Thread Rating:
  • 40 Vote(s) - 3.4 Average
  • 1
  • 2
  • 3
  • 4
  • 5
Erotic Thriller মরীচিকা ও মোহময়ী
(20-04-2026, 05:56 PM)BiratKj Wrote: Darun update chilo.... But choto update khubi

আসলে গল্পটা এভাবেই structure করা। প্রতি অধ্যায়ে তিন-চারটে করে সিন। অধ্যায়ের সাইজ বাড়াতে হলে সিন সংখ্যা বাড়াতে হয়। কিন্তু, গল্প এখনো সে জায়গায় পৌঁছয়নি। তাছাড়া,- থ্রিলার গল্প, অতিরিক্ত কথাবার্তা রাখলে টানটান ভাব নষ্ট হয়ে যাবে। 

তবে, একটা উপায় আছে। আমি একসাথে দুটো অধ্যায় পোস্ট করতে পারি। সেইক্ষেত্রে দুই সপ্তাহ অন্তর আপডেট আসবে। আমি চেষ্টা করি সপ্তাহে একটা করে অধ্যায় পোস্ট করার।
[+] 1 user Likes RockyKabir's post
Like Reply
Do not mention / post any under age /rape content. If found Please use REPORT button.
(20-04-2026, 08:55 PM)Paul Wrote: Darun buildup!!

Thank you.
Like Reply
(19-04-2026, 10:00 PM)rakib6192522 Wrote: পড়লে মনেই হয় না যে, কোন সস্তা সাইটে চটি ইন্সেস্ট গল্প পড়ছি।
It’s just like a Romantic, Suspense, Thriller Story. It’s gonna be a masterpiece.
Keep it up Dada.  Eagerly waiting for next update.

ধন্যবাদ ভাই। এই গল্পটা যতটা সম্ভব প্রফেশনাল কোয়ালিটির কাছাকাছি নিয়ে যাওয়াই লক্ষ্য।
[+] 1 user Likes RockyKabir's post
Like Reply
(20-04-2026, 02:37 AM)deepdick Wrote: sabh tikh cholche,  khali galpo ta compact  rekho beshe stretch koro na ta nahole bhalo lagbe na . ar cheleta  jeno jete  kintu  bidisha ganguly getting horny by thinking what could have happened , and do a solo dildo play of her and her son watches her mom cumming while taking the name of  Vikram so the son gets more angry .

দুঃখিত ভাই। এটা এই সাইটের আর পাঁচটা গল্পের মতো নয়। এই গল্পটার প্লট যথেষ্ট জটিল আর গভীর , তবে adult genre তাই সেক্স থাকবে। ব্যস এটুকুই।
[+] 1 user Likes RockyKabir's post
Like Reply
Notun kore kichu bolar nai... Just osadharon cholche.... Hero ebar mone hoi aktu thanda hobe... Waiting for next update
[+] 1 user Likes Akhilaa's post
Like Reply
(22-04-2026, 12:07 AM)Akhilaa Wrote: Notun kore kichu bolar nai... Just osadharon cholche.... Hero ebar mone hoi aktu thanda hobe... Waiting for next update

এখনই কিছু বলব না, spoiler হয়ে যাবে Big Grin
[+] 1 user Likes RockyKabir's post
Like Reply
Seara laglo... Darun darun... Egoche... Waiting for next update
[+] 1 user Likes BiratKj's post
Like Reply
Update please!!
[+] 1 user Likes Paul's post
Like Reply
(26-04-2026, 02:16 PM)Paul Wrote: Update please!!

আজ রাতেই দেব।
[+] 1 user Likes RockyKabir's post
Like Reply
(26-04-2026, 05:14 PM)RockyKabir Wrote: আজ রাতেই দেব।

Aktu baro kore update deben dada.
Like Reply
(26-04-2026, 10:34 PM)Mr. Mondal Wrote: Aktu baro kore update deben dada.

এটাই এখনও অবধি এই গল্পের সবচেয়ে বড় চ্যাপ্টার। তবে কতটা খুশি হবেন জানি না কারণ গল্পটা স্লো-বার্ণ। চ্যাপ্টার আকারে বড় হলেও গল্প ধীরে ধীরেই এগোবে।
[+] 1 user Likes RockyKabir's post
Like Reply
[Image: 1777228087814.png]

"কলেজ একটা চূড়ান্ত ক্রাইসিসের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে।" 
[+] 2 users Like RockyKabir's post
Like Reply
উনবিংশ অধ্যায়

ডক্টর বাগচীর দেওয়া দেওয়া সেই অনৈতিক প্রস্তাব আর তারপর তার সাথে বিদিশার উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়ের পরে একটা গোটা সপ্তাহ কেটে গেছে। 

এই মুহূর্তে কলেজের দীর্ঘ, নিঃসঙ্গ করিডোর দিয়ে বিদিশা প্রিন্সিপালের ঘরের দিকে এগোচ্ছেন, তাঁর পরনের কালো বর্ডারের ছাই-রঙা হ্যান্ডলুম শাড়িটা যেন তাঁর গুমোট মানসিক অবস্থার মূর্ত প্রতিচ্ছবি।

বাইরে নির্লিপ্ততার মুখোশ পড়ে থাকলে কী হবে, গত সপ্তাহের স্মৃতি এখনো তার মনের অন্দরে ভাঙা কাঁচের টুকরোর মতো গেঁথে আছে। চাইলেও তিনি সেটা উপেক্ষা করতে পারছেন না। 

হাঁটতে হাঁটতেই তাঁর চোখের সামনে সিনেমার ফ্রেমের মতো গত সপ্তাহে প্রিন্সিপালের অফিসের সেই নাটকীয় মুহূর্তগুলো আবার ভেসে উঠল।

[ফ্ল্যাশব্যাক]

ডক্টর বাগচীর ঘর থেকে বেরিয়ে আসার ঠিক পরের দিনই প্রিন্সিপালের অফিস থেকে বিদিশার ডাক পড়েছিল। তিনি নিশ্চিত ছিলেন যে তাকে প্রভাবশালী স্টুডেন্টদের ফেল করানোর ইস্যুতেই জবাবদিহি করতে হবে। 

বিদিশা মানসিক ভাবে পুরোপুরি তৈরি হয়েই প্রিন্সিপালের অফিসে ঢুকেছিলেন। তার ভ্যানিটি ব্যাগের ভেতর একটা সাদা কাগজে লেখা ইস্তফাপত্র রেডি ছিল। আত্মসম্মানে সামান্যতম আঘাত লাগলে তিনি এক সেকেন্ডও ভাববেন না, সোজা প্রিন্সিপালের মুখের উপর ইস্তফার কাগজটা ছুড়ে দিয়ে এই ক্যাম্পাস থেকে বেরিয়ে আসবেন। এমনটা ভেবেই তিনি প্রিন্সিপালের অফিসে পা রেখেছিলেন। 

কিন্তু প্রিন্সিপাল সান্যালের ঘরে ঢোকার পর যা ঘটল, তার জন্য তিনি একেবারেই প্রস্তুত ছিলেন না।

"মিস গাঙ্গুলি, প্লিজ হ্যাভ আ সিট", প্রিন্সিপাল সান্যাল অত্যন্ত উষ্ণ হাসির সাথে তাকে অভ্যর্থনা জানালেন।

বিদিশা একটু সতর্ক হয়ে চেয়ারে বসলেন। 

প্রিন্সিপাল হাসছেন ? ডক্টর বাগচী কি তবে কালকের ঘটনাটা ওনাকে জানাননি? 

প্রিন্সিপাল ডক্টর বাগচীর প্রসঙ্গে ধারকাছ দিয়েও গেলেন না। বরং একটা ফাইল এগিয়ে দিয়ে বললেন, "ম্যানেজমেন্ট, আপনার কালচারাল ফেস্টের বাজেটিং আর যে ডেডিকেশন নিয়ে আপনি কাজটা করেছেন, তাতে অত্যন্ত ইমপ্রেসড। কোনো এক্সট্রা খরচ হয়নি এবং স্পনসরশিপের টাকাও এত নিখুঁতভাবে ইউটিলাইজ করা হয়েছে যে অডিটররা আপনার প্রশংসা করেছেন। আপনি সত্যিই খুব দক্ষভাবে কাজটা সামলেছেন। এত কম বয়সে এমন অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ দক্ষতা সত্যিই বিরল।"

বিদিশা নিজের বিস্ময়টা আপ্রাণ চেষ্টায় গিলে ফেললেন। একটা প্রফেশনাল হাসি ধরে রেখে বললেন, "থ্যাংক ইউ, স্যার। আই ওয়াজ জাস্ট ডুইং মাই জব।"

কথাটা শেষ হওয়ার পর গোটা ঘরে একটা অদ্ভুত নিস্তব্ধতা নেমে এসেছিল। বিদিশা অনুভব করলেন, তার ভ্যানিটি ব্যাগের ভেতর রাখা ইস্তফাপত্রটা এক নিমেষেই গুরুত্বহীন একটা সাধারণ কাগজে পরিণত হয়েছে। যে সম্ভাব্য শাস্তির খাঁড়া বা অপমানের মুখোমুখি হবার প্রস্তুতি নিয়ে তিনি অফিসে ঢুকেছিলেন, তার বদলে প্রশংসার এই বর্ষণ তাঁকে এক অদ্ভুত স্বস্তি দিল। তাঁর মেরুদণ্ডের সেই টানটান উত্তেজনাটা ধীরে ধীরে শিথিল হয়ে এল।

তবে তিনি অসতর্ক হলেন না। বরং নিজের মুখে গাম্ভীর্যের মুখোশটা আরো মজবুতভাবে এঁটে নিলেন। অয়নকে নিয়ে যে প্রশ্নটা ছুটি কাটিয়ে কলেজে ফেরার পর থেকে তাঁর মনের অন্দরে কাঁটার মতো বিঁধছিল, সেটাকে অত্যন্ত সুকৌশলে বাইরের আবহে মুক্তি দিলেন তিনি।

নিজের কভার পুরোপুরি অটুট রেখে বিদিশা অত্যন্ত ক্যাজুয়াল, প্রায় গুরুত্বহীন গলায় একটা প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলেন:

"বাই দ্য ওয়ে স্যার, ফার্স্ট ইয়ারের অয়ন চ্যাটার্জী... ও গত কয়েকদিন ধরে আমার ক্লাসে অ্যাটেন্ড করছে না। ওর সাসপেনশন তো উঠে গেছে তাই না?"

সেদিন ব্যাকস্টেজে অয়নকে তিনি নিজের জীবন থেকে বেরিয়ে যেতে বলেছিলেন ঠিকই, কিন্তু, তার অবচেতন মন কোনদিন কল্পনা করেনি যে সেজন্য ছেলেটা তার ক্লাসে আসা ছেড়ে দেবে! অয়ন তো পড়াশোনায় কোনোদিন খারাপ ছিল না। জেদের বশে ছেলেটা কী এবার নিজের ভবিষ্যতটা জলাঞ্জলি দেবে ?

