Posts: 122
Threads: 7
Likes Received: 469 in 152 posts
Likes Given: 68
Joined: Jan 2023
Reputation:
40
অধ্যায় ২১ : যে কথায় হাত কেঁপে উঠল
সেদিন সন্ধ্যায় কাশীপুরে কুয়াশা একটু আগেই নেমেছিল।
শীত যত বাড়ছে, দিন তত ছোট হয়ে আসছে।
সূর্য ডোবার পর যেন পুরো গ্রামটাকে ধীরে ধীরে একটা সাদা, নিঃশব্দ চাদর ঢেকে ফেলছে।
⸻
হরিপদ মাস্টার নিজের উঠোনে বসেছিলেন।
পুরোনো কাঠের চেয়ারে।
গায়ে ধূসর চাদর।
হাতে পিতলের গ্লাস।
চায়ের ধোঁয়া ধীরে ধীরে উঠছে।
⸻
বয়স হয়েছে।
আগের মতো হাঁটতে পারেন না।
তবু গ্রামের লোকজন এখনও তাকে “মাস্টারমশাই” বলেই ডাকে।
সম্মান করে।
পরামর্শ নেয়।
কোনো ঝামেলা হলে ডেকে আনে।
⸻
তার নাতি কার্তিক তখন উঠোনেই বসে ছিল।
কলেজের খাতা খুলে।
যদিও পড়ার চেয়ে গল্পেই তার বেশি মন।
⸻
— দাদু?
— হুঁ?
— একটা কথা বলি?
— বল।
⸻
কার্তিক কিছুক্ষণ ইতস্তত করল।
তারপর বলল,
— সেদিন যে জায়গার কথা বলছিলে…
হরিপদ মাস্টারের চোখ ধীরে ধীরে উঠল।
⸻
— কোন জায়গা?
— ওই মাঠের পরের দিকটা…
— হুঁ।
⸻
— রতন গিয়েছিল।
⸻
চায়ের গ্লাসটা হরিপদ মাস্টারের হাতে থেমে গেল।
⸻
এক মুহূর্ত।
দুই মুহূর্ত।
⸻
— কী বললি?
গলার স্বর বদলে গেছে।
কার্তিক নিজেও বুঝতে পারল।
⸻
— রতন গিয়েছিল।
— কোথায়?
— ওইদিকে।
⸻
হরিপদ মাস্টারের আঙুল শক্ত হয়ে উঠল।
পিতলের গ্লাসে টুং করে একটা শব্দ হলো।
⸻
— কে বলল?
— আমি নিজেই দেখেছি।
— কবে?
— কয়েকদিন আগে।
⸻
হরিপদ মাস্টারের মুখের রং যেন একটু ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
⸻
— একা?
— হ্যাঁ।
— সন্ধ্যার আগে?
⸻
কার্তিক থেমে গেল।
⸻
— না…
— তাহলে?
— সূর্য প্রায় ডুবে গিয়েছিল।
⸻
হরিপদ মাস্টারের হাত কেঁপে উঠল।
সত্যিই কেঁপে উঠল।
এতটা যে গ্লাসের চা তার আঙুলে পড়ে গেল।
⸻
— দাদু!
কার্তিক উঠে দাঁড়াল।
— কী হলো?
⸻
হরিপদ মাস্টার শুনলেনই না।
⸻
তার চোখ যেন কোথাও দূরে চলে গেছে।
অনেক দূরে।
অনেক বছর আগে।
⸻
কুয়াশা।
আগুন।
মন্ত্র।
কালো ধোঁয়া।
আর সেই মানুষটা।
⸻
হঠাৎ তার বুকের ভেতর ঠান্ডা একটা শীতলতা ছড়িয়ে পড়ল।
⸻
— না…
খুব আস্তে বললেন তিনি।
⸻
— দাদু?
⸻
— না…
⸻
— কী হয়েছে?
⸻
হরিপদ মাস্টার শুকনো ঠোঁট ভিজিয়ে নিলেন।
⸻
তারপর প্রায় নিজের সঙ্গেই কথা বলার মতো করে বললেন—
“তাহলে কি…
আবার শুরু হবে সেই…”
⸻
কথাটা শেষ করলেন না।
পারলেন না।
⸻
ঠিক তখনই ভেতর থেকে কার্তিকের ঠাকুমা ডাকলেন—
— কার্তিক! খেতে আয়!
⸻
কার্তিক উঠে দাঁড়াল।
⸻
— আসছি!
⸻
তারপর দাদুর দিকে তাকাল।
— তুমি আসবে?
⸻
হরিপদ মাস্টার কোনো উত্তর দিলেন না।
⸻
তিনি তখনও একই জায়গায় তাকিয়ে।
একইভাবে।
⸻
কার্তিক ভেতরে চলে গেল।
⸻
উঠোনে একা বসে রইলেন হরিপদ মাস্টার।
⸻
কুয়াশা আরও ঘন হচ্ছে।
⸻
দূরে একটা পেঁচা ডেকে উঠল।
⸻
হঠাৎ মনে হলো চারপাশের শব্দগুলো যেন অনেক দূরে সরে গেছে।
⸻
তার বুকের ভেতর ধুকপুক করছে।
⸻
কারণ তিনি জানেন।
অথবা অন্তত মনে করেন তিনি জানেন।
⸻
সেই জায়গা শুধু একটা গাছ নয়।
কখনও ছিল না।
⸻
আর যে মানুষটার কথা এত বছর ধরে কেউ উচ্চারণ করে না…
তার নামও সময় পুরো মুছে ফেলতে পারেনি।
⸻
সেদিন রাতে বহু বছর পর তিনি আবার পুরোনো কাঠের বাক্সটা খুললেন।
⸻
ভেতর থেকে বের করলেন একটা পুরোনো খাতা।
⸻
পাতাগুলো হলুদ।
ধারে ধারে ছিঁড়ে গেছে।
⸻
কাঁপা হাতে তিনি পাতা উল্টাতে লাগলেন।
⸻
একটা জায়গায় এসে থামলেন।
⸻
তার চোখ স্থির হয়ে গেল।
⸻
সেখানে কয়েকটা নাম লেখা।
কিছু তারিখ।
আর কিছু ঘটনা।
⸻
সবচেয়ে নিচে…
একটা নাম।
⸻
তিনি অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলেন।
⸻
তারপর খাতাটা বন্ধ করলেন।
⸻
আজ আর অপেক্ষা করা যাবে না।
⸻
কাল সকালেই রমাপদের সঙ্গে কথা বলতে হবে।
সব বলতে হবে।
⸻
হয়তো এতদিন বলা উচিত ছিল।
⸻
হয়তো অনেক আগেই।
⸻
বিছানায় শুয়েও সারা রাত ঘুম এল না।
⸻
বারবার মনে হচ্ছিল—
সময় ফুরিয়ে আসছে।
⸻
আর সেই একই রাতে…
রতন ঘুমের মধ্যে আবার স্বপ্ন দেখল।
⸻
এইবার আগুনটা আরও কাছে।
⸻
ধোঁয়াটা আরও ঘন।
⸻
আর অন্ধকারের মধ্যে বসে থাকা সেই ছায়ামূর্তিটা…
আগের চেয়ে স্পষ্ট।
⸻
মুখ এখনও দেখা যায় না।
⸻
কিন্তু এবার…
সে যেন ধীরে ধীরে মাথা তুলছে।
⸻
যেন বহুদিনের অপেক্ষার পর…
অবশেষে কেউ তার ডাক শুনেছে।
⸻
রতনের ঘুম ভাঙল হঠাৎ।
⸻
ঘর অন্ধকার।
⸻
চারপাশ নিস্তব্ধ।
⸻
কিন্তু কেন জানি তার মনে হলো—
সে ঘরে একা নেই।
⸻
একদম একা নয়।
⸻
সে ধীরে ধীরে মাথা ঘুরিয়ে জানলার দিকে তাকাল।
⸻
কিছুই নেই।
⸻
তবু…
তার বুকের ভেতর বরফের মতো ঠান্ডা একটা অনুভূতি জমে রইল।
⸻
আর দূরে কোথাও, কুয়াশার আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকা সেই বিশাল গাছটার শিকড়ের ফাঁকে, রাতের অন্ধকার যেন আগের চেয়ে একটু বেশি গভীর হয়ে উঠল।
Posts: 122
Threads: 7
Likes Received: 469 in 152 posts
Likes Given: 68
Joined: Jan 2023
Reputation:
40
ফ্ল্যাশব্যাক : হরিপদ মাস্টারের দাদুর গল্প
সেই রাতেও ঘুম আসছিল না হরিপদ মাস্টারের।
বিছানায় শুয়ে শুয়ে তিনি জানলার বাইরে তাকিয়ে ছিলেন।
কুয়াশা।
নিঃশব্দ অন্ধকার।
আর দূরে কোথাও কুকুরের ডাক।
⸻
তারপর হঠাৎ মনে পড়ে গেল বহু বছরের পুরোনো একটা কথা।
একটা গল্প।
না…
গল্প নয়।
তার দাদুর মুখে শোনা একটা ঘটনা।
⸻
তখন হরিপদ ছোট।
দশ-এগারো বছরের বেশি নয়।
শীতের রাতে দাদুর গা ঘেঁষে বসে থাকত।
আর দাদু মাঝে মাঝে পুরোনো দিনের কথা বলতেন।
⸻
সেইসব গল্পের মধ্যে একটা গল্প ছিল।
যে গল্পের শেষ পর্যন্ত তিনি কোনোদিন শুনতে পারেননি।
⸻
দাদু বলতেন—
“তুই যে বটগাছটা দেখিস না মাঠের ওদিকটায়…
ওটা সবসময় এমন ছিল না।”
⸻
তখনও কাশীপুর এত বড় হয়নি।
বাড়িঘর কম।
জঙ্গল বেশি।
⸻
একদিন এক লোক এল।
কোথা থেকে এসেছে কেউ জানে না।
⸻
লম্বা মানুষ।
শুকনো চেহারা।
জট বাঁধা চুল।
কাঁধ পর্যন্ত নেমে এসেছে।
চোখ দুটো অদ্ভুত।
কখনও স্থির।
কখনও অস্বাভাবিক উজ্জ্বল।
⸻
লোকটা নিজেকে সাধক বলত।
⸻
প্রথমদিকে গ্রামের মানুষ তাকে সম্মানই করত।
⸻
কেউ দুধ দিত।
কেউ ভাত।
কেউ শীতের রাতে চাদর।
⸻
লোকটা সবসময় হেসে কথা বলত।
ধীরে ধীরে।
ভদ্রভাবে।
⸻
আর অদ্ভুতভাবে গ্রামের মানুষের কিছু কিছু ব্যাপার আগে থেকেই বলে দিতে পারত।
⸻
কারও গরু হারাবে।
কারও ফসল নষ্ট হবে।
কারও বাড়িতে অসুখ আসবে।
⸻
সব না।
তবু কয়েকটা এত নিখুঁতভাবে মিলেছিল যে গ্রামের মানুষ অবাক হয়ে গিয়েছিল।
⸻
তারপর…
কিছু বদলাতে শুরু করল।
⸻
ধীরে।
খুব ধীরে।
⸻
কয়েকজন মহিলা তার নাম শুনলে মুখ গম্ভীর করে ফেলতেন।
⸻
কেউ কিছু বলতেন না।
কিন্তু অস্বস্তি ছিল।
⸻
কিছু একটা ঠিক ছিল না।
⸻
একদিন গ্রামের একজন বয়স্ক মহিলা বলেছিলেন—
“লোকটার চোখ ভালো না।”
⸻
কেউ গুরুত্ব দেয়নি।
⸻
তারপর আরও কয়েক মাস কেটে যায়।
⸻
হঠাৎ একদিন…
গ্রামের এক বিবাহিতা মহিলা নিখোঁজ হয়ে যান।
⸻
সারারাত খোঁজাখুঁজি।
⸻
ভোরের দিকে তাকে পাওয়া যায়।
গ্রামের বাইরে।
একটা ঝোপের কাছে।
⸻
তিনি তখনও কাঁপছিলেন।
⸻
চোখে আতঙ্ক।
⸻
লোকজন জিজ্ঞেস করেছিল—
— কী হয়েছিল?
⸻
তিনি উত্তর দেননি।
⸻
শুধু একবার বলেছিলেন—
“ওর চোখের দিকে তাকিয়ো না…”
⸻
তারপর আর কিছু বলেননি।
⸻
ঘটনার পরে পুরো গ্রাম অস্থির হয়ে উঠেছিল।
⸻
কিন্তু আসল ঘটনা ঘটল কয়েক সপ্তাহ পরে।
⸻
এক শীতের রাতে।
⸻
কুয়াশা নেমেছে।
⸻
বেশিরভাগ মানুষ ঘুমিয়ে।
⸻
ঠিক তখন গ্রামের কয়েকজন দূরে আগুনের আলো দেখতে পেল।
⸻
বটগাছের দিক থেকে।
⸻
প্রথমে ভাবল কেউ হয়তো আগুন জ্বালিয়েছে।
⸻
কিন্তু আলোটা স্বাভাবিক ছিল না।
⸻
স্থির না।
⸻
নাচছিল।
⸻
আর তার সঙ্গে ভেসে আসছিল মন্ত্রের মতো শব্দ।
⸻
নিচু।
⸻
অস্পষ্ট।
⸻
শুনলে শরীর ঠান্ডা হয়ে যায়।
⸻
গ্রামের কয়েকজন সাহসী লোক এগিয়ে গেল।
⸻
তারা ভেবেছিল চোর।
অথবা ডাকাত।
⸻
কিন্তু কাছে গিয়ে…
তারা যা দেখেছিল…
সেটা নিয়ে পরে কেউ স্পষ্ট করে কথা বলতে চাইত না।
⸻
শুধু দাদু একবার বলেছিলেন—
“সেদিন ওর আসল মুখ বেরিয়ে এসেছিল।”
⸻
ছোট হরিপদ জিজ্ঞেস করেছিল—
— কী দেখেছিলে?
