Thread Rating:
  • 40 Vote(s) - 3.4 Average
  • 1
  • 2
  • 3
  • 4
  • 5
Erotic Thriller মরীচিকা ও মোহময়ী
#61
চতুর্দশ অধ্যায়


কলেজের মেইন বিল্ডিংয়ের পেছনে পুরনো ছায়ানট ঘেরা একটা চত্বর আছে। জায়গাটা কলেজের পেছনের দিকে, বেশ নিরিবিলি, চারদিকে বড় বড় মেহগনি গাছের ছায়া। সাধারণ স্টুডেন্টরা সচরাচর এদিকে ঘেঁষার সাহস পায় না, জায়গাটা ওদের আনাগোনার বাইরে।

কারণ এখানে বিক্রম মালহোত্রা এবং তার গ্যাংয়ের একচেটিয়া রাজত্ব। এখানে বলে রাখা ভালো যে 'স্পোর্টস কোটা' হলেও কেউ কোনদিন বিক্রমকে খেলার মাঠে ঘাম ঝরাতে দেখেনি। তার বাবার অঢেল প্রতিপত্তি আর টাকার গরমই ছিল বিক্রমের আসল যোগ্যতা; যার প্রভাবে কোনো নিয়ম বা শাসন কোনদিন তার আয়েশি রাজত্বকে স্পর্শ করার সাহস পায়নি।

একটা পুরনো, বিশাল শিরীষ গাছের ছায়ায় রাখা কংক্রিটের বেঞ্চের ওপর পা তুলে আয়েশ করে বসে ছিল বিক্রম। দুপুরের কড়া রোদটা বিশাল শিরীষ গাছের পাতা ছুঁয়ে নিচে পড়ছে। বাতাসে একটা ভ্যাপসা গরম আর তার সাথে মিশে আছে দামি সিগারেটের তামাকের গন্ধ। কংক্রিটের বেঞ্চটার ওপর দুই পা তুলে দিয়ে বিক্রম এমনভাবে হেলান দিয়ে বসে আছে, যেন এই চত্বরটা ওর নিজের বাড়ির ড্রয়িংরুম । তার চোখে রে-ব্যান, শার্টের হাতা কনুই অবধি গোটানো। বিক্রমের ডান হাতের দুই আঙুলের ফাঁকে ধরা একটা দামি ফ্রেঞ্চ সিগারেট। সে একটা লম্বা টান দিয়ে ধোঁয়াটা রিং করে ওড়াল।

সামনে দাঁড়িয়ে রকি, সামির। তাদের চোখেমুখে ঔৎসুক্য। বিক্রমের ঠোঁটের কোণে একটা হাসি লেগে আছে। সেই হাসিতে কোনো নিরীহভাব নেই, বরং তার জায়গায় আছে অহংকার।

"ভাই, তুই তো কাল অনেকক্ষণ ছিলি কেবিনে। কী বুঝলি? মালটা কি আদৌ গলবে, নাকি শুধু শুধু টাইম ওয়েস্ট?" 

সামির একটা লাইটার হাতে নিয়ে ঘোরাতে ঘোরাতে জিজ্ঞেস করল।

বিক্রম হাতের সিগারেটটা বেঞ্চের হাতলে একবার ঠুকল। ছাইটা ঝরে পড়ল মাটিতে। 
"টাইম ওয়েস্ট? মালহোত্রারা কখনো ফালতু জায়গায় ইনভেস্ট করে না, সামির", বিক্রম চিবিয়ে চিবিয়ে বলল।

"তোরা মালটাকে বাইরে থেকে দেখছিস। একটা কড়া, অহংকারী অঙ্কের টিচার। কিন্তু কাল কেবিনের ভেতর আমি ওই প্রফেশনাল মুখোশটার পেছনে এক চিলতে দুর্বলতা দেখেছি।"

রকি একটু ঝুঁকে এল। "কীসের দুর্বলতা ভাই?"

"তৃষ্ণা, ভাই। প্রচণ্ড তৃষ্ণা," বিক্রম সিগারেটের ছাইটা বেঞ্চের গায়ে ঘষে ঝেড়ে ফেলল।

"আমি শিওর, মালটার পার্সোনাল লাইফে কোনো বড় ভ্যাকুয়াম আছে। কাল যখন আমি একটু ঝুঁকে ওর পারফিউমের প্রশংসা করলাম না, আমি স্পষ্ট দেখলাম ওর চোখদুটো এক সেকেন্ডের জন্য কেমন আনস্টেডি হয়ে গেল। গালের কাছে একটা লালচে আভা ফুটে উঠল।" 

বিক্রম অত্যন্ত নিচু তারে, রসালো গলায় বর্ণনা দেওয়া শুরু করল।

"লাস্ট দু-সপ্তাহে আমি বাজেট কমিটির বাহানায় জাস্ট ফিল্ডিং সাজাচ্ছিলাম। কাল কেবিনে বসে আমি প্রথমবার ওর দিকে সুতোটা ছুঁড়লাম। আর বিলিভ মি, মাছ টোপ গিলেছে।"

"ভাই, তুই কি সিরিয়াসলি বলছিস? মালটা সত্যিই তোর কথায় পটছে?", সামির চোখ বড় বড় করে জিজ্ঞেস করল।

"পটছে মানে? আমি জাস্ট সুতোটা একটু ঢিলে ছেড়েছি আর মাছটা নিজের থেকেই বঁড়শির দিকে এগিয়ে আসছে।"

রকি একটু অবাক হয়ে বলল, "কিন্তু বস, আমরা তো শুনেছিলাম মিস গাঙ্গুলি হেভি প্রাউড! কাউকে পাত্তাই দেয় না। অ্যাটিটিউড দেখে মনে হয় পুরো কলেজটাকে নিজের জুতোর তলায় রাখে। সে তোর টোপ গিলেছে?"

বিক্রম একটা ছোট, অহংকারী হাসি হাসল। 

"অ্যাটিটিউডটা শুধু বাইরের খোলস, সামির। ভেতরে ভেতরে এই ধরনের মেয়েছেলেরা ভীষণ ডেসপারেট হয়। জাস্ট ঠিক জায়গায় ট্রিগারটা প্রেস করতে হয়।"

সামির চোখ বড় বড় করে সব শুনছিল, "সত্যি?"

"অ্যাবসোলিউটলি," বিক্রম সিগারেটের ছাই ঝেড়ে একটা ছোট শ্বাস নিল, যেন কোনো অত্যন্ত উপাদেয় খাবারের স্বাদ মনে করার চেষ্টা করছে।

তারপর নিজের দুই হাত দিয়ে বাতাসে একটা নারীশরীরের শেপ আঁকল। তার চোখে একধরনের আদিম উল্লাস খেলা করছে।

"কাল ও একটা ওয়াইন-রেড রঙের শাড়ি পরেছিল। শাড়িটা ওর বডির সাথে এমনভাবে সেঁটে ছিল না! এসির হাওয়ায় যখন ও আমার দিকে ঝুঁকে ফাইলের হিসেব দেখাচ্ছিল...ওর শাড়ির আঁচলটা একটু সরে গিয়েছিল। জাস্ট এক ঝলক। উফফ! যা ফিগার না মাইরি! মাই গড! আমার তো প্যান্টের ভেতরটা জাস্ট লোহা হয়ে গিয়েছিল।"
বিক্রম কথাটা শেষ করে একটা কামার্ত আওয়াজ করল।

সামির আর রকি নোংরাভাবে হেসে উঠল।

"তারপর কী হলো বস? তুই কিছু বললি না?"

"ভাই, আমি তো জাস্ট পাগল হয়ে যাচ্ছিলাম। আমার তো মনে হচ্ছিল কালকেই কেবিনের দরজা বন্ধ করে ডেস্কের ওপর ফেলে..." বিক্রম হাসতে হাসতে রকির কাঁধে একটা চাপড় মারল। 

"বাট পেশেন্স ইজ দ্য কি। নিজের রূপ এবং মেধা নিয়ে ওর একটা মারাত্মক অহংকার আছে। যে মেয়ের ইগো যত বড়, তাকে নিজের ফাঁদে ফেলার রাস্তাটাও তত সোজা। মিস গাঙ্গুলি মনে করছে, সে নিজের চারপাশের সবকিছু কন্ট্রোল করছে। ওর ওই ইন্টেলেকচুয়াল ইগোটাকে আমি রোজ একটু একটু করে মাসাজ করছি।

আমার ওই মেপে মেপে বলা কথা, কাজের প্রতি ফেক ডেডিকেশন, সবকিছু ওর প্রফেশনাল ইগোর আড়ালে একটা ট্রাস্ট তৈরি করেছে। ও ভাবছে আমি একটা বাধ্য, ইনোসেন্ট স্টুডেন্ট যে ফেস্ট নিয়ে খুব ডেডিকেটেড। ওর ওই প্রফেশনাল, ইন্টেলেকচুয়াল ইগোর আড়ালে ও আমাকে একটা সেফ-জোন দিয়ে ফেলেছে।

আর কিছুদিন। জাস্ট আর কয়েকটা দিন। তারপর ওই শাড়ির ভাঁজ আমি খুলবই। দ্যাটস মাই গ্যারান্টি। আমার বিছানায় শুয়ে গোঙানো ছাড়া ওর কাছে আর কোনো রাস্তা থাকবে না। ফেস্টের আগে বা ফেস্টের রাতেই... ।"

বিক্রমের এই ঠান্ডা মাথার, সাইকোপ্যাথিক কথাবার্তা শুনলে যেকোনো সাধারণ মানুষের গা গুলিয়ে উঠবে। সে বিদিশাকে একজন মানুষ নয়, স্রেফ একটা শিকার, একটা ট্রফি হিসেবে তুলে ধরছে তার বন্ধুদের কাছে।

সামির আর রকি নোংরাভাবে হেসে উঠল। "গুরু, তোর কথা শুনে মনে হচ্ছে তুই এক মাসের আগেই বাজি জিতে যাবি!"