কঠোর শিক্ষিকা আর মমতাময়ী মা, ফেস্টের আগে থেকে বিদিশার ভেতরে এই দুই সত্তার মধ্যে যে অদৃশ্য টানাপোড়েনটা শুরু হয়েছিল, সেই দ্বন্দ্বে মাতৃসত্তা শেষ পর্যন্ত জয়ী হয়েছিল। 

একজন কড়া শিক্ষিকা হিসেবে ফেস্টের রাতের মারপিটের পরে অয়নের অনুপস্থিতিটা তার কাছে একান্তই কাঙ্ক্ষিত হবার কথা। যে ছাত্র তাঁর সামাজিক সম্মানকে এক লহমায় ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছে, ক্লাসে তার শূন্য স্থান বিদিশার জন্য এক ধরনের স্বস্তি বয়ে আনার কথা।

কিন্তু, সে যখন তার নিজের ছেলে, তখন একজন মায়ের মন কী কখনো পেশাদারিত্বের নিয়ম মেনে শান্ত হতে পারে ? তার মাতৃসত্ত্বা ক্লাসে অয়নের এই অনুপস্থিতি মেনে নিতে পারছিল না।

তিনি ঠিক করেছিলেন যে সুযোগ এলে ব্যাপারটা নিয়ে প্রিন্সিপাল সান্যালের সাথে প্রফেশনাল গ্রাউন্ডে কথা বলবেন। আজ সুযোগ পেয়ে তিনি তার সদ্ব্যবহার করতে ছাড়লেন না। 


প্রিন্সিপাল সান্যাল চশমাটা খুলে একটু কেশে নিয়েছিলেন। 

"ওহ, অয়ন? হ্যাঁ, ওর সাসপেনশন তো উইথড্র করা হয়েছে। 

"তাহলে ও ক্লাসে আসছে না কেন স্যার?" বিদিশা ভ্রু কুঁচকে বললেন। 

"আমি ফার্স্ট ইয়ারের অ্যাটেনডেন্স দেখছিলাম। অয়ন চ্যাটার্জী ফেস্টের পর থেকে আমার প্রতিটি ক্লাসে অ্যাবসেন্ট। ও এমনিতেই একটা ক্রিমিনাল অফেন্স করেছে, তার ওপর ক্লাসে না এলে তো ও ফেল করবে। আমি ওকে কোনো স্পেশাল ফেভার করতে রাজি নই।"

প্রিন্সিপাল সান্যাল কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইলেন। তারপর একটু অপ্রস্তুত হেসে বললেন, 

"ওহ, মিস গাঙ্গুলি। আমি আসলে আপনাকে ব্যাপারটা ইনফর্ম করতে ভুলে গিয়েছিলাম। অয়ন চ্যাটার্জী আপনার ক্লাসে অ্যাবসেন্ট নয়। ওকে আসলে আপনার ক্লাস থেকে রিমুভ করে অন্য সেকশনে, মিস্টার দাসের ক্লাসে ট্রান্সফার করা হয়েছে।"

বিদিশার চোখের পলক পড়া বন্ধ হয়ে গেল। এক ঝটকায় যেন তার চারপাশের বাতাসটা ভারী হয়ে এল।

"ট্রান্সফার করা হয়েছে? মানে? আমার কনসেন্ট ছাড়া?" 

বিদিশার গলার স্বরে চরম বিস্ময় এবং প্রচ্ছন্ন অপমানের সুর।

প্রিন্সিপাল একটু সামনের দিকে ঝুঁকে এলেন। গলার স্বর মোলায়েম করে বললেন, "মিস গাঙ্গুলি, প্লিজ ডোন্ট টেক ইট পার্সোনালি। এটা ম্যানেজমেন্টের একটা 'ক্লিন-আপ' ডিসিশন। প্রথমত, সেদিন ফেস্টের পর আপনার এবং বিক্রমের সাথে অয়নের যা ইনসিডেন্ট হলো, তারপর ওকে আপনার ক্লাসে রাখলে একটা বিশ্রী পরিবেশ তৈরি হতো। স্টুডেন্টদের মধ্যে নানা গসিপ চলত। আমরা চাইনি আপনার মতো একজন রেসপেক্টেড টিচার কোনো অস্বস্তিতে পড়ুন।"

বিদিশার হাত দুটো কোলের ওপর শক্ত হয়ে মুঠি পাকিয়ে গেল।

"আর দ্বিতীয়ত" প্রিন্সিপাল বলতে লাগলেন, 

"অয়ন আমাদের কলেজের ফুটবল টিমের প্লেয়ার। স্পোর্টস ডিপার্টমেন্ট থেকে কোচ সেনগুপ্ত ওর জন্য স্পেশাল প্র্যাকটিসের রিকোয়েস্ট করেছেন। আপনার অ্যাডভান্সড ম্যাথমেটিক্সের ক্লাসগুলো বেশ টাফ আর আপনার অ্যাটেনডেন্সের নিয়মও খুব কড়া। স্পোর্টসের জন্য ওকে অনেক ক্লাস কামাই করতে হবে, যেটা আপনি অ্যালাও করবেন না। তাই সবদিক ভেবেই ওকে মিস্টার দাসের সেকশনে দেওয়া হয়েছে। ওখানে পড়াশোনার প্রেশারটা একটু কম।"
বিদিশার কান ঝাঁ ঝাঁ করছে। প্রিন্সিপালের কথাগুলো তাঁর মাথায় ঠিকমতো ঢুকছিল না। 
তার মাথায় কেবল একটা কথাই ঘুরছিল, অয়নকে তার ক্লাস থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে আর সে এতে কোনো আপত্তি জানায়নি ! যে ছেলেটা তাকে সবসময় চোখে চোখে রাখত, সে এত সহজে মিস্টার দাসের ক্লাসে চলে যেতে রাজি হয়ে গেল? 

তার মানে, ও আর সত্যিই তার কাছে থাকতে চাইছে না।

এই চিন্তাটা মনে আসার সঙ্গে সঙ্গে বিদিশার বুকের ভেতরটা কেমন যেন হু হু করে উঠল।

প্রিন্সিপাল একটু হাসলেন।
 
"এনিওয়ে, আপনি এবার নিশ্চিন্তে আপনার ক্লাসে ফোকাস করুন আর শুনলাম বিক্রম নাকি আপনার বাজেটের কাজগুলো খুব চমৎকারভাবে সামলেছে?"

বিদিশা যান্ত্রিকভাবে মাথা নাড়লেন। 
"হ্যাঁ... এক্সকিউজ মি স্যার। আমার একটা ক্লাস আছে।"

প্রিন্সিপালের রুম থেকে বেরিয়ে আসার পর পুরো করিডোরটা তার কাছে হঠাৎ করে ভীষণ ফাঁকা আর বড় বলে মনে হচ্ছিল। করিডোর দিয়ে হাঁটার সময় মনে হচ্ছিল তার পা দুটো যেন সিসার মতো ভারী হয়ে উঠেছে। 

অয়নকে তিনি তার থেকে দূরে থাকতে বলেছিলেন। কিন্তু ছেলেটাকে আক্ষরিক অর্থেই তার চোখের সামনে থেকে, এভাবে পুরোপুরি সরিয়ে দেওয়া হবে, এটা বিদিশার মাতৃসত্তা মেনে নিতে পারছিল না। তার মনে হচ্ছিল, কেউ যেন কাঁচি দিয়ে তার অস্তিত্বের একটা বড় অংশ কেটে বাদ দিয়ে দিল।

[বর্তমান সময়]

হাঁটতে হাঁটতে বিদিশা একটা ধীর দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। গত সপ্তাহে সব কটি বিষয়ের ইন্টারনাল পরীক্ষার রেজাল্ট বেরিয়ে গেছে, কিন্তু অয়নের ফলাফল কেমন হয়েছে, সেটা তিনি জানতে পারেননি। ফেস্টের সেই রাতের পর প্রায় দুই সপ্তাহ কাটতে চলল, এই বারোদিনে অয়ন একবারের জন্যও তার সাথে কোন যোগাযোগ করেনি। তারপর থেকে তিনি ওকে মেইন বিল্ডিংয়ের আর কোথাও দেখতে পাননি। 

ফেস্টের পরে ছেলেটা যেন স্বেচ্ছায় কোন এক অচেনা গ্রহের বাসিন্দা হয়ে গেছে।

মনের অগোছালো ভাবনাগুলো এক ঝটকায় ঝেড়ে ফেলে বিদিশা প্রিন্সিপালের ঘরের দরজায় মৃদু নক করলেন।

"কাম ইন", ভেতর থেকে প্রিন্সিপাল সান্যালের গলা ভেসে এল। 

প্রিন্সিপাল সান্যালের গলার স্বরটা বিদিশার রোজকার মতো স্বাভাবিক মনে হল না।

তিনি ভেতরে ঢুকলেন। ঘরের ভেতরের আবহাওয়াটা তাকে এক মুহূর্তের জন্য হলেও থমকে দিল।

প্রিন্সিপাল সান্যালের ঘরের পরিবেশটা আজ অন্যদিনের মতো স্বাভাবিক মনে হচ্ছে না। বিশাল ঘরটায় সেন্ট্রাল এসির ঠান্ডা হাওয়া সত্ত্বেও দমবন্ধ করা একটা আবহাওয়া। বাতাসে একটা লেমন-গ্রাস রুম ফ্রেশনারের গন্ধ থাকলেও বিদিশার আজকে ঘরের গুমোটভাবটা সেদিনের চেয়েও অনেক বেশি বলে মনে হল।

প্রিন্সিপাল সান্যাল তার বিশাল ডেস্কের ওপাশে আনমনা অবস্থায় বসে আছেন। তার ডেস্কের একপাশে ফাইলের স্তূপ, সামনে ল্যাপটপের স্ক্রিনটা খোলা, তার পাশে একটা ফাইল আর একটা অর্ধেক খাওয়া কফির কাপ। মানুষটাকে আজ ভীষণ ক্লান্ত দেখাচ্ছে। তার চোখের নিচে কালচে ছাপ, টাইয়ের নটটা সামান্য আলগা করা, যেন একটা বিশাল ঝড়ের মোকাবিলা করতে গিয়ে তিনি বিধ্বস্ত হয়ে পড়েছেন।

"গুড আফটারনুন, স্যার। আপনি ডেকেছিলেন?"

