Thread Rating:
  • 40 Vote(s) - 3.4 Average
  • 1
  • 2
  • 3
  • 4
  • 5
Erotic Thriller মরীচিকা ও মোহময়ী
আজ ভীষণ ক্লান্ত লাগছে। তাই আর পোস্টার দিতে ইচ্ছে করল না। এই নভেলটা ওয়েব সিরিজগুলোকে মডেল করে লিখছি তাই আজ আপনাদের ধামাকা নয় বরং পরের আর্কে কী আসতে চলেছে সেই সম্পর্কে অনেকগুলো হিন্টস মিলবে। কারণ, এটাই এই আর্কের শেষ চ্যাপ্টার। তবে এরপর আমায় আবার নেক্সট আর্ক প্ল্যান করতে হবে। সেটার জন্য আগের বারের মতোই আবার দেড়-দুই সপ্তাহ ব্রেক নেব। সেই বিরতিটা হয় এই রবিবার, নাহলে পরের রবিবার থেকে শুরু হবে। যদি পরের সপ্তাহ থেকে শুরু করি তবে এই রবিবার একটা চ্যাপ্টার পোস্ট করব।



অধ্যায় তেইশ

Flashback 

দশ বছর আগে। নর্থ ব্লক বয়েজ হোস্টেলের পেছনের দিকটা।

এখন মাঝরাত, চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার। একটু দূরে একটা সোডিয়াম ভেপার ল্যাম্প আছে বটে, সেটার আলোটা এমনি সময়ে ক্ষীণ, এখন জোরালো বৃষ্টির ছাঁটে হলদে রংটা আরো ঝাপসা দেখাচ্ছে। এতক্ষণ ধরে চলা মুষলধারে চলা বৃষ্টির তোড়টা আগের থেকে সামান্য কমলেও ঝমঝম করে বৃষ্টি পড়েই চলেছে। ঘন, কালো মেঘের গর্জনে চারপাশটা মাঝে মাঝেই কেঁপে উঠছে।

এইরকম অবস্থায় কারোর বাইরে থাকার কথা নয়। অথচ, হোস্টেলের ছাদের কার্নিশ ঘেঁষে কয়েকটা ছায়ামূর্তিকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে। 

ল্যাম্পের ক্ষীণ আলো কালো, জমাট বাঁধা অন্ধকারকে ভেদ করতে ব্যর্থ। তাদের মুখ স্পষ্ট নয়। শুধু অবয়বগুলো বোঝা যাচ্ছে।

এমন সময় ছাদ থেকে তলার দিক লক্ষ্য করে একটা টর্চলাইট জ্বলে উঠল।

টর্চের আলোর রেখাটা ওপর থেকে নিচে অন্ধকারের বুক চিরে নেমে গেল। বৃষ্টির মোটা ধারাগুলো সেই আলোর রেখার মধ্যে দিয়ে পড়ার সময় রুপোলি তীরের মতো দেখাচ্ছে। আলোর বৃত্তটা নিচে পড়ে থাকা একটা নিথর, দুমড়ে যাওয়া মৃতদেহের ওপর গিয়ে স্থির হলো।

নিচের অন্ধকারে পড়ে আছে একটা মানুষের শরীর। বাঁ পা-টা হাঁটুর কাছ থেকে এমন একটা কোণে বেঁকে আছে, যেটা কোন জীবিত মানুষের মধ্যে সম্ভব না।

ঘাড়টা কাঁধের সাথে একটা অসম্ভব কোণে হেলে আছে, ঘাড়ের হাড়গুলো যে মটকে কয়েক টুকরো হয়ে গেছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। 

তার নিষ্প্রাণ, ফ্যাকাশে মুখটার ওপর অবিশ্রান্ত ধারায় বৃষ্টির জল আছড়ে পড়ছে। আধখোলা, স্থির চোখদুটো যেন অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে কোনো এক না-বলা প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে।

মাথার পেছনের দিকটা কংক্রিটের সাথে যেখানে আছড়ে পড়েছে, সেখান থেকে গাঢ় লাল রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। অবিরাম বৃষ্টির তোড়ে জলের সাথে মিশে সেটা সঙ্গে সঙ্গে থকথকে ভাবটা হারিয়ে ফেলছে, তারপর সেটা একটা অপেক্ষাকৃত পাতলা, উজ্জ্বল লাল স্রোত তৈরি করছে। বৃষ্টির ফোঁটার আঘাতে তোড়ে সেই ধারাটা আবার চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে।

ছেলেটার ডান হাতের আঙুলগুলো আধো-মুঠি করা। পড়ার শেষ মুহূর্তে সে শূন্যে কিছু একটা খামচে ধরতে চেয়েছিল নাকি তার হাতে কিছু একটা শক্ত করে ধরা ছিল ?

টর্চের আলোটা হঠাৎ কেঁপে উঠল। সেটা স্পষ্ট হল ছাদের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেগুলোর মধ্যে একজন পিছিয়ে যাওয়া শুরু করতে। 

"যাঃ..." ছেলেটার গলা থেকে একটা অস্ফুট, কাঁপাকাঁপা শব্দ বেরিয়ে এল। ড্রেনপাইপ দিয়ে হুড়হুড় করে জল নামার শব্দ আর হাওয়ার আওয়াজের মধ্যে শব্দটা প্রায় হারিয়ে যাচ্ছিল। 

সে একটা শুকনো ঢোঁক গিলল, তার বুকটা হাপরের মতো ওঠানামা করছে। সে আরেকবার কার্নিশের কাছে গিয়ে নিচের দৃশ্যটা দেখার চেষ্টা করল।

এবার, তার হাত থেকে টর্চটা প্রায় খসে পড়ার উপক্রম হল।  

"ভাই... মালটার ঘাড়টা পুরো বেঁকে গেছে! মারা গেল নাকি রে!"

ছেলেটার গলাটা ভয়ে কাঁপছে।

"তোর কী মনে হয়...এত ওপর থেকে পড়লে আর কী হতে পারে ?"

যে উত্তর দিল তার গলাটা প্রথমজনের চেয়ে অনেক বেশি শান্ত।

দেখা গেল দ্বিতীয় ছায়ামূর্তিটা একটু এগিয়ে এসেছে। সে টর্চ ধরা প্রথম ছায়ামূর্তির হাতটা আলতো করে ধরে আলোটা বডির দিক থেকে সরিয়ে পাশের দেওয়ালে ফেলল।

"আলোটা নেভা। নিচে কেউ দেখে ফেললে অকারণে সিন ক্রিয়েট হবে।" এই অবস্থাতেও তার গলায় একটা অদ্ভুত কমান্ডিং টোন।

তারপর সে প্রথমজনকে সান্ত্বনা দিল।

"প্যানিক করিস না। যা হবার হয়ে গেছে।"

"কী বলছিস তুই! কাল সকালে ফর শিওর পুলিশ আসবে! এনকোয়ারি হবে! আমরা সবাই ফেঁসে যাব..."

আতঙ্কিত প্রথমজন এবার দু'হাতে নিজের ভেজা চুলগুলো খামচে ধরল।

এমন সময় পাশ থেকে আরেকটা ছায়ামূর্তি এক পা এগিয়ে এসে প্রথমজনের শার্টের কলারটা সজোরে খামচে ধরল।

"চুপ কর শালা ! একদম ঘ্যানঘ্যান করবি না! তোর সবেতেই বাড়াবাড়ি। ওই শুয়োরের বাচ্চাটা সব লিমিট ক্রস করে ফেলেছিল, ওর এটাই প্রাপ্য ছিল।" 

সে হিসহিস করে উঠল। তার গলার স্বরে মৃত ব্যক্তির প্রতি আক্রোশ ভর্তি।

"তোরা থামবি! এটা বাওয়াল করার টাইম নয়! ওর কলারটা ছেড়ে দে।" 

এবার, মোটা গলায় একজন ওদের সবাইকে ধমকে উঠল।

"পুলিশ এলে, আসবে। এটা সিম্পল সুইসাইড। আমরা কেউ এখানে ছিলাম না, আমরা কেউ কিছু জানি না। ব্যস।"

"কিন্তু... কিন্তু বডিটা? বডিটার কী হবে?" 

প্রথমজনের গলায় আবার আর্তনাদ ফুটে উঠল।

"কীভাবে ম্যানেজ করবি কিছু ভেবেছিস ?"

 দ্বিতীয়জনের থেকে প্রশ্নটা ধেয়ে এল।

"আমরা কিছু করব না, যা করার দত্ত করবে। তোরা শুধু খেয়াল রাখ, পেনড্রাইভটা আমাদের জায়গা মতো পৌঁছে দিতে হবে। ওর ল্যাপটপটা ফরম্যাট করে ফেলেছিস তো ?"

যে উত্তর দিল তার গলাটা একদম সমতল, আবেগহীন এবং বরফের মতো ঠান্ডা। যেন একটু আগে ঘটে যাওয়া ঘটনাটা তার কাছে একটা খুব তুচ্ছ ব্যাপার।
এমন সময়...

ছলাত !

বৃষ্টির একটানা শব্দের মধ্যে একটা খুব সূক্ষ্ম, কিন্তু স্পষ্ট শব্দ ওদের কান এল। শব্দটা ওদের পেছন থেকে, অর্থাৎ ছাদের সিঁড়ির দরজার দিক থেকে এল।

ছাদের জমাট বাঁধা জলের ওপর একটা ভারী জুতোর পা পড়ার শব্দ।

সবকটা ছায়ামূর্তি এক লহমায় পাথরের মতো জমে গেল। প্রথম ছেলেটার হাতের টর্চটা আবার জ্বলে উঠল আর সেটা সোজা ঘুরে গেল ওই দরজার দিকে।

সিঁড়ির ঘরের ওই অন্ধকার, আবছা আয়তক্ষেত্রাকার ফ্রেমে একটা দীর্ঘ, অস্পষ্ট অবয়ব দাঁড়িয়ে আছে।

টর্চের আলোটা সরাসরি লোকটার মুখের ওপর পড়ল না, পড়ল তার গলা থেকে বুক অবধি। 

লোকটার পরনে একটা ডার্ক কালারের রেইনকোট, যেটার ওপর দিয়ে বৃষ্টির জল গড়িয়ে পড়ছে, মুখটা সম্পূর্ণ অন্ধকারে ঢাকা। শুধু হাতে ধরা একটা আধ-খাওয়া সিগারেটের জ্বলন্ত লাল বিন্দুটা অন্ধকারের মধ্যে জ্বলজ্বল করছে।

তার উপস্থিতিটা এতটাই ভারী যে ছাদের খোলা হাওয়ার মধ্যেও ছেলেগুলোর মনে হলো তাদের দমবন্ধ হয়ে আসছে। নিকষ অন্ধকারে দুর্যোগের রাতে এরকম অবস্থায় একটা অচেনা লোকের মুখোমুখি হলে অনেক কিছু ঘটতে পারে।

লোকটা এক পা এক পা করে ওদের দিকে এগিয়ে আসতে থাকল। জলের ওপর ভারী জুতোর শব্দ হচ্ছিল। 

যে ছেলেটা খিস্তি দিয়েছিল, তার গলা দিয়ে একটা শুকনো ঢোঁক গেলার শব্দ হলো। প্রথম ছেলেটার হাত থেকে টর্চের আলোটা ছিটকে নিচে পড়ে গেল। তার হাতের মুঠো কখন শিথিল হয়ে গেছে সে টের পায়নি। আলোটা নিভে গিয়ে ছাদটা একটা নিশ্ছিদ্র অন্ধকারে ডুবে গেল।

কয়েক সেকেন্ডের একটা দমবন্ধ করা নিস্তব্ধতা। চারপাশে শুধু বৃষ্টির আওয়াজ।

এমন সময় ঠাণ্ডা গলার মালিক ফিসফিস করে, একটা সমীহ মেশানো গলায় বলে উঠল,

"স্যার... আপনি এখানে?"

