Thread Rating:
  • 4 Vote(s) - 3 Average
  • 1
  • 2
  • 3
  • 4
  • 5
গুপ্তসোনা
#1
গুপ্তসোনা
Like
Do not mention / post any under age /rape content. If found Please use REPORT button.
#2
শ্রাবণের আকাশটা সকাল থেকেই যেন ভারী কোনো বিষাদে মুখ কালো করে আছে। মেঘের গুরুগুরু ডাক আর মেঘনা-পদ্মার মোহনার দিক থেকে আসা সোঁদা বাতাসের ঝাপটা জানান দিচ্ছে—আজও ধুমধাপাড় বৃষ্টি নামবে। বর্ষাকালটা এলেই এই গাঁয়ের রূপ বদলে যায়। মাঠ-ঘাট থইথই জলে ডোবে, আর কৃষাণদের হাতের লাঙল জোয়াল এককোণে জিরোতে বসে।

আমাদের আসিফ মিঞার অবস্থাও তাই। বছরজুড়ে গাঁয়ের গৃহস্থদের জমিতে জোয়াল কাঁধে নিয়ে, হালের বলদ ছুটিয়ে যে মানুষটার দিন কাটে, বর্ষা নামলেই তার সেই চেনা রুটিন থমকে যায়। মাঠের কাজ বলতে তখন আর কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। তবে আসিফের কপাল ভালো, হাত গুটিয়ে বসে থাকার পাত্র সে নয়। এই দুই-তিন মাস সে পদ্মা নদীর বুকে জাল ফেলে ভাগ্য গোছায়। ভরা বর্ষায় পদ্মার রুপোলি ইলিশের যে টান, তাতে দু-পয়সা ভালোই উপার্জন হয়। ঘরে আবার যেমন-তেমন সংসার না, দু-দুটো বউ! ছেলেমেয়েদের হাঁ করা মুখ। তাই বর্ষা এলে আসিফের ঘরে বসে থাকার জো নেই। তর সয় না তার, গাঙের ডাক এলেই ডিঙি নৌকাখানা নিয়ে বেরিয়ে পড়ে।

তবে আসিফ এই গাঙের বুকে একা ভাসে না। ওপার গাঁয়ের রতন আছে তার সাথে। রতনের বয়সটা ওই চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশের কোঠায়, চামড়া তামাটে হয়ে গেছে রোদে পুড়ে আর নোনা জলে ভিজে। আসিফ শুধু বর্ষায় গাঙে নামে, কিন্তু রতন হলো খাঁটি জাইল্যা মানুষ—সারা বছরই তার জীবন কাটে ওই জলের ওপর। রতনের ঘর বলতে এক বউ আর এক ছেলে। বউ মালতী তার চেয়ে বছর তিনেকের ছোট হবে, এখনো শরীরে সেই গ্রামীণ বাঁধুনি আর মায়া লেগে আছে। আর রতনের বুক ফোলানো গর্ব হলো তার ছেলেটা, গাঁয়ের গণ্ডি পেরিয়ে শহরে গেছে কলেজে পড়তে। সেই ছেলের পড়াশোনার খরচ আর সংসারের চাকা ঘোরাতেই রতনের দিন-রাত এক করা খাটুনি।

নিয়ম করে প্রতিদিন দুপুর গড়াতেই দুজনে নিজ নিজ ঘাট থেকে নৌকা ছাড়ে। মাঝনদীতে এসে যখন দুজনের ডিঙি পাশাপাশি জোড়া লাগে, তখন যেন দুজনের প্রাণ ফেরে। সেখান থেকে গল্পগাছা করতে করতে তারা এগিয়ে যায় মোহনার দিকে, যেখানে ইলিশের ঝাঁক এসে খেলা করে। দুপুর রোদে জাল ফেলে শুরু হয় অপেক্ষা। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামে, কালো রাত নেমে আসে পদ্মার বুকে। কুপি বা লণ্ঠনের আলোয় রূপোলি ইলিশের ছটফটানি দেখতে দেখতে রাত পার হয়। ভোরের আলো ফোটার আগেই সেই টাটকা মাছ নিয়ে তারা চলে যায় আড়তে। বিক্রিবাট্টা শেষ করে যখন ঘরে ফেরে, তখন সকাল গড়িয়ে দুপুর। দুটো খেয়ে না-খেয়ে আবার পরের দুপুরের দৌড়। এই তো জীবন!