প্রিন্সিপাল সান্যাল চমকে মুখ তুললেন। বিদিশাকে দেখে তিনি জোর করে একটা হাসি মুখে আনার চেষ্টা করলেন, কিন্তু বিদিশার চোখে সেই হাসিটা আজ বড় ম্লান ঠেকল।

"আসুন মিস গাঙ্গুলি। প্লিজ হ্যাভ এ সিট।"

বিদিশা একটু সতর্ক হয়ে ডেস্কের সামনের লেদার চেয়ারটায় বসলেন। প্রিন্সিপাল সান্যাল নিজের চশমাটা খুলে টেবিলের ওপর রাখলেন। দুই হাতের আঙুলগুলো দিয়ে নিজের কপালের দু-পাশটা ঈষৎ চেপে ধরে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

"মিস গাঙ্গুলি, আজ আপনাকে কোনো রুটিন কাজের জন্য ডাকিনি। কলেজ একটা চূড়ান্ত ক্রাইসিসের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। আমার এই মুহূর্তে এমন একজনকে দরকার যার নার্ভ খুব স্ট্রং এবং যার লিডারশিপ আর ম্যানেজমেন্ট স্কিলের উপর আমি চোখ বুজে ভরসা করতে পারি।" 

প্রিন্সিপাল সান্যাল সরাসরি পয়েন্টে এলেন।

বিদিশার ভ্রু সামান্য কুঁচকে গেল। 

"ক্রাইসিস? আমি ঠিক বুঝতে পারলাম না, স্যার।"

প্রিন্সিপাল সান্যাল ফাইলটা খুলে সেটা থেকে একটা সরকারি লেটারহেড বের করে আনলেন।

"আপনি নিশ্চয়ই জানেন, আমাদের কলেজ গত কয়েক বছর ধরে 'ডিমড ইউনিভার্সিটি' স্ট্যাটাস পাবার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে। এই স্ট্যাটাসটা পেলে কলেজের রেপুটেশন, প্রেস্টিজ সবকিছু একধাক্কায় অন্য উচ্চতায় পৌঁছে যাবে।"

বিদিশা মাথা নাড়লেন। 

"হ্যাঁ স্যার, আমি শুনেছি।"

"এই স্ট্যাটাসটা পাওয়ার একমাত্র চাবিকাঠি হলো NAAC-এর গ্রেডিং", প্রিন্সিপাল সান্যাল একটু সামনের দিকে ঝুঁকে এলেন। তার গলার স্বরে উদ্বেগের সুর স্পষ্ট। 

তিনি কথা বলতে বলতে ফাইলটা বিদিশার দিকে এগিয়ে দিলেন।

"ইউনিভার্সিটি গ্রান্টস কমিশন এবং ন্যাক-এর 'পিয়ার টিম'-র আমাদের কলেজ পরিদর্শনে আসার কথা ছিল আগামী বছর মার্চ মাসে। আমাদের হাতে অনেকটা সময় ছিল। কিন্তু গতকাল বিকেলে ন্যাক-এর অফিস থেকে হঠাৎ একটা নোটিশ এসেছে। কোনো অজ্ঞাত কারণে তারা তাদের ভিজিটের শিডিউল প্রি-পোন করেছে। তারা মার্চে নয়, আগামী জানুয়ারি মাসের সেকেন্ড উইকেই কলেজ ভিজিটে আসছেন! জাস্ট আউট অফ নো হোয়্যার!"

বিদিশার চোখের দৃষ্টি তীক্ষ্ণ হলো। যেকোন অ্যাকাডেমিক প্রতিষ্ঠানের জন্য ন্যাক ভিজিট একটা জীবন-মরণ সমস্যা। কিন্তু এর সাথে ডিমড ইউনিভার্সিটি স্ট্যাটাসের কী সম্পর্ক?

"ন্যাকের রুল অনুযায়ী, একটা 'এ প্লাস' (A+) গ্রেড আমাদের পেতেই হবে আর এই গ্রেডিংয়ের সবচেয়ে ভাইটাল পার্ট হলো 'ক্রাইটেরিয়ন থ্রি' - রিসার্চ, ইনোভেশনস অ্যান্ড এক্সটেনশন। অ্যাকাডেমিক প্রোফাইল সমৃদ্ধ না হলে ওরা আমাদের ডিমড ইউনিভার্সিটি স্ট্যাটাসের অ্যাপ্লিকেশন শুরুতেই খারিজ করে দেবে।"

প্রিন্সিপাল সান্যালের গলাটা এবার আরও ভারী শোনাল। 

"ক্রাইটেরিয়ন থ্রি' হল ন্যাক গ্রেডিংয়ের সবচেয়ে ভাইটাল পার্ট। এই স্কোরটা বাড়ানোর জন্যই আগামী বছর ফেব্রুয়ারিতে আমরা একটা 'ন্যাশনাল লেভেল ম্যাথমেটিক্স সিম্পোজিয়াম' হোস্ট করার প্ল্যান করেছিলাম। দেশের নামকরা সব ম্যাথমেটিশিয়ানদের আসার কথা। কিন্তু ন্যাক ভিজিট জানুয়ারিতে এগিয়ে আসায়, আমাদের বাধ্য হয়ে এই ন্যাশনাল সিম্পোজিয়ামটাও প্রি-পোন করতে হচ্ছে। ইভেন্টটা আমাদের ডিসেম্বরের সেকেন্ড উইকে অর্গানাইজ করতে হবে। অর্থাৎ, হাতে সময় আছে আঠারো দিন। নইলে আমাদের অ্যাকাডেমিক স্কোর আবার এক ধাক্কায় অনেকটা নিচে নেমে যাবে। ডিমড ইউনিভার্সিটির স্বপ্নটা এই বছরের মতো শেষ হয়ে যাবে।"

বিদিশা মনে মনে দ্রুত হিসেব কষতে শুরু করলেন। আঠারো দিন মানে ৪৩২ ঘন্টা। একটা ন্যাশনাল লেভেলের ইভেন্ট, যেখানে সারা দেশ থেকে ডেলিগেটরা আসবেন, সেটার ডেট দুমাস এগিয়ে এনে মাত্র আঠারো দিনের নোটিশে নামানো? এটা এক প্রকার আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত বললেও কিছুই বলা হয় না!

"এই ইভেন্টের কো-অর্ডিনেটর ছিলেন সিনিয়র প্রফেসর শুভেন্দু বোস।" 

কথা বলতে বলতে প্রিন্সিপালের মুখে চিন্তার রেখাগুলো আরও গাঢ় হয়ে উঠলো। 

"কিন্তু, শুভেন্দুবাবুর তিন দিন আগে একটা মাইল্ড হার্ট-অ্যাটাক হয়েছে। উনি এখন হসপিটালাইজড। আগামী এক মাস ডাক্তার ওনাকে সম্পূর্ণ বেড-রেস্টে থাকতে বলেছেন। এই ইমার্জেন্সি সিচুয়েশনে পুরো ইভেন্টটা এখন অথৈ জলে।" 

প্রিন্সিপাল একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফাইলের স্তূপ থেকে বেশ কয়েকটা মোটা, অগোছালো ফাইল বের করে আনলেন।

"ডক্টর বোস অসুস্থ হবার আগে ইভেন্টের একটা খসড়া বা একটা প্রাথমিক কাঠামো বানিয়ে গিয়েছিলেন। আপাতত আমাদের কাছে যেটা আছে সেটা হলো, দেশ-বিদেশের আমন্ত্রিত অতিথিদের একটা প্রাথমিক তালিকা এবং তাঁদের কয়েকজনকে পাঠানো মেইল। কিন্তু মুশকিল হলো, সেমিনারের ডেট দুমাস এগিয়ে আসায় সেই পুরো শিডিউলটা এখন তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছে।"

প্রিন্সিপাল একটা নীল রঙের ফাইল বিদিশার দিকে এগিয়ে দিলেন।

"কাজটা এখন অনেকটা পাহাড় সমান, মিস গাঙ্গুলি। প্রথমত, আমাদের প্রায় সত্তরজন ডেলিগেটকে ব্যক্তিগতভাবে মেইল এবং ফোন করে এই নতুন শিডিউলে তাঁদের সম্মতি নিতে হবে। তাঁদের ফ্লাইটের টিকিট রি-বুকিং আর ডিসেম্বরের পর্যটন মরসুমে কলকাতার কোনো ভালো ফাইভ-স্টার হোটেলে এই অল্প সময়ে ব্লকে অন্তত পঁচিশটা রুম কনফার্ম করা, এটা এই মুহূর্তে সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জ।

দ্বিতীয়ত, আমাদের কাছে সারা দেশ থেকে প্রায় তিনশো রিসার্চ পেপার জমা পড়েছে। ডক্টর বোস সেগুলো স্ক্রিনিং করা শুরু করতে পারেননি। এই অল্প সময়ে আমাদের অ্যাকাডেমিক প্যানেলকে দিয়ে পেপারগুলো শর্টলিস্ট করে অ্যাবস্ট্রাক্ট বুক ছাপাতে হবে। এছাড়া ভেন্ডারদের সাথে নতুন করে রেট নেগোশিয়েশন, অডিটোরিয়ামের টেকনিক্যাল সেটআপ আর লজিস্টিকস... সবকিছুই এখন একটা 'লুজ এন্ড'-এ ঝুলে আছে।"

প্রিন্সিপাল সান্যাল একটু থেমে সরাসরি বিদিশার চোখের দিকে তাকালেন। তার সেই দৃষ্টিতে একজন প্রশাসকের আদেশের চেয়ে একজন মরিয়া মানুষের অনুরোধ বেশি স্পষ্ট ছিল।

"মিস গাঙ্গুলি, কালচারাল ফেস্টে আমি আপনার ম্যানেজমেন্ট স্কিল, আপনার ক্রাইসিস হ্যান্ডলিং এবং আপনার নিখুঁত ডেডিকেশন দেখেছি। আপনি যেভাবে কোনো এক্সট্রা খরচ না করে, স্পনসরশিপের টাকা ইউটিলাইজ করে ফেস্ট উতরে দিয়েছেন, তাতে আমরা আপনার কাজে অত্যন্ত ইমপ্রেসড। 

আমি জানি কাজটা এই আঠারো দিনে করা হিউম্যানলি অলমোস্ট ইম্পসিবল। কিন্তু ডক্টর বোস ফাইলগুলো যেভাবে ক্যাটাগরাইজ করে রেখে গেছেন, তাতে আপনি যদি আজ থেকে কো-অর্ডিনেশন শুরু করেন, তবে জটগুলো একে একে খোলা সম্ভব। আপনার শুধু প্রয়োজন একটা শক্ত টিম আর নিখুঁত টাইম ম্যানেজমেন্ট। আমি জানি আপনি এটা পারবেন।

আমি চাই, আপনি এই ন্যাশনাল সিম্পোজিয়ামের 'লিড কো-অর্ডিনেটর'-এর দায়িত্বটা নিজের কাঁধে তুলে নিন।"

