28-06-2026, 09:17 PM
(This post was last modified: 02-07-2026, 01:37 AM by RockyKabir. Edited 2 times in total. Edited 2 times in total.)
আরো কদিন পরে।
মাঝে সাতটা দিন কেটে গেছে।
অয়নের শরীরের কালশিটে দাগগুলো ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে হলদেটে আকার নিয়েছে। ফাটা ঠোঁট শুকিয়ে গেছে, তবে জোরে কথা বলতে গেলে এখনও সামান্য ব্যথা করে। পেইনকিলার আর অ্যান্টি-বায়োটিকের দৌলতে পাঁজরের ব্যথাটাও এখন আগের চেয়ে অনেক কম। ফাইট ক্লাবের সেই রাতের পর থেকে সেই রাগটা এখন আর ওকে পাগল, অস্থির করে তোলে না।
এই সাতটা দিন অয়ন মাঠমুখো হয়নি। কোচ সেনগুপ্তকে সে মেসেজ করে ডক্টরের নির্দেশের কথা জানিয়ে দিয়েছিল। ফুটবল মাঠের পাশাপাশি বালিগঞ্জের সেই মার্শাল আর্টস অ্যাকাডেমি, অর্থাৎ দোজো-তেও সে গত এক সপ্তাহ ধরে সম্পূর্ণ অনুপস্থিত ছিল। কোচ সেনগুপ্ত তাকে মেসেজ করে আশ্বস্ত করেছিলেন, যে তিনি নিজেই মিস্টার প্রধানকে অয়নের চোট পাওয়ার ব্যাপারটা ইনফর্ম করে দেবেন, অয়নকে আর আলাদা করে কিছু জানাতে হবে না।
তাই অয়ন নিজে থেকে আর মিস্টার প্রধানকে কিছু জানানোর চেষ্টা করেনি। প্রথমত, তাঁর ফোন নম্বর ওর কাছে নেই। দ্বিতীয়ত, লোকটার চোখের দিকে তাকালে একটা অজানা অস্বস্তি ওকে কুরে কুরে খায়।
অয়নের মনে হয় মিস্টার প্রধান যেন ইচ্ছা করলেই ওর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি দিয়ে ওর অন্তরের সমস্ত অনুভূতি এক লহমায় পড়ে ফেলতে পারেন। তিনি চাইলেই ওর মনের অন্ধকারে লুকিয়ে থাকা সমস্ত চিন্তা-ভাবনা, ভয়, দুঃখ, প্রতিশোধের ইচ্ছা এমনকী তাঁর সম্পর্কে অয়ন কী ভাবে সেটাও দেখে নিতে পারেন।
এটা অয়নের কাছে চরম অস্বস্তির। তাই, দোজোয় যেতে না পারায় অয়নের মনে কোন আফশোস ছিল না।
আজ অয়ন স্পোর্টস ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে অত্যন্ত নিশ্চিত মনেই দোজো-র দিকে রওনা দিল।সাতদিন পর আজ সে আবার দোজোতে যাচ্ছে। তবে সে জানে মিস্টার সেনগুপ্ত যা বলার বলে দিয়েছেন। ওকে দোজোতে গিয়ে কোনরকম জবাবদিহি করতে হবে না।
বালিগঞ্জের পরিচিত নির্জন গলিটায় অয়ন যখন এসে পৌঁছোল, ততক্ষণে অন্ধকার নেমে গেছে। ডিসেম্বরের বাতাসে ঠাণ্ডা ভাব।
ভারী লোহার গেটটা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই দোজোর চেনা নিঃশব্দ পরিবেশটা আবার অয়নের সত্ত্বাকে গ্রাস করল। বাতাসে ধূপের একটা শান্ত অথচ কড়া গন্ধ। ম্যাটের ওপর খালি পায়ে প্র্যাকটিস করা ছাত্রদের মৃদু শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ।
অয়ন নিজের স্পোর্টস ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে ম্যাটের বাইরে জুতো খুলল। সে নিশ্চিত মনেই ভেতরে ঢুকেছিল। সে মানসিকভাবে আজ 'কিবা দাচি' (হর্স স্ট্যান্স) বা মেডিটেশন করার জন্য নিজেকে তৈরি করেই এসেছিল।
কিন্তু ভেতরে ঢুকে ম্যাটের ওপর অন্য স্টুডেন্টদের প্র্যাকটিস করতে দেখলেও সে মিস্টার প্রধানকে দেখতে পেল না। অয়নের আজকে দোজোর পরিবেশটা একটু থমথমে মনে হল।
অয়ন জুতো খুলে ম্যাটের দিকে এগোতে যাবে, ঠিক সেই সময় একজন জুনিয়র ইনস্ট্রাক্টর তার পথ আটকাল।
"অয়ন চ্যাটার্জী?"
"হ্যাঁ।"
"মিস্টার প্রধান আপনাকে ওনার অফিসঘরে ডাকছেন।"
অয়ন এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল।
অফিসঘর?
মিস্টার প্রধান হঠাৎ করে তাকে আলাদা ভাবে ভেতরে ডাকছেন কেন ? তিনি তো সাধারণত এই হলঘরে ম্যাটের ওপর বসে সবার সাথে কথা বলেন।
অয়নের বুকের ভেতরটা হঠাৎ করে একটা অজানা আশঙ্কায় ধক করে উঠল, কিন্তু সে নিজের মুখটা ভাবলেশহীন রাখল।
"কোথায় ওনার অফিস?" সে নিস্পৃহ গলায় জিজ্ঞেস করল।
জুনিয়র ইনস্ট্রাক্টর তাকে হলঘরের পেছনে একটা দরজা দিয়ে বার করল। একটা সরু, অন্ধকার প্যাসেজ; প্যাসেজের একদম শেষে একটা ভারী সেগুন কাঠের দরজা। দরজাটা অর্ধেক ভেজানো।
দরজাটা ঠেলে ঘরের ভেতরে ঢুকে অয়ন চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে নিল।
মিস্টার প্রধানের অফিসঘরটা কোনো সাধারণ স্পোর্টস কোচের অফিসঘরের মতো নয়। আকারে খুব একটা বড় না হলেও, এর ভেতরে পা রাখলেই একটা অদ্ভুত ভারিক্কি ভাব চোখে পড়ে। এখানকার পরিবেশ আরো থমথমে। ঘরের বাতাসে পুরোনো কাগজের গন্ধ। ঘরের জানলাগুলো বন্ধ, তার ওপর ভারী মেরুন রঙের পর্দা টানা।
ঘরের ঠিক মাঝখানে একটা বিশাল, সেকেলে মেহগনি কাঠের ডেস্ক। ডেস্কের ওপর একটা পুরনো পিতলের ল্যাম্প, যার হলুদ আলো ডেস্কের একটা অংশকে আলোকিত করে রেখেছে। ডেস্কের একপাশে একটা ব্রোঞ্জের বুদ্ধমূর্তি আর অন্য পাশে সারি সারি সাজানো কয়েকটা ডায়েরি। ডেস্কের ওপাশে একটা লেদার-কভার করা চেয়ারে বসে আছেন মিস্টার প্রধান। তার সামনে একটা ছোট্ট টি-পটে গরম চা রাখা; সেখান থেকে হালকা ধোঁয়া উঠছে।
উপরে সিলিং থেকে একটা পুরোনো আমলের ফ্যান ঘুরছে, যার একটানা ক্যাঁচক্যাঁচ আওয়াজ ঘরের নিস্তব্ধতাকে আরও প্রকট করে তুলছে। ঘরের দেওয়ালগুলো কাঠের প্যানেল করা, যেখানে কাঁচের ফ্রেমে বাঁধানো বেশ কিছু পুরোনো, সাদাকালো ছবি আর অজস্র মেডেল ঝোলানো।
দেওয়ালের একটা দিকে কাঠের ফ্রেমে বাঁধানো আসল জাপানি কাতানা (তলোয়ার)। ছবিগুলোর দিকে তাকালে মিস্টার প্রধানকে চিনে নিতে অসুবিধে হয় না। এগুলো তার যৌবনের ছবি।
কিন্তু অয়ন ঘরে ঢোকার পরে তার চোখ মিস্টার প্রধানের দিকে গেল না। তার দৃষ্টি আটকে গেল ঘরের এক কোণে, অন্ধকারের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা একটা ছায়ামূর্তির দিকে।
রৌণক।
রৌণক দেয়ালের সাথে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার পরনে সেদিনকার মতো লেদার জ্যাকেট নেই, বদলে সে একটা কালো রংয়ের ফুলহাতা সোয়েটার পরে আছে। ঘরের আবছা অন্ধকারে সোয়েটারের কালো রঙটা মিশে গেছে।
এক নজরে তাকালে চোখে পড়বে না।
কিন্তু ওর কাছে সবচেয়ে আশ্চর্য ঠেকলো রৌণকের বডি ল্যাঙ্গুয়েজ। রৌণকের চেনা বডি ল্যাঙ্গুয়েজটা আজ উধাও। সে আজকে মাথা নিচু করে মেঝেতে কার্পেটের নকশার দিকে তাকিয়ে আছে, কাঁধ দুটো সামান্য ঝুলে আছে। ঠিক যেমনভাবে মারাত্মক কোন অপরাধ করে ধরা পড়ার পর বাবার সামনে ছেলে দাঁড়িয়ে থাকে।
অয়নকে ঘরে ঢুকতে দেখেও রৌণক একবারও চোখ তুলে ওর দিকে তাকাল না, বরং ওর মাথাটা যেন আরও একটু নিচের দিকে ঝুঁকে গেল।
সঙ্গে সঙ্গে অয়নের মস্তিষ্কের ভেতর ওয়ার্নিং বেল বেজে উঠল।
বিপদ ! চরম বিপদ !