আজকেও তার ব্যতিক্রম হলো না। ঘরের ভেতর দুই বউয়ের টুকটাক খটখটানি আর ছেলেমেয়েদের শোরগোলের মাঝেই আসিফ তাড়াহুড়ো করে রান্নাঘরে ঢুকল। সময় নেই, ওদিকে রতন আবার ওপার থেকে ফোনে তাগাদা দিচ্ছে। থালায় রাখা দুটো মুড়ি আর কাল রাতের বেঁচে যাওয়া আলুভাতে—কোনোরকমে মুখে গুঁজে, এক ঘটি জল খেয়েই সে দিল ছুট।

ঘাটে এসে ডিঙি নৌকার বাঁধনটা খুলতেই রতনের ফোনটা আবার বেজে উঠল স্ক্রিনে। ওপাশ থেকে রতনের চেনা কর্কশ অথচ আপন কণ্ঠ ভেসে এল, "কী রে আসিফ, কই তুই? আমি তো গাঙে নাইমা পড়লাম। মেঘের ডাক ভালো ঠেকতাছে না, তাড়াতাড়ি আয়!" আসিফ মোবাইলটা লুঙ্গির খোঁচে গুঁজে নৌকার বৈঠায় হাত দিল। পদ্মার জল তখন ছলাৎ ছলাৎ শব্দে তাকে ডাকছে, আর ওপারে মেঘের আড়ালে লুকিয়ে থাকা মোহনা তাদের আজকের রুজিরুটির হিসাব মেলাতে অপেক্ষা করছে।


গাঙের বুক চিরে দুটো ডিঙি নৌকা তখন তীরের বেগে ছুটে চলেছে মোহনার দিকে। রতন আর আসিফ—কারো মুখে কথা নেই, দুজনের চোখই আটকে আছে সামনের উত্তাল জলরাশির ওপর। রতন তো সারাবোচরই গাঙে বৈঠা বায়ায়, তার হাতের কবজি জলের সমীকরণ ভালোই চেনে। কিন্তু আসিফের শরীরটা তো আর পাঁচটা সাধারণ মানুষের মতো নয়, চৈত্র মাসের খটখটে রোদে শক্ত মাটিতে যে মানুষ দিনরাত লাঙল চেপে ধরে, তার হাতের জোর আর গায়ের তাগদ আলাদা। লোহার মতো শক্ত সেই বাহুর টানে আসিফের ডিঙিটাই বরাবর জলের বুক চিরে আগে বেরিয়ে যায়। আজও তার ব্যতিক্রম হলো না; রতনকে পেছনে ফেলে আসিফই সগৌরবে আগে গিয়ে পৌঁছাল মোহনার মোহনীয় বাঁকে।

সেখানে পৌঁছাতেই আর এক মুহূর্তও সময় নষ্ট করল না দুজনে। মেঘ জমতে থাকা আকাশের দিকে তাকিয়ে তড়িঘড়ি করে জাল ফেলে দিল গাঙের পেটে। অন্ধকার নামার আগেই কাজটা সেরে ফেলা দরকার। দেখতে দেখতে নদীর ওপর বিকেলের আলো ম্লান হয়ে এলো, সাঁঝের অন্ধকার আলতো করে চাদর বিছিয়ে দিল পদ্মার বুকে।

কাজ শেষ হতেই রতন তার চটের থলে থেকে চাল বের করে নদীর জলেই ধুয়ে হাঁড়িতে চাপিয়ে দিল। ডিঙির এক কোণে থাকা মাটির উনুনে শুকনো কাঠের টুকরোয় আগুন জ্বলতেই চারপাশটা একটু আলো হয়ে উঠল। রতনের বউ মালতী আজ বড় যত্ন করে বাড়ি থেকে পুঁই শাকের তরকারি রেঁধে দিয়েছিল, সাথে চালের পুটলি। সেই তরকারির সুবাস যেন নদীর নোনা বাতাসে মিশে এক অদ্ভুত মায়া তৈরি করল।

চাল ফুটতে মিনিট বিশ-ত্রিশেক লাগবে। উনুনের আঁচ বাড়িয়ে দিয়ে রতন যখন হাঁড়ির দিকে তাকিয়ে আছে, আসিফ তখন নৌকার গলুইয়ে বসে আয়েশ করে একটা বিড়ি ধরাল। নদীর ঠাণ্ডা হাওয়া এসে মুখে লাগতেই শরীরের সব ক্লান্তি যেন জুড়িয়ে যায়। তবে আসিফের আসল আকর্ষণ অন্য জায়গায়। সে আজ চুপিচুপি দুটো 'পাইপ' (দেশি চোলাই মদ) সঙ্গে এনেছে। রাতে খাওয়া-দাওয়া শেষ হলে দুজনে মিলে নদীর বুকে বসে আরাম করে চুমুক দেবে—এই আনন্দেই সে মনে মনে বিভোর হয়ে ছিল।