প্রস্তাবটা শুনে বিদিশা একটা জোর ধাক্কা খেলেন।

তিনি একজন শিক্ষিকা, কোনো প্রফেশনাল ইভেন্ট ম্যানেজার নন। যেরকম অনুষ্ঠান আয়োজনের গুরুদায়িত্ব প্রিন্সিপাল তার ঘাড়ে চাপাতে চাইছেন সেটা সামলানোর মতো অভিজ্ঞতা বা মানসিক প্রস্তুতি কোনটাই তাঁর নেই।

তার উপর এই সামান্য কটা দিনের নোটিশে এত বড় একটা ইভেন্ট নামানো অসম যুদ্ধের সমান।

তাছাড়া, একটা ন্যাশনাল লেভেলের সিম্পোজিয়াম আর কলেজের ফেস্ট এক জিনিস নয়। ফেস্ট কলেজের নিজস্ব ইভেন্ট, সেখানে সিম্পোজিয়াম জাতীয় স্তরের ইভেন্ট। সেখানে বাইরে থেকে গেস্টরা আসবেন। সামান্য একটা ফ্লাইট মিস বা অ্যাকোমোডেশন নিয়ে গেস্টরা একটু অসন্তোষ প্রকাশ করলে কলেজের রেপুটেশন মুহূর্তেই ধুলোয় মিশে যাবে। আর সেই বিপর্যয়ের সমস্ত দায়ভার এসে পড়বে বিদিশার ঘাড়ের ওপর। 

তিনি সবেমাত্র এই কলেজে পা রেখেছেন। শুরুতেই যদি এমন কালির দাগ লাগে তবে তার কেরিয়ার শুরু হতে না হতেই ধুলোয় মিশে যাবে।

বিদিশার ফর্সা মুখে একটা সূক্ষ্ম দ্বিধার রেখা ফুটে উঠল। তিনি প্রিন্সিপালকে সরাসরি 'না' বলে চটাতে চান না, আবার বিনাবাক্যে এই আত্মঘাতী দায়িত্ব নিজের ঘাড়ে নিতে চাইছেন না।

"স্যার... ইটস আ হিউজ রেসপন্সিবিলিটি", বিদিশা অত্যন্ত সতর্কভাবে মেপে মেপে কথাগুলো বললেন। তার গলার স্বরে বিনয় থাকলেও তাতে একটা প্রচ্ছন্ন সতর্কতার সুর ফুটে উঠল। 

"আপনি আমার ওপর ভরসা রাখছেন, তার জন্য আমি গ্রেটফুল। কিন্তু, আমার এর আগে এত বড় অ্যাকাডেমিক ইভেন্ট কো-অর্ডিনেট করার কোন অভিজ্ঞতা নেই। তাও সব আবার গোড়া থেকে শুরু করতে হবে। আর হাতে মাত্র আঠারো দিন... আমার নিজের রেগুলার ক্লাস, ফার্স্ট ইয়ার, থার্ড ইয়ারের সিলেবাস, সব এক সাথে..."

কথাগুলো বলতে বলতে এই দ্বিধার মুহূর্তেই বিদিশার মনে সাম্প্রতিক অতীতের একটা স্মৃতি বিদ্যুতের ঝলকের মতো খেলে গেল।

ডক্টর বাগচীর সেই ঠান্ডা, হুমকিভরা গলাটা যেন তার কানের কাছে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল।

'সামনেই কলেজকে ডিমড ইউনিভার্সিটি করার জন্য একটা বড় ফান্ডিংয়ের দরকার। যার জন্য খুব শিগগিরই একটা বড় ফান্ডিংয়ের প্রয়োজন। এর একটা অংশ এদের থেকে আসার কথা। আপনি যদি এখন এই প্রভাবশালী ঘরের ছেলেদের ফেল করান, তবে ফান্ডিংটা আটকে যেতে পারে...'

Continued...
[+] 6 users Like RockyKabir's post
Like Reply
সাথে সাথে বিদিশার সারা শরীর দিয়ে এক অজানা শিহরণ বয়ে গেল। তাঁর মনের ভেতরে ফুটে উঠল এক তীব্র তাচ্ছিল্যের ভাব।

ভাগ্যের কী আশ্চর্য পরিহাস! ডক্টর বাগচী তাকে বলেছিলেন যে, ওই অযোগ্য, প্রভাবশালী ছেলেগুলোকে পাস না করালে কলেজের ডিমড ইউনিভার্সিটির স্ট্যাটাস পাওয়া আটকে যাবে। তিনি চেয়েছিলেন ডোনেশনের টাকায় ইউনিভার্সিটির স্ট্যাটাস কিনতে। সেটার জন্য উনি দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দিতে পিছপা হননি। 

আর আজ? 

আজ প্রতিষ্ঠানের সম্মান, ন্যাক-এর এ-প্লাস গ্রেডিং আর ডিমড ইউনিভার্সিটির স্বপ্ন এইসব নির্ভর করছে বিদিশার একটা সিদ্ধান্তর উপরে!

একেই বলে ভাগ্য। 

আজ ডোনেশনের টাকা নয় বরং বিদিশার মেধা, বুদ্ধির জোর, তার পরিশ্রম করার ক্ষমতা আর নেতৃত্বের ওপর এই কলেজের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে। এই সিম্পোজিয়ামটা ডক্টর বাগচী আর তার সিন্ডিকেটের মুখে সপাটে ছুঁড়ে দেওয়া একটা জবাব হতে পারে।

এই ইভেন্টের পরে ডক্টর বাগচী আর তাকে ঘাঁটানোর সাহস পাবেন না।

নিমেষের মধ্যে বিদিশার মনের মেঘটা কেটে গেল। তার জায়গায় জন্ম নিল এক ইস্পাত-কঠিন জেদ আর লড়াকু মানসিকতা। ইতালির সেই অভিশপ্ত রাতে লড়াই করে বেঁচে ফেরা নারীটি আজ আবার তার সামনে একটা নতুন যুদ্ধের ময়দান দেখতে পাচ্ছে।

প্রিন্সিপাল সান্যাল বিদিশার মুখের এই পরিবর্তনটা লক্ষ্য করলেন।

"মিস গাঙ্গুলি, আমি আপনার কনসার্নটা বুঝতে পারছি", প্রিন্সিপাল দৃঢ় গলায় বললেন। 

"আমি আপনাকে একা লড়তে বলছি না। পুরো কলেজ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন আপনার পেছনে থাকবে। প্রথমত, আগামী কুড়ি দিন আপনাকে কোন ক্লাস নিতে হবে না। আপনার ক্লাসগুলো আমি গেস্ট ফ্যাকাল্টিদের মধ্যে ডিস্ট্রিবিউট করে দিচ্ছি। আপনার ফোকাস থাকবে শুধুই সিম্পোজিয়াম।"

প্রিন্সিপাল একটু থামলেন, বিদিশার চোখের পলকহীন স্থির দৃষ্টির ওপর নিজের চোখ রেখে আবারও যোগ করলেন,

"দ্বিতীয়ত, আমাদের সেমিনার কমিটি অলরেডি ফর্ম করা আছে। আমি আজই কমিটির হেডকে নির্দেশ দিচ্ছি তারা যেন ইমিডিয়েটলি আপনার সাথে যোগাযোগ করে। এছাড়া অ্যাকোমোডেশন, কেটারিং এবং টেকনিক্যাল সাপোর্টের জন্য আলাদা কমিটি আছে। তারা সবাই সরাসরি আপনাকে রিপোর্ট করবে। আপনি জাস্ট জাহাজের ক্যাপ্টেন হয়ে হাল ধরুন। আপনার যা যা রিসোর্স লাগবে, আমি প্রিন্সিপাল হিসেবে পার্সোনালি সেটা অ্যাপ্রুভ করব। জাস্ট মেক দিস হ্যাপেন।"

প্রিন্সিপালের কথায় একটা মরিয়া ভাব ছিল বটে, কিন্তু তার সাথেই ছিল বিদিশার প্রতি অটুট বিশ্বাস।

বিদিশা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তার চোখের দৃষ্টিতে এখন আর দ্বিধা নেই। তিনি সোজা হয়ে বসলেন।

"ইটস অ্যান অনার, স্যার", মনের ভাবটা প্রকাশ না করে বিদিশা শান্ত ভাবে, আত্মবিশ্বাসী গলায় বললেন।

"আমি এই দায়িত্বটা নিচ্ছি। কিন্তু আমার কাজ করার ধরনটা একটু স্ট্রিক্ট। আমি চাইব আমার সিদ্ধান্তে যেন অন্য কারোর, যেন কোন আন-অফিশিয়াল ইন্টারফেয়ারেন্স না থাকে।"

প্রিন্সিপাল সান্যাল একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেন। তার ক্লান্ত মুখে এতক্ষণে সত্যিকারের হাসি ফুটে উঠল।

"ইউ হ্যাভ মাই ওয়ার্ড, মিস গাঙ্গুলি। এই ইভেন্টে আপনার কথাই শেষ কথা। কাজটা অনেক বড়, তাই আপনার একটা অত্যন্ত অ্যাকটিভ আর স্মার্ট ভলান্টিয়ার টিম দরকার হবে।"

বিদিশা সতর্ক হয়ে গেলেন। তিনি আন্দাজ করতে পারছিলেন এরপর প্রিন্সিপাল কী বলতে চলেছেন। প্রিন্সিপাল ঠিক সেই কথাটাই বললেন, "ফেস্টে বিক্রমের সাথে আপনার টিউনিংটা খুব ভালো ছিল। সেমিনারের ভলান্টিয়ারিং টিমের দায়িত্বটাও কি ওকে দিয়ে দেব?"