লোকটা কোন উত্তর না দিয়ে কার্নিশের ধারে এসে নিচের দিকে তাকাল।

"স্যা...স্যার" প্রথম ছেলেটা তোতলে উঠল।

লোকটা সিগারেটে একটা লম্বা টান দিল। তারপর অত্যন্ত শান্ত, ভাবলেশহীন গলায় বলল, "বডিটা ওইভাবেই পড়ে থাক। আমি ঠিক সময়ে সিকিউরিটিকে দিয়ে পুলিশকে কল করাব। তোমরা পেছনের সিঁড়ি দিয়ে নিজের নিজের রুমে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ো। কাল সকালে পুলিশ এলে যেন তোমাদের চোখেমুখে ঘুমের রেশ থাকে।"

ছায়ামূর্তিগুলো শুধু ঘাড় নাড়ল, যদিও অন্ধকারে সেটা দেখা গেল না। আস্তে আস্তে ছায়ামূর্তিগুলো কার্নিশ থেকে সরে শুরু করল। তারা মাথা নিচু করে, ওই দীর্ঘ ছায়ামূর্তিটার পাশ কাটিয়ে, সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে গেল। যাবার আগে অবশ্য ওরা টর্চটা কুড়িয়ে নিয়ে যেতে ভুলল না।

ওদিকে নিচে, ছেলেটার মাথা থেকে বেরোতে থাকা রক্তের স্রোত বৃষ্টির জলের তোড়ে ধুয়ে যাচ্ছিল।

ছাদের ওপর তখন শুধু সেই রেইনকোট পরা লোকটা একা দাঁড়িয়ে। সে ধীরে ধীরে কার্নিশের দিকে এগিয়ে গেল। নিচের অন্ধকারের দিকে একবার তাকাল, সেখানে বৃষ্টির জলে একটা তরতাজা প্রাণের শেষ চিহ্নগুলো ধুয়ে যাচ্ছে।

সে পকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে ধরাল। লাইটারের ক্ষণস্থায়ী আলোয় তার মুখের একটা পাশ কেবল এক সেকেন্ডের জন্য আলোকিত হয়ে আবার অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।

বর্তমান সময়

সকালের নরম, মিঠে রোদ ডর্মের জানলার কাঁচ গলে ঘরের ভেতরে এসে পড়ছে।

সেই আলোয় বাথরুমের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের মুখটা দেখছে অয়ন। তার খালি গা, পরনে শুধু একটা ট্র্যাকপ্যান্ট। ট্যাপ থেকে বেসিনে সরু ধারায় জল পড়ছে, জল পড়ার একটানা শব্দ ছাড়া বাথরুমের ভেতর আর কোনো আওয়াজ নেই।

পরশুদিন রাতে বক্সিং রিংয়ে বিকাশের সলিড জ্যাবগুলো তার ডান চোখের নীচে আর বাঁ গালে যে জায়গাগুলোতে আছড়ে পড়েছিল, সেই জায়গাগুলোতে কালচে-নীল কালশিটে দাগ বসে গেছে। নাকে একটা নাসাল স্ট্রিপ পরানো আছে। শ্বাস নিতে গেলে নাক আর পাঁজর দু জায়গাতেই, ব্যথা ভালোই টের পাওয়া যাচ্ছে। ভাগ্য ভালো যে নাকটা ভেঙে যায়নি। নিচের ঠোঁটের ডানদিকটা ফেটে কিছুটা ফুলে আছে, কাল সকাল অবধি ওখানটায় শুকিয়ে যাওয়া রক্তের একটা কালচে আস্তরণ লেগেছিল। কপালের একপাশে চামড়া ছড়ে গেছে। শার্টহীন অবস্থায় পাঁজরের কাছে, কাঁধের কাছে যেখানে যেখানে বিকাশের পাঞ্চগুলো এসে তার উপর পড়েছিল সেখানে সেখানে লালচে দাগ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। 

সারা শরীর জুড়ে একটা অবশ করা ভোঁতা ব্যথা; পেশিগুলো আড়ষ্ট হয়ে আছে, নড়তে-চড়তে গেলেও কষ্ট হচ্ছে। যেন তাদের উপর প্রচণ্ড ধকল গিয়েছে, অমানুষিক পরিশ্রম করানো হয়েছে। 

কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, শরীরের এই নিদারুণ যন্ত্রণার সম্পূর্ণ বিপরীতে তার মাথার ভেতরটা অদ্ভুতভাবে শান্ত, ঠিক যেন কোনো গভীর হ্রদের স্থির, নিস্তরঙ্গ জল।

অয়ন একটা তুলোয় অ্যান্টিসেপ্টিক মলম লাগিয়ে খুব সন্তর্পণে নিজের ফাটা ঠোঁটের ওপর ছোঁয়াল। সঙ্গে সঙ্গে জায়গাটা তীব্র জ্বালা করে উঠল ঠিকই, কিন্তু সে ব্যথায় মুখ বিকৃত করল না।

গতকাল সারাটা দিন সে একরকম বিছানাতেই কাটিয়েছে। শরীরের এই অবস্থায় ফুটবল মাঠে যাবার প্রশ্নই ওঠে না, সেখানে শের সিংয়ের বক্সিং ক্লাব তো কোন ছাড়। কোচ সেনগুপ্তকে সে একটা টেক্সট করে জানিয়ে দিয়েছিল, 'বাথরুমে স্লিপ করে পড়ে গিয়েছিলাম স্যার। মুখে আর পাঁজরে একটু চোট লেগেছে। আজ মাঠে যেতে পারব না।' 

কোচ সঙ্গে সঙ্গে ফিরতি মেসেজে তাকে রিপ্লাই করেছিলেন, 'ইটস্ ওকে। টেক রেস্ট। কাল ডক্টরকে দেখিয়ে নিও।' 

গতকাল সকালে ওয়াশরুমে অয়ন যখন অ্যান্টিসেপ্টিক মলম নিয়ে ধীরেসুস্থে নিজের ফাটা ঠোঁটের ওপর লাগাচ্ছিল সেই সময় ওয়াশরুমের অর্ধেক খোলা দরজা দিয়ে উঁকি মেরেছিল রনি। সে তখন ব্রাশ হাতে নিয়ে রুমের ভেতরে ঢুকতে যাচ্ছিল, কিন্তু আয়নার সামনে অয়নের ওই চেহারাটা চোখে পড়ায় সে ভূত দেখার মতো চমকে ওঠে।

পায়ের শব্দ পেয়ে ঠিক সেইসময় অয়ন পিছন দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে রনির দিকে ফিরে তাকিয়েছিল। অয়নের ক্ষতবিক্ষত মুখ, তার সম্পূর্ণ আবেগহীন, হিমশীতল চোখের চাউনি দেখে রনি আক্ষরিক অর্থেই ভয়ে শিউরে উঠেছিল। 

তার হাত থেকে ব্রাশটা প্রায় খসে পড়ার উপক্রম হয়েছিল। অয়ন প্রায় দিন সন্ধ্যাবেলা কোথায় বেরিয়ে যায় আর কী করে রাত্রিবেলা হোস্টেলে ফেরে, সেটা ভেবেই সঙ্গে সঙ্গে ওর শিরদাঁড়া দিয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত নেমে গেছিল। একটা কথাও না বলে সে ভয়ে ছিটকে সেখান থেকে দৌড়ে পালিয়ে গিয়েছিল।

কথাটা মনে করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে অয়ন মলমের টিউবটা বন্ধ করে বেসিনের ওপর রাখল। ফেস্টের রাতের পর থেকে ওর মাথার ভেতরটা একটা জ্বলন্ত চুল্লির মতো হয়ে ছিল। মায়ের প্রতি এক অদ্ভুত, নিষিদ্ধ আকর্ষণের জন্য, যার কারণ সম্পর্কে সে নিজেও পুরোপুরি নিশ্চিত নয়, অয়ন বাড়ি থেকে এক প্রকার পালিয়ে আসে। 

কিন্তু, এখানে এসেও নিজের মায়ের প্রতি তার সেই নিষিদ্ধ আকর্ষণ একটুও কমেনি। যেজন্য অয়ন দিনের পর দিন ভয়ংকর অপরাধবোধে ভুগেছে। 

যার নিট ফলাফল হল প্রচণ্ড মানসিক অস্থিরতা। তবু এসব হয়তো সামলে নেওয়া যেত। কিন্তু, যাকে এড়ানোর জন্য এখানে আসা, সে নিজেই একদিন এখানে এসে হাজির হল।

সেদিনের পর থেকে যা যা ঘটেছে তাতে অয়নের জীবন পুরোপুরি ঘেঁটে গেছে।

সে আশা করেনি বিদিশা তাকে ক্যাম্পাসে সম্পূর্ণ অচেনা মানুষ হিসেবে ট্রিট করবেন, সে আশা করেনি বিক্রম তার মাকে নিয়ে ওইরকম একটা নোংরা পরিকল্পনা বানাবে। আর, সেই বিষয়ে সাবধান করতে গেলে তার মা যে তাকে অপমান করে নিজের অফিস থেকে বের করে দেবে এটা তো ওর কল্পনার অতীত ছিল। আর, সবশেষে ফেস্টের রাতে হাজারটা চোখের সামনে তার গালে বিদিশার ওই চড়!

পুরোনো স্মৃতিগুলো আবার একসঙ্গে ভিড় করে এলেও আজকে অয়নের মনটা বরাবরের মতো চঞ্চল হয়ে উঠল না। গতকাল থেকেই তার মনটা এক অদ্ভুত স্তব্ধতায় আচ্ছন্ন। আজকেও অতীত স্মৃতির কোলাহল তার মনে চিন্তার ঝড় তুলতে ব্যর্থ হল। শূন্যতার এই অনুভূতিটা মোটেও যন্ত্রণাদায়ক নয়, বরং আরামদায়ক। সে চায় তার মনটা এবার থেকে এমনই থাকুক। 

আজ অনেকদিন পর আবার ওর মাঠে নেমে যেতে ইচ্ছে করছে। অন্য কোন কারণে নয়, শুধুই ফুটবল খেলার জন্য। 

যদিও শরীরের এই অবস্থায় সেটা সম্ভব নয়। শরীরের এখন কী অবস্থা জানার জন্য আজ ওকে একবার ওকে ডাক্তারের কাছে যেতেই হবে।

অয়ন খুব সাবধানে ওর মুখে যেখানে যেখানে চোট লেগেছে সেই অংশগুলো বাদ দিয়ে, ঠাণ্ডা জলে মুখের অবশিষ্ট অংশগুলো ভাল করে ধুয়ে তোয়ালে দিয়ে আলতো করে মুখ মুছে নিল। তারপর, আয়নায় মুখের দিকে আরেকবার তাকিয়ে সে একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল। 

এই নীরবতাটুকু ওর ভীষণ প্রয়োজন ছিল।

প্রচণ্ড মানসিক আঘাত পেলে মানুষ শকে চলে যায়। অয়নের সাথেও সেটাই ঘটেছিল। ওর গোটা জগতের একটা বড় অংশ জুড়ে ছিল ওর মা আর ফেস্টের রাতে সেই জগতটা ওলটপালট হয়ে যাওয়াতে সে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে।

সারাদিন ধরে ডর্মের ঘরে বসে থাকা, স্বেচ্ছায় পড়াশোনা বন্ধ করে দেওয়া, জীবনের প্রতি সমস্ত রকম উৎসাহ হারিয়ে ফেলা, এগুলো আসলে উপসর্গ মাত্র। বাস্তবে সেই অবস্থায় অয়নের পক্ষে বিক্রমের উপর প্রতিশোধ নেওয়া কোনমতেই সম্ভব ছিল না।

অয়নের চারপাশে ওর এমন কোন শুভাকাঙ্খী ছিল না, যে আসল রোগটা ধরতে সক্ষম।

সেদিন কোচ সেনগুপ্ত ঠেলে অয়নকে দোজোতে না পাঠালে এতদিনে সে হয়তো মানসিক অবসাদের এক অতল গহ্বরে তলিয়ে যেত। 

দোজোতে যাওয়ার জন্য নিয়মিত হোস্টেলের বাইরে বেরোনো, সেই সূত্রে রৌণকের সঙ্গে দেখা হওয়া, বক্সিং-ক্লাবে বিকাশের সঙ্গে ফাইট এসবই শাপে বরের কাজ করেছে।

এসব বোঝার মতো আত্ম-সচেতনতা অয়নের মধ্যে এখনও অবধি তৈরি না হলেও অবচেতনে সে এই অন্ধকার কাটিয়ে বেরিয়ে আসার জন্য হাঁসফাঁস করছিল।
সেজন্যই সে একটা আউটলেট খুঁজছিল আর সেটাই তাকে আপাত অচেনা রৌণকের ডাকে সাড়া দিতে বাধ্য করে।

অয়ন আজও সম্পূর্ণ বিপন্মুক্ত নয় কিন্তু সে একটু হলেও স্বাভাবিক হচ্ছে। ফুটবল খেলার আকাঙ্খার পুনর্জাগরণ সেটাই প্রমাণ করে।

সেমিনার ডে: সকাল দশটা। মেইন অডিটোরিয়াম।

আজ ন্যাশনাল লেভেল ম্যাথ সিম্পোজিয়ামের গ্র্যান্ড ওপেনিং।

পুরো অডিটোরিয়াম চত্বরটায় উৎসবের মেজাজ। তবে, এখানে কালচারাল ফেস্টের সেই উদ্দাম পরিবেশ একদমই নেই।

মেইন গেট থেকে শুরু করে অডিটোরিয়ামের প্রবেশদ্বার পর্যন্ত লাল কার্পেট বিছানো। দু-পাশে সারি সারি রজনীগন্ধা আর গ্ল্যাডিওলাসের স্ট্যান্ড। 

অডিটোরিয়ামের ভেতরে গমগম করছে ডেলিগেট আর অতিথিদের ভিড়। সেখানে উপস্থিত কানপুর, খড়গপুর আইআইটি এবং আইআইএসসি ব্যাঙ্গালোর থেকে আসা দেশের প্রথম সারির গণিতজ্ঞ এবং স্কলাররা।

অডিটোরিয়ামের বাকি সিটগুলো কলেজের বিভিন্ন ডিপার্টমেন্টের ফ্যাকাল্টি, রিসার্চ স্কলার এবং স্টুডেন্টদের ভিড়ে কানায় কানায় পূর্ণ।

স্টেজের ওপরের বিশাল নীল মখমলের ব্যাকড্রপে সোনালি অক্ষরে জ্বলজ্বল করছে- 'Calculus: The Language of the Universe'। স্টেজের লাইটিং, সাউন্ড সিস্টেম, ডেকোরেশন, সবকিছু একেবারে নিখুঁত। কোথাও কোন ত্রুটির লেশমাত্র নেই।

আর এই পুরো মেগাইভেন্টের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন একজন নারী। মিস বিদিশা গাঙ্গুলি।

আজ তিনি পরেছেন একটা ক্লাসি, ডিপ নেভি-ব্লু রঙের সিল্কের শাড়ি, যার পাড়ে সরু রুপোলি কাজ। ব্লাউজটা অত্যন্ত মার্জিত, কনুই অবধি হাতা। চুলগুলো একটা নিটোল ফ্রেঞ্চ রোলে বাঁধা, গলায় একটা সরু প্লাটিনামের চেন, চোখে হালকা কাজল আর ঠোঁটে ম্যাট নুড লিপস্টিক। তাকে আজ দেখে মনে হচ্ছে কোনো কর্পোরেট সংস্থার দক্ষ এবং আত্মবিশ্বাসী পদাধিকারী। 

হবেই না বা কেন ?

