Posts: 122
Threads: 7
Likes Received: 469 in 152 posts
Likes Given: 68
Joined: Jan 2023
Reputation:
40
অধ্যায় ১ : কাশীপুরের সকাল
বীরভূম জেলার কাশীপুর গ্রামটা খুব বড় ছিল না। আবার একেবারে ছোটও নয়। প্রায় দেড়-দুইশো ঘর মানুষ থাকবে। গ্রামের একদিকে ধানখেত, অন্যদিকে বিস্তীর্ণ মাঠ। বর্ষাকালে চারদিক সবুজে ঢেকে যেত, আর শীতকালে সকালের কুয়াশায় যেন পুরো গ্রামটা সাদা চাদরের নিচে হারিয়ে যেত।
সেই শীতেরই এক সকাল।
ভোরের আলো তখনও পুরোপুরি ফোটেনি। কুয়াশার আস্তরণে গ্রামের মাটির রাস্তা ঝাপসা হয়ে আছে। দূরে কোথাও মোরগ ডেকে উঠল।
প্রতিমা মুখার্জী উঠোনে ঝাঁট দিচ্ছিলেন।
ঝাঁটের শব্দে উঠোনের এক কোণে বসে থাকা কয়েকটা চড়ুই হঠাৎ উড়ে গেল।
রান্নাঘরের উনুনে আগুন জ্বলছে। ভাতের হাঁড়ি চাপানো হয়েছে। ধোঁয়ার গন্ধ শীতের বাতাসে মিশে ধীরে ধীরে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে।
প্রতিমা একবার আকাশের দিকে তাকালেন।
সূর্য উঠতে এখনও কিছুটা সময় আছে।
বারান্দার খুঁটির পাশে নিজের পুরোনো সাইকেলটা দাঁড় করিয়ে টায়ারে বাতাস দেখছিলেন রমাপদ মুখার্জী।
প্রায় পনেরো বছর ধরে তিনি পাশের গ্রামের উচ্চবিদ্যালয়ে পড়াচ্ছেন।
বাংলা শিক্ষক।
গ্রামের ছেলেমেয়েরা কেউ চাকরি পেলে, কেউ কলেজে ভর্তি হলে, কেউ ভালো ফল করলে রমাপদ মাস্টারমশাইয়ের নামও সঙ্গে উচ্চারণ করে।
এলাকার মানুষ তাঁকে সম্মান করত।
তবে সেই সম্মান নিয়ে তাঁর কোনো অহংকার ছিল না।
প্রতিদিনের মতো আজও সময়মতো কলেজে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।
প্রতিমা রান্নাঘর থেকে ডাকলেন,
— শোনো, আজ ফিরতে বেশি দেরি কোরো না।
— কেন?
— বাজার প্রায় ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে। সর্ষের তেল শেষ।
— আচ্ছা, নিয়ে আসব।
প্রতিমা একটু থেমে আবার বললেন,
— আর তোমার ছেলেকে একবার ডাকো তো। এখনও উঠল না।
রমাপদ হেসে ফেললেন।
— আমি ডাকলে উঠবে?
— চেষ্টা করে দেখো।
রমাপদ বারান্দা থেকে ভেতরের ঘরের দিকে তাকালেন।
— রতন! ও রতন!
কোনো উত্তর নেই।
— ও রে, কলেজ যাবি না?
ঘরের ভেতর থেকে অস্পষ্ট একটা আওয়াজ এল।
— উঁ… উঠছি…
রমাপদ আর প্রতিমা দুজনেই হেসে ফেললেন।
প্রতিদিনের একই গল্প।
রতনের বয়স **।
অষ্টম শ্রেণিতে পড়ে।
যে কলেজে রমাপদ পড়ান, সেই কলেজেই।
তবে বাবা-ছেলে একসঙ্গে যায় না।
রমাপদ একটু আগে বের হন। পথে কয়েকজন শিক্ষককে নিয়ে কলেজে যান।
আর রতন যায় তার বন্ধুদের সঙ্গে।
গ্রামের প্রায় সব ছেলেই দল বেঁধে কলেজে যায়।
কেউ সাইকেলে, কেউ হেঁটে।
সকালে কলেজে যাওয়ার পথটাই যেন তাদের দিনের প্রথম আড্ডা।
অবশেষে প্রতিমার বকুনি খেয়ে রতন বিছানা ছাড়ল।
মুখ ধুয়ে, ইউনিফর্ম পরে, বইয়ের ব্যাগ কাঁধে তুলে বারান্দায় এল।
প্রতিমা একটা গরম রুটি হাতে দিয়ে বললেন,
— হাঁটতে হাঁটতে খেয়ে নিস।
— দেরি হয়ে গেছে মা।
— তাই বলে না খেয়ে যাবি?
রতন মুখ বাঁকিয়ে রুটিটা হাতে নিল।
গেটের বাইরে তখনই শোনা গেল ডাকার শব্দ।
— রতন! ও রতন!
পল্টুর গলা।
রতন তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে গেল।
প্রতিমা পিছন থেকে বললেন,
— ফিরে এসে আগে পড়তে বসবি!
— হ্যাঁ মা!
বলে ছুট দিল সে।
যদিও প্রতিমা জানতেন, কথাটা আজও রাখা হবে না।
কলেজে যাওয়ার রাস্তাটা গ্রামের ছেলেদের খুব প্রিয়।
মাটির রাস্তা ধরে হাঁটতে হাঁটতে তারা কখন যে গল্পে মেতে উঠত, নিজেরাও বুঝত না।
রতনের সঙ্গে ছিল পল্টু, বাপন, কার্তিক আর শিবু।
পাঁচজন প্রায় সবসময় একসঙ্গেই থাকে।
কেউ ক্রিকেট নিয়ে কথা বলছে।
কেউ আগের দিনের ফুটবল ম্যাচ নিয়ে তর্ক করছে।
কেউ আবার বলছে বড় হয়ে সে কলকাতায় যাবে।
রাস্তার ধারে খেজুর গাছ থেকে রস নামানোর হাঁড়ি ঝুলছে।
এক জায়গায় দুজন কৃষক জমিতে জল দিচ্ছে।
আরেক জায়গায় একজন বৃদ্ধ গরু নিয়ে মাঠের দিকে যাচ্ছে।
সবাই সবাইকে চেনে।
কেউ রতনদের দেখে বলে উঠল,
— কিরে, আজও দেরি?
ছেলেরা হেসে দৌড়ে এগিয়ে গেল।
এই ছিল কাশীপুরের জীবন।
সাধারণ।
ধীর।
চেনা।
Posts: 122
Threads: 7
Likes Received: 469 in 152 posts
Likes Given: 68
Joined: Jan 2023
Reputation:
40
অধ্যায় ২ : কাশীপুরের মানুষজন
কাশীপুরে কেউ অসুস্থ হলে প্রথমে ডাক্তার ডাকার কথা খুব কম লোকেরই মাথায় আসত।
অধিকাংশ সময় সবাই আগে যেত নকুল কবিরাজের কাছে।
গ্রামের দক্ষিণপাড়ায় তার ছোট্ট টালির ঘর।
ঘরের সামনে নিমগাছ।
সকালবেলা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মানুষজন লাইন দিয়ে বসে থাকত।
কেউ জ্বর নিয়ে এসেছে।
কেউ পেটব্যথা।
কেউ আবার গরুর অসুখের ওষুধ নিতে এসেছে।
নকুল কবিরাজের বয়স প্রায় সত্তর।
সাদা ধুতি, মলিন ফতুয়া আর চোখে মোটা কাচের চশমা।
কথা কম বলতেন।
তবে গ্রামের লোকজনের বিশ্বাস ছিল, অনেক সময় শহরের ডাক্তার যেখানে ব্যর্থ হয়, নকুল কবিরাজ সেখানে কাজ করে দেখান।
⸻
গ্রামের সবচেয়ে সম্মানিত মানুষ অবশ্য ছিলেন হরিপদ মাস্টার।
একসময় প্রাইমারি কলেজের প্রধান শিক্ষক ছিলেন।
এখন বয়স আশির কাছাকাছি।
হাঁটতে লাঠি লাগে।
কিন্তু স্মৃতিশক্তি এখনও টনটনে।
চায়ের দোকানের আড্ডায় তিনি বসলে সবাই একটু চুপচাপ হয়ে যেত।
তার কথা মন দিয়ে শুনত।
কারণ হরিপদ মাস্টারের মুখে গ্রামের পঞ্চাশ-ষাট বছরের ইতিহাস জমা ছিল।
⸻
গ্রামের মাঝখানে একটা ছোট্ট শিবমন্দির।
বড় কিছু নয়।
সিমেন্টের তৈরি ছোট্ট মন্দির।
সামনে বেলগাছ।
সন্ধ্যায় পুরোহিত ঘণ্টা বাজালে সেই শব্দ প্রায় পুরো গ্রামে শোনা যেত।
প্রতিমা প্রায়ই সন্ধ্যাবেলা সেখানে প্রদীপ দিতে যেতেন।
অনেক সময় রতনও মায়ের সঙ্গে যেত।
যদিও মন্দিরের চেয়ে তার বেশি আগ্রহ থাকত মন্দিরের সামনে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেওয়ায়।
⸻
সন্ধ্যা নামার একটা আলাদা রূপ ছিল কাশীপুরে।
সূর্য ডুবে গেলে প্রথমে পাখিদের ডাক কমে যেত।
তারপর দূরে দূরে রান্নার ধোঁয়া উঠতে দেখা যেত।
একটু পরে মন্দিরের ঘণ্টা বাজত।
তারপর গ্রামের একে একে ঘরগুলোর আলো জ্বলে উঠত।
কোথাও সাদা বাল্ব।
কোথাও কেরোসিনের লণ্ঠন।
কোথাও আবার দুটোই।
রাত আটটার পরেই গ্রাম অনেকটা নিস্তব্ধ হয়ে যেত।
শুধু কুকুরের ডাক আর দূরে কোথাও শেয়ালের চিৎকার শোনা যেত মাঝেমধ্যে।
⸻
সেই রাতেও সবকিছু ছিল স্বাভাবিক।
রমাপদ খাতা দেখছিলেন।
প্রতিমা রান্নাঘরের কাজ গুছোচ্ছিলেন।
রতন পড়ার বই খুলে বসেছিল বটে, কিন্তু তার মন ছিল জানালার বাইরের অন্ধকারে।
বাইরে কুয়াশা পড়তে শুরু করেছে।
দূরে শিবমন্দিরের ঘণ্টার শেষ শব্দটা মিলিয়ে গেল।
কাশীপুর তখন ঘুমের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
Posts: 122
Threads: 7
Likes Received: 469 in 152 posts
Likes Given: 68
Joined: Jan 2023
Reputation:
40
অধ্যায় ৩ : মাঠের বিকেল
শীতের দুপুরের একটা আলাদা স্বভাব আছে।
গরমকালের মতো তীব্র রোদ নয়, আবার বর্ষার মতো মেঘলা আকাশও নয়।
কাশীপুরে দুপুর গড়াতে না গড়াতেই গ্রামের বেশিরভাগ মানুষ নিজের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ত।
কেউ জমিতে।
কেউ বাজারে।
কেউ বা ঘরের বারান্দায় বসে রোদ পোহাত।
রতনের অবশ্য দুপুরের খাওয়া শেষ হলেই একটাই চিন্তা।
মাঠ।
প্রতিমা খেতে বসে বললেন,
— আজকে কিন্তু বিকেলে ফিরেই পড়তে বসবি।
রতন মাথা নেড়ে সম্মতি দিল।
যদিও দুজনেই জানত, কথাটা শুধু মুখের কথা।
কারণ বিকেল মানেই মাঠ।
আর মাঠ মানেই বন্ধুদের সঙ্গে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফুটবল।
খাওয়া শেষ করেই সে ব্যাগ ছুড়ে রেখে বেরিয়ে গেল।
প্রতিমা বারান্দা থেকে চিৎকার করে বললেন,
— অন্ধকার হওয়ার আগে ফিরিস!
— হ্যাঁ মা!
দৌড়তে দৌড়তেই উত্তর দিল রতন।
⸻
কাশীপুরের মাঠটা গ্রামের গর্ব।
বর্ষায় সেখানে জল জমে যায় বটে, কিন্তু শীত আর গরমে গ্রামের সব ছেলেপুলের প্রাণকেন্দ্র হয়ে ওঠে জায়গাটা।
বিকেল হলেই একে একে সবাই জড়ো হয়।
সেদিনও তার ব্যতিক্রম হলো না।
রতন পৌঁছাতেই পল্টু বলল,
— এই যে মহারাজ এলেন!
— চুপ কর।
— আজ আবার দেরি করেছিস।
— মা ধরে বসেছিল।
— কাকিমা ঠিকই করে।
সবাই হেসে উঠল।
পল্টু দলের সবচেয়ে দুষ্টু ছেলে।
তার মুখে সবসময় কিছু না কিছু মন্তব্য থাকবেই।
পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল বাপন।
মজবুত চেহারা।
দৌড়ালে তাকে ধরা মুশকিল।
পড়াশোনায় মন নেই, কিন্তু মাঠে নামলে সবাই তাকে নিজেদের দলে নিতে চায়।
কার্তিক একটু আলাদা।
সে খেলাধুলা করে, কিন্তু গ্রামের বয়স্কদের গল্পও মন দিয়ে শোনে।
কে কোথায় কী বলল, সব খবর তার জানা।
আর শিবু…
সে সবচেয়ে চুপচাপ।
কেউ ঝগড়া করলে সবার আগে থামানোর চেষ্টা করে।
পাঁচজনের বন্ধুত্বটা পুরো গ্রামে পরিচিত।
একজন ছাড়া অন্য কাউকে খুব কমই দেখা যায়।
⸻
খেলা শুরু হতেই মাঠ জমে উঠল।
কেউ খালি পায়ে খেলছে।
কেউ পুরোনো ক্যানভাস জুতো পরে এসেছে।
চিৎকার, হাসাহাসি, ঝগড়া—সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত প্রাণচাঞ্চল্য।
দূরে কয়েকজন বয়স্ক মানুষ দাঁড়িয়ে খেলা দেখছিল।
তাদের মধ্যে ভোলা ঘোষও ছিলেন।
মাঝে মাঝে ছেলেদের দেখে মাথা নাড়ছিলেন।
যেন নিজের ছোটবেলার দিনগুলো মনে পড়ছে।
একপাশে কয়েকজন ছোট ছেলে মার্বেল খেলছিল।
আরও দূরে কয়েকজন গরু চরাচ্ছিল।
পুরো মাঠটাই যেন গ্রামের একটা আলাদা জগৎ।
⸻
খেলা শেষ হতে হতে সূর্য পশ্চিমে হেলে পড়েছে।
আকাশে কমলা রঙ ছড়িয়ে গেছে।
ছেলেরা হাঁপাতে হাঁপাতে মাঠের মাঝখানে বসে পড়ল।
বাপন বলল,
— বড় হয়ে আমি কলকাতা যাব।
পল্টু হেসে বলল,
— তুই আগে ক্লাস এইট পাস কর।
সবাই আবার হেসে উঠল।
রতন ঘাসের ওপর শুয়ে আকাশের দিকে তাকাল।
কিছু সাদা বক উড়ে যাচ্ছে।
দূরে ধোঁয়া উঠছে কোনো বাড়ির রান্নাঘর থেকে।
মন্দিরের ঘণ্টা এখনও বাজেনি, কিন্তু সন্ধ্যা যে খুব দূরে নয়, সেটা বোঝা যাচ্ছে।
কার্তিক হঠাৎ বলল,
— জানিস, দাদু বলছিল ছোটবেলায় এই মাঠটা নাকি আরও বড় ছিল।
— তাই নাকি?
— হ্যাঁ।
— তারপর?