বিদিশার শরীরটা এক মুহূর্তের জন্য শক্ত হয়ে গেল। কিন্তু তিনি তার মুখের ভাবে কোন পরিবর্তন আসতে দিলেন না।

ভলান্টিয়ার টিম কথাটা শোনা মাত্রই তার মাথার ভেতর নন্দিতাদির সেই সতর্কবাণীটা বিদ্যুৎবেগে খেলে গিয়েছিল আর তার ঠিক পরক্ষণেই চোখের সামনে ভেসে উঠৈছিল ফেস্টের অন্ধকার অডিটোরিয়ামের সেই দৃশ্যটা - শাড়ির পিন আটকে দেওয়ার অছিলায় তার কোমরে বিক্রমের সেই ইচ্ছাকৃত স্পর্শ।

সেই স্পর্শে যে শুধু সাহায্যের হাত ছিল না, বরং তাতে কাম লুকিয়ে ছিল তা বিদিশার মতো অভিজ্ঞ নারীর বুঝতে অসুবিধা হয়নি। কিন্তু, সে রাতে অয়নের অমন উন্মত্ত আচরণে সে সব চাপা পড়ে গিয়েছিল। 

নয়তো বিক্রমের একটা উপযুক্ত শাস্তি তখন সেই মুহুর্তেই পাওনা ছিল। বিদিশার ধারণা, ফেস্টের পরে বিক্রম সম্ভবত সেজন্যই আর ভয়ে তার সামনে আসেনি। কিন্তু, বিদিশা তো এখনও সেই রাতের কিছুই ভোলেননি, ভুলতে পারেননি।

সেদিন রাতের লালসাভরা আচরণই আজ বিক্রমের ভাগ্য নির্ধারণ করে দিল।
 
বিদিশা অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সাথে, ঠান্ডা মাথায় বিক্রমকে সেমিনারের কাজ থেকে ছেঁটে ফেলার সিদ্ধান্ত নিলেন।

"না স্যার।" 

বিদিশা অত্যন্ত মার্জিত ও পেশাদার ভাবে বললেন। 

"বিক্রম হিস্ট্রির স্টুডেন্ট। এটা একটা ম্যাথমেটিক্স সিম্পোজিয়াম। এখানে ওর ইনভলভমেন্টের কোনো দরকার নেই। তাছাড়া, বারবার এসব এক্সট্রা-কারিকুলার কাজে ইনভলভমেন্ট বরং ওর পড়াশোনার ক্ষতি করতে পারে।"

প্রিন্সিপাল একটু ভেবে মাথা নাড়লেন, "হুম, তা অবশ্য ঠিক।"

বিদিশা একটুও না ভেবে বললেন, "আমি সেকেন্ড ইয়ারের সাহিল খানকে নেব। ও ম্যাথস অনার্সের ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট, এই টপিকগুলো ওর বুঝতে সুবিধা হবে আর স্টুডেন্ট কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট হিসেবে ওর লিডারশিপ আর অর্গানাইজিং স্কিলও নিশ্চয়ই বিক্রমের চেয়ে অনেক বেশি শার্প হবে।"

প্রিন্সিপাল সান্যাল সন্তুষ্ট হয়ে হাসলেন। 

"পারফেক্ট চয়েস। সাহিল ইজ আ ভেরি ব্রাইট বয়। তাহলে আপনি ওর সাথেই টিমটা রেডি করে নিন।"

"থ্যাংক ইউ, স্যার।" বিদিশা উঠে দাঁড়ালেন।

প্রিন্সিপাল সান্যাল চশমাটা টেবিলের ওপর রেখে যোগ করলেন, "আরেকটা কথা মিস গাঙ্গুলি, যেহেতু এটা পিওরলি একটা ম্যাথমেটিক্স সিম্পোজিয়াম, তাই আমি চাই আমাদের ম্যাথ ডিপার্টমেন্টের প্রতিটি মেম্বার যেন এতে সক্রিয়ভাবে ইনভলভড থাকে। অভিজ্ঞ শিক্ষকরা পেপার প্রেজেন্টেশনের দিকটা সামলাবেন আর বাকিরা অর্গানাইজিং কমিটির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকবেন। আমি চাইছি পুরো বিভাগটা একটা টিম হিসেবে পারফর্ম করুক, যার লিড দেবেন আপনি।"

বিদিশা সামান্য মাথা ঝুঁকিয়ে সম্মতি জানালেন। তার চেহারায় এক ধরনের দৃঢ়তা ফুটে উঠল।

"নিশ্চয়ই স্যার। আমি আজই ডিপার্টমেন্টের সবার সাথে বসে একটা প্রাইমারি ব্লু-প্রিন্ট তৈরি করে ফেলব। প্রত্যেকে যেন তাদের যোগ্যতা অনুযায়ী সঠিক দায়িত্ব পায়, সেটা আমি পার্সোনালি সুপারভাইজ করব।"

"ভেরি গুড! আপনার ওপর আমার পূর্ণ আস্থা আছে", প্রিন্সিপাল তৃপ্তির হাসি হাসলেন।

"ধন্যবাদ স্যার। আসি তাহলে", বলে বিদিশা ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন।

ভারী কাঠের দরজাটা পেছনে বন্ধ হতেই বিদিশা করিডোরে এসে একবার থামলেন। তার বুকের ভেতরের ভারটা যেন একটু হালকা হয়েছে। তিনি অনুভব করলেন, গত কিছু দিনের অপমানের স্তূপ সরিয়ে এক লড়াকু সত্তা তাঁর ভেতরে জেগে উঠেছে। 

করিডোর দিয়ে হাঁটার সময় তিনি আর নতুন করে কোন দুশ্চিন্তাকে প্রশ্রয় দিলেন না। অয়ন কিংবা বিক্রম কারোর চিন্তাই তার মনকে নতুন করে বিক্ষিপ্ত করতে পারল না। 

তিনি এক ঝটকায় নিজের মনের অগোছালো ভাবনার ওপর কড়া শাসন জারি করলেন। এখানে আবেগের কোন জায়গা নেই, এখন ব্যক্তিগত টানাপোড়েনের সময় নয়। সামনে তার কেরিয়ারের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। খটখট শব্দে নিস্তব্ধ করিডোর কাঁপিয়ে তিনি ম্যাথ ডিপার্টমেন্টের স্টাফরুমের দিকে এগিয়ে গেলেন।

দুপুরবেলা, কলেজের ক্যাফেটেরিয়া।

ক্যাফেটেরিয়ার এক কোণে, এসির ঠিক নিচে একটা টেবিলে বসে ছিল রনি আর কবীর। সামনে টেবিলে দুটো কোল্ড কফি পড়ে আছে। কিন্তু, ওদের আড্ডার সেই চেনা আমেজ আর নেই। ফেস্টের রাতের পর থেকে ওদের পুরো গ্রুপটাই যেন তছনছ হয়ে গেছে। 

অয়নকে ছাড়া ওদের কলেজ লাইফটা খুব ফাঁকা লাগছে ঠিকই কিন্তু অয়নের এখনকার ওই উগ্র রূপটার ধারেকাছে যেতেও ওদের ভয় করে।

"ভাই, অয়নটা পুরো সাইকো হয়ে গেছে মাইরি", রনি একটা স্যান্ডউইচে কামড় দিয়ে ফিসফিস করে বলল। 

"কাল ডর্মে দেখলাম, একা একা বসে দেওয়ালের দিকে তাকিয়ে আছে। আমি ওকে ডাকলাম, আমার দিকে জাস্ট এমন একটা লুক দিল না...মনে হলো সুযোগ পেলে আমাকে জ্যান্ত পুঁতে ফেলবে।"

কবীর মাথা নাড়ল। 

"ও এখন একটা টাইমবোমা। কখন কার ওপর ফাটবে কেউ জানে না। ভালোই হয়েছে ও আমাদের সেকশন থেকে ট্রান্সফার হয়ে গেছে। ওর ধারেকাছে ঘেঁষাও এখন বিপদ।"

ঠিক সেই সময়, ক্যাফেটেরিয়ার কোলাহল ভেদ করে একটা পরিচিত, অত্যন্ত গ্ল্যামারাস অবয়ব সোজা ওদের টেবিলের দিকে হেঁটে এল।

চন্দ্রিমা সেন।

আজ তার পরনে একটা অফ-শোল্ডার ব্ল্যাক টপ আর ফেডেড ডেনিম। চোখে সানগ্লাসটা মাথার ওপরে তোলা। কলেজের 'কুইন বি'-কে সোজা তাদের টেবিলের দিকে আসতে দেখে রনি আর কবীরের চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল। কবীরের মুখের স্যান্ডউইচটা আটকে যাওয়ার উপক্রম হলো।

"হেই বয়েজ", চন্দ্রিমার গলায় মিষ্টি সুর, কিন্তু তাতে যে কমান্ডিং টোন, সেটার ধার ছুরির মতো। উত্তরের অপেক্ষা না করেই সে ওদের সামনের ফাঁকা চেয়ারটা টেনে নিয়ে অত্যন্ত রাজকীয় ভঙ্গিতে বসে পড়ল। পুরো ক্যাফেটেরিয়ার অর্ধেক ছেলের নজর এখন ওদের টেবিলের দিকে।

রনি একটা শুকনো ঢোক গিলে আমতা আমতা করে বলল, "কী... কী ব্যাপার চন্দ্রিমা? কোনো হেল্প লাগবে?"

চন্দ্রিমা নিজের পারফেক্ট ম্যানিকিওর করা আঙুল দিয়ে টেবিলের ওপর দুবার টোকা দিল। 

"আমি এখানে হেল্প চাইতে আসিনি। ইনফরমেশন নিতে এসেছি", চন্দ্রিমা সরাসরি ওর চোখের দিকে তাকিয়ে বলল। তার গলায় কোনো ভনিতা নেই।

"ইনফরমেশন? কীসের?" রনি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল।

"তোমাদের ওই অ্যারোগ্যান্ট, জংলি বন্ধুটার ব্যাপারে। অয়ন চ্যাটার্জী।"

নামটা শোনা মাত্রই রনি আর কবীর একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করল।

"অয়ন? ওর ব্যাপারে আমরা কী করে জানব? ও তো আজকাল আমাদের সাথে মেশেই না", রনি একটু ভয় পাওয়া গলায় বলল।

চন্দ্রিমা একটু সামনে ঝুঁকে এল। তার চোখের দৃষ্টি তীক্ষ্ণ। 

"ডোন্ট লাই টু মি। তোমরা ওর ক্লাসমেট, ওর ডর্মের বন্ধু। ও কোথায় থাকে, কখন কী করে, আমি সব ডিটেইলস জানতে চাই। স্পিক আপ।"

কবীর একটু আমতা আমতা করে বলল, "বিশ্বাস করো চন্দ্রিমা, আমরা সত্যিই কিছু জানি না। ফেস্টের পর থেকে ও পুরো চেঞ্জ হয়ে গেছে। ও ক্লাসেও আসে না। ওই ফুটবল মাঠে প্র্যাকটিসের পর চক্কর কাটে আর সন্ধেবেলা কোথায় যেন চলে যায়। ডর্মে ফিরলে কারো সাথে একটা কথাও বলে না। ওর চোখগুলো এমন লাল হয়ে থাকে যে আমাদের নিজেদেরই ভয় লাগে। হি ইজ লাইক আ ঘোস্ট নাও।"

"ও কারোর সাথে মেশে না? কোনো মেয়ের সাথেও না?" চন্দ্রিমা কনফার্ম করার জন্য জিজ্ঞেস করল।

"আরে নাহ! মেয়ের কথা তো ছেড়েই দাও, ও আমাদের সাথেও কথা বলে না। পুরো একা হয়ে গেছে ভাই। মনে হয় ফেস্টে ম্যামের কাছে চড় খাওয়ার পর ওর ব্রেনটা ড্যামেজ হয়ে গেছে", রনি ফিসফিস করে বলল।

চন্দ্রিমা চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। তার যা জানার দরকার ছিল, সে জেনে গেছে।