তিনি অসম্ভবকে সম্ভব করে দেখিয়েছেন যে। বিদিশার চোখেমুখে ক্লান্তির লেশমাত্র নেই, বরং নির্ভেজাল আনন্দ এবং সাফল্যের দীপ্তি তার পুরো মুখশ্রীকে উদ্ভাসিত করে রেখেছে। হাতে একটা ট্যাবলেট নিয়ে তিনি একদিক থেকে অন্যদিকে নির্দেশ দিচ্ছেন, মাইকের সাউন্ড চেক করাচ্ছেন, ডেলিগেটদের সাথে হাসিমুখে কুশল বিনিময় করছেন।

প্রিন্সিপাল সান্যাল একটু আগেই স্টেজে উঠে হাসি মুখে বিদিশার ভূয়সী প্রশংসা করে গেছেন। এটা তারও জয়, তিনিই ভরসা করে বিদিশাকে দায়িত্বটা দিয়েছিলেন।

ম্যাথ ডিপার্টমেন্টের অন্য ফ্যাকাল্টিরা আজ বিদিশার ছায়ায় ঢাকা পড়ে গেছেন। এমনকি ম্যাথ ডিপার্টমেন্টের সবচেয়ে সিনিয়র এবং খিটখিটে প্রফেসর ঘোষও আজ বিদিশার দিকে তাকিয়ে সন্তুষ্ট হয়ে একবার মাথা নেড়েছেন। গেস্টরা নিখুঁত আয়োজনের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করছেন। যেসব ফ্যাকাল্টিরা আড়ালে এতদিন বিদিশাকে একজন 'নতুন আসা রূপসী টিচার' বলে তাচ্ছিল্য করত, তারা আজ বিদিশার এই লিডারশিপ আর ম্যানেজমেন্ট স্কিল দেখে হতবাক। তাদের মুখে কথা সরছে না।

এর মধ্যেই একটু আগে রাহুল বোস ভিড় ঠেলে বিদিশার কাছে এসেছিলেন। তার পরনে একটা ছাই-রঙা ব্লেজার।

"মেনি কনগ্র্যাচুলেশনস, মিস কো-অর্ডিনেটর," রাহুল একটা স্নিগ্ধ হাসি দিয়ে বিদিশার সামনে এসে দাঁড়ালেন। 

"আপনার এই রাজকীয় আয়োজনের সামনে তো সাহিত্যের কোনো শব্দই আজ যুৎসই মনে হচ্ছে না। আপনি তো দেখছি আজকে একার হাতে একটা আস্ত সাম্রাজ্য শাসন করছেন।"

রাহুলের গলায় সেই চেনা রসবোধ।

উত্তরে বিদিশা একটা ঝলমলে হাসি উপহার দিয়ে বলেছিলেন, 

"থ্যাংক ইউ মিস্টার বোস। তবে একার হাতে নয়, আমার গোটা ভলান্টিয়ার টিম, বিশেষ করে সাহিল খুব খেটেছে। আর, সাম্রাজ্য সামলানো সোজা নয়, গত আটচল্লিশ ঘণ্টায় আমার যা স্ট্রেস গেছে, সেটা আমিই জানি!"

"কিন্তু আপনার চেহারায় তো সেই স্ট্রেসের কোনো ছাপ নেই। ইউ লুক অ্যাবসলুটলি স্টানিং অ্যান্ড ইন কন্ট্রোল।" 

কথাটা বলে রাহুল মুচকি হেসে নিজের সিটে ফিরে গিয়েছিলেন।

বিদিশা আবার নিজের ফাইলে চোখ রাখলেন। তার বুকের ভেতরটা আজ গর্বে ফুলে উঠেছে। ডক্টর বাগচী আর সুব্রত সেনের নোংরা ষড়যন্ত্রকে তিনি যেভাবে নস্যাৎ করে দিয়েছেন, সেটা তার আত্মবিশ্বাসকে তুঙ্গে পৌঁছে দিয়েছে।

কিন্তু এই পুরো অডিটোরিয়ামের একটা অন্ধকার কোণায়, পিলারের আড়ালে দাঁড়িয়ে আছে একজন, যার এখানে আজ কোনোভাবেই থাকার কথা ছিল না।

বিক্রম মালহোত্রা।

সম্ভব হলে সে আজকে কলেজের ত্রিসীমানায় আসত না। কিন্তু সুব্রত সেনের হাত ধরে এই সেমিনারের পার্ট হওয়ার পর, তাকে আজ আসতেই হতো। নইলে স্টুডেন্ট কাউন্সিলের ট্রেজারার হিসেবে তার নিজের ইমেজটাই নষ্ট হতো।

তবে, সে আজ যথাসম্ভব বিদিশাকে এড়িয়ে চলছে। সবসময় আড়ালে আড়ালে থাকছে যাতে তাকে তিনি দেখতে না পান। বিক্রমের বুকের ভেতর একটা অজানা আতঙ্ক দলা পাকিয়ে আছে।

To be continued...
[+] 6 users Like RockyKabir's post
Like Reply
Do not mention / post any under age /rape content. If found Please use REPORT button.
(ফ্ল্যাশব্যাক: আগের দিন সকাল)

প্ল্যান অনুযায়ী, বিক্রম গতকাল সকালে অত্যন্ত ফুরফুরে মেজাজে কলেজে এসেছিল। সে আশা করেছিল, কলেজে এসে সে একটা ছন্নছাড়া অবস্থা দেখবে। 

ভেন্ডাররা কাজ বন্ধ করে চলে গেছে, ডেকোরেশনের অর্ধেক খোলা হয়ে গেছে, স্টেজ ফাঁকা, প্রিন্সিপাল বিদিশাকে চরমভাবে অপমান করেছেন আর বিদিশা নিজের কেবিনে বসে অসহায়ভাবে কাঁদছেন।

সে ভেবেছিল, ঠিক সেই মুহূর্তে সে বিদিশার কেবিনে ঢুকবে এবং স্টুডেন্ট কাউন্সিলের এমার্জেন্সি ফান্ডের কথা বলে তাকে উদ্ধার করবে। কিন্তু, মেইন অডিটোরিয়ামের সামনে পৌঁছোতেই বিক্রমের পায়ের তলা থেকে মাটি সরে গিয়েছিল।

একি !

ভিতরে পূর্ণগতিতে কাজ চলছে। ফ্লোরাল ডেকোরেশনের লোক ফুল সাজাচ্ছে, স্পিকারদের ডায়াস বসানো হচ্ছে, লাইটিংয়ের ফোকাস চেক করা হচ্ছে, লাইটিংয়ের টেকনিশিয়ানরা ট্রাসে লাইট ফিক্স করছে। সবকিছু একটা ওয়েল-অয়েল্ড মেশিনের মতো চলছে।

ভেন্ডারদের কেউ চলে তো যায়ইনি, উল্টে ডবল স্পিডে কাজ করছে!

বিক্রম হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। কীভাবে সম্ভব? টাকা এল কোত্থেকে? সুব্রত সেন তো ফান্ড আটকে দিয়েছিলেন! 

ঠিক সেই সময় পেছন থেকে একটা তার পরিচিত গলা ভেসে এসেছিল।

"তুমি এখানে কী করছ, বিক্রম?"

বিক্রম চমকে ঘুরে দাঁড়িয়েছিল। বিদিশা গাঙ্গুলি। তার পরনে একটা সুতির শাড়ি, চোখে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি।

"ম্যাম... মানে... আমি..." সাজানো স্ক্রিপ্ট পুরো ঘেঁটে যাওয়াতে বিক্রমের মতো ধূর্ত ছেলের গলা দিয়েও কথা বেরোতে চাইছিল না। সে তখনও এই ধাক্কাটা সামলে উঠতে পারেনি।

"তোমার তো আজ আসার কথা ছিল না। স্পনসরশিপের ফাইন্যান্সিয়াল কাজগুলো তো শেষ", বিদিশা চোখ সরু করে ওর দিকে তাকিয়েছিলেন। তার গলায় একটা সন্দিগ্ধ ভাব।

বিক্রম থতমত খেয়ে গিয়েছিল। তার সহজাত কনফিডেন্স এক লহমায় উধাও হয়ে গিয়েছিল।

"ম্যা-ম্যাম... আমি... আমি আসলে শুনেছিলাম কাজ নাকি বন্ধ হয়ে গেছে... মানে ফান্ডিংয়ের কোনো ইস্যু হয়েছে... তাই ছুটে এলাম যদি কোনো হেল্প করতে পারি..." বিক্রম তোতলেছিল।

বিদিশার চোখদুটো এক সেকেন্ডের জন্য সরু হয়ে গিয়েছিল।

"আমি সামলে নিয়েছি," বিদিশা ঠান্ডা গলায় উত্তর দিয়েছিলেন। 

"কিন্তু ফান্ডিংয়ের ইস্যু হওয়ার কথা তুমি কীভাবে জানলে? এই ইনফরমেশন তো শুধু আমি, সাহিল আর অ্যাকাউন্টস ডিপার্টমেন্ট ছাড়া আর কেউ জানে না।" 

কথাটা বলে ফেলেই বিক্রম বুঝতে পেরেছিল সে একটা বড়সড় ভুল করে ফেলেছে। শিকার করতে এসে তার নিজেরই শিকারে পরিণত হবার মতো অবস্থা।

"ম্যাম, আমি আসলে স্টুডেন্ট কাউন্সিলের এক বন্ধুর কাছ থেকে শুনলাম যে অডিটোরিয়ামের কাজ নাকি ফান্ডের জন্য বন্ধ হয়ে গেছে। তাই... তাই আমি ছুটে এলাম। যদি কোনো হেল্প লাগে..."

বিক্রম একটা ডাহা মিথ্যে বলে কোনমতে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেছিল আর মনে মনে প্রার্থনা করছিল বিদিশা যেন সেটা বিশ্বাস করে নেন।

বিদিশা তার চোখের দিকে কয়েক সেকেন্ড স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলেন। বিক্রমের মনে হচ্ছিল সেসময় বিদিশার দৃষ্টি যেন ওর মনের ভেতরটা পড়ে নিচ্ছিল।

"আই সি," বিদিশা আর কিছু বলেননি। তিনি ফাইলটা হাতে নিয়ে সোজা অডিটোরিয়ামের ভেতরে চলে গিয়েছিলেন।

বিদিশা আর কোনো প্রশ্ন করেননি। তিনি ভেবেছিলেন সাহিলই হয়তো বন্ধুদের কাউকে গল্প করেছে কাজ বন্ধ হওয়ার ব্যাপারটা। সুব্রত সেনের বিষয়টা তার মাথা থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল।

কিন্তু বিক্রম সেখানেই পাথরের মতো দাঁড়িয়ে ছিল। তার মেরুদণ্ড বেয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত নেমে গিয়েছিল। সে বুঝতে পেরেছিল, সে একটা বড় বিপদে পড়তে চলেছে।

(বর্তমান সময়)

পিলারের আড়ালে দাঁড়িয়ে বিক্রম বিদিশার দিকে আড়চোখে তাকাল। দূর থেকে নেভি-ব্লু সিল্কের রাজকীয় ছটায় বিদিশাকে দেখে ওর হাতের মুঠোটা রাগে শক্ত হয়ে উঠল। 

কিন্তু, আজকে বিক্রমের রাগের লক্ষ্য বিদিশা নন।

সেদিন ওর নিজের সিক্সথ সেন্স একদম সঠিক ছিল, সুব্রত সেন বড্ড বেশি হঠকারী সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিল। লোকটার কোনো লং-টার্ম ভিশন বা প্ল্যান ছিল না, স্রেফ সাময়িক আক্রোশ মেটাতে গিয়ে একটা সুইসাইডাল মুভ খেলে বসেছিল। 

বিক্রম ঠান্ডা মাথায় হিসেব করে দেখল, যদি সত্যিই ফান্ডের অভাবে সিম্পোজিয়ামটা ভেস্তে যেত, তবে কলেজ ম্যানেজমেন্ট নিশ্চিতভাবেই একটা হাই-লেভেল এনকোয়ারি কমিটি বসাত। আর সেই তদন্ত শুরু হলে, অফিশিয়াল ট্রেইল ধরে সবার আগে ফাঁসতেন খোদ সুব্রত সেন নিজে!

