হতে পারে সেটা দুর্গাচরণ মুখার্জি স্ট্রিটে! ওটাও তো উত্তর কলকাতাতেই।"

বিদিশার চোখে মুহূর্তের জন্য একটা আলোর ঝলক খেলে গেল,

"দুর্গাচরণ মুখার্জি স্ট্রিট? সেটা আবার কোথায়? এখান থেকে কাছে ?"

"দূরে মানে? ওটা বাগবাজারে।" 

দোকানদার গলার গামছাটা দিয়ে কপালটা মুছে নিয়ে বললেন, 

"এখান থেকে কম করে ২ কিলোমিটার তো হবেই। এ রাস্তায় সোজা হেঁটে গিয়ে ট্যাক্সি ধরতে হবে আপনাকে।"

'বাগবাজার!' 

শব্দটা শুনেই বিদিশা থমকে গেলেন। 

এতক্ষণ ঘুরে ঘুরে শরীরের সঙ্গে সঙ্গে মনটাও যেন এক ধাক্কায় ক্লান্ত হয়ে পড়ল। 

২ কিলোমিটার দূরে আরেকটা অচেনা রাস্তা, আর সেখানে গিয়েও যে উত্তর মিলবে। তারই বা গ্যারান্টি কোথায়? বিদিশা একটা দীর্ঘশ্বাস চেপে শালটা আর একটু গায়ে জড়িয়ে নিলেন।

"মা।" 

দোকানদার গলাটা সামান্য নামিয়ে বললেন,

"ওখানে দুটো কাছাকাছি রাস্তা আছে। একটা হলো দুর্গাচরণ মুখার্জি স্ট্রিট আর তার কাছাকাছিই রয়েছে দুর্গাচরণ ব্যানার্জী স্ট্রিট।"

বিদিশা একমুহূর্ত থমকে গেলেন। মনের ভেতরে দোলাচলটা এক ধাক্কায় আরও কিছুটা বেড়ে গেল।

দুটো রাস্তা আছে ? দুটোই পাশাপাশি ?

বৃদ্ধ ওনার মুখের দ্বিধাটা হয়তো টের পেলেন।

"এক কাজ করুন মা।" 

তিনি সহানুভূতিশীল গলায় বললেন, 

"এখান থেকে আর গাড়ি পাবেন না। সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউয়ের মোড়ে গিয়ে একটা অটো ধরে সোজা বাগবাজার মোড়ে নেমে পড়ুন। ওখান থেকে যে কাউকে জিজ্ঞেস করলেই দুর্গাচরণ মুখার্জি স্ট্রিট আর ব্যানার্জী স্ট্রিট দুটোই দেখিয়ে দেবে। তবে বেলা পড়ে আসছে... যা খোঁজার আলো থাকতে থাকতেই খুঁজে নিন। ওসব পুরনো অলিগলিতে অন্ধকার নামলে বাড়ি চেনা বড় দায়।"

কাগজটা আবার সযত্নে পার্সের ভেতরে পুরতে পুরতে বিদিশা নম্র গলায় বললেন, 

"অনেক ধন্যবাদ, জ্যাঠাবাবু।"

"আরে কিসের ধন্যবাদ মা! আদি উত্তর কলকাতার অলিগলি তো গোলকধাঁধার মতো। গিয়ে দেখুন যদি সন্ধান মেলে।"
[+] 7 users Like RockyKabir's post
Like Reply
৯

সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউয়ের রাস্তার মোড়ে এসে থামতেই একটা হালকা হলুদ রঙের শেয়ার অটো এসে দাঁড়াল সামনে। 

বাগবাজারগামী অটোটাতে পেছনের আসনে দুটো সিট খালি। বিদিশা শালটা আরও একটু আঁটসাঁট করে চেপে ধরে নিঃশব্দে উঠে বসলেন।

ব্যস্ত ট্রাফিকের গর্জনের মাঝে অটোটি সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউ ধরে দ্রুত গতিতে এগোতে লাগল। কিন্তু অটোর ঝাঁকুনি আর অটোর ইঞ্জিনের চেনা ঘড়ঘড় শব্দের সাথে সাথে বিদিশার মনের চাকাটা ঘুরে পেছনে চলে যেতে লাগল। 

বাইরের চলমান শহরের দৃশ্যপট ঝাপসা হয়ে এল, আর বিদিশার ভাবনার জগৎটা গিয়ে পৌঁছল গতকালে,

[ফ্ল্যাশব্যাক]

সাতদিনের দীর্ঘ ছুটি কাটিয়ে গতকালই তিনি কলেজে যোগ দিয়েছেন। পরের দিন পঁচিশে ডিসেম্বর হওয়ায়, ক্লাসে চাপ তেমন ছিল না। অনেকদিন পরে পড়াতে ফিরে বিদিশারও ধাতস্থ হতে একটু সময় লাগছিল।


কিন্তু বেলা বারোটা বাজতে না বাজতেই মেসেঞ্জার পিয়ন এসে খবর দিল, (গণিত বিভাগের হেড অব দ্য ডিপার্টমেন্ট) ডঃ সিদ্ধার্থ বাগচী তাকে নিজের ঘরে ডেকে পাঠিয়েছেন।

বিদিশা যখন দীর্ঘ করিডোর পেরিয়ে ডক্টর বাগচীর কেবিনের ভারী সেগুন কাঠের দরজার সামনে এসে দাঁড়ালেন তখন তার বুকের ভেতরটা সতর্কতায় একরকম টানটান হয়ে ছিল। ফান্ড আটকে দেওয়ার যে নোংরা খেলাটা সুব্রত সেন খেলেছিল, তার মাস্টারমাইন্ড যে এই ডক্টর বাগচীই, সে বিষয়ে তিনি প্রায় নিশ্চিত ছিলেন। 

অথচ এই মানুষটাই সিম্পোজিয়ামের প্রথম দিন যখন তাকে অভিনন্দন জানাচ্ছিলেন, সেই সময় ওনার মুখে কোনোরকম রাগ বা ভয়ের চিহ্ন দেখতে পাননি বিদিশা। সেদিক দিয়ে সুব্রত সেনের আচরণ অত্যন্ত স্বাভাবিক ও প্রত্যাশিতও বটে। ড. বাগচী যে খুব ভালো অভিনেতা একথা স্বীকার করতেই হবে।

বিদিশা একটা গভীর শ্বাস নিয়ে ফাইলটা বাঁ হাতে শক্ত করে ধরে ডান হাত দিয়ে দরজায় দুটো মৃদু, কিন্তু স্পষ্ট টোকা দিলেন।

"কাম ইন", ভেতর থেকে ডক্টর বাগচীর রাশভারী গলা ভেসে এল।

বিদিশা দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকলেন। ডক্টর বাগচীর কেবিনটা বিদিশার কেবিনের চেয়ে অনেকটাই আলাদা। ঘরটা বেশ বড়, মেঝেতে দেয়াল থেকে দেয়াল পর্যন্ত ছাই-রঙা কার্পেটে মোড়া, যা হাঁটার সব শব্দ শুষে নেয়। ঘরের একদিকের পুরো দেয়াল জুড়ে কাঁচের জানলা, যার ব্লাইন্ডসগুলো অর্ধেক নামানো।

জানলার ফাঁক দিয়ে আসা দুপুরের রোদ ডক্টর বাগচীর বিশাল মেহগনি কাঠের ডেস্কের একপাশে এসে পড়েছে। ঘরের সেন্ট্রাল এসির হাওয়াটা এখানে একটু বেশিই শীতল। বাতাসে বই, দামি এয়ার ফ্রেশনারের গন্ধ ভাসছে। 

এই ঘরের পরিবেশে এমন একটা আভিজাত্য এবং ক্ষমতার আস্ফালন আছে, যা যেকোনো জুনিয়র ফ্যাকাল্টিকে প্রথমেই মানসিকভাবে ছোট করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।

ডক্টর বাগচী নিজের ডেস্কের ওপাশে একটা হাই-ব্যাক লেদার চেয়ারে বসে ল্যাপটপে কিছু একটা দেখছিলেন। বিদিশাকে ঢুকতে দেখে তিনি ল্যাপটপের স্ক্রিনটা সামান্য নামিয়ে রাখলেন। তার চোখেমুখে আজ বিদিশা কোনো বিরক্তির চিহ্ন দেখতে পেলেন না। বরং, বিদিশাকে দেখে তার মুখে একটা অত্যন্ত মার্জিত হাসি ফুটে উঠল।

"আসুন মিস গাঙ্গুলি। প্লিজ টেক এ সিট।"

কিন্তু বিদিশার তার শান্ত মুখোশে কোনো ফাটল ধরতে দিলেন না। তার চোখের দৃষ্টি স্থির, মুখের পেশিগুলো একদম রিল্যাক্সড। তিনি ডক্টর বাগচীর এই আপাত-নির্দোষ হাসির পেছনের আসল উদ্দেশ্যটা কী, সেটা বোঝার চেষ্টা করতে লাগলেন।

"আপনি যেভাবে পুরো ইভেন্টটা হ্যান্ডেল করেছেন, তার কোনো তুলনাই হয় না।"

ডক্টর বাগচী একটু থামলেন। তারপর চেয়ারে হেলান দিয়ে বিদিশার চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে অত্যন্ত মোলায়েম গলায় বললেন, 

"প্রিন্সিপাল স্যার আমাকে সব বলেছেন।"

বিদিশার চোখের পলক এক মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে গেল। 

'সব বলেছেন? কতটা?'

