Posts: 54
Threads: 3
Likes Received: 295 in 40 posts
Likes Given: 161
Joined: May 2023
Reputation:
102
অরণ্যের গোপন আদিমতা
এই গল্পটা লিখতে চাই অনেক দিন ধরে। কিন্তু গল্পটা সহজ না। কারণ এটা শুধু একটা গল্প না, এটা নারীজীবনের নানা রকম অভিজ্ঞতা, কষ্ট, স্বপ্ন, ভালোবাসা, ভয় আর বেঁচে থাকার গল্প। এখানে থাকবে এমন কিছু মেয়ের কথা, যারা ছোটবেলা থেকেই অবহেলা, বুলিং, নির্যাতন কিংবা অন্যায়ের শিকার হয়েছে। থাকবে তাদের ভেঙে পড়ার গল্প, আবার উঠে দাঁড়ানোর গল্পও। থাকবে এমন পুরুষদের কথাও, যারা আঘাত দেয়; আর এমন পুরুষদের কথাও, যারা পাশে দাঁড়ায়, ভালোবাসে, আশ্রয় দেয়।
এখানে যৌনতা থাকেবে, কিন্তু সেই যৌনতা পেতে হলে আপনাকে অনেক দুর যেতে হবে। যৌনতা পেতে হলে আপনাকে হতে হবে সেই আসল পুরুষ। অপেক্ষা করতে হবে সঠিক সময়ের। এখানে প্রাধান্য দেওয়া হবে মনের চাহিদাকে। এখানে আমি নারীদের চাওয়া-পাওয়া, তাদের স্বপ্ন, তাদের ইচ্ছা, তাদের না-বলা কথাগুলো বলার চেষ্টা করব।
তবে আমি জানি, একজন লেখক হিসেবে সবকিছু আমি জানি না। তাই এই গল্প শুরু করার আগে আমি বাস্তব নারীদের কথা শুনতে চাই। আপনি যদি একজন নারী হন, আপনার জীবনের কোনো অভিজ্ঞতা, কোনো কষ্ট, কোনো স্বপ্ন, কোনো অপূর্ণতা বা এমন কোনো গল্প থাকে যা কাউকে বলতে চেয়েও বলতে পারেননি—আমি শুনতে চাই। প্রাইভেসির জন্য আমাকে DM করতে পারেন।
এই গল্প এক দিনে লেখা হবে না। হয়তো মাসের পর মাস, হয়তো বছরেরও বেশি সময় লাগবে। অধ্যায়ে অধ্যায়ে গল্পটা এগোবে, আর সেই পথচলায় আপনাদের অভিজ্ঞতা ও অনুভূতিও হয়তো জায়গা করে নেবে।
I've wanted to write this story for a long time. But it won't be an easy story to write, because it's more than just a story. It's about the many realities of women's lives—their struggles, dreams, love, fears, and their journey of survival.
There will be stories of women who have faced neglect, bullying, abuse, and injustice since childhood. There will be stories of breaking down, and stories of finding the strength to rise again. There will be men who hurt them, but there will also be men who stand beside them, love them, and offer them shelter and support.
There will be sexuality in this story, but it won't be the destination. To reach it, you'll have to travel a long way with the characters. It will belong to those who understand patience, respect, and genuine connection. The emotional needs of the heart will always take precedence over physical desire. Through this story, I will try to explore women's hopes, dreams, desires, and the countless things they often leave unsaid.
But I also know that, as a writer, I don't know everything. That's why, before I begin this journey, I want to listen to real women. If you are a woman and have an experience, a hardship, a dream, a regret, or a story you've always wanted to tell but never could—I would like to hear it. If privacy is a concern, feel free to send me a direct message.
This story won't be written in a day. It may take months, perhaps even years. It will unfold chapter by chapter, and along the way, your experiences and emotions may find a place within its pages.
Posts: 54
Threads: 3
Likes Received: 295 in 40 posts
Likes Given: 161
Joined: May 2023
Reputation:
102
04-06-2026, 11:03 PM
(This post was last modified: 04-06-2026, 11:06 PM by Moan_A_Dev. Edited 2 times in total. Edited 2 times in total.)
প্রথম অধ্যায়: নীল শাড়ির ফাঁস
বিকেলের ম্লান আলোটা যখন গুলশানের তেরো তলার বিলাসবহুল পেন্টহাউসের বিশাল কাঁচের দেওয়াল ভেদ করে ড্রইংরুমে এসে পড়ল, জোয়ার মনে হলো ওটা কোনো আলো নয়, একটা অদৃশ্য চাবুকের দাগ। চারপাশটা বড্ড বেশি নিস্তব্ধ, শুধু সেন্ট্রাল এসির একটা একটানা মৃদু, যান্ত্রিক গুঞ্জন ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। এই ঠাণ্ডা, কৃত্রিম বাতাসের মাঝে এক ধরনের নিঃসঙ্গতা লুকিয়ে থাকে, যা চামড়া ভেদ করে হাড়ের মগজে গিয়ে কামড় বসায়। ইতালিয়ান ক্যালাকাট্টা মার্বেলের ধবধবে সাদা মেঝেতে বিকেলের সেই মরা আলোটা পড়ে কেমন যেন ফ্যাকাশে দেখাচ্ছিল। দেয়ালে ঝুলছে দেশের এক নামী চিত্রকরের আঁকা বিমূর্ত তৈলচিত্র—ধূসর আর কালোর মাঝে একটা লাল বৃত্ত, যা জোয়ার কাছে সবসময় মনে হতো একটা রক্তাক্ত জরায়ুর মতন আটকে আছে ফ্রেমে। ঘরের কোণায় সাজানো বেলজিয়ান ক্রিস্টালের ঝাড়বাতি, দামী ওক কাঠের কনসোল টেবিল—সবই যেন এক একটা রাজকীয় প্রহরী, যারা জোয়াকে চব্বিশ ঘণ্টা পাহারা দিচ্ছে।
জোয়া আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল। ড্রেসিং টেবিলের বিশাল ডিম্বাকৃতি আয়নাটায় নিজের প্রতিফলন দেখতে দেখতে তার নিজেরই নিজেকে অচেনা ঠেকল। আজ রাতে তার স্বামী আসিফের কর্পোরেট বসেরা আসবে ডিনারে। আসিফ চৌধুরীর ক্যারিয়ারের গ্রাফ এখন ঊর্ধ্বমুখী, আর সেই গ্রাফের একটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো তার লাইফস্টাইল এবং তার স্ত্রী। আসিফ ভালোবাসে জোয়াকে নিখুঁত ‘টফি ওয়াইফ’ হিসেবে সমাজের উচ্চবিত্ত মহলে উপস্থাপন করতে। সিল্কের একটা রয়্যাল ব্লু শাড়ি আজ জোয়ার পরনে, যা আসিফ নিজে গত সপ্তাহে সিঙ্গাপুর থেকে এনে দিয়েছিল। শাড়ির জমিনটা বড্ড মসৃণ, কিন্তু জোয়ার মনে হচ্ছিল ওটা যেন একটা রেশমি অজগর, যা তার শরীরের চারপাশে কুন্ডলী পাকিয়ে বসে আছে। মুখে একটা মাপা, বিনীত হাসি ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করল সে—যা এই পুরুষতান্ত্রিক আভিজাত্যের জগতের চোখে একজন ‘আদর্শ উচ্চবিত্ত গৃহবধূ’র পরম খোলস।
-"শোনো জোয়া, আজকের লিপস্টিকটা একটু বেশি উগ্র লাগছে না? ওটা বদলে হালকা কোনো নিউড বা প্যাস্টেল শেড দাও, তোমাকে ভদ্র আর সফিস্টিকেটেড দেখাবে।"
হঠাৎ ওয়াশরুমের দরজা খুলে ভেজা চুলে আসিফ বের হতে হতে কথাটি বলল। তার পরনে দামী সিল্কের বাথরোব, হাতে ট্রিমার। আসিফের গলাটা অত্যন্ত মার্জিত, সুশীল। সে কখনোই চিৎকার করে না, গায়ে হাত তোলে না, কখনো কোনো সস্তা গালিগালাজ তার মুখ দিয়ে বের হয় না। কিন্তু তার এই ঠাণ্ডা, পরিপাটি শব্দবন্ধগুলো জোয়ার কানে তপ্ত সিসার মতো বাজতে লাগল। আসিফের এই অত্যাচারটা অনেক বেশি সূক্ষ্ম, মনস্তাত্ত্বিক। সে জোয়ার প্রতিটি ছোট ছোট ইচ্ছাকে, তার সত্ত্বাকে মৃদু হেসে, পরম যত্নের ভেক ধরে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেয়।
জোয়া আয়নায় আসিফের প্রতিফলনের দিকে তাকাল। আসিফ তখন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের দাড়ি ট্রিম করতে ব্যস্ত। জোয়া শান্ত গলায় বলল, "উগ্র মানে কী আসিফ? এটা জাস্ট একটা ক্লাসিক রেড শেড। রাতের ডিনারে এই শাড়ির সাথে এটা বেশ মানায়।"
আসিফ ট্রিমারটা বন্ধ করল। একটা হালকা সুক্ষ্ম হাসির রেখা তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল, যা জোয়ার ভেতরের রাগটাকে আরও উস্কে দেয়। আসিফ জোয়ার কাঁধে হাত রাখল। স্পর্শটা ঠাণ্ডা, যেন কোনো রোবটের হাত। সে নরম গলায় বলল, "তুমি বুঝছ না সুইটহার্ট। আজ যারা আসছে, তারা ওল্ড মানি সোসাইটির মানুষ। তারা নারীদের মধ্যে একটা ক্লাসি, সাবলীল নীরবতা পছন্দ করে। রেড লিপস্টিক একটু... কেমন যেন অ্যাটেনশন সিকিং লাগে। আমি চাই না আমার কলিগরা তোমাকে অন্যভাবে জাজ করুক। গো অ্যান্ড চেঞ্জ ইট, ফর মাই সেক।"
‘ফর মাই সেক’—এই তিনটি শব্দ জোয়ার জীবনের সমস্ত দরজায় তালা লাগিয়ে দিয়েছে গত পাঁচ বছর ধরে। জোয়া দেশের অন্যতম নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি সাহিত্যের গোল্ড মেডেলিস্ট। একসময় তার খসখসে খাতার পাতায় উত্তর-উপনিবেশবাদী নারীবাদের ওপর বড় বড় থিসিস লেখা হতো। করিডোরে তার বন্ধুদের সাথে সাহিত্যের গভীর তত্ত্ব নিয়ে ঝড় উঠত। অথচ আজ তার পরিচয় কেবল আসিফ চৌধুরীর ড্রইংরুমের একটা দামী, সুন্দর শো-পিস। তার সমস্ত মেধা, তার প্রজ্ঞা আজ চাপা পড়ে গেছে দামী ডিনার সেট আর শেফদের তৈরি মেন্যু নির্বাচনের আড়ালে।
রাত আটটা বাজতেই পেন্টহাউসের কলিংবেলটা বেজে উঠল। জোয়া তার ঠোঁটের সেই লাল রংটা মুছে একটা ফ্যাকাশে গোলাপি শেড লাগাতে বাধ্য হয়েছিল। দরজা খুলতেই ভেতরে ঢুকলেন আসিফের কোম্পানির ম্যানেজিং ডিরেক্টর তানভীর সাহেব আর তার স্ত্রী শারমিন বেগম। তানভীর সাহেবের বয়স পঞ্চাশের কোঠায়, চোখে চশমা, আর মুখে একটা কর্পোরেট চাতুর্যের হাসি। শারমিন বেগমের পরনে ভারী জর্জেটের শাড়ি, গলায় হিরের নেকলেস যা ড্রইংরুমের আলোয় চকচক করে উঠছে।
"ওহ আসিফ! তোমার পেন্টহাউসের ইন্টেরিয়রটা কিন্তু জাস্ট মাইন্ডব্লোয়িং! আর জোয়া, তোমাকে তো আজ একদম অপ্সরার মতো লাগছে," শারমিন বেগম সোফায় বসতে বসতে কৃত্রিম উচ্ছ্বাস প্রকাশ করলেন।
জোয়া মুখে সেই মাপা হাসিটা ঝুলিয়ে বলল, "থ্যাংক ইউ ভাবি। আপনারা আসতে পারলেন, খুব ভালো লাগল। ভেতরে আসুন, ফ্রেশ হয়ে নিন।"
ডিনার টেবিলে যখন স্যুপ সার্ভ করা হচ্ছিল, তখন ব্যবসার নানা খুঁটিনাটি নিয়ে কথা শুরু হলো। কথার এক পর্যায়ে তানভীর সাহেব দেয়ালে ঝোলানো সেই বিমূর্ত ছবিটার দিকে তাকিয়ে বললেন, "আসিফ, এই পেইন্টিংটা কিন্তু বেশ ইন্টারেস্টিং। তবে মডার্ন আর্টের এই জ্যামিতিক জটিলতা আমি ঠিক মাথায় ঢোকাতে পারি না।"
জোয়া চামচটা হাতে নিয়ে একটু সোজা হয়ে বসল। সাহিত্যের ছাত্রী হিসেবে শিল্পের এই বিমূর্ততা তাকে টানে। সে নরম কিন্তু স্পষ্ট গলায় বলল, "আসলে স্যার, এই ছবিটা জ্যামিতিক জটিলতা নয়। শিল্পী এখানে অবদমিত মানবাত্মার একটা ক্রন্দন ফুটিয়ে তুলেছেন। এই যে চারপাশের ধূসর রঙ, এটা হলো সমাজের চাপিয়ে দেওয়া নিয়ম, আর মাঝের লাল বৃত্তটা হলো একটা ছটফটে প্রাণ, যা খাঁচা ভেঙে বেরিয়ে আসতে চাইছে।"
জোয়া তার কথা শেষ করতে পারল না। টেবিলের নিচ থেকে আসিফের ফর্মাল সুতো পরা জুতোটা জোয়ার পায়ে আলতো কিন্তু শক্তভাবে চেপে বসল। একটা তীব্র, গোপন সতর্কবার্তা।
আসিফ সঙ্গে সঙ্গে তানভীর সাহেবের দিকে তাকিয়ে অমায়িক হেসে বলল, "আরে স্যার, আপনি তো জানেনই, জোয়া ঢাকা ইউনিভার্সিটির সাহিত্যের ছাত্রী তো! সবসময় সবকিছুতে একটু বেশি ইমোশনাল আর ফিলোসফিক্যাল এঙ্গেল খোঁজে। আসলে এই ছবিটা আমি কিনেছিলাম স্রেফ লিভিংরুমের কালার প্যালেটের সাথে ম্যাচ করার জন্য। কর্পোরেট রিয়ালিটিতে এই থিওরির কোনো ভ্যালু নেই, হা হা।"
তানভীর সাহেব আর শারমিন বেগম আসিফের কথায় তাল মিলিয়ে হেসে উঠলেন। শারমিন বেগম বললেন, "একদম ঠিক বলেছ আসিফ। মেয়েদের বেশি পড়াশোনা আর মাথা খাটালে ঘরসংসার সামলানো মুশকিল হয়ে পড়ে। আমার তো বাপু এই সমস্ত আঁকিবুঁকি দেখার সময় নেই, রূপচর্চা আর শপিং নিয়েই দিন কেটে যায়।"
জোয়া স্তব্ধ হয়ে গেল। তার মুখের ভেতরের স্যুপটা তখন তিতো লাগছিল। আসিফ কত সহজে, কত আভিজাত্যের সাথে সবার সামনে জোয়ার বুদ্ধিমত্তাকে একটা 'মেয়েলি আদিখ্যেতা' বলে ছোট করে দিল। জোয়া চামচটা নামিয়ে রাখল। সে বুঝতে পারল, এই টেবিলে তার কোনো কণ্ঠস্বর নেই। তাকে এখানে রাখা হয়েছে শুধু খাবার পরিবেশন করার জন্য এবং আসিফের একজন সুন্দর ও বাধ্য স্ত্রী হিসেবে সার্টিফিকেট দেওয়ার জন্য।
মেহমানরা যখন রাত এগারোটা নাগাদ বিদায় নিল, তখন পেন্টহাউসের দরজা বন্ধ হতেই জোয়ার ভেতরের সেই মাপা হাসিটা এক সেকেন্ডে মিলিয়ে গেল। সে ক্লান্ত পায়ে ড্রইংরুমের সোফায় এসে বসল। তার শরীর রি রি করছিল অপমানে।
আসিফ তার টাইয়ের নটটা আলগা করতে করতে ড্রইংরুমে এলো। তার মুখে তখন এক ধরনের বিজয়ের তৃপ্তি। সে জোয়ার দিকে তাকিয়ে বলল, "ডিনারটা চমৎকার হয়েছিল জোয়া। তানভীর স্যার খুব ইমপ্রেসড। তবে ওই পেইন্টিং নিয়ে তোমার ওই লেকচারটা দেওয়ার কোনো দরকার ছিল না। ডিনার টেবিলে কেউ আর্ট ক্রিটিক শুনতে আসে না। ওটা বড্ড চিপ শোনায়।"
জোয়া আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে উঠে দাঁড়িয়ে আসিফের মুখোমুখি হলো। তার বুকটা কাঁপছিল রাগে। সে বলল, "চিপ শোনায়? আমি একটা যুক্তিসঙ্গত কথা বলেছি আসিফ। আমার একটা নিজস্ব মতামত আছে, আমার একটা শিক্ষা আছে। তুমি সবার সামনে আমাকে এভাবে ইনসাল্ট করতে পারো না!"
আসিফ একটুও উত্তেজিত হলো না। সে জোয়ার দিকে কয়েক পা এগিয়ে এলো। তার চোখ দুটো ঠাণ্ডা, কোনো আবেগ নেই। সে অত্যন্ত ধীর লয়ে বলল, "ইনসাল্ট? আমি তোমাকে প্রটেক্ট করছিলাম জোয়া। এই সমাজটা তুমি বোঝো না। এখানে নারীদের বেশি পণ্ডিতি দেখাতে নেই। আমি তোমাকে এই রাজপ্রাসাদে রেখেছি, দামী শাড়ি-গহনা দিচ্ছি, একটা বিলাসবহুল জীবন দিচ্ছি—এর বিনিময়ে আমি শুধু একটু ভদ্রতা আর উইশফুল সাইলেন্স আশা করি। এটা কি খুব বেশি চাওয়া?"