ঠিক এই মনোরম মুহূর্তেই আসিফের লুঙ্গির খোঁচে থাকা মোবাইলটা আচমকা কেঁপে উঠল। স্ক্রিনের আলোয় একটা অচেনা নম্বর জ্বলজ্বল করছে। আসিফ একবার আড়চোখে রতনের দিকে তাকাল। দেখল রতন আপনমনে কাঠের টুকরো ঠেলছে উনুনে, এদিকে খেয়াল নেই। আসিফ আলতো করে বোতাম টিপে ফোনটা কানের কাছে নিল।

ওপাশ থেকে একটা নারীকণ্ঠ ভেসে এলো, খুব ফিসফিসে গলা, যেন চারপাশের বাতাসকেও সে বিশ্বাস করতে পারছে না। আওয়াজটা ঠিক পরিষ্কার বোঝা গেল না, শুধু একটা আকুলতা টের পাওয়া গেল। আসিফ নিজের গলার আওয়াজ একদম খাদে নামিয়ে, ফিসফিসিয়ে উত্তর দিল, "ঘাটে নাকি? দাঁড়াও, পাঁচ মিনিট, আসতেছি।"

ফোনটা কেটেই আসিফ চটজলদি উঠে দাঁড়াল। রতনের দিকে তাকিয়ে একটু আমতা আমতা করে বলল, "দোস্ত, আমি একটু আসতেছি রে। তুই রান্না শেষ করে আমারে একটা কল দিস।"

রতন হাঁড়ি থেকে মুখ তুলে অবাক হয়ে তাকাল, "কই যাস এই বেলা? রান্না তো প্রায় হয়েই আইলো!"

আসিফ আর তর সইতে পারছিল না, সে নৌকার বাঁধন আলগা করতে করতে বলল, "আরে আসতাছি রে! তুই দুটো মাছ তুলে একটু ভেজে রাখ, পাইট সাথে জমিয়ে খাওয়া যাবে।"

বলেই রতনের আর কোনো কথার অপেক্ষা না করে, আসিফ নিজের ডিঙিটা খুলে দাঁড় হাতে নিল। জোরসে দাঁড়ের ঘা দিয়ে নদীর জল কেটে তার নৌকা নিমেষেই অন্ধকারের দিকে ছুটে চলল। ওদিকে রতন উনুনের আলোয় একা বসে রইল, আসিফের এই আচমকা চলে যাওয়ার রহস্যটা তার মাথায় কিছুতেই খেলল না।



পদ্মার বুকে অন্ধকার তখন আরও জমাট বেঁধেছে। উনুনের আগুনের লালচে আভা রতনের চিন্তিত মুখে এসে পড়ছে। আসিফের এই আচমকা হাওয়া হয়ে যাওয়া রতনের জন্য একেবারেই নতুন কিছু নয়। এর আগেও বেশ কয়েকবার এমন অদ্ভুত কাণ্ড ঘটিয়েছে আসিফ। গাঙে জাল পাতার পর মাঝেমধ্যেই কার যেন ফোন আসে, আর আসিফ অমনি জরুরি কাজের বাহানা দিয়ে ডিঙি ছুটিয়ে অন্ধকারের দিকে মিলিয়ে যায়।

মাটির উনুনে ভাত ততক্ষণে ফুটে গেছে। রতন হাড়িটা নামিয়ে ফ্যান গালল। এরপর টাটকা ইলিশ মাছ দুটো বঁটি দিয়ে কেটে ভালো করে ধুয়ে হলুদ-নুন মাখিয়ে এককোণে রেখে দিল। এখনই ভাজলে মাছ দুটো ঠাণ্ডা হয়ে কাঠ হয়ে যাবে। তার চেয়ে আসিফ ফিরুক, কড়া উনুনের তাপে গরম গরম ভাজলেই  ভালো।

দেখতে দেখতে আধ ঘণ্টার ওপর কেটে গেল। চারপাশটা কেমন যেন থমথমে। নদীর ওপর নিশুত রাতের স্তব্ধতা নেমে এসেছে। রতন আর ধৈর্য ধরে রাখতে না পেরে তার ভাঙা মোবাইলটা পকেট থেকে বের করল। আসিফের নম্বরে ডায়াল করতেই ওপাশে বেশ কয়েকবার রিং হলো। অনেকক্ষণ বাজার পর ওপাশ থেকে ফোনটা রিসিভ হলো।

আসিফ বেশ চাপাগলায় বলল, "বল ভাই..."