"ফান্ডিং আটকে যাওয়া সত্ত্বেও আপনি যেভাবে নিজের পকেট থেকে আড়াই লাখ টাকা বের করে ইভেন্টটা উতরে দিয়েছেন, সেটার জন্য প্রিন্সিপাল স্যার আপনার অনেক প্রশংসা করেছেন," ডক্টর বাগচী অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে বলে চললেন। 

"অ্যাকাউন্টসের ওই টেকনিক্যাল এররটার জন্য শেষ মুহূর্তে একটা বড় ডিজাস্টার হতে পারত। কিন্তু আপনার প্রেজেন্স অফ মাইন্ড আর ডেডিকেশন আমাদের কলেজের সম্মান বাঁচিয়ে দিয়েছে। আই মাস্ট সে, আপনার এই ডেডিকেশন সত্যিই প্রশংসনীয়।"

বিদিশা চুপচাপ বসে রইলেন। ডক্টর বাগচীর গলার স্বরে এক ফোঁটাও মেকি ভাব নেই। বরং তাকে দেখে মনে হচ্ছে তিনি সত্যিই বিদিশার এই কাজে অত্যন্ত গর্বিত।

কিন্তু বিদিশার মন অন্য কথা বলছে। 

'অ্যাকাউন্টসের টেকনিক্যাল এরর?'

বিদিশার মনের ভেতর একটা তাচ্ছিল্যের হাসি খেলে গেল। সুব্রত সেনের ওই জালিয়াতির ফাইল আটকানোর ব্যাপারটা ডক্টর বাগচীর মতো একজন ধূর্ত এইচওডি জানবেন না, এটা বিশ্বাস করার কোনো কারণ নেই। এই পুরো ফান্ডিং ক্রাইসিসটা যে তাকে তাড়ানোর একটা সাজানো নাটক ছিল, সেটা বিদিশা জানেন। আর এখন, যখন বিদিশা সেই ফাঁদটা কেটে বেরিয়ে এসেছেন, তখন ডক্টর বাগচী অত্যন্ত নিখুঁতভাবে 'টেকনিক্যাল এরর'-এর দোহাই দিয়ে সুব্রত সেনকে বাঁচাচ্ছেন এবং নিজেকে পুরো ব্যাপারটার থেকে আলাদা করে নিচ্ছেন।

সত্যিই, কী অসামান্য অভিনয়! প্রথমে ভাড়াটে খুনিকে সুপারি দিয়ে খুনের চেষ্টা। তারপর ব্যর্থ হলে ক্ষতর জায়গায় ব্যান্ডেজের প্রলেপ লাগানোর ব্যবস্থা করে দেওয়া। বিদিশার ইচ্ছে করছিল এই মুহূর্তেই ওই লোকটার এই মেকি ভদ্রতার মুখোশটা টেনে ছিঁড়ে ফেলতে। কিন্তু এটা আবেগ দেখানোর জায়গা নয়। এখানে ভেবেচিন্তে কাজ করতে হবে।

"থ্যাংক ইউ, স্যার।" বিদিশা অত্যন্ত মাপা গলায় উত্তর দিলেন। "কলেজের সম্মান বাঁচানোটা আমার দায়িত্ব ছিল। ফান্ড কোত্থেকে এল, সেটা বড় কথা নয়; ইভেন্টটা সাকসেসফুল হওয়াটাই আসল কথা।"

"অ্যাবসোলিউটলি!" 

ডক্টর বাগচী হাসিমুখে সায় দিলেন।

তারপর তিনি একটু সোজা হয়ে বসলেন। তার মুখের হাসিটা সামান্য ছোট হয়ে এল, চোখের দৃষ্টিতে একটা গাম্ভীর্য ফুটে উঠল। ঘরের আবহাওয়ার মধ্যে হঠাৎ করেই একটা সূক্ষ্ম পরিবর্তন এল।

"মিস গাঙ্গুলি, আপনাকে ডেকে পাঠানোর কারণটা বেশ জরুরি।" 

ডক্টর বাগচী গলার স্বরটা সামান্য নামিয়ে বললেন।

বিদিশার পেশিগুলো আবার টানটান হয়ে উঠল। 

"বলুন, স্যার।"

ডক্টর বাগচী অভ্যাসবশত ডেস্কের ওপর রাখা একটা পেপারওয়েট ঘোরানো শুরু করলেন।

"আমাদের কলেজের 'স্টুডেন্ট ওয়েলফেয়ার কমিটি'-তে একটা জায়গা খালি হয়েছে। আপনি হয়তো জানেন, এই কমিটি কলেজের একটা গুরুত্বপূর্ণ বডি। স্টুডেন্টদের আর্থিক সহায়তা, স্কলারশিপ, কাউন্সেলিং, ক্যাম্পাসে তাদের সেফটি মেনটেইন করা, স্টুডেন্টরা ফেসিলিটিজ ঠিকঠাক পাচ্ছে কি না সেটা দেখা; এগুলো স্টুডেন্ট ওয়েলফেয়ার কমিটির কাজের মধ্যে পড়ে।"

বিদিশা চুপ করে শুনছেন।

"পজিশনটা আমরা প্রথমে নন্দিতা দাশগুপ্তকে অফার করেছিলাম।" 

ডক্টর বাগচী পেপারওয়েট থেকে চোখ তুলে বিদিশার দিকে তাকালেন। 

"উনি আমাদের একজন পুরোনো এবং সিনিয়র ফ্যাকাল্টি। কিন্তু নন্দিতা ম্যাডাম কিছু ব্যক্তিগত কারণে এই দায়িত্বটা নিতে চাইছেন না।"

ডক্টর বাগচী একটু থামলেন, যেন বিদিশাকে এই ভাবার সময় দিচ্ছেন। তারপর তিনি সরাসরি বিদিশার চোখে চোখ রেখে বললেন, 

"তাই, আমি আর প্রিন্সিপাল স্যার এই পজিশনটার জন্য আপনাকে কনসিডার করছি।"

বিদিশার চোখের তারা একবার প্রসারিত হয়ে আবার স্বাভাবিক হয়ে গেল। তিনি প্রবলভাবে চমকে গেলেও সেটা প্রাণপণে সামলে নিলেন।
ডক্টর বাগচীর সামনে তিনি কোনভাবেই নিজের দুর্বলতা প্রকাশ পেতে দিতে চান না।

চকিতে তার মনে পড়ে গেছিল অনামিকা রায়ের সেদিনের হেঁয়ালি ভরা কথাগুলো,

এই ক্যাম্পাসের আসল নার্ভটা কিন্তু ক্লাসরুম বা অ্যাকাডেমিক্সের মধ্যে থাকে না, মিস গাঙ্গুলি... ম্যানেজমেন্ট চায় সব কিছু কন্ট্রোলে থাকুক। ওরা তো আপনার মতো ডেডিকেটেড, ইন্টেলিজেন্ট আর স্ট্রং মানুষদেরই চায়...'
এই কলেজে তিনি জয়েন করেছেন মেরেকেটে চার মাস। তিনি এখনো একজন প্রবেশনারি পিরিয়ডে আছেন; তার পার্মানেন্ট হতে এখনো অনেক দেরি। এই কলেজের নিয়মকানুন সম্পর্কে তিনি এখনো পুরোপুরি ওয়াকিবহাল নন। 

কোনভাবেই তিনি এই ধরনের প্রশাসনিক দায়িত্ব পাবার যোগ্য নন। অন্তত, দশ পনের বছরের অভিজ্ঞতা না থাকলে কলেজ কর্তৃপক্ষর কোনভাবেই বিবেচনা করার কথা নয়।

বিদিশা বুঝতে পারলেন এটা ডক্টর বাগচীর পাতা নতুন একটা ফাঁদ। এর সাথে যোগ্যতার কোন সম্পর্ক নেই।

কিন্তু, নন্দিতাদি 'না' করে দিলেন কেন ?