-"আমি তোমার কেনা কোনো পুতুল নই আসিফ!" জোয়ার গলাটা সামান্য চড়ে গেল।
আসিফ তার হাতটা তুলে জোয়ার ঠোঁটে আলতো করে আঙুল ছোঁয়ালা। স্পর্শটা এতটাই শীতল যে জোয়ার পুরো শরীর শিউরে উঠল। আসিফ বলল, "গলার আওয়াজ নিচে নামাও জোয়া। এই ফ্ল্যাটের দেওয়ালগুলো বড্ড পাতলা। আর হ্যাঁ, পুতুল নও বলেই তো তোমাকে আমার বিছানায় জায়গা দিই। নাও, চেঞ্জ করে বেডরুমে এসো। আই অ্যাম ওয়েটিং।"
আসিফ চলে গেল। জোয়া সেই শূন্য ড্রইংরুমে একা দাঁড়িয়ে রইল। তার মনে হলো, এই দামী রয়্যাল ব্লু সিল্কের শাড়িটা আসলে কোনো পোশাক নয়, এটা একটা ফাঁসির দড়ি, যা প্রতি মুহূর্তে তার শ্বাসরোধ করে চলেছে।
বেডরুমের আলোটা ম্লান। আসিফ ইতিমধ্যে বিছানায় শুয়ে পড়েছে। জোয়া যখন শাড়িটা বদলে একটা পাতলা সুতির নাইটগাউন পরে বিছানায় এসে বসল, তখন তার শরীর এবং মন দুই-ই সম্পূর্ণ মৃতপ্রায়।
আসিফ কোনো কথা না বলে জোয়াকে নিজের দিকে টেনে নিল। তার হাত দুটো জোয়ার পিঠের ওপর চলতে লাগল। এই স্পর্শে কোনো প্রেম নেই, কোনো উষ্ণতা নেই। আছে কেবল এক ধরনের জৈবিক অধিকার খাটানোর উগ্রতা। আসিফ জোয়ার নাইটগাউনের ওপরের বোতামগুলো একে একে খুলতে লাগল। তার চুম্বনে কোনো প্যাশন ছিল না, ছিল এক ধরনের যান্ত্রিক রুটিন। আসিফের কাছে জোয়ার শরীরটা কেবল তার সারাদিনের কর্পোরেট ক্লান্তি মেটানোর একটা মাধ্যম। সে একবারও জোয়ার চোখের দিকে তাকাল না, জানতে চাইল না জোয়া মানসিকভাবে এই মুহূর্তে প্রস্তুত কি না।
জোয়া চোখ বন্ধ করল। সে আর এই বিছানায় থাকতে চাইল না। তার বাস্তব শরীরটা আসিফের নিচে পিষ্ট হতে লাগল ঠিকই, কিন্তু তার অবচেতনের মনস্তত্ত্ব তাকে টেনে নিয়ে গেল এক সম্পূর্ণ ভিন্ন, নিষিদ্ধ জগতে। এই প্রথম জোয়া তার মনের ভেতরের অবদমিত কাম আর ফ্যান্টাসির ডানা দুটোকে পুরোপুরি মেলে দিল।
সে চোখ বন্ধ করে অন্ধকার ক্যানভাসে কল্পনা করতে লাগল এক অন্য পুরুষকে। এক সম্পূর্ণ অচেনা, বন্য এবং পৌরুষদীপ্ত অবয়ব।
কল্পনার সেই পুরুষটি আসিফের মতো সুশীল বা পরিপাটি নয়। তার গায়ের রঙ রোদে পোড়া তামাটে, তার শরীর থেকে বের হচ্ছে এক আদিম, পুরুষালী ঘাম আর ভেজা মাটির তীব্র সুবাস। তার হাত দুটো আসিফের মতো ঠাণ্ডা আর নরম নয়; তা খসখসে, শক্ত এবং প্রচণ্ড শক্তিশালী। কল্পনায় সেই পুরুষটি জোয়াকে কোনো দামী পেন্টহাউসে নয়, নিয়ে গেছে এক ঘন, কুয়াশাচ্ছন্ন আদিম অরণ্যের গভীরে। যেখানে কোনো সমাজের নিয়ম নেই, কোনো আসিফ চৌধুরীর শাসন নেই। সেই পুরুষটি জোয়ার চুলগুলো মুঠো করে ধরে তার মুখটা ওপরে তুলল। তার চোখে কোনো মেকি ভদ্রতা নেই, আছে এক তীব্র, গ্রাস করে নেওয়ার মতন লালসা—যা জোয়াকে ছোট করে না, বরং তাকে একজন নারী হিসেবে পূর্ণাঙ্গভাবে চিনে নেয়।
সেই পুরুষটির শক্ত ঠোঁট দুটো যখন জোয়ার গলায় আর বুকে বন্য পশুর মতো কামড় বসাল, জোয়া কল্পনায় ব্যথায় নয়, এক পরম অপার্থিব আনন্দে শিউরে উঠল। পুরুষটি তাকে বিছানায় শুইয়ে দিচ্ছে না, সে তাকে মাটির ওপর, ঝরাপাতার বিছানায় চেপে ধরছে। তার প্রতিটি স্পর্শে কোনো দয়া বা শাসন নেই, আছে এক আদিম, বন্য স্বাধীনতা। সে জোয়ার শরীরকে স্রেফ ব্যবহার করছে না, সে জোয়াকে এক তীব্র কামের আগুনে পুড়িয়ে খাক করে দিচ্ছে, যেখানে জোয়া নিজেও সমানভাবে দাহ্য।
বাস্তব বিছানায় আসিফ যখন তার যান্ত্রিক প্রক্রিয়া শেষ করে একসময়ে জোয়ার ওপর থেকে নেমে পাশে শুয়ে পড়ল এবং কয়েক মিনিটের মাঝেই তার ক্লান্ত, ভারী নিঃশ্বাসের শব্দ পাওয়া যেতে লাগল, জোয়ার শরীর তখনো কাঁপছিল। কিন্তু এই কম্পন আসিফের জন্য নয়। এই কম্পন ছিল তার অবচেতনের সেই কাল্পনিক পুরুষের তীব্র স্পর্শের অবশিষ্টাংশ।
জোয়া অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে রইল। তার তলপেটে তখনো এক অপূর্ণ খিদের হাহাকার, এক তীব্র কামের জোয়ার। সে বুঝতে পারল, আসিফ তার শরীরটাকে হয়তো চার দেওয়ালে বন্দি করে রাখতে পেরেছে, কিন্তু তার ভেতরের যে আদিম নারীত্ব, তার যে তীব্র যৌন আকাঙ্ক্ষা আর স্বাধীনতার ফ্যান্টাসি—তাকে শেকল পরানোর ক্ষমতা এই সমাজের কোনো আসিফ চৌধুরীর নেই। এই অন্ধকূপের ভেতর দাঁড়িয়ে জোয়া আজ রাতে নিজের ভেতরের এক নতুন শাসককে আবিষ্কার করল। সে আর কোনো বাধ্য লতা নয়; সে নিজেই এখন থেকে তার কামনার অরণ্যের একমাত্র রানী।
Posts: 1,051
Threads: 0
Likes Received: 504 in 479 posts
Likes Given: 1,104
Joined: Jan 2024
Reputation:
14
•
Posts: 54
Threads: 3
Likes Received: 295 in 40 posts
Likes Given: 161
Joined: May 2023
Reputation:
102
দ্বিতীয় অধ্যায়: শব্দের খাঁচা ও কাল্পনিক চাদর
মফস্বল শহরের ঝুম বৃষ্টিতে মেদিনীপুরের ছায়াঘেরা গলিটা তখন সম্পূর্ণ মাখামাখি হয়ে আছে। আকাশ ভেঙে নেমে আসা এই শ্রাবণের বৃষ্টির কোনো ক্লান্তি নেই। পুরনো ইটের দেওয়াল বেয়ে শ্যাওলার সবুজ দাগগুলো পানির স্পর্শে আরও গাঢ় হয়ে উঠছে। জানালার লোহার গ্রিলটা শক্ত করে ধরে দাঁড়িয়ে ছিল প্রিয়ংবদা। গ্রিলের ঠাণ্ডা লোহাটা তার হাতের তালুতে এক ধরনের অবশ অনুভূতি তৈরি করছে, কিন্তু প্রিয়ার সেদিকে খেয়াল নেই। জানালার বাইরে আদিম উন্মাদনায় ঝরতে থাকা বৃষ্টির ছাঁট এসে লাগছে তার মুখে, চোখে, কলারবোনে। ভেজা মাটির তীব্র সোঁদা গন্ধটা বাতাসের ডানায় ভর করে এসে মিশে যাচ্ছে তার খোলা চুলে আর সুতির সাধারণ শাড়ির আঁচলে। এই গন্ধটা প্রিয়াকে এক অদ্ভুত অতীতে টেনে নিয়ে যায়, কিন্তু পরক্ষণেই ঘরের ভেতরের ভারী বাতাস তাকে আছড়ে ফেলে এক নিষ্ঠুর বাস্তবে।
আজ কলেজ থেকে ফেরার পথে মেদিনীপুরের বড় হাটের মোড়ে আচমকাই এক পুরনো বান্ধবীর সাথে দেখা হয়েছিল প্রিয়ার। মিতা। কলেজ জীবনের পর দীর্ঘ এক দশক পর তাদের এই আকস্মিক সাক্ষাৎ। চেনা মানুষকে এত বছর পর চেনা চত্বরে দেখে প্রিয়া নিজের চারপাশের সমস্ত সামাজিক খোলস এক মুহূর্তের জন্য ভুলে গিয়েছিল। মিতা যখন তাদের কলেজের এক খ্যাপাটে শিক্ষকের পুরনো এক কাণ্ড নিয়ে একটা চুটকি শোনাল, প্রিয়া তখন নিজেকে ধরে রাখতে পারেনি। সে মাথা পেছন দিকে হেলিয়ে, বুক খুলে এক চিলতে অকৃত্রিম আনন্দে জোরে হেসে ফেলেছিল। সেই হাসিতে কোনো কৃত্রিমতা ছিল না, কোনো মাপা ভদ্রতার শেকল ছিল না। ওটা ছিল খাঁচামুক্ত এক বুনো পাখির ডানা ঝাপটানোর শব্দ।
ঠিক তখনই তার স্বামী, মেদিনীপুর কলেজের নামী এবং অত্যন্ত সম্মানিত অধ্যাপক বিকাশ চ্যাটার্জি, ছাতা মাথায় দিয়ে পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। ভরা বাজারে, একদল সাধারণ মানুষ, দোকানদার আর সহকর্মীদের সামনে প্রিয়ার ওই উচ্চস্বরে হাসিটা বিকাশের চোখে গিয়ে বিঁধেছিল। বিকাশ চ্যাটার্জি প্রিয়াকে টেনে ধরেননি, কোনো দৃশ্য তৈরি করেননি। তিনি শুধু মাঝরাস্তায় এক সেকেন্ডের জন্য থমকে দাঁড়িয়েছিলেন। তারপর প্রিয়ার চোখের দিকে তাকিয়ে এমন এক শীতল, তীব্র এবং শাসনভারাক্রান্ত দৃষ্টি দিয়েছিলেন—যা কোনো ধারালো ছুরির চেয়েও তীক্ষ্ণ। সেই হিমশীতল চোখের চাউনিতে কোনো ক্রোধের আগুন ছিল না, ছিল এক পরম অবজ্ঞা এবং মালিকানার চাবুক। প্রিয়ার ভেতরের সেই আদিম, অকৃত্রিম হাসিটা ওই এক সেকেন্ডের চাউনিতে নিমেষের মধ্যে কর্পূরের মতো উড়ে গিয়ে এক জমাট বাঁধা ভয়ে রূপ নিয়েছিল।
হাটের সেই ঘটনার পর তিন ঘণ্টা কেটে গেছে। বিকাশ চ্যাটার্জির এই আদিপুরুষীয় চুনট করা আভিজাত্যের বাড়িতে এখন কেবল বৃষ্টির শব্দের রাজত্ব। বাড়িতে ফেরার পর থেকে বিকাশ প্রিয়ার সাথে একটা শব্দও বলেনি। সে নিজের জুতো জোড়া পরিপাটি করে গুছিয়ে রেখেছে, ছাতাটা বারান্দায় মেলে দিয়েছে, তারপর কাপড় বদলে ড্রইংরুমের ইজিচেয়ারে গিয়ে বসেছে। এই ‘সাইলেন্ট ট্রিটমেন্ট’ হলো বিকাশ চ্যাটার্জির সবচেয়ে বড় এবং ভয়ঙ্কর মনস্তাত্ত্বিক অস্ত্র। সে কখনো চিৎকার করে বাড়ি মাথায় তোলে না, কখনো কোনো কুরুচিপূর্ণ গালিগালাজ তার মুখ দিয়ে বের হয় না। কিন্তু তার এই পাথুরে, হিমশীতল নীরবতা প্রিয়ার আত্মসম্মানকে ভেতরের নরম মাংসের মতন কুঁড়ে কুঁড়ে খায়। সে প্রিয়াকে এমনভাবে অগ্রাহ্য করে, যেন প্রিয়া এই ঘরের কোনো মানুষ নয়, স্রেফ বাতাসে ভেসে থাকা একটা অদৃশ্য ধূলিকণা।
প্রিয়া রান্নাঘর থেকে ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপটা নিয়ে এসে বিকাশের সামনের টেবিলে রাখল। কাপের সিরামিকের মৃদু টুংটাং শব্দ ছাড়া ঘরে কোনো আওয়াজ নেই। প্রিয়া দরজার চৌকাঠে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে অত্যন্ত বিনীত, প্রায় অপরাধী গলায় বলল, "চা এনেছি। একটু খেয়ে নাও।"
বিকাশ চ্যাটার্জি তার চশমাটা নাক থেকে একটু নামালেন। কোলে রাখা রবীন্দ্রনাথের 'গল্পগুচ্ছ' বইটার পাতা উল্টাতে উল্টাতে সে প্রিয়ার দিকে একবারও তাকাল না। সে অত্যন্ত ধীরস্থিরভাবে চায়ের কাপটা হাতে নিল, একটা চুমুক দিল, তারপর কাপটা নামিয়ে রেখে আবার বইয়ের পাতায় চোখ ফেরাল। প্রিয়া সেখানে দাঁড়িয়ে রইল এক মূর্তির মতো। সে জানে, এই নীরবতার মেয়াদ হয়তো আগামী তিনদিন কিংবা এক সপ্তাহ চলবে, যতক্ষণ না প্রিয়া নিজে গিয়ে বিকাশের পায়ে হাত দিয়ে নিজের ভুলের জন্য ক্ষমা চাইছে। এই পুরুষতান্ত্রিক নীরবতা আসলে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক ফাঁসি, যা নারীকে প্রতি মুহূর্তে মনে করিয়ে দেয় যে তার অস্তিত্বের চাবিকাঠি অন্য কারোর হাতে।
প্রিয়া পায়ে পায়ে নিজের শোবার ঘরের ড্রেসিং টেবিলের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। ড্রেসিং টেবিলের কাঠের ফ্রেমে আয়নাটা বড্ড পুরনো, পারদ চটে যাওয়া আয়নায় নিজের অবয়বটা কেমন ভাঙা ভাঙা দেখাল। প্রিয়া লক্ষ্য করল, তার সুতির শাড়ির ওড়নাটা গলার কাছে অত্যন্ত শক্ত করে জড়ানো। মফস্বল সমাজের চোখে একজন শিক্ষিকা এবং একজন প্রথিতযশা অধ্যাপকের স্ত্রীর পোশাক কেমন হওয়া উচিত, তা এই সমাজ প্রতিদিন প্রিয়াকে শিখিয়েছে।
"মেয়েরা রাস্তাঘাটে অত জোরে হাসলে লোকে কী ভাবে বলো তো প্রিয়া? তুমি একজন কলেজের শিক্ষিকা, সমাজের ১০টা মানুষ তোমাকে চেনে। একজন নারীর মধ্যে একটু গাম্ভীর্য, একটু রহস্য থাকা দরকার। উগ্র চপলতা সস্তা মেয়েদের লক্ষণ।"
অতীতে বিভিন্ন সময়ে বিকাশের শান্ত অথচ ধারালো গলায় বলা এই কথাগুলো প্রিয়ার মাথার ভেতর এই বৃষ্টির শব্দের সাথে তাল মিলিয়ে ঘুরপাক খেতে লাগল। প্রিয়া নিজের হাত দুটো দিয়ে গলার ওড়নাটা একটু আলগা করতে চাইল, কিন্তু পারল না। তার মনে হলো, পুরুষতান্ত্রিক সমাজ কেবল একজন নারীর শরীর বা তার পোশাকের দৈর্ঘ্য নিয়ন্ত্রণ করে ক্ষান্ত হয় না; তারা নারীর কণ্ঠস্বরের ডেসিবেল, তার হাসির তীব্রতা, এমনকি তার ফুসফুস থেকে বাতাস বেরিয়ে আসার গতিপথ পর্যন্ত নিজেদের মুঠোয় রাখতে চায়। নারীকে হতে হবে নিচু স্বরের, বিনয়ী, এবং সর্বদা এক অদৃশ্য পর্দার অন্তরালে থাকা এক ম্লান ছায়া।
বিকাশের এই ধারাবাহিক মানসিক ক্রুরতা আর প্রতিদিনের এই অদৃশ্য দেওয়ালের বিপরীতে প্রিয়ার মন আজ আর ঘরে থাকতে চাইল না। সে এই বৃষ্টির শব্দকে ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক বানিয়ে নিজের অবচেতনের দরজাগুলো একে একে খুলে দিল। তার মন ছিটকে চলে গেল এক দশক আগের এক সম্পূর্ণ ভিন্ন দিনগুলোতে—তার আঠারো বছর বয়সের সেই উন্মাতাল কলেজ জীবনে।
প্রিয়ার মনের ক্যানভাসে ভেসে উঠল সাব্বিরের মুখ। সাব্বির—যাকে প্রিয়া কোনোদিন নিজের করে পায়নি জাত-ধর্ম আর রক্ষণশীল পরিবারের নির্মম বেড়াজালে, কিন্তু যে প্রিয়ার মনের গভীরে এক আজন্মের সিংহাসন পেতে বসে আছে। সাব্বির ছিল বিকাশ চ্যাটার্জির সম্পূর্ণ বিপরীত এক মেরুর পুরুষ। সে প্রিয়ার এই চপলতা, প্রিয়ার এই খিলখিলিয়ে ওঠা উচ্চস্বরের হাসিকে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর সুর মনে করত।
প্রিয়ার মনে পড়ে গেল তাদের কলেজ জীবনের সেই বিশেষ একটা দুপুরের কথা। তখনো মেদিনীপুরের বুকে এমন এক শ্রাবণের বৃষ্টি নেমেছিল। কলেজের বারান্দায় দাঁড়িয়ে প্রিয়া যখন মিতার সাথেই একটা মজার গল্পে মেতেছিল এবং তার সেই চিরচেনা মুক্ত হাসিটা হাসছিল, সাব্বির দূর থেকে একটা খাতা বুকে চেপে ধরে প্রিয়ার দিকে তাকিয়ে ছিল। প্রিয়া যখন হাসতে হাসতে খেয়াল করল যে সাব্বির তার দিকে মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাকিয়ে আছে, সে লজ্জিত গলায় জিজ্ঞেস করেছিল, "কী দেখছ অমন করে? আমি কি বেশি জোরে হাসছি?"