"বাজি তো আমি জিতবই," বিক্রমের চোখে এখন এক হিমশীতল আত্মবিশ্বাস। 

"ও যতই ফায়ারব্র্যান্ড হোক না কেন, আমার ওই 'গুড বয়' আর 'রেস্পেক্টফুল স্টুডেন্ট'-এর মুখোশটা ধরতে পারেননি।"

কয়েকঘন্টা আগে আজ সকালবেলা

কলকাতার চ্যাটার্জী বাড়ির সকালটা আজ অন্যদিনের চেয়ে একটু আলাদা।
মাস্টার বেডরুমের লাগোয়া বিশাল ড্রেসিং টেবিলের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন বিদিশা।

আজ তিনি একটা সি-গ্রিন রঙের হালকা সিল্কের শাড়ি পরেছেন। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে বিদিশা অত্যন্ত নিখুঁতভাবে শাড়ির কুঁচিগুলো ঠিক করছিলেন। 

তার সদ্য স্নান করা, খোলা চুল থেকে দামি শ্যাম্পুর একটা স্নিগ্ধ সুবাস সারা ঘরে মায়াজালের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। বিদিশা একটু ঝুঁকে আয়নার খুব কাছাকাছি গিয়ে অত্যন্ত যত্ন নিয়ে ঠোঁটে একটা গাঢ় শেডের লিপস্টিক লাগালেন। তারপর নিজের চোখে একটু কাজল টেনে পিছিয়ে এসে নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে একটা আলতো, তৃপ্তির হাসি হাসলেন।

সেই হাসিতে আজ আর কোন ক্লান্তি নেই, আছে এক স্বাধীন, আত্মবিশ্বাসী নারীর দীপ্তি। তার চোখের নিচের সেই কালশিটে পড়া বিষাদটা যেন জাদুমন্ত্রে উধাও হয়ে গেছে। একটা আলাদা গ্লো, একটা সতেজ আভা তার পুরো মুখমণ্ডলকে ভরিয়ে রেখেছে।

ওদিকে বাড়ির ড্রয়িংরুমে অরুণ সোফায় বসে খবরের কাগজের আড়ালে মুখ লুকিয়ে আছেন। তার চোখের দৃষ্টি খবরের পাতায় স্থির, কিন্তু মন অন্য কোথাও পড়ে আছে।

ঠিক সেই সময় সিঁড়ি দিয়ে নেমে এলেন বিদিশা।

অরুণ কাগজের পাশ দিয়ে অত্যন্ত সন্তর্পণে, লুকিয়ে তার দিকে আড়চোখে তাকালেন। 

বিদিশার চুলগুলো অত্যন্ত পরিপাটি করে বাঁধা। তার চোখে হালকা কাজল, ঠোঁটে একটা পিচ রঙের লিপস্টিক, যা তার ফর্সা ত্বককে আরও উজ্জ্বল করে তুলেছে। তার শরীর থেকে শ্যাম্পুর আর দামী পারফিউমের স্নিগ্ধ গন্ধ ভেসে আসছে।

অরুণের চোখের সামনে বিদিশা ড্রয়িংরুমের বিশাল আয়নাটার সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। নিজের শাড়ির আঁচলটা আরেকবার ঠিক করে নিলেন, তারপর ঠোঁটের কোণে একটা আত্মবিশ্বাসী হাসি ফুটিয়ে নিজের পার্সটা তুলে নিলেন।

অরুণের মনে একটা কুৎসিত সন্দেহের পোকা নড়াচড়া করে উঠল।

বিদিশা কলেজে কী করে ? রোজ এত পরিপাটি হয়ে সেজেগুজে কলেজে যায়? এই রূপ, এই সাজগোজ অন্য কারও জন্য? স্টাফরুমের কোনো পুরুষ কলিগ? নাকি অন্য কেউ? 

এই প্রশ্নগুলো অরুণের মাথার ভেতর ঘুরপাক খেতে লাগল।

এই নারী... এই আত্মবিশ্বাসী, রূপসী, স্বাধীন মহিলা কি সত্যিই তার স্ত্রী? বিদিশার চোখেমুখে একটা আলাদা দীপ্তি, একটা আনন্দের আভা, অরুণের মেলাতে কষ্ট হচ্ছে। অরুণের বুকের ভেতরটা এক অদ্ভুত অনুভূতিতে তোলপাড় হচ্ছিল। সে নিজের মনের ভেতরে উঁকি মেরে সেই অনুভূতিটার পরিচয় জানবার চেষ্টা করল। কিন্তু, সাহসের অভাব তাকে সেই অনুমতি দিল না।

ইতালির সেই রাতের মুছে যাওয়া স্মৃতি যা তাকে আজও ধাওয়া করে, যার জন্য প্রায়ই নিজেকে বারবার ব্যর্থ, কাপুরুষ মনে হয়— সেই সবকিছুর যুগলবন্দী একটা অদৃশ্য শেকল হয়ে অরুণের সত্তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলল। 

একটা দীর্ঘশ্বাস চেপে, কাপুরুষের মতো আবার খবরের কাগজের আড়ালে অরুণ নিজের মুখটা লুকিয়ে ফেলল। 

বিদিশা নিজের পার্সটা তুলে নিয়ে একবারও অরুণের দিকে না তাকিয়ে, হাই-হিলের খটখট শব্দ তুলে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।

অরুণ কাগজটা নামিয়ে রেখে ঠান্ডা হয়ে যাওয়া কফির কাপটা হাতে তুলে নিল। তার মনে হলো, সে যেন এক জীবন্ত মমি, যার চোখের সামনে দিয়ে জীবন প্রতিদিন একটু একটু করে তার হাতের মুঠোর ফাঁক দিয়ে বালির মতো ঝুর ঝুর করে খসে পড়ছে।

দুপুর দুটো, মেন বিল্ডিংয়ের তিনতলা, বিদিশার কেবিন

মেন বিল্ডিংয়ের থার্ড ফ্লোরের ম্যাথমেটিক্স ডিপার্টমেন্টের করিডোর ধরে অয়ন দ্রুত পায়ে, প্রায় ছুটতে ছুটতে বিদিশার কেবিনের দিকে আসছিল। জুতো আর মেঝের ঘর্ষণে একটা কর্কশ শব্দ প্রতিধ্বনিত হচ্ছে পুরো ফ্লোরে। ওর চোখমুখ লাল, নিঃশ্বাস দ্রুত পড়ছে, চুলগুলো এলোমেলো। 

অয়নের মনের ভেতরে একটা বিশাল ঝড় বয়ে চলেছে। এইমাত্র ক্যাফেটেরিয়ার পাশ দিয়ে আসার সময় বিক্রমের বন্ধুদের মুখে সে অস্পষ্টভাবে, নোংরা ফিসফিসানি শুনেছে। যদিও সে পুরো কথাটা শুনতে পায়নি, কিন্তু বিক্রমের নাম আর তার মায়ের প্রসঙ্গটা তার কানে ঠিকই পৌঁছেছে। তার মাথার ভেতর রক্ত ফুটছে। বিক্রমকে এর মূল্য চোকাতেই হবে।

কিন্তু, আপাতত সে তার দেবীতুল্য মাকে এই লম্পটটার ব্যাপারে আগাম সতর্ক করে দিতে চায়। সে জানে বিদিশা অত্যন্ত বুদ্ধিমতী। কিন্তু, নতুন জায়গায় এখনও সবাইকে চিনে উঠতে পারেননি।সেজন্য হয়তো তিনি মুখোশের আড়ালে ধূর্ত বিক্রমের আসল চেহারাটা ধরে ফেলতে পারছেন না। বিদিশাকে বাঁচানোর জন্য অয়ন সবরকম পন্থা নেবে। কিন্তু তার আগে তাকে সতর্ক করে দিতে হবে। দেরি করলে চলবে না।

দ্রুত হাঁটার চোটে ওর কপালে ঘামের সূক্ষ্ম বিন্দু জমেছে। তিনতলার শেষ প্রান্তে বিদিশার কেবিনের দরজার সামনে এসে ও হঠাৎ থমকে দাঁড়াল। 

বুকটা হাপরের মতো ওঠানামা করছে, হৃৎপিণ্ডটা যেন পাঁজরের হাড় ভেঙে বেরিয়ে আসতে চাইছে। কিছুক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে নিজের আলুথালু শ্বাস আর অবাধ্য উত্তেজনাকে বশ করার চেষ্টা করল সে। তারপর একটা দীর্ঘ, গভীর শ্বাস নিয়ে কাঁপাকাঁপা হাতে দরজায় নক করল।

কেবিনের দরজা অর্ধেক ভেজানো।

"কাম ইন।"

অয়ন দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল। ভেতরে এয়ার কন্ডিশনারের একটানা, একঘেয়ে গুনগুন শব্দ।

বিদিশা ডেস্কে বসে ফার্স্ট ইয়ারের অ্যাসাইনমেন্ট চেক করছিলেন। কালচারাল ফেস্টের কাজগুলো তাকে রীতিমতো প্রেশারে রেখেছে। তার জন্য যাতে ক্লাসের পড়ানোয় ফাঁক যাতে না থাকে সেজন্য তিনি সদা সতর্ক।

অয়নকে দেখে তার হাত এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল। তার ভ্রু সামান্য কুঁচকে এল।

"তুমি? এখানে? কী ব্যাপার ?" 

বিদিশা পেনটা নামিয়ে রেখে জিজ্ঞেস করলেন।

বিদিশার গলায় কোনো মাতৃসুলভ উষ্ণতা নেই, আছে একজন কড়া প্রফেসরের বিরক্তি।

অয়ন দরজাটা পেছন থেকে বন্ধ করে দিল। এসির একটানা গুনগুন আওয়াজ আর বিদিশার সেই ল্যাভেন্ডার পারফিউমের গন্ধ কেবিনের পরিবেশটাকে একটা অদ্ভুত থমথমে রূপ দিয়েছে।

"মা... আই মিন, মিস গাঙ্গুলি। আমার একটা কথা ছিল" 

অয়ন টেবিলের সামনে এসে দাঁড়াল। তার হাত দুটো প্যান্টের পকেটে শক্ত করে মুঠি পাকানো।

"বলো। অ্যাকাডেমিক কোনো প্রবলেম?" 

বিদিশা পেনটা নামিয়ে রেখে হাত দুটো বুকের কাছে ক্রস করে বসলেন। তার এই বডি ল্যাঙ্গুয়েজটাই দুজনের মধ্যে একটা অদৃশ্য দেওয়াল তুলে দিল।

"অ্যাকাডেমিক নয়। এটা... এটা বিক্রম মালহোত্রাকে নিয়ে", অয়নের গলাটা একটু কেঁপে গেল।

বিক্রমের নাম শুনতেই বিদিশার মুখটা ইস্পাতের মতো কঠিন হয়ে গেল। তার চোয়াল শক্ত হলো, ভ্রু দুটো কুঁচকে উঠল।

"বিক্রমকে নিয়ে তোমার কী সমস্যা?"

অয়ন বুঝতে পারছিল না সে কীভাবে কথাটা বলবে। তার কথা আটকে যাচ্ছে। সে তো বিক্রমের সেই নোংরা ফ্যান্টাসি, ক্যাফেটেরিয়ার বাজির কথা নিজের মুখে উচ্চারণ করতে পারবে না! 

যে মাকে সে মনে মনে পুজো করে। একটা ছেলে হয়ে সে কীভাবে তাকে বলবে যে কলেজের ছেলেরা তার শরীর নিয়ে বাজি ধরছে?