বিদিশা ঠিক করে নিলেন মুখের উপর না বলে একটু ঘুরিয়ে উত্তর দেবেন।

"ইটস এ হিউজ রেসপন্সিবিলিটি, স্যার। স্পেশালি আমার মতো নতুন একজন ফ্যাকাল্টির জন্য।" 
বিদিশা কয়েক সেকেন্ডের নিস্তব্ধতা ভেঙে ধীর গলায় বললেন। তার শান্ত গলার স্বরে একটা দ্বিধা মেশানো। 

"আমি কলেজে জয়েন করেছি খুব বেশিদিন হয়নি। আমার প্রবেশনারি পিরিয়ডও শেষ হয়নি। এত বড় একটা অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ কমিটিতে আমার মতো একজন জুনিয়রকে... আর তাছাড়া, ম্যাথ ডিপার্টমেন্টে আরো অনেক সিনিয়র ফ্যাকাল্টি আছেন..."

ডক্টর বাগচী হাত তুলে বিদিশাকে থামিয়ে দিলেন। তার মুখে চওড়া, আত্মবিশ্বাসী হাসি।

"এক্সপেরিয়েন্স ইজ নট এভরিথিং, মিস গাঙ্গুলি। আপনার ম্যানেজমেন্ট স্কিল, আপনার ক্রাইসিস হ্যান্ডলিং আর সবচেয়ে বড় কথা স্টুডেন্টদের প্রতি আপনার অবজেক্টিভ অ্যাপ্রোচ। এগুলোই এই কমিটির জন্য সবচেয়ে বেশি দরকার। প্রিন্সিপাল স্যারও আপনার ব্যাপারে অত্যন্ত পজিটিভ।"

বিদিশা সোজা হয়ে বসলেন। ডক্টর বাগচী হয় ইঙ্গিতটা বুঝতে পারছেন না অথবা বুঝেও না বোঝার ভান করছেন।

"আমি প্রিন্সিপাল স্যার এবং আপনার কনফিডেন্সের জন্য গ্রেটফুল, স্যার। আপনারা আমার ওপর এত বড় ভরসা রাখছেন, এটা আমার কাছে বড় পাওনা।" 

বিদিশা মুখে একটা হাসি ফুটিয়ে তুলে বললেন। তাকেও তো অভিনয়টা চালিয়ে যেতে হবে।

"কিন্তু, কমিটিটার কাজের পরিধি সম্পর্কে আমার কোনো আইডিয়া নেই। হঠাৎ করে এত বড় একটা দায়িত্ব নিলে যদি আমি জাস্টিফাই করতে না পারি, তবে কলেজেরই ক্ষতি। আমাকে ডিসিশন নেওয়ার জন্য একটু সময় দিতে হবে।"

ডক্টর বাগচীর মুখের হাসিতে এক চুলও পরিবর্তন হলো না। তিনি যেন জানতেন বিদিশা একটু সময় চাইবেন।

"অফকোর্স, টেক ইওর টাইম।" 

ডক্টর বাগচী অত্যন্ত রিল্যাক্সড ভঙ্গিতে বললেন।

 "তবে এই সপ্তাহের মধ্যেই আমাদের কমিটিটা রিকনস্টিটিউট করতে হবে। আপনি কালকের মধ্যে আপনার ডিসিশনটা আমাকে জানালে ভালো হয়।"

"শিওর, স্যার। আমি কাল সকালের মধ্যেই আপনাকে কনফার্ম করে দেব।" 

বিদিশা চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন।

"গ্রেট। হ্যাভ আ গুড ডে, মিস গাঙ্গুলি।" 

ডক্টর বাগচী আবার নিজের ল্যাপটপের স্ক্রিনে চোখ ফেরালেন।

"গুড ডে, স্যার।" 
বিদিশা ঘুরে দরজার দিকে পা বাড়ালেন। কেবিন থেকে বেরিয়ে দরজাটা পেছনে বন্ধ করার সাথে সাথে বিদিশার মুখের সেই হাসিটা উবে গিয়ে সেখানে একটা গম্ভীর ভাব ফুটে উঠল।করিডোরের ফাঁকা জায়গায় দাঁড়িয়ে তিনি একটা গভীর শ্বাস নিলেন। 

[বর্তমান]

বিদিশার ভাবনাতে হঠাৎ ছেদ পড়ল। অটোর ড্রাইভার জোরে ব্রেক কষে চেঁচিয়ে উঠল, 

"বাগবাজার মোড়! বাগবাজার মোড় এসে গেছে!"

অটোর ঝাঁকুনিতে বিদিশা আবার বাস্তবে ফিরে এলেন। কলেজ, ডক্টর বাগচীর অফিসঘর, তার কুটিল প্রস্তাব। সব এক মুহূর্তের জন্য বাগবাজার মোড়ের চেনা কোলাহলে তলিয়ে গেল। 

চালককে ভাড়া মিটিয়ে দিয়ে বিদিশা মোড়ের ফুটপাতে এসে দাঁড়ালেন।

ঘড়িতে চারটে।

গঙ্গার কোল ঘেঁষা এই পুরনো অঞ্চলে শীতের বিকেল ক্রমে ঘন হয়ে আসছে। সূর্য ততক্ষণে অনেকটা পশ্চিমের দিকে হেলে পড়েছে।

গঙ্গার পার থেকে আসা কনকনে ঠান্ডা হাওয়াটা এসে গায়ে লাগতেই বিদিশা শালটা গালে ও ঘাড়ে আরও চেপে জড়ালেন।

একটু এগোতেই বিদিশা দেখলেন মোড়ের মাথায় ছাতার নিচে বসে এক বয়স্ক ট্রাফিক পুলিশ ট্রাফিক সামলাচ্ছেন। তিনি পা চালিয়ে ওনার কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন।

"নমস্কার। একটু শুনবেন?" 

বিদিশা বিনীত সুরেই শুরু করলেন। ট্রাফিক পুলিশটি বিদিশার দিকে তাকিয়ে একটু সোজা হয়ে দাঁড়ালেন। বললেন, 

"হ্যাঁ বলুন, কোথায় যাবেন?"

"এখানে দুটো রাস্তা আছে শুনলাম, একটা দুর্গাচরণ মুখার্জি স্ট্রিট, আর একটা দুর্গাচরণ ব্যানার্জী স্ট্রিট। মুখার্জীবাড়িটা ঠিক কোন রাস্তায় পড়বে বলতে পারেন? পুরনো বেশ নামকরা ভিটে... শুনেছিলাম এককালে সেখানে দুর্গাপুজোও হতো।"

ট্রাফিক পুলিশটি কপালে হাত দিয়ে টুপিটা সামান্য একটু ঠেলে ওপরের দিকে তুলে একটু চিন্তা করলেন। তারপর দূর থেকে গঙ্গার দিকে যাওয়ার রাস্তার দিকে আঙুল উঁচিয়ে বললেন, 

"মুখার্জীবাড়ির পুজো বলতে আপনি লাহা বা বোসদের মতো বিখ্যাত পুজো খুঁজছেন কি না জানি না, তবে মুখার্জিদের ভিটে কিন্তু দুর্গাচরণ মুখার্জি স্ট্রিটেই। 

ওই রাস্তাটা ধরে সোজা গঙ্গার ঘাটের দিকে খানিকটা এগিয়ে যান। গলিটা বেশ পেঁচানো আর শান্ত। 

দুটো রাস্তা কিন্তু খুব বেশি দূরে নয়, একটায় না পেলে কাছেই ব্যানার্জী স্ট্রিট।"

"ধন্যবাদ।" 

বিদিশা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে মোড় থেকে ডানদিকের গলিটায় পা বাড়ালেন।