— তারপর আর কিছু না।
বলেই সে চুপ করে গেল।
পল্টু সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল,
— তোর দাদুর গল্প শুরু হলে আর শেষ হয় না।
আবার হাসির রোল উঠল।
কথাটা সেখানেই শেষ হয়ে গেল।
কিন্তু কার্তিকের মনে পড়ল, দাদু আরেকটা কথাও বলেছিলেন।
মাঠ নিয়ে।
পুরোনো একটা কথা।
যেটা তিনি শেষ পর্যন্ত বলেননি।
কারণ জিজ্ঞেস করতেই দাদু শুধু বলেছিলেন—
“ওসব পুরোনো কথা। জানার দরকার নেই।”
কার্তিক তখন আর চাপ দেয়নি।
কিন্তু আজ হঠাৎ কথাটা তার মনে পড়ে গেল।
⸻
সন্ধ্যার আগে সবাই বাড়ির পথে হাঁটা দিল।
দূরে শিবমন্দিরের ঘণ্টা বেজে উঠেছে।
এক এক করে মাঠ ফাঁকা হয়ে আসছে।
কাশীপুর আবার রাতের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
Posts: 122
Threads: 7
Likes Received: 469 in 152 posts
Likes Given: 68
Joined: Jan 2023
Reputation:
40
অধ্যায় ৪ : নরুর চায়ের দোকান
শীতের সন্ধ্যা কাশীপুরে খুব দ্রুত নামে।
বিকেলের সোনালি রোদ কখন যে ফিকে হয়ে যায়, কেউ টেরও পায় না।
মাঠ থেকে ফিরতে ফিরতে রতনদের গায়ে হালকা ঠান্ডা লাগতে শুরু করেছিল।
পল্টু হাত দুটো ঘষতে ঘষতে বলল,
— উফ্ফ, এ বছর শীতটা বেশ জাঁকিয়ে পড়েছে রে।
বাপন সঙ্গে সঙ্গে হেসে উঠল।
— এইটুকুতেই তোর শীত করছে? পৌষ মাস আসুক, তখন বুঝবি।
— তখন আমি লেপের তলায় থাকব।
— মিথ্যে কথা। তখনও মাঠেই ঘুরবি।
হাসতে হাসতে সবাই গ্রামের দিকে হাঁটতে লাগল।
⸻
কাশীপুরের মাঝামাঝি একটা জায়গায় ছিল নরুর চায়ের দোকান।
বাঁশের খুঁটি আর টিনের চালের ছোট্ট দোকান।
সামনে দুটো লম্বা বেঞ্চ।
একপাশে কাচের বয়ামে বিস্কুট, মুড়ি আর নানারকম লজেন্স।
সন্ধ্যা হলেই জায়গাটা জমে উঠত।
কৃষক, দোকানদার, কলেজশিক্ষক, রাজমিস্ত্রি—সবাই একবার না একবার সেখানে এসে বসত।
আজও তার ব্যতিক্রম হয়নি।
নরু চা ছেঁকে ভাঁড় সাজিয়ে রাখছিল।
চুলোর ওপর কেটলি ফুটছে।
চায়ের সঙ্গে আদার গন্ধ বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে।
দোকানের সামনে বেঞ্চে বসেছিলেন হরিপদ মাস্টার।
তার পাশে ভোলা ঘোষ।
আর একটু দূরে গদাধর কাকা।
তিনজনের বয়স মিলিয়ে প্রায় দুইশো বছর হবে।
নরু মজা করে প্রায়ই বলত,
— তোমরা তিনজন বসলে দোকানের বয়সও বেড়ে যায়।
তখন ভোলা ঘোষ বলতেন,
— চুপ কর হতভাগা, এখনও তোকে কাঁধে তুলে পুকুরে ফেলে দিতে পারি।
সবাই হেসে উঠত।
⸻
রতনরা দোকানের সামনে পৌঁছাতেই নরু বলল,
— এই যে ফুটবলের বীরপুরুষেরা! আজ ক’টা গোল হল?
পল্টু বুক ফুলিয়ে বলল,
— আমি দুটো দিয়েছি।
বাপন সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করল।
— একটা দিয়েছিস। আরেকটা নিজেরাই গোল খেয়েছে।
— গোল তো গোলই।
নরু হেসে মাথা নাড়ল।
— যাও, বাড়ি যাও। না হলে কাকিমারা এসে আমার দোকান ভাঙবে।
ছেলেরা আবার হেসে উঠল।
⸻
এই সময় রমাপদও কলেজ থেকে ফিরছিলেন।
সাইকেলটা দোকানের সামনে থামিয়ে বললেন,
— নরু, এক ভাঁড় চা দে তো।
— এই আসছে মাস্টারমশাই।
হরিপদ মাস্টার রমাপদকে দেখে একটু সরে বসলেন।
— আয় রমাপদ, বস।
— নমস্কার মাস্টারমশাই।
— কলেজ কেমন চলল?
— যেমন চলে।
চা এল।
রমাপদ ধীরে ধীরে চুমুক দিলেন।
কিছুক্ষণ কৃষিকাজ, কলেজ আর বাজারের দাম নিয়ে গল্প চলল।
সাধারণ গ্রামের আড্ডা।
প্রতিদিনের মতো।
⸻
হঠাৎ ভোলা ঘোষ বললেন,
— শুনলি? মধু ঘোষের গোরুটা আবার হারিয়েছে।
গদাধর কাকা নাক সিটকালেন।
— হারায়নি। কোথাও ঘুরে বেড়াচ্ছে।
— তা হতেই পারে।
— এখনকার লোকজনও কেমন! একটু কিছু হলেই হইচই।
হরিপদ মাস্টার চুপচাপ শুনছিলেন।
কথাটা এখানেই শেষ হয়ে যেতে পারত।
কিন্তু ভোলা ঘোষ হঠাৎ যেন কী মনে করে বললেন,
— তবে খোঁজ করতে গিয়ে যেন…
বাকিটা তিনি বললেন না।
গদাধর কাকা কড়া চোখে তাকালেন।
— থাক।
একটা মাত্র শব্দ।
কিন্তু শব্দটার মধ্যে এমন কিছু ছিল, যা রতনের কানে লাগল।
সে তখন দোকানের সামনেই দাঁড়িয়ে ছিল।
ভোলা ঘোষ কাশলেন।
তারপর অন্য প্রসঙ্গ শুরু করলেন।
— এইবার ধানের ফলন মন্দ হয়নি।
কথা ঘুরে গেল।
সবাই স্বাভাবিক হয়ে গেল।
কিন্তু রতনের মনে হলো, একটু আগের কথাটার মধ্যে যেন কিছু একটা ছিল।
কী?
সে বুঝতে পারল না।
⸻
সন্ধ্যা আরও ঘনিয়ে এলো।
শিবমন্দিরে ঘণ্টা বেজে উঠল।
দূরে কোথাও শঙ্খধ্বনি শোনা গেল।
গ্রামের বাড়িগুলোতে একে একে আলো জ্বলতে শুরু করেছে।
নরুর দোকানেও হারিকেন জ্বালানো হলো।
হলুদ আলোয় হরিপদ মাস্টারের মুখটা কেমন যেন ক্লান্ত দেখাচ্ছিল।
তিনি ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন।
লাঠিতে ভর দিয়ে বললেন,
— যাই হে, রাত হয়ে আসছে।
ভোলা ঘোষও উঠলেন।
গদাধর কাকাও।
এক এক করে সবাই বাড়ির পথে হাঁটা দিল।
শুধু নরুর দোকানের সামনে হারিকেনটা জ্বলতে থাকল।
আর রতনের মনে বারবার ঘুরতে লাগল ভোলা ঘোষের অসমাপ্ত কথাটা—
“তবে খোঁজ করতে গিয়ে যেন…”
তারপর কী?
কেউ আর বলেনি।
Posts: 122
Threads: 7
Likes Received: 469 in 152 posts
Likes Given: 68
Joined: Jan 2023
Reputation:
40
অধ্যায় ৫ : পুকুরঘাটের গল্প
কাশীপুরে শীত যতই পড়ুক, গ্রামের জীবন থেমে থাকত না।
ভোর হতেই আবার শুরু হয়ে যেত একই ব্যস্ততা।
সেদিনও তার ব্যতিক্রম হয়নি।
সকালের কুয়াশা ধীরে ধীরে পাতলা হচ্ছে। গাছের পাতায় জমে থাকা শিশির সূর্যের আলোয় চকচক করছে।
প্রতিমা উঠোনে ধান শুকোতে দিয়েছেন।
রান্নাঘরে ডাল ফুটছে।
রমাপদ কলেজে চলে গেছেন অনেকক্ষণ।
রতনও বন্ধুদের সঙ্গে কলেজে গেছে।
বাড়ির কাজ সেরে প্রতিমা একটা কাপড়ের ঝুড়ি হাতে বেরোলেন।
পুকুরঘাটে কাপড় কাচতে যাবেন।
⸻
কাশীপুরের বড় পুকুরটা গ্রামের প্রায় মাঝখানেই।
পুকুরের একদিকে বাঁধানো ঘাট।
অন্যদিকে কচুরিপানা আর ঝোপঝাড়।
শীতের সকালেও সেখানে মানুষের আনাগোনা লেগেই থাকে।
কেউ কাপড় কাচছে।
কেউ বাসন মাজছে।
কেউ জল তুলছে।
কেউ শুধু গল্প করতে এসেছে।
প্রতিমা পৌঁছতেই কমলা বৌদি দূর থেকে ডাক দিলেন,
— এই যে, আজ এত দেরি?
— আর বোলো না। সকালের কাজ শেষই হচ্ছিল না।
কমলা বৌদির বয়স তেত্রিশ-চৌত্রিশ হবে।
গোলগাল মুখ।
সবসময় হাসিখুশি।
গ্রামের কোনো খবর তার অজানা থাকে না।
তার পাশে বসে ছিলেন মঞ্জু কাকিমা।
তিনি হেসে বললেন,
— শুনেছিস? রতনদের কলেজে নাকি আবার ক্রীড়া প্রতিযোগিতা হবে।
প্রতিমা কাপড় ভেজাতে ভেজাতে বললেন,
— রতন তো এখন থেকেই উত্তেজিত।
— ও তো দৌড়ঝাঁপ ছাড়া কিছু বোঝে না।
তিনজনেই হেসে উঠলেন।
⸻
ঘাটের একটু দূরে সরস্বতী ঠাকুমা বসেছিলেন।
বয়স আশির বেশি।
মাথাভর্তি সাদা চুল।
হাতে একটা পুরোনো লাঠি।
চোখে কম দেখেন, কিন্তু গ্রামের কার বাড়িতে কী হচ্ছে, সে খবর অনেক সময় অন্যদের আগেই জেনে যান।
তিনি চুপচাপ পুকুরের জলের দিকে তাকিয়ে ছিলেন।
কমলা বৌদি বললেন,
— ঠাকুমা, কী এত ভাবছেন?
বৃদ্ধা ধীরে মাথা তুললেন।
— ভাবার বয়স গেছে রে মা। এখন শুধু দেখি।
— কী দেখেন?
— মানুষ বদলায়। গ্রাম বদলায়। কিন্তু কিছু জিনিস বদলায় না।
মঞ্জু কাকিমা হেসে বললেন,
— আবার শুরু হল।
সরস্বতী ঠাকুমাও হালকা হাসলেন।
আর কিছু বললেন না।
⸻
দুপুরের দিকে কলেজ ছুটি হল।
রতন, পল্টু, বাপন, কার্তিক আর শিবু ব্যাগ কাঁধে নিয়ে ফিরছিল।
শীতের রোদ তখন নরম হয়ে এসেছে।
পথে একটা পুকুরের ধারে এসে সবাই থামল।
পল্টু বলল,
— চল, পাঁচ মিনিট বসে যাই।
— বাড়ি গিয়ে মার খাবি।
— সে পরে দেখা যাবে।
ছেলেরা পুকুরপাড়ে বসে গল্প করতে লাগল।
একটা মাছরাঙা আচমকা জলে ঝাঁপ দিল।
বাপন বলল,
— দেখলি?
— উফ্, কী দ্রুত!
শিবু হেসে বলল,
— তোদের চেয়ে বেশি দ্রুত।
আবার হাসাহাসি।
⸻
সন্ধ্যার আগে কাশীপুর আবার নিজের চেনা ছন্দে ফিরল।
মন্দিরে ঘণ্টা বাজল।
গরুগুলো গোয়ালে ফিরল।
চুলোর ধোঁয়া উঠতে শুরু করল।
নরুর দোকানে হারিকেন জ্বলে উঠল।
সবকিছু যেন প্রতিদিনের মতোই।
তবু হরিপদ মাস্টার সেদিন সন্ধ্যায় নরুর দোকানে বসে ছিলেন অস্বাভাবিক চুপচাপ।
নরু জিজ্ঞেসও করেছিল,
— শরীর খারাপ নাকি মাস্টারমশাই?
হরিপদ মাথা নাড়লেন।
— না রে।
— তাহলে এত চুপ কেন?
বৃদ্ধ শিক্ষক কিছুক্ষণ চায়ের ভাঁড়টার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
তারপর ধীরে বললেন,
— এমনিই। পুরোনো কথা মনে পড়ছিল।
— কী কথা?
হরিপদ মাস্টার উত্তর দিলেন না।
শুধু দূরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
নরুও আর কিছু জিজ্ঞেস করল না।
কাশীপুরের বয়স্ক মানুষদের কিছু কিছু নীরবতা ছিল, যেগুলোকে সবাই সম্মান করত।
সেই নীরবতার ভেতরে কী লুকিয়ে আছে, তা জানার চেষ্টা খুব কম মানুষই করত।
Posts: 122
Threads: 7
Likes Received: 469 in 152 posts
Likes Given: 68
Joined: Jan 2023
Reputation:
40
অধ্যায় ৬ : ছোট ছোট চিন্তা
সেদিন রাতে খাওয়ার সময় মুখার্জী বাড়িতে তিনজনই একসঙ্গে বসেছিল।
কাশীপুরে এটা সবদিন হতো না।
রমাপদ কলেজ থেকে ফিরতে কখনও দেরি করতেন, কখনও আবার খাতা দেখতে বসে যেতেন।
কিন্তু শীতের রাতগুলোতে তিনি চেষ্টা করতেন পরিবারের সঙ্গে একটু সময় কাটাতে।
প্রতিমা ভাত বেড়ে দিতে দিতে বললেন,
— রতন, আজ আবার অঙ্কের খাতায় কী লিখেছিস?
রতন মুখ নামিয়ে ভাত মাখতে লাগল।
রমাপদ হেসে বললেন,
— তা বল তো শুনি।
— কিছু না।
— “কিছু না” মানে?
— দুটো অঙ্ক ভুল হয়েছে।
প্রতিমা সঙ্গে সঙ্গে বললেন,
— দুটো?
— হ্যাঁ।
— মাস্টারমশাইয়ের ছেলে হয়ে এই অবস্থা!
রতন বিরক্ত হয়ে বলল,
— বাবা সব বিষয়ে ভালো ছিলেন নাকি?
রমাপদ হঠাৎ হেসে ফেললেন।
— না, আমি ভূগোলে বেশ কাঁচা ছিলাম।
প্রতিমা অবাক হয়ে তাকালেন।
— ওকে আবার সাহস দিচ্ছ?
— আরে, দুটো অঙ্ক ভুল হয়েছে, পৃথিবী শেষ হয়ে যায়নি।
রতনের মুখে একটু হাসি ফুটল।
এমন মুহূর্তগুলোই তার সবচেয়ে ভালো লাগত।
যখন বাবা শুধু শিক্ষক নন, বাবাই থাকেন।
⸻
খাওয়া শেষে রমাপদ বারান্দায় বসেছিলেন।
শীতের রাত নেমেছে।
দূরে কোথাও কুকুর ডাকছে।
আকাশে অসংখ্য তারা।
বিদ্যুৎ থাকলেও আলো খুব উজ্জ্বল নয়।
গ্রামের রাত যেন শহরের চেয়ে অনেক বেশি অন্ধকার।
প্রতিমা পাশে এসে বসলেন।
— শুনছো?
— বলো।
— রতনটা দিনদিন শুধু খেলাধুলো নিয়েই আছে।
— বয়সটাই তো ওর এমন।
— তোমার কোনো চিন্তা হয় না?
রমাপদ কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তারপর বললেন,
— হয়।
— তাহলে?
— কিন্তু সবসময় বকাঝকা করলে হবে?
প্রতিমা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
— আমি শুধু চাই ছেলেটা মানুষ হোক।
— হবে।
— কী করে এত নিশ্চিন্ত থাকো?
রমাপদ দূরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললেন,
— কারণ আমি ওকে চিনি।
ঘরের ভেতর তখন রতন বই খুলে বসেছে।
পড়ার চেয়ে জানলার বাইরে তাকানোতেই তার আগ্রহ বেশি।
মাঠে আগামীকালের ম্যাচটা নিয়ে সে ভাবছে।
বাপনকে হারাতে হবে।
এই মুহূর্তে পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সেটাই।
⸻
পরদিন দুপুর।
কলেজ ছুটি হওয়ার পর রতনদের দল প্রায় দৌড়েই মাঠে এল।
শীতের বিকেলের রোদ নরম।
মাঠে ইতিমধ্যে কয়েকজন ছোট ছেলে ক্রিকেট খেলছে।
দূরে দুটো গরু ঘাস খাচ্ছে।
পল্টু এসে বলল,
— আজ কিন্তু আমি ক্যাপ্টেন।
— কে বলেছে?
— আমি বলেছি।
— তাহলে আমি বলছি, তুই ক্যাপ্টেন না।
বাপন বলতেই সবাই হেসে উঠল।
পাঁচ মিনিটের মধ্যে তর্ক শুরু হয়ে গেল।
আর আরও পাঁচ মিনিট পরে সবাই মিলে খেলাও শুরু করে দিল।
যেন কিছুই হয়নি।
⸻
খেলার মাঝখানে একবার রতনের চোখ চলে গেল মাঠের দূরের দিকে।
অনেক দূরে।
যেখানে মাঠ শেষ হয়ে গেছে।
সেখানে কুয়াশার আবছা পর্দা নেমে আছে।
শীতের বিকেলে এমন দৃশ্য নতুন কিছু নয়।
তবু কয়েক সেকেন্ড সে তাকিয়ে রইল।
কেন, সে নিজেও জানত না।
— এই রতন!
পল্টুর চিৎকারে সে চমকে উঠল।
— কী দেখছিস?
— কিছু না।
— তাহলে দাঁড়িয়ে আছিস কেন? বলটা দে!
