Thread Rating:
  • 40 Vote(s) - 3.4 Average
  • 1
  • 2
  • 3
  • 4
  • 5
Erotic Thriller মরীচিকা ও মোহময়ী
R Ami jani eta baki  der moto matha mundu hin  choti golpo noi, jekhane golper goru gache na uthe space ship e kore Mongol Grohe pari dai. Ai quality bojai rakhte apnak onnoder theke bashi khat te hoi. 

Jai hok golpo ta besh chorom, Mon chai protidin update ashuk . But update to gache dore na je lekhak pere chobi tule pathiya debe. 

Next update Kobe asbe bolben oppekhai achi. 
[+] 1 user Likes mity odin 2's post
Like Reply
Do not mention / post any under age /rape content. If found Please use REPORT button.
দাদা আপনি আপনার মতো করে এগিয়ে যান। হাতে সময় নিয়ে, মন দিয়ে আপনি আপনার
মতো করে লিখুন। আমরা আছি আপনার সাথে।
ভালোবাসা অবিরাম।
[+] 1 user Likes rakib6192522's post
Like Reply
(29-04-2026, 05:28 AM)mity odin 2 Wrote: R Ami jani eta baki  der moto matha mundu hin  choti golpo noi, jekhane golper goru gache na uthe space ship e kore Mongol Grohe pari dai. Ai quality bojai rakhte apnak onnoder theke bashi khat te hoi. 

Jai hok golpo ta besh chorom, Mon chai protidin update ashuk . But update to gache dore na je lekhak pere chobi tule pathiya debe. 

Next update Kobe asbe bolben oppekhai achi. 

এই সপ্তাহেই আসবে। কাল বা পরশুদিন।
Like Reply
(29-04-2026, 05:17 AM)mity odin 2 Wrote: Amar kotha golpo bondho na holai holo. Baki lomba hoi, borohok, seta boro kotha noi. Niyomitio update palai holo. 

Ami  sudhu dekte chai bidishar moto adorsho boti nari kivabe sex korte raji hoi. 
1. Nijer Kam jala metabar jonno. 2.nijer pran bachanor jonno power ful lol O tader cele der theke 3.blackmailing r shikar naki 4.ayan k nijer kache feranor price hisebe ekbar na bar bar or none of the above.

আমি বলতে চাইছিলাম ধৈর্য্য ধরতে হবে। আরেকটা ব্যাপার হচ্ছে, ভবিষ্যতে কী হবে সেই বিষয়ে আমি এর মধ্যেই গল্পে বেশ কিছু ক্লু ছড়িয়ে রেখেছি। জানি না এখানকার পাঠকরা সেগুলো লক্ষ্য করেছে কিনা।
Like Reply
(29-04-2026, 10:25 PM)rakib6192522 Wrote: দাদা আপনি আপনার মতো করে এগিয়ে যান। হাতে সময় নিয়ে,  মন দিয়ে আপনি আপনার
মতো করে লিখুন। আমরা আছি আপনার সাথে।
ভালোবাসা অবিরাম।

পাশে থাকার, রেপু আর লাইক দেবার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ ভাই। আমার ভালবাসা নেবেন।
[+] 1 user Likes RockyKabir's post
Like Reply
আপনার লেখার মান অনেক ভালো। যতই পড়ছি ততই মুগ্ধতা ছড়াচ্ছে, এই সাইটে গল্প পড়ার মূল উদ্দেশ্য হলো আপনি জানেন, গল্পে সেক্স, রোমান্টিকজম, গল্প আকারে তুলে ধরা এগুলোই তো, আশা করি পাঠকদের বিষয়গুলো বিবেচনায় নিবেন । বিনয়ের সহিত বলছি ।
[+] 1 user Likes Monika Rani Monika's post
Like Reply
Waiting eagerly for the next episode!!
[+] 1 user Likes Paul's post
Like Reply
ভাই আমার মনে হয় আয় গল্পে সামনে অয়নকে তীব্র মা বিদ্বেষ করে, ও মা তার ক্যারিয়ার এ ফোকাস করলে এগিয়ে যাবে। এতে গল্পটা প্রাণ থাকবে। এমন ও হতে পারে যে অয়ন ওকিল নোটিশে এর মাধ্যমে তার পরিবারের সাথে সম্পর্ক শেষ করবে, নাম পরিবর্তন করবে।
একজন পাঠক হিসেবে এখন গল্পে রোমান্টিক বা সেক্স দিয়ে গল্পটা নষ্ট না করলে ভালো লাগবে।
[+] 1 user Likes jackson08's post
Like Reply
(02-05-2026, 08:51 PM)Paul Wrote: Waiting eagerly for the next episode!!

It'll be uploaded between 8 and 10 PM tonight.
Like Reply
(03-05-2026, 09:26 AM)jackson08 Wrote: ভাই আমার মনে হয় আয় গল্পে সামনে অয়নকে তীব্র মা বিদ্বেষ করে, ও মা তার ক্যারিয়ার এ ফোকাস করলে এগিয়ে যাবে। এতে গল্পটা প্রাণ থাকবে। এমন ও হতে পারে যে অয়ন ওকিল নোটিশে এর মাধ্যমে তার পরিবারের সাথে সম্পর্ক শেষ করবে, নাম পরিবর্তন করবে।
একজন পাঠক হিসেবে এখন গল্পে রোমান্টিক বা সেক্স দিয়ে গল্পটা নষ্ট না করলে ভালো লাগবে।

চিন্তা করবেন না ভাই, গল্পের প্লট নষ্ট করে সেক্স বা রোমান্স কোনটাই আনব না। আমি আগেই বলেছি এটা এই সাইটের অন্য গল্পগুলোর মতো সেক্সপ্রধান গল্প না। তবে অ্যাডাল্ট জঁর যেহেতু সেজন্য এটাতেও সেক্স আর রোমান্স থাকবেই। তবে সেটা প্লট নষ্ট করে দিয়ে আসবে না।
Like Reply
(01-05-2026, 02:52 PM)Monika Rani Monika Wrote: আপনার লেখার মান অনেক ভালো।  যতই পড়ছি ততই মুগ্ধতা ছড়াচ্ছে,  এই সাইটে গল্প পড়ার মূল উদ্দেশ্য হলো আপনি জানেন,  গল্পে সেক্স,  রোমান্টিকজম,  গল্প আকারে তুলে ধরা এগুলোই তো,  আশা করি পাঠকদের বিষয়গুলো বিবেচনায় নিবেন ।  বিনয়ের সহিত বলছি ।

আমার লেখা পড়ে আপনি মুগ্ধ হয়েছেন শুনে ভাল লাগল কিন্তু আপনি সবটা খুঁটিয়ে পড়েননি। আপনি যে অনুরোধ জানিয়েছেন সেই অনুরোধ আগেও এসেছে আর তার উত্তরে আমি কী বলেছি সেটা পড়ে নিলে আর এই কথা বলতেন না।

এটা অ্যাডাল্ট ইরোটিক থ্রিলার জঁরের মেগা নভেল। সেক্স আর রোমান্স যথাসময়ে আসবে। গল্পের ক্যানভাস বড় করতে হলে তার কাহিনী, চরিত্রগুলোকে শক্তিশালী বানানো জরুরি। গল্পের মেইন ক্যারেক্টারেরা প্রত্যেক চ্যাপ্টারে সেক্স করতে চাইলে সেটা সম্ভব নয়।

সাধারণ চটি গল্প এটা নয়। চটি গল্পে world building, character development থাকে না। যারা চটি পড়তে চাইছেন তারা পস্তাবেন। আগেই কয়ে দিলাম। আমি তাদের বলবো এই সাইটে এমন গল্প অজস্র আছে সেগুলো পড়ুন।
[+] 1 user Likes RockyKabir's post
Like Reply
মরীচিকা ও মোহময়ী

অধ্যায় ২০

পোস্টার রিলিজ


[Image: 1777801535779-2.jpg]
[+] 3 users Like RockyKabir's post
Like Reply
[Image: 1777820712428-2.jpg]

বিংশ অধ্যায়

(আগের দিন)

প্রিন্সিপাল সান্যালের ঘর থেকে ন্যাশনাল সিম্পোজিয়ামের বিশাল দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে বেরোনোর পর বিদিশার মনে হচ্ছিল, তিনি যেন এক লহমায় একটা নতুন যুদ্ধক্ষেত্রে প্রবেশ করলেন। অন্তত তার জন্য ন্যাশনাল লেভেল সিম্পোজিয়ামের লিড কো-অর্ডিনেটর হওয়াটা সাধারণ প্রশাসনিক দায়িত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটা তার কেরিয়ারের মরণ-বাঁচন সমস্যা।

তিনি জেনেশুনেই এই অগ্নিপরীক্ষায় প্রবেশ করেছেন। সফল হতে হলে সাহস আর কৌশলের পাশাপাশি প্রশাসনিক দৃঢ়তা আর মাথা ঠাণ্ডা রাখা একান্ত জরুরি। নয়তো চাপের মুখে পরিস্থিতি হাতের বাইরে বেরিয়ে যেতে পারে।


সেটার প্রমাণ তিনি হাতে নাতে পেয়েছিলেন ম্যাথমেটিক্স ডিপার্টমেন্টের স্টাফরুমে এসে।
প্রিন্সিপালের ঘর থেকে বেরিয়ে বিদিশা সটান এখানে চলে এসেছিলেন। ম্যাথমেটিক্স ডিপার্টমেন্টের স্টাফরুমটা মেইন বিল্ডিংয়ের দোতলাতে অবস্থিত। 


এটা কলেজের কমন স্টাফরুম বা টিচার্স লাউঞ্জের চেয়ে একটু আলাদা। এখানে সাধারণত একটা নীরস গাম্ভীর্যপূর্ণ নিস্তব্ধতা বিরাজ করে। 

টিচার্স লাউঞ্জে যেখানে চা-আড্ডা, গল্পগুজব আর হাসাহাসি চলে, সেখানে ম্যাথ ডিপার্টমেন্টের এই ঘরটা একটা নিস্তব্ধ দ্বীপের মতো। 
 
