09-04-2026, 04:58 AM
দুর্দান্ত আপডেট দাদা
|
Erotic Thriller মরীচিকা ও মোহময়ী
|
|
09-04-2026, 04:58 AM
দুর্দান্ত আপডেট দাদা
09-04-2026, 05:50 AM
(This post was last modified: 09-04-2026, 05:53 AM by mity odin 2. Edited 1 time in total. Edited 1 time in total.)
Apnar sobai k janiya biroti nabar bissoy ta proman kore kore apni koto ta responsible lekhok. Nijer personal jogot k samle amni likchen pathok der jonno, se bisoya jai boli seta not enough.
Choti golpe jounotai sesh kotha, kintu lekhok seta koto ghotona bhoul r koto ta logical kore tulte paren tatai lekhoker sarthokota. Apnar golpe protiti ghotonar pachoner reason ache jeta ei golpo take r interesting kore tuleche. Manush nijeder jibon k koto ta jotil kore tulte pare ta ayan r bidishar golpa sposto r sai jotilota lakhok joto sundor kore tule dhoreche ta theke lakhoker lakhar hat koto ta vlo ta bojha jai. Ei lekha tar mann choti golpo theke onek upore uthe gache . Apnar biroti vlo katuk ,I hope apni aro intersiting plot niya fire asun amader jonno, Odhir agrohe opekkha korbo apnar golper next updater jonno Apni bollen apnar onno lekha gulo ache, segulor name, ki vabe porbo sa bisoy a janala ei 2 week ogulo pore katate partam. Thank you for all your sincere efforts. Your big fan , Mity
09-04-2026, 09:22 AM
Darun
09-04-2026, 12:19 PM
Incredible plot and beautiful details.
পুরো সেনসেশনাল। আশা করব লেখক তার ব্যক্তিগত জীবনের কাজ ও ব্যস্ততা কাটিয়ে দ্রুতই আমাদের মাঝে ফিরে আসবেন। খুব মিস করব আপনার লেখাকে এই কয়দিন। নিজের খেয়াল রাখবেন, সুস্থ থাকবেন। উপরওয়ালা আপনার মঙ্গল করুক।
09-04-2026, 02:53 PM
Sera sera..... Akebare onoboddo..... Khub bhalo lekha..... Abar asol jombe golper plot ta... Next update er opekhai thakbo..... Apni somoy niye likhun
11-04-2026, 12:10 PM
Lovely, just awesome ?
17-04-2026, 12:11 AM
(09-04-2026, 12:19 PM)rakib6192522 Wrote: Incredible plot and beautiful details. আপনার সুন্দর মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ ভাই। উপরওয়ালা আপনার মঙ্গল করুন। আপনাদের এই ভালোবাসাই আমাকে লিখতে অনুপ্রাণিত করে। খুব শীঘ্র দুয়েকদিনের মধ্যেই আপনাদের মাঝে ফিরে আসব। আপনিও সুস্থ থাকবেন, আনন্দে থাকবেন। পয়লা বৈশাখের শুভেচ্ছা।
17-04-2026, 12:13 AM
17-04-2026, 12:22 AM
(This post was last modified: 17-04-2026, 12:22 AM by RockyKabir. Edited 1 time in total. Edited 1 time in total.)
(09-04-2026, 05:50 AM)mity odin 2 Wrote: Apnar sobai k janiya biroti nabar bissoy ta proman kore kore apni koto ta responsible lekhok. Nijer personal jogot k samle amni likchen pathok der jonno, se bisoya jai boli seta not enough. ধন্যবাদ দাদা, গল্পটা যখন আপনাদের ভাল লাগছে তার মানে আমার লেখা সার্থক। আমি কাউকে মিথ্যা আশা দিতে চাই না। আসলে বাস্তবের অফলাইন জীবনেও এই ডেডলাইনের চাপ থাকে। তা অফিসে হোক বা সম্পাদকের তাগাদা। বিরতি নিলে জানিয়ে নেওয়াই ভাল। এই গল্পটা ইরোটিকা তো নিশ্চয়ই। কিন্তু, কমপ্লিট ইরোটিকা নয়, part-erotica, এর মধ্যে Coming of age, থ্রিলার, সাসপেন্স, অ্যাকশন, forbidden romance ইত্যাদি আরো জঁর আছে। এর প্রধান কারণ হল আমি এটাকে বড় উপন্যাস হিসাবে conceptualize করেছিলাম। শুধু ইরোটিকা হলে এটা কখনোই মেগা নভেল হয়ে উঠবে না। আমার অন্য গল্প আছে মানে ম্যাগাজিনে। আমার নিজের নামে প্রকাশিত হয়েছে। বুঝতেই পারছেন আমি আমার আসল পরিচয় এখানে প্রকাশ করতে অপারগ। ধন্যবাদ।
17-04-2026, 12:24 AM
17-04-2026, 04:03 AM
(17-04-2026, 12:22 AM)RockyKabir Wrote: ধন্যবাদ দাদা, গল্পটা যখন আপনাদের ভাল লাগছে তার মানে আমার লেখা সার্থক। আমি কাউকে মিথ্যা আশা দিতে চাই না। আসলে বাস্তবের অফলাইন জীবনেও এই ডেডলাইনের চাপ থাকে। তা অফিসে হোক বা সম্পাদকের তাগাদা। বিরতি নিলে জানিয়ে নেওয়াই ভাল। গল্পটা কাকোল্ড হবে কি অন্য গল্প গুলোর মতো...???
17-04-2026, 07:07 AM
অসাধারণ, অনবদ্য দাদা।
শুধু প্রথম প্রতিজ্ঞা- সম্পর্ক শেষ। এটা হৃদয়ে রক্তক্ষরণ করল।
17-04-2026, 09:59 AM
Ektai katha, apnar jayga ei baje eroticar jagat noy. Mainstream e likhun. Apnar sona badhano hat.
17-04-2026, 07:47 PM
আপডেটের আশায় আছি স্যার
17-04-2026, 10:00 PM
(17-04-2026, 12:22 AM)RockyKabir Wrote: ধন্যবাদ দাদা, গল্পটা যখন আপনাদের ভাল লাগছে তার মানে আমার লেখা সার্থক। আমি কাউকে মিথ্যা আশা দিতে চাই না। আসলে বাস্তবের অফলাইন জীবনেও এই ডেডলাইনের চাপ থাকে। তা অফিসে হোক বা সম্পাদকের তাগাদা। বিরতি নিলে জানিয়ে নেওয়াই ভাল। ইরোটিক পার্ট আসবে আসবে করেও আসছে না , ক্রমশ thirll দিচ্ছে তাই যখন দাদা erotic পার্ট টা আসবে তখন সেটাকে পুরোপুরি সম্পূর্ণ ভাবে ফুটিয়ে তুলবেন, request রইলো ,
18-04-2026, 12:03 PM
গল্পটি শেষ করার পর "আমার দিপ্তী" গল্পটি একটু দেখবেন। ঐ অসমাপ্ত গল্প শেষ করার অনুরোধ রইল
18-04-2026, 06:33 PM
(This post was last modified: 19-04-2026, 02:41 AM by RockyKabir. Edited 2 times in total. Edited 2 times in total.)