সাব্বির তার সেই গভীর, মায়াবী চোখ দুটো প্রিয়ার চোখের ওপর রেখে বলেছিল, "প্রিয়া, তোমার এই হাসিটা যখন আমি শুনি, আমার মনে হয় পৃথিবীর সমস্ত যুদ্ধ এক সেকেন্ডে থেমে গেছে। তুমি যখন হাসো, তোমার চারপাশের বাতাসটাও যেন জীবন্ত হয়ে ওঠে। কোনোদিন নিজের এই হাসিটাকে কারও জন্য থামিয়ে দিও না।"
সাব্বির প্রিয়ার মেধার কদর করত। প্রিয়া যখন কোনো কবিতা লিখত, সাব্বির সেই কবিতার প্রতিটি শব্দের পেছনের মনস্তত্ত্ব নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আলোচনা করত। সে প্রিয়াকে কোনো খাঁচায় বন্দি করতে চায়নি, বরং সে প্রিয়ার ডানায় আরও কিছু আকাশ জুড়ে দিতে চেয়েছিল। আজ এই নিস্তব্ধ, নিঃসঙ্গ নরকগুলজারে দাঁড়িয়ে প্রিয়া তীব্রভাবে টের পায় যে একজন প্রকৃত পুরুষের পৌরুষ নারীকে ছোট করায় নয়, বরং তাকে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে বিকশিত হতে দেওয়ার মাঝে লুকিয়ে থাকে।
রাত গভীর হতে লাগল। বাইরের বৃষ্টির তীব্রতা এখন আরও বেড়েছে, ঘরের পেছনের আমগাছটার পাতাগুলো বাতাসের ধাক্কায় জানালার কাঁচের ওপর আছড়ে পড়ছে। বিকাশ চ্যাটার্জি ডিনার শেষ করে যথারীতি কোনো কথা না বলে বিছানার একপাশে শুয়ে পড়েছে। সে যথারীতি প্রিয়ার দিকে পিঠ ফিরিয়ে, নিজের চাদরটা গায়ে জড়িয়ে গভীর ঘুমে মগ্ন। তাদের মধ্যে এখন কোনো শারীরিক সম্পর্কও নেই, যা আছে তা কেবল এক ছাদের নিচে দুই অচেনা প্রাণীর সহবস্থান।
প্রিয়া বিছানার অন্য প্রান্তে গিয়ে শুয়ে পড়ল। তার চোখ দুটো খোলা, ঘরের সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে সে নিজের ভেতরের অবদমিত নারীত্বকে অনুভব করার চেষ্টা করল। বিকাশের এই নীরব বয়কট আর মানসিক অত্যাচার প্রিয়ার শরীরের ভেতরের কামনার আগুনকে নেভাতে পারেনি, বরং তাকে আরও বেশি হিংস্র আর ব্যাকুল করে তুলেছে। প্রিয়া একজন ভারতীয় মফস্বলের নারী, তার সংস্কার, তার পারিবারিক মূল্যবোধ তাকে কোনোদিন অন্য কোনো পুরুষের বিছানায় বাস্তবে যেতে দেবে না। সে জানে, সে কোনোদিন পরকীয়া করতে পারবে না। কিন্তু এই দমবন্ধ করা খাঁচায় নিজের মানসিক ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য সে রোজ রাতে নিজের মনের ভেতরে এক নিষিদ্ধ, গভীর এবং স্বাধীন জগতের জন্ম দেয়।
প্রিয়া আস্তে করে চোখ দুটো বন্ধ করল। সে আর মেদিনীপুরের এই স্যাঁতসেঁতে, নেপথালিনের গন্ধ ছড়ানো বিছানায় নেই। সে চোখ বন্ধ করে আবাহন করল সাব্বিরকে। তার আঠারো বছরের সেই সাব্বির আজ প্রিয়ার কল্পনায় এক পূর্ণাঙ্গ, দীর্ঘদেহী, চরম পুরুষালী এবং তীব্র আকর্ষক পুরুষে রূপান্তরিত হয়েছে।
কল্পনার সেই অন্ধকার অবয়বে সাব্বির প্রিয়ার বিছানার পাশে এসে বসেছে। তার গায়ের থেকে কোনো সস্তা সুগন্ধি নয়, বের হচ্ছে সেই কলেজের বকুলতলার শুকনো পাতা আর বৃষ্টির মাটির এক মাতাল করা ঘ্রাণ। সাব্বির অত্যন্ত ধীর লয়ে, পরম শ্রদ্ধায় প্রিয়ার গলার সেই শক্ত করে জড়ানো ওড়নাটা নিজের হাত দিয়ে খুলে দিল। তার খসখসে, উষ্ণ হাত দুটো যখন প্রিয়ার গলার স্পর্শকাতর ত্বকে ঠেকল, প্রিয়ার বাস্তব শরীরটা এই ঠাণ্ডা ঘরে শুয়েই এক অজানা কামনায় শিউরে উঠল।
কল্পনায় সাব্বির প্রিয়ার চোখের দিকে তাকাল। সেই চোখে কোনো শাসন নেই, কোনো অবজ্ঞা নেই; আছে এক পরম সমর্পণ আর কামনার তীব্র ব্যাকুলতা। সাব্বির তার শক্ত, পুরুষালী হাত দুটো দিয়ে প্রিয়ার মুখটা আলতো করে নিজের দিকে ঘোরাল। তারপর অত্যন্ত নিচু, গভীর কণ্ঠে বলল, "প্রিয়া, ওরা তোমার কণ্ঠস্বর কেড়ে নিতে চেয়েছিল, কিন্তু আমি তোমার ভেতরের সেই অবাধ্য নদীটাকে দেখতে পাই।"
প্রিয়া কল্পনা করতে লাগল সাব্বিরের সেই উষ্ণ ঠোঁট দুটো তার ঠোঁটের ওপর নেমে আসছে। বিকাশের মতন কোনো যান্ত্রিক বা পাশবিক জোর নেই এই চুম্বনে, কিন্তু এর মধ্যে আছে এক অমোঘ, বন্য অধিকার। সাব্বিরের ঠোঁট প্রিয়ার ঠোঁটের ভেতরের সমস্ত না-বলা কথা, সমস্ত অবদমিত ক্ষোভ আর তৃষ্ণা যেন শুষে নিচ্ছে। কল্পনায় সাব্বিরের শক্ত, চওড়া বুকটা প্রিয়ার নরম শরীরের ওপর চেপে বসল। তার হাত দুটো প্রিয়ার শাড়ির আঁচল সরিয়ে তার উন্মুক্ত কোমরের ত্বকে এক তীব্র, দাবদাহ তৈরি করছে। প্রিয়া নিজের অবচেতনে অনুভব করতে পারল সাব্বিরের সেই আদিম, পুরুষালী শক্তি—যা তাকে আঘাত করে না, বরং তাকে এক চরম তৃপ্তির সাগরে ভাসিয়ে নিয়ে যায়।
এই নিষিদ্ধ, কাল্পনিক মিলনের তীব্রতায় প্রিয়ার বাস্তব শরীরের নিঃশ্বাসের গতি দ্রুত হতে লাগল। সে বিছানার চাদরটা নিজের হাত দিয়ে শক্ত করে খামচে ধরল, তার দুই উরু একে অপরের সাথে চেপে বসল এক তীব্র শারীরিক উত্তেজনায়। কল্পনার সাব্বির যখন তার শরীরের প্রতিটি গোপন ভাঁজে নিজের ভালোবাসার চাদর জড়িয়ে দিচ্ছে, প্রিয়ার ভেতরের সেই অবদমিত কাম এক পরম তৃপ্তির অর্গাজমে গিয়ে আছড়ে পড়ল। এক দীর্ঘ, শান্ত নিঃশ্বাস ফেলে প্রিয়া চোখ খুলল।
বাইরে তখনো বৃষ্টি পড়ছে। পাশে শুয়ে থাকা বিকাশ চ্যাটার্জি জানতেও পারল না যে তার এই নীরব চাবুকের সীমানা ভেঙে প্রিয়া আজ রাতেও এক সম্পূর্ণ অন্য পুরুষের বাহুতে নিজের স্বাধীনতা আর কামের উদযাপন শেষ করেছে। প্রিয়া মুচকি হাসল। এই সমাজ, এই বিয়ে, এই চার দেওয়াল হয়তো তার শরীরটাকে বন্দি রাখতে পারে, কিন্তু তার ভেতরের আসল অরণ্য আর তার কামনার তীব্র ফ্যান্টাসিকে শাসন করার ক্ষমতা পৃথিবীর কোনো পুরুষের নেই। সে এই খাঁচায় থেকেও এক পরম স্বাধীন বিজয়ী নারী।
Posts: 228
Threads: 0
Likes Received: 109 in 93 posts
Likes Given: 320
Joined: Sep 2024
Reputation:
7
Darun start ....chalia jan
Posts: 3,355
Threads: 0
Likes Received: 1,470 in 1,309 posts
Likes Given: 45
Joined: May 2019
Reputation:
34
Posts: 54
Threads: 3
Likes Received: 295 in 40 posts
Likes Given: 161
Joined: May 2023
Reputation:
102
তৃতীয় অধ্যায়: ভাঙনের শব্দ ও মাটির তৃষ্ণা
বরিশালের মেঘনা নদীর পাড়ে তখন কালবৈশাখীর ঘন কালো মেঘ জমছে। দুপুরের চড়া রোদকে এক লহমায় গিলে খেয়ে আকাশটা কেমন যেন এক অলৌকিক বেগুনী আর কালচে রঙের চাদর মুড়ি দিয়েছে। বাতাসটা হঠাৎ করেই তার চেনা গতিপথ বদলে এক হিংস্র পশুর মতো গোঙাতে গোঙাতে ছুটে আসছে চরের বুক চিরে। বাতাসের তীব্র ঝাপটায় কাঁচা ইলিশ মাছের আঁশটে গন্ধ, নদীর ওপাড়ের পলিমাটি আর নোনা জল ছিটকে এসে আছড়ে পড়ছে ফাতেমার মুখের ওপর। নদীর বুক থেকে উঠে আসা সেই জল কণার স্বাদ নোনতা, ঠিক যেমন ফাতেমার সারাজীবনের চোখের জলের স্বাদ।
ফাতেমা তাদের ভাঙাচোরা খড় আর টিনের চালার দাওয়ায় বসে একটা ক্ষয়ে যাওয়া লণ্ঠনের কাঁপা কাঁপা আলোয় কাঁচা আম কাটছিল। তার সামনে রাখা একখানা পুরনো লোহার বঁটি। বঁটির ডগাটা নোনা বাতাসে কিছুটা মরচে ধরা হলেও, তার ধারালো পেটটা লণ্ঠনের আলোয় মাঝে মাঝেই এক একটা ক্ষুরধার বিদ্যুতের মতন ঝিলিক দিয়ে উঠছিল। ফাতেমার হাতের নখগুলো কর্দমাক্ত, নদীর চরে কাজ করতে করতে চামড়া খসখসে হয়ে গেছে। সে একটা একটা করে আম কাটছিল আর তার ভেতরের সমস্ত শক্তি যেন ওই বঁটির ওপর গিয়ে পড়ছিল। আমের আঁটিটা যখন বঁটির টোকা খেয়ে দু-টুকরো হয়ে যাচ্ছিল, ফাতেমার মনে হচ্ছিল ওটা যেন আম নয়, মন্টু মাঝির বুকের পাঁজর।
আজ সকালেই ফাতেমার জীবনের শেষ সম্বলটুকু চিরতরে হারিয়ে গেছে। তার মা মরার আগে একটা সস্তা তামার ওপর সোনার জল করা কানের দুল দিয়ে গিয়েছিল। ওটা দামী কিছু ছিল না, কিন্তু ওই এক জোড়া দুলের মধ্যেই ফাতেমা তার শৈশবের মাটির গন্ধ, মায়ের আঁচলের ওম খুঁজে পেত। আজ সকালে মন্টু মাঝি এসে ফাতেমার চুলটা মুঠো করে ধরে হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে গেল উঠোনের মাঝখানে। চরের মাতব্বরদের সাথে নতুন করে জুয়া খেলার টাকা চাই তার। ফাতেমা যখন নিজের বুক দিয়ে দুল জোড়া আগলে রাখার চেষ্টা করেছিল, তখন মন্টু তার শক্ত, কাদা মাখা পা দিয়ে ফাতেমার তলপেটে একটা তীব্র লাথি বসিয়ে দেয়।
"হারামজাদী! এত বড় সাহস তোর? আমার মুখের ওপর কথা কস? দে কইতাছি, দুল জোড়া দে!"