সেক্ষেত্রে সুব্রত সেনের চাকরি তো যেতই, সাথে ব্যাকএন্ডের ডিলিংয়ের সূত্র ধরে বিক্রমের ওপরেও টান পড়তো। 'শালা মালটা নিজে তো ফাঁসতই সঙ্গে আমারও বারোটা বাজাতো,' বিক্রম মনে মনে ভাবল। 

বিদিশা ইভেন্টটা নামিয়ে দেওয়ায় একদিক থেকে বিক্রম বেঁচে গেছে। এই মুহূর্তে অবশ্য বিদিশা নয়, তার দরকার প্রফেসর সুব্রত সেনকে। সে একবার প্রফেসর সেনের সাথে বোঝাপড়া করতে চায়।


দুপুর দুটো। লাইব্রেরি বিল্ডিং, রেফারেন্স সেকশন।

অডিটোরিয়ামের জাঁকজমক, মাইক্রোফোনের গমগমে আওয়াজ আর মানুষের কোলাহল থেকে অনেক দূরে, লাইব্রেরি বিল্ডিংয়ের রেফারেন্স সেকশনটা বরাবরের মতোই নীরবতায় ডুবে আছে। 

সোনালি রোদ মেহগনি কাঠের বুকশেলফগুলোর ফাঁক দিয়ে এসে লম্বা টেবিলটায় পড়েছে। বাতাসে পুরোনো বইয়ের সেই নিজস্ব চেনা গন্ধ।

লাইব্রেরির এই রেফারেন্স সেকশনটা দেখলে মনে হয় এটা যেন একটা আলাদা গ্রহ। জায়গাটা সবসময় নিস্তব্ধতায় ডুবে থাকে।
 
অয়ন জানলার ধারের নির্দিষ্ট টেবিলটায় বসে আছে। পরনে একটা ধূসর রঙের শার্ট। সমস্ত শরীর ব্যথায় টনটন করলেও, ওর মনটা লাইব্রেরির মতোই শান্ত, নিস্তব্ধ।

কোচের কথামতো সে আজ ডাক্তার দেখাতে গিয়েছিল। তার ক্ষতগুলো দেখে ডাক্তারবাবু ভুরু কুঁচকেছিলেন। 

"পড়ে গিয়ে তো এরকম চোট লাগার কথা নয়। মাসলে হেমাটোমা হয়েছে। আগামী এক সপ্তাহ কোনরকম ফিজিক্যাল কন্ট্যাক্ট স্পোর্টস নয়। অ্যান্টিবায়োটিক আর পেনকিলার লিখে দিচ্ছি, ঘরে বসে চুপচাপ রেস্ট নেবে।"

এমন সময় ওর চিন্তার ব্যাঘাত ঘটিয়ে জুতোর মৃদু শব্দ তুলে ঋতুপর্ণা এসে টেবিলের উল্টোদিকে বসল। আজ তার পরনে একটা হালকা হলুদ রঙের সুতির কুর্তি, চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা। হাতে মোটা ক্যালকুলাসের বই আর খাতা। বসার সাথে সাথেই তার চোখ চলে গেল অয়নের মুখের দিকে। 

ওর ঠোঁটের কাটার দাগ আর গালের কালশিটেগুলো দেখে ঋতুপর্ণার কপালে কয়েক সেকেন্ডের জন্য একটা সূক্ষ্ম ভাঁজ পড়ল আর সঙ্গে সঙ্গে সেটা মিলিয়েও গেল।

সে মনে মনে ভাবল, 'বড়লোকের বখে যাওয়া গুন্ডা ছেলে। নিশ্চয়ই কাল রাতে বারে বা রাস্তায় কারোর সাথে বস্তির ছেলেদের মতো মারপিট করে মুখ ফাটিয়ে এসেছে। এরাই ক্যাম্পাসের পরিবেশটা নষ্ট করে।'

অয়ন কোথায় কী করে এসেছে, কার সাথে মারপিট করেছে, এতে তার বিন্দুমাত্র কোনো ইন্টারেস্ট নেই। It is none of her business. সে এখানে শুধু মিস্টার দাসের নির্দেশে এসেছে।

"অ্যাডভান্সড ক্যালকুলাসের ভলিউম টু-টা বের করো", সে অত্যন্ত নিস্পৃহ গলায় বলল। 

কোনো ব্যক্তিগত প্রশ্ন নয়, কোনো কৌতূহল নয়, কোন সিমপ্যাথি নয়। অয়ন ঋতুপর্ণার এই নির্লিপ্ত অ্যাটিটিউড দেখে মনে মনে একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল। 

অয়ন চুপচাপ বইটা নিজের দিকে টেনে নিল।

"আজকের টপিকটা মাল্টিপল ইন্টিগ্রালস," ঋতুপর্ণা পেন দিয়ে একটা বেশ বড় এবং জটিল ইকুয়েশন খাতায় লিখে দিল। 

"এটা সলভ করতে গেলে তোমাকে প্রথমে লিমিটগুলো সেট করতে হবে, তারপর চেইন রুল অ্যাপ্লাই করে..."

ঋতুপর্ণা চিরাচরিত নিয়ম মেনে করা পাতা জোড়া একটা সলিউশনের স্টেপস বোঝাতে শুরু করল।

অয়ন খাতার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল। আজ তার মাথাটা আশ্চর্যরকম ক্লিয়ার। তার ব্রেন কোনররকম ডিস্ট্র্যাকশন ছাড়াই কাজ করছে। ইকুয়েশনের নাম্বারগুলো ওর চোখের সামনে ভাসতে শুরু করল। সে ঋতুপর্ণার কথা শুনল ঠিকই, কিন্তু তার মস্তিষ্ক ওই এক পাতার লম্বা ক্যালকুলেশনের তোয়াক্কা করল না।

অয়ন হাত বাড়িয়ে ঋতুপর্ণার হাত থেকে পেনটা নিল।

"লিমিটটা চেঞ্জ করার দরকার নেই" অয়ন অত্যন্ত শান্ত গলায় বলল।

তারপর সে খাতায় পেন ঠেকিয়ে, চিরাচরিত চেইন রুল বা সাবস্টিটিউশন মেথড সম্পূর্ণ ইগনোর করে, নিজের মাথায় তৈরি করা একটা অদ্ভুত, আউট-অফ-দ্য-বক্স শর্টকাট নিয়মে মাত্র দুটো লাইনে ইকুয়েশনটা নামিয়ে দিল।

"হয়ে গেছে", অয়ন পেনটা খাতার ওপর রেখে দিল।

ঋতুপর্ণা ভুরু কুঁচকে খাতাটার দিকে তাকাল। 

এত তাড়াতাড়ি হয়ে গেল ?

ওর প্রথম ভাবনা ছিল, ছেলেটা নির্ঘাত হাবিজাবি কিছু একটা লিখেছে। কিন্তু সে যখন খাতার ওই লাইন দুটোর দিকে ভালো করে নজর দিল, তার চোখদুটো চশমার কাঁচের ভেতর দিয়ে সামান্য বড় বড় হয়ে গেল। তারপর, কপালের ভাঁজটা একটু গভীর হলো। সে নিজের চশমাটা আঙুল দিয়ে একটু ঠেলে উপরে পাঠিয়ে ইকুয়েশনটার দিকে আবার ভাল করে তাকাল।

ঋতুপর্ণা মনে মনে ইকুয়েশনটা ট্রেস করতে শুরু করল। ছেলেটা কোনো ফর্মুলা ফলো করেনি, কোনো থিওরেম লেখেনি। সে মাঝখানের একগাদা স্টেপ জাম্প করে, একটা আন-অর্থোডক্স লজিক অ্যাপ্লাই সোজা ফাইনাল অ্যানসারে পৌঁছে গেছে। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, অ্যানসারটা ১০০% কারেক্ট!

ঋতুপর্ণা একটা জোর ধাক্কা খেল। সে খাতা থেকে একবার চোখ তুলে অয়নের কালশিটে পড়া শান্ত মুখটার দিকে তাকাল। ছেলেটা জানলার বাইরের দিকে এমনভাবে তাকিয়ে আছে, যেন এই অঙ্কটা সলভ করা ওর কাছে জলভাত।

'এই বখাটে ছেলেটার ব্রেন এভাবে কাজ করে?' 

ঋতুপর্ণা নিজের কাছে অবাক হয়ে প্রশ্ন করল। কিন্তু, সে নিজের বিস্ময়টা বাইরে এক বিন্দুও প্রকাশ করল না। মুখটা একইরকম সিরিয়াস রেখে বইটা নিজের দিকে আরেকটু টেনে নিল।

"মেথডটা স্ট্যান্ডার্ড নয়। এক্সামে এভাবে লিখলে জিরো পাবে।" 

যদিও তার চোখ তখনো ওই দুটো লাইনের ওপর আটকে আছে,

"বাট... অ্যানসারটা ঠিক আছে। নেক্সট প্রবলেম।"

উত্তরে অয়ন কিছু বলল না। সে পরের অঙ্কটার দিকে মনোযোগ দিল।

দুপুর দুটো, মেন অডিটোরিয়াম

মেন অডিটোরিয়ামের ভেতরে তখন করতালির শব্দে কান পাতা দায়। আইআইটি থেকে আসা একজন গেস্টের ভাষণ সবে শেষ হয়েছে। মঞ্চের একপাশে দাঁড়িয়ে আছেন বিদিশা গাঙ্গুলি, তাঁর মুখে তৃপ্তির হাসি। পুরো অডিটোরিয়াম জুড়ে আনন্দের পরিবেশ।

কিন্তু এই আলো ঝলমলে অডিটোরিয়াম থেকে বেশ কিছুটা দূরে, মেইন বিল্ডিংয়ের দোতলার একটা অব্যবহৃত, অন্ধকার ঘরের ভেতরে তখন অন্য কিছু ঘটছে।

যাতে বাইরে থেকে হঠাৎ করে কেউ না এসে পরে সেজন্য ঘরের দরজা, জানালা ভেতর থেকে বন্ধ। ভেতরে থমথমে পরিবেশ। অডিটোরিয়ামের করতালির আওয়াজ এখানে আসছে না। ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে বিক্রম মালহোত্রা আর ডক্টর সুব্রত সেন।

একটু আগেই ডঃ সেন কলেজে ফিরেছেন আর ফেরার পরে ঠিকঠাক ভাবে সিম্পোজিয়াম অনুষ্ঠিত হতে দেখে তিনি সটকে পড়েছেন।


এই ডিসেম্বরেও টেনশনে তার কপাল দিয়ে বিন্দু বিন্দু ঘাম ঝরছে। তিনি বারবার পকেট থেকে একটা রুমাল বের করে নিজের ঘাড় আর মুখের ঘাম মুছছেন। 

শিয়াল-পণ্ডিতের মতো চেনা ধূর্ত চাউনিটা তার চোখে সবসময় খেলা করে, সেটা আজ উধাও। তার জায়গায় বাসা বেঁধেছে চরম আতঙ্ক আর বিভ্রান্তি।

"কোথা থেকে পেল টাকাটা?" সুব্রত সেনের গলাটা হিসহিস করে উঠল, ঠিক যেন একটা ফাঁদে পড়া ইঁদুর। 

"তুমি না বলেছিলে সব রাস্তা বন্ধ? তুমি না বলেছিলে ও তোমার পায়ে এসে পড়বে? তুমি বুঝতে পারছ মালহোত্রা ? কী ডিজাস্টার হয়ে গেল! আজ সকালে যখন আমি কলেজে পা রাখলাম, আমি ভেবেছিলাম একটা ছন্নছাড়া অবস্থা দেখব। 

আর এসে কী দেখছি? স্টেজে নীল মখমলের পর্দা ঝুলছে, ডেলিগেটরা ফাইভ-স্টার হোটেল থেকে গাড়িতে করে এসে নামছেন! কাজ এক সেকেন্ডের জন্যও থামেনি! এসবের মানে কী?", তাঁর গলা কাঁপছে।

"আমি... আমি বুঝতে পারছি না, স্যার। পেমেন্ট ক্লিয়ার হয়েছে। কিন্তু কীভাবে হলো, সেটা আমি জানি না।"

বিক্রম দাঁতে দাঁত চেপে উত্তর দিল। তার গলার স্বরটাও খাদের মতো নিচু। মনে মনে সে বলল, 'সেটা আমি কি করে বলব, প্ল্যানটা তো আপনার ছিল। তখন আমায় জিজ্ঞাসা করে কাজটা করেছিলেন ?'