না। 

অয়ন একজন ছেলে হয়ে নিজের মায়ের সামনে এই নোংরা, অশালীন শব্দগুলো উচ্চারণ করতে পারবে না। তার জিভ আড়ষ্ট হয়ে আসছে। সমাজ, সম্পর্ক আর নিজের ভেতরের অবদমিত কমপ্লেক্সিটি - সবকিছু মিলে তার গলা টিপে ধরেছে।

অয়নের গলার কাছে শব্দগুলো আবার দলা পাকিয়ে গেল।

"ছেলেটার নজর ভালো নয়..." অয়ন খুব কষ্ট করে, কোনরকমে বলতে শুরু করল। 

"ওর ব্যাকগ্রাউন্ড খুব খারাপ। ওর মতলব অন্য, ও আপনাকে ফেস্টের নাম করে ম্যানিপুলেট করার চেষ্টা করছে। প্লিজ, ওকে আপনি এত সহজে আপনার কেবিনে আসার পারমিশন দেবেন না।"

অয়ন কথাগুলো প্রায় এক নিঃশ্বাসে বলে ফেলল।

কথাগুলো শোনার পর কেবিনে কয়েক সেকেন্ডের জন্য একটা হিমশীতল নিস্তব্ধতা নেমে এল। শুধু এসির গুনগুন আওয়াজটা শোনা যাচ্ছে।

বিদিশা ধীরে ধীরে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। তার চোখদুটো এখন রাগে বড় বড় হয়ে গেছে, সঙ্গে মিশে আছে তীব্র বিরক্তি। 

তার কলিগরা যখন বিক্রম নিয়ে তাকে সতর্ক করেছিল, যখন রাহুল বোস বিক্রম নিয়ে তাকে সতর্ক করেছিলেন, তখন বিদিশা সেগুলো ফুৎকারে উড়িয়ে দিয়েছিলেন। 

কিন্তু, আজ অয়নের মুখে সেই এক সাবধানবাণী শুনে তিনি তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলেন। তার মনে হল অয়নকে তিনি যা করতে বারণ করেছিলেন ও সেটা আবার শুরু করে দিয়েছে - তার জীবন নিয়ে অনধিকারচর্চা। এখানে তিনি কারোর মা, কারোর স্ত্রী হিসাবে নয়, নিজের পরিচয়ে প্রতিষ্ঠিত হতে এসেছেন। কিন্তু সবাই মিলে যদি সবসময় তার বুদ্ধিমত্তাকে ছোট করে দেখে, নিজের ছেলে সারাক্ষণ ওর উপর ছড়ি ঘোরাতে চেষ্টা করে তাহলে সেটা কীভাবে সম্ভব ?

বিদিশার মাথায় এটা একবারও এল না, যে অয়ন সেদিন রাতে ইতালিতে তাকে বাঁচিয়েছিল বলেই আজ তিনি এই চেয়ারটায় বসে আছেন। নয়তো, আজ তিনি কোথায় পড়ে থাকতেন তার কোন ঠিকঠিকানা থাকত না।

"মিস্টার চ্যাটার্জী" 

বিদিশার গলার স্বরটা এতটাই তীক্ষ্ণ আর শীতল ছিল, যে অয়নের মনে হলো কেউ যেন তাকে চাবুক মারল। 

"আমি কার সাথে মিশব, কাকে আমার কেবিনে আসতে দেব আর কাকে দেব না, সেটা সম্পূর্ণ আমার প্রফেশনাল এবং পার্সোনাল ডিসিশন। সেই শিক্ষা আমায় আপনার থেকে নিতে হবে না।"

অয়নের পায়ের তলার মাটিটা যেন এক মুহূর্তের জন্য সরে গেল। সে আশা করেছিল বিদিশা তাকে একটু হলেও গুরুত্ব দেবেন, তার উদ্বেগকে বুঝবেন। সে জায়গায় তার এই অপমান, ওর আর বিদিশার মাঝখানে হিমালয় সমান এক দূরত্ব তৈরি করে দিল। ওর বুকের ভেতরটা অপমানে আর অভিমানে দুমড়ে-মুচড়ে গেল, চোখের কোণটা একবার জ্বলে উঠলেও...

"কিন্তু আপনি বুঝতে পারছেন না! ও ভীষণ বাজে ছেলে! ও আপনাকে-" অয়ন মরিয়া হয়ে আবার বলতে গেল।

"স্টপ!" 

বিদিশা ডান হাতটা তুলে তাকে থামিয়ে দিলেন। "ডোন্ট ক্রস ইওর লিমিটস। নিজের পড়াশোনায় মন দিন। আপনি আমার ব্যক্তিগত গার্ড নন। আমার নিজের ভালো-মন্দ বোঝার বয়স হয়েছে। আপনি কি আমাকে এতটা অক্ষম ভাবেন যে একটা একুশ বছরের ছাত্র আমাকে তার হাতের তালুতে রেখে নাচাবে আর আমি সেটা বুঝতে পারব না?"

অয়ন যেন পাথর হয়ে গেল। 

'ডোন্ট ক্রস ইওর লিমিটস', কথাগুলো তার মস্তিষ্কে হাতুড়ির মতো আঘাত করল। সে দেখল বিদিশার চোখে তার প্রতি কোনো বিশ্বাস নেই, বদলে আছে একরাশ চরম বিরক্তি।

"বিক্রম আমার ছাত্র, ও খুব হেল্পফুল। ও বাজেটের কাজ নিয়ে অত্যন্ত সিরিয়াস", বিদিশা অত্যন্ত কঠোর গলায় বললেন। তিনি একটুও থামলেন না। 

কথা বলতে বলতে তার গলা আগের চেয়েও তীক্ষ্ণ, ধারালো হয়ে উঠল। 

"আপনার এই সংকীর্ণ মানসিকতা আর অদ্ভূত ঈর্ষা আমায় সত্যিই অবাক করছে। আপনি হয়তো ভাবছেন আমি আপনার মা, তাই আমার ওপর আপনার একটা অধিকার আছে। কিন্তু এই ক্যাম্পাসের ভেতরে আপনি শুধুই ফার্স্ট ইয়ারের একজন স্টুডেন্ট।"
বিদিশা আবার নিজের চেয়ারে বসে পড়লেন। 

"জেলাসি? ভিত্তিহীন?" অয়ন অস্ফুটে বলে উঠল, তার গলা দিয়ে যেন স্বর বেরোচ্ছে না।
অয়নের মনে হলো তার বুকের ভেতর কেউ একটা ধারালো ছুরি ঢুকিয়ে সেটাকে মুচড়ে দিল। 'সংকীর্ণ মানসিকতা', 'জেলাস'! এই শব্দগুলো তাকে ভেতর থেকে ছিন্নভিন্ন করে দিচ্ছিল।

"আমার প্রফেশনাল লাইফ এবং আমি কার সাথে মিশব, সেটা নিয়ে আপনার মাথা ঘামানোর বিন্দুমাত্র প্রয়োজন নেই", বিদিশা এবার একটা ফাইল টেনে নিয়ে আবার পেনের ঢাকনা খুললেন, যেন অয়নের অস্তিত্বটাই তার কাছে এখন বিরক্তিকর।

"আপনার এই 'চাইল্ডিশ জেলাসি' আমার প্রফেশনাল লাইফে ডিস্টার্ব করছে। ইফ ইউ হ্যাভ নাথিং এলস টু সে, ইউ মে লিভ।"

'চাইল্ডিশ জেলাসি', শব্দদুটো অয়নের কানে গলিত সীসার মতো ঢুকল। তার মা... তার দেবী... তাকে একজন অপরিপক্ব, হিংসুটে বাচ্চা ছেলে বলে অপমান করলেন? আর কার জন্য? ওই লম্পট, সাইকোপ্যাথ বিক্রম মালহোত্রার জন্য? 

সে এই নারীটির পবিত্রতা রক্ষা করার জন্য ইতালিতে নিজের হাতে একটা রাক্ষসকে খুন করতে গেছিল। আর, আজ সেই নারীটি তাকে একটা হিংসুটে বাচ্চা ছেলে বলে উড়িয়ে দিচ্ছে! 

তার ভালোবাসা, সন্তান হিসাবে তার অধিকারবোধ, তার তীব্র প্রটেকটিভ ইনস্টিংক্ট - সবকিছুকে বিদিশা আজ তার জুতোর তলায় পিষে দিলেন। অপমান, রাগ আর চরম অসহায়তায় অয়নের চোখদুটো রক্তবর্ণ হয়ে উঠল। তার কপালের রগগুলো দপদপ করতে লাগল। কিন্তু সে আর একটা কথাও বলল না। 

অয়ন বুঝতে পারল, সে যতই তার মাকে রক্ষা করার চেষ্টা করুক না কেন, বিদিশাকে বোঝানো অসম্ভব। বিদিশার কাছে এই মুহূর্তে তার পরিচয় শুধুই একজন অবাধ্য, অধিকার ফলানো ছেলের। 

আর একটাও কথা না বলে সে বিদিশার চোখের দিকে শেষবারের মতো একবার তাকিয়ে কেবিন থেকে বেরিয়ে এল। তার চোয়ালের পেশিগুলো পাথরের মতো শক্ত হয়ে উঠেছে। 

অয়ন যে পথ ধরে এসেছিল, সেই পথ ধরে ফিরে যাচ্ছে। 

তার কান ঝাঁ ঝাঁ করছে। "আপনি আমার ব্যক্তিগত গার্ড নন... চাইল্ডিশ জেলাসি... ডোন্ট ক্রস ইওর লিমিটস..." কথাগুলো একটা লুপের মতো তার মাথায় বাজতে শুরু করেছে। 

হাঁটতে হাঁটতে অয়ন কখন বাথরুমে চলে এসেছে সে নিজেই জানে না। খেয়াল হবার পর দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ করে অয়ন বাথরুমের দেওয়ালে একটা সজোরে ঘুসি মারল। তার হাতের হাড়গুলো ব্যথায় টনটন করে উঠল বটে, কিন্তু তার বুকের ভেতরের যন্ত্রণার কাছে এই ব্যথাটা কিছুই নয়। তার মা আজ একটা লম্পটের জন্য তাকে অপমান করে তাড়িয়ে দিয়েছে।

এখন ওর কতটা অসহায় লাগছে সেটা ও কারোর সাথে ভাগ করে নিতে পারবে না। এই দমবন্ধ করা অনুভূতি, এই জ্বালা আজ ও অন্য কোথাও উগরে দেবে। 

আজ বিকেলে কলেজের মাঠে ইন্টার-ডিপার্টমেন্টাল টুর্নামেন্টের সেমি-ফাইনাল ম্যাচ আছে। অয়নের মাথার ভেতর এখন শুধু একটাই চিন্তা ঘোরাফেরা করছে - ধ্বংস
[+] 4 users Like RockyKabir's post
Like Reply
Do not mention / post any under age /rape content. If found Please use REPORT button.
#62
মেইন বিল্ডিংয়ের তিনতলার বিদিশার শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত, নিস্তব্ধ কেবিন আর কলেজের পেছনের সেই রুক্ষ, ধুলোয় ওড়া ফুটবল মাঠ।

দুটো সম্পূর্ণ আলাদা জগৎ, অথচ এক অদ্ভুত সুতোয় বাঁধা। 

দুটো জায়গাতেই একই সাথে খেলা চলছিল। একদিকে বিদিশার কেবিনে চলছিল সূক্ষ্ম মনস্তাত্ত্বিক এক দাবা খেলা, যেখানে বিক্রম তার অভিনয়ের চালে বিদিশার বিশ্বাসকে একটু একটু করে গ্রাস করছিল। 

অন্যদিকে, দুপুরবেলা ফুটবল মাঠে চলছিল এক আদিম দৈহিক শক্তির লড়াই। সেখানে অয়নের পায়ের প্রতিটি শট যেন বিদিশার দেওয়া অপমানের তীব্র জবাব হয়ে উঠছিল।

একটা খেলা চলছিল বিশ্বাসের আড়ালে বিশ্বাসঘাতকতার আর অন্যটা চলছিল ধ্বংসের আড়ালে নিজেকে খুঁজে পাওয়ার।


(কেবিন)

ডেস্কের ওপাশে দাঁড়িয়ে আছে বিক্রম মালহোত্রা। তার হাতে স্পনসরশিপের একটা ব্রোশিওর। সে অত্যন্ত মোলায়েম, সম্মানজনক ভঙ্গিতে একটু ঝুঁকে বিদিশাকে ব্রোশিওরের ডিজাইনটা দেখাচ্ছে।

"ম্যাম, আপনি যদি এই ব্যানারটার প্লেসমেন্টটা দেখেন, মেইন স্টেজের ঠিক ডানদিকে..." 