ঘরের মাঝখানে লম্বাটে একটা সেগুন কাঠের টেবিল, যার ওপরটা কাঁচ দিয়ে মোড়া। টেবিলের চারদিকে রাখা ভারী গদিওয়ালা ঘোরানো চেয়ার।

দেয়ালজুড়ে টাঙানো বিখ্যাত গণিতজ্ঞদের ছবি আর বড় বড় বুকশেলফে থরে থরে সাজানো জার্নাল আর মোটা মোটা সব অঙ্কের বই। 

জানলার ভারী পর্দাগুলো সবসময় অর্ধেক টানা থাকে বলে দিনের বেলাতেও ঘরের ভেতরে ভালভাবে রোদ ঢোকে না। এখানকার পরিবেশটাই এমন যে, কেউ উচ্চস্বরে কথা বলে না।

আজ বিদিশা যখন স্টাফরুমে ঢুকলেন, তখন সবাই না থাকলেও বেশ কয়েকজন ফ্যাকাল্টি সেখানে উপস্থিত ছিলেন। ডিপার্টমেন্টে মোট দশজন রেগুলার এবং দুজন গেস্ট ফ্যাকাল্টি আছেন। এদের মধ্যে নির্জনতাপ্রিয় ডঃ দাস লাইব্রেরি বিল্ডিংয়ে নিজের কেবিনে থাকতেই পছন্দ করেন।

এই ডিপার্টমেন্টের ফ্যাকাল্টিদের মধ্যে একটা অদ্ভুত বৈচিত্র্য আছে। একদিকে যেমন আছেন মিস্টার দাসের মতো নির্জনতাপ্রিয় প্রাজ্ঞ শিক্ষক, যিনি নিজের চারদিকে এক অদৃশ্য দেয়াল তুলে রাখেন; অন্যদিকে আছেন নন্দিতা দাশগুপ্তের মতো অভিজ্ঞ কলিগ, যিনি সবার সব খবরে আগ্রহ রাখলেও দরকারের সময় বড় বোনের মতো পাশে দাঁড়ান।

আজ, নন্দিতা দাশগুপ্ত ছাড়াও স্টাফরুমে আরও তিনজন উপস্থিত ছিলেন ।

প্রথমজন সুব্রত সেন, বয়স পঁয়তাল্লিশের কোঠায় হলেও এর মধ্যেই মাথার চুল সামনের দিকে পাতলা হতে শুরু করেছে। চোখে একটা সরু সোনালি ফ্রেমের চশমা, পরনে ফিটিং শার্ট। তার ঠোঁটের কোণে সবসময় একটা বাঁকা, তাচ্ছিল্য মেশানো হাসি লেগে থাকে। যেন পৃথিবীর সবকিছুই তাঁর কাছে উপহাসের বিষয়।

তার চোখের দৃষ্টিটা দেখলে বিদিশার অস্বস্তি হয়। তিনি যতটুকু দেখেছেন, অ্যাকাডেমিক পড়াশোনার চেয়ে ডিপার্টমেন্টাল পলিটিক্সের দিকেই ডক্টর সেনের বেশি আগ্রহ।

তার ঠিক পাশের ডেস্কে প্রায় কুঁকড়ে বসে আছেন অরিন্দম মাইতি। অত্যন্ত নার্ভাস, লাজুক প্রকৃতির এই জুনিয়র ফ্যাকাল্টি বয়স ত্রিশের কোঠায় হলেও তার মধ্যে যুবকসুলভ তেজ একেবারে নেই। চোখে মোটা পাওয়ারের চশমা, যেটা মাঝে মাঝে নাকের ডগা দিয়ে নীচে নেমে আসে। তাকে নিজস্ব কোনো মত প্রকাশ করতে বিদিশা এখনো অবধি দেখেননি। ডক্টর সেনকে ইনি প্রচণ্ড ভয় পান, তিনি কখনও বিরক্তি প্রকাশ করলে অরিন্দম রীতিমতো সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েন। 

আজ, বিদিশাকে ঘরে ঢুকতে দেখে তিনি নিজের নোটবুকের আড়ালে এমনভাবে মুখ লুকোলেন, যেন বিদিশা তাঁকে এক্ষুণি ভস্ম করে দেবেন।

আর ছিলেন সুমনা পাল, অত্যন্ত চুপচাপ। বিদিশা জয়েন করার পর থেকে এই এক মাসে সুমনার সাথে তাঁর কাজের বাইরে কোনো বাক্য বিনিময় হয়নি।

সুমনার পরনে সবসময় সাধারণ রঙের শাড়ি আর চোখে এক ধরণের ক্লান্তি। তিনি নিজের ডেস্কের বই আর খাতার স্তূপের মাঝে নিজেকে এমনভাবে আড়াল করে রাখেন যে তাঁর অস্তিত্বও মাঝেমাঝে ছায়ার মতো মনে হয়। বিদিশার সাথে তাঁর পরিচয় বলতে কেবল দূর থেকে মাথা নামিয়ে একবার সম্ভাষণ জানানো।

বিদিশা স্টাফরুমে ঢুকে ব্যাগটা ডেস্কে রেখে একটা ফাইল হাতে নিলেন।

"গুড আফটারনুন এভরিওয়ান, আমি আপনাদের পাঁচটা মিনিট সময় নেব।" 

বিদিশার কন্ঠস্বর শান্ত হলেও তাতে একটা কর্তৃত্বের সুর ছিল।

সুব্রত সেন নিজের হাতের চায়ের কাপটা নামিয়ে রেখে একটু বাঁকা হাসলেন।

 "বলুন মিস গাঙ্গুলি। আপনার জন্য তো প্রিন্সিপাল স্যারের দরজা সবসময় খোলা। আজ কী নতুন দায়িত্ব নিয়ে এলেন?"

কথাটার মধ্যে একটা প্রচ্ছন্ন খোঁটা ছিল, কিন্তু বিদিশা সেটা সম্পূর্ণ ইগনোর করলেন। তিনি সোজা হোয়াইটবোর্ডের সামনে গিয়ে মার্কারটা হাতে নিলেন। তাঁর মেরুদণ্ড টানটান, তিনি মার্কারটা হাতে নিয়ে বোর্ডের ওপর বড় বড় হরফে লিখলেন - ‘NATIONAL MATHEMATICS SYMPOSIUM’।

"প্রিন্সিপাল স্যার আগামী মাসে আমাদের কলেজে একটা 'ন্যাশনাল লেভেল ম্যাথমেটিক্স সিম্পোজিয়াম' হোস্ট করার দায়িত্ব আমাদের ডিপার্টমেন্টকে দিয়েছেন",

কথা বলতে বলতে বিদিশা ব্ল্যাকবোর্ডের ওপর একটা ফ্লো-চার্ট আঁকতে শুরু করলেন। চকের খসখস শব্দে ঘরের নিস্তব্ধতা ভেঙে যাচ্ছে।

একবার আঁকা থামিয়ে বিদিশা একবার সবার দিকে মুখ ফিরিয়ে নিজের গলাটা একটু গম্ভীর করলেন। 

"NAAC-এর যে ভিজিটটা মার্চে হবার কথা ছিল সেটা জানুয়ারি মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে এগিয়ে এনেছে। এর ফলে, আমাদের কলেজে যে 'ন্যাশনাল লেভেল ম্যাথমেটিক্স সিম্পোজিয়াম'টা ফেব্রুয়ারি মাসে আয়োজন হবার কথা ছিল সেটা আঠারো দিন পরে অনুষ্ঠিত হতে চলেছে। অর্থাৎ, আমাদের হাতে আর দু-তিন মাস সময় নেই। ডক্টর শুভেন্দু বোসের আকস্মিক অসুস্থতার কারণে প্রিন্সিপাল স্যার আমাকে এই ইভেন্টের লিড কো-অর্ডিনেটর হিসেবে মনোনীত করেছেন।"

খবরটা স্টাফরুমে যেন একটা ছোটখাটো বিস্ফোরণ ঘটাল। নন্দিতা দাশগুপ্ত চমকে উঠে চশমাটা ঠিক করলেন, অরিন্দমবাবুর হাত থেকে নোটবুকটা প্রায় পড়েই যাচ্ছিল। সুব্রত সেনের চোখের পলক এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। আঠারো দিনের নোটিশে একটা ন্যাশনাল স্তরের ইভেন্ট আয়োজন ? অসম্ভব!

"আমি জানি, হাতে সময় অসম্ভব কম" 

বিদিশা এবার পিছন ফিরে সরাসরি সবার চোখের দিকে তাকালেন। 

"কিন্তু, এই চ্যালেঞ্জটা আমাদের নিতেই হবে। আর সেটার জন্য পুরো ডিপার্টমেন্টের সক্রিয় সহযোগিতা প্রয়োজন।"

বিদিশা দ্রুত কাজ ভাগ করে দিতে শুরু করলেন,

"সুব্রতবাবু, আপনার নেটওয়ার্কিং ভালো, তাই আমি চাই আপনি স্পনসরশিপ আর ফান্ডিংয়ের দিকটা সামলান। নন্দিতাদি, আপনি পেপার প্রেজেন্টেশনের শিডিউল ঠিক করা আর অ্যাকাডেমিক সেশনগুলোর প্যানেল ডিসকাশনের মডারেটরের দায়িত্ব নেবেন।"

"অরিন্দম বাবু, আপনি ডেলিগেটদের হসপিটালিটি আর অ্যাকোমোডেশনের দিকটা দেখবেন। আর ডক্টর পাল..."