রতন একটু বিরক্ত হয়েই বলল, "কী রে, কখন গেছিস! আর কতক্ষণ? "

রতনের কথা শেষ হওয়ার আগেই ফোনের ওপার থেকে এক নারীর ভারী হাঁপানির আওয়াজ আর ফিসফিসে অসন্তুষ্ট কণ্ঠ ভেসে এলো। স্পষ্ট বোঝা গেল, নারীটি বিরক্ত হয়ে বলছে—"এখন কি ফোনটা না তুললেই নয়?!"

কথাটা কানে আসতেই আসিফ ওপাশে যেন বিষম খেল। তড়িঘড়ি করে রতনকে বলল, "ভাই, তুই ফোনটা রাখ, আমি ১০-১৫ মিনিটের মধ্যে আইতাছি!" বলেই খট করে লাইনটা কেটে দিল।

ফোনটা কেটে যাওয়ার পর রতন হাতের মোবাইলটার দিকে তাকিয়ে স্তব্ধ হয়ে বসে রইল। সে পরিষ্কার বুঝতে পারল ওপাশে কী ঘটছে। কিন্তু মাথায় একটা বড় খটকা লাগল—কে এই মহিলা? আসিফের ঘরে দু-দুটো বউ আছে, তাদের গলার আওয়াজ রতনের খুব চেনা। কিন্তু এই কণ্ঠস্বর তো তাদের কারো সাথে মিলছে না!  ভাবতে ভাবতে রতনের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ল, কিন্তু কোনো কূলকিনারা পেল না সে।

মিনিট দশেক পার হয়ে যাওয়ার পরও যখন আসিফের ডিঙির কোনো সাড়াশব্দ মিলল না, তখন রতনের মনে আর তর সইল না। একটা চাপা কৌতুহল আর আশঙ্কা তাকে গ্রাস করল। সে নিজের ডিঙির বাঁধনটা আলগা করে দাঁড় হাতে তুলে নিল। আসিফ যখন ঘাট ছেড়েছিল, তখন সে লক্ষ্য করেছিল নৌকাটা পুব ঘাটের বনের দিকে এগিয়েছিল। রতনও সেই নিশানা ধরে অন্ধকারে নিজের নৌকা বাইতে শুরু করল।

নদীর বুক চিরে মিনিট দু-তিনেক এগোতেই, অন্ধকারের মাঝে হাত তিনেক দূরে একটা অবয়ব আবছা চোখে পড়ল রতনের। হ্যাঁ, ওটাই আসিফের ডিঙি, পুব ঘাটের একটা হিজল গাছের গুঁড়ির সাথে বাঁধা। রতন আর কোনো শব্দ না করে নিজের নৌকার গতি ধীর করল এবং খুব সাবধানে সেদিকে এগোতে লাগল।

ঠিক তখনই আসিফের নৌকার ছইয়ের ভেতর থেকে এক নারী হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে এলো। চারপাশ ঘুটঘুটে অন্ধকার হলেও নারীটির বাঁ হাতে একটা মৃদু আলো ছড়ানো হারিকেন দুলছিল। সেই আলোর কাঁপাকাঁপিতে রতন যা দেখল, তাতে তার চোখ কপালে উঠল। মহিলাটির মাথার চুল আলুথালু, শাড়ির আঁচলটা কোনো রকমে গায়ের সাথে এলমেলো হয়ে জড়িয়ে আছে। নৌকা থেকে নামার সময় সে নিজের বুকের ব্লাউজের হুক আর কোঁচকানো কাপড়টা তাড়াহুড়ো করে ঠিক করে নিচ্ছিল। ঘাট ছুঁতেই নারীটি আর এক মুহূর্ত দাঁড়াল না, হালকা পায়ে ডিঙি থেকে নেমে তীরের ঘন জঙ্গলের অন্ধকারের মধ্যে মিলিয়ে গেল।

