বৌদি বললো, "হ্যাঁ ওর নজর ভালো ছিলো না, আমিও খেয়াল করেছি অনেকবার। সোজা বুকের দিকে তাকাতো।"
আমি বললাম, "আজ যদি এই ক্ষতিপূরণ এবং শাস্তি না দেওয়া হয়, এই পাঁচু এদের দলে থেকে যাবে। পরবর্তী ট্যুরে আবার কোনো মেয়ের ক্ষতি করবে। পাঁচুর জন্য ওদের দু লাখ ষাট হাজার টাকা গচ্ছা গেলো, এবারে ওরা পাখির ডানা থেকে ওকে বের করে দেবে। এটা খুব দরকার ছিলো। তরুদা ভালো মানুষ, কিন্তু খারাপের সঙ্গে থাকলে এমন খেসারত দিতেই হয় ভালো মানুষকেও।"
বৌদি বললো, "দু লাখটা একটু বেশি হয়ে গেলো না? আমাদের কোনো ক্ষতি তো ওরা করতে পারেনি?"
আমি হেসে বললাম, "তাহলে কি আমাদের ক্ষতিপূরণ পাবার জন্য ক্ষতি হয়ে যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা উচিৎ? ক্ষতি হবার আগেই আটকানো ভালো। আর একটা ট্যুর কোম্পানির জন্য দু আড়াই লাখ টাকা এমন কিছু ব্যাপার না। দু একটা ট্যুর থেকে তুলে নেবে ওরা। কিন্তু সাবধান হয়ে যাবে আজেবাজে লোক দলে নেবার ব্যাপারে।
আর শোনো বৌদি, চেকটা আমার নামে নিলাম কারণ আমি চাইনা ব্যপারটা মৃণালদা জানুক। এতো গুলো টাকা কেন পেলে তার জবাব দিতে হলে তোমাকে সত্যিটা বলতে হতো। তার চেয়ে আমার নামেই থাক। কলকাতায় ফিরে আমার কাছে এসো। আমি তোমার নামে ফিক্সড ডিপোজিট করে দেবো টাকাটা। যদি সত্যিই তোমার কোল আলো করে কেউ আসে, তার ভবিষ্যতের জন্য এটা ভীষণ দরকারী হবে। আর একটা অনুরোধ বৌদি, এর সাথে আমার তরফ থেকেও কিছু দিতে চাই, না করতে পারবে না।"
বৌদি বললো, " না না তমাল, তুমি যা দিয়েছো তাই এ জীবনের জন্য যথেষ্ট। আর কিছু দিতে হবে না তোমাকে!"
আমি বললাম, "তোমাকে তো দেবো না? তোমাকে তো দেবো অন্য জিনিস, যতোবার আমার কাছে আসবে ততোবার। কিন্তু এটক দেবো যে আসবে তার জন্য। দাবী না রাখলেও বায়োলজিকাল ফাদার হিসাবে আমারও তো একটা কর্তব্য থাকে? এই একবারই কিছু করতে দাও, আর আমি কখনো দাবী করবো না।"
বৌদি কোনো কথা বললো না। শাড়ির আঁচল দিয়ে একবার চোখ মুছে নিলো শুধু।
আমরা হোটেলে ফিরে দেখি রিয়া আর অঙ্কিতা অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য। তাদের বিস্তারিত ভাবে সবটা জানালাম। ভীষণ খুশি হলো দুজনে। রিয়া বললো, "ঠিক হয়েছে, উচিৎ শিক্ষা হয়েছে।"
আমি রিয়াকে বললাম, "আজ তোমরা ট্যুরের লাকি মেম্বার হবে। এবং তোমাদের প্যাকেজটা ফ্রি ঘোষনা করা হবে। এটা এখনি বাবা মা কে জানিও না। ইন ফ্যাক্ট তুমি এই ব্যাপারে কিছুই জানো না, মনে রেখো।"
রিয়া বললো, " হি হি, বেশ মজা তো, ফ্রি তে কাশ্মীর ভ্রমণ হয়ে গেলো! আমার তো তাহলে তোমাদের একদিন ট্রিট দেওয়া উচিৎ?"