রতন মাথা ঝাঁকিয়ে আবার খেলায় মন দিল।
⸻
বিকেল গড়াতে লাগল।
হাসি, চিৎকার, দৌড়ঝাঁপে মাঠ সরগরম।
কিন্তু আজ একটা অদ্ভুত ব্যাপার ঘটল।
খেলার ফাঁকে রতন লক্ষ্য করল, হরিপদ মাস্টার মাঠের ধারে দাঁড়িয়ে আছেন।
এটা নতুন কিছু নয়।
বৃদ্ধ মানুষটি মাঝেমধ্যে ছেলেদের খেলা দেখতে আসেন।
কিন্তু আজ তিনি খেলার দিকে তাকিয়ে নেই।
তার দৃষ্টি যেন মাঠের আরও দূরে কোথাও।
অনেক দূরে।
রতন একবার তাকাল।
তারপর আবার।
হরিপদ মাস্টারের মুখে এমন একটা ভাব ছিল, যেন তিনি কিছু মনে করার চেষ্টা করছেন।
অথবা…
কিছু ভুলে যাওয়ার।
কিছুক্ষণ পর বৃদ্ধ ধীরে ধীরে ঘুরে হাঁটতে শুরু করলেন।
লাঠির শব্দ মাটিতে ঠক… ঠক… ঠক…
ক্রমশ দূরে মিলিয়ে গেল।
রতন কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে রইল।
তারপর আবার খেলায় ফিরে গেল।
কিন্তু সেদিন সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরার সময়ও কেন জানি না, হরিপদ মাস্টারের সেই মুখটা বারবার তার মনে পড়ছিল।
Posts: 122
Threads: 7
Likes Received: 469 in 152 posts
Likes Given: 68
Joined: Jan 2023
Reputation:
40
অধ্যায় ৭ : অর্ধেক শোনা গল্প
শীতকালের সকালগুলোতে কাশীপুরের কলেজ যাওয়ার রাস্তার একটা আলাদা রূপ ছিল।
ধান কাটা প্রায় শেষ।
মাঠের ওপর হালকা কুয়াশা।
খেজুর গাছের মাথা থেকে টুপটাপ রস পড়ার শব্দ।
রতন, পল্টু, বাপন, কার্তিক আর শিবু প্রতিদিনের মতো দল বেঁধে কলেজে যাচ্ছিল।
পল্টু আজও যথারীতি সবচেয়ে বেশি কথা বলছে।
— শুনেছিস? আগামী রবিবার নাকি পাশের গ্রামের সঙ্গে ম্যাচ।
— কে বলল?
— সবাই বলছে।
— সবাই মানে?
— সবাই মানে… সবাই।
বাপন হেসে বলল,
— তোর “সবাই” কে, সেটা কোনোদিন জানলাম না।
ছেলেরা হেসে উঠল।
⸻
কলেজের দিনটা অন্য দিনের মতোই কাটল।
প্রথমে বাংলা।
তারপর ইতিহাস।
মাঝে টিফিন।
শেষে অঙ্ক।
অঙ্ক ক্লাসে রতনের অবস্থা যথারীতি করুণ।
কিন্তু মাঠে নামলে যে ছেলেটা এত আত্মবিশ্বাসী, খাতার সামনে বসলে সেই ছেলেটাই যেন অন্য মানুষ হয়ে যায়।
কলেজ ছুটি হতেই সবাই হাঁপ ছেড়ে বাঁচল।
⸻
ফেরার পথে কার্তিক আজ অস্বাভাবিক চুপচাপ ছিল।
পল্টু প্রথম খেয়াল করল।
— কী রে? প্রেমে পড়েছিস নাকি?
— ধুর।
— তাহলে মুখ হাঁড়ির মতো কেন?
কার্তিক একটু ইতস্তত করল।
তারপর বলল,
— কাল রাতে দাদুর সঙ্গে কথা হচ্ছিল।
— তারপর?
— একটা কথা বলছিল।
— কী কথা?
কার্তিক কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল।
যেন নিজেই বুঝতে পারছে না বলবে কি না।
তারপর বলল,
— মাঠ নিয়ে।
রতন মাথা তুলল।
— কোন মাঠ?
— আমাদের মাঠ।
— কী বলছিল?
— পুরোটা বলেনি।
— মানে?
— আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, হরিপদ মাস্টাররা ছোটবেলায় কোথায় খেলত।
দাদু বলল, তখনও ওই মাঠেই খেলত।
তারপর হঠাৎ বলল—
“তখন মাঠটা অন্যরকম ছিল।”
— অন্যরকম মানে?
— জানি না।
— তারপর?
— তারপর আর কিছু বলেনি।
⸻
পল্টু হো হো করে হেসে উঠল।
— এই নাকি তোর ভয়ংকর গল্প?
— ভয়ংকর বললাম কই?
— তোর দাদুদের সব গল্পই এমন। শুরু আছে, শেষ নেই।
বাপনও হেসে ফেলল।
কিন্তু রতন হাসল না।
কার্তিকের কথাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ নয়।
আসলে তেমন কিছুই নয়।
তবু কেন জানি না, তার মনে হলো বৃদ্ধরা যেন ইচ্ছে করেই কিছু কথা শেষ করতে চান না।
⸻
সেদিন বিকেলে মাঠে লোকজন একটু বেশি ছিল।
রবিবারের ম্যাচ নিয়ে সবাই উত্তেজিত।
একদল ছেলে প্র্যাকটিস করছে।
কয়েকজন ছোট ছেলেও বল কুড়োচ্ছে।
দূরে ভোলা ঘোষ দাঁড়িয়ে গল্প করছেন।
আরও দূরে দুজন কৃষক গরু নিয়ে ফিরছেন।
সবকিছু স্বাভাবিক।
খুবই স্বাভাবিক।
তবু রতনের মনে বারবার কার্তিকের কথাটা ফিরে আসছিল।
“তখন মাঠটা অন্যরকম ছিল।”
অন্যরকম কীভাবে?
মাঠ তো মাঠই।
মাটি, ঘাস, ধুলো।
এতে আবার আলাদা কী?
⸻
খেলা শেষ হতে হতে সূর্য নেমে এসেছে।
আকাশে লালচে আভা।
মন্দিরের ঘণ্টা বাজতে এখনও একটু দেরি।
রতন জুতো হাতে নিয়ে হাঁটছিল।
ঠিক তখনই তার চোখে পড়ল হরিপদ মাস্টারকে।
বৃদ্ধ মানুষটা রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে ছিলেন।
মাঠের দিকে তাকিয়ে।
একদৃষ্টে।
আজও।
গতকালের মতো।
তারপর খুব ধীরে মাথা নেড়ে নিজের বাড়ির দিকে হাঁটা দিলেন।
কেউ কিছু বলল না।
কেউ কিছু জিজ্ঞেসও করল না।
কিন্তু রতনের মনে হলো—
হরিপদ মাস্টার যেন মাঠটাকে শুধু দেখেন না।
মাঠটার মধ্যে অন্য কিছু খোঁজেন।
⸻
সেদিন রাতে কাশীপুরে লোডশেডিং হলো।
এটা নতুন কিছু নয়।
গ্রামের মানুষ অভ্যস্ত।
প্রতিমা হারিকেন জ্বালালেন।
রমাপদ খাতা দেখা বন্ধ করে চশমা খুললেন।
রতন জানলার পাশে বসে ছিল।
বাইরে অন্ধকার।
দূরে কোথাও কুকুর ডাকছে।
আরও দূরে শেয়ালের ডাক শোনা গেল।
প্রতিমা বললেন,
— জানলাটা বন্ধ করে দে।
— কেন?
— ঠান্ডা ঢুকছে।
রতন উঠে জানলা বন্ধ করতে গেল।
বন্ধ করার আগে একবার বাইরে তাকাল।
অন্ধকার ছাড়া কিছুই দেখা যায় না।
তবু অদ্ভুতভাবে তার মনে হলো—
কাশীপুরের রাতের অন্ধকার যেন দিনের গ্রামের মতো নয়।
দিনে যে গ্রাম এত চেনা, রাতে সে যেন অন্য কেউ হয়ে যায়।
জানলাটা বন্ধ করে সে ভেতরে ফিরে এল।
আর বাইরে ধীরে ধীরে আরও ঘন হতে লাগল শীতের রাত।
Posts: 122
Threads: 7
Likes Received: 469 in 152 posts
Likes Given: 68
Joined: Jan 2023
Reputation:
40
অধ্যায় ৮ : হারিকেনের আলো
লোডশেডিং শেষ হতে হতে অনেক রাত হয়ে গিয়েছিল।
ততক্ষণে রতনের চোখে ঘুম নেমে এসেছে।
প্রতিমা মশারি টাঙিয়ে দিয়েছেন।
ঘরের এক কোণে হারিকেনটা এখনও জ্বলছে।
কেরোসিনের গন্ধ হালকা করে ভেসে বেড়াচ্ছে।
— ঘুমিয়ে পড়।
প্রতিমা বললেন।
— হুম।
— আবার গল্পের বই নিয়ে বসিস না যেন।
— না।
প্রতিমা জানতেন, “না” কথাটার ওপর খুব বেশি ভরসা করা যায় না।
তবু হেসে হারিকেনটা একটু নামিয়ে রাখলেন।
⸻
ভোরে রতনের ঘুম ভাঙল পরিচিত একটা শব্দে।
ঠক।
ঠক।
ঠক।
প্রথমে বুঝতে পারল না।
তারপর মনে পড়ল।
প্রতিমা শিলনোড়ায় মশলা বাটছেন।
শীতের সকালে প্রায়ই এই শব্দে তার ঘুম ভাঙে।
মশারির ভেতর থেকে সে দেখল জানলার ফাঁক দিয়ে হালকা আলো ঢুকছে।
উঠোনে একটা কাক নেমেছে।
দূরে মোরগ ডাকছে।
আর রান্নাঘর থেকে ধোঁয়া উঠছে।
এইসব জিনিস এত পরিচিত যে আলাদা করে খেয়ালই করা হয় না।
তবু এগুলো ছাড়া সকালটাকে কল্পনা করাও যায় না।
⸻
রমাপদ তখন বারান্দায় বসে।
চোখে চশমা।
হাতে খবরের কাগজ।
পাশে ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপ।
চা খেতে খেতে মাঝে মাঝে তিনি রাস্তার দিকে তাকাচ্ছেন।
এই সময়টায় গ্রামের লোকজন কাজে বেরোয়।
কেউ সাইকেলে।
কেউ হেঁটে।
কেউ গরু নিয়ে।
যাকে দেখেন, তাকেই মাথা নেড়ে সম্ভাষণ জানান।
— নমস্কার মাস্টারমশাই।
— নমস্কার।
— কলেজে যাচ্ছেন?
— হ্যাঁ।
এইসব ছোট ছোট কথোপকথন প্রায় প্রতিদিনই হয়।
⸻
রতন উঠেই প্রথমে টিউবওয়েলের কাছে গেল।
শীতের জল।
হাত দিলেই শরীর কেঁপে ওঠে।
— উঃ!
সে হাত সরিয়ে নিল।
পাশ থেকে প্রতিমা বলে উঠলেন,
— কী হলো?
— বরফের মতো ঠান্ডা!
— শীতে জল গরম হবে নাকি?
প্রতিমার গলায় হাসি।
রতন মুখ বাঁকিয়ে আবার জল ঢালল।
⸻
কলেজের দিনটা বিশেষ কিছু নয়।
কিন্তু ফেরার পথে সে আর পল্টু নরুর দোকানের সামনে দাঁড়াল।
নরু তখন বিস্কুটের কৌটো সাজাচ্ছে।
— কাকা, একটা লজেন্স দাও তো।
— পয়সা আছে?
— কাল দেব।
— তোর সেই কাল কোনোদিন আসে না।
দোকানে বসে থাকা ভোলা ঘোষ হেসে ফেললেন।
— এই ছেলেটাকে খাতায় লিখে রাখ নরু।
— খাতা ভরে গেছে।
সবাই হেসে উঠল।
⸻
সন্ধ্যার সময় রমাপদ ফিরলেন একটু ক্লান্ত মুখে।
কলেজে পরীক্ষার খাতা দেখা চলছে।
তিনি খাওয়া শেষ করেই খাতা নিয়ে বসলেন।
লাল কালি দিয়ে নম্বর দিচ্ছেন।
মাঝে মাঝে ভুরু কুঁচকে যাচ্ছে।
কোনো ছাত্র একই ভুল বারবার করেছে।
প্রতিমা উল বুনছেন।
রতন বই খুলে বসেছে বটে, কিন্তু মন বারবার অন্যদিকে চলে যাচ্ছে।
হঠাৎ সে বলল,
— বাবা?
— হুম?
— তুমি ছোটবেলায় কোথায় খেলতে?
রমাপদ খাতা থেকে চোখ তুললেন।
— এই গ্রামেই।
— এই মাঠে?
— হ্যাঁ।
— তখনও কি সবাই এখানে খেলত?
— খেলত তো।
— মাঠটা কি আগে অন্যরকম ছিল?
প্রশ্নটা শুনে রমাপদ কয়েক সেকেন্ড থেমে গেলেন।
খুব অল্প সময়।
কিন্তু রতনের নজর এড়াল না।
তারপর তিনি স্বাভাবিক গলায় বললেন,
— কিছুটা।
— কীভাবে?
— অনেক বেশি খোলা ছিল। কম ঘরবাড়ি ছিল তখন।
রতন মাথা নাড়ল।
উত্তরটা স্বাভাবিক।
খুবই স্বাভাবিক।
তবু কেন জানি না, তার মনে হলো বাবার থেমে যাওয়ার সেই কয়েক সেকেন্ড যেন একটু বেশি লম্বা ছিল।
ঠিক তখনই বাইরে কোথাও একটা কুকুর অকারণে ডেকে উঠল।
একবার।
দু’বার।
তারপর আবার সব শান্ত।
হারিকেনের আলোয় ঘরটা আগের মতোই রইল।
কিন্তু রতনের মনে প্রশ্নটা রয়ে গেল।
মাঠটা কি সত্যিই শুধু “আরও খোলা” ছিল?
নাকি আর কিছু?
Posts: 122
Threads: 7
Likes Received: 469 in 152 posts
Likes Given: 68
Joined: Jan 2023
Reputation:
40
অধ্যায় ৯ : একেবারে সাধারণ একটা দিন
সকালে কলেজ যাওয়ার সময় রতনের জুতোর ফিতে আবার খুলে গিয়েছিল।
এটা প্রায়ই হয়।
রাস্তার মাঝখানেই বসে ফিতে বাঁধতে হলো।
পল্টু দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বলল,
— তোর জুতোটার বয়স আমার ঠাকুরদার চেয়েও বেশি।
— চুপ কর।
— সত্যি বলছি।
বাপন একটা শুকনো ঢেলা তুলে পল্টুর দিকে ছুড়ে মারল।
ঢেলাটা অবশ্য অনেক আগেই মাটিতে পড়ে গেল।
তবু পল্টু এমনভাবে সরে গেল যেন ইট ছোঁড়া হয়েছে।
— মারবি নাকি?
— লাগেইনি তো।
— লাগলে?
— তাহলেও কিছু হতো না।
দুজনের খুনসুটি শুরু হতেই কার্তিক বিরক্ত মুখে বলল,
— তোরা রোজ একই জিনিস নিয়ে ঝগড়া করিস কী করে?
⸻
কলেজ থেকে ফেরার সময় রাস্তার ধারে একটা ছাগল বাঁধন খুলে বেরিয়ে এসেছিল।
ছোট্ট একটা কালো ছাগল।
সে দিব্যি রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে শুকনো পাতা খাচ্ছিল।
পেছন থেকে একজন সাইকেলওয়ালা এসে প্রায় ধাক্কা মেরে ফেলছিল।
— এই এই এই!
লোকটা কোনোমতে সাইকেল সামলাল।
ছাগলটা নির্বিকার।
মাথা নিচু করে পাতা খেতেই থাকল।
পল্টু এত জোরে হেসে উঠল যে তার নিজেরই কাশি শুরু হয়ে গেল।
⸻
বাড়ি ফিরে রতন দেখল প্রতিমা রোদে বড়ি শুকোতে দিয়েছেন।
উঠোনের একপাশে পুরোনো একটা চাটাই পাতা।
তার ওপর সারি সারি বড়ি।
প্রতিমা সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলেন,
— সাবধানে হাঁটিস।
— কেন?
— পা দিয়ে চেপে দিবি।
রতন নিচে তাকিয়ে দেখল, সত্যিই আর এক পা এগোলেই কয়েকটা বড়ি শেষ।
সে তাড়াতাড়ি সরে গেল।
প্রতিমা মাথা নাড়লেন।
— সবসময় আকাশের দিকে তাকিয়ে হাঁটলে হবে?
⸻
রমাপদ সেদিন একটু আগে ফিরেছিলেন।
সাইকেলটা বারান্দার দেওয়ালে ঠেকিয়ে রাখতেই একটা শুকনো পাতা তার কাঁধে এসে পড়ল।
তিনি পাতাটা নামিয়ে মাটিতে ফেললেন।
তারপর ব্যাগ খুলে খাতাগুলো বের করলেন।
একটা খাতার কোণা ভাঁজ হয়ে গেছে।
তিনি বিরক্ত মুখে সেটা সোজা করতে লাগলেন।
এই সময় প্রতিমা ভেতর থেকে বললেন,
— চা দেব?