"কীভাবে হলো মানে? টাকাটা এল কোথা থেকে?" সুব্রত সেন প্রায় বিক্রমের কলার চেপে ধরার উপক্রম করলেন। 


বিক্রমের মুখটা থমথমে। সে নিজে যথেষ্ট কোণঠাসা অনুভব করছে।

"আমি কী করে জানব স্যার? আপনিই তো বললেন আপনি অ্যাকাউন্টস থেকে ফাইল ব্লক করেছেন! হয়তো নিজের পকেট থেকেই টাকা ঢেলেছে, নয়তো ম্যানেজমেন্টের কাউকে ধরে ফান্ড বের করেছে।"

"অসম্ভব!" সুব্রত সেন প্রায় চেঁচিয়ে উঠলেন, পরক্ষণেই আবার গলা নামিয়ে ফেললেন।

"আমি কাল রাতে অ্যাকাউন্টস হেডকে ফোন করেছিলাম। ফাইল এখনো রিভিউর জন্যই পড়ে আছে। টোটাল আড়াই লাখ টাকার অ্যাডভান্স! ম্যানেজমেন্ট টাকা দেয়নি! তাহলে বিদিশা টাকাটা পেল কোথায়? ওর কি প্রিন্সিপালের সাথে অন্য কোনো আন্ডারস্ট্যান্ডিং আছে?"

বিক্রমের চোখের তারা স্থির হয়ে গেল।

"আমার তো মনে হয় সাহিল প্রিন্সিপালকে গিয়ে সব বলে দিয়েছে। আর প্রিন্সিপাল স্যার হয়তো ম্যানেজমেন্টের ইমার্জেন্সি ফান্ড থেকে ডিরেক্ট ভেন্ডারদের অ্যাকাউন্টে টাকাটা ট্রান্সফার করে দিয়েছেন।"

সুব্রত সেনের মুখটা আক্ষরিক অর্থেই কাগজের মতো সাদা হয়ে গেল।

"সর্বনাশ! যদি প্রিন্সিপাল স্যার বা ম্যানেজমেন্ট জেনে যায় যে আমি ইচ্ছাকৃতভাবে একটা ফেক 'টেকনিক্যাল এরর' দেখিয়ে ফান্ড আটকেছিলাম, তাহলে আমার চাকরি তো যাবেই, জালিয়াতির কেসও হতে পারে! মেয়েটা যদি প্রিন্সিপালকে বলে দেয়...", সুব্রত সেন আর কথা শেষ করতে পারলেন না। 

বিক্রমের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। 

"আমি আপনাকে বলেছিলাম স্যার, ওভারকনফিডেন্ট হবেন না। এখন যদি উনি ম্যানেজমেন্টকে জানিয়ে দেন যে আপনি ইচ্ছাকৃতভাবে ফাইল আটকেছেন, তাহলে আপনার চাকরি নিয়ে টানাটানি পড়বে!"

"আমার চাকরি? তুমি আমাকে জ্ঞান দিচ্ছ?" সুব্রত সেন রাগে ফুঁসে উঠলেন। 

"পুরো প্ল্যানটা তোমার ছিল! তুমি আমাকে এই নোংরা পলিটিক্সে জড়ালে নিজের ফ্যান্টাসি মেটানোর জন্য! এখন যদি ইনকোয়ারি হয়, আমি কিন্তু একা ডুবব না মালহোত্রা। আমি সব ফাঁস করে দেব!"

বিক্রম আর সুব্রতর এই পার্টনারশিপটা একটা নোংরা বোঝাপড়ার উপর দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু আজ যখন প্ল্যানটা ভেস্তে গেছে, তখন দুজনের মধ্যেই অবিশ্বাসের ফাটল ধরতে শুরু করেছে। 

বিক্রম বুঝতে পারল, সুব্রত সেন আসলে একটা মেরুদণ্ডহীন লোক। বিপদ এলে সে সব ঘটনার দায় ওর উপর চাপিয়ে দিয়ে নিজে বাঁচার চেষ্টা করবে। সে সুব্রত সেনের কলারটা চেপে ধরার চিন্তাটা বহু কষ্টে দমন করে নিল। 

"ভয় দেখাবেন না স্যার। আপনিই ফাইল আটকেছিলেন, আমার কোথাও কোনো সিগনেচার নেই। এখন নিজেকে বাঁচানোর রাস্তা খুঁজুন। আর বিদিশার সামনে একদম নার্ভাসনেস দেখাবেন না।"

তারপর কী একটা ভেবে সুব্রতকে ভরসা জোগাল।

"আপনি শান্ত হোন, স্যার, প্যানিক করবেন না" বিক্রম অত্যন্ত ঠান্ডা গলায় বলল। 

"প্রিন্সিপাল স্যার যদি জানতেনই যে আপনি ইচ্ছাকৃতভাবে ফাইল আটকেছেন, তাহলে আজ আপনাকে সেমিনারের ফার্স্ট রো-তে সম্মানের সাথে বসতে দিতেন না। উনি হয়তো ভেবেছেন সত্যিই কোনো টেকনিক্যাল এরর হয়েছিল। আপনি এখন অডিটোরিয়ামে ফিরে যান।" সুব্রত সেন ঘামে ভেজা রুমালটা পকেটে ঢোকালেন। তার বুকটা ধড়ফড় করছে। 

"হ্যাঁ... হ্যাঁ। আমাকে এখন অডিটোরিয়ামে ফিরে যেতে হবে। আমি স্পনসরশিপের দায়িত্বে আছি, আমি না থাকলে সন্দেহ আরও বাড়বে।"

সুব্রত সেন পা টেনে টেনে স্টোররুম থেকে বেরিয়ে গেলেন। বিক্রম অন্ধকারে একা দাঁড়িয়ে রইল। 

সুব্রত সেন ঘর থেকে বেরিয়ে গেলে সে পকেট থেকে নিজের আইফোনটা বের করে আনল। স্ক্রিনের সিক্রেট অডিও ডিরেক্টরিটা খুলে সে প্লে-বাটনটা প্রেস করল। স্পিকারটা কানের খুব কাছে ধরতেই সুব্রত সেনের কণ্ঠস্বরটা স্পষ্ট ফিসফিসিয়ে উঠল:

"......ম্যানেজমেন্ট টাকা দেয়নি! তাহলে বিদিশা টাকাটা পেল কোথায়? ওর কি প্রিন্সিপালের সাথে অন্য কোনো আন্ডারস্ট্যান্ডিং আছে? ...সর্বনাশ! যদি প্রিন্সিপাল স্যার বা ম্যানেজমেন্ট জেনে যায় যে আমি ইচ্ছাকৃতভাবে একটা ফেক 'টেকনিক্যাল এরর' দেখিয়ে ফান্ড আটকেছিলাম, তাহলে আমার চাকরি তো যাবেই, জালিয়াতির কেসও হতে পারে! মেয়েটা যদি প্রিন্সিপালকে বলে দেয়..."


বিক্রম মুচকি হাসল।

"গান্ডু ! ভেবেছিলি সব দায় বিক্রম মালহোত্রার ঘাড়ে চাপিয়ে নিজে সাধু সাজবি?" 

এই চালটা ভেস্তে গেলেও ওর একটা মস্ত বড় লাভ হয়ে গেল।

ম্যাথ ডিপার্টমেন্টের এই সিনিয়র প্রফেসর এখন থেকে ওর হাতের পুতুল। এই অডিও ক্লিপটার একটা কপি ডক্টর বাগচী বা প্রিন্সিপালের টেবিলে পৌঁছানো মানেই সুব্রত সেনের পুরো কেরিয়ার ধ্বংস হয়ে যাবে। এখন থেকে এই মেরুদণ্ডহীন জীবটাকে ব্ল্যাকমেইল করে বিদিশার প্রতিটা পদক্ষেপের ওপর নজর রাখা বিক্রমের জন্য জলভাত হয়ে গেল। ম্যাথ ডিপার্টমেন্টের খবরাখবর পেতে ওর আর অসুবিধা হবে না।

মালহোত্রারা কখনো খালি হাতে ময়দান ছাড়ে না।

কিন্তু...

রেকর্ডারটা বন্ধ করে ফোনটা পকেটে রাখতে রাখতে ওর ভুরুটা কুঁচকে গেল। তার চোখের মণি দুটো ছোট হয়ে এল।

এই রাহুল বোস আজকাল বিদিশার বড্ড বেশি কাছাকাছি ঘোরাফেরা করছে না?

ফেস্টের রাতেও রাহুল বোস বিদিশার দিকে ক্ষুধার্ত চোখে তাকিয়ে ছিল। তারও আগে, যেদিন বিক্রম প্রথমবার টিচার্স লাউঞ্জে বিদিশাকে ইমপ্রেস করতে গেছিল, সেদিনও এই রাহুল বোস ওর আর বিদিশার মাঝখানে কাবাব মে হাড্ডি হয়ে বসে ছিল। আজ দুপুরেও শালা বিদিশার সাথে এমনভাবে হেসে হেসে গল্প করছিল, যেন কতকালের চেনা ইয়ার-দোস্ত!

বিক্রমের চোখে বিদিশার শরীরের প্রতিটা ইঞ্চি তার ভোগের জন্য নির্দিষ্ট। সেখানে অন্য কোনো পুরুষ এসে ভাগ বসাবে এটা সে কোনোদিন মেনে নেবে না। 

বিদিশার সাথে রাহুলের সম্পর্ক কতদূর এগিয়েছে সে বিষয়ে এবার থেকে ওকে তীক্ষ্ণ নজর রাখতে হবে।

(বর্তমান সময়: সেমিনার হল)

উদ্বোধনী পর্ব শেষ হওয়ার পর টি-ব্রেক চলছে।
প্রিন্সিপাল সান্যাল একটু আগে সবার সামনে আবার বিদিশার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। সবাই তার তারিফ করেছে। 

এমন সময় ডক্টর বাগচী, ম্যাথমেটিক্স ডিপার্টমেন্টের এইচওডি, হাতে একটা কফির কাপ নিয়ে বিদিশার দিকে এগিয়ে এলেন। তার মুখে একটা চওড়া হাসি।

"ফ্যান্টাস্টিক জব, মিস গাঙ্গুলি! এত বড় একটা ইভেন্ট, এতগুলো ডেলিগেট, কিন্তু কোথাও কোনো বিশৃঙ্খলা নেই। সবকিছু একদম ঘড়ির কাঁটার মতো চলছে। অসাধারণ অর্গানাইজেশন।"

ড. বাগচী অত্যন্ত আন্তরিক গলায় বললেন। "আই অ্যাম রিয়েলি প্রাউড অফ ইউ। আমি জানতাম আপনি পারবেন।"

বিদিশা হাতের ফাইলটা নামিয়ে রেখে ড. বাগচীর দিকে তাকালেন। তার শান্ত মুখে একটা মাপা হাসি। কিন্তু তার দৃষ্টিটা ডঃ বাগচীর মতো উষ্ণ নয়।

বিদিশা মনে মনে ভাবলেন, 'কী দারুণ অভিনেতা এই লোকটা! কাল আমার সব ফান্ডিং আটকে দিয়ে, আমাকে সবার সামনে অপদস্থ করার সব বন্দোবস্ত করে, আজ কেমন সাধু সেজে অভিনন্দন জানাচ্ছে!' 