মহিলাটি চোখের আড়াল হতেই ছইয়ের ভেতর থেকে মাথা নিচু করে বেরিয়ে এলো আসিফ। তার পরনের লুঙ্গিটা ঢিলে হয়ে নিচে নেমে এসেছিল, সে সেটা টেনেটুনে কোমরে শক্ত করে বাঁধল। এরপর নিজের পুরুষাঙ্গটা আলগা হাতে একবার কচলিয়ে নিয়ে, পকেট থেকে বিড়ি আর দেশলাই বের করল। একটা কাঠি জ্বালিয়ে বিড়িটা ধরাতেই দেশলাইয়ের ক্ষণস্থায়ী আলোয় আসিফের তৃপ্ত এবং ঘর্মাক্ত মুখটা রতনের চোখে ভেসে উঠল।

বিড়িতে একটা লম্বা টান দিয়ে আসিফ নৌকার দাঁড়টা হাতে তুলে নিল। গাছের গুঁড়ি থেকে দড়িটা খুলে সে এবার ফেরার জন্য ডিঙিটা বাঁয়ে ঘুরিয়ে জলের বুকে ছেড়ে দিল।

আসিফ যে এবার ফিরছে, তা বুঝতে পেরে সে নিজের ডিঙিটা খুব দ্রুত আর নিঃশব্দে ঘুরিয়ে নিল। আসিফ পৌঁছানোর আগেই রতন অন্ধকার নদী বেয়ে তড়িঘড়ি করে নিজের আগের জায়গায় ফিরে গিয়ে এমনভাবে বসল, যেন সে এতক্ষণ উনুনের পাড়েই বসে ছিল আর কিছুই জানে না।


আসিফ ঘাটে ডিঙি ভেড়াতেই রতন এমন ভাব করল যেন সে এতক্ষণ উনুনের পাড়েই বসে ছিল। ভাতের হাঁড়ির ঢাকনাটা আলগা করে কাঠের কাঠি দিয়ে নাড়তে নাড়তে রতন মুখ তুলে তাকাল। চোখেমুখে পুরো না জানার ভান।

আসিফ নৌকার গলুইয়ে পা রাখতেই রতন স্বাভাবিক গলায় প্রশ্ন করল, "কী রে, কোথায় ছিলি এতক্ষণ? কাজ হইলো তর?"

আসিফ তখনো একটু হাঁপাচ্ছিল, কপালে জমে থাকা ঘামটা লুঙ্গির খুঁটে মুছতে মুছতে সে বসল। রতনের প্রশ্নের জবাবে তার মুখে কোনো জড়তা দেখা গেল না। উল্টো বেশ সহজ আর চটপটে গলায় বলল, "হাঁ ভাই, কাম হইলো। তর রান্না হয়ে গেছে? খাইতে দে দেহি, পেটে একদম চিল্লাইতাছে, খুব ক্ষুধা লাগছে!"

রতনের বুকের ভেতর তখন হাজারটা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিল, কিন্তু সে আর কথা বাড়াল না। উনুন থেকে কড়াই নামিয়ে গরম গরম মাছ দুটো ভেজে নিল। তেল-মাছের কড়া সুবাসে রাতের অন্ধকার নদীটা যেন চনমন করে উঠল।

এরপর দুজনে মিলে নৌকার ছাইয়ের তলায় মুখোমুখি বসল। থালায় ধোঁয়া ওঠা গরম ভাত, সাথে মালতীর হাতের সেই পুঁই শাকের তরকারি। চারপাশের নিশুত রাতে শুধু শোনা যেতে লাগল দুজনের গোগ্রাসে ভাত খাওয়ার 'হস হস' শব্দ। ক্ষুধার পেটে গরম ভাতের গ্রাস মুখে তুলতেই আসিফের চোখ দুটো তৃপ্তিতে বুজে এলো।

মুখের লোকমাটা গিলে আসিফ তারিফ করে বলল, "ভাবীর হাতের পুঁই শাক... উফফ, সেই লাগছে বুঝলি রতন! "