বিদিশা সুমনার দিকে তাকালেন। 

"আমি চাই আপনি পেপার প্রেজেন্টেশন এবং আমন্ত্রিত গেস্ট লেকচারারদের শিডিউলিংয়ের দায়িত্বটা নিন।"

পুরো ঘরটা কয়েক সেকেন্ডের জন্য নিস্তব্ধ হয়ে গেল। সবাই এখনও আঠারো দিনে একটা ন্যাশনাল লেভেলের সিম্পোজিয়াম আয়োজন করার খবরটা হজম করে উঠতে পারেনি।

কিন্তু এর মাঝেই সুব্রত সেনের মনোযোগ ছিল সম্পূর্ণ অন্য কোথাও। তিনি চেয়ারে আয়েশ করে হেলান দিয়ে বসলেন, তার হাতের চায়ের কাপটা টেবিলের ওপর অবহেলায় পড়ে রইল।

বিদিশার পরনে ছিল ছাই-রঙা হ্যান্ডলুম শাড়ি যা তার তন্বী শরীরের সাথে একাত্ম হয়ে মিশে ছিল। তিনি যখন হাত উঁচিয়ে বোর্ডের ওপরের দিকে লিখছিলেন, তখন শাড়ির আঁচলটা কাঁধ থেকে সামান্য সরে গিয়ে তার ফর্সা পিঠের মসৃণ ত্বকের একটা অংশ উন্মুক্ত করে দিয়েছিল। সুব্রত সেনের সরু ফ্রেমের চশমার আড়ালে থাকা চোখদুটো যেন সেই সুযোগের অপেক্ষাতেই বসে ছিল।

তার দৃষ্টি অত্যন্ত ক্ষুধার্তভাবে বিদিশার কোমরের নিখুঁত ভাঁজটিতে গিয়ে স্থির হলো, যেখানে শাড়ির পাড় তার তন্বী শরীরকে জাপটে ধরে আছে। বিদিশার প্রতিটি নড়াচড়ায় তার শরীরের যে ছন্দ তৈরি হচ্ছিল, সুব্রত তা রীতিমতো চেটেপুটে খাচ্ছিলেন। 

শাড়ির আঁচলটা কাঁধের ওপর পিন করা থাকলেও, বিদিশা যখন হাত তুলে বোর্ডের উপরের দিকে লিখছিলেন, তখন তার কোমরের ধবধবে ফর্সা মসৃণ ত্বক এবং কোমর আর পিঠের বিভাজিকা স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল, সুব্রত সেন নির্লজ্জের মতো অত্যন্ত ধীরলয়ে, প্রায় চেটেপুটে দেখার মতো করে বিদিশার সরু কোমরের সেই নিখুঁত বাঁক আর শাড়ির নিচে ভাঁজ হয়ে থাকা নিতম্বের ভারী গড়নটা পর্যবেক্ষণ করতে লাগলেন।

দেখতে দেখতে সুব্রতর নিশ্বাসের শব্দ সামান্য ভারী হয়ে এল। তিনি একবার কাপটা তুলে নিঃশব্দে এক চুমুক চা খেলেন, কিন্তু বিদিশার উপর থেকে তার চোখ সরলো না। 

নন্দিতা দাশগুপ্ত বা সুমনা পালের উপস্থিতি তাকে বিন্দুমাত্র দমাতে পারল না। বরং সবার সামনে ব্ল্যাকবোর্ডে তাকানোর অছিলায় একজন কলিগকে এভাবে নিজের দৃষ্টি দিয়ে নগ্ন করার মধ্যে তিনি একধরনের বিকৃত আনন্দ খুঁজে পাচ্ছিলেন।

বিদিশা বোর্ডের লেখা শেষ করে পিছন ফিরতে সুব্রত দ্রুত বিদিশার উপর থেকে তার দৃষ্টি সরিয়ে নিলেন ঠিকই, কিন্তু তার চোখের আভাটা বুঝিয়ে দিচ্ছিল যে তিনি বিদিশাকে একজন সহকর্মী হিসেবে নয় বরং লালসার লক্ষ্যবস্তু হিসেবেই দেখছেন।

বিদিশা অবশ্য পিছন ঘুরতে দেখতে পেলেন সুব্রত সেন নিজের চেয়ারটায় আয়েশ করে হেলান দিয়ে আছেন।

বিদিশার দিকে তাকিয়ে তিনি অত্যন্ত ক্যাজুয়াল গলায় বলে উঠলেন, "অবশ্যই, মিস গাঙ্গুলি। আপনি যখন লিড করছেন, তখন আমাদের তো ফলো করতেই হবে, প্রিন্সিপাল স্যার তো আর এমনি এমনি ইমপ্রেসড হননি! তবে আমরা তো পুরোনো, বোরিং লোক। আমাদের প্রেজেন্টেশনে কি আর ন্যাশনাল লেভেলের স্পনসররা গলবে?"

স্টাফরুমে একটা অস্বস্তিকর নিস্তব্ধতা নেমে এল। অরিন্দম মাথা নিচু করে নিজের নোটপ্যাডটা টেনে নিয়ে তাতে লেখার ভান করতে লাগলেন। নন্দিতা দাশগুপ্ত অন্যদিকে তাকালেন, তার চোখেমুখে তীব্র বিরক্তির ছাপ।

কথাটার মধ্যে যে নোংরা, অশালীন ইঙ্গিতটা লুকিয়ে আছে, সেটা বুঝতে বিদিশার এক সেকেন্ডও সময় লাগল না। 

তার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। কিন্তু তিনি মেজাজ হারালেন না। তিনি জানেন এই ধরনের নোংরা উস্কানিকে কীভাবে নিজের ব্যক্তিত্ব দিয়ে পিষে দিতে হয়। ইতালি তাকে অনেক কিছু শিখিয়ে দিয়ে গেছে। বনগানি তার চারিত্রিক কাঠিন্যের প্রমাণ পেয়েছিল, সুব্রতর বস ড.বাগচীও গতকাল সেই কাঠিন্যের প্রমাণ পেয়েছেন। আজ সুব্রতর পালা।

বিদিশা 'ঠক' করে একটা আওয়াজ মার্কারটা বোর্ডের ওপর করে নামিয়ে রাখলেন। স্টাফরুমের গুমোট নিস্তব্ধ পরিবেশে শব্দটা চাবুকের মতো শোনাল। 

তিনি অত্যন্ত ঠান্ডা চোখে সুব্রত সেনের দিকে তাকালেন। বিদিশার দৃষ্টিতে প্রচ্ছন্ন ঘৃণাটা সুব্রত বুঝতে পারলেন না।

"ডক্টর সেন, প্রিন্সিপাল স্যার আমার অ্যাকাডেমিক রেকর্ড আর কাজের প্রতি নিষ্ঠা দেখে এই দায়িত্বটা আমায় দিয়েছেন। আর স্পনসরশিপ আনার জন্য 'আকর্ষণীয়' হওয়ার প্রয়োজন নেই, প্রফেশনাল হওয়াটাই যথেষ্ট।"

বিদিশার গলার স্বরটা বরফের মতো শীতল হলেও তাঁর প্রতিটি শব্দের উচ্চারণে ইস্পাতের মতো কঠিন দৃঢ়তার সুর।

"আমার প্রেজেন্টেশনের 'আকর্ষণ' নিয়ে আপনার মাথাব্যথা না থাকলেও চলবে। গত বছর আপনার ন্যাশনাল কনফারেন্সের পেপারটা অ্যাকাডেমিক কমিটিতে রিজেক্ট হয়ে গিয়েছিল বলে শুনেছি। আশা করি এবারে আর এমন কোন ভুল হবে না।"

সুব্রত সেনের মুখের সেই বাঁকা হাসিটা এক লহমায় মিলিয়ে গেল। তার মুখটা রাগে, অপমানে লাল হয়ে উঠল। একজন জুনিয়র যে একটু আগে তার লালসার লক্ষ্যবস্তু ছিল, তার কাছ থেকে এমন সপাট জবাব তিনি আশা করেননি। 

স্টাফরুমের বাকি কলিগদের সামনে তার অ্যাকাডেমিক ব্যর্থতার কথা এভাবে কেউ তার দিকে ছুঁড়ে দেবে, সেটা তিনি দুঃস্বপ্নেও ভাবেনি। তার ইগোতে প্রচণ্ড আঘাত লাগল। তার গলার শিরগুলো ফুলে উঠল, কপাল দিয়ে ঘাম নামতে শুরু করল।

তিনি প্রতিবাদের জন্য কিছু একটা বলতে গেলেন, কিন্তু অপমানের জ্বালায় তাঁর কণ্ঠনালী অবশ হয়ে গেছে। একটা শব্দও তাঁর মুখ দিয়ে বেরোল না। তিনি শুধু দাঁতে দাঁত চেপে একদৃষ্টে বিদিশার দিকে তাকিয়ে রইলেন আর সরু চশমার আড়ালে থাকা তাঁর চোখদুটোতে জ্বলে উঠল জিঘাংসার আগুন।

বিদিশা সেটাকে পাত্তাই দিলেন না।

"অরিন্দম বাবু", বিদিশা সুব্রতর দিক থেকে চোখ সরিয়ে অত্যন্ত স্বাভাবিক গলায় অরিন্দমের দিকে তাকালেন। 

"আপনি হসপিটালিটির ডিটেইলসগুলো নোট করে নিন। আমি কাল সকালের মধ্যে ড্রাফটটা দেখতে চাই।"

"ইয়েস... ইয়েস ম্যাম। আমি নোট করে নিচ্ছি" 

অরিন্দম ভয়ে ভয়ে, মাথা নিচু করে নিজের নোটপ্যাডে দ্রুত লিখতে শুরু করলেন।

বিদিশা আর কোনো কথা না বাড়িয়ে ব্ল্যাকবোর্ড থেকে ডাস্টার দিয়ে ফ্লো-চার্টটা মুছতে শুরু করলেন। তার প্রফেশনাল স্পেসে এই ধরনের নোংরামি তিনি কোনভাবেই বরদাস্ত করবেন না।

মিটিংয়ের আধ ঘণ্টা পরে বিদিশার কেবিনের দরজায় দুটো মৃদু টোকা পড়ল।

"কাম ইন", বিদিশা ল্যাপটপ থেকে মুখ না তুলেই বললেন।

দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল সাহিল খান। সেকেন্ড ইয়ার, থার্ড সেমিস্টার, অঙ্কে অনার্স, তুখোড় ছাত্র। স্টুডেন্ট কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট।

তার পরনে একটা পরিষ্কার ধবধবে সাদা আয়রন করা শার্ট আর ফর্মাল প্যান্ট। সাহিল কেবিনের ভেতরে ঢুকে আলতো করে দরজাটা ভেজিয়ে দিল। বিদিশা লক্ষ্য করলেন, সাহিল ডেস্কের খুব কাছে এগিয়ে এল না; বরং টেবিল থেকে অন্তত তিন ফুট দূরত্ব বজায় রেখে স্থির হয়ে দাঁড়াল। তার শরীরী ভাষায় কোনো বাড়তি চপলতা নেই।

"গুড আফটারনুন, ম্যাম। আপনি আমাকে ডেকেছিলেন?" 