বিদিশার বদ্ধমূল ধারণা, প্রভাবশালী স্টুডেন্টদের ফেল করানোর কারণেই ডক্টর বাগচী আর ম্যানেজমেন্ট মিলে তার বিরুদ্ধে এই নোংরা খেলাটা খেললো।

"থ্যাংক ইউ, স্যার, আপনাদের সাপোর্ট ছাড়া এটা সম্ভব হতো না।" 

বিদিশা বিনীতভাবে উত্তর দিলেও কথাটার আড়ালে ব্যঙ্গ লুকিয়ে ছিল। তিনি ভেবেছিলেন এই গোটা প্ল্যানটা আসলে ডঃ বাগচীর মাথা থেকে বেরিয়েছে।

কিন্তু, পুরো কথাটা ড. বাগচীর মাথার উপর দিয়ে গেল, যদিও তিনি সেটা প্রকাশ করলেন না। শুধু হাসিমুখে মাথা নাড়লেন।

"অ্যাবসোলিউটলি। এনজয় দ্য সাকসেস, মিস গাঙ্গুলি", বলে তিনি অন্য ডেলিগেটদের দিকে এগিয়ে গেলেন।

খানিক দূরে দাঁড়িয়ে এই পুরো দৃশ্যটা দেখছিলেন সুব্রত সেন। এসির মধ্যেও তার কপালে ঘাম জমছে। তিনি বারবার আড়চোখে ওদিকে দিকে তাকাচ্ছেন এটা বোঝার জন্য যে বিদিশা ফান্ডিংয়ের ব্যাপারটা ড. বাগচীকে জানিয়ে দিচ্ছেন কি না। তার বুকটা ধড়ফড় করছে। 

কিন্তু, একইসঙ্গে বিদিশাকে দেখে তার গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাচ্ছে। তিনি চেষ্টা করছেন যাতে কোনোভাবেই বিদিশার সাথে সরাসরি তার চোখ না মেলে। কেউ তাকে কিছু বললে তিনি জোর করে হেসে উত্তর দিচ্ছেন।

তিনি এখন অডিটোরিয়াম থেকে পালাতে পারলে বাঁচেন।
[+] 4 users Like RockyKabir's post
Like Reply
দুপুরবেলা। কলেজের পার্কিং লট সংলগ্ন এলাকা।

কলেজের বিশাল পার্কিং লটে চারপাশে সারি সারি দাঁড় করানো দামি গাড়িগুলোর কাঁচে দুপুরের রোদের আলো ঠিকরে পড়ছে। পার্কিং লটের একপাশে নিজের স্পোর্টস কারে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল রোহিত। ফোর্থ ইয়ার, বিজনেস ম্যানেজমেন্ট। শহরের এক নামকরা ব্যবসায়ীর একমাত্র ছেলে। স্টাইলিশ স্পাইক করা চুল, কানে ডায়মন্ড স্টাড, পরনে ব্র্যান্ডেড টি-শার্ট আর চোখে আরমানির রোদচশমা।

তার হাতে একটা গাঢ় নীল রঙের ভেলভেটের বাক্স। ভেতরে একটা অত্যন্ত দামি প্ল্যাটিনাম চেইন। সে আজ মনস্থির করেই এসেছে।

তার থেকে কয়েক হাত দূরে, পার্কিং লটের একটা পিলারের কাছে দাঁড়িয়ে ছিল চন্দ্রিমা সেন। আজ তার পরনে একটা সি-গ্রিন রঙের স্লিভলেস লিনেন ড্রেস, চোখে প্রাডার সানগ্লাস। তার পারফেক্ট, ম্যানিকিওর করা আঙুলগুলো আইফোনের স্ক্রিনে দ্রুত টাইপ করছে। বাতাসের সাথে তার দামি ডিওর পারফিউমের গন্ধটা মিশে একটা মাদকতাভরা আবেশ তৈরি করেছে।


কিন্তু চন্দ্রিমার মাথার ভেতরে শুধু একজনের মুখই জাঁকিয়ে বসে আছে, সেটা অয়ন।

গতকাল তার এক বন্ধু, স্নেহা, তাকে একটা অদ্ভুত ইনফরমেশন দিয়েছে। তাদের একজন কমন ফ্রেন্ড নাকি গত পরশুদিন সন্ধেবেলায় অয়নকে সেন্ট্রাল কলকাতার ঘুরে বেড়াতে দেখেছে।

চন্দ্রিমা প্রথমে বিশ্বাস করতে চায়নি। অয়ন? সেন্ট্রাল কলকাতায়? কী করতে যাবে ও ওখানে? নিশ্চয়ই দেখার ভুল।

কিন্তু, যদি ওটা সত্যিই অয়ন হয়? সে স্নেহাকে বলে রেখেছে সে যেন এর মধ্যে ওই এরিয়াতে গেলে চারপাশে তীক্ষ্ণ নজর রাখে এবং অয়নকে দেখলেই তাকে ইনফর্ম করে।

চন্দ্রিমা যখন চিন্তার জগতে মগ্ন হয়েছিল ঠিক সেই সময় রোহিত তার বাইক থেকে সোজা হয়ে দাঁড়াল এবং একটা আত্মবিশ্বাসী, প্লে-বয় মার্কা হাসি মুখে ঝুলিয়ে চন্দ্রিমার দিকে এগিয়ে এল।

"হেই, গর্জিয়াস!" 

রোহিত চন্দ্রিমার খুব কাছাকাছি এসে দাঁড়াল। ওর গা থেকে ভেসে আসা দামী কোলোনের গন্ধটা চন্দ্রিমার নাকে ধাক্কা মারল।

চন্দ্রিমা সানগ্লাসের ওপর দিয়ে একবার রোহিতের দিকে তাকাল। ওর চোখে কোন ইমোশন নেই।

"কী ব্যাপার রোহিত ?" চন্দ্রিমার গলাটা বরফের মতো ঠান্ডা।

রোহিত তার চার্মিং হাসিটা আরও একটু চওড়া করল। সে পকেট থেকে ভেলভেটের বাক্সটা বের করে চন্দ্রিমার চোখের সামনে মেলে ধরল। রোদের আলোয় প্ল্যাটিনামের চেইনটা ঝিলিক দিয়ে উঠল।

"জাস্ট আ স্মল টোকেন অফ অ্যাপ্রিসিয়েশন, ফর দ্য মোস্ট বিউটিফুল গার্ল ইন দ্য ক্যাম্পাস। দিস উইকএন্ড, আমার ফার্মহাউসে একটা প্রাইভেট পার্টি আছে। অ্যান্ড আই ওয়ান্ট ইউ টু বি মাই ভিআইপি গেস্ট। হোয়াট ডু ইউ সে?" 

রোহিতের গলার স্বরে প্রচ্ছন্ন অহংকার, যেন সে নিশ্চিত চন্দ্রিমা এই দামি গিফট আর ইনভাইটেশন পেয়ে ইমপ্রেসড হয়ে যাবে।

কিন্তু, চন্দ্রিমা কোন কথা না বলে একদৃষ্টে রোহিতের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।

কয়েক মাস আগে এই দামি গিফট, এই অ্যাটেনশন আর ইনভিটেশন ওর ইগোকে স্যাটিসফাই করতে সমর্থ হতো। সে বক্সটা হাতে নিয়ে একটু মুচকি হাসত, একটু ফ্লার্ট করত আর ছেলেটার ইগোটাকে একটু সুড়সুড়ি দিয়ে নিজের ফ্যান ফলোয়িং বাড়াত।

কিন্তু আজ? আজ রোহিতের এই মুখটার দিকে তাকিয়ে চন্দ্রিমার ভেতর থেকে একটা তীব্র তাচ্ছিল্য উপচে পড়ল।


রোহিতের এই সাজানো, মেকি পৌরুষের সাথে অয়নের সেই ঘামে ভেজা, শীতল-পাথুরে রূপটার কোনো তুলনাই হয় না। ডার্ক, আনপ্রেডিক্টেবল, ডেঞ্জারাস না হলে কিসের পুরুষ? আসল পুরুষ সেই, যাকে বশ করতে বেগ পেতে হয়।

অয়নের চোখের একটা নিস্পৃহ দৃষ্টির কাছে রোহিতের এই লক্ষ টাকার গ্ল্যামার ভীষণ সস্তা মনে হলো চন্দ্রিমার।

সে ধীরে ধীরে নিজের সানগ্লাসটা চোখ থেকে খুলল। তার চোখের দৃষ্টি এখন ছুরির ফলার মতো ধারালো। অয়নের অবজ্ঞা আর প্রত্যাখ্যান চন্দ্রিমার সাইকোলজিতে কিছুটা হলেও বদল এনেছে। 

"রোহিত", চন্দ্রিমার গলাটা এতটাই নিস্পৃহ আর ঠান্ডা ছিল যে রোহিতের মেকি হাসিটা এক লহমায় থমকে গেল। সে যেরকম ভেবেছিল চন্দ্রিমার রিঅ্যাকশনটা সেরকম নয়।

"তুমি কি ভেবেছ পুরো পৃথিবীটা শুধু তোমার আর তোমার বাবার টাকার চারপাশে ঘোরে?"

রোহিত চমকে এক পা পিছিয়ে গেল। 

"এক্সকিউজ মি? চন্দ্রিমা, আই জাস্ট থট..."

"তুমি কী ভেবেছ, আর তুমি কী চাও, তাতে আমার বিন্দুমাত্র ইন্টারেস্ট নেই", চন্দ্রিমা সেদিন ম্যাচের শেষে অয়ন ঠিক যে কথাগুলো ওকে নির্মমভাবে শুনিয়েছিল ঠিক সেই শব্দগুলোই নিখুঁতভাবে রোহিতের সামনে উচ্চারণ করল।

"শোনো রোহিত, তুমি কে আর তুমি কী চাও তাতে আমার বিন্দুমাত্র ইন্টারেস্ট নেই। তোমার এই প্লে-বয় ইমেজ আর দামি গিফটগুলো অন্য সস্তা মেয়েদের কাছে গিয়ে ফ্লন্ট করো। আমার কাছে তোমার কোনো অস্তিত্ব নেই। তুমি আমার কাছে জাস্ট এই পার্কিং লটের একটা ল্যাম্পপোস্ট বা পিলারের মতো একটা অবজেক্ট। আমার সময় নষ্ট কোরো না। রাস্তা ছাড়ো।"

কথাটা বলে চন্দ্রিমা এক সেকেন্ডও দাঁড়াল না। রোহিতের হতবাক, অপমানিত, ফ্যাকাশে মুখটার দিকে একবার তাচ্ছিল্যের দৃষ্টি ছুঁড়ে দিয়ে সে নিজের হিল জুতোর খটখট শব্দ তুলে পার্কিং লট থেকে বেরিয়ে গেল।

চন্দ্রিমার বুকের ভেতরটা একটা পৈশাচিক আনন্দে ভরে উঠল। অয়নের সেদিনের নির্মম ব্যবহারের আস্বাদ সে আজ নিজে অনুভব করল। নো ডাউট যে ওই বুনো জংলি ছেলেটাই আসল পুরুষ। অয়ন চ্যাটার্জীকে তার চাই-ই চাই।যেকোনো মূল্যে।

ওদিকে, রোহিত বেশ কিছুক্ষণ সেখানে পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইল। তার ভেতরের সমস্ত পুরুষালি দম্ভ এক লহমায় ধুলোয় মিশে গেছে। এরকম জঘন্য ব্যবহার সে এর আগে জীবনে কখনও পায়নি। এত দামী উপহার দিতে এসে এই ব্যবহার ? কী মনে করে মেয়েটা নিজেকে ?

ওর হাতের ভেলভেটের বাক্সটা তখনো খোলা ছিল। সে আস্তে আস্তে ঢাকনাটা বন্ধ করল। ওর চোয়ালটা শক্ত হয়ে উঠল।

এর একটা বিহিত করতেই হবে।


পরিশিষ্ট

রাত তখন প্রায় দুটো ছুঁইছুঁই।

বাইপাসের ধারে শহরের অন্যতম এক্সক্লুসিভ লাউঞ্জ ক্লাব, 'দ্য ভেলভেট লাউঞ্জে তখন পার্টি চলছে। সারাদিনের পরিশ্রমের শেষে শ্রান্ত শহর তখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। 

বাইপাসের ধারের এই 'দ্য ভেলভেট লাউঞ্জ'-এর মেম্বারশিপ শহরের ক্ষমতাশালী হাই-প্রোফাইল পলিটিশিয়ান, ইন্ডাস্ট্রিয়ালিস্ট এবং কর্পোরেট ব্যারন ছাড়া আর কারোর নেই। এখানকার বাতাস সবসময় ক্ষমতার গন্ধে ভারী হয়ে থাকে।

কালো সাফারি স্যুট পরা বাউন্সারদের কড়া প্রহরার বাইরে থেকে ভেতরের রাজকীয় জাঁকজমকের কোনো আঁচই মেলে না।

আজ এখানে শহরের অন্যতম এক্সক্লুসিভ, 'ইনভাইটেশন-ওনলি' পার্টি চলছে। এত রাতেও বাইরের গেটে বেশ কিছু বিলাসবহুল গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। 

লাউঞ্জের একদম ভেতরের দিকের 'ভিআইপি এনক্লেভ'-এর পরিবেশটা অদ্ভুত মায়াবী এবং অন্ধকারাচ্ছন্ন। সিলিং থেকে ঝুলতে থাকা অ্যান্টিক ক্রিস্টাল শ্যান্ডেলিয়ার থেকে এক ম্লান, সোনালি-অ্যাম্বার রঙের আলো নিচে দামি পার্সিয়ান কার্পেটের ওপর এসে পড়েছে। স্পিকারে খুব নিচু গ্রামে বাজছে একটা স্লো, সেন্সুয়াল জ্যাজ স্যাক্সোফোনের সুর। বাতাসে মিশে আছে কিউবান চুরুটের ধোঁয়া এবং অত্যন্ত দামি ফ্রেঞ্চ পারফিউমের একটা মাদকতাময় সংমিশ্রণ।