⸻
দাদু অনেকক্ষণ চুপ ছিলেন।
⸻
তারপর বলেছিলেন—
“সব জানতে নেই।”
⸻
সেই ঘটনার পর আর কেউ লোকটাকে সাধু বলত না।
⸻
তার নামও মানুষ মুখে আনত না।
⸻
খবর ছড়িয়ে পড়ল আশপাশের গ্রামে।
⸻
তারপর আরও দূরে।
⸻
অবশেষে কয়েক মাস পরে…
কাশী থেকে কয়েকজন তপস্বী এলেন।
⸻
সাধারণ মানুষ না।
⸻
বৃদ্ধ।
গম্ভীর।
⸻
তাদের একজন বটগাছটা দেখে অনেকক্ষণ চুপ করে ছিলেন।
⸻
তারপর বলেছিলেন—
“এখানে বহুদিন ধরে অশুভ সাধনা হয়েছে।”
⸻
আরেকজন মাটির দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন—
“যা জেগেছে, তাকে ধ্বংস করা যাবে না।
কেবল বেঁধে রাখা যাবে।”
⸻
তারপর শুরু হয়েছিল কয়েকদিনের এক অদ্ভুত আচার।
⸻
বটগাছের চারপাশে মাটি খোঁড়া হয়েছিল।
⸻
মন্ত্রপাঠ হয়েছিল।
⸻
লাল আর হলুদ সুতো টানা হয়েছিল।
⸻
খুঁটি পোঁতা হয়েছিল।
⸻
মাটির নিচে কিছু পুঁতে দেওয়া হয়েছিল।
⸻
সেই সময় গ্রামের কাউকে কাছে যেতে দেওয়া হয়নি।
⸻
শেষদিন সেই বৃদ্ধ তপস্বী গ্রামের মানুষদের বলেছিলেন—
“এই গণ্ডির ভেতরে কেউ যাবে না।”
⸻
— কেন?
লোকজন জিজ্ঞেস করেছিল।
⸻
বৃদ্ধ মানুষটা উত্তর দিয়েছিলেন—
“যে বন্দি আছে…
সে মুক্তি চাইবে।”
⸻
— আর যদি কেউ যায়?
⸻
বৃদ্ধ কিছুক্ষণ চুপ করে ছিলেন।
⸻
তারপর বলেছিলেন—
“তাহলে সে হয়তো পথ খুঁজে পাবে।”
⸻
এতটুকুই দাদু বলেছিলেন।
⸻
এরপর যতবার হরিপদ প্রশ্ন করেছে—
ততবারই দাদু চুপ করে গেছেন।
⸻
আর এখন…
এত বছর পরে…
অন্ধকার ঘরে বসে হরিপদ মাস্টারের মনে হচ্ছিল—
রতন কি সেই পথটাই খুলে ফেলেছে?
⸻
জানলার বাইরে কুয়াশা আরও ঘন হচ্ছিল।
⸻
আর বহু দূরে…
অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকা সেই বিশাল বটগাছটা যেন নিঃশব্দে অপেক্ষা করছিল।
•
Posts: 122
Threads: 7
Likes Received: 469 in 152 posts
Likes Given: 68
Joined: Jan 2023
Reputation:
40
অধ্যায় ২২ : শেষ সতর্কবার্তা
সারা রাত হরিপদ মাস্টারের চোখে ঘুম এল না।
পুরোনো খাতাটা তার সামনে খোলা।
হারিকেনের হলদে আলোয় পাতাগুলো আরও পুরোনো লাগছে।
বাইরে কুয়াশা।
ঘরের ভেতর নিস্তব্ধতা।
আর তার বুকের ভেতর অজানা এক আশঙ্কা।
⸻
দাদু আরও একটা কথা বলেছিলেন।
অনেক বছর আগে।
যেটা হরিপদ প্রায় ভুলেই গিয়েছিলেন।
⸻
সেই সময় যখন গ্রামে অশান্তি শুরু হয়েছিল, তখন কাশীপুরেই এসেছিলেন এক সন্ন্যাসী।
গ্রামের লোক নন।
তবে এই মাটির সঙ্গেই তার জন্মসূত্রের সম্পর্ক ছিল।
এখানেই তার পৈতৃক ভিটে।
অনেক বছর আগে সংসার ত্যাগ করেছিলেন।
তারপর দেশ ঘুরে সাধনা।
শেষমেশ কাশীতে আশ্রয়।
⸻
সেই মানুষটাই প্রথম বুঝেছিলেন—
বটগাছের নিচে থাকা লোকটা সাধারণ কেউ নয়।
⸻
আর তিনিই নাকি কাশীতে চিঠি লিখেছিলেন।
একটা না।
অনেকগুলো।
⸻
দাদু বলতেন,
“যারা পরে এসেছিল, তারা নিজেরা খবর পেয়ে আসেনি।
তাদের ডেকে আনা হয়েছিল।”
⸻
সেই সন্ন্যাসীর নাম এখন আর কেউ মনে রাখে না।
⸻
শুধু একটা কথা লোকমুখে রয়ে গেছে।
⸻
তান্ত্রিককে বন্দি করার সময় তিনিও উপস্থিত ছিলেন।
⸻
আর তিনি নাকি বলেছিলেন—
“একে মারা যাবে না।
এ যে শক্তির সঙ্গে খেলেছে, তা মৃত্যুর পরেও শেষ হয় না।”
⸻
সেই সংঘর্ষের কথা কেউ পুরো জানে না।
⸻
শুধু শোনা যায়—
সেদিন রাতভর ঝড় হয়েছিল।
আকাশে বিদ্যুৎ চমকেছিল।
বটগাছের ডাল ভেঙেছিল।
আর ভোর হওয়ার আগে গণ্ডি সম্পূর্ণ হয়েছিল।
⸻
তার দুদিন পরই সেই সন্ন্যাসী আবার কাশীর উদ্দেশে রওনা দেন।
⸻
তারপর…
কোনো খবর নেই।
⸻
তিনি বেঁচে ছিলেন কি না।
কোথায় গিয়েছিলেন।
কেউ জানে না।
⸻
হরিপদ মাস্টার দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
⸻
এত বছর হয়ে গেছে।
হয়তো মানুষটাও আর পৃথিবীতে নেই।
⸻
আর যদি সত্যিই না থাকেন…
তাহলে এখন গ্রামের মানুষকে কে বাঁচাবে?
⸻
ভোর হয়ে এল।
⸻
তিনি আর অপেক্ষা করলেন না।
⸻
আজই রমাপদের সঙ্গে কথা বলতে হবে।
আজই।
⸻
চাদর গায়ে জড়িয়ে তিনি বেরিয়ে পড়লেন।
⸻
কুয়াশা তখনও পুরো কাটেনি।
রাস্তার ধারে ঘাসে শিশির।
দূরে কারও উঠোন থেকে ধোঁয়া উঠছে।
⸻
হাঁটতে হাঁটতে তিনি বারবার ভাবছিলেন—
রতনের সঙ্গে কথা বলতে হবে।
দেরি করা যাবে না।
⸻
তার পা দ্রুত চলছিল।
যতটা দ্রুত তার বয়সে সম্ভব।
⸻
ঠিক তখনই…
তার বুকের ভেতর কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠল।
⸻
তিনি থেমে গেলেন।
⸻
এক হাত বুকে।
অন্য হাতে খাতাটা শক্ত করে ধরা।
⸻
শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে।
⸻
তিনি সামনে তাকালেন।
রমাপদদের বাড়ি আর খুব দূরে নয়।
⸻
আর একটু।
⸻
শুধু আর একটু।
⸻
কিন্তু পা আর এগোল না।
⸻
তার চোখের সামনে কুয়াশা যেন আরও ঘন হয়ে উঠল।
⸻
হঠাৎ…
তার মনে হলো দূরে বটগাছটার ছায়া দেখতে পাচ্ছেন।
অসম্ভব।
এই দূরত্ব থেকে দেখা যাওয়ার কথা নয়।
⸻
তবু যেন দেখলেন।
⸻
আর সেই ছায়ার নিচে…
কেউ দাঁড়িয়ে আছে।
⸻
একটা লম্বা অবয়ব।
স্থির।
অপেক্ষমাণ।
⸻
হরিপদ মাস্টার কিছু বলতে চাইলেন।
পারলেন না।
⸻
খাতাটা হাত থেকে পড়ে গেল।
⸻
মাটির ওপর।
⸻
শিশির ভেজা ঘাসের মধ্যে।
⸻
আর কয়েক মুহূর্ত পর রাস্তার ধারে নিস্তব্ধ হয়ে পড়ে রইলেন তিনি।
⸻
সকালে প্রথম তাকে দেখতে পায় এক দুধওয়ালা।
⸻
খবর ছড়িয়ে পড়ে পুরো গ্রামে।
⸻
লোকজন বলে—
“হৃদরোগ।”
“বয়স হয়েছিল।”
“ভাগ্যের লেখা।”
⸻
কেউ কোনো অস্বাভাবিকতা খুঁজে পায় না।
⸻
কিন্তু…
ভেজা মাটিতে পড়ে থাকা খাতার একটা পাতা বাতাসে উল্টে গিয়েছিল।
⸻
সেই পাতার ওপর কাঁপা হাতে লেখা ছিল মাত্র কয়েকটা শব্দ—
“গণ্ডি দুর্বল হলে…
সে পথ খুঁজে পাবে…”
⸻
আর সেই সময়, কাশীপুরের অন্যপ্রান্তে, রতন ঘুম থেকে উঠছিল।
সে জানত না—
গ্রামের একমাত্র মানুষ, যে হয়তো সবটা বুঝতে পেরেছিল, সে আর বেঁচে নেই।
Posts: 122
Threads: 7
Likes Received: 469 in 152 posts
Likes Given: 68
Joined: Jan 2023
Reputation:
40
অধ্যায় ২৩ : যে কথা রতনের ছিল না
হরিপদ মাস্টারের মৃত্যুর খবরটা কাশীপুরে ছড়িয়ে পড়তে বেশি সময় লাগল না।
সকালের কুয়াশা পুরো কাটার আগেই প্রায় সবাই জেনে গেল।
⸻
নরুর চায়ের দোকানে ভিড়।
⸻
— কাল বিকেলেও তো দেখলাম।
— একদম ভালোই ছিলেন।
— ভগবানের ডাকে কারও কিছু করার নেই।
⸻
কথা চলতেই থাকল।
চায়ের ভাঁড় থেকে ধোঁয়া উঠতে থাকল।
⸻
পুকুরঘাটেও একই আলোচনা।
⸻
মঞ্জু কাকিমা বললেন,
— এমন মানুষ আর হবে না।
⸻
পারুল পিসি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
⸻
— আমাদের ছেলেবেলায় কলেজে পড়িয়েছেন।
⸻
সবাই যেন বিশ্বাস করতে পারছিল না।
⸻
রমাপদও খবর শুনে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলেন।
⸻
কলেজে যাওয়ার আগে তিনি কিছুক্ষণ চুপ করে বসেছিলেন।
⸻
হরিপদ মাস্টারের সঙ্গে তার খুব ঘনিষ্ঠতা না থাকলেও গভীর শ্রদ্ধা ছিল।
⸻
কিন্তু একটা প্রশ্ন বারবার মাথায় আসছিল।
⸻
কাল সকালেই বা উনি কোথায় যাচ্ছিলেন?
⸻
কেন এত ভোরে বেরিয়েছিলেন?
⸻
কেউ জানে না।
⸻
আর ঠিক সেই সময়…
রতন উঠোনে বসে ছিল।
⸻
তার সামনে মাটির বাটিতে মুড়ি।
⸻
প্রতিমা রান্নাঘরে।
⸻
সাধারণ সকাল।
⸻
তবু আজ যেন সবকিছু একটু মলিন।
⸻
হরিপদ মাস্টারকে সে খুব কাছ থেকে চিনত না।
⸻
কিন্তু লোকটার মুখ মনে পড়ছিল।
⸻
আর আশ্চর্যভাবে…
তার মনে হচ্ছিল লোকটা যেন তাকে কিছু বলতে চাইছিল।
⸻
কিন্তু কী?
⸻
মনে পড়ছিল না।
⸻
একদম না।
⸻
সেদিন বিকেলে গ্রামের লোকজন যখন শেষকৃত্যের প্রস্তুতি নিচ্ছিল…
রতনও কার্তিকদের বাড়ির সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
⸻
অনেক মানুষ।
⸻
অনেক মুখ।
⸻
অনেক চাপা কথা।
⸻
কার্তিক চুপচাপ বসে ছিল।
⸻
চোখ লাল।
⸻
রতন তার পাশে গিয়ে দাঁড়াল।
⸻
কিছুক্ষণ কেউ কথা বলল না।
⸻
তারপর…
কোনো কারণ ছাড়াই…
রতনের মুখ থেকে একটা কথা বেরিয়ে এল।
⸻
— দাদু জানত।
⸻
কার্তিক চমকে তাকাল।
⸻
— কী?
⸻
রতনও থমকে গেল।
⸻
সে নিজেই বুঝতে পারল না কেন কথাটা বলল।
⸻
— কী জানত?