বিক্রমের ভরাট, ব্যারিটোন গলাটা কেবিনের নিস্তব্ধতায় একটা অদ্ভুত মাদকতা তৈরি করছিল। সে ইচ্ছে করেই একটু বেশি ঝুঁকে ছিল, যাতে তার ফ্রেঞ্চ কোলনের সুবাসটা বিদিশার নাকে পৌঁছায়।

বিদিশা সি-গ্রিন শাড়ির আঁচলটা একটু টেনে ব্রোশিওরটার দিকে তাকালেন। তার চোখে নির্ভরতা যদিও সেটায় পেশাদারিত্ব ছাড়া আর কিছু নেই। 

"হুঁ, প্লেসমেন্টটা পারফেক্ট। তুমি সত্যিই খুব ডিটেলে কাজ করো, বিক্রম।"

(কাট টু)

খেলার মাঠে তখন প্রথমার্ধের শেষ বাঁশি বাজার আর মাত্র কয়েক মিনিট বাকি। অয়ন বল পেল। তার কপালের ঘাম চিবুক বেয়ে টপটপ করে মাটিতে পড়ছে।

ওর চোখের সামনে এখন কোনো ডিফেন্ডার নেই, বদলে সে দেখতে পাচ্ছে বিক্রমের ওই ধূর্ত হাসিটা। অয়ন বল নিয়ে চরম স্পিডে বক্সের দিকে ঢুকল। দুজন প্লেয়ার তাকে আটকাতে এল, কিন্তু তীব্র গতিতে ছুটে চলা অয়ন একটা শারীরিক মোচড়ে দুজনকেই ছিটকে দিল।

শট নেবার আগে তার পুরো শরীরটা যেন একটা ধনুকের মতো বেঁকে গেল। তার সমস্ত অপমান, তার সমস্ত অবদমিত হতাশা - সবকিছু সে ওই একটা শটে উগরে দিল।

বুম!

বলটা গোলকিপারের হাতের পাশ দিয়ে বুলেটের মতো গিয়ে নেটে আছড়ে পড়ল।

১ -০

(কেবিন)

এসির মৃদু, একঘেয়ে গুনগুন শব্দ। জানলার ব্লাইন্ডস গলে আসা বিকেলের নরম, কমলা আলোটা বিদিশার মেহগনি কাঠের ডেস্কের ওপর একটা স্নিগ্ধ, আরামদায়ক পরিবেশ তৈরি করেছে। 

বিদিশার শরীর থেকে ভেসে আসা চন্দন আর ল্যাভেন্ডারের সেই সিগনেচার পারফিউমের গন্ধে পুরো কেবিনটা ম-ম করছে।

ডেস্কের উল্টোদিকে বসে আছে বিক্রম মালহোত্রা। তার মুখে সেই নিখুঁত, জেন্টলম্যানের মুখোশ। সে অত্যন্ত বিনয়ের সাথে, একটু ঝুঁকে একটা স্পনসরশিপের কাগজ বিদিশার দিকে এগিয়ে দিল।

"ম্যাম, এই এগ্রিমেন্টটায় আপনার একটা সিগনেচার লাগবে। আমি ভেন্ডারের সাথে কথা বলে রেটটা আরও পাঁচ হাজার কমিয়ে দিয়েছি," বিক্রমের গলাটা মধুর মতো মোলায়েম, কিন্তু তার সানগ্লাসের আড়ালে থাকা চোখদুটো বিদিশার ব্লাউজের নেকলাইনের ওপর স্থির।

(মাঠ)

অয়ন চ্যাটার্জীর চোখে আজ কোনো স্পোর্টসম্যান স্পিরিট নেই। তার চোখদুটো লাল, কপালের শিরাগুলো ফুলে উঠেছে। তার কানের কাছে ক্রমাগত বেজে চলেছে কয়েক ঘণ্টা আগের সেই হিমশীতল, অপমানজনক কথাগুলো "সংকীর্ণ মানসিকতা... চাইল্ডিশ জেলাসি... ডোন্ট ক্রস ইওর লিমিটস!"

বিপক্ষের একজন মিডফিল্ডার বল নিয়ে এগোচ্ছিল। অয়ন একটা বন্য চিতার মতো দৌড়ে গেল। তার মাথার ভেতর তখন লাভা ফুটছে। সে কোনো ট্যাকটিক্স মানল না, সরাসরি একটা মারাত্মক স্লাইডিং ট্যাকল করল। ছেলেটা টাল সামলাতে না পেরে সজোরে আছড়ে পড়ল শক্ত মাটির ওপর। ধুলো উড়ে গেল চারদিকে। 

রেফারি হলুদ কার্ড দেখালেন, কিন্তু অয়নের কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। ফাউল করার আগের মুহূর্তে তার চোখের সামনে মাঠে পড়ে থাকা ছেলেটার মুখের জায়গায় বিক্রমের মুখটা ভাসছিল।

(কেবিন)


বিদিশা বিক্রমের হাত থেকে কাগজটা নিলেন। নেওয়ার সময় বিক্রমের আঙুল খুব সন্তর্পণে, অত্যন্ত 'ক্যাজুয়ালি' বিদিশার নরম আঙুল ছুঁয়ে গেল। বিদিশা সেটাকে পাত্তাই দিলেন না, কারণ তার চোখে বিক্রম একজন নিবেদিতপ্রাণ ছাত্র মাত্র।

"থ্যাংক ইউ বিক্রম," বিদিশা কাগজে সই করতে করতে একটা তৃপ্তির হাসি হাসলেন। "তুমি না থাকলে কালচারাল ফেস্টের এই বাজেটটা এত সহজে সামলানো মুশকিল হতো। তোমার ডেডিকেশন সত্যিই ইমপ্রেসিভ।"

বিক্রমের ঠোঁটে একটা বিনীত, লাজুক হাসি ফুটে উঠল। "ইটস মাই প্লেজার, ম্যাম। আমি শুধু আপনার কাজটা একটু সহজ করার চেষ্টা করছি।" এই নিরীহ কথার আড়ালে তার মনের অভিসন্ধিটা বিদিশার কাছে সম্পূর্ণ অধরাই থেকে গেল।

(মাঠ)

অয়ন বল পেয়েছে। রাইট উইং ধরে সে একাই ঝড়ের বেগে উঠে যাচ্ছে। প্রতিপক্ষ দলের দুজন হেভিওয়েট ডিফেন্ডার তাকে ব্লক করার জন্য এগিয়ে এল।

"ওর মতলব অন্য... ও আপনাকে হেল্প করার নাম করে আসলে..." তার সাবধানবাণীগুলো যেন তাকেই তীব্র উপহাসে বিদ্ধ করছে। যে মাকে সে দেবী রূপে ভক্তি করে, সেই মা আজ একটা লম্পটের কাছে নিজেকে উন্মুক্ত করছে, তার মিথ্যে অভিনয়ে গলে যাচ্ছে আর নিজের ছেলেকে অপমান করে তাড়িয়ে দিচ্ছে!

এই মানসিক আঘাতের চরম ক্ষতটা আজ ওকে শক্তিতে জোগাচ্ছে। অয়ন বলটা সাইডকাট করে প্রথম ডিফেন্ডারের দিকে সরাসরি দৌড়ে গেল, ছেলেটা ট্যাকল করার আগের মুহূর্তে অয়ন একটা ব্লাইন্ড টার্ন নিল, সে স্রেফ ছিটকে গেল। দ্বিতীয় জনকে বোকা বানিয়ে ও সোজা বক্সে ঢুকে পড়ল। 
সামনে একা গোলকিপার।

২-০

(কেবিন)

"আপনার কফিটা একদম ঠান্ডা হয়ে গেছে, ম্যাম," বিক্রম অত্যন্ত যত্নশীল গলায় বলল। সে নিজের জায়গা থেকে সামান্য উঠে, ডেস্কের একপাশে রাখা ফ্লাস্ক থেকে ধোঁয়া ওঠা গরম কফি ঢালল বিদিশার মগে।

"ইউ ওয়ার্ক টু হার্ড। ফেস্টের এত প্রেসারের মধ্যে আপনার নিজের একটু খেয়াল রাখা উচিত।" বিক্রমের গলার স্বরে এমন একটা নিখুঁত দরদমাখা ভাব ছিল, যা যেকোনো নারীর ইগোকে তুষ্ট করতে বাধ্য।

বিদিশা কফির মগটা হাতে তুলে নিলেন। তার ঠোঁটের কোণে একটা তৃপ্তির হাসি। সকালে অয়নের ওই 'অবাধ্যতা'র পর বিক্রমের এই ভদ্র এবং পরিণত আচরণ তাকে মানসিকভাবে অনেক রিল্যাক্স করে দিল। বিক্রমের এই ভদ্রতা আর পরোপকারী স্বভাব তার অবচেতন মনকে একটা অদ্ভুত স্বস্তি দিচ্ছিল।

"থ্যাংক ইউ, বিক্রম। তুমি বেশ ম্যাচিওরড।"

বিক্রম আরেকটু সামনে ঝুঁকল। "ম্যাম, ফেস্টের দিন আপনাকে কিন্তু ট্রেডিশনাল শাড়িতেই দেখতে চাই। স্টুডেন্টরা সবাই আপনার ড্রেসিং সেন্সের ফ্যান।"

বিদিশা পেনটা রেখে একটু হাসলেন। তার নারীমন এই প্রশংসায় একটু হলেও তৃপ্ত হলো।

"দেখা যাক। আগে ফেস্টের কাজগুলো ঠিকঠাক মিটুক।"

(মাঠ)

অয়ন বক্সের একদম ভেতরে, সামনে বাধা বলতে শুধু গোলকিপার। সে ডাইভ দেওয়ার জন্য শরীর টানটান করে তৈরি।

অয়ন বাঁ পা দিয়ে একটা কামানের গোলার মতো শট নিল।

বলটা হাওয়ায় একটা বাঁক খেয়ে গোলকিপারের হাতের অনেক ওপর দিয়ে সোজা ক্রসবারের নিচের কোণায় গিয়ে প্রচণ্ড শব্দে আছড়ে পড়ল। বলটা নেটের ভেতর জড়িয়ে যেতেই সাইডলাইন থেকে রনি আর কবীরের চিৎকার উঠল। 

গোল!

৩-০ ! হ্যাটট্রিক !