— দাও।
— চিনি কম?
— আগের মতোই।
এই কথোপকথনটা এতবার হয়েছে যে দুজনের কারও আর ভাবতে হয় না।
⸻
বিকেলে মাঠে যাওয়ার পথে রতন রাস্তার ধারে একটা ছোট পাথর দেখতে পেল।
কথা বলতে বলতে সে পাথরটাকে পা দিয়ে ঠেলে দিল।
কয়েক কদম পরে আবার।
তারপর আবার।
পাথরটা রাস্তার ধুলোয় গড়াতে গড়াতে এগোতে লাগল।
পল্টু জিজ্ঞেস করল,
— কী করছিস?
— কিছু না।
— তাহলে পাথরটাকে এত কষ্ট দিচ্ছিস কেন?
রতন হেসে ফেলল।
পাথরটা এবার রাস্তার ধারের ঘাসে ঢুকে হারিয়ে গেল।
⸻
সেদিন মাঠে পৌঁছে তারা দেখল নরুর ছোট ছেলে বাবাই একটা পুরোনো টায়ার গড়িয়ে খেলছে।
টায়ারটা একদিকে হেলে যাচ্ছিল।
সে আবার সোজা করছিল।
আবার গড়াচ্ছিল।
আবার হেলে যাচ্ছিল।
তবু তার উৎসাহ কমছিল না।
মাঠের ধারে দুটো শালিক ঝগড়া করছিল।
কিছু দূরে একটা কুকুর গা এলিয়ে রোদ পোহাচ্ছিল।
সবকিছু এত সাধারণ, এত চেনা যে কেউ সেদিকে আলাদা করে তাকাত না।
⸻
সন্ধ্যায় খাওয়ার পর প্রতিমা লক্ষ্য করলেন রান্নাঘরের কোণে রাখা চালের ডিব্বার ঢাকনাটা খোলা।
— রতন!
— কী?
— তুই খুলেছিস?
— না তো।
— ইঁদুর আবার ঢুকেছে মনে হয়।
তিনি ঢাকনা লাগিয়ে দিলেন।
তারপর ঝাঁট নিয়ে কোণটা একটু পরিষ্কার করলেন।
এমন ঘটনা নতুন কিছু নয়।
গ্রামের প্রায় সব বাড়িতেই হয়।
তবু প্রতিবারই বিরক্ত লাগে।
⸻
রাতে শুতে যাওয়ার আগে রতন জানলার ফাঁক দিয়ে বাইরে তাকাল।
দূরে কোথাও একটা আলো জ্বলছে।
সম্ভবত কারও উঠোনে।
একটা পোকা এসে জানলার কাঠে ধাক্কা খেল।
টুপ।
আবার উড়ে গেল।
ঘরের ভেতর প্রতিমা মশারি গুঁজে দিচ্ছেন।
রমাপদ কাশি দিলেন একবার।
তারপর চশমা খুলে খাটের পাশে রাখলেন।
সবকিছুই স্বাভাবিক।
একেবারে সাধারণ একটা দিন।
Posts: 122
Threads: 7
Likes Received: 469 in 152 posts
Likes Given: 68
Joined: Jan 2023
Reputation:
40
অধ্যায় ১০ : শীতের রাত, উষ্ণ ঘর
পৌষ মাস আরও একটু এগিয়ে এসেছে।
কাশীপুরে এখন সন্ধ্যা নামলেই ঠান্ডা হাওয়ার দাপট শুরু হয়।
দিনে রোদে বসলে আরাম লাগে, কিন্তু সূর্য ডুবলেই মানুষ গায়ে চাদর জড়াতে শুরু করে।
সেদিনও তার ব্যতিক্রম ছিল না।
বিকেলে মাঠ থেকে ফিরতে ফিরতে রতনের নাক লাল হয়ে গিয়েছিল।
পল্টু বলেছিল,
— তোর নাকটা ঠিক টমেটোর মতো হয়ে গেছে।
রতন সঙ্গে সঙ্গে একটা শুকনো আমপাতা ছুঁড়ে মেরেছিল।
অবশ্য পাতাটা মাঝপথেই মাটিতে পড়ে গিয়েছিল।
তবু বাকিরা হেসে কুটিকুটি।
⸻
বাড়ি ফিরে রতন দেখল উঠোনে ধোঁয়া উঠছে।
প্রতিমা শুকনো পাতা জ্বালিয়ে জল গরম করছেন।
চুলোর পাশে একটা সাদা-কালো বিড়াল গোল হয়ে বসে আছে।
আগুনের উষ্ণতা উপভোগ করছে।
রতন কাছে যেতেই বিড়ালটা একবার চোখ খুলে তাকাল।
তারপর আবার চোখ বন্ধ করল।
যেন রতনের অস্তিত্ব নিয়ে তার কোনো আগ্রহই নেই।
⸻
ঘরের ভেতরে রমাপদ খাতা দেখছেন।
টেবিলের ওপর কালি কলম।
একপাশে বইয়ের স্তূপ।
মাঝে মাঝে তিনি লাল কলম দিয়ে কিছু লিখছেন।
আবার ভুরু কুঁচকে চশমা একটু ওপরে তুলছেন।
হঠাৎ বললেন,
— রতন।
— হুঁ?
— অঙ্কের খাতা এনেছিস?
— এখন?
— না, আগামী বছর।
রতন মুখ বাঁকিয়ে ব্যাগের দিকে গেল।
প্রতিমার মুখে চাপা হাসি ফুটে উঠল।
⸻
রাতে খাওয়া হলো একটু দেরিতে।
প্রতিমা আলু-পোস্ত আর ডাল করেছিলেন।
রমাপদ খেতে খেতে বললেন,
— আলু-পোস্তটা আজ ভালো হয়েছে।
প্রতিমা স্বাভাবিক গলায় বললেন,
— রোজ খারাপ হয় নাকি?
— তা বলিনি।
— বললেও কিছু যায় আসে না।
রমাপদ হেসে ফেললেন।
রতন দুজনের দিকে তাকিয়ে রইল।
এই কথাগুলো প্রায়ই হয়।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত কখনও ঝগড়ায় গড়ায় না।
⸻
খাওয়ার পরে রতন পড়তে বসল।
যদিও পড়ার চেয়ে জানলার বাইরে তাকানোতেই তার আগ্রহ বেশি।
আজ আকাশ পরিষ্কার।
অনেক তারা দেখা যাচ্ছে।
দূরে কোথাও বাঁশঝাড়ে বাতাস ঢুকছে।
শৌ-শৌ শব্দ।
মাঝে মাঝে কুকুরের ডাক।
আবার সব চুপ।
⸻
রতন যখন নিজের ঘরে, তখন বারান্দায় বসেছিলেন রমাপদ আর প্রতিমা।
হারিকেনের আলোটা খুব উজ্জ্বল নয়।
আলো আর ছায়ার মাঝামাঝি একটা আবহ।
প্রতিমা পুরোনো একটা শাল সেলাই করছিলেন।
রমাপদ খাতা গুছিয়ে রাখছিলেন।
কিছুক্ষণ কেউ কথা বললেন না।
দীর্ঘদিনের সংসারে এমন নীরবতাও এক ধরনের কথা।
শেষে প্রতিমাই বললেন,
— মনে আছে?
— কী?
— বিয়ের পর প্রথম শীতে তোমার ওই একটাই সোয়েটার ছিল।
রমাপদ হেসে ফেললেন।
— আর তোমার ছিল ওই নীল শালটা।
— যেটা পরে ছিঁড়ে গিয়েছিল।
— আর তুমি এক সপ্তাহ আমার ওপর রাগ করেছিলে।
— কারণ তুমিই পেরেকে আটকে ছিঁড়েছিলে।
— ইচ্ছে করে নাকি?
প্রতিমা এবারও হাসলেন।
হাসলে এখনও তাকে বয়সের চেয়ে একটু কম লাগে।
রমাপদ কয়েক মুহূর্ত চুপ করে তাকিয়ে রইলেন।
প্রতিমা সেটা টের পেয়ে বললেন,
— কী?
— কিছু না।
— কিছু না মানে?
— কিছু না।
প্রতিমা চোখ ছোট করে তাকালেন।
— এত বছরেও মিথ্যে বলতে শিখলে না।
দুজনেই হেসে উঠলেন।
⸻
ভেতরের ঘর থেকে রতন এসব শুনতে পাচ্ছিল না।
সে তখন অঙ্কের খাতার দিকে তাকিয়ে যুদ্ধ করছে।
একটা অঙ্ক বারবার ভুল হচ্ছে।
শেষে বিরক্ত হয়ে পেন্সিলটা টেবিলে ছুঁড়ে রাখল।
পেন্সিলটা গড়িয়ে গিয়ে বইয়ের নিচে ঢুকে গেল।
এখন আবার সেটা খুঁজতে হবে।
— ধুর!
নিজের সঙ্গেই কথা বলল সে।
⸻
রাত আরও গভীর হলো।
এক এক করে কাশীপুরের আলো নিভে যেতে লাগল।
শুধু কোথাও কোথাও হারিকেনের ক্ষীণ আলো।
দূরে নরুর দোকানও বন্ধ হয়ে গেছে।
মন্দির নিঃশব্দ।
রাস্তাঘাট ফাঁকা।
শীতের রাত যেন পুরো গ্রামটাকে ধীরে ধীরে নিজের চাদরের নিচে ঢেকে ফেলল।
রমাপদ ঘুমোতে যাওয়ার আগে উঠোনে একবার বেরোলেন।
অভ্যাস।
সবকিছু ঠিক আছে কি না দেখে নেওয়া।
গোয়ালের দরজা বন্ধ।
টিউবওয়েলের পাশে বালতি উল্টে রাখা।
কাঠের গেট লাগানো।
সব ঠিক।
তিনি ফিরে আসতে যাচ্ছিলেন।
হঠাৎ দূরের মাঠের দিক থেকে ভেসে এল একটুকরো শব্দ।
খুব ক্ষীণ।
হয়তো কোনো রাতচরা পাখি।
হয়তো বাতাসে দুলে ওঠা ডাল।
হয়তো অন্য কিছু।
রমাপদ কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে শুনলেন।
তারপর মাথা নাড়িয়ে ঘরে ফিরে এলেন।
কারণ কাশীপুরে এমন শব্দ নতুন কিছু নয়।
আর মানুষ সাধারণত সেই জিনিসগুলো নিয়েই ভাবে না, যেগুলোকে সে প্রতিদিন শুনে অভ্যস্ত।
কিন্তু কখনও কখনও, সবচেয়ে পরিচিত শব্দের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে অচেনা কিছুর প্রথম পদচিহ্ন।
Posts: 122
Threads: 7
Likes Received: 469 in 152 posts
Likes Given: 68
Joined: Jan 2023
Reputation:
40
অধ্যায় ১১ : রবিবারের সকাল
রবিবার বলে কাশীপুরে কেউ দেরি করে ঘুমোয় না।
শহরের মতো এখানে ছুটির দিন মানে বিছানায় গড়াগড়ি নয়।
বরং অনেকের কাজ যেন আরও বেড়ে যায়।
ভোরের কুয়াশা তখনও পুরো কাটেনি।
দূরের তালগাছগুলো আবছা দেখা যাচ্ছে।
মোরগ ডেকেছে অনেকক্ষণ।
পুকুরের ধারে কয়েকজন মহিলা ইতিমধ্যেই জড়ো হয়ে গেছেন।
কারও হাতে কাপড়ের ঝুড়ি।
কারও হাতে পিতলের কলসি।
কারও হাতে বাসন।
⸻
প্রতিমা আজ একটু আগে বেরিয়েছেন।
গতকালের কিছু কাপড় ধোয়া বাকি ছিল।
পুকুরঘাটে পৌঁছাতেই কমলা বৌদি বললেন,
— এই যে, আজ সূর্য কোনদিকে উঠেছে?
— কেন?
— তুমি আমার আগে এসেছ!
মহিলাদের মধ্যে হাসির রোল উঠল।
প্রতিমাও হেসে ফেললেন।
পাশে মঞ্জু কাকিমা বাসন ধুচ্ছিলেন।
জল থেকে হাত তুলে বললেন,
— শুনেছ? কাল নাকি ম্যাচ আছে।
— শুনেছি।
— রতন খেলবে তো?
— খেলবে বলেই তো সকাল থেকে মাথা খাচ্ছে।
⸻
পুকুরের অন্যপ্রান্তে বাসন্তী পিসি কাপড় কাচছিলেন।
বয়স পঞ্চাশ পেরিয়েছে।
চোখেমুখে বয়সের ছাপ আছে, কিন্তু কাজের সময় কাউকে টেক্কা দেওয়া কঠিন।
তিনি বললেন,
— ছেলেপুলে যত বড় হয়, তত চিন্তা বাড়ে।
কমলা বৌদি সঙ্গে সঙ্গে বললেন,
— আমার ওদের বয়সে শুধু খাওয়া আর ঘুমের চিন্তা ছিল।
— এখনও তাই আছে।
আবার হাসাহাসি।
⸻
এই সময় সরস্বতী ঠাকুমা ধীরে ধীরে ঘাটে এসে বসলেন।
হাতে লাঠি।
চোখ কুঁচকে চারপাশ দেখলেন।
— কে রে? কমলা?
— হ্যাঁ ঠাকুমা।
— আর প্রতিমা?
— আমি আছি।
— ভালো ভালো।
বৃদ্ধা বসে রইলেন।
কিছুক্ষণ পরে পুকুরের জলের দিকে তাকিয়ে বললেন,
— এই পুকুরটা আগে আরও বড় ছিল।
মঞ্জু কাকিমা হেসে বললেন,
— আপনার কাছে সবই আগে বড় ছিল।
— তা ছিলই তো।
— আচ্ছা আচ্ছা, মানলাম।
কথাটা হেসে উড়িয়ে দেওয়া হলো।
কিন্তু বৃদ্ধা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
যেন তিনি সত্যিই অন্য একটা কাশীপুর দেখেছেন।
⸻
এদিকে রতনের রবিবার মানেই মাঠ।
খাওয়া শেষ করেই সে বেরিয়ে পড়ল।
প্রতিমা পেছন থেকে ডাকলেন,
— দুপুরের আগে ফিরবি।
— চেষ্টা করব।
— “চেষ্টা করব” মানে?
— ফিরব।
বলেই সে দৌড় দিল।
⸻
রাস্তার ধারে শিবু দাঁড়িয়ে ছিল।
হাতে একটা কঞ্চি।
মাটিতে আঁকিবুঁকি কাটছে।
— চল।
— চল।
দুজন হাঁটতে শুরু করল।
পথে একটা আমগাছের নিচে কয়েকজন বয়স্ক মানুষ রোদ পোহাচ্ছিলেন।
ভোলা ঘোষ, গদাধর কাকা আর আরও দু-একজন।
ভোলা ঘোষ ডাকলেন,
— আজ আবার ফুটবল?
— হ্যাঁ।
— পা ভেঙে আনিস না যেন।
পল্টু সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল,
— ভাঙলে মাস্টারমশাইকে বলব আপনিই বলেছেন।
সবাই হেসে উঠল।
⸻
মাঠে পৌঁছে দেখা গেল ইতিমধ্যেই বেশ ভিড়।
ছোটরা ক্রিকেট খেলছে।
কয়েকজন মেয়ে দূরে দাঁড়িয়ে গল্প করছে।
দু-একজন ছোট্ট বাচ্চা ঘাসের মধ্যে প্রজাপতি ধরার চেষ্টা করছে।
নরুর ছেলে বাবাই আবার সেই পুরোনো টায়ার নিয়ে এসেছে।
টায়ারটা আজও সোজা চলছে না।
তবু সে হাল ছাড়েনি।
⸻
খেলা শুরু হওয়ার আগে রতন ঘাসে বসে জুতোর ফিতে বাঁধছিল।
তার পাশে কার্তিক একটা শুকনো ডাল দিয়ে মাটি খুঁটছিল।
পল্টু একটা ছোট পাথর তুলে দূরের ঝোপের দিকে ছুঁড়ে মারল।
ঝোপটা কেঁপে উঠল।
সঙ্গে সঙ্গে একটা শালিক উড়ে বেরিয়ে এলো।
— আরে!
পল্টু নিজেই চমকে উঠল।
সবাই হেসে গড়াগড়ি।
⸻
মাঠের চারপাশে তখন শীতের নরম রোদ।
দূরে কয়েকজন মহিলা মাথায় শুকনো ডাল নিয়ে বাড়ি ফিরছেন।
কারও শাড়ির আঁচল বাতাসে উড়ছে।
কারও সঙ্গে ছোট্ট ছেলে হাঁটছে।
কেউ আবার রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে পরিচিত কাউকে ডেকে কথা বলছে।
এইসব দৃশ্য এত সাধারণ যে কেউ আলাদা করে খেয়াল করে না।
কিন্তু কাশীপুরকে কাশীপুর বানায় এইসব মানুষই।
⸻
সেদিন বিকেলে হরিপদ মাস্টার মাঠে আসেননি।
ভোলা ঘোষও না।
এটা খুব অস্বাভাবিক নয়।
তবু কার্তিক একবার বলল,
— আজ দাদুকেও দেখলাম না।
— হয়তো ঘুমোচ্ছে।
— হতে পারে।
কথা সেখানেই শেষ হয়ে গেল।
⸻
সন্ধ্যায় প্রতিমা যখন রান্নাঘরে রুটি বেলছিলেন, তখন বাইরে থেকে কমলা বৌদির গলা শোনা গেল।
— প্রতিমা!
