Thread Rating:
  • 40 Vote(s) - 3.4 Average
  • 1
  • 2
  • 3
  • 4
  • 5
Erotic Thriller মরীচিকা ও মোহময়ী
(06-06-2026, 04:08 PM)All IS WELL Wrote: আপনার একটা পোস্ট টাইপিং করতে কত সময় লাগে। আপনি কী কোন জায়গায় আগে পোস্ট টিকে কোথাও আগে লিখে রাখেন? 
 
না, ডাইরেক্ট মাথা থেকে চিন্তা করে টাইপিং শুরু করে দেন। 
মানে আমি যা জানতে চাই তা হল দুটি পোস্টের মধ্যবর্তী সময়ে কী কী স্টেপে লেখাটি আপনি নিয়ে যান।

আমি আগে চ্যাপ্টারটা নিয়ে চিন্তা করি, কটা সিন থাকবে, কী কী ডায়লগ থাকবে। তারপর লিখতে বসি। লেখা হয়ে গেলে Rewrite করি। যতক্ষণ না ঠিক হচ্ছে, দুবার, তিনবার, পাঁচবার, ছবার।

এইসময় অনেক সিন বাদ যায়, নতুন সিন আর নতুন চরিত্র যোগ হয়। এটাই গল্প লেখার আসল জায়গা।
[+] 2 users Like RockyKabir's post
Like Reply
Do not mention / post any under age /rape content. If found Please use REPORT button.
(06-06-2026, 01:13 PM)Colds Wrote: বিদিশার sex এর জন্য অপেক্ষা করে আছি,

অনেক দেরি আছে।
Like Reply
আমার একটা কমেন্ট এখানে খুঁজে পাচ্ছি না। কিছুদিন আগে করেছিলাম
Like Reply
আপনার আসল পরিচয় পেলে বাড়ি গিয়ে আলাপ করে আসতাম।আপনার লেখার গুণমুগ্ধ আমি।ভালো থাকবেন।লাইক ও রেপু রইলো।
[+] 2 users Like Ankit Roy's post
Like Reply
দাদা update কবে আসতে পারে?
[+] 1 user Likes All IS WELL's post
Like Reply
(15-06-2026, 05:56 AM)All IS WELL Wrote: দাদা update কবে আসতে পারে?

আজ আসবার কথা ছিল। লেখা শেষ হয়ে গেলেও নানা ঝামেলায় Rewrite একদমই হয়নি। আজ নিয়ে বসেছি। যদি Rewrite করতে গিয়ে নতুন কোন সিন যোগ না করি তবে বুধবার রাতে আপডেট আসবে বলে ধরে রাখুন।
[+] 1 user Likes RockyKabir's post
Like Reply
(12-06-2026, 01:15 PM)Ankit Roy Wrote: আপনার আসল পরিচয় পেলে বাড়ি গিয়ে আলাপ করে আসতাম।আপনার লেখার গুণমুগ্ধ আমি।ভালো থাকবেন।লাইক ও রেপু রইলো।

অসংখ্য ধন্যবাদ। লেখার গুণমান বজায় রাখতে চেষ্টা করব। আপনিও ভাল থাকবেন।
[+] 2 users Like RockyKabir's post
Like Reply
(12-06-2026, 10:05 AM)All IS WELL Wrote: আমার একটা কমেন্ট এখানে খুঁজে পাচ্ছি না। কিছুদিন আগে করেছিলাম

কোন কমেন্ট ? আমি অনেকদিন এখানে আসিনি।
[+] 1 user Likes RockyKabir's post
Like Reply
বুধবারে আপডেট আসার কথা ছিল।
Like Reply
(25-06-2026, 04:59 PM)dddmm Wrote: বুধবারে আপডেট আসার কথা ছিল।

হ্যাঁ, ঠিকই বলেছেন। তবে আমার লেখা কমপ্লিট হয়নি। আজকেও হবার চান্স কম, কাল আসতে পারে।
Like Reply
Update কখন আসবে
Like Reply
আপডেট কবে পাবো জনাব?? বিনয়ের সহিত বলছি গল্প শেষ করাকে বেশি গুরুত্ব দিবেন অনেক সময় গল্প নিয়ে বেশি ভাবতে ভাবতে লেখকদের হারিয়ে ফেলি তাই গল্প ছোট হলেও শেষ করটাই মৌলিক বা মুখ্য বিষয় জনাব
Like Reply
(26-06-2026, 10:19 PM)Monika Rani Monika Wrote: আপডেট কবে পাবো জনাব?? বিনয়ের সহিত বলছি গল্প শেষ করাকে বেশি গুরুত্ব দিবেন অনেক সময় গল্প নিয়ে বেশি ভাবতে ভাবতে লেখকদের হারিয়ে ফেলি তাই গল্প ছোট হলেও শেষ করটাই মৌলিক বা মুখ্য বিষয় জনাব

এই জাস্ট লেখা শেষ করে উঠলাম। দেখুন দিদিভাই, আপনাদের গল্পটা ভাল লেগেছে, তাই বারবার খোঁজ নিচ্ছেন এটা আমার কাছে আনন্দের বিষয়। কিন্তু, আপনাদেরও একটা কথা বুঝতে হবে। কাল গভীর রাত জেগে আর আজ সন্ধ্যা থেকে কোন কাজ না করে যে আমি গল্পটা লিখলাম, এত পরিশ্রম করলাম তারপর কী আমার ভাল লাগবে যদি আমি দেখি গল্পটা পড়তে আমার নিজের ভাল লাগছে না ? প্রয়োজনে মাসে একটা আপডেট দেব কিন্তু যতক্ষণ না নিজের লেখার কোয়ালিটি নিয়ে সন্তুষ্ট হচ্ছি ততক্ষণ আপডেট দেব না।
[+] 6 users Like RockyKabir's post
Like Reply
[Image: 1782641096296.png]
[+] 5 users Like RockyKabir's post
Like Reply
(27-06-2026, 11:53 PM)RockyKabir Wrote: এই জাস্ট লেখা শেষ করে উঠলাম। দেখুন দিদিভাই, আপনাদের গল্পটা ভাল লেগেছে, তাই বারবার খোঁজ নিচ্ছেন এটা আমার কাছে আনন্দের বিষয়। কিন্তু, আপনাদেরও একটা কথা বুঝতে হবে। কাল গভীর রাত জেগে আর আজ সন্ধ্যা থেকে কোন কাজ না করে যে আমি গল্পটা লিখলাম, এত পরিশ্রম করলাম তারপর কী আমার ভাল লাগবে যদি আমি দেখি গল্পটা পড়তে আমার নিজের ভাল লাগছে না ? প্রয়োজনে মাসে একটা আপডেট দেব কিন্তু যতক্ষণ না নিজের লেখার কোয়ালিটি নিয়ে সন্তুষ্ট হচ্ছি ততক্ষণ আপডেট দেব না।

Lotpot
Like Reply
Ajj ki new update asbe..??
Like Reply
(28-06-2026, 05:11 PM)Mr. Mondal Wrote: Ajj ki new update asbe..??

হ্যাঁ।
Like Reply
এই অধ্যায় থেকে গল্পে অরুণ আর তার জগতের লোকজনের প্রবেশ ঘটল। চরিত্র হিসেবে অরুণকে ফুটিয়ে তোলা বেশ চ্যালেঞ্জিং ছিল। অরিজিনাল গল্পে তিনি একটি বহুজাতিক সংস্থার এমডি ছিলেন। কিন্তু সেই সংস্থা কোন সেক্টরের, অরুণের এমডি পদটা কোন লেভেলে, ইন্ডিয়ান রিজিয়ন না কন্টিনেন্টাল, সেটা তিনি স্পষ্ট করেননি। আমি এটা স্বাভাবিক বলেই ধরে নিয়েছি, চটি আর সাহিত্যের ফারাক। সেজন্য আমি অরুণের কর্মজগতকে নিজের মনোমতো সাজিয়ে নিয়েছি। কিন্তু, মুশকিল হল পোর্ট আর শিপিং আমার জগত নয়। সেজন্য পড়াশোনা করার দরকার ছিল।

আরেকটা জিনিস লক্ষ্য করলাম, কর্পোরেট বা ইন্ডাস্ট্রিয়াল পটভূমিকায় লেখা থ্রিলার বাংলাভাষায় নেই বললেই চলে। রেফারেন্স মেটিরিয়াল যা আছে সবই ইংরেজি থ্রিলার। সেটাকেই বাংলা করে নিতে হবে। যখন গল্প লিখতে শুরু করেছিলাম তখন কল্পনা করিনি যে এতটা পড়াশোনা করতে হবে। 

এসবের জন্য আগের মতো সাতদিন পরপর আপডেট নাও আসতে পারে। তবে সেইক্ষেত্রে আমি আগেই জানিয়ে দেব।

কিছু পরিভাষা

NDPO = National director of Port Operation
NDSC = National director of Commercial and Liner Sales
HMO = Head of Marine Operations
CFO = Chief Financial Officer


অজানা এক শহরের এক অ্যাপার্টমেন্টের সাততলার ঘর 

বাইরের ডিসেম্বরের কনকনে ঠান্ডাটা ঘরের জানলার কাঁচে বারবার ধাক্কা খেয়ে ফিরে যাচ্ছে। ঘরের ভেতরে আবহাওয়া অবশ্য একদম আলাদা। সেখানে ডিসেম্বরের শীতলতার কোনরকম চিহ্ন নেই।

রুম হিটারের উষ্ণ ওম আর পারফিউমের সুগন্ধি মিলেমিশে ঘরের মধ্যে একটা মায়াবী পরিবেশ তৈরি করেছে। গোটা ঘরটায় কেমন যেন একটা নেশাতুর ভাব। বোধহয় পারফিউমের গন্ধটার জন্যেই।

চারপাশে একবার নজর বুলোলে বোঝা যায় যে ঘরটা ছিমছাম। অতিরিক্ত বিলাসবহুল নয়, তবে গোছানো; দামী আসবাবপত্র, মেঝেতে পুরু পার্সিয়ান কার্পেট, একপাশে টেবিলের উপর দামি স্কচের বোতল।

ঘরের এক কোণে একটা নাইট ল্যাম্প জ্বলছে, সিল্কের ভারী পর্দার গায়ে ল্যাম্পটার লম্বাটে যে ছায়াটা পড়েছে, সেটার দিকে তাকালে গা ছমছম করে ওঠে। মনে হয় একটা ছোটখাট বামন যেন ওখানটা দাঁড়িয়ে ঘরের দুই বাসিন্দার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।

ঘরের ঠিক মাঝে বিছানার উপর একটা লোক চিত হয়ে শুয়ে আছে। কিং-সাইজ বিছানাটার চাদর অবশ্য দুমড়ে-মুচড়ে একাকার হয়ে গেছে।

মধ্যবয়সী লোকটার সম্পূর্ণ নগ্ন শক্তপোক্ত শরীরটা ঘামে চকচক করছে। চওড়া বুক জুড়ে ঘন লোমের জঙ্গল আর এই বয়সেও পেটের পেশিগুলো পাথরের মতো শক্ত।

তার কোমরের ওপর চড়ে বসে দ্রুত, তীব্র ছন্দে কোমর দুলিয়ে চলেছে এক যুবতী।

বয়স কতই বা হবে ? 