সাহিলের গলার স্বরটা শান্ত এবং গভীর সম্ভ্রমপূর্ণ।

বিদিশা ল্যাপটপ বন্ধ করে সোজা হয়ে বসলেন। সাহিলের এই পরিমিতিবোধ তাঁর ভালো লাগল।

"এসো সাহিল, বোসো।"

সাহিল অনুমতি পাওয়ার পর অত্যন্ত মার্জিত ভঙ্গিতে সামনের চেয়ারটায় বসল। তার বসার ধরনে কোনো ঔদ্ধত্য নেই, বরং একজন শিক্ষিকার প্রতি প্রাপ্য সম্মান ফুটে উঠছে।

"সাহিল, আগামী মাসে আমাদের কলেজে একটা ন্যাশনাল লেভেল ম্যাথমেটিক্স সিম্পোজিয়াম অনুষ্ঠিত হতে চলেছে, তার জন্য একটা ভলান্টিয়ার টিম দরকার।ভলান্টিয়ারিং টিমের হেড হিসেবে আমি তোমাকে বেছে নিয়েছি", বিদিশা সরাসরি আসল কথায় এলেন।

সাহিলের মুখে এক চিলতে বিনয়ী হাসি ফুটে উঠল।

"ইটস অ্যান অনার, ম্যাম। আমি আমার বেস্ট দেওয়ার চেষ্টা করব। আমাদের ঠিক কতজন ভলান্টিয়ার লাগবে আর ইভেন্টের স্কেলটা কী রকম হবে, সেটার কোনো রাফ আইডিয়া কি আমাকে দেওয়া যাবে?"

সাহিল চেয়ারটায় বসে খুব মন দিয়ে বিদিশার কথাগুলো শুনল। সে কথার মাঝে অপ্রাসঙ্গিক কোন প্রশ্ন করল না, কোনো ব্যক্তিগত স্তুতি বা অপ্রয়োজনীয় প্রশংসার ধার দিয়েও গেল না।

"ম্যাম, আমি আজ বিকালের মধ্যেই বিশ জনের একটা কোর টিম রেডি করে ফেলব। ম্যাথস আর স্ট্যাটিস্টিক্স ডিপার্টমেন্টের থার্ড ইয়ারের স্টুডেন্টদের প্রায়োরিটি দেব, কারণ ডেলিগেটদের সাথে অ্যাকাডেমিক ইন্টার‍্যাকশনের দরকার হতে পারে তখন তাদের এই ব্যাকগ্রাউন্ডটা খুব কাজে দেবে", সাহিল অত্যন্ত সুশৃঙ্খল এবং পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট উত্তর দিল।

"চমৎকার চিন্তা, সাহিল। আমি তোমাকে পুরো ডিটেইলসটা মেইল করে দিচ্ছি। তুমি তোমার টিম রেডি করে কাল ফার্স্ট আওয়ারের মধ্যে আমাকে একটা লিস্ট জমা দেবে", বিদিশা একটু রিল্যাক্সড গলায় বললেন।

"সিওর, ম্যাম। থ্যাংক ইউ ফর দিস অপরচুনিটি", সাহিল মাথা সামান্য ঝুঁকিয়ে অভিবাদন জানিয়ে, নিঃশব্দে কেবিন থেকে বেরিয়ে গেল।

সাহিল বেরিয়ে যাওয়ার পর কেবিনটা আবার নিস্তব্ধ হয়ে গেল। বিদিশা একা বসে ভাবছিলেন। 

সাহিলের এই নিখুঁত 'বাউন্ডারি' বা পেশাদারী দূরত্ব বজায় রাখাটা তাঁকে এক মুহূর্তের জন্য অতীতে ফিরিয়ে নিয়ে গেল। তাঁর চোখের সামনে ভেসে উঠল বিক্রম মালহোত্রার সেই প্রথম দিনের আলাপ।

করিডোরে দেখা হওয়ার দিন থেকেই বিক্রম বারবার তাঁর পার্সোনাল স্পেস বা ব্যক্তিগত গণ্ডি আক্রমণ করার চেষ্টা করেছে। 

সে কখনো তার রূপের প্রশংসা করেছে, কখনো তার শাড়ির প্রশংসা করেছে, কখনো তার পারফিউমের গন্ধ নিয়ে ব্যক্তিগত মন্তব্য ছুঁড়ে দিয়েছে। আর, প্রতিবার সে কাজের অছিলায় তার পার্সোনাল স্পেসে ঢুকে পড়ত। 

ওটা কী আদৌ স্বাভাবিক আচরণ ছিল ?

আজ সাহিলকে দেখে তো সেটা মনে হচ্ছে না। আজ সাহিল তাকে কোন পার্সোনাল কমপ্লিমেন্ট দিল না, ব্যক্তিগত জায়গায় ঢোকার চেষ্টা করল না, সরাসরি পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট কাজের কথা বলল। 

বিদিশা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তাঁর ষষ্ঠেন্দ্রিয় বা 'সিক্সথ সেন্স' তাকে সেদিন ঠিকই সংকেত দিয়েছিল, কিন্তু তিনি সবার সতর্কবাণীর মতো সেটাকে গ্রাহ্য করেননি। অয়নের সেদিনের ওয়ার্নিং'টা যে অমূলক ছিল না এখন তিনি সেটা বুঝতে পারছেন।

বিদিশা আজ নির্জনে স্বীকার করলেন, অয়ন ভুল ছিল না।

তবে, অয়নের হিংস্র আচরণ তিনি এখনো সমর্থন করতে পারছেন না। প্রতিবাদ করার জন্য সে যে হিংস্র পথ বেছে নিয়েছিল, তা কোনোভাবেই মার্জনীয় নয়। সে নিজেও অতি জঘন্য অপরাধ করেছে। তার জন্য সে উপযুক্ত শাস্তিই পেয়েছে। আজ অভিমান করলেও বড় হলে বুঝতে পারবে। মা হিসেবে কষ্ট পেলেও একজন শিক্ষিকা হিসেবে তিনি এ ধরনের গুন্ডাসুলভ আচরণকে প্রশ্রয় দিতে পারেন না।

যা হবার তা তো হয়েই গেছে। এই নিয়ে আর চিন্তা করে লাভ নেই।

বিদিশা চেয়ারে হেলান দিয়ে একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেন। সাহিলের সাথে কাজ করলে মনে হয় তাকে আর ব্যক্তিগত পরিসর ভাঙার আশঙ্কায় ভুগতে হবে না। তিনি মনে মনে নিশ্চিত হলেন যে বিক্রমকে ছেঁটে ফেলে সাহিলকে ভলান্টিয়ার টিমের লিডারের দায়িত্ব দিয়ে তিনি সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

(বর্তমান সময়)

দুপুর দুটো। মেইন বিল্ডিংয়ের গ্রাউন্ড ফ্লোরের ডান পাশের করিডোর। স্টুডেন্ট কাউন্সিলের অফিসটা গ্রাউন্ড ফ্লোরের এক কোণে অবস্থিত। অফিসের অবস্থানটা এমন একটা জায়গায়, যেখান থেকে পুরো করিডোরের গতিবিধি নজর রাখা যায়, অথচ সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের আনাগোনা এদিকে কম। পুরনো আমলের ভারী সেগুন কাঠের দরজা, যার ওপর পিতলের প্লেটে খোদাই করা 'Student Council Office'।

সেই ভারী পাল্লার দরজাটা একটা ক্যাঁচক্যাঁচে শব্দ করে খুলে গেল। ভেতর থেকে বেরিয়ে এল বিক্রম মালহোত্রা। 

তার ঠোঁটের গভীর ফাটা দাগটা এখনো পুরোপুরি শুকায়নি, তবে ব্যান্ডেজটা খোলা হয়েছে।

তার মনের ভেতরটা ফেস্টের পর থেকে তীব্র হতাশা আর রাগে ফুটছে। অয়ন চ্যাটার্জী নামে ফার্স্ট ইয়ারের ওই ইডিয়ট-টা তার সমস্ত প্ল্যানে জল ঢেলে দিয়েছে। নাহলে সে নিশ্চিত যে সেদিন রাতে মালটা ওর হাতের মুঠোয় এসে গিয়েছিল। ফেস্টের রাতের ম্যাজিক মোমেন্টটা যদি চ্যাটার্জী নষ্ট না করত, তবে ওই মোহময়ী মেয়েছেলেটাকে সে অনায়াসে সেদিন রাতে নিজের বিছানায় তুলে ফেলত।

বিদিশা এখন ওর কাছে স্রেফ আর একটা শখের শিকার নয়। শৌখিন বিনোদনের সীমা ছাড়িয়ে বিদিশা এখন বিক্রমের মস্তিষ্কে অবসেশন হয়ে জেঁকে বসেছে। বিক্রম বন্ধুদের কাছে এক মাসের যে বাজিটা লড়েছিল, সেটা হেরে যাওয়াতে ওর পুরুষালি ইগোতে যে চোটটা লেগেছে সেটা এখন বিষাক্ত ক্ষতর মতো দিনরাত জ্বলছে। সেই জ্বলুনিটা ওকে থিতু হতে দিচ্ছে না।

আর, অয়ন চ্যাটার্জী হল একটা অযাচিত কাঁটা যাকে সে ঠিক সময়মতো উপড়ে ফেলবে।

কেন অয়ন চ্যাটার্জী সেদিন রাতে ওর উপর চড়াও হল বিক্রম তার কোনো কূলকিনারা পাচ্ছে না। সে বারবার স্মৃতি হাতড়েও মনে করতে পারছে না ক্যাম্পাসে কোনদিন ওই ছেলেটার সাথে তার কথা কাটাকাটি হওয়া তো দূরের কথা, আদৌ কখনো চোখের দেখা হয়েছে কিনা।