— আসছি!
প্রতিমা হাত মুছে বেরোলেন।
কমলা বৌদি এসে দাঁড়িয়ে আছেন।
মুখে সেই চিরচেনা হাসি।
— কিছু না, ভাবলাম একটু গল্প করি।
গ্রামে এভাবেই মানুষ একে অপরের ঘরে ঢুকে পড়ে।
আগে থেকে খবর দিতে হয় না।
দরজা বন্ধ থাকে না।
মানুষও একা থাকে না।
কাশীপুর এখনও সেই পুরোনো অভ্যাস আঁকড়ে ধরে আছে।
আর হয়তো সেই কারণেই, গ্রামের গভীরে লুকিয়ে থাকা কোনো পুরোনো গোপন কথা এতদিন মানুষের চোখ এড়িয়ে থাকতে পেরেছে।
Posts: 122
Threads: 7
Likes Received: 469 in 152 posts
Likes Given: 68
Joined: Jan 2023
Reputation:
40
অধ্যায় ১২ : কাশীপুরের রাত
দিনের বেলায় কাশীপুরকে দেখে কেউ ভয় পেত না।
কাঁচা রাস্তা।
পুকুর।
মাঠ।
টিনের চালের ঘর।
মন্দিরের ঘণ্টা।
চায়ের দোকানের আড্ডা।
সব মিলিয়ে আর পাঁচটা গ্রামের মতোই।
কিন্তু রাতের কাশীপুর…
রাতের কাশীপুরকে সবাই সমানভাবে চিনত না।
⸻
সেদিন রাতেও খাওয়া শেষ হতে হতে বেশ দেরি হয়ে গিয়েছিল।
প্রতিমা রান্নাঘর গুছিয়ে নিচ্ছিলেন।
পিতলের থালা ধোয়া হয়েছে।
চুলোর আগুন প্রায় নিভে এসেছে।
এক কোণে রাখা কলসির গায়ে হারিকেনের আলো পড়ে চিকচিক করছে।
তিনি অভ্যাসমতো চালের ডিব্বার ঢাকনা একবার দেখে নিলেন।
তারপর মশলার কৌটোগুলো ঠিক জায়গায় রাখলেন।
এসব কাজ তিনি প্রায় চোখ বন্ধ করেও করতে পারেন।
তবু প্রতিদিন করেন।
একইভাবে।
একই ক্রমে।
⸻
রতন পড়ার টেবিলে বসেছিল।
অঙ্কের খাতা খোলা।
পেন্সিলটা আঙুলের ফাঁকে ঘুরছে।
পড়ার চেয়ে তার মন জানলার বাইরে বেশি।
দূরে কোথাও একটা কুকুর ডেকে উঠল।
আরেকটা উত্তর দিল।
তারপর আবার সব চুপ।
⸻
রমাপদ বারান্দায় বসে ছিলেন।
চশমা খুলে চোখ মুছলেন।
আজ খাতা দেখার ইচ্ছে করছে না।
সারাদিন কলেজে কাটিয়ে মাথাটা একটু ভারী লাগছে।
তিনি উঠোনের দিকে তাকালেন।
তুলসীতলার পাশে ছায়া পড়ে আছে।
টিউবওয়েলের হাতলটা অন্ধকারে কেবল আবছা বোঝা যাচ্ছে।
দড়িতে শুকোতে দেওয়া একটা গামছা হাওয়ায় হালকা দুলে উঠল।
এইসব দৃশ্য তিনি হাজারবার দেখেছেন।
তবু রাতে জিনিসগুলোকে একটু আলাদা লাগে।
⸻
এদিকে কাশীপুরের পুকুরটাও নিশ্চুপ।
দিনভর যেখানে কাপড় কাচা, বাসন ধোয়া, গল্পগুজব লেগে থাকে, সেই ঘাট এখন ফাঁকা।
জলের ওপর আকাশের তারাগুলো কাঁপতে কাঁপতে ভেসে আছে।
মাঝে মাঝে কোনো মাছ জলের তলা থেকে উঠে এসে ছোট্ট একটা বৃত্ত তৈরি করে।
তারপর আবার অন্ধকার।
⸻
গ্রামের শেষের দিকের মাটির রাস্তা প্রায় জনমানবশূন্য।
দিনে এখান দিয়ে গরু যায়।
সাইকেল যায়।
ছেলেরা দৌড়ায়।
কিন্তু রাতে রাস্তার ওপর শুধু কুয়াশা নামে।
কোথাও কোথাও শুকনো পাতা জমে থাকে।
বাতাস এলেই সেগুলো একটু সরে যায়।
দূর থেকে শুনলে মনে হয় কেউ হাঁটছে।
কাছে গেলে বোঝা যায়, কেউ না।
⸻
বাঁশঝাড়ের ভেতর দিয়ে বাতাস ঢুকল।
শোঁ-শোঁ।
তারপর খসখস।
আবার শোঁ-শোঁ।
কাশীপুরের মানুষ এই শব্দে অভ্যস্ত।
ছোটবেলা থেকে শুনে এসেছে।
তবু গভীর রাতে ঘুম ভেঙে গেলে অনেকেই কয়েক সেকেন্ড চুপ করে শোনে।
তারপর নিজেকে বোঝায়—
বাতাস ছাড়া আর কিছু না।
⸻
মাঠটাও এখন খালি।
বিকেলে যেখানে রতনদের চিৎকারে আকাশ মাথায় ওঠে, সেখানে এখন কুয়াশার পাতলা চাদর।
ঘাসের ডগায় শিশির জমছে।
এদিক-ওদিক দু-একটা জোনাকি জ্বলছে।
দিনের পরিচিত মাঠটাকে যেন চিনতেই কষ্ট হয়।
⸻
নরুর দোকান বন্ধ।
কাঠের ঝাঁপ নামানো।
বেঞ্চ দুটো ফাঁকা।
দিনভর চায়ের গন্ধ, হাসাহাসি, তর্কের পর এখন সেখানে শুধু নীরবতা।
দোকানের সামনে একটা কুকুর গোল হয়ে শুয়ে আছে।
মাঝে মাঝে কান নেড়ে আবার ঘুমিয়ে পড়ছে।
⸻
রাত আরও গভীর হলো।
কাশীপুরের বেশিরভাগ মানুষ তখন ঘুমিয়ে।
কারও স্বপ্নে ফসল।
কারও স্বপ্নে শহরে থাকা ছেলে।
কারও স্বপ্নে আগামীকালের কাজ।
সবকিছু যেন স্বাভাবিক।
একেবারে স্বাভাবিক।
⸻
কিন্তু কিছু জায়গা আছে, যেগুলোকে রাত অন্যভাবে ছুঁয়ে যায়।
কাশীপুরের কয়েকজন বৃদ্ধ মানুষ এটা জানেন।
তারা কাউকে বোঝানোর চেষ্টা করেন না।
কারণ ব্যাখ্যা করা কঠিন।
হয়তো অসম্ভবও।
তারা শুধু জানেন—
কিছু কিছু জায়গা দিনের আলোয় যেমন দেখায়, অন্ধকারে ঠিক তেমন থাকে না।
আর সেই কারণেই হয়তো, অনেক পুরোনো অভ্যাস আজও পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি।
কেউ কেউ এখনও অকারণে কিছু রাস্তা এড়িয়ে চলে।
কেউ কেউ এখনও সন্ধ্যার পরে বাড়ি ফিরতে দেরি করতে চায় না।
আর কেউ কেউ কোনো কোনো প্রসঙ্গ উঠলেই চুপ করে যায়।
⸻
সেই রাতেও কাশীপুর ঘুমিয়ে ছিল।
শীতের কুয়াশা ধীরে ধীরে নামছিল।
একটা রাতচরা পাখি ডেকে উঠল দূরে কোথাও।
তারপর আবার নীরবতা।
এমন নীরবতা, যার ভেতরে কোনো রহস্য আছে কি না, তা কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারে না।
তবু…
কিছু কিছু মানুষ মনে মনে বিশ্বাস করে—
সব নীরবতা একরকম নয়।
Posts: 122
Threads: 7
Likes Received: 469 in 152 posts
Likes Given: 68
Joined: Jan 2023
Reputation:
40
অধ্যায় ১৩ : দেরি
শীতকালের বিকেলগুলো বড়ই বিশ্বাসঘাতক।
মনে হয় এখনও অনেক সময় আছে।
তারপর হঠাৎ দেখা যায় সূর্য নেমে গেছে, আলো ফুরিয়ে এসেছে।
কাশীপুরের মানুষ এই ব্যাপারটা ভালো করেই জানে।
তাই বিকেলের কাজগুলো সবাই একটু তাড়াতাড়িই সেরে ফেলার চেষ্টা করে।
⸻
সেদিন কলেজ থেকে ফেরার পথে রতনরা রাস্তার ধারে একটা খেজুর গাছের নিচে দাঁড়িয়েছিল।
গাছের গায়ে বাঁধা মাটির ভাঁড় থেকে ফোঁটা ফোঁটা রস পড়ছে।
পল্টু দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সেটা দেখছিল।
— যদি একটু খেতে দিত!
— চুরি করে খাস।
বাপন বলল।
— তারপর ধরা পড়লে?
— তাহলে দৌড় দিবি।
পল্টু গভীর চিন্তার ভান করল।
— পরিকল্পনাটা খারাপ না।
শিবু হেসে ফেলল।
⸻
বাড়ি ফিরে রতন দেখল প্রতিমা একটা পুরোনো শার্টে বোতাম লাগাচ্ছেন।
জানলার পাশে বসে কাজ করছেন।
আলো ভালো পাওয়া যায় সেখানে।
সুঁইয়ে সুতো ঢোকাতে গিয়ে একবার চোখ ছোট করলেন।
তারপর আবার চেষ্টা করলেন।
— মা।
— কী?
— খেতে কী হবে?
— আগে হাতমুখ ধুয়ে আয়।
— সেটা তো হবেই।
— তাহলে প্রশ্ন কেন?
রতন হেসে বেরিয়ে গেল।
⸻
বিকেলের দিকে মাঠ যথারীতি জমে উঠল।
আজ একটু বেশি ঠান্ডা।
খেলার ফাঁকে ফাঁকে সবাই নিঃশ্বাসের ধোঁয়া বের করে দেখছে।
পল্টু সবচেয়ে বেশি।
সে বারবার মুখ দিয়ে বাতাস ছাড়ছে।
— দেখ! ধোঁয়া বেরোচ্ছে!
— তো?
— আমি ড্রাগন।
— তুই গাধা।
কার্তিক উত্তর দিল।
সবাই হেসে উঠল।
⸻
মাঠের একধারে কয়েকজন ছোট ছেলে ঘুড়ি ওড়ানোর চেষ্টা করছিল।
হাওয়া কম।
ঘুড়ি বারবার উঠছে, আবার নামছে।
একজন রেগে গিয়ে সুতোটা মাটিতে ছুঁড়ে ফেলল।
আরেকজন বলল,
— আরে ধৈর্য ধর!
এইসব ছোটখাটো ঘটনা মাঠজুড়ে ছড়িয়ে ছিল।
⸻
সূর্য একটু নিচে নামতেই লোকজনও কমতে শুরু করল।
গ্রামের মহিলারা কেউ কেউ মাথায় শুকনো ডালের বোঝা নিয়ে ফিরছেন।
কেউ পুকুরঘাট থেকে আসছেন।
কেউ দূর থেকে পরিচিত কাউকে দেখে দাঁড়িয়ে দুটো কথা বলে নিচ্ছেন।
কাশীপুর সন্ধ্যার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
⸻
ঠিক সেই সময় খবরটা প্রথম এল।
মধু ঘোষের ছোট ছাগলটা এখনও ফেরেনি।
খবরটা অবশ্য প্রথমে কেউ গুরুত্ব দিল না।
ছাগল মাঝেমধ্যে এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়ায়।
এ নতুন কিছু নয়।
নরুর দোকানে বসে ভোলা ঘোষ বললেন,
— একটু পরেই চলে আসবে।
গদাধর কাকা মাথা নাড়লেন।
— নিশ্চয়ই।
নরুও একই কথা বলল।
— ছাগল কি ট্রেনে চেপে কলকাতা যাবে নাকি?
হাসাহাসি হলো।
বিষয়টা সেখানেই শেষ হয়ে গেল।
⸻
কিন্তু সন্ধ্যা নামার পরও ছাগলটা ফিরল না।
এবার মধু ঘোষ নিজে বেরোলেন খুঁজতে।
দু-একজন প্রতিবেশীও গেল।
কারণ গ্রামে এমনটাই হয়।
একজনের সমস্যা মানে অনেক সময় সবার সমস্যা।
⸻
নরুর দোকানে তখন হারিকেন জ্বলছে।
কেটলির মুখ দিয়ে বাষ্প উঠছে।
বেঞ্চের নিচে একটা কুকুর কুঁকড়ে শুয়ে আছে।
ভোলা ঘোষ চায়ের ভাঁড় হাতে নিয়ে বসেছিলেন।
ঠিক তখনই মধু ঘোষের ভাই এসে বলল,
— কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না।
নরু বলল,
— ভালো করে দেখেছ?
— যতদূর পারি দেখেছি।
ভোলা ঘোষের মুখের হাসিটা একটু মিলিয়ে গেল।
— কোথায় কোথায় খুঁজেছ?
লোকটা কয়েকটা জায়গার নাম বলল।
সবাই শুনল।
কেউ কিছু বলল না।
⸻
সেই সময় রতনও দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল।
সে লক্ষ্য করল, হরিপদ মাস্টার আজও এসেছেন।
কিন্তু আগের মতো গল্প করছেন না।
শুধু চুপচাপ শুনছেন।
মধু ঘোষের ভাই যখন বলল—
— মাঠের ওদিকটাও দেখে এসেছি…
তখন হরিপদ মাস্টারের আঙুল ভাঁড়ের গায়ে একবার থেমে গেল।
খুব ছোট্ট একটা ব্যাপার।
হয়তো কাকতালীয়।
হয়তো না।
রতন ঠিক বুঝতে পারল না।
⸻
— পাওয়া যাবে।
শেষমেশ গদাধর কাকা বললেন।
— ছাগল তো আর হাওয়া হয়ে যায় না।
কথাটা যুক্তিসঙ্গত।
সবাই মাথা নাড়ল।
ধীরে ধীরে আড্ডা অন্যদিকে চলে গেল।
কিন্তু আগের সেই হাসিঠাট্টা আর ফিরল না।
⸻
রাতে বাড়ি ফিরে রতন দেখল রমাপদ বই পড়ছেন।
প্রতিমা একটা পুরোনো চাদর গুছিয়ে রাখছেন।
ঘরটায় পরিচিত উষ্ণতা।
নিরাপত্তা।
স্বাভাবিকতা।
তবু রতনের মাথায় ঘুরছিল ছাগলটার কথা।
একটা ছাগল হারানোয় এত ভাবার কী আছে?
সে নিজেই বুঝতে পারছিল না।
⸻
ঘুমোতে যাওয়ার আগে সে জানলার কাছে দাঁড়াল।
বাইরে কুয়াশা।
দূরে একটা আলো।
সম্ভবত কারও উঠোনে হারিকেন।
তারও দূরে অন্ধকার।
অসীম অন্ধকার।
রতন কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইল।
তারপর জানলা বন্ধ করে দিল।
সে জানত না, মধু ঘোষের ছাগলটার গল্প এখানেই শেষ হয়নি।
আর কাশীপুরের কয়েকজন বৃদ্ধ মানুষ সেই রাতে স্বাভাবিকের চেয়ে একটু বেশি সময় জেগে ছিলেন।
Posts: 122
Threads: 7
Likes Received: 469 in 152 posts
Likes Given: 68
Joined: Jan 2023
Reputation:
40
অধ্যায় ১৪ : লণ্ঠনের আলো
মধু ঘোষের ছাগলটা সেদিন আর ফিরল না।
রাতের খাওয়া-দাওয়া শেষ হয়ে গেছে।
বেশিরভাগ বাড়ির হারিকেন নিভে এসেছে।
কাশীপুর ধীরে ধীরে ঘুমিয়ে পড়ছে।
তবু কয়েকটা মানুষ এখনও জেগে।
কারণ একটা ছাগল হয়তো খুব বড় ব্যাপার নয়, কিন্তু গ্রামের মানুষ জানে—যা প্রতিদিনের নিয়মে ঘটে, হঠাৎ তা না ঘটলে অস্বস্তি থেকেই যায়।
⸻
নরুর দোকানের সামনে তখনও দু-একজন দাঁড়িয়ে।
হারিকেনের আলোয় ধোঁয়া ভাসছে।
মধু ঘোষের মুখে চিন্তার ছাপ।
ভোলা ঘোষ গোঁফে হাত বুলিয়ে বললেন,
— চল, আর একবার খুঁজে দেখি।
— এখন?