"গুড। থ্যাংকস ফর দ্য ইনফো বয়েজ", চন্দ্রিমা অত্যন্ত ক্যাজুয়াল ভঙ্গিতে সানগ্লাসটা চোখে নামিয়ে যেভাবে এসেছিল ঠিক সেভাবেই ক্যাফেটেরিয়া থেকে বেরিয়ে গেল।

ক্যাফেটেরিয়ার বাইরে এসে চন্দ্রিমা একটা গভীর শ্বাস নিল। বাইরে রোদ থাকলেও মনের ভেতরে হিমশীতল রোমাঞ্চ অনুভব করল সে। অয়ন চ্যাটার্জী এখন সম্পূর্ণ একা। ঠিক যেন আহত একটা সিংহ। যে এখন নিজের ডেরায় বসে ছটফট করছে। তার চারপাশটা ফাঁকা। তার পাশে কোন বন্ধু নেই, কোন সাপোর্ট সিস্টেম নেই, সে এখন পুরোপুরি অসহায়।

চন্দ্রিমার ঠোঁটে একটা হাসি ফুটে উঠল, এটা একটা বিশাল সুযোগ। আহত সিংহকে কাবু করা সহজ, যদি আগে থেকে জানা থাকে ঠিক কোন ক্ষতে চাপ দিলে সে যন্ত্রণায় কুঁকড়ে যাবে। এর আগে সে বড় ভুল করেছিল। সে ভেবেছিল আর পাঁচটা ছেলের মতো ওর একটা ইশারাতেই অয়ন ওর সামনে হাঁটু গেড়ে বসে পড়বে।

কিন্তু, ফেস্টের রাতে ও বুঝতে পেরেছে অয়ন কোন সাধারণ ছেলে নয়।

অয়নের এই দুর্বল মুহূর্তে এমন একটা জায়গা দিয়ে এমনভাবে এন্ট্রি নিতে হবে, যাতে ও চাইলেও পালাতে না পারে। বরং এমন ব্যবস্থা করতে হবে যাতে সে নিজেই চন্দ্রিমার খাঁচায় নিজে থেকে বন্দী হতে বাধ্য হবে। তার জন্য সময় লাগলে লাগুক, এবারে সে আর তাড়াহুড়ো করবে না। হাতে সময় নিয়ে পরিকল্পনার ছক কষবে। তবে তার আগে অয়নের হোয়্যারঅ্যাবাউটস জানা দরকার।

বিকেল তিনটে। লাইব্রেরি বিল্ডিং।

মিস্টার দাস কলেজের ম্যাথমেটিক্স ডিপার্টমেন্টের একজন সিনিয়র এবং অত্যন্ত সম্মানীয় প্রফেসর। তার বয়স পঞ্চান্ন। কাঁচাপাকা চুল, চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা। মানুষটি অত্যন্ত শান্ত, রাশভারী এবং নিখাদ অ্যাকাডেমিক। ডিপার্টমেন্টের ভেতরকার দলাদলি, কলেজের রাজনীতি, সব রকম গসিপ থেকে তিনি নিজেকে সযত্নে শতহস্তে দূরে সরিয়ে রাখেন।

তিনি এই কলেজের অন্যতম পুরোনো মুখ। যখন তিনি এই কলেজে জয়েন করেছিলেন তখন মেইন বিল্ডিংয়ে ম্যাথমেটিক্স ডিপার্টমেন্টের জন্য আলাদা কোনো স্টাফরুম ছিল না। সব ম্যাথ টিচারের জন্য কেবিন বরাদ্দ হয়নি।

সেই সময় থেকেই তিনি লাইব্রেরি বিল্ডিংয়ের দোতলার একেবারে শেষ প্রান্তে, নির্জন করিডোরের ধারের এই ছোট্ট ঘরটিতে বসতেন। 

পরবর্তীতে ম্যাথ ডিপার্টমেন্টের জন্য আলাদা উইং, স্টাফরুম এসব তৈরি হলেও, তিনি এই পুরোনো ঘরটি ছেড়ে চলে যাননি। 

আজ উনি অফটাইমে একটা বই পড়ছিলেন।

এমন সময় অয়ন দরজায় একটা হালকা টোকা মেরে ভেতরে মুখ বাড়িয়ে বলল।

"মে আই কাম ইন, স্যার?"

অয়নের গলার স্বরটা আবেগহীন, যান্ত্রিক। তার চোখের নিচের কালচে ছোপ মিস্টার দাসের নজর এড়াল না। 

"কাম ইন।"

অয়ন ঘরে ঢুকলে উনি চোখের ইশারায় ওকে বসতে বললেন। সে সামনের চেয়ারটায় বসল।

"তোমার কোচ, আমাকে সব বলেছেন", মিস্টার দাস সরাসরি পয়েন্টে এলেন। কোচ সেনগুপ্তর সাথে তার দীর্ঘদিনের সুসম্পর্ক।

"আমি শুনেছি গতকাল প্র্যাকটিস ম্যাচে তুমি এমন একটা ফাউল করেছ যার জন্য কোচ তোমাকে এক সপ্তাহের জন্য মাঠ থেকে ব্যান করেছেন। তোমাকে প্র্যাকটিসের সময় শুধু মাঠের বাইরে চক্কর কাটতে বলা হয়েছে।"

অয়ন মাথা নিচু করে সব শুনল। রাগে ওর চোয়াল শক্ত হয়ে গেল, কিন্তু সে কোনো উত্তর দিল না। গতকালের সেই ঘটনাটা ওর রাগের আগুনে আরও ঘি ঢেলেছে। ফুটবল মাঠটাই ছিল ওর শ্বাস নেবার একমাত্র জায়গা, এখন সেটাও ওর কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া হল।

মিস্টার দাস একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, "দেখো বাবা, স্পোর্টস নিজের জায়গায় আর পড়াশোনা নিজের জায়গায়।"

অয়ন মাথা নিচু করে কথাগুলো শুনল। সে কোনো উত্তর দিল না।

মিস্টার দাস বললেন, "নিয়মিত ক্লাসে না আসার ফলে তুমি ম্যাথসের সিলেবাসে অনেকটাই পিছিয়ে পড়ছ। কিন্তু তোমার কোচ যখন তোমার জন্য এতবড় গ্যারান্টি দিয়েছেন, তখন আমারও তো একটা দায়িত্ব থাকে। এই ব্যানের সময়টা নষ্ট না করে তুমি অঙ্কের সিলেবাসটা মেকআপ করতে কাজে লাগাও।"

তিনি ড্রয়ার থেকে একটা ছোট চিরকুট বের করে অয়নের দিকে এগিয়ে দিলেন।

"আমি তোমার জন্য একটা স্পেশাল টিউটোরিয়াল অ্যারেঞ্জমেন্ট করেছি। আমাদের কলেজেরই একজন অত্যন্ত ব্রাইট স্টুডেন্ট তোমাকে গাইড করবে। তোমার মিসড ক্লাস
গুলোর নোটস আর জটিল কনসেপ্টগুলো ও তোমাকে বুঝিয়ে দেবে।"

অয়ন চিরকুটটার দিকে তাকিয়ে নিস্পৃহ গলায় বলল, "এর কোনো দরকার ছিল না, স্যার। আমি ম্যানেজ করে নেব।"

"ডোন্ট আর্গিউ, অয়ন" মিস্টার দাস এবার একটু কড়া গলায় বললেন। 

"তুমি একা সব ম্যানেজ করতে পারবে না। কাল বিকেল চারটের সময় তুমি কলেজ লাইব্রেরির রেফারেন্স সেকশনে যাবে। তোমার টিউটর সেখানে তোমার জন্য ওয়েট করবে।"

মিস্টার দাস তার নামটা বললেন না আর অয়নও জিজ্ঞেস করল না। নিজের কেরিয়ার, পড়াশোনা, ভবিষ্যত এসব নিয়ে তার বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা নেই। এমনকী ইন্টারনাল পরীক্ষায় ফিজিক্সে খারাপ রেজাল্ট আসার পরেও সে নির্লিপ্ত থেকেছে। 

এই এক সপ্তাহে অয়নের মানসিক অবস্থার বিশেষ উন্নতি হয়নি। বন্ধুদের সঙ্গে তার সম্পর্কের সুতোটা পুরোপুরি ছিঁড়ে গেছে। রোজ ক্লাস কামাই করাটা ওর রুটিন হয়ে গিয়েছে। অয়ন মনে মনে ঠিকই করে ফেলেছে যে ফার্স্ট সেমিস্টারের পরীক্ষার আগে সে আর কোন ক্লাসরুমের চৌকাঠ মাড়াবে না। অয়নের পুরো সময় আজকাল ডর্মের মধ্যেই কাটে। সেখানে বসে বসে ও সবসময় কিভাবে বিক্রমের উপর প্রতিশোধ নেবে সেটা প্ল্যান করে। ওর মায়ের প্রতি জমে থাকা ক্ষোভ আর বিক্রমের ওপর থাকা প্রতিহিংসার আগুনটা এখন আর নির্দিষ্ট কোনো গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই। সেইটা এবার চেনা-অচেনা সবার ওপর ছড়িয়ে পড়ছে, ওর কেবল মনে হচ্ছে সবাই মিলে ওর উপর অবিচার করেছে। ও এখন গোটা পৃথিবীটাকেই নিজের প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখতে শুরু করেছে। অঙ্ক শেখার জন্য ওর মোটেও কোথাও যাবার ইচ্ছে নেই। ওর এখন নিজের ঘরে থাকতেই ভাল লাগে।

কিন্তু, আজ সন্ধ্যাবেলা ওকে আবার সেই দোজোতে যেতেই হবে।

সন্ধ্যা আটটা। প্রধান মার্শাল আর্টস অ্যাকাডেমি।

দোজো-র ভেতরে এই মুহূর্তে সম্পূর্ণ নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে। এখানে পা রাখার পর থেকেই দোজোর এই জমাট বাঁধা নৈঃশব্দ্যের সাথে অয়নের মাথার ভেতর টগবগ করে ফুটতে থাকা লাভার এক নিরন্তর যুদ্ধ চলছে।

সে ভেবেছিল এখানে ভর্তি হয়ে কোন স্পারিং পার্টনারকে হাতের মুঠোয় পেয়ে নিজের ভেতরের জমে থাকা সমস্ত বিষ, রাগ আর আক্রোশ তার উপর উগরে দেবে। তার ফুটন্ত স্নায়ুগুলো এখন কেবল হাতাহাতি আর লড়াই চায়। তার এই রক্তের স্বাদের পেছনে এতটা মরিয়া হয়ে ওঠার পেছনে অবশ্য একটা বড় কারণ আছে। তার রাগ উগরে দেওয়ার যে একমাত্র জায়গা, অর্থাৎ ফুটবল মাঠ, সেখান থেকেও তাকে সাময়িকভাবে ছেঁটে ফেলা হয়েছে।