কার্তিক আবার জিজ্ঞেস করল।
⸻
রতন কিছুক্ষণ চুপ।
⸻
তার মাথার ভেতর যেন কুয়াশা।
⸻
— আমি…
⸻
— বল।
⸻
— জানি না।
⸻
সত্যিই জানত না।
⸻
সে কথা ঘুরিয়ে দিল।
⸻
কিন্তু কার্তিকের বুকের ভেতর হঠাৎ কেমন যেন করে উঠল।
⸻
কারণ দাদু মারা যাওয়ার আগের সন্ধ্যাতেও এমন অদ্ভুত আচরণ করেছিলেন।
⸻
সেই স্মৃতি হঠাৎ আবার ফিরে এল।
⸻
সন্ধ্যা নামতে শুরু করল।
⸻
গ্রামের ওপর ধীরে ধীরে অন্ধকার নেমে এল।
⸻
আর সেই রাতেই…
রতন আবার স্বপ্ন দেখল।
⸻
এবার আগের চেয়ে অনেক বেশি স্পষ্ট।
⸻
আগুন।
⸻
বটগাছ।
⸻
শিকড়।
⸻
লাল আর হলুদ কিছু একটা মাটির মধ্যে চাপা।
⸻
কেউ একজন মন্ত্র পড়ছে।
⸻
কিন্তু শব্দগুলো বোঝা যাচ্ছে না।
⸻
তারপর…
একটা কণ্ঠস্বর।
⸻
এই প্রথম।
⸻
একটা মাত্র শব্দ।
⸻
খুব নিচু স্বরে।
⸻
খুব কাছে থেকে।
⸻
যেন কানের পাশেই।
⸻
“রতন…”
⸻
সে চমকে উঠল।
⸻
স্বপ্নের মধ্যেই।
⸻
কারণ গলাটা তার নিজের না।
⸻
বাবার না।
⸻
মায়ের না।
⸻
কোনো পরিচিত মানুষের না।
⸻
গলাটা ছিল শুকনো।
⸻
পুরোনো।
⸻
যেন বহু বছর ধরে কেউ কথা বলেনি।
⸻
তারপর অন্ধকার।
⸻
সম্পূর্ণ অন্ধকার।
⸻
রতনের ঘুম ভাঙল।
⸻
সে হাঁপাচ্ছিল।
⸻
ঘর অন্ধকার।
⸻
জানলার ফাঁক দিয়ে সামান্য চাঁদের আলো ঢুকছে।
⸻
রমাপদ আর প্রতিমা ঘুমিয়ে।
⸻
সব ঠিক।
⸻
সব স্বাভাবিক।
⸻
তবু তার মনে হচ্ছিল…
ঘরে আরও একজন আছে।
⸻
ঠিক বিছানার পায়ের দিকে।
⸻
অন্ধকারে।
⸻
দাঁড়িয়ে।
⸻
সে তাকিয়ে রইল।
⸻
কিছু দেখা গেল না।
⸻
তবু অনুভূতিটা গেল না।
⸻
অনেকক্ষণ পর ধীরে ধীরে আবার শুয়ে পড়ল।
⸻
সকালে উঠে সে রাতের বেশিরভাগ কথাই ভুলে যাবে।
⸻
কিন্তু একটা জিনিস ভুলবে না।
⸻
ঘুম ভাঙার ঠিক আগে…
সে যেন কারও ফিসফিসানি শুনেছিল।
⸻
খুব আস্তে।
⸻
খুব ধীরে।
⸻
“এখন আর কেউ নেই…”
⸻
আর বহু দূরে…
কুয়াশার আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকা সেই বটগাছটার চারপাশে, মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকা পুরোনো লাল-হলুদ বন্ধনের কোথাও যেন অদৃশ্য একটা টান আরও একটু শক্ত হয়ে উঠল।
•
Posts: 122
Threads: 7
Likes Received: 469 in 152 posts
Likes Given: 68
Joined: Jan 2023
Reputation:
40
অধ্যায় ২৪ : প্রতিমার অস্বস্তি
হরিপদ মাস্টারের মৃত্যুর পর তিন দিন কেটে গেছে।
গ্রামের জীবন আবার ধীরে ধীরে আগের ছন্দে ফিরছে।
⸻
নরুর দোকানে আবার আড্ডা বসছে।
⸻
পুকুরঘাটে আবার মহিলাদের হাসির শব্দ শোনা যাচ্ছে।
⸻
কলেজে ক্লাস চলছে।
⸻
মাঠে খেলাও হচ্ছে।
⸻
তবু…
কিছু কিছু ঘটনা গ্রামের স্মৃতি থেকে এত সহজে মুছে যায় না।
⸻
হরিপদ মাস্টারের নাম এখনও মাঝেমধ্যে উঠে আসে।
⸻
আর কার্তিক এখনও আগের মতো হয়নি।
⸻
রতনও সেটা বুঝতে পারে।
⸻
তবু সে নিজেও আজকাল নিজের মধ্যেই যেন হারিয়ে যাচ্ছে।
⸻
সকালে প্রতিমা ডাকলেন,
— রতন!
⸻
কোনো উত্তর নেই।
⸻
— রে রতন!
⸻
তবুও না।
⸻
প্রতিমা ভাবলেন, হয়তো পড়ছে।
⸻
রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এসে দেখলেন, রতন উঠোনে বসে আছে।
⸻
চুপচাপ।
⸻
একদৃষ্টে তাকিয়ে।
⸻
সামনের আমগাছটার দিকে।
⸻
— ডাকছি, শুনতে পাচ্ছিস না?
⸻
রতন চমকে উঠল।
⸻
যেন অনেক দূর থেকে ফিরে এল।
⸻
— হ্যাঁ?
⸻
— কতক্ষণ ধরে ডাকছি।
⸻
— শুনিনি।
⸻
— কী ভাবছিলি?
⸻
রতন উত্তর দিল না।
⸻
কারণ সে নিজেও জানত না।
⸻
সে সত্যিই কী ভাবছিল?
⸻
মনে করার চেষ্টা করল।
⸻
পারল না।
⸻
শুধু মনে হলো…
কিছু একটা প্রায় মনে পড়ে গিয়েছিল।
⸻
তারপর আবার হারিয়ে গেছে।
⸻
সেদিন দুপুরে খাওয়ার সময় একটা ছোট ঘটনা ঘটল।
⸻
খুব ছোট।
⸻
কিন্তু প্রতিমার অস্বস্তি হলো।
⸻
কারণ তিনি রতনকে জিজ্ঞেস করেছিলেন,
— ডাল দেব?
⸻
রতন মাথা না তুলেই বলল,
— আগে নুনটা সরাও।
⸻
প্রতিমা অবাক।
⸻
— কেন?
⸻
— নুনের বাটি ওইখানে থাকলে পড়ে যাবে।
⸻
প্রতিমা বাটিটার দিকে তাকালেন।
⸻
ভালোভাবেই রাখা।
⸻
পড়ার কোনো সম্ভাবনাই নেই।
⸻
তিনি কিছু বললেন না।
⸻
কিন্তু ঠিক আধ মিনিট পরে…
তাকের ওপর বসে থাকা একটা বেড়াল লাফ দিল।
⸻
ধাক্কা খেল।
⸻
আর নুনের বাটিটা নিচে পড়ে গেল।
⸻
ঝনঝন শব্দ।
⸻
সাদা নুন ছড়িয়ে পড়ল মেঝেতে।
⸻
প্রতিমা স্থির হয়ে গেলেন।
⸻
রতনও থেমে গেল।
⸻
কারণ সে নিজেও জানত না সে কথাটা কীভাবে বলেছিল।
⸻
একটা কাঁটা যেন তার বুকের ভেতর বিঁধল।
⸻
এটা কি আন্দাজ?
⸻
নাকি…
⸻
সে আর ভাবল না।
⸻
সন্ধ্যায় মাঠে গিয়ে খেলল।
⸻
সব ঠিক।
⸻
সব স্বাভাবিক।
⸻
কিন্তু কার্তিক হঠাৎ বলল,
— তুই ঠিক আছিস তো?
⸻
— কেন?
⸻
— জানি না।
⸻
রতন হেসে উড়িয়ে দিতে গেল।
⸻
কিন্তু পারল না।
⸻
কারণ একই প্রশ্ন সে নিজেকেও করছে।
⸻
রাতে খাওয়া শেষ করে রমাপদ হারিকেনের আলোয় খাতা দেখছিলেন।
⸻
প্রতিমা চাল বাছছিলেন।
⸻
রতন বই খুলে বসেছিল।
⸻
হঠাৎ সে বলল,
— বাবা।
⸻
— কী?
⸻
— হরিপদ দাদু কি ভয় পেত?
⸻
রমাপদ চশমার ওপর দিয়ে তাকালেন।
⸻
— সবাই কিছু না কিছু ভয় পায়।
⸻
— উনি কী ভয় পেতেন?
⸻
প্রশ্নটা শুনে প্রতিমাও তাকালেন।
⸻
কারণ প্রশ্নটা অদ্ভুত।
⸻
রতন নিজেও জানে না কেন জিজ্ঞেস করল।
⸻
রমাপদ হেসে বললেন,
— মানুষ চলে গেলে এসব আর জানা যায় না।
⸻
রতন মাথা নেড়ে চুপ করে গেল।
⸻
কিন্তু তার ভেতরে যেন কেউ ফিসফিস করে বলল—
“জানা যায়…”
⸻
সে চমকে উঠল।
⸻
চারদিকে তাকাল।
⸻
কেউ না।
⸻
কিছু না।
⸻
শুধু নিজের হৃদস্পন্দন।
⸻
আর গভীর রাত।
⸻
সেই রাতে প্রতিমার ঘুম ভেঙে গেল।
⸻
কেন ভাঙল, তিনি বুঝতে পারলেন না।
⸻
হয়তো কোনো শব্দে।
⸻
হয়তো নিছকই।
⸻
তিনি চোখ খুললেন।
⸻
ঘর অন্ধকার।
⸻
রমাপদ ঘুমোচ্ছেন।
⸻
রতনের খাটও দেখা যাচ্ছে।
⸻
সব স্বাভাবিক।
⸻
তবু…
কিছু একটা যেন ঠিক নেই।
⸻
প্রতিমা ধীরে ধীরে উঠে বসলেন।
⸻
তারপর খেয়াল করলেন।
⸻
রতন ঘুমিয়ে আছে।
⸻
কিন্তু…
⸻
সে যেন কিছু বলছে।
⸻
খুব আস্তে।
⸻
ফিসফিস করে।
⸻
ঘুমের মধ্যেই।
⸻
প্রতিমা ভালো করে শোনার চেষ্টা করলেন।
⸻
শব্দগুলো স্পষ্ট না।
⸻
তবু মনে হলো—
রতন কারও সঙ্গে কথা বলছে।
⸻
একতরফা না।
⸻
যেন প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছে।
⸻
তার বুকের ভেতর ঠান্ডা একটা অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ল।
⸻
তিনি ধীরে ধীরে ছেলের কাছে এগিয়ে গেলেন।
⸻
আর ঠিক তখনই…
রতন খুব আস্তে একটা শব্দ উচ্চারণ করল।
⸻
একটা নাম।
⸻
এত আস্তে যে পুরোটা বোঝা গেল না।
⸻
শুধু প্রথম অক্ষরটা।
⸻
“নি…”
⸻
তারপর থেমে গেল।
⸻
আবার নীরবতা।
⸻
প্রতিমা কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলেন।
⸻
তারপর ধীরে ধীরে ফিরে এলেন।
⸻
নিজেকে বোঝালেন—
স্বপ্ন দেখছে।
এর বেশি কিছু না।
⸻
তবু সেই রাতে আর তার ঘুম এল না।
⸻
আর গ্রামের অন্যপ্রান্তে…
কার্তিক তার দাদুর ভেজা খাতাটা আবার খুলেছিল।
⸻
বেশিরভাগ লেখা নষ্ট।
⸻
কালি ছড়িয়ে গেছে।
⸻
কিন্তু একটা পাতায় এখনও কয়েকটা শব্দ পড়া যায়।
⸻
খুব কষ্টে।
⸻
খুব অস্পষ্টভাবে।
⸻
“…গণ্ডি…”
“…বট…”
“…নিরঞ্জ…”
⸻
তারপর বাকিটা মুছে গেছে।
⸻
কার্তিক শব্দটার দিকে তাকিয়ে রইল।
⸻
“নিরঞ্জ…”
⸻
এটা কি কোনো নাম?
⸻
নাকি অন্য কিছু?
⸻
সে জানত না।
⸻
কিন্তু বহু দূরে, অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকা বটগাছটার শিকড়ের নিচে চাপা পড়ে থাকা এক বিস্মৃত নাম যেন দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলল।
⸻
অনেকদিন পরে।
খুব অনেকদিন পরে।
কারও মুখে তার ছায়া আবার উচ্চারিত হয়েছে।
Posts: 122
Threads: 7
Likes Received: 469 in 152 posts
Likes Given: 68
Joined: Jan 2023
Reputation:
40
অধ্যায় ২৫ : এক মাস পরে
হরিপদ মাস্টারের মৃত্যুর পর প্রায় এক মাস কেটে গেছে।
শীত আরও নেমেছে।
সকালে মাঠে কুয়াশা এমন ঘন হয় যে দশ হাত দূরের মানুষও স্পষ্ট দেখা যায় না।
⸻
কাশীপুর আবার নিজের ছন্দে ফিরেছে।
⸻
লোকজন কাজে যায়।
⸻
কলেজ বসে।
⸻
সন্ধ্যায় চায়ের দোকানে আড্ডা হয়।
⸻
শুধু একটা জিনিস ধীরে ধীরে বদলেছে।
⸻
রতন।
⸻
আর মজার ব্যাপার হলো…
কেউ সেটা খেয়ালই করছে না।
⸻
কারণ পরিবর্তনটা এত ধীরে হয়েছে।
⸻
আজকাল রতন কম কথা বলে।
⸻
কিন্তু যখন বলে…
অদ্ভুতভাবে ঠিক কথা বলে।
⸻
প্রথম ঘটনা ঘটেছিল মঞ্জু কাকিমার বাড়িতে।
⸻
অনেকদিন ধরে একটা রুপোর পুরোনো মল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না।
⸻
ঘর তন্নতন্ন করে খোঁজা হয়েছে।
⸻
উঠোন খোঁজা হয়েছে।
⸻
পুকুরঘাটও।
⸻
কোথাও নেই।
⸻
রতন সেদিন সেখানে দাঁড়িয়ে ছিল।
⸻
হঠাৎ বলল—
— চৌকিটার নিচে দেখেছেন?
⸻
মঞ্জু কাকিমা হেসে উঠলেন।
⸻
— ওখানে দশবার দেখা হয়েছে।
⸻
তবু আরেকবার দেখা হলো।
⸻
আর সেখানেই পাওয়া গেল।
⸻
সবাই অবাক।
⸻
রতনও।
⸻
কারণ সে নিজেও জানত না কেন কথাটা বলেছিল।
⸻
এরকম আরও দু-একটা ঘটনা ঘটল।
⸻
ছোটখাটো।
⸻
তেমন গুরুত্ব দেওয়ার মতো নয়।
⸻
তবু লোকজন বলতে শুরু করল—
— ছেলেটার মাথা ভালো।
⸻
— বুদ্ধি বেড়েছে।
⸻
— বাবার মতো হবে।
⸻
আর দূরে কোথাও…
কেউ যেন নিঃশব্দে হাসল।
⸻
কারণ এটাই তো দরকার ছিল।
⸻
ভয় না।
⸻
বিশ্বাস।
⸻
সেদিন সন্ধ্যায় রতন মাঠ থেকে ফিরছিল।
⸻
কার্তিক পাশে।
⸻
আকাশে লাল আলো।
⸻
পাখিরা বাসায় ফিরছে।
⸻
হঠাৎ রতন থেমে গেল।
⸻
রাস্তার ধারে একটা ভাঙা কুঁড়েঘরের দিকে তাকিয়ে।
⸻
কার্তিক বলল,
— কী হলো?