এনক্লেভের একদম কোণের দিকের একটা হাফ-মুন লেদার সোফায় বসে আছেন একজন মাঝবয়সী, অত্যন্ত প্রভাবশালী চেহারার মানুষ। শিশিরকুমার রায়। রাজ্যের অন্যতম বড় পোর্ট ট্রাস্ট এবং শিপিং কর্পোরেশনের চেয়ারম্যান।

কিন্তু, এই মুহূর্তে তার চেহারায় কোনো ক্ষমতার দম্ভ নেই। বরং সেন্ট্রাল এসির এই কনকনে ঠান্ডার মধ্যেও তার কপাল দিয়ে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমছে। 

তিনি একটু পরপরই হাতের রুমালে কপালের ঘাম মুছছেন আর তার সামনের টেবিলে রাখা আঠারো বছরের পুরোনো সিঙ্গল মল্ট স্কচের গ্লাসটায় চুমুক দিচ্ছেন। তার চোখ বারবার দরজার দিকে যাচ্ছে।

তিনি কারোর জন্য অপেক্ষা করছেন। এমন একজনের জন্য, যাকে তিনি ভয় পান, আবার যার মোহ থেকে তিনি বেরোতেও পারেন না।

একটু পরে ভিআইপি এনক্লেভের ভারী মেহগনি কাঠের দরজাটা নিঃশব্দে খুলে গেল। দরজার ফ্রেমে এসে দাঁড়াল একটা ছায়ামূর্তি। শিশির বাবুর বুকের ভেতরটা ছ্যাঁত করে উঠল। তিনি প্রায় রিফ্লেক্স অ্যাকশনের মতো নিজের সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন।


মহিলা ধীর, অত্যন্ত মাপা এবং রাজকীয় পদক্ষেপে ভেতরের অ্যাম্বার আলোর মধ্যে এসে দাঁড়ালেন।

বয়স চল্লিশের কোঠায়, কিন্তু তার শরীর এবং উপস্থিতিতে এমন একটা আদিম অথচ সফিস্টিকেটেড আকর্ষণ আছে, যা যেকোন যুবতীকে লজ্জায় ফেলে দেবে। 

আজ তার পরনে একটা ডিপ মিডনাইট-ব্লু রঙের ডিজাইনার ফ্রেঞ্চ শিফন শাড়ি। শাড়ির ফ্যাব্রিকটা এতটাই মিহি এবং স্বচ্ছ যে, লাউঞ্জের ম্লান আলোয় তার মেদহীন, মাখনের মতো মসৃণ কোমরের খাঁজ আর নাভির গভীরতা একটা অদ্ভুত মায়াবী মোহ তৈরি করেছে।

শাড়ির সাথে তার পরনে একটা স্লিভলেস, ডিপ-কাট ব্ল্যাক ভেলভেটের ব্লাউজ। ব্লাউজের সামনের দিকের গভীরতা তার সুডৌল, স্ফীত বক্ষবিভাজিকার একটা আকর্ষণীয়, অথচ পরিশীলিত আভাস দিচ্ছে। আর পেছনের দিকটা প্রায় পুরোটাই উন্মুক্ত, যেখানে শুধু একটা সরু কালো ফিতে তার ফর্সা, নিটোল পিঠের মেরুদণ্ডকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রেখেছে।

তার চুলগুলো একটা নিটোল, টাইট ফ্রেঞ্চ রোলে বাঁধা, ঘাড়ের কাছে কয়েকটা অবাধ্য চুল এসে পড়েছে। চোখে ডার্ক স্মোকি আই মেকআপ, যা তার চাউনিকে আক্ষরিক অর্থেই শিকারি চিতার মতো ধারালো করে তুলেছে। ভরাট, সুগঠিত ঠোঁটে গাঢ় বার্গান্ডি রঙের ম্যাট লিপস্টিক। গলায় কোনো গয়না নেই, শুধু তার ডান হাতের অনামিকায় একটা বিশাল আকারের সলিটেয়ার ডায়মন্ড রিং লাউঞ্জের আলোয় চোখ ধাঁধিয়ে দিচ্ছে।

তিনি সামনের সোফাটার দিকে এগিয়ে এলেন। তার স্টিলেটোর খটখট শব্দগুলো লাউঞ্জের কার্পেটে একটা নীরব ছন্দের মতো বাজতে লাগল। 

শাড়ির কুঁচিগুলো তার সুগঠিত উরু আর নিতম্বের খাঁজে একটা অদ্ভুত সেন্সুয়াল দুলুনি তৈরি করছে। তার শরীর থেকে ভেসে আসা একটা কড়া অথচ মোহময়ী পারফিউমের গন্ধ শিশিরবাবুর নাকে এসে ধাক্কা মারল। 

গন্ধটার মধ্যে নিঃসন্দেহে একটা সম্মোহনী ক্ষমতা আছে, যা মানুষের চিন্তাশক্তিকে গুলিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।

"গুড ইভিনিং... ম্যাডাম," শিশির বাবুর গলাটা সামান্য কেঁপে গেল। রাজ্যের এতবড় একজন ক্ষমতাবান আমলা, যার একটা সইয়ের ওপর কোটি টাকার শিপিং টেন্ডার পাস হয়, তিনি এই মহিলার সামনে একটা বাধ্য, নার্ভাস কলেজছাত্রের মতো দাঁড়িয়ে আছেন।

মহিলা কোনো উত্তর দিলেন না। তিনি অত্যন্ত ধীরেসুস্থে শিশিরবাবুর ঠিক উল্টোদিকে একটা হাই-ব্যাক লেদার সোফায় পা এলিয়ে বসলেন। তার বসার ভঙ্গিতে কোনো আড়ষ্টতা নেই, বরং এমন একটা রাজকীয় শিথিলতা আছে, যা শুধুমাত্র সেইসব মানুষদের থাকে যারা নিজেদের ক্ষমতার ওপর নিরঙ্কুশ আধিপত্য উপভোগ করে।

বসার সময় তিনি ইচ্ছে করে তার শাড়ির আঁচলটা একটু অযত্নের সাথে ডান কাঁধ থেকে নামিয়ে দিলেন। এর ফলে তার বক্ষ ভাঁজের গভীরতা এবং ফর্সা কলারবোন লাউঞ্জের আলোয় আরো স্পষ্ট হয়ে উঠল।

শিশির বাবুর চোখ কয়েক সেকেন্ডের জন্য ওদিকে আটকে গেল, কিন্তু পরক্ষণেই তিনি ভয় পেয়ে চোখ সরিয়ে নিলেন। 

এই মহিলা সাংঘাতিক।

"বসুন, মিস্টার রায়" মহিলার গলাটা একদম খাদে নামানো, হাস্কি এবং বরফের মতো ঠান্ডা। গলার স্বরে একটা কমান্ডিং টোন আছে।

শিশিরবাবু ঢোক গিলে আবার সোফায় বসলেন। মহিলা তার পার্স থেকে একটা লম্বাটে, গোল্ড-প্লেটেড সিগারেট কেস বের করলেন। অত্যন্ত মার্জিত ভঙ্গিতে একটা সরু মেন্থল সিগারেট দুই ঠোঁটের মাঝে রাখলেন। সাথে সাথে শিশিরবাবু নিজের পকেট থেকে লাইটার বের করে আগুনটা তার ঠোঁটের কাছে ধরলেন।

মহিলা লাইটারের আগুনের দিকে সামান্য ঝুঁকলেন। শিশিরবাবু খুব কাছ থেকে দেখতে পেলেন ওই গাঢ় বার্গান্ডি কালারের লিপস্টিকে মোড়া ঠোঁটদুটো কীভাবে ফিল্টারটাকে স্পর্শ করেছে। লাইটারের আলোয় মহিলার স্মোকি চোখের শিকারের মতো দৃষ্টি তার মেরুদণ্ড দিয়ে একটা হিমশীতল স্রোত নামিয়ে দিল।

মহিলা একটা গভীর টান দিয়ে ধোঁয়াটা খুব ধীর গতিতে, সেন্সুয়াল ভঙ্গিতে শিশির বাবুর মুখের দিকে ছাড়লেন।

"আপনি ঘামছেন, মিস্টার রায়", মহিলা ঠোঁটের কোণে একটা বাঁকা, রহস্যময় হাসি ফুটিয়ে বললেন। 

"এই ষোল ডিগ্রির সেন্ট্রাল এসির মধ্যেও আপনার কপাল ঘামছে। কোনো বিশেষ কারণ?"

"ম্যাডাম... সি-কাস্টমস ক্লিয়ারেন্সের ওই ফাইলটা..." 

শিশির বাবু আমতা আমতা করে বললেন, "ওটা পাস করানো এই মুহূর্তে ইম্পসিবল। মিনিস্ট্রি থেকে ডিরেক্ট অডিট বসিয়েছে। আমি যদি এখন ওই ফেক চালানটাতে সই করি, তাহলে আমি সোজা সিবিআইয়ের জালে পড়ব।"

মহিলা সিগারেটের ছাইটা টেবিলের ওপর রাখা ক্রিস্টালের অ্যাশট্রেতে আলতো করে ঝেড়ে ফেললেন। তার চোখের দৃষ্টি এক চুলও কাঁপল না।

"ইম্পসিবল বলে কোনো শব্দ আমার ডিকশনারিতে নেই, মিস্টার রায়" মহিলার গলার স্বরটা হঠাৎ করেই যেন আরও কয়েক ডিগ্রি নিচে নেমে গেল। "আপনার পোর্ট ট্রাস্টের ওই ক্লিয়ারেন্সটা আমার দরকার। আগামী চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে।"

"কিন্তু ম্যাডাম, আমার চাকরি চলে যাবে! আমি ফেঁসে যাব!" শিশিরবাবু প্রায় কাঁদো কাঁদো গলায় বললেন।

মহিলা এবার একটু সামনের দিকে ঝুঁকে এলেন। তার বুকের শিফন শাড়ির আবরণটা আরও একটু সরে গেল। তিনি নিজের মসৃণ, পারফেক্ট ম্যানিকিওর করা হাতটা বাড়িয়ে টেবিলের ওপর রাখা শিশির বাবুর ঘামে ভেজা হাতটার ওপর রাখলেন। তার সারা শরীরে একটা বিদ্যুৎ খেলে গেল। মহিলার হাতের স্পর্শটা অদ্ভুত রকমের ঠান্ডা, কিন্তু তার মধ্যে একটা ইলেকট্রিক উত্তেজনা আছে। তার নখের ধারালো কোণটা শিশিরবাবুর হাতের চামড়ায় খুব হালকাভাবে আঁচড় কাটছে।

"মিস্টার রায়..." মহিলা প্রায় ফিসফিস করে, একটা মোহময়ী স্বরে ডাকলেন। তার উষ্ণ নিঃশ্বাস শিশির বাবুর ঘাড়ের কাছে পৌঁছোচ্ছে। 

"আপনি কি সত্যিই ভাবছেন সিবিআইয়ের ভয় দেখিয়ে আপনি আমার কাজটা আটকাতে পারবেন?"