রাস্তার নামফলকটা দেয়ালে জ্বলজ্বল করছে, ‘দুর্গাচরণ মুখার্জি স্ট্রিট’।

গলির ভেতর ঢুকতেই বাইরের ব্যস্ত রাস্তার শোরগোল যেন এক লহমায় উধাও হয়ে গেল। এখানে সময় যেন কয়েক দশক আগে থমকে গেছে। 

দু'পাশে প্রকাণ্ড সব বনেদি বাড়ি। কোনোটার অবস্থা শোচনীয়। চুনকাম খসে লোনাধরা ইট বেরিয়ে পড়েছে। আবার, কোনোটার ঝুলন্ত কাঠের জাফরি দেওয়া বারান্দায় এখনো সেকালের রাজকীয় ছোঁয়া। প্রাচীন লাল মেঝের দালান আর খড়খড়িওয়ালা জানালাগুলোর দিকে তাকাতে তাকাতে বিদিশার বুকটা ধুকপুক করতে লাগল।

তিনি পার্স খুলে মায়ালু হাতে মায়ের সেই পুরনো সাদা-কালো ছবিটা বের করলেন।

ছবিতে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, বিশাল লম্বা একটা বারান্দা, আর তার ওপর সূক্ষ্ম নক্সা করা ঢালাই লোহার রেলিং। রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আছেন এক তার মা।

এক পা এক পা করে এগোতে লাগলেন বিদিশা। প্রতিটা বাড়ির বারান্দার দিকে তীব্র কৌতূহল ও আশায় তাকিয়ে দেখছেন তিনি।

একটা জায়গায় এসে বিদিশা থমকে দাঁড়ালেন।

রাস্তার ঠিক শেষ মাথায়, গঙ্গার একবারে কাছ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে এক বিশাল, গম্ভীর চেহারার দোতলা প্রাক-স্বাধীনতা যুগের প্রাসাদোপম বাড়ি। বাড়ির মূল ফটকের ওপর খোদাই করা নক্সা, আর দোতলার পুরোটা জুড়ে মেহগনি রঙের বিশাল বারান্দা। যার লোহার রেলিংয়ের নক্সাটা হুবহু ছবির নক্সাটার সাথে মিলে যাচ্ছে!

বিদিশার শিরদাঁড়া বেয়ে যেন একটা ঠান্ডা স্রোত নেমে গেল।

বাড়ির সদর দরজার কাঠ বেশ পুরনো, মোটা পেতলের খিল দেওয়া। দরজার একপাশে পেতলের একটা বেশ মলিন ফলকে নাম খোদাই করা রয়েছে। বিদিশা শালটা সামলে কাছে এগিয়ে গিয়ে ফলকের ধুলোটুকু হাত দিয়ে মোছালেন।

স্পষ্ট হরফে লেখা- মুখার্জী হাউস।

বাড়িটার সিংহদুয়ার আধখোলা। ভেতরে এক বিশাল ঠাকুরদালান দেখা যাচ্ছে।

বিদিশা দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে থেকে বুকভরে একটা শ্বাস নিলেন। দীর্ঘ বিশ-পঁচিশ বছর আগে বাবার মুখে আবছা শোনা রাস্তার নাম, মায়ের কয়েকটা পুরনো ছবি আর এক কঠিন ধাঁধার সমাধান আজ যেন এই বাড়ির দরজায় এসে ধাক্কা খেল।

তিনি ভেতরে ঢোকার জন্য পা বাড়াতেই ঠাকুরদালানের এক কোণে কাঠের বেঞ্চে বসে থাকা এক প্রবীণ লোক লাঠি ঠুকে দাঁড়িয়ে উঠলেন।

"কাকে চাই মা? এটা তো ব্যক্তিগত ভিটে, ভেতরে যাওয়া মানা আছে।" 

প্রবীণ লোকটির গম্ভীর গলায় কিছুটা সতর্কতার সুর।

বিদিশা থমকে দাঁড়িয়ে নিজেকে একটু গুছিয়ে নিলেন। তারপর ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে পরম যত্নে মায়ের ছবিটা বের করে লোকটির দিকে এগিয়ে দিয়ে ধীর, কিন্তু স্পষ্ট গলায় বললেন, "আমি সুমিত্রা গাঙ্গুলি।"

লোকটি চশমাটা নাকের ওপর ভালো করে আটকে নিয়ে ছবিটার দিকে বেশ কিছুক্ষণ একদৃষ্টে চেয়ে রইলেন। তারপর বিদিশার দিকে চোখ তুলে সন্দিগ্ধ গলায় প্রশ্ন করলেন, 

"তা মা, আপনি কে? হঠাৎ এই ছবি নিয়ে এখানে কি মনে করে?"

বিদিশা একটু সোজা হয়ে দাঁড়ালেন। নিজেকে সামলে নিয়ে মার্জিত অথচ স্পষ্ট গলায় বললেন, 

"আমি একজন গবেষক। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন স্টাডিজ ডিপার্টমেন্টের সাথে যুক্ত। মূলত বিশ শতকের শুরুর দিকে উত্তর কলকাতার বনেদি পরিবারগুলোর অন্দরমহল আর মহিলাদের সামাজিক অবস্থান নিয়ে কাজ করছি। সেই গবেষণার সূত্র ধরেই আমার এই বাড়িতে আসা। আমার যত দূর ধারণা, এই ছবিটা আপনাদের এই ভিটেরই কোনো বারান্দায় তোলা।"

বৃদ্ধ এবার মৃদু একটু হেসে মাথা নাড়লেন। লাঠিতে ভর দিয়ে ধীরে ধীরে বিদিশার একটু কাছে এগিয়ে এসে বললেন, 

" আপনি ভুল কিছু বলেননি, এটা মুখার্জীদেরই ভিটে। এই যে রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছেন, দুর্গাচরণ মুখার্জি স্ট্রিট; এই রাস্তাটা কিন্তু আমাদের পরিবারের প্রতিষ্ঠাতা দুর্গাচরণ মুখোপাধ্যায়ের নামেই। তবে..."

বৃদ্ধ একটু থামলেন। তারপর ছবিটার দিকে আঙুল নির্দেশ করে বললেন, 

"আপনি যে বাড়িটা খুঁজছেন, সেটা এই বাড়ি নয় মা।"

কথাটা শোনামাত্র বিদিশার বুকের ভেতরটা যেন এক মুহূর্তে বসে গেল। এতক্ষণ ধরে বুকে পুষে রাখা সবটুকু আশা যেন এক লহমায় ফিকে হয়ে এল। তিনি চকিতে নিজের হাতের ছবিটার দিকে আরেকবার তাকালেন, তারপর প্রবীণ লোকটার মুখের দিকে চেয়ে হতাশ গলায় বললেন, 

"এই বাড়ি নয়? কিন্তু... এই যে বারান্দার লোহার নক্সা, আর ওই ঢালাই কাজের মোটিফগুলো... এগুলো তো হুবহু এক! আমি তো নিজের চোখে মিলিয়ে দেখলাম।"

"আপনার চোখে ভুল নেই মা," 

প্রবীণ লোকটি সহানুভূতির সুরে বললেন। 

"নক্সা এক হবে না-ই বা কেন? ঢালাই লোহার এই কাজগুলো তো একই মিস্ত্রি দিয়ে একই সময়ে করানো। কিন্তু ভালো করে খেয়াল করে দেখুন, ছবিতে রেলিংয়ের পেছনে কাঠের যে খড়খড়ি দেওয়া দরজাগুলো দেখা যাচ্ছে, সেগুলোর মাথায় গোল আর্চ করা। আর আমাদের এই চণ্ডীমণ্ডপের ওপরের বারান্দার দরজায় কোনো আর্চ নেই, ওগুলো একদম সোজা চৌকাঠ। আপনি যেটা ছবিতে দেখছেন, ওটা আসলে ‘দেবাশ্রয়’-এর ছবি।"

"দেবাশ্রয়?" 

বিদিশা ভ্রূ কুঁচকে শব্দটা উচ্চারণ করলেন।

"সেটা আবার কোথায়?"

