Thread Rating:
  • 72 Vote(s) - 2.81 Average
  • 1
  • 2
  • 3
  • 4
  • 5
Erotic Thriller মরীচিকা ও মোহময়ী
(01-08-2026, 11:12 PM)RockyKabir Wrote: নতুন চ্যাপ্টারের 50% কমপ্লিট হয়েছে। কালকের মধ্যে দেবার চেষ্টা করব, তবে না এলে বুঝে নেবেন কমপ্লিট হয়নি।
আমি আগেই বলে দিলাম, যেহেতু এর আগে বলেছিলাম কতটা লেখা হয়েছে তার আপডেট দেব।
Like Reply
Do not mention / post any under age /rape content. If found Please use REPORT button.
(01-08-2026, 11:12 PM)RockyKabir Wrote: নতুন চ্যাপ্টারের 50% কমপ্লিট হয়েছে। কালকের মধ্যে দেবার চেষ্টা করব, তবে না এলে বুঝে নেবেন কমপ্লিট হয়নি।
আমি আগেই বলে দিলাম, যেহেতু এর আগে বলেছিলাম কতটা লেখা হয়েছে তার আপডেট দেব।

Waiting for new update
Like Reply
Update কখন আসবে স্যার
Like Reply
আজ কী আপডেট আসবে
Like Reply
একটা সিন লেখা শেষ করে এবার শুতে যাব। এখনও 40%-35% লেখা বাকি।

এটা কী ছেলের হাতের মোয়া নাকি যে আবদার করবে আর হাতে ধরিয়ে দেব ? জীবনে তো কখনো রেপু দিতে দেখলাম না। এক একটা চরিত্রের ওয়ার্ল্ড বিল্ড করতে কত রিসার্চ করতে হয় সেই সম্পর্কে কোন আইডিয়া আছে ?
Like Reply
(02-08-2026, 11:54 AM)rehanarman29 Wrote: Waiting for new update

ভাই তুই আগে রেপুটেশন দে তারপর আপডেটের বায়না করবি।
[+] 1 user Likes RockyKabir's post
Like Reply
লেখক কে নিজের মতো করে লিখতে দিন | এই ধরনের ক্রিয়েটিভ কাজে মারাত্মক রকমের burnout হয় | সুতরাং আপডেট দিতে দেরি হলেও উনাকে ব্যতিব্যস্ত করা উচিত না।
[+] 1 user Likes bad_boy's post
Like Reply
যদি আপনি নিজের লেখার নিজেই রিভিউ করেন তাহলে আপনার লেখা সম্বন্ধে আপনি কি বলবেন?
[+] 1 user Likes All IS WELL's post
Like Reply
ভাই অসাধারণ লেখা আজ দুই দিনে শেষ করেছি কিন্তু আপনার লিখতে অনেক সময় লেগেছ। ভাই আমি নাম গুলো গুলিয়ে ফেলছি হা হা, তবে ভাই নতুন কোন চরিত্র ডুকালে গল্পের যে সেটা কেটে জায় আর ভাই আমি তোসার কাছে অনুরোধ করবো মা জেলের মধ্যে যেন একটা কষ্টের পরিস্থিতি তৈরি হয়, যেখানে এতদিন বিদিশা অয়নকে এরিয়ে চলেছে, এক মস পরে ওকে দেখে যেন খুব কস্ট পায় যে আমার ছেলের এমন হাল আমার জন্য হয়েছে, এবং মা ও ছেলের মধ্যে যেন ফোনে কথপোকথন টা বারে। আমার কাছে গল্পটা পরে মনে হোচ্ছে আমি কোন কলেজ পরছি ভাই একটু ঘররে সিন নিলে ভাল হয়। অয়নকে ওর বাবা ফোন করবে মাঝে মাঝে মা ফোন করবে তার পরে আস্তে আস্তে অয়ন বিদিশার মধ্যা সেক্স হবে কঠিন সেক্স। তবে লেখকের কি ধারনা তা আমি জানি না আমি গল্পপরে সুধু এই টুকু চাওয়া বিদিশাকে অয়ন ছারা অন্য কাউকে দিয়ে চোদাবেন না প্লিজ, তবে লেখক কি চান সেটা একমাত্র তার ইচ্ছে।


পরি শেষে বলবো অসাধারণ লেখা ভাই এই ভাললাগা থাকতে থাকতে আপডেট দিলে গল্পের মজা অনেক গুন বেড়েজাবে ধন্যবাদ ভাই
Like Reply
Writer sahab with due respect. Ekta hoya sex scene na lakha, r Ekta kichu sexy  na lakha apni second Tai korchan. Jakhon thaka Vidisha jawan hoya mana 26 years hoyacha, jaeta impossible. takhon thaka sae gajano  Vidisha, football , office politics.  Apnar story tag ki acha "erotic thriller " . Apni erotic thriller mana bhojan.  Original writer lakaha sesh hobar pora story ta erotic thriller "e" pojonto nei.

@sarit11  please look in to this . Writer is using erotic thriller tag but writing nothing erotic after original writer writing ends. Please do something.
[+] 1 user Likes Man of steel's post
Like Reply
(06-08-2026, 06:39 AM)Man of steel Wrote: Writer sahab with due respect. Ekta hoya sex scene na lakha, r Ekta kichu sexy  na lakha apni second Tai korchan. Jakhon thaka Vidisha jawan hoya mana 26 years hoyacha, jaeta impossible. takhon thaka sae gajano  Vidisha, football , office politics.  Apnar story tag ki acha "erotic thriller " . Apni erotic thriller mana bhojan.  Original writer lakaha sesh hobar pora story ta erotic thriller "e" pojonto nei.

@sarit11  please look in to this . Writer is using erotic thriller tag but writing nothing erotic after original writer writing ends. Please do somethin .
(Who the hell are you) না ভালো লাগলে আপনার পায়ে পড়তে কেউ যাচ্ছে না। আমাদের এভাবেই ভালো লাগছে। আপনার বেশি s*x scene লাগলে আরো অনেক গল্প আছে। এই ভাবে বলে একটা গল্প শুরুতেই শেষ করাতে চান। আপনি একটা লিখুন, ভালো গল্প। যেখানে রাইটার শুরুতেই / মাঝে বলেছেন আমার গল্পে অতিরিক্ত sex পাবেন না তাই তাকে খোঁচানোর কোনো প্রয়োজন মনে করছি না আমি.।। ধন্যবাদ ?।।
announce horseride
[+] 3 users Like Soytan@'s post
Like Reply
(05-08-2026, 03:07 PM)bad_boy Wrote: লেখক কে নিজের মতো করে লিখতে দিন | এই ধরনের ক্রিয়েটিভ কাজে মারাত্মক রকমের burnout হয় | সুতরাং আপডেট দিতে দেরি হলেও উনাকে ব্যতিব্যস্ত করা উচিত না।

আমার দিকটা বোঝার জন্য অনেক ধন্যবাদ ভাই। আরেকটা সিন বাকি আছে। যদি শেষ করতে পারি তবে আজ রাতে আপডেট দেব নয়তো আগামীকাল।
[+] 1 user Likes RockyKabir's post
Like Reply
(05-08-2026, 05:07 PM)All IS WELL Wrote: যদি আপনি নিজের লেখার নিজেই রিভিউ করেন তাহলে আপনার লেখা সম্বন্ধে আপনি কি বলবেন?

নিজের লেখার unbiased রিভিউ করা খুব কঠিন কাজ। রিডার হিসাবে রিভিউ করাও সম্ভব নয় কারণ রিডার গল্পটা পড়ে রিভিউ করে। কিন্তু, লেখক জানে গল্প লেখার সময় তার মাথায় কী চলছিল।

তবু চেষ্টা করছি।

এই গল্পটার মোট তিনটে পার্ট।

অধ্যায় ৮ থেকে ১৭ ফেস্টিভাল আর্ক, অধ্যায় ১৮ থেকে ২৩ সিম্পোজিয়াম আর্ক আর তারপর থেকে এই সিজনের লাস্ট আর্ক শুরু হয়েছে।

তার আগের যে দুটো চ্যাপ্টার আমি লিখেছি, সেদুটোকে ধরছি না কারণ ওগুলো আমি ইতালির কাহিনী, যা আমার নয়, সেইটা শেষ করব বলে লিখেছিলাম। গল্প শুরু হচ্ছে আট নম্বর চ্যাপ্টার থেকে, ইতালির ঘটনার চার-সাড়ে চার বছর পরে,
অয়ন কলেজে ভর্তি হবার চার মাস পরে যখন বিদিশা কলেজে চাকরিতে জয়েন করছে।
আমার মনে হয়েছিল বিদিশার ব্যক্তিত্বময়ী আদর্শবতী চরিত্রের মহিলা শিক্ষিকা হিসেবে একদম আইডিয়াল হবে।

আমি ইচ্ছে করেই টাইম স্কিপ করে গেছি আর চেষ্টা করেছি গল্পটা যতটা সম্ভব নির্মেদ থাকে। 

প্রথম আর্কটা মূলত অয়ন-বিদিশা-বিক্রমের ত্রিভুজ নিয়ে। শুধু এই আর্কটা পড়লে রিডারের মনে হবে গল্পটা কেবল এই নিয়েই। 

কিন্তু, আমি যখন গল্পটা লিখতে বসি তখন আমি গেম অফ থ্রোনস দ্বারা inspired ছিলাম। আমি ওইধরনের এপিক লিখতে চেয়েছিলাম যেটা একটা বড় জায়গা জুড়ে থাকবে, যেখানে অনেক চরিত্র থাকবে। সেটা আমি ধাপে ধাপে করেছি।

প্রথম আর্কের শেষে অয়ন আর বিদিশার মুখ দেখাদেখি বন্ধ হয়েছে, তারপর সিম্পোজিয়াম আর্কে ওদের আলাদা জীবন দেখিয়েছি। এরপর বর্তমান যে আর্কটা চলছে সেখানে ক্যানভাসটা আরো বাড়িয়েছি। স্বাভাবিকভাবেই প্রতি চ্যাপ্টারেই নতুন নতুন চরিত্রের আগমন ঘটছে।

প্রথম আর্কে আমি অয়ন-বিদিশা-বিক্রম বাদে কলেজে ইচ্ছে করেই আর কোন মেজর চরিত্রে ফোকাস করিনি। 

হ্যারি যখন হগওয়ার্টসে প্রথম বছর আসে, সে কী কলেজের সম্বন্ধে সবকিছু জেনে গিয়েছিল ? তাহলে তো চেম্বার অফ সিক্রেটস ঘটতোই না। গল্প যত এগোবে তত আমরা কলেজের গভীরে ঢুকব।

দ্বিতীয় আর্কে আসল চরিত্র হল অয়ন। সে কীভাবে ফাইট ব্যাক করে জীবনে ফিরে আসে এটাই এই আর্কের ফোকাস।

বাস্তব জীবনে, ভালোবাসার মানুষ, যাদের আমরা চোখ বুজে বিশ্বাস করি, তারা বিট্রে করলে আমরা কী ভেঙে পড়ি না ?

বাস্তব জীবন হলে অয়নের এই ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে অনেক বেশি সময় লাগতো। যেমন বিদিশার লেগেছিল। কিন্তু, গল্পের খাতিরে অয়নকে তাড়াতাড়ি স্বাভাবিক জীবনে ফেরাতে হয়েছে।

আমারও মনে হয়েছে যে সিম্পোজিয়ামের জায়গায় অন্য কিছু থাকলে বেটার হতো। কিন্তু, সেই সময় বিদিশা কলেজে একেবারেই নতুন ছিল। তার উপর একটা স্ক্যান্ডালে পরে তার মুখ কিছুটা হলেও পুড়েছে। বিদিশাকে তার হারানো জায়গাটা ফিরিয়ে দেওয়া দরকার ছিল। প্লাস, বিক্রমকে unmask করা আর কলেজ পলিটিক্সের introduction যেটা খুবই important, সেটা সিম্পোজিয়ামের মাধ্যমেই হয়েছে। ওই আর্কেই ডঃ বাগচীর মতো একজন important character এর introduction হয়েছে।

প্রেজেন্ট আর্কটা কলেজ ছাড়িয়ে বাইরের জগতে কী ঘটছে সেটা দেখাচ্ছে আর এটা আপাতত হচ্ছে অরুণের মাধ্যমে। আমি মনে করি না যে অরুণকে আনতে দেরি হয়েছে। অরুণের জগতটা অনেক বড় আর সেখানে চরিত্রের সংখ্যা প্রচুর। আরো আগে অরুণকে আনলে গল্পে জটিলতা বাড়ত।

ব্যক্তিগত ভাবে আমি অবাক হয়েছি, রিডাররা 'মরীচিকা' আর 'মোহময়ী' এই দুটো শব্দের তাৎপর্য নোটিশ না করায়। আমি ইচ্ছে করেই বারবার করে মোহময়ী উল্লেখ করেছিলাম।

আরেকটা বিষয় হল, সূক্ষ্ম character dynamics। এটা কেউ নোটিশ করেনি। যেমন, বিদিশা বারবার মনে করছেন ডঃ বাগচী সিম্পোজিয়াম ভেস্তে দিতে চাইছিলেন, বাস্তবে এর পিছনে ওনার কোন হাতই নেই।
[+] 1 user Likes RockyKabir's post
Like Reply
(06-08-2026, 06:39 AM)Man of steel Wrote: Writer sahab with due respect. Ekta hoya sex scene na lakha, r Ekta kichu sexy  na lakha apni second Tai korchan. Jakhon thaka Vidisha jawan hoya mana 26 years hoyacha, jaeta impossible. takhon thaka sae gajano  Vidisha, football , office politics.  Apnar story tag ki acha "erotic thriller " . Apni erotic thriller mana bhojan.  Original writer lakaha sesh hobar pora story ta erotic thriller "e" pojonto nei.

@sarit11  please look in to this . Writer is using erotic thriller tag but writing nothing erotic after original writer writing ends. Please do something.

উলি বাবালে, আমায় ভয় দেখাতে এয়েচে। erotic thriller ট্যাগটা সরিৎ-র ই বেছে দেওয়া। তার আগে ইনসেস্ট ছিল। একজন চটিখোরের সাহিত্য ভাল নাই লাগতে পারে কিন্তু তার জন্য অ্যাডমিনকে ডেকে আনার মানে কী ? বিশেষ করে যখন আমি সাইটের কোন নিয়মই ভাঙিনি।

সেভাবে সেক্স না থাকা সত্ত্বেও প্রায় ১,৩৮,০০০ লোক পড়ে ফেলেছে বলে হিংসে হচ্ছে ? 

আমি অ্যাকাউন্ট খুলেছি এক বছরও হয়নি। এই গল্পের ছ মাস হবার আগেই একলাখের উপর ভিউজ। দেখ, যদি না পোষায় নিজেই ইরোটিক থ্রিলার লেখ। অবশ্য তুমি খেঁচা ছাড়া আর কিছু পার কিনা আমার সন্দেহ আছে। তিন বছরের পুরোনো অ্যাকাউন্ট অথচ একটা ছোট গল্প লেখারও সামর্থ্য নেই।
[+] 2 users Like RockyKabir's post
Like Reply
ভাই আপডেটের অপেক্ষায়।
[+] 1 user Likes সমাপ্তি's post
Like Reply
দারুণ একটা আপডেটের অপেক্ষায়
[+] 1 user Likes Aphrodite's Lover's post
Like Reply
অধ্যায় 26

বিনীত অনুরোধ, এটা plot and character driven story, এখানে গল্পের প্রয়োজনে সেক্স আর সেন্সুয়ালিটি দুটোই আসবে। "সেক্স চাই, সেক্স চাই" বলে অকারণে আমার মাথা খারাপ করবেন না।

২৬ নং অধ্যায়টি তিলোত্তমা 'কলকাতা'কে উৎসর্গ করা হল।

সকাল সাড়ে এগারোটা।

ক্রোবার দিয়ে দরজার পুরনো পাইন কাঠের লকটা চাড় দিয়ে ভেঙে ফেলতেই গন্ধের চোটে ইন্সপেক্টর শিন্ডে পকেট থেকে রুমাল বার করে মুখে চাপা দিলেন। ঘরের ভেতরের এসি বন্ধ, মুম্বইয়ের ভ্যাপসা গরমে তিন দিন ধরে বন্ধ থাকা একটা ঘরের ভেতরে বাতাস থমকে আছে।

শোবার ঘরের সেন্ট্রাল লাইটটা জ্বলছিল না, কিন্তু জানলার পর্দা সামান্য সরে থাকায় দিনের আলোয় ঘরের ভেতরের দৃশ্যটা অস্পষ্ট হলেও স্পষ্ট।

বিছানার ওপর চিৎ হয়ে পড়ে আছে একটি মধ্যবয়সী পুরুষের দেহ। শরীরটা সম্পূর্ণ নগ্ন।

পেটটা গ্যাসে ফুলে উঠে একটা ঢিবির মতো দেখাচ্ছে। বুক আর পেটের চামড়ার নিচে রক্তনালীগুলো মরে গিয়ে কালচে-সবুজ মার্বেল পাথরের নকশার মতো ফুটে উঠেছে। গলার চামড়া আলগা হয়ে এসেছে। আধখোলা চোখের মণিদুটো ঘোলাটে। সিলিংয়ের স্থবির পাখাটার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।

শিন্ডে ঘরে পা না রেখে চৌকাঠের ওপর দাঁড়িয়েই চোখ দুটো দিয়ে টেবিল আর মেঝেটা স্ক্যান করলেন।