⸻
রতন উত্তর দিল না।
⸻
কয়েক সেকেন্ড পরে বলল,
— এখানে আগে একজন থাকত।
⸻
— থাকত তো।
⸻
— বাঁ পায়ে একটু খুঁড়িয়ে হাঁটত।
⸻
কার্তিক ভুরু কুঁচকাল।
⸻
— তুই জানলি কী করে?
⸻
রতন তাকাল।
⸻
তারপর বলল,
— জানি না।
⸻
সত্যিই জানত না।
⸻
কারণ লোকটাকে সে কখনও দেখেনি।
⸻
লোকটা মারা গেছে তার জন্মেরও আগে।
⸻
তবু…
তার মাথার ভেতর ছবিটার মতো ভেসে উঠেছিল।
⸻
যেন কোনো স্মৃতি।
⸻
কিন্তু স্মৃতিটা তার নয়।
⸻
সেই রাতে প্রতিমা প্রথমবার সত্যি সত্যি ভয় পেলেন।
⸻
খুব ছোট একটা কারণে।
⸻
রতন খাচ্ছিল।
⸻
ভাত।
ডাল।
আলুভাজা।
⸻
হঠাৎ সে খাওয়া থামিয়ে দিল।
⸻
মাথা তুলে তাকাল দরজার দিকে।
⸻
কয়েক সেকেন্ড।
⸻
তারপর আবার খেতে শুরু করল।
⸻
প্রতিমা বললেন,
— কী দেখলি?
⸻
— কিছু না।
⸻
— তাহলে তাকিয়ে ছিলি কেন?
⸻
রতন থেমে গেল।
⸻
সত্যিই তো।
⸻
সে তাকিয়ে ছিল কেন?
⸻
মনে করার চেষ্টা করল।
⸻
তারপর কাঁপা গলায় বলল—
— মনে হলো কেউ দাঁড়িয়ে ছিল।
⸻
ঘরের ভেতর হঠাৎ নীরবতা নেমে এল।
⸻
রমাপদ হাসলেন।
⸻
— সন্ধ্যার আলোছায়া।
⸻
— হয়তো।
⸻
রতন মাথা নেড়ে আবার খেতে লাগল।
⸻
কিন্তু প্রতিমা খেয়াল করলেন—
ছেলের হাতটা সামান্য কাঁপছে।
⸻
সেই রাত।
⸻
গভীর রাত।
⸻
সবাই ঘুমিয়ে।
⸻
রতনও।
⸻
কিন্তু আজ স্বপ্নটা অন্যরকম।
⸻
এই প্রথম।
⸻
সে বটগাছটাকে কাছ থেকে দেখল।
⸻
খুব কাছ থেকে।
⸻
এত কাছে আগে কখনও না।
⸻
শিকড়।
⸻
অন্ধকার।
⸻
মাটির গন্ধ।
⸻
আর মাটির নিচে…
কিছু একটা।
⸻
লাল।
⸻
হলুদ।
⸻
পচে যাওয়া সুতো।
⸻
ভাঙা খুঁটি।
⸻
মাটির চাপে আধ ডুবে আছে।
⸻
তারপর সেই কণ্ঠস্বর।
⸻
আগের চেয়ে স্পষ্ট।
⸻
অনেক স্পষ্ট।
⸻
“দেখেছ?”
⸻
রতনের বুক ধক করে উঠল।
⸻
সে উত্তর দিল না।
⸻
দিতে চাইলও না।
⸻
কিন্তু তার মুখ নিজে থেকেই খুলে গেল।
⸻
“হ্যাঁ…”
⸻
তারপর সে নিজেই ভয় পেয়ে গেল।
⸻
কারণ সে জানত—
স্বপ্নের মধ্যে সে উত্তর দিয়েছে।
⸻
আর সঙ্গে সঙ্গে অন্ধকারের মধ্যে যেন একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস শোনা গেল।
⸻
সন্তুষ্ট।
⸻
অপেক্ষমাণ।
⸻
“ভালো…”
⸻
এই একটুকু শব্দ।
⸻
তারপর সব মিলিয়ে গেল।
⸻
ভোরে ঘুম ভাঙার পর রতনের কিছুই মনে রইল না।
⸻
শুধু একটা অদ্ভুত অনুভূতি।
⸻
যেন সে কারও সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ কথা বলেছে।
⸻
আর সেই কারও কাছে…
অজান্তেই একটা দরজা একটু বেশি খুলে দিয়েছে।
⸻
দূরে, বহুদিনের পুরোনো বটগাছটার শিকড়ের নিচে, মাটির গভীরে চাপা পড়ে থাকা ভাঙা বন্ধনের কোথাও যেন একটা সূক্ষ্ম ফাটল আরও একটু চওড়া হয়ে উঠল।
Posts: 122
Threads: 7
Likes Received: 469 in 152 posts
Likes Given: 68
Joined: Jan 2023
Reputation:
40
অধ্যায় ২৬ : যে দৃষ্টি রতনের নয়
পৌষ মাস প্রায় শেষের দিকে।
শীত এখনও আছে।
তবে সকালের কুয়াশা আগের মতো ঘন নয়।
⸻
এক মাসে অনেক কিছু বদলেছে।
⸻
আবার অনেক কিছু একই রয়ে গেছে।
⸻
রতন এখনও কলেজে যায়।
⸻
বন্ধুদের সঙ্গে খেলে।
⸻
প্রতিমার বকা খায়।
⸻
রমাপদের সঙ্গে বসে পড়েও।
⸻
সবকিছু স্বাভাবিক।
⸻
অন্তত বাইরে থেকে।
⸻
সেদিন বিকেলে কলেজ ছুটি হওয়ার পর রতন একা ফিরছিল।
⸻
কার্তিক অন্যদিকে গেছে।
⸻
রাস্তার ধারে শুকনো ধানের খড়ের গাদা।
⸻
দূরে কয়েকজন মহিলা কাঁথা শুকোতে দিয়েছে।
⸻
একটা ছোট ছেলে বাঁশের লাঠি দিয়ে চাকা গড়িয়ে খেলছে।
⸻
সাধারণ গ্রাম।
⸻
সাধারণ বিকেল।
⸻
হঠাৎ…
রতনের পা থেমে গেল।
⸻
কোনো কারণ ছাড়াই।
⸻
সে রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে রইল।
⸻
তার চোখ ধীরে ধীরে চারপাশে ঘুরল।
⸻
মহিলারা।
⸻
ঘরগুলো।
⸻
মাটির রাস্তা।
⸻
পুকুর।
⸻
বটগাছের দিকে যাওয়া দূরের পথ।
⸻
আর ঠিক সেই মুহূর্তে…
তার মাথার ভেতর একটা চিন্তা ভেসে উঠল।
⸻
একটা চিন্তা…
যা তার হওয়ার কথা নয়।
⸻
“সব বদলে গেছে।”
⸻
রতনের বুক ধক করে উঠল।
⸻
সে চারদিকে তাকাল।
⸻
কে বলল?
⸻
কেউ না।
⸻
রাস্তায় সে একাই দাঁড়িয়ে।
⸻
তবু…
আরেকটা ভাবনা।
⸻
“এখানে আগে জঙ্গল ছিল।”
⸻
“ওখানে ঘর ছিল না।”
⸻
“ওই পুকুরটাও ছোট ছিল।”
⸻
রতনের নিঃশ্বাস ভারী হয়ে উঠল।
⸻
সে চোখ বন্ধ করল।
⸻
মাথা ঝাঁকাল।
⸻
সব মিলিয়ে গেল।
⸻
কিন্তু তার কপালে ঘাম জমল।
⸻
শীতের বিকেলে।
⸻
সেদিন সন্ধ্যায় গ্রামে সরস্বতী পুজোর প্রস্তুতি চলছিল।
⸻
ছেলেরা বাঁশ বেঁধে মণ্ডপ বানাচ্ছে।
⸻
মহিলারা আলপনার কথা বলছে।
⸻
সবাই ব্যস্ত।
⸻
রতনও দাঁড়িয়ে দেখছিল।
⸻
হঠাৎ তার চোখ গিয়ে থামল মানুষের মুখের ওপর।
⸻
একজন।
⸻
দুজন।
⸻
পাঁচজন।
⸻
দশজন।
⸻
তারপর…
অদ্ভুত একটা অনুভূতি।
⸻
যেন সে তাদের দেখছে না।
⸻
যেন অন্য কেউ দেখছে।
⸻
আর সেই অন্য দৃষ্টিটা ছিল ঠান্ডা।
⸻
অনুভূতিহীন।
⸻
ধীরে ধীরে সেই অনুভূতি একটা চিন্তায় পরিণত হলো।
⸻
“এরা কেউ আমাকে মনে রাখেনি।”
⸻
রতনের বুকের ভেতর কেমন যেন করল।
⸻
তারপর…
আরেকটা।
⸻
“ভালোই হয়েছে।”
⸻
“ভুলে গেলে আবার শেখানো সহজ হয়।”
⸻
এইবার সে প্রায় ভয় পেয়ে গেল।
⸻
মাথা ঘুরে উঠল।
⸻
এক পা পিছিয়ে গেল।
⸻
কার্তিক পাশে এসে বলল,
— কী হয়েছে?
⸻
— কিছু না।
⸻
— তোর মুখ সাদা হয়ে গেছে।
⸻
রতন জোর করে হাসল।
⸻
— মাথা ঘুরেছিল।
⸻
কার্তিক বিশ্বাস করল।
⸻
রতনও চাইছিল বিশ্বাস করতে।
⸻
কিন্তু সে জানত…
কিছু একটা বদলাচ্ছে।
⸻
সেই রাত।
⸻
ঘরের সবাই ঘুমিয়ে।
⸻
বাইরে দূরে শেয়ালের ডাক।
⸻
হাওয়ায় শুকনো পাতার শব্দ।
⸻
রতন গভীর ঘুমে।
⸻
কিন্তু তার স্বপ্নে…
সে একা না।
⸻
সে দাঁড়িয়ে আছে।
⸻
বটগাছের সামনে।
⸻
এই প্রথম।
⸻
সে বুঝতে পারল—
সে নিজের চোখ দিয়ে দেখছে না।
⸻
কারও চোখ দিয়ে দেখছে।
⸻
অনেক উঁচু থেকে।
⸻
অনেক পুরোনো একটা দৃষ্টি।
⸻
সেই দৃষ্টিতে বটগাছটাকে দেখে মনে হলো না গাছ।
⸻
মনে হলো দুর্গ।
⸻
আশ্রয়।
⸻
অধিকার।
⸻
তারপর ধীরে ধীরে চারপাশে মানুষের মুখ ভেসে উঠল।
⸻
গ্রামের মানুষ।
⸻
একটার পর একটা।
⸻
কেউ মৃত।
⸻
কেউ জীবিত।
⸻
কেউ বহু আগেই মাটির নিচে।
⸻
তবু সেই দৃষ্টির মধ্যে ভয় নেই।
⸻
রাগও নেই।
⸻
বরং…
একটা বিকৃত অধিকারবোধ।
⸻
“আমার…”
⸻
রতনের শরীর কেঁপে উঠল।
⸻
“সব আমার…”
⸻
আরেকটা মুখ ভেসে উঠল।
⸻
এক বৃদ্ধ।
⸻
চোখে দৃঢ়তা।
⸻
সেই অচেনা সন্ন্যাসী?
⸻
নাকি অন্য কেউ?