মহিলা তার আরেক হাত দিয়ে নিজের ডিজাইনার পার্সটা খুললেন। ভেতর থেকে একটা ছোট কালো পেন-ড্রাইভ বের করে টেবিলের ওপর, ঠিক শিশির বাবুর স্কচের গ্লাসের পাশে রাখলেন।

"এই পেন-ড্রাইভে একটা ছোট্ট ভিডিও আছে," মহিলা অত্যন্ত ক্যাজুয়াল ভঙ্গিতে, যেন আবহাওয়ার খবর পড়ছেন, এমনভাবে বললেন। 

"গত মাসে ব্যাংককের একটা প্রাইভেট ইয়টে আপনি এবং আপনার দুজন রাশিয়ান এসকর্টের কিছু এক্সক্লুসিভ মুহূর্ত। আপনার স্ত্রী এবং আপনার ওই পলিটিক্যাল গডফাদারদের এই ভিডিওটা দেখতে বেশ ভালোই লাগবে বলে আমার বিশ্বাস।"

শিশির বাবুর মুখটা মুহূর্তের মধ্যে কাগজের মতো সাদা হয়ে গেল। তার হাত-পা অবশ হয়ে আসছে। তার চোখেমুখে চরম আতঙ্ক ফুটে উঠল।

"ম্যা... ম্যাডাম... প্লিজ! আপনি এটা করতে পারেন না..." তার গলা দিয়ে ঘড়ঘড়ে আওয়াজ বেরোল।

মহিলা শিশির বাবুর হাতের ওপর থেকে নিজের হাতটা সরিয়ে নিলেন। তিনি আবার সোফায় হেলান দিয়ে বসে সিগারেটে শেষ টানটা দিলেন।

"আমি কী করতে পারি আর কী পারি না, সেটা আপনি খুব ভালো করেই জানেন" 

মহিলা এবার অত্যন্ত নিস্পৃহ গলায় বললেন। তার চোখের সেই সম্মোহনী মোহটা কেটে গিয়ে সেখানে এখন ক্রুরতা খেলা করছে।

"কাল সকাল দশটায় আমার লোক আপনার অফিসে যাবে। ফাইলে সইটা হয়ে যাওয়া চাই। আর হ্যাঁ, এই ডিলের কাটমানির পার্সেন্টেজটা আমি টুয়েন্টি থেকে থার্টি পার্সেন্ট করে দিয়েছি। দ্যাটস মাই ফি ফর নট রিলিজিং দিস ভিডিও।"

শিশির বাবুর আর কোনো কথা বলার মতো ক্ষমতা ছিল না। তার দম্ভ, তার অহংকার, সবকিছু আজকে এই শিফনে মোড়া আগুন আর বরফের সংমিশ্রণের সামনে ধুলোয় মিশে গেল। 

তিনি শুধু অসহায়ভাবে মাথা ওপর-নিচ করে সম্মতি জানালেন।

মহিলা ঠোঁটের কোণে আবার সেই মোহময়ী হাসিটা ফুটিয়ে তুললেন। তিনি নিজের পার্সটা হাতে তুলে নিয়ে সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন।

"গুড বয়," মহিলা একটা তাচ্ছিল্যভরা স্বরে বললেন।

তিনি যাওয়ার আগে শিশিরবাবুর কানের খুব কাছে নিজের মুখটা নিয়ে গেলেন। তার ডিওর পারফিউমের গন্ধ আর উষ্ণ নিঃশ্বাসের তাপ শিশিরবাবুর গায়ের রোম খাড়া করে দিল।

"নেক্সট টাইম, মিস্টার রায়... আমার সাথে ডিল করার আগে নিজের লিমিটটা মনে রাখবেন। আই ক্যান বি ইওর বেস্ট ড্রিম, অর ইওর ওয়ার্স্ট নাইটমেয়ার।"

কথাটা বলে মহিলা আর এক সেকেন্ডও সেখানে দাঁড়ালেন না। তিনি ঘুরে দরজার দিকে পা বাড়ালেন। তার হিল জুতোর ছান্দিক শব্দ আর শাড়িতে মোড়া পাছার মোহময়ী দুলুনি আবার লাউঞ্জের ওই অ্যাম্বার আলোর মধ্যে দিয়ে ধীরে ধীরে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।

টেবিলের ওপর পড়ে রইল শুধু একটা অর্ধেক খাওয়া স্কচের গ্লাস, একটা কালো পেন-ড্রাইভ, আর একরাশ পোড়া সিগারেটের ছাই। শিশিরকুমার রায় সেখানে একটা জীবন্ত লাশের মতো বসে রইলেন, তার চোখ তখনো ওই দরজার দিকে স্থির।

তিনি দেখতে পেলেন না 'ম্যাডাম'-এর মুখে একটা পরম তৃপ্তির হাসি। এই ক্ষমতার খেলা, এই ম্যানিপুলেশন, সুতোর টানে ক্ষমতাশালী পুরুষদের পুতুলের মতো নাচানো, এটা তার কাছে নেশার মতো।
Like Reply
(02-06-2026, 02:57 PM)Ankit Roy Wrote: সত্যিকথা বলতে এই সাইটে বেশ কিছু ভালো লেখক আছেন তবে আপনার মত বিনয়ী ও নম্র লেখক বর্তমানে নেই বললেই চলে । লাইক আর রেপুটেশন রইলো।ভালো থাকবেন।

লাইক আর রেপুটেশনের জন্য ধন্যবাদ। আমি অধ্যায় প্রতি ২৫টি করে রেপুটেশন পয়েন্ট দাবি করেছিলাম। পাঠক-পাঠিকারা কথা রেখেছেন। আমার দায়িত্ব সেক্ষেত্রে বেড়ে যায়। পালন করতে পেরে আমার ভালোই লাগছে।
[+] 1 user Likes RockyKabir's post
Like Reply
(02-06-2026, 10:31 PM)Stranger995 Wrote: দাদা আমি জানি এই forum এ  লিখে কেউ রোজগার করে না তাই এর আগে যতো গুলো লেখককে গল্প বন্ধ করতে দেখেছি সব এই reason দেখিয়ে বন্ধ করেছে যে কাজের খুব চাপ কিন্তু আপনার এত কাজের চাপ এর পরে ও গল্প লেখার আগ্রহ দেখে খুব ভালো লাগলো reputation রইলো আশা করছি এই ভাবেই চালিয়ে যাবেন l

কাজের চাপ তো আছেই ভাই। সেজন্য চাইলে কেউ লম্বা গ্যাপ নিতে পারে অথবা আপডেট কমিয়ে দিতে পারে। এমার্জেন্সি পরিস্থিতি, অসুস্থতার জন্য সাময়িকভাবে বন্ধ করতেও পারে। আমার হলে আমিও তখন গ্যাপ নেব।

বড় গল্প লিখতে গেলে লম্বা সময় লাগবে আর এসব বাধাও আসবে। লেখাও সাময়িকভাবে ব্যাহত হবে।

কিন্তু, হুট করে পার্মানেন্টলি বন্ধ করে দেওয়া মানে সে আসলে গল্পটার প্রতি ইনভেস্টেড ছিল না। বড় গল্প লিখে শেষ করা ভীষণ পরিশ্রমের কাজ। যে লেখে কেবল সেই জানে।

শেষ করতে হলে লেখকের গল্পের প্রতি ইনভেস্টেড হওয়া সবার আগে দরকার। নইলে পাঠকের হাজার গালাগাল সত্ত্বেও তার কিছু যায় আসবে না।
[+] 1 user Likes RockyKabir's post
Like Reply
(03-06-2026, 01:12 AM)Ratul05 Wrote: আপনি যা পরিশ্রম আর সময় দিচ্ছেন ভাই। আর আপনার লেখনী অনবদ্য। আপনার উপর কৃতজ্ঞতা। এখন শুধু আপনার উপন্যাস টা পড়তেই আসা হয় এক রকম।

শুনে খুব আনন্দ পেলাম ভাই। একটা সময় পরে যখন উৎসাহে ঘাটতি পরে তখন এগুলোই লেখা চালিয়ে যাবার প্রেরণা দেয়। চেষ্টা করব আপনাকে হতাশ না করার।
Like Reply
Khubi bhalo update... Darun... Chalia jan
[+] 1 user Likes Slayer@@'s post
Like Reply
What an update!! Keep it up ?
[+] 1 user Likes Paul's post
Like Reply
অনেকদিন পরে এতো সুন্দর একটা গল্প পড়ছি, খুবই ভালো লেখেন আপনি, পরবর্তী আপডেট এর অপেক্ষায় রইলাম
[+] 1 user Likes Amidevil's post
Like Reply
অনেক দিন পর আবার একটি সত্যিই ভালো লেখা পড়ার সুযোগ পেলাম। অসাধারণ।
[+] 1 user Likes bad_boy's post
Like Reply
Khub Valo laglo.
Like Reply
(04-06-2026, 04:49 PM)rehanarman29 Wrote: Khub Valo laglo.

প্রশংসার জন্য ধন্যবাদ। এবার রেপুটেশন পয়েন্ট দিন ভাই।
Like Reply
(04-06-2026, 06:04 AM)Paul Wrote: What an update!! Keep it up ?

ধন্যবাদ দাদা। গল্পের গুণমান বজায় রাখতে চেষ্টা করব।
Like Reply
ঘোষণা:- গল্পের পরবর্তী arc শুরু হবার আগে একটা ব্রেক নেব বলেছিলাম। এই সপ্তাহে গল্পের পরবর্তী পর্যায় নিয়ে চিন্তাভাবনা বা লেখালেখি কোনটাই সম্ভব হয়নি। এই রবিবার আর সামনের রবিবার কোন আপডেট আসবে না। আশা করছি আগামী রবিবারের পরের শনিবার অথবা রবিবার আবার আপডেট দিতে পারব। ধন্যবাদ। সঙ্গে থাকুন।
[+] 2 users Like RockyKabir's post
Like Reply
(04-06-2026, 09:01 AM)Amidevil Wrote: অনেকদিন পরে এতো সুন্দর একটা গল্প পড়ছি, খুবই ভালো লেখেন আপনি,  পরবর্তী আপডেট এর অপেক্ষায় রইলাম

ধন্যবাদ। নিজের লেখার প্রশংসা শুনতে সবারই ভাল লাগে। আমারও ভাল লাগছে। চেষ্টা করব গুণমান মান বজায় রাখতে।
[+] 1 user Likes RockyKabir's post
Like Reply
(06-06-2026, 12:08 AM)RockyKabir Wrote: ধন্যবাদ। নিজের লেখার প্রশংসা শুনতে সবারই ভাল লাগে। আমারও ভাল লাগছে। চেষ্টা করব গুণমান মান বজায় রাখতে।

বিদিশার sex এর জন্য অপেক্ষা করে আছি,
Like Reply
আপনার একটা পোস্ট টাইপিং করতে কত সময় লাগে। আপনি কী কোন জায়গায় আগে পোস্ট টিকে কোথাও আগে লিখে রাখেন? 
 
না, ডাইরেক্ট মাথা থেকে চিন্তা করে টাইপিং শুরু করে দেন। 
মানে আমি যা জানতে চাই তা হল দুটি পোস্টের মধ্যবর্তী সময়ে কী কী স্টেপে লেখাটি আপনি নিয়ে যান।
Like Reply
দাদা একটা সাজেশন র ইল বনগনির মৃত্যুটা এডিট করে তাকে বদলা নিতে কলকাতাতে আনুন। নয়তো তার কোনো যমজ ভাইকে। কাহিনী পুরো জমে যাবে।
রেপুটেশন কিভাবে দিতে হয় একটু জানাবেন। এই ফোরামে নতুন।
আর পারলে কাহিনী বিষয়ক ছবি এড করবেন।
[+] 2 users Like All IS WELL's post
Like Reply
(06-06-2026, 04:23 PM)All IS WELL Wrote: দাদা একটা সাজেশন র ইল বনগনির মৃত্যুটা এডিট করে তাকে বদলা নিতে কলকাতাতে আনুন। নয়তো তার কোনো যমজ ভাইকে। কাহিনী পুরো জমে যাবে।
রেপুটেশন কিভাবে দিতে হয় একটু জানাবেন। এই ফোরামে নতুন।
আর পারলে কাহিনী বিষয়ক ছবি এড করবেন।

Darun idea amaro mona  hoi bagnani  moto character ta k aro time dila aro dekhte parle vlo lagto. Jai hok duniyay bagnani r moto poker ovab nai se bidesh hok ba Kolkata.BUT kabir ja vabe likhchen se ta o mondo noi tini tar moto likhun. 

Apnar comments dekhe mona hoi apni golpo likhte chaichen  ba likhben, jodi amon ta hoi tobe orginal writer der theke permission niya ekta parelal
golpo likhte paren jakhne bagnani r deal mena nilya bidishar jibon  kamon  hoto and se ki firte parto kono vabe. Golpota te onek rosod acha orginal lekhak k hatts off amon akta golpo bananor jonno. 

Amnar r amar bagnani k chinta dara ta same tai ato kichu  bola. 
Best of luck
Like Reply
(06-06-2026, 04:23 PM)All IS WELL Wrote: দাদা একটা সাজেশন র ইল বনগনির মৃত্যুটা এডিট করে তাকে বদলা নিতে কলকাতাতে আনুন। নয়তো তার কোনো যমজ ভাইকে। কাহিনী পুরো জমে যাবে।
রেপুটেশন কিভাবে দিতে হয় একটু জানাবেন। এই ফোরামে নতুন।
আর পারলে কাহিনী বিষয়ক ছবি এড করবেন।

ইতালি আর্ককে ফিরিয়ে আনার আইডিয়াটা ভালো। বিষয়টা যে আমার মাথায় আসেনি এমন নয়, আসল সমস্যা হল বনগানী মানুষ নয় একটা গরিলা। তার চরিত্রে কোন গভীরতা নেই, সে বিদিশাকে দেখার পর থেকে শুধু চুদতে চেয়েছে। আসল লেখক চটি লিখেছিলেন, কিন্তু আমি তো ইরোটিক সাহিত্য রচনা করছি। শুধু লাগানো দিয়ে কখনো সাহিত্য রচনা হয় না।

Daniel Q Steele-র When we were Married পড়ে দেখতে পারেন।

সেজন্যই ইতালি arc শেষ করে আমায় গল্পটি প্রায় নতুন করে লিখতে হচ্ছে।

ছবি দেবার আইডিয়াটা ভালো। মাথায় রইল। এবার থেকে কিছু চরিত্রের ছবি দেব।
[+] 1 user Likes RockyKabir's post
Like Reply




Users browsing this thread: 3 Guest(s)