গতকাল থেকেই কোচ সেনগুপ্ত অয়নকে দিয়ে প্র্যাকটিসের পুরো সময়টা মাঠের চক্কর কাটাচ্ছেন। অয়নের আচরণে তার মতো মানুষের ধৈর্য্যের বাঁধও শেষমেশ ভেঙে গিয়েছে। 

গতকাল প্র্যাকটিস ম্যাচের মাঝপথে অয়ন সম্পূর্ণ হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিল। বল কেড়ে নেওয়ার লড়াইয়ে সে বিপক্ষের ডিফেন্ডার সুমিতের ওপর যেভাবে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, তাকে কোনোভাবেই 'ফুটবল' খেলার অঙ্গ বলা চলে না।

সুমিত যখন বলটা ক্লিয়ার করতে যাচ্ছিল, অয়ন কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করে সরাসরি সুমিতের গোড়ালি লক্ষ্য করে একটা স্লাইডিং ট্যাকল করে। 
 
সঙ্গে সঙ্গেই সে আর্তনাদ করে কাটা কলাগাছের মতো মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। যন্ত্রণায় ছটফট করতে থাকা সুমিতকে তাড়াতাড়ি স্ট্রেচারে করে মাঠের বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়। আজ মেডিক্যাল রিপোর্ট এসেছে, প্রাথমিক পরীক্ষার পরে ডাক্তার তাকে একমাসের জন্য মাঠের বাইরে থাকতে বলেছেন। 

কোচ সেনগুপ্তর ধৈর্য্যের বাঁধ সেই মুহুর্তেই ভেঙে যায়। যাকে ঘিরে তিনি কলেজের ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়নশিপ জয়ের স্বপ্ন বুনেছিলেন সে ক্রমশ টিমের 'অ্যাসেট' থেকে একটা মারাত্মক লায়াবিলিটিতে পরিণত হয়ে উঠছে। 

এভাবে চলতে থাকলে তো টুর্নামেন্ট শুরু হবার আগেই অর্ধেক টিম হাসপাতালের পথ ধরবে। তখন প্রিন্সিপালকে কী জবাব দেবেন তিনি ?

অনেক হয়েছে, আর না।

দলের স্বার্থে তিনি একটা কঠোর সিদ্ধান্ত নিলেন। আগামী এক সপ্তাহ অয়ন শুধু মাঠের চক্কর কাটবে। নো প্র্যাকটিস। 

নিজের সেরা অস্ত্রকে এভাবে মাঠের বাইরে পাঠাতে তার খারাপ লাগছিল ঠিকই।

Continued...
[+] 5 users Like RockyKabir's post
Like Reply
কিন্তু, এছাড়া এই মুহূর্তে তার কাছে আর কোন উপায় নেই।

অয়ন কোচ সেনগুপ্তের মনের গহীনে লুকিয়ে থাকা উদ্বেগটুকু টের পায়নি। সে কোচের এই সিদ্ধান্তকে এক অমানবিক শাস্তি হিসেবে দেখছে।

ফুটবল মাঠটা ছিল একমাত্র জায়গা যেখানে মনের বিষ উগরে দিয়ে অয়ন অল্প কিছু সময়ের জন্য হালকা হতে পারত। এর আগেও সে মাঠের খেলায় প্রতিপক্ষকে তছনছ করে তার মায়ের থেকে পাওয়া অপমানের বদলা তুলেছে। 

তাকে স্রেফ মাঠের চক্কর কাটাতে বাধ্য করা মানে, তার যন্ত্রণা বের করে দেবার মুখটা জোর করে বন্ধ করে দেওয়া। অয়নের মনে হচ্ছিল সবাই ইচ্ছে করে তাকে কোণঠাসা করে ফেলছে।

সে একবারও বুঝতে পারছিল না যে তার অনিয়ন্ত্রিত ক্ষোভ আর হিতাহিত জ্ঞানশূন্য মারমুখী আচরণের ঠেলায় তার নিজের সতীর্থরা কতটা অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। 

এক সময় যারা তাকে ঘিরে আনন্দ করত, আজ তারা অয়নকে মাঠের মাঝখানে দেখলে আতঙ্কিত হয়। 

অয়ন তাদের চোখের সেই বিরক্তি আর ভয় দেখতে পায় না, কারণ তার নিজের ভেতরের দহন এখন এতটাই তীব্র যে বাইরের পৃথিবীর কোনো সংকেত তার মস্তিষ্কে পৌঁছায় না।

অন্যদিকে, দোজোর পরিবেশটা যেন কাটা ঘায়ে নুনের ছিটের মতো কাজ করছিল। গত এক সপ্তাহ ধরে মিস্টার প্রধান তাকে দিয়ে কেবল ফ্লোরে বসে মেডিটেশন করিয়েছেন আর শ্বাস-প্রশ্বাসের অদ্ভুত সব কসরত শিখিয়েছেন।

এই স্থিরতা অয়নের কাছে অসহ্য। বাইরের এই কৃত্রিম প্রশান্তি আদতে তার মনের ভেতরের অশান্তিটাকে আরও কয়েক গুণ বাড়িয়ে তোলে।

চোখ বন্ধ করলেই সে নিজেকে এক বিভীষিকার মুখোমুখি দেখতে পায়। 

যখনই সে দু চোখের পাতা এক করে মনকে শান্ত করার চেষ্টা করে, অমনি অন্ধকারের বুক চিরে ফেস্টের রাতের সেই অভিশপ্ত স্মৃতিগুলো তীরের মতো ছুটে আসে।

সে স্পষ্ট দেখতে পায় তার মায়ের সেই অগ্নিশর্মা রূপ। সবার সামনে সেই প্রচণ্ড চড়ের শব্দটা এখনো তার কানে প্রতিধ্বনিত হয়। মায়ের চোখে তার প্রতি সেই ঘৃণা আর লম্পট বিক্রমের প্রতি দিনের পর দিন তার সেই অদ্ভুত প্রশ্রয়, এই বৈপরীত্যের স্মৃতিগুলো তাকে পাগল করে তোলে। বিক্রমের সেই জয়ী হাসিটা অন্ধকারের মাঝে ধকধক করে জ্বলতে থাকে। অয়ন যতবার শান্ত হওয়ার চেষ্টা করে, ততবার...ওর আসলে বিক্রমকে চাই... 

কিন্তু যতক্ষণ না বিক্রম মিলছে ততক্ষণ কাউকে না কাউকে তার হাতের সামনে চাই। 

চোখ বন্ধ করে সে কার সাথে লড়বে ?

"ব্রিদ ইন... হোল্ড... ব্রিদ আউট", মিস্টার প্রধানের ভরাট গলাতে নিস্তব্ধ হলঘরটা গমগম করছে।

কিন্তু, অয়নের বুকের ভেতরটা রাগে জ্বলছে। এই কৃত্রিমতা তার অসহ্য লাগছে আর নেওয়া যাচ্ছে না।

অয়ন হঠাৎ চোখ খুলে ফেলল। ওর চোখের মণি দুটো রাগে আর উত্তেজনায় কাঁপছে, তার শ্বাস-প্রশ্বাস অত্যন্ত দ্রুত আর অগোছালো।

"আমি এখানে এগুলো করতে আসিনি!" অয়ন দাঁতে দাঁত চেপে, চাপা গলায় বলে উঠল। দোজোর নিস্তব্ধ পরিবেশে সেটা গর্জনের মতো শোনাল।

মিস্টার প্রধান তার ঠিক সামনেই বসে ছিলেন। তিনি অত্যন্ত ধীরগতিতে চোখ খুললেন। তার ইস্পাত-শীতল স্থির দৃষ্টি অয়নের চোখের ওপর স্থির হলো। সেই দৃষ্টিতে কোন রাগ নেই বরং করুণা মেশানো গভীরতা আছে।

"তাহলে, তুমি এখানে ঠিক কী করতে এসেছ, অয়ন?" মিস্টার প্রধানের কণ্ঠস্বর শান্ত হলেও তাতে কর্তৃত্বের সুর মেশানো।

"ফাইট! আমি ফাইট করতে চাই!" অয়ন প্রায় চিৎকার করে উঠল।

"আমি কোন সাধু-সন্ন্যাসী নই। আমি এখানে বসে বসে এই দম নেওয়ার নাটক করতে পারব না! আমার হাত-পা নিশপিশ করছে। আমায় লড়তে দিন।"

অন্য স্টুডেন্ট, যারা আশেপাশে প্র্যাকটিস করছিল তারা এক মুহূর্তের জন্য থমকে আড়চোখে ওর দিকে তাকাল। তাদের চোখে বিস্ময়। 

কিন্তু, মিস্টার প্রধানের একটা সূক্ষ্ম ইশারায় তারা আবার নিজেদের প্র্যাকটিসে ফিরে গেল।

মিস্টার প্রধান ধীরলয়ে উঠে দাঁড়ালেন। তিনি অয়নের দিকে সরাসরি তাকিয়ে একটা শান্ত হাসি ছুঁড়ে দিলেন। হাসিতে মেশানো তাচ্ছিল্যটা ধরতে অয়নের অসুবিধা হল না। ওর মনে হল যেন ওর কাটা ঘায়ে নুনের ছিটে পড়ল।

"ফাইট করবে? রক্ত ঝরাবে ?" মিস্টার প্রধানের গলায় হঠাৎই গাম্ভীর্যের সুর। 

"ঠিক আছে। আজ তুমি একটা ফাইট-ই করবে।"

অয়ন হকচকিয়ে গিয়ে মিস্টার প্রধানের দিকে তাকাল। হঠাৎ করে এই ডিসিশন? সে ভাবেনি মিস্টার প্রধান এত সহজে রাজি হয়ে যাবেন।

ওর ভেতরে উত্তেজনা আর জেদ দানা বাঁধল। ও ভাবল, এবার নিজের হাতের জোর প্রমাণ করার সময় এসেছে। ও দেখাবে, ও কেবল ফুটবল মাঠের রাজা নয়, মার্শাল আর্টেও ও অপরাজেয়।

মিস্টার প্রধান হাত তুলে দোজো-র এক কোণে অনুশীলনে মগ্ন এক কিশোরকে ডাকলেন। 

"আয়ুষ, এদিকে এসো।"

ছেলেটা দ্রুতপদে দৌড়ে এল। বয়স মেরেকেটে পনেরো কী ষোলো হবে। তামাটে গায়ের রঙ, রোগা, ছিপছিপে চেহারা। চোখেমুখে শান্ত, নিষ্পাপ ভাব। কোমরে একটা ব্লু বেল্ট।

"অয়ন, এ হলো আয়ুষ। আজ তুমি ওর সাথে স্পারিং করবে", মিস্টার প্রধান অত্যন্ত স্বাভাবিক গলায় বললেন।