18-04-2026, 06:39 PM
18-04-2026, 09:28 PM
(This post was last modified: 19-04-2026, 12:11 AM by RockyKabir. Edited 1 time in total. Edited 1 time in total.)
অধ্যায় ১৮
কলেজের অ্যানুয়াল কালচারাল ফেস্ট শেষ হয়ে যাওয়ার পর পাঁচদিন কেটে গেছে। ফেস্টের সময় গোটা ক্যাম্পাসের সর্বত্র যেন একটা জাদুকরী ঘোর বিরাজ করছিল। সেই চাকচিক্য এখন ফিকে হয়ে গেছে। চারপাশের গাছগুলো থেকে ফেয়ারি লাইটগুলো একে একে খুলে ফেলা হয়েছে। করিডোরের দেওয়াল থেকে ফেস্টের রঙিন পোস্টারগুলো উধাও। স্টেজের বাঁশ আর ত্রিপলগুলো ট্রাকে করে যথাস্থানে ফিরে গেছে। অডিটোরিয়ামের দরজাটা আপাতত বন্ধ। চারপাশের পরিবেশটা আবার রুক্ষ বাস্তবে ফিরে এসেছে। ফেস্টের সময়কার ঢিলেঢালা ভাব কাটিয়ে ক্যাম্পাস আবার তার চেনা, একঘেয়ে, রুটিনমাফিক ছন্দে ফিরে এসেছে। কিন্তু উপর উপর শান্ত গাম্ভীর্য থাকলেও এর তলায় একটা চাপা গুঞ্জন সারাক্ষণ মৌমাছির মতো ভনভন করছে। ক্লাসরুমের কোণে হোক বা ক্যাফেটেরিয়ার ধোঁয়া ওঠা কফির টেবিলে কিংবা কলেজের নির্জন করিডরে, স্টুডেন্টদের আড্ডায় ফেস্টের রাতের সেই ঘটনাটা নিয়ে এখনও তীব্র আলোচনা চলছে। ফার্স্ট ইয়ারের একটা নতুন ছেলের স্টুডেন্ট কাউন্সিলের ট্রেজারার বিক্রম মালহোত্রাকে ওভাবে অকারণে মারধর করে রক্তারক্তি করে দেওয়া আর তারপর একজন ফ্যাকাল্টির হাতে সবার সামনে তার লাঞ্ছনা। গসিপের উপযুক্ত মুচমুচে বিষয়ই বটে। তবে গোটা কলেজ সবচাইতে বেশি বিস্মিত হয়েছে, অয়ন চ্যাটার্জীর কোন কড়া শাস্তি না হওয়াতে। সাসপেন্ড হওয়া তো দূর অস্ত, প্রিন্সিপাল সান্যাল কোন অজানা কারণে শুধুমাত্র একটা নামকাওয়াস্তে 'শো-কজ' নোটিশ ধরিয়েই পুরো ব্যাপারটা ধামাচাপা দিয়ে দিয়েছেন। বিক্রম মালহোত্রাও নিজেও প্রিন্সিপালকে জানিয়েছে যে, সে বিষয়টি নিয়ে আর জলঘোলা করতে চায় না। এটা অবশ্য তার ধূর্ততা ছাড়া আর কিছু নয়। একদিকে 'মহান' সাজা হল আর অন্যদিকে সেদিন রাত নিয়ে বেশি ঘাঁটাঘাঁটি হলে তার কীর্তিকলাপ সবার ফাঁস হয়ে যাবার যে সম্ভাবনা ছিল সেটা নির্মূল করা গেল। এদিকে, শাস্তির খাঁড়া থেকে রক্ষা পেলেও অয়ন ক্যাম্পাস থেকে অদৃশ্য হয়ে গেছে। তাকে কোথাও দেখা যায় না। সে ক্লাসে যায় না। অন্তত, মিস বিদিশা গাঙ্গুলির অ্যাডভান্সড ম্যাথমেটিক্সের ক্লাসে তো নয়ই। সেদিনের প্রিন্সিপালের অফিস ভিজিটের পরে বিদিশা তিনদিনের ছুটি নিয়েছিলেন। এই ঘটনার ধাক্কা কাটিয়ে ওঠার জন্য এই ছুটিটা তার খুব দরকার ছিল। মানসিক ক্লান্তি কাটিয়ে উঠে তিনি এখন অনেকটা স্বাভাবিক। ছুটি থেকে ফিরে এসে গতকাল কাজে যোগ দেবার পর থেকে তিনি লক্ষ্য করছেন অয়ন যে শুধু তার ক্লাসে গরহাজির তাই নয়, মেইন বিল্ডিংয়ের কোথাও ওর ছায়াটুকুও দেখা যাচ্ছে না। অবশ্য বিদিশা এর মধ্যে নিজে থেকে ওকে খুঁজতে যাননি। অন্যদিকে, অদ্ভুতভাবে বিক্রম কাল থেকে একবারের জন্যও বিদিশার সাথে দেখা করতে আসেনি। যে বিক্রম আগে বিদিশাকে সাহায্য করার জন্য চব্বিশ ঘণ্টা নানা অজুহাতে তার চারপাশে ঘুরঘুর করত সে হঠাৎ করে তাঁর চৌহদ্দি থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছে। তবে সে অয়নের মতো ক্যাম্পাস থেকে অদৃশ্য হয়ে যায় নি। বরং ঠোঁটে ব্যান্ডেজ আর মুখে এক বিষণ্ণ কিন্তু ক্ষমাপরায়ণ 'মহান' ইমেজ নিয়ে সে গোটা ক্যাম্পাসের সহানুভূতি কুড়িয়ে বেড়াচ্ছে। ছাত্রছাত্রী থেকে শুরু করে অশিক্ষক কর্মচারী, সবার চোখেই এখন বিক্রম একজন লাঞ্ছিত নায়ক আর অয়ন একজন বখে যাওয়া গুন্ডা। বিক্রমের থেকে চরম প্রতিশোধ নেবে এমনটা স্থির করলেও, অয়ন নিজে গোটা ঘটনার তীব্র অভিঘাত এখনও সামলে উঠতে পারেনি। তার চেনা পৃথিবীটা এক লহমায় ওলটপালট হয়ে গেছে। ক্যাম্পাসের প্রতিটি কোণে এখন বিক্রমের জন্য উপচে পড়া সহানুভূতি আর অয়নের জন্য বরাদ্দ কেবল ঘৃণা মিশ্রিত আড়চোখ। ওর পক্ষে ক্যাম্পাসে স্বাভাবিক ভাবে চলাফেরা করাটাই কঠিন হয়ে গেছে। অয়ন ক্লাসে যাওয়া ছেড়ে দিয়েছে। এখন ও সারাদিন ডর্মে নিজের ঘরে গুম হয়ে বসে থাকে। ওটাই তার একমাত্র আশ্রয়। ছেলেটা যেন একটা জীবন্ত পাথরে পরিণত হয়েছে। সে নিজে থেকে কারও সাথে একটা কথাও বলে না; কেউ যদি তাকে নেহাতই দরকারি কিছু জিজ্ঞেস করে, তবেই সে