বড়জোড় কুড়ি বা বাইশ। মেয়েটার গায়ের রঙ কাঁচা হলুদের মতো, তার উপর নাইট ল্যাম্পের আলো ওর মসৃণ ভিজে পিঠে পড়ে এক দ্যুতি তৈরি করেছে। যুবতীর টানটান, উদ্ধত স্তনদুটো প্রতিটা ঊর্ধ্বমুখী ঠাপের ধাক্কার ঝাঁকুনিতে উন্মত্তের মতো দুলছে। মেয়েটা তার হাত দুটো লোকটার বুকে শক্তভাবে চেপে বসা, যেন উত্তাল তরঙ্গে নিজেকে কোনরকমে ভাসিয়ে রাখতে চাইছে। পিঠটা ধনুকের মতো বেঁকে আছে আর ঘাড়ের ওপর ছড়িয়ে থাকা ঘামে ভেজা চুলগুলো প্রতিটা ঠাপের ধাক্কায় পুরুষটির বুকে-মুখে আছড়ে পড়ে দারুণ এক কামোদ্দীপক দৃশ্য তৈরি করছে।

লোকটা নিচ থেকে মেয়েটার কোমরটা শক্ত মুঠোয় চেপে ধরে রেখে, মন দিয়ে ওকে একটানা ঠাপিয়ে যাচ্ছে। প্রতিটি ঠাপের ধাক্কায় খাটটা পেছনের দেওয়ালে ধাক্কা খেয়ে কর্কশ আওয়াজ তুলে ঘরের নিস্তব্ধতা ভেঙেই চলেছে। তার সাথে ছন্দময় ভাবে  

প্রতিধ্বনিত হয়ে চলেছে একটা শব্দ,



চপ-চপ

চপ-চপ



ভেজা, পিচ্ছিল যোনিপথে পুরুষাঙ্গ প্রবেশের আওয়াজ।


"আহ্... উফ্, আর একটু..." মেয়েটার গলা দিয়ে একটা চাপা গোঙানি বেরিয়ে এল। 

উত্তরে লোকটা কোনো কথা বলল না। নিজের চোয়ালটা শক্ত করে পাছাদুটো সজোরে খামচে ধরে নিজের পুরো শক্তি দিয়ে মেয়েটা শরীরটাকে ওপরের দিকে ছুঁড়ে দিয়ে, জোরে, আরো জোরে নিজের খাড়া বাড়াটার উপর টেনে ফেলতে লাগল। ওর আঙুলগুলো মেয়েটার নিতম্বের নরম চামড়ার গভীরে দেবে বসে গেল, যেখানটা ইতিমধ্যেই লাল দাগ তৈরি হয়েছে। 

মেয়েটি চোখ দুটো বন্ধ করে মাথাটা পেছনের দিকে ঝুঁকিয়ে দিল, তার গলার শিরাগুলো টানটান। 

সেখান থেকে ক্রমাগত শীৎকার বেরিয়ে আসছে।

সেক্সের তীব্রতা থাকলেও মিলনটা যান্ত্রিক, সেখানে প্যাশনের বড়ই অভাব। দেখলে বোঝা যায় এরা কেউ কারোর লাভার নয়। স্রেফ এক ক্ষমতাশালী পুরুষ আর তার লালসা মেটানোর সস্তা মাধ্যম।

ঠিক এই চরম উত্তেজনার মুহূর্তে, বিছানার পাশের সাইড টেবিলে রাখা ফোনটা তীব্র স্বরে কেঁপে উঠল। স্ক্রিনের আলোয় ঘরের অন্ধকার দেওয়ালটা এক লহমায় উজ্জ্বল হয়ে উঠল।

এই সুখের মুহূর্তের মধ্যেও পুরুষটির চোখ দুটি নিমেষে সতর্ক হয়ে উঠল।

সে নিজের কোমরের গতি একটুও না কমিয়ে নিখুঁত রিফ্লেক্সে তার পেশিবহুল হাতটা বাড়িয়ে ফোনটা তুলে নিল। তার অপর হাতটি তখনও মেয়েটার কোমরে শক্ত করে বসানো, শরীর তখনও সমান তালে ওপরের দিকে ছিটকে উঠছে। 

সে ফোনটা কানে চেপে ধরল।

ফোনটা কানের কাছে আনতেই ওপাশ থেকে একটা খসখসে, চেনা গলা ভেসে এল:

"কাম হো গয়া বস।"

লোকটার ঠোঁটের কোনায় একটা নিষ্ঠুর হাসি ফুটে উঠল। সে একটা তৃপ্তির শ্বাস নিয়ে, নিজের ঠাপের গতি আরও একধাপ বাড়িয়ে দিল। মেয়েটি চেঁচাতে গিয়েও লোকটার চোখের ইশারায় চুপ করে গেল, নিজের মুখটা হাত দিয়ে চেপে ধরল সে।

লোকটা ভারী গলায় বলল, "বহোত বড়িয়া। আব ওয়াহা সে নিকাল লে। ওয়াহা কোই সবুদ রহনা নেহি চাহিয়ে। বাকি কা রূপয়া কাল অ্যাকাউন্ট মে ঘুস জায়গা।"

তার বুকটা কামের তাড়নায় আর পরিশ্রমে কামারের হাপরের মতো ওঠানামা করলেও গলার স্বর সম্পূর্ণ স্থির, অবিচলিত।

কেটে দেবার পরে সে ফোনটা কান থেকে নামাল না, তৎক্ষণাৎ অন্য একটা নাম্বারে ডায়াল করল। একবার রিং হতেই ওপাশ থেকে একজন ফোনটা ধরল।

মেয়েটা তখন ক্লান্ত হয়ে পুরুষটির লোমশ বুকে মাথা রেখে হাঁপাচ্ছিল। রতিক্রিয়ার মাঝে এই ছোট্ট বিরতিতে সে একটু দম নেবার
চেষ্টা করছিল, লোকটা অত্যন্ত নির্মমভাবে মেয়েটার মাথার একগোছা চুল নিজের হাতের মুঠোয় খামচে ধরে সজোরে টান মারল। 

সঙ্গে সঙ্গে মেয়েটা আবার খাড়া হয়ে বসল।

"আহ্!"

সে যন্ত্রণায় কঁকিয়ে উঠল।


সেই আওয়াজটা লাইনের ওপারে পৌঁছানোর আগেই লোকটা ফোনে নিরাসক্ত, ভাবলেশহীন গলায় বলল:

"কাম হো গয়া।"

উল্টোদিকের অপেক্ষা না করেই সে লাইনটা কেটে দিল। ফোনটা ছুঁড়ে ফেলে দিল মেঝের দামি কার্পেটের উপর। তারপর সে আর নিজেকে ধরে রাখার কোন চেষ্টাই করল না। 

ফোনটা পাবার পর যেন ওর দম আর উৎসাহ দুটোই বেড়ে গেছে। বোধহয় এই বিশেষ খবরটার জন্যই এতক্ষণ অপেক্ষা করছিল সে।

 সে দু-হাতে মেয়েটার কোমর ধরে এক টানে তাকে বিছানায় চিত করে শুইয়ে দিল। তারপর মেয়েটির উরু দুটো নিজের দু-কাঁধের ওপর টেনে নিল। 

মেয়েটা দুই হাত দিয়ে পুরুষটির চওড়া কাঁধ দুটো খামচে ধরল, তার ধারালো নখগুলো পুরুষটার পিঠের চামড়া চিরে বসে গেল। কিন্তু পুরুষটির মুখে ব্যথার কোনো চিহ্ন দেখা গেল না।


সে আবার নিজের কোমরটা ওপরের দিকে তুলল, তারপর ঘরের ম্লান আলোর বুক চিরে নেমে এল নীচে। মেয়েটার শরীরে আবার প্রবেশ করার জন্য।

এইবার আরও জোরে, আরও গভীরে।

সকাল সাড়ে নটা। 
লোয়ার পারেল, মুম্বই
বহুজাতিক সংস্থা ভ্যানগার্ড গ্লোবালের ইন্ডিয়া হেডকোয়ার্টার্স। 

উনপঞ্চাশ তলার এই গগনচুম্বী ইমারতের সাউন্ডপ্রুফ ডাবল-গ্লেজড কাচের জানলার ওপারে মুম্বই শহরটাকে একটা নিখুঁত থ্রি-ডি আর্কিটেকচারাল মডেলের মতো দেখায়। ঠিক যেমনটা সিনেমার মিনিয়েচার সেটে ব্যবহার হয়। চারপাশের কাঁচ আর কংক্রিটের তৈরি উঁচু আধুনিক বহুতলগুলোকে দেখে মনে হয় যেন ওগুলো কার্ডবোর্ড দিয়ে তৈরি।  

চোখ যখন আরো দূরে, দূরদিগন্তে শহরের সীমানা ছাড়িয়ে যায়, তখন দেখা মেলে মুম্বই হারবারের।

শীতের দুপুরে এই ভরা রোদে আরব সাগরের খাঁড়িটা চকচকে রূপোলি রেখার মতো জ্বলজ্বল করছে। এখান থেকে বন্দর বা ডকইয়ার্ডের খুঁটিনাটি কাজকর্ম পরিষ্কার দেখা যায় না ঠিকই; তবে সমুদ্রের উপর ভাসমান বিশাল আকৃতির কার্গো জাহাজ এবং কন্টেইনার ভেসেলগুলোকে দেখলে মনে হয় নীল জলরাশির ওপর ছোট ছোট খেলনা নৌকো স্থির হয়ে বসে আছে।

সেই ডানদিকের দিগন্তেই, সাগরের খাঁড়ি ছাড়িয়ে আরও দূরে তাকালে ট্রম্বে আর নভি মুম্বইয়ের পাহাড়গুলোর অস্পষ্ট নীলচে রেখা চোখে পড়ে, যেখানে জওহরলাল নেহেরু পোর্টের দিকে যাওয়ার জন্য মালবাহী জাহাজগুলো লাইনে দাঁড়িয়ে বার্থিং-এর অপেক্ষা করছে।

আর ঠিক এর বিপরীতে, বাঁ-দিকের জানলা দিয়ে তাকালে দেখা যায় সম্পূর্ণ অন্য দৃশ্য। সেখানে সাগরের বুক চিরে সাপের মতো বেঁকে চলে গেছে বান্দ্রা-ওরলি সি-লিঙ্ক, যা গিয়ে মিশেছে দূরের মাহিম খাঁড়ির মোহনায়। 

সি-লিঙ্কের ওপর ছুটন্ত গাড়িগুলোর ধাতব শরীর থেকে ঠিকরে পড়া দুপুরে রোদের আলো হিরের কুচির মতো ঝিকমিক করছে। দেখলে মনে হয়, কে যেন সাগরের বুকে এক থলি হিরে ছড়িয়ে দিয়েছে।

এক কথায় অসাধারণ দৃশ্য। কেন মুম্বই দেশের পাঁচটা শহরের থেকে একদম আলাদা, তার আরেকটা অকাট্য প্রমাণ। 

অবশ্য, এত কিছু না থাকলেও মুম্বই শহরটার প্রতি অরুণের দুর্বলতা এতটুকুও কমতো না। তার প্রথম চাকরি এই শহরে, বেকারত্বের জ্বালা কাটিয়ে আত্মপরিচয় গড়ার প্রথম সোপান, নিজের পায়ে তলায় মাটি খুঁজে পাবার পথে প্রথম পদক্ষেপ এই শহরে।