অয়ন একবার আয়ুষের দিকে তাকাল, তারপর মিস্টার প্রধানের দিকে ফিরে একটা ব্যঙ্গাত্মক হাসি ছুঁড়ে দিল। ঠিক যেমনটা একটু আগে উনি ওর দিকে ছুঁড়ে দিয়েছিলেন।

"আপনি আমার সাথে জোক করছেন? আমি এই বাচ্চাটার সাথে লড়ব? আমি ওর গায়ে হাত তুললে ওর হাড়গোড় ভেঙে যাবে।" 

"তোমার ইগোটা তোমার স্কিলের চেয়ে অনেক বেশি বড়, অয়ন", মিস্টার প্রধানের শান্ত দৃষ্টি একচুলও নড়ল না। 

"লড়াই শুরু করো। তবে একটা শর্ত - তুমি ওকে নকডাউন করার চেষ্টা করবে আর ও শুধু নিজেকে ডিফেন্ড করবে।"

অয়নের মনে হল মিঃ প্রধান বোধহয় পাগল হয়ে গিয়েছেন। সে একটা তাচ্ছিল্যের নিঃশ্বাস ফেলে ম্যাটের ওপর উঠে দাঁড়াল। শরীরটা একটু টানটান করে সে আয়ুষের দিকে তাকিয়ে বলল, "সরি, আমি আজ খুব খারাপ মুডে আছি। ব্যথা পেলে কিন্তু পরে আমায় দোষ দিও না।"

আয়ুষ কোন উত্তর দিল না। সে কোনো কথা না বলে, মাথা সামান্য ঝুঁকিয়ে সম্মান জানিয়ে এক পা পিছিয়ে ফাইট পজিশন নিল। ওর বডি ল্যাঙ্গুয়েজ একদম রিল্যাক্সড, অবিশ্বাস্য রকমের স্থিতধী, যেন গভীর সরোবরের অচল, নিস্তরঙ্গ জল। ওর চোখদুটো অয়নের বুকে স্থির।

"হাজিমে! (শুরু করো)" মিস্টার প্রধান নির্দেশ দিলেন।

নির্দেশ পাওয়া মাত্রই অয়ন একটা ক্ষ্যাপা ষাঁড়ের মতো উন্মত্তভাবে আয়ুষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। ওর মাথার ভেতর তখন রক্ত ফুটছে। সে তার গায়ের সমস্ত জোর দিয়ে আয়ুষের মুখ তাক করে একটা ভয়ংকর ঘুঁষি ছুঁড়ল। এই ঘুঁষিটা লাগলে বাচ্চা ছেলেটার চোয়াল ভেঙে যাওয়ার কথা।

কিন্তু আয়ুষ একটুও ঘাবড়াল না, এমনকী সে একটুও পিছু হটল না। সে ঘুঁষিটা ব্লক করার কোন চেষ্টাই করল না, বরং অত্যন্ত সাবলীলভাবে, একটা জলের স্রোত যেভাবে বড় বোল্ডার পাথরকে এড়িয়ে যায়, সেভাবেই সে নিজের শরীরটাকে একটু ডানদিকে সরিয়ে নিল।

অয়নের ঘুঁষিটা শূন্যে আঘাত করল। তার নিজের প্রচন্ড গতি আর নিয়ন্ত্রণহীন রাগের কারণে তৈরি হওয়া সেই 'মোমেন্টাম'-র জন্য সে টাল সামলাতে পারল না, তার শরীরটা ভারসাম্য হারিয়ে সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ল।

ঠিক সেই সুযোগে, সেকেন্ডের ভগ্নাংশের মধ্যে আয়ুষ তার বাঁ পা-টা অয়নের ডান পায়ের গোড়ালির পেছনে হুক করল আর নিজের ডান হাত দিয়ে অয়নের শার্টের কলার ধরে তার রাগের মোমেন্টামটাকেই তার বিরুদ্ধে ব্যবহার করে একটা নিখুঁত আইকিডো থ্রো করল।

অয়ন কিছু বুঝে ওঠার আগেই দেখল তার পা দুটো মাটি ছেড়ে শূন্যে উঠে গেছে।

ধড়াস!

অয়ন সজোরে পিঠের ওপর ম্যাটে আছড়ে পড়ল। সজোরে পড়ার অভিঘাতে তার ফুসফুস থেকে সমস্ত বাতাস এক ধাক্কায় বেরিয়ে গেল। লজ্জায় আর অপমানে তার গোটা শরীরটা কুঁকড়ে গেল।

শুরু হবার এক মিনিটের মধ্যেই ফাইট শেষ। অয়ন এখন মাটির ওপর পড়ে হাঁপাচ্ছে আর আয়ুষ আগের মতোই শান্ত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে।

পুরো দোজোতে পিন-ড্রপ সাইলেন্স। একটা পনেরো বছরের রোগা ছেলে, উনিশ বছরের একটা অ্যাথলিটকে জাস্ট কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে তুলে মাটিতে ফেলে দিয়েছে! অবিশ্বাস্য!

অয়ন ম্যাটের ওপর শুয়ে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে আছে, তার হাতে-পায়ে কোন জোর নেই।তার মাথার ভেতরটা এখন ফাঁকা হয়ে গেছে, এক মুহূর্ত আগের সেই রাগটা আর নেই।

মিস্টার প্রধান ধীর পায়ে হেঁটে এসে অয়নের ঠিক মাথার কাছে দাঁড়ালেন। তিনি ওপর থেকে অয়নের চোখের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত গম্ভীর গলায় বললেন -

"রাগ হলো হাতল ছাড়া তলোয়ারের মতো, অয়ন। শত্রুকে কাটার আগে সেটা নিজের হাতটাই রক্তাক্ত করে দেয়। তুমি তোমার রাগের দাস হয়ে আছ। যতদিন না তুমি তোমার এই রাগটাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছ, ততদিন তুমি এই পনেরো বছরের ছেলেটার কাছে বারবার হারবে আর ফুটবল মাঠেও রেড কার্ড খেয়ে বেরিয়ে আসবে।"

অয়ন সেই অবস্থাতেই ফ্লোরে শুয়ে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে রইল। তার চোখদুটো জ্বালা করছে, চারপাশ ঝাপসা হয়ে আসছে। 

তার জীবনটা আর কত নিচে নামবে?

তার মা তাকে সবার সামনে কুকুরের মতো দূর দূর করে তাড়িয়ে দিয়েছে, বন্ধুরা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। ফুটবল মাঠে সে এখন ব্রাত্য, তার বল ছোঁয়া বারণ। আর আজ, এখানে সবার সামনে একটা বাচ্চা ছেলে ওকে জাস্ট এক সেকেন্ডে মাটিতে শুইয়ে দিল !

তার না আছে কোনো আশ্রয় আর না আছে তার হাত ধরার জন্য কোন বিশ্বস্ত মানুষ। 

একটা চরম শূন্যতা, একটা ঘুটঘুটে অন্ধকার তার মনকে গ্রাস করতে শুরু করল। অয়ন খুব একা বোধ করতে লাগল। তার মনে হলো সে যেন মাঝ সমুদ্রে তলিয়ে যাচ্ছে, যেখানে প্রতিটি নিশ্বাসের বদলে ওর ফুসফুসের ভেতর কেবল কালো জল ঢুকে পড়ছে। সে ডুবে যাচ্ছে।

তাকে টেনে তোলার মতো কেউ নেই।

কিন্তু ঠিক সেই গভীর অন্ধকারে, ডুবে যাওয়ার এই মুহূর্তে হঠাৎ করে বিদ্যুত ঝলকের মতো অয়নের চোখের সামনে একটা মুখ ভেসে উঠল।

বিক্রম মালহোত্রা।

ফেস্টের রাতে ওর রক্তে মাখামাখি ফাটা ঠোঁটের কোণে ঝুলে থাকা শয়তানি হাসিটা আবার অয়নের চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে উঠল। বিক্রম যেন ওকে বিদ্রুপ করছে, সে যেন ওর এই অসহায়তা উপভোগ করছে।

না !

সে এভাবে হার মানবে না। ওই জানোয়ারের বাচ্চাটা ওর সাজানো জীবন ছারখার করে দিয়েছে। আর ওর থেকে প্রতিশোধ নেবার বদলে আজ ও এখানে মাটিতে পড়ে শুয়ে শুয়ে কাঁদছে। 

ওর নিয়তিতে তবে কী শেষপর্যন্ত এই গ্লানিই লেখা আছে ? অসম্ভব !

অয়ন ম্যাটের ওপর কাঁপা কাঁপা দুই হাত রেখে, দাঁতে দাঁত চেপে এক অবিশ্বাস্য জেদে ভর করে শরীরটাকে টেনে তুলল। ধীরে ধীরে উঠে বসল সে। তারপর সে সরাসরি মিস্টার প্রধানের চোখের দিকে তাকাল। 

সেখানে তখন যন্ত্রণার লেশমাত্র নেই, বরং ধিকধিক করে প্রতিহিংসার আগুন জ্বলছে। ওর চোখে প্রতিহিংসার সেই লেলিহান শিখা দেখে মিঃ প্রধান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। 

ছেলেটা আজকের অভিজ্ঞতা থেকে কোন শিক্ষাই নেয়নি।
Like Reply
Osadaron
Like Reply
Darun darun khub bhalo... Chalia jan... Dekhkar next update e ki hoi
[+] 1 user Likes Slayer@@'s post
Like Reply
Sera sera lagche.... Aste aste bujte parche sob chokranto gulo... Sera thriller... But romance ta nai akdom.... Jai hok asa korbo aste aste asbe....
[+] 1 user Likes BiratKj's post
Like Reply
(27-04-2026, 09:29 AM)Slayer@@ Wrote: Darun darun khub bhalo... Chalia jan... Dekhkar next update e ki hoi

উৎসাহ, সঙ্গে লাইক আর রেপু দেবার জন্য অশেষ ধন্যবাদ। আশা করি পরের চ্যাপ্টারটাও আপনার ভাল লাগবে।
Like Reply
(27-04-2026, 02:27 PM)BiratKj Wrote: Sera sera lagche.... Aste aste bujte parche sob chokranto gulo... Sera thriller... But romance ta nai akdom.... Jai hok asa korbo aste aste asbe....

হ্যাঁ, ঠিকই বলেছেন। এটা আপাতত থ্রিলার, রোমান্স খুব একটা নেই। এখন গল্প যেদিকে এগোচ্ছে এটাই মেইন থিম থাকবে। আশা করি পরের চ্যাপ্টারটাও ভাল লাগবে। লাইক আর রেপুর জন্য অনেক ধন্যবাদ।
[+] 3 users Like RockyKabir's post
Like Reply




Users browsing this thread: 4 Guest(s)