"সেটাও মুখার্জীবাড়িই মা," 

বৃদ্ধ একটু হেসে বুঝিয়ে বললেন, 

"এই তল্লাটে মুখার্জী বংশের একাধিক শাখা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। যে বাড়িটার নাম 'দেবাশ্রয়', সেটা হলো আমাদের মেজো শরিকের বাড়ি। সেখান থেকে আমাদের এই বাড়ি আর ঠাকুরদালান হাঁটাপথে সাত-আট মিনিট।"

বিদিশার চোখে আবার আলোর ঝিলিক খেলে গেল। বুক ধড়ফড়ানি সামলে নিয়ে তিনি অধীর হয়ে শুধোলেন,
 
"সেখানে যাওয়ার রাস্তাটা একটু বলে দেবেন, প্লিজ? আমি ঠিক কীভাবে যাব?"

"একদম সহজ পথ।" 

বৃদ্ধ হাতের লাঠিটা তুলে গঙ্গার উল্টোদিকে ইশারা করে বললেন, 

"আপনি এই রাস্তাটা দিয়ে যেদিক থেকে এলেন, সেদিকেই একটু পিছিয়ে যান। ডানহাতে একটা ছোট বাঁক পাবেন, ওটাই দুর্গাচরণ ব্যানার্জী স্ট্রিট। সেখানে ঢুকে হাতদশেক এগোলেই বাঁহাতে প্রকাণ্ড একটা সিংহদুয়ার দেখতে পাবেন। দরজার ওপর পেতলের ফলকে লেখা আছে ‘দেবাশ্রয়’। ওটাই মেজো শরিকদের আসল বাড়ি।"

বিদিশার হাত থেকে পার্সের হাতলটা এক মুহূর্তের জন্য যেন ফসকে যেতে চাইল। 'দেবাশ্রয়'... এই শব্দটা ওনার বাবার কাছে বা মায়ের কাছে কোনোদিন শোনেননি, অথচ শব্দটার মধ্যে কেমন যেন এক অদ্ভুত শ্যাওলা-ধরা প্রাচীন দীর্ঘশ্বাসের সুর জড়িয়ে আছে।

"ধন্যবাদ, জ্যাঠাবাবু।"

বিদিশা কোনোক্রমে কণ্ঠস্বর স্বাভাবিক রেখে মাথা নোয়ালেন। প্রবীণ লোকটি লাঠিতে ভর দিয়ে আবার ঠাকুরদালানের দিকে ফিরে গেলেন।

বিদিশা আর এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে হনহন করে উল্টোদিকে হাঁটতে শুরু করলেন। বিকেলের রোদ ততক্ষণে একদম রক্তাভ লাল হয়ে গঙ্গার ওপর ঢলে পড়েছে। উত্তর কলকাতার অলিগলিতে হালকা ছাইরঙা শীতের কুয়াশা আর কয়লার উনুনের ধোঁয়া জমতে শুরু করেছে। গলির ভেতরের প্রাচীন বাড়িগুলোর বারান্দায় একের পর এক হলুদ আলোর বাল্ব জ্বলে উঠছে।

পাঁচ মিনিটের মাথায় তিনি দুর্গাচরণ ব্যানার্জী স্ট্রিটে এসে ঢুকলেন। রাস্তাটা মুখার্জি স্ট্রিটের চেয়ে সরু এবং বেশি নির্জন। দু-পাশে বিশালাকার পুরনো অট্টালিকাগুলো যেন একে অপরের দিকে ঝুঁকে এক রহস্যময় ছায়াঘেরা পরিবেশ তৈরি করে রেখেছে।
দশ-বারো পা এগোতেই বিদিশার চোখে পড়ল সেই সিংহদুয়ার।

রাস্তার বাঁ পাশে, সুবিশাল এক জোড়া কালো লোহার গেট। জং ধরা পেতলের ফলকে খোদাই করা রয়েছে দুটো শব্দ— ‘দেবাশ্রয়’।

গেটের একপাশের খড়খড়ি দেওয়া একটা ছোট কাঠের পকেট-ডোর আধখোলা ছিল। বিদিশার হৃদস্পন্দন এখন কানের পর্দায় সশব্দে হাতুড়ি পিটছে। তিনি পার্সটা আঁকড়ে ধরে শালটা গায়ে চড়িয়ে আলতো পায়ে সেই ছোট দরজাটা গলে ভেতরে প্রবেশ করলেন।

ভেতরে ঢুকতেই এক আশ্চর্য নিস্তব্ধতা তাকে গ্রাস করল। একসময় নিশ্চয়ই এই চত্বর গমগম করত, কিন্তু এখন সেখানে শুধুই এক পরিত্যক্ত রাজকীয় ধ্বংসাবশেষের গন্ধ। সুবিশাল উঠোনজুড়ে বালি আর চুনকামের গুঁড়ো ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। ঠিক সামনেই বিশাল ঠাকুরদালান, তার ওপরেই সেই দোতলার প্রকাণ্ড মেহগনি রঙের বারান্দা। যা ছবির সেই খড়খড়ি দেওয়া গোল আর্চের দরজাগুলোর সাথে একশো শতাংশ মিলে যায়।

"কে ওখানে? অতো আড়ালে দাঁড়িয়ে কাকে খুঁজছেন?"

দালানের অন্ধকারের ভেতর থেকে এক প্রৌঢ়া মহিলার কড়া, সতর্ক কণ্ঠস্বর ভেসে এল।

বিদিশা চমকে উঠে দাঁড়িয়ে পড়লেন। দালানের সিঁড়ি দিয়ে ধীরে ধীরে নেমে আসছেন এক ষাটোর্ধ্ব প্রৌঢ়া। পরনে সাধারণ একটা সুতির থান, গায়ে খয়েরি রঙের চাদর জড়ানো; কিন্তু চেহারায় এক ধরনের ক্ষুরধার আভিজাত্যের ছাপ স্পষ্ট।

বিদিশা সঙ্গে সঙ্গে নিজের ভেতরের অস্থিরতাটুকু চেপে নিলেন। গবেষক আর রিফাইনড ভদ্রমহিলার সেই নিখুঁত মুখোশটা আবার মুখে পরে নিলেন তিনি।


"নমস্কার।" বিদিশা অত্যন্ত বিনম্র ভঙ্গিতে সামনে এগিয়ে গেলেন। 

"আমি সুমিত্রা গাঙ্গুলি। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন স্টাডিজ ডিপার্টমেন্টের সাথে যুক্ত। উত্তর কলকাতার আদি বনেদি পরিবারগুলোর অন্দরমহলের সামাজিক পরিবর্তন নিয়ে একটা ডকুমেন্টারি ও আর্টিকেলের কাজ করছি। দুর্গাচরণ মুখার্জি স্ট্রিটের মূল ভিটে থেকে আমাকে এখানকার খোঁজ দেওয়া হলো।"

প্রৌঢ়া থামলেন। বিদিশার আপাদমস্তক তীব্র তীক্ষ্ণ চোখে পর্যবেক্ষণ করলেন, 

বিদিশার পেস্তারঙা সিল্কের শাড়ি, কালো শাল, রুচিশীল কথা বলার ধরন আর স্বভাব আভিজাত্য ধরন দেখে মহিলার চোখের কড়া ভাবটা কিছুটা হলেও আলগা হলো।

"বিশ্ববিদ্যালয়? গবেষণা?" 

প্রৌঢ়া একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, যাতে স্পষ্ট জমে থাকা একরাশ তিক্ততা। 

"এখানে আর কীসের গবেষণা করবেন বাপু? যা দেখার, তা তো বহুকাল আগেই হারিয়ে গিয়েছে। প্রমোটাররা দিনরাত চক্কর কাটছে। তাও বলুন, কী জানতে চান?"