অফিসের অরুণ আর বাড়ির চার দেওয়ালের মধ্যে যে অরুণ বিরাজ করেন তারা দুজনে আলাদা ব্যক্তি। দুজনের আচার-আচরণ, হাবেভাবে কোন মিল নেই। 

কিন্তু, সেটা বাদ দিলেও মুম্বইতে এলে অরুণের হাবভাব পুরোপুরি পাল্টে যায়। তখন তাকে আর চেনা যায় না।

মুম্বইয়ের গতি, রূঢ়তা আর নির্লজ্জ উচ্চাকাঙ্ক্ষা অরুণের নিজস্ব জীবনের জীবনদর্শনের সাথে হুবহু মিলে যায়। মুম্বই তাকে শিখিয়েছে যে, জীবনে বড় জায়গায় পৌঁছতে চাইলে উদ্যমী হতে হয়, ঝুঁকি নিতে জানতে হয়, সাহসী সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষমতা থাকা চাই। নয়তো তোমার মুখের গ্রাস অন্য কেউ এসে কেড়ে নিয়ে চলে যাবে।

বরং কলকাতার মন্থর, ধীর লয়ের, গয়ংগচ্ছ জীবনযাত্রা তার কাছে সবসময় স্লো-পয়জনের মতো মনে হয়েছে। তা মানুষের মধ্যে থেকে সমস্ত উদ্যোগ, প্রচেষ্টাকে নিঃশব্দে শুষে নেয়। মানুষ জানতেও পারে না কখন সে একটু একটু করে নিজের তৈরি করা আত্মসন্তুষ্টির গন্ডিতে আটকা পড়ে যাচ্ছে।

এই অল্পেতে সন্তুষ্ট মনোভাবকে অরুণ মন থেকে ঘৃণা করেন। তাই তিনি কর্মজীবনে বরাবর চ্যালেঞ্জ নিয়েছেন আর সেটাই তাকে কম বয়সে পেশাদার জগতে এতটা উচ্চতা এনে দিয়েছে।

অরুণ তার কর্মজীবন শুরু করেছিলেন মুম্বইয়ে এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট সেক্টরে, তারপর তিনি বেশ কয়েকবার কোম্পানী আর সেক্টর দুই-ই পাল্টেছেন। ভ্যানগার্ড গ্লোবালের চাকরিতে যোগ দেবার আগে অরুণ পূর্ব ভারতের একটা মাঝারি সাইজের লজিস্টিকস কোম্পানির সিইও ছিলেন। সেই চাকরিটা অত্যন্ত আরামের ছিল, ক্ষমতাও ছিল অঢেল। তার জায়গায় অন্য কেউ হলে সারাজীবন ওই পদেই কাটিয়ে দিত। কিন্তু, অরুণের কাছে সেটা যথেষ্ট ছিল না।

তার চাই উন্নতি। আরো উন্নতি।

সেজন্য তিনি এমডি-র চেয়ার ছেড়ে বছর দুয়েক আগে ভ্যানগার্ড গ্লোবালের মতো একটা মাল্টিন্যাশনাল জায়ান্টের রিজিওনাল হেড এর পদে যোগ দিতে দুবার ভাবেননি। 

পদমর্যাদায় এটা আগেরটার থেকে ক'ধাপ নিচে ঠিকই, কিন্তু উন্নতির সুযোগটা কয়েক হাজার গুণ বেশি। 

ভ্যানগার্ড গ্লোবাল গোটা বিশ্বের অন্যতম বড় পোর্ট এবং শিপিং কোম্পানি। পৃথিবীর সব কটা মহাদেশে তাদের ব্যবসা ছড়ানো আছে।

অরুণের লক্ষ্য একদিন মুম্বইয়ের এই বিল্ডিংটার পঞ্চাশ তলায় এমডি-র চেয়ারটায় এসে বসা। এই কোম্পানির পূর্ব ভারতের ডিভিশনাল হেড হয়ে থাকার জন্য তিনি এই কোম্পানিতে জয়েন করেননি।

এই মুহূর্তে তিনি উনপঞ্চাশ তলার একটা ঘরে বিশাল, মেহগনি কাঠের কনফারেন্স টেবিলের এক প্রান্তে একা বসে আছেন।

তার পরনে একটা ডার্ক নেভি-ব্লু ইতালিয়ান কাট স্যুট, ক্রিস্প সাদা শার্ট আর একটা সিল্কের ধূসর রঙের টাই। বাঁ হাতের কব্জিতে রোলেক্স ঘড়িটা থেকে দুপুরের রোদ ঠিকরে পড়ছে। 

অরুণের মেরুদণ্ড একদম সোজা, মুখটা পাথরের মতো ভাবলেশহীন। বাইরের দিকে তাকালে বোঝার উপায় নেই যে তার ভেতরে কোনো উত্তেজনা কাজ করছে কি না।

উনপঞ্চাশ তলার বোর্ডরুমের ভেতর থেকে বাইরের কোলাহল, ট্রাফিকের আওয়াজ বা সমুদ্রের গর্জন কিছুই শোনা যায় না। ভেতরে শুধু সেন্ট্রাল এসির একটানা, নিস্তব্ধ 'হামিং' সাউন্ড আর বরফের মতো জমে থাকা শীতল নীরবতা।

অরুণ জানলার কাঁচ থেকে নিজের চোখটা সরিয়ে নিলেন। বোর্ডরুমের ভারী সেগুন কাঠের দরজাটা একটু পরেই খুলবে।

তাকে বলা হয়েছে আজকের বোর্ড মিটিংটা ডাকা হয়েছে একটা স্পেশাল এবং ক্রিটিক্যাল এজেন্ডার ওপর ভিত্তি করে। অরুণ অবশ্য জানেন, আজ ভেতরে তাকে ছিঁড়ে খাওয়ার জন্য অনেকে অপেক্ষা করবে।

ঠিক সকাল দশটা বাজার পাঁচ মিনিট আগে দরজাটা খুলে গেল। এক এক করে ভেতরে প্রবেশ করলেন ভ্যানগার্ড গ্লোবাল ইন্ডিয়ার শীর্ষ কর্তারা।

To be continued...
[+] 4 users Like RockyKabir's post
Like Reply
ঘরের ঠিক মাঝখানে চল্লিশ ফুটের বিশাল মেহগনি কাঠের কনফারেন্স টেবিল। টেবিলের চারধারে ইতালিয়ান লেদারের হাই-ব্যাক চেয়ারগুলো সাজানো।

টেবিলের ঠিক মাঝখানে বসে আছেন ভ্যানগার্ড গ্লোবাল ইন্ডিয়ার ম্যানেজিং ডিরেক্টর এবং প্রেসিডেন্ট, মিস্টার বিনোদ কুমার গুপ্তা। বয়স ষাটের উপর, রুপোলি চুল, গম্ভীর মুখ, হাতে একটা ফাউন্টেন পেন; তার দুপাশে বসে আছেন কোম্পানির CFO অজয় বনসাল, লিগ্যাল হেড মীরা আইয়ার, NDPO প্রশান্ত আহুজা, NDCS সচ্চিদানন্দ পাঠক এবং HMO ইন্দ্রজিত সিনহা। 

অরুণের ঠিক উল্টো দিকে অভিব্যক্তিহীন মুখে বসে আছে রাজীব মাথুর, ভ্যানগার্ডের ওয়েস্ট জোনের হেড এবং এই কোম্পানীতে অরুণের প্রধান রাইভাল। 

যদিও আজকে রাজীব নয়, অরুণের প্রধান মাথাব্যথা গুপ্তাসাহেব নিজেই। সে জানে কেন মিটিংটা ডাকা হয়েছে।

কিন্তু, গুপ্তাসাহেব কাউকেই সরাসরি নিজের লক্ষ্যবস্তু বানালেন না।

"ওয়েল জেন্টেলম্যান, এই মাসের শেষেই ফোর্থ কোয়ার্টার ক্লোজ হচ্ছে। ম্যানেজমেন্ট যে ফিন্যান্সিয়াল টার্গেট সেট করেছিল, আমরা তা থেকে কতটা শর্ট রান করছি, জানতে পারি কি?"

গুপ্তাসাহেব তার ভারী, গমগমে ঘরের নিস্তব্ধতা ভাঙলেন।

মুখে সবাইকে অ্যাড্রেস করলেও প্রশ্নবাণটা যে কমার্শিয়াল হেড সচ্চিদানন্দ পাঠকের দিকেই ধেয়ে গেল, তা বুঝতে ঘরের কারও বাকি রইল না। তবে সচ্চিদানন্দ পাঠক মুখ খোলার আগেই টেবিলের ওপাশ থেকে একটা ফাইল গুপ্তাসাহেবের দিকে বাড়িয়ে দিলেন CFO অজয় বনসাল।

লাল রঙের ফাইলটার ওপর গুপ্তাসাহেবের রুপোলি ফাউন্টেন পেনটা মৃদু শব্দ করে টোকা মারলেন। অরুণের মনে হল, ঘরের তাপমাত্রা যেন এক ধাক্কায় আরো কয়েক ডিগ্রি নেমে গেছে। ঠিক ওর উল্টো দিকে বসা রাজীব মাথুরের ঠোঁটের কোণে হালকা, প্রায় অদৃশ্য একটা হাসি ওর চোখ এড়িয়ে গেল না।

সচ্চিদানন্দ পাঠক গলা ঝেড়ে সোজা হয়ে বসলেন, 

"স্যার, আমরা ফোর্থ কোয়ার্টারে ওশান ফ্রেইট এবং লাইনার সেলস থেকে যে রেভিনিউ প্রজেক্ট করেছিলাম, তা থেকে আমরা প্রায় চোদ্দো শতাংশ শর্ট রান করছি। 

তবে এর পেছনে পিওরলি কমার্শিয়াল ফেইলিওর নেই। 

রেড-সীতে হুথি অ্যাটাকের কারণে গ্লোবাল সাপ্লাই চেইনের যে দশা হয়েছে তাতে কমার্শিয়াল লাইন্সের প্রফিট মার্জিন ধরে রাখা কঠিন ছিল। 

আমাদের ভেসেলগুলোকে আফ্রিকার কেপ অব গুড হোপ ঘুরে আসতে হচ্ছে। কেপ অফ গুড হোপ ঘুরে জাহাজ আসায় আমাদের ভেসেল ট্রানজিট টাইম প্রায় বারো থেকে পনেরো দিন বেড়ে গেছে। তার ওপর বাঙ্কার কস্ট (জ্বালানি খরচ) বেড়েছে।

ওদিকে আমেরিকার নতুন ট্রেড ট্যারিফের ধাক্কায় গ্লোবাল ফ্রেইট কস্ট আর ইন্সুরেন্স প্রিমিয়াম ডাবল হয়ে গেছে। গ্লোবাল ক্লায়েন্টরা এই মুহূর্তে লং-টার্ম কন্ট্রাক্ট হোল্ডে রাখছে। তা সত্ত্বেও আমরা টার্গেটের কাছাকাছি ছিলাম।"

পাঠক একটু থামলেন, তারপর চশমাটা নাকের ওপর ঠিক করে নিয়ে টেবিলের ওপাশে বসা প্রশান্ত আহুজার দিকে তাকিয়ে একটা বিষাক্ত হাসি ছুড়ে দিলেন।