খাটের পাশের সাইড টেবিলে দুটো স্কচের গ্লাস। একটা খালি, অন্যটায় এখনও অল্প জলীয় অংশ জমে আছে। তার পাশেই পড়ে আছে দামী হুইস্কির বোতলের শেষ সিকিভাগ এবং খাটের নিচে মেঝেতে দুমড়ানো একটা ব্যবহৃত কন্ডোমের মোড়ক। 

চাদরটার এক পাশ মেঝেতে ঝুলে আছে, ঘরের কোথাও কোনো ধস্তাধস্তির চিহ্ন নেই। ড্রয়ার আর আলমারিগুলো পরিপাটি করে বন্ধ।

লাশের মুখটা সামান্য হাঁ করা, ঠোঁটের কোণে শুকিয়ে যাওয়া ফেনার দাগ। গলার কাছটা গ্যাসে ফুলে বিকৃত হয়ে গেছে, তবে বাইরে থেকে সেখানে কোনো কাটা বা রক্তপাতের দাগ নেই।

শিন্ডে রুমালটা মুখে চেপে ধরে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা কনস্টেবলকে বললেন, "বুড়ো বয়সের ভীমরতি! মদের সাথে পিল গিলে লাইফ এনজয় করতে গিয়েছিল। হার্ট অ্যাটাক হতেই সাথে যে মালটা ছিল, সে ভয়ে জামাকাপড় পরা অবস্থায় সটান চম্পট দিয়েছে। পঞ্চনামায় কেস অ্যাক্সিডেন্টাল ডেথ হবে। তবে আগে সরকারি হাসপাতালের গাড়ি ডাকো, যা গন্ধ ! বডি ফুলতে শুরু করেছে, এই গন্ধের চোটে পুরো ফ্লোর খালি না হয়ে যায়।"

১

কলকাতা বললে চোখের সামনে সাধারণ মানুষের মনের যে ছবিটা ভেসে ওঠে, তাতে আলিপুর সাধারণত থাকে না।

কলকাতা মানেই ভিড়ে-ঠাসা যানজটে হাঁসফাঁস করতে থাকা এক শহর। ফুটপাথ জুড়ে হকারদের চিৎকার, পথচারীর ব্যস্ততা আর তারই মাঝে ফুটপাথে জবুথবু হয়ে শুয়ে থাকা অনাহারী দারিদ্র্য।

অথচ এই চেনা কলকাতার পাশেই এক অচেনা কলকাতা আছে, আলিপুর আর বালিগঞ্জ। শহরের বনেদী বড়লোকদের নিজস্ব ঠিকানা। তার মধ্যে আলিপুরকে তো অনায়াসেই সমগ্র পূর্বভারতের সবচেয়ে অভিজাত পাড়া বলা যায়।

বেকার রোড, বেলভেডিয়ার রোড, অলটার রোড কিংবা বর্ধমান রোড, এসব নামগুলোয় এখনও ব্রিটিশ আমলের আভিজাত্যের গন্ধ মেলে। যখন কলকাতা অবিভক্ত ভারতের রাজধানী ছিল, তখন থেকেই মধ্য কলকাতা, বালিগঞ্জ আর আলিপুরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল সুবিশাল সব বাংলো।

সময়ের সাথে সাথে মধ্য কলকাতার সেই সব ঐতিহ্যবাহী বাংলো ভেঙে তার জায়গায় মাথা তুলেছে চকচকে শপিং মল, বহুতল আবাসন আর বহুজাতিক সংস্থার অফিস বিল্ডিং। বালিগঞ্জের কোল থেকেও মুছে গিয়েছে বহু বাংলোর স্মৃতি।

কিন্তু আলিপুর আজও আলাদা। তার চিরাচরিত আভিজাত্যের প্রাচীরে আজও আধুনিকতা আঁচড় কাটতে পারেনি।

তিন-মানুষ-সমান উঁচু ভারী লোহার গেট, উঁচু প্রাচীরের আড়াল, দেবদারু গাছের ছায়ামাখা নির্জনতা, সিসিটিভি আর সশস্ত্র প্রাইভেট সিকিউরিটির কড়া পাহারায় থাকা বাংলোগুলোতে নজর দেবার সাহস আজ অবধি কোন প্রমোটার দেখায়নি। 

দেখাবেই বা কী করে? 

রাজ্যের শীর্ষ শিল্পপতি, ঝানু আমলা, হাইকোর্টের বিচারপতি আর ডাকসাইটে আইনজীবীদের আস্তানা এই আলিপুরেই।

ক্ষমতা আর আভিজাত্যের বিচারে আলিপুরের এই বংশানুক্রমিক ‘ওল্ড মানি’-র সাথে যদি টেক্কা দেওয়ার মতো কোনো এলাকা থেকে থাকে, তবে তা কিছুটা হেস্টিংসের বাংলোগুলো। 

কিন্তু সে তো সেনাবাহিনীর সংরক্ষিত সীমানা। সাধারণের অলক্ষ্যেই তাদের বসবাস।

বৈদিক ভিলেজের কাছে লাউহাটিতে আর জোকাতেও রজনীশ মালহোত্রার বিলাসবহুল ফার্মহাউস রয়েছে। কিন্তু আভিজাত্য আর ক্ষমতার প্রচ্ছন্ন দাপটে সেগুলো আলিপুরের ধারেকাছেও আসতে পারে না।

আলিপুর হলো কলকাতার আসল 'পাওয়ার সেন্টার'। 

বিড়লা, গোয়েঙ্কা, জালান, খৈতান, বাঙ্গুর কিংবা রুংটাদের মতো শহরের ভাগ্যনিয়ন্তাদের বসবাস এখানে। এদের একেকটা এস্টেট দু-চার একর জমি জুড়ে জাঁকিয়ে বসে আছে।

যেন শহরের বুকের ভেতর গড়ে ওঠা অন্য এক শহর।

সেই আলিপুরে, আলিপুর পার্ক রোডে, উঁচু ও সুদৃঢ় সীমানা প্রাচীরের ওপারে বিঘা বিঘা জমি জুড়ে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে সুবিশাল সব বাংলো। চারপাশ ঘন, সুউচ্চ, প্রাচীন মেহগনি, অশ্বত্থ আর দেবদারু গাছে ঘেরা বাইরের দুনিয়ার ধুলো-বালি এদেরকে সযত্নে আড়াল করে রাখে।

এখানেই 'মালহোত্রা ম্যানশন'।

বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে একটা রাজপ্রাসাদ।

সুবিশাল কালো লোহার অটোমেটিক রিভলভিং গেট পার হলে চোখে পড়ে নিখুঁতভাবে ট্রিম করা সবুজ ঘাসের বিস্তীর্ণ লন। মাঝখানে ইতালিয়ান মার্বেলে বাঁধানো ফোয়ারা, যা থেকে অজস্র সূক্ষ্ম জলধারা শূন্যে ছড়িয়ে পড়ছে। রাতের বেলায় সেই জলকণাগুলোতে আলো ঠিকরে পড়ে চারপাশে হীরের কুচির মতো দ্যুতি ছড়ায়।

লন পেরিয়ে আরও খানিকটা এগিয়ে গেলেই প্রাসাদের মূল প্রবেশদ্বার। ভিক্টোরিয়ান স্থাপত্যের আদলে তৈরি সুবিশাল ভবনের সদর দরজাটি ভারী সেগুন কাঠের তৈরি, গায়ে জটিল নকশার পিতলের কাজ। 

প্রবেশদ্বার টপকালেই চোখে পড়ে এক রাজকীয় পরিমণ্ডল। সিলিং থেকে ঝুলছে বেলজিয়াম কাঁচের সুবিশাল ঝাড়বাতি। পালিশ করা ইতালিয়ান মার্বেলের মেঝেয় তার আলো পড়ে প্রতিফলিত হয়ে গোটা ঘরে এক অনন্য পরিবেশ তৈরি করছে।

দেওয়ালে টাঙানো তৈলচিত্র আর ঘরের কোণে রাখা দুষ্প্রাপ্য অ্যান্টিক ভাস্কর্যগুলো আভিজাত্যের প্রমাণ দিচ্ছে। 

এন্ট্রান্স হল পার হয়ে বাঁ-দিকের লম্বা, গালিচা-মোড়া চওড়া করিডর ধরে কিছুটা এগিয়ে গেলেই চোখে পড়ে এক জোড়া সুউচ্চ, ডাবল-লিফ মেহগনি কাঠের কারুকার্য করা দরজা।

সেই অলঙ্কৃত দরজা ঠেলে ভেতরে পা রাখলেই মালহোত্রা ম্যানশনের সুবিশাল ডাইনিং হল।
এটা বাংলোর নিচতলার সাউথ উইং। প্রাইভেট ডাইনিং হলটি এই মুহূর্তে রোজকার দিনের মতো ঠান্ডা থমথমে মেজাজে ডুবে আছে।

ঘরটির উচ্চতা সাধারণ যে কোনো আধুনিক বাড়ির দ্বিগুণ। এখানেও, সিলিং থেকে ঝুলছে বিশাল এক ক্রিস্টালের অ্যান্টিক ঝাড়বাতি, ঘরের তিনদিকের দেওয়ালে বার্মিজ টিক কাঠের প্যানেলিং।

দেওয়াল থেকে ঝুলছে তৈলচিত্র। ঘরের ঠিক মাঝখানে বিশ ফুট লম্বা মেহগনি কাঠের তৈরি ডাইনিং টেবিল। টেবিলটি এতই নিখুঁতভাবে পলিশ করা যে, সেখানে সিলিংয়ের আলোর প্রতিফলন যেন আয়নার মতো ভেসে উঠছে। 

টেবিলের ওপর পাতা রয়েছে হস্তশিল্পের কাজ করা সিল্কের রানার। তার ওপর সাজানো কাট-গ্লাসের জগ, বোন চায়নার থালা-বাসন, আর রুপোলি ক্যাটলারি সেট।

টেবিলের প্রধান আসনে টানটান হয়ে বসে আছেন মালহোত্রা গ্রুপের একচ্ছত্র অধিপতি, রজনীশ মালহোত্রা। তার পরনে একদম নিখুঁত ইস্ত্রি করা সিল্কের ডার্ক নেভি-ব্লু হাউজ গাউন, ভেতরে হালকা নীল রঙের ফর্মাল শার্ট। কলারের বোতাম খোলা থাকলেও তার মেরুদণ্ড কাঠপেন্সিলের মতো সোজা।

মাথার চুলগুলো ব্যাক-ব্রাশ করা, দু-পাশের কনপটির কাছে কালচে চুলে রুপোলি ছোপ লেগেছে, ব্যস এটুকুই। তার চওড়া শারীরিক গঠনে বয়সের আর কোন ছাপ পড়েনি। বরং বলা ভালো, সময় যেন এই লোকটার কাছে এসে নতজানু হয়ে দাঁড়িয়েছে। 

নাকের ওপর পাতলা গোল্ডেন ফ্রেমের একটা বাইফোকাল চশমা। ঠোঁটের গঠন সরু আর খসখসে। রজনীশের মুখের হাড়গুলো অত্যন্ত শার্প। চওড়া চোয়াল সবসময় শক্ত থাকে, এই দুটো মিলে তার চেহারায় এক ধরনের নিষ্ঠুর গম্ভীরতার ছাপ ফেলেছে। 

তার হাতের আঙুলগুলোতে ঘন লোমের আস্তরণ, ডান হাতের তর্জনীতে একটা বিশাল আকারের রক্তমুখী নীলার আংটি। লাউঞ্জের আলোয় ঠিকরে উঠছে।

রজনীশ মালহোত্রা এই শহরের অন্যতম ক্ষমতাবান ও পরাক্রান্ত শিল্পপতি। রিয়েল এস্টেট, টেক্সটাইল এবং হসপিটালিটি সেক্টরে মিলিয়ে এক বিশাল সাম্রাজ্য তিনি পরিচালনা করেন সম্পূর্ণ নিজের ইশারায়। কিন্তু, তার পরিচিতি কেবল একজন ব্যবসায়ী হিসেবে শেষ হয় না। সেই প্রসঙ্গে পরে আসা যাবে।

এই বিশাল বাড়িতে প্রতিটা ধূলিকণা পর্যন্ত তার অনুশাসন মেনে নড়াচড়া করে। কোন আবেগ, কোনরকম কোমলতা, দুর্বলতার স্থান তার ডিকশনারিতে নেই। করুণা শব্দটাকে তিনি দুর্বল মানুষের বিলাসিতা বলে মনে করেন।

আপাতত, ওনার পুরো মনোযোগ নিবন্ধ হয়ে আছে হাতে ধরা ইংরেজি দৈনিক 'দ্য টেলিগ্রাফ'-এর ফ্রন্ট পেজে।

সংবাদপত্রের প্রতিটি খবর উনি অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে পড়েন। ব্যবসায়ের রাজনীতি আর রাজনীতির ব্যবসা, এই দুটোই ওনার জীবনের মূল মন্ত্র। 

চশমার কাঁচের ওপর দিয়ে ওনার তীক্ষ্ণ, কালো চোখের তারা দুটো খবরের প্রতিটি লাইনের ওপর দিয়ে স্ক্যানারের মতো ঘুরে বেড়াচ্ছে।
প্রথম পাতার একদম নিচের অংশে একটি খবর বিশেষ ব্লকে ছাপা হয়েছে। গাঢ় অক্ষরে শিরোনাম:

"TRAGIC CAR ACCIDENT AT BYPASS: STATE INFRASTRUCTURE BOARD MEMBER'S WIFE PASSES AWAY, SISIR ROY CRITICAL"

খবরের সারসংক্ষেপ হলো - গতকাল সন্ধ্যায়, ইস্টার্ন মেট্রোপলিটন বাইপাসের ধারে সায়েন্স সিটির কাছাকাছি এক মারাত্মক গাড়ি দুর্ঘটনা ঘটেছে। রাজ্য শিপিং করপোরেশনের ভাইস চেয়ারম্যান শিশির কুমার রায়ের মার্সিডিজ গাড়িটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ল্যাম্পপোস্টে সজোরে ধাক্কা মারে। গাড়িতে থাকা ওনার স্ত্রী অমৃতা রায় (৩৫) ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারিয়েছেন। শিশির রায় আশঙ্কাজনক অবস্থায় বাইপাসের এক বেসরকারি হাসপাতালের আইসিইউ-তে মৃত্যুর সাথে লড়ছেন।

রজনীশ খুব ধীরে, ঠান্ডা মাথায় শেষ পর্যন্ত খবরটা পড়লেন। তার মুখে বিষাদ, সহানুভূতি বা বিস্ময়, কোনরকম ইমোশনের চিহ্ন ফুটে উঠল না। শিশির কুমার রায় বা ওনার স্ত্রী, কারো সাথেই রজনীশ মালহোত্রার কোনো ব্যক্তিগত বা ব্যবসায়িক সম্পর্ক ছিল না। শহরের ক্ষমতার শীর্ষে থাকা রজনীশের কাছে আরও দশটা চেনা চেহারার মতো শিশির রায়ও কেবলই এক পরিচিত নাম। 

ওনার মুখটা পাথরের মতো ভাবলেশহীন রইল।

ঠিক এই সময়ে ডাইনিং হলে প্রবেশ করে রজনীশের ডানদিকের চেয়ারটি সামান্য টেনে অত্যন্ত নিঃশব্দে ওনার পাশে এসে বসলেন ওনার বিধবা বোন, বীণা কাপুর।

তার পরনে, হালকা ক্রিম রঙের হাতে বোনা চিকনকারির সুতি-সিল্কের সালওয়ার স্যুট, কাঁধে আলতো করে ফেলা ম্যাচিং করা সূক্ষ্ম দোপাট্টা। চুলে নিখুঁত পরিপাটি খোঁপা। গলায় একটা মোটা সোনার চেন। 

বীণা দেবী হলেন এই মালহোত্রা প্রাসাদের অন্দরমহলের মূল কাণ্ডারী। ওনার নিজের স্বামী মারা যাওয়ার পর থেকে তিনি ভাইয়ের সংসারে স্থায়ী আস্তানা গেড়েছেন। রজনীশকে তিনি ভয়ও পান, আবার ভালোও বাসেন; একইসাথে ওনার ক্ষমতার ছায়ায় থেকে এই বাড়িতে নিজের দাপট বজায় রাখেন।

বীণা দেবী চেয়ার টেনে বসার পরও রজনীশের দৃষ্টি খবরের কাগজ থেকে সরলো না। তিনি টেবিলে বসেই সার্ভেন্ট বেলটা আলতো করে বাজালেন। যতক্ষণ না রজনীশ কফির কাপে চুমুক দিচ্ছেন, ততক্ষণ পর্যন্ত এই টেবিলে আর কারও কোনো কিছু মুখে তোলার নিয়ম নেই।

সার্ভেন্ট বেলের মিহি আওয়াজটা ডাইনিং হলের সুউচ্চ সিলিংয়ে ধাক্কা খেয়ে মিলিয়ে যাওয়ার আগেই করিডর দিয়ে একজন প্রৌঢ় লোক নিঃশব্দ পায়ে ঘরে প্রবেশ করল। 

মালহোত্রা পরিবারের পুরানো ভৃত্য রামদীন। গত তিরিশ বছর ধরে সে এই পরিবারে দাসত্ব করে আসছে। ষাটোর্ধ্ব রামদীন বয়সে রজনীশের চেয়ে বেশ কিছুটা বড়।

রামদীনের পরনে ধবধবে সাদা কাজের পোশাক। হাতে রুপোলি ট্রে-তে সাজানো কাঁচের গ্লাসে টাটকা ফলের রস, মাখন মাখানো টোস্ট আর রজনীশের জন্য কাপ থেকে ধোঁয়া ওঠা গরম ব্ল্যাক কফি।

রামদীন অত্যন্ত সতর্কতার সাথে প্লেট আর কাঁচের গ্লাসগুলো টেবিলে সাজিয়ে রেখে, একইভাবে নিঃশব্দে টেবিল থেকে একটু পিছিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। 

বীণা দেবী আড়চোখে একবার ভাইয়ের দিকে তাকালেন। 

"সংবাদপত্রে বিশেষ কোন খবর বেরিয়েছে নাকি, ভাই ?" 