অঙ্কিতা বললো, "ট্রিট তো আমার দেবার কথা। কিছু না করেই পনেরো হাজার টাকা ফেরত পেয়ে গেলাম। কলকাতায় ফিরে একদিন তমালের বাড়িতে হবে ট্রিটটা। মেইন কোর্স আমার দায়িত্ব, কিন্তু স্টার্টার আর ডেসার্ট হবে তমালের, তার নিজস্ব ফ্যাক্টরির পায়েশ দিয়ে!" সবাই অঙ্কিতার কথা শুনে হেসে গড়িয়ে পড়লো।
প্রত্যাশা মতো ঘোষনাটা হলো। লাকি ড্র তে রিয়ার পরিবার ফ্রি প্যাকেজ উপহার হিসাবে পাচ্ছে। আমরা সবাই এই হঠাৎ পাওয়া খবরে উল্লসিত হয়ে আনন্দে চিৎকার করে উঠলাম। অনেকে এসে রিয়ার বাবা মা কে অভিনন্দন জানিয়ে গেলো।
রাতের দিকে আরও একটা খবর পেলাম কর্মচারীদের মুখে। এটাও আমাদের অজানা। পাখির ডানার পার্টনার পঞ্চানন আর তার সহকারী বসন্ত ট্যুর কম্পানির ক্যাশ থেকে দু লাখ টাকা চুরি করেছে। সেই টাকার ভাগ বাটোয়ারা নিয়ে নিজেদের মধ্যে মারামারিও করেছে। তাদের সারা গায়ে আঘাতের চিহ্ন স্পষ্ট প্রমাণ। পুলিশ দু'জনকেই তুলে নিয়ে গেছে।
সংবাদদাতা কর্মচারীকে লুকিয়ে একটু মুচকি হেসে নিলাম, আর মনে মনে সেই দেবতুল্য মেষপালক ভদ্রলোককে ধন্যবাদ দিলাম ওদের শরীরে অনেক আঘাতের চিহ্ন এঁকে দেবার জন্য।
রিয়া খবরটা শুনে বললো, "আচ্ছা, আমরা চলে গেলে তো তরুদা কেস তুলে নেবে। আবার তো যেই কে সেই হয়ে যাবে তমাল?"
আমি বললাম, "আমার তা মনে হয়না। কেস হয়তো তুলে নেবে, কারণ পশ্চিমবাংলা থেকে এসে এখানে কোর্টে হাজিরা দেওয়া সহজ নয় তাই। কিন্তু আর পাঁচু এবং বসন্তকে দলে নেবে না আমি শিওর। তা যদি হতো তাহলে চুরির পরিমান ঠিক বৌদিকে দেওয়া দু লাখ বলতো না। এক ঠিলে দুই পাখি মারলো তরুদা। দু লাখ টাকা এবার পাঁচুর অংশীদারিত্ব থেকে কেটে নেবে। আর অপরাধের জন্য পার্টনারশিপ ও বাতিল করে দেবে।"
এতো গুলো ভালো খবরে বিকালে তৈরি হওয়া গুমোট ভাবটা কেটে গেলো আমাদের মনের। সবাই আবার আগের মতো হাসিখুশি হয়ে উঠলো। কিন্তু সেই খুশি বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। আজ আর আমরা একসাথে থাকতে পারবো না। কাল খুব সকালেই ফেরার পথে যাত্রা করতে হবে আমাদের। রিয়া আর তার পরিবার অমৃতসর যাবে, তাদের গাড়ি আলাদা। তাই রিয়াকে আজ রাতে তার বাবা মায়ের সাথেই থাকতে হবে। মৃণালদা তার তাস পার্টিকে বিদায় দিয়ে এই হোটেলে এসে উঠবে। অঙ্কিতা মা আর গায়েত্রী মাসিমার কাছে চলে যাবে কারণ পাশের ঘরটা উমা বৌদিরা ব্যবহার করবে। আমি অবশ্য একাই থাকবো।
এই সব কারণে সবার ভীষণ মন খারাপ। ডিনারের পরে রিয়া আর তার বাবা মা আমাদের কাছে বিদায় নিয়ে, কলকাতায় তাদের বাড়িতে নিমন্ত্রণ জানিয়ে নিজেদের হোটেলে চলে গেলো। আমরা বাকী তিন পরিবার ব্যাগ প্যাক করতে লেগে গেলাম। খুব ভোরে বেরিয়ে পড়তে হবে।