ওই অচেনা ছেলেটা সেদিন রাতে কেন ওরকম পাগলের মতো আচরণ করল সেটা বিক্রমের মতো একটা বুদ্ধিমান ছেলের কাছেও একটা অমীমাংসিত ধাঁধা হয়ে রয়ে গেছে।

বিক্রম অত্যন্ত ধূর্ত। সবার সামনে অয়নের তাকে পেটানো, তার ঠোঁট ফাটানো, এই পুরো ব্যাপারটা সে সফলভাবে পুঁজি করেছে। বিক্রম বিদিশাকে ইমপ্রেস করার জন্য প্রিন্সিপালের কাছে অয়নকে ক্ষমা করে দেওয়ার আর্জি জানিয়েছিল। সে ভেবেছিল, বিষয়টা বিদিশার কানে পৌঁছলে সে ওর চোখে 'মহান' হয়ে উঠবে। তারপর থেকে সে ইচ্ছে করেই আর বিদিশার ধারেকাছে যায়নি। যাতে বিদিশা নিজে অপরাধবোধে ভুগে তাঁর এই ‘আদর্শ ছাত্রের’ খোঁজ নিতে ছুটে আসেন।

সারা ক্যাম্পাস এখন তাকে 'মহান' বলছে ঠিকই, কিন্তু যার জন্য সে এত নাটক করল, সেই বিদিশা ফেস্টের পর থেকে কলেজে জয়েন করার পর থেকে এই দেড় সপ্তাহে একবারও ওর খোঁজ পর্যন্ত নেয়নি। সারা ক্যাম্পাস যখন তাকে সহানুভূতির বন্যায় ভাসাচ্ছে, তখন বিদিশার এই নিস্পৃহ উপেক্ষা বিক্রমকে পাগল করে দিচ্ছে।

চ্যাটার্জী ইডিয়টটাকে ও পরে দেখে নেবে। ওটার জন্য নকশা তৈরি হয়েই আছে। ওটাকে সে সময়মতো এমনভাবে পিষে ফেলবে যে ওর আর কোথাও কোন চিহ্ন থাকবে না। সে কার গায়ে হাত দিয়েছে সেই বিষয়ে গাধাটার কোন আইডিয়াই নেই।

কিন্তু, আপাতত বিদিশার কোন রেসপন্স না পাওয়াটা ওকে ভাবিয়ে তুলেছে। বিক্রম করিডোরের একটা পিলারের কাছে দাঁড়িয়ে পকেট থেকে সিগারেট বের করতে যাচ্ছিল, ঠিক সেই সময়...

"মালহোত্রা!"

পেছন থেকে একটা ডাক শুনে বিক্রম ঘুরে দাঁড়াল।

ম্যাথমেটিক্স ডিপার্টমেন্টের ডক্টর সুব্রত সেন করিডোর ধরে হেঁটে আসছেন। তার হাতে কয়েকটা ফাইল। ঠোঁটের কোণে সেই বাঁকা হাসি।

বিক্রম হিস্ট্রির স্টুডেন্ট হলেও, স্টুডেন্ট কাউন্সিলের ট্রেজারার হওয়ার সুবাদে কলেজের সব ডিপার্টমেন্টের ফ্যাকাল্টির সাথেই তার ওঠাবসা আছে। বিশেষ করে সুব্রত সেনের মতো টিচারদের সাথে আন্ডারগ্রাউন্ড পলিটিক্সের সূত্রে তার একটা ভালো বোঝাপড়া রয়েছে।

"গুড আফটারনুন, স্যার", বিক্রম ভদ্রভাবে হাসার চেষ্টা করল, যদিও ফাটা ঠোঁটের কারণে হাসিটা একটা বিকৃত রূপ নিল।

"কী হে মালহোত্রা? তোমার ঠোঁটের অবস্থা তো দেখছি বেশ খারাপ", সুব্রত সেন একটু নিচু গলায়, মক করার সুরে বললেন।

বিক্রম সিগারেটটা ফেলে দিয়ে একটা মেকি, ভদ্র হাসি দিল। "আর বলবেন না স্যার। একটা ফার্স্ট ইয়ারের সাইকো... এনিওয়ে, ম্যানেজমেন্ট বিষয়টা দেখছে।"

সে বিষয়টা এড়ানোর চেষ্টা করল।

সুব্রত সেন এদিক-ওদিক তাকিয়ে বিক্রমের দিকে একটু এগিয়ে এলেন। তার চোখে হিসেবি দৃষ্টি।

"ম্যানেজমেন্ট কী দেখছে সেটা ম্যানেজমেন্টই জানে। কিন্তু আমি তো দেখলাম তোমার ম্যাডাম তোমাকে সাইড করে স্টুডেন্ট কাউন্সিলের প্রেসিডেন্টকে কাছে টেনে নিল!" 

সুব্রত একটা গা-জ্বালানো হাসি হাসলেন।

বিক্রমের চোখের তারা এক মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে গেল। 

"আমি ঠিক বুঝতে পারলাম না স্যার। কোন ম্যাডাম?"

"আরে, আমাদের ম্যাথস ডিপার্টমেন্টের নতুন সেনসেশন- মিস বিদিশা গাঙ্গুলি", সুব্রত সেন গলাটা একটু নামিয়ে বললেন। 

"ন্যাশনাল সিম্পোজিয়ামের ভলান্টিয়ারিং টিমের হেডের জন্য প্রিন্সিপাল স্যার তোমার নাম রেকমেন্ড করেছিলেন। কিন্তু তোমার ম্যাডাম তো তোমার বদলে সাহিল খানকে পছন্দ করলেন! প্রিন্সিপালকে সোজা মুখের ওপর না করে দিলেন।"

বিক্রমের মনে হল কেউ যেন ওর বুকের ভেতর একটা জ্বলন্ত কয়লা ছুঁড়ে মারল। 

বিদিশা তাকে বাদ দিয়েছে ? 

যে বিদিশা ওর সূক্ষ্ম কমপ্লিমেন্টগুলোতে একটু হলেও থমকে যেত, যার গালের ওপর লাল আভা খেলে যেত, সেই বিদিশা ওকে কোনো কৈফিয়ত না দিয়েই এত গুরুত্বপূর্ণ একটা ইভেন্ট থেকে ওকে আবর্জনার মতো ছেঁটে ফেলল ?

বিক্রমের চোয়ালের পেশিগুলো শক্ত হয়ে উঠল।

সুব্রত সেনের ঠোঁটের কোণে ঝুলে থাকা সেই পরিচিত বাঁকা হাসিটা এবার আরও চওড়া হলো।

"আমরা ভেবেছিলাম ফেস্টে তুমি যখন এত খেটেছ, তখন এই ইভেন্টেও তুমিই লিড করবে। কিন্তু আজ শুনলাম, উনি নাকি সাহিল খানকে ভলান্টিয়ারিং হেড করেছেন। তোমাকে পুরোপুরি ছেঁটে ফেলেছেন!"

বিক্রমের শরীরটা এক মুহূর্তের জন্য পাথরের মতো শক্ত হয়ে গেল। সুব্রত সেন সেই সুযোগটা ছাড়লেন না।

"নতুনদের এই এক দোষ, রূপের দেমাগে সিনিয়র-জুনিয়র কাউকে পাত্তাই দেয় না। আমরা তো তাও কলিগ, কিন্তু তোমার মতো একটা ডেডিকেটেড স্টুডেন্টকে এভাবে ছুড়ে ফেলে দেওয়াটা... সত্যি, ভেরি আনফেয়ার! হঠাৎ সাহিলকে কেন কাছে টানলেন, কে জানে! এনিওয়ে, তোমার মতো ব্রাইট স্টুডেন্টের একটু সাবধানে থাকাই ভালো।"

বিক্রমের বুকের ভেতরটা অপমানে আর রাগে জ্বলে উঠল।

এতদিন বিক্রম ভাবছিল বিদিশা তার হাতের মুঠোয় থাকা একটা পুতুল যাকে সে ইচ্ছেমতো নিজের ছাঁচে ঢালতে পারে। সে অত্যন্ত সুকৌশলে বিদিশার চারপাশে এক অদৃশ্য মায়াজাল বুনেছিল। 

তাঁর শাড়ির প্রশংসা করা, তার পারফিউমের ঘ্রাণ নিয়ে মুগ্ধতা প্রকাশ করা, ফেস্টের কাজের অজুহাতে বারবার তাঁর 'পার্সোনাল স্পেস' বা ব্যক্তিগত পরিসরে ঢুকে পড়া, এই সবকিছুই ছিল বিদিশার অবচেতন মনকে বশ করার একেকটা ধাপ। বিক্রম দেখছিল, বিদিশা তাঁর এই চতুর চাটুকারিতায় ক্রমশ নরম হয়ে পড়ছেন, তাঁর বর্মটা বিক্রমের মোলায়েম আচরণের সামনে আলগা হয়ে আসছে। বিক্রম ভেবেছিল, বিদিশা তার সান্নিধ্য মনে মনে উপভোগ করছে, যা ওকে সুযোগ করে দেবে বিদিশাকে ইচ্ছামতো নাচানোর।

কিন্তু এখন তার মনে হতে লাগল বিদিশা তাকে ইউজ করে মাঝপথে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে। ফেস্টের যতরকমের কঠিন কাজ, সব বিক্রমকে দিয়ে করিয়ে নিয়েছে সে। আর এখন, বিনা কারণে সে জাতীয় স্তরের ম্যাথ সিম্পোজিয়ামের মতো বড় এক মঞ্চ থেকে বিক্রমকে অনায়াসে ছেঁটে ফেলল।

"থ্যাংক ইউ ফর দা ইনফরমেশন, স্যার", বিক্রম কোনোমতে নিজের রাগটা চেপে রেখে বলল।

সুব্রত সেন যাওয়ার জন্য পা বাড়িয়েও একবার থামলেন। বিক্রমের কাঁধে একটা হাত রেখে গলাটা আরও একধাপ নামিয়ে বললেন, "এনিওয়ে, নিজের খেয়াল রেখো। আর ওই ফার্স্ট ইয়ারের ছোকরাটা... অয়ন না কী যেন নাম, ওর সাথে এই মুহূর্তে সরাসরি কোন ঝামেলায় জড়াতে যেও না। ছেলেটা এখন সেনগুপ্তর চোখের মণি, ওর আদরের দুলাল আর তার উপর প্রিন্সিপাল ওকে সফট কর্নার দিচ্ছে। বুঝে-শুনে পা ফেলো", সুব্রত সেন বিক্রমকে সাবধান করে দিয়ে পা ফেলে এগিয়ে গেলেন।

বিক্রম পাথরের মূর্তির মতো করিডোরে দাঁড়িয়ে রইল। তার চোয়ালের পেশিগুলো রাগে ফুলে উঠেছে। তার হাতের মুঠো শক্ত হয়ে গেল।

তার মাথায় এখন হাজার মৌমাছির গুঞ্জনের মতো একটাই নাম আছড়ে পড়ছে - বিদিশা। 

বিদিশা তাকে বাদ দিয়েছে? তাকে? বিক্রম মালহোত্রাকে? আর কার জন্য? ওই সাহিলের জন্য? 