তার স্নায়ুগুলো টানটান হয়ে গেল।
"এসো, অয়ন। বসো।"
মিস্টার প্রধান ডেস্কের সামনের দুটো কাঠের চেয়ারের একটার দিকে ইশারা করলেন। তার ভরাট, নিচু স্বর ঘরের নিস্তব্ধতাকে এক নিমেষে চিরে দিল।
অয়ন ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়ে চেয়ারটায় বসল। তার শিরদাঁড়া টানটান। সে লক্ষ্য করল, মিস্টার প্রধানের গলার স্বরে সেই চিরাচরিত নির্লিপ্ত ভাবটা আজ অনুপস্থিত। বরং আজকে তার গলার স্বরে একটা কাঠিন্য মিশে আছে।
মিস্টার প্রধান অত্যন্ত ধীরেসুস্থে চায়ের পট থেকে গরম গরম লিকার চা ঢালতে শুরু করলেন। চায়ের কাপ থেকে ওঠা গরম ধোঁয়া, অয়ন আর মিস্টার প্রধানের সামনে এক মুহূর্তের জন্য একটা অস্পষ্ট পর্দা তৈরি করল।
"কোচ সেনগুপ্ত আমাকে ফোন করেছিলেন।"
কথা বলতে বলতে মিস্টার প্রধান চায়ের কাপটা অয়নের দিকে এগিয়ে দিলেন। যদিও তার চোখ তখনো কাপের দিকেই স্থির হয়ে আছে।
"উনি বললেন, বাথরুমে স্লিপ করে পড়ে গিয়ে নাকি তোমার মুখে আর পাঁজরে মারাত্মক চোট লেগেছে।"
তার চোখদুটো এবার অয়নের মুখের হলদেটে কালশিটে দাগ দুটো আর ফাটা ঠোঁটের ওপর স্থির হল।
অয়ন নিজের স্পোর্টস ব্যাগটা পাশে নামিয়ে রাখল। সে নিজের গলার স্বরকে যথাসম্ভব শান্ত রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করতে করতে বলল, "হ্যাঁ, স্যার। ফ্লোরটা ভিজে ছিল, আমি খেয়াল করিনি। সোজা বেসিনের কর্নারে গিয়ে ধাক্কা লেগেছে।"
অয়নের কথা শুনতে শুনতে মিস্টার প্রধান আরেকটা কাপে চা ঢালছিলেন। তিনি চা ঢালা শেষ করে পটটা নামিয়ে রেখে অত্যন্ত ধীর লয়ে চোখ তুলে সরাসরি অয়নের চোখের দিকে তাকালেন।
সেই অন্তর্ভেদী দৃষ্টি!
অয়নের মনে হতে লাগলো, মিস্টার প্রধান যেন ওর মনের ভেতরের সব গোপন কথা একে একে পড়ে ফেলছেন।
"বেসিনের কর্নারে ধাক্কা খেলে সাধারণত হাড়ের ওপর লিনিয়ার কনটিউশন বা লম্বাটে কালশিটে পড়ে, অয়ন", মিস্টার প্রধান ভরাট গলায় ধীরে ধীরে কথা বললেও সেটা অয়নের কানে বোমার মতো শোনাল।
"বেসিনের সিরামিক বা মার্বেল যখন হাড়ে আঘাত করে অয়ন, তখন চামড়া লিনিয়ার হয়ে ফেটে যায়, সেখানে কালশিটের চারপাশে এমন বৃত্তাকার ‘নাকল-মার্ক’ পড়ে না। আমি গত পঁচিশ বছর ধরে ফাইট শেখাচ্ছি। বাথরুমে পড়ে গেলে কীভাবে চোট লাগে আর একটা সলিড বক্সিং গ্লাভসের পাঞ্চ কীভাবে গালের চামড়ায় কালশিটে ফেলে, এই দুটোর পার্থক্য বোঝার মতো চোখ আমার আছে।"
অয়ন বুঝতে পারল, মিস্টার প্রধান সব জানতে পেরে গেছেন।
তবুও, ও সহজে হার স্বীকার করতে চাইল না।
"আমি আপনার কথা বুঝতে পারছি না, স্যার। আমি সত্যিই বাথরুমে..."
"স্টপ। মিথ্যে বোলো না, অয়ন", মিস্টার প্রধান তাকে মাঝপথে থামিয়ে দিলেন। শব্দটা খুব জোরে উচ্চারিত হয়নি ঠিকই, কিন্তু তার মধ্যে একটা ওয়ার্নিং টোন ছিল যেটা অয়নকে থামিয়ে দিল।
"অস্বীকার করে আর নিজের সম্মান নষ্ট কোরো না। রৌণক আমাকে সব বলেছে। তুমি আয়রন ফিস্ট নামে একটা বক্সিং ক্লাবে গিয়ে ফাইট করতে নেমেছিলে আর তুমি সেখানে একটা ছেলেকে তিন মিনিটের ফাইটে নকআউট করেছ।"
অয়ন এবার সম্পূর্ণ চুপ হয়ে গেল। সে রৌণকের দিকে একটা তীব্র দৃষ্টি ছুঁড়ে দিল।
'বিশ্বাসঘাতক!'
যে ছেলেটা তাকে এই ক'দিন আগে নিয়ম ভাঙতে বলছিল। সে-ই আজ মিস্টার প্রধানের কাছে সব ফাঁস করে দিল?