তিনি খুব সাবধানে অত্যন্ত মৃদু কণ্ঠে প্রশ্ন করলেন, যাতে রজনীশের মনোযোগে কোন ব্যাঘাত না ঘটে।

রজনীশ হাতের কাগজটা সামান্য নামিয়ে চশমার কাঁচের ওপর দিয়ে বোনের দিকে তাকালেন। তার চোখে কোনো রকম চাঞ্চল্য নেই। 

তিনি অত্যন্ত ধীর ও গম্ভীর গলায় জবাব দিলেন, 

"বিশেষ কিছু নয়। রাজ্য শিপিং করপোরেশনের ভাইস চেয়ারম্যান শিশির রায়ের গাড়ি অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে বাইপাসে। মিঃ রায় আইসিইউ-তে, ওনার স্ত্রী স্পট ডেড।"

বীণা কপূর সামান্য চমকে উঠে বুকের ওপর দোপাট্টাটা টেনে নিলেন। 

"ইশ! বড্ড মর্মান্তিক ঘটনা। উনি কিছুদিন আগেই আমাদের ক্লাবের চ্যারিটি ফাংশনে এসেছিলেন না? ভদ্রমহিলার বয়সও তো বেশি হয়নি..."

রজনীশ খবরের কাগজটা এক ছাঁচে ভাঁজ করে টেবিলের একপাশে রেখে নিজের ব্রেকফাস্ট টেনে নিলেন। কিন্তু, দিদির কথার কোন উত্তর দিলেন না। 

তার কাছে অহেতুক সমবেদনা জানানো কিংবা শোক প্রকাশ করা সময়ের অপচয় ছাড়া আর কিছুই নয়। যে বিষয়ে তার নিজস্ব লাভ-ক্ষতির অঙ্ক জড়িয়ে নেই, সেখানে তার বিন্দুমাত্র মাথাব্যথাও নেই।

ঠিক এই সময়েই ডাইনিং হলের বাইরের করিডরে একজোড়া ভারী বুটের শব্দ পাওয়া গেল।

ভেতরে প্রবেশ করল বরুণ কপূর, রজনীশ মালহোত্রার ভাইপো, বীণার একমাত্র ছেলে।


বরুণের পরনে একটি নিখুঁত কাট এর চারকোল-গ্রে থ্রি-পিস ফর্মাল স্যুট, ইস্ত্রি করা ধবধবে সাদা শার্ট আর একটি ডার্ক মেরুন টাই। চুলগুলো জেল দিয়ে পারফেক্ট সাইড-পার্টিং করে আঁচড়ানো। হাতে একটা দামি লেদার ফাইল আর লেটেস্ট মডেলের আইপ্যাড। সে মালহোত্রা গ্রুপের ডিরেক্টর অফ অপারেশনস।

বরুণের চেহারাটি সুঠাম, ঠোঁটের কোণে সবসময় মার্জিত হাসি ঝুলে থাকে, যা দেখলে মনে হবে সে বুঝি পৃথিবীর সবচেয়ে বিনয়ী মানুষ। কিন্তু, মনে মনে বরুণ ভালোমতোই জানে সে মালহোত্রা রক্তের ডিরেক্ট ওয়ারিশ নয়। এই মালহোত্রা পরিবারে সে কেবলই একজন 'ভাগ্নে', আসল উত্তরাধিকারী বিক্রম।

"গুড মর্নিং, মামাজি। গুড মর্নিং, মাম্মি" বরুণ বিনীতভাবে বলল।

রজনীশ এতক্ষণ হাত গুটিয়ে বসে ছিলেন। তিনি বাইফোকালের ওপর দিয়ে বরুণের দিকে তাকালেন। 

কোনো ভূমিকা না করে এক শব্দে প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন, 

"কাজ কতদূর?"

"কমপ্লিট, মামাজি" বরুণের গলায় হঠাৎই এক ধরণের পেশাদারি তৎপরতা চলে এল। 

"বাইপাসের জমির ক্লিয়ারেন্স আমরা আগামী সোমবারের মধ্যেই পেয়ে যাচ্ছি। কেএমডিএ-র নতুন জয়েন্ট কমিশনার কাল রাতে ফাইল সই করে দিয়েছেন। এখন শুধু এনওসিটা বাকি।"

কথাটা শেষ হতেই ডাইনিং হলে কয়েক সেকেন্ডের জন্য নিস্তব্ধতা নেমে এল।

রজনীশ চশমার ওপর দিয়ে একবার রামদীনকে দেখে নিয়ে শান্তভাবে চায়ের কাপে চুমুক দিলেন। 

এবার টেবিলের বাকিরা খাওয়া শুরু করতে পারে।

কিন্তু, চায়ের কাপটা টেবিলে নামাতেই তার গলায় ফুটে উঠল বিরক্তির স্পষ্ট ছাপ,

"রামদীন, বিক্রম কোথায় ?এখনও নিচে নামেনি কেন ?"

রজনীশের কণ্ঠে স্পষ্ট বিরক্তির ছাপ।

রামদীনের মুখটা মুহূর্তের মধ্যে কাগজের মতো সাদা হয়ে গেল। সে তোতলে উঠল,

"ম-ছোট সাহেব... মানে বিক্রম বাবা... উনি... উনি তো এখনও নিজের কামরায়..."

রজনীশ এবার চশমার ওপর দিয়ে সরাসরি রামদীনের দিকে তাকালেন। ডাইনিং হলের তাপমাত্রা যেন এক ধাক্কায় কয়েক ডিগ্রি নেমে গেল।

"কামরায় মানে?" 

রজনীশের গলাটা খাদে নামানো, কিন্তু তাতে এমন এক গম্ভীর ভারী ভাব ছিল যা ঘরের বাতাসকে ভারী করে দিল। 

"কটা বাজে এখন? এখনও ঘুম থেকে ওঠেনি?"

রামদীন এক পা পিছিয়ে গিয়ে মাথা নিচু করে হাত জোড় করল। ওর বুক ধড়ফড় করছে।
 
"মা-মালিক... ছোট সাহেব কাল রাতে... মানে আজ ভোরে... শেষ রাতে বাড়ি ফিরেছেন। খুব... খুব ক্লান্ত ছিলেন, তাই..."

"শেষ রাতে?"

রজনীশের মুখের ফর্সা চামড়া মুহূর্তের মধ্যে রাগে লাল হয়ে উঠল। ওনার চওড়া চোয়ালের পেশিগুলো দপ দপ করে কেঁপে উঠল। 

"একটা একুশ বছরের ধাড়ি বাছুর, কোম্পানির কোন দায়িত্ব নেয় না, সারারাত পার্টি করে মদ গিলে ভোরে বাড়ি ফেরে! আর এগারোটা-বারোটা অবধি শুয়ে শুয়ে শুয়োরের মতো ঘুমায়!"

রজনীশের গলার আওয়াজে ডাইনিং হলের কাঁচের ঝাড়বাতিটা যেন হালকা কেঁপে উঠল।

বরুণ জুসের গ্লাসটা হাতে নিয়ে এমন নির্লিপ্তভাবে তাতে চুমুক দিল, যেন সে কিছুই শুনতে পাচ্ছে না। বাইরে থেকে দেখে বোঝার উপায় নেই, তবে রজনীশের এই বিরক্তি মনে মনে তাকে বেশ খানিকটা তৃপ্তিই দিল। ঠোঁটের কোণে সেই সূক্ষ্ম হাসির আভাসটা অবশ্য সে ধরা পড়তে দিল না।

বীণা দেবী মোলায়েম গলায় বাধা দিয়ে বললেন, 

"আহা রজনীশ, তুমি সকাল সকাল অকারণে কেন নিজেকে উত্তেজিত করছ বল তো? ও তো বাইরে কোনরকম বাজে ঝামেলায় জড়াচ্ছে না। বাচ্চা ছেলে, এটাই তো আনন্দ করার বয়স। এ বয়সে পুরুষমানুষের ওসব একটু-আধটু থাকেই। বয়স বাড়লে, মাথায় দায়িত্ব পড়লে সব ঠিক হয়ে যাবে।"

রজনীশ ওনার দিদির দিকে তাকালেন না। কিন্তু ওনার চেহারায় চরম বিতৃষ্ণা ফুটে উঠল।

এই নিয়ে অনেকবার তাদের মধ্যে কথা হয়েছে, রজনীশ কখনো জিততে পারেননি।

তিনি ভালো করেই জানেন কেন ওনার দিদি বিক্রমকে এই উচ্ছৃঙ্খল জীবনযাত্রাকে অন্ধের মতো প্রশ্রয় দেয়।

তিনি আবার কাজের কথায় ফিরে এলেন।

"ভোটের ফান্ডের আপডেট কী ?"

রজনীশের গলায় শীতলভাবটা আবার ফিরে এসেছে।

বরুন সোজা হয়ে বসল। 

"মামাজি, ওদের স্টেট ট্রেজারার পরশুদিন আবার মেসেজ পাঠিয়েছে। রাজারহাটের এনওসি-র বিনিময়ে ওরা ডাবল ডিজিট চাইছে। একেবারে ফিফটি পার্সেন্ট আপফ্রন্ট আর বাকিটা ফাইল ক্লিয়ার হওয়ার পর।"

সে একটু থামল, তারপর নিচু গলায় যোগ করল, 

"অপনেন্ট পার্টিও অন-টেবিল বসার মেসেজ দিয়েছে। ওরা বাজেটের থার্টি পার্সেন্ট ডিমান্ড করছে। তবে দিল্লির ইনপুট, তাতে এবার হাওয়া ঘোরার চান্স সেভেন্টি পার্সেন্ট।"

রজনীশ শান্তভাবে আবার চশমাটা পরে নিলেন। খুব ধীর, কিন্তু মেধাচ্ছন্ন গলায় বললেন,

"অনিশ্চিত ভবিষ্যতের জন্য ডাবল ডিজিটের ক্যাশ ছুড়ে দেওয়া বোকামি। ট্রেজারারকে বলো পাঁচ পার্সেন্ট টোকেন অ্যামাউন্ট রিলিজ হবে, তাও আমাদের সার্ভিস প্রোভাইডারদের অ্যাকাউন্ট দিয়ে। নিউ টাউনের প্রজেক্টের এনওসি সই হয়ে আমার টেবিলে না আসা পর্যন্ত এক পয়সার এনভেলপও লকার থেকে বের হবে না।"

"আর অপনেন্ট পার্টিকে বলো...এখন কেবল চায়ের খরচ দেওয়া হবে। বাকিটা রেজাল্টের পর। আমরা পলিটিশিয়ানদের কিনে নিই বরুণ, ওদের কথায় উঠি-বসি না। 

আমাদের ইনভেস্টমেন্ট যেন সবসময় রিটার্ন দেয়।"

"আন্ডারস্টুড, মামাজি। একদম ক্রিস্টাল ক্লিয়ার। আমি আজ দুপুরে লিগ্যাল টিমকে সেইভাবেই নির্দেশ দিচ্ছি," 

বরুন মাথা নিচু করে বলল।

এমন সময় রামদীন আবার ডাইনিং টেবিলের পাশে এসে দাঁড়াল। 

"মালিক... একটা খবর ছিল" 

সে ভীরু স্বরে বলল।

রজনীশ বিরক্ত চোখে তাকালেন। 

"কিসের খবর?"

"অনন্যা দিদিমণি...আগামী কদিনের মধ্যেই কলকাতায় আসছেন।"

কথাটা রামদীনের মুখ থেকে বেরোনো মাত্র ডাইনিং হলের বাতাস যেন এক লহমায় জমাট বেঁধে বরফ হয়ে গেল।

রজনীশের হাত টেবিলের ওপর শক্ত মুঠি পাকিয়ে উঠল। ওনার ফর্সা মুখটা মুহূর্তের মধ্যে কঠিন হয়ে উঠল, ওনার চওড়া কপাল কুঁচকে উঠল। চিন্তায় নয়, রাগে।

বীণার মুখটাও মুহূর্তের মধ্যে কঠিন হয়ে উঠল। তিনি কটু চোখে রামদীনের দিকে তাকালেন।

বরুণ অবশ্য নিজের মুখের ভাব সামলে নিল। কিন্তু ওর চোখের মণি দুটো এক মুহূর্তের জন্য চঞ্চল হয়ে উঠল। 

রজনীশ মালহোত্রা প্রায় এক মিনিট কোন কথা বললেন না। নিস্তব্ধ ডাইনিং রুমে শুধু দেয়ালঘড়ির টিক-টিক শব্দ শুনতে পাওয়া যাচ্ছিল।

তারপর তিনি ধীরভাবে বরফ ঠান্ডা গলায় রামদীনকে নির্দেশ দিলেন,

"বলবি, এ বাড়িতে কোন ঘর খালি নেই। ও যেন কোন হোটেলে গিয়ে ওঠে।"

কথাটা বলে রজনীশ এক মুহূর্তও আর টেবিলে বসলেন না। তিনি টেবিল ছেড়ে সশব্দে উঠে দাঁড়ালেন, তারপর আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা না করে হনহন করে হেঁটে ডাইনিং হল ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন।
[+] 4 users Like RockyKabir's post
Like Reply
২

সকাল আটটা বাজতে দশ।

শীতের সকালের কুয়াশা পুরো চত্বরটাকে একটা আবছা, স্লেট-রঙা চাদরে মুড়ে রেখেছে। উত্তর দিক থেকে ভেসে আসা হিমশীতল বাতাসটা মেহগনি গাছের পাতার ওপর জমতে থাকা শিশিরকে ছুঁয়ে এসে ফুটবল মাঠের উপর দিয়ে বয়ে যাবার সময় যেন চামড়ায় সুচ ফুটিয়ে দিচ্ছিল।

মাঠটা কলেজের মেইন একাডেমিক বিল্ডিংয়ের ঠিক পেছনে নয়, কিছুটা উত্তর-পশ্চিম কোণ ঘেঁষে বিস্তৃত। ইন্টার-ডিপার্টমেন্টাল ফুটবল টুর্নামেন্ট অনুষ্ঠিত হয়েছিল। মাঠের চার ধার ঘেঁষে রয়েছে গ্যালারি, যা মেটাল নেট দিয়ে ঢাকা। উত্তর দিকে কিছুটা গেলে কলেজের ফাঁকা অনাবাদী জমি; যা ঘন জঙ্গলে ঢাকা। ওখানে চট করে কেউ যায় না। উত্তর-পশ্চিমে গেলে চোখে পড়বে নর্থ ব্লকের হোস্টেলগুলো। এখানে অনেক সিনিয়র স্টুডেন্টরা থাকে।

শেষ ডিসেম্বরের এই হাড়কাঁপানো ঠাণ্ডায় মাঠের ভেজা ঘাসের ওপর দিয়ে একনাগাড়ে ল্যাপস মেরে চলেছে অয়ন।

তার পরনে একটা ডার্ক ব্ল্যাক ফিটেড কম্প্রেশন টি-শার্ট, গ্রে রানিং ট্রাউজার্স আর পায়ে স্পাইক স্নিকার্স। হুডিটা মাঠের বাইরের বেঞ্চে রাখা। 
বিগত কুড়ি মিনিটে সে একবারের জন্যও থামেনি।

ফুসফুসে কনকনে ঠান্ডা বাতাস ঢুকছে আর মুখ থেকে বেরোচ্ছে ধোঁয়ার মতো সাদা ভাপ। কপালের চারপাশ বেয়ে ঘামের বিন্দু ঝরে পড়ে গালের ফিকে হয়ে আসা হলদেটে কালশিটের দাগগুলোকে ভিজিয়ে দিচ্ছে। পাঁজরের চোটটা কড়া পেইন কিলারের দৌলতে এখন আর আগের মতো টনটন করছে না ঠিকই, তবে টানা দৌড়ের চাপে হ্যামস্ট্রিংয়ের পেশিগুলো টান টান হয়ে শক্ত রূপ ধারণ করেছিল।

মিস ব্যানার্জী অয়নকে সাহায্য করার চেষ্টা করলেও, ফিজিক্স ডিপার্টমেন্টের বাকি অধ্যাপকেরা ঘটনাটা মোটেও সহজভাবে নেননি। শেষ কয়েকটা দিন অয়নের ওপর দিয়ে ঝড়ের মতো গেছে। 

এক মাস ক্লাস বাঙ্ক মারার ফল সে প্রতি মুহূর্তে টের পাচ্ছে।

দৌড়ানোর মাঝেই অয়নের মনটা আচমকা পিছিয়ে গেল গত সপ্তাহে।

মিস ব্যানার্জীর নির্দেশমতো পরের দিনই ল্যাবে গিয়েছিল অয়ন। ল্যাবে ঢোকামাত্রই প্রফেসর পাল নিজের চশমার ওপর দিয়ে ওর দিকে তাকিয়ে একটা তীব্র কটাক্ষ ছুঁড়ে দিয়েছিলেন,

"ওহ! দ্য গ্রেট অয়ন চ্যাটার্জী! তা হঠাৎ করে কলেজের কথা মনে পড়ল যে? নাকি মারপিটের ফাঁকে একটু পড়াশোনা করার ইচ্ছা জাগল ?"