কিন্তু অয়ন সেলিব্রেট করল না। সে মাঠের ধুলোর ওপর হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। তার বুকটা হাপরের মতো ওঠানামা করছে। ঘাম আর ধুলোয় মাখামাখি তার মুখটা ঘাসের দিকে নামানো। তার মনের ভেতরে যে কালবৈশাখী চলছিল, এই গোলের পরও সেটা বিন্দুমাত্র শান্ত হলো না।

একটু পরে ম্যাচ শেষ হল। ফার্স্ট ইয়ার ফিজিক্স আজ একতরফাভাবে খেলে ফাইনালে উঠেছে আর সেটা সম্ভব হয়েছে শুধুমাত্র আজকে অয়নের এই ধ্বংসাত্মক পারফরম্যান্সের সৌজন্যে।

অয়ন মাঠের ধার দিয়ে একা হেঁটে আসছে। তার সাদা জার্সিটা এখন কাদা আর ঘামের ছোপে কালচে হয়ে গেছে। ঘামে ভিজে সেটা বুকের সাথে লেপ্টে আছে। মাথার চুলগুলো অবাধ্যভাবে কপালের ওপর এসে পড়েছে। যেন সে প্রাচীন যুগের রক্তাক্ত, শ্রান্ত এক গ্ল্যাডিয়েটর। এইমাত্র লড়াই শেষ করে ফিরল।

সাইডলাইনের একদম কাছে, একটা গাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে ছিল চন্দ্রিমা সেন। তার হাতে একটা মিনারেল ওয়াটারের ঠান্ডা বোতল। বরফগলা জলের বিন্দুগুলো বোতলের গা বেয়ে তার পারফেক্ট ফ্রেঞ্চ-ম্যানিকিওর করা আঙুল ছুঁয়ে গড়িয়ে পড়ছে । এসির বাইরে, এই ভ্যাপসা গরমে, চন্দ্রিমা সেন দেড় ঘন্টা ধরে দাঁড়িয়ে তার জন্য অপেক্ষা করছে, এটা ক্যাম্পাসের যেকোনো ছেলের কাছে একটা স্বপ্নের মতো ব্যাপার। 

অয়নকে মাঠ থেকে বেরিয়ে আসতে দেখেই চন্দ্রিমা ওর দিকে এগিয়ে গেল।

"হেই..." চন্দ্রিমার গলাটা একটু কাঁপল। তার ঠোঁটে একটা গ্ল্যামারাস, মোহময়ী হাসি, যা দিয়ে জীবনে আজ পর্যন্ত সে যাকে ইচ্ছা তাকে নিজের আঙুলের ডগায় নাচিয়েছে।

অয়ন থমকে দাঁড়াল।

চন্দ্রিমা জলের বোতলটা অয়নের দিকে এগিয়ে দিল। ওর অফ-শোল্ডার ক্রপ টপের ওপর দিয়ে ফর্সা কাঁধদুটো আলোয় চকচক করছে।

"গ্রেট গেম। জল খাবে?"

অয়ন ধীরে ধীরে মুখ তুলে চন্দ্রিমার দিকে তাকাল। চন্দ্রিমা আশা করেছিল ওকে দেখে ছেলেটার চোখে একটা মুগ্ধতা ফুটে উঠবে বা সে অন্তত একটা 'থ্যাংক ইউ' বলে বোতলটা হাতে নেবে। চন্দ্রিমা সেন নিজে থেকে কাউকে জল অফার করছে, এটা তো লটারি পাওয়ার মতোই একটা ব্যাপার !

কিন্তু অয়ন যখন চোখ তুলে ওর দিকে তাকাল, তখন ওর মুখটা দেখে চন্দ্রিমার বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে উঠল।

অয়নের মুখে কোনো অনুভূতি নেই। কোনরকম মুগ্ধতা নেই, কোনো উত্তেজনা নেই, জাস্ট একটা জমাট বাঁধা শূন্যতা। ওর গভীর চোখদুটোতে এত অন্ধকার যে চন্দ্রিমার মনে হলো সে যেন কোনো অতল খাদের দিকে তাকিয়ে আছে।

আসলে চন্দ্রিমার জানার কথা নয়, বিধ্বস্ত হৃদয়ের ধ্বংসস্তূপে ভালোবাসার ফুল ফোটানো যে কোনো নারীর পক্ষেই এক দুঃসাধ্য কাজ। 

অয়নের চোখে এখন অন্ধকার। চন্দ্রিমার রূপের ছটা, তার আকাশচুম্বী স্ট্যাটাস, তার অন্ধ ভক্তদের স্তুতি এই সবকিছু ওর কাছে এই মুহূর্তে ফিকে, অর্থহীন, মাঠের ধুলোর মতো মূল্যহীন।

সে চন্দ্রিমার দিকে তাকিয়েও যেন ওকে দেখতে পেল না। অয়ন চ্যাটার্জী সম্পূর্ণভাবে, আক্ষরিক অর্থেই চন্দ্রিমা সেনকে ইগনোর করল। সে জলের বোতলটার দিকে হাত তো বাড়ালই না, বরং কোনো শব্দ না করে, নিজের কিটব্যাগটা কাঁধে তুলে নিয়ে চন্দ্রিমাকে পাশ কাটিয়ে মেইন গেটের দিকে হাঁটতে শুরু করল। একবারের জন্যও সে পেছনদিকে ফিরে তাকাল না।

চন্দ্রিমা পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইল। তার হাতে ধরা বোতলের গা বেয়ে জলের বিন্দুগুলো নিচে ঘাসের ওপর গড়িয়ে পড়ছে।

পুরো কলেজের ছেলেরা যার একঝলক অ্যাটেনশনের জন্য পাগল, তাকে ওই ছেলেটা আজ জাস্ট ডাস্টবিনের মতো ইগনোর করে চলে গেল!

অপমানে চন্দ্রিমার ফর্সা গালদুটো লাল হয়ে উঠল। সে বোতলটা ঘাসের ওপর ছুঁড়ে ফেলে দিল। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার, এই চরম অপমানের জ্বালা থেকেই তার মনের ভেতর এক তীব্র আকর্ষণ জন্ম নিল।

এই জ্বালার দহনে চন্দ্রিমার অয়নের থেকে দূরে সরে যাবার কথা ছিল, কিন্তু ফল হল উল্টো, এই অবহেলা বারুদের কাজ করল। তার আত্মাভিমান আরো প্রবল হল। এই শীতল প্রত্যাখানে সে পিছু হটল না বরং তার শিকারি প্রবৃত্তি যেন হাজারগুণ বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠল।

অয়ন চ্যাটার্জী তাকে ইগনোর করল? তাকে?

হেঁটে যাওয়া অয়নের চওড়া, ঘামে ভেজা পিঠটার দিকে তাকিয়ে চন্দ্রিমার ঠোঁটে একটা রহস্যময় হাসি ফুটে উঠল। তার সাজানো জীবনে এই প্রথম সে এমন কাউকে পেল, যে নিজে থেকে তার বশ্যতা স্বীকার করতে নারাজ। 

অয়ন চ্যাটার্জী এখন তার কাছে আর শুধু একটা হ্যান্ডসাম ছেলে নয়, একটা দুর্ভেদ্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াল। 

যে করেই হোক, এই ছেলেটার ওই বরফের মতো ঠাণ্ডা চোখে সে নিজের জন্য আগুন জ্বালাবেই। 

"অয়ন চ্যাটার্জী..." চন্দ্রিমা মনে মনে বিড়বিড় করল, তার ঠোঁটের কোণে একটা বেপরোয়া হাসি ফুটে উঠেছে।

"খুব দেমাগ তোমার, তাই না? গেম অন।"

যে ছেলেটা আজ তাকে ছুঁড়ে ফেলে দিল, তাকে সে একদিন নিজের পায়ের তলায় বসিয়ে ছাড়বে।
[+] 11 users Like RockyKabir's post
Like Reply
#63
your writing skills and imagination is too superb. can you give a try to an Old story(পূর্বার দূর্বার প্রেমিক) that was published 10/12 years ago but stopped after just starting?? i'm giving you link posted in this forum. https://xossipy.com/thread-27104.html?hi...F%E0%A6%95
Like Reply
#64
Just Superb!!
[+] 1 user Likes Paul's post
Like Reply
#65
(29-03-2026, 12:23 AM)Zrahman Wrote: your writing skills and imagination is too superb. can you give a try to an Old story(পূর্বার দূর্বার প্রেমিক) that was published 10/12 years ago but stopped after just starting?? i'm giving you link posted in this forum.  https://xossipy.com/thread-27104.html?hi...F%E0%A6%95

দুঃখিত ভাই, আমি কাকোল্ড পছন্দ করি না
[+] 1 user Likes RockyKabir's post
Like Reply
#66
(29-03-2026, 10:11 AM)Paul Wrote: Just Superb!!

Thanks !
Like Reply
#67
আপনাদের গল্পটা কীরকম লাগছে জানান। নেগেটিভ, পজিটিভ, বিশ্লেষণাত্মক সবধরনের মন্তব্য স্বাগতম।
Like Reply
#68
Your story building and flow is very good. Language is also matured. So i wanted if you could Start the Story above that was originally published 13/14 years ago. it was stopped at the very begining, so you can also continue that in your version.
Like Reply
#69
Ektu boro update chai
Like Reply
#70
(29-03-2026, 04:14 PM)ss80_ssnpl Wrote: Ektu boro update chai

আপনি তো দেখছি কাউকেই লাইক, রেপু আর রেটিং দেননি। তারপর এরচেয়েও বড় আপডেট দাবি করছেন ? গজব সাহস ! লেখক আপনার কথা শুনবে কেন ? আগে দশবিশটা লাইক আর পাঁচদশটা রেপু দিন তারপর বলবেন আর চ্যাপ্টার চাইলেই টেনে বড় করা যায় না। চ্যাপ্টারের সাইজ ছোটবড় হয় গল্পের প্রয়োজনে।
Like Reply
#71
মা ছেলের চুদাচুদী হলে গল্পটা জমে ক্ষীর হয়ে যাবে, ????????
Like Reply
#72
পঞ্চদশ অধ্যায়

কলেজের অ্যানুয়াল কালচারাল ফেস্টের আর মাত্র দু'দিন বাকি।

পুরো ক্যাম্পাস জুড়ে এখন একটা উৎসবের আমেজ। চারদিকে ব্যস্ততা, মেইন বিল্ডিংয়ের চারদিকে ব্যানার ফ্লেক্স লাগানোর কাজ চলছে, করিডোরগুলোতে স্টুডেন্টদের ব্যস্ত আনাগোনা, অডিটোরিয়াম থেকে রিহার্সালের অগোছালো বাদ্যযন্ত্রের আওয়াজ ভেসে আসছে।

করিডোরে করিডোরে পোস্টার, অডিটোরিয়াম থেকে ভেসে আসা সাউন্ড চেকের অস্পষ্ট আওয়াজ আর স্টুডেন্টদের দলবেঁধে ছোটাছুটি। সব মিলিয়ে একটা জমজমাট পরিবেশ।

কিন্তু এই প্রবল কোলাহলের মাঝেও বিদিশা চ্যাটার্জী থুড়ি, মিস বিদিশা গাঙ্গুলির মনের ভেতর একটা অদ্ভুত, দমবন্ধ করা অস্বস্তি কাজ করছে।

আর সেটার কারণ হলো, অয়ন।

গত তিনদিন ধরে অয়ন আক্ষরিক অর্থেই বিদিশার নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছে। সে বিদিশার পেশাগত পরিসর থেকে নিজেকে এমনভাবে গুটিয়ে নিয়েছে, যেন বিদিশা নামক মানুষটির কোন অস্তিত্বই তার জীবনে নেই। সে ইচ্ছে করে বিদিশাকে এড়িয়ে চলছে না বরং বিদিশা ঠিক যেটা চেয়েছিলেন সেই নিখুঁত, যান্ত্রিক 'প্রফেশনাল ডেকোরাম' বজায় রাখছে।

তিনদিন আগের কথা, 

সকাল এগারোটা। সেদিন সেকেন্ড ইয়ারের ক্লাস নিয়ে মেন করিডোর দিয়ে নিজের কেবিনের দিকে ফিরছিলেন বিদিশা। হাতে একগাদা ফাইল, ফেস্টের কাজের চাপ প্রচুর।