⸻
স্বপ্নের মধ্যে বোঝা গেল না।
⸻
কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে সেই কণ্ঠস্বর বদলে গেল।
⸻
প্রথমবার।
⸻
প্রথমবার সেখানে রাগ শোনা গেল।
⸻
খুব গভীর।
⸻
খুব পুরোনো।
⸻
“ওরা আমাকে বেঁধেছিল…”
⸻
“ওরা ভেবেছিল শেষ।”
⸻
অন্ধকার যেন কেঁপে উঠল।
⸻
“শেষ হয়নি।”
⸻
রতনের বুক ধড়ফড় করতে লাগল।
⸻
সে চিৎকার করতে চাইল।
⸻
পারল না।
⸻
নড়তে চাইল।
⸻
পারল না।
⸻
শুধু শুনতে থাকল।
⸻
আর সেই কণ্ঠস্বর ফিসফিস করে বলতে থাকল—
⸻
“তারা ভুলে গেছে…”
⸻
“আমি ভুলিনি…”
⸻
ভোরের ঠিক আগে রতনের ঘুম ভাঙল।
⸻
সে বিছানায় উঠে বসল।
⸻
হাঁপাচ্ছে।
⸻
ঘর অন্ধকার।
⸻
সবাই ঘুমিয়ে।
⸻
তবু তার চোখ দুটো কয়েক সেকেন্ডের জন্য স্থির রইল।
⸻
অস্বাভাবিকভাবে স্থির।
⸻
তারপর খুব আস্তে…
খুব নিচু গলায়…
সে একটা কথা বলল।
⸻
একটা কথা, যার অর্থ সে নিজেও জানে না।
⸻
“এবার মনে করাব…”
⸻
তারপর আবার শুয়ে পড়ল।
⸻
সকালে উঠে তার কিছুই মনে থাকবে না।
⸻
কিন্তু অন্ধকারে বলা সেই কথাগুলো…
সেগুলো রতনের ছিল না।
•
Posts: 122
Threads: 7
Likes Received: 469 in 152 posts
Likes Given: 68
Joined: Jan 2023
Reputation:
40
অধ্যায় ২৭ : ঘরের ভেতরের অন্ধকার
কাশীপুরের আকাশে সেদিন বিকেল থেকেই মেঘ জমেছিল। পৌষের শেষ, অথচ বাতাসটা কেমন যেন গুমোট আর ভারী। মাটির রাস্তাগুলোতে কুয়াশার বদলে এক ধরণের কালচে ধোঁয়াটে ভাব।
রতন সেদিন মাঠ থেকে একটু আগেই ফিরে এসেছিল। কিন্তু বাড়ি ফিরে সে নিজের বইয়ের ব্যাগটা বারান্দায় ছুড়ে দিয়ে সোজা গিয়ে বসল রান্নাঘরের দরজার চৌকাঠে।
ভেতরে প্রতিমা উনুন ধরানোর চেষ্টা করছিলেন। কাঠের টুকরোগুলো কাঁচা থাকায় ধোঁয়া হচ্ছিল খুব। তিনি আঁচল দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে ফুঁ দিচ্ছিলেন উনুনে। তার পরনের সুতির শাড়িটা কাজের চাপে কিছুটা আলগা হয়ে পিঠের দিকে নেমে গিয়েছিল। ঘাড়ের কাছে জমেছিল হালকা ঘামের বিন্দু।
রতন চুপচাপ বসে ছিল। কিন্তু তার বসার ভঙ্গিটা আজ তেরো বছরের কোনো কিশোরের মতো ছিল না। তার মেরুদণ্ডটা একদম সোজা, দু-হাতের আঙুলগুলো খাটের পায়ার মতো শক্ত হয়ে দুই হাঁটুর ওপর রাখা। আর তার চোখ দুটো…
এতদিন যে রতন মাকে দেখলেই এক পরম শান্তিতে চোখ জুড়িয়ে ফেলত, সেই রতনের চোখের মণি দুটো আজ অস্বাভাবিক রকমের বড় আর স্থির। সেই দৃষ্টিতে কোনো সন্তানের শ্রদ্ধা নেই, কোনো চেনা টান নেই। সেই দৃষ্টিটা ছিল হাড়হিম করা ঠান্ডা, পরখ করে নেওয়ার মতো এবং তীব্রভাবে বিকৃত।
রতনের ভেতরের সেই বহু প্রাচীন সত্তা—সেই তান্ত্রিক—আজ প্রথমবার রতনের চোখ দুটোকে পুরোপুরি ধার নিয়েছে। সে প্রতিমার অবয়বটাকে দেখছিল। একজন সাধারণ গ্রামীণ গৃহবধূর শরীরের গঠন, তার উরুর বাঁক, শাড়ির আঁচল সরে গিয়ে উন্মুক্ত হওয়া ফর্সা পিঠের চামড়া—সবকিছুকে সে এক কুৎসিত জ্যামিতিক মাপে মেপে নিচ্ছিল। তান্ত্রিকের সেই লোলুপ, পৈশাচিক চেতনা প্রতিমার মাতৃত্বকে এক নিমেষে মুছে দিয়ে তার শরীরটাকে কেবল একটা মাংসের পিণ্ড আর নিজের অশুভ কামনার ক্ষেত্র হিসেবে পর্যবেক্ষণ করছিল।
প্রতিমা উনুনে ফুঁ দিতে দিতে হঠাৎ কেমন যেন অস্বস্তি বোধ করলেন। তার শিরদাঁড়া বেয়ে একটা শীতল স্রোত নেমে গেল। শীতের দিনেও তার মনে হলো ঘরের বাতাসটা যেন ফুটন্ত জলের মতো গরম হয়ে উঠছে। তিনি খড়িটা রেখে হঠাৎ ঘাড় ঘুরিয়ে দরজার দিকে তাকালেন।
রতন তখনও একইভাবে তাকিয়ে। তার ঠোঁটের কোণে একটা খুব মৃদু, কুৎসিত হাসি ঝুলে আছে। যে হাসিটা কোনো তেরো বছরের ছেলের মুখে অসম্ভব।
প্রতিমা একটু ঘাবড়ে গিয়ে বললেন,
— কী রে রতন? অমন কসাইয়ের মতো তাকিয়ে আছিস কেন? মুখটা অমন দেখাচ্ছে কেন তোর?
রতনের ভেতরের সেই সত্তাটা এক মুহূর্তের জন্য চমকে উঠল। সে বুঝতে পারল, তার এই বিকৃত রূপটা বড় তাড়াতাড়ি প্রকাশ পেয়ে যাচ্ছে। চোখের পলকে তান্ত্রিকের সেই কুৎসিত চাউনিটা আবার রতনের নিষ্পাপ চোখের আড়ালে লুকিয়ে গেল।
রতন চোখ পিটপিট করে খুব স্বাভাবিক, চেনা গলায় বলল,
— কিছু না মা। উনুনের ধোঁয়ায় তোমার চোখ দুটো একদম লাল হয়ে গেছে, তাই দেখছিলাম।
কথাটা খুব সাধারণ। কিন্তু প্রতিমার বুকের ভেতরের ধুকপুকানিটা কমল না। তিনি লক্ষ্য করলেন, রতন যখন কথা বলছিল, তার গলার স্বরটা যেন তার নিজের নয়—খুব গভীর থেকে উঠে আসা একটা খসখসে, শুকনো পাতার মতো আওয়াজ।
তিনি শাড়ির আঁচলটা টেনে ভালো করে গা ঢাকলেন। তার মনে এক অমোঘ চাবুকের মতো গ্লানি আর ভয় এসে বিঁধল। নিজের পেটের ছেলের সামনে দাঁড়িয়ে আজ কেন জানি না তার নিজেকে সম্পূর্ণ নগ্ন আর অরক্ষিত মনে হচ্ছিল।
ঠিক তখনই বারান্দায় রমাপদ মাস্টারের সাইকেলের ঘণ্টা বাজল। ঘরের ভেতরের সেই গুমোট অন্ধকারটা যেন এক ঝটকায় কেটে গেল, কিন্তু প্রতিমা আর রতন—দুজনের মাঝখানের চেনা পৃথিবীটা চিরতরে বদলে গেল।
•
Posts: 122
Threads: 7
Likes Received: 469 in 152 posts
Likes Given: 68
Joined: Jan 2023
Reputation:
40
অধ্যায় ২৮ : অবদমিত ক্ষুধা
কাশীপুরের মানুষ জানত, শীতের রাত যত বাড়ে, বাইরের পৃথিবীটা ততটাই ছোট হয়ে আসে।
দিনের বেলা সবকিছুই ছিল একেবারে স্বাভাবিক, প্রতিদিনের চেনা ছন্দে মাখামাখি। রতন সকালে কলেজে গেল, বন্ধুদের সাথে মাঠে ফুটবলও খেলল। পল্টু যথারীতি চেঁচামেচি করল, কার্তিক দূর থেকে মাঠের শেষের দিকে চেয়ে রইল। কোনো অস্বাভাবিকতা নেই। রমাপদ মাস্টারমশাই নরুর দোকানে বসে চা খেলেন, প্রতিমা মণ্ডপের আলপনার জন্য চালের গুঁড়ো ভিজিয়ে রাখলেন। কিন্তু সূর্যটা পাটের খেতের ওপাড়ে ডুবতেই গ্রামের ওপর যেন এক অদৃশ্য কালচে চাদর নেমে এল।
রাত তখন প্রায় সাড়ে দশটা। মুখার্জী বাড়ির আলো নিভে গেছে অনেকক্ষণ।
বাইরে কুয়াশা এত ঘন যে জানলার কাচ ভেদ করে ভেতরের অন্ধকারকে আরও জমাট করে তুলছে। রমাপদ আর প্রতিমা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। কিন্তু মাঝখানের ছোট খাটটিতে শুয়ে থাকা রতনের চোখ দুটো অন্ধকারের মধ্যেও খোলা। সম্পূর্ণ স্থির, নিষ্পলক।
রতনের শরীরের ভেতর তখন এক তীব্র ছটফটানি। কিন্তু সে নড়াচড়া করছে না। তার ভেতরের সেই প্রাচীন তান্ত্রিক সত্তাটা এক অদ্ভুত যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সে বুঝতে পারছে, এই তেরো বছরের কাঁচা মাংসের খাঁচায় বন্দি থাকায় তার সেই অলৌকিক ক্ষমতার প্রকাশ বড় ধীর গতিতে হচ্ছে। বহু বছরের পুরোনো সেই মন্ত্রের জোর, সেই অশুভ শক্তির তেজ এই কিশোর শরীরের রক্ত আর হাড়ের সীমানা পেরিয়ে পুরোপুরি বাইরে আসতে পারছে না। এই সীমাবদ্ধতা তাকে ক্ষিপ্ত করে তুলছে।
কিন্তু শক্তির চেয়েও বড় যে জিনিসটা আজ মাঝরাতে তাকে পাগল করে তুলছে, তা হলো এক তীব্র জান্তব আদিম ক্ষুধা।
বহু যুগ, বহু দশক ধরে সে মাটির নিচে, ওই অন্ধকারের শিকড়ে বন্দি ছিল। এতগুলো বছর সে কোনো রক্তমাংসের মানুষের ছোঁয়া পায়নি। বিশেষ করে, কোনো নারী শরীরের সেই চিরন্তন ঘ্রাণ, তার উষ্ণতা থেকে সে বঞ্চিত ছিল। এই মানব শরীরে প্রবেশ করার পর, রতনের অবচেতনের কামনার সুতো অবদি পৌঁছে তান্ত্রিকের সেই প্রাচীন ক্ষুধাটা আজ দাউদাউ করে জেগে উঠেছে। একটা তীব্র লোভ, একটা হিংস্র কামুক খিদে তার ভেতরের অন্ধকারকে চাবুক মারছে।
সে বিছানায় শুয়েই খুব ধীর গতিতে নিজের মাথাটা ঘোরাল।
পাশের বড় খাটটিতে মশারির আড়ালে শুয়ে আছেন প্রতিমা। অন্ধকারের মধ্যেও তান্ত্রিকের সেই অতিপ্রাকৃতিক চোখ দুটো স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিল প্রতিমার শরীরের অবয়ব। মশারির হালকা কাপড়ের ওপার থেকে ভেসে আসছিল এক নারীর শরীরের চেনা সুবাস—যাতে মিশে আছে ধূপকাঠি, সর্ষের তেল আর মাতৃত্বের এক পবিত্র গন্ধ।
কিন্তু তারের ভেতরের পিশাচটার কাছে ওটা মাতৃত্বের গন্ধ নয়; ওটা এক নিষিদ্ধ মাংসের সুবাস, যা তার বহু বছরের উপোসকে ভাঙার জন্য ডাক দিচ্ছে। তান্ত্রিকটি নিজের শুকনো ঠোঁট দুটো জিভ দিয়ে চাটল। রতনের তেরো বছরের কচি হাত দুটো বিছানার চাদরটাকে খামচে ধরল, নখগুলো চাদর চিরে ভেতরে ঢুকে যাওয়ার উপক্রম। তার ইচ্ছা করছিল এখনই খাট থেকে নেমে ওই মশারির ভেতর ঢুকে পড়তে, ওই শরীরটাকে নিজের অবদমিত লালসার নিচে পিষে ফেলতে।
কিন্তু সে পারল না। এক তীব্র যন্ত্রণায় তার কপাল বেয়ে ঘাম ঝরে পড়ল। এই কিশোর শরীরের পেশিগুলো তার সেই হিংস্র ইচ্ছার ভার সহ্য করতে পারছে না। শক্তি এখনও পুরোপুরি সম্পূর্ণ হয়নি। গণ্ডির শেষ বাঁধনটুকু না ছিঁড়লে সে এই শরীরে পূর্ণ অধিকার পাবে না।
সে এক গভীর, অবরুদ্ধ দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ঘরের ভ্যাপসা বাতাসে সেই দীর্ঘশ্বাসের শব্দটা কেমন যেন সাপের হিসহিসানির মতো শোনাল।
ঠিক তখনই ঘুমের ঘোরেই প্রতিমা একপাশ ফিরলেন। তার হাতের চুড়ি দুটো টুং করে সামান্য শব্দ করে উঠল। সেই অত্যন্ত চেনা, সাধারণ শব্দেই রতনের ভেতরের সেই পিশাচটা এক ঝটকায় আবার অবচেতনের অন্ধকারে গুটিয়ে গেল। রতনের চোখ দুটো বন্ধ হয়ে এলো।
বাইরে তখন কুয়াশা চুঁইয়ে পড়ছে মাটির রাস্তায়। আর মুখার্জী বাড়ির সেই অন্ধকার ঘরের ভেতর, এক মায়ের ঠিক পাশেই শুয়ে রইল এক কিশোর, যার শরীরের ভেতরে প্রতি মুহূর্তে বড় হচ্ছিল এক প্রাচীন, ক্ষুধার্ত জানোয়ার।
Posts: 122
Threads: 7
Likes Received: 469 in 152 posts
Likes Given: 68
Joined: Jan 2023
Reputation:
40
অধ্যায় ২৯ : নিস্তব্ধতার লুণ্ঠন
বাইরের পৃথিবীটা তখন যেন কোনো এক আদিম শ্মশানের মতো স্তব্ধ হয়ে গেছে। কুয়াশার চাদর এত ঘন যে কাশীপুরের একটা পাতাও নড়ছে না। সাধারণত শীতের রাতে দূর থেকে যে ঝিঁঝি পোকার একটানা ডাক শোনা যায়, আজ তাও সম্পূর্ণ স্তব্ধ। এক অদ্ভুত, থমথমে নিস্তব্ধতা গ্রাস করেছে পুরো মুখার্জী বাড়িকে।
রতন নিজের খাটে উঠে বসল। তার চোখ দুটো বন্ধ। অন্ধকারের মধ্যেই সে খুব শান্ত ভঙ্গিতে, আলতো করে নিজের দুটো ঠোঁট নাড়িয়ে কোনো এক প্রাচীন, নামহীন মন্ত্র উচ্চারণ করতে লাগল। শব্দগুলো বাইরে বেরোলো না, ঘরের বাতাসের মধ্যেই এক অদৃশ্য কম্পন তৈরি করে মিলিয়ে গেল। মন্ত্র শেষ হতেই সে চোখ খুলল।