পুরো ল্যাবের সামনে প্রফেসর পালের খোঁচাটা নীরবে হজম করে নেওয়া ছাড়া অয়নের কাছে আর কোন উপায় ছিল না।

সে শুধু মাথা নিচু করে বলেছিল, "আই অ্যাম সরি, স্যার। আমি আগামী তিন দিনের মধ্যে সব পেন্ডিং ল্যাব এক্সপেরিমেন্ট সাবমিট করে দেব।"

প্রফেসর পাল বিরক্তি দেখিয়ে আর কিছু না বললেও ঠিক একই কথা শুনে প্রফেসর চ্যাটার্জী ছেড়ে দেননি। কড়া শিক্ষিকা হিসেবে এমনিই তার বেশ নামডাক আছে।

তিনি অয়নের কথা শুনে চোখের চশমাটা খুলে টেবিলের ওপর রাখা মোটা প্র্যাক্টিক্যাল রেজিস্টার খাতাটা সশব্দে বন্ধ করেছিলেন। আওয়াজটা এত জোরে হয়েছিল যে পুরো নিস্তব্ধ স্টাফরুমে সেটা যেন প্রতিধ্বনি তৈরি করেছিল। আওয়াজটা এত জোরে হয়েছিল যে অয়নের মনে হয়েছিল শব্দটা রুমের সুউচ্চ সিলিংয়ে ধাক্কা খেয়ে ওর দিকে ছিটকে এল।

"এক মাস ! পুরো তিরিশ দিন আপনি ক্লাসে পা রাখেননি, মিঃ চ্যাটার্জী। উইদআউট এনি রিজন।" 

প্রফেসর চ্যাটার্জী কেটে কেটে উচ্চারণ করলেন, তার গলাটা বরফের মতো ঠান্ডা। 

"মিস ব্যানার্জী হয়তো আপনার ওপর একটু বেশিই সহানুভূতিশীল, তাই আপনাকে ছেড়ে দিয়েছেন। কিন্তু আমার ক্লাসের আপনার অ্যাটেন্ডেন্স পার্সেন্টেজ ফর্টি-ফাইভের নিচে। 

ইউনিভার্সিটি রুল অনুযায়ী আপনার অ্যাডমিট কার্ড হোল্ড হওয়ার কথা, সেটা জানেন নিশ্চয়ই ?"

সেইসময় ফিজিক্স স্টাফরুম প্রায় ফাঁকা ছিল। শুধু হাজির ছিলেন থার্মোডাইনামিক্সের অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর সুরজিৎবাবু। তিনি আড়চোখে একবার অয়নকে দেখে নিয়ে নিজের চায়ের কাপে চুমুক দিলেন। 

তার মুখে এক ধরনের সূক্ষ্ম, কৌতুকপূর্ণ মেজাজ।

অয়ন দাঁড়িয়ে ছিল টেবিলের উল্টোদিকে। পরনে একটা সাধারণ কালচে-ধূসর গোল গলার টি-শার্ট আর জিন্স। কাঁধে ঝোলানো পুরোনো রুকস্যাক। এক মাস আগের অয়ন হলে কী করতো বলা মুশকিল, হয়তো এই অপমানের জবাবে মুখ ঘুরিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যেত।

কিন্তু আজকের অয়ন সেটা করল না। সে নিজের কাঁধটা সোজা রাখল। কথা বলার সময় তার চোখের মনি দুটো এতটুকুও কাঁপল না।

"আমি জানি আমার ভুল হয়েছে, ম্যাম।" 

অয়নের গলাটা শান্ত, পরিষ্কার। 

"প্র্যাক্টিক্যাল রেজিস্টারের বাকি আটটা এক্সপেরিমেন্টের রিডিং আর গ্রাফ আমি আগামী সোমবার বিকালের মধ্যে আপনার টেবিলে জমা করে দেব।"

প্রফেসর চ্যাটার্জী চশমাটা খুলে টেবিলে রাখলেন।

"আটটা কঠিন এক্সপেরিমেন্টের ডেটা ক্যালকুলেশন দু-দিনে ? আপনি কি রসিকতা করছেন ? অন্য স্টুডেন্টদের থেকে টুকে জমা দেবেন ভাবছেন?"

"না, ম্যাম। ডাটাগুলো ল্যাব অ্যাসিস্ট্যান্টের কাছ থেকে নেওয়া অরিজিনাল র-রিডিং থেকেই ক্যালকুলেট করব। আপনি ইচ্ছে করলে পরশুদিন ল্যাবে দাঁড়িয়ে আমার ভাইভা নিতে পারেন। যদি একটাও ভুল পান, আমার অ্যাডমিট কার্ড আটকে দেবেন। আই ওন্ট কমপ্লেন।"

নবনীতা চ্যাটার্জী কয়েক মুহূর্ত ওর মুখের দিকে একদৃষ্টিতে চেয়ে অয়নের মুখটা পড়তে চেষ্টা করলেন। 

ছেলেটার কথাগুলোর মধ্যে আত্মবিশ্বাস আছে ঠিকই কিন্তু তার মধ্যে একটা অদ্ভুত বিষণ্ণভাবও রয়েছে।

"ঠিক আছে।" 

ভেতরের কৌতূহলটা চেপে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নবনীতা খাতাটা আবার নিজের দিকে টেনে নিলেন। 

"সোমবার বিকেল চারটে। একটা ক্যালকুলেশন মিস হলে প্র্যাক্টিক্যাল মার্কস জিরো বসাব।"

অয়ন শুধু হালকা মাথা নোয়াল। 

"থ্যাঙ্ক ইউ, ম্যাম।"

সে ঘর থেকে বেরিয়ে এসে একবার নিজের কবজিটা দেখেছিল, বেলা আড়াইটে। পেটে খিদে নেই, মাথায় এক মাস ধরে জমা হওয়া পড়াশোনার সুবিশাল পাহাড়। অ্যাটেনডেন্স রেজিস্টারে লালে লাল হয়ে থাকা শূন্যতা ওর মনস্তত্ত্বে নাড়া দিয়েছিল। 

অয়ন বুঝতে পারছিল, আবেগের ঘোরে মায়ের ওপর ক্ষোভে হোস্টেলের ঘরে নিজেকে বন্দি রেখে, সে আসলে নিজের ভবিষ্যতের উপর নিজেই কুড়ুল মেরেছিল। 

আজ তার পাশে কেউ নেই। না আছে মা আর না আছে বন্ধু-বান্ধব।

তবে এই নির্মম উপলব্ধির পরও অয়নের ভেতরে কোন অস্থিরতা জন্ম নেয়নি। কারণ অয়ন মনে মনে মেনে নিয়েছিল, এখন তার সামনে শুধুই অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই আর সেটা তাকে একাই লড়তে হবে।

আবেগের দিন শেষ, এখন গাধার মতো খেটে নিজের হারিয়ে যাওয়া জমি উদ্ধার করতে হবে।

সেই চরম জেদ থেকেই গত শুক্রবার থেকে রবিবার, এই তিনদিনে অয়ন ঘুমিয়েছে মাত্র দশ ঘণ্টা। রাত জেগে একদিকে সুরঙ্গনা ব্যানার্জীর থিওরি অ্যাসাইনমেন্ট শেষ করা আর অন্যদিকে একই সাথে প্রফেসর চ্যাটার্জীর আট-আটটা কঠিন প্র্যাক্টিক্যালের জটিল ক্যালকুলেশন, গ্রাফ প্লটিং আর ভাইভার প্রিপারেশন নেওয়া।

গতকাল অর্থাৎ সোমবারে সে সব ক্লিয়ার করে এসেছে ঠিকই, কিন্তু লড়াই তো কেবল শুরু।


দৌড়ের গতি একটু কমাল অয়ন। বুক ভরে ঠান্ডা বাতাস টেনে নিয়ে আবার ভাবল। অন্য সাবজেক্টের শিক্ষকদের ক্লাসে তো এখনও যাওয়াই হয়নি। সেখানে গেলে না জানি আরও কত কী শুনতে হবে, কত অ্যাসাইনমেন্ট ক্লিয়ার করতে হবে !

অথচ, সামনেই সেমিস্টার এক্সাম। এসব প্র্যাক্টিক্যাল আর অ্যাসাইনমেন্টের চক্করে মূল সিলেবাসের প্রিপারেশন সে এখনো শুরুই করতে পারল না।

তবে এই পরিস্থিতির জন্য অন্য কেউ নয়, সম্পূর্ণভাবে সে নিজেই দায়ী। 

মাঠের ঠিক বাইরে, লোহার সাইডলাইনের রেলিংয়ে একহাতে গরম চায়ের ভাঁড় আর অন্য হাতে স্টপওয়াচ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন কোচ সেনগুপ্ত। ওনার পরনে একটা মোটা ট্র্যাকস্যুট, মাথায় উলের টুপি। উনি তীক্ষ্ণ চোখে অয়নের গতিবিধি, তার পেসিং আর পায়ের স্ট্রাইড পর্যবেক্ষণ করছেন।

অয়ন ল্যাপটা শেষ করে কোচ সেনগুপ্তর সামনে এসে থামল। সে দুই হাঁটুতে দু-হাত দিয়ে একটু ঝুঁকে গভীর শ্বাস নিতে শুরু করল। তার বুকটা হাপরের মতো ওঠানামা করছে।

"স্টপওয়াচ বলছে চার কিলোমিটার কুড়ি মিনিটে।" কোচ সেনগুপ্ত চায়ের ভাঁড়ে চুমুক দিয়ে বললেন, তার গলায় নিস্পৃহ ভাব।

অয়ন সোজা হয়ে দাঁড়াল। তোয়ালে দিয়ে মুখের ঘাম মুছে হাঁফাতে হাঁফাতে ভাবে বলল, 

"আই অ্যাম রেডি, স্যার। আমাকে আজকে টিমে রাখুন।"

কোচ সেনগুপ্ত ওনার চশমাটা নাকের ওপর ঠিক করে নিয়ে একটা তাচ্ছিল্যের মতো শব্দ করলেন।

"রেডি? কিসের রেডি? চার কিলোমিটার ল্যাপস মেরে তোমার কোয়াড্রিসেপস কাঁপছে, চ্যাটার্জী। অ্যাথলেটিক ফিটনেস আর ম্যাচ ফিটনেসের মধ্যে তফাত বোঝো ? তোমার এখনকার ম্যাচ ফিটনেস একদম জিরো। 

গত এক মাসে একটাও ম্যাচ খেলোনি আর তুমি ভাবছ সোজা ফার্স্ট ইলেভেনের সাথে গেমে নেমে যাবে?"

"আমার কোনো সমস্যা হচ্ছে না, স্যার... "

"তোমার কোথায় সমস্যা হচ্ছে, সেটা বোঝার জন্য আমি এখানে আছি। একবার হ্যামস্ট্রিং বা কুঁচকির মাসল পুল করলে পুরো স্টেট চ্যাম্পিয়নশিপটা তোমাকে বেঞ্চে বসে কাটাতে হবে। আমি কোন কথা শুনব না। আজকে শুধুই লাইট ড্রিলস, কোন প্র্যাকটিস ম্যাচ নয়। আগে পাঁচটা কোণ-ড্রিল শেষ করো, তারপর ল্যাটারাল জাম্প। ওসব জেদ এখানে এসে দেখাবে না।"

কোচ সেনগুপ্ত কড়া গলায় জবাব দিলেন। অয়ন কোচের সাথে কোনরকম তর্কে গেল না। সে নিঃশব্দে মাথা নেড়ে ডাবল-কোন রাখা জায়গাটার দিকে হেঁটে গেল।

কোণ-ড্রিল আর ল্যাটারাল জাম্প কমপ্লিট করে পরের আধ ঘণ্টা সে একটানা লেডার ড্রিলস, শর্ট স্প্রিন্ট আর বল কন্ট্রোল ড্রিল করল। ফুটওয়ার্ক করার সময় তার মিঃ প্রধানের বলা কথাটা মনে পড়ছিল - "পেশাদার বক্সিং বা ক্যারাটের ফুটওয়ার্ক ফুটবলেও সাহায্য করে।"

মিস্টার প্রধানের কথাগুলো মনে পড়তেই অয়ন খেয়াল করল, আজকে তার বডি ব্যালেন্স আগের চেয়ে স্টেডি। টার্ন নেওয়ার সময় তার শরীর হেলে পড়ছে না আর টার্ন নিতে আগের থেকে একটু হলেও সময় কম লাগছে।

সে মনে মনে ঠিক করল পরের ক্লাসে সে এই বিষয়ে মিঃ প্রধানের সঙ্গে কথা বলবে। 

৩

মাঠে বল গড়াচ্ছে। 

প্রথমে একদম রাজি না হলেও, প্র্যাকটিস ম্যাচের শেষ দশ মিনিটে কোচ সেনগুপ্ত অয়নকে অপনেন্ট টিমের বিপক্ষে নামিয়েছেন। তবে একইসাথে সে যেন বেশি স্ট্রেইন না নেয় সে বিষয়ে বারবার সতর্কও করে দিয়েছেন। 

অয়নের ম্যাচ ফিটনেস কোথায় আছে, সেটা ফিরিয়ে আনতে কতদিন লাগবে, সেটা দেখে নেওয়ার জন্য কোচের কাছে এই সময়টুকু যথেষ্ট।

অনেক দিন পরে মাঠে নেমে অয়ন খুব একটা খারাপ খেলেনি। একটা লং পাস রিসিভ করে সে খুব আলতো ছোঁয়ায় বলটাকে সহজেই নিজের নিয়ন্ত্রণে আনল। সামনে থাকা দুজন ডিফেন্ডারকে কেবল একটা বডি ফেক আর হালকা ডিরেকশন চেঞ্জে পরাস্ত করে সে বল নিয়ে বক্সে ঢুকে পড়ল। পুরো মুভমেন্টটা এত মসৃণ এবং নিখুঁত ছিল, যে কোচ সেনগুপ্ত মাঠের বাইরে দাঁড়িয়ে হালকা করতালি দিয়ে উঠলেন।

"হুম... ওর অ্যাটিটিউড যেমনই হোক, খেলে কিন্তু দারুণ।" 

গ্যালারির ওপরের দিকে বসে থাকা দুজন মেয়ের একজন কফির ক্যানে চুমুক দিয়ে কথাটা বলল। অন্যজন কোনো উত্তর দিল না, যদিও তার চোখ দুটো অয়নের পিঠের দিকেই আটকে ছিল।

প্র্যাকটিস ম্যাচ শেষ হতে সাড়ে নটা বাজল। সবাই একে একে বেরিয়ে যেতে লাগল।

অয়ন বাইরেই বোতলের জলে মুখ-হাত ধুয়ে নিল। তার হাতে একদমই সময় নেই; অন্য সাবজেক্টের টিচারদের সে এখনও অবধি ফেস করার সময় পায়নি। ডর্মে ফিরে অল্প কিছু খেয়ে তাকে পড়তে বসতে হবে।

ভেজা চুলগুলো হাত দিয়ে পেছনের দিকে ঠেলে দিয়ে সে হুডিটা গায়ে চড়িয়ে নিল।

ব্যাগটা কাঁধে তুলতে যাবে, ঠিক তখনই হিমশীতল বাতাস চিরে একটা পরিচিত পারফিউমের সুবাস ওর নাকে এল।

“হেই অয়ন! গড, ইউ লুক এক্সহস্টেড!"

অয়ন মুখ তুলে তাকাতেই স্থির হয়ে গেল।

মাঠের সাইডলাইন ধরে ওর দিকে হেঁটে আসছে দুজন মেয়ে।

সকালের হালকা রোদে বৈশালীকে এড়িয়ে যাওয়া অসম্ভব। তার পরনে একটা বেগুনি রঙের ক্রপ-টপ, যা তার মেদহীন অনাবৃত পেট আর ধারালো কোমরকে স্পষ্ট করে তুলেছে, আর নিচে অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত ফেডেড ডেনিম শর্টস, যাতে তার দীর্ঘ, মসৃণ উরু অনাবৃত। ঠোঁটে গাঢ় প্লাম রঙের লিপস্টিক, হাই-পনিটেল করা চুল দুলছে, আর কপালে তোলা দামি রে-ব্যান সানগ্লাস। চোখে-মুখে এক উদ্ধত, অহংকারী সৌন্দর্য। 

পাশে দাঁড়িয়ে জিনিয়া, ওর ঘনিষ্ঠ বন্ধু।

অয়নের মনে পড়ে গেল মিস ব্যানার্জীর ফিজিক্স ক্লাসে বৈশালীর ওর দিকে কটমট করে চেয়ে থাকার কথা।

অয়ন ডিনিয়ার দিকে ঘাড় নেড়ে একটু হাসার চেষ্টা করল। 

“হ্যাঁ জিনিয়া।” 

তারপর সোজাসুজি পয়েন্টে এল,

"তুমি কিছু বলবে ?"