"কিন্তু, ডোমেস্টিক্যালি আমরা পোর্ট অপারেশন্সের থেকে যে লজিস্টিকাল সাপোর্ট আশা করেছিলাম, সেটা পাওয়া যায়নি। কমার্শিয়াল টিম বুকিং এনে রেডি রাখলেও, আমাদের অপারেশনাল এফিসিয়েন্সি যদি পোর্টে জাহাজের টার্ন-অ্যারাউন্ড টাইম কমাতে না পারে... তবে কস্ট ওভাররানের দায় কমার্শিয়ালের একার নয়। জাহাজ এসে বন্দরে দিনের পর দিন বার্থিংয়ের জন্য দাঁড়িয়ে থাকছে, শুধু লজিস্টিকস আর ক্লিয়ারেন্সের গাফিলতিতে। যার জন্য প্রতিদিন আমাদের লক্ষ লক্ষ ডলার ডেমারেজ গুনতে হচ্ছে। 

বিশেষ করে কিছু স্ট্র্যাটেজিক জোনে লোকাল পোর্ট হ্যান্ডলিংয়ের অবস্থা খুবই হতাশাজনক।

স্যার, কমার্শিয়াল টিম ক্লায়েন্ট এনে দেবে, কিন্তু অপারেশনাল টিম যদি পোর্ট হ্যান্ডলিং-ই স্মুদ না করতে পারে, তবে ফিন্যান্সিয়াল টার্গেট মিস হওয়াটাই স্বাভাবিক।"

প্রশান্ত আহুজার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল, পাঠক এভাবে সরাসরি তার দিকে আক্রমণ শানাবেন সেটা তিনি ভাবেননি। সাধারণত, কর্পোরেটের এই স্তরে কেউ এভাবে সামনাসামনি কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি করে না।

তিনি টেবিলে রাখা কাচের গ্লাস থেকে এক চুমুক জল খেয়ে নিজের বক্তব্য শুরু করতে যাবেন, এমন সময় হেড অফ মেরিন অপারেশনস ইন্দ্রজিত সিনহা তার হাতের পেনটা টেবিলে রেখে মাঝখান থেকে কথা লুফে নিলেন।

"পাঠক সাহেব, আপনি কেবল কমার্শিয়াল দিকটা দেখছেন, কিন্তু রিয়্যালিটিটা আলাদা।"

ইন্দ্রজিৎ সিনহা সরাসরি পাঠকের দিকে তাকালেন।

"আমাদের দুটো কেপসাইজ ভেসেলকে এই মুহূর্তে ওশেন সেফটির কারণে হলদিয়া আর বিশাখাপত্তনমের মাঝখানে হোল্ড করাতে হয়েছে। পোর্ট অপারেশনস রাতারাতি চ্যানেলের ড্রেজিং করতে পারবে না। লো-টাইডের কারণে হলদিয়াতে বড় জাহাজ ঢুকতে পারছে না, এটার সাথে অপারেশনাল ফেইলিওরের কোন সম্পর্ক নেই।"

সচ্চিদানন্দ পাঠক আর ইন্দ্রজিত সিনহার মধ্যে তর্কাতর্কি চরমে ওঠার আগেই গুপ্তাসাহেবের হাতের ফাউন্টেন পেনটা টেবিলের ওপর দুবার শব্দ করল। 

ঠং! ঠং!

মুহূর্তে ঘরের আবহাওয়া আবার থমেথমে হয়ে গেল। গুপ্তাসাহেব ঠান্ডা চোখে তাকালেন প্রশান্ত আহুজার দিকে।

"প্রশান্ত, জিওগ্রাফির লেকচার আমি গ্লোবাল বোর্ড মিটিংয়ে অনেকবার শুনেছি। আমার ইন্ডিয়া রিজিয়নের জাস্টিফিকেশন চাই। ইস্টার্ন জোনের গ্রাফ গত তিন মাসে এভাবে ক্র্যাশ করল কেন?"

প্রশান্ত টেবিলে রাখা মেহগনি কাঠের ওপর দুই হাত রাখলেন, তার কপালে হালকা ঘামের বিন্দু দেখা দিয়েছে। তিনি গলাটা সামান্য ঝেড়ে নিলেন,

"পাঠক সাহেব মেরিটাইম জিওপলিটিক্স ভালোই বোঝেন। কিন্তু উনি নিজের টিমের সেলস ড্রপ ঢাকতে ট্রেড ওয়ার, রেড সী ক্রাইসিস এসব টেনে আনছেন। অপারেশনস টিম চব্বিশ ঘণ্টা কাজ করে টার্ন-অ্যারাউন্ড টাইম নিয়ন্ত্রণে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করছে।"

প্রশান্ত এবার একটু থামলেন। তারপর ধীরে ধীরে মাথা ঘুরিয়ে তাঁর ঠিক পাশে বসা অরুণের দিকে তাকালেন। অরুণের মনে হলো প্রশান্তের চোখের মণি দুটো যেন জমে বরফ হয়ে গেছে।

"তাছাড়া স্যার..." প্রশান্ত এবার সরাসরি এমডি বিনোদ কুমার গুপ্তার দিকে চাইলেন। "পোর্ট অপারেশন্স টিম দূরদর্শী চিন্তাভাবনা করেই এগোচ্ছিল। কিন্তু আমাদের ভেতরের কিছু সিদ্ধান্ত আত্মঘাতী ছিল। স্পেসিফিকালি ইন ইস্ট জোন। 

ফাইনাল বিডিংয়ের ঠিক চব্বিশ ঘণ্টা আগে, কোনোরকম ভ্যালিড রিজন ছাড়া অরুণ হলদিয়া পোর্ট এক্সপ্যানশনের তিনশো কোটি টাকার একটা টেন্ডার থেকে আমাদের বিড উইথড্র করেছে। 

ওই প্রোজেক্টটা আমাদের হাতে এলে আগামী বছরের জন্য ইস্টার্ন জোনে ভ্যানগার্ডের রেভিনিউ নিয়ে কোনো চিন্তাই করতে হতো না।

কোম্পানির হিস্ট্রিতে এমন ঘটনা নজিরবিহীন।ইস্টার্ন হেড কেন কোম্পানির গাইডলাইনের বাইরে গিয়ে এই কাজটা করলেন, সেটা আমি এখনও বুঝে উঠতে পারছি না।"

পুরো ঘরে একটা পিনপতন নীরবতা নেমে এল। মীরা আইয়ার চমকে উঠে অরুণের দিকে তাকালেন।

গুপ্তাসাহেব তাঁর হাতের ফাউন্টেন পেনটার ক্যাপটা আস্তে করে আটকে, অত্যন্ত শীতল দৃষ্টিতে অরুণের দিকে তাকালেন।

"মিস্টার চ্যাটার্জী, আমি আপনার এক্সপ্ল্যানেশন শোনার জন্য ওয়েট করছি।"

গুপ্তা সাহেবের গলার স্বরটা থমথমে,

 "আপনি আমাদের কোম্পানির ইস্ট জোন টেকওভার করার পর, আমি আপনাকে সম্পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছিলাম। কারণ আপনার ট্র্যাক রেকর্ড ইমপেকেবল।আমরা আশা করেছিলাম, আপনি ইস্ট জোনে আমাদের মনোপোলি তৈরি করবেন। কিন্তু, তার রেজাল্ট কী হলো? থ্রি হান্ড্রেড ক্রোরস! তিনশো কোটি টাকার একটা স্ট্র্যাটেজিক টেন্ডার আমাদের হাতছাড়া হলো।"

গুপ্তাসাহেব সামান্য সামনে ঝুঁকলেন,

"শুধু হাতছাড়া হলো না, আপনি ফাইনাল বিডিং প্রসেসের ঠিক চব্বিশ ঘণ্টা আপনি নিজের ভেটো পাওয়ার ইউজ করে আমাদের বিডটা প্রত্যাহার করে নিলেন ! বোর্ডকে শুধু একটা এক লাইনের ইমেইল পাঠালেন যে - 'This project is non-viable' এবং টেন্ডারটা পেল আমাদের সবচেয়ে বড় রাইভাল, 'পোলারিস পোর্টস & শিপিং। 

তিনশো কোটির টেন্ডারটা আপনি কার স্বার্থে ছেড়ে দিলেন? ভ্যানগার্ডের নাকি অন্য কারও?"

কথা বলতে বলতে বিনোদ গুপ্তার চোয়ালের পেশি শক্ত হয়ে উঠল।

এতক্ষণ ধরে চুপ করে থাকা ওয়েস্ট জোনের হেড রাজীব মাথুর এবার সুযোগ বুঝে একটু সামনে ঝুঁকে এলেন। তার মুখে একটা মেকি সহানুভূতির ভাব।

"ইফ আই মে অ্যাড, স্যার", রাজীব অত্যন্ত বিনয়ের সাথে মিস্টার গুপ্তার দিকে তাকিয়ে বলল। 

"অরুণ হয়তো আমাদের কোম্পানির কাজের স্কেলের সাথে এখনো নিজেকে মানিয়ে নিতে পারেনি। একটা মিড সাইজ কোম্পানীতে কাজ করা আর ভ্যানগার্ডের মতো একটা ন্যাশনাল কোম্পানির হয়ে তিনশো কোটির টেন্ডার হ্যান্ডেল করার মধ্যে অনেক তফাত। আমাদের টেকনিক্যাল টিম, লিগ্যাল টিম গত তিন মাস ধরে ওই প্রজেক্টের পেছনে খেটেছে। আমাদের বিড সবচেয়ে স্ট্রং ছিল। কিন্তু অরুণ লাস্ট মোমেন্টে উইথড্র করে আমাদের পুরো কোম্পানিকে ইন্ডাস্ট্রির কাছে একটা জোক বানিয়ে দিয়েছে। শেয়ারহোল্ডাররা অলরেডি প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছে।"

অজয় বনসাল তার চশমাটা একটু ঠিক করে নিয়ে শান্ত গলায় যোগ করলেন, "অরুণ, রাজীবের কথায় লজিক আছে। আমাদের ফিনান্সিয়াল প্রোজেকশন অনুযায়ী এই পোর্ট প্রজেক্টটা আগামী তিন বছরে আমাদের ইবিটা (EBITDA) মার্জিন অন্তত ১৫% গ্রোথ দিত। আপনার এই সাডেন পুল-আউটটা ইনভেস্টরদের কাছে একটা খুব ভুল মেসেজ দিয়েছে। দিস লাইক পিওর সাবোটাজ। এর জন্য আপনাকে কিন্তু উপযুক্ত জবাবদিহি করতে হবে।"

বোর্ডরুমের সবাই এখন অরুণের উত্তরের অপেক্ষায়। রাজীবের মুখে একটা অদৃশ্য হাসি।

পুরো বোর্ডরুম অরুণের উত্তরের অপেক্ষায় রুদ্ধশ্বাসে বসে আছে। সবাই নিশ্চিত, অরুণ আজ শেষ। ইচ্ছে করে তিনশো কোটি টাকার প্রজেক্ট হাতছাড়া করার পর পৃথিবীতে কেউ কোন কোম্পানিতে টিকে থাকতে পারে না।

অরুণ চ্যাটার্জী এতক্ষণ একটা কথাও বলেননি। তিনি অত্যন্ত শান্তভাবে নিজের ডান হাতের রোলেক্স ঘড়িটার ডায়ালে একবার হাত বোলালেন। তারপর খুব ধীরেসুস্থে টেবিলের ওপর রাখা নিজের আইপ্যাডটা অন করলেন এবং স্ক্রিনটা স্লাইড করে বোর্ডরুমের মেইন প্রজেক্টরে কানেক্ট করলেন। তার মুখে ভয়ের বা নার্ভাসনেসের কোনো ছিটেফোঁটা নেই। 