মিস্টার প্রধান অয়নের মনের ভাষাটা তার চোখের দৃষ্টি দেখেই পড়ে ফেললেন।
"রৌণককে দোষ দিও না", মিস্টার প্রধান শান্ত গলায় বললেন।
"ও আমার কাছে আজ পনের বছর ধরে ট্রেনিং নিচ্ছে। আমি ওর চোখ, ওর বডি ল্যাঙ্গুয়েজ সব পড়তে পারি। অপরাধবোধ খুব ভারী জিনিস, অয়ন। ওকে ভাঙতে আমার ঠিক দু-মিনিট সময় লেগেছে।"
অয়ন মাথা নিচু করে নিজের দুই হাতের আঙুলগুলো শক্ত করে মুঠি পাকাল। তার আর অস্বীকার করার কোনো জায়গা নেই। সে চুপ করে রইল। তার ভেতরের রাগটা এখন আর রৌণকের ওপর নয়, বরং নিজের এই অসহায় অবস্থার ওপর তৈরি হচ্ছে। সে শুধু নিজের মতো করে বাঁচতে চেয়েছিল, একটু স্পেস চেয়েছিল। কিন্তু, তার চারপাশের মানুষগুলো যেন তাকে নিয়ে ছিনিমিনি খেলায় মেতেছে।
মিস্টার প্রধান ডেস্কের ওপর হেলান দিয়ে অয়নের চোখের দিকে সরাসরি তাকালেন। তার দৃষ্টিতে শাসন এবং প্রচ্ছন্ন উদ্বেগের একটা অদ্ভুত মিশ্রণ যদিও অয়ন সেটা বুঝতে পারল না।
"তুমি কি জানো তুমি কী করেছ?" মিস্টার প্রধান এবার একটু সামনের দিকে ঝুঁকলেন।
"তুমি একজন নভিশ, যে কোনরকম গার্ড ছাড়া একটা প্রফেশনাল বক্সিং রিংয়ে নেমেছে। বক্সিং পাড়ার মোড়ের মারপিট নয় অয়ন। বক্সিং একটা অত্যন্ত ডেডলি, ডিমান্ডিং কমব্যাট স্পোর্টস। ফিজিক্যাল ড্যামেজ, ইনজুরি পেশাদার ফাইটারদের নিত্যদিনের সঙ্গী। তুমি একজন অ্যাথলিট হয়ে এই বেসিক জ্ঞানটুকু রাখো না?"
অয়ন চুপ করে রইল।
"তুমি যদি সিরিয়াসলি পেশাদার বক্সিংয়ে নামো আর নিয়মিত ফাইটে অংশ নিতে চাও, তাহলে তোমাকে এখনকার জীবনটা ভুলে যেতে হবে। তোমার ডায়েট, তোমার ডেইলি রুটিন সব পালটে যাবে। তোমার ফুটবল ক্যারিয়ারের কথা তো ছেড়েই দিলাম, তোমার পড়াশোনা আর স্বাভাবিক জীবনযাপনও মারাত্মক রকম ধাক্কা খাবে।
আন্ডারগ্রাউন্ড সার্কিটে লড়তে চাইলে ওখানকার ফাইটে রেফারিরা তোমাকে প্রোটেক্ট করতে আসবে না। একটা ভুল পাঞ্চ তোমার খেলাধূলা, পড়াশোনা চিরকালের মতো শেষ করে দিতে পারে। তুমি কি ভেবেছ এগুলো?"
অয়ন এই কথার কোন উত্তর দিল না। সে যে এই বিষয়গুলো সম্পর্কে একেবারে অজ্ঞ তা নয়। সে খুব ডিটেইলসে এসব নিয়ে ভাবেনি, সেই অবস্থায় ভাবা সম্ভবও ছিল না। আফটার অল, ও নিজের মনের জ্বালা মেটাতে ওখানে গেছিল।
কিন্তু, ওই তিন মিনিটেই সে উপলব্ধি করেছিল যে এই জগৎটা কত নির্মম হতে পারে।
কিন্তু মিস্টার প্রধান সেটা বুঝতে চাইছেন না।
অয়ন তো পেশাদার বক্সার হতে চায় না! তার শুধু একটা আউটলেট দরকার ছিল যেখানে সে নিজের পুঞ্জীভূত রাগ, দুঃখ-হতাশাকে কারো মুখের ওপর ঘুঁষি মেরে বের করে দিতে পারে।
যদি ওইদিন সে বক্সিং ক্লাবে গিয়ে বিকাশের মুখে পাঞ্চগুলো না মারত, তাহলে হয়তো একদিন সে রাগ সামলাতে না পেরে কলেজের ভেতরেই কাউকে খুন করে বসত।
কিন্তু এসব কথা সে মিস্টার প্রধানকে কীভাবে বোঝাবে?
এই লোকটা শুধু ডিসিপ্লিন বোঝে। ওর দোজোর নিয়ম না ভাঙলেই হল। ব্যস, আর কিছু নিয়ে এর মাথাব্যথা নেই।
ওনার না আছে দয়ামায়া আর না আছে মানুষের ইমোশন নিয়ে কোনো আইডিয়া। উনি কীভাবে বুঝবেন জীবনের সবচেয়ে প্রিয় মানুষ, সবচেয়ে ভালবাসার মানুষটার কাছ থেকে বিনা দোষে সবার সামনে অপমানিত, লাঞ্ছিত, নিগৃহীত হলে একটা মানুষ কেমনভাবে নিজের ভেতরে রোজ একটু একটু করে মরে যায় ? এই মানুষটা কিভাবে বুঝবে কেন বিক্রম মালহোত্রাকে খুন করার ইচ্ছাটা প্রতি মুহূর্তে ওর প্রতিটা শিরায় শিরায় দৌড়ায়?
এই লোকটাকে কিছু বলাই বৃথা।
তাই অয়ন চুপ করেই রইল। সে শুধু অপেক্ষা করতে লাগল কখন এই লেকচারটা শেষ হবে আর তারপর সে এই দোজো থেকে চিরকালের মতো বেরিয়ে যাবে। এনাফ ইজ এনাফ !
মিস্টার প্রধান কয়েক সেকেন্ড অয়নের জেদী দৃষ্টির দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর তিনি দৃষ্টি ঘুরিয়ে কোণায় দাঁড়িয়ে থাকা রৌণকের দিকে তাকালেন।
"রৌণক"
রৌণক সামান্য কেঁপে উঠল। সে ধীরে ধীরে মাথা তুলে তার গুরুর দিকে তাকাল।
"তুমি আমার অত্যন্ত স্নেহের ছাত্র। কিন্তু তুমি আমাকে না জানিয়ে, আমার পারমিশন ছাড়া আমার একজন আনট্রেইনড ছাত্রকে ওখানে নিয়ে গিয়ে অত্যন্ত অন্যায় করেছ। যদি সেদিন বিকাশের একটা পাঞ্চ ওর টেম্পোরাল বোনে লাগত, তাহলে ছেলেটা রিংয়ের ম্যাটেই কোমায় চলে যেত! তুমি কী বুঝতে পারছ তুমি কী করেছ ? তোমার তো ওর থেকে মানসিকভাবে অনেক বেশি পরিণত হওয়ার কথা। আজ যদি ওর বড়সড় কোন ক্ষতি হয়ে যেত, ওর ফুটবল ক্যারিয়ার শেষ হয়ে যেত, এর সম্পূর্ণ দায়ভার আমার ঘাড়ে এসে পড়ত। তুমি আমার বিশ্বাস ভেঙেছ।"
রৌণক মাথা হেঁট করেই রইল, একটা শব্দও উচ্চারণ করল না।
তারপর মিস্টার প্রধান আবার অয়নের দিকে ফিরলেন। তার চোখদুটো এবার একটু নরম হলো।
"কোচ সেনগুপ্ত আমার পুরনো বন্ধু। উনি আমাকে বিশ্বাস করে তোমার দায়িত্ব আমার হাতে দিয়েছেন। উনি তোমাকে ভীষণ স্নেহ করেন। তোমার স্পোর্টস ক্যারিয়ার নিয়ে স্বপ্ন দেখেন। তোমার যাতে কোনো ক্ষতি না হয়, তুমি যাতে নিজেকে ধ্বংস না করে ফেল, সেটা দেখার দায়িত্ব আমার। আমি একজন শিক্ষক। আমি আমার ছাত্রকে চোখের সামনে অন্ধকারের পথে যেতে দিতে পারি না।"
এবার অয়ন মুখ খুলল। তার গলার স্বরটা ঠাণ্ডা।
এসব দায়িত্ব, কর্তব্যের কথা শুনেই ওর রাগ উঠেছে।
"আমার দায়িত্ব নেওয়ার কোনো দরকার নেই আপনার। আমি নিজের খেয়াল খুব ভালভাবে রাখতে পারি।
আমার লাইফটা অলরেডি একটা জোক হয়ে গেছে। আমি ওখানে বক্সার হওয়ার জন্য যাইনি। আমি ওখানে গিয়েছিলাম কারণ আমি কাউকে হার্ট করতে চেয়েছিলাম। আপনি আমাকে এখানে দণ্ডবত করিয়ে আমার রাগটাকে কন্ট্রোল করা শেখাচ্ছিলেন। কিন্তু, আমার রাগটা কন্ট্রোলে আসার নয়। ওটা বের করার জন্য আমার একটা জায়গার দরকার ছিল। দ্যাটস ইট!