জিনিয়া বৈশালীর দিকে একবার তাকাল, তারপর অয়নের দিকে তাকিয়ে স্বাভাবিক গলায় বলল, 

"নেক্সট উইকে আমাদের নিউ ইয়ার্স পার্টি আছে। ইউ শুড কাম। একটা চেঞ্জ হবে তোমার জন্য।"

যেন ওরা কতদিনের বন্ধু। মাঝের ক'মাস যে কোন যোগাযোগ নেই সেটা মনেই হয় না।

অয়ন সামান্য ইতস্তত করল। 

"জিনিয়া, আমি এখন একটু ব্যস্ত।" 

সেমিস্টার এক্সামের আর একমাসও বাকি নেই। সিলেবাস কভার করার জন্য অনেক খাটতে হবে।

"কাম অন অয়ন ! প্লিজ, জাস্ট ফর ওয়ান আওয়ার? রাত ৯টার পর আসলেও চলবে।" 

জিনিয়া অনুরোধের সুরে বলল।

অয়ন এক সেকেন্ড ভাবল।

"আই উইল ট্রাই।"

সংক্ষিপ্ত উত্তর দিয়ে সে জুতো পাল্টে স্নিকার্স পরতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।

ইঙ্গিতটা পরিষ্কার। 

কথা শেষ, তোমরা এবার আসতে পার।

সেটা বুঝতে পেরে জিনিয়া হেসে বলল, “গ্রেট! তাহলে আজ আমরা আসি, বৈশালী চল- ”

"তুই এগো, আমি আসছি।" 

বৈশালী জিনিয়াকে এড়িয়ে গিয়ে সটান অয়নের দিকে পা বাড়াল।

জিনিয়া একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সরে গেল। নিজের বন্ধুকে সে ভালোই চেনে, অয়নকে সে এখন কী কী বলবে সেই বিষয়ে ওর ধারণা আছে। তবে সে বৈশালীকে সমর্থন করে না; ওর চোখে বৈশালীর বর্তমান বয়ফ্রেন্ড একটা জোকার ছাড়া আর কিছু নয়।

সে হেসে হাত নেড়ে অন্যদিকে হেঁটে চলে গেল।

সেই খাঁ খাঁ করা মাঠের এক কোণে, বিশাল গ্যালারির মেটাল ফেন্সিংয়ের পেছনে এখন শুধু অয়ন আর বৈশালী। সকালের রোদ এসে পড়ছে গ্যালারির সিটগুলোর ওপর। বাতাসে ঘাম আর ভেজা ঘাসের গন্ধ।

“কী চাও বৈশালী?”

অয়ন ঘাড় তুলে ওর দিকে তাকাল। ওর গলার আওয়াজ একদম ফ্ল্যাট, তাতে কোনরকম আবেগ নেই।

বৈশালী এক পা এগিয়ে এল। ওর গায়ের পারফিউমের তীব্র গন্ধটা এসে অয়নের নাকে ধাক্কা মারলো। বৈশালীর চোখে-মুখে রাগের স্পষ্ট ছাপ।

"কী চাই? সিরিয়াসলি অয়ন? নিজেকে ভাবটা কী বল তো তুমি ? হু দ্য হেল ডু ইউ থিংক ইউ আর?"

ওর গলাটা রাগে কাঁপছিল।

অয়ন কোন জবাব দিল না। সে কেবল একটা শান্ত দৃষ্টিতে ওর মুখের দিকে চেয়ে রইল।

কলেজে সদ্য ভর্তি হবার পরে মায়ের প্রতি নিজের নিষিদ্ধ আকর্ষণ ভোলার জন্য অয়ন তখন নিয়মিত বিভিন্ন মেয়ের সাথে ডেটে যেত আর কিছুদিন পর পর তাদের ডিচ করত। বৈশালী সেই অতীত অধ্যায়েরই একটা পৃষ্ঠা, তবে নিঃসন্দেহে সবচাইতে স্পেশাল।

"ইউ জাস্ট ইউজড মি! রাইট?" 

বৈশালীর গলার আওয়াজ চড়তে লাগল, 

“তোমার লজ্জা করে না লোকের ইমোশন নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে ? তোমাদের মতো বখে যাওয়া, সাইকো ছেলেদের স্বভাবই এটা! যেখানেই যাবে, সবকিছু এলোমেলো করে দিয়ে চলে আসবে। তোমরা মনে কর গোটা দুনিয়াটা তোমাদের ইশারায় নাচে, তাই না ? হাউ ক্যান ইউ বি সো হার্টলেস?"

অয়ন একটা লম্বা শ্বাস নিল, যেভাবে হোক তাকে এখানে নিজের মাথাটা ঠাণ্ডা রাখতেই হবে। সে অত্যন্ত ধীরভাবে, ঠান্ডা গলায় উত্তর দিল, 

“আমি তোমাকে কোন প্রমিস করিনি বৈশালী।অ্যান্ড আই নেভার ইউজড ইউ। তুমি নিজের ইচ্ছায় আমার সাথে ঘুরতে গিয়েছিলে।

উই ওয়ার নেভার আ থিং। ইট ওয়াজ ক্যাজুয়াল। এত নাটক করার কোনো অর্থ হয় না।”

“ক্যাজুয়াল? নাটক?” 

বৈশালীর মুখের রঙ রাগে লাল হয়ে গেল। তার চোখ দুটো যেন আরো হিংস্র হয়ে উঠল। সে এক পা আরো এগিয়ে এসে অয়নের খুব কাছাকাছি দাঁড়াল, এতটাই যে ওর ঘন নিশ্বাস নিজের ঠোঁটে এসে পড়ছে বলে অয়নের মনে হল। রাগে-ক্ষোভে বৈশালীর সুন্দর মুখটা লাল হয়ে উঠেছে।

"তুমি এটাকে নাটক বলছ, অয়ন? ইউ রিয়্যালি হ্যাভ নো সাইড অফ কনসায়েন্স, রাইট? তোমার কাছে আমার ফিলিংসগুলো জাস্ট একটা নাটক ছিল ? 

আমি কতখানি জেনুইন ছিলাম তোমার সাথে, আর তুমি আমাকে জাস্ট একটা ক্যাজুয়াল অপশন বানিয়ে রেখে দিলে?"

বৈশালী অয়নের বুকের কাছে আঙুল উঁচিয়ে বলে চলল, 

"কোন ছাঁচে তৈরি তুমি অয়ন? ভালোবাসার নাটক করো, কিন্তু তোমার ভেতরে কোন মানুষের বাস নেই! কোন মা তোমাকে জন্ম দিয়েছে ? তোমার মতো একটা নিচু মানসিকতার সেলফিশ ছেলের শরীরের মধ্যে নিশ্চয়ই কোন না কোন নোংরা রক্ত বইছে! কোন মায়ের গর্ভে তোমার মতো একটা কোল্ড, সেলফিশ দানব তৈরি হয়, আমার জানতে ইচ্ছে করে!"

ও চুপচাপ বৈশালীর অপমানজনক কথাগুলো হজম করে নিচ্ছিল; কিন্তু, 'মা' শব্দটা শোনামাত্রই অয়নের ভেতরে হঠাৎ একটা ঝাঁকুনি লাগল।

গত এক মাস ধরে যে নামটাকে সে বুকচাপা যন্ত্রণার নিচে পুঁতে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করছিল, যার স্মৃতিগুলো তাকে প্রতিনিয়ত কুড়ে কুড়ে খাচ্ছিল, তার নামটা বৈশালীর মুখে এরকমভাবে শুনে ওর মাথার ভেতরের রগগুলো মুহূর্তের মধ্যে দপদপ করে উঠল।
রাগে তার চোখের মণি দুটো কুঁকড়ে এল।

চোখের পলকে অয়নের চেহারার শান্ত ভাবটা মিলিয়ে গেল। কথা না বলে সে নিঃশব্দে এক পা এগোতেই তার মুখের হিংস্র ভাব দেখে বৈশালী ভয়ে পিছিয়ে গেল। অয়নের এই মূর্তির সাথে তার পরিচয় আছে। অয়নের ছায়াটা বৈশালীর পুরো শরীরের ওপর এসে পড়তেই ও এক অজানা আশঙ্কায় শিউরে উঠল। বৈশালীর নিঃশ্বাস আটকে এল...কিন্তু অয়ন তার উপর এগিয়ে এসে গায়ে হাত তোলা তো দূরের কথা, একটা কথাও বলল না। কেবল একটা তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল। 

তার চোখেমুখে একটা অবজ্ঞা ফুটে উঠল। সে যে বৈশালীর এই ভয় পাওয়াটা উপভোগ করছে, সেটা বেশ বোঝা যাচ্ছিল। নিজের দুর্বলতা আর অয়নের চোখের অসীম তাচ্ছিল্য বৈশালীর ইগোতে তীরের মতো গিয়ে বিধল। 

মুহূর্তের মধ্যে ভয়ের জায়গাটা দখল করে নিল তীব্র অপমানবোধ আর নিজের প্রতি ক্ষোভ। যে ছেলেটা তাকে ইউজ করে ফেলে দিয়েছে সে তার চোখের সামনে দাঁড়িয়ে তাকে তাচ্ছিল্য দেখাচ্ছে ? অয়নের চোখে ওর দুর্বলতা ধরা পড়ে যাবার অপমানটা ও কিছুতেই হজম করতে পারছিল না।

মাথা ঠিক রাখতে পারল না বৈশালী। 

গায়ের সমস্ত শক্তি জড়ো করে, তীব্র রাগে ফুঁসে উঠল সে,

"ইউ ব্লাডি বাস্টার্ড ! তোমাকে আমি এমন শিক্ষা দেব...!”

ডানহাত তুলে অয়নকে চড় মারতে গেল বৈশালী।

কিন্তু, তার হাতটা অয়নকে স্পর্শ করার আগেই সে কুইক রিফ্লেক্সে বৈশালীর কবজিটা শূন্যে ধরে ফেলল। অয়নের আঙুলগুলো লোহার চিমটের মতো বৈশালীর নরম, গম-রঙা চামড়ায় বসে গেল।

“ডোন্ট।” 

অয়ন অত্যন্ত নিচু গলায় সতর্ক করল। মেয়েটা সত্যিই ওর ধৈর্যের পরীক্ষা নিতে ভালবাসে।

বৈশালী ব্যথায় ফুঁসে উঠল, কিন্তু একইসাথে অয়নের হাতের স্পর্শ, ওর শরীরের আঁচ, বৈশালীর শরীরের ভেতর দিয়ে এক অনাকাঙ্ক্ষিত শিহরণ বইয়ে দিল।

“ছাড়ো আমায়! ইতর কোথাকার !”

বৈশালী দাঁতে দাঁত চেপে অয়নকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেবার চেষ্টা করল, কিন্তু শক্তিতে অয়ন তার চেয়ে বহু গুণ এগিয়ে। সে একচুলও নড়ল না।

চোখের পলকে সে বৈশালীর অন্য হাতটাও একইভাবে ধরে ফেলল। 

তারপর এক মোচড়ে বৈশালীর দুটো হাতই ওর মাথার ওপর তুলে গ্যালারির কোল্ড মেটাল ফেন্সিংয়ের সাথে চেপে ধরল।

“উফ...!” 

মেটাল নেটের সাথে ধাক্কা খেতেই বৈশালীর পিঠটা ঝনঝন করে উঠল। অয়ন বৈশালীর একদম কাছাকাছি এগিয়ে এল। তাদের মাঝখানে এক ইঞ্চি দূরত্বও খালি নেই। 

নিজেকে ছাড়ানোর জন্য বৈশালী মোচড়া মুচড়ি করে বেরোনোর চেষ্টা করল, কিন্তু পেছনে ঠান্ডা মেটাল নেটিং আর সামনে অয়নের চওড়া, পাথরের মতো শক্ত বুকের খাঁচা। ওর পালানোর সব রাস্তা বন্ধ।

তার উপর, স্পোর্টস শর্টসের ওপর দিয়ে অয়নের উরুর শক্ত কঠিন পেশি সরাসরি এসে চেপে বসেছে ওর শর্টস পরা পায়ের ওপর। চামড়ায় চামড়ার ঘষা লাগতেই বৈশালীর মেরুদণ্ড বেয়ে একটা বিদ্যুত তরঙ্গ খেলে গেল। ও ছিটকে সরে যেতে চাইল, কিন্তু পা দুটো যেন মাটির সাথে জমে গেছে। না চাইতেই নিঃশ্বাস ভারী হয়ে উঠেছে, ওর বুকটা হাপরের মতো ওঠানামা করছে।

বৈশালী চোয়াল শক্ত করে রাগটা ধরে রাখতে চাইল। ওর চোখে একদিকে প্রচণ্ড রাগ আর অপমানের আগুন, অন্যদিকে অয়নের এই আচমকা শারীরিক আধিপত্যের ফলে সেই রাগের নীচে জমা হতে থাকা অবদমিত তীব্র আকর্ষণ। 

এমন সময় ওর চোখে চোখ রাখতে বৈশালীর শ্বাস আটকে এল। অয়নের চোখ দুটো এখন কুচকুচে কালো, সেখানে দয়া বা ভালবাসা, কোনটাই নেই। 

“তুমি একইরকম রয়ে গেছ, বৈশালী। একটুও বদলাও নি।” 

অয়ন ওর একদম মুখের ওপর ঝুঁকে, ডান হাতে ওর চিবুকটা তুলে ধরে ফিসফিস করে বলল। কথা বলার সময় ওর গরম শ্বাস এসে বৈশালীর নরম ঠোঁটের উপর আছড়ে পড়ছিল।

“তোমার এই ক্ষোভ, এই রাগ... এটা কী আমার প্রতি তোমার ঘৃণার জন্য? না ! এটা তোমার স্বার্থপরতা ছাড়া আর কিছু নয়। যখন কোনকিছু তোমার ইচ্ছের বিরুদ্ধে যায়, তখন তুমি ঠিক এভাবেই পাগলের মতো আচরণ করো।”

কথাগুলো বলার সময় অয়নের চোখের সামনে আচমকা চন্দ্রিমার ছবিটা ভেসে উঠল। দুজনের মধ্যে ভালোই মিল আছে। ওকে আবার ওই মেয়েটার সাথে ছয় মাস কাটাতে হবে। কথাটা চিন্তা করতেই অয়নের চোয়ালটা শক্ত হয়ে উঠল।

"ঠিক এইজন্য আমি তোমার সাথে ব্রেকআপ করেছিলাম।”

বৈশালীর চোখে চোখ রেখে অয়ন কথাগুলো ছুঁড়ে দিল।

খোঁচাটা খেয়ে রাগে ওর চোখমুখ লাল হয়ে উঠল।

“ইউ... ইউ অ্যারোগ্যান্ট...” বৈশালী গালি দিতে গেল, কিন্তু ওর গলা কেঁপে উঠল। 

অয়ন বৈশালীর কথা শেষ হতে দিল না। তার অন্য হাতটা ততক্ষণে বৈশালীর সরু কোমর পেঁচিয়ে ওকে এক ঝটকায় নিজের শরীরের দিকে আরও শক্ত করে চেপে ধরল।

দুজনের মাঝে ব্যবধানের শেষ সেন্টিমিটারটুকুও মুছে গেল।

বৈশালীর চোখের সামনের পৃথিবীটা এবার ঘুরতে শুরু করল। তার মুখ দিয়ে আর কোন শব্দ বেরলো না। সে পরিষ্কার টের পেল অয়নের স্পোর্টস শর্টসের ভেতর আটকে থাকা শক্ত, উত্তপ্ত পুরুষাঙ্গটা ওর তলপেটের উপর চাপ সৃষ্টি করছে। বৈশালীর মেদহীন তলপেটে এক অচেনা বিদ্যুত তরঙ্গ খেলে গেল।

বৈশালী এতক্ষণ তার শারীরিক অনুভূতিগুলোকে রাগ আর অভিমান দিয়ে ঢাকার চেষ্টা করছিল। কিন্তু, এবার সে আর পারল না। অয়নের এই তীব্র শারীরিক অনুভূতির নিচে এতদিনের জমানো রাগ, ক্ষোভ, অভিমান গলে জল হয়ে যেতে লাগল। ওর চোখ দুটো ভিজে আসা আবেগে আধবোজা হয়ে এল, হৃদস্পন্দন পাগলের মতো ধুকপুক করছে।

অয়ন বৈশালীর চোখে এই মানসিক পরিবর্তনটা পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছিল।

সে আর এক মুহূর্ত সময় নষ্ট করল না, বৈশালীর হাত দুটো ওপরে ধরে রেখেই এক মোচড়ে ওকে উল্টে দিল। 

জালের ঠান্ডা লোহা বৈশালীর গাল, বুক আর ক্রপ-টপের ওপর থেকে উন্মুক্ত পেটের উপর চেপে বসল। 

অয়ন পেছন থেকে একদম সেঁটে দাঁড়াল। বৈশালীর পিঠের ওপর ওর চওড়া বুকের চাপ।

বৈশালী শ্বাস টানতে টানতে নিজের অজান্তেই তার দুটো হাত দিয়ে জালের লোহা শক্ত করে আঁকড়ে ধরল।

তার শরীরের ভেতরের রাগটা এখন তীব্র শারীরিক ব্যাকুলতার রূপ নিতে শুরু করেছে। সে আর নিজেকে এখান থেকে সরাতে চাইছে না। বরং, অয়নের এই ডমিনেশন তার শরীর-মনকে এক অদ্ভুত উত্তেজনায় অবশ করে ফেলছে।

অয়ন বৈশালীর কোমরের দুই পাশ দু-হাতে শক্ত করে চেপে ধরে ওকে সামান্য ওপরের দিকে টেনে নিজের দিকে সাঁটিয়ে নিল। তার কঠিন শরীরের সম্পূর্ণ চাপ এসে বৈশালীর পিঠ আর নিতম্বের উপর পড়ল। সঙ্গে সঙ্গে ওদের পোশাকের ব্যবধানটুকু পার হয়ে অয়নের স্পোর্টস শর্টসের ভেতর টানটান হয়ে ওঠা শক্ত লিঙ্গটা বৈশালীর পাতলা ফেডেড ডেনিম শর্টসের ওপর দিয়ে ওর উঁচিয়ে থাকা গোল পাছার খাঁজে সরাসরি গিয়ে সরাসরি ঘষা খেল। 

বৈশালীর শিরদাঁড়া বেয়ে এক তীব্র বিদ্যুত তরঙ্গ নেমে গেল। সে অবশ হয়ে মেটাল জালের ঠান্ডা লোহাটা আরও শক্ত করে আঁকড়ে ধরল।

“শাস্তি পাওয়ার অভ্যাস তো তোমার পুরোনো, তাই না বৈশালী।" 

উত্তরের অপেক্ষা না করে অয়ন এক হাতে বৈশালীর চুলটা মুঠি করে ধরে ওর মাথাটা সামান্য পেছনে টেনে আনল আর অন্য হাতটা সজোরে নামিয়ে আনল বৈশালীর কোমরের নিচে। ডেনিম শর্টসের ওপর দিয়েই অয়নের চওড়া, ভারী হাতটা বৈশালীর বাম নিতম্বে সশব্দে আছড়ে পড়ল।

ঠাস!

