20-04-2026, 01:25 AM
Niber Chaudhary Wrote:অসাধারণ আপডেট![]()
লেখক এর কাছে একটাই অনুরোধ
গল্পটা যেন শেষ হয়।
অসমাপ্ত যেন হারিয়ে না যায়
হারিয়ে গেলে আমি আছি যদি বলেন সুন্দর করে লিখতে পরাবো। ধন্যবাদ
|
Adultery জুলাই আন্দোলন
|
|
20-04-2026, 01:25 AM
Niber Chaudhary Wrote:অসাধারণ আপডেট হারিয়ে গেলে আমি আছি যদি বলেন সুন্দর করে লিখতে পরাবো। ধন্যবাদ
20-04-2026, 04:18 PM
যেহেতু এই লেখকের সব লেখাই একই ধাঁচের, তাই পাঠক/পাঠিকা ওঁর লেখা পড়ার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে। তাই আর না লেখাই ভালো। সম্মানিত পাঠক/পাঠিকা গণ এখন বৈচিত্র্য খোঁজেন। কাহাতক আর এক জিনিস ভালো লাগে!!
20-04-2026, 05:02 PM
(20-04-2026, 04:18 PM)Mohomoy Wrote: যেহেতু এই লেখকের সব লেখাই একই ধাঁচের, তাই পাঠক/পাঠিকা ওঁর লেখা পড়ার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে। তাই আর না লেখাই ভালো। সম্মানিত পাঠক/পাঠিকা গণ এখন বৈচিত্র্য খোঁজেন। কাহাতক আর এক জিনিস ভালো লাগে!! বেশ্যা মাগীর ছেলে ধনে জোড় থাকলে নিজে লেখ নাহলে নিজের পুটকি নিজে মার। তাও যারা নিয়মিত গল্প লেখে তাদের গল্পে পুটকিমারা দিতে যাস না
20-04-2026, 06:56 PM
Vai update diyen etar...
Eta onk valo golpo
20-04-2026, 06:57 PM
Plz etar update diyen
..
20-04-2026, 09:06 PM
কাকের বাসায় কোকিল বাচ্চা
Bhai atar update dita hobe pls
20-04-2026, 10:05 PM
Pls update, waiting
21-04-2026, 08:54 PM
Plz update
Apni onek ta heney er moto golpo lekhen
22-04-2026, 12:15 AM
Update
22-04-2026, 01:24 AM
গুরু আপেক্ষায় আছি
22-04-2026, 11:22 AM
পর্ব ১০: নোংরা রাজনীতি
সকাল সাড়ে দশটার দিকে মকবুল তার নতুন ভাড়া করা চেম্বারে বসে ছিল। সামনের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সে এই ছোট্ট অফিসটা নিয়েছে। ঘরের ভেতর কয়েকটা চেয়ার, একটা টেবিল আর দেওয়ালে তার বড় পোস্টার ঝুলছে। বাইরে চার-পাঁচজন সাঙ্গোপাঙ্গ বসে আছে — তাদের কাজই হলো মকবুলের হয়ে এলাকায় টহল দেওয়া, লোকজনকে ভয় দেখানো আর ভোটের আগে “কাজ” করে দেওয়া। মকবুল চেয়ারে হেলান দিয়ে সিগারেট টানছিল। তার মাথায় এখন চৈতির চিন্তা। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল, কলেজে চৈতির আসার সময় হয়ে গেছে। চেম্বারে আর মন টিকছিল না। সে হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে সাঙ্গোপাঙ্গদের বলল, “শোন, তোরা আজ মোটরসাইকেল নিয়ে এলাকায় টহল দে। আমার শরীরটা খুব খারাপ লাগছে। আমি বাড়ি যাব।” একজন তাড়াতাড়ি বলে উঠল, “জ্বী বস, আপনি চিন্তা করবেন না। আমরা সব দেখে রাখব।” আরেকজন উঠে বলল, “বস, আমি আপনাকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে আসি।” মকবুলের মনে হাসি পেল। সে তো বাড়ি যাবে না, যাবে চৈতিকে দেখতে। কিন্তু এই খবর যদি লিক হয়ে যায় যে বিএনপির নেতা হয়ে সে অল্পবয়সী মহিলাদের পেছনে ঘুরছে, তাহলে পার্টি তাকে বহিষ্কার করতে পারে। তাই সে হাত নেড়ে বলল, “না না, তোরা যা। আমি শো-ডাউন দিয়ে যাব। নিজেই চলে যাব।” মকবুল তার হোন্ডা মোটরসাইকেল চালু করে বের হয়ে পড়ল। সে চলে যাওয়ার পর চেম্বারের বাইরে বসা এক সাঙ্গোপাঙ্গ অন্যজনকে ফিসফিস করে বলল, “সালা মাদারচোদ… নিজে আরামে থাকবে, আর আমাদের খাটিয়ে মারবে।” আরেকজন হেসে বলল, “যাক গে, যা বলছে করি। নির্বাচনের সময় তো টাকা-পয়সা পাব।” মকবুল কলেজের কাছাকাছি একটা গাছের ছায়ায় হোন্ডা থামিয়ে অপেক্ষা করতে লাগল। তার চোখ কলেজ গেটের দিকে স্থির। কিছুক্ষণ পর একটা রিকশা এগিয়ে আসতে দেখল। রিকশায় চৈতি। মকবুলের মুখে হাসি ফুটে উঠল। কিন্তু পরমুহূর্তেই তার হাসি মিলিয়ে গেল। রিকশায় চৈতির পাশে বসে আছে লোকনাথ। ঝুমু তার কোলে। মকবুলের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। তার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। সে আশা করেছিল চৈতি একা আসবে। কিন্তু লোকনাথের উপস্থিতি তার সব পরিকল্পনা নষ্ট করে দিল। মকবুল হোন্ডার হ্যান্ডেল চেপে ধরল। তার মনে হচ্ছিল — এই লোকনাথটা আবার কী করছে? কেন সে চৈতির সাথে ঘুরছে? নাকি চৈতি নিজেই লোকনাথকে সাথে নিয়ে আসছে? সে রাগে দাঁতে দাঁত চেপে বসে রইল। রিকশাটা কলেজ গেটের সামনে থামতেই মকবুল আরও গভীর ছায়ায় সরে গেল, যাতে কেউ তাকে না দেখতে পায়। কিন্তু তার চোখ দুটো রিকশা থেকে নামতে থাকা চৈতি আর লোকনাথের দিকে স্থির হয়ে ছিল। রিকশা থেকে নামার পরপরই মকবুল হোন্ডা থেকে নেমে হাসিমুখে এগিয়ে এল। “আরে আপা! আপনি এসেছেন? আমি তো এখান দিয়েই যাচ্ছিলাম।” লোকনাথ ও চৈতি কেউই কোনো উত্তর দিল না। চৈতি চুপ করে ঝুমুর হাত ধরে দাঁড়িয়ে রইল। লোকনাথের মুখ শক্ত। মকবুল ঝুমুর দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে বলল, “মামনি, তুমি কেমন আছো?” ঝুমু সরলভাবে বলল, “খুব ভালো। আপনি কেমন আছেন?” “এই তো, অনেক ভালো!” মকবুল হেসে বলল, “তুমি কি কিছু খাবে? আসো, তোমাকে