গল্পটা অফিশিয়ালি এখানেই শেষ করছি, কারণ এর পরের অংশটা এই গল্পের সাথে সামঞ্জস্যহীন। তবুও একটু না বললে কাশ্মীর ভ্রমণ অসম্পূর্ণ থাকে বলেই সংক্ষেপে বলছি।পর দিন খুব ভোরে বেরিয়ে আমরা দশটা নাগাদ কাটরা পৌঁছলাম। সেখানে একটা হোটেলের দুটো ঘর ভাড়া নিয়ে ব্যাগ পত্র রেখে আমরা বেরিয়ে বিশ্রাম নিলাম। সন্ধ্যে নাগাদ বেরিয়ে পড়লাম বৈষ্ণদেবী দর্শনে। সবার জন্যই ঘোড়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিলো, কারণ আমাদের হাতে অনেক টাকা ছিলো পাখির ডানার থেকে পাওয়া। শেষ সাত কিলোমিটার শুধু মা মাসিমা আর মৃণালদার জন্য বৈদ্যুতিক যানের ব্যবস্থা হলো। আমি অঙ্কিতা আর উমা বৌদি হেঁটেই উঠলাম। পূজো সেরে আবার একই ভাবে ফিরে এলাম হোটেলে। পুরো যাত্রা পথের বিস্তারিত বর্ননায় গেলাম না, কারণ চোদাচুদির গল্পে সেই পূণ্যযাত্রার কাহিনী ম্যাচ করবে না।
আমরা হোটেলে ফিরে ঘুম লাগালাম। কারণ সবাই ভীষণ ক্লান্ত ছিলো। সময় মতো একটা গাড়ি ভাড়া করে পৌঁছে গেলাম জম্মু স্টেশন। সেখান থেকে হিমগিরি এক্সপ্রেস ধরে কলকাতার উদ্দেশ্যে পাড়ি জমালাম। রিয়ারা লুধিয়ানা থেকে উঠবে।
আমাদের তিনজনের সীট একই সাথে ছিলো, কিন্তু রিয়াদের সীট পড়েছিলো এবার অনেক দূরে। হাওড়া স্টেশনে নামার আগে আর দেখা হয়নি তাদের সাথে। এ কদিনে আমরা চারজন মিলে এতো মজা করেছি যে ফেরার পথে আর আমাদের লুকিয়ে বাথরুমে যেতে হয়নি। গল্প করতে করতেই সময়টা কাটিয়ে দিয়েছি।
হাওড়া স্টেশনে নেমে শুরু হলো কান্নাকাটি। যে যাকে পারছে জড়িয়ে ধরে কাঁদছে। মা আর গায়েত্রী মাসিমার কান্না তো বাংলা সিরিয়ালকেও হার মানিয়ে দিলো। এক ফাঁকে উমা বৌদি আমার কাছে এসে চুপিচুপি বললো, "দুটো নাম ঠিক করে রেখো। একটা ছেলের একটা মেয়ের।" বলেই সরে গেলো আমার কাছ থেকে।
সব আনন্দই এক সময় শেষ হয়, সব কান্নাও। আমাদের বিদায় লগ্নও এসে গেলো। এবার যার যার পথে যেতে হবে। হাসি কান্নার মালা গলায় ঝুলিয়ে নিয়ে যে যার বাড়ির পথ ধরলাম।
আমাদের ট্যাক্সিটা হাওড়া স্টেশন থেকে উত্তর কলকাতার দিকে ছুটে চলেছে। জানালা দিয়ে আবার সেই ধুলো ধোঁয়া ঢাকা আকাশ আর প্রিয় শহরের পরিচিত কোলাহল শুনতে পাচ্ছি। সীটে আরাম করে হেলান দিয়ে বসে চেয়ে ছিলাম বাইরের দিকে। গত চোদ্দদিনের অসংখ্য স্মৃতি একসাথে ভীড় করে এলো মনে। কতো কথা, কতো হাসি, আনন্দ, রঙ্গ তামাশা, চিরকাল মনের কোনে জ্বলজ্বল করবে।
সবাই কতোকিছু ফিরে পেলো এই ক'দিনে। রিয়ার বাবা মা ফিরে পেলো পুরানো রিয়াকে, রিয়া ফিরে পেলো জীবনের মানে, মৃণালদা ফিরে পেলো উমা বৌদির হাসি আর মনের গভীরে লালিত একটা সন্তানের আশা, অঙ্কিতা ফিরে পেলো মানুষ আর ভালোবাসার প্রতি বিশ্বাস, মা ফিরে পেলো সখীর সাথে কাটানো ছেলেবেলার মতো কিছু মুহুর্ত, আর আমি? আমি কি পেলাম?

kingsuk25@ জিমেইল ডট কম


![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)