অরুণ নিজের আইপ্যাডটা আনলক করলেন 

"মিস্টার বনসাল ঠিকই বলেছেন, অন পেপার এই প্রজেক্টটা আমাদের ১৫% গ্রোথ দিত" অরুণের শান্ত আত্মবিশ্বাসী গলা বোর্ডরুমের নিস্তব্ধতাকে চিরে দিল। 

"কিন্তু রিয়েলিটিতে, এই প্রজেক্টটা ভ্যানগার্ড গ্লোবালের বিরাট ক্ষতি করে দিত।"

অরুণ প্রজেক্টরের দিকে ইশারা করলেন। স্ক্রিনে একটা জটিল কর্পোরেট স্ট্রাকচারের গ্রাফ ভেসে উঠল।

"স্যার, আপনারা পোর্ট এক্সপ্যানশনের টেন্ডার ডকুমেন্টের ক্লজ নং ফোর-পয়েন্ট-টু (Clause 4.2) নিশ্চয়ই পড়েছেন?" 
অরুণ জিজ্ঞেস করলেন।

"অফকোর্স। লোকাল এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সাব-কন্ট্রাক্টিং ক্লজ।" 

মীরা আইয়ার এতক্ষণে মুখ খুললেন। 

"প্রজেক্টের অন্তত ৪০% কাজ লোকাল রেজিস্টার্ড কোম্পানিগুলোকে দিতে হবে। দ্যাটস স্ট্যান্ডার্ড প্রসিডিওর।"

"কারেক্ট" অরুণ মৃদু হাসলেন। 

"স্ট্যান্ডার্ড প্রসিডিওর। কিন্তু যেটা স্ট্যান্ডার্ড নয়, সেটা হলো ওই লোকাল কোম্পানিগুলোর ব্যাকগ্রাউন্ড। আমি গত এক মাস ধরে শুধু পোর্টের ড্রাফটের পাশাপাশি ওই এলাকার লোকাল সাপ্লায়ার এবং পলিটিক্যাল সিন্ডিকেটের রুট স্টাডি করেছি।"

অরুণ আইপ্যাডে একটা সোয়াইপ করতেই স্ক্রিনে তিনটে কোম্পানির নাম এবং ডিরেক্টরদের ডিটেইলস ফুটে উঠল।

"আমাদের টেন্ডার জিতলে এই তিনটে কোম্পানিকেই সাব-কন্ট্রাক্ট দিতে হতো, কারণ ওই পার্টিকুলার জোনে পোর্ট অথরিটির ক্লিয়ারেন্স শুধু এদেরই আছে। আপনারা কি জানেন এই কোম্পানিগুলোর আসল মালিক কে?"

বোর্ডরুমের সবাই স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে আছে। মীরা আইয়ার চোখ সরু করে ডেটাগুলো পড়ার চেষ্টা করছেন।

"এরা কোনো ইনফ্রাস্ট্রাকচার কোম্পানি নয়, স্যার। এরা লোকাল মাফিয়াদের টাকা সাদা করার মেশিন। কিন্তু প্রবলেমটা শুধু এখানে নয়। আসল ডেডলকটা হলো এনভায়রনমেন্টাল ক্লিয়ারেন্স।" 

অরুণ আবার স্ক্রিন পাল্টালেন। এবার স্ক্রিনে একটা সরকারি রিপোর্টের স্ক্যান কপি ফুটে উঠল, যার ওপর লাল কালিতে 'RESTRICTED' লেখা।

"অরুণ! এই ড্রাফট তো পাবলিক ডোমেইনে নেই! আপনি এই রিপোর্ট কোথায় পেলেন?"

মীরা আইয়ার চমকে উঠলেন। 

"আমি কোথা থেকে ইনফরমেশন পাই, সেটা আমার প্রফেশনাল সিক্রেট, মিসেস আইয়ার।" অরুণ নিস্পৃহ গলায় বললেন।

তারপর সরাসরি মিস্টার গুপ্তার দিকে তাকিয়ে বললেন। 

"রিপোর্টটা দেখুন, স্যার, যে জমিটা পোর্ট এক্সপ্যানশনের জন্য অ্যালোকেট করা হয়েছে, সেটা কোস্টাল রেগুলেশন জোন-ওয়ানের (CRZ-I) আন্ডারে পড়ে। ন্যাশনাল গ্রিন ট্রাইব্যুনাল (NGT) অলরেডি ওই জমির ওপর একটা স্যু-মোটো (Suo-motu) কগনিজেন্স নিয়েছে, যেটা পাবলিকলি ডিক্লেয়ার করা হয়নি। কারণ, এই শেল কোম্পানিগুলোর পলিটিক্যাল বাবারা সেটা ধামাচাপা দিয়ে রেখেছিল।"

বোর্ডরুমের এসি-র ঠান্ডা হাওয়ার মধ্যেও রাজীব মাথুরের কপালে এবার বিন্দু বিন্দু ঘাম জমতে শুরু করল।

"আমরা যদি তিনশো কোটি টাকা বিড করে টেন্ডারটা জিততাম, তাহলে প্রথম তিন মাসের মধ্যেই আমাদের অন্তত একশো কোটি টাকা মবিলাইজেশন ফান্ড হিসেবে ইনভেস্ট করতে হতো। আর ঠিক তার পনেরো দিনের মাথায় গ্রিন ট্রাইব্যুনাল থেকে প্রজেক্টের ওপর 'স্টে অর্ডার' (Stay Order) চলে আসত। কাজ বন্ধ হয়ে যেত। লোকাল সাব-কন্ট্রাক্টররা আমাদের চেপে ধরত পেমেন্টের জন্য, আর এদিকে পোর্ট অথরিটি আমাদের পেনাল্টি করত ডেডলাইন মিট না করার জন্য।"

অরুণ একটু থামলেন। তিনি স্থির দৃষ্টিতে মিস্টার গুপ্তার দিকে ফিরে তাকালেন।

"আমাদের তিনশো কোটি টাকা আগামী দশ বছরের জন্য লিটিগেশনে আটকে যেত, স্যার। কোম্পানির ব্যালেন্স শিট ব্লিড করত, আর স্টক মার্কেটে ভ্যানগার্ড গ্লোবালের শেয়ারের দাম হু হু করে পড়ত। 

আর পোলারিস? তারা এই পলিটিক্যাল ফাঁদে জেনেশুনেই পা দিয়েছে, কারণ তাদের পলিটিক্যাল ইকুয়েশন আলাদা। কিন্তু আমরা কর্পোরেট প্লেয়ার। দ্যাটস হোয়াই, আই পুলড দ্য প্লাগ। আমি একটা গ্লোবাল কর্পোরেশনকে লোকাল সিন্ডিকেটের ব্ল্যাকমেইলের শিকার হতে দিতে পারি না। নাও স্যার, ডিসিশন ইজ ইয়োর্স।"

বোর্ডরুমে এখন পিন-ড্রপ সাইলেন্স। মিস্টার গুপ্তা অত্যন্ত ধীরস্থিরভাবে একবার অজয় বনসালের দিকে চাইলেন।

অজয় বনসাল চুপ করে রইলেন। তিনি একজন সিএফও, তিনি কেবল সংখ্যার ভাষা বোঝেন। অরুণের দেখানো ডেটাগুলো যদি সত্যি হয়, তাহলে অরুণ আজ কোম্পানিকে বিরাট বড় বিপর্যয়ের হাত থেকে বাঁচিয়েছে।

রাজীব মাথুর টেবিলের দিকে সামান্য ঝুঁকে এলেন। তাঁর গলায় কোনো চিৎকার নেই, বরং অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত ও ধারালো টোনে বললেন, 

"অরুণ, তোমার এই ডেটা অ্যানালিসিস অন-পেপার বেশ ইমপ্রেসিভ শোনায়। কিন্তু রিয়ালিটি হলো, পোলারিস পোর্টস কিন্তু এই রিস্কগুলো জেনেশুনেই বিড করেছে। তাদের লিগ্যাল আর টেকনিক্যাল টিম আমাদের চেয়ে কোনো অংশে কমজোরি নয়। তুমি কি বলতে চাইছ তারা এই সিআরজেড ক্লিয়ারেন্সের লুপহোলটা ধরতে পারেনি? নাকি তুমি স্রেফ অতিরিক্ত সাবধানী হয়ে ভ্যানগার্ডের একটা নিশ্চিত রেভিনিউ উইন্ডো হাতছাড়া করলে?"

গুপ্তাসাহেব কোনো কথা বললেন না। তাঁর দীর্ঘ চল্লিশ বছরের কর্পোরেট কেরিয়ারে তিনি বহু প্রজেক্ট প্রপোজাল দেখেছেন। তিনি তীক্ষ্ণ চোখে প্রজেক্টরের স্ক্রিনে থাকা এনভায়রনমেন্টাল রিপোর্টের ডেট আর স্যু-মোটো নোটিসের নম্বরটা মিলিয়ে দেখছিলেন।


এই ফাঁকে, মীরা আইয়ার নিজের ল্যাপটপে দ্রুত টাইপ করে কিছু খুঁজছিলেন। স্ক্রিনে কিছু দেখে তাঁর মুখের পেশিগুলো শক্ত হয়ে উঠল। তিনি চশমাটা নাক থেকে নামিয়ে সরাসরি মিস্টার গুপ্তার দিকে তাকালেন।

"স্যার, অরুণ যে ফাইলটা দেখাচ্ছে, সেটার সোর্স পাবলিক ডোমেইনে না থাকলেও, এটার লিগ্যাল ইমপ্যাক্ট জেনুইন," মীরা আইয়ারের শান্ত কিন্তু স্পষ্ট গলা পুরো বোর্ডরুমের মনোযোগ কেড়ে নিল। 

"আমি জাস্ট দিল্লির এনজিটি (NGT) রেজিস্ট্রি থেকে ইন্টারনাল সোর্সের মাধ্যমে চেক করলাম। গ্রিন ট্রাইব্যুনাল অলরেডি এই পার্টিকুলার কোস্টাল বেল্টের ওপর একটা কড়া রুলিং ড্রাফট করে রেখেছে, যা আগামী সপ্তাহের মধ্যেই পাবলিশ হবে। পোলারিস পোর্টস হয়তো তাদের পলিটিক্যাল কানেকশন নিয়ে কনফিডেন্ট ছিল, কিন্তু এই ক্লিয়ারেন্স ভায়োলেশনের পর কোনো ইন্টারন্যাশনাল ব্যাংক তাদের এই প্রজেক্টের জন্য ফান্ড রিলিজ করবে না।"

বোর্ডরুমের আবহাওয়া এক মুহূর্তে পাল্টে গেল। রাজীব মাথুরের পিঠ সোজা হয়ে হাই-ব্যাক চেয়ারে ঠেকে গেল। তাঁর ঠোঁটের কোণের সেই সূক্ষ্ম হাসির রেখাটা এবার পুরোপুরি মিলিয়ে গেছে।

সিএফও অজয় বনসাল তাঁর সামনে থাকা ডায়েরিটা বন্ধ করলেন। ক্যালকুলেটিভ চোখে অরুণের দিকে তাকিয়ে বললেন, 

"তার মানে তিনশো কোটির টেন্ডার জিতলেও, অন্তত আগামী এক বছর পোলারিস ইয়ার্ডের একটা ইটও নাড়াতে পারবে না। অথচ তাদের মবিলাইজেশন ক্যাপিটাল আটকে থাকবে। অরুণ, তুমি আমাদের ব্যালেন্স শিট ব্লিড হওয়া থেকে বাঁচিয়েছ, দ্যাটস আ ফ্যাক্ট। কিন্তু এই লিটিগেশনের খবর তুমি অফিশিয়াল চ্যানেলগুলোর আগে কীভাবে পেলে?"