হ্যাঁ বা না-তে উত্তর দেয়। রনি আর কবীর, যারা অয়নের সবচেয়ে কাছের বন্ধু ছিল। যারা সবসময় ওর সাথে লেপ্টে থাকত, তারাও এখন ওর ধারেকাছে ঘেঁষতে ভয় পায়। অয়নের নিয়মিত দেখা এখন মেলে কেবল কলেজের ফুটবল মাঠে। ঠিক যখন প্র্যাকটিস শুরু হয়, সে একটা ছায়ার মতো মাঠে এসে উপস্থিত হয় আর প্র্যাকটিস শেষ হওয়ার বাঁশি বাজার সাথে সাথেই সে টিমের বাকিদের মতো ড্রেসিংরুমে না গিয়ে সোজা নিজের ডর্মে নিজের ঘরের নির্জনতায় ফিরে যায়। সামনে ইন্টার-কলেজ স্টেট চ্যাম্পিয়নশিপ, তাই মাঠে রোজ জোরকদমে প্র্যাকটিস চলছে। কিন্তু, অয়ন যেন মাঠে থেকেও অনুপস্থিত। ওর খেলার সেই চেনা স্বাভাবিক ছন্দ উধাও।খেলায় পরিকল্পনার কোন বালাই নেই। যে ড্রিবলিং দিয়ে ও প্রতিপক্ষ রক্ষণভাগকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিত সেটা কোথায় হারিয়ে গেছে। আজকাল মাঠে অয়নকে দেখলে মনে হয় যেন একটা খ্যাপা ষাঁড় ঘুরে বেড়াচ্ছে। যেকোন সময় গুঁতিয়ে দেবে। প্রতিপক্ষের পা থেকে বল কেড়ে নেবার বদলে তাদের আঘাত করাটাই তার মূল উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। খেলার ছোটখাটো ট্যাকটিক্সকে সে থোড়াই কেয়ার করে। সামান্য ফাউল করলেও সে মেজাজ হারায়, উল্টোদিকের খেলোয়াড়ের দিকে তেড়ে যায়। সবচেয়ে ভয়ানক ব্যাপার হলো, প্র্যাকটিস ম্যাচের সময় অয়ন এখন নিজের দলের সতীর্থদেরও রেয়াত করছে না। তাদের প্রতি ওর ব্যবহারে সামান্যতম সৌজন্য নেই। কারোর একটু ভুল দেখলে সে ক্ষেপে ওঠে। কেউ তাকে পরামর্শ দিতে এলে বা পাসের জন্য চিৎকার করলে সে এমনভাবে তার দিকে তাকায়, যেন সে শত্রু শিবিরের কেউ। "পাস কর অয়ন! হোল্ড করিস না!" অয়ন বল নিয়ে দৌড়োচ্ছে। পাশ থেকে সতীর্থের চিৎকারটা শুনেও সে পাত্তা দিল না। বিপক্ষের একজন ডিফেন্ডার বল কাড়বার জন্য ওর সামনে আসতেই অয়ন বল ছেড়ে ঠাণ্ডা মাথায় সজোরে, সম্পূর্ণ ইচ্ছাকৃতভাবে, ছেলেটার শিন-বোনে বুট দিয়ে লাথি মারল। ছেলেটা যন্ত্রণায় ককিয়ে উঠে মাটিতে পড়ে গেল। রেফারি এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে দৌড়ে এসে সঙ্গে সঙ্গে পকেট থেকে লাল কার্ড বের করে অয়নের চোখের সামনে ধরলেন। অয়ন একটাও কথা না বলে, মাঠের ঘাসে থুতু ফেলে চোয়াল শক্ত করে সোজা সাইডলাইনের দিকে হাঁটা লাগাল। ওর চেহারায় অনুশোচনার কোন চিহ্ন নেই। ও যন্ত্রণায় কাতরাতে থাকা ছেলেটার দিকে একবার ফিরেও তাকাল না। সাইডলাইনের বাইরে এসেই ও একটা জলের বোতল তুলে নিয়ে সরাসরি মাথার ওপর উপুড় করে দিল। কোচ সেনগুপ্ত সাইডলাইনে দাঁড়িয়ে গোটা দৃশ্যটা দেখে একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। এটা নিয়ে গত পাঁচদিনে ছয়বার এমন ঘটনা ঘটল। ফেস্টের পর থেকেই ছেলেটার খেলার বারোটা বেজে গেছে। এমন চলতে থাকলে ট্রফি জেতা তো দূরের কথা, তারা আদৌ কোয়ার্টার ফাইনালে উঠতে পারবেন কিনা সন্দেহ। প্রিন্সিপালের কাছে লজ্জায় তার মাথা কাটা যাবে। তিনি এগিয়ে এলেন। "কী ছিল ওটা অয়ন?" তার গলাটা অত্যন্ত গম্ভীর। অয়ন বোতলটা নিচে রেখে কোচের চোখের দিকে তাকাল। সে কোন জবাব দিল না। "গত কয়েকদিন ধরে আমি তোমাকে লক্ষ্য করছি। রোজ মাঠে নেমে তুমি কাউকে না কাউকে মারছ। শোনো, এভাবে মারপিট করলে হয়তো রাস্তায় ফাইট জিতে বড় গুণ্ডা হিসাবে নাম করবে। কিন্তু, আমার ফুটবল মাঠে তোমার কোন জায়গা নেই।" অয়ন জলের বোতল থেকে এক ঢোঁক জল খেয়ে মাথা নিচু করে রইল। সে কী উত্তর দেবে? তার মাথা সবসময় আগুন হয়ে আছে। ফেস্টের রাতের ঘটনার ক্ষত এখনও ওর মনে টাটকা। প্রতিবার যখন ও বল নিয়ে দৌড়োয়, ওর চোখের সামনে প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়দের বদলে বিক্রমের মুখটা ভেসে ওঠে। সেজন্য মাঠে নামলেই ওর হাত-পা, দুটোই নিশপিশ করে। কেউ বিশ্বাস করবে ? আসলে জীবন জিনিসটারই কোন মূল্য রয়েছে বলে ওর মনে হচ্ছে না। ওর মনে হচ্ছে ত্যাগ, ভালোবাসা এসব ফাঁপা বুলি আর সম্পর্ক-টম্পর্ক এগুলো আসলে মিথ্যে, সাজানো নাটক। নাহলে, যে মায়ের চোখ দিয়ে ও ছোটবেলা থেকে পৃথিবীকে চিনতে শিখল সেই মা একটা শুয়োরের কথায় বিশ্বাস করে এমন আচরণ করতে পারে ? এটা বললে ভুল বলা হবে না যে অয়ন বড় হয়ে উঠেছে ওর মাকে কেন্দ্র করে। বিদিশা অয়নের ছোটবেলার আশ্রয় এবং কৈশোরের বন্ধু, যার সাথে ও ছোট থেকে সমস্ত কিছু শেয়ার করে এসেছে। বিদিশা ওর বিশ্বাসের ভিত্তিপ্রস্তর, ওর সবচেয়ে কাছের মানুষ। তার কাছ থেকে এমন বিশ্বাসঘাতকতা অয়নের জীবনের গোটা ভিতটাকে নাড়িয়ে দিয়েছে। বিদিশা ওর দেবীও বটে। ইতালির সেই অভিশপ্ত রাতে, যখন বনগানি নামের রাক্ষসটা তার দিকে হাত বাড়িয়েছিল, অয়ন নিজের জীবনের পরোয়া করেনি। সে নিজের তার মায়ের প্রতি কামনার দৃষ্টি দিতে ভয় পেয়েছে, পাছে তার দেবীর পবিত্রতা নষ্ট হয়।