আর, আপনি বলছেন ক্ষতি ?
আমি সেদিন শের সিংয়ের ওয়ান অফ দ্য বেস্ট ফাইটারকে ওই রিংয়ে তিন মিনিটের মধ্যে নকডাউন করে এসেছি।"
মিস্টার প্রধান একটা তাচ্ছিল্যের হাসি হাসলেন।
অন্তত অয়নের তাই মনে হল।
"তুমি বিকাশকে নিজের স্কিল দিয়ে নকডাউন করোনি, অয়ন। তুমি ওকে হারিয়েছ তোমার 'ডেথ-উইশ' দিয়ে। যাদের কিছু হারানোর নেই, যারা নিজের জীবনের তোয়াক্কা করে না, তারা প্রথম প্রথম একটা অবিশ্বাস্য শক্তি নিয়ে রিঙে লড়াই করতে নামে। সেদিন তুমি ঠিক সেটাই করেছিলে।
কিন্তু অয়ন, এরকম ভাবে দু-একবার ফাইট জেতা যায়, অপনেন্টকে চমকে দেওয়া যায়, কিন্তু রোজ জেতা যায় না। যেদিন তোমার উল্টোদিকে একটা টেকনিক্যালি সাউন্ড বক্সার দাঁড়াবে... সেদিন তুমি আর নিজের পায়ে হেঁটে ফিরবে না। সেদিন তোমাকে 'বডি ব্যাগে' করে বাড়ি ফিরতে হবে।"
অয়ন চমকে উঠল। তার মেরুদণ্ড দিয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত নেমে গেল।
বডি ব্যাগ !
সত্যিই তো, সেদিন ও নিজের জীবনের পরোয়া করেনি। সেদিন বিকাশের সামনে ওর কোনো ডিফেন্স ছিল না। ডিফেন্স করার ইচ্ছেও ছিল না। ও শুধু মারতে চেয়েছিল, মার খাবার পরোয়া করেনি। যদি সেদিন বিকাশ সত্যিই ওর চোখে বা নার্ভে কোনো মারণ-আঘাত করত?
"তুমি কি সত্যিই বক্সিংটাকে সিরিয়াসলি নেওয়ার ব্যাপারে কিছু ভেবেছ?" মিস্টার প্রধান অত্যন্ত সিরিয়াস গলায় জিজ্ঞেস করলেন।
"তুমি কি সত্যিই ওই জগতে ঢুকতে চাও?"
অয়ন উত্তর দিতে পারল না। সে মাথা নিচু করে ম্যাটের দিকে তাকিয়ে রইল। তার গলা দিয়ে কোন শব্দ বেরোল না। সে নিজেও জানে না সে কী চায়। ফেস্টের পর থেকে তার জীবনে সবকিছু তালগোল পাকিয়ে গেছে।
এত ভেবেচিন্তে সে ওখানে যায়নি। বক্সিং ওর কাছে একটা ইনস্ট্রুমেন্ট মাত্র।
অয়ন নিজের অসহায়তা আর অন্তর্দ্বন্দ্ব ঢাকতে পাল্টা আক্রমণের পথ বেছে নিল। সে সরাসরি মিস্টার প্রধানের চোখে চোখ রেখে কৌতূহলী, অথচ প্রচ্ছন্ন চ্যালেঞ্জের সুরে তাকে পাল্টা জিজ্ঞেস করল,
"আমার একটা প্রশ্ন ছিল, স্যার।"
"বলো।"
"আপনি বলছেন বক্সিং এত ডিমান্ডিং স্পোর্টস যে এটা মানুষের জীবন, ক্যারিয়ার সব ধ্বংস করে দিতে পারে। অথচ, আপনি রৌণককে মার্শাল আর্ট আর বক্সিং, দুটোই পার্সিউ করতে অ্যালাও করছেন।
কেন?"
কথা বলতে বলতে অয়নের গলায় চ্যালেঞ্জের সুর স্পষ্ট ফুটে উঠল।
"রৌণকও তো শের সিংয়ের বক্সিং ক্লাবে যায়। আপনি তো ওকে আটকাননি। তাহলে আমাকে জ্ঞান দিচ্ছেন কেন?"
রৌণক চমকে অয়নের দিকে তাকাল। এই অফিসে দাঁড়িয়ে মিস্টার প্রধানের সঙ্গে কেউ কখনো এভাবে কথা বলার সাহস দেখায়নি।
কিন্তু মিস্টার প্রধান রাগলেন না। বরং তার ঠোঁটের কোণে একটা ম্লান হাসি ফুটে উঠল। তিনি ধীরে ধীরে নিজের চেয়ারটায় হেলান দিলেন।
"খুব ভালো প্রশ্ন করেছ, অয়ন", মিস্টার প্রধান ল্যাম্পের আলোর দিকে তাকিয়ে বললেন।
"রৌণক কেন ওখানে যায় জানো? কারণ ওর আর হারানোর কিছু নেই।"
অয়ন ভুরু কুঁচকাল।
"রৌণক বড় হয়েছে ট্যাংরার একটা বস্তিতে।"
মিস্টার প্রধান শান্ত গলায় বলতে শুরু করলেন।
"ওর বাবা রোজ রাতে মদ খেয়ে বাড়ি এসে ওর মাকে পেটাত। রৌণক যখন আমার কাছে আসে, তখন ও ক্লাস ফাইভে পড়া একটা ভীতু ছেলে। ওর কাছে কোনো কলেজ ডিগ্রি নেই, যে ও কোন অফিসে ভালো পোস্টে চাকরির জন্য দরখাস্ত করতে পারবে। ওর কোনো কোচ সেনগুপ্ত নেই যে ওর জন্য নিজের চাকরি বাজি রাখবে।"
মিস্টার প্রধান পিছন ফিরে রৌণকের দিকে একবার তাকিয়ে আবার সামনে অয়নের দিকে তাকালেন।
"রৌণকের কাছে বক্সিং রিংটা শখের জায়গা নয়। ও ওখানে যায় কারণ, ওই রিংয়ে মার খেয়ে ও যে টাকাটা পায়, সেটা দিয়ে ওর মায়ের ওষুধের খরচা আসে। বক্সিংটা ওর জন্য জীবনযুদ্ধ।
কিন্তু তুমি?"
মিস্টার প্রধান একটু সামনের দিকে ঝুঁকে এলেন।
"তুমি একটা ফাইভ-স্টার কলেজের স্টুডেন্ট। বড়লোকের ছেলে। তোমার সামনে একটা উজ্জ্বল ভবিষ্যত, ব্রাইট কেরিয়ার পড়ে আছে। তুমি কদিন পরেই স্টেট ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপ খেলবে।
তুমি ওখানে কেন গেছিলে?
তোমার টাকার দরকার ?
না।
To be continued...