“আহহহ...!” 

বৈশালীর মুখ থেকে একটা অনিয়ন্ত্রিত শীৎকার ঠিকরে বের হয়ে এসে গ্যালারির চারকোণায় ছড়িয়ে গেল। তীব্র ব্যথার চাবুক বৈশালীর পুরো নিতম্বে আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়ল, কিন্তু সেই ব্যথার চেয়েও অনেক বেশি তীব্র, আদিম কামনার স্রোত ওর মেরুদণ্ড বেয়ে সোজা মাথার দিকে উঠে গেল।

অয়ন থামল না। সে বৈশালীর চুল ধরে টেনে ওর কানটাকে নিজের ঠোঁটের কাছে নিয়ে এলো।বৈশালীর পিঠটা ধনুকের মতো বেঁকে গেল।

"তোমার অহংকারটা বরাবরই একটু বেশি, বৈশালী। তুমি ভেবেছিলে চিৎকার করে, গালি দিয়ে আমাকে অপরাধী বানিয়ে দেবে ?
নাও ইটস পানিশমেন্ট টাইম।”

সে আবার হাতটা ওঠাল, এবার আরও জোরে বৈশালীর অন্য পাশের নিতম্বে চালাল। ডেনিম কাপড়ের ওপর দিয়ে সেই আঘাতের শব্দ আবারও গোটা মাঠে ছড়িয়ে পড়ল।

ঠাস!

“ওহ গড... অয়ন... প্লিজ...” 

বৈশালীর পা দুটো কেঁপে উঠল। তার হাঁটু দুটো অবশ হয়ে আসছে। মেটাল নেটিং আঁকড়ে না ধরলে হয়তো সে ওখানেই মাটিতে লুটিয়ে পড়ত। নিতম্বের তীব্র জ্বলন আর কামনার তীব্রতায় তার চোখ বন্ধ হয়ে আসছে। তার সংক্ষিপ্ত ডেনিম শর্টসের নিচে থাকা প্যান্টি ততক্ষণে ভেজা কামরসে সিক্ত হয়ে উঠেছে।

পিছন থেকে অয়নের শক্তিশালী উরুর চাপ, তার শরীরের ওজন পেছন থেকে বৈশালীকে একদম পিষে ফেলছিল।

“এখনও বদলা নেওয়ার ইচ্ছা আছে তো , বৈশালী ?” 

অয়ন বৈশালীর কানের লতিটা কামড়ে ধরে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল।

এবার জবাবে বৈশালী আর কোন গালি দিল না। কোন প্রতিরোধও করল না। সে ব্যাকুলভাবে নিজের নিতম্বটা পেছন দিকে অয়নের পুরুষাঙ্গের ওপর আরেকটু চেপে হালকা দুলিয়ে দিল, অয়নের শক্ত পুরুষাঙ্গের ওপর ঘষে নিয়ে
নিজেকে সঁপে দিল।

“অয়ন... ইউ ফাকিং ডেভিল... প্লিজ...”

৪

মাঠের বাইরে দাঁড়িয়ে বারবার ঘড়ি দেখছিল জিনিয়া। ঘড়ির কাঁটা সোয়া দশটা ছুঁইছুঁই। পৌনে একঘণ্টা হতে চলল, অথচ বৈশালীর আসার কোনো নামগন্ধ নেই! 

কী এত কথা হচ্ছে দুজনের মধ্যে? অথচ, ও প্রথমে মাঠে ঢুকতেই চাইছিল না !

জিনিয়া একটা সরু সিগারেট ধরিয়ে ধোঁয়ার হালকা রিং ছাড়ল।

বিপ... বিপ...

স্মার্টফোনের ভাইব্রেশনে তার চিন্তার সূত্র কেটে গেল। ভুরু কুঁচকে পকেট থেকে ফোনটা বের করল জিনিয়া। স্ক্রিনে ভেসে উঠছে দেবমাল্যর নাম, বৈশালীর বর্তমান রিচ-কিড বয়ফ্রেন্ড।

অ্যানসার না করে মেসেজ বক্সটা খুলল জিনিয়া। দেবমাল্য পাঠিয়েছে:

"হাই জিনিয়া, বৈশালী কি তোমার সাথে আছে? ও লাস্ট এক ঘণ্টা ধরে আমার কল পিক করছে না। এনি প্রবলেম?"

মেসেজটা পড়া মাত্রই জিনিয়ার ঠোঁটের কোণে একটা কৌতুকপূর্ণ হাসি ফুটে উঠল।

সে একবার দূরে স্পোর্টস কমপ্লেক্সের খাঁ খাঁ করা গ্যালারিটার দিকে তাকাল। তার চোখ জোড়া একবার দূর নির্জন গ্যালারির ধাতব ফেন্সিংয়ের আড়ালে, যেখানে ও শেষবার অয়ন আর বৈশালী একে অপরের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছিল; জিনিয়া চোখ সরু সেদিকে তাদের খুঁজতে ব্যর্থ চেষ্টা করল।

কিছু কিছু মানুষ কাকোল্ড হওয়ার জন্যই জন্মায়।

সে একহাতে সিগারেটের ছাই ঝেড়ে ধীরেসুস্থে দেবমাল্যের জন্য মেসেজ টাইপ করতে শুরু করল:

"রিল্যাক্স দেব। বৈশালীর গাড়ির টায়ারে একটা পাংচার হয়েছিল। আমরা গ্যারেজেই আছি, ও আধা ঘণ্টার মধ্যে ফ্রি হয়ে তোকে কল করবে।"

সেন্ড বোতামে চাপ দিয়ে জিনিয়া ফোনটা পকেটে রেখে দিল। তারপর সিগারেটে শেষ টান দিয়ে মনে মনে হাসল,

আফটারঅল, বেস্টফ্রেন্ডকে কভার করা আর তাকে সেফ রাখাটা ওর দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে।

‘বেচারা দেবমাল্য! তোর গার্লফ্রেন্ড এখন তার এক্সের কাছে স্পেশাল ক্লাস নিচ্ছে। তুই আপাতত চুপচাপ বসে আঙুল চোষ!’
[+] 6 users Like RockyKabir's post
Like Reply
৫

ডিসেম্বর ২৫, সকাল পৌনে এগারোটা। 

বাইরে কলকাতার রাস্তায় বড়দিনের হালকা রোদের আমেজ ছড়িয়ে পড়ছে, ডালহৌসি স্কোয়ারের ওপর হালকা রোদের এক পাতলা চাদর বিছানো, যদিও রোদের তীব্রতা নেই। 

কিন্তু, লালবাজারের দোতলায় প্রেস ব্রিফিং রুমের চার দেওয়ালের পরিবেশ হাওয়া বেশ টানটান।

ঘর ভর্তি মিডিয়ার লোক। ভিড়, ক্যামেরার ট্রাইপডের ঠোকাঠুকি, মাইকের ঘড়ঘড় আওয়াজ আর খবরের কাগজ আর টেলিভিশনের সাংবাদিকদের ব্যস্ততা। এসি চলছে, তবু একটা দমবন্ধ ভাব। চারকোনা টেবিলটার কাঠের রোস্ট্রামের ওপর প্রায় বারো-চৌদ্দখানা আলাদা আলাদা চ্যানেলের বুম জটলা পাকিয়ে আছে।  

টেবিলের কেন্দ্রে বসে আছেন জয়েন্ট সিপি (ক্রাইম) সুব্রত চক্রবর্তী। তাঁর চোখের নিচে সামান্য কালি, চেহারায় বয়সের ছাপ, মাথার চুলগুলো পাশ থেকে স্লেট রঙের, চোখের নিচে ফোলা থলে। 

ওনার বাঁ পাশে গোয়েন্দা বিভাগের ডিসি আর ডানপাশে অ্যাডিশনাল সিপি বসে।

অর্জুন লাহিড়ী ঘরের পেছনের দিকের একটা সিটে হেলান দিয়ে বসেছিল। 'দ্য স্টেটসম্যান'-এর লোগো দেওয়া প্যাডটা কোলের ওপর খোলা, তবে কলমটা আঙুলের ফাঁকে অলসভাবে ঘুরছে। 

২৭ বছরের অর্জুনের জিন্সের জ্যাকেটের কলারটা কিছুটা তোলা, চোখে মৃদু ক্লান্তি। গত চারদিন ধরে এই অজয় সামন্ত কেসটা নিয়ে কলকাতার কোনো সংবাদমাধ্যমের শান্তিতে ঘুম হয়নি।

শিক্ষা মন্ত্রকের ক্ষমতাশালী আমলা অজয় সামন্ত দিন পাঁচেক আগে বিকাশ ভবনে নিজের অফিসে কাজ করার সময় হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। 

হাসপাতালে আনার আধঘণ্টার মধ্যে তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। কারণ, সিভিয়ার কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট। গল্পটা ওখানেই শেষ হতে পারত। 

কিন্তু, শেষ হলো না কারণ তাঁর স্ত্রী সোমা সামন্ত পরদিনই হাইকোর্টে রিট পিটিশন দাখিল করলেন। 

তাঁর অভিযোগ, তাঁর স্বামীর মৃত্যু স্বাভাবিক নয়, এটা পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড এবং এতে মন্ত্রকেরই উচ্চপর্যায়ের লোক জড়িত। হাইকোর্ট দ্রুত সৎকার থামিয়ে পোস্টমর্টেমের নির্দেশ দেয়। রাজ্য রাজনীতিতে তোলপাড় শুরু হয়ে যায়।

সুব্রত চক্রবর্তী গলার আওয়াজ খাঁকারি দিয়ে সামনে রাখা জলের গ্লাসে এক চুমুক দিলেন। ঘরের চ্যাটারিং এক লহমায় বন্ধ হয়ে গেল। সব ক্যামেরার ফ্ল্যাশ একসঙ্গে জ্বলে উঠল।

তিনি টেবিলের ওপর রাখা ফাইলটা খুলে তাঁর পরিচিত গম্ভীর, গলায় বলতে শুরু করলেন,

"লেডিস অ্যান্ড জেন্টলমেন, মাননীয় হাইকোর্টের নির্দেশে আরজিকর হাসপাতালের তিন সদস্যের ফরেনসিক বোর্ডের অধীনে অজয় সামন্তের যে পোস্টমর্টেম সম্পন্ন হয়েছে, তার প্রিলিমিনারি রিপোর্ট আজ সকালে আমরা হাতে পেয়েছি। মিডিয়াতে যেভাবে নানা জল্পনা ছড়ানো হচ্ছে, পুলিশ বিভাগ হিসেবে আমাদের দায়িত্ব সত্যটা পরিষ্কার করা।

শিক্ষা মন্ত্রকের অতিরিক্ত সচিব প্রয়াত অজয় সামন্তের পোস্টমর্টেম রিপোর্ট আজ সকালে আমাদের হাতে এসেছে। ময়নাতদন্ত হাইকোর্টের নির্দেশমতো গতকাল রাতে তিন সদস্যের মেডিকেল বোর্ডের নজরদারিতেই করা হয়েছে এবং পুরো প্রসিডিওর ভিডিওগ্রাফি করা হয়েছে।”

এক সেকেন্ড থামলেন তিনি। ঘরের ক্যামেরাগুলোর ফ্ল্যাশ একসাথে জ্বলে উঠল।

অর্জুন তার কোলের ওপর রাখা প্যাডে নীল বলপেনটা আঙুলের খাঁজে নাড়াচাড়া করতে লাগল। সে কোনো নোট নিচ্ছে না। 

প্রেস কনফারেন্সে আইপিএস অফিসারদের মুখের কথার চেয়ে মুখের রেখা পড়াটা বেশি দরকারী, এই প্র্যাক্টিক্যাল শিক্ষাটা সে ‘দ্য স্টেটসম্যান’-এ কাজ করতে করতেই পেয়েছে।

“রিপোর্টে খুব পরিষ্কার করে বলা হয়েছে।” 

সুব্রত চক্রবর্তী ফাইলের একটা পাতায় আঙুল বোলালেন, 

“অটোপ্সি রিপোর্টে পরিষ্কার বলা হয়েছে, দেহের বাইরে বা ভেতরে কোনো আঘাতের চিহ্ন নেই। পয়জনিং বা কোনো কেমিক্যাল টক্সিনের উপস্থিতিও প্রাথমিক ভিসেরা টেস্টে পাওয়া যায়নি। টক্সিকোলজি রিপোর্টও নেগেটিভ। ওনার পাকস্থলীতে সাধারণ খাবার ছাড়া সন্দেহজনক কিছু মেলেনি। 

ডাক্তারদের ওপিনিয়ন মৃত্যুর কারণ ‘অ্যাকিউট মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কশন’। অর্থাৎ যাকে আমরা চলতি ভাষায় ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাক বলি। ওনার হৃৎপিণ্ডের বাঁ দিকের ধমনীতে প্রায় নব্বই শতাংশ ব্লকেজ ছিল। বিষক্রিয়া বা বাইরে থেকে কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। সো, লেডিজ অ্যান্ড জেন্টলমেন, ইট ইজ আ কেস অফ ন্যাচারাল ডেথ। মিসেস সোমা সামন্ত যেসব অভিযোগ তুলেছিলেন, তার সপক্ষে কোনো মেডিকো-লিগ্যাল এভিডেন্স পাওয়া যায়নি।

পুলিশ আজই এই ফাইনাল রিপোর্ট আদালতে জমা দিচ্ছে এবং বডি ফ্যামিলির হাতে হ্যান্ডওভার করার প্রসেস শুরু হয়েছে। থ্যাংক ইউ।”

সুব্রত চক্রবর্তী ফাইলটা বন্ধ করতেই হট্টগোল শুরু হয়ে গেল। একসঙ্গে ছ-সাতজন সাংবাদিক সোজা দাঁড়িয়ে উঠলেন। 

“স্যার! তাহলে ম্যাডাম সামন্ত যে বিষপ্রয়োগের দাবি করেছিলেন ?”

"স্যার, বিকাশ ভবনের যে সিসিটিভি ফুটেজ গায়েব হওয়ার কথা বলা হচ্ছিল, সেটা নিয়ে পুলিশের কী বক্তব্য?"

“স্যার, শিক্ষা মন্ত্রকের যে সিএসআর ফাইলের গায়েব হওয়া নিয়ে কথা উঠছিল, সেটার সঙ্গে কি এই অ্যাটাকের কোনো যোগ আছে?”

" পুলিশ কী পলিটিক্যাল প্রেসারেই পোস্টমর্টেম রিপোর্টে তড়িঘড়ি ক্লিনচিট দিল স্যার?"

সুব্রত চক্রবর্তী হাত তুলে সবাইকে শান্ত হওয়ার ইঙ্গিত দিলেন। তাঁর মুখে একচিলতে হাসির রেখা।

"পুলিশ কোনো রিপোর্টের ওপর রং চড়ায় না। সিসিটিভি ফুটেজের টেকনিক্যাল গ্লিচ নিয়ে সাইবার সেল আলাদা তদন্ত করছে, কিন্তু ডেথ কজ্‌ একেবারে পরিষ্কার। আপনারা দয়া করে মনগড়া কোনো থিওরি ছড়াবেন না।"

সাংবাদিকদের প্রশ্নের ঝড় আরও মিনিট পনেরো চলল।

তিনি ধীরেসুস্থে প্রশ্নের উত্তর দিলেন। আইনি ভাষায় গোল গোল জবাব, যাতে কোনো নতুন বিতর্ক তৈরি না হয়।

সুব্রত যখন ফাইলটা গুটিয়ে উঠতে যাচ্ছেন, অর্জুন হঠাৎ সোজা হয়ে বসল। ডান হাতটা সামান্য তুলল।

"স্যার, একটা প্রশ্ন।" অর্জুনের গলা খুব বেশি উঁচু ছিল না, কিন্তু স্বরটা পরিষ্কার শোনালো।

সুব্রত চক্রবর্তী চোখ তুলে অর্জুনের দিকে তাকালেন। 

“ইয়েস।”

অর্জুন মাইকের দিকে না ঝুঁকেই পরিষ্কার গলায় বলল, 

"কিন্তু, আরজিকর-এর ফরেনসিক টিম কি সাধারণ টক্সিকোলজি স্ক্রিনিং করেছে, নাকি কোনো সিন্থেটিক কার্ডিও-টক্সিন বা অর্গানিক নিউরোটক্সিনের জন্য অ্যাডভান্সড স্পেকট্রোমেট্রি টেস্টের সুপারিশ করেছে? 