— এখনই।
— কুয়াশা বাড়ছে।
— তবু চল।
⸻
শেষ পর্যন্ত পাঁচজন বেরোল।
মধু ঘোষ।
তার ভাই নিতাই।
ভোলা ঘোষ।
গদাধর কাকা।
আর হরিপদ মাস্টার।
হরিপদ মাস্টার প্রথমে যেতে চাইছিলেন না।
কেউ খেয়াল করেনি।
শুধু ভোলা ঘোষ একবার বলেছিলেন,
— আপনি যাবেন?
বৃদ্ধ মানুষটা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে বলেছিলেন,
— যাই।
শব্দটা খুব সাধারণ ছিল।
কিন্তু তার মুখটা সাধারণ ছিল না।
⸻
প্রত্যেকের হাতে লণ্ঠন।
মাটির রাস্তা ধরে তারা এগোতে লাগল।
পায়ের নিচে শুকনো পাতা মচমচ শব্দ করছে।
দূরে কোথাও শেয়াল ডেকে উঠল।
নিতাই থেমে গেল।
— শেয়াল।
— তা তো।
ভোলা ঘোষ বললেন।
— বাঘ না।
লোকজন হেসে ফেলল।
কিন্তু হাসিটা বেশিক্ষণ টিকল না।
⸻
প্রথমে তারা পুকুরপাড় খুঁজল।
তারপর বাঁশঝাড়ের দিক।
তারপর জমির আল।
ছাগলের কোনো চিহ্ন নেই।
কোথাও না।
⸻
একসময় মধু ঘোষ বিরক্ত হয়ে বলল,
— তাহলে গেল কোথায়?
কেউ উত্তর দিল না।
শুধু লণ্ঠনের আগুনটা বাতাসে দুলে উঠল।
⸻
আরও কিছুটা এগিয়ে গিয়ে তারা মাঠের কাছে পৌঁছাল।
দিনের সেই চেনা মাঠ।
যেখানে বিকেলে ছেলেরা খেলাধুলো করে।
এখন কুয়াশায় আধা ঢাকা।
দূর থেকে মনে হচ্ছে যেন মাঠটা আরও বড়।
আরও ফাঁকা।
আরও নীরব।
⸻
হরিপদ মাস্টার হঠাৎ হাঁটা একটু ধীর করলেন।
খুব সামান্য।
কেউ খেয়াল করার কথা নয়।
তবু ভোলা ঘোষ করলেন।
তিনি কিছু বললেন না।
শুধু একবার তাকালেন।
তারপর আবার সামনে।
⸻
মাঠের শেষপ্রান্তের দিকে যেতে যেতে কুয়াশা যেন একটু ঘন হলো।
হয়তো সত্যিই।
হয়তো শুধু মনে হচ্ছে।
রাতের বেলায় অনেক কিছুই নিশ্চিত করে বলা যায় না।
⸻
নিতাই লণ্ঠন উঁচু করল।
আলোটা সামনে পড়ল।
শুকনো ঘাস।
ঝোপ।
মাটি।
আর কিছু না।
⸻
ঠিক তখনই মধু ঘোষ বলল,
— দাঁড়া।
সবাই থামল।
— কী হয়েছে?
— ওটা কী?
মাটির দিকে আঙুল দেখাল সে।
⸻
লণ্ঠনের আলো নামানো হলো।
মাটিতে কিছু একটা পড়ে আছে।
একটা দড়ি।
ছাগলের গলায় বাঁধা দড়ির মতো।
মধু ঘোষ নিচু হয়ে তুলে নিল।
— এটাই তো!
তার গলায় উত্তেজনা।
— এটাই আমার ছাগলের দড়ি।
⸻
ভোলা ঘোষ বললেন,
— ছিঁড়েছে নাকি?
মধু ঘোষ দড়িটা উলটে-পালটে দেখল।
তারপর কপাল কুঁচকে গেল।
— না।
— খুলে গেছে?
— তাও না।
⸻
কথাটা শুনে সবাই চুপ।
দড়িটার একদিক অদ্ভুতভাবে ফাঁকা।
যেন বাঁধা ছিল।
আবার যেন ছিল না।
ছেঁড়া নয়।
খোলা নয়।
তবু আলাদা।
⸻
ঠিক সেই সময় হরিপদ মাস্টার নিচের দিকে তাকিয়ে ছিলেন।
দীর্ঘক্ষণ।
অস্বাভাবিক দীর্ঘক্ষণ।
⸻
ভোলা ঘোষ বললেন,
— কী দেখছেন?
হরিপদ মাস্টার উত্তর দিলেন না।
প্রথমে।
তারপর খুব আস্তে বললেন,
— কিছু না।
কিন্তু তার গলার স্বর বলছিল, তিনি কিছু একটা দেখেছেন।
অথবা মনে করেছেন।
⸻
মাটিতে দড়িটার কাছেই কালচে একটা দাগ ছিল।
পুরোনো।
খুব পুরোনো।
বৃষ্টিতে ধোয়া।
রোদে পোড়া।
মাটির সঙ্গে প্রায় মিশে যাওয়া।
দিনের বেলায় কেউ দেখলেও গুরুত্ব দিত না।
⸻
হরিপদ মাস্টারের চোখ সেখানে স্থির।
তার মুখে এমন এক অভিব্যক্তি ফুটে উঠল, যা রতন কখনও দেখেনি।
যদিও রতন এখানে নেই।
তবু যদি থাকত, সে বুঝত—
এটা ভয় না।
এটা আতঙ্কও না।
এটা এমন কিছু, যা বহু বছর ধরে ভুলে থাকতে চেয়েও ভুলে থাকা যায়নি।
⸻
হঠাৎ দূরে একটা রাতচরা পাখি ডেকে উঠল।
খুব কাছে মনে হলো।
আবার খুব দূরে।
নিতাই চমকে কাঁধ ঘুরিয়ে তাকাল।
কেউ কিছু বলল না।
⸻
শেষ পর্যন্ত তারা ছাগলটাকে পেল না।
শুধু দড়িটা নিয়ে ফিরে এল।
⸻
ফেরার সময় কেউ খুব বেশি কথা বলছিল না।
লণ্ঠনের আলো রাস্তার ওপর দুলছিল।
একেকবার মনে হচ্ছিল সামনে কেউ দাঁড়িয়ে আছে।
কাছে গেলে দেখা যাচ্ছে, একটা ঝোপ।
অথবা বাঁকা গাছের ছায়া।
⸻
কাশীপুর তখন ঘুমিয়ে।
বাড়ির ভেতরে রতনও ঘুমিয়ে।
প্রতিমা ঘুমিয়ে।
রমাপদ ঘুমিয়ে।
তারা কেউ জানে না, সেই রাতে গ্রামের কয়েকজন মানুষ এমন একটা জায়গায় গিয়েছিল, যেখানে গিয়ে হরিপদ মাস্টার ফেরার পর অনেকক্ষণ ঘুমোতে পারেননি।
আর বহু বছর পরে প্রথমবারের মতো, তিনি শুয়ে শুয়ে একটা পুরোনো নাম মনে করার চেষ্টা করেছিলেন।
একটা নাম…
যেটা তিনি দীর্ঘদিন ধরে উচ্চারণ করেননি।
আর যার সঙ্গে জড়িয়ে ছিল কাশীপুরের বহু পুরোনো, প্রায় বিস্মৃত একটা ইতিহাস।
•
Posts: 122
Threads: 7
Likes Received: 469 in 152 posts
Likes Given: 68
Joined: Jan 2023
Reputation:
40
অধ্যায় ১৫ : যে কথা বলা হয় না
পরদিন সকালে কাশীপুর আবার আগের মতোই ছিল।
সূর্য উঠেছে।
পুকুরঘাটে ভিড়।
নরুর দোকানে চায়ের কেটলি চাপানো।
মাঠে দু-একটা গরু চরছে।
দেখলে কেউ বলবে না, আগের রাতে গ্রামের কয়েকজন মানুষ কুয়াশার মধ্যে একটা হারানো ছাগল খুঁজতে বেরিয়েছিল।
আর দেখলে কেউ বলবে না, হরিপদ মাস্টার প্রায় সারারাত ঘুমোতে পারেননি।
⸻
রতনের অবশ্য এসব কিছুই জানা নেই।
সে তখন নিজের সমস্যা নিয়েই ব্যস্ত।
অঙ্কের হোমওয়ার্ক।
মাস্টারমশাইয়ের বকুনি।
আর রবিবারের ম্যাচ।
তেরো বছরের ছেলের পৃথিবী সাধারণত এতটুকুই।
তার চেয়ে বড় চিন্তা করার দরকার হয় না।
⸻
সকালে খেতে বসে রতন ভাতের সঙ্গে আলুভাজা মাখছিল।
প্রতিমা রান্নাঘর থেকে বললেন,
— ধীরে খা।
— দেরি হয়ে যাবে।
— প্রতিদিনই দেরি হয়, তবু বেঁচে আছিস।
রতন হেসে ফেলল।
⸻
আলোয় বসে থাকতে থাকতে প্রতিমার মুখটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল।
গায়ের রং খুব ফর্সা নয়, আবার চাপাও নয়।
বছরের পর বছর রোদ, ধোঁয়া আর সংসারের কাজের ছাপ আছে মুখে।
তবু চোখ দুটো শান্ত।
অদ্ভুতভাবে শান্ত।
গ্রামের অনেক মহিলার মতো তিনিও বেশি কথা বলেন না।
কিন্তু রতনের সামান্য জ্বর হলেও রাত জেগে বসে থাকতে পারেন।
⸻
রমাপদ তখন সাইকেল বের করছেন।
তার বয়স চল্লিশ পেরিয়েছে।
একসময় বেশ রোগা ছিলেন।
এখন শরীর একটু ভরাট।
নাকের ওপর চশমা না থাকলে যেন তাকে অসম্পূর্ণ লাগে।
সাইকেলের চেনটা আবার একটু শব্দ করছে।
তিনি নিচু হয়ে দেখলেন।
তারপর মাথা নেড়ে বললেন,
— আবার তেল দিতে হবে।
এ কথাটা তিনি গত মাসেও বলেছিলেন।
তার আগের মাসেও।
⸻
কলেজে যাওয়ার পথে রতন একটা শুকনো কঞ্চি কুড়িয়ে নিল।
হাঁটতে হাঁটতে সেটা দিয়ে রাস্তার ধুলোয় দাগ কাটছিল।
কখনও ঝোপে ঠুকছিল।
কখনও পথের ধারে থাকা আগাছায়।
কার্তিক বলল,
— তুই পাঁচ বছরের বাচ্চা নাকি?
— চুপ কর।
— তাহলে এসব করছিস কেন?
— এমনি।
এই “এমনি”র কোনো উত্তর হয় না।
⸻
কলেজ ছুটি হওয়ার পরে ফেরার সময় রতন লক্ষ্য করল কার্তিক আজ অদ্ভুত চুপ।
পল্টুও খেয়াল করল।
— কী রে?
— কিছু না।
— কিছু না মানে?
কার্তিক একটু ইতস্তত করল।
তারপর বলল,
— কাল রাতে দাদু একটা কথা বলছিল।
রতন তাকাল।
— কী কথা?
— ওই ছাগল নিয়ে।
— তারপর?
কার্তিক গলা নামাল।
— বলছিল, আগে নাকি এমন একবার হয়েছিল।
— কী হয়েছিল?
— জানি না।
— দাদু বলল না?
— বলছিল… তারপর হঠাৎ থেমে গেল।
⸻
সন্ধ্যার আগে রতন মাঠে গেল।
খেলা হলো।
হাসাহাসি হলো।
ঝগড়াও হলো।
সবই স্বাভাবিক।
তবু আজ কেন জানি মাঠটাকে একটু অন্যরকম লাগছিল।
মাঠ বদলায়নি।
আকাশও না।
বন্ধুরাও না।
তবু…
কখনও কখনও কোনো কারণ ছাড়াই একটা জায়গাকে আলাদা লাগে।
⸻
সূর্য নামার সময় রতন বলটা কুড়িয়ে আনতে একটু দূরে গিয়েছিল।
মাঠের শেষদিকে নয়।
তার অনেক আগেই।
তবু বাকিদের চেয়ে একটু দূরে।
সে নিচু হয়ে বলটা তুলল।
ঠিক তখনই…
তার মনে হলো কেউ যেন তাকিয়ে আছে।
⸻
সে সঙ্গে সঙ্গে মাথা তুলল।
কেউ না।
শুধু কুয়াশা।
ঘাস।
দূরের গাছ।
আর সন্ধ্যার আলো।
⸻
কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে রইল সে।
তারপর নিজেই হেসে ফেলল।
— ধুর।
বলটা বগলে নিয়ে ফিরে এল।
⸻
কিন্তু সেই রাতে…
ঘুমের মধ্যে রতন একটা অদ্ভুত স্বপ্ন দেখল।
স্বপ্নে সে মাঠে দাঁড়িয়ে।
একাই।
চারপাশে কেউ নেই।
কোনো শব্দ নেই।
শুধু দূরে একটা খুব বড় ছায়া।
গাছও হতে পারে।
আবার নাও হতে পারে।
স্বপ্নে সে সেটা দেখার চেষ্টা করছিল।
বারবার।
কিন্তু যতই তাকায়, কুয়াশা ততই ঘন হয়ে যায়।
⸻
ভোরের দিকে তার ঘুম ভাঙল।
ঘাম হয়নি।
ভয়ও লাগেনি।
স্বপ্নটা প্রায় মনেই নেই।
শুধু একটা অনুভূতি রয়ে গেছে।
যেন সে কাউকে মনে করার চেষ্টা করছে।
কিন্তু মনে করতে পারছে না।
আর গ্রামের অন্যপ্রান্তে, নিজের ঘরের অন্ধকারে বসে হরিপদ মাস্টার জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিলেন।
তার সামনে খোলা একটা পুরোনো খাতা।
হলুদ হয়ে যাওয়া পাতা।
আর পাতার এক কোণে কাঁপা হাতে লেখা একটা নাম।
একটা নাম, যেটা তিনি বহু বছর উচ্চারণ করেননি।
তিনি অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলেন।
তারপর ধীরে ধীরে খাতাটা বন্ধ করে দিলেন।
বাইরে তখন ভোরের আলো ফুটছে।
কিন্তু হরিপদ মাস্টারের মুখ দেখে মনে হচ্ছিল, তার মনে এখনও রাত কাটেনি।
•
Posts: 122
Threads: 7
Likes Received: 469 in 152 posts
Likes Given: 68
Joined: Jan 2023
Reputation:
40
অধ্যায় ১৬ : সাহস
ছাগল হারানোর ঘটনার পর কয়েকদিন কেটে গেছে।
কাশীপুর আবার তার নিজের ছন্দে ফিরেছে।
অন্তত বাইরে থেকে তাই মনে হয়।
মানুষের জীবন থেমে থাকে না।
ধান শুকোয়।
কলেজ বসে।
চায়ের দোকানে আড্ডা হয়।
পুকুরঘাটে গল্প হয়।
শীতের রোদে বৃদ্ধরা বসে গা গরম করে।
সবকিছুই আগের মতো।
তবু কিছু কিছু ঘটনা গ্রামের মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকে।
চোখে দেখা যায় না।
কিন্তু পুরোপুরি হারিয়েও যায় না।
⸻
সেদিন শনিবার।
কলেজে অর্ধেক দিন ক্লাস হয়েছিল।
দুপুরের আগেই ছুটি।
ফেরার পথে পল্টুর হাতে একটা শুকনো আখের টুকরো ছিল।
সে হাঁটতে হাঁটতে সেটা চিবোচ্ছিল।
হঠাৎ বলে উঠল,
— শুনেছিস?
— কী?
— মধু কাকার ছাগলটা নাকি এখনও পাওয়া যায়নি।
বাপন বলল,
— একটা ছাগল নিয়ে এত কথা বলিস কেন?
— কারণ ব্যাপারটা রহস্যময়।
— তুই বেশি সিনেমা দেখিস।
⸻
কথা বলতে বলতে তারা গ্রামের শেষদিকের রাস্তার দিকে চলে এসেছিল।
এখানে লোকজন তুলনামূলক কম।
রাস্তার দুপাশে ঝোপঝাড়।
মাঝে মাঝে বড় বড় গাছ।
শীতের বিকেলের আলোও যেন একটু ফিকে।
⸻
কার্তিক হঠাৎ বলল,
— দাদু কাল আবার বলছিল।
— কী?
— কিছু জায়গা নাকি সন্ধ্যার পরে ফাঁকা রাখা ভালো।
পল্টু হেসে উঠল।
— আবার শুরু হলো।
— আমি বানাচ্ছি না।
— তা হলে দাদুকে নিয়ে একদিন মাঠে চল।
কার্তিক চুপ করে গেল।
⸻
রতন তখন রাস্তার ধারের একটা ছোট পাথর পা দিয়ে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছিল।
কিছু বলছিল না।
কিন্তু তার মনে পড়ছিল কয়েক রাত আগের স্বপ্নটার কথা।
স্বপ্নটা প্রায় ভুলে গেছে।
তবু পুরোপুরি নয়।
⸻
বিকেলে মাঠে লোকজন কম ছিল।
শীতের দিনে অনেকেই তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে যায়।
তবু রতনরা খেলা শুরু করল।
চিৎকার।
দৌড়ঝাঁপ।
হাসাহাসি।
সব আগের মতো।
⸻
খেলার মাঝখানে বলটা একবার অনেক দূরে চলে গেল।
মাঠের শেষের দিক নয়।
তবু স্বাভাবিক খেলার এলাকার বাইরে।
পল্টু বলল,
— নিয়ে আয়।
— তুই যা।
— আমি কেন?