মাঝে সাতটা দিন কেটে গেছে।
অয়নের শরীরের কালশিটে দাগগুলো ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে হলদেটে আকার নিয়েছে। ফাটা ঠোঁট শুকিয়ে গেছে, তবে জোরে কথা বলতে গেলে এখনও সামান্য ব্যথা করে। পেইনকিলার আর অ্যান্টি-বায়োটিকের দৌলতে পাঁজরের ব্যথাটাও এখন আগের চেয়ে অনেক কম। ফাইট ক্লাবের সেই রাতের পর থেকে সেই রাগটা এখন আর ওকে পাগল, অস্থির করে তোলে না।
এই সাতটা দিন অয়ন মাঠমুখো হয়নি। কোচ সেনগুপ্তকে সে মেসেজ করে ডক্টরের নির্দেশের কথা জানিয়ে দিয়েছিল। ফুটবল মাঠের পাশাপাশি বালিগঞ্জের সেই মার্শাল আর্টস অ্যাকাডেমি, অর্থাৎ দোজো-তেও সে গত এক সপ্তাহ ধরে সম্পূর্ণ অনুপস্থিত ছিল। কোচ সেনগুপ্ত তাকে মেসেজ করে আশ্বস্ত করেছিলেন, যে তিনি নিজেই মিস্টার প্রধানকে অয়নের চোট পাওয়ার ব্যাপারটা ইনফর্ম করে দেবেন, অয়নকে আর আলাদা করে কিছু জানাতে হবে না।
তাই অয়ন নিজে থেকে আর মিস্টার প্রধানকে কিছু জানানোর চেষ্টা করেনি। প্রথমত, তাঁর ফোন নম্বর ওর কাছে নেই। দ্বিতীয়ত, লোকটার চোখের দিকে তাকালে একটা অজানা অস্বস্তি ওকে কুরে কুরে খায়।
অয়নের মনে হয় মিস্টার প্রধান যেন ইচ্ছা করলেই ওর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি দিয়ে ওর অন্তরের সমস্ত অনুভূতি এক লহমায় পড়ে ফেলতে পারেন। তিনি চাইলেই ওর মনের অন্ধকারে লুকিয়ে থাকা সমস্ত চিন্তা-ভাবনা, ভয়, দুঃখ, প্রতিশোধের ইচ্ছা এমনকী তাঁর সম্পর্কে অয়ন কী ভাবে সেটাও দেখে নিতে পারেন।
এটা অয়নের কাছে চরম অস্বস্তির। তাই, দোজোয় যেতে না পারায় অয়নের মনে কোন আফশোস ছিল না।
আজ অয়ন স্পোর্টস ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে অত্যন্ত নিশ্চিত মনেই দোজো-র দিকে রওনা দিল।সাতদিন পর আজ সে আবার দোজোতে যাচ্ছে। তবে সে জানে মিস্টার সেনগুপ্ত যা বলার বলে দিয়েছেন। ওকে দোজোতে গিয়ে কোনরকম জবাবদিহি করতে হবে না।
বালিগঞ্জের পরিচিত নির্জন গলিটায় অয়ন যখন এসে পৌঁছোল, ততক্ষণে অন্ধকার নেমে গেছে। ডিসেম্বরের বাতাসে ঠাণ্ডা ভাব।
ভারী লোহার গেটটা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই দোজোর চেনা নিঃশব্দ পরিবেশটা আবার অয়নের সত্ত্বাকে গ্রাস করল। বাতাসে ধূপের একটা শান্ত অথচ কড়া গন্ধ। ম্যাটের ওপর খালি পায়ে প্র্যাকটিস করা ছাত্রদের মৃদু শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ।
অয়ন নিজের স্পোর্টস ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে ম্যাটের বাইরে জুতো খুলল। সে নিশ্চিত মনেই ভেতরে ঢুকেছিল। সে মানসিকভাবে আজ 'কিবা দাচি' (হর্স স্ট্যান্স) বা মেডিটেশন করার জন্য নিজেকে তৈরি করেই এসেছিল।
কিন্তু ভেতরে ঢুকে ম্যাটের ওপর অন্য স্টুডেন্টদের প্র্যাকটিস করতে দেখলেও সে মিস্টার প্রধানকে দেখতে পেল না। অয়নের আজকে দোজোর পরিবেশটা একটু থমথমে মনে হল।
অয়ন জুতো খুলে ম্যাটের দিকে এগোতে যাবে, ঠিক সেই সময় একজন জুনিয়র ইনস্ট্রাক্টর তার পথ আটকাল।
"অয়ন চ্যাটার্জী?"
"হ্যাঁ।"
"মিস্টার প্রধান আপনাকে ওনার অফিসঘরে ডাকছেন।"
অয়ন এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল।
অফিসঘর?
মিস্টার প্রধান হঠাৎ করে তাকে আলাদা ভাবে ভেতরে ডাকছেন কেন ? তিনি তো সাধারণত এই হলঘরে ম্যাটের ওপর বসে সবার সাথে কথা বলেন।
অয়নের বুকের ভেতরটা হঠাৎ করে একটা অজানা আশঙ্কায় ধক করে উঠল, কিন্তু সে নিজের মুখটা ভাবলেশহীন রাখল।
"কোথায় ওনার অফিস?" সে নিস্পৃহ গলায় জিজ্ঞেস করল।
জুনিয়র ইনস্ট্রাক্টর তাকে হলঘরের পেছনে একটা দরজা দিয়ে বার করল। একটা সরু, অন্ধকার প্যাসেজ; প্যাসেজের একদম শেষে একটা ভারী সেগুন কাঠের দরজা। দরজাটা অর্ধেক ভেজানো।
দরজাটা ঠেলে ঘরের ভেতরে ঢুকে অয়ন চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে নিল।
মিস্টার প্রধানের অফিসঘরটা কোনো সাধারণ স্পোর্টস কোচের অফিসঘরের মতো নয়। আকারে খুব একটা বড় না হলেও, এর ভেতরে পা রাখলেই একটা অদ্ভুত ভারিক্কি ভাব চোখে পড়ে। এখানকার পরিবেশ আরো থমথমে। ঘরের বাতাসে পুরোনো কাগজের গন্ধ। ঘরের জানলাগুলো বন্ধ, তার ওপর ভারী মেরুন রঙের পর্দা টানা।
ঘরের ঠিক মাঝখানে একটা বিশাল, সেকেলে মেহগনি কাঠের ডেস্ক। ডেস্কের ওপর একটা পুরনো পিতলের ল্যাম্প, যার হলুদ আলো ডেস্কের একটা অংশকে আলোকিত করে রেখেছে। ডেস্কের একপাশে একটা ব্রোঞ্জের বুদ্ধমূর্তি আর অন্য পাশে সারি সারি সাজানো কয়েকটা ডায়েরি। ডেস্কের ওপাশে একটা লেদার-কভার করা চেয়ারে বসে আছেন মিস্টার প্রধান। তার সামনে একটা ছোট্ট টি-পটে গরম চা রাখা; সেখান থেকে হালকা ধোঁয়া উঠছে।
উপরে সিলিং থেকে একটা পুরোনো আমলের ফ্যান ঘুরছে, যার একটানা ক্যাঁচক্যাঁচ আওয়াজ ঘরের নিস্তব্ধতাকে আরও প্রকট করে তুলছে। ঘরের দেওয়ালগুলো কাঠের প্যানেল করা, যেখানে কাঁচের ফ্রেমে বাঁধানো বেশ কিছু পুরোনো, সাদাকালো ছবি আর অজস্র মেডেল ঝোলানো।
দেওয়ালের একটা দিকে কাঠের ফ্রেমে বাঁধানো আসল জাপানি কাতানা (তলোয়ার)। ছবিগুলোর দিকে তাকালে মিস্টার প্রধানকে চিনে নিতে অসুবিধে হয় না। এগুলো তার যৌবনের ছবি।
কিন্তু অয়ন ঘরে ঢোকার পরে তার চোখ মিস্টার প্রধানের দিকে গেল না। তার দৃষ্টি আটকে গেল ঘরের এক কোণে, অন্ধকারের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা একটা ছায়ামূর্তির দিকে।
রৌণক।
রৌণক দেয়ালের সাথে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার পরনে সেদিনকার মতো লেদার জ্যাকেট নেই, বদলে সে একটা কালো রংয়ের ফুলহাতা সোয়েটার পরে আছে। ঘরের আবছা অন্ধকারে সোয়েটারের কালো রঙটা মিশে গেছে।
এক নজরে তাকালে চোখে পড়বে না।
কিন্তু ওর কাছে সবচেয়ে আশ্চর্য ঠেকলো রৌণকের বডি ল্যাঙ্গুয়েজ। রৌণকের চেনা বডি ল্যাঙ্গুয়েজটা আজ উধাও। সে আজকে মাথা নিচু করে মেঝেতে কার্পেটের নকশার দিকে তাকিয়ে আছে, কাঁধ দুটো সামান্য ঝুলে আছে। ঠিক যেমনভাবে মারাত্মক কোন অপরাধ করে ধরা পড়ার পর বাবার সামনে ছেলে দাঁড়িয়ে থাকে।
অয়নকে ঘরে ঢুকতে দেখেও রৌণক একবারও চোখ তুলে ওর দিকে তাকাল না, বরং ওর মাথাটা যেন আরও একটু নিচের দিকে ঝুঁকে গেল।
সঙ্গে সঙ্গে অয়নের মস্তিষ্কের ভেতর ওয়ার্নিং বেল বেজে উঠল।
বিপদ ! চরম বিপদ !