কারণ সাধারণ পোস্টমর্টেমে ডিজিটালিস বা পটাশিয়াম ক্লোরাইডের মতো উপাদান রক্তে ধরা পড়ে না যদি না স্পেশাল রিজেন্ট ব্যবহার করা হয়।"

প্রশ্নটা শুনে পুরো প্রেস রুম সেকেন্ডের জন্য চুপ মেরে গেল। অন্য সাংবাদিকরা অর্জুনের দিকে ঘুরে তাকাল।

সুব্রত চক্রবর্তীর ঠোঁটের কোণটা সামান্য কুঁচকে গেল। তিনি অর্জুনের চোখের দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে বললেন, 

"বোর্ড সব রকমের কেমিক্যাল অ্যানালিসিসের জন্যই নমুনা সিএফএসএল-এ পাঠিয়েছে। ফাইনাল টক্সিকোলজি রিপোর্ট আসতে তিন সপ্তাহ লাগবে। কিন্তু প্রিলিমিনারি রিপোর্টে কোনো অ্যাবনরমালিটি মেলেনি। স্যাটিসফাইড?"

"থ্যাঙ্ক ইউ, স্যার।" 

অর্জুন আলতো মাথা নাড়ল।

"ওকে জেন্টলমেন, দ্যাটস অল ফর টুডে।" 

সুব্রত ডায়াস ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন।

ডায়াস খালি হতেই ভিড় ভেঙে গেল। সাংবাদিকরা ক্যামেরাম্যানদের নিয়ে হুড়মুড় করে দরজার দিকে ছুটল। কে আগে নিউজ ডেস্কে খবর পৌঁছাবে তার প্রতিযোগিতা। অর্জুন ধীরে সুস্থে নিজের প্যাডটা জ্যাকেটের ভেতরের পকেটে রাখল। তার তাড়া নেই। সে জানত এই রিপোর্টের খবর সব কাগজেই কাল একই ছাপা হবে, পুলিশের ক্লিনচিট।

অর্জুন তাড়াহুড়ো করল না, সে তার নোটবইটা পকেটে ঢুকিয়ে ধীরে সুস্থে উঠে দাঁড়াল। সুব্রত চক্রবর্তী ততক্ষণে পাশের দরজা দিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেছেন।

ঘর প্রায় খালি হয়ে আসতে অর্জুন দোতলার লম্বা বারান্দায় এসে দাঁড়াতেই দেখল সুব্রত চক্রবর্তী তাঁর দুই বডিগার্ড আর পিএ-কে নিয়ে লিফটের দিকে না গিয়ে বাঁদিকের সিড়ির দিকে হাঁটা দিচ্ছেন।

অর্জুন ভিড় এড়িয়ে দ্রুত পায়ে ওনার পিছু নিল। সিঁড়ির মুখে গিয়ে মৃদু গলায় ডাকল, "সুব্রতদা।"

সুব্রত চক্রবর্তী থামলেন। পেছনের গার্ড দুজনকে একটু দূরত্ব বজায় রাখতে ইশারা করে পিছনে ঘুরলেন। তাঁর চোখের চশমাটা খুলে পকেটের রুমাল দিয়ে মুছতে মুছতে অর্জুনের দিকে তাকালেন।

"পটাশিয়াম ক্লোরাইডের জ্ঞানটা কার থেকে ঝাড়লে অর্জুন? গত সপ্তাহে সিবিআই-এর কোনো সোর্সের সঙ্গে চা খাচ্ছিলে নাকি ?" 

তার গলায় হালকা ঠাট্টার সুর।

"না সুব্রতদা।" 

অর্জুন একটু হাসল, 

"ফোরেনসিক মেডিসিনের বইগুলো মাঝে মাঝে নাড়াচাড়া করি। তাছাড়া আপনি তো জানেন, অজয় সামন্তর স্ত্রী সোমা সামন্ত একা রিট পিটিশন করেননি, ওনার পেছনে রাজভবনের ইনভিজিবল লবি কাজ করছিল। কেসটা অত সহজে মিটে যাবে?"

সুব্রত বাবু চশমাটা আবার চোখে পরে একটা শ্বাস ফেললেন। 

"আদালত পোস্টমর্টেম রিপোর্ট চেয়েছে, পুলিশ জমা দিয়েছে। বাকিটা ল্যাব বলবে। তুমি ছুটির দিনেও খবরের পেছনে মতো দৌড়চ্ছ কেন বল তো ? তোমার কোন গার্লফ্রেন্ড নেই, ছুটিতে বেড়াতে যাবার ইচ্ছা করে না?"

"আপনি তো জানেন দাদা, আমার ঘরে শুধু বই আর কফির কাপ অপেক্ষা করে।" 

অর্জুন মুচকি হাসল। 

"তবে আপনার আজকের বডি ল্যাঙ্গুয়েজ কিন্তু বলছিল অজয় সামন্ত কেসটা নিয়ে আপনি ভেতরে ভেতরে খুব একটা সন্তুষ্ট নন।"

সুব্রতবাবু আড়চোখে করিডোরের শেষ প্রান্তটা দেখে নিলেন। একজন কনস্টেবল ছাড়া আর কেউ দাঁড়িয়ে নেই। লালবাজারের দোতলার এই করিডোরটা ছুটির দিন সকালে একবারে নিঝুম।

"এখানে দাঁড়িয়ে কথা বলার কোন মানে হয় না।" 

সুব্রতবাবু হাতের ঘড়িটার দিকে তাকালেন। পৌনে এগারোটা বাজছে। 

"আমায় এখুনি বেরোতে হবে। পার্ক স্ট্রিটে একটা সিকিউরিটি ব্রিফিং আছে, তারপর ভিক্টোরিয়ার দিকে একটা ভিজিট। গাড়ি বের করতে বলেছি।"

অর্জুন কোনো কথা বলল না, শুধু ওনার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।

সুব্রত বাবু দু-সেকেন্ড ইতস্তত করলেন। তারপর বললেন, 

"গাড়িতে উঠবে? তোমাকে ধর্মতলায় ড্রপ করে দিতে পারি। রাস্তায় কথা বলছি।"

অর্জুন খবরের গন্ধ পেল। একজন পেশাদার সাংবাদিকের এই ইনস্টিংক্টটা থাকা খুব দরকার। মনে মনে উৎসাহিত হয়ে উঠলেও সে কিন্তু মনের ভাবটা মুখে একদম প্রকাশ করল না।

"আচ্ছা, চলুন তাহলে।" অর্জুন সংক্ষিপ্ত জবাব দিল।

লালবাজারের পিছনের গেটে দাঁড়িয়ে ছিল গাঢ় নীল রঙের টাটা সাফারি। ফ্ল্যাশার লাইটে কালো কাপড়ে ঢাকা। ড্রাইভার দরজা খুলে দাঁড়িয়েছিল। 

অর্জুন পেছনের সিটে গিয়ে বসতেই শক্ত ভারি দরজাটা 'ঠাস' শব্দে বন্ধ হয়ে গেল। বাইরের দুনিয়ার শোরগোল এক লহমায় গায়েব। গাড়ির ভেতরের এসি থেকে একটা চাপা পারফিউমের গন্ধ আর মৃদু ঠান্ডা হাওয়া ভেসে আসছে।

মুহুর্তের মধ্যেই ভারী গাড়িটা একটা হালকা ঝাঁকুনি দিয়ে লালবাজারের পেছনের গেট টপকে রয়্যাল এক্সচেঞ্জ প্লেসের ওপর এসে পড়ল। ভেতরের এসির হাওয়া বাইরের কলকাতার আর্দ্র শীতের থেকে আলাদা।

সুব্রত বাবু উইন্ডস্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রিল্যাক্সড হয়ে বসলেন। জ্যাকেটের পকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে ড্যাশবোর্ডের দিকে তাকিয়ে লাইটার জ্বালানোর আগে ড্রাইভারের দিকে তাকিয়ে বললেন, 

"হরেন, কাচটা একটু ডাউন করো তো।"

তারপর অর্জুনের দিকে না তাকিয়েই চুরুট বা সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়লেন। 

"অজয় সামন্তকে নিয়ে যা ভাবছ, সত্যিটা হয়তো তার কাছাকাছিই। কিন্তু ওটা নিয়ে ওপর মহলের এতো চাপ যে খবর করা শক্ত।"

অর্জুন শান্ত গলায় বলল। 

“সামন্তবাবু যে খুব সৎ অফিসার ছিলেন না সেটা সবাই জানে। একজন মানুষ হার্ট অ্যাটাকে মারা যেতেই পারেন। কিন্তু, মৃত্যুর পরে কেন ওনার ঘরের সিসিটিভি ফুটেজ গায়েব হয়ে যাবে ? ফাইল গায়েবের অভিযোগ উঠবে ? আর, বলা নেই কওয়া নেই ফোন বন্ধ রেখে ওনার ড্রাইভার কেন দুম করে উধাও হয়ে যাবে? 

আপনি তো ভালো করেই জানেন দাদা, পোস্টমর্টেম রিপোর্টে কিছু না পাওয়া যাওয়া মানেই মৃত্যুটা স্বাভাবিক, এমনটা না-ও হতে পারে।”

কথাগুলো শুনে সুব্রত চক্রবর্তী জানলার বাইরে ফাঁকা কলকাতার দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইলেন। অর্জুনের বাবা যখন কলকাতা পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চে ছিলেন, সুব্রত মুখার্জি তখন ওনার অধীনে ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন। সেই সূত্রে অর্জুনকে তিনি ছোটবেলা থেকে চেনেন। অর্জুন যে সস্তা টিআরপি-র পেছনে দৌড়ানো সাংবাদিক নয়, তা সুব্রতবাবু ভালো করেই জানেন।

লালবাজারের ভারী টাটা সাফারিটা এখন স্টিফেন হাউসের অট্টালিকাটা পার হয়ে সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউয়ের ক্রসিংয়ের দিকে এগোচ্ছে। 

২৫ শে ডিসেম্বরের সকালের মিষ্টি রোদে অন্যদিনের জমজমাট ডালহৌসির মোড় আজ প্রায় ফাঁকা। ইতি-উতি দুচারজন লোক দেখা যাচ্ছে।

সুব্রত চক্রবর্তী সিগারেটের ধোঁয়াটুকু জানালার সামান্য ফাঁক গলে বাইরে ছেড়ে দিলেন। অর্জুনের কথার ধার তিনি জানেন। অর্জুনের বাবাও ঠিক এভাবেই জটিল কেসের সূক্ষ্ম সুতো ধরে টান দিতেন।

"অর্জুন।" 

সুব্রতবাবুর গলার স্বর এবার স্বাভাবিকের চেয়ে অন্তত দুই স্কেল নিচে নেমে এল,

"তোমার হোমওয়ার্ক বেশ ভালো। কিন্তু সাংবাদিকতার সমস্যা হলো, তোমরা ডটগুলো মেলাতে গিয়ে মাঝে মাঝে এমন ছবি আঁকো যেগুলো আইনের চোখে টিকবে না।"

তিনি চশমাটা খুলে কোলঘেঁষা সিটের ওপর রাখলেন। চোখের নিচের ফোলা ভাবটায় যেন ক্লান্তির চাপ আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল।

"ড্রাইভার রাম বিলাস উধাও হয়নি। সে নিজেই থানায় গিয়ে স্টেটমেন্ট দিয়ে গেছে, মালিকের মৃত্যুর পর কিছু রাজনৈতিক ক্যাডারের হুমকির ভয়ে সে বিহারে গ্রামের বাড়িতে গা ঢাকা দিয়েছিল। গতকাল তাকে লালবাজারে এনে ইন্টারোগেট করা হয়েছে। সে স্পষ্ট বলেছে, সেদিন অজয় সামন্ত তাঁর চেম্বারে একাই ছিলেন।"

অর্জুন জ্যাকেটের পকেটে হাত গুঁজে স্থির হয়ে শুনছিল। গাড়ির ভেতরের এসি-র মৃদু গুঞ্জন ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। সে একটু ঝুঁকে প্রশ্ন করল, 

"আর সিসিটিভি ফুটেজ? বিকাশ ভবনের চারতলার করিডোরের আধ ঘণ্টার ফুটেজ ডিলিট হওয়াটাও কি 'টেকনিক্যাল গ্লিচ', সুব্রতদা?"

সুব্রত চক্রবর্তী অর্জুনের দিকে চোখ ফেরালেন। তার ঠোঁটের কোণে একটা হাসি ফুটে উঠল।

"বিকাশ ভবনের ওই করিডরটায় গত এক মাস ধরে রক্ষণাবেক্ষণের কাজ চলছিল, পিডব্লিউডি-র রিপোর্ট অন্তত সেটাই বলছে। 

তবে হ্যাঁ... কেমিক্যাল অ্যানালিসিস রিজিওনাল ফরেনসিক ল্যাবে পাঠানো হলেও, ডক্টর সেনগুপ্ত আমাকে পার্সোনালি একটা কথা বলেছেন।"

অর্জুন চোখের পাতা না ফেলে অপেক্ষা করতে লাগল।

"ডক্টর বলেছেন, অটোপ্সির সময় রক্তে একটা বিশেষ উপাদানের উপস্থিতি সন্দেহ করা হয়েছে, যেটা সাধারণ কার্ডিয়াক প্যানেলে আসে না। 'Digoxin' এর নাম শুনেছ? এটা পেশী অবশ করার এমন এক ওষুধ যা শরীরে ঢোকার অল্পক্ষণের মধ্যে ন্যাচারাল মেটাবোলাইটে ভেঙে যায়। হার্ট অ্যাটাক ঘটিয়ে এটা উবে যায়, সাধারণ টক্সিকোলজি স্ক্রিনিং একে ধরতে পারে না।"

অর্জুন মৃদু শ্বাস ফেলল। 

"তার মানে সোমা সামন্তের অভিযোগ একবারে ভিত্তিহীন নয়। অজয় সামন্তকে কোনো সূক্ষ্ম বিষক্রিয়ায় মারা হয়েছে।"

গাড়ি ততক্ষণে মিশন রো-এর ক্রসিং পেরিয়ে গেছে।

"অভিযোগ প্রমাণ করার মতো শক্ত ডকুমেন্ট এখনও আমাদের হাতে নেই, অর্জুন।"

সুব্রতবাবু সোজাসুজি অর্জুনের দিকে তাকালেন, 

"আর ওই সিএসআর ফাইলের কথা বলছিলে? ফাইলটা গায়েব হয়নি। রাজভবন থেকে একটা কেস রেফারেন্স আসতেই সেটা নবান্নে স্পেশাল ক্যাবিনেট সেল নিজেদের হেফাজতে নিয়ে নিয়েছে। লালবাজারকে শুধু বলা হয়েছে শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখতে।"

গাড়িটা ততক্ষণে সেন্ট্রালের ক্রসিংয়ে এসে সিগন্যালে দাঁড়িয়ে গেছে। রাস্তার বাঁ পাশেই অর্জুনের অফিস। ঐতিহাসিক স্টেটসম্যান হাউস। 

এবিষয়ে আর কিছু জানার যখন নেই তখন ফালতু ডোরিনা ক্রসিংয়ে নেমে আবার হেঁটে ব্যাক করার চেয়ে এখানে নেমে যাওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।

কিন্তু, সুব্রত বাবুর একটা কথায় সে থমকে গেল,

"তোমাদের মিডিয়া কিন্তু এসবের চক্করে পড়ে আসল খবরটা ভুলে যাচ্ছে।"

অর্জুনের কান আবার খাড়া হয়ে উঠল। সুব্রত চক্রবর্তী আজকে ভালো মুডে আছেন। 

সে কোন তাড়াহুড়ো দেখাল না।

“কিসের কথা বলছেন সুব্রতদা ?” 

অর্জুন খুব নিস্পৃহভাবে প্রশ্ন করল। 

ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজমের প্রথম নিয়ম; যখন কোনো বড় অফিসার অফ-দ্য-রেকর্ড মোডে চলে যায়, তখন বেশি বাড়াবাড়ি করলে সে মুখ বন্ধ করে ফেলে।

"পাঁচদিন আগে, যেদিন অজয় সামন্ত বিকাশ ভবনে অসুস্থ হয়ে পড়লেন, সেদিন সন্ধ্যাবেলা বাইপাসের রুবি মোড় আর পরমা ফ্লাইওভারের কনেক্টিং র‍্যাম্পের কাছে একটা প্রাইভেট কার এক্সিডেন্ট হয়েছিল, মনে আছে?"

অর্জুন ব্রেনটা একটু ঝালিয়ে নিল। 

"হ্যাঁ, একটা কালো স্কোডা আইল্যান্ডে ধাক্কা মেরে উল্টে গিয়েছিল। পোর্ট ট্রাস্টের চেয়ারম্যান ছিলেন না ভেতরে?"

"ইয়েস," সুব্রত বাবু এক মুখ ধোঁয়া ছাড়লেন। 

"শিশির রায়। পোর্ট ট্রাস্টের মাথা। সঙ্গে তাঁর স্ত্রী অমৃতা রায় ছিলেন। অমৃতা রায় অন দ্য স্পট ডেড। স্কোডার পেছনের দরজার গ্লাস ভেঙে ওনার ঘাড়ের হাড় বেরিয়ে গিয়েছিল। শিশির রায়... উডল্যান্ডসে এখনও ভেন্টিলেশনে। স্কাল ফ্র্যাকচার, ব্রেন হেমারেজ। ডাক্তাররা আশা ছেড়ে দিয়েছে। বেঁচে উঠলে অলৌকিক ব্যাপার হবে।"

অর্জুন ভ্রূ কুঁচকে ভাবল। 

"এটা তো একটা অ্যাকসিডেন্ট সুব্রতদা। যতদূর মনে পড়ছে, গাড়িটা শিশিরবাবু নিজেই ড্রাইভ করছিলেন। উনি নাকি মদ্যপ অবস্থায় ছিলেন, পুলিশের প্রাথমিক রিপোর্টে এটা ড্রিঙ্ক অ্যান্ড ড্রাইভের এক্সিডেন্ট বলে রেজিস্টার্ড হয়েছে।" 

অর্জুন বলল। 

"শিশির রায় নিজে গাড়ি চালাচ্ছিলেন, গাড়ি আউট অফ কন্ট্রোল হয়ে ডিভাইডারে মারে।"

সুব্রত বাবু হাসলেন। 

"তুমিও ওই থিওরি গিলে বসে আছ অর্জুন? পোর্টের চেয়ারম্যান যে পাঁচ বছর ধরে কলকাতা পোর্টের হাজার হাজার কোটি টাকার কন্টেনার লিজিং আর প্রাইভেট বার্থ অ্যালোকেশন সামলাচ্ছে, সে সন্ধেবেলা মদ খেয়ে বউকে পাশে বসিয়ে ১২০ স্পিডে বাইপাসের ব্লাইন্ড স্পটে গাড়ি মারবে?"