একাজে যখনই সে ব্যর্থ হয়েছে তখনই একটা অপরাধবোধ ওকে কুরে কুরে খেয়েছে। আজ সেই দেবী, সেই মা, এক লহমায় তাকে আগলে রাখার তার সমস্ত তাগিদকে সস্তা গুন্ডামি আখ্যা দিয়ে ওকে সটান ডাস্টবিনে ছুঁড়ে ফেলে দিল! যে চোখে একদিন সে তার মাকে দেখেছিল বনগানিকে মারতে, সেই একই চোখে সে দেখল তার মাকে একটা লম্পট ছেলের নোংরা, কামার্ত স্পর্শকে 'সাহায্য' বলে মেনে নিতে! ওই শুয়োরটার সাজানো নাটকে ভুলে নিজের ছেলেকে সবার সামনে চড় মারল ! লম্পট-টার মিথ্যে ভদ্রতায় গলে গিয়ে সবার সামনে নিজের ছেলেকে অপমান করে কুকুরের মতো তাড়িয়ে দিল ! অয়নের সবচেয়ে বড় অবলম্বন, বিশ্বাসের জায়গাটা আজ হারিয়ে গেছে। তাই ওর সবসময় নিজেকে বড্ড একা, অস্থির, দিশাহীন লাগে। এককথায় ওর জীবনটা এখন ভিত্তিহীন। তবে একটা বিষয়ে ও নিশ্চিত, বিক্রমের থেকে একদিন সে এর বদলা নেবেই। বিক্রম মরেও শান্তি পাবে না। এদিকে অয়ন নিজের চিন্তার জগতে মগ্ন হয়ে থাকায় কোচ সেনগুপ্ত এতক্ষণ ধরে যা যা বলে যাচ্ছিলেন সবই ওর মাথার উপর দিয়ে চলে যাচ্ছিল। উনি অবশ্য সেটা জানতেও পারলেন না। তবে, তার একটা ধমক খুব শিগগিরই ওকে বাস্তবের রুক্ষ মাটিতে ফিরিয়ে আনল, "আমি প্রিন্সিপালের কাছে নিজের ঘাড় পেতে দিয়ে তোমার সাসপেনশন রুখেছি অয়ন। ভেবেছিলাম তুমি কৃতজ্ঞ থাকবে। কিন্তু তুমি তো দেখছি রোজ মাঠে কাউকে না কাউকে খুন করার চেষ্টা করছ! এই অ্যাটিটিউড নিয়ে তুমি পাড়ার টুর্নামেন্টেও পাঁচ মিনিট টিকতে পারবে না। কারণ, অপনেন্ট তোমাকে একবার প্রোভোক করলেই তুমি রেড কার্ড খেয়ে মাঠের বাইরে চলে যাবে। তাতে তোমার ইগো শান্ত হবে ঠিকই, কিন্তু টিমের বারোটা বেজে যাবে।" কথাটা শেষ করে কোচ সেনগুপ্ত পকেট থেকে একটা পুরানো হয়ে যাওয়া ভিজিটিং কার্ড বের করে অয়নের দিকে এগিয়ে দিলেন। "বালিগঞ্জে একটা পুরোনো মার্শাল আর্ট ইন্সটিটিউট আছে। ওখানকার হেড ইনস্ট্রাক্টর মিস্টার প্রধান আমার অনেক দিনের পরিচিত। আমি ওনাকে তোমার কথা বলে রেখেছি। আজ থেকেই তুমি ওখানে সন্ধেবেলার ক্লাসে জয়েন করবে।" অয়ন অবাক হয়ে কার্ডটার দিকে তাকাল। "মার্শাল আর্ট? কিন্তু স্যার, সামনেই তো স্টেট লেভেল কোয়ালিফায়ার...আমি মাঠ ছেড়ে ওখানে কেন যাব ?" "তুমি ফুটবলারই থাকবে"...কোচ ওকে মাঝপথে থামিয়ে দিলেন। তারপর একটু থেমে..."মার্শাল আর্ট মানে শুধু মারপিট নয়, অয়ন। কিন্তু, এখন তোমার মাঠে নেমে ফুটবল খেলার চেয়ে ফোকাস আর ইমোশনাল কন্ট্রোলটা বেশি দরকার। বাকিটা মিস্টার প্রধান তোমায় শেখাবেন।" সকাল এগারোটা, এইচ.ও.ডি (HOD) অফিস, ম্যাথমেটিক্স ডিপার্টমেন্ট, তিনতলা, মেইন বিল্ডিং বিশাল, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরটায় একটা অস্বস্তিকর নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে। ডক্টর বাগচী, তার ভারী চশমাটা টেবিলের ওপর নামিয়ে রেখে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তার মুখে স্পষ্ট বিরক্তির ছাপ। টেবিলের ওপাশে, মেরুদণ্ড সোজা করে, শান্ত এবং আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গিতে বসে আছেন বিদিশা। আজ তার পরনে একটা গাঢ় সবুজ রঙের সোনালি বর্ডার দেওয়া তসর সিল্ক। "মিস গাঙ্গুলি, আমি আপনার ফার্স্ট ইয়ারের অ্যাডভান্সড ম্যাথসের রেজাল্ট শিটটা দেখছিলাম।", ডক্টর বাগচী ফাইলটা টেবিলের মাঝখানে ঠেলে দিলেন। "আপনার ক্লাসগুলোতে প্রচুর স্টুডেন্ট ফেল করেছে। আপনার নিজের সেকশনেরও একই অবস্থা। অর্ধেকের বেশি স্টুডেন্ট ফেল করেছে এবং তাদের প্রাপ্ত নম্বর অত্যন্ত শোচনীয়।" "কারণ তাদের খাতার অবস্থাও অত্যন্ত শোচনীয়, স্যার", বিদিশা শান্তভাবে অত্যন্ত