রতন আসিফের মুখের দিকে তাকিয়ে চুপ করে রইল। একটা কথাও তার মুখ দিয়ে বের হলো না। সে শুধু দেখছিল, যে মানুষটা মাত্র কয়েক মিনিট আগে অন্য এক নারীর সাথে বনের অন্ধকারে সময় কাটিয়ে এলো, সে কত সহজে, কত গুছিয়ে মিথ্যা বলতে পারে! নিজের আপন বন্ধুর চোখে চোখ রেখে এতটুকু না কেঁপে কীভাবে এমন স্বাভাবিক অভিনয় করা যায়, তা ভেবে রতন কূল পাচ্ছিল না। মালতীর হাতের রান্নার প্রশংসা আসিফ মন থেকে করছে, নাকি নিজের পাপ ঢাকতে করছে—সেই ভাবনায় রতনের প্রতিটা ভাতের গ্রাস যেন গলায় আটকে যেতে লাগল। ওদিকে আসিফ তখন মনের সুখে তৃপ্তি করে খেয়ে চলেছে, যেন একটু আগের অন্ধকার রাতের ওই ঘটনাটা শুধুই একটা স্বপ্ন ছিল।
[+] 5 users Like tony321's post
Like
#3
খাওয়া-দাওয়া শেষ করে দুজনে যখন জুত হয়ে বসল, ততক্ষণে আকাশের চাদর ফুঁড়ে মেঘের দল কোন সুদূরে কেটে গেছে। মেঘমুক্ত আকাশে তখন ফুটফুটে পূর্ণিমার চাঁদ মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে। রুপোলি সেই চাঁদের আলো পদ্মার শান্ত জলের ওপর আছড়ে পড়ে চারদিকটা একদম আলোয় আলো করে দিল। ঝকঝকে জোছনার আলোয় নদীটাকে আর চেনা চেনা লাগে না, যেন এক মায়াবী রূপকথা।

আসিফ তার পকেট থেকে দুটো প্লাস্টিকের পাইপ বের করল। ছিপি খুলে রতনের দিকে একটা বাড়িয়ে দিয়ে নিজেরটা মুখে ঠেকাল। কড়া দেশি মদের কয়েক ঢোক গলা দিয়ে নামতেই দুজনেরই যেন কলজেটা ঠাণ্ডা হয়ে গেল, সারাদিনের ক্লান্তি ধুয়ে-মুছে এক অদ্ভুত অবশ করা আরামের নেশা তাদের পেয়ে বসল।

আসিফ আড়মোড়া ভেঙে বিড়িতে একটা লম্বা টান দিয়ে বলল, " খাওয়া শেষ কইরা এক্কেবারে বোবা হয়া গেলি যে? কথা নাই বার্তা নাই, ঘটনা কী তোর?"

রতন কোনো জবাব দিল না। সে নিজের পাইপটায় মুখ ঠেকিয়ে একনাগাড়ে আরও দুই ঢোক গিলল। কড়া চোলাইয়ের ঝাঁজ বুকে ধাক্কা দিতেই তার তামাটে ফর্সা গাল দুটো লাল হয়ে উঠল, চোখ দুটো জবা ফুলের মতো রাঙা দেখাল। মদের উত্তাপে রতনের শান্ত গলাটা এক নিমেষে কর্কশ আর ধারালো হয়ে উঠল।

সে আসিফের দিকে সোজা তাকিয়ে খনখনে গলায় বলল, "শালা বোকাচোদা! তুই যে আমারে এমনে খাঁটি মিছা কথাটা কইলি, ভাবলি আমি কিছুই বুঝি না? শেষমেষ আমার লগেও বাটপারি করলি?"

আসিফ একটু ভড়কে গেলেও সামলে নিয়ে হাসার চেষ্টা করল, "কী যা-তা বলতাছিস দোস্ত? তর কি একটু বেশি হয়া গেল নাকি? নেশায় উল্টাপাল্টা বকিস না।"

"নেশা আমার হয় নাই, হইছে তোর!" রতন হাতের পাইপটা নৌকার তক্তায় ঠুকে চেঁচিয়ে উঠল, "এই যে একটু আগে তুই ঘাট ছাইড়া একলা ডিঙি নিয়া ছুটলি, কার কাম সারতে গেছিলি তুই?"

আসিফ এবার একটু ইতস্তত করতে লাগল। শুকনো হাসির একটা প্রলেপ মুখে মেখে বলল, "আরে, কইলাম তো একটা দরকারি কাম ছিল। আমার বড় বউ আইছিল ঘাটে। আসার সময় ঘরে টাকা দিয়ে আসতে ভুইলা গেছিলাম, ওইডাই নিতে আইছিল।"

"বোকাচোদা! আবার মিছা কথা কস! আমি নিজের চোখে দেখছি রে আসিফ! তর নৌকার ছাওয়ার (ছই) ভিতর থেইকা কোন মাগী তড়িঘড়ি কইরা বাইর হইয়া জঙ্গলে পলাইল! চুল আলুথালু, ব্লাউজের হুক লাগাইতে লাগাইতে গেল! ক, আমি মিছা দেখছি? ক বোকাচোদা, এই মাঝরাতে কার রূপের রস খাইতে গেছিলি তুই?"