— তুই সবচেয়ে কাছে।
— আমি ক্যাপ্টেন।
— কে বানিয়েছে?
— আমি নিজে।
সবাই হেসে উঠল।
শেষ পর্যন্ত রতনই গেল।
⸻
দৌড়ে গিয়ে বলটা তুলে নিল।
তারপর এক মুহূর্তের জন্য দাঁড়িয়ে রইল।
সামনে আরও কিছুটা খোলা জায়গা।
তারও পরে কুয়াশার মধ্যে গাছের অস্পষ্ট অবয়ব।
দূরে।
খুব দূরে।
দিনের আলোয় তেমন কিছু মনে হয় না।
তবু…
কেন জানি জায়গাটা তার চোখে আটকে গেল।
⸻
— এইইই!
পেছন থেকে পল্টুর চিৎকার।
— ঘুমিয়ে গেছিস নাকি?
রতন ফিরে তাকাল।
তারপর বল নিয়ে ফিরে এল।
⸻
খেলা শেষ হওয়ার পরে ছেলেরা মাঠের ধারে বসে গল্প করছিল।
কারও হাতে বাদাম।
কারও হাতে গুড়।
শীতের বিকেলের শেষ আলো তখন ধীরে ধীরে মরে যাচ্ছে।
⸻
পল্টু হঠাৎ বলল,
— একটা কথা বলি?
— বল।
— তোরা সবাই ভয়পাস।
— কিসের?
— ওইসব জায়গার।
কার্তিক সঙ্গে সঙ্গে বলল,
— ভয় পাওয়ার কথা বলিনি।
— বলেছিস।
— বলিনি।
— বলেছিস।
⸻
তর্ক শুরু হলো।
স্বাভাবিক তর্ক।
কিশোরদের তর্ক।
কিন্তু ধীরে ধীরে সেটা অন্যদিকে গেল।
⸻
— তাহলে সন্ধ্যার পরে যাবি?
পল্টু বলল।
— কোথায়?
— ওইদিকে।
সে মাথা নেড়ে দূরের অস্পষ্ট অংশটার দিকে ইশারা করল।
⸻
কয়েক সেকেন্ড চুপচাপ।
তারপর বাপন বলল,
— পাগল নাকি?
— কেন?
— দরকার কী?
— দরকার নেই বলেই তো মজা।
⸻
রতন কিছু বলল না।
শুধু শুনছিল।
⸻
পল্টু আবার বলল,
— দেখলি? কেউ যাবে না।
— না গেলেই ভয় পেয়েছি?
কার্তিক বিরক্ত।
— তাহলে যা।
— তুই যা।
— আমি কেন?
— তুই তো বড় সাহসী।
⸻
কথাগুলো মজার ছলে বলা।
হাসাহাসিও হচ্ছে।
কিন্তু রতনের ভেতরে অদ্ভুত কিছু নড়েচড়ে উঠল।
তেরো বছরের ছেলেদের একটা বয়স থাকে, যখন নিজেদের সাহস প্রমাণ করার ইচ্ছে খুব বেশি।
বিশেষ করে বন্ধুদের সামনে।
⸻
সে মাটির দিকে তাকাল।
তারপর দূরের দিকে।
আবার বন্ধুদের দিকে।
⸻
— গেলে কী হবে?
সে জিজ্ঞেস করল।
পল্টুর চোখ চকচক করে উঠল।
— তাহলে তুই কিংবদন্তি।
— ধুর।
— সত্যি।
⸻
সবাই হেসে ফেলল।
কথাটা মজার।
একেবারেই সিরিয়াস নয়।
⸻
কিন্তু সেদিন বাড়ি ফেরার পথে রতনের মাথায় কথাটা রয়ে গেল।
অকারণে।
⸻
রাতে খাওয়ার সময়ও।
অঙ্ক করতে বসার সময়ও।
ঘুমোতে যাওয়ার সময়ও।
⸻
বাইরে তখন শীতের হাওয়া।
দূরে কুকুর ডাকছে।
প্রতিমা মশারি গুঁজে দিচ্ছেন।
রমাপদ বই বন্ধ করে আলো কমিয়ে দিলেন।
⸻
রতন চোখ বন্ধ করল।
কিন্তু ঘুম আসার আগে শেষ যে চিন্তাটা তার মাথায় এল, সেটা অঙ্ক নয়।
কলেজ নয়।
ফুটবলও নয়।
⸻
তার মনে হলো—
সত্যিই যদি একদিন গিয়ে দেখা যায়?
সত্যিই যদি কিছু না থাকে?
⸻
আর সেই একই সময়ে, কাশীপুরের অন্যপ্রান্তে, হরিপদ মাস্টার নিজের উঠোনে দাঁড়িয়ে ছিলেন।
দূরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে।
অনেকক্ষণ।
খুব অনেকক্ষণ।
তারপর প্রায় ফিসফিস করে বললেন,
— আর যেন কেউ না যায়…
কথাটা শুনবার মতো কেউ ছিল না।
শুধু শীতের বাতাস।
আর নীরব রাত।
•
Posts: 122
Threads: 7
Likes Received: 469 in 152 posts
Likes Given: 68
Joined: Jan 2023
Reputation:
40
অধ্যায় ১৭ : বাজি
শীতের বিকেলগুলো দ্রুত ফুরিয়ে যায়।
কলেজ ছুটি, দুপুরের খাওয়া, একটু পড়া, তারপর মাঠ—সবকিছু যেন চোখের পলকেই শেষ হয়ে আসে।
সেদিনও তার ব্যতিক্রম হলো না।
⸻
মাঠে পৌঁছে রতন দেখল পল্টু আগেই এসেছে।
হাতে ফুটবল।
পায়ে জুতো নেই।
ঘাসের ওপর দাঁড়িয়ে একা একা বল মারছে।
একবার বলটা বেশি জোরে মারতেই সেটা গিয়ে একটা ঝোপে ঢুকল।
পল্টু নিজেই গিয়ে তুলে আনল।
ফিরতে ফিরতে বিড়বিড় করছিল,
— একদিন এই বলটা আমায় মেরেই ফেলবে।
⸻
খেলা জমে উঠতে বেশি সময় লাগল না।
চিৎকার।
হাসাহাসি।
ঝগড়া।
আবার মিল।
কাশীপুরের মাঠে বিকেল মানেই এসব।
⸻
দূরে কয়েকজন মহিলা মাথায় কলসি নিয়ে পুকুর থেকে ফিরছিলেন।
কারও সঙ্গে ছোট্ট ছেলে।
কারও সঙ্গে মেয়ে।
কেউ হাঁটতে হাঁটতে গল্প করছে।
কেউ আবার হেসে উঠছে কোনো কথায়।
শীতের নরম রোদ তাদের গায়ের শালের ওপর পড়ে ঝলমল করছিল।
⸻
খেলা শেষে সবাই হাঁপাতে হাঁপাতে মাঠের ধারে বসে পড়ল।
ঘাস ভেজা।
হাতে ধরলে ঠান্ডা লাগে।
কার্তিক একটা শুকনো ঘাস ছিঁড়ে দাঁতে কাটছিল।
পল্টু মাটিতে কাঠি দিয়ে গোল গোল দাগ আঁকছিল।
⸻
কথা ঘুরতে ঘুরতে আবার সেই জায়গায় এল।
যে জায়গার নাম কেউ ঠিকমতো নেয় না।
শুধু বলে—
“ওইদিক।”
⸻
— রতন তো বলেছিল যাবে।
পল্টু বলল।
— কবে বললাম?
— সেদিন।
— আমি শুধু জিজ্ঞেস করেছিলাম।
— ভয় পেয়ে গেছিস?
পল্টুর মুখে সেই পরিচিত হাসি।
যে হাসি দেখে বোঝা যায় সে ইচ্ছে করেই খোঁচাচ্ছে।
⸻
রতন কিছু বলল না।
সে জানে পল্টুকে উত্তর দিলে পল্টু আরও খোঁচাবে।
⸻
— ভয় পেলে সমস্যা নেই।
পল্টু আবার বলল।
— সবাই সব পারে না।
⸻
বাপন হেসে ফেলল।
শিবুও।
কার্তিক অবশ্য হাসল না।
সে শুধু চুপ করে ছিল।
⸻
রতনের বুকের ভেতর হালকা একটা জেদ জেগে উঠল।
কারণ ভয় পাওয়ার জন্য নয়।
বরং তাকে ভয় পেয়েছে ভাবা হচ্ছে বলে।
⸻
— যাব।
সে শান্ত গলায় বলল।
⸻
কথাটা শুনে কয়েক সেকেন্ড সবাই চুপ।
⸻
— সত্যি?
পল্টুর চোখ বড় হয়ে গেল।
— হ্যাঁ।
— আজ?
— না।
— তাহলে?
— কাল।
⸻
কার্তিক সঙ্গে সঙ্গে মাথা তুলল।
— পাগল নাকি?
— কেন?
— দরকার কী?
— কোনো দরকার নেই।
রতন কাঁধ ঝাঁকাল।
— তবু যাব।
⸻
বাপন হেসে বলল,
— গিয়ে যদি ভূত ধরে?
— তাহলে তোকে আগে ধরবে।
— কেন?
— তুই বেশি কথা বলিস।
⸻
আবার হাসাহাসি।
কিন্তু কার্তিক হাসল না।
⸻
সূর্য তখন প্রায় ডুবে গেছে।
মাঠের ওপর লম্বা ছায়া পড়েছে।
দূরের গাছগুলোকে অদ্ভুত কালচে দেখাচ্ছে।
⸻
রতন একবার সেদিকে তাকাল।
অনেক দূরে।
কুয়াশার আবছা পর্দার ওপারে।
⸻
কিছুই দেখা যায় না।
তবু…
কী যেন আছে।
ঠিক কী, সে বলতে পারল না।
⸻
সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরতেই প্রতিমা বললেন,
— হাত ধুয়ে আয়।
— আসছি।
— “আসছি” মানে আধঘণ্টা না।
— পাঁচ মিনিট।
— তিন মিনিট।
— চার।
— তিন।
রতন হেসে ফেলল।
⸻
রান্নাঘর থেকে ভাজা জিরের গন্ধ আসছিল।
চুলোর আগুনে প্রতিমার মুখে লালচে আলো পড়েছে।
ঘরের এই উষ্ণতা, এই পরিচিত গন্ধ, এই ছোট ছোট কথাগুলো রতনের কাছে এতই স্বাভাবিক যে সে কখনও ভেবে দেখেনি এগুলো একদিন কত মূল্যবান মনে হতে পারে।
⸻
রমাপদ সেদিন একটু দেরিতে ফিরলেন।
সাইকেল বারান্দায় রেখে চশমা খুলে বললেন,
— আজ আবার রাস্তার মাঝে চেন খুলে গেল।
— ঠিক করাও না।
প্রতিমা বললেন।
— করাব।
— কবে?
— শিগগিরই।
⸻
প্রতিমা হেসে মাথা নাড়লেন।
এই “শিগগিরই” কথাটা তিনি বহুবার শুনেছেন।
⸻
রাতে খাওয়ার পর রতন পড়তে বসেছিল।
কিন্তু মন বসছিল না।
বারবার আগামীকালের কথা মনে পড়ছে।
⸻
অবশেষে বই বন্ধ করে জানলার কাছে গেল।
বাইরে ঠান্ডা বাতাস।
দূরে কুয়াশা।
আরও দূরে অন্ধকার।
⸻
হঠাৎ তার মনে হলো—
গ্রামের সব মানুষ কি সত্যিই শুধু কুসংস্কারের জন্য ওইদিকে যায় না?
⸻
তার বাবা তো কুসংস্কার মানেন না।
হরিপদ মাস্টারও শিক্ষিত মানুষ।
তবু সেদিন…
মধু ঘোষের ছাগলের কথা উঠতেই কেন তিনি এমন চুপ হয়ে গিয়েছিলেন?
⸻
প্রশ্নটা মাথায় এল।
তারপর আবার চলে গেল।
কারণ তেরো বছরের ছেলেরা সাধারণত প্রশ্নের চেয়ে অভিযানের কথা বেশি ভাবে।
⸻
সে ঠিক করল।
কাল যাবে।
অল্প একটু।
শুধু দেখে আসবে।
তার বেশি কিছু না।
⸻
আর সেই রাতে, বহুদিন পর, হরিপদ মাস্টার একটা স্বপ্ন দেখলেন।
খুব পুরোনো স্বপ্ন।
এত পুরোনো যে তিনি প্রায় ভুলেই গিয়েছিলেন।
স্বপ্নে কুয়াশা ছিল।
একটা গাছ ছিল।
আর ছিল আগুনের ক্ষীণ আলো।
⸻
ঘুম ভেঙে যাওয়ার পরও তিনি অনেকক্ষণ বিছানায় বসে রইলেন।
তারপর ফিসফিস করে বললেন,
— আবার নয়…
কিন্তু কাকে বললেন?
নিজেকে?
অতীতকে?
নাকি এমন কাউকে, যার নাম তিনি এখনও উচ্চারণ করতে চান না?
বাইরে তখন গভীর রাত।
আর কাশীপুরের ওপর নেমে এসেছে এমন এক নীরবতা, যা ঝড়ের আগের নীরবতার মতো লাগছিল।
•
Posts: 122
Threads: 7
Likes Received: 469 in 152 posts
Likes Given: 68
Joined: Jan 2023
Reputation:
40
অধ্যায় ১৮ : সীমার ওপারে
পরদিন বিকেলে আকাশটা অদ্ভুত পরিষ্কার ছিল।
শীতের রোদ।
হালকা বাতাস।
সবকিছু স্বাভাবিক।
এতটাই স্বাভাবিক যে রতনের নিজের কাছেই আগের রাতের সিদ্ধান্তটা একটু বোকামি মনে হচ্ছিল।
তবু সে সিদ্ধান্ত বদলাল না।
⸻
খেলা শেষ হতে হতে আলো ফিকে হতে শুরু করেছে।
পল্টু বলল,
— তো?
রতন বুঝল প্রশ্নটা কী নিয়ে।
— যাচ্ছি।
— সত্যি?
— হ্যাঁ।
⸻
কার্তিক সঙ্গে সঙ্গে বলল,
— আরে বাদ দে।
— কেন?
— ভালো লাগছে না।
— তুই আসিস না।
— আমি যাবও না।
⸻
শেষ পর্যন্ত রতন একাই হাঁটতে শুরু করল।
প্রথমে মাঠের পরিচিত অংশ।
যেখানে রোজ খেলে।
তারপর আরও সামনে।
যেখানে সাধারণত যাওয়ার দরকার পড়ে না।
⸻
পেছন থেকে বন্ধুদের গলা ভেসে আসছিল।
তারপর ধীরে ধীরে সেটাও ক্ষীণ হয়ে গেল।
⸻
কিছুক্ষণ পর রতন বুঝল—
চারপাশ অস্বাভাবিক চুপচাপ।
একেবারে নিস্তব্ধ নয়।
কিন্তু গ্রামের স্বাভাবিক শব্দগুলো নেই।
না মানুষের কথা।
না গরুর ঘণ্টা।
না হাঁসের ডাক।
⸻
সে থামল।
চারদিকে তাকাল।
কিছুই নেই।
⸻
আরও কয়েক কদম এগোতেই সে প্রথম গাছটাকে দেখল।
বিরাট।
আলো কমে আসায় পুরোটা বোঝা যাচ্ছে না।
শুধু ছায়ার মতো দাঁড়িয়ে আছে।
⸻
রতনের বুকের ভেতর হালকা কাঁপন উঠল।
ভয়?
হয়তো।
হয়তো না।
⸻
সে নিজেকে বলল,
— কিছু না।
⸻
ঠিক তখনই বাতাস এল।
কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার—
চারপাশের শুকনো ঘাস নড়ল।
দূরের ঝোপ নড়ল।
কিন্তু তার সামনে ঝুলে থাকা কয়েকটা শিকড় স্থির রইল।
একটুও নড়ল না।
⸻
রতন কপাল কুঁচকাল।
এক সেকেন্ড।
দুই সেকেন্ড।
⸻
তারপর হঠাৎ তার মনে হলো—
সে যেন এখানে আগে এসেছে।
⸻
ভাবনাটা এত অদ্ভুত ছিল যে সে নিজেই চমকে উঠল।
সে তো কখনও আসেনি।
তাহলে এমন মনে হচ্ছে কেন?