তার স্নায়ুগুলো টানটান হয়ে গেল।
"এসো, অয়ন। বসো।"
মিস্টার প্রধান ডেস্কের সামনের দুটো কাঠের চেয়ারের একটার দিকে ইশারা করলেন। তার ভরাট, নিচু স্বর ঘরের নিস্তব্ধতাকে এক নিমেষে চিরে দিল।
অয়ন ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়ে চেয়ারটায় বসল। তার শিরদাঁড়া টানটান। সে লক্ষ্য করল, মিস্টার প্রধানের গলার স্বরে সেই চিরাচরিত নির্লিপ্ত ভাবটা আজ অনুপস্থিত। বরং আজকে তার গলার স্বরে একটা কাঠিন্য মিশে আছে।
মিস্টার প্রধান অত্যন্ত ধীরেসুস্থে চায়ের পট থেকে গরম গরম লিকার চা ঢালতে শুরু করলেন। চায়ের কাপ থেকে ওঠা গরম ধোঁয়া, অয়ন আর মিস্টার প্রধানের সামনে এক মুহূর্তের জন্য একটা অস্পষ্ট পর্দা তৈরি করল।
"কোচ সেনগুপ্ত আমাকে ফোন করেছিলেন।"
কথা বলতে বলতে মিস্টার প্রধান চায়ের কাপটা অয়নের দিকে এগিয়ে দিলেন। যদিও তার চোখ তখনো কাপের দিকেই স্থির হয়ে আছে।
"উনি বললেন, বাথরুমে স্লিপ করে পড়ে গিয়ে নাকি তোমার মুখে আর পাঁজরে মারাত্মক চোট লেগেছে।"
তার চোখদুটো এবার অয়নের মুখের হলদেটে কালশিটে দাগ দুটো আর ফাটা ঠোঁটের ওপর স্থির হল।
অয়ন নিজের স্পোর্টস ব্যাগটা পাশে নামিয়ে রাখল। সে নিজের গলার স্বরকে যথাসম্ভব শান্ত রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করতে করতে বলল, "হ্যাঁ, স্যার। ফ্লোরটা ভিজে ছিল, আমি খেয়াল করিনি। সোজা বেসিনের কর্নারে গিয়ে ধাক্কা লেগেছে।"
অয়নের কথা শুনতে শুনতে মিস্টার প্রধান আরেকটা কাপে চা ঢালছিলেন। তিনি চা ঢালা শেষ করে পটটা নামিয়ে রেখে অত্যন্ত ধীর লয়ে চোখ তুলে সরাসরি অয়নের চোখের দিকে তাকালেন।
সেই অন্তর্ভেদী দৃষ্টি!
অয়নের মনে হতে লাগলো, মিস্টার প্রধান যেন ওর মনের ভেতরের সব গোপন কথা একে একে পড়ে ফেলছেন।
"বেসিনের কর্নারে ধাক্কা খেলে সাধারণত হাড়ের ওপর লিনিয়ার কনটিউশন বা লম্বাটে কালশিটে পড়ে, অয়ন", মিস্টার প্রধান ভরাট গলায় ধীরে ধীরে কথা বললেও সেটা অয়নের কানে বোমার মতো শোনাল।
"বেসিনের সিরামিক বা মার্বেল যখন হাড়ে আঘাত করে অয়ন, তখন চামড়া লিনিয়ার হয়ে ফেটে যায়, সেখানে কালশিটের চারপাশে এমন বৃত্তাকার ‘নাকল-মার্ক’ পড়ে না। আমি গত পঁচিশ বছর ধরে ফাইট শেখাচ্ছি। বাথরুমে পড়ে গেলে কীভাবে চোট লাগে আর একটা সলিড বক্সিং গ্লাভসের পাঞ্চ কীভাবে গালের চামড়ায় কালশিটে ফেলে, এই দুটোর পার্থক্য বোঝার মতো চোখ আমার আছে।"
কথাগুলো শুনতে শুনতে সেকেন্ডের ভগ্নাংশে অয়নের হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে এল। সে একবার আড়চোখে রৌণকের দিকে তাকাল। কিন্তু, রৌণক মাথা নিচু করে রইল, মুখটা তুলল না।
অয়ন বুঝতে পারল, মিস্টার প্রধান সব জানতে পেরে গেছেন।
তবুও, ও সহজে হার স্বীকার করতে চাইল না।
"আমি আপনার কথা বুঝতে পারছি না, স্যার। আমি সত্যিই বাথরুমে..."
"স্টপ। মিথ্যে বোলো না, অয়ন", মিস্টার প্রধান তাকে মাঝপথে থামিয়ে দিলেন। শব্দটা খুব জোরে উচ্চারিত হয়নি ঠিকই, কিন্তু তার মধ্যে একটা ওয়ার্নিং টোন ছিল যেটা অয়নকে থামিয়ে দিল।
"অস্বীকার করে আর নিজের সম্মান নষ্ট কোরো না। রৌণক আমাকে সব বলেছে। তুমি আয়রন ফিস্ট নামে একটা বক্সিং ক্লাবে গিয়ে ফাইট করতে নেমেছিলে আর তুমি সেখানে একটা ছেলেকে তিন মিনিটের ফাইটে নকআউট করেছ।"
অয়ন এবার সম্পূর্ণ চুপ হয়ে গেল। সে রৌণকের দিকে একটা তীব্র দৃষ্টি ছুঁড়ে দিল।
'বিশ্বাসঘাতক!'
যে ছেলেটা তাকে এই ক'দিন আগে নিয়ম ভাঙতে বলছিল। সে-ই আজ মিস্টার প্রধানের কাছে সব ফাঁস করে দিল?