অরুণ চ্যাটার্জী নিজের জায়গায় অত্যন্ত শান্তভাবে বসে ছিলেন। তিনি আইপ্যাডটা লক করে টেবিলের ওপর রাখলেন।

"আমি যখন মিড-সাইজ কোম্পানিতে কাজ করতাম রাজীব।" 

অরুণ উত্তরটা অজয়কে না দিয়ে সরাসরি রাজীবের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত ঠান্ডা গলায় বললেন। তাঁর স্বরে কোনো দম্ভ নেই, বরং এক অদ্ভুত স্থিরতা। 

"তখন আমাদের রিসোর্স কম ছিল। তাই মাঠের ইনফরমেশন আমাদের নিজেদের জোগাড় করতে হতো। ভ্যানগার্ডের মতো বড় কর্পোরেশনে এসে আমি একটা জিনিস খেয়াল করেছি - আমরা টেবিলে বসে রিপোর্টের ওপর ভরসা করি বেশি, গ্রাউন্ড রিয়ালিটি দেখি না। হলদিয়া পোর্ট ট্রাস্টে আমার সোর্সের কাছ থেকে যখন আমি এই সিন্ডিকেটের খবর পাই, তখনই আমি পার্সোনালি রিস্ক অ্যাসেসমেন্ট টিম পাঠিয়েছিলাম।"

মিস্টার গুপ্তা এতক্ষণ একটা কথাও বলেননি। তিনি তাঁর ফাউন্টেন পেনটার ক্যাপটা আস্তে করে টেবিলের ওপর রেখে চেয়ারে সামান্য সোজা হয়ে বসলেন। তাঁর গম্ভীর মুখাবয়বে এবার অত্যন্ত সূক্ষ্ম সন্তুষ্টির আভাস পাওয়া গেল।

"রাজীব" 

গুপ্তাসাহেবের ভারী গলা ঘরটার নীরবতা ভাঙল। 

"কর্পোরেট স্ট্র্যাটেজি মানে শুধু আগ্রাসন নয়। কোন লড়াইটা লড়তে হবে আর কোনটা ছেড়ে দিতে হবে, সেটা বুঝতে পারাটাই আসল লিডারশিপ। অরুণ যদি শেষ মুহূর্তে বিড প্রত্যাহার না করত, তবে আজ আমাদের বোর্ড মিটিংয়ে থার্ড কোয়ার্টারের শর্টফলের বদলে কীভাবে আমরা তিনশো কোটি টাকার একটা ডেড প্রজেক্ট থেকে নিজেদের ক্যাপিটাল উদ্ধার করব সেই নিয়ে আলোচনা হত।"

গুপ্তাসাহেব এবার অরুণের দিকে তাকালেন। তাঁর চোখে এখন প্রচ্ছন্ন সমীহ।

"অরুণ, উইথড্র করার পর এক লাইনের ইমেইল না পাঠিয়ে, এই ফাইলটা যদি চব্বিশ ঘণ্টা আগে আমার ডেস্কে আসত, আই উড হ্যাভ বিন মোর কম্ফোর্টেবল। তবে, এন্ড রেজাল্টটা ভ্যানগার্ডের ফেভারে গেছে। ইউ সেভড আওয়ার ক্যাপিটাল, অ্যান্ড মোর ইম্পর্ট্যান্টলি, আওয়ার রেপুটেশন।"

To be continued...
[+] 3 users Like RockyKabir's post
Like Reply
গুপ্তাসাহেব উঠে দাঁড়ালেন। প্রোটোকল অনুযায়ী বাকি ডিরেক্টরেরাও তৎক্ষণাৎ উঠে দাঁড়ালেন।

"মিটিং ডিসমিসড," গুপ্তাসাহেব ফাইলগুলো গোছাতে গোছাতে বললেন। 

"প্রশান্ত, ইস্টার্ন জোনের অপারেশনাল ইস্যুগুলো নিয়ে আগামীকাল সকালে আমি আপনার আর অরুণের সাথে আলাদাভাবে বসব। আর মিস্টার বনসাল, পোলারিস এই ফাঁদে আটকে যাওয়ার পর ইস্টার্ন জোনের যে কন্টেইনার ভলিউমটা ওপেন থাকবে, সেটা আমরা কীভাবে ট্যাপ করতে পারি, আপনি তার একটা ফিনান্সিয়াল মডেল রেডি করুন। অরুণ, গুড জব।"

"থ্যাঙ্ক ইউ, স্যার," অরুণ সামান্য মাথা নিচু করে বিনীতভাবে বললেন।

গুপ্তাসাহেব ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর রাজীব মাথুর আর এক সেকেন্ডও সেখানে দাঁড়ালেন না। নিজের ল্যাপটপটা তুলে নিয়ে প্রায় নিঃশব্দে বোর্ডরুম ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন। 

অরুণ শান্তভাবে নিজের ঘড়ির দিকে তাকালেন, লাঞ্চের সময় হয়ে এসেছে। 

সিম্পোজিয়াম শেষ হওয়ার ঠিক চারদিন পর। 
বিদিশার কেবিন
কলেজের মেন বিল্ডিং

ইভেন্ট শেষ হওয়া মানেই যে কাজ শেষ, তা নয়। এই মুহূর্তে ভেন্ডারদের ফাইনাল পেমেন্ট ক্লিয়ারেন্স, স্পনসরশিপের টাকার পাই-টু-পাই হিসেব, ডেলিগেটদের ট্রাভেল অ্যালাউন্সের ভাউচার, সব মিলিয়ে গাদাখানেক বিল এবং রসিদের স্তূপ বিদিশার মেহগনি কাঠের ডেস্কের ওপর জমে পাহাড় প্রমাণ স্তূপের মতো হয়ে আছে।

সাধারণত ন্যাশনাল লেভেলের এত বড় একটা ইভেন্টের পর 'ফাইনাল ক্লোজার রিপোর্ট' জমা দেওয়ার জন্য অন্তত দশ-বারো দিন সময় পাওয়া যায়। কিন্তু, ন্যাক-এর পিয়ার টিমের ভিজিট অতটা এগিয়ে আসার জন্য প্রত্যাশিতভাবেই দশ-বারো দিনের মেয়াদ কমে চার-পাঁচ দিনে নেমে এসেছে। তাই ইভেন্ট আয়োজনের পরেও বিদিশার একটুও স্বস্তি মেলেনি।

আগের মতো এখন তাঁকে আর রোজ রোজ সাত সকালে নির্দিষ্ট সময়ের আগে কলেজে ছুটতে হচ্ছে না ঠিকই, কিন্তু কাজের চাপ এখনও কমেনি। 

তাই ইভেন্ট শেষ হওয়ার পরে তিন দিন কেটে গেলেও তিনি এখনও ক্লাসে ফিরতে পারেননি।

আজ বিদিশার পরনে একটা সাধারণ, ছাই-রঙা সুতির শাড়ি, চুলগুলো একটা পেন্সিল দিয়ে খোঁপার মতো করে আটকানো। তিনি ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে ক্লান্ত চোখে একদৃষ্টে তাকিয়ে এক্সেল শিটের ডেটাগুলোর সাথে ভেন্ডারদের দেওয়া ম্যানুয়াল বিলগুলো মেলাচ্ছিলেন।

এসির ঠান্ডা হাওয়াও স্বস্তি দিতে ব্যর্থ। মাথাটা দপদপ করছে, এক্সেল শিটের সারি সারি সংখ্যাগুলো চোখের সামনে বারবার জট পাকিয়ে যাচ্ছে। 

কয়েকবার চেষ্টার পরে হার মেনে নিয়ে বিদিশা ল্যাপটপের স্ক্রিন থেকে চোখ সরিয়ে দু'হাত দিয়ে নিজের কপালটা চেপে ধরলেন। তার বুক চিরে একটা ক্লান্ত দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল। 

তিন সপ্তাহের উপর কাজের চাপ, তার সঙ্গে টেনশন, দুটোর ভার বহন করতে করতে তিনি হাঁপিয়ে উঠেছেন।

অথচ উপায় নেই, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তাকে রিপোর্ট রেডি করে কাল অথবা পরশুর মধ্যেই প্রিন্সিপালের টেবিলে জমা দিতে হবে।
 
কিন্তু, এই মুহূর্তে তার সাময়িক মুক্তির দরকার। অন্তত আধ ঘন্টার জন্য তার এমন একটা মানুষের সঙ্গ চাই, যার সাথে কথা বললে কাজ বা কলেজের পলিটিক্স কোনটা নিয়ে ভাবতে হবে না।

তার মনের আয়নায় একটা মুখ ভেসে উঠল, রাহুল বোস। এই অল্প সময়ের মধ্যে তিনি বিদিশার কাছে একটা 'কমফোর্ট জোন' হয়ে উঠেছেন।

মুখে না বললেও রাহুলের আন্তরিকতা, সূক্ষ্ম রসবোধ, কথায় কথায় সাহিত্যের উপমা এগুলো বিদিশা উপভোগ করেন। একজন শিক্ষিত, রুচিশীল মানুষের সঙ্গে কথা বলার যে আলাদা একটা আনন্দ আছে, রাহুলের সাহচর্যে এসে বিদিশা প্রতি মুহূর্তেই সেটা অনুভব করতে পারেন। তার শুকনো, রুটিনমাফিক নিঃসঙ্গ জীবনে এটা একটা বড় প্রাপ্তি।

তাছাড়া, নিজের কাছে স্বীকার করতে না চাইলেও রাহুলের চোখের প্রচ্ছন্ন, মার্জিত মুগ্ধতাবোধ বিদিশার অবদমিত নারীসত্তাকে তৃপ্ত করে।
অরুণের সাথে একটানা একঘেয়ে যান্ত্রিক দাম্পত্য-জীবন এবং অয়নের সাথে দূরত্বের ফলে তাঁর জীবনের একটা বড়সড় শূন্যতা আছে, রাহুল বোস সেটা নিজের অজান্তেই একটু একটু করে ভরাট করতে শুরু করেছেন।

তার সাথে কথা বলার সময় বিদিশা অনুভব করেন যে তিনিও একজন রক্তমাংসের মানুষ। তার নিজস্ব কিছু অনুভূতি, চাওয়া-পাওয়া আছে। 
অরুণের আচরণে তো সেটা কখনোই মনে হয় না। তার জীবনের প্রথম প্রায়োরিটি তার কেরিয়ার। তার কাছে রাত করে বাড়ি ফেরা, মাসের মধ্যে পনের দিন, এমনকী কুড়ি দিন আউট অফ স্টেশন থাকা খুব সাধারণ বিষয়। এই তো, আজ নিয়ে সাতদিন হল অফিসের কাজে অরুণ মুম্বই গিয়েছেন , এর মধ্যে বাড়িতে ফোন করেছেন মাত্র একবার। সেটাও মুম্বই পৌঁছনোর পরে।

বাড়িতে একটা লোক যে একা আছে সেটা একবারের জন্যও তার মনে আসেনি। আজকালকার মেয়ে হলে কবেই ডিভোর্স হয়ে যেত। বিদিশা আলাদা ধাতুতে তৈরি, তার এসব গা-সওয়া হয়ে গেছে। তিনি মানিয়ে নিয়েছেন। তার বাবাও এরকমই ছিলেন। তিনি ভেবেছিলেন অয়নটা অন্তত আলাদা হবে...তার চাহিদা তো খুব বেশি কিছু ছিল না...