মন্টুর গলার সেই মদ্যপ, কর্কশ চিৎকার চরের বাতাসকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল। ফাতেমা উঠোনের ধুলোয় পড়ে ছটফট করছিল, আর চারপাশের প্রতিবেশীরা যে যার ঘরের দরজা বন্ধ করে দিচ্ছিল। এই চরে কোনো নারীর আর্তনাদ কারো কান পর্যন্ত পৌঁছায় না। মন্টু ফাতেমার কান থেকে দুল জোড়া প্রায় ছিঁড়ে রক্তারক্তি করে নিয়ে চলে গেছে। প্রতিবাদ করায় যে পিটুনিটা ফাতেমা আজ খেয়েছে, তার নীল কালশিটে দাগগুলো এখন তার পিঠে, কোমরে আর স্তনের নিচে কামড়ে ধরে আছে।
কিন্তু ফাতেমা আজ কাঁদেনি। এই চরের উত্তাল বাতাসে আর মেঘনার নোনা জলে তার চোখের জল বহু বছর আগেই শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। সে শুধু ধুলোবালি মাখা মেঝে থেকে উঠে দাঁড়ানোর সময় মন্টুর চোখের দিকে তাকিয়েছিল। সেই লাল, নেশাগ্রস্ত চোখে কোনো অনুশোচনা ছিল না, কোনো দয়া ছিল না। ছিল এক আদিম, পশুতুল্য পুরুষতান্ত্রিক দম্ভ। মন্টু যাওয়ার সময় ফাতেমার মুখের ওপর থুতু ফেলে বলেছিল, "তুই আমার টাকা দিয়া বিয়া করা বউ। তোরে পিটামু না তো কারে পিটামু? বেশি চিল্লাচিল্লি করবি তো এক্কেবারে গাঙে ভাসাইয়া দিমু।"
এই নদীপাড়ের গ্রামটাতেই ফাতেমার জন্ম, এখানেই তার বেড়ে ওঠা। সে ছোটবেলা থেকেই দেখে এসেছে, মেঘনা নদীটা কেমন রাক্ষসীর মতো প্রতি বছর নিঃশব্দে এক একটা পাড় ভাঙে, মানুষের ভিটেমাটি গিলে খায়। আজ যে জমিটা সবুজ ফসলে ভরা, কাল সকালে তা নদীর পেটে। ফাতেমার মনে হয়, এই চরের পুরুষমানুষগুলোও ঠিক ওই নদীর মতোই। তারা প্রতিদিন, প্রতি রাতে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে মেয়েদের স্বপ্নগুলো, তাদের শরীর আর আত্মসম্মানকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয়।
মন্টু মাঝির সাথে তার বিয়ে হয়েছিল মাত্র চৌদ্দ বছর বয়সে। তখন সে শরীর কী, পুরুষ কী—তার কিছুই বুঝত না। বিয়ের প্রথম রাত থেকেই মন্টু তার ওপর যে আদিম পাশবিকতা চালিয়ে আসছে, তা ফাতেমার কাছে কোনো প্রেম ছিল না, ছিল স্রেফ এক রক্তাক্ত শিকারের মতন। এই প্রতিদিনের অবমাননা, এই পশুর মতন যাপন ফাতেমার ভেতরের এক কোমল বালিকাকে বহু আগেই মেরে ফেলেছে। কিন্তু তার জায়গায় এখন জন্ম নিয়েছে এক ভয়ঙ্কর, ঠাণ্ডা এবং বিষাক্ত হিংসা।
বিকেলের আলো পুরোপুরি মুছে গিয়ে যখন কালবৈশাখীর রাত নামল, তখন চরের আকাশ চিরে বজ্রপাত হতে শুরু করেছে। মন্টু মাঝি নদীর ঘাট থেকে মদ গিলে, জুয়ায় সব হেরে ল্যাংচাতে ল্যাংচাতে ঘরে ফিরে এলো। এসেই কোনো কথা না বলে চৌকির ওপর ধপ করে শুয়ে পড়ল। কিছুক্ষণের মধ্যেই তার নাক ডাকার বিকট শব্দ আর মুখের সস্তা মদের পচা গন্ধ পুরো ছোট ঘরটায় ছড়িয়ে পড়ল।
ফাতেমা তখনো দাওয়ায় বসে আছে। তার চোখ দুটো গিয়ে আটকাল ঘরের কোণে পড়ে থাকা সেই ভারী, ধারালো বঁটিটার ওপর। ঘরের টিনের চালার একটা ফুটো দিয়ে আসা বিদ্যুতের আলোয় বঁটিটা যেন ফাতেমাকে ডাকছিল। ফাতেমার শিরায় শিরায় এক অদ্ভুত, আদিম রাগ বয়ে যেতে লাগল। তার ভেতরের অবদমিত বাঘিনীটা ফিসফিস করে বলতে লাগল— “উঠে দাঁড়া ফাতেমা। এই লোকটা যখন অঘোরে ঘুমাচ্ছে, এক কোপে তার ওই অহংকারী গলাটা দু-টুকরো করে দে। যে হাত দিয়ে সে তোর মায়ের স্মৃতি কেড়ে নিয়েছে, সেই হাতটা কেটে গাঙে ভাসিয়ে দে।”
ফাতেমা বঁটিটার দিকে তাকিয়ে এক দৃষ্টিতে বসে রইল। তার হাত দুটো কাঁপছিল, কিন্তু সেই কাঁপাটা ভয়ের ছিল না, ওটা ছিল এক চরম উত্তেজনার। সমাজ হয়তো তাকে খুনি বলবে, পুলিশ এসে তাকে ধরে নিয়ে যাবে, হয়তো তার ফাঁসি হবে। কিন্তু ফাতেমার মনে হলো, ফাঁসির মঞ্চটাও মন্টু মাঝির এই নরককুন্ডের চেয়ে অনেক বেশি শান্তির হবে। সে অন্তত একটা রাতের জন্য হলেও এই পুরুষতান্ত্রিক চাবুক থেকে সম্পূর্ণ মুক্তি পাবে।
টিনের চালে তখন বৃষ্টির উন্মাদনা শুরু হয়েছে। বড় বড় ফোটার বৃষ্টিগুলো যখন পুরনো টিনের ওপর আছড়ে পড়ছে, মনে হচ্ছে যেন হাজারটা ড্রাম একসাথে বাজছে। বাতাসের ধাক্কায় ঘরের বাঁশের বেড়াটা মড়মড় করে উঠছে। ফাতেমা বঁটিটা হাত দিয়ে ধরল না। সে এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঘরের ভেতর ঢুকে মন্টুর থেকে অনেকটা দূরে, বিছানার এককোণে গুটিসুটি মেরে শুয়ে পড়ল। ছেঁড়া কাঁথাটা গায় দিয়ে সে চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ করল।
এই নোংরা, স্যাঁতসেঁতে, মদের গন্ধে দমবন্ধ হয়ে যাওয়া বিছানায় শুয়েও ফাতেমার অবচেতনের মনস্তত্ত্ব তাকে এক সম্পূর্ণ অন্য জগতে নিয়ে গেল। সে তো একজন নারী, তার খসখসে, রুক্ষ চামড়ার নিচেও তো একটা জ্যান্ত শরীর আছে, যা একটু আদর চায়, একটু সোহাগ চায়। মন্টু মাঝির মতন কোনো পশুর উগ্রতা নয়, সে চায় এমন একজন পুরুষের স্পর্শ—যে হবে প্রকৃত পৌরুষের প্রতীক।
ফাতেমা চোখ বন্ধ করে অন্ধকার চরের বুকে এক কাল্পনিক পুরুষের অবয়ব তৈরি করতে লাগল।
কল্পনার সেই পুরুষটি মন্টুর মতো নোংরা বা দূষিত নয়। সে অত্যন্ত লম্বা, চওড়া কাঁধ আর তার বুকের ছাতিটা যেন কোনো শক্ত পাথরের দেয়াল। তার শরীর থেকে মদের গন্ধ বের হয় না, তার শরীর থেকে আসে গভীর নদীর তাজা বাতাস আর চরের তপ্ত বালির এক তীব্র, মাতাল করা পুরুষালী ঘ্রাণ।
কল্পনায় সেই পুরুষটি ফাতেমার এই খসখসে, কাদা মাখা হাত দুটো পরম যত্নে নিজের বড়, উষ্ণ হাতের মুঠোয় তুলে নিল। তার ছোঁয়াতে কোনো আঘাত নেই, কোনো ক্ষত তৈরি করার জেদ নেই। পুরুষটি ফাতেমার চোখের দিকে তাকাল। সেই চোখে কোনো পশুর লালসা নেই, আছে এক অমোঘ, গভীর নদীসম ভালোবাসা—যা ফাতেমাকে এক সেকেন্ডে অবশ করে দেয়।
ফাতেমা কল্পনা করতে লাগল, সেই পুরুষালী শক্ত হাত দুটো যখন তার পিঠের কালশিটে দাগগুলোর ওপর পরম মমতায় বুলাচ্ছে, ফাতেমার বাস্তব শরীরটা এই ছেঁড়া কাঁথার নিচে শুয়েই এক অজানা কামে শিউরে উঠছে। পুরুষটি তার ঠোঁট দুটো ফাতেমার কানের কাছে নিয়ে এসে চরের আঞ্চলিক ভাষায় কিন্তু অত্যন্ত নরম, পুরুষালী কণ্ঠে বলছে, "ফাতেমা, তোর এই শরীরে আর কেউ কোনোদিন হাত তুলতে পারবে না। তুই শুধু আমার।"
কল্পনায় সেই প্রকৃত পুরুষটি ফাতেমার ভেজা সুতি শাড়িটা আলতো করে শরীর থেকে সরিয়ে দিচ্ছে। তার শক্ত, লড়াকু বুকটা ফাতেমার খসখসে শরীরের ওপর চেপে বসছে। এই মিলনে কোনো যান্ত্রিকতা নেই, কোনো জবরদস্তি নেই। পুরুষটি ফাতেমার শরীরের প্রতিটি ভাঁজকে, তার জরায়ুকে এক পরম তৃপ্তির আগুনে পুড়িয়ে দিচ্ছে, যেখানে ফাতেমা নিজেই নিজেকে সম্পূর্ণ সঁপে দিতে চাইছে। সেই কাল্পনিক পুরুষের তীব্র, বন্য অথচ শ্রদ্ধাপূর্ণ ভালোবাসার ঘর্ষণে ফাতেমা নিজেকে এক অনন্য উচ্চতায় আবিষ্কার করল, যেখানে সে কোনো চরের দাসী নয়, সে এক আদিম প্রকৃতির মতন স্বাধীন নারী।
ফাতেমা চোখ খুলল। টিনের চালের ফুটো দিয়ে বৃষ্টির জল এসে তার কপালে পড়ছে। পাশে মন্টু মাঝি একইভাবে পড়ে আছে। ফাতেমা ঠোঁটের কোণে এক চিলতে শীতল হাসি ফোটাল। এই চর, এই সমাজ, এই দারিদ্র্য আর মন্টুর চাবুক হয়তো তার বাস্তব জীবনটাকে নরক বানিয়ে রেখেছে; কিন্তু তার ভেতরের আসল যে কামনার আকাশ, তার যে গোপন তীব্র বাসনা—সেখানে আঘাত করার ক্ষমতা এই চরের কোনো পুরুষমানুষের নেই। সে তার নিজের কল্পনার পুরুষের বাহুডোরে জড়িয়ে এই সমাজকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে প্রতি রাতে বেঁচে থাকার এক নতুন বারুদ খুঁজে পায়।
Posts: 54
Threads: 3
Likes Received: 295 in 40 posts
Likes Given: 161
Joined: May 2023
Reputation:
102
চতুর্থ অধ্যায়: কুয়াশার অরণ্য ও অধরা বাঘিনী
শহরের এই নামী কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্ট্রাল লাইব্রেরির পেছনের চত্বরটা তখন বিকেলের ম্লান, পোড়া আলো আর পলিটিক্যাল আড্ডার চড়া শব্দে মুখরিত। চারপাশের বাতাসে ভাসছে সস্তা সিগারেটের ধোঁয়া, রাজপথের তপ্ত পিচের গন্ধ আর প্রধান ফটকের মোড় থেকে ভেসে আসা মাইকের একটানা কর্কশ স্লোগান। এই শহরের বাতাস বড্ড চটচটে, চর্বিযুক্ত ঘামের মতো তা গায়ের চামড়ায় লেপ্টে থাকে। এই কোলাহলের ঠিক মাঝখানে, এক প্রাচীন খসখসে গাছের গুঁড়িটাতে পিঠ ঠেকিয়ে চুপচাপ বসে ছিল এস্থার। তার পরনে একটা সাধারণ সুতির কুর্তি, কিন্তু কাঁধের ওপর ছেড়ে দেওয়া তার সিল্কের মতন কুচকুচে কালো, ভারী চুলগুলো যখন বাতাসের ধাক্কায় উড়ছিল, তখন তাকে এই যান্ত্রিক কংক্রিটের জঙ্গল থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন এক আদিম অরণ্যের টুকরো বলে মনে হচ্ছিল।
পাহাড়ি চা-বাগান আর কুয়াশাঘেরা আদিম অরণ্যের মিস্ট-শেকেন সবুজ উপত্যকা থেকে যখন সে প্রথম স্কলারশিপ পেয়ে এই শহরের বুকে পা রেখেছিল, তার মনে এক বুক স্বাধীনতা আর অচেনা স্বপ্ন ছিল। সে ভেবেছিল, শহরের শিক্ষিত, প্রগতিশীল এবং আধুনিক পুরুষদের জগতটা হয়তো তার চেনা আদিবাসী সমাজের রক্ষণশীল গণ্ডির চেয়ে অনেক বেশি উদার, অনেক বেশি শ্রদ্ধাশীল হবে। কিন্তু বাস্তবতা তাকে প্রতিদিন, প্রতি মুহূর্তে এক অদৃশ্য, ধারালো দেওয়ালে আছড়ে ফেলে। এই শহর তাকে একজন মানুষ হিসেবে দেখে না; দেখে স্রেফ একটা ভিন্ন জাতের, এক্সোটিক মাংসের টুকরো হিসেবে।
ঠিক তখনই চত্বরের দিক থেকে হলের কয়েকজন তথাকথিত প্রভাবশালী পলিটিক্যাল সিনিয়র ভাই চায়ের কাপ হাতে নিয়ে গাছের দিকে এগিয়ে এলো। তাদের চাউনিটা সোজা এসে পড়ল এস্তারের বুকের ওপর, তার চওড়া কলারবোন আর পাহাড়ি ফিগারের নিখুঁত গড়নের ওপর। তাদের মধ্যে খদ্দরের পাঞ্জাবি পরা একজন, যার মুখে দাড়ি আর চোখে এক নোংরা চাতুর্য, সে নিজের বন্ধুকে কনুই দিয়ে একটা ধাক্কা দিল। তারপর ইচ্ছে করেই একটু চড়া গলায় বলল, "কিরে শাহীন, দেখছিস? পাহাড়ের ওই প্রত্যন্ত অঞ্চলের মেয়েদের শরীরের খাঁজগুলো কিন্তু সমতলের মেয়েদের চেয়ে বড্ড অন্যরকম হয়। একদম বুনো নদীর মতো আঁকাবাঁকা। এদেরকে পোষ মানাতে পারলে কিন্তু আসল সুখ!"
তার বন্ধু শাহীন একটা কুৎসিত হাসি হেসে জবাব দিল, "আরে ভাই, এরা তো বুনো পাহাড়ের জাত। শুনছি এদের সমাজে নাকি মেয়েদের স্বাধীনতাই বেশি। বিছানায় এদের এনার্জি কেমন হয় রে? একবার ট্রাই মারতে পারলে লাইফ সেট!"
কথাগুলো বাতাসের ডানায় ভর করে একদম স্পষ্ট তীরের মতো এসে বিঁধল এস্তারের কানে। তার পুরো শরীরটা মুহূর্তের মধ্যে রি রি করে উঠল, শিরদাঁড়া বেয়ে এক তীব্র অপমানের ঠাণ্ডা স্রোত নেমে গেল। সে নিজের হাত দুটো শক্ত করে মুঠো করল, নখগুলো হাতের তালুর নরম চামড়ায় বসে গিয়ে এক ধরনের তীব্র ব্যথার জন্ম দিল। এই শহরে আসার পর থেকেই সে টের পায়, এখানকার তথাকথিত আধুনিক পুরুষদের লোলুপ দৃষ্টি কীভাবে তার জাতিগত পরিচয় আর তার নারীত্বকে একসাথে পরিমাপ করে। বাসে যাতায়াতের সময় কনুইয়ের নোংরা ধাক্কা, মোড়ের মাথায় অযাচিত টিটকারি, কিংবা ডিপার্টমেন্টের করিডোরে পেছন থেকে ভেসে আসা ফিসফিসানি—সবকিছুই তাকে মনে করিয়ে দেয় যে সে এই সমাজে একজন বহিরাগত, এবং একই সাথে শিকারী পুরুষদের জন্য একটা সহজ শিকার।
পাঞ্জাবি পরা ছেলেটা আরও দু-পা এগিয়ে এসে এস্তারের ঠিক সামনে দাঁড়াল। তার গা থেকে সস্তা ঘাম আর জর্দার গন্ধ বের হচ্ছিল। সে চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বলল, "কী গো এস্থার? একা একা বসে কী ভাবছ? আমাদের সাথে একটু আড্ডা দেবে না? নাকি পাহাড়ের মানুষ আমাদের মতন সমতলের ছেলেদের সাথে কথা বলতে লজ্জা পায়?"
এস্থার মাথা তুলল। তার চোখে তখন কোনো ভয় ছিল না, ছিল এক আদিম বাঘিনী মতন জ্বলন্ত হিংসা। সে সোজা ছেলেটার চোখের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত ধারালো, ঠাণ্ডা গলায় বলল, "আপনাদের মতন সস্তা চণ্ডালদের সাথে কথা বলার চেয়ে পাহাড়ের বুনো শুয়োরের সাথে বসে থাকা অনেক বেশি সম্মানের। সামনে থেকে সরুন, বাতাসের গন্ধ নষ্ট হচ্ছে।"
শাহীন নামের ছেলেটা রে রে করে উঠল, "কী রে হারামজাদী! এত বড় সাহস তোর? এই ইউনিভার্সিটিতে পইড়া নিজেকে ডানা কাটা পরী ভাবছিস? তোদের মতন মেয়েদের কীভাবে সাইজ করতে হয়, আমাদের জানা আছে।"
"শাহীন, চল তো! এদের মুখ বড্ড উগ্র। পাহাড়ি মাল তো, একটু বেশি গরম," পাঞ্জাবি পরা ছেলেটা শাহীনের হাত ধরে টেনে নিয়ে গেল ঠিকই, কিন্তু যাওয়ার সময় যে চাউনিটা দিয়ে গেল, তা বলে দিচ্ছিল যে তারা এই অপমানের শোধ নেওয়ার সুযোগ খুঁজবে।
এস্থার একাই বসে রইল। তার বুকটা হাপরের মতো উঠানামা করছিল। গত সপ্তাহে নিজের এলাকা থেকে তার দূর সম্পর্কের এক বড় ভাই ফোনে সুরক্ষার খোলসে এক শাসন বাণী শুনিয়েছিল—"এস্থার, শুনলাম তুমি নাকি আজকাল ক্যাম্পাসে ছেলেদের সাথে বেশি তর্ক করো? জিন্স-কুর্তি পরো? আমাদের পাহাড়ি সমাজের মেয়েরা কিন্তু এত স্বাধীনভাবে চলে না। বেশি উড়ো না, ডানা কেটে মাটিতে নামিয়ে দেবে সমাজ।"
ভালোবাসার নামে, সুরক্ষার খোলসে কীভাবে চারপাশের পুরুষরা তার সীমানাটা ছোট করে আনতে চায়, তা ভেবে এস্তারের ভেতরে এক তীব্র অবাধ্যতা দানা বাধে। এই দমবন্ধ করা পুরুষতান্ত্রিক নজরদারির বিপরীতে সে নিজের ভেতরে এক আদিম অরণ্যের স্বাধীনতাকে বাঁচিয়ে রাখতে চায়, যেখানে কোনো পুরুষ তাকে তার পোশাক, তার শরীর বা তার জাতি দিয়ে বিচার করার সাহস পাবে না।