সেই অতিপ্রাকৃতিক সত্তার কাছে ঘরের এই ঘন অন্ধকারও যেন দুপুরের আলোর মতো পরিষ্কার। তার ঠান্ডা নজরটা গিয়ে পড়ল পাশের বড় খাটটির দিকে।
সেখানে রমাপদ মুখার্জী সারাদিনের খাটুনির পর গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। তিনি চিত হয়ে শুয়ে আছেন, ডান হাতটা মাথার নিচে আর বাঁ হাতটা পেটের ওপর শিথিল হয়ে পড়ে আছে। তার ভারী নিশ্বাসের শব্দই বলে দিচ্ছে সে কতখানি ক্লান্ত। আর তাঁর ঠিক পাশেই, স্বামীর দিকে মুখ করে শুয়ে আছেন প্রতিমা। তাঁর পিঠটা বিছানার ধারের দিকে, দুটো পা হালকা ভাঁজ করা।
রতন খুব নিঃশব্দে খাট থেকে নামল। তার পায়ের পাতায় কোনো শব্দ নেই। সে মশারির কোণটা খুব চেনা ভঙ্গিতে, আলতো করে ওপরে তুলল। তান্ত্রিকের সেই লোলুপ চোখ দুটো এখন প্রতিমার ফর্সা পিঠ আর ঘাড়ের দিকে স্থির। সে প্রতিমার মুখের কাছে নিজের মুখটা নিয়ে গিয়ে গভীর এক নিশ্বাস ভেতরে টেনে নিল—যেন এই নারী শরীরের ঘ্রাণটুকুকে সে নিজের ভেতরে পুরে নিতে চায়। ঘ্রাণটা ভেতরে যেতেই তান্ত্রিকের মাথাটা এক তীব্র তৃপ্তিতে সামান্য ঝাঁকুনি দিয়ে উঠল।
পূর্ণ শক্তির বিকাশ না হলেও, এই মানব শরীরে বন্দি থাকা সত্তাটা আজ নিজের অলৌকিক ক্ষমতার এক বীভৎস নিদর্শন দেখাল।
রতন খুব ধীরগতিতে তার ডান হাতটা প্রতিমার কোমরের নিচে ঢুকিয়ে দিল। তারপর, কোনো রকম পরিশ্রম ছাড়াই, এক তুড়িতে যেন প্রতিমার ভারী কোমরটাকে বিছানা থেকে প্রায় ৫-৬ ইঞ্চি ওপরে শূন্যে তুলে ধরল। তেরো বছরের একটা সাধারণ কিশোরের পক্ষে একজন মধ্যবয়সী পূর্ণাঙ্গ মানুষের শরীরকে এভাবে একহাতে শূন্যে তুলে রাখা সম্পূর্ণ অসম্ভব, অবাস্তব। এই মুহূর্তে যদি রমাপদ বা প্রতিমা নিজেরা চোখ খুলতেন, তবে এই পৈশাচিক দৃশ্য দেখে হয়তো ভয়ে সেখানেই জ্ঞান হারাতেন।
প্রতিমা তখন কোনো এক গভীর, মায়াবী ঘুমে আচ্ছন্ন। তান্ত্রিকের মন্ত্রের জোরেই হোক বা শরীরের ক্লান্তিতে, এই বিশাল আলোড়নেও তাঁর ঘুম ভাঙল না।
রতন তার ডান হাত দিয়ে প্রতিমার শরীরটাকে ওই অবস্থাতেই শূন্যে ধরে রাখল। তারপর নিজের বাঁ হাতটা বাড়িয়ে প্রতিমার মোটা গোছের পায়ের গোড়ালি থেকে সুতির শাড়িটা ধরল। অত্যন্ত দক্ষ হাতে সে শাড়িটাকে ধীরে ধীরে ওপরের দিকে তুলতে শুরু করল—উরু ছাড়িয়ে, কোমরের ওপর পর্যন্ত শাড়িটা দলা পাকিয়ে উঠে গেল। আর সেই আবছা আলো-আঁধারিতে উন্মোচিত হলো এক নিরাবরণ বাস্তবতা। প্রতিমা তীব্র গরম আর ক্লান্তির কারণে আজ রাতে ভেতরে কোনো অন্তর্বাস বা সায়া পরেননি।
তান্ত্রিকের সেই প্রাচীন, কুৎসিত চোখ দুটো অন্ধকারের মধ্যেও গ্রাস করতে চাইল এক গ্রামীণ মধ্যবয়সী নারীর সেই শরীরকে। যেমন ভরাট, তেমনই সুডোল, আর পাছার ওপর হালকা কালচে এক ছায়া। তান্ত্রিকটি শাড়িটাকে ওই অবস্থাতেই কোমরের ওপর জড়ো করে রেখে, খুব ধীরে ধীরে নিজের মুখটা নামিয়ে নিয়ে গেল পূর্ণিমার সেই বিশাল নিতম্বদ্বয়ের মাঝখানের গভীর ফাটলটির কাছে।
সেখানে মুখ ঠেকিয়ে সে এক দীর্ঘ, তীব্র জান্তব শ্বাস টানল। সেই গোপন অংশের তপ্ত ঘাম আর আদিম নারীত্বের গন্ধ মাতাল করে তুলল তার বহু বছরের ক্ষুধার্ত চেতনাকে। এক চরম পৈশাচিক তৃপ্তিতে তান্ত্রিকের মাথাটা আবার সজোরে ঝাঁকিয়ে উঠল।
সে এখনই এই শরীরটাকে ছিঁড়েখুঁড়ে খেতে পারত, কিন্তু সে জানে—তাড়াহুড়ো করলে এই কাঁচা খাঁচাটা ভেঙে যাবে। সে অত্যন্ত সাবধানে, যেভাবে শাড়িটা ওপরে তুলেছিল, ঠিক তেমনই আলতো করে আবার নিচে নামিয়ে দিয়ে প্রতিমার শরীরটাকে বিছানায় শুইয়ে দিল। মশারির কাপড়টা আগের জায়গায় নেমে এল।
রতন আবার নিজের খাটে গিয়ে শুয়ে পড়ল। বাইরে তখন কুয়াশার ভেতর দিয়ে ভোরের প্রথম ম্লান আলো ফুটতে শুরু করেছে। অথচ ঘরের ভেতর, এক পবিত্র মাতৃত্বের আড়ালে, এক অলৌকিক ও কলঙ্কিত অধ্যায়ের দাগ রয়ে গেল, যা কেউ দেখতে পেল না।
•
Posts: 122
Threads: 7
Likes Received: 469 in 152 posts
Likes Given: 68
Joined: Jan 2023
Reputation:
40
অধ্যায় ৩০ : উঠোনের মায়া ও কুৎসিত ছায়া
পরদিন সকালের কুয়াশাটা যেন অন্য দিনের চেয়ে একটু বেশি ঠান্ডা ছিল। কাশীপুরের বাতাসে একটা গুমোট গন্ধ তখনও লেগে আছে। রতন প্রতিদিনের মতোই কলেজ ইউনিফর্ম পরে বইয়ের ব্যাগ কাঁধে নিয়ে বেরিয়ে পড়ল। বাইরে থেকে তাকে দেখে বোঝার উপায় নেই যে, গতরাতে তার শরীরের ভেতর দিয়ে এক অলৌকিক নরক নেমে এসেছিল।
সে সোজা গিয়ে পৌঁছাল তার বন্ধু শিবুর বাড়ির উঠোনে।
শিবুদের পরিবারটি মুখার্জী বাড়ির চেয়ে বয়সে কিছুটা ছোট। শিবুর বাবা বিপ্লব কাকা আর মা ঝুমা কাকিমা—দুজনেই রমাপদ মাস্টারমশাই আর প্রতিমার চেয়ে বয়সে ছোট হওয়ায় গ্রামে তারা কাকা-কাকিমা বলেই পরিচিত। ঝুমা কাকিমার বিয়ে হয়েছে প্রতিমার বেশ কিছু পরে, তাই তাঁর শরীরে এখনও এক ধরণের ভরপুর যৌবনের গ্রামীণ লাবণ্য রয়ে গেছে।
রতন যখন উঠোনে গিয়ে দাঁড়াল, শিবু তখন সবেমাত্র স্নান সেরে ভেতরের ঘরে ঢুকেছে কলেজের পোশাক পরার জন্য। উঠোনের এক কোণে উনুনের পাশে পিঁড়ি পেতে বসেছিলেন ঝুমা কাকিমা। তিনি দুই পা ভাঁজ করে বসে থালায় সেদ্ধ আলু মাখছিলেন ছেলের টিফিনের জন্য। সকালের নরম আলোয় তাঁর মুখে এক অদ্ভুত শান্ত, সংসারী শান্তি লেগে ছিল। সুতির শাড়িটা তাঁর ভরাট শরীরে জড়িয়ে ছিল পরম মায়ায়।
ঠিক এই সময়, ভেতরের ঘরে পোশাক পরতে পরতে শিবুর মনের ভেতর এক অদ্ভুত আলোড়ন শুরু হলো। তান্ত্রিকের সেই অদৃশ্য ক্ষমতার চাদর যেন শিবুর মগজটাকেও আচ্ছন্ন করতে শুরু করেছে। শিবু প্যান্টটা পরে বেল্ট বাঁধতে গিয়ে হঠাৎ থমকে গেল। তার মনে হতে লাগল—সে যেন খুব জরুরি কিছু একটা ভুলে যাচ্ছে। সে একবার প্যান্টের পকেটে হাত দিয়ে দেখল, পরমুহূর্তেই আবার কলেজের ব্যাগটা খুলে খাতাগুলো চেক করতে লাগল। সব ঠিক আছে দেখে সে কাঠের আলমারির সামনে গিয়ে চিরুনিটা হাতে নিল।
মাথা আঁচড়াতে আঁচড়াতে শিবু আবার থমকে গেল। চিরুনিটা চুলের মাঝখানে আটকে রইল, আর সে শূন্য চোখে তাকিয়ে রইল দেওয়ালের দিকে। কী যেন এক গভীর, নামহীন চিন্তা তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে ধরে রেখেছে। কিছুক্ষণ পর সে আবার চিরুনিটা চালাল, আবার থেমে গেল। এই অদ্ভুত ঘোরের মধ্যে প্রায় দশ-বারো মিনিটের বেশি সময় কেটে গেল, অথচ শিবু ঘর থেকে বেরোতে পারল না।
ওদিকে উঠোনের দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা রতনের মাথাটা হঠাৎ এক তীব্র আক্রোশে ঝাঁকিয়ে উঠল। তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল সেই পরিচিত বিকৃত, বাঁকা হাসি। তান্ত্রিকের সেই বহু বছরের অবদমিত নারী শরীরের ক্ষুধা আজ ঝুমা কাকিমার ভরাট অবয়ব দেখে তীব্রভাবে জেগে উঠেছে। সে চোখ দুটো বন্ধ করে বিড়বিড় করে এক প্রাচীন বশীকরণ মন্ত্র আওড়াতে লাগল।
মন্ত্র শেষ হতেই সে ধীর পায়ে উনুনের পাশে এগিয়ে গেল। ঝুমা কাকিমা কিছু বুঝে ওঠার আগেই, রতন নিজের তেরো বছরের দুটো হাত বাড়িয়ে কাকিমার বসে থাকা ভারী শরীরটাকে এক তুড়িতে শূন্যে তুলে ফেলল। মন্ত্রের মায়ায় ঝুমা কাকিমার চোখের চাউনি এক নিমেষে বদলে গেল। তাঁর চোখ দুটো খোলাই রইল, কিন্তু তা যেন ফ্যাকাশে, নিষ্প্রাণ—তিনি রতনকে দেখছেন, অথচ তাঁর চেতনা যেন কোনো গভীর ঘুমের অতলে তলিয়ে গেছে। তিনি কোনো প্রতিবাদ করতে পারলেন না।
রতন কাকিমার শরীরটাকে সোজা নিয়ে গেল উঠোনের একপাশে থাকা সেই ছোট ঘরটার দিকে, যেখানে রান্নার কাঠ আর গোবরের ঘুটে জমা করে রাখা হয়। সেই অন্ধকার, ঘুপচি ঘরের ভেতর ঝুমা কাকিমাকে খাড়া দাঁড় করিয়ে দিল সে। রতনের উচ্চতা কাকিমার চেয়ে কিছুটা কম। সে আর এক মুহূর্তও নষ্ট করল না।
সে নিজের দুই হাত দিয়ে ঝুমা কাকিমার শাড়ি আর সায়ার বাঁধনটা একসাথে মুঠো করে ধরে কোমরের ওপর তুলে ফেলল। আর সেই গোবরের গন্ধ ও অন্ধকারের মিশেলে উন্মোচিত হলো ঝুমা কাকিমার মসৃণ, মোটা উরু দুটো আর তার মাঝখানে কোঁকড়ানো কালো চুলে ভরা সেই অত্যন্ত গোপন যোনিপথ। তেরো বছরের একটা বাচ্চার পক্ষে এই বয়সে এই ধরণের কাজ করা বা ভাবা সম্পূর্ণ অসম্ভব, কিন্তু রতনের ভেতরের সেই পিশাচটা আজ সম্পূর্ণ উন্মত্ত।
রতন সেই শাড়ি আর সায়াটা কাকিমার কোমরের কাছে শক্ত করে ধরে রেখে, নিজেই মেঝের ওপর হাঁটু গেড়ে (kneeling) বসে পড়ল। তারপর এক পৈশাচিক আগ্রহে সে ঝুমা কাকিমার সেই যোনিপথে নিজের জিভটা নামিয়ে আনল। কোনো কুশলী জানোয়ারের মতো সে সেই নরম, তপ্ত মাংসকে আইসক্রিমের মতো চুষে আর চেটে লুণ্ঠন করতে শুরু করল।
শরীরের সেই অতি সংবেদনশীল অংশে রতনের জিভের উষ্ণ আর ভেজা ছোঁয়া লাগতেই ঝুমা কাকিমার অবশ শরীরটা এক চরম বৈদ্যুতিক ঝটকার মতো বারবার কেঁপে কেঁপে উঠতে লাগল। মন্ত্রের ঘোরে তিনি চিৎকার করতে পারছিলেন না, তাঁর মুখ দিয়ে কোনো শব্দ বেরোচ্ছিল না, কেবল এক অবরুদ্ধ, কামুক গোঙানি অন্ধকারের ভেতর আছড়ে পড়ছিল—"আআআহ... উফফফ... অঅঅহ..."।
এক অমোঘ, আদিম আকর্ষণে ঝুমা কাকিমার নিজের দুই হাতের আঙুলগুলো রতনের মাথার চুলে গিয়ে বসে গেল। তিনি নিজের অবচেতন ভালোলাগা আর তীব্র টানে রতনের মাথাটাকে সজোরে চেপে ধরলেন নিজের সেই চুলে ভরা, লালা-ভেজা যোনিপথের সাথে। রতনের জান্তব চোষণের শব্দ আর কাকিমার অবরুদ্ধ গোঙানিতে সেই ঘুটে ঘরের অন্ধকার বাতাস এক বীভৎস, নিষিদ্ধ কলঙ্কে ভারী হয়ে উঠল। ওদিকে শিবু তখনও ঘরের ভেতর চিরুনি হাতে এক অলৌকিক ঘোরের মধ্যে দাঁড়িয়ে রইল, জানলই না যে তার নিজের উঠোনের এক কোণে তার মায়ের মাতৃত্ব আজ এক তান্ত্রিকের পায়ের তলায় ধুলোয় মিশে যাচ্ছে।
Posts: 122
Threads: 7
Likes Received: 469 in 152 posts
Likes Given: 68
Joined: Jan 2023
Reputation:
40
লাইক আর রেপু আর কমেন্ট আসা রাখছি ।
•
Posts: 61
Threads: 4
Likes Received: 30 in 26 posts
Likes Given: 79
Joined: May 2024
Reputation:
3
OSADHARON DADA, SUMONAR GOLPO TA POREI APNAR LEKHAR FAN HOYA GACHI. APNAR LEKHAR HAT OSADHARON. EI TYEP R GOLPO APNI ONEK SUNDOR LAKHEN. PURO TA PORLAM EKBARE.