বিদিশা পার্স থেকে মায়ের সেই পুরনো সাদা-কালো ছবিটা বের করে এগিয়ে দিলেন।

"আমি কোনো ঝামেলায় জড়াতে আসিনি, ম্যাম। আসলে এই ছবিটা একটা পুরোনো আর্কাইভে পেয়েছিলাম। বিশ শতকের চারের বা পাঁচের দশকের একটা ছবি। আমার মনে হলো, এই ছবিটা এই 'দেবাশ্রয়'-এর বারান্দাতেই তোলা।"

প্রৌঢ়া ছবিটা হাতে নিলেন। চাদরের ভেতর থেকে একজোড়া পুরনো চশমা বের করে চোখে লাগালেন।

প্রথম কয়েক সেকেন্ড তিনি ছবিটার বারান্দা আর রেলিংয়ের দিকে তাকালেন। তারপর, হঠাৎ করেই ওনার হাতটা সামান্য কেঁপে উঠল। ওনার দৃষ্টি আটকে গেল ছবিতে বারান্দার রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে থাকা বিদিশার মায়ের মুখটার ওপর।

প্রৌঢ়ার মুখের সমস্ত কড়া ভাব যেন এক লহমায় উবে গিয়ে এক অদ্ভুত, আতঙ্কে পরিণত হলো। ওনার চোখের মণি দুটো স্থির হয়ে গেল।

"এ... এই ছবি আপনি কোথায় পেলেন?" প্রৌঢ়ার গলার দাপুটে স্বর বদলে গিয়ে এক ভাঙা, খসখসে আওয়াজে পরিণত হলো।

বিদিশা প্রৌঢ়ার এই আকস্মিক পরিবর্তন দেখে মনে মনে চমকে উঠলেন, কিন্তু বাইরে একদম স্বাভাবিক থেকে বললেন, 

"বললাম তো, কলকাতা ইউনিভার্সিটির ফটোগ্রাফিক আর্কাইভ থেকে সংগৃহীত। কেন বলুন তো? ওনাকে কি আপনি চেনেন?"

প্রৌঢ়া বিদিশার চোখের দিকে তাকালেন। সেই চাহনিতে এক অসীম সন্দেহ আর প্রচ্ছন্ন ভয়।

"এই মেয়েটির নাম সুচরিতা ?" 

প্রৌঢ়া খুব নিচু, থমথমে গলায় শুধোলেন। 

"সুচরিতা মুখোপাধ্যায়। এই বাড়ির ছোট মেয়ে।"

বিদিশার বুকের ভেতরটা যেন একটা বিশাল ধাক্কা খেল।

 'সুচরিতা'... ওনার মায়ের নাম! এত বছর পর এই অচেনা বাড়ির উঠোনে দাঁড়িয়ে নিজের মায়ের নাম আর পরিচয় আবার এভাবে কোন আত্মীয়ের মুখে শুনবেন, তিনি কল্পনাও করতে পারেননি।

বিদিশা নিজের আবেগ চরম কষ্টে চেপে রেখে বললেন, 

"হ্যাঁ... নথিতে ওনার নাম সুচরিতাই লেখা ছিল। আপনি কি ওনার সম্পর্কে কিছু জানেন?"

প্রৌঢ়া ছবিটা প্রায় বিদিশার হাতে ঠেলে ফেরত দিলেন। আগের ভীত ভাবটা কেটে গিয়ে ওনার চেহারায় হঠাৎ করেই এক চরম বিরক্তি আর অস্বস্তি ছড়িয়ে পড়ল।

"যে নাম এই বাড়ি থেকে আশির দশকেই মুছে ফেলা হয়েছে, তা নিয়ে আর কোনো কথা আমি বলতে চাই না।" 

প্রৌঢ়া গায়ের চাদরটা শক্ত করে জড়িয়ে নিলেন। 

"উনি পরিবারের অমতে এক সাধারণ কুলীন পরিবারের ছেলেকে পালিয়ে বিয়ে করে বংশের নাম ডুবিয়েছিলেন। এই বাড়ির বড় কর্তা ওনাকে ত্যাজ্য করেছিলেন। ওনার কোনো অস্তিত্ব এই বাড়িতে নেই। আপনি ভুল জায়গায় এসেছেন, দয়া করে এখন আসুন।"

কথাটা শেষ করে প্রৌঢ়া ঘুরে সিঁড়ি দিয়ে হনহন করে ওপরে উঠতে লাগলেন।

"এক মিনিট শুনুন!" 

বিদিশা কিছুটা এগিয়ে গিয়ে ডাকার চেষ্টা করলেন। 

"উনি তো আর বেঁচে নেই... ওনার কোনো ডায়েরি বা কোনো স্মৃতি কি এই বাড়িতে নেই?"

প্রৌঢ়া সিঁড়ির মাঝামাঝি গিয়ে থামলেন। কিন্তু পেছনে ফিরলেন না। কিছুটা উত্তেজিত গলায় বললেন, 

"ওনার কোনো স্মৃতি এ বাড়িতে রাখা হয়নি। সে মেয়ে এই ভিটে থেকে কী নিয়ে পালিয়েছিল, সেই সম্পর্কে আপনার কোন ধারণা আছে কী ! পুলিশের ঝামেলা করার আগে আপনি দয়া করে এখান থেকে চলে যান।"

প্রৌঢ়া দ্রুত পায়ে দোতলার অন্ধকারের মধ্যে মিলিয়ে গেলেন।

উঠোনে বিদিশা একা নির্বাক অবস্থায় দাঁড়িয়ে রইলেন। বিকেলের শেষ আলোটুকু ধুয়ে গিয়ে পুরো 'দেবাশ্রয়'-এর ওপর ততক্ষণে থমথমে অন্ধকার নেমে এসেছে।

তার মা রাতের অন্ধকারে বাড়ি থেকে পালিয়ে বিয়ে করেছিলেন ? নিজের সঙ্গে করে পরিবারের কোনো দূমূর্ল্য সম্পদ নিয়ে পালিয়েছিলেন তার মা ? এইজন্যই কী তারা মায়ের সব চিহ্ন মুছে ফেলেছিল ?

কই, তার বাবা তো কখনও এবিষয়ে মুখ খোলেননি। 

বিদিশার চোখের কোণে এক ফোঁটা জল জমে উঠেছিল। সেটা টের পাওয়ামাত্র তিনি সঙ্গে সঙ্গে জলটা মুছে ফেললেন। 

অভিমান? নাকি আবিষ্কারের উত্তেজনা?

তিনি জেনে গেছেন, তার মায়ের স্মৃতি এই দেবাশ্রয়েই কোথাও লুকিয়ে আছে। আর বিদিশা গাঙ্গুলি কোনোদিন অর্ধেক রাস্তায় কাজ ফেলে পিছু হটেন না।

আজ তিনি ফিরে যাচ্ছেন ঠিকই। কিন্তু, খুব শিগগিরই, যেভাবে হোক, কোন উপায়ে বা কোন কৌশলে, এই ভিটেতে তিনি ফিরবেনই। তাকে ফিরতেই হবে।
Like Reply
অসাধারণ আপডেট | কিন্তু সপ্তম পর্ব টা দু বার আপলোড হয়ে গেছে। পরবর্তী পর্বের অপেক্ষায় রইলাম |
[+] 1 user Likes bad_boy's post
Like Reply
Just great... Awasome update.great writing. Mone hoi u no ta 2 bar ese gache... But really really great update
[+] 1 user Likes Slayer@@'s post
Like Reply
(09-08-2026, 11:46 AM)bad_boy Wrote: অসাধারণ আপডেট | কিন্তু সপ্তম পর্ব টা দু বার আপলোড হয়ে গেছে। পরবর্তী পর্বের অপেক্ষায় রইলাম |
লাইক আর রেপু দেবার জন্য অনেক ধন্যবাদ। আমি সপ্তম পর্বটা ডিলিট করে দিয়েছি। আমি চার-পাঁচদিন পরে আবার লিখতে শুরু করব। পরের পর্ব আবার দু-আড়াই সপ্তাহ পরে।
Like Reply
(09-08-2026, 12:41 PM)Slayer@@ Wrote: Just great... Awasome update.great writing. Mone hoi u no ta 2 bar ese gache... But really really great update

লাইক আর রেপু দেবার জন্য অশেষ ধন্যবাদ। হ্যাঁ, ওই পর্বটা ডিলিট করে দিয়েছি।
Like Reply
(09-08-2026, 10:06 PM)RockyKabir Wrote: লাইক আর রেপু দেবার জন্য অনেক ধন্যবাদ। আমি সপ্তম পর্বটা ডিলিট করে দিয়েছি। আমি চার-পাঁচদিন পরে আবার লিখতে শুরু করব। পরের পর্ব আবার দু-আড়াই সপ্তাহ পরে।

অপেক্ষায় রইলাম। একটা প্রশ্ন আছে। 'পুজোর আগে কি আগামী পর্বটাই শেষ পর্ব?'
Like Reply
(09-08-2026, 11:59 PM)bad_boy Wrote: অপেক্ষায় রইলাম। একটা প্রশ্ন আছে। 'পুজোর আগে কি আগামী পর্বটাই শেষ পর্ব?'