নির্লিপ্ত গলায় ছোট করে উত্তর দিলেন। "পড়াশোনার সাথে যাদের দূরতম সম্পর্ক নেই, তাদের কাছ থেকে এর চেয়ে ভালো ফল আশা করা কঠিন।" ডক্টর বাগচী ফাইলের পাতা উল্টে বিদিশাকে কয়েকটা নামের পাশে লাল কালি দেখালেন। "আপনি ফার্স্ট ইয়ার সেকশন বি-র একজন, ফোর্থ ইয়ারের সেকশন এ-র একজন, থার্ড ইয়ার সেকশন সি-র একজন আর সেকশন বি-র দুজন স্টুডেন্টকে ডিরেক্ট ফেল করিয়েছেন। এরা কেউ দু-সংখ্যার ঘরে পৌঁছোতে পারেনি।" "দু-সংখ্যা অনেক দূরের কথা স্যার, ওরা ক্যালকুলাসের বেসিক ইকুয়েশনগুলো পর্যন্ত ভুল করেছে। ওদের পেপারে নম্বর দেওয়ার মতো কিছু ছিল না।" বিদিশার গলা শান্ত থাকলেও তা অত্যন্ত দৃঢ়। ডক্টর বাগচীর মুখটা আরো গম্ভীর হয়ে উঠল। তিনি একটু সামনের দিকে ঝুঁকে এসে গলাটা খাদে নামালেন। "ইটস নট দ্যাট সিম্পল, মিস গাঙ্গুলি। আপনি হয়তো জানেন না আপনি ঠিক কাদের ফেল করিয়েছেন। এই তালিকার প্রতিটি স্টুডেন্ট অত্যন্ত প্রভাবশালী পারিবারিক ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে আসা। এদের কেউ পলিটিক্যালি কানেক্টেড, আবার কারোর পরিবার ট্রাস্টি বোর্ডের ঘনিষ্ঠ।" বিদিশা ভ্রু সামান্য কুঁচকালেন, যদিও ইঙ্গিতটা তার কাছে পরিষ্কার তবু তার ভেতরের শিক্ষক সত্তা সেটা মেনে নিতে নারাজ। "তার সঙ্গে আমার অঙ্কের খাতার কী সম্পর্ক, স্যার?" ড. বাগচী অসহিষ্ণু হয়ে টেবিলের ওপর রাখা একটা পেপারওয়েট ঘোরাতে শুরু করলেন। কাঁচের সাথে কাঠের ঘর্ষণে এক কর্কশ শব্দ গোটা ঘরে ছড়িয়ে পড়ল। "এটা আপনার আদর্শ জাহির করার জায়গা নয়। এদের সবার ফ্যামিলি কলেজের অন্যতম বড় ডোনার। একজনের গার্জেন গত বছর কলেজের লাইব্রেরি বিল্ডিংয়ের জন্য মোটা টাকা ডোনেশন দিয়েছিলেন। আমাদের কলেজকে 'ডিমড ইউনিভার্সিটি' করার প্রক্রিয়া চলছে, যার জন্য খুব শিগগিরই একটা বড় ফান্ডিংয়ের প্রয়োজন। এর একটা অংশ এদের থেকে আসার কথা। আপনি যদি এখন এই প্রভাবশালী ঘরের ছেলেদের ফেল করান, তবে সেই ফান্ডিং আটকে যেতে পারে। কলেজের এই বিশাল আর্থিক ক্ষতি কি আপনি সামলাতে পারবেন?" বিদিশা চুপ করে শুনে গেলেন। তার চোখের দৃষ্টি এক মুহূর্তের জন্যও কাঁপল না। ড. বাগচী এবার সুরটা একটু নরম করে বললেন, "খাতাগুলো আর একবার রি-চেক করুন। একটু গ্রেস মার্কস বা অন্য কোনোভাবে পাস মার্কসটা তুলে দিন। ম্যানেজমেন্ট খুশি থাকবে, আপনার ক্যারিয়ারও সুরক্ষিত থাকবে।" বিদিশা ধীরে ধীরে নিজের কোলের ওপর রাখা ফাইলটা বন্ধ করলেন। তার চোয়াল শক্ত, মেরুদণ্ড টানটান। তারপর সোজা ড. বাগচীর চোখের দিকে তাকিয়ে তিনি অত্যন্ত শান্ত, কিন্তু ইস্পাত-কঠিন গলায় বললেন, "স্যার, ম্যাথমেটিক্সে হয় উত্তর সঠিক, নয় ভুল। এটা কোনো ইতিহাস বা সাহিত্যের খাতা নয় যে পাতার পর পাতা বানিয়ে লিখলে নম্বর বাড়ানো যায়। এখানে উত্তর হয় ঠিক না হয় ভুল। অঙ্ক না মিললে নম্বর দেওয়ার কোনো জায়গা নেই। আমি ভুলকে সঠিক করার জন্য কলেজের থেকে বেতন নিই না।" ডক্টর বাগচী চমকে উঠলেন। তিনি নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছেন না। একটা বাচ্চা মেয়ে, এই সেদিন জয়েন করল, আজ তাকে মুখের ওপর না বলছে! তিনি এবার সজোরে পেপারওয়েটটা টেবিলের ওপর রাখলেন। "মিস গাঙ্গুলি, আপনি পরিস্থিতিটার গুরুত্ব বুঝতে পারছেন না!" ড. বাগচী প্রায় ধমকে উঠলেন। বিদিশা একটুও বিচলিত হলেন না, "আমি পরিস্থিতির গুরুত্ব ঠিকই বুঝেছি স্যার। কিন্তু, আমি এখানে অঙ্ক পড়াতে এসেছি, পলিটিক্স করতে বা ডোনেশন কালেক্ট করতে নয়।" "মিস গাঙ্গুলি, আপনি কিন্তু এবার নিজের সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছেন।", ডক্টর বাগচী এতক্ষণ যে উত্তপ্ত ভঙ্গিতে কথা চালাচ্ছিলেন সেটা হঠাৎ ঝেড়ে ফেলে এক অস্বাভাবিক শান্ত, বরফশীতল গলায় কথাগুলো উচ্চারণ করলেন। কথাটায় হুমকির সুর স্পষ্ট থাকলেও ড.