চকলেট কিনে দিই।” সে হাত তুলে একটা দোকানদারকে ডাকতে যাচ্ছিল, কিন্তু চৈতি তাড়াতাড়ি বলে উঠল, “না কাকা, লাগবে না।” ‘কাকা’ শব্দটা শুনে মকবুলের মুখটা হঠাৎ করেই হতাশায় ভরে গেল। তার হাসি মিলিয়ে গেল। সে একটু জোর করে হাসার চেষ্টা করে বলল, “আরে কী যে বলো ! আমাকে কাকা ডেকো না। আমার বয়স তো…” চৈতি তাকে কথা শেষ করতে না দিয়ে ঝুমুর দিকে তাকিয়ে বলল, “চল মা, এবার ক্লাসে যাবি। দেরি হয়ে যাবে।” লোকনাথ চৈতি যাবার সময়," ভাবী আমি এখানে দাঁড়িয়ে আছি, এখানে আসবেন। একসাথে যাব।" কিন্তু চৈতি পাত্তা দিল না। কিন্তু লোকনাথ একটা ভাব ধরল যে চৈতি লোকনাথের কত কাছে। চৈতি ঝুমুর হাত ধরে দ্রুত কলেজের ভেতরে চলে গেল। মকবুল কিছু বলার সুযোগই পেল না। চৈতি চলে যাওয়ার পর মকবুলের মুখের হাসি পুরোপুরি মিলিয়ে গেল। সে মনে মনে গর্জে উঠল, “কথা বলার সুযোগ তো দিবি সালী… যখন তোকে চুদব, তখন বুঝিয়ে দিব কে কাকা আর কে লাং।” মকবুল এবার লোকনাথের দিকে ঘুরল। তার চোখে রাগ ঝলসে উঠল। সে এক পা এগিয়ে লোকনাথের কলার চেপে ধরল। “এই সালা! তুই এখানে কেন এসেছিস?” লোকনাথ শান্ত কিন্তু দৃঢ় গলায় বলল, “ভাই, আমার দোষ নেই। ভাবী বললেন, আপনি নাকি তাকে বিরক্ত করেন। তাই আমাকে সাথে নিয়ে এসেছে।” মকবুল হতাশ হয়ে লোকনাথের কলার ছেড়ে দিল। সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “আরে আমি… আমি ওকে কেন বিরক্ত করব? আমি তো ওকে ভালোবাসি রে।” দুজনেই কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। বাতাসে একটা অস্বস্তিকর নীরবতা ঘুরে বেড়াচ্ছিল। অবশেষে মকবুল নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, “না… এভাবে হয় না। একটা নারীর জন্য পুরো ক্যারিয়ার ধ্বংস করা যাবে না।” লোকনাথের বুক থেকে একটা ভার নেমে গেল। সে মনে মনে ভাবল — হয়তো মকবুল এখন চৈতিকে আর বিরক্ত করবে না। কিন্তু মকবুলের চোখে যে ঠান্ডা, হিসাবি দৃষ্টি ফুটে উঠেছিল, সেটা লোকনাথ দেখতে পায়নি।
22-04-2026, 11:24 AM
পর্ব ১১: পরিকল্পনা
রাত আটটা বেজে গেছে। মকবুল তার বাড়ির বারান্দায় একটা পুরনো চেয়ারে দুলছিল। এক হাতে জ্বলন্ত বিড়ি, অন্য হাতে চায়ের কাপ। তার চোখের সামনে বারবার ভেসে উঠছিল শুধু একটাই মুখ — চৈতি। চৈতির নরম গাল, পুরু ঠোঁট, লজ্জায় লাল হয়ে ওঠা মুখ, আর সেই পাতলা ওড়নার নিচে যে আকৃতি দেখা গিয়েছিল — সবকিছু তার মাথার ভেতর ঘুরপাক খাচ্ছিল। প্রতি মুহূর্তে তার শরীরে একটা অসহ্য জ্বালা অনুভব করছিল। চৈতির সঙ্গ পাওয়ার জন্য সে এখন মরিয়া হয়ে উঠেছে। হঠাৎ বাইরের গেটে কলিংবেল বেজে উঠল। মকবুলের ঠোঁটে একটা চাপা হাসি ফুটে উঠল। যেন এই আওয়াজেরই অপেক্ষা করছিল সে। কুলসুম বেগম গেট খুলে দিয়ে অবাক হয়ে বলল, “আরে আপনারা! আসুন আসুন।” সে ভেতরে এসে চিৎকার করে ডাকল, “শুনছো? কবির ভাই আর কলেজের হেডমাস্টার এসেছে!” মকবুল চেয়ার থেকে উঠে পড়ল। “আরে আসতে দাও, আসতে দাও।” কবির মিয়া এই পৌরসভার সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি, কলেজ কমিটির সভাপতি এবং চৈতির বান্ধবী মিরার বাবা। তার সাথে কলেজের হেডমাস্টারও এসেছে। তিনজন বসার পর প্রথমে কলেজের অবস্থা, ছাত্রছাত্রী, শিক্ষকদের নিয়ে সাধারণ কথাবার্তা শুরু হলো। কুলসুম বেগম তাদের জন্য চা নিয়ে এল। কবির মিয়াকে চিনি ছাড়া চা দিল, আর হেডমাস্টার ও মকবুলকে চিনি দিয়ে। “ভাই, খেয়ে যাবেন কিন্তু?” কুলসুম হেডমাস্টার ও কবির মিয়াকে বলল। কবির মিয়া হেসে বললেন, “আরে ভাবী, এত কষ্ট করবেন না।” কুলসুম বেগম মিষ্টি করে বলল, “ভাই এর জন্য বোন করবে না ত কার জন্য করবে। মকবুল চুপ করে চা খাচ্ছিল, কিন্তু তার মাথায় অন্য চিন্তা। সে অপেক্ষা করছিল সঠিক সময়ের জন্য। চা শেষ হওয়ার পর সে একটু গলা খাঁকারি দিয়ে বলল, “কবির ভাই, আসলে আজ আপনাদের ডেকেছি একটা গুরুতর বিষয় নিয়ে।” কবির মিয়া ও হেডমাস্টার দুজনেই মকবুলের দিকে তাকালেন। মকবুল চেয়ারে সোজা হয়ে বসে বলল, “কলেজের কিছু সমস্যা নিয়ে কথা বলতে চাই। বিশেষ করে… কয়েকজন অভিভাবকের ব্যাপারে।” তার চোখে একটা চাপা হিসাবি দৃষ্টি খেলে গেল। চৈতির ছবিটা আবার তার মনে ভেসে উঠল। এবার আর শুধু শরীর নয়, একটা পুরো পরিকল্পনা তার মাথায় ঘুরতে শুরু করেছে। কবির একটু বিরক্ত হয়ে,"মকবুল কি বলবা সব খুলে বল। তুমি জানো আমি এই অর্ধেক কথা পছন্দ করি না।" সে আবার একটু চায়ে চুমুক দেয়। তার মুখে একটা গম্ভীর ভাব। সে কবির মিয়া ও হেডমাস্টারের দিকে তাকিয়ে বলল, “কবির ভাই, হেডমাস্টার সাহেব, আসলে আমি আপনাদের ডেকেছি একটা জরুরি বিষয় নিয়ে। অনেক অভিভাবক আমাদের কলেজের পড়ার মান নিয়ে অভিযোগ করছে। বলছে পড়াশোনার মান খুব খারাপ। শুধু তাই নয়, কলেজে কোনো বনভোজন হয় না, কোনো এক্সট্রা কারিকুলার অ্যাকটিভিটি নেই। তাই আমি ভাবছি, এবার কলেজের জন্য একটা বনভোজনের আয়োজন করলে কেমন হয়?” হেডমাস্টার মাথা নেড়ে বললেন, “হ্যাঁ মকবুল ভাই, আমারও এই পরিকল্পনা অনেকদিন ধরে ছিল। কিন্তু টাকার একটা বড় সমস্যা আছে।” মকবুল