নাহ। তার পরে আরেকটা পর্ব দেবার ইচ্ছে আছে। সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে শেষ করতে পারলে ওটাই পুজোর আগে শেষ পর্ব হবে। যদি সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে কোনভাবেই লেখা শেষ না করতে পারি তাহলে ওটা পুজোর পরে আসবে।
[+] 3 users Like RockyKabir's post
Like Reply
এই গল্পের নিয়মিত পাঠকদের কাছে প্রশ্ন,

১) কোন কোন চরিত্রকে আপনাদের ইন্টারেস্টিং লাগছে এবং আরো দেখার ইচ্ছা জাগছে ?
২) গল্পের কোন কোন ট্র্যাক এবং সাবপ্লট আপনাদের ইন্টারেস্টিং লাগছে এবং আরো জানার ইচ্ছা জাগছে ?
৩) আগামী অধ্যায়ে কার কার ছবি দেখতে চান।
[+] 2 users Like RockyKabir's post
Like Reply
(13-08-2026, 10:19 PM)RockyKabir Wrote: এই গল্পের নিয়মিত পাঠকদের কাছে প্রশ্ন,

১) কোন কোন চরিত্রকে আপনাদের ইন্টারেস্টিং লাগছে এবং আরো দেখার ইচ্ছা জাগছে ?
২) গল্পের কোন কোন ট্র্যাক এবং সাবপ্লট আপনাদের ইন্টারেস্টিং লাগছে এবং আরো জানার ইচ্ছা জাগছে ?
৩) আগামী অধ্যায়ে কার কার ছবি দেখতে চান।

বিদিশা আর আয়ানয়ের একটা কিসিং ফটো দেখতে চাই
Like Reply
বর্তমানের নিরিখে এখন অরুণের চরিত্রের আর্কা সবচেয়ে কমপ্লেক্স একই সাথে ইন্টারেস্টিং। তবে টেকনিক্যাল টার্মে গুলো বুঝতে বেশ বেগ পেতে হচ্ছে। এই আর্কটাই কর্পোরেট কালচার,এফেয়ার,ক্ষমতার লড়াই,murder, এফেয়ার,পলিটিক্স সব আছে। তবে মানতে হবে ফরেনসিক নিয়ে আপনাকে যথেষ্ট রিসার্চ করতে হয়েছে। আর একটা কথা জানার ছিল ফিরেন্সিকের পার্ট সম্পূর্ণ বাস্তবিক না কিছুকা কল্পনা মেশানো? যাই হোক অরুণের আর্কটা কলপ্লেক্সসিটির দিক থেকে বাকি অয়ন বা বিদিশাকে পুরোপুরি ওভারশাডো করে দিয়েছে।

বিদিশার পার্ট আমার বেস্ট লাগে।না খুব জটিল না খুব সহজ ।একদম ব্যালেন্সড ।যেমনটা হওয়া উচিত। একটু রহস্যভেদ গোয়েন্দার মতো।

আর অয়নের পার্টটা এখনো পর্যন্ত যতটা পড়েছে তার মধ্যে সবচেয়ে খারাপ। বৈশালির সাথে সিনসটা কি একান্তই জরুরি ছিল । কোনো রিলেশনশিপে থাকা মেয়ের সাথে। যদি অয়নের প্লে বয়েই হয় তাহলে তার আর বিক্রমের মধ্যে কি ফারাক রইল। আমাদের কাহিনীর মূল নায়ক মাগীবাজি করে। এটা কোনো হিরোর কাজ হলো। কোথায় অয়নের সাথে রিলেশন বিল্ড আপ ,রোমান্স, দেখিয়ে তার পর sex হবে তানা হুটহাট sex। Amar কাছে worst লেগেছে জিনিসটা।অয়নের প্রথম sex কোনো ওয়েল established চরিত্রের সাথে হওয়া উচিত ছিল। আইকনিক ভাবে । বৈশালী কোনো established চরিত্র না। Random charecter ।

কাহিনী যত এগোচ্ছে চরিত্র যেন শেষই হচ্ছে না । নতুন চরিত্রের মধ্যে বিনা কাপুর তার ছেলে ,অন্যান্য মালহোত্রা,আর অর্জুন লাহিড়ী এদের সবার একটা ক্রিটিক্যাল রোলে থাকবে আশা করছি। দেখা যাক।
[+] 2 users Like All IS WELL's post
Like Reply
(13-08-2026, 10:19 PM)RockyKabir Wrote: এই গল্পের নিয়মিত পাঠকদের কাছে প্রশ্ন,

১) কোন কোন চরিত্রকে আপনাদের ইন্টারেস্টিং লাগছে এবং আরো দেখার ইচ্ছা জাগছে ?
২) গল্পের কোন কোন ট্র্যাক এবং সাবপ্লট আপনাদের ইন্টারেস্টিং লাগছে এবং আরো জানার ইচ্ছা জাগছে ?
৩) আগামী অধ্যায়ে কার কার ছবি দেখতে চান।
বিদিশা
Like Reply
(14-08-2026, 06:09 PM)All IS WELL Wrote: বর্তমানের নিরিখে এখন অরুণের চরিত্রের আর্কা সবচেয়ে কমপ্লেক্স একই সাথে ইন্টারেস্টিং। তবে টেকনিক্যাল টার্মে গুলো বুঝতে বেশ বেগ পেতে হচ্ছে। এই আর্কটাই কর্পোরেট কালচার,এফেয়ার,ক্ষমতার লড়াই,murder, এফেয়ার,পলিটিক্স সব আছে। তবে মানতে হবে ফরেনসিক নিয়ে আপনাকে যথেষ্ট রিসার্চ করতে হয়েছে। আর একটা কথা জানার ছিল ফিরেন্সিকের পার্ট সম্পূর্ণ বাস্তবিক না কিছুকা কল্পনা মেশানো? যাই হোক অরুণের আর্কটা কলপ্লেক্সসিটির দিক থেকে বাকি অয়ন বা বিদিশাকে পুরোপুরি ওভারশাডো করে দিয়েছে।

বিদিশার পার্ট আমার বেস্ট লাগে।না খুব জটিল না খুব সহজ ।একদম ব্যালেন্সড ।যেমনটা হওয়া উচিত। একটু রহস্যভেদ গোয়েন্দার মতো।

আর অয়নের পার্টটা এখনো পর্যন্ত যতটা পড়েছে তার মধ্যে সবচেয়ে খারাপ। বৈশালির সাথে সিনসটা কি একান্তই জরুরি ছিল । কোনো রিলেশনশিপে থাকা মেয়ের সাথে। যদি অয়নের প্লে বয়েই হয় তাহলে তার আর বিক্রমের মধ্যে কি ফারাক রইল। আমাদের কাহিনীর মূল নায়ক মাগীবাজি করে। এটা কোনো হিরোর কাজ হলো। কোথায় অয়নের সাথে রিলেশন বিল্ড আপ ,রোমান্স, দেখিয়ে তার পর sex হবে তানা হুটহাট sex। Amar কাছে worst লেগেছে জিনিসটা।অয়নের প্রথম sex কোনো ওয়েল established চরিত্রের সাথে হওয়া উচিত ছিল। আইকনিক ভাবে । বৈশালী কোনো established চরিত্র না। Random charecter ।

কাহিনী যত এগোচ্ছে চরিত্র যেন শেষই হচ্ছে না । নতুন চরিত্রের মধ্যে বিনা কাপুর তার ছেলে ,অন্যান্য মালহোত্রা,আর অর্জুন লাহিড়ী এদের সবার একটা ক্রিটিক্যাল রোলে থাকবে আশা করছি। দেখা যাক।

সুন্দর বিশ্লেষণ ।
Like Reply
(14-08-2026, 06:09 PM)All IS WELL Wrote: বর্তমানের নিরিখে এখন অরুণের চরিত্রের আর্কা সবচেয়ে কমপ্লেক্স একই সাথে ইন্টারেস্টিং। তবে টেকনিক্যাল টার্মে গুলো বুঝতে বেশ বেগ পেতে হচ্ছে। এই আর্কটাই কর্পোরেট কালচার,এফেয়ার,ক্ষমতার লড়াই,murder, এফেয়ার,পলিটিক্স সব আছে। তবে মানতে হবে ফরেনসিক নিয়ে আপনাকে যথেষ্ট রিসার্চ করতে হয়েছে। আর একটা কথা জানার ছিল ফিরেন্সিকের পার্ট সম্পূর্ণ বাস্তবিক না কিছুকা কল্পনা মেশানো? যাই হোক অরুণের আর্কটা কলপ্লেক্সসিটির দিক থেকে বাকি অয়ন বা বিদিশাকে পুরোপুরি ওভারশাডো করে দিয়েছে।