মিস্টার প্রধান অয়নের মনের ভাষাটা তার চোখের দৃষ্টি দেখেই পড়ে ফেললেন।
"রৌণককে দোষ দিও না", মিস্টার প্রধান শান্ত গলায় বললেন।
"ও আমার কাছে আজ পনের বছর ধরে ট্রেনিং নিচ্ছে। আমি ওর চোখ, ওর বডি ল্যাঙ্গুয়েজ সব পড়তে পারি। অপরাধবোধ খুব ভারী জিনিস, অয়ন। ওকে ভাঙতে আমার ঠিক দু-মিনিট সময় লেগেছে।"
অয়ন মাথা নিচু করে নিজের দুই হাতের আঙুলগুলো শক্ত করে মুঠি পাকাল। তার আর অস্বীকার করার কোনো জায়গা নেই। সে চুপ করে রইল। তার ভেতরের রাগটা এখন আর রৌণকের ওপর নয়, বরং নিজের এই অসহায় অবস্থার ওপর তৈরি হচ্ছে। সে শুধু নিজের মতো করে বাঁচতে চেয়েছিল, একটু স্পেস চেয়েছিল। কিন্তু, তার চারপাশের মানুষগুলো যেন তাকে নিয়ে ছিনিমিনি খেলায় মেতেছে।
মিস্টার প্রধান ডেস্কের ওপর হেলান দিয়ে অয়নের চোখের দিকে সরাসরি তাকালেন। তার দৃষ্টিতে শাসন এবং প্রচ্ছন্ন উদ্বেগের একটা অদ্ভুত মিশ্রণ যদিও অয়ন সেটা বুঝতে পারল না।
"তুমি কি জানো তুমি কী করেছ?" মিস্টার প্রধান এবার একটু সামনের দিকে ঝুঁকলেন।
"তুমি একজন নভিশ, যে কোনরকম গার্ড ছাড়া একটা প্রফেশনাল বক্সিং রিংয়ে নেমেছে। বক্সিং পাড়ার মোড়ের মারপিট নয় অয়ন। বক্সিং একটা অত্যন্ত ডেডলি, ডিমান্ডিং কমব্যাট স্পোর্টস। ফিজিক্যাল ড্যামেজ, ইনজুরি পেশাদার ফাইটারদের নিত্যদিনের সঙ্গী। তুমি একজন অ্যাথলিট হয়ে এই বেসিক জ্ঞানটুকু রাখো না?"
অয়ন চুপ করে রইল।
"তুমি যদি সিরিয়াসলি পেশাদার বক্সিংয়ে নামো আর নিয়মিত ফাইটে অংশ নিতে চাও, তাহলে তোমাকে এখনকার জীবনটা ভুলে যেতে হবে। তোমার ডায়েট, তোমার ডেইলি রুটিন সব পালটে যাবে। তোমার ফুটবল ক্যারিয়ারের কথা তো ছেড়েই দিলাম, তোমার পড়াশোনা আর স্বাভাবিক জীবনযাপনও মারাত্মক রকম ধাক্কা খাবে।
আন্ডারগ্রাউন্ড সার্কিটে লড়তে চাইলে ওখানকার ফাইটে রেফারিরা তোমাকে প্রোটেক্ট করতে আসবে না। একটা ভুল পাঞ্চ তোমার খেলাধূলা, পড়াশোনা চিরকালের মতো শেষ করে দিতে পারে। তুমি কি ভেবেছ এগুলো?"
অয়ন এই কথার কোন উত্তর দিল না। সে যে এই বিষয়গুলো সম্পর্কে একেবারে অজ্ঞ তা নয়। সে খুব ডিটেইলসে এসব নিয়ে ভাবেনি, সেই অবস্থায় ভাবা সম্ভবও ছিল না। আফটার অল, ও নিজের মনের জ্বালা মেটাতে ওখানে গেছিল।
কিন্তু, ওই তিন মিনিটেই সে উপলব্ধি করেছিল যে এই জগৎটা কত নির্মম হতে পারে।
কিন্তু মিস্টার প্রধান সেটা বুঝতে চাইছেন না।
অয়ন তো পেশাদার বক্সার হতে চায় না! তার শুধু একটা আউটলেট দরকার ছিল যেখানে সে নিজের পুঞ্জীভূত রাগ, দুঃখ-হতাশাকে কারো মুখের ওপর ঘুঁষি মেরে বের করে দিতে পারে।
যদি ওইদিন সে বক্সিং ক্লাবে গিয়ে বিকাশের মুখে পাঞ্চগুলো না মারত, তাহলে হয়তো একদিন সে রাগ সামলাতে না পেরে কলেজের ভেতরেই কাউকে খুন করে বসত।
কিন্তু এসব কথা সে মিস্টার প্রধানকে কীভাবে বোঝাবে?
এই লোকটা শুধু ডিসিপ্লিন বোঝে। ওর দোজোর নিয়ম না ভাঙলেই হল। ব্যস, আর কিছু নিয়ে এর মাথাব্যথা নেই।
ওনার না আছে দয়ামায়া আর না আছে মানুষের ইমোশন নিয়ে কোনো আইডিয়া। উনি কীভাবে বুঝবেন জীবনের সবচেয়ে প্রিয় মানুষ, সবচেয়ে ভালবাসার মানুষটার কাছ থেকে বিনা দোষে সবার সামনে অপমানিত, লাঞ্ছিত, নিগৃহীত হলে একটা মানুষ কেমনভাবে নিজের ভেতরে রোজ একটু একটু করে মরে যায় ? এই মানুষটা কিভাবে বুঝবে কেন বিক্রম মালহোত্রাকে খুন করার ইচ্ছাটা প্রতি মুহূর্তে ওর প্রতিটা শিরায় শিরায় দৌড়ায়?
এই লোকটাকে কিছু বলাই বৃথা।
তাই অয়ন চুপ করেই রইল। সে শুধু অপেক্ষা করতে লাগল কখন এই লেকচারটা শেষ হবে আর তারপর সে এই দোজো থেকে চিরকালের মতো বেরিয়ে যাবে। এনাফ ইজ এনাফ !
মিস্টার প্রধান কয়েক সেকেন্ড অয়নের জেদী দৃষ্টির দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর তিনি দৃষ্টি ঘুরিয়ে কোণায় দাঁড়িয়ে থাকা রৌণকের দিকে তাকালেন।
"রৌণক"
রৌণক সামান্য কেঁপে উঠল। সে ধীরে ধীরে মাথা তুলে তার গুরুর দিকে তাকাল।
"তুমি আমার অত্যন্ত স্নেহের ছাত্র। কিন্তু তুমি আমাকে না জানিয়ে, আমার পারমিশন ছাড়া আমার একজন আনট্রেইনড ছাত্রকে ওখানে নিয়ে গিয়ে অত্যন্ত অন্যায় করেছ। যদি সেদিন বিকাশের একটা পাঞ্চ ওর টেম্পোরাল বোনে লাগত, তাহলে ছেলেটা রিংয়ের ম্যাটেই কোমায় চলে যেত! তুমি কী বুঝতে পারছ তুমি কী করেছ ? তোমার তো ওর থেকে মানসিকভাবে অনেক বেশি পরিণত হওয়ার কথা। আজ যদি ওর বড়সড় কোন ক্ষতি হয়ে যেত, ওর ফুটবল ক্যারিয়ার শেষ হয়ে যেত, এর সম্পূর্ণ দায়ভার আমার ঘাড়ে এসে পড়ত। তুমি আমার বিশ্বাস ভেঙেছ।"
রৌণক মাথা হেঁট করেই রইল, একটা শব্দও উচ্চারণ করল না।
তারপর মিস্টার প্রধান আবার অয়নের দিকে ফিরলেন। তার চোখদুটো এবার একটু নরম হলো।
"কোচ সেনগুপ্ত আমার পুরনো বন্ধু। উনি আমাকে বিশ্বাস করে তোমার দায়িত্ব আমার হাতে দিয়েছেন। উনি তোমাকে ভীষণ স্নেহ করেন। তোমার স্পোর্টস ক্যারিয়ার নিয়ে স্বপ্ন দেখেন। তোমার যাতে কোনো ক্ষতি না হয়, তুমি যাতে নিজেকে ধ্বংস না করে ফেল, সেটা দেখার দায়িত্ব আমার। আমি একজন শিক্ষক। আমি আমার ছাত্রকে চোখের সামনে অন্ধকারের পথে যেতে দিতে পারি না।"
এবার অয়ন মুখ খুলল। তার গলার স্বরটা ঠাণ্ডা।
এসব দায়িত্ব, কর্তব্যের কথা শুনেই ওর রাগ উঠেছে।
"আমার দায়িত্ব নেওয়ার কোনো দরকার নেই আপনার। আমি নিজের খেয়াল খুব ভালভাবে রাখতে পারি।
আমার লাইফটা অলরেডি একটা জোক হয়ে গেছে। আমি ওখানে বক্সার হওয়ার জন্য যাইনি। আমি ওখানে গিয়েছিলাম কারণ আমি কাউকে হার্ট করতে চেয়েছিলাম। আপনি আমাকে এখানে দণ্ডবত করিয়ে আমার রাগটাকে কন্ট্রোল করা শেখাচ্ছিলেন। কিন্তু, আমার রাগটা কন্ট্রোলে আসার নয়। ওটা বের করার জন্য আমার একটা জায়গার দরকার ছিল। দ্যাটস ইট!