কলেজের এই চাকরিটা তাকে অন্তত একটা খোলা জানালার সন্ধান দিয়েছে। শেষবার কবে তিনি কারোর কথায় স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে হেসে উঠেছিলেন, সেটা বিদিশা আজ অনেক চেষ্টা করেও মনে করতে পারেন না।

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে তিনি ঘড়ির দিকে তাকালেন, দুপুর দেড়টা। 

এখন লাঞ্চ আওয়ার চলছে।

তিনি ডেস্ক থেকে উঠে পড়লেন। শাড়ির আঁচলটা একটু ঠিক করে নিয়ে তিনি কেবিন থেকে বেরিয়ে করিডোর ধরে দোতলার কমন স্টাফরুমের দিকে পা বাড়ালেন।

দোতলার কমন স্টাফরুম যেটা ইদানীং টিচার্স লাউঞ্জ নামে পরিচিত, সাধারণত এই সময় ফাঁকা থাকে। বেশিরভাগ সিনিয়র ফ্যাকাল্টিরা নিজেদের ব্যক্তিগত কেবিনেই লাঞ্চ করা পছন্দ করেন। অন্য টিচাররাও যে যার ডিপার্টমেন্টের স্টাফরুমেই থাকতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন বেশি।

সিম্পোজিয়ামের আগে এটাকে অনেকটা ফাইভ-স্টার হোটেলের বিজনেস লাউঞ্জের মতো রূপ দেওয়া হয়েছিল। মেঝেতে ওয়াল-টু-ওয়াল কার্পেট বিছানো হয়েছিল, যা হাঁটার শব্দ পুরোপুরি শুষে নেবে। ঘরের মাঝখানে থেকে কাঠের টেবিল-চেয়ারগুলো সরিয়ে তার জায়গায় দেওয়াল ঘেঁষে সারি সারি লেদার সোফা আর কাঁচের সেন্টার টেবিল রাখা হয়েছিল। ঘরের এককোণে একটা অত্যাধুনিক প্যান্ট্রি সেট করা হয়েছিল, যেখানে স্বয়ংক্রিয় কফি মেশিন থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের ড্রিংকস আর কুকিজ রাখা থাকবে।

বিদিশা আশা করেছিলেন যে আজকেও স্টাফরুমটা ফাঁকাই থাকবে এবং রাহুল বোস হয়তো তার জন্য কফি নিয়ে রেডি হয়ে থাকবেন।
কিন্তু স্টাফরুমের ভারী কাঁচের দরজাটা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই তিনি একটু থমকে গেলেন। স্টাফরুমের দৃশ্যটা সম্পূর্ণ অন্যরকম। বিভিন্ন ডিপার্টমেন্ট মিলিয়ে অন্তত জনা কুড়ি-পঁচিশ ফ্যাকাল্টি এই মুহূর্তে এখানে উপস্থিত।

বিদিশা দরজার কাছে দাঁড়িয়েই পুরো স্টাফরুমটা একবার চোখ বুলিয়ে স্ক্যান করে নিলেন।

এসির ঠাণ্ডা আবহাওয়ায় মিশে থাকা কফির গন্ধ আর উপস্থিত সবার সমবেত কণ্ঠস্বর, যা দূর থেকে শুনলে একটানা গুঞ্জনের মতো লাগে।
নাহ, রাহুল বোস এখানে নেই।

বিদিশার মনটা এক মুহূর্তের জন্য হালকা হতাশায় ভরে গেল। একা একা এই ভিড় স্টাফরুমে বসে কফি খাওয়ার কোনো ইচ্ছে তার নেই। এই ভিড়ের মধ্যে তার এক মুহূর্তও দাঁড়াতে ইচ্ছে করছে না। তিনি দরজার হ্যান্ডেলটা টেনে আবার বাইরে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য পা বাড়ালেন।

"মিস গাঙ্গুলি এখানে বসুন না। দেখে তো মনে হচ্ছে আপনার এখন একটু বিশ্রামের প্রয়োজন।"

বিদিশার খুব কাছ থেকে একটা মার্জিত নারী কণ্ঠস্বর ভেসে এল।

বিদিশা থমকে দাঁড়ালেন। কণ্ঠস্বরটা তার অপরিচিত। তিনি ঘুরে তাকালেন।

তার ঠিক বাঁ দিকের একটা কর্নার সোফায় বসে আছেন এক ভদ্রমহিলা। বয়স চল্লিশের কোঠায় হবে। 
গায়ের রঙ উজ্জ্বল ফর্সা, মুখের গড়ন ডিম্বাকৃতি, পরনে একটা দামি, প্যাস্টেল শেডের তসর সিল্কের শাড়ি। পরিপাটি করে ব্লো-ড্রাই করা চুলগুলো তার কাঁধের ওপর নিখুঁতভাবে ছড়িয়ে আছে। চোখে একটা সরু, গোল্ডেন ফ্রেমের চশমা,  ভেতর দিয়ে তার চোখের দৃষ্টি ঠিকরে বেরোচ্ছে।

তার ঠোঁটে আন্তরিক হাসি। ভদ্রমহিলার বডি ল্যাঙ্গুয়েজ ভীষণ রিল্যাক্সড, অথচ অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী। তার সামনে সেন্টার টেবিলে একটা খোলা ল্যাপটপ আর একটা স্যান্ডউইচের প্লেট রাখা। ডান হাতে একটা কফির কাপ আর বাঁ হাতের আঙুলগুলো সোফার হাতলের ওপর একটা নির্দিষ্ট ছন্দে টোকা দিচ্ছে। 

তার পুরো বডি ল্যাঙ্গুয়েজের মধ্যে এমন একটা অদ্ভুত স্থিরতা আছে, যা স্টাফরুমের এই পরিবেশের সাথে একদমই খাপ খাচ্ছে না। তিনি যেন এই ঘরের কোলাহল থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন ভাবে সবকিছু খুব পর্যবেক্ষণ করছেন। বিদিশা এই মহিলাকে আগে কখনো দেখেছেন বলে মনে করতে পারলেন না।

"অত্যন্ত ক্লান্ত লাগছে আপনাকে। প্লিজ, বসুন, এখানে জায়গা আছে" ভদ্রমহিলা নিজের পাশের ফাঁকা জায়গাটার দিকে একটু সরে গিয়ে, পাশের ফাঁকা লেদার সোফাটার দিকে ডান হাত দিয়ে বিদিশাকে বসার ইশারা করলেন।

বিদিশা স্বভাবতই একজন ইন্ট্রোভার্ট মানুষ। নিজে থেকে গিয়ে অপরিচিতদের সাথে বসে গল্প করা তার ধাতে নেই। কিন্তু মহিলা যেভাবে তাকে নাম ধরে ডাকলেন এবং বসার জায়গা করে দিলেন, তাতে সরাসরি না বলে বেরিয়ে যাওয়াটা অত্যন্ত অভদ্রতা হয়ে যায়।

বিদিশা একটু ইতস্তত করে ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে সোফাটার এক প্রান্তে, ভদ্রতাসূচক দূরত্ব বজায় রেখে বসলেন।

"থ্যাংক ইউ" বিদিশা মাপা গলায় বললেন।

মহিলা কফির কাপটা সামনের কাঁচের টেবিলের ওপর নামিয়ে রাখলেন। তার হাতের নখগুলো পারফেক্টলি ম্যানিকিওর করা, নেলপলিশের রঙটা শাড়ির বর্ডারের সাথে নিখুঁতভাবে ম্যাচ করানো।

"আমি অনামিকা। অনামিকা রায়," ভদ্রমহিলা নিজের ডান হাতটা বাড়িয়ে দিলেন। 

"কলেজের সাইকোলজি ডিপার্টমেন্টের সিনিয়র ফ্যাকাল্টি আর স্টুডেন্ট কাউন্সিলর।"

বিদিশা হাত মেলালেন। 

"আমি বিদিশা গাঙ্গুলি। ম্যাথমেটিক্স..."

"ওহ, আপনার নতুন করে পরিচয় দেওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই।" 

অনামিকা খুব মিষ্টি করে হেসে উঠলেন। 

"আমি তো প্রিন্সিপাল স্যারকে সেদিন বলছিলাম, আমাদের কলেজে একজন সত্যিকারের ক্রাইসিস ম্যানেজার এসেছেন।" 
অনামিকা হাত ছাড়িয়ে নিয়ে সোফায় একটু হেলান দিয়ে বসলেন।

বিদিশা সামান্য ভ্রু কুঁচকালেন। মহিলা তার সম্পর্কে যথেষ্ট খোঁজ রাখেন।

"সিম্পোজিয়ামের ওই হাড়ভাঙা খাটুনির পর আপনার তো অন্তত এক সপ্তাহ ছুটিতে থাকা উচিত ছিল।" 

মহিলা খুব মোলায়েম গলায়, হাসিমুখে কথাগুলো বললেন।

"কাজ তো করতেই হবে। ফাইনাল ক্লোজার রিপোর্টটা ন্যাকের অডিটের জন্য খুব ক্রুশিয়াল। তাই ছুটি নেওয়ার কোনো সুযোগ ছিল না," 
বিদিশা প্রফেশনাল এবং ফ্ল্যাট টোনে উত্তর দিলেন। তিনি নিজের সম্পর্কে খুব বেশি তথ্য অপরিচিত কাউকে দিতে চান না।

"অফকোর্স। আর আপনার কাজের এফিসিয়েন্সি নিয়ে তো এখন সবাই চর্চা করছে। সিম্পোজিয়াম নিয়ে ঐ ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট! মাই গুডনেস!

এমনকি ম্যানেজমেন্টের উপরতলা অবধি আপনার খবর পৌঁছে গেছে।"

মহিলার কথাটা শোনার সাথে সাথে বিদিশার মস্তিষ্কে একটা সতর্কঘণ্টা বেজে উঠল।

'ম্যানেজমেন্টের উপরতলা?' 

একজন সাধারণ টিচারের কানে কীভাবে এসব কথা পৌঁছয় ?

"থ্যাংক ইউ, মিস রায়। কিন্তু, ক্রাইসিস ম্যানেজার হওয়ার কোনো ইচ্ছে আমার ছিল না। পরিস্থিতি বাধ্য করেছিল।" 
বিদিশা খুব সাবধানে, মেপে মেপে উত্তর দিলেন।

"আমি বুঝতে পারছি। বাইরে থেকে সবাই শুধু গ্ল্যামার আর সাকসেসটা দেখে। কিন্তু আমি একজন সাইকোলজিস্ট। আমি মানুষের মুখ দেখে বুঝতে পারি তাদের ভেতরে কী হচ্ছে। এই যে গত তিন সপ্তাহ ধরে আপনি লড়ে যাচ্ছেন... ইটস মেন্টালি এক্সহস্টিং।"

অনামিকা একটু সামনের দিকে ঝুঁকে এলেন। তার চোখদুটো সরাসরি বিদিশার চোখের দিকে স্থির।

"আর তার ওপর, এই কলেজের পলিটিক্স। আপনি নতুন এসেছেন, হয়তো এখনো সবটা বুঝে উঠতে পারেননি।"

বিদিশার মস্তিষ্কের অ্যালার্ম বেলটা বেজে উঠল।

পলিটিক্স ! এই মহিলা কি ড. বাগচী আর সুব্রত সেনের ফান্ড আটকানোর ব্যাপারটা জানেন? নাকি তিনি অন্য কোনো ইঙ্গিত দিচ্ছেন?