অর্জুন সোজা হয়ে বসল। 

"আপনি বলতে চাইছেন এটা অ্যাক্সিডেন্ট নয়?"

গাড়ি এখন সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউ ধরে এগোচ্ছে। ফুটপাতে ক্রিসমাসের টুপি পরা কিছু বাচ্চা আর বেলুন বিক্রেতা ছাড়া রাস্তায় গাড়ির সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম। সেরকম লোকজন নেই।

"প্রাথমিক তদন্তে যা এসেছে, তা যদি আমি তোমাকে বলি, তুমি কাল কাগজে ছাপতে পারবে না। কারণ আমার কাছে এখনও কোনো পেপার প্রুফ নেই।"

"প্রাথমিক তদন্তে কী মিলেছে ?" অর্জুনের গলায় ইনভেস্টিগেটিভ প্রেশার।

"গাড়িটার ফরেনসিক এক্সামিনেশন করা হয়েছিল লালবাজারের টেকনিক্যাল টিমকে দিয়ে।" 

সুব্রত বাবু আস্তে আস্তে বললেন। 

"স্কোডার স্টিয়ারিং কলাম আর ব্রেক ফ্লুইড পাইপে কোনো যান্ত্রিক ত্রুটি ছিল না। কিন্তু মজার বিষয় হলো, গাড়ির ইসিইউ (ইলেকট্রনিক কন্ট্রোল ইউনিট) চিপটা ইমপ্যাক্টের পর পুড়ে গেছে। ওটা ইমপ্যাক্টে পোড়েনি, ওটাকে শর্ট সার্কিট করানো হয়েছে বা কেমিক্যাল দিয়ে মেল্ট করানো হয়েছে। তার চেয়েও বড় কথা, শিশির রায়ের ব্লাড অ্যালকোহল লেভেল ছিল জিরো। অথচ দুঘণ্টার মধ্যে ট্রাফিক পুলিশ রিপোর্ট বানিয়ে দিল ড্রিঙ্ক অ্যান্ড ড্রাইভ।"

গাড়ির ভেতরের হাওয়াটা হঠাৎ ভারী হয়ে উঠল। অর্জুন পুরো ব্যাপারটা ছকে ফেলার চেষ্টা করল। 

"আর অমৃতা রায়? শিশির রায়ের স্ত্রী?"

“অমৃতা রায় সাধারণ হাউসওয়াইফ ছিলেন না।” 

সুব্রতবাবু বললেন। 

"বিয়ের আগে উনি একটা লজিস্টিক কোম্পানির এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টরের প্রাক্তন পার্সোনাল সেক্রেটারি ছিলেন।

শিশির রায়ের সমস্ত পার্সোনাল ফাইল, অফ-দ্য-রেকর্ড ডায়রি আর পার্সোনাল অ্যাকাউন্টস অমৃতা রায়ই হ্যান্ডেল করতেন। বলতে পারো, শিশির রায়ের সমস্ত হাঁড়ির খবর উনি জানতেন।

তিন বছর আগে শিশির রায়ের সাথে ওনার বিয়ে হয়। দুজনের বয়সের অনেকটা ডিফারেন্স, প্রায় পনের বছর। ম্যারেজটা কতটা লাভ আর কতটা স্ট্র্যাটেজিক বিজনেস ছিল, সেটা বড় প্রশ্ন।”

"মার্ডার?" 

অর্জুন ফিসফিস করে বলে উঠল।

"যদি হিট অ্যান্ড রান হতো, তাও একরকম ছিল। কিন্তু যেভাবে ঘটনাটা ঘটানো হয়েছে, তাতে মনে হবে স্রেফ হাই-স্পিড স্টিয়ারিং ফেলিউর।"

“দুটো কেসের মধ্যে কোনো কানেকশন আছে ?”

“নাহ। তবে, গত ছয় মাস ধরে উনি কয়েকটা প্রাইভেট শিপিং কোম্পানির লাইসেন্স রিনিউ করার ফাইল চেপে বসেছিলেন।"

অর্জুন এক মুহূর্ত চুপ করে রইল। তারপর সুব্রত মুখার্জির দিকে তাকিয়ে বলল, 

“আপনি আমাকে এসব কেন বলছেন সুব্রতদা ?”

"আমি তোমায় শুধু একটা খবর দিলাম। তুমি তো খবরের হাড়মাস চিবোতে ভালোবাসো। ট্রাই করে দেখ। তবে সাবধান, পোর্ট আর লজিস্টিকসের পেছনে যেসব প্লেয়াররা আছে, তারা কিন্তু কলকাতার ছোটখাটো তোলাবাজ গ্যাং নয়। তারা ইন্টারন্যাশনালি কানেক্টেড।"

গাড়ি পার্ক স্ট্রিটের মোড়ে এসে মোলায়েমভাবে দাঁড়িয়ে পড়ল। পার্ক স্ট্রিট আলোর মালায় সাজানো, রাতে এখানটা লোকে লোকারণ্য হয়ে উঠবে। যত রাত বাড়বে তত ভিড় বাড়বে।

"থ্যাঙ্ক ইউ, সুব্রতদা," অর্জুন গাড়ির হ্যান্ডেলে হাত দিল। 

তারপর থমকে একটু পিছন ফিরে তাকাল। 

"একটা শেষ কথা। পুলিশ কি বাইপাসের সিসিটিভি ফুটেজ পেয়েছে?"

সুব্রত বাবু একটা অদ্ভুত হাসি হাসলেন। 

"কোন ফুটেজ? যে জায়গায় এক্সিডেন্টটা দেখানো হয়েছে, সেখানকার চারটে ক্যামেরা নাকি আগেরদিন থেকে 'অ্যানুয়াল মেনটেন্যান্স'-এর জন্য বন্ধ রাখা হয়েছিল। গুড লাক অর্জুন।"

অর্জুন গাড়ি থেকে নেমে আসার সময় সুব্রতবাবু ওর কাঁধে হাত রাখলেন।

"মনে রেখো, 'দ্য স্টেটসম্যান'-এ যদি কাল সকালে ডিগক্সিনের গল্প নিয়ে লিড নিউজ ছাপা হয়, তবে ল্যাব রিপোর্ট আসার আগেই পুরো তদন্ত ভেস্তে যাবে। আমার হাত- পা বাঁধাই থাকবে।"

অর্জুন গাড়ির হ্যান্ডেল ধরে হালকা চাপ দিল। 

"আমি কোনো জল্পনা ছাপব না, সুব্রতদা। তবে সত্যটা পুলিশ যদি না বার করে তাহলে প্রেসকে বার করতেই হবে। আর জাস্টিস না পেলে সোমা সামন্তও থেমে থাকবেন না।"

গাড়ির লকটা ‘ক্লিক’ করে খুলে গেল। অর্জুন গাড়ি থেকে নেমে দরজাটা বন্ধ করে দেওয়ার আগে সুব্রতবাবুর দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল, 

"শুভ বড়দিন, সুব্রতদা।"

সুব্রতবাবু আলতো মাথা নাড়লেন, 

"শুভ বড়দিন। খবর ধাওয়া করা কমিয়ে নিজের স্বাস্থ্যের দিকে একটু নজর দাও।"

ব্ল্যাক গ্লাসে ঢাকা নীল টাটা সাফারিটা ডিসি সাউথের অফিসের দিকে চলে গেল।

পার্ক স্ট্রিটের ফুটপাতে দাঁড়িয়ে অর্জুন হালকা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। 

এখান থেকে হাঁটা পথে ওর অফিস কম করে দেড় কিলোমিটার।
[+] 6 users Like RockyKabir's post
Like Reply
অর্জুন ফুটপাতে দাঁড়িয়ে দু-সেকেন্ড চিন্তা করল। তারপর পকেট থেকে নিজের ফোনটা বের করল।

ফোনটা তিনবার রিং হওয়ার পর ওপাশ থেকে হালকা শোরগোল আর হিন্দি গানের আওয়াজ ভেসে এল।

"হ্যালো লাহিড়ীদা! হ্যাপি ক্রিসমাস!"

উল্টোদিকের লোকটির গলায় বাংলা আর হিন্দির অদ্ভুত মিশ্রণ।

“হ্যাঁ প্যারাডিক, তোমাকেও।” অর্জুন ফুটপাতের একপাশে চেপে দাঁড়িয়ে বলল।

'প্যারাডিক' পূর্ব কলকাতার একজন পুরানো ইনফর্মার। পুলিশ আর অপরাধী, দুটো জগতেরই খবর তার নখদর্পণে। 

“বলো, হঠাৎ ফোন ? কোন বড় শিকার মিলল নাকি?”

“প্যারাডিক, আমার হাতে একদম সময় নেই।” 

অর্জুন নিচু স্বরে কিন্তু কড়া গলায় বলল। 

“একুশে ডিসেম্বর, বৃহস্পতিবারের কথা মনে করো। সন্ধে সাড়ে সাতটা থেকে আটটার মধ্যে বাইপাসে রুবি আর পরমার মাঝের র‍্যাম্পে যে স্কোডা এক্সিডেন্টটা হয়েছিল...... পোর্টের শিশির রায় আর তার ওয়াইফের।”

ওপাশে হঠাৎ নীরবতা নেমে এল। বাজনার শব্দটা যেন এক নিমেষে দূরে চলে গেল। প্যারাডিক বোধহয় একটু আড়ালে গেল।

“ওই কেসটা তো পুলিশ ক্লোজ করে দিয়েছে। ড্রাইভিং লিকেজ, মদ খেয়ে গাড়ি চালানো। প্রাইভেট কারের ওপর ট্রাকের চাপ নেই।”

“আমি জানি পুলিশ কী রিপোর্ট দিয়েছে।” 

অর্জুন বিরক্ত হয়ে বলল। 

“তুমি আমাকে বলো, স্পটে কী ছিল? ওটা তো তোমার এরিয়ার মধ্যেই পড়ে। বাইপাসের ওই ক্রসিংটায় কলকাতা পুলিশের অনেকগুলো হাই-রেজোলিউশন ক্যামেরা আছে। ঐদিন সবকটা মেনটেন্যান্সের জন্য বন্ধ ছিল।”

"লাহিড়ীদা...ফোনে এসব কথা নয়। তবে একটা কথা বলে রাখি। অ্যাক্সিডেন্ট হওয়ার আগে দশ মিনিট ধরে একটা সিলভার রঙের টয়োটা ফরচুনার, স্কোডাটাকে ফলো করছিল। ইস্ট ট্রাফিক গার্ডের একজন এএসআই নিজের চোখে দেখেছে, কিন্তু তার মুখ সেলোটেপ দিয়ে আঁটা।

“ঐ গাড়ির নাম্বারটা জোগাড় করতে পারবে ?”

“মাফ করো লাহিড়ীদা, আমি নিজের প্রাণ হাতে নিয়ে ঘুরি না।" 

প্যারাডিক সোজা বলে দিল।

“তবে ওই রাতে বাইপাসের ক্রসিংয়ে ডিউটিতে যে সার্জেন্ট ছিল, দেবাশীষবাবু, সে এখন ইএম বাইপাসের ওই একই বিটে ডিউটিতে আছে। ওনাকে গিয়ে ধরো। তবে আমার নাম নিও না। আর হ্যাঁ, আমার ক্রিসমাসের বকশিস কিন্তু পাওনা রইল।”

“পেয়ে যাবে। রাখছি।” 

অর্জুন ফোন কেটে দিল।

সে রাস্তার ধারে একটা চায়ের দোকানের সামনে এসে দাঁড়াল। হাতটা একটু কাঁপছে। না, ভয়ে নয়, রক্ত গরম করা উত্তেজনায়। 

সুব্রত চক্রবর্তী যা ইঙ্গিত দিয়েছেন, তার চেয়ে ঘটনা অনেক বেশি গভীর। 

অর্জুন দ্বিতীয় ডায়ালটা করল স্টেটসম্যানের পলিটিক্যাল বিটের জুনিয়র রিপোর্টার, দেবোত্তমকে। 

ছেলেটা নতুন এসেছে, কিন্তু পলিটিক্যাল লিডার আর আমলাদের হাঁড়ির খবর জোগাড় করায় তার জুড়ি মেলা ভার।

দেব ফোন তুলল দ্বিতীয় রিংয়েই। 

“হ্যাঁ অর্জুনদা! প্রেস কনফারেন্স শেষ? সামন্ত কেসে তো কিছু মিলল না শুনলাম, পোস্টমর্টেম তো হার্ট অ্যাটাক বলে দিয়েছে!”

“সামন্ত কেস ছাড় দেব।"

অর্জুন সোজা কাজের কথায় এল। 

“তোকে আমি একটা ডেডলাইন দিচ্ছি। কাল সকাল আটটার মধ্যে আমাকে দুটো ভাইটাল ইনফরমেশন এনে দিতে হবে। পারবি?”

দেবোত্তম একটু থমকাল। 

“কাল সকাল আটটা? অর্জুনদা, আজ পঁচিশে ডিসেম্বর! কাল হাফ স্টাফ লিভে থাকবে সবাই। আচ্ছা। কী লাগবে বলো তো?”

“প্রথমত, পোর্ট ট্রাস্টের চেয়ারম্যান শিশির রায়ের পার্সোনাল অ্যান্ড অফিশিয়াল ফোন নম্বরের গত এক সপ্তাহের সিডিআর (কল ডিটেইল রেকর্ড)। আই নো এটা ইল্লিগাল, কিন্তু তোর টেলিকম বিটের ইনফর্মারকে ব্যবহার কর। টাকা যা লাগবে আমি পার্সোনাল ট্রাভেল অ্যালাউয়েন্স থেকে দেব। আর দ্বিতীয়ত...” 

“শিশির রায় আর ওনার স্ত্রী অমৃতা রায়ের ব্যাংকের পার্সোনাল অ্যাকাউন্ট থেকে গত ছয় মাসে কোনো প্রাইভেট শিপিং কোম্পানির অ্যাকাউন্টে টাকা লেনদেন হয়েছে কি না? অথবা কোনো শিপিং কোম্পানি ওনার অ্যাকাউন্টে কোনো মোটা অ্যামাউন্ট ট্রান্সফার করেছে কি না?”

দেবোত্তম ওপাশে কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, 

“অর্জুনদা, শিশির রায় তো ভেন্টিলেশনে। ওই কেসটা তো ট্রাফিক এক্সিডেন্ট...”

“ট্রাফিক এক্সিডেন্ট কি না, সেটা কাল সকালের মধ্যে তুই আর আমি ঠিক করব।” 

অর্জুন শক্ত গলায় বলল। 

“আমার সিডিআর-এর টপ ফাইভ ফ্রিকোয়েন্ট নম্বর চাই। বিশেষ করে একুশে ডিসেম্বর বিকেল চারটে থেকে রাত আটটার মধ্যে কার কার সঙ্গে শিশির রায়ের কথা হয়েছিল। পারবি?”

“চেষ্টা করছি অর্জুনদা। সিডিআরের লোকটাকে ধরতে পারলে আজ রাতের মধ্যেই পেয়ে যাব। তবে রিস্ক আছে।”

“রিস্ক না নেবার মতো খবর হলে সেটা স্টেটসম্যানের প্রথম পাতায় ছাপা হয় না দেবোত্তম।” অর্জুন বলল। 

“আই অ্যাম ওয়েটিং ফর ইউর কল।”

অর্জুন ফোনটা পকেটে রেখে চায়ের ভাঁড়টা মাটির ভাঁড় ফেলার ঝুড়িতে ছুঁড়ে মারল।

শীতের সকালের কলকাতা এখন বেশ ঝলমলে। পার্ক স্ট্রিটের মুখে ক্রিসমাসের পার্ক আলোয় সাজানো হচ্ছে, সাধারণ মানুষ পরিবার নিয়ে ভিক্টোরিয়া আর আলিপুর চিড়িয়াখানার দিকে ছুটছে। চারদিকে আনন্দের পরিবেশ। কিন্তু, ওর কাছে রক্তাভ মনে হতে লাগল। 

ও ঘড়ির দিকে তাকাল, বেলা পৌনে বারোটা বাজে। সে বাইপাসের দিকে যাওয়ার জন্য একটা হলুদ ট্যাক্সিকে হাত দেখিয়ে থামাল। 

তদন্ত সবে মাত্র শুরু হয়েছে আর অর্জুন লাহিড়ী ভালো করেই জানে, যে খবরের ভেতরে রক্তের গন্ধ থাকে, সে খবর বেশিদিন চাপা রাখা যায় না।
[+] 6 users Like RockyKabir's post
Like Reply




Users browsing this thread: 4 Guest(s)