বাগচীর চোখে-মুখে তার কোনরকম ছাপ পড়েনি। বিদিশা আর চেয়ারে বসে থাকার প্রয়োজন মনে করলেন না। তিনি ধীরভাবে উঠে দাঁড়ালেন। ড. বাগচীর চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে শীতল গলায় পাল্টা জবাব দিলেন, "আমার কলম দিয়ে এই দুর্নীতি হবে না, মিস্টার বাগচী। ট্রাস্টি বোর্ড যদি মনে করে যে কিছু টাকার জন্য তারা শিক্ষার মান বিক্রি করে দেবে, তাহলে আমার মতো টিচারের এই কলেজে না থাকাই ভালো।" কথাটা বলে ডক্টর বাগচীর মুখের দিকে আর একবারও না তাকিয়ে বিদিশা কেবিন থেকে বেরিয়ে এলেন। তার গোটা শরীর এই মুহুর্তে প্রবল বিতৃষ্ণায় রি-রি করছে। সবে একটা ধাক্কা কাটিয়ে কলেজে ফেরার পরে, নিজের বসের থেকে পাওয়া এইধরনের দুর্নীতির প্রস্তাব তাঁকে পুরোপুরি স্তম্ভিত করে দিয়েছে। গোটা বিষয়টা তিনি এখনও হজম করতে পারেননি। তার মনে উথালপাথাল চলছে। শুধু যে উত্তর তিনি ড. বাগচীকে দিয়েছেন তা নিয়ে বিদিশার মনে কোন সংশয় নেই। নীতির প্রশ্নে তিনি বরাবর আপসহীন। করিডোর দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় এত রাগ আর হতাশার মধ্যেও বিদিশার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠল। এই সামান্য কয়েক লাখ টাকার ডোনেশনের জন্য এরা শিক্ষার মান কোথায় নামিয়ে দিচ্ছে। বিদিশার বাবার রেখে যাওয়া যে অগাধ সম্পত্তি আছে, তার একটা সামান্য ভগ্নাংশ ছুঁড়ে দিলে এই ফান্ডিংয়ের আর দরকার পড়বে না। কিন্তু, বিদিশা তা কোনদিন করবেন না। তিনি এখানে তার বাবার টাকার পরিচয়ে পরিচিত হতে আসেননি। তিনি এখানে নিজের মেধার জোরে, নিজের যোগ্যতায় একটা পরিচয় তৈরি করতে এসেছেন। তাই এরকম একটা প্রস্তাব তাকে প্রচন্ড ক্রুদ্ধ করেছে। কিন্তু তাই বলে এরকম দুর্নীতির সঙ্গে আপস তিনি কিছুতেই মেনে নেবেন না। এটা তো একধরনের অপমান। সেজন্য তার চাকরি গেলে যাবে। তার বুকের ভেতরটা রাগে আর হতাশায় এখন তোলপাড় করছে। তিনি নিজের কেবিনে ফিরে এসে দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে ধপাস করে নিজের চেয়ারে বসে পড়লেন। বিকেল পাঁচটা, বিদিশার কেবিন সকালের ওই ঘটনার পর আজ সারাদিন বিদিশা প্রিন্সিপালের অফিসের থেকে ডাক আসার অপেক্ষা করছিলেন কিন্তু সেরকম কিছু আসেনি। বাকি দিনটায় আর তেমন উল্লেখযোগ্য কোনো ঘটনা ঘটেনি ঠিকই, কিন্তু ড. বাগচীর ওই কথাগুলো বিদিশা কিছুতেই মন থেকে ঝেড়ে ফেলতে পারছিলেন না। আজ সারাদিন কাজের চাপে নিজেকে ব্যস্ত রাখতে চাইলেও ডক্টর বাগচীর কণ্ঠস্বর সারাক্ষণ তাঁর কানে বেজে চলেছে। সেজন্য তিনি বারবার অন্যমনস্ক হয়ে যাচ্ছিলেন। বিদিশা মোটামুটি নিশ্চিত যে এখানে তার চাকরির মেয়াদ সীমিত। কলেজের ঝকঝকে ইমেজের আড়ালে চলতে থাকা এই ধরনের নোংরা দুর্নীতির সঙ্গে আপস করে টিকে থাকা তার পক্ষে সম্ভব নয়। দিন শেষ হবার মুখে, বাড়ি যাওয়ার জন্য যখন তিনি ব্যাগ গুছিয়ে নেবার জন্য চেয়ার ছেড়ে উঠবেন মনে করছেন, ঠিক সেই সময় দরজায় একটা মৃদু নক হলো। বিদিশা এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেলেন। তার বুকের ভেতরটা হঠাৎ ধক করে উঠল। এই অসময়ে কে হতে পারে ? অয়ন ? কাল কলেজে আবার জয়েন করার পর থেকে বিদিশা ওকে মেইন বিল্ডিংয়ের কোথাও একবারের জন্যও দেখতে পাননি। ছেলেটা হঠাৎ করে যেন ভোজবাজির মতো হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে। বিদিশা দ্রুত নিজের ডেস্কের ওপর ছড়িয়ে থাকা ফাইলগুলো গুছিয়ে নিলেন, যেন অয়ন এলে তাকে খুব ব্যস্ত দেখায়। আবার, পরক্ষণেই সেগুলো সরিয়ে রাখলেন। তার বুকের ভেতরটা একইসঙ্গে অজানা আশঙ্কায় আর প্রত্যাশায় ঢিপঢিপ করছে। ফেস্টের রাতের ঘটনা, প্রিন্সিপাল অফিসের সেই তিক্ততা আর তারপর তার ক্লাস থেকে অয়নের অনুপস্থিতি, সব মিলিয়ে বিদিশার মনের ভেতর যে অভিমানের পাহাড় জমেছিল, দরজার ওই একটা মৃদু টোকা নিমেষে যেন তা গলিয়ে দিল। তার মনের ভেতর একটা চাপা আশা জন্ম নিল। অয়ন হয়তো তার সেদিনকার আচরণের জন্য ক্ষমা চাইতে এসেছে। ছেলেমানুষ তো, এই কদিনে বোধহয় নিজের ভুল বুঝতে পেরেছে। তিনি মনে মনে নিজেকে তৈরি করতে লাগলেন। গলার স্বরটাকে সামান্য গম্ভীর করলেন, পরক্ষণেই ভাবলেন, নাহ, বেশি কড়া হওয়া ঠিক হবে না। ছেলেটা এমনিতেই বড্ড জেদি আর অভিমানী। হয়তো, এই ক'দিন অনুশোচনায় ভুগেছে, নিজের মধ্যেই গুটিয়ে ছিল। আজ ক্ষমা চাইতে এসেছে। বিদিশা নিজেকে বোঝালেন, ইতালির সেই রাতের ঘটনার কারণেই অয়ন তাকে নিয়ে একটু বেশি স্পর্শকাতর। নাহ, অয়ন এলে তিনি আজ আর বকবেন না। তিনি তো মা, তিনি ছাড়া আর কে বুঝবে ? শুধু ওর মাথায় হাত রেখে জিজ্ঞেস করবেন, সেদিন রাতে ও ওইরকম পাগলামি কেন করল...