সাহিল খানকে ভলান্টিয়ারিং হেড করা মানে বিক্রমের গালে সপাটে এক চড় মারা।

বিক্রম এমনিই সাহিলকে পছন্দ করে না, তার ধারণা স্টুডেন্ট কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট পদটা ওরই পাওয়া উচিত ছিল। ওকে বাদ দিয়ে বিদিশার সাহিলকে বেছে নেওয়াটা বিক্রমের কাটা ঘায়ে নুনের ছিটে ছড়ানোর মতো।

"ইউ মেড আ বিগ মিসটেক, বিদিশা..." বিক্রম দাঁতে দাঁত চেপে বিড়বিড় করল। তার এতদিন সযত্নে লালন করা ভদ্রতার মুখোশটা খুলে পড়েছে, সে জায়গায় ফুটে উঠেছে হিংস্রতা। এতদিন বিদিশার কথা উঠলে বিক্রমের চোখের তারায় যে লোলুপতা ফুটে উঠত সেটা এই মুহূর্তে অদৃশ্য, তার জায়গা নিয়েছে প্রতিহিংসা।

বিদিশা বোধহয় ভেবেছে তাকে ছেঁটে ফেলে সে শান্তিতে থাকবে। কিন্তু বিক্রম ওকে এত সহজে নিস্তার দেবে না। 

বিক্রম নিজের আঙুলগুলো দিয়ে দেওয়ালে এমনভাবে নখ বসাল, যেন ও বিদিশার শরীরটাকেই খামচে ধরতে চাইছে।

"তুমি একটা বড়সড় বোকামি করলে বিদিশা। এবার আমি দেখাব, বিক্রম মালহোত্রাকে অপমান করলে তার ফল কী হয়।"

বিক্রম মালহোত্রাকে চেনা বিদিশার এখনো বাকি আছে।

To be continued...
[+] 7 users Like RockyKabir's post
Like Reply
বিকেল চারটে। লাইব্রেরি বিল্ডিং।

কলেজের সেন্ট্রাল লাইব্রেরি বিল্ডিংয়ের তিনতলার রেফারেন্স সেকশনটা এমনিতেই সবসময় একটা থমথমে নিস্তব্ধতায় ডুবে থাকে। 

পুরো লাইব্রেরির মধ্যে এই অংশটা সবচেয়ে বেশি চুপচাপ। এখানে সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের আনাগোনা প্রায় নেই বললেই চলে।

সারি সারি বিশাল মেহগনি কাঠের বুকশেলফ, তার গায়ে থরে থরে সাজানো মোটা মোটা সব বই আর জার্নাল। 

জানলার কাঁচ ভেদ করে আসা বিকেলের ম্লান, সোনালি রোদ কাঠের লম্বা টেবিলগুলোর ওপর এসে পড়েছে। বাতাসে পুরোনো কাগজের একটা সোঁদা, ধুলোমাখা গন্ধ। এখানে কেউ জোরে কথা বলে না, জুতোর শব্দটাও সাবধানে করতে হয়।

রেফারেন্স সেকশনের একদম শেষ প্রান্তের একটা নির্জন টেবিলে একা বসে ছিল অয়ন।

তার পরনে একটা ফেডেড কালো টি-শার্ট আর ডার্ক জিন্স। সামনে একটা ফাঁকা খাতা খোলা, কিন্তু তার দৃষ্টি সেদিকে নেই। সে একদৃষ্টে জানলার বাইরে তাকিয়ে আছে, যেন অসীম অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে আছে। 

তার চোখের নিচে কালচে ছোপ, মাথার উসকোখুসকো চুল আর চোয়ালের শক্ত পেশিগুলো প্রমাণ করছে ছেলেটার মনের ভেতরে কী প্রচণ্ড অশান্তি চলছে।

তার মনের ভেতরটা এখন ঝড়ে তছনছ হয়ে যাওয়া শ্রীহীন বাগানের মতো। গত কয়েকদিনে তার উপর দিয়ে অনেকগুলো ঝড় বয়ে গেছে আর তার উপর কাল দোজো-তে ওই পনেরো বছরের বাচ্চাটার কাছে জাস্ট কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে মাটিতে আছড়ে পড়া, এই সবকিছু মিলে তার আত্মবিশ্বাসকে ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছে।

সে এখানে নিজে থেকে পড়াশোনা করতে আসেনি। সে এসেছে, কারণ মিস্টার দাস তাকে আসতে বাধ্য করেছেন।

তার পড়াশোনার প্রতি যে সহজাত টান ছিল সেটা আজ মৃত। সিলেবাস শেষ করা, পরীক্ষায় ভাল করার কোন তাগিদ তার মধ্যে অবশিষ্ট নেই। অয়নের মাঝেমাঝে মনে হয় তার ভেতরটা একটা ধূসর মরুভূমি হয়ে গেছে। সেখানে না আছে কোন স্বপ্ন, না আছে কোন আশা-আকাঙ্খা। শুধু বিক্রম মালহোত্রার মুখটা মনে পড়লেই তার কপালের শিরাগুলো দপদপ করে ওঠে।

লাইব্রেরির এই নিস্তব্ধতার মাঝেই জুতোর একটা মৃদু শব্দ তার টেবিলের দিকে এগিয়ে এল। অয়ন সেদিকে ঘাড় ঘোরাল না। মিস্টার দাসের পাঠানো সেই 'স্পেশাল টিউটর' এসেছে বোধহয়। থার্ড বা ফোর্থ ইয়ারের কোনো সিনিয়র হবে হয়তো, যে তাকে ক্যালকুলাসের বোরিং থিওরি বোঝাতে আসবে। অয়নের এসব ফালতু জিনিসে কোনো ইন্টারেস্ট নেই। সে ঠিক করে রেখেছে, ছেলেটা এলেই তাকে সে অত্যন্ত রূঢ়ভাবে বিদায় করে দেবে।

কিন্তু অয়ন কিছু বলার বা করার আগেই...

ধড়াস!

একটা বিশাল, ভারী অ্যাডভান্সড ক্যালকুলাসের বই সজোরে, তার ঠিক সামনে টেবিলের উপর আছড়ে পড়ল। লাইব্রেরির ওই নিস্তব্ধ পরিবেশে আওয়াজটা প্রায় একটা বিস্ফোরণের মতো শোনালো।  

অয়ন চমকে উঠল। তার ঘোরটা এক লহমায় কেটে গেল।

সে অত্যন্ত বিরক্ত হয়ে, ভুরু কুঁচকে ধীরে ধীরে মুখ তুলে তাকাল।

তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে একটা মেয়ে। তার পরনে একটা আকাশি নীল রঙের সুতির সালোয়ার-কামিজ। কাঁধের ওপর দিয়ে ওড়নাটা কড়াভাবে পিন করা। কোন মেকআপ করেছে বলে মনে হচ্ছে না, চুলগুলো শক্ত করে টেনে একটা সাধারণ বিনুনি করা, যা তার পিঠের ওপর ঝুলছে। 

চোখে একটা কালো, মোটা ফ্রেমের চশমা, যার কাঁচের ভেতর দিয়ে দুটো অত্যন্ত তীক্ষ্ণ, বুদ্ধিদীপ্ত এবং কড়া চোখ সরাসরি অয়নের দিকে তাকিয়ে আছে।

মেয়েটার বডি ল্যাঙ্গুয়েজে কোনো আড়ষ্টতা নেই, আর তার চেয়েও বড় কথা, অয়ন চ্যাটার্জীকে দেখে তার মধ্যে বিন্দুমাত্র কোনো ভয়ের লেশ নেই।

অয়নের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। অসভ্য মেয়ে !