একটু হেসে বলল, “টাকা আমি কিছু দেব, কিন্তু…” সে ইচ্ছে করে কথা অসম্পূর্ণ রেখে কবির মিয়ার দিকে তাকাল। আসলে তার পুরো অভিনয়টাই ছিল কবির মিয়ার টাকা বের করার জন্য। কারণ কলেজ কমিটির সভাপতি হিসেবে কবির মিয়াকে দিতেই হবে। আর মকবুল ঠিক ই সফল হলো। মকবুলের প্ল্যান ঠিকমতো কাজ করল। কবির মিয়া গম্ভীরভাবে বললেন, “তোমরা যে সিদ্ধান্ত নিয়েছ, এটা খুবই ভালো সিদ্ধান্ত। আমি এই বনভোজনের সম্পূর্ণ খরচটা দেব। তোমরা চিন্তা করো না।” হেডমাস্টার উৎসাহিত হয়ে বলে উঠলেন, “আরে কবির ভাই, আপনি আসলেই বড় মনের মানুষ!” কবির মিয়া হেসে বললেন, “তোমরা একদিনের জন্য কোন জায়গাটা বেস্ট হবে, তার একটা খসড়া খরচ আমাকে পাঠিয়ে দিও।” মকবুলের ভেতরটা ছটফট করে উঠল। যদি শুধু একদিনের পিকনিক হয়, তাহলে তার পুরো পরিকল্পনা নষ্ট হয়ে যাবে। সে তাড়াতাড়ি বলে উঠল, “সব বার তো একদিনের করি। এবার ভাবছি এক রাত থাকার ব্যবস্থা করব। এতে ছেলেমেয়েরা অনেক বেশি আনন্দ পাবে।” কবির মিয়া ভুরু কুঁচকে বললেন, “তা বুঝলাম, কিন্তু এতগুলো পোলাপানকে সেফ রাখতে পারবে তো রাতে?” মকবুল আত্মবিশ্বাসের সাথে বলল, “পোলাপানের সাথে তাদের মা-বাবাকেও নেব। তাহলে তো সবাই সেফ থাকবে।” কবির মিয়া একটু ভেবে বললেন, “যআ ভালো বুঝ কর।” মকবুলের মনটা নেচে উঠল। সে মনে মনে বলল, “এবার চৈতি পালাবে কোথায়? এক রাত… এক রাতেই সব হবে।” এখন সেখানে নিরবতাম, এই মিটিং টা মকবুল যে কারণে রেখেছিল তা সমাধান হয়েছে। চায়ে এক চুমুক দিয়ে কবির মিয়া হেডমাস্টারের দিকে তাকিয়ে বললেন, “আচ্ছা, আমার মেয়ে মিরার ছেলে মিরাজ কেমন পড়াশোনা করছে?” হেডমাস্টার তেল মাখানো গলায় বললেন, “মিরাজ তো পুরো আপনার মতো হয়েছে কবির ভাই। ক্লাসের সবচেয়ে জ্ঞানী ছেলে। ওকে দেখলেই আপনার কথা মনে পড়ে যায়।” কবির মিয়া হেডমাস্টারের তৈলাক্ত প্রশংসা শুনে গর্বে একটা হাসি দিলেন। তার মুখে সন্তুষ্টির ছাপ স্পষ্ট। মকবুল চুপ করে বসে ছিল, কিন্তু তার মাথায় এখন শুধু একটাই চিন্তা — কীভাবে এই বনভোজনকে এক রাতের প্রোগ্রাম করে চৈতিকে ফাঁদে ফেলা যায়।
22-04-2026, 11:38 AM
পর্ব ১২: মিরা ও রাহাত
রাত তখন এগারোটা বেজে গেছে। বাড়ির ড্রয়িং রুমে আলো জ্বলছে। মিরা তার ছেলে মিরাজকে পড়াচ্ছিল। ছোট্ট টেবিলের উপর ইংরেজি বই খোলা। মিরাজ বারবার একই কবিতার লাইন মুখস্থ করার চেষ্টা করছে, কিন্তু কিছুতেই মনে রাখতে পারছে না। '' Baa Baa Black Sheep Baa Baa Black Sheep Baa Baa Black Sheep" “মা… আমি আর পারছি না। ঘুম পাচ্ছে,” মিরাজ ক্লান্ত গলায় বলল। মিরা রেগে গিয়ে বলল, “ঘুমাবে? ঘুমাবে তুমি? এর আগে এই কবিতাটা মুখস্থ করবে। একবারও ঠিকমতো বলতে পারছ না!” মিরাজের চোখে পানি চলে এল। সে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল, “মা… আমার মাথা ব্যথা করছে…” “চুপ! একদম চুপ!” মিরা ধমক দিয়ে বলল। মিরাজের কান্নার আওয়াজ বেড়ে গেল। বেডরুম থেকে তার বাবা রাহাত বের হয়ে এল। তার মুখে বিরক্তির ছাপ স্পষ্ট। “কী করছ মিরা? ছেলেকে এত রাতে এভাবে পড়াচ্ছ কেন? অনেক হয়েছে। ঘুমাতে দাও ওকে,” রাহাত বিরক্ত সুরে বলল। মিরা ঘুরে তার স্বামীর দিকে তাকাল। তার চোখে রাগ আর হতাশা মিশে ছিল। “তুমি কী বুঝবে? ছেলেকে সময় দাও? আমি বুঝি। প্রতিবার কলেজে ওর জন্য আমাকে লজ্জা পেতে হয়। ঝুমুর চেয়ে আমি কি কম দিচ্ছি ওকে? তবুও রেজাল্ট খারাপ হয় কেন? অন্য বাচ্চারা কীভাবে এত ভালো করে?” কথা বলতে বলতে মিরা রাগের মাথায় মিরাজের পিঠে একটা চড় মেরে দিল। “কাল কলেজে গিয়ে ঝুমুর পা ধোয়া পানি এনে খাবি! তাহলে হয়তো তোর মাথায় একটু বুদ্ধি ঢুকবে!” মিরাজ জোরে কেঁদে উঠল। সে তার বাবার দিকে করুণ চোখে তাকিয়ে বলল, “বাবা…” রাহাত ছেলের দিকে তাকাল। তার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। কিন্তু সে কিছু বলতে পারল না। শুধু অসহায়ের মতো দাঁড়িয়ে রইল। সে জানে, মিরা তার চেয়ে অনেক বেশি ধনী পরিবারের মেয়ে। বিয়ের আগে মিরা তাকে সাহায্য করে আর বিয়ে করার পর মিরার বাবা কবির মিয়া তাকে অনেক সাহায্য করেছিলেন। এখনো এই বাড়ি, এই সংসার — সবকিছুর পেছনে কবির মিয়ার অবদান আছে। রাহাত জানে, সে যদি মিরার বিরুদ্ধে কথা বলে, তাহলে তার অবস্থা খারাপ হয়ে যাবে। তাই সে চুপ করে থাকে। মিরা আরও ক্ষেপে গিয়ে বলল, “দেখো, ছেলেকে নষ্ট করার জন্য তুমি কথা বলো না। আমি যা করছি, ঠিকই করছি।” রাহাত শুধু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বেডরুমের দিকে ফিরে গেল। তার পেছনে মিরাজের কান্নার আওয়াজ আরও জোরে বাজতে থাকল। মিরা ছেলের সামনে বসে আবারও কবিতার বই খুলে ধরল। তার চোখে জেদ আর হতাশা মিশে ছিল। সে চায় না তার ছেলে কোনোদিন তার বান্ধবির মেয়ে ঝুমুর চেয়ে কম পাক। মিরা চৈতীকে সব ক্ষেত্রে ভালোবাসলেও এ ক্ষেত্রে হিংসে করে। সে নিজের ছেলেকে তার বান্ধবীর মেয়ের চেয়ে ভালো করতে চায়। বাংলাদেশে এ প্রতিযোগিতা মনে হয় শহর থেকে গ্রাম সব ঘরে ঘরে। কিন্তু এই রাতে, এই ড্রয়িং রুমে — শুধু একটা ছোট ছেলের