ক্যাম্পাসের চারপাশটা এখন আরও অন্ধকার হয়ে গেছে। সোডিয়ামের হলদেটে আলোয় চারপাশটা কেমন যেন এক রহস্যময় মায়াজাল তৈরি করেছে। এস্থার লাইব্রেরির পেছনের অন্ধকার করিডোর ধরে হেঁটে যাচ্ছিল নিজের হলের দিকে। চারপাশের এই নোংরা পরিবেশ, ছেলেদের ওই কুৎসিত ‘মাল’ সম্বোধন তার ভেতরের নারীত্বকে চরমভাবে আঘাত করেছে। কিন্তু অদ্ভুতভাবে, এই তীব্র অপমানের প্রতিক্রিয়ায় তার শরীরের ভেতরের এক অবদমিত, সুপ্ত কামনার জগত জেগে উঠতে শুরু করল। সে তো একজন যুবতী নারী, তার শিরায় শিরায় বইছে বুনো পাহাড়ের তপ্ত রক্ত। সে পুরুষকে ঘৃণা করে ঠিকই, কিন্তু তার অবচেতনের মনস্তত্ত্ব এমন এক পুরুষকে খোঁজে, যে হবে এই চারপাশের নোংরা ছেলেদের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা—এক পারফেক্ট, প্রকৃত পুরুষ।
এস্থার করিডোরের একটা পিলারে হেলান দিয়ে চোখ দুটো বন্ধ করল। বাইরের স্লোগান আর কোলাহল এক মুহূর্তে উবে গেল। সে নিজের মনের ভেতরে এক নিষিদ্ধ, গভীর এবং বন্য ফ্যান্টাসির জন্ম দিল। সে চোখ বন্ধ করে আবাহন করল এমন এক পুরুষকে, যার অবয়ব কোনো মেকি আভিজাত্যে গড়া নয়।
কল্পনার সেই পুরুষটি দীর্ঘদেহী, তার চওড়া বুকটা যেন তার নিজের জন্মভূমির কোনো শক্ত গ্রানাইট পাথর দিয়ে তৈরি। তার শরীর থেকে কোনো সস্তা সিগারেট বা মদের গন্ধ বের হচ্ছে না; তার গা থেকে আসছে তার নিজের এলাকার গভীর বনের পাইন পাতা, কুয়াশা, বুনো চা-পাতা আর ভেজা মাটির এক তীব্র, ঝাঁঝালো পুরুষালী ঘ্রাণ।
কল্পনায় সেই পুরুষটি এস্থারের সামনে এসে দাঁড়াল। তার চোখে কোনো লোলুপতা নেই, কোনো সস্তা কামনার স্লেজিং নেই। আছে এক চরম, গ্রাস করে নেওয়ার মতন পৌরুষদীপ্ত তীব্রতা—যা এস্থারকে ভয় দেখায় না, বরং তার ভেতরের সমস্ত অবাধ্যতাকে এক সেকেন্ডে গলিয়ে দেয়।
পুরুষটি কোনো অনুমতি না নিয়ে এস্তারের সেই সিল্কের মতন কালো চুলগুলো নিজের শক্ত, খসখসে হাতের মুঠোয় পেঁচিয়ে ধরল। তার টানে কোনো হ্যারাসমেন্টের নোংরামি নেই, আছে এক অমোঘ বন্য অধিকার। সে এস্তারের মুখটা ওপরে তুলে তার ঠোঁটের দিকে তাকাল। এস্থার কল্পনায় অনুভব করতে পারল সেই পুরুষের তপ্ত নিঃশ্বাস, যা তার ঠোঁটের ওপর এসে আছড়ে পড়ছে।
পুরুষটি অত্যন্ত নিচু, গম্ভীর এবং পুরুষালী কণ্ঠে বলল, "ওরা তোকে সস্তা মাংস ভাবে এস্থার, কিন্তু তুই তো আমাদের পাহাড়ের একমাত্র বাঘিনী। তোকে শাসন করার ক্ষমতা শুধু আমার আছে।"
কল্পনায় সেই প্রকৃত পুরুষটি এস্তারের কুর্তির কাপড়টা বুক চিরে টেনে ছিঁড়ে ফেলল। তার শক্ত, লড়াকু ঠোঁট দুটো যখন এস্তারের কলারবোন আর স্তনের তপ্ত ভাঁজে বন্য পশুর মতো কামড় বসাল, এস্থার এই ঠাণ্ডা করিডোরে দাঁড়িয়েই এক পরম অপার্থিব সুখে নিজের চোখ দুটো আরও শক্ত করে বন্ধ করে নিল। পুরুষটি তাকে কোনো নরম বিছানায় নয়, নিয়ে গেছে তাদের সেই মেঘে ঢাকা পাহাড়ি ঝর্ণার পাড়ে, যেখানে পিঠ ঠেকিয়ে সে এস্তারের দুই উরু নিজের চওড়া কোমরের সাথে শক্ত করে চেপে ধরছে। এই মিলনে কোনো যান্ত্রিকতা নেই, কোনো ছলনা নেই। পুরুষটি নিজের চরম পৌরুষদীপ্ত শক্তি দিয়ে এস্তারের শরীরের প্রতিটি গোপন কোণকে জয় করে নিচ্ছে, আর এস্থার নিজের সমস্ত অবদমিত কাম, তার সমস্ত রাগ আর অহংকারকে সেই কাল্পনিক পুরুষের পায়ে উৎসর্গ করে দিচ্ছে। সেই তীব্র, রসালো এবং বন্য ঘর্ষণে এস্তারের ভেতরের সমস্ত শৈশব ট্রমা যেন এক মুহূর্তে পুড়ে ছাই হয়ে এক চরম অর্গাজমের সৃষ্টি করল।
করিডোরের অন্ধকারে এস্তারের বাস্তব শরীরের নিঃশ্বাসের গতি প্রচণ্ড দ্রুত হয়ে উঠল। সে পিলারটাকে নিজের দুই হাত দিয়ে শক্ত করে খামচে ধরল, তার উরু জোড়া একে অপরের সাথে তীব্র শারীরিক উত্তেজনায় চেপে বসল। এক দীর্ঘ, তৃপ্তিদায়ক উষ্ণ ভরা নিঃশ্বাস ফেলে সে চোখ খুলল।
ক্যাম্পাসের সোডিয়াম লাইটটা একইভাবে জ্বলছে। হলের গেটের দিকে হেঁটে যাওয়ার সময় এস্তারের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে শীতল, আত্মবিশ্বাসী হাসি ফুটে উঠল। এই শহর, এই পলিটিক্যাল বড় ভাইরা আর সমাজের চাপিয়ে দেওয়া দেওয়ালগুলো হয়তো তার বাস্তব জীবনটাকে প্রতিনিয়ত অবমূল্যায়ন করতে পারে; কিন্তু তার ভেতরের যে আদিম অরণ্য, তার যে তীব্র যৌন ফ্যান্টাসি আর কামের স্বাধীনতা—সেখানে থাবা বসানোর ক্ষমতা এই সমতলের কোনো সস্তা পুরুষের নেই। সে নিজের মনের ভেতরের সেই পারফেক্ট পুরুষের ওম বুকে নিয়ে এই শহরের বুকে এক অপরাজেয় বাঘিনীর মতো মাথা উঁচু করে হেঁটে গেল।
Posts: 1,051
Threads: 0
Likes Received: 504 in 479 posts
Likes Given: 1,104
Joined: Jan 2024
Reputation:
14
•
Posts: 54
Threads: 3
Likes Received: 295 in 40 posts
Likes Given: 161
Joined: May 2023
Reputation:
102
পঞ্চম অধ্যায়: মাপা কাপড়ের খাঁচা ও প্রকাশ্য লালসা
পরদিন সকালটা শুরু হলো এক অদ্ভুত মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন দিয়ে। গুলশানের সেই বিলাসবহুল পেন্টহাউসের ওয়াক-ইন ক্লোজেটের বিশাল আয়নাটার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল জোয়া। বাইরে তখন সকালের নরম রোদ চুইয়ে পড়ছে কাঁচের দেওয়াল বেয়ে। আলমারি খুলে সে একটা হালকা বেগুনি রঙের স্লিভলেস কটন শাড়ি বের করল। গরমের এই দিনগুলোয় এই শাড়িটা পরলে তার ত্বক কিছুটা শ্বাস নিতে পারে, নিজেকে একটু স্বাধীন মনে হয়। শাড়িটা গায়ে জড়িয়ে সে যখন আঁচলটা ঠিক করছিল, ঠিক তখনই আসিফ ওয়াশরুম থেকে বের হলো। তার মুখে তখনো শেভিং ক্রিমের সাদা ফেনা লেগে আছে, হাতে জ্বলজ্বলে রেজার।
আয়নায় জোয়ার স্লিভলেস ব্লাউজ আর উন্মুক্ত কাঁধের দিকে তাকিয়ে আসিফের হাতটা এক সেকেন্ডের জন্য থমকে গেল। তার চোখের মণি দুটো সামান্য সংকুচিত হলো, কিন্তু মুখে সেই চিরচেনা, পরিপাটি আভিজাত্যের মুখোশটা বজায় রইল। সে অত্যন্ত শান্ত, সুশীল গলায় বলল, "আজ আমাদের ক্লাবের কয়েকজন এলিট মেম্বার আসবে ফাইল সই করতে। তুমি বরং ওই ফুল-স্লিভ ঢাকাই জামদানিটা পরো, জোয়া। এই স্লিভলেস শাড়িতে তোমাকে বড্ড... কেমন যেন ক্যাজুয়াল আর একটু বেশি এক্সপোজড লাগে। আমার বন্ধুদের সামনে আমি চাই না তোমাকে নিয়ে কেউ কোনো আলগা কথা বলুক।"
আসিফ তাকে কোনো গালি দেয়নি, তার ওপর চিৎকারও করেনি। কিন্তু তার ওই "আলগা কথা" শব্দবন্ধ জোয়ার আত্মসম্মানে এক গভীর, অদৃশ্য ক্ষত তৈরি করল। জোয়া আয়নায় আসিফের চোখের দিকে তাকিয়ে স্থির গলায় বলল, "আলগা কথা মানে কী আসিফ? এটা একটা সাধারণ সুতির শাড়ি। আর এখন যে গরম, তাতে এই পোশাকে আমি কমফোর্টেবল। তোমার বন্ধুরা কি আমার কাপড়ের দৈর্ঘ্য দেখতে আসে, নাকি ফাইল সই করতে?"
আসিফ রেজারের ফেনাটা একটা তোয়ালে দিয়ে মুছতে মুছতে জোয়ার দিকে এগিয়ে এলো। তার ঠোঁটের কোণে সেই চেনা, বিষাক্ত মৃদু হাসি। সে জোয়ার জাবড়ো করে ধরা শাড়ির আঁচলটার ওপর নিজের হাত রাখল। স্পর্শটা যেন একটা ঠান্ডা শেকল। সে নরম কিন্তু নিরেট গলায় বলল, "তুমি বড্ড ইমোশনাল হয়ে যাও জোয়া। পুরুষদের মনস্তত্ত্ব তুমি বোঝো না। ওটা একটা এলিট ক্লাব, সেখানকার পুরুষদের চাউনি বড্ড পরিমাপক। আমি ভয় পাই না সুইটহার্ট, আমি আসলে তোমার শরীরের ওপর অন্য কারও কাল্পনিক থাবা পড়তে দিতে চাই না। আমার সামাজিক মর্যাদার একটা দাম আছে। গো অ্যান্ড চেঞ্জ ইট, প্লিজ।"
জোয়া হাত থেকে শাড়িটা নামিয়ে রাখল। তার পুরো শরীর রাগে কাঁপছিল। তার মনে হলো, সে কোনো স্বাধীন মানুষ নয়; তার শরীরের প্রতিটি ইঞ্চি কাপড়ের মাপ, ব্লাউজের হাতার দৈর্ঘ্য—সবকিছু যেন আসিফের সামাজিক প্রতিপত্তি আর পুরুষতান্ত্রিক অহংকারের দাঁড়িপাল্লায় মাপা হচ্ছে। সে একটা বন্ধী পুতুল, যাকে প্রতিদিন আসিফের পছন্দমতো পোশাকে সাজিয়ে ড্রইংরুমে দাঁড় করিয়ে দিতে হবে।
ঠিক একই সময়ে, কয়েকশ কিলোমিটার দূরে মফস্বলের সেই ছায়াঘেরা পুরনো চুনকাম করা বাড়িতে প্রিয়ংবদা রেডি হচ্ছিল কলেজে যাওয়ার জন্য। বাইরে তখনো রাতের বৃষ্টির পর একটা স্যাঁতসেঁতে ভ্যাপসা গরম ভাপ উঠছে মাটি থেকে। প্রিয়া একটা সুতির সাধারণ তাঁতের শাড়ি পরে যখন তার আঁচলটা বাম কাঁধে তুলে নিচ্ছিল, তখন ড্রইংরুমের ইজিচেয়ারে বসে নিজের মোটা ফ্রেমের চশমাটা মুছছিলেন বিকাশ চ্যাটার্জি। চশমাটা চোখের ওপর পরে সে প্রিয়ার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকাল। তার চাউনিতে একজন অধ্যাপকের গাম্ভীর্য যতটা ছিল, তার চেয়ে অনেক বেশি ছিল একজন কড়া পাহারাদারের কর্তৃত্ব।
বিকাশ চ্যাটার্জি গলাটা একটু খাঁকারি দিয়ে কড়া গলায় বলল, "প্রিয়া, শাড়ির আঁচলটা বড্ড সরু করে রেখেছ। ওটাকে আরেকটু চওড়া করে পুরো বুকের ওপর টেনে দাও। ব্লাউজের গলাটাও বোধহয় একটু বেশি বড় হয়ে গেছে দর্জির ভুলের কারণে। কলেজের তরুণ ছেলেদের মনস্তত্ত্ব কিন্তু ভালো নয়। আজকালকার যুগের ছেলেদের চোখের ভাষা বড্ড নোংরা। একজন শিক্ষিকার পোশাক হওয়া উচিত একদম নিচ্ছিদ্র, চারপাশ থেকে ঢাকা, যাতে কোনো পুরুষ তোমার দিকে তাকানোর সাহস না পায়।"
প্রিয়া আয়নার দিকে তাকাল। তার সুতির শাড়ির আঁচলটা যথেষ্ট শালীনভাবেই জড়ানো ছিল, কিন্তু বিকাশের চোখে তা যেন এক মহা অপরাধ। প্রিয়া জোর করে নিজের ভেতর জমে থাকা ক্ষোভটাকে চেপে রেখে শান্ত গলায় বলল, "আমি একজন প্রাপ্তবয়স্ক নারী বিকাশ। কলেজে আমি ক্লাস নিতে যাই, থিয়েটার করি। আমার পোশাক কতটা শালীন, তা নির্ধারণ করার বুদ্ধি আমার আছে। ছেলেদের চোখ নোংরা হলে শাসন ছেলেদের করা উচিত, আমার কাপড়কে কেন চাদর বানাতে হবে?"
বিকাশ চ্যাটার্জি তার হাতের খবরের কাগজটা টেবিলের ওপর সশব্দে আছড়ে ফেলল। তার মুখটা রাগে অন্ধকার হয়ে গেল। সে বলল, "যুক্তি দেখাবে না প্রিয়া। এই উপমহাদেশে পুরুষরা নারীদের শরীরকে কেবল একটা কামনার বস্তু হিসেবেই দেখে। তুমি নিজেকে যত আধুনিকই ভাবো না কেন, রাস্তাঘাটে বের হলে তুমি স্রেফ একটা শরীর। আর আমি চাই না আমার স্ত্রীর শরীর নিয়ে কলেজের করিডোরে কোনো সস্তা আলোচনা হোক। আঁচলটা ঠিক করো, নয়তো আজ কলেজে যাওয়ার দরকার নেই।"
প্রিয়া স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। সে বুঝতে পারল, এই পুরুষরা আসলে নারীদের সুরক্ষার নামে তাদের এক একটা জীবন্ত লাশে পরিণত করতে চায়। অথচ এই বিকাশ চ্যাটার্জিই রাতের অন্ধকারে ল্যাপটপের স্ক্রিনে অন্য কোনো অচেনা নারীর নগ্নতার খোঁজ করে। প্রিয়া জোর করে আঁচলটা আরও চওড়া করে বুকের ওপর টেনে পিন ফুটিয়ে দিল। কিন্তু তার মনে হলো, সেই সেফটিপিনের তীক্ষ্ণ ডগাটা আসলে তার নিজের হৃদয়ে গিয়ে বিঁধছে। তার ভেতরের তীব্র রাগটা যেন সেই সুতির কাপড়ের নিচ্ছিদ্র বাঁধন ছিঁড়ে এক বুনো আগুনের মতো বেরিয়ে আসতে চাইল।
একই দিনে দুপুরের কড়া রোদে শহরের একটা ব্যস্ত বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে ছিল এস্থার। পিচগলা রাস্তার তপ্ত ভাপ আর শত শত গাড়ির কালো ধোঁয়া মিলে মিশে এক দমবন্ধ করা নরক তৈরি করেছে চারপাশ। এস্থারকে আজ একটা জরুরি অ্যাসাইনমেন্ট জমা দিতে অন্য একটা ক্যাম্পাসে যেতে হচ্ছে। একটা লোকাল বাস এসে হর্ন বাজিয়ে থামতেই চারপাশ থেকে একদল পুরুষ পঙ্গপালের মতো হুমড়ি খেয়ে পড়ল বাসের দরজায়।
এস্থার যখন ভিড় ঠেলে বাসের হাতলটা ধরে ভেতরে ওঠার চেষ্টা করছিল, ঠিক তখনই তার পেছনে থাকা এক মাঝবয়সী লুঙ্গি আর শার্ট পরা লোক ইচ্ছে করেই নিজের শরীরটা এস্তারের পিঠের ওপর চেপে দিল। এস্থার তীব্র অস্বস্তিতে ঘুরে তাকিয়ে বলল, "আরে ভাই! ধাক্কা দিচ্ছেন কেন? একটু দূরত্ব রেখে দাঁড়ান।"
লোকটা একটা নির্বিকার, নোংরা হাসি হেসে বলল, "আরে আপা, বাসে উঠলে একটু-আধটু ছোঁয়া লাগবই। এত শরীর বাঁচাইয়া চললে পাবলিক বাসে চড়েন কেন? ট্যাক্সি ভাড়া কইরা যান।"
বাসের ভেতরে তিল ধারণের জায়গা নেই। এস্থার কোনোমতে লেডিস সিটের পাশে দাঁড়িয়ে হাতল ধরে ঝুলছিল। বাসের চাকা যখনই কোনো গর্তে পড়ছে বা ব্রেক কষছে, চারপাশের পুরুষ যাত্রীগুলো যেন সুযোগ পেয়ে গেল। এস্তারের ঠিক পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এক কলেজপড়ুয়া ছেলে কনুইটা এমনভাবে বাড়িয়ে রাখল, যা প্রতিবার বাসের ঝাঁকুনিতে এস্তারের স্তনের পাশে এসে সজোরে আঘাত করছিল। এস্থার নিজের ব্যাগটা বুকের সামনে তুলে ধরে নিজেকে আড়াল করার আপ্রাণ চেষ্টা করছিল, কিন্তু চারপাশের লোলুপ চাউনিগুলো যেন তাকে এক সেকেন্ডের জন্যও রেহাই দিচ্ছিল না।
বাসের কন্ডাক্টর ভাড়া নিতে নিতে এস্তারের একদম গা ঘেঁষে চলে গেল। যাওয়ার সময় তার খসখসে নোংরা হাতটা ইচ্ছে করেই এস্তারের কোমরের ওপর দিয়ে টেনে নিয়ে গেল।
"এই যে আপা, ভাড়াটা দ্যান," কন্ডাক্টরের গলায় কোনো দ্বিধা নেই, যেন এই প্রকাশ্য হ্যারাসমেন্টটা তার নিত্যদিনের অধিকার।
"আপনি হাত দিচ্ছেন কেন? ভদ্রভাবে ভাড়া চাওয়া যায় না?" এস্থার চড়া গলায় চিৎকার করে উঠল।