বিদিশার পার্ট আমার বেস্ট লাগে।না খুব জটিল না খুব সহজ ।একদম ব্যালেন্সড ।যেমনটা হওয়া উচিত। একটু রহস্যভেদ গোয়েন্দার মতো।

আর অয়নের পার্টটা এখনো পর্যন্ত যতটা পড়েছে তার মধ্যে সবচেয়ে খারাপ। বৈশালির সাথে সিনসটা কি একান্তই জরুরি ছিল । কোনো রিলেশনশিপে থাকা মেয়ের সাথে। যদি অয়নের প্লে বয়েই হয় তাহলে তার আর বিক্রমের মধ্যে কি ফারাক রইল। আমাদের কাহিনীর মূল নায়ক মাগীবাজি করে। এটা কোনো হিরোর কাজ হলো। কোথায় অয়নের সাথে রিলেশন বিল্ড আপ ,রোমান্স, দেখিয়ে তার পর sex হবে তানা হুটহাট sex। Amar কাছে worst লেগেছে জিনিসটা।অয়নের প্রথম sex কোনো ওয়েল established চরিত্রের সাথে হওয়া উচিত ছিল। আইকনিক ভাবে । বৈশালী কোনো established চরিত্র না। Random charecter ।

কাহিনী যত এগোচ্ছে চরিত্র যেন শেষই হচ্ছে না । নতুন চরিত্রের মধ্যে বিনা কাপুর তার ছেলে ,অন্যান্য মালহোত্রা,আর অর্জুন লাহিড়ী এদের সবার একটা ক্রিটিক্যাল রোলে থাকবে আশা করছি। দেখা যাক।

একে একে উত্তর দিচ্ছি, হ্যাঁ, ফরেন্সিকের পুরো অংশটাই সত্যি। ডিগক্সিন নামে এরকম একটা বস্তু সত্যিই আছে যা খাবারে মিশিয়ে দিলে নিমেষের মধ্যে হার্ট অ্যাটাক ঘটাতে পারে। এটার মতো আরো বেশ কয়েকটা যৌগ আছে যারা একই কাণ্ড ঘটাতে সক্ষম। এটা জানার জন্য রিসার্চ করতে হয়েছে।

শুধু এটাই নয়, বাগবাজারে সত্যিই দুর্গাচরণ মুখার্জী স্ট্রিট আছে আর ওই রাস্তাটার নাম যার নামে রাখা হয়েছে সেই দুর্গাচরণ মুখার্জীর পরিবারের বাসভবন "মুখার্জী হাউস" সত্যিই ওখানে আছে। এটাই শেষ নয়, সাত-আট মিনিট দূরত্বে দুর্গাচরণ ব্যানার্জীর নামে সত্যিই আরেকটা রাস্তা আছে। দর্জিপাড়ায় দুর্গাচরণ মিত্রের নামেও একটা রাস্তা আছে আর মিত্রদের বাড়ির পুজো খুব ধুমধাম করে হয়। এগুলো সবই রিসার্চের ফল।

এবার থেকে আমি টেকনিক্যাল টার্মের অর্থ দিয়ে দেব।


এবার গল্পের প্রসঙ্গে আসি, এটুকুতেই হাঁপিয়ে উঠলে হবে ? এখনো অনেক চরিত্র গল্পে আসেইনি।

তবে, চিন্তা কর না; যাদের দরকার তাদের বাইরে কোন অতিরিক্ত চরিত্র আমি গল্প বড় করবার জন্য
আনব না।

আমি আগে বলেছি, এই আর্কটা একটা ব্রিজ হিসেবে কাজ করছে। এই আর্কে সবার বড় রোল নেই।

চরিত্রগুলোর মধ্যে, অরুণের জগতটা অনেক বড়। এত শেডস আছে বলেই ওটা অত ইন্টারেস্টিং।

কিন্তু, অয়ন একটা কলেজ স্টুডেন্ট। অরুণের তুলনায় ওর জগতটা বেশ সীমিত। অরুণ না থাকলে শুধু বিদিশা আর অয়নের কাহিনী দিয়ে গল্পটা ভীষণ স্লো মনে হতো।

চাইলে প্রতিটা অধ্যায়ে অরুণের কাহিনী অয়ন আর বিদিশাকে overshadow করতে পারে। সেজন্য খুব বুঝে বুঝেশুনে ওই সাইডটা দেখাতে হয়। এটাও আপডেট দিতে দেরি হবার একটা কারণ।

বিদিশাকে লিখতে আমায় বেশ বেগ পেতে হচ্ছে। আসল গল্পে বিদিশার কোন ব্যাকস্টোরি নেই, কোন হিস্টরি নেই, পরিবার বলে কিছু নেই, শুধু ধনী পরিবারের মেয়ে আর বাবার উল্লেখ আছে। কোন বন্ধুবান্ধব নেই। আমি জানি না, বাস্তবে এমন কোন মানুষ আছে কিনা যার একটাও বন্ধু নেই।

লেখক কী খেয়ে গল্পটা লিখতে বসেছিল কে জানে।

এজন্য বিদিশার ক্যারেক্টার ডেভেলপমেন্ট বেশ স্লো। আপাতত যতক্ষণ না আপ টু ডেট হচ্ছে ততক্ষণ এরকমই চলবে।

গল্পে ইরোটিকা তো থাকবেই। অয়ন আর বৈশালীর সিনটা কেমন হয়েছে সেটা বললে না তো ? এবার উতরেছে ?

আমি অষ্টম অধ্যায়ে অলরেডি মেনশন করেছি যে অয়ন কলেজে ভর্তি হয়ে স্পোর্টসের যোগ দেবার পাশাপাশি একাধিক মেয়ের সাথে ডেটে গেছিল। অয়ন আর বৈশালীর বিষয়টা হঠাৎ ঘটেনি, সে random character নয়। তবে গল্পে কতটা জায়গা দেব সেটা নিয়ে কিছু ভাবিনি। আর, দুজনের মধ্যে সেক্স হয়নি। তাহলে আমি পুরোটাই লিখতাম।
Like Reply
নতুন আপডেট কবে আসছে
Like Reply
(19-08-2026, 08:53 PM)সমাপ্তি Wrote: নতুন আপডেট কবে আসছে

লেখা চলছে। ধরে নিন সামনের সপ্তাহে কোন একসময় আপডেট আসবে। কবে আসবে এখনই ঠিকঠাক ভাবে বলতে পারব না। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আপডেট দেবার চেষ্টা করব।
[+] 1 user Likes RockyKabir's post
Like Reply
দাদা আপনার আপডেট দেরির কারণে কাহিনীর হাইপে যথেষ্ট প্রভাব পড়ছে। একটা আপডেটের পর আমাদের তিন সপ্তাহের বেশি অপেক্ষা করতে হয়।যদি আপডেট আগের মতো অন্তত সাপ্তাহিক হতো তবুও বেশ running লাগত।এখন যেন সেই আগের টোন টা হারিয়ে গেছে । জানি আপনি লেখাতে অনেক সময় দেন তবে বলছি আপনি একসাথে পুরো আপডেট না দিয়ে একটি একট করে 5দিন বা 7দিনের গ্যাপ ছোট করে ভেঙে আপডেট গুলো পোস্ট করুন।তাতে আমাদের এত দীর্ঘ অপেক্ষা করতে হবে না আর কাহিনীটা ডিসকনটিনিউ মনে হবে না। আমার মতে লম্বা গ্যাপের পর একসাথে অনেকগুলো আপডেটের চেয়ে কম সময়ের ব্যবধানে ছোট বা মাঝারি আপডেট বেশি প্রেফারেবল। এটা যেমন ব্রেকফাস্ট,লাঞ্চ না করে রাতে একসাথে পুরো দিনের খবর খাওয়া। আর মাঝের সময়গুলোতে আপনি কিছু ai post করতে পারেন। ভেবে দেখবেন ব্যাপারটা।
Like Reply




Users browsing this thread: 1 Guest(s)