কান্না আর একজন মায়ের কঠোরতা ছাড়া আর কিছুই ছিল না। রাহাত বিছানায় শুয়ে পড়ল। ঘরের আলো নিভিয়ে দিয়েছে, কিন্তু তার চোখে ঘুম নেই। মিরাজের কান্না আর মিরার রাগী গলা এখনো কানে বাজছে। সে চোখ বন্ধ করতেই অতীতের স্মৃতি ঝড়ের মতো ভেসে উঠল। মিরা ছিল তার কলেজের সবচেয়ে ধনী ও সুন্দরী মেয়ে। রাহাদ কখনোই ভাবে নি, মিরার মত মেয়ে তাকে পছন্দ করবে। মিরা গার্লফ্রেন্ড হিসেবে ছিল অনেক সাপোর্টিভ। রাহাদ পড়াশোনায় ছিল অনেক ভালো, কিন্তু তাকে প্রায় ই অন্য ছেলেরা বিভিন্ন কারণে বিরক্ত করত। মিরা ওই ছেলেদের খুব কঠিন শাস্তি দেয়। যার কারণে রাহাদকে আর কখনো বিরক্ত করার সাহস পায় নি। বিয়ের আগে আসলেই মিরা তাকে যেভাবে ভালোবাসত, সেই দিনগুলো এখন স্বপ্নের মতো লাগে। সেদিনের কথা মনে পড়লে এখনো তার বুক জ্বলে। যেদিন সে কবির মিয়ার কাছে মিরার হাত চাইতে গিয়েছিল, সেদিন কবির মিয়া তাকে অনেক অপমান করেছিলেন। “তোমার কি মনে হয়? তোমার মতো ছোট লোককে আমি আমার মেয়ে তুলে দেব? যে জায়গা থেকে আমার মেয়ের সম্বন্ধ আসছে, তুমি সেই জায়গার চাকর হওয়ার যোগ্যতাও রাখো না!” কথাগুলো এখনো রাহাতের কানে বাজে। কিন্তু মিরা সেদিন তার বাবার সামনে দাঁড়িয়ে চ্যালেঞ্জ করেছিল। “বাবা, একদিন তুমি নিজেই গর্ব করে বলবে — রাহাত আমার মেয়ের জামাই!” সেদিন মিরা রাহাতের হাত ধরে কবির মিয়ার বাড়ি থেকে বের হয়ে গিয়েছিল। আর সেই রাতেই তাদের বিয়ে হয়। বিয়ের পর মিরা তার বান্ধবী চৈতীর পা ধরে কেঁদেছিল। মিরা নিজের স্ট্যাটাস ভুলে যায়। চৈতি তখন তার শ্বশুর কুদ্দুস মিয়াকে বলে রাহাতের জন্য পৌরসভায় একটা সরকারি চাকরির ব্যবস্থা করে দিয়েছিল। মিরাজ যখন জন্ম নিল, কবির মিয়া সব কিছু ভুলে গেলেন। জামাইকে মেনে নিলেন। রাহাত তখন গর্বিত পুরুষ ছিল। রাহাত সব পেয়ে গিয়েছিল, সন্তান, শ্বশুর বাড়ির সাপোর্ট ও একটা সুন্দর ও সাপোর্টিভ বউ। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে সব বদলে গেছে। এখন রাহাত আর গর্বিত পুরুষ নয়। সে এক বিষণ্ণ, অসহায় মানুষ। মিরার চোখে সে এখন শুধু তার বাবার টাকায় বেঁচে থাকা একটা “রক্তের পিণ্ড জন্তু”। মিরার অহংকার প্রতিদিন বেড়েই চলেছে। রাহাত যত চেষ্টা করে দূরত্ব কমাতে, মিরা ততই দূরে সরে যায়। আড়াই মাস আগে শেষবার তারা স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক রেখেছিল। রাহাত তখন মিরার শরীরের কাছে যাওয়ার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু মিরা তাকে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে বলেছিল, “এখন আমার মন নেই।” তারপর থেকে আর কোনোদিন হয়নি। রাহাত চোখ বন্ধ করে শুয়ে রইল। তার বুকের ভেতরটা ভারী হয়ে উঠছিল। একসময় যে মেয়ে তার জন্য বাবার বাড়ি ছেড়ে বের হয়ে এসেছিল, আজ সেই মেয়েই তাকে প্রতিদিন ছোট করে দিচ্ছে তার ই ছেলের সামনে। পাশের ঘর থেকে এখনো মিরাজের ফোঁপানি ভেসে আসছিল। রাহাতের চোখের কোণে অশ্রু জমে উঠল, কিন্তু সে মুছে ফেলল। সে জানে, এই সংসারে তার কোনো অধিকার নেই। শুধু সহ্য করা ছাড়া তার আর কোনো উপায় নেই।
22-04-2026, 11:48 AM
পর্ব ১৩: অভিমান
পরদিন কলেজটা যেন একটা মৌচাক। হেডমাস্টার সাহেব দরজায় দরজায় গিয়ে যখন বনভোজনের ঘোষণা দিলেন, বাচ্চাদের চিৎকারে ক্লাসরুমের জানালার কাচ কেঁপে উঠল। "এই বৃহস্পতিবার পিকনিক। নির্দিষ্ট চাঁদা দিলেই যাওয়া যাবে, আর নিরাপত্তার জন্য বাবা-মাকেও সাথে নেওয়ার অনুমতি মিলেছে। মিরাজ লাফিয়ে উঠল, ঝুমুর চোখ দুটো জ্বলজ্বল করে উঠল। খুশিতে ক্লাসঘর ভরে গেল।" কিন্তু সেই খুশির ঢেউ ঝুমুর জীর্ণ দরজায় এসে মুখ থুবড়ে পড়ল। রাত আটটা। রান্নাঘরের বাতিটা জ্বলছে। মাকড়সা বাসা করে রেখেছে। । চুলার আগুনের আঁচে চৈতির কপাল বিন্দু বিন্দু ঘামে ভিজে গেছে। পেঁয়াজের ঝাঁজে চোখ জ্বলছে, নাকি অন্য কিছুর জ্বালায়—বোঝা যায় না। খুন্তি নেড়ে সে ভাতের মাড় দেখছে। দরজার চৌকাঠ ধরে দাঁড়িয়ে আছে ঝুমু। আঙুল মটকাচ্ছে, জামার কোণা পাকাচ্ছে। কথাটা গলার কাছে এসে বারবার আটকে যাচ্ছে। “মা…” গলাটা কেঁপে গেল ঝুমুর। “কলেজ থেকে পিকনিকে নিয়ে যাবে। সবাই যাচ্ছে।” চৈতি ফিরেও তাকাল না। খুন্তিটা কড়াইয়ে ঠক করে শব্দ করল। “সবাই গেলে তোমাকেও যেতে হবে? পড়ার নামে তো অষ্টরম্ভা। দিন দিন রেজাল্টের যা ছিরি হচ্ছে, ঘরে বসে বইয়ে মুখ গুঁজে থাকো।” মায়ের গলার বরফ-ঠান্ডা সুরটা ঝুমুর বুকের ভেতরটা খালি করে দিল। সে এক পা এগিয়ে মায়ের ভেজা ওড়নার খুঁটটা মুঠো করে ধরল। “তুমি এমন করো কেন মা? মিরাজের মা-ও তো যাবে। আমাকে কেন যেতে দেবে না?” এবার চৈতি ঘুরে দাঁড়াল। চুলার লাল আভা তার চোখেমুখে পড়েছে। ক্লান্তি, বিরক্তি, আর একরাশ চাপা আগুন মিশে আছে সেখানে। হাতের চাকুটা বোর্ডের উপর রেখে সে হিসহিস করে উঠল, “বেয়াদব হয়ে যাচ্ছিস দিন দিন। মুখে মুখে তর্ক করা শিখেছিস? ইদানীং তোর মুখে খালি আজেবাজে কথা। এখন আবার জেদ? এই কলেজটাই আমি বদলে দেব। মানুষ কলেজে যায় পড়ালেখা শিখতে, আর তুই শিখছিস শুধু মর্জি