মুহূর্তের মধ্যে পুরো বাসের পুরুষ যাত্রীরা এস্তারের দিকে তাকাল। কিন্তু তাদের চোখে কন্ডাক্টরের প্রতি কোনো ক্ষোভ ছিল না, ছিল এস্তারের প্রতি এক অদ্ভুত অবজ্ঞা। বাসের এক কোণ থেকে এক বৃদ্ধ যাত্রী বলে উঠলেন, "আজকালকার মেয়েদের লজ্জা-শরম এক্কেবারে গেছে। বাসে একটু ছোঁয়া লাগতেই কী চিৎকার! পাহাড়ি মেয়ে তো, স্বভাবটাই বুনো। মেয়েদের এই জন্য একা একা বাইরে বের হতে নেই।"
এস্তারের চোখের কোণ দিয়ে জল বেরিয়ে আসতে চাইল, কিন্তু সে তা গিলে ফেলল। তার মনে হলো, এই গণপরিবহনগুলো আসলে একেকটা বৈধ কয়েদখানা, যেখানে প্রতিদিন হাজার হাজার নারী তাদের অজান্তেই পুরুষদের নোংরা কামনার শিকার হচ্ছে। এই উপমহাদেশে একজন নারীর পোশাকের স্বাধীনতা, তার চলাফেরার নিরাপত্তা যে কতখানি আপেক্ষিক আর ভঙ্গুর—তা আজ এই তিন নারী তাদের ভিন্ন ভিন্ন সামাজিক স্তরে বসে সমান্তরালভাবে টের পাচ্ছিল।
•
Posts: 54
Threads: 3
Likes Received: 295 in 40 posts
Likes Given: 161
Joined: May 2023
Reputation:
102
ষষ্ঠ অধ্যায়: শব্দের শেকল ও অদৃশ্য থাবা
বিকেলের দিকে গুলশানের একটা অতি দামী, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত রেস্তোরাঁয় বসেছিল জোয়া আর আসিফ। তাদের সাথে বসে আছেন আসিফের এক নতুন ব্যবসায়িক পার্টনার, রহমান সাহেব। টেবিলের ওপর দামী ক্রিস্টালের গ্লাসে আইস-টি আর প্লেটে সুদৃশ্য স্ন্যাক্স সাজানো। রহমান সাহেব একজন রসিক মানুষ, কথার মাঝখানে সে তাদের পুরোনো এক বিজনেস ডিল নিয়ে একটা বেশ মজার রসিকতা করলেন। রসিকতাটা এতটাই অকৃত্রিম ছিল যে জোয়া নিজের অজান্তেই, তার সেই সুশীল মুখোশটা ভুলে একটু শব্দ করে, খিলখিলিয়ে হেসে ফেলল।
ঠিক সেই মুহূর্তেই, টেবিলের নিচ থেকে একটা তীব্র, শক্ত আঘাত এলো জোয়ার পায়ে। আসিফের ফর্মাল ইতালিয়ান লেদার শু-টা মুহূর্তের মধ্যে জোয়ার পায়ের পাতায় আলতো কিন্তু প্রচণ্ড শক্তভাবে চেপে বসল। ওটা কোনো ভুলবশত ছোঁয়া ছিল না; ওটা ছিল একটা সুক্ষ্ম, তীব্র এবং হিংস্র সতর্কবার্তা। জোয়ার হাসির শব্দটা মাঝপথেই আটকে গেল, যেন কেউ তার গলায় একটা অদৃশ্য ফাঁস পরিয়ে দিয়েছে।
আসিফ তার মুখে সেই চিরচেনা অমায়িক, দেবতুল্য হাসিটা বজায় রেখেই রহমান সাহেবের দিকে তাকিয়ে বলল, "আসলে রহমান সাহেব, জোয়া একটু বেশি ইমোশনাল তো! সাহিত্যের ছাত্রী হওয়ায় ও ছোটখাটো বিষয়েই খুব উত্তেজিত হয়ে পড়ে। হাসিও ঠিক নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না, হা হা।"
রহমান সাহেবও আসিফের কথায় তাল মিলিয়ে হাসলেন, কিন্তু জোয়ার ভেতরের পৃথিবীটা তখন ওলটপালট হয়ে যাচ্ছিল। বাড়ি ফেরার পথে গাড়ির এসি চালু থাকা সত্ত্বেও জোয়ার মনে হচ্ছিল সে একটা জ্বলন্ত চুল্লির ভেতর বসে আছে। আসিফ এতক্ষণ চুপচাপ গাড়ি চালাচ্ছিল, কিন্তু গুলশানের নিরিবিলি রাস্তায় ঢুকতেই তার রূপ এক সেকেন্ডে বদলে গেল। তার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল, গলার স্বর নেমে গেল এক হিমশীতল স্তরে।
সে স্টিয়ারিং হুইলে চাপ দিয়ে বলল, "রেস্তোরাঁয় ওভাবে হাটের সস্তা মেয়েদের মতো উচ্চস্বরে হাসাটা বড্ড চিপ দেখায় জোয়া। তুমি আসিফ চৌধুরীর ওয়াইফ। একজন সফিস্টিকেটেড উচ্চবিত্ত নারীর জানা উচিত সমাজে কখন, কতটা এবং কীভাবে হাসতে হয়। তোমার ওই খিলখিল শব্দটা আমার পার্টনারের সামনে আমার ইমেজটা নষ্ট করে দিচ্ছিল। নেক্সট টাইম যেন আমি এমন সস্তা আচরণ না দেখি।"
জোয়া গাড়ির জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল। তার চোখ দিয়ে এক ফোঁটা জলও পড়ল না, কিন্তু তার ভেতরের সেই অবদমিত রাগটা এবার একটা আগ্নেয়গিরির রূপ নিতে শুরু করল। সে বুঝতে পারল, আসিফ কেবল তার শরীর বা পোশাক নয়; তার ফুসফুস থেকে বেরিয়ে আসা আনন্দের শব্দটুকুও নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায়।
একই সময়ে, বিশ্ববিদ্যালয়ের এক চটচটে, নোংরা প্লাস্টিকের চেয়ার-টেবিলে সাজানো ক্যাফেটেরিয়াতে বসে ছিল এস্থার। টেবিলের ওপর ঠান্ডা হয়ে যাওয়া চায়ের কাপ আর কিছু আধখাওয়া সিঙ্গারা ছড়ানো। এস্থার তার ক্লাসের কয়েকজন বন্ধুর সাথে একটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অ্যাকাডেমিক অ্যাসাইনমেন্টের তত্ত্ব নিয়ে তর্ক করছিল। আলোচনার বিষয় ছিল—উন্নয়নের নামে কীভাবে আদিবাসী মানুষদের তাদের নিজস্ব ভূমি থেকে উচ্ছেদ করা হয়।
এস্থার নিজের জাতির এই আজন্ম লড়াই নিয়ে কথা বলার সময় স্বাভাবিকভাবেই একটু আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছিল। সে যখন নিজের যুক্তিটা একটু জোর দিয়ে, গলার আওয়াজ সামান্য চড়া করে বলছিল, ঠিক তখনই তার সহপাঠী ছেলে, রাকিব, হঠাৎ টেবিল চাপড়ে বলে উঠল, "আরে এস্থার! তুমি এত চিল্লাচ্ছ কেন বলো তো? এটা তো কোনো খাসিয়া পাড়ার সালিশি বৈঠক না যে এভাবে চিৎকার করে কথা বলতে হবে। মেয়েদের গলার আওয়াজ এত উগ্র আর চড়া হলে ছেলেরা কিন্তু ভয় পেয়ে যাবে। একটু সফট টোনে, মেয়েদের মতো করে কথা বলতে শেখো।"
ক্যাফেটেরিয়ার আশেপাশের টেবিল থেকে কয়েকজন ছাত্র আর সিনিয়র ভাইরা খিলখিল করে হেসে উঠল। এস্থার মুহূর্তের মধ্যে স্তব্ধ হয়ে গেল। তার মুখের ভেতরের শব্দগুলো যেন তার গলার কাছে এসে এক একটা পাথরের মতো জমাট বেঁধে গেল। সে বুঝতে পারল, এই প্রগতিশীল শিক্ষার আঙিনাতেও একজন নারীর মেধা বা যুক্তির চেয়ে তার গলার ‘ডেসিবেল’টা পুরুষের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ নারীকে সবসময় নিচু স্বরের, বিনীত এবং নীরব দেখতে চায়। নারী যখনই নিজের অধিকার বা যুক্তির জন্য গলার আওয়াজ উঁচিয়ে তোলে, তখনই সমাজ তাকে ‘উগ্র’, ‘অসভ্য’ বা ‘অবাধ্য’ বলে তকমা দিয়ে দেয়।
ওদিকে মফস্বলের সেই নিস্তব্ধ বাড়িতে প্রিয়ংবদা প্রতিদিন এই একই অদৃশ্য চাবুকের মুখোমুখি হচ্ছিল। রাত তখন সাড়েনয়টা। ডিনার টেবিলে বিকাশ চ্যাটার্জি খুব ঠান্ডা মাথায় প্রিয়াকে বলছিলেন যে, আগামী মাস থেকে প্রিয়াকে কলেজের থিয়েটার ক্লাবের দায়িত্বটা ছেড়ে দিতে হবে। কারণ সেখানে নাকি পুরুষ সহকর্মীদের সাথে তাকে অনেক রাত পর্যন্ত মিটিং করতে হয়।
প্রিয়া চামচটা প্লেটের ওপর রেখে সোজা হয়ে বসল। সে বলল, "বিকাশ, থিয়েটার ক্লাবটা আমি নিজের মেধা আর খাটুনি দিয়ে দাঁড় করিয়েছি। সেখানে কোনো নোংরামি হয় না। আর আমি কোনো অন্যায় করছি না যে আমাকে মাঝপথে এটা ছেড়ে দিতে হবে। তুমি এভাবে আমার প্রফেশনাল লাইফ নিয়ন্ত্রণ করতে পারো না।"
বিকাশের মুখটা মুহূর্তের মধ্যে এক কুৎসিত শাসকের রূপ নিল। সে তার হাতের জলের গ্লাসটা ডাইনিং টেবিলের ওপর সশব্দে নামিয়ে রাখল। সে প্রিয়ার দিকে আঙুল উঁচিয়ে অত্যন্ত নিচু কিন্তু ধারালো গলায় বলল, "মুখ সামলে কথা বলো প্রিয়া! গলার আওয়াজ একদম নিচে নামাও। এটা তোমার বাপের বাড়ি নয় যে যখন খুশি যেভাবে খুশি বরের মুখের ওপর চিল্লাইয়া কথা বলবে। এই বাড়িতে থাকতে হলে আমার নিয়ম মেনে, মাথা নিচু করে কথা বলতে হবে। মেয়েমানুষের গলার আওয়াজ ডাইনিং রুমের বাইরে গেলে সেই ঘরের আভিজাত্য শেষ হয়ে যায়।"
‘বাপের বাড়ি নয়’—এই একটা চিরন্তন পুরুষতান্ত্রিক বাক্য প্রিয়ার ভেতরের সমস্ত লড়াকু সত্ত্বাকে এক মুহূর্তে পিষে গুঁড়িয়ে দিল। এই উপমহাদেশে একজন নারী বিয়ের পর নিজের ঘর বলতে কোনো জায়গাই খুঁজে পায় না। বাপের বাড়ি পর হাত, আর স্বামীর বাড়ি এক পরম কয়েদখানা।
এই কণ্ঠস্বর চেপে রাখার, হাসির ডেসিবেল মেপে দেওয়ার এবং পোশাকের নিচ্ছিদ্র দেওয়াল তোলার সংস্কৃতি এই চারজন নারীর ভেতরেই—জোয়া, প্রিয়া, এস্থার এবং ফাতেমার অন্তরে এক নীরব, বিস্ফোরক ক্ষোভের জন্ম দিচ্ছিল। তাদের ভেতরের এই অবদমিত কাম, রাগ আর স্বাধীনতার তীব্র আকাঙ্ক্ষাগুলো এখন আর কেবল ফ্যান্টাসির জগতে সীমাবদ্ধ থাকতে চাইছে না। তা এক ভয়ঙ্কর বারুদে রূপান্তরিত হচ্ছে, যা প্রকাশের জন্য একটা সঠিক, নিখুঁত এবং চরম ধ্বংসাত্মক মুহূর্তের অপেক্ষা করছে মাত্র। তারা চারজনই মনে মনে জানত, যেদিন এই বাঁধন ছিঁড়বে, সেদিন এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজের কোনো দেওয়ালই তাদের আটকে রাখতে পারবে না।
Posts: 3,355
Threads: 0
Likes Received: 1,470 in 1,309 posts
Likes Given: 45
Joined: May 2019
Reputation:
34
•
Posts: 1,051
Threads: 0
Likes Received: 504 in 479 posts
Likes Given: 1,104
Joined: Jan 2024
Reputation:
14
•
Posts: 54
Threads: 3
Likes Received: 295 in 40 posts
Likes Given: 161
Joined: May 2023
Reputation:
102
সপ্তম অধ্যায়: নিয়তির সুতো
শহরের এক প্রান্তে যখন উচ্চবিত্তের চার দেওয়ালে ঘেরা ড্রইংরুমে এক চরম মনস্তাত্ত্বিক ও নীরব যুদ্ধ চলছে, ঠিক তখনই অন্য প্রান্তে এক প্রবল জীবনসংগ্রামের ঢেউ আছড়ে পড়ছিল ঢাকার সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে। বুড়িগঙ্গার কালো, কুচকুচে এবং পচা জলের ওপর ভোরের ঘন কুয়াশা আর লঞ্চের ইঞ্জিন থেকে নির্গত পোড়া মবিলের ধোঁয়া মিলেমিশে এক নিঃশ্বাসবন্ধ করা পরিবেশ তৈরি করেছে। সকালের আলো ফোটার আগেই বরিশাল থেকে ছেড়ে আসা বিশাল তিন তলার একখানা ডাবল-ডেকার লঞ্চ এক বিকট, কানফাটানো সাইরেন বাজিয়ে সজোরে এসে ধাক্কা খেল লোহার পন্টুনের গায়ে। সেই ধাক্কায় লোহার নোঙর আর শেকলের ঘর্ষণে এক তীব্র শব্দের জন্ম হলো, আর পন্টুনটা কেঁপে উঠল এক বড় জলোচ্ছ্বাসে।
লঞ্চের নিচের ডেক থেকে তখন পঙ্গপালের মতো নামছিল মানুষ। চর্বিযুক্ত ঘামের গন্ধ, কাঁচা শুঁটকি মাছের আঁশটে ঘ্রাণ, পচা ফলের ঝুড়ি আর হাজারো মানুষের তীব্র চিৎকারে সদরঘাটের বাতাস যেন এক আদিম নরককুণ্ডে রূপ নিয়েছে। কুলিদের মাথায় বিশাল সব বস্তা, হকারদের সস্তা চিল- চিৎকার আর পন্টুনের মোড়ে মোড়ে জমে থাকা পানের পিকে চারপাশটা এক বীভৎস বাস্তব।
সেই চিল-চিৎকার আর বিশৃঙ্খল ভিড়ের আড়াল থেকে এক পা, দু-পা করে পন্টুনের পিচ্ছিল লোহার মেঝেতে এসে দাঁড়াল ফাতেমা। তার পরনে একটা মলিন, চটা ও তালি দেওয়া সস্তা সুতি শাড়ি। শাড়ির আঁচলটা তার বুকের ওপর কোনোমতে জড়ানো, যা গত কয়েকদিনের ধুলোবালি, লঞ্চের ডেকের নোংরা মেঝে আর ইঞ্জিনের কালিতে চটচটে হয়ে গেছে। তার এক হাতে একটা ছেঁড়া প্লাস্টিকের বস্তা, যার ভেতর তার জীবনের যসামান্য অবশিষ্টাংশ—একটা ভাঙা অ্যালুমিনিয়ামের বাটি, মায়ের দেওয়া সেই ছেঁড়া সুতি শাড়ির টুকরো আর একটা ক্ষয়ে যাওয়া প্লাস্টিকের চিরুনি।
ফাতেমার চোখ দুটোর দিকে তাকালে যে কেউ এক সেকেন্ডের জন্য থমকে যাবে। সেই চোখে কোনো জল নেই, কোনো চেনা ভয় নেই; আছে এক অলৌকিক, পাথর হয়ে যাওয়া শূন্যতা। বরিশালের মেঘনা নদীর পাড়ের সেই কালবৈশাখীর রক্তাক্ত রাতের কথা তার মগজের কোষে কোষে এখনো টাটকা হয়ে জ্বলছে। মন্টু মাঝি যখন মদের ঘোরে তার ওপর সেই পশুত্ব চালাতে চেয়েছিল, ফাতেমার ভেতরের অবদমিত বাঘিনীটা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারেনি। ঘরের কোণে পড়ে থাকা সেই মরচে ধরা ধারালো বঁটিখানা যখন মন্টুর ঘাড়ে আর পিঠে আছড়ে পড়েছিল, তখন ফাতেমা কোনো মানুষের চিৎকার শোনেনি; সে শুনেছিল একটা পশুর শেষ গোঙানি। মন্টুকে সেই অন্ধকার ঘরের মেঝেতে নিজের রক্তের পুকুরে ছটফট করতে ফেলে রেখেই সে রাতের অন্ধকারে মেঘনার বুক চিরে ঢাকার উদ্দেশ্যে ছেড়ে যাওয়া শেষ লঞ্চটার নিচের ডেকে এসে লুকিয়েছিল।
লঞ্চের পুরোটা রাত সে কাটিয়েছে ইঞ্জিনের ঠিক পেছনের নোংরা মেঝের এককোণে, আলুর বস্তার আড়ালে গুটিসুটি মেরে। ইঞ্জিনের বিকট গর্জন আর গরম ভাপ তার গায়ের চামড়া পুড়িয়ে দিচ্ছিল, কিন্তু তার চেয়েও বড় আগুন জ্বলছিল তার বুকের ভেতর। মন্টু মাঝি মরেছে নাকি এখনো চরের হাসপাতালে বেঁচে বেঁচে মরছে, ফাতেমা তা জানে না, জানতে চায়ও না। সে শুধু জানে, সে সেই নরক থেকে নিজের সত্ত্বাটাকে ছিঁড়ে নিয়ে পালিয়ে এসেছে।
পন্টুন পার হয়ে ঘাটের কাদা-জল মাখা রাস্তায় দাঁড়াতেই ফাতেমার চারপাশটা কেমন যেন ঘুরতে লাগল। দীর্ঘ তিরিশ ঘণ্টা তার পেটে এক দানা অন্ন পড়েনি। তার ঠোঁট দুটো ফেটে চৌচির হয়ে রক্ত জমছে। ঠিক তখনই তার সামনে এসে দাঁড়াল ঘাটের এক দালাল, নাম তার কলিমুদ্দিন। কলিমুদ্দিনের চোখে এক ধরনের শিকারী চাতুর্য। সে ফাতেমার খসখসে চেহারা, তার তালি দেওয়া শাড়ি, বাম চোখের নিচে থাকা সেই গাঢ় বেগুনি রঙের কালশে দাগটার দিকে তাকাল। ওটা মন্টু মাঝির দেওয়া শেষ লাথির এক অমোঘ স্মৃতিচিহ্ন।
"কী রে খুকী? দেশ থেইকা ভাইগা আইছস বুঝি? লগে কেউ নাই?" কলিমুদ্দিন নিজের মুখের ভেতরের পানের জর্দাটা মাটিতে ফেলে জিজ্ঞেস করল।
ফাতেমা প্রথমে ভয় পেয়ে নিজের প্লাস্টিকের বস্তাটা বুকের সাথে আরও শক্ত করে চেপে ধরল। তার গলা দিয়ে কোনো শব্দ বের হতে চাইল না। সে শুধু মাথা নেড়ে বোঝাল যে তার কেউ নেই।
কলিমুদ্দিন একটা কুৎসিত কিন্তু আশ্বাসের হাসি হেসে বলল, "ডরাইস না। এই ঢাকা শহরে ডরাইলে মানুষ কুত্তা-বেড়ালের মতো মরে। কাম কাজ করবি? বড় লোকের বাড়ি। গুলশানে। থাহন-খাওন পাবি, লগে কিছু টেকাটুকাও মিলব। তরে যেমন দেখতাছি, তগো বাড়িতে এমন জ্যান্ত কামের মানুষই লাগব। যাবি আমার লগে?"