AJKER SOB REPU APNAK UTSORGO KORBO. EKTAI REQUEST JOLDI R UPDATE DEBAR TRY KORBEN. R GOLPO TA K EKTU BORO KORAR REQUEST ROILO.
YOUR BIG FAN
MITY ODIN
•
Posts: 1,410
Threads: 2
Likes Received: 1,446 in 996 posts
Likes Given: 1,765
Joined: Mar 2022
Reputation:
82
(19-06-2026, 01:45 AM)Toxic boy Wrote: লাইক আর রেপু আর কমেন্ট আসা রাখছি ।
ভালো হচ্ছে, দারুন লেখার হাত আপনার। রতনের মাধ্যমে নয়, তান্ত্রিক যেন নিজের রূপে এসে প্রতিমাকে ভোগ করে। তাহলে ব্যাপারটা আরো erotic হবে। লাইক আর রেপু দিলাম।
•
Posts: 122
Threads: 7
Likes Received: 469 in 152 posts
Likes Given: 68
Joined: Jan 2023
Reputation:
40
(19-06-2026, 12:02 PM)Somnaath Wrote: ভালো হচ্ছে, দারুন লেখার হাত আপনার। রতনের মাধ্যমে নয়, তান্ত্রিক যেন নিজের রূপে এসে প্রতিমাকে ভোগ করে। তাহলে ব্যাপারটা আরো erotic হবে। লাইক আর রেপু দিলাম।
ধন্যবাদ ?
•
Posts: 122
Threads: 7
Likes Received: 469 in 152 posts
Likes Given: 68
Joined: Jan 2023
Reputation:
40
(19-06-2026, 07:16 AM)mity odin 2 Wrote: OSADHARON DADA, SUMONAR GOLPO TA POREI APNAR LEKHAR FAN HOYA GACHI. APNAR LEKHAR HAT OSADHARON. EI TYEP R GOLPO APNI ONEK SUNDOR LAKHEN. PURO TA PORLAM EKBARE.
AJKER SOB REPU APNAK UTSORGO KORBO. EKTAI REQUEST JOLDI R UPDATE DEBAR TRY KORBEN. R GOLPO TA K EKTU BORO KORAR REQUEST ROILO.
YOUR BIG FAN
MITY ODIN ? অসংখ্য ধন্যবাদ ☺️
Posts: 122
Threads: 7
Likes Received: 469 in 152 posts
Likes Given: 68
Joined: Jan 2023
Reputation:
40
শিবু যখন কাঠের খাটটায় বসে তার মাথার সেই অদ্ভুত ঝিমঝিম ভাবটা কাটাল, তখন চারপাশের বাতাস যেন আবার স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। সে নিজের কলেজের ইউনিফর্মটা ভালো করে ঠিক করে নিয়ে, ডান হাতে বইয়ের ভারী ব্যাগটা ঝুলিয়ে উঠোনের দিকে পা বাড়াল।
কিন্তু তখন ওই ঘুপচি ঘুটে ঘরের ভেতরে চলছে এক আদিম, নিষিদ্ধ লীলা। তান্ত্রিকের সেই পৈশাচিক শক্তির মায়ায় ঝুমা কাকিমার মাতৃত্বের বোধ তখন অবশ, সেখানে জেগে উঠেছে এক কামার্ত নারীর আদিম শরীরী আর্তি। রতনের মুখটা তখন কাকিমার কোঁকড়ানো চুলে ঘেরা যোনিগহ্বরের গভীরে সেঁধিয়ে আছে। যে রতনকে ঝুমা কাকিমা নিজের ছেলের মতোই জানতেন—মাস্টারমশাইয়ের শান্ত, ভদ্র ছেলে বলে স্নেহ করতেন—আজ সেই কিশোর শরীরের ভেতরে বাস করছে এক ঘোর পাপী, যার নরকেও স্থান হবে না। কাকিমা আর নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারছিলেন না। তাঁর দুই হাতের থাবায় সবুজ ব্লাউজের ভেতরের সেই ভরা যৌবনের স্তনজোড়া নিচ থেকে চেপে ধরে নিজেই ওপরে তুলছিলেন, আর রতনের ছোট কাঁধের ওপর তুলে দিয়েছিলেন নিজের মসৃণ বাঁ পা-টি। রতনের বাঁ হাতটা কাকিমার ভরাট পাছার ওপর কামড়ে বসেছিল, আর ডান হাতটা কাঁধের ওপর থাকা কাকিমার পা-টাকে আঁকড়ে ধরেছিল।
ঠিক পাঁচ মিনিটের মধ্যে সেই জাদুমন্ত্রের ঘোর কেটে গেল। যখন শিবু ঘর থেকে বের হয়ে উঠোনে পা রাখল, তখন চারপাশের পরিবেশ সম্পূর্ণ স্বাভাবিক।
রতন তখন উনুনের সামনে শান্ত মুখে বসে আছে। উনুনে পুঁই চচ্চড়ি ফুটছে, ঘটি-বাটিগুলো এদিক-ওদিক ছড়ানো। রতন কড়াইয়ের সেই চচ্চড়ি নাড়ানো দেখছে গভীর মনোযোগ দিয়ে। তবে কেউ যদি খুব সূক্ষ্মভাবে খেয়াল করত, তবে দেখতে পেত রতনের ঠোঁটের ঠিক নিচে ঝুমা কাকিমার গোপন অঙ্গের একটা কোঁকড়ানো চুল লেগে আছে, আর ঠোঁটের কোণটা লালায় সামান্য ভেজা।
কিন্তু ঝুমা কাকিমা বা রতন—কারও মুখ দেখেই বোঝার উপায় নেই যে একটু আগে এখানে কী নারকীয় কাণ্ড ঘটে গেছে। ঝুমা কাকিমা খুন্তি দিয়ে চচ্চড়িটা নাড়তে নাড়তেই খুব স্বাভাবিক ও স্নেহমাখা গলায় বলে উঠলেন,
— এই রতন, তুইও শিবুর সাথে আমার বানানো চচ্চড়িটা খেয়ে দেখ তো, কেমন হয়েছে?
রতন একগাল হেসে বলল,
— না কাকিমা, মা আজ সকালে আলুর পরোটা বানিয়েছিল। পেট একদম ভর্তি, আর কোনো জায়গা বাকি নেই।
ঝুমা কাকিমা একটু হেসে বললেন,
— বাহ বাহ! দিদি তাহলে আজ পরোটা বানিয়েছে? তা কৈ, একটা আনতে পারতিস কাকিমার জন্য!
এই বলে তিনি একটু হাসলেন। তারপর ঘরের দিকে মুখ ঘুরিয়ে ডাকলেন,
— কৈ রে শিবু? আর কত সময় লাগবে তোর? খেয়ে জলদি কলেজ যা, রতন কখন থেকে এসে বসে আছে!
ঝুমা কাকিমার মুখের ভাব আর কথার ধরন দেখে মনেই হবে না যে এই মানুষটা একটু আগে ওই তান্ত্রিকের কামনার শিকার হয়েছিলেন। তবে উনুনের পাশে দাঁড়ানোর সময় কাকিমার নিজের ভেতরের অংশটা একটু ভেজা ভেজা লাগছিল, কিন্তু তিনি সেটাকে বিশেষ গুরুত্ব দিলেন না। তিনি ভাবলেন, হয়তো কাল রাতে স্বামীর সাথে মিলনের কারণে এমনটা লাগছে। ঝুমা কাকিমা যেমন দেখতে সুন্দরী, তেমনই তাঁর শরীরটাও ছিল রসে ভরা ও অত্যন্ত নরম।
শিবু ব্যাগ কাঁধে নিয়ে উঠোনে আসতেই রতন উঠে দাঁড়াল। দুই বন্ধু গেটের দিকে এগোতে লাগল, আর ঝুমা কাকিমা পরম মমতায় তাদের দিকে তাকিয়ে রইলেন—জানলেনই না তাঁর শরীরের পবিত্রতা আজ কোন অন্ধকারের নিচে পিষ্ট হয়ে গেছে।
Posts: 122
Threads: 7
Likes Received: 469 in 152 posts
Likes Given: 68
Joined: Jan 2023
Reputation:
40
অধ্যায় ৩২ : কলেজের দিন
রতন, সিবু আর বাকিরা কলেজের গেট পেরিয়ে ভেতরে ঢুকল।
সকালের রোদ তখন পুরোপুরি চড়ে বসেনি।
কলেজের মাঠে কয়েকটা ছেলে এখনও দৌড়াদৌড়ি করছে।
কেউ ক্রিকেট ব্যাট হাতে।
কেউ মার্বেল নিয়ে ব্যস্ত।
⸻
বাইরে থেকে সবকিছু একেবারে স্বাভাবিক।
⸻
কিন্তু রতনের বুকের ভেতর আজ সকাল থেকে একটা চাপা অস্বস্তি।
⸻
ঠিক ভয় নয়।
⸻
আবার স্বস্তিও নয়।
⸻
যেন কেউ খুব আস্তে তার কানের কাছে দাঁড়িয়ে আছে।
কিন্তু কথা বলছে না।
শুধু অপেক্ষা করছে।
⸻
— কী রে?
সিবুর ডাক শুনে চমকে উঠল রতন।
⸻
— কোথায় হারিয়ে গেলি?
⸻
— কোথাও না।
⸻
— আজকাল তোকে কেমন কেমন লাগে।
⸻
রতন হেসে উড়িয়ে দিল।
⸻
কিন্তু তার নিজেরও মনে হচ্ছিল, কথাটা পুরো মিথ্যে নয়।
⸻
প্রথম পিরিয়ড বাংলা।
দ্বিতীয় পিরিয়ড ইতিহাস।
⸻
ইতিহাস ক্লাসে শিক্ষক যখন পুরোনো বাংলার কথা বলছিলেন, রতনের মন হঠাৎ অন্যদিকে চলে গেল।
⸻
খাতার কোণে অজান্তেই সে কিছু আঁকতে শুরু করল।
⸻
একটা বৃত্ত।
⸻
তার চারপাশে আরও কয়েকটা দাগ।
⸻
তারপর কয়েকটা অদ্ভুত চিহ্ন।
⸻
সে খেয়ালই করেনি।
⸻
ঘণ্টা পড়ার পর সিবু খাতা টেনে নিয়ে বলল—
— এ আবার কী এঁকেছিস?
⸻
রতন তাকিয়ে থমকে গেল।
⸻
কারণ সে নিজেও জানে না।
⸻
চিহ্নগুলো তার কাছে অচেনা।
⸻
তবু…
কোথায় যেন দেখেছে বলে মনে হচ্ছে।
⸻
খুব দূরের কোনো স্মৃতির মতো।
⸻
কিন্তু সেই স্মৃতি তার নিজের না।
⸻
তার বুকের ভেতর আবার সেই চাপা অস্বস্তি।
⸻
সে তাড়াতাড়ি পাতাটা ছিঁড়ে ফেলল।
⸻
— আরে ছিঁড়লি কেন?
⸻
— এমনি।
⸻
সিবু কাঁধ ঝাঁকাল।
⸻
বিষয়টা নিয়ে আর ভাবল না।
⸻
কিন্তু রতনের হাত তখনও সামান্য কাঁপছে।
⸻
টিফিনের সময় সবাই মাঠে বেরিয়ে গেল।
⸻
কলেজের পিছনদিকে একটা পুরোনো ঘর আছে।
⸻
অনেক বছর ধরে বন্ধ।
⸻
জানলার কাঠ পচে গেছে।
⸻
দেওয়ালের চুন খসে পড়েছে।
⸻
সাধারণত কেউ ওদিকে যায় না।
⸻
রতনও কখনও যায়নি।
⸻
তবু আজ…
তার চোখ বারবার সেদিকেই চলে যাচ্ছে।
⸻
যেন কেউ ডাকছে।
⸻
খুব আস্তে।
⸻
খুব দূর থেকে।
⸻
সে নিজেও বুঝতে পারল না কখন মাঠ ছেড়ে কয়েক পা এগিয়ে গেছে।
⸻
পুরোনো ঘরটার সামনে এসে দাঁড়াতেই তার শরীর দিয়ে কাঁটা বয়ে গেল।
⸻
দরজা বন্ধ।
⸻
তালা ঝুলছে।
⸻
তবু মনে হলো…
ভেতরে কেউ আছে।
⸻
কেউ দাঁড়িয়ে।
⸻
অপেক্ষা করছে।
⸻
ঠিক তখনই পিছন থেকে সিবুর গলা।
⸻
— রে! এখানে কী করছিস?