করা!” মায়ের প্রতিটা শব্দ ঝুমুর ছোট্ট বুকের পাঁজরে গিয়ে বিঁধল। তার ঠোঁট কাঁপতে লাগল। পা দাপিয়ে, কান্না চেপে সে চিৎকার করে উঠল, “না! আমি যাব! আমি পিকনিকে যাবই!” ব্যস, এতদিনের জমানো বারুদে যেন আগুন লাগল। চৈতির গলার স্বর সপ্তমে উঠল। “যা! তুই যা! নিজের মুরোদে টাকা জোগাড় করে যেখানে খুশি যা! আমার কাছে একটা ফুটো পয়সাও পাবি না। তোর যা ইচ্ছা কর!” অভিমানে, রাগে অন্ধ হয়ে ঝুমু বলে বসল, “তুমি টাকা দেবে কোত্থেকে? তোমার কাছে টাকা আছে নাকি? আমি লোকনাথ কাকুর কাছ থেকে নিয়ে নেব। কাকু অনেক ভালো। কাকু ঠিকই আমাকে টাকা দেবে।” ‘লোকনাথ’—নামটা শুনেই চৈতির মাথার ভেতরটা দপ করে জ্বলে উঠল। কানের পাশ দিয়ে গরম হলকা বেরিয়ে গেল যেন। লোকটা বাড়ির কাজের লোক, কিন্তু তার চোখের চাহনি, অকারণে আশেপাশে ঘোরাঘুরি—সব মিলিয়ে একটা অস্বস্তি চৈতির শিরদাঁড়া বেয়ে নামে। তার উপর নিজের মেয়ের মুখে এই বিশ্বাস! দাঁত দিয়ে ঠোঁট চেপে সে ফুঁসে উঠল, “তাহলে যা! ওই লোকনাথকেই গিয়ে বাবা ডাক! আমাকে আজ থেকে মা বলে ডাকবি না। ওর কাছেই গিয়ে থাক তুই!” ঝুমু আর সহ্য করতে পারল না। কান্নায় ভেঙে পড়ে চিৎকার করল, “তাও ভালো!” বলেই সে দরজার দিকে ছুটল। ঠিক তখনই পাশের ঘর থেকে রেহানা বেগম বেরিয়ে এলেন। পান চিবোতে চিবোতে এতক্ষণ সবই শুনছিলেন। দরজার কাঠে হেলান দিয়ে একটা ভারী দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। “আহা, কী করছ বউমা? দুধের বাচ্চা, একটু আনন্দ করতে চায়। এই বয়সে ঘুরবে না তো কবে ঘুরবে? কেন ওর সাথে এমন করছো?” চৈতি চুলার দিকে মুখ ঘুরিয়ে নিল। গলার কাছে দলা পাকানো কান্নাটা সে জোর করে চাপা দিল। “মা, ওর যা ইচ্ছা করুক। আমি আর কিছু বলব না। আমি তো এখন ওর চোখের শত্রু!” রেহানা বেগম কাঁপা হাতে ঝুমুকে বুকের কাছে টেনে নিলেন। নাতনির ফুঁপিয়ে ওঠা কান্না তার বুকের পাঁজর ভেঙে দিচ্ছে। স্বামী নিখোঁজ , ছেলে পলাতক—এই ভাঙা সংসারে অভাবের চেয়ে বড় হয়ে উঠেছে এক অদৃশ্য আতঙ্ক, নিরাপত্তাহীনতার কাঁটা। তিনি বোঝেন, বউমা আসলে ঝুমুর উপর রাগ করেনি। সে রাগ করেছে নিজের পোড়া কপালের উপর, এই বন্দী জীবনের উপর। কিন্তু রেহানা বেগম কী করবেন? একদিকে সন্তান-স্বামীর শূন্য জায়গা, অন্যদিকে নাতনির চোখের জল—এই দুইয়ের মাঝে পড়ে এই সন্ধ্যায় তার নিজেকেই পৃথিবীর সবচেয়ে একা মানুষ মনে হচ্ছে। রাতের ডিনার টেবিলে বসে আছে চারজন—লোকনাথ, সীমা, ঝুমু আর রেহানা বেগম। ভাতের ধোঁয়া উঠছে, ডালের বাটি থেকে মশলার গন্ধ ভাসছে, কিন্তু কারও মুখে কথা নেই। টেবিলের মাঝখানে পড়ে থাকা নীরবতা যেন ভাতের চেয়েও ভারী। রেহানা বেগম গলা একটু চড়া করে ডাকলেন, “ও বউমা, খেতে এসো। আর কত রাগ করে থাকবে? এই রাগারাগি আমার আর ভালো লাগে না।” উত্তর এল না। চৈতির বেডরুমের দরজা শক্ত করে আঁটা। ভেতরে সে ঐশীকে ঘুম পাড়ানোর চেষ্টা করছে। ঐশী বিছানায় এপাশ-ওপাশ করে ঠোঁট ফুলিয়ে বলল, “মা, আমি এখন ঘুমাবো না।” চৈতির ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল। “একটা চড় মারব বেয়াদব মেয়ে। ঘুমাবি না কেন? কী, এখন বড় হয়ে গেছিস? এখন আর মাকে লাগে না, না?” তার গলার ঝাঁঝ দেওয়াল ভেদ করে ডাইনিং পর্যন্ত এল। টেবিলে বসা চারজন আরও জমে গেল। সীমা শাড়ির আঁচলটা আঙুলে পেঁচাতে পেঁচাতে নিচু গলায় বলল, “আজ মনে হয় চৈতি ভাবি আসবে না। আমরা খেয়ে নিই?” কেউ উত্তর দিল না। কাঁটাচামচের টুংটাং শব্দটাও আজ অপরাধ মনে হচ্ছে। আরও পাঁচ মিনিট কেটে গেল। চৈতির ঘর থেকে কোনো সাড়া নেই। শেষে ক্ষুধার কাছে হার মেনে সীমা কাঁপা হাতে নিজের প্লেটে ভাত তুলে নিল। নিঃশব্দে একটু ডাল মাখিয়ে মুখে দিল। তার দেখাদেখি ঝুমুও প্লেট টেনে নিল। মাথা নিচু করে ভাত নাড়ছে, কিন্তু খাচ্ছে না। রেহানা বেগম আর লোকনাথ একে অপরের দিকে তাকালেন। তারাও অনিচ্ছায় প্লেটে হাত দিলেন। ঠিক যখন রেহানা আর লোকনাথ প্রথম ন্যালা মুখে তুলতে যাবে—**ক্যাচ** করে একটা শব্দ। চৈতির ঘরের দরজা খুলে গেল। চৈতি দরজায় দাঁড়িয়ে। চোখ দুটো লাল, চুল এলোমেলো, মুখে সারাদিনের ক্লান্তি আর জমাট রাগ। তার চোখ গিয়ে পড়ল একদম লোকনাথের উপর। লোকনাথ তখন ভাতের প্রথম ন্যালাটা মুখের সামনে ধরে আছে। এক সেকেন্ড। দুজনের চোখাচোখি হলো। কোনো কথা নেই, কিন্তু হাজারটা কথা হয়ে গেল সেই দৃষ্টিতে। লোকনাথের হাতটা বাতাসে থেমে গেল। ন্যালাটা আর মুখে উঠল না। প্রায় একই সাথে রেহানা বেগমও নিজের হাতটা নামিয়ে নিলেন। আঙুলের ফাঁক থেকে ভাতের দলাটা টুপ করে প্লেটে পড়ে গেল। লোকনাথ অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়াল। পাশের চেয়ারটা টেনে চৈতির দিকে একটু এগিয়ে দিয়ে বলল, “ভাবী, রাগ করে থাইকেন না। ডিনারটা খেয়ে নেন। না খেলে শরীর অসুস্থ হয়ে যাবে।” চৈতি এবার পানির বোতলটা শক্ত করে চেপে ধরলেন। লোকনাথের দিকে এমনভাবে তাকালেন যেন চোখ দিয়েই ভস্ম করে দেবেন। গলার স্বর হিমের মতো ঠান্ডা। “তুমিই খাও। আর তোমার মেয়েকে খাওয়াও।” ‘তোমার মেয়ে’—শব্দটা ঘরের বাতাসে চাবুকের মতো বাড়ি