অয়ন তার সেই স্বভাবসিদ্ধ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে মেয়েটার চোখের দিকে তাকাল। এই দৃষ্টিটা অয়নের একটা মোক্ষম অস্ত্র। ফেস্টের রাতের পর থেকে এই চাউনি দেখে হোস্টেলের সিনিয়র দাদারাও ঘাবড়ে পিছিয়ে যায়। যেকোন মেয়ে এই চোখের দিকে তাকালে ভয়ে সিঁটিয়ে যাবে।

অয়ন মেয়েটার চোখের দিকে তাকিয়ে একটা শীতল, ওয়ার্নিং দেওয়া দৃষ্টি ছুঁড়ে দিল, যার সোজা অর্থ - 'আমায় ঘাঁটাস না। যা ভাগ এখান থেকে।'

কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার! অয়নের ওই দৃষ্টি মেয়েটার ওপর বিন্দুমাত্র কোনো প্রভাবই ফেলতে পারল না। মেয়েটা এক চুলও কাঁপল তো নাই-ই, উল্টে অত্যন্ত ক্যাজুয়ালি সামনের চেয়ারটা টেনে নিয়ে সশব্দে অয়নের ঠিক উল্টোদিকে বসে পড়ল।

তারপর সরাসরি অয়নের ওই রক্তবর্ণ চোখের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত কড়াভাবে নো-ননসেন্স গলায় বলে উঠল,

"চোখ রাঙিয়ে লাভ নেই।"

অয়ন সামান্য থমকাল। মেয়েটার গলায় কোনো দ্বিধা নেই, কোনো অস্বস্তি নেই। গলাটা একদম সমতল, কিন্তু তাতে একটা চাবুকের মতো ধার আছে।

অয়নের চোয়ালের পেশিগুলো এক মুহূর্তের জন্য শক্ত হয়ে উঠল।

মেয়েটা নিজের ব্যাগ থেকে একটা পেন আর খাতা বের করতে করতে অয়নের চোখের দিকে তাকিয়েই আবার বলল, "তোমার ওই অ্যারোগ্যান্স আর হিরোগিরিটা ফুটবল মাঠে দেখাবে। এখানে তুমি একটা স্টুডেন্ট, যে সিলেবাসে যোজন মাইল পিছিয়ে আছে। আমি আমার নিজের পড়াশোনার সময় নষ্ট করে এখানে তোমাকে উদ্ধার করতে এসেছি। চ্যাপ্টার ফোর খোল।", মেয়েটার গলাটা ছুরির মতো ধারালো।

অয়ন এবার আক্ষরিক অর্থেই হতবাক হয়ে গেল। সে একদৃষ্টে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে রইল। তার মাথার ভেতরটা কয়েক সেকেন্ডের জন্য ব্ল্যাঙ্ক হয়ে গেল।

এই মেয়েটা কে? 

অয়নের জীবনে তার মা, বিদিশা ছাড়া আজ পর্যন্ত কোনো নারী তার চোখের দিকে তাকিয়ে ওর সাথে এভাবে কথা বলার সাহস পায়নি। সবাই তাকে দেখে ভয় পায়। এমনকি ওই হাই-সোসাইটির চন্দ্রিমা সেনও তার সাথে কথা বলার সময় তার রূপ আর গ্ল্যামার দিয়ে তাকে ইমপ্রেস করার চেষ্টা করেছিল।

সেখানে এই সাধারণ, ছিমছাম সুতির সালোয়ার পরা কোথাকার কে মেয়েটা, সে এসে সোজা অয়ন চ্যাটার্জীর চোখে চোখ রেখে তাকে ধমক দিচ্ছে?

অয়নের ভেতরের সেই রক্ষণাত্মক কাঁটাগুলো, তার রাগের সেই বর্মটা এই অপ্রত্যাশিত সলিড অ্যাটিটিউডের সামনে হঠাৎ করে কেমন যেন ভোঁতা হয়ে গেল। সে এমন একটা রিঅ্যাকশনের জন্য একেবারেই প্রস্তুত ছিল না। এই কড়া ধমকটার মধ্যে একটা অদ্ভুত সততা আছে, যা অয়নকে বাধ্য করল মেয়েটাকে সমীহ করতে।

"তুমি কে?" অয়ন তার নিস্পৃহ, শীতল গলায় জিজ্ঞেস করল, যদিও তার গলার স্বর আগের চেয়ে অনেক নমনীয়।

"ঋতুপর্ণা। থার্ড সেমিস্টার, ম্যাথ অনার্স", মেয়েটা বইয়ের পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে বলল। কথা বলার সময় সে একবারও অয়নের দিকে তাকাল না। 

"মিস্টার দাস আমাকে পাঠিয়েছেন তোমার মিসড ক্লাসগুলো কভার করানোর জন্য। তোমার হাতে সময় খুব কম আর সিলেবাসের অনেকটা বাকি। যদি মনে করো যে এখানে বসে তুমি তোমার ডার্ক ফেজ এনজয় করবে, তাহলে ইউ ক্যান লিভ। আর যদি সত্যিই পরীক্ষায় পাস করতে চাও, তাহলে চুপচাপ বইটা খোলো। পেজ নাম্বার এইটি-ফোর।"

ঋতুপর্ণার চোখে অয়ন কোনো হ্যান্ডসাম স্পোর্টস স্টার নয়, কোনো ব্রুডিং হিরো নয়। সে যখন জানতে পেরেছিল যে তার স্টুডেন্টটির নাম 'অয়ন চ্যাটার্জী', তখন তার ভেতরে একটা তীব্র বিরক্তি কাজ করেছিল।

অয়ন চ্যাটার্জী নামটা এখন পুরো কলেজে গুণ্ডামি আর অসভ্যতার সমার্থক হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফেস্টের রাতে ব্যাকস্টেজে বিক্রম মালহোত্রাকে ওইভাবে জানোয়ারের মতো মারার ঘটনাটা নিজের চোখে সবাই না দেখলেও ওটার বর্ণনা এখন ক্যাম্পাসে সবার মুখে মুখে ঘোরে।

পুরো ঘটনাটা শুনে ঋতুপর্ণার মনে হয়েছিল, ছেলেটা কোনো সাধারণ ছাত্র নয়, একটা সাইকোপ্যাথ। নেহাৎ, মিস্টার দাস তার সবচেয়ে প্রিয় এবং শ্রদ্ধেয় প্রফেসর। তিনি যখন নিজে থেকে তাকে এই দায়িত্বটা দিয়েছেন, তাই সে না করতে পারেনি। 

সে ঠিকই করে এসেছে যদি আজ অয়ন চ্যাটার্জী কোনরকম অসভ্যতা করে সে সোজা মিস্টার দাসকে গিয়ে জানিয়ে দেবে, এই অমানুষকে অঙ্ক গেলাবার দায়ভার অন্তত সে নিতে পারবে না। যে ছেলে নিজের প্রফেসরের সামনে স্টুডেন্ট কাউন্সিলের ট্রেজারারকে মেরেকেটে একসা করে দিতে পারে, তাকে মানুষ করার দায়িত্ব ওর ? 

মিস্টার দাসের আর কোনো স্টুডেন্ট জুটল না? 

এই রকম একটা বখে যাওয়া গুন্ডাকে ও কিভাবে ক্যালকুলাস বোঝাবে ? সামনে নিজের সেমিস্টার এক্সাম, তার ওপর এই আপদ! তবে হ্যাঁ, ছেলেটা যদি ভাবে এখানে এসে সে তার ওই রাফ-অ্যান্ড-টাফ হিরোগিরি দেখাবে, তাহলে সে ভুল দরজায় কড়া নেড়েছে। 

ওর চোখে অয়ন জাস্ট একটা বড়লোকের বখে যাওয়া ছেলে যাকে সে অঙ্ক গেলাতে এসেছে। নইলে এত বড় অপরাধ করার পরে যার জেলে থাকার কথা, সে দিব্যি গায়ে হাওয়া লাগিয়ে ক্যাম্পাসে ঘুরে বেড়ায় কী করে ? নিশ্চয়ই বাপ-মা কলেজ অথরিটির সাথে কানেকশন কাজে লাগিয়ে ছেলের কুকীর্তি ধামাচাপা দিয়ে দিয়েছে। কোন সাধারণ ঘরের ছেলে হলে এতক্ষণে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে কলেজ থেকে বের করে দেওয়া হতো। আইনের শাসনের এই বৈষম্য ঋতুপর্ণার কাছে সবচাইতে বেশি অসহ্য লাগে।

ঋতুপর্ণা খাতাটা টেনে নিয়ে একটা জটিল ডিফারেন্সিয়াল ইকুয়েশন লিখতে শুরু করল।

অয়ন কয়েক মুহূর্ত চুপ করে ঋতুপর্ণার সেই শান্ত, কিন্তু ফোকাসড মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। মেয়েটার কাজের প্রতি ডেডিকেশন আর কোনো রকম ভনিতা না থাকার বিষয়টা অয়নের মনের ভেতরকার জমাট বাঁধা অন্ধকারে খুব সামান্য হলেও একটা স্পার্ক তৈরি করল।

গত কয়েক সপ্তাহ ধরে সে শুধু অবহেলা, বিশ্বাসঘাতকতা আর অপমান সয়েছে। তার মা, যার ভালোবাসাকে সে ছোটবেলা থেকে ধ্রুব সত্য বলে মানত, সেই মা তাকে ভুল বুঝেছে। সবার সামনে অপমান করে তার গায়ে হাত তুলেছে। নিজের জীবন থেকে বার করে দিয়েছে। তার প্রিয় ফুটবল মাঠে আজ তার ফুটবল খেলা বন্ধ। দোজো-তে গিয়ে শান্তির বদলে একগাদা অপমান জুটেছে। 

আসলে, অয়ন যে রুক্ষ মেজাজ আর রাগ নিয়ে সবার সামনে ঘুরে বেড়ায়, তা কেবল একটা খোলস। এটা সে নিজেই তৈরি করেছে যাতে ওর ভেতরের ক্ষতবিক্ষত, অসহায় ছেলেটাকে পৃথিবী থেকে নতুন করে আঘাত না পেতে হয়।

কিন্তু আজ, এই নিস্তব্ধ লাইব্রেরিতে, একটা অত্যন্ত সাধারণ মেয়ের এই কড়া, প্রায় মাতৃসুলভ বা একজন স্ট্রিক্ট টিচারের মতো ধমক অয়নের ওই খোলসটায় একটা সূক্ষ্ম ফাটল তৈরি করল। যতই রূঢ় হোক না কেন, এই শাসনের মধ্যে কোনো ম্যানিপুলেশন নেই।

সে আর কোনো তর্ক করল না। কোনো বিরক্তিও দেখাল না। তার পাথরের মতো কঠিন ব্যক্তিত্ব, যা প্রিন্সিপালের ঘরেও ভাঙেনি, যা চন্দ্রিমা সেনের রূপের সামনেও গলেনি, তা আজ এই সাধারণ, আটপৌরে মেয়েটার নো-ননসেন্স আচরণের সামনে নিঃশব্দে নতি স্বীকার করল।

বাধ্য ছাত্রের মতো ধীরে ধীরে হাত বাড়িয়ে অয়ন ভারী ক্যালকুলাসের বইটা নিজের দিকে টেনে নিল। সে বইটার পাতা উল্টে ১২ নম্বর পেজটা খুলল।

"গুড", ঋতুপর্ণা অত্যন্ত পেশাদার গলায় বলল।

তারপর সে একটা পেন নিয়ে বইয়ের একটা সমীকরণের ওপর পয়েন্ট করে বোঝাতে শুরু করল, "এই ডিফারেন্সিয়াল ইকুয়েশনটার বেসটা তুমি ভুল করেছ। লিমিটটা ইনফিনিটি হলে..."