সেই সময় করিডোরের উল্টোদিক থেকে আসছিল অয়ন। তার কাঁধে একটা ব্যাগ, হাতে কয়েকটা বই।


বিদিশার বুকের ভেতর মাতৃসত্তাটা এক মুহূর্তের জন্য একটু নড়েচড়ে উঠল। গত পরশু কেবিনে ওইরকম ধমক দেওয়ার পর থেকে অয়নের সাথে তার আর কোনো কথা হয়নি।

বিদিশার মাতৃসত্তা অবচেতনে আশা করেছিল যে, অয়ন অন্তত একবার তার দিকে তাকাবে। হয়তো তার চোখে অভিমান থাকবে, রাগ থাকবে অথবা অপরাধবোধ থাকবে। একজন মায়ের বকুনি খাওয়ার পর ছেলে যেমন মুখ গোঁজ করে থাকে, সেরকম কিছু একটা।

একটা মায়ের মন তো সেটাই আশা করে।

কিন্তু অয়ন বিদিশাকে আসতে দেখে করিডোরের একপাশে সরে গিয়ে দাঁড়াল, ঠিক যেমন একজন অত্যন্ত বাধ্য, সাধারণ ছাত্র একজন সিনিয়র প্রফেসরের জন্য রাস্তা ছেড়ে দেয়। বিদিশা যখন তাকে ক্রস করছেন, অয়ন একটুও মাথা তুলল না।

"গুড মর্নিং, ম্যাম।"

গলার স্বরে কোনো আবেগ নেই, কোনো ওঠানামা নেই, কোনো তিক্ততাও নেই। একদম পারফেক্ট, মেপে বলা দুটো শব্দ। চোখে কোনো আই-কন্ট্যাক্ট নেই। কথাটা বলেই সে একই ছন্দে হেঁটে চলে গেল, ঠিক যেমন কোনো অপরিচিত, সাধারণ ছাত্র তার ডিপার্টমেন্টের একজন টিচারকে উইশ করে চলে যায়।

বিদিশা থমকে গেলেন। এই 'ম্যাম' ডাকটার মধ্যে কোনো পরিচিতির লেশমাত্র ছিল না। 

"গুড মর্নিং," বিদিশা কোনোমতে উত্তর দিয়ে নিজের কেবিনের দিকে এগিয়ে গেলেন।

অয়ন একবারের জন্যও ফিরে তাকালো না। সে বিদিশাকে ইচ্ছে করে এড়িয়ে যাচ্ছে না, কিন্তু বিদিশা যেটা চেয়েছিলেন; 'প্রফেশনাল ডেকোরাম', সেটা সে আক্ষরিক অর্থে এমন নিখুঁতভাবে পালন করছে যে বিদিশার নিজেরই বুকটা আজ কেমন যেন ফাঁকা লাগছে।

কেবিনে ঢুকে দরজাটা বন্ধ করে ডেস্কে বসে পড়লেন বিদিশা। একটা অচেনা অনুভূতি তার মনকে আষ্ঠেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরল। তার ছেলে তাকে আক্ষরিক অর্থেই একজন 'অচেনা মানুষ' হিসেবে ট্রিট করছে, এটা তার মনে বারবার কাঁটার মতো বিঁধছিল। 

বিদিশার প্রখর ব্যক্তিত্বের আড়ালে থাকা চিরন্তন মাতৃসত্তা আজ এক নির্মম আঘাতের সম্মুখীন হলো। তার মনে একটা চাপা অপরাধবোধ মাথাচাড়া দিয়ে উঠল, "আমি কি সেদিন বড্ড বেশি রূঢ় ব্যবহার করে ফেলেছিলাম?" 

ছোটবেলা থেকেই ছেলেটা বড্ড অভিমানী।

কিন্তু পরক্ষণেই 'বিদিশা গাঙ্গুলির' শিক্ষিকাসত্ত্বা মাথাচাড়া দিয়ে উঠল, "যা হয়েছে ভালোই হয়েছে। অয়ন নিজের গণ্ডি আর সীমা বুঝতে শিখছে। বাস্তব পৃথিবীটা তো আর মা-ছেলের সস্তা আবেগ দিয়ে চলবে না। বড় তো হচ্ছে, আর কবে শিখবে ?"
 
কিন্তু অবচেতনে সেই সূক্ষ্ম অপরাধবোধ তার ভেতরের নরম মাতৃসত্তাটাকে কুরে কুরে খেতে লাগল। এই দূরত্বটুকু বিদিশার নিজেরই তৈরি করা, সেজন্যই অয়নের ওই আচরণ, বিদিশাকে ভেতর থেকে সামান্য হলেও অস্থির করে তুলল। ওই অচেনা, অস্বস্তিকর অনুভূতিটা তার মগজের এক কোণায় লেপ্টেই রইল। 

বর্তমান সময়

দুপুর দুটো। বিদিশার কেবিন।

টেবিলের ওপর ফেস্টের হাজারটা বিল, স্পনসরশিপ ফর্ম আর ভেন্ডারদের কোটেশন ছড়ানো। কাজের মারাত্মক চাপ। বিদিশা একটা পেন দিয়ে কপালে হালকা মাসাজ করছিলেন।আজ ভেতরে ভেতরে তিনি একটু আনমনা।

এমন সময় দরজায় টোকা দিয়ে ভেতরে ঢুকল বিক্রম। তার হাতে একটা খোলা ল্যাপটপ। পরনে একটা হালকা নীল রঙের শার্ট, চুলগুলো পারফেক্টলি সেট করা। মুখে সেই ট্রেডমার্ক 'গুড বয়' ইনোসেন্স।

"সরি টু ডিস্টার্ব ইউ, ম্যাম, ফাইনাল পেমেন্ট শিডিউল আর স্টেজের থ্রি-ডি লেআউটটা রেডি করে এনেছি", বিক্রম অত্যন্ত প্রফেশনাল গলায় বলল। তার গলা বরাবরের মতোই মোলায়েম, সম্ভ্রমপূর্ণ।

বিদিশা নিজের মনের অস্থিরতাটাকে জোর করে সরিয়ে রেখে একটু হাসলেন। 

"এসো বিক্রম। দেখি কী শিডিউল করেছ।", বিদিশা সোজা হয়ে বসলেন।

সাধারণত বিক্রম ডেস্কের ওপাশে বসেই ল্যাপটপ ঘুরিয়ে কাজ দেখায়। কিন্তু আজ সে তা করল না। সে ডেস্কের পাশ দিয়ে হেঁটে, একদম বিদিশার চেয়ারের পাশে এসে দাঁড়াল।

বিদিশা একটু অবাক হলেন, কিন্তু কিছু বলার আগেই বিক্রম ল্যাপটপটা বিদিশার চোখের সামনে টেবিলে রেখে একটু ঝুঁকে এল।

ফেস্টের একদম দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে বিক্রম এবার তার 'গুড বয়' ইমেজের আড়ালে খুব সন্তর্পণে বিদিশার 'পার্সোনাল স্পেস' বা ব্যক্তিগত সীমানা ভাঙার খেলাটা শুরু করে দিয়েছে।

ল্যাপটপের স্ক্রিনে কিছু একটা দেখানোর অছিলায় বিক্রম বিদিশার খুব কাছে ঝুঁকে পড়ল। তার বাঁ হাতটা বিদিশার চেয়ারের হাতলের একদম গা ঘেঁষে ডেস্কের ওপর রাখা। বিক্রমের শরীর থেকে একটা কড়া ফ্রেঞ্চ কোলন আর পুরুষালি উত্তাপ বিদিশার নাকে এসে ধাক্কা মারল। তাদের দুজনের শরীরের মধ্যে দূরত্ব এখন মাত্র কয়েক ইঞ্চির। বিক্রমের শ্বাস-প্রশ্বাস বিদিশার ঘাড়ের খুব কাছে অনুভূত হচ্ছে।

বিদিশার নারীসত্তা এক মুহূর্তের জন্য সজাগ হয়ে উঠল। একটা অদ্ভুত অস্বস্তি তাকে গ্রাস করল। ছেলেটা বড্ড বেশি কাছে চলে আসছে না ? একটা ছাত্রের তো একজন শিক্ষিকার এতটা কাছাকাছি আসার কথা নয়! 

এটা প্রফেশনাল 'পার্সোনাল স্পেস'-এর ইনভেশন। বিদিশার শরীরটা এর প্রতিক্রিয়ায় একটু শক্ত হয়ে গেল, তার ভ্রু কুঁচকে গেল। তিনি নিজের চেয়ারটা একটু পিছিয়ে নেওয়ার জন্য পা বাড়ালেন। তিনি সামান্য একটু পিছিয়ে যাওয়ার বা বিক্রমকে সরে দাঁড়াতে বলার জন্য মুখ খুলতে যাবেন...

"ম্যাম, এই রো-তে দেখুন", বিক্রম অত্যন্ত সিরিয়াস এবং প্রফেশনাল একটা টোনে বলে উঠল। 

"সাউন্ড সিস্টেমের ট্যাক্সটা কি জিএসটি ইনক্লুসিভ ধরব, নাকি এক্সক্লুসিভ? আমার মনে হয় এক্সক্লুসিভ ধরলে বাজেটটা পঁচিশ হাজার ওভারশুট করবে। লাস্ট ইয়ারের অডিটে এই জায়গাটাতেই প্রবলেম হয়েছিল। আপনি কী বলেন?"

বিক্রমের এই নিরস এবং নিখুঁত প্রফেশনাল প্রশ্নে বিদিশার ভেতরের অস্বস্তিটা এক লহমায় নিজের প্রতি একটা লজ্জায় পরিণত হলো।

বিদিশা মনে মনে নিজেকেই ধমক দিলেন, "হোয়াট ইজ রং উইথ মি? আমি কি প্যারানয়েড হয়ে যাচ্ছি? অয়ন সেদিন যে সব আজেবাজে কথা বলে গেল, সেইসব শুনে আমার মাথাটাও খারাপ হয়ে গেছে! ছেলেটা জাস্ট কাজের জন্য ঝুঁকে বাজেট দেখাচ্ছে আর আমি আজেবাজে চিন্তা করছি!"

নিজের ইগো আর বিক্রমের ওই নিখুঁত 'ভদ্র' ইমেজের কারণে বিদিশা নিজের ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়ের সঠিক ইঙ্গিতটাকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করলেন।

তিনি চেয়ারটা না পিছিয়ে, ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে মন দিলেন।

"ওরা জিএসটি আলাদা করেই অ্যাড করেছে, বিক্রম। তুমি টোটাল অ্যামাউন্টটা এই কলামে বসিয়ে দাও", বিদিশা ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত স্বাভাবিক গলায় বললেন।

"রাইট, ম্যাম। আমি ঠিক করে দিচ্ছি," বিক্রম অত্যন্ত বাধ্য ছেলের মতো ল্যাপটপের কিপ্যাডে কয়েকটা ফিগার টাইপ করল।

টাইপ করার সময় তার কনুইটা 'ভুল করে' খুব সামান্য, প্রায় পালকের মতো বিদিশার বাহু ছুঁয়ে গেল। বিদিশা সেটাকে কাজের ব্যস্ততার অঙ্গ হিসেবেই মেনে নিলেন।

টাইপ করতে করতে বিক্রম তার মোলায়েম, সিরিয়াস গলায় বলে উঠল, "ম্যাম, গেস্ট ব্যান্ডের পারফরম্যান্সটা কি ছ'টার সময় রাখব, নাকি সাউথ-উইংয়ের লাইটিংয়ের কাজটা শেষ হওয়ার পর সাড়ে ছ'টায় রাখলে বেটার হয়? আপনার কী মনে হয়?"