মারল। ঝুমু চমকে মাথা আরও নিচু করল। কথা শেষ করেই চৈতি ঘুরে দাঁড়ালেন না। চৈতি এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে থেকে দরাম করে দরজাটা লাগিয়ে দিল। শব্দটা পুরো বাড়িতে কেঁপে উঠল। তারপর দুই মিনিট। পিনপতন নীরবতা। শুধু দেওয়াল ঘড়ির কাঁটার টিকটিক শব্দ। সীমা প্রথমে নড়ল। ঢোক গিলে আবার খাওয়া শুরু করল। একে একে বাকিরাও। কিন্তু ভাত এখন আর শুধু ভাত নেই, গলায় কাঁটার মতো বিঁধছে। খাওয়া শেষ হলে রেহানা বেগম আঁচলে মুখ মুছলেন। ঝুমুর মাথায় হাত রেখে নরম গলায় বললেন, “আয় তো দাদুভাই, আজ তোর মায়ের সাথে ঘুমাতে হবে না। আজ দাদি-নাতনি একসাথে ঘুমাবো। অনেক গল্প করব, কেমন?” ঝুমু কোনো কথা না বলে চুপচাপ দাদির আঙুল ধরল। সারা ঘরজুড়ে তখন শুধু একটা জিনিসই টের পাওয়া যাচ্ছে—চৈতির রাগের আগুন। সে আগুনে আজ ভাত পুড়ছে না, পুড়ছে এই সংসারের বাকি শান্তিটুকুও।
22-04-2026, 12:11 PM
পর্ব ১৪: যাত্রা
পিকনিকের সকালটা শুরু হলো ঝলমলে রোদ দিয়ে। কলেজের মাঠে সারি সারি দাঁড়িয়ে আছে তিনটা বাস। দুটো সাধারণ, আর প্রথম বাসটা চকচকে এসি বাস—কমিটির লোকজন আর “ভিআইপি” অভিভাবকদের জন্য। এসি বাসের গায়ে লাল ফিতা বাঁধা, ভেতরে ঠান্ডা হাওয়া। এই বাসের সিটগুলো আগেই বুকড। মকবুল, হেডমাস্টার সাহেব, কবির মিয়া সস্ত্রীক, আর কবির মিয়ার মেয়ে-জামাই মিরা, রাহাদ ও তাদের ছেলে মিরাজ—এদের জন্যই সামনের সারিগুলো রাখা। বাস ছাড়ার সময় ঘনিয়ে আসছে। অভিভাবক-বাচ্চারা হৈচৈ করে উঠছে বাসে। হেডমাস্টার সাহেব লিস্ট হাতে দৌড়াদৌড়ি করছেন। কিন্তু মকবুলের চোখ বারবার গেটের দিকে। তার কপালে ভাঁজ, ঠোঁট শুকনো। কারণ একটাই—চৈতি এখনো আসেনি। পুরো আয়োজনের মূল উদ্দেশ্যই ছিল চৈতি। মকবুল নিজে হেডমাস্টারকে আলাদা করে ডেকে বলেছিল, “যেভাবে পারেন, ঝুমুর মাকে আনবেন। বাচ্চা মেয়ে, মা ছাড়া যাবে কীভাবে? বুঝিয়ে বলবেন।” হেডমাস্টার কথা রেখেছিলেন। গত দুদিন ধরে চৈতির বাড়ির সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছেন, সামাজিকতার দোহাই দিয়েছেন, ঝুমুর পড়াশোনার ভবিষ্যৎ টেনেছেন। কিন্তু চৈতি পাথর। মাথা নিচু করে শুধু বলেছে, “স্যার, মাফ করবেন। আমার শরীরটা ভালো না। আপনারা যান। যদি ঝুমু যেতে চায় যাবে, আমি কিছু জানি না।” হেডমাস্টারের শত যুক্তি, অনুরোধ—সব ওই একটা কথার দেওয়ালে ধাক্কা খেয়ে ফিরে এসেছে। মকবুল বাসের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে ঘাম মুছল। রুমালটা ভিজে গেছে। রাগে না হতাশায়—বোঝা যাচ্ছে না। এত টাকা ঢালল, কবির মিয়াকে দিয়ে ফান্ড করাল, এক রাতের প্রোগ্রাম বানাল—সব এই একটা মানুষের জন্য। আর সেই মানুষই আসল না। তার সমস্ত প্ল্যান, সমস্ত ছক, মুখ থুবড়ে পড়ল কলেজের মাঠের ধুলোয়। ড্রাইভার হর্ন দিল। “ভাই, আর কতক্ষণ? রোদ চড়ে যাচ্ছে।” হেডমাস্টার অসহায় মুখে মকবুলের দিকে তাকালেন। মকবুল দাঁতে দাঁত চেপে আছে কিন্তু কিছু বলল না। এসি বাসের সামনে দাঁড়িয়ে কবির মিয়ার মেজাজ তখন সপ্তমে। হাতের দামি ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে তিনি রাহাদের উপর ঝাঁঝিয়ে উঠলেন, “এই রাহাদ, মিরা কোথায়? বউ কোথায় থাকে সেটাও জানো না?” রাহাদ ফোনটা কানে চেপে ধরে আমতা আমতা করল, “বাবা, এই তো কল দিচ্ছি।” “কল দিচ্ছি মানে?” কবির মিয়ার গলা আরও চড়ল। “তুমি কেমন স্বামী? পিকনিকে আসবে, অথচ নিজের স্ত্রীকে সাথে নিয়ে আসতে পারো না?” রাহাদ মাথা নিচু করে বলল, “বাবা, ও সকালে বলল ওর নাকি একটা জরুরি কাজ আছে। তাই…” “কাজ আছে মানে?” কবির মিয়া ধমকে উঠলেন। “দ্রুত ফোন লাগাও। দেখো কোথায় মেয়েটা। সময় নষ্ট হচ্ছে।” রাহাদ আবার ডায়াল করল। কানের কাছে রিংটোন বেজে যাচ্ছে—টু...টু...টু...। ধরছে না। তার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। ঠিক তখনই পেছন থেকে খিলখিল হাসির সাথে একটা পরিচিত কণ্ঠ ভেসে এল, “আরে, কাকে কল দিচ্ছ শুনি?” রাহাদ চমকে পিছনে তাকাল। তার চোখ আটকে গেল। মিরা দাঁড়িয়ে, ঠোঁটের কোণে সেই পুরনো দুষ্টু হাসি। রাহাদের শক্ত হয়ে থাকা মুখটা মুহূর্তে নরম হয়ে গেল। সেও হেসে ফেলল। কতদিন পর! কতদিন পর দুজনে এভাবে একসাথে, কোনো রাগ-ক্ষোভ ছাড়া হাসল। বাসের সামনের এই ছোট্ট মুহূর্তটা হঠাৎ করেই অনেক দামি হয়ে উঠল। কিন্তু চমকের তখনও বাকি ছিল। মিরার পাশে, গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে চৈতি। দুজনেই আজ একই রঙের শাড়ি পরেছে—হালকা গোলাপি জমিনে সোনালি পাড়। খোলা চুল, কপালে ছোট্ট টিপ, চোখে হালকা কাজল, মাথার উপর চশমা। যেন দুই বোন, অথবা... যেন দুই পরী মাটিতে নেমে এসেছে। রূপের দিক দিয়ে কেউ কারও চেয়ে একচুলও কম না। বাসের সিঁড়িতে দাঁড়ানো মকবুলের নিঃশ্বাস আটকে গেল। এই তো, সেই মুখ। যার জন্য এত আয়োজন, এত ছক। সে ভেবেছিল সব শেষ, কিন্তু চৈতি এসেছে। নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না। মকবুল প্রায় দৌড়ে সিঁড়ি বেয়ে নামল। “আ-আরে চৈতি আপনি? আপনি এসেছেন?” চৈতি একবার শুধু