ওকে একটু বোঝাতে হবে...রক্ষাকর্তা হওয়ার জন্য গুন্ডামি করার প্রয়োজন পড়ে না। ওকে আশ্বস্ত করবেন যে, ওর মা নিজেকে সামলাতে জানে। ইতালির সেই বিভীষিকা তিনি বহুদিন আগেই জয় করেছেন। বিদিশা গভীর একটা শ্বাস নিয়ে বুকের ধুকপুকুনিটা শান্ত করার চেষ্টা করলেন। "কাম ইন", বিদিশা গলাটা যথাসম্ভব নরম করে বললেন। তার চোখদুটো দরজার দিকে স্থির। দরজার পাল্লাটা ধীরে ধীরে নড়ে উঠল আর বিদিশার বুকের ধুকপুকুনিটা ঠিক সেই তালে তাল মিলিয়ে বেড়ে গেল। এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো, সময়টা যেন থমকে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু অয়ন নয়। ভেতরে ঢুকলেন ম্যাথস ডিপার্টমেন্টের সিনিয়র টিচার, নন্দিতা দাশগুপ্ত। মধ্যবয়সী, কথা বলতে ভালোবাসেন ঠিকই, কিন্তু মানুষ হিসেবে খারাপ নন। চাকরিতে যোগ দেবার পর থেকে নন্দিতার থেকেই বিদিশা সবচেয়ে বেশি সাহায্য পেয়েছেন। বিদিশা নিজের মুখের হতাশাটাকে আপ্রাণ চেষ্টায় লুকিয়ে ফেলে মুখে একটা জোর-করা হাসি টেনে আনলেন। "আসুন নন্দিতাদি। বসুন।" নন্দিতা দরজাটা খুব সাবধানে ভেতর থেকে বন্ধ করে দিয়ে বিদিশার ডেস্কের সামনের চেয়ারটায় একটু ঝুঁকে বসলেন। চশমার ফাঁক দিয়ে তাঁর উদ্বিগ্ন চোখদুটো বিদিশার ওপর স্থির। তার মুখে একটা চাপা উৎকণ্ঠা। "বিদিশা, তুমি নাকি আজ সকালে ড. বাগচীর মুখের ওপর তর্ক করে এসেছ?", নন্দিতা অত্যন্ত নিচু গলায় ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করলেন। বিদিশা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। স্টাফরুমে কথা ছড়াতে বেশি সময় লাগে না, "তর্ক নয়, নন্দিতাদি। আমি শুধু আমার এথিক্সের কথাটা বলেছি। ফেল করা স্টুডেন্টদের আমি অন্যায়ভাবে পাস করাতে পারব না।" নন্দিতার চোখেমুখে আতঙ্ক খেলে গেল। বিদিশার ঋজু ভঙ্গি আর সাহসের বহর দেখে তিনি যেন নিজের অজান্তেই শিউরে উঠলেন। "সর্বনাশ করেছ বিদিশা! একদম সর্বনাশ! তুমি জানো না তুমি কার গর্তে হাত দিয়েছ। তুমি নতুন এসেছ, এই ঝকঝকে ক্যাম্পাস আর ডিসিপ্লিন দেখে ভাবছ সবটাই নিয়ম মেনে চলে? এখানে শুধু সিলেবাস শেষ করা আর পরীক্ষা নেওয়াটাই সব নয়।" বিদিশা ভুরু কুঁচকালেন। তার মুখে বিরক্তির চেয়ে বিস্ময়টাই বেশি, "কেন? ওরা ডোনারদের ছেলে বলে কি আইনের ঊর্ধ্বে? স্রেফ টাকার জোরে কি ওরা অংকে পাঁচ-দশ পেয়ে পাস করে যাবে?" "শুধু ডোনারদের ছেলে নয়" নন্দিতা গলাটা আরও নামিয়ে বললেন। "এই কলেজে এমন বেশ কিছু জিনিস আছে যাদের শেকড় অনেক তলা পর্যন্ত বিস্তৃত। তুমি যাদের ফেল করানোর সাহস দেখিয়েছ, তারা এক একটা পাওয়ার হাউসের অংশ। তুমি আগ্নেয়গিরির মুখে দাঁড়িয়ে আগুন নিয়ে খেলছ, বিদিশা। ওই ছেলেগুলো অত্যন্ত পাওয়ারফুল একটা গ্যাংয়ের অংশ। স্টুডেন্ট কাউন্সিলের যারা মাথা, এরা হলো তাদের একদম ইনার সার্কেলের লোক। এই ক্যাম্পাসের আন্ডারগ্রাউন্ড পলিটিক্সটা ওরাই কন্ট্রোল করে।" বিদিশা কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু নন্দিতা তাঁকে থামিয়ে দিয়ে ফিসফিস করে বললেন, "গ্যাংটা কিন্তু শুধু স্টুডেন্টদের উপর নয়, টিচারদের ওপরও মারাত্মক প্রভাব খাটায়। যারা এদের কথা শোনে না বা এদের অবাধ্য হয়, তাদের নামে এরা মিথ্যা অভিযোগ এনে ক্যারিয়ার নষ্ট করে দেয়। একবার ফিজিক্সের একজন কড়া স্যারকে এরা 'স্টুডেন্ট হ্যারাসমেন্ট'-র মিথ্যা কেস দিয়ে কলেজ থেকে তাড়াতে বাধ্য করেছিল। তুমি এদের সাথে ইগো ফাইট করতে যেও না।" বিদিশার চোখের দৃষ্টি তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল। এত নামী একটা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আড়ালে এরকম মাফিয়া রাজ চলছে, সেটা ভাবতেই তার রক্ত গরম হয়ে উঠল। নন্দিতা একটুখানি চুপ করে রইলেন, তারপর অফিসের দরজার দিকে সন্তর্পণে একবার তাকিয়ে নিয়ে বললেন, "আরেকটা কথা বলি বিদিশা, কিছু মনে কোরো না। ফেস্টের রাতে ব্যাকস্টেজে যা হয়েছে, সেটা অবশ্যই ঠিক হয়নি। একটা স্টুডেন্ট আরেকটা স্টুডেন্টের গায়ে হাত তুলবে, এটা মেনে নেওয়া যায় না। কিন্তু..." নন্দিতা হঠাৎ থেমে গেলেন। তার দ্বিধাগ্রস্ত চাউনি দেখে বিদিশা সোজা হয়ে বসলেন। মেরুদণ্ডটা তার