"সাড়... সাড়ে ছ'টাই বেটার হবে। লাইটিং চেক করাটা আগে জরুরি," বিদিশা ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়েই উত্তর দিলেন।

"পারফেক্ট, ম্যাম। আমি তাহলে এটাই লক করে দিচ্ছি," বিক্রম একটা অত্যন্ত নিষ্পাপ হাসি দিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল।

বিক্রম ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়েই একটা অদৃশ্য হাসি হাসল। তার প্ল্যান সাকসেসফুল। সে বিদিশার পার্সোনাল স্পেসে ঢুকে পড়েছে, অথচ বিদিশা তাকে বকতে বা সরাতে পারলেন না। 

ল্যাপটপটা নিয়ে ডেস্কের ওপাশে গিয়ে বসতে বসতে বিক্রমের চোখের তারায় একটা ক্রুর উল্লাস নেচে গেল।

সে খুব ভালো করেই জানে সে কী করছে। কাজের মোড়কে সে একটা অত্যন্ত অহংকারী মেয়েছেলের চারপাশের অদৃশ্য দেওয়ালটা ভাঙার কাজ শুরু করে দিয়েছে। 

ব্যক্তিগত সীমানার প্রথম দেওয়ালটা এই স্পেস ইনভেশনটা বিদিশাকে অবচেতনে অস্বস্তিতে ফেলছে, অথচ তার প্রফেশনাল ইগোর জন্য তিনি সেটা মুখে বলতেও পারছেন না।

এদিকে একই সময়ে, মেইন বিল্ডিংয়ের ক্যাফেটেরিয়ার কাছে দাঁড়িয়ে ছিল চন্দ্রিমা সেন।

তার চোখে আজ প্রাডার সানগ্লাস নেই বটে তবে চোখের দৃষ্টিতে একটা ধারালো জেদ আছে। গত পরশুর ম্যাচের পর অয়নের ওই চরম অবহেলা চন্দ্রিমাকে পাগল করে তুলেছে। তবে সে হাল ছাড়ার পাত্রী নয়। চন্দ্রিমা সেন কোনোদিন কোনো ছেলের কাছে রিজেক্টেড হয়নি আর এই ফার্স্ট ইয়ারের ইডিয়টটা তাকে এমনভাবে ট্রিট করেছে যেন সে আক্ষরিক অর্থেই 'অদৃশ্য' !

"নেহা, শোন," চন্দ্রিমা তার কফির গ্লাসে স্ট্র দিয়ে নাড়তে নাড়তে বলল। 

"আজ বিকেলে কলেজ টুর্নামেন্টের ফাইনাল ম্যাচ আছে না?"

"হ্যাঁ। থার্ড ইয়ার ইকোনমিক্সের সাথে। কেন বল তো? তুই কি আবার মাঠে যাবি নাকি?" নেহা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল।

চন্দ্রিমার ঠোঁটের কোণে একটা রহস্যময় হাসি ফুটে উঠল। 

"মাঠে যাব না। কিন্তু ম্যাচ শেষে ওই অয়ন চ্যাটার্জী কোথায় যায়, কী করে, তার পুরো রুটিন আমার চাই। ও আমাকে ইগনোর করে খুব সস্তায় পার পেয়ে গেছে বলে ভাবছে। বাট হি হ্যাজ নো আইডিয়া, ও কার লেজে পা দিয়েছে।"

চন্দ্রিমা নিজের পারফেক্ট ম্যানিকিওর করা নখগুলো দিয়ে কফির গ্লাসটা শক্ত করে ধরল।

আজ ফাইনাল ম্যাচের পর সে অয়নকে ধরবেই। এমন জায়গায় ধরবে, যেখান থেকে ওই অহংকারী ছেলেটা তাকে ইগনোর করে পালাতে পারবে না।



বিকেলবেলা, কলেজ গ্রাউন্ড

বিকেলের পড়ন্ত রোদ কলেজের স্পোর্টস বিল্ডিংয়ের ছাদের কার্নিশে এসে ঠেকেছে।কলেজের পেছনের ফুটবল মাঠে তখন বিকেলের আলো ম্লান হয়ে এসেছে। ইন্টার-ডিপার্টমেন্টাল টুর্নামেন্টের ফাইনাল ম্যাচ সদ্য শেষ হয়েছে। থার্ড ইয়ার ইকোনমিক্সকে হারিয়ে ফার্স্ট ইয়ার ফিজিক্স ডিপার্টমেন্ট চ্যাম্পিয়ন হয়েছে।

ফেস্টের প্রস্তুতির জন্য মাঠের গ্যালারি আজ প্রায় ফাঁকাই ছিল। হাতেগোনা কয়েকজন দর্শক আর ফিজিক্স ডিপার্টমেন্টের ছেলেদের উল্লাসের মাঝেই রেফারি জয়ী দলের হাতে ট্রফিটা তুলে দিয়েছেন। 

এবারের টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় অয়ন চ্যাটার্জী।

আজ সে একাই দুটো গোল করেছে। কিন্তু তার মুখে জয়ের কোন আনন্দ নেই। তার কপালে ঘাম, হাঁটুতে ধুলো আর কাদার দাগ আর বুকের ভেতর সেই একই জমাট বাঁধা শূন্যতা। 

সতীর্থরা যখন ট্রফি নিয়ে লাফালাফি করছে, অয়ন নিঃশব্দে ভিড় থেকে বেরিয়ে নিজের কিটব্যাগটা কাঁধে তুলে নিল। সে এখন একটু একা থাকতে চায়।

মেইন বিল্ডিংয়ের পেছনে অবস্থিত মাঠের পাশ দিয়ে হেঁটে পুরোনো, ছায়ানট ঘেরা ড্রেসিংরুমের করিডোরটার দিকে এগিয়ে গেল সে। জায়গাটা বেশ স্যাঁতসেঁতে আর নির্জন।

স্পোর্টস বিল্ডিংয়ের ড্রেসিংরুমের দিকের এই করিডোরটা বেশ সংকীর্ণ আর অন্ধকার।টিউবলাইটের আলো এখানে টিমটিম করে জ্বলছে।

অয়ন একাই হেঁটে আসছিল ড্রেসিংরুমের দিকে। ঘামে ভেজা চুলগুলো হাত দিয়ে পেছনে ঠেলে করিডোরে ঢুকে একটা বাঁক ঘুরতেই তার পা থমকে গেল।

দেওয়ালে হেলান দিয়ে, দু'হাত বুকের কাছে ক্রস করে দাঁড়িয়ে আছে চন্দ্রিমা সেন। আজ তার পরনে একটা ব্ল্যাক হাই-ওয়েস্ট জিন্স আর মেরুন রঙের একটা স্লিভলেস টপ। ঠোঁটে ডার্ক রেড লিপস্টিক।

তার পারফেক্ট, গ্ল্যামারাস ফিগারটা এই পুরোনো, স্যাঁতসেঁতে করিডোরে যেন একটা অদ্ভুত বৈপরীত্য তৈরি করেছে। তার পারফিউমের দামি, কড়া সুবাস ঘামের গন্ধকে ঢেকে দিচ্ছে। চন্দ্রিমা দু'হাত বুকের কাছে ক্রস করে, একটা পা সামান্য এগিয়ে, ঠিক যেন একটা শিকারির মতো দাঁড়িয়ে আছে। যেন আজ সে পালানোর কোন রাস্তা অয়নকে দিতে নারাজ।

অয়ন এক সেকেন্ডের জন্য চন্দ্রিমার দিকে তাকাল। সেই দৃষ্টিতে কোনো চমক নেই, কোনো বিরক্তিও নেই। তারপর নিজের দৃষ্টি সম্পূর্ণ নামিয়ে নিয়ে, কোনো প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে চন্দ্রিমার পাশ কাটিয়ে নিঃশব্দে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য একটু বাঁ-দিকে সরল।

কিন্তু চন্দ্রিমাও সমান ক্ষিপ্রতায় এক পা বাঁ-দিকে সরে অয়নের রাস্তা পুরোপুরি ব্লক করে দিল।

"কংগ্র্যাচুলেশনস, ফাইনালি চ্যাম্পিয়ন। কিন্তু হিরো তো দেখছি সেলিব্রেট না করেই পালাচ্ছে।" চন্দ্রিমার গলার আওয়াজে নিস্তব্ধ করিডোরটা গমগম করে উঠল। ওর অহংকারী গলার স্বরে কোনো উষ্ণতা নেই, বরং তার জায়গায় আছে একরাশ ধারালো বিদ্রুপ আর প্রচ্ছন্ন চ্যালেঞ্জ। 

"খেলাটা তুমি সত্যিই ভালো খেলো। কিন্তু তোমার ম্যানারস আর অ্যাটিটিউড নিয়ে একটু কাজ করা দরকার, অয়ন চ্যাটার্জী"।

অয়ন এবার সরাসরি চন্দ্রিমার চোখের দিকে তাকাল। 

"এক্সকিউজ মি। তুমি আমার রাস্তা আটকাচ্ছ।"

"হ্যাঁ, আটকাচ্ছি, আমি তোমার সাথে কথা বলছি। কী ভাব নিজেকে ? ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো?" 

চন্দ্রিমার তীক্ষ্ণ গলাটা করিডোরের নিস্তব্ধতা চিরে দিল।

বলতে বলতে চন্দ্রিমা এক পা এগিয়ে এল। তাদের দুজনের মধ্যে দূরত্ব এক হাতেরও কম। চন্দ্রিমার দামী পারফিউমের গন্ধ অয়নের নাকে এসে ধাক্কা মারল। অয়নের ঘামে ভেজা, পুরুষালি শরীরের উত্তাপটা চন্দ্রিমা এখন স্পষ্ট অনুভব করতে পারছে।

তার গলায় এবার একটু অহংকারী, তীক্ষ্ণ সুর। 

"তুমি কি কালা, নাকি মেয়েদের দেখলে ভয় পাও? আগের দিন জল অফার করলাম, ইগনোর করে চলে গেলে। আজ উইশ করছি, তাও সেম অ্যাটিটিউড! হোয়াট ইজ ইওর প্রবলেম ?

শোনো, তোমার এই অ্যারোগ্যান্ট, ডার্ক বয় ইমেজটা হয়তো অন্য মেয়েদের ইমপ্রেস করে, বাট আই অ্যাম চন্দ্রিমা সেন। আমি যা চাই, সেটা..."

"তুমি কে আর তুমি কী চাও, তাতে আমার বিন্দুমাত্র ইন্টারেস্ট নেই", নিচু গলায় অয়ন উত্তর দিল।

"পুরো ক্যাম্পাসের ছেলেরা আমার একটা অ্যাটেনশন পাওয়ার জন্য কুকুরের মতো ঘোরে।"

চন্দ্রিমা এবার সরাসরি অয়নের চোখের দিকে তাকিয়ে কথাটা বলল। 

"সেদিন সাইডলাইনে আমি তোমাকে নিজে থেকে জল অফার করলাম আর তুমি এমন ভাব করে চলে গেলে যেন আমি একটা ইনভিজিবল ডাস্টবিন! তোমার এত ইগো কিসের ?"