আসিফ বুঝতে পারল, অস্বীকার করে আর লাভ নেই। রতন শুধু অনুমান করেনি, একদম হাতেনাতে দেখে ফেলেছে। চারপাশের নিঝুম রাতে কেবল পদ্মার ঢেউয়ের ছলাৎ ছলাৎ শব্দ ছাড়া আর কোনো আওয়াজ নেই। আসিফ বিড়ির শেষ অংশটুকু নদীতে ফেলে দিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তার মুখের চোর চোর ভাবটা কেটে গিয়ে সেখানে এক ধরনের নির্লজ্জ হাসির রেখা ফুটে উঠল।

সে গলার স্বর নামিয়ে বলল, "আইচ্ছা, যখন দেখছিসই, তখন আর লুকাইয়া কী লাভ! কিছু মনে করিস না দোস্ত। আসলে গেরামের এক ঘরের বউ আইছিল। কে সে—সেটা জাইনা তোর কাম নাই। তবে এইটা বোঝ, নিজের শরীরের জ্বালা মেটাইতে আইছিল সে।"

রতন নাক কুঁচকে বলল, "তোর এই গাঁজাখুরি কথা কে বিশ্বাস করব রে? কোন ভদ্র ঘরের বউ এই মাঝরাতে গাঙের ঘাটে আইসা পরপুরুষের নৌকায় ঢুকে? সত্যি কইরা বল, কোন বেশ্যারে টাকা দিয়া ডাকছিলি?"

আসিফ খিলখিল করে হেসে উঠল, "তুই আসলেই একটা আস্ত অবুঝ, রতন! আমি পয়সা দিয়া বেশ্যা —আমার কি এত পয়সা হইছে রে ভাই? দুই দুইটা বউয়ের ভরণপোষণ চালাতেই তো আমার জান শেষ!"

রতন : "তোর ঘরে দুই দুইটা ডাগর বউ থাকতে তুই পরের বউয়ের পেছনে লাইগা বেড়াস? তর শরম করে না?" 

আসিফ পাইপ থেকে আর এক ঢোক খেয়ে নিল। তারপর অবলীলায় বলতে লাগল, "আরে ধুর, তুই বুঝবি না। ওর মরদ থাকে বিদেশে। দুই বছর ধইরা দেশে ফেরে না। জোয়ান শরীর, কত আর ধইরা রাখবে? ওই নিজের জ্বালায় অস্থির হয়া আমারে ডাকে। আর তুই পয়সার কথা বলিস? ও উল্টা আমারে হাত খরচের টাকা দিয়া যায়! তো আমার এখানে সমস্যাটা কই বল? কিছু কিছু মাগী আছে বুঝলি, তাদের শরীরে ঠিকমতো টেপন না পড়লে  তারা ঠিক থাকে না।"

রতন একদম থমকে গেল। আসিফের ভেতরের এই নোংরা রূপটা সে আগে কখনো এভাবে দেখেনি। তার গলা শুকিয়ে এল, সে আর কোনো কথা না বলে রাগে-দুঃখে নিজের বোতল থেকে বড় এক ঢোক গিলল।

আসিফ রতনের দিকে চেয়ে এবার এক কুটিল হাসল। সে শরীরটা একটু এগিয়ে এনে বলল, "তুই কী ভাবিস রে রতন? আমার ঘরে দুই দুইটা বউ এমনি এমনি আমারে ভালোবাইসা পইড়া আছে? আমি দুইটারে ঠিকমতো ডলা দেই দেখেই তারা আমার লগে কামড়াকামড়ি করে থাকে। নইলে কবেই অন্য মরদের সাথে ভাগত! এই যে ভাবী... তোর বউ মালতী, তুই শেষ কবে ওরে আদর করছিস মনে আছে? বেশিদিন ওরে না ছুঁইলে দেখবি ও-ও অন্য কোথাও পিরিত জুতায়ে নিছে।"

কথাটা শোনামাত্র রতনের মাথায় যেন আগুন ধরে গেল। সে চেঁচিয়ে উঠল, "বোকাচোদা! মুখ সামলায়া কথা ক! মালতীর নামে একটা বাজে কথা কইলে তোরে আমি মাঝগাঙেই চুবায়া মারব!"