লাইব্রেরির নিস্তব্ধ কোনায় সবার চোখের আড়ালে শুরু হলো টিউটোরিয়াল ক্লাস। যেখানে অসহায় একটা ছেলে বাধ্য ছাত্রের মতো একটা সাধারণ মেয়ের নির্দেশ মেনে অঙ্ক কষতে শুরু করল।

কিন্তু সেইসময় লাইব্রেরির রেফারেন্স সেকশনে আরেকজন উপস্থিত ছিল।

ঠিক তিনটি বুকশেলফ দূরে, সারি সারি এনসাইক্লোপিডিয়া আর মোটা মোটা রেফারেন্স 
বইয়ের র‍্যাকের আড়ালে একজন লুকিয়ে লুকিয়ে পুরো দৃশ্যটা দেখছিল।

চন্দ্রিমা সেন।

তার পরনে দামী অফ-শোল্ডার টপ আর ফেডেড ডেনিম জিন্স, চোখে দামি মেকআপ আর সারা শরীর থেকে ভেসে আসা ডিওর পারফিউমের কড়া, মোহময়ী সুবাস লাইব্রেরির এই ধুলোমাখা, বোরিং পরিবেশের সাথে একদম বেমানান। 

অয়ন কার সাথে মেশে না মেশে, সেটা রনি আর কবীররা সত্যিই জানত না। কিন্তু, এই কমাসে কলেজে চন্দ্রিমা নিজস্ব একটা নেটওয়ার্ক তৈরি করে ফেলেছে। 

ফার্স্ট ইয়ারের রোহন আধঘণ্টা আগে ওকে মেসেজ করে জানিয়েছিল, "অয়ন লাইব্রেরি বিল্ডিংয়ে ঢুকছে।" 

খবরটা পাওয়া মাত্রই চন্দ্রিমা নিজের ক্লাস বাঙ্ক করে সোজা লাইব্রেরিতে চলে এসেছে। সে জানত না অয়ন ওখানে কার সাথে দেখা করতে যাচ্ছে। তার মনে একটা সন্দেহ ছিল, হয়তো কোনো মেয়ের সাথে অয়নের সিক্রেট অ্যাফেয়ার চলছে। সেই সন্দেহ মেটাতেই সে নিঃশব্দে, নিজের হাই-হিলের আওয়াজ লুকিয়ে বুকশেলফের আড়ালে এসে দাঁড়িয়েছিল।

কিন্তু গত দশ মিনিট ধরে র‍্যাকের আড়াল থেকে সে যা দেখল, সেটা তাকে একটা বড়সড় ধাক্কা দিল। সে নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না।

চন্দ্রিমার শ্বাস দ্রুত হয়ে গেছে। সে শেলফের কাঠের ফ্রেমটা এত শক্ত করে চেপে ধরেছে যে তার পারফেক্ট ফ্রেঞ্চ-ম্যানিকিওর করা নখগুলো সাদা হয়ে গেছে।

যে অয়ন চ্যাটার্জী, তাকে, কলেজের কুইন বি, যার এক ঝলক হাসির জন্য ছেলেরা পাগল হয়ে থাকে সেই চন্দ্রিমা সেনকে স্পোর্টস করিডোরে আক্ষরিক অর্থে একটা ইনভিজিবল ডাস্টবিনের মতো ইগনোর করে চলে গিয়েছিল ! যে ছেলেটা তার মুখের ওপর বলে গিয়েছিল 'আমার কাছে তোমার কোনো অস্তিত্ব নেই'... সেই অয়ন, সেই ডার্ক, অ্যারোগ্যান্ট, আনপ্রেডিক্টেবল অয়ন আজ একটা সাধারণ, বোরিং মেয়ের ধমক চুপচাপ হজম করছে? সে কোনো প্রতিবাদ করল না? একবারের জন্যও চোখ রাঙাল না? 

চন্দ্রিমা র‍্যাকের ফাঁক দিয়ে ঋতুপর্ণাকে খুব ভালো করে স্ক্যান করল।

কী আছে ওই মেয়েটার মধ্যে? একটা সস্তা, সুতির সালোয়ার-কামিজ পরে আছে, চোখে আদ্যিকালের চশমা, চুলে একটা বোরিং বিনুনি আর জিরো মেকআপ! না আছে কোনো ফ্যাশন সেন্স, না আছে কোনো গ্ল্যামার। কোনো পুরুষের রক্তে একবিন্দুও আলোড়ন তোলার ক্ষমতা নেই এই মেয়েটার।

জাস্ট আ প্লেইন জেন! 

অথচ... অথচ অয়ন!

সেই অয়ন চ্যাটার্জী, যাকে সে হাজার চেষ্টা করেও নিজের গ্ল্যামারের মায়ায় এক সেকেন্ডের জন্য স্থির করতে পারেনি, সেই অয়ন আজ এই সাধারণ, আটপৌরে মেয়েটার একটা তুচ্ছ ধমকে বাধ্য কুকুরের মতো মাথা নিচু করল?

চন্দ্রিমার বুকের ভেতরটা রাগে, অপমানে আর এক তীব্র ঈর্ষায় জ্বলতে শুরু করল। ওর মনে হতে লাগল, কেউ যেন ওর সুন্দর, নিখুঁত মুখে এক বালতি কাদা ছুঁড়ে মেরেছে। 

তার ইগোতে আক্ষরিক অর্থেই দাউদাউ করে আগুন লেগে গেল। সে যখন অয়নকে জল অফার করেছিল, অয়ন তার দিকে ফিরেও তাকায়নি। সে যখন করিডোরে অয়নের রাস্তা আটকে তাকে ডমিনেট করার চেষ্টা করেছিল, অয়ন তাকে 'পিলার বা অবজেক্ট' বলে অপমান করে চলে গিয়েছিল। 

আর আজ? 

এই চশমা-পরা আঁতেল মেয়েটা এসে সজোরে একটা বই আছড়ে ফেলে অয়নকে চোখ রাঙাল, আর অয়ন সেটা বিনা বাক্যব্যয়ে মেনে নিল ?

কেন? 

এই 'বেহেনজি' টাইপের মেয়েটার মধ্যে এমন কী আছে, যা চন্দ্রিমা সেনের মধ্যে নেই? 

অয়ন কি তাহলে এই ধরনের মেয়ে পছন্দ করে?

না ! এটা হতেই পারে না।

চন্দ্রিমা বইয়ের ফাঁক আবার উঁকি মেরে দেখল, ঋতুপর্ণা অত্যন্ত সিরিয়াস মুখে একটা ইকুয়েশন বোঝাচ্ছে আর অয়ন মাথা নিচু করে সেটা শুনছে। 

অয়ন তাহলে কারোর কথা শোনে ! 

অয়নকে তাহলে কন্ট্রোল করা যায় !
 
অয়নের ওই উদ্ধত চোখ দুটোকেও নত করা যায় !

চন্দ্রিমার বুকের ভেতরটা ভয়ংকর ঈর্ষায় জ্বলে উঠল। তার সহজাত ইগো আর ঈর্ষা মিলে তার মস্তিষ্কে একটা মারাত্মক ককটেল তৈরি করল। তার শ্বাস-প্রশ্বাস আরো দ্রুত হয়ে গেল, বুকের ওঠানামা বেড়ে গেল।

সে আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না। সে অত্যন্ত সাবধানে, নিজের স্টিলেটোর কোনো আওয়াজ না করে নিঃশব্দে লাইব্রেরির রেফারেন্স সেকশন থেকে বেরিয়ে এল।

ওর বুকের ভেতরটা রাগে তোলপাড় করছে। 

চন্দ্রিমার চোখের সামনে বারবার অয়নের মুখটা ভেসে উঠছে। বেরিয়ে আসার আগে ও র‍্যাকের ফাঁক দিয়ে অয়নের ওই সুন্দর মুখটা আরেকবার দেখে নিয়েছে। অয়নের মুখটা যেন কোনো গ্রিক ভাস্কর্যের মতো দেখাচ্ছিল। চওড়া কপাল, নিখুঁত ভাবে খোদাই করা টিকালো নাক আর পৌরুষদীপ্ত শার্প ‘জ-লাইন’ যা ওর মুখকে আভিজাত্য এনে দিয়েছে। অবিন্যস্ত একগুচ্ছ চুল এসে অয়নের কপালে পড়েছিল, সেই অবিন্যস্ত ভাবটার মধ্যেও এক অদ্ভুত পৌরুষদীপ্ত আবেদন আছে, সাথে ওই ডার্ক, ব্রুডিং পার্সোনালিটি যা চন্দ্রিমাকে চুম্বকের মতো টানে।

একে পাবার জন্য চন্দ্রিমা সব কিছু করতে পারে।

এর ওপর একমাত্র ওরই অধিকার থাকা উচিত।

সে জন্য যদি তাকে এই 'বেহেনজি'কে রাস্তা থেকে সরানোর দরকার হয় বা অয়নের কোনো ডার্ক সিক্রেট খুঁজে বের করতে হয়, তাহলে সে তাই করবে।
Like Reply
Poster ta besh interesting.
Like Reply
Apurbo!!
Like Reply
দুর্দান্ত
Like Reply
ডার্ক সিক্রেট মানে গল্পটা কি এত ফাস্ট শেষ করে দিবেনা??
Like Reply
Just awesome... Ak tana pore gelam... Darun cholche... New character er abirvab darun darun chalia jan
Like Reply
@rockykabir bro this awesome. please eagerly waiting for a huge update. Thank you.
[+] 1 user Likes rehanarman29's post
Like Reply




Users browsing this thread: 3 Guest(s)