ফাতেমা আর কিছু ভাবার অবস্থায় ছিল না। এই বিশাল, অচেনা যান্ত্রিক শহরে সে যদি এই দালালের হাত না ধরে, তবে আজ রাতেই হয়তো সদরঘাটের কোনো অন্ধকার গলিতে অন্য কোনো মন্টু মাঝির হিংস্র থাবার নিচে তাকে পড়তে হবে। সে অত্যন্ত নিচু, ভাঙা গলায় বলল, "যামু। আমারে খালি একটু পেটভইরা ভাত আর মাথা গোঁজার ঠাঁই দ্যাওন লাগব। আমি সব কাম করুম।"
ঠিক একই সময়ে, গুলশানের তেরো তলার সেই বিলাসবহুল পেন্টহাউসের বিশাল ইতালিয়ান মার্বেল বসানো ড্রইংরুমে বসে একা একা কফি খাচ্ছিল জোয়া। চারপাশটা বড্ড বেশি নিস্তব্ধ। সেন্ট্রাল এসির সেই একটানা মৃদু যান্ত্রিক শব্দটা জোয়ার মাথার ভেতর হাতুড়ির মতো বাজছিল। আসিফ সকালে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কর্পোরেট মিটিংয়ের সিলসিলায় হংকংয়ের ফ্লাইটে চলে গেছে। যাওয়ার আগে সে জোয়াকে এক চিলতে কিস খেয়ে বলে গেছে—"আই উইল বি ব্যাক অন নেক্সট ফ্রাইডে, সুইটহার্ট। এই কয়দিন একটু সাবধানে থেকো, আর হ্যাঁ, বাইরে বেশি ঘোরাঘুরি করার দরকার নেই। আজকাল শহরের পরিবেশ ভালো না।"
জোয়ার মনে হলো, আসিফের কাছে শহরের পরিবেশ কোনোদিনই ভালো থাকে না, যদি না জোয়া তার হাত ধরে বাইরে বের হয়। আসিফ চলে যাওয়ার পর এই বিশাল পেন্টহাউসটা জোয়ার কাছে একটা রাজকীয় মর্গ বলে মনে হচ্ছিল। সে তার দামী সিরামিকের কাপ থেকে কফিতে একটা চুমুক দিল। কফিটা বড্ড তিতো, ঠিক যেমন তার গত পাঁচ বছরের দাম্পত্য জীবন।
দেয়ালে ঝুলছে সেই বিমূর্ত তৈলচিত্র—ধূসর আর কালোর মাঝে সেই রক্তাক্ত লাল বৃত্তটা। জোয়া ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইল। কাল রাতেও আসিফ তার শোবার ঘরে এসে তার পোশাকের স্বাধীনতা নিয়ে, তার হাসির ডেসিবেল নিয়ে যে মানসিক চাবুক চালিয়েছে, তার দাগগুলো জোয়ার শরীরের কোথাও চামড়ায় দেখা যাবে না; কিন্তু তার আত্মাটা এখন রক্তবমি করছে। সে আয়নার সামনে গিয়ে নিজের সুদৃশ্য ফুল-স্লিভ নাইটিটার কলারটা একটু নামাল। তার গলার নরম ত্বকে কোনো কালশিটে নেই, কিন্তু সেখানে এক অদৃশ্য ফাঁসের দাগ সে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিল।
হুট করেই পেন্টহাউসের সদর দরজার বেলটা বেজে উঠল। এই অসময়ে কে আসতে পারে? আসিফের কোনো ড্রাইভার নাকি দারোয়ান? জোয়া কফির কাপটা কনসোল টেবিলের ওপর রেখে অলস, ক্লান্ত পায়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেল।
জোয়া দরজার লকটা ঘুরিয়ে যখন ভারী মেহগনি কাঠের দরজাটা খুলল, তখন বাইরের করিডোরের আলোয় সে এক অদ্ভুত দৃশ্য দেখল। দালালের কলিমুদ্দিন সামনে দাঁড়িয়ে দাঁত কেলিয়ে হাসছে, আর তার ঠিক পেছনে গুটিসুটি মেরে দাঁড়িয়ে আছে এক প্রান্তিক, চূর্ণ-বিচূর্ণ নারী অবয়ব।
"সালাম খাম্মাজান! এই যে, আফনেরা একটা ভালো, বিশ্বস্ত কাজের বুয়া খুজতাছিলেন না? এই মেয়েডারে বরিশাল থেইকা এক্কেরে লঞ্চঘাট থেইকা লইয়া আইলাম। খুব সোজা-সরল মাইয়া, চরের মানুষ। আপনের ঘরের সব কাম এক্কেরে নিখুঁত কইরা দিব," কলিমুদ্দিন এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে ফাতেমাকে একটু সামনের দিকে ধাক্কা দিল।
জোয়া কলিমুদ্দিনের কথার দিকে কান দিল না। তার চোখ দুটো স্থির হয়ে গেল ফাতেমার মুখের ওপর। ফাতেমা তখন ভয়ে, লজ্জায় আর নিজের মলিনতার কারণে মাথাটা একদম নিচু করে রেখেছিল। তার হাতের সেই প্লাস্টিকের ছেঁড়া বস্তাটা সে পায়ের কাছে নামিয়ে রেখেছে।
"তোমার নাম কী?" জোয়া অত্যন্ত নরম, মায়াবী গলায় জিজ্ঞেস করল।
ফাতেমা আস্তে করে মাথাটা তুলল। জোয়ার সেই অভিজাত, সুগন্ধি মাখা চেহারা আর তার পরনের দামী রেশমি পোশাক দেখে ফাতেমা এক সেকেন্ডের জন্য চোখ ধাঁধিয়ে গেল। সে কাঁপা কাঁপা গলায় বলল, "ফাতেমা... আমারে সবাই ফাতেমাই ডাকে, বুজান।"
ফাতেমা যখন মাথাটা পুরোপুরি তুলল, তখন ড্রইংরুমের ভেতরের সাদা লাইটের আলো এসে পড়ল তার মুখের বাম পাশে। জোয়া এক লহমায় দেখতে পেল ফাতেমার বাম চোখের নিচে থাকা সেই কালচে, ফোলা কালশিটে দাগটা। ওটা কোনো সাধারণ আঘাতের দাগ নয়; ওটা যে একটা পুরুষালী পশুর শক্ত হাতের বা পায়ের আঘাতের চিহ্ন, তা বুঝতে জোয়ার এক সেকেন্ডও সময় লাগল না।
জোয়া এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। তার বুকের ভেতরটা কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠল। সে কলিমুদ্দিনের দিকে তাকিয়ে কিছু টাকা বের করে দিয়ে বলল, "তুমি আসতে পারো। একে আমি রাখছি।"
কলিমুদ্দিন টাকাটা পেয়ে খুশি মনে করিডোর দিয়ে চলে গেল। পেন্টহাউসের বিশাল দরজাটা আবার বন্ধ হয়ে গেল। এবার ঘরের ভেতর কেবল দুজন নারী—একজন সিল্কের চাদরে মোড়ানো অভিজাত কয়েদী, আর অন্যজন সস্তা সুতির তালি দেওয়া শাড়িতে মোড়ানো এক রক্তাক্ত পলাতক বাঘিনী।
ফাতেমা দরজার পাশে দাঁড়িয়ে এক দৃষ্টিতে ঘরের ভেতরের রাজকীয় সাজসজ্জা দেখছিল। এত বড় ঘর, মেঝেটা আয়নার মতো চকচক করছে যে নিজের পায়ের ঘাটের কাদা-জল মাখা ছাপ সেখানে পড়তেই ফাতেমা লজ্জায় কুঁকড়ে গেল। সে তার প্লাস্টিকের বস্তাটা এক কোণে রেখে মেঝের ওপর, ঠিক যেখানে জুতো খোলার জায়গা, সেখানে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ার চেষ্টা করল। চরের মানুষেরা বড়লোকদের বাড়িতে এলে এভাবেই মেঝেতে বসে অভ্যস্ত।
"আরে! ওখানে বসছ কেন? ভেতরে এসো," জোয়া দ্রুত এগিয়ে গিয়ে ফাতেমার হাতটা ধরল।
ফাতেমা বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো চমকে উঠল। সে নিজের হাতটা টেনে নেওয়ার চেষ্টা করে ভাঙা গলায় বলল, "না না, বুজান! আমার গায়ে লঞ্চঘাটের ময়লা, চরের কাদা। আফনের এই চকচকা মেঝে নষ্ট হইয়া যাইব। আমি এইহানেই ভালো আছি।"
জোয়া ফাতেমার কোনো ওজর শুনল না। সে ফাতেমার সেই খসখসে, রোদে পোড়া আর কাদা মাখা হাত দুটো নিজের নরম, দামী লোশন মাখা ফর্সা হাত দিয়ে শক্ত করে চেপে ধরল। এই স্পর্শে কোনো ঘৃণা ছিল না, কোনো আভিজাত্যের দূরত্ব ছিল না; ছিল এক পরম, অব্যাখ্যায়িত মায়া। জোয়া ফাতেমাকে টেনে নিয়ে এসে ড্রইংরুমের সেই ইতালিয়ান দামী ক্যালাকাট্টা সোফার ওপর বসিয়ে দিল।
ফাতেমা সোফায় বসেই যেন এক অদ্ভুত আতঙ্কে শিউরে উঠল। এত নরম গদি সে জীবনে কোনোদিন দেখেনি। তার মনে হচ্ছিল সে যেন একটা তুলোর মেঘের ভেতর ঢুকে যাচ্ছে। সে সোফার এককোণে একদম গুটিসুটি মেরে বসে রইল, যেন একটু নড়াচড়া করলেই এই দামী জিনিসটা ভেঙে যাবে।
জোয়া ফাতেমার সামনে হাঁটু গেড়ে মেঝেতে বসল। সে ফাতেমার মুখের দিকে, বিশেষ করে তার চোখের নিচের সেই কালশিটে দাগটার দিকে হাত বাড়াল। তার আঙুলের ডগাটা যখন ফাতেমার ফোলা চামড়াটায় আলতো করে ঠেকল, ফাতেমা ব্যথায় চোখ দুটো বন্ধ করে ফেলল।
"কে মেরেছে তোমাকে ফাতেমা? তোমার স্বামী?" জোয়ার গলাটা কাঁপছিল। সে নিজেই জানত না সে কেন এই প্রশ্নটা করছে, কিন্তু তার অবচেতনের মনস্তত্ত্ব যেন আগে থেকেই উত্তরটা জানত।
ফাতেমা চোখ খুলল। তার চোখ দিয়ে এবার আর জল বের হলো না, বরং এক ধরনের শুকনো, তপ্ত দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো। সে সোজা জোয়ার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,
-"হ বুজান। মন্টু মাঝি। চরের জুয়ারী, মাতাল। প্রতিদিন রাইতে মদ খাইয়া আইসা আমারে পিটাইত। আমার মায়ের দেওন শেষ কানের দুল জোড়াও আজ সকালে ছিঁইড়া লইয়া গেছে। আমি আর সহ্য করতে পারি নাই, বুজান... হেই কালবৈশাভীর রাইতে যখন সে মদের ঘোরে আমার ওপর আইসা পড়ল, আমি ঘরের কোণের বঁটিডা দিয়া তারে কোপায়া ফালাইয়া লঞ্চে উইঠা পড়ছি। সে মরছে না বাঁচছে আমি জানি না।"
ফাতেমা এক নিঃশ্বাসে তার জীবনের সবচেয়ে বড় সত্যটা স্বীকার করে নিল। সে জোয়ার চোখের দিকে তাকাল, সেখানে কোনো পুলিশের ভয় বা ঘৃণার বদলে সে দেখতে পেল এক অদ্ভুত, শীতল সমর্থন।
জোয়ার ভেতরের পৃথিবীটা এই কথায় তোলপাড় হয়ে গেল। ফাতেমা নিজের ওপর হওয়া হিংস্র অত্যাচারের বিরুদ্ধে এক রক্তক্ষয়ী প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে, সে এক অর্থে মুক্ত। আর জোয়া? সে এই তেরো তলার বিলাসবহুল কফিনে প্রতিদিন নিজের অস্তিত্বকে একটু একটু করে মরতে দেখছে। কিন্তু জোয়া তার আভিজাত্য আর সামাজিক খোলসটা এক মুহূর্তে খুলে ফেলতে পারল না। সে একজন হাই-সোসাইটির কর্পোরেট ডিরেক্টরের স্ত্রী, তার রক্তে মিশে আছে নিজের আবেগ লুকিয়ে রাখার মেকি আভিজাত্য। প্রথম দিনেই এই অপরিচিত, প্রান্তিক নারীর সামনে নিজের দাম্পত্য জীবনের কুৎসিত অধ্যায়টা সে মেলে ধরতে পারল না। তার আত্মসম্মান আর সামাজিক আভিজাত্যের দেওয়াল তাকে আটকে দিল।
ফাতেমা জোয়ার এই রাজকীয় রূপ, তার এই অদ্ভুত নরম ব্যবহার দেখে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, "বুজান, আফনে এত বড় প্রাসাদে থাহেন, আফনের জামাই বুঝি আফনেরে অনেক ভালোবাসে? এত দামী শাড়ি, এত সুন্দর ঘর... আফনের মনে তো কোনো দুঃখ নাই? আফনে তো এক্কেরে রানীর মতো আছেন।"
ফাতেমার এই সরল কিন্তু তীক্ষ্ণ প্রশ্নটা জোয়ার বুকের ভেতর একটা তীরের মতো বিঁধল। জোয়া এক লহমায় হাসার চেষ্টা করল। সেই হাসিটা বড্ড ম্লান, বড্ড কৃত্রিম। সে নিজের নাইটির স্লিভটা একটু টেনে হাতটা আড়াল করল। সে ফাতেমার চোখের দিকে তাকিয়ে নিজের ভেতরের ঝড়টাকে চেপে রেখে অত্যন্ত শান্ত, পরিপাটি গলায় বলল,
"সব চকচকে জিনিস সোনা হয় না, ফাতেমা। এই বড় বড় ঘরের দেওয়ালগুলো বড্ড বেশি ঠান্ডা। এখানে মানুষের শরীর ভালো থাকে, কিন্তু ভেতরটা মাঝে মাঝে বড্ড একা হয়ে যায়। তোমার মন্টু মাঝির আঘাত যেমন চোখে দেখা যায়, এই শহরের অনেক বড় সাহেবের দেওয়া আঘাত সহজে বাইরে থেকে দেখা যায় না। তবে তুমি আজ থেকে এখানে নিরাপদ। এই ঘরে তোমাকে আর কেউ মারতে পারবে না।"
জোয়ার গলার আওয়াজটা সামান্য কেঁপে উঠল, কিন্তু সে নিজেকে সামলে নিল। সে আসিফের নাম নিল না, তার সাইকোলজিক্যাল টর্চারের কোনো বিবরণ দিল না। কিন্তু তার চোখের ভেতরের গভীর বিষাদ আর গলার সেই ভারী হয়ে আসা স্বর ফাতেমার মতন এক চরের অশিক্ষিত নারীর বুঝতে একটুও সময় লাগল না। ফাতেমা বুঝতে পারল, এই বড় বেগম সাহেবের জীবনেও এক মস্ত বড় শূন্যতার পাহাড় জমে আছে, যা দামী আসবাব আর রেশমি কাপড়ের আড়ালে ঢাকা।
জোয়া উঠে দাঁড়িয়ে রান্নাঘরে গেল। সে নিজের হাতে এক গ্লাস ঠাণ্ডা জল আর কিছু খাবার প্লেটে সাজিয়ে নিয়ে এলো ফাতেমার জন্য। ফাতেমা জলটা পেয়ে এক ঢোকে পুরো গ্লাসটা খালি করে দিল, যেন তার ভেতরের এক আজন্মের তৃষ্ণা এই এক গ্লাস জলে মিটবে। সে অত্যন্ত ক্ষুধার্তের মতো প্লেটের খাবারগুলো খেতে লাগল। জোয়া এক দৃষ্টিতে তার খাওয়া দেখছিল এবং তার মনে হচ্ছিল, এই মেয়েটার অবাধ্যতা আর লড়াকু মানসিকতা যেন তাকে এক অদ্ভুত শক্তি দিচ্ছে।
বিকেলের ম্লান আলোটা যখন পেন্টহাউসের ড্রইংরুমে আরও গাঢ় হয়ে এল, তখন সেই ঘরের সেন্ট্রাল এসির ঠাণ্ডা বাতাস আর বাইরের পৃথিবীর কোলাহল যেন এক অলৌকিক শান্তিতে রূপ নিয়েছে। ড্রেসিং টেবিলের ডিম্বাকৃতি আয়নাটার সামনে এখন দুজন নারী দাঁড়িয়ে।
জোয়া ফাতেমাকে তার নিজের একটা সুতির সাধারণ হালকা শাড়ি পরতে দিয়েছে। শাড়িটা ফাতেমার শরীরের সাথে বড্ড মানিয়েছে। ফাতেমা নিজের ভেতরের সমস্ত ক্লান্তি ধুয়ে ফেলে চুলগুলো পিঠের ওপর মেলে দিয়েছে। তার চোখের নিচের কালশিটে দাগটা এখনো স্পষ্ট, কিন্তু তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা জোয়ার চোখের ভেতরের যে শূন্যতা—দুজনের অবয়ব আয়নায় একসাথে মিলেমিশে এক অদ্ভুত একাত্মতা তৈরি করেছে।
জোয়ার মনে হলো, এই প্রথম সে আয়নায় নিজের আসল রূপটা দেখতে পাচ্ছে। ফাতেমা কোনো বাইরের মানুষ নয়; ফাতেমা হলো জোয়ারই এক আদিম, লড়াকু প্রতিচ্ছবি—যা সে নিজে কোনোদিন হতে পারেনি। আর ফাতেমার মনে হলো, এই শহরের বড় বেগম সাহেব আসলে তার চরের কোনো এক দুর্ভাগা বোনের মতোই এক নিঃসঙ্গ পাখি, যার খাঁচাটা লোহার নয়, সোনার তৈরি।
সিল্কের দামী কাপড়ের আভিজাত্য আর সস্তা তালি দেওয়া সুতির শাড়ির যে বিশাল সামাজিক দেওয়াল, তা আজ এই তেরো তলার পেন্টহাউসের চার দেওয়ালে এসে এক মুহূর্তে ধুলোয় মিশে গেল। কোনো বড় রকমের স্বীকারোক্তি বা কান্নাকাটি ছাড়াই, কেবল চোখের ভাষা আর নীরব সহমর্মিতায় দুজন নারী একে অপরের সাথে এক অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা পড়ে গেল।