আর, আপনি বলছেন ক্ষতি ?
আমি সেদিন শের সিংয়ের ওয়ান অফ দ্য বেস্ট ফাইটারকে ওই রিংয়ে তিন মিনিটের মধ্যে নকডাউন করে এসেছি।"
মিস্টার প্রধান একটা তাচ্ছিল্যের হাসি হাসলেন।
অন্তত অয়নের তাই মনে হল।
"তুমি বিকাশকে নিজের স্কিল দিয়ে নকডাউন করোনি, অয়ন। তুমি ওকে হারিয়েছ তোমার 'ডেথ-উইশ' দিয়ে। যাদের কিছু হারানোর নেই, যারা নিজের জীবনের তোয়াক্কা করে না, তারা প্রথম প্রথম একটা অবিশ্বাস্য শক্তি নিয়ে রিঙে লড়াই করতে নামে। সেদিন তুমি ঠিক সেটাই করেছিলে।
কিন্তু অয়ন, এরকম ভাবে দু-একবার ফাইট জেতা যায়, অপনেন্টকে চমকে দেওয়া যায়, কিন্তু রোজ জেতা যায় না। যেদিন তোমার উল্টোদিকে একটা টেকনিক্যালি সাউন্ড বক্সার দাঁড়াবে... সেদিন তুমি আর নিজের পায়ে হেঁটে ফিরবে না। সেদিন তোমাকে 'বডি ব্যাগে' করে বাড়ি ফিরতে হবে।"
অয়ন চমকে উঠল। তার মেরুদণ্ড দিয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত নেমে গেল।
বডি ব্যাগ !
সত্যিই তো, সেদিন ও নিজের জীবনের পরোয়া করেনি। সেদিন বিকাশের সামনে ওর কোনো ডিফেন্স ছিল না। ডিফেন্স করার ইচ্ছেও ছিল না। ও শুধু মারতে চেয়েছিল, মার খাবার পরোয়া করেনি। যদি সেদিন বিকাশ সত্যিই ওর চোখে বা নার্ভে কোনো মারণ-আঘাত করত?
"তুমি কি সত্যিই বক্সিংটাকে সিরিয়াসলি নেওয়ার ব্যাপারে কিছু ভেবেছ?" মিস্টার প্রধান অত্যন্ত সিরিয়াস গলায় জিজ্ঞেস করলেন।
"তুমি কি সত্যিই ওই জগতে ঢুকতে চাও?"
অয়ন উত্তর দিতে পারল না। সে মাথা নিচু করে ম্যাটের দিকে তাকিয়ে রইল। তার গলা দিয়ে কোন শব্দ বেরোল না। সে নিজেও জানে না সে কী চায়। ফেস্টের পর থেকে তার জীবনে সবকিছু তালগোল পাকিয়ে গেছে।
এত ভেবেচিন্তে সে ওখানে যায়নি। বক্সিং ওর কাছে একটা ইনস্ট্রুমেন্ট মাত্র।
অয়ন নিজের অসহায়তা আর অন্তর্দ্বন্দ্ব ঢাকতে পাল্টা আক্রমণের পথ বেছে নিল। সে সরাসরি মিস্টার প্রধানের চোখে চোখ রেখে কৌতূহলী, অথচ প্রচ্ছন্ন চ্যালেঞ্জের সুরে তাকে পাল্টা জিজ্ঞেস করল,
"আমার একটা প্রশ্ন ছিল, স্যার।"
"বলো।"
"আপনি বলছেন বক্সিং এত ডিমান্ডিং স্পোর্টস যে এটা মানুষের জীবন, ক্যারিয়ার সব ধ্বংস করে দিতে পারে। অথচ, আপনি রৌণককে মার্শাল আর্ট আর বক্সিং, দুটোই পার্সিউ করতে অ্যালাও করছেন।
কেন?"
কথা বলতে বলতে অয়নের গলায় চ্যালেঞ্জের সুর স্পষ্ট ফুটে উঠল।
"রৌণকও তো শের সিংয়ের বক্সিং ক্লাবে যায়। আপনি তো ওকে আটকাননি। তাহলে আমাকে জ্ঞান দিচ্ছেন কেন?"
রৌণক চমকে অয়নের দিকে তাকাল। এই অফিসে দাঁড়িয়ে মিস্টার প্রধানের সঙ্গে কেউ কখনো এভাবে কথা বলার সাহস দেখায়নি।
কিন্তু মিস্টার প্রধান রাগলেন না। বরং তার ঠোঁটের কোণে একটা ম্লান হাসি ফুটে উঠল। তিনি ধীরে ধীরে নিজের চেয়ারটায় হেলান দিলেন।
"খুব ভালো প্রশ্ন করেছ, অয়ন", মিস্টার প্রধান ল্যাম্পের আলোর দিকে তাকিয়ে বললেন।
"রৌণক কেন ওখানে যায় জানো? কারণ ওর আর হারানোর কিছু নেই।"
অয়ন ভুরু কুঁচকাল।
"রৌণক বড় হয়েছে ট্যাংরার একটা বস্তিতে।"
মিস্টার প্রধান শান্ত গলায় বলতে শুরু করলেন।
"ওর বাবা রোজ রাতে মদ খেয়ে বাড়ি এসে ওর মাকে পেটাত। রৌণক যখন আমার কাছে আসে, তখন ও ক্লাস ফাইভে পড়া একটা ভীতু ছেলে। ওর কাছে কোনো কলেজ ডিগ্রি নেই, যে ও কোন অফিসে ভালো পোস্টে চাকরির জন্য দরখাস্ত করতে পারবে। ওর কোনো কোচ সেনগুপ্ত নেই যে ওর জন্য নিজের চাকরি বাজি রাখবে।"
মিস্টার প্রধান পিছন ফিরে রৌণকের দিকে একবার তাকিয়ে আবার সামনে অয়নের দিকে তাকালেন।
"রৌণকের কাছে বক্সিং রিংটা শখের জায়গা নয়। ও ওখানে যায় কারণ, ওই রিংয়ে মার খেয়ে ও যে টাকাটা পায়, সেটা দিয়ে ওর মায়ের ওষুধের খরচা আসে। বক্সিংটা ওর জন্য জীবনযুদ্ধ।
কিন্তু তুমি?"
মিস্টার প্রধান একটু সামনের দিকে ঝুঁকে এলেন।
"তুমি একটা ফাইভ-স্টার কলেজের স্টুডেন্ট। বড়লোকের ছেলে। তোমার সামনে একটা উজ্জ্বল ভবিষ্যত, ব্রাইট কেরিয়ার পড়ে আছে। তুমি কদিন পরেই স্টেট ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপ খেলবে।
তুমি ওখানে কেন গেছিলে?
তোমার টাকার দরকার ?
না।
To be continued...


![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)