চোখ তুলে তাকাল। কোনো উত্তর দিল না। তার চোখে-মুখে একরকম পাথরের মতো কঠিন শীতলতা। উত্তরটা দিল মিরা। মকবুলের দিকে তাকিয়ে সে ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসল, “হ্যাঁ কাকা। কেন, এখন আর জয়েন করার সময় নেই নাকি? দেরি করে ফেলেছি?” মকবুল তাড়াতাড়ি মাথা নাড়ল। “আরে কী বলো মা! সময় কেন থাকবে না? অবশ্যই আছে। তোমাদের জন্য সব সময় আছে।” তার গলার উৎসাহ বাঁধ মানছে না। কথা শেষ না হতেই ভিড় ঠেলে হাজির হলো লোকনাথ। দুই হাতে চারটা বড় বড় ব্যাগ। কাঁধে আরও একটা সাইড ব্যাগ ঝুলছে। ঘেমে নেয়ে একাকার। হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, “উফ, ব্যাগগুলোর যা ওজন। হাত খুলে আসছে।” মকবুলের হাসি মুখটা মুহূর্তে কালো হয়ে গেল। “লোকনাথ? তুমি এখানে কী করো?” লোকনাথ মাথা চুলকে আমতা আমতা করে বলল, “ওই... মিরা ভাবীই তো বলল। বলল, ব্যাগপত্র টানার জন্য হলেও তোকে যেতে হবে। আপনি না গেলে কে নেবে এত কিছু?” মিরা কোমরে হাত রেখে বলল, “হ্যাঁ কাকা, ঠিকই তো। লোকনাথকে রেখে আসব কেন? এতগুলো ব্যাগ কে টানবে? ও যাবে আমাদের সাথে।” মকবুলের বুকের ভেতরটা আবার খচ করে উঠল। চৈতি এলো, কিন্তু এই আপদটাও সাথে এলো। তার প্ল্যানের মাঝখানে আবার কাঁটা। ঠিক তখনই বাসের জানালা দিয়ে কবির মিয়ার গর্জন ভেসে এল, “আরে ওই! তোমরা ওখানে পঞ্চায়েত বসিয়েছ নাকি? তাড়াতাড়ি ওঠো সবাই। সময়ের কি কোনো দাম নেই তোমাদের কাছে?” কবির মিয়ার ধমকে যেন ম্যাজিক কাজ করল। মকবুল, মিরা, চৈতি, লোকনাথ—সবাই হুড়মুড় করে বাসে উঠতে লাগল। বাসের দরজা বন্ধ হলো। ইঞ্জিন গর্জে উঠল। মকবুল জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল। তার মুখে হাসি, কিন্তু চোখে হিসেব। চৈতি এসেছে। খেলা এখন নতুন করে শুরু হবে। বাস ছাড়ার মুখেই বাঁধল গোল। তৃতীয় বাস থেকে এক অভিভাবক ছুটে এসে হেডমাস্টারকে চেপে ধরলেন, “স্যার, ওই বাসের পোলাপানগুলা বেশি ফাজিল। আপনি একটু ওই বাসে যান। সামলাতে পারছি না।” হেডমাস্টার অসহায় মুখে মকবুলের দিকে তাকালেন, “চলেন ভাই, আপনিও। দুজন থাকলে ওরা একটু ভয় পাবে।” মকবুল বিরক্তিতে মুখ কুঁচকাল। তার চোখ তখন এসি বাসের জানালায়, যেখানে চৈতি সবে উঠে বসেছে। “ধুর! তুমি যাও। আমি কেন যাব? আমার কি আর কাজ নেই?” কিন্তু পাশের সিট থেকে কবির মিয়ার গর্জন ভেসে এল, “এই! তোমরা দুইজন দ্রুত যাও তো। ফাজলামো করার জায়গা পাও না? বাস চালু করতে হবে না?” কবির মিয়ার ধমকের সামনে মকবুলের সব আপত্তি উবে গেল। মুখ কালো করে, রাগে গজগজ করতে করতে সে আর হেডমাস্টার নেমে গেল এসি বাস থেকে। সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় শেষবারের মতো চৈতির দিকে তাকাল। মনটা ভেঙে চুরমার হয়ে গেল তার। এত আয়োজন, এত প্ল্যান—সবই এখন দূর থেকে দেখতে হবে। এদিকে এসি বাসের ভেতরের দৃশ্য ততক্ষণে পালটে গেছে। জানালার ধারের পাশাপাশি সিটে বসেছে চৈতি আর মিরা। মিরার চোখে-মুখে আজ অন্যরকম দীপ্তি। কলেজের সেই দস্যি মেয়েটা যেন ফিরে এসেছে। আর মিরাকে পেয়ে চৈতির বুকের ভেতর জমে থাকা বরফটাও গলতে শুরু করেছে। মনে হচ্ছে, দেওয়ালগুলো সরে গিয়ে সেই পুরনো ক্যাম্পাসটা ফিরে এসেছে। মিরা হাতের মিউজিক বক্সটা অন করল। একটা আধুনিক দিনের গান বাজতে শুরু করল—ধীর লয়ে, কিন্তু নেশা ধরানো সুর। মিরা এক ঝটকায় সিটের উপর উঠে দাঁড়াল। চৈতির হাত ধরে টান দিল, “ওঠ! আজ কোনো বারণ শুনব না।” চৈতিও উঠে দাঁড়াল। দুই বান্ধবী সিটের উপর দাঁড়িয়ে দুলতে লাগল। তাদের দেখে আরও কয়েকজন অভিভাবক হাততালি দিয়ে যোগ দিল। পুরো বাসটা মুহূর্তে একটা চলন্ত উৎসবে বদলে গেল। মিরা হাত বাড়িয়ে দিল রাহাদের দিকে। রাহাদ প্রথমে একটু থমকাল, তারপর মিরার হাত ধরে উঠে দাঁড়াল। স্বামী-স্ত্রী যখন একসাথে পা মেলাল, বাসের সবাই মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল। তাদের মানিয়েছে দারুণ। রাহাদের শক্ত চোয়ালেও আজ হাসি। তাদের দেখে আরও দু-তিন জোড়া স্বামী-স্ত্রীও উঠে দাঁড়াল। বাসের সরু গলিটা হয়ে উঠল ডান্স ফ্লোর। ভিড়ের মধ্যেই হঠাৎ চৈতি অনুভব করল, কেউ তার হাত ধরেছে। তাকিয়ে দেখল, লোকনাথ। তার বিশাল কালো হাতের মুঠোয় চৈতির ফর্সা হাতটা হারিয়ে গেছে। অন্য সময় হলে হয়তো ঝটকা দিয়ে ছাড়িয়ে নিত। কিন্তু আজ না। আজ চারপাশে আলো, গান, হাসি। আর সবচেয়ে বড় কথা—রাজীব এখানে নেই। এই পুরো বাসে, এই মুহূর্তে, লোকনাথই তার ‘বাসার লোক’। চৈতি কিছু বলল না। হাতটা ধরা থাকল। নাচের তালে তালে চৈতি লোকনাথের দিকে ফিরে হেসে জিজ্ঞেস করল, “কেমন লাগছে লোকনাথ?” লোকনাথের চোখ চৈতির মুখের উপর আটকে ছিল। সে ঢোক গিলে বলল, “এই তো... খুব ভালো। তোমাকে অনেক সুন্দর লাগছে।” ‘তোমাকে’। এই প্রথম লোকনাথ তাকে ‘ভাবী’ না ডেকে ‘তুমি’ বলল। শব্দটা কানের পাশে গরম হলকা হয়ে লাগল চৈতির। এক মুহূর্তের জন্য বুকের ভেতরটা ছ্যাঁৎ করে উঠল। এতদিনের সম্বোধনটা এক ঝটকায় ভেঙে গেল। চৈতির আজব লাগল, একটু অস্বস্তিও। কিন্তু গানের তাল, বাসের দুলুনি, চারপাশের হাসি—সব