অজান্তেই টানটান হয়ে গেল। "কিন্তু কী, নন্দিতাদি?" "ওই বিক্রম মালহোত্রা ছেলেটার থেকে একটু দূরত্ব বজায় রাখাই ভালো।" বিক্রমের নামটা শোনা মাত্রই বিদিশার বুকের ভেতরটা কেমন যেন ছ্যাঁত করে উঠল। ফেস্টের রাতে ওর আচরণ তিনি ভুলে যাননি। কোথাও একটা মনের কোণে তিনি যেন জানতেন, নন্দিতাদি ঠিক এই নামটাই নেবেন। এক অজানা আশঙ্কায় তাঁর স্নায়ুগুলো অবশ হয়ে এল। "গত বছর ওর জন্য হিস্ট্রির একজন ইয়াং ম্যাম শেষমেশ কলেজ ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন", নন্দিতা অত্যন্ত সিরিয়াস গলায় বললেন। "কী হয়েছিল কেউ ঠিক করে জানে না, কারণ পুরো ব্যাপারটাই ধামাচাপা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু, এই নিয়ে অনেক নোংরা রটনা আছে। ছেলেটা খুব একটা সুবিধার নয়।" বিদিশা পাথরের মতো বসে রইলেন। "আমি অনেকদিন এখানে আছি, বিদিশা", নন্দিতা উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বললেন। তার গলার স্বর বিষণ্ণ। "এইধরনের ছেলেরা যখন প্রয়োজনের বেশি 'হেল্পফুল' আর 'বাধ্য' হয়ে ওঠে, তখন বুঝতে হবে যে কোথাও একটা জাল বিছানো হচ্ছে। আমি জানি তুমি শিক্ষিতা, বুদ্ধিমতী। কিন্তু, এদেরকে একদম হালকাভাবে নিও না। নিজের দিকে একটু খেয়াল রেখ, সাবধানে থেকো।" কথাটা বলে নন্দিতা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে দরজার দিকে এগোলেন, "আমি চলি। যা বললাম, একটু মাথায় রেখো।" নন্দিতা দাশগুপ্ত বেরিয়ে যাওয়ার পর কেবিনটা আবার নিস্তব্ধ হয়ে গেল। কিন্তু বিদিশার মাথার ভেতর তখন হাজারটা সাইরেন একসাথে বাজতে শুরু করেছে। এমন নয় যে অয়নের আগে কেউ তাকে বিক্রম সম্বন্ধে সাবধান করেনি। তার আগে রাহুল বোস সতর্ক করেছিলেন। তারও আগে করিডরে বিক্রমের সাথে তার প্রথমবার দেখা হবার পর স্টাফরুমে অন্য কলিগরাও আকার-ইঙ্গিতে তাকে একই কথা বলেছিল। কিন্তু ফেস্টের রাতের আগে বিদিশা সেসব কথাকে পাত্তা দেননি। তার মনে হয়েছিল, 'একটা একুশ বছরের ছেলে আদৌ কতটা বিপদজ্জনক হতে পারে ?' কিন্তু এখন একা ঘরে বসে বিদিশার চোখের সামনে ফেস্টের রাতের সেই অস্বস্তিকর দৃশ্যটা আবার জীবন্ত হয়ে উঠল। বিক্রমের সেই হাঁটু গেড়ে বসা, ড্রেস ঠিক করে দেওয়ার অছিলায় তাঁর কোমরের খুব কাছে হাত রাখা। সেই স্পর্শটার মধ্যে যে লালসা আর কামার্ত ছোঁয়া ছিল, সেটা বিদিশার অভিজ্ঞ নারীমন সেদিন টেরও পেয়েছিল। কিন্তু সেইসময় পরিস্থিতির আকস্মিকতায় তিনি তখন হতভম্ব হয়ে পড়েছিলেন। তারপর, অয়ন হঠাৎ করে এসে না পড়লে বিষয়টা কোন দিকে মোড় নিত বলা কঠিন। সেই রাতের অসভ্যতার জন্য বিক্রমের একটা শাস্তি প্রাপ্য ছিল ঠিকই কিন্তু তারপর অয়ন যা করল ! সেই রক্তারক্তি কাণ্ড বিদিশার চিন্তাভাবনা, বিচারবুদ্ধিকে আচ্ছন্ন করে দিয়েছিল। অয়নের চরম প্রতিক্রিয়ার আড়ালে বিক্রমের অপরাধটা ঢাকা পড়ে গেল। ছুটি থেকে ফেরার পর থেকে তার সঙ্গে বিক্রমের আর দেখা হয়নি। কিন্তু আজ নন্দিতাদির কথা শুনে, একটা খচখচে অস্বস্তি এখন বিষের মতো তার মনের গভীরে ছড়িয়ে পড়ছে। এই ক্যাম্পাসের ঝাঁ-চকচকে রূপের আড়ালে একটা অন্ধকার ক্ষমতার কেন্দ্রের অস্তিত্ব রয়েছে, সেটা তো স্পষ্ট। কিন্তু, স্টুডেন্ট কাউন্সিলের সেক্রেটারি বিক্রম কী সেই চক্রের সাথে জড়িত ? যা শুনলেন তার কতটা সত্যি ? বিনা প্রমাণে কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা বিদিশার নীতিবিরুদ্ধ। কিন্তু, ফেস্টের রাতের ঘটনাটা তো মিথ্যে নয়। "ছেলেটা তাহলে কি সত্যিই যা দেখায় আসলে তা নয়?", বিদিশা নিজের মনে ফিসফিস করে বলে উঠলেন। নিজের গলার স্বর তার কাছে অচেনা ঠেকল। হঠাৎ তাঁর মনে পড়ল, সেদিন দুপুরের কথা, যেদিন অয়ন ঝড়ের মতো তাঁর কেবিনে ঢুকেছিল। সেদিন ও তার কেবিনে এসে কী যেন বলছিল ? "বিক্রমের ব্যাকগ্রাউন্ড ভালো নয়, ওর মতলব অন্য!" বিদিশার মনে প্রথমবারের জন্য একটা সূক্ষ্ম অপরাধবোধ জন্ম নিল। তিনি সেদিন অয়নকে কথা বলার সুযোগটুকুও দেননি। হয়তো সেদিন ও এই সম্পর্কেই কিছু বলতে এসেছিল। কি বলতে এসেছিল অয়ন ? শুনলে ভালো হত। বিদিশা চেয়ারে হেলান দিয়ে চোখ বুজলেন। না চাইতেও একটা অদ্ভুত শূন্যতা তাঁর মনকে গ্রাস করতে শুরু করল। |
|
« Next Oldest | Next Newest »
|