"চটতাছিস কেন দোস্ত? যেটা খাঁটি সত্য, হেইডাই কইলাম।" আসিফের চোখ দুটো নেশায় আর শয়তানিতে চকচক করছে। "তুই তোর বউরে সময় দিস না, আদর করিস না। একদিন পরখ কইরা দেখিস।"

রতনের মাথাটা কেমন যেন ফাঁকা হয়ে গেল। আসিফের কথায় রাগ হলেও, তার মনের কোন এক কোণে একটা কাঁটা খচখচ করে উঠল। সে আসলেই মনে করতে পারল না—শেষ কবে সে মালতীর শরীরে হাত দিয়েছিল। সংসার আর ছেলের পড়াশোনার টাকা জোগাতে জোগাতে সে নিজের বউয়ের খবর রাখতেই ভুলে গেছে।

আসিফ রতনের মুখের নীরবতা দেখে বুঝতে পারল মোক্ষম চালটা দেওয়ার সময় এখনই। সে তার মনের কুটিল ফন্দিটা এবার উগরে দিল, "তোর যদি নিজের বউয়ের ওপর এতই ভরসা থাকে, তবে যাচাই কইরা দেখিস না কেন?"

রতন লাল চোখে তাকাল, "কী বলতে চাস তুই?"

"আমি ঠিক কথাই বলতেছি। দেখবি তোর বউ আসলেই কত সতী আর কতখানি ভদ্র।" আসিফ চিবুকে হাত বুলাতে বুলাতে বলল, "এক কাজ কর। কালকে ভাবীরে নিয়া আমাদের এই ডিঙি নৌকায় আয়। সারাদিন আমাদের সাথেই থাকবে ও। আমি ওর লগে একটু মিষ্টি মিষ্টি কথা কইয়া পটানোর চেষ্টা করমু। ও যদি গইলা যায়, তবে জানবি তর বউয়ের মনেও মাগী স্বভাব আছে। আর যদি না গলে, তো বুঝবি তোর কপাল ভালো।"

রতন রাগে কাঁপতে কাঁপতে বলল, "আমার মালতী কোনোদিন এইসবে যাবে না! ও অমন মেয়েই না!"

"আরে ডরাস কেন?" আসিফ ফিসফিসিয়ে এক পৈশাচিক অভয় দিল, "নিয়া আইসাই দেখ না! আমি কথা দিতাছি, আমি ওরে জোর কইরা ছোঁব না। কিন্তু আমার কথা মিলায়া নিস, তোর বউ নিজেই গইলা আমারে জড়ায়ে ধরব।"

আসিফের এই কথাগুলো যেন রতনের কানের ভেতর গরম সীসার মতো ঢুকতে লাগল। তার মাথাটা ভোঁ ভোঁ করতে শুরু করল, চারপাশের চাঁদের আলো যেন হঠাৎ এক নিমেষে তার চোখে অন্ধকার হয়ে এলো। নিজের প্রিয়তমা বউ মালতীকে নিয়ে আসিফের মুখ থেকে এমন জঘন্য প্রস্তাব সে আর সহ্য করতে পারছিল না। তার গা গুলিয়ে উঠল, কান্না আর রাগ একসাথে দলা পাকিয়ে গলার কাছে চলে এলো।

সে আর একটা কথাও বলল না। নিজের পাইপে থাকা বাকিটুকু তরল এক ঢোঁকে গলায় ঢেলে দিয়ে, টালমাটাল পায়ে ডিঙির ছাওয়ার ভেতরে চলে গেল। কাঠের তক্তায় সশব্দে শুয়ে পড়ে সে চোখের ওপর হাত চাপা দিল। ওদিকে আসিফ একলা চাঁদের আলোয় বসে রতনের বিধ্বস্ত অবস্থা দেখে ঠোঁটের কোণে এক পৈশাচিক এবং কুটিল তৃপ্তির হাসি হাসল। পুরো পদ্মার বুক তখন এক থমথমে নীরবতায় ছেয়ে গেছে, যেন কালকের বড় কোনো ঝড়ের পূর্বাভাস দিচ্ছে।
[+] 8 users Like tony321's post
Like
#4
[Image: Chat-GPT-Image-Jul-14-2026-07-16-33-PM.png]
[+] 1 user Likes tony321's post
Like
#5
সুন্দর গল্প
Like
#6
update diyen
Like
#7
Darun
Like
#8
[Image: Chat-GPT-Image-Jul-14-2026-07-14-02-PM.png]
Like
#9
Ki je koren
Like




Users browsing this thread: 1 Guest(s)