মিলিয়ে সেই অস্বস্তিটা আর টিকল না। হয়তো পরিস্থিতিটাই এমন। চৈতি আজ বাঁধনহারা। গানের সাথে সে ইচ্ছে করেই বেশি লাফাচ্ছে, ঘুরছে। শাড়ির আঁচল উড়ছে। লোকনাথ ফিসফিস করে বলল, “আরে, আস্তে। পড়ে গিয়ে ব্যথা পাবে তো।” চৈতি ঠোঁট উলটে, কপট রাগ দেখিয়ে বলল, “পেলাম ব্যথা! তো কী করবে আমাকে? আমি তো নাচবই।” লোকনাথের চোখে একরকম চাপা অধিকার ফুটে উঠল। সে গলা নামিয়ে বলল, “মাইর দিব তোমাকে।” চৈতি খিলখিল করে হেসে উঠল। চোখে কৌতুক। “ওকে, দাও। দাও আমাকে। দেখি কেমন মাইর দাও।” লোকনাথ আর কিছু ভাবল না। ডান হাতটা তুলে চৈতির নরম গালে আলতো করে একটা চড় মারল। শব্দ হলো না, কিন্তু স্পর্শটা রয়ে গেল। মিষ্টি, কিন্তু শাসনের। “আর করবি দুষ্টামি?” লোকনাথের গলাটা এখন আর কাজের লোকের মতো শোনাল না। চৈতি চড় খেয়েও সরল না। বরং তার চোখে একরকম আবদার খেলে গেল। যেন আরও চাইছে। সে মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, “হ্যাঁ।” লোকনাথ এবার চৈতিকে একটু কাছে টেনে নিল। ভিড়ের মধ্যে তাদের গা ঘেঁষাঘেঁষি হয়ে গেল। চৈতির কানের কাছে মুখ নিয়ে নরম গলায় বলল, “এত লাফিয়ো না।” কথাটায় শাসন ছিল, আবার একরকম আদরও। চৈতি কি সত্যিই পালটে গেছে? না। আসলে মিরা যখন রাহাদের হাত ধরে হাসতে হাসতে নাচছে, চৈতির বুকের খুব গভীরে একটা শূন্যতা মোচড় দিয়ে উঠল। সবার জোড়া আছে, তার পাশটা ফাঁকা। ঠিক তখনই লোকনাথ তার হাত ধরল। যে মানুষটা সারাক্ষণ ছায়ার মতো তার সংসারটা পাহারা দেয়, আজ এই চলন্ত বাসে, এই উৎসবের ভিড়ে, সেই শক্তপোক্ত পুরুষটাই হয়ে উঠল তার একমাত্র ‘ভরসা’। আর সেই ভরসার কাছেই সে একটুখানি বাঁধন ছিঁড়তে দিল। পর্ব ১৩(গ): নীরব আশ্রয় বাসের গান চলছে। হইচই, হাততালি, পায়ের তাল—সব বজায় আছে। জানালা দিয়ে দুপুরের তীব্র আলো এসে পড়ছে সিটে। সবার হাতে Mojo দেয়া হলো। লোকনাথ চুপ কথা বলছে না, শুধুই চৈতির দিকে তাকিয়ে। নীরবতা ভাঙল চৈতি নিজেই। গলাটা আগের মতো চড়া নয়, বরং ক্লান্ত, ভাঙা। “আমি ব্যথা পেলে তুমি কষ্ট পাবে?” লোকনাথ মুখ না তুলেই উত্তর দিল, “কেন পাব না, বলো তো?” চৈতি জানালার বাইরে তাকাল। গাছগুলো সরে সরে যাচ্ছে। “জানো, আমি না ওইদিন খুব কষ্ট পেয়েছি।” “কোন দিন?” লোকনাথ এবার চৈতির চোখে তাকাল। “যেদিন ঝুমু বলল... আমি নাকি ওর মা না।” চৈতির গলাটা ধরে এল। “তোমার কী মনে হয়? আমি কি সত্যিই খারাপ মা?” লোকনাথ এক মুহূর্ত চুপ করে রইল। তারপর দৃঢ় গলায় বলল, “না তো। তুমি দায়িত্ববান। আমি তো দেখি, সারাদিন সংসারটা কেমনে আগলে রাখো।” কথাটা শুনে চৈতির বুকের ভেতর জমে থাকা পাথরটা একটু নড়ল। সে নিজেও বুঝতে পারছে না, কেন নিজের মেয়ের বিচার দিচ্ছে কাজের লোকটার কাছে। কিন্তু বলা থামাতে পারল না। “তবে কেন ঝুমু অমন করে বলল? বলো তুমি? কোথায় আমার ভুল?” লোকনাথ আর কোনো উত্তর দিল না। সে ধীরে ডান হাতটা তুলল। আলতো করে চৈতির ঘামে ভেজা কপালে নিজের ঠোঁট ছোঁয়াল। একটা উষ্ণ, নীরব আশ্বাস। তারপর চৈতিকে নিজের দিকে টেনে নিল। চৈতির মাথাটা নিজের চওড়া বুকের উপর রাখল। বাঁ হাত দিয়ে চৈতির মাথায় আস্তে আস্তে হাত বুলাতে লাগল, যেমন করে মা কাঁদতে থাকা বাচ্চাকে শান্ত করে। ফিসফিস করে বলল, “তুমি ক্লান্ত। অনেক ক্লান্ত। এখন চোখ বন্ধ করো। একটু ঘুমাও।” চৈতি বাধা দিল না। লোকনাথের গায়ের ঘাম আর সস্তা সাবানের গন্ধ মেশানো পুরুষালি গন্ধটা তার নাকে এল। এই বুকটা পাথরের মতো শক্ত, কিন্তু আশ্চর্য নিরাপদ। চৈতি চোখ বন্ধ করল। দুজন দুজনকে জড়িয়ে ধরে আছে। বাসের দুলুনিতে তাদের শরীর একসাথে দুলছে। কোনো কথা নেই, শুধু দুটো হৃদপিণ্ডের ওঠানামা। কিছুক্ষণ আগে যেখানে চৈতি আর মিরা পাশাপাশি বসেছিল, সেখানে এখন দৃশ্যপট পালটে গেছে। মিরা সরে গিয়ে বসেছে রাহাদের পাশে। স্বামী-স্ত্রী মাথা কাছাকাছি এনে গল্প করছে, মাঝে মাঝে হেসে উঠছে। বহুদিনের জমা অভিমানের বরফ গলছে। আর ওদিকে জানালার ধারের সিটে চৈতি বসে আছে লোকনাথের সাথে। চৈতির মাথা এলিয়ে আছে লোকনাথের কাঁধে। নিঃশ্বাস ভারী হয়ে এসেছে—ঘুমিয়ে পড়েছে। লোকনাথ এক হাতে চৈতিকে আগলে ধরে রেখেছে, যেন পড়ে না যায়। তার অন্য হাতটা সিটের হাতলে শক্ত হয়ে বসে আছে। বাস চলছে। হাইওয়ের মসৃণ রাস্তায় চাকার শব্দটাও যেন কমে এসেছে। একটু আগে যে বাস গানে, হাসিতে, নাচে কাঁপছিল, সেখানে এখন গভীর নীরবতা। শুধু ইঞ্জিনের একটানা গোঁ গোঁ শব্দ, আর জানালার কাচে বাতাসের শোঁ শোঁ আওয়াজ। সব শব্দ বিলীন হয়ে গেছে। পড়ে আছে শুধু দুটো ভাঙা মানুষের নিঃশব্দ আশ্রয় খোঁজার দৃশ্য।
22-04-2026, 07:33 PM
অসাধারণ আপডেট ভাই
কিন্ত এমন একটা জায়গাতে আটকিয়ে রাখছেন ভাই তারাতারি আপডেট চাই
22-04-2026, 09:18 PM
খুব সুন্দর আপডেট
22-04-2026, 09:51 PM
Mindblowing! Your written style is totally different, like common conversation among village people, which makes this story different.
Keep it up, bro.
22-04-2026, 10:36 PM
আফসোস এখন ও সেক্স মিলন পেলাম না
|
|
« Next Oldest | Next Newest »
|