"পলিটিক্স তো সব জায়গাতেই থাকে, মিস রায়।" 

বিদিশা তার ফেস এক্সপ্রেশন সম্পূর্ণ ব্ল্যাঙ্ক রেখে উত্তর দিলেন। 

"আমি অ্যাকাডেমিক্সে ফোকাস করতে পছন্দ করি। এই পলিটিক্যাল নয়েজগুলো আমি ইগনোর করার চেষ্টা করি।"

"দ্যাটস আ ভেরি স্মার্ট অ্যাপ্রোচ" অনামিকা হাসিমুখে সায় দিলেন। 

"কিন্তু প্রবলেম হলো, আপনি পলিটিক্সকে ইগনোর করলেও, পলিটিক্স কিন্তু আপনাকে ইগনোর করবে না। স্পেশালি, যখন আপনি এত ব্রিলিয়ান্ট, এত ফোকাসড। আপনার মতো স্বাধীনচেতা মেয়েদের এই সিস্টেম খুব ভয় পায়। স্টুডেন্টদের কাউন্সেলিং করতে গিয়ে দেখেছি, এই অল্প ক'দিনেই ফার্স্ট ইয়ারের স্টুডেন্টদের মধ্যে আপনার একটা বিশাল ইমপ্যাক্ট তৈরি হয়েছে। 
স্পেশালি, ফেস্টের রাতের সেই ঘটনার পর..."

অনামিকা একটু থামলেন। 

তিনি খুব সন্তর্পণে বিদিশার চোখের মাইক্রো-এক্সপ্রেশনগুলো পড়ার চেষ্টা করলেন। বিদিশার শিরদাঁড়া টানটান হয়ে গেল।

ফেস্টের রাত! অয়ন!

এই মহিলা কি অয়নের সাথে তার সম্পর্কের কোনো আঁচ পেয়েছেন? নাকি তিনি শুধু অয়নের বিক্রম মালহোত্রাকে ঘুঁষি মারার ঘটনাটার দিকে ইঙ্গিত করছেন?"

বিদিশা নিজের মুখের পেশিগুলোকে পাথরের মতো শক্ত করে ফেললেন। তার চোখেমুখে কোনরকম ইমোশন বা অস্বস্তির বিন্দুমাত্র ছাপ তিনি প্রকাশ হতে দিলেন না।

"স্টুডেন্টরা অনেক কিছুই বানিয়ে বলতে ভালোবাসে, মিস রায়। আমি শুধু একজন টিচার হিসেবে আমার বাউন্ডারি মেইনটেইন করার চেষ্টা করি। দ্যাটস অল" বিদিশা ঠাণ্ডা গলায় উত্তর দিলেন।

অনামিকার চোখের ভেতর দিয়ে একটা সূক্ষ্ম বিস্ময়ের ঝলক বয়ে গেল। তিনি ভেবেছিলেন এবার হয়তো বিদিশা তার কাছে একটু ওপেন-আপ হবেন, একটু ফ্রাস্ট্রেশন দেখাবেন, বা ম্যানেজমেন্টের নামে দু-চার কথা বলবেন।

এই বিদিশা গাঙ্গুলি মেয়েটার সেল্ফ-কন্ট্রোল মারাত্মক। এক ইঞ্চিও জমি ছাড়তে চায় না।

"অ্যাবসোলিউটলি," অনামিকা হাসিমুখে সায় দিলেন। 

"বাউন্ডারি মেইনটেইন করাটা খুব দরকার। কিন্তু মুশকিল হলো, এই ক্যাম্পাসের আসল নার্ভটা কিন্তু ক্লাসরুম বা অ্যাকাডেমিক্সের মধ্যে থাকে না, মিস গাঙ্গুলি।"

অনামিকা একটু সামনের দিকে ঝুঁকে এলেন। তার গলার স্বরটা ফিসফিসানিতে নেমে এসেছে।

"আজকালকার ছেলেমেয়েরা বড্ড আনপ্রেডিক্টেবল। তাদের সমস্যা, তাদের সাইকোলজি, তাদের পলিটিক্স... এগুলো ক্লাসরুম থেকে বোঝা যায় না। আর সেই সমস্যাগুলো যদি আউট অফ 'কন্ট্রোল' হয়ে যায়, তখন আবার ম্যানেজমেন্টকে অনেক মূল্য চোকাতে হয়।"

বিদিশা চুপ করে শুনছেন। তার প্রখর গাণিতিক মস্তিষ্ক অনামিকা রায়ের ছুঁড়ে দেওয়া প্রত্যেকটা শব্দকে ডিকোড করার চেষ্টা করছে। এই মহিলা তাকে এসব কথা কেন বলছেন?

"সেইজন্যই" 

অনামিকা আবার সোফায় হেলান দিলেন।

"ম্যানেজমেন্ট চায় সব কিছু কন্ট্রোলে থাকুক। ওরা তো আপনার মতো ডেডিকেটেড, ইন্টেলিজেন্ট আর স্ট্রং মানুষদেরই চায়।"

"ওপরতলার ইমপ্রেশন নিয়ে আমি খুব একটা মাথা ঘামাই না, মিস রায়। আমার কাজ আমার সাবজেক্ট পড়ানো আর যে দায়িত্বটা প্রিন্সিপাল স্যার দেন, সেটা নিখুঁতভাবে শেষ করা। এর বাইরে কোন কিছু নিয়ে আমার কোনো এক্সপার্টিজও নেই আর বিন্দুমাত্র ইন্টারেস্টও নেই।"

বিদিশা কথাটা এমন একটা টোনে বললেন, যা ওপর থেকে শুনতে মার্জিত লাগলেও তাতে প্রত্যাখ্যানের স্পষ্ট সুর মেশানো ছিল। তিনি বুঝিয়ে দিলেন যে তিনি এই ধরনের গসিপে অংশ নিতে চান না।

অনামিকার মতো অভিজ্ঞ মানুষের ইঙ্গিতটা বুঝতে অসুবিধা হল না।

"দ্যাটস সো রিলিভিং টু হিয়ার!"

অনামিকা আবার তার মিষ্টি হাসির আবরণে ফিরে গেলেন। 

"আপনার এই কনফিডেন্সটাই আপনার সবচেয়ে বড় অস্ত্র, বিদিশা। কিপ ইট আপ।"

অনামিকা তার ল্যাপটপটা ব্যাগে ঢোকাতে শুরু করলেন।

"আমি উঠি। আমার একটা কাউন্সেলিং সেশন আছে। বেশ কিছু স্টুডেন্ট আজকাল সিভিয়ার ডিপ্রেশন আর অ্যাংজাইটি নিয়ে আসছে। কলেজের এই প্রেশার কুকার এনভায়রনমেন্ট অনেক বাচ্চাই নিতে পারে না।"

ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে নিয়ে অনামিকা উঠে দাঁড়ালেন।

"আপনার সাথে কথা বলে ভীষণ ভালো লাগল, বিদিশা। আপনি যে কোন সময়, কোন মেন্টাল স্ট্রেস বা কলেজের কোনো ইন্টারনাল বিষয়ে কথা বলতে চাইলে, মাই ডোর ইজ অলওয়েজ ওপেন। সামটাইমস, উই অল নিড আ সেফ স্পেস টু টক। তাই না?"

অনামিকা আবার একটা উষ্ণ হাসি ছুঁড়ে দিয়ে স্টাফরুম থেকে বেরিয়ে গেলেন।

বিদিশা সোফায় বসে রইলেন। তার মনের ভেতর এখন একটা নতুন চিন্তার স্রোত বইতে শুরু করেছে।
স্টাফরুমের চারপাশের কোলাহল, গুঞ্জন তার চিন্তায় কোনরকম ব্যাঘাত ঘটল না। তার মনের ভেতর অনামিকা রায়ের কয়েকটা শব্দ ইকো হচ্ছে - ম্যানেজমেন্ট তার মতো মানুষদের চায়... কিন্তু কেন ?

স্টাফরুমে একগাদা টিচারের সামনে অচেনা একজন মানুষকে ডেকে হুট করে এসব কথা কেউ কাউকে বলবে কেন ? আর, ফেস্টের কথা তুলে উনি কী বোঝাতে চাইলেন, ইঙ্গিতটা কী অয়নের দিকে ছিল ? নাকি ওই মহিলা তাকে আসন্ন কোন ঘটনার ইঙ্গিত দিতে চাইছিলেন ? 
কী হতে পারে সেটা ? আবার নতুন কোন একটা ফাঁদ যা ম্যানেজমেন্ট থুড়ি বাগচী তার জন্য পাতা শুরু করেছে ? অনামিকা রায়ের সাথে কী বাগচীর কোন যোগাযোগ আছে ?

বিদিশা একটা গভীর শ্বাস নিলেন। তার এতক্ষণের ক্লান্তি, রিপোর্ট জমা নিয়ে টেনশন সব কোথায় যেন উধাও হয়ে গেছে। তার জায়গায় মাথায় গিজগিজ করছে অসংখ্য প্রশ্ন। বাসা বেঁধেছে তীক্ষ্ণ সতর্কতা। 

এখন তার মনে হচ্ছে, সিম্পোজিয়ামের ফান্ডিং আটকানোর চেষ্টাটা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা বা একক প্রয়াস ছিল না। 

তিনি নিশ্চিত যে শুধু বাগচী নয় এর পেছনে ম্যানেজমেন্টের কোন ক্ষমতাশালী ব্যক্তির হাত ছিল। কলেজের এই আপাত-শান্ত অ্যাকাডেমিক খোলসটার নিচে একটা ক্ষমতার লড়াই চলছে, আর কেউ চাইছে বিদিশা তাতে জড়িয়ে যাক।

বিদিশা সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। হঠাৎ করেই একটা নতুন অ্যাড্রেনালিনের রাশ অনুভব করলেন তিনি, এতক্ষণের ক্লান্ত অনুভূতিটা আর নেই। 

যে বা যারা তাকে এই জালে জড়াতে চাইছে, তাদের খুব শিগগিরই বুঝতে হবে যে তারা ভুল মানুষকে টার্গেট করেছে। তিনি কারোর সামনে মাথা নোয়ান না।

যে উদ্দেশ্য নিয়েই এরা এমন কাজ করে থাকুক সেটা সফল হবে না। নাহ, এসব নিয়ে বেশি চিন্তা করে লাভ নেই।

বিদিশা নিজের শাড়ির আঁচলটা কাঁধের ওপর ঠিক করে নিয়ে, মেরুদণ্ড টানটান করে কমন স্টাফরুম থেকে বেরিয়ে নিজের কেবিনের দিকে পা বাড়ালেন। ফাইনাল ক্লোজার রিপোর্টটা তাকে আজ রাতের মধ্যেই শেষ করতে হবে।
To be continued...
[+] 5 users Like RockyKabir's post
Like Reply




Users browsing this thread: 4 Guest(s)