⸻
মাথার ভেতর যেন ক্ষণিকের জন্য একটা ছবি জ্বলে উঠল।
আগুন।
ধোঁয়া।
কারও বসে থাকা ছায়া।
⸻
তারপরই সব উধাও।
⸻
রতন হাঁফ ছাড়ল।
মনে হলো মাথা ঘুরছে।
খুব সামান্য।
⸻
সে আর দাঁড়াল না।
দ্রুত পায়ে ফিরে চলল।
⸻
ফেরার সময় একবারও পেছনে তাকাল না।
কিন্তু কেন জানি বারবার মনে হচ্ছিল—
পেছনে কেউ দাঁড়িয়ে আছে।
দেখছে।
অপেক্ষা করছে।
⸻
সেই রাতে রতন জ্বরে পড়ল না।
অসুস্থও হলো না।
সব স্বাভাবিক।
⸻
তবু রাতের খাবার খেতে বসে প্রতিমা একবার বললেন,
— কী হয়েছে তোর?
— কিছু না।
— চুপচাপ কেন?
— এমনি।
⸻
রমাপদও একবার তাকালেন।
কিছু বললেন না।
⸻
আর গভীর রাতে…
রতনের ঘুম ভেঙে গেল।
হঠাৎ।
কোনো কারণ ছাড়াই।
⸻
ঘরের ভেতর অন্ধকার।
পাশে মা-বাবার ঘুমন্ত নিঃশ্বাসের শব্দ।
সব ঠিক আছে।
⸻
তবু সে কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে শুয়ে রইল।
কারণ তার মনে হচ্ছিল—
সে কোনো স্বপ্ন দেখছিল।
খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা স্বপ্ন।
⸻
কিন্তু কী স্বপ্ন?
সে মনে করতে পারল না।
একটাও না।
⸻
শুধু একটা অনুভূতি রয়ে গেল।
যেন ঘুমের মধ্যে কেউ তার কানের কাছে খুব আস্তে একটা কথা বলেছিল।
একটা নাম।
অথবা একটা ডাক।
•
Posts: 122
Threads: 7
Likes Received: 469 in 152 posts
Likes Given: 68
Joined: Jan 2023
Reputation:
40
অধ্যায় ১৯ : চেনা মুখ
গাছটার কাছে যাওয়ার পর তিন দিন কেটে গেছে।
রতন কাউকে কিছু বলেনি।
বন্ধুদেরও না।
বাড়িতেও না।
আসলে বলার মতো কিছু ঘটেনি।
সে গিয়েছিল।
দেখেছিল।
ফিরে এসেছিল।
ব্যস।
⸻
তবু…
পুরো ব্যাপারটা তার মাথা থেকে যাচ্ছিল না।
কারণ ভয় নয়।
বরং একটা অদ্ভুত অনুভূতি।
যেন কোনো অসমাপ্ত কথা।
যার শুরু মনে আছে, শেষটা নেই।
⸻
সকালে ঘুম ভাঙতেই সে কিছুক্ষণ বিছানায় চুপচাপ বসে রইল।
জানলার ফাঁক দিয়ে আলো ঢুকছে।
দূরে কারও হাঁস ডাকছে।
পুকুরঘাটের দিক থেকে মহিলাদের কথাবার্তার শব্দ ভেসে আসছে।
সবই স্বাভাবিক।
⸻
তবু কয়েক সেকেন্ডের জন্য তার মনে হলো—
সে যেন অনেক দূর থেকে এই দৃশ্যটা দেখছে।
নিজের ঘর।
নিজের বিছানা।
নিজের জীবন।
সব যেন একটু দূরের।
⸻
অনুভূতিটা চলে গেল।
যত দ্রুত এসেছিল।
⸻
— রতন!
প্রতিমার ডাক।
— উঠবি না?
— উঠছি।
⸻
সে উঠল।
কিন্তু দরজার কাছে গিয়ে হঠাৎ থেমে গেল।
কেন থামল, সে নিজেও জানে না।
মনে হলো সে কিছু একটা ভুলে গেছে।
খুব জরুরি কিছু।
⸻
কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে রইল।
তারপর আর মনে করতে পারল না।
মাথা ঝাঁকিয়ে বাইরে বেরিয়ে গেল।
⸻
রান্নাঘরে প্রতিমা ভাত বেড়ে দিচ্ছিলেন।
চুলোর আগুনে তার মুখে হলদে আলো পড়ছে।
কপালের পাশে কয়েকটা চুল নেমে এসেছে।
হাতে হলুদের হালকা দাগ।
গ্রামের আর দশজন গৃহস্থ মহিলার মতোই।
চেনা।
খুব চেনা।
⸻
রতন বসে খেতে লাগল।
তারপর হঠাৎ…
হঠাৎ তার মনে হলো, সে যেন মাকে আগে কখনও দেখেনি।
⸻
অনুভূতিটা এত অদ্ভুত যে সে খাওয়া থামিয়ে তাকিয়ে রইল।
প্রতিমা খেয়াল করলেন।
— কী হলো?
— কিছু না।
— এমন করে তাকিয়ে আছিস কেন?
— না… কিছু না।
⸻
প্রতিমা আবার কাজে ব্যস্ত হয়ে গেলেন।
আর কয়েক সেকেন্ড পর অনুভূতিটাও মিলিয়ে গেল।
⸻
কিন্তু রতনের বুকের ভেতর ঠান্ডা একটা ভাব রয়ে গেল।
⸻
কলেজে সেদিন মন বসল না।
অঙ্কের খাতা খুলে বসে আছে।
সংখ্যাগুলো দেখছে।
কিন্তু মাথায় ঢুকছে না।
⸻
রমাপদ দূরের ক্লাসে পড়াচ্ছিলেন।
একবার বারান্দা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ছেলেকে দেখলেন।
মনে হলো রতন যেন অস্বাভাবিক চুপচাপ।
⸻
কিন্তু তেরো বছরের ছেলেরা মাঝে মাঝে এমন হয়।
তিনি আর গুরুত্ব দিলেন না।
⸻
বিকেলে মাঠে গিয়ে রতন আগের মতো খেলল।
দৌড়াল।
চিৎকার করল।
হাসলও।
⸻
তবু মাঝে মাঝে সে অন্যমনস্ক হয়ে যাচ্ছিল।
বল পায়ে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
খেলা চলছে।
হঠাৎ মনে হচ্ছে সে যেন কিছু শুনেছে।
⸻
পেছনে তাকাচ্ছে।
কেউ নেই।
⸻
দূরে কুয়াশা।
ঝোপ।
গরু চরছে।
আর কিছু না।
⸻
পল্টু বলল,
— কী দেখছিস?
— কিছু না।
— আজকাল তুই “কিছু না” খুব বলছিস।
— কারণ কিছু না।
⸻
পল্টু হাসল।
কিন্তু রতন হাসল না।
⸻
সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরার পথে সে একা ছিল।
কার্তিক অন্যদিকে গেছে।
পল্টুর বাড়ি আগে।
রাস্তা প্রায় ফাঁকা।
⸻
সূর্য ডুবে গেছে।
আকাশে শেষ আলো।
দূরে বাঁশঝাড়।
⸻
হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ তার মনে হলো—
তার পেছনেও আরেকজন হাঁটছে।
⸻
খস।
⸻
খস।
⸻
রতন থেমে গেল।
শব্দও থেমে গেল।
⸻
সে ধীরে ধীরে ঘুরে তাকাল।
⸻
কেউ না।
⸻
রাস্তা ফাঁকা।
ঝোপ ফাঁকা।
বাঁশঝাড়ও স্থির।
⸻
কয়েক সেকেন্ড সে দাঁড়িয়ে রইল।
তারপর নিজেই নিজের ওপর বিরক্ত হলো।
⸻
— ধুর।
⸻
আবার হাঁটা শুরু করল।
⸻
খস।
⸻
খস।
⸻
আবার।
⸻
এইবার সে সঙ্গে সঙ্গে ঘুরে তাকাল।
⸻
কেউ না।
⸻
শুধু বাতাস।
হয়তো।
⸻
সেদিন রাতে খাওয়ার সময় রমাপদ বলছিলেন কলেজের কথা।
একজন ছাত্রের দুষ্টুমি।
অন্য শিক্ষকের সঙ্গে তর্ক।
সাধারণ গল্প।
⸻
রতন শুনছিল।
কিন্তু যেন পুরো মন দিয়ে না।
⸻
তার চোখ বারবার চলে যাচ্ছিল ঘরের অন্ধকার কোণগুলোর দিকে।
যেখানে কিছুই নেই।
⸻
তবু মনে হচ্ছিল—
কেউ দাঁড়িয়ে আছে।
⸻
খুব মন দিয়ে শুনছে।
⸻
আর গভীর রাতে…
একটা স্বপ্ন এল।
⸻
আগুন।
⸻
কালো ধোঁয়া।
⸻
মাটির ওপর আঁকা অদ্ভুত বৃত্ত।
⸻
কারও বসে থাকা ছায়া।
⸻
তারপর…
একজোড়া চোখ।
⸻
রতন চমকে ঘুম ভেঙে উঠে বসল।
শ্বাস দ্রুত চলছে।
⸻
ঘর অন্ধকার।
সবাই ঘুমিয়ে।
⸻
সে বুঝতে পারল না ঠিক কী দেখেছে।
স্বপ্নটা ভেঙে ভেঙে গেছে।
⸻
শুধু একটা জিনিস মনে রয়ে গেল।
⸻
স্বপ্নের সেই চোখদুটো…
তাকে দেখছিল না।
⸻
অপেক্ষা করছিল।
⸻
যেন বহুদিন ধরে।
আর এখন প্রথমবার…
সে তাদের নজরে এসেছে।
•
Posts: 122
Threads: 7
Likes Received: 469 in 152 posts
Likes Given: 68
Joined: Jan 2023
Reputation:
40
অধ্যায় ২০ : নামহীন অস্বস্তি
পরদিন ভোরে কাশীপুরের ওপর ঘন কুয়াশা নেমেছিল।
পুকুরের ওপারটা ঠিকমতো দেখা যাচ্ছিল না।
তালগাছের মাথাগুলো সাদা আবরণের ভেতর ভাসছে বলে মনে হচ্ছিল।
দূরে কারও গলার আওয়াজ শোনা যাচ্ছে, কিন্তু মানুষটাকে দেখা যাচ্ছে না।
শীতের গ্রামে এমন সকাল নতুন কিছু নয়।
তবু সেদিন রতনের কাছে সবকিছু একটু আলাদা লাগছিল।
⸻
ঘুম থেকে উঠে সে কয়েক সেকেন্ড বুঝতেই পারেনি সে কোথায় আছে।
এটা নতুন।
আগে কখনও হয়নি।
চোখ খুলে সে সিলিংয়ের বাঁশগুলো দেখছিল।
দেয়ালের ক্যালেন্ডার।
জানলার কাঠ।
সবই চেনা।
তবু মনে হচ্ছিল, যেন অনেকদিন পরে এই ঘরে ফিরেছে।
⸻
— রতন!
প্রতিমার ডাক।
— চা ঠান্ডা হয়ে যাবে।
ডাকটা শুনে যেন হুঁশ ফিরল।
⸻
রান্নাঘরে ঢুকে সে দেখল প্রতিমা ভাঁড়ে চা ঢালছেন।
চুলোর আগুনে তার মুখে লালচে আভা।
কপালে সামান্য ঘাম।
সকালের এত কাজের মধ্যেও তিনি একসঙ্গে তিন-চারটা জিনিস সামলাচ্ছেন।
রতন চুপ করে তাকিয়ে রইল।
⸻
প্রতিমা হেসে বললেন,
— কী দেখছিস?
— কিছু না।
— আবার “কিছু না”?
⸻
রতন উত্তর দিল না।
কারণ সে নিজেও জানত না।
মায়ের মুখটা তার কাছে চেনা।
খুব চেনা।
তবু আজ সকালে কয়েক মুহূর্তের জন্য মনে হয়েছিল—
সে যেন এই মুখ আগে কোথাও দেখেছে।
অন্য কোনো সময়ে।
অন্য কোনো জায়গায়।
একটা অসম্ভব অনুভূতি।
⸻
কলেজে যাওয়ার পথে কার্তিক বলল,
— তোর কী হয়েছে রে?
— কিছু হয়নি।
— হয়েছে।
— কেন?
— আগের মতো কথা বলিস না।
⸻
রতন হেসে উড়িয়ে দিতে চাইল।
কিন্তু পারল না।
কারণ সে নিজেও জানত, কিছু একটা বদলাচ্ছে।
যদিও ঠিক কী, সেটা ধরতে পারছে না।
⸻
কলেজে ইতিহাস ক্লাস চলছিল।
মাস্টারমশাই বোর্ডে লিখছেন।
ছাত্ররা খাতায় নোট করছে।
⸻
হঠাৎ রতনের চোখ চলে গেল জানলার বাইরে।
দূরে একটা শিরীষ গাছ।
শুধু গাছ।
কিছুই অস্বাভাবিক না।
⸻
তবু এক মুহূর্তের জন্য তার বুকের ভেতর ধক করে উঠল।
কারণ তার মনে হলো—
গাছটার নিচে কেউ দাঁড়িয়ে আছে।
⸻
সে চোখ পিটপিট করল।
আবার তাকাল।
⸻
কেউ নেই।
⸻
শুধু ছায়া।
⸻
সেদিন ফেরার পথে রমাপদ সাইকেলে করে তাকে নিয়ে ফিরছিলেন।
এমনটা মাঝে মাঝে হয়।
বিশেষ করে শীতকালে।
⸻
রতন পিছনের ক্যারিয়ারে বসেছিল।
রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে সে গ্রামের মানুষদের দেখছিল।
⸻
ভোলা ঘোষ রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে কারও সঙ্গে কথা বলছেন।
⸻
মঞ্জু কাকিমা উঠোনে ধান ওলটাচ্ছেন।
⸻
নরুর দোকানে ধোঁয়া উঠছে।
⸻
সবই চেনা।
⸻
কিন্তু হঠাৎ একটা অদ্ভুত ব্যাপার ঘটল।
খুব অল্প সময়ের জন্য।
⸻
সে রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে থাকা এক বৃদ্ধকে দেখল।
⸻
মুখটা অস্পষ্ট।
⸻
এক ঝলক।
⸻
তারপর মানুষটা নেই।
⸻
রতনের বুকের ভেতর কেমন যেন হয়ে গেল।
সে সঙ্গে সঙ্গে পেছনে তাকাল।
⸻
কেউ নেই।
⸻
রমাপদ টের পেলেন।
— কী হলো?
— কিছু না।
— শরীর খারাপ?
— না।
⸻
কথাটা সেখানেই শেষ।
⸻
কিন্তু রতন আর কিছু বলল না।
কারণ সে জানত না কী বলবে।
“একজন মানুষকে দেখলাম, তারপর নেই”?
নিজের কাছেই বোকা শোনাচ্ছিল।
⸻
সন্ধ্যায় প্রতিমা লুচি ভাজছিলেন।
রতনের খুব প্রিয়।
সাধারণ দিনে সে রান্নাঘরের আশেপাশে ঘুরঘুর করত।
আজ করল না।
⸻
সে বারান্দায় বসে ছিল।
চুপচাপ।
⸻
দূরে অন্ধকার নামছে।
⸻
একটা কুকুর রাস্তা দিয়ে হেঁটে গেল।
⸻
একটা সাইকেলের ঘণ্টা শোনা গেল।
⸻
তারপর আবার নীরবতা।
⸻
হঠাৎ তার মনে হলো—
এই দৃশ্যটা সে আগে দেখেছে।
ঠিক এভাবেই।
ঠিক এই আলো।
ঠিক এই বাতাস।
ঠিক এই শব্দ।
⸻
কিন্তু কবে?
⸻
মনে পড়ল না।
⸻
সেই রাতে আবার স্বপ্ন এল।
আগের চেয়ে একটু স্পষ্ট।
⸻
আগুন।
⸻
ধোঁয়া।
⸻
মাটিতে আঁকা বৃত্ত।
⸻
কোনো একজন বসে আছে।
⸻
মুখ দেখা যাচ্ছে না।
⸻
শুধু শুকনো, হাড়জিরজিরে হাত।
⸻
আঙুলে কালো কিছু লেগে আছে।
মাটি?
রক্ত?
ছাই?
বোঝা যায় না।
⸻
আর তারপর…
একটা কণ্ঠস্বর।
⸻
খুব নিচু।
⸻
খুব কর্কশ।
⸻
যেন শুকনো পাতার ওপর দিয়ে বাতাস বয়ে যাচ্ছে।
⸻
কথাগুলো বোঝা গেল না।
⸻
শুধু একটা অনুভূতি।
⸻
কেউ তাকে ডাকছে।
⸻
নাম ধরে না।
⸻
তবু তাকে।
⸻
রতনের ঘুম ভাঙল।
⸻
এইবার সে চিৎকার করেনি।
হাঁপায়ওনি।
⸻
সে শুধু বিছানায় বসে রইল।
⸻
কারণ প্রথমবারের মতো তার মনে হলো—
স্বপ্নটা শুধু স্বপ্ন নয়।
⸻
আর একই রাতে, নিজের ঘরের জানালার সামনে বসে হরিপদ মাস্টার একটা পুরোনো কাগজের দিকে তাকিয়ে ছিলেন।
⸻
তার কাঁপা আঙুল এক জায়গায় থেমে ছিল।
⸻
একটা নামের ওপর।
⸻
বহু বছর আগের।
⸻
প্রায় ভুলে যাওয়া।
⸻
তিনি ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করলেন।
⸻
তারপর খুব আস্তে বললেন—
“না…
আবার না…”
⸻
•
|