তারা দুজনই মনে মনে জানত, এই ঘরের ভেতরে এক নতুন ঝড়ের পূর্বাভাস তৈরি হচ্ছে। নিয়তির এক অলৌকিক সুতো আজ মেদিনীপুরের প্রিয়া, বিশ্ববিদ্যালয়ের এস্থার, গুলশানের জোয়া আর বরিশালের চরের ফাতেমাকে এক বিন্দুতে এনে দাঁড় করাল। এই কুয়াশার অরণ্যে এবার এক নতুন শিকারের গল্প শুরু হতে চলেছে, যেখানে শিকারী আর পুরুষ থাকবে না; এবার বাঘিনীরাই নিজেদের নীরব ইশারায় নিজেদের সাম্রাজ্য বুঝে নেওয়ার প্রস্তুতি নেবে।
•
Posts: 3,355
Threads: 0
Likes Received: 1,470 in 1,309 posts
Likes Given: 45
Joined: May 2019
Reputation:
34
Posts: 54
Threads: 3
Likes Received: 295 in 40 posts
Likes Given: 161
Joined: May 2023
Reputation:
102
অষ্টম অধ্যায়: রক্তের প্রথম দাগ
গুলশানের পেন্টহাউসের আধুনিক, মডুলার রান্নাঘরটা দেখতে কোনো বিদেশি ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদের মতো। চারপাশটা চকচকে ক্রোমিয়াম, দামি ওভারহেড চিমনি আর অটোমেটিক ওভেনের নিরেট আভিজাত্যে মোড়ানো। সেখানে দাঁড়িয়ে ফাতেমার জন্য এক গ্লাস জল ঢালতে গিয়ে জোয়া হঠাৎ থমকে দাঁড়াল। কাঁচের ওয়াটার পিউরিফায়ার থেকে জল পড়ার একটানা ঝিরঝির শব্দের সমান্তরালে তার তলপেটের ভেতর এক চেনা, তীব্র এবং ধারালো মোচড় দিয়ে উঠল।
মোচড়টা এক সেকেন্ডের জন্য জোয়ার মেরুদণ্ড সোজা করে দিল। সে কাউন্টার টপটা এক হাত দিয়ে শক্ত করে চেপে ধরল। আজ তার পিরিয়ডের বা ঋতুস্রাবের প্রথম দিন। প্রতি মাসের এই বিশেষ দিনটায় তার মনে হয়, তার জরায়ুর দেওয়ালে কে যেন এক জোড়া অদৃশ্য নোখ দিয়ে অবিরাম আঁচড়ে চলেছে। একটা চটচটে, উষ্ণ তরল স্রোত তার উরু বেয়ে নেমে যাওয়ার অনুভূতি হতেই জোয়া এক গভীর অবসাদে চোখ বুজল। এই চেনা শারীরিক যন্ত্রণাটা তাকে এক মুহূর্তে টেনে নিয়ে গেল আজ থেকে ঠিক বিশ বছর আগের এক তপ্ত, ধুলোবালি মাখা দুপুরে, যখন সে বারো বছরের এক অবুঝ, নিষ্পাপ বালিকা।
পেন্টহাউসের সুদৃশ্য ইতালিয়ান বাথরুমে ঢুকে দরজাটা লক করল জোয়া। ড্রয়ার খুলে সে একটা আমদানিকৃত, সুগন্ধি আর সিল্কের মোড়কে ঢাকা দামি স্যানিটারি প্যাড বের করল। প্যাডটার আঠার কাগজটা আলতো করে টেনে প্যান্টের সাথে আটকাতে আটকাতে জোয়া আয়নায় নিজের ফ্যাকাশে মুখের দিকে তাকাল। তার মনে হলো, এই দামি সুগন্ধি আর সিল্কের মোড়ক আসলে একটা মস্ত বড় প্রতারণা। এটা আসলে নারীর ভেতরের রক্তক্ষরণ আর যন্ত্রণাকে সমাজের চোখে অদৃশ্য করে রাখার এক আধুনিক খোলস মাত্র।
স্মৃতির পাতাগুলো মড়মড় করে খুলে গেল জোয়ার মগজে। বিশ বছর আগে, সে তখন ক্লাস সেভেনের ছাত্রী। ফ্রক আর স্কার্ট পরার সেই দিনগুলো। সেদিন কলেজের টিফিন পিরিয়ডে বেঞ্চ থেকে ওঠার সময় সে খেয়াল করেনি তার নীল সুতির স্কার্টের পেছনে একটা বড়, গাঢ় লাল রঙের রক্তের দাগ লেগে গেছে। সে যখন ব্ল্যাকবোর্ডের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল, পেছনের বেঞ্চের কয়েকজন সহপাঠী ছেলে আর মেয়ে একসাথে খিলখিল করে হেসে উঠেছিল।
"ওই দেখ, জোয়ার স্কার্টে ভূত লেগেছে! রক্ত!" একটা ছেলে আঙুল উঁচিয়ে চিৎকার করে উঠেছিল।
বারো বছরের জোয়া তখনো জানত না পিরিয়ড কী, রক্তক্ষরণ কী। সে ভেবেছিল তার শরীরে কোনো মরণব্যাধি বাসা বেঁধেছে, সে হয়তো আর বাঁচবে না। ভয়ে, চরম অপমানে আর এক অজানা আশঙ্কায় সে ক্লাসরুমের মেঝেতে দাঁড়িয়ে ডুকরে কেঁদে ফেলেছিল। সহপাঠীদের সেই ক্রূর, লোলুপ আর বিদ্রূপাত্মক হাসিগুলো তার কচি মনে এক আজন্মের ট্রমা তৈরি করে দিয়েছিল।
ছুটি হওয়ার পর সে কোনোমতে ব্যাগটা পেছনের দিকে চেপে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি ফিরেছিল। সে ভেবেছিল মা তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলবে, ‘কোনো ভয় নেই মা’। কিন্তু বাস্তবতা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। মা তার রক্তাক্ত স্কার্টটা দেখেই কপালে হাত দিয়ে ঘরের দরজাটা দড়াম করে বন্ধ করে দিলেন। জোয়াকে জড়িয়ে ধরা তো দূরের কথা, তাকে ঘরের একটা অন্ধকার কোণায় ঠেলে বসিয়ে দিয়ে মা চারপাশ তাকিয়ে ফিসফিস করে ক্রুদ্ধ গলায় বলেছিলেন,
"চুপ কর! একদম কান্দিস না! গলার আওয়াজ নিচে নামা। বাইরে তোর বাবা আর ভাইয়া বসে আছে, তারা যেন এক বিন্দুও জানতে না পারে। আজ থেকে তুই বড় হয়েছিস জোয়া। তোর শরীরে নজর লাগবে। এখন থেকে ছেলেদের থেকে চার হাত দূরে থাকবি। নিজের এই নোংরা জামাকাপড় ধুয়ে লুকিয়ে রাখ।"
মা সেদিন তাকে সান্ত্বনা দেননি, বরং তার মনে এই বিশ্বাসটা ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন যে—তার এই নারী শরীরটা আসলে একটা পাপের বস্তু, একটা লজ্জার আধার, যাকে সবসময় পৃথিবীর চোখ থেকে লুকিয়ে রাখতে হয়।
আজ এত বছর পর, বিবাহিত জীবনে এসেও জোয়া টের পায় সেই বারো বছর বয়সের ভয়, একাকীত্ব আর শরীরের প্রতি ঘৃণাটা আজও শেষ হয়নি। আসিফ চৌধুরী একজন উচ্চশিক্ষিত, আধুনিক পুরুষ। সে নারীর অধিকার নিয়ে বড় বড় সেমিনারে স্পন্সর করে। কিন্তু এই শোবার ঘরের চার দেওয়ালে এলে আসিফের সেই আধুনিকতার মুখোশটা এক সেকেন্ডে খসে পড়ে।
জোয়ার স্পষ্ট মনে আছে, গত মাসেও যখন তার পিরিয়ডের দ্বিতীয় দিন চলছিল, তখন সে তীব্র শারীরিক যন্ত্রণায় আর মানসিক অবসাদে বিছানায় গুটিসুটি মেরে শুয়ে ছিল। তলপেটের ব্যথায় তার কপাল দিয়ে ঘাম ঝরছিল। আসিফ মাঝরাতে মদ্যপ অবস্থায় ঘরে ঢুকে জোয়ার সেই যন্ত্রণাকাতর শরীরটার ওপরেই নিজের অধিকার ফলাতে এসেছিল।
জোয়া যখন আসিফের হাতটা সরিয়ে দিয়ে ক্লান্ত গলায় বলেছিল, "আসিফ, প্লিজ আজ নয়। আমার খুব পিরিয়ডের ব্যথা হচ্ছে। শরীরটা একদম চলছে না।"
আসিফ তখন তার চেনা, শীতল এবং বিষাক্ত হাসিটা হেসে জোয়ার চিবুকটা শক্ত করে চেপে ধরে বলেছিল,
"আই ডোন্ট কেয়ার জোয়া। পিরিয়ডের ব্যথা সব মেয়েরই হয়। ওটা কোনো প্যারালাইসিস নয়। আমি বাইরে সারাদিন খাটাখাটনি করে এসে যদি ঘরে শান্তি না পাই, তবে আমার এই কোটি টাকার পেন্টহাউস আর তোমাকে এত দামি শাড়ি কিনে দেওয়ার মানে কী? ইউ আর মাই ওয়াইফ, জোয়া। তোমার শরীরটা সবসময় আমার ক্ষুধা মেটানোর জন্য প্রস্তুত থাকা উচিত।"
আসিফ সেদিন জোয়ার কোনো আপত্তি শোনেনি। তার সেই তীব্র তলপেটের ব্যথার ওপরই আসিফ নিজের পাশবিক কামনার চাবুক চালিয়েছিল। জোয়া বিছানার চাদরটা খামচে ধরে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে চোখের জল ফেলেছিল। তার মনে হয়েছিল, এই সমাজ যাকে ‘বিয়ে’ বলে একটা পবিত্র তকমা দেয়, তা আসলে একজন পুরুষের জন্য নারীর শরীরকে বৈধভাবে ব্যবহারের এক লাইসেন্স মাত্র। সেখানে নারীর সম্মতি, তার শারীরিক অসুস্থতা বা যন্ত্রণার কোনো মূল্য নেই। আসিফের কাছে জোয়ার শরীরটা একটা দামি অলঙ্কার, যা সে যখন খুশি যেভাবে খুশি ব্যবহার করতে পারে।
বাথরুম থেকে বের হয়ে জোয়া আবার রান্নাঘরে ফিরে এলো। ফাতেমা তখন রান্নাঘরের এক কোণে মেঝেতে বসে বঁটি দিয়ে তরকারি কাটছিল। জোয়া ফাতেমার সামনে গিয়ে জলের গ্লাসটা বাড়িয়ে দিল।
ফাতেমা জলের গ্লাসটা নেওয়ার জন্য হাত বাড়াতেই সে থমকে গেল। সে জোয়ার মুখের দিকে তাকাল। জোয়ার ফর্সা মুখটা তখন ব্যথায় কেমন যেন হলদেটে মেরে গেছে, চোখের নিচে ক্লান্তির গাঢ় ছায়া, আর সে নিজের অজান্তেই এক হাত দিয়ে তলপেটটা চেপে ধরে আছে। ফাতেমা একজন চরের মেয়ে হতে পারে, কিন্তু নারীর শরীরের এই চেনা ক্লান্তি আর যন্ত্রণার রঙ চিনতে তার এক মুহূর্তও লাগল না।
ফাতেমা বঁটিটা একপাশে সরিয়ে রেখে মেঝে থেকে উঠে দাঁড়াল। সে সোজা জোয়ার চোখের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত নরম, এক গভীর মাতৃত্বের সুরে বলল, "বুজান, আফনেরও কি আজ পেটে কামড় দিতাছে? শরীলডা ভালো ঠেকতাছে না?"
জোয়া প্রথমে একটু চমকে গেল। সে আশা করেনি ফাতেমা এত সহজে তার ভেতরের কষ্টটা ধরে ফেলবে। সে আস্তে করে মাথা নেড়ে বলল, "হ্যাঁ ফাতেমা। আজ প্রথম দিন। বড্ড ব্যথা করছে।"
ফাতেমা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর সে নিজের শাড়ির আঁচলের খুঁট থেকে একটা পুরনো, মলিন কিন্তু পরিষ্কার সুতি কাপড়ের টুকরো বের করল। সে কাপড়ের টুকরোটার দিকে তাকিয়ে এক ম্লান হাসি হেসে বলল, "বুজান, আমাগো কপালডা এক্কেরে এক। আমারও আজ দুই দিন চলে। এই চরের বাতাসে আর মেঘনার নোনা জলে আমাগো জরায়ুডাও বুঝি শুকাইয়া পাথর হয়া গেছে।"
জোয়া ফাতেমার হাতের সেই পুরনো কাপড়ের টুকরোটার দিকে তাকাল। তার মনে পড়ে গেল, ফাতেমারা তো চরের প্রান্তিক মানুষ। তাদের জীবনে এই সিল্কের দামি প্যাড, সুগন্ধি বা আধুনিক বাথরুম এক অলীক কল্পনা।
ফাতেমা মেঝেতে আবার বসতে বসতে বলতে লাগল, "বুজান, আফনেরা তো বড় লোক। দালানকোঠায় থাহেন। দামি জিনিস পরেন। আমাগো চরের জীবনে এইগুলা নাই। আমরা গরিব মেয়েছেলে। এই পিরিয়ডের দিনগুলায় পুরনো শাড়ির নোংরা ন্যাকড়া ব্যবহার করা লাগব। হেই ন্যাকড়া আবার ধুইয়া রোদ্রে দেওন যাইব না। চরের পুরুষমানুষদের নজর যদি হেই কাপড়ে পড়ে, তবে নাকি মহাপাপ হইব! সমাজ কইব মেয়েছেলেদের এইগুলা অলক্ষুণে কথা, গোপন জিনিস লোকসমক্ষে আনন যাইব না। তাই আমরা ঘরের অন্ধকার, স্যাঁতসেঁতে কোণায় বা গোয়ালঘরের পেছনে হেই ভেজা ন্যাকড়া লুকাইয়া শুকাইতাম। অসুখ-বিসুখ হয়া চরের কত মেয়েছেলে যে মরল, তার কোনো হিসাব নাই বুজান। কিন্তু সমাজ খালি একটা কথাই জানে—মেয়েছেলের শরীর মানেই লজ্জা, তারে লুকায়া রাখো।"
ফাতেমার কথাগুলো রান্নাঘরের বাতাসে এক অদ্ভুত ভারী পরিবেশ তৈরি করল। জোয়া ফাতেমার পাশে মেঝেতেই বসে পড়ল। তার পরনের দামি নাইট গাউনটা রান্নাঘরের মেঝেতে লেপ্টে গেল, কিন্তু আজ তার কোনো পরোয়া নেই। সে ফাতেমার সেই খসখসে হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিল।
দুজনের সামাজিক অবস্থান সম্পূর্ণ আলাদা। একজন গুলশানের বিলাসবহুল ফ্ল্যাটের মালকিন, যে পৃথিবীর সমস্ত আধুনিক সুবিধা পায়; আর অন্যজন বরিশালের এক প্রত্যন্ত চরের নিঃস্ব, পলাতক নারী, যে স্যানিটারি প্যাডের নামও হয়তো কোনোদিন শোনেনি। কিন্তু অদ্ভুতভাবে, প্রকৃতির দেওয়া এই রক্তক্ষরণ, তলপেটের এই আদিম কামড় আর তার ওপর সমাজের চাপিয়ে দেওয়া সেই আজন্মের ‘লজ্জা’ আর ‘নিষেধের’ শৃঙ্খল—এক মুহূর্তের মধ্যে তাদের দুজনকে এক সমান্তরাল রেখায় এনে দাঁড় করাল।
জোয়া ফাতেমার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, "জানিস ফাতেমা, আমাদের সমাজটা অদ্ভুত। তারা আমাদের শরীর থেকে জন্ম নেয়, কিন্তু আমাদের এই স্বাভাবিক রক্তক্ষরণটাকেই সবচেয়ে বড় অপবিত্র আর নোংরা জিনিস মনে করে। এরা আমাদের দেবী বলে পূজা করতে পারে, কিন্তু পিরিয়ডের দিনে রান্নাঘরে ঢুকতে দিতে বা ছুঁতে দ্বিধা করে।"
ফাতেমা মাথা নাড়ল। তার চোখে তখন এক চিলতে বুনো আগুন। সে বলল, "হ বুজান। মন্টু মাঝি তো এই দিনগুলায় আমারে আরো বেশি কইরা পিটাইত। বলত, মেয়েছেলেদের এই সময় নাকি শরীর অপবিত্র থাকে, তাই কথা শুনলে ঘরের অমঙ্গল হইব। পুরুষমানুষেরা আমাগো রক্ত শোষণ কইরা বাঁইচা থাকে বুজান, অথচ আমাগো এই রক্তের দাগটারে ঘেন্না করে।"
দুই নারী নীরবে রান্নাঘরের মেঝেতে বসে রইল। বাইরে তখন দুপুরের চড়া রোদ গুলশানের কাঁচের দেওয়ালে এসে আছড়ে পড়ছে। কিন্তু এই রান্নাঘরের ভেতরে, মেঝের ওপর বসে থাকা সিল্ক আর সুতির দুই প্রতিনিধি আজ তাদের জরায়ুর ব্যথা আর সমাজের চাপিয়ে দেওয়া লজ্জার স্মৃতিগুলো একে অপরের সাথে ভাগ করে নিল। কোনো কান্নাকাটি নেই, কোনো উচ্চস্বরে হাহাকার নেই; শুধু এক গভীর, আদিম এবং নিঃশব্দ মনস্তাত্ত্বিক মেলবন্ধন।
তারা বুঝতে পারল, এই রক্ত কোনো লজ্জার বিষয় নয়; এই রক্ত হলো তাদের নারীত্বের, তাদের লড়াকু সত্ত্বার প্রথম বারুদ। এই সমাজ তাদের যত বেশি অন্ধকার কোণায় লুকিয়ে রাখতে চাইবে, তাদের ভেতরের সেই অবদমিত বুনো নদীটা তত বেশি শক্তি নিয়ে একদিন এই পুরুষতান্ত্রিকতার দেওয়াল ভেঙে গুঁড়িয়ে দেবে। রক্তের এই প্রথম দাগ আজ তাদের ভেতরের বাঘিনীকে আরও একবার মনে করিয়ে দিল—তারা আর কোনোদিন মাথা নিচু করে এই শৃঙ্খল মেনে নেবে না।
•
|