⸻
রতন যেন ঘোর থেকে ফিরে এল।
⸻
— কিছু না।
⸻
— চল।
⸻
সে আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না।
⸻
সেদিন বাড়ি ফেরার আগে শেষ ঘণ্টা বাজল।
⸻
সবাই বই গুছিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে।
⸻
রতনও খাতা ব্যাগে ঢোকাচ্ছিল।
⸻
হঠাৎ তার চোখ গিয়ে পড়ল ডেস্কের ওপর।
⸻
কাঠের ওপর পুরোনো খোদাই।
⸻
অনেক দিনের।
⸻
হয়তো কোনো ছাত্র কেটেছিল।
⸻
সাধারণ একটা দাগ হওয়ার কথা।
⸻
কিন্তু রতন স্থির হয়ে গেল।
⸻
কারণ দাগটা অদ্ভুতভাবে তার খাতায় আঁকা চিহ্নটার মতো।
⸻
একই রকম।
⸻
প্রায় হুবহু।
⸻
তার বুকের ভেতর ঠান্ডা একটা অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ল।
⸻
সে হাত বাড়িয়ে দাগটাকে ছুঁতে গেল।
⸻
আর ঠিক সেই মুহূর্তে—
তার মাথার ভেতর একটা ঝলক।
⸻
এক সেকেন্ড।
⸻
তারও কম।
⸻
অন্ধকার।
⸻
আগুনের আলো।
⸻
আর একটা কণ্ঠস্বর।
⸻
খুব নিচু।
⸻
খুব পুরোনো।
⸻
“মনে পড়ছে?”
⸻
রতন হাত সরিয়ে নিল।
⸻
শ্বাস দ্রুত হয়ে গেছে।
⸻
চারপাশে তাকাল।
⸻
ক্লাসরুম ফাঁকা।
⸻
কেউ নেই।
⸻
তবু মনে হলো…
সে একা নয়।
⸻
একদম একা নয়।
⸻
সেই সন্ধ্যায় যখন রতন বাড়ি ফিরছিল, আকাশের রং ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে আসছিল।
⸻
আর বহু দূরে…
বটগাছটার দিকে তাকালে মনে হতো সব আগের মতোই আছে।
⸻
কিন্তু অদৃশ্য কোথাও…
একটা কু-প্রভাব নীরবে আরও একটু গভীরে শিকড় ছড়িয়ে দিল।
Posts: 122
Threads: 7
Likes Received: 469 in 152 posts
Likes Given: 68
Joined: Jan 2023
Reputation:
40
অধ্যায় ৩৩ : নামের ছায়া
কলেজ ছুটি হওয়ার পর রতন, সিবু, গোপাল আর আরও দু-একজন একসঙ্গে গ্রামের দিকে ফিরছিল।
বিকেলের আলো তখন নরম হয়ে এসেছে।
ধান কাটা হয়ে যাওয়া জমির ওপর দিয়ে হাওয়া বয়ে যাচ্ছে।
⸻
ছেলেগুলো নিজেদের মধ্যে গল্প করছে।
কেউ ক্রিকেট নিয়ে।
কেউ কলেজের নতুন শিক্ষক নিয়ে।
⸻
কিন্তু রতন আজ একটু চুপ।
⸻
সে হাঁটছে ঠিকই।
কিন্তু তার মন যেন অন্য কোথাও।
⸻
রাস্তার ধারে একটা পুরোনো বটের চারা দেখে হঠাৎ তার মাথার ভেতর কেমন যেন ঝাঁকুনি লাগল।
⸻
একটা নাম।
⸻
একটা বহু পুরোনো নাম।
⸻
মনে হলো নামটা সে বহুবার শুনেছে।
⸻
অথচ কখনও শোনেনি।
⸻
তার ঠোঁট নড়ল।
খুব আস্তে।
⸻
— নিরঞ্জ…
⸻
পাশ থেকে সিবু শুনে ফেলল।
⸻
— কী বললি?
⸻
রতন চমকে উঠল।
⸻
— কই? কিছু না তো।
⸻
— না না, কিছু একটা বললি।
⸻
গোপালও তাকাল।
⸻
— কার নাম রে?
⸻
রতনের বুকের ভেতর ধক করে উঠল।
⸻
কারণ সে নিজেই জানে না কেন শব্দটা মুখে এসেছিল।
⸻
— আরে কিছু না। ভুল শুনেছিস।
⸻
সে দ্রুত হাঁটতে শুরু করল।
⸻
বন্ধুরা কিছুক্ষণ খোঁচাখুঁচি করল।
তারপর অন্য প্রসঙ্গে চলে গেল।
⸻
কিন্তু রতনের কপালে তখন হালকা ঘাম।
⸻
শীতের বিকেলে।
⸻
সন্ধ্যা নামার আগেই সে বাড়ি ফিরল।
⸻
প্রতিমা রান্নাঘরে।
⸻
রমাপদ এখনও ফেরেননি।
⸻
সবকিছু আগের মতো।
⸻
তবু রতনের ভেতরে কোথাও যেন আরেকটা নীরব উপস্থিতি জেগে আছে।
⸻
রাত।
⸻
সবাই ঘুমিয়ে।
⸻
চাঁদের আলো জানলার ফাঁক দিয়ে ঘরে ঢুকেছে।
⸻
রতনের চোখ বন্ধ।
⸻
কিন্তু তার ভেতরে অন্য এক জাগরণ।
⸻
স্বপ্ন নয়।
⸻
আবার পুরো জাগরণও নয়।
⸻
এক অদ্ভুত মাঝামাঝি অবস্থা।
⸻
সেখানে সে নিজেকে দেখতে পেল গ্রামের ওপর দিয়ে তাকিয়ে থাকতে।
⸻
মাঠ।
⸻
পুকুর।
⸻
মন্দির।
⸻
নতুন টিনের ছাউনি দেওয়া কয়েকটা বাড়ি।
⸻
ইলেকট্রিকের খুঁটি।
⸻
দূরে মোবাইল টাওয়ারের আলো।
⸻
সবকিছু সে দেখছে।
⸻
কিন্তু রতনের চোখ দিয়ে নয়।
⸻
আর সেই অদৃশ্য দৃষ্টির মধ্যে একটা শীতল কৌতূহল।
⸻
“অনেক বদলে গেছে…”
⸻
“তবু মানুষ একই রয়ে গেছে।”
⸻
একটা নিঃশব্দ অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ল।
⸻
যেন বহু বছর পরে কেউ নিজের পুরোনো জায়গায় ফিরে এসেছে।
⸻
আর চারপাশটা পরীক্ষা করে দেখছে।
⸻
কে বেঁচে আছে।
⸻
কী বদলেছে।
⸻
কী ভেঙেছে।
⸻
আর কী এখনও আগের মতো আছে।
⸻
দূরে গ্রামের মন্দিরের ঘণ্টা বাজল।
⸻
সেই শব্দ শুনে অন্ধকারের ভেতরে যেন এক মুহূর্তের জন্য একটা তীক্ষ্ণ হাসি ফুটে উঠল।
⸻
সেটা আনন্দের হাসি নয়।
⸻
বিদ্রূপেরও নয়।
⸻
বরং এমন এক হাসি, যা দেখে মনে হয়—
কেউ খুব ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করছে।
⸻
খুব দীর্ঘ সময় ধরে।
⸻
আর এখন মনে করছে—
অপেক্ষার শেষটা হয়তো আর বেশি দূরে নয়।
⸻
সকালে ঘুম ভাঙার পর রতনের কিছুই মনে রইল না।
⸻
শুধু জানলার বাইরে তাকিয়ে তার হঠাৎ মনে হলো—
গ্রামটাকে সে যেন নতুন করে দেখছে।
⸻
আর অনেক দূরে, কুয়াশার আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকা বটগাছটার দিকে তাকিয়ে তার অকারণ মনে হলো—
ওখানে কিছু একটা এখনও জেগে আছে।
•
Posts: 122
Threads: 7
Likes Received: 469 in 152 posts
Likes Given: 68
Joined: Jan 2023
Reputation:
40
অধ্যায় ৩৪ : অনুভূতি
পৌষের শেষ দিক।
বিকেলের রোদে আর তেমন তেজ নেই।
কাশীপুরের শিবমন্দিরের সামনে ধুলো উড়ছে হালকা হাওয়ায়।
⸻
মন্দিরটা খুব বড় নয়।
পুরোনো।
অনেক পুরোনো।
⸻
কত মানুষ এসেছে।
কত মানুষ চলে গেছে।
⸻
কিন্তু মন্দিরটা এখনও দাঁড়িয়ে।
নীরবে।
⸻
চাতালের এক কোণে বসে ছিলেন হরিমণি বুড়ি।
গ্রামের সবাই অবশ্য তাকে “হরিঠাকুমা” বলেই ডাকে।
⸻
বয়স আশির ওপর।
কেউ বলে পঁচাশি।
কেউ বলে নব্বই।
⸻
আসল বয়স তিনি নিজেও জানেন না।
⸻
চোখের দৃষ্টি ঝাপসা।
হাঁটতেও কষ্ট হয়।
⸻
তবু প্রতিদিন সকালে আর বিকেলে তিনি মন্দিরে আসেন।
⸻
বাবা মহাদেবের সামনে বসে জপ করেন।
⸻
আজও করছেন।
⸻
হাতে পুরোনো তুলসীর জপমালা।
⸻
ঠোঁট নড়ে।
শব্দ প্রায় শোনা যায় না।
⸻
চারপাশে কয়েকজন মহিলা ফুল দিয়ে পুজো সেরে ফিরছেন।
⸻
একটা কুকুর চাতালের নিচে গুটিসুটি মেরে শুয়ে।
⸻
সবকিছু স্বাভাবিক।
⸻
ঠিক সেই সময় কলেজ থেকে ফেরার পথে রতন ওই রাস্তা দিয়ে আসছিল।
⸻
কাঁধে ব্যাগ।
⸻
মাথা নিচু।
⸻
বাইরে থেকে সাধারণ একটা গ্রামের ছেলে।
⸻
কেউ দ্বিতীয়বার তাকাবে না।
⸻
কিন্তু…
রতন মন্দিরের কাছাকাছি আসতেই হরিঠাকুমার আঙুল থেমে গেল।
⸻
জপমালার দানা আর এগোল না।
⸻
তিনি ভুরু কুঁচকালেন।
⸻
কেন?
⸻
তিনি জানেন না।
⸻
শুধু মনে হলো…
হাওয়ার মধ্যে কিছু একটা বদলে গেছে।
⸻
একটা ঠান্ডা ভাব।
⸻
খুব সূক্ষ্ম।
⸻
খুব অদ্ভুত।
⸻
তিনি ধীরে ধীরে মাথা তুললেন।
⸻
চোখে পরিষ্কার দেখেন না।
⸻
তবু রাস্তার দিকে তাকালেন।
⸻
একটা ছায়ামূর্তি এগিয়ে যাচ্ছে।
⸻
কে?
⸻
রতন?
⸻
হতে পারে।
⸻
হরিঠাকুমা নিশ্চিত নন।
⸻
ঠিক তখনই…
রতনের পা থেমে গেল।
⸻
এক মুহূর্তের জন্য।
⸻
কোনো কারণ ছাড়াই।
⸻
তারপর খুব ধীরে…
সে ঘাড় ঘুরিয়ে মন্দিরের দিকে তাকাল।
⸻
মন্দির।
⸻
চাতাল।
⸻
বৃদ্ধা।
⸻
সবকিছু তার চোখে ধরা পড়ল।
⸻
আর তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল একটা অদ্ভুত হাসি।
⸻
খুব ক্ষীণ।
⸻
খুব ছোট।
⸻
কিন্তু সেই হাসির মধ্যে শিশুর সরলতা ছিল না।
⸻
ছিল অন্য কিছু।
⸻
অনেক পুরোনো।
⸻
অনেক অন্ধকার।
⸻
হরিঠাকুমা সেই হাসি দেখতে পেলেন না।
⸻
কিন্তু তার বুকের ভেতর ধক করে উঠল।
⸻
হাত থেকে জপমালা পিছলে মাটিতে পড়ে গেল।
⸻
টুপ।
⸻
শব্দটা খুবই ছোট।
⸻
তবু তার শরীর কেঁপে উঠল।
⸻
চাতালের নিচে ঘুমিয়ে থাকা কুকুরটাও আচমকা মাথা তুলে চারদিকে তাকাল।
⸻
তারপর কুঁই কুঁই করে সরে গিয়ে অন্যদিকে চলে গেল।
⸻
হরিঠাকুমা ফিসফিস করে বললেন,
— এ কী…
⸻
তার গলা কাঁপছে।
⸻
কারণ বহু বছর পরে আজ আবার সেই পুরোনো অনুভূতিটা ফিরে এসেছে।
⸻
একটা অনুভূতি…
যেটা তিনি শেষবার পেয়েছিলেন ছোটবেলায়।
⸻
যখন তার ঠাকুমা রাতে দরজা বন্ধ করতে করতে বলতেন—
“সূর্য ডোবার পর বটতলার পথ মাড়াস না।”
⸻
তখন তিনি কারণ জানতেন না।
⸻
আজও জানেন না।
⸻
তবু বুকের ভেতর সেই একই অস্বস্তি।
⸻
রতন ইতিমধ্যে অনেকটা দূরে চলে গেছে।
⸻
তবু অদ্ভুতভাবে তার কানে যেন বৃদ্ধার কাঁপা নিঃশ্বাসের শব্দ পৌঁছে গেল।
⸻
সে থামল না।
⸻
পেছনেও তাকাল না।
⸻
কিন্তু তার ভেতরে কোথাও…
অন্ধকারের গভীরে…
একটা ভাবনা জেগে উঠল।
⸻
“কেউ একজন টের পেয়েছে…”
⸻
ভাবনাটা রতনের ছিল না।
⸻
কিন্তু সেটার সঙ্গে একটা ঠান্ডা সন্তুষ্টিও মিশে ছিল।
⸻
যেন দীর্ঘ নিদ্রা থেকে জেগে ওঠা কোনো সত্তা চারপাশ পর্যবেক্ষণ করছে।
⸻
কে অন্ধ।
⸻
কে সতর্ক।
⸻
আর কে এখনও মনে রাখতে পেরেছে।
⸻
সন্ধ্যার ঘণ্টা বেজে উঠল।
⸻
মন্দিরের ভেতর শঙ্খধ্বনি শোনা গেল।
⸻
হরিঠাকুমা কাঁপা হাতে জপমালা তুলে নিলেন।
⸻
তারপর শিবলিঙ্গের দিকে তাকিয়ে খুব আস্তে বললেন—
“বাবা…
যদি কোনো ছায়া ফিরে এসে থাকে…
তবে আমায় ভুল দেখতে দিয়ো না।”
⸻
দূরে, পশ্চিম আকাশে সূর্য ডুবে গেল।
⸻
আর কাশীপুর গ্রামের ওপর নেমে এল আরেকটা দীর্ঘ রাত।
•
|