অয়ন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তার মুখটা পাথরের মতো শক্ত। সে খুব ধীরে ধীরে চোখ তুলে চন্দ্রিমার দিকে তাকাল। সে একদৃষ্টে চন্দ্রিমার এই ফুঁসতে থাকা, দাম্ভিক রূপটার দিকে তাকিয়ে রইল। চন্দ্রিমার ফর্সা, মসৃণ কাঁধ, তার রূপ, তার কমলা লেবুর কোয়ার মতো ফোলা ঠোঁট, কোনো কিছুই অয়নের মনে আঁচড় কাটতে পারল না।

অয়নের চোখের দিকে তাকিয়ে চন্দ্রিমার বুকের ভেতরটা আবার ছ্যাঁত করে উঠল। ওই নিস্পৃহ চোখদুটোতে আজকেও কোনো ফিলিংস নেই। তার বদলে আছে শুধু একরাশ বিরক্তি।

"আমার ইগোর কোন সমস্যা নেই।" 

অয়নের গলাটা এতটাই ঠান্ডা যে চন্দ্রিমার মনে হলো তার গায়ে কেউ এক বালতি বরফজল ঢেলে দিয়েছে। 

"তোমার নামের ওই ট্যাগটা আর ওই ইগোটা তোমার ওই 'কুকুর'দের কাছে গিয়ে দেখাও। আমার কাছে তোমার কোনো অস্তিত্ব নেই। তুমি আমার কাছে জাস্ট এই করিডোরের আরেকটা ইট বা পিলারের মতো একটা অবজেক্ট। রাস্তা ছাড়ো।"

কথাটা চন্দ্রিমার কানে চাবুকের মতো আছড়ে পড়ল। 'অস্তিত্ব নেই'! 'পিলার বা অবজেক্ট'! 

অপমানে চন্দ্রিমার ফর্সা গালদুটো লাল হয়ে গেল, সে রাগে কাঁপতে লাগল। নিজের জায়গা থেকে সে একটুও সরল না, উল্টে তার চোখদুটো আরও ধারালো হয়ে উঠল।

অয়ন তাকে পাশ কাটিয়ে বেরিয়ে যেতে চাইল, কিন্তু চন্দ্রিমা নিজের ডান হাতটা করিডোরের দেওয়ালে রেখে অয়নের পথ আটকে দিল। 

"রাস্তা ছাড়ব না। কী করবে? গায়ে হাত দেবে?", সে একটা ব্যঙ্গাত্মক হাসি হাসল। 

"জেনে রাখো, চন্দ্রিমা সেনকে ইগনোর করে কেউ চলে যেতে পারে না। তুমি হয়তো জানো না আমি কে..."

"তুমি কে, সেটা নিয়ে আমার বিন্দুমাত্র ইন্টারেস্ট নেই", অয়ন অত্যন্ত নির্মমভাবে তার কথা মাঝপথেই কেটে দিল। 

"আমার প্রবলেম হলো এমন মানুষ, যারা ভাবে পুরো পৃথিবীটা শুধু তাদের চারপাশে ঘোরে। সরে দাঁড়াও"। 

"আর তুমি যে গেমটা খেলছ, সেটা আমার সাথে খেলার চেষ্টা করো না। আমার প্রায়োরিটি আলাদা। সো প্লিজ, নিজের আর আমার সময় নষ্ট কোরো না।"

শান্তভাবে কথাটা বলে অয়ন আর দাঁড়াল না। নিজের কাঁধের জোরে চন্দ্রিমার হাতটা হালকাভাবে সরিয়ে দিয়ে ড্রেসিংরুমের দিকে এগিয়ে গেল। তারপর নিঃশব্দে, ঘাড় না ঘুরিয়ে সোজা ড্রেসিংরুমের দিকে এগিয়ে গেল।

চন্দ্রিমা স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। এভাবে কেউ কখনো তার সঙ্গে কথা বলেনি। 

'আমার প্রায়োরিটি আলাদা' - কথাটা চন্দ্রিমার কানে বাজতে লাগল। মানে কী ? 
কিসের কথা বলে গেল ? ফুটবল না এই অ্যারোগ্যান্ট, হ্যান্ডসাম ছেলেটার জীবনে অন্য কোনো মেয়ে আছে? 

আস্তে আস্তে চন্দ্রিমার হাতের মুঠো শক্ত হয়ে এল। অয়ন তাকে 'অস্তিত্বহীন' বলেছে এই শব্দটাই ওর মাথায় ঘুরপাক খেতে লাগল। অপমানে, রাগে তার শরীর থরথর করে কাঁপছে।

অয়ন চ্যাটার্জী কী ওকে কোন সহজলভ্য ট্রফি ভাবছে ? নিজেকে কী ভাবে সে ?

সে স্থির ভাবে অয়নের চলে যাওয়া পথের দিকে এক মুহূর্তের জন্য তাকিয়ে রইল।

"প্রায়োরিটি আলাদা ? আই উইল সি টু ইট, অয়ন চ্যাটার্জী। তুমিও রক্ত-মাংসের মানুষ, পাথর নও।", চন্দ্রিমা নিজের মনে বিড়বিড় করল। 

তারপর নিজের অবিন্যস্ত চুলগুলো এক ঝটকায় পেছনে ঠেলে দিয়ে করিডোর ধরে দৃপ্ত পায়ে হেঁটে গেল।

সন্ধ্যাবেলা, মেন অডিটোরিয়াম

বিকেল গড়িয়ে তখন সন্ধে নামছে। কলেজের বিশাল মেন অডিটোরিয়ামে ফেস্টের প্রস্তুতির জন্য অডিটোরিয়ামে তখন জোরকদমে লাইটিং চেক হচ্ছে। 

বাইরে দিনের আলো প্রায় নিভে এসেছে। বিশাল, ছড়ানো অডিটোরিয়ামটার ভেতরটা অন্ধকার। শুধু স্টেজের ওপর থেকে কয়েকটা হাই-ভোল্টেজ স্পটলাইট আর রঙিন লেজার লাইট চারদিকে ঘুরপাক খাচ্ছে। বাতাসে একটা পুরোনো কাঠের স্টেজ আর থিয়েট্রিক্যাল স্মোকের হালকা গন্ধ। 

স্টুডেন্টদের খুব একটা ভিড় নেই, কয়েকজন টেকনিশিয়ান দূরে কন্ট্রোল প্যানেলে কাজ করছে।

কালচারাল ফেস্টের ফাইনাল লাইটিং চেক চলছে।

অডিটোরিয়ামের ঠিক মাঝখানের সারিতে, প্যাসেজের ওপর দাঁড়িয়ে ছিলেন বিদিশা। আজ তার পরনে একটা অফ-হোয়াইট রঙের সফট সিল্কের শাড়ি, যার পাড়ে সরু সোনালি কাজ। তার পাশে, খুব সামান্য দূরত্ব বজায় রেখে দাঁড়িয়ে আছে বিক্রম মালহোত্রা। বিক্রম তাকে ফাইনাল লাইটিং অ্যারেঞ্জমেন্টের অ্যাপ্রুভাল নেওয়ার জন্য ডেকে এনেছে।

অন্ধকার অডিটোরিয়ামের বিশালতা আর স্পটলাইটের এই মায়াবী আলো পুরো পরিবেশটাকে একটা অদ্ভুত, সিনেমাটিক রূপ দিয়েছে।

"ম্যাম, ওই ব্লু স্পটলাইটগুলো কি মেন স্টেজের ব্যাকগ্রাউন্ডের জন্য ঠিক আছে, নাকি ওখানে ওয়ার্ম হোয়াইট দেব?" বিক্রম খুব প্রফেশনাল গলায় জিজ্ঞেস করল।

বিদিশা ঘাড় উঁচু করে ওপরের ট্রাসের দিকে তাকালেন। স্পটলাইটের আলো তার ফর্সা, মসৃণ মুখে এসে পড়েছে। ওপরের দিকে তাকানোর ফলে তার গলার খাঁজটা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

"ওয়ার্ম হোয়াইট-টাই বেটার হবে, বিক্রম। ব্লু-টা একটু বেশিই ড্রামাটিক লাগছে", বিদিশা ওপরের দিকে তাকিয়েই উত্তর দিলেন।

"ঠিক আছে, ম্যাম। আমি চেঞ্জ করতে বলে দিচ্ছি।"
বিক্রম বিদিশার ঠিক পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল। অডিটোরিয়ামের অন্ধকার আর তাদের দুজনের শারীরিক নৈকট্য ঠিক বোঝা যাচ্ছিল না।

"ম্যাম, দেখুন... ওই সাউথ উইংয়ের স্পটলাইটটা বোধহয় একটু অফ-সেন্টার হয়ে আছে", বিক্রম স্টেজের দিকে আঙুল দেখিয়ে বলল। তার গলার স্বর এই বিশাল, ফাঁকা অডিটোরিয়ামে একটা অদ্ভুত ইকো তৈরি করছিল।

বিদিশা ঘাড় উঁচু করে ওপরের দিকে তাকালেন। লাইটের ফোকাসটা বুঝতে গিয়ে তিনি একটু বেশিই পেছনের দিকে হেলে গেলেন।

ঠিক সেই মুহূর্তটায় একটা সূক্ষ্ম বিপত্তি ঘটল। 

সারাদিনের ব্যস্ততা আর ছোটাছুটির কারণে বিদিশার বাঁ-কাঁধে আটকানো শাড়ির আঁচলের পিনটা আগে থেকেই একটু আলগা হয়ে ছিল। ঘাড় উঁচু করে পেছনের দিকে হেলতেই পিনটা হঠাৎ করে খুলে গেল। বিক্রমের চোখ কিন্তু সেইসময় ওপরের লাইটের দিকে ছিল না, তার দৃষ্টি আটকে ছিল বিদিশার ওপর। কিন্তু, বিদিশা সেটা লক্ষ্য করেননি।

শাড়ির আঁচলটা কাঁধ থেকে খসে পড়ার উপক্রম হলো। আঁচলটা সরে গেলেই তার ব্লাউজের নেকলাইন আর স্তনের খাঁজ পুরোপুরি উন্মুক্ত হয়ে পড়বে।

বিদিশা চমকে উঠে নিজের বাঁ হাতটা কাঁধের দিকে নিয়ে যাবেন, তার আগেই বিক্রম ঝাঁপিয়ে পড়ল।

"ম্যাম, জাস্ট আ সেকেন্ড..." বিক্রমের গলাটা হঠাৎ করে একটু নিচু, একটু বেশিই মোলায়েম শোনাল।

যেন সে জাস্ট একটা দুর্ঘটনা থেকে তার শিক্ষিকাকে বাঁচাতে চাইছে।


বিদিশা চমকে মুখ নামানোর আগেই বিক্রম তার শক্ত, পুরুষালি হাতটা বিদিশার ফর্সা, মসৃণ কাঁধের একদম কাছে নিয়ে গেল।

"আপনার পিনটা খুলে যাচ্ছে..."

কথাটা শেষ হওয়ার আগেই বিক্রমের আঙুলগুলো অত্যন্ত দক্ষভাবে বিদিশার শাড়ির আঁচলের পিনটা ধরে ফেলল। কিন্তু পিনটা আটকে দেওয়ার অছিলায়, একটা অত্যন্ত নিখুঁত, মেপে করা 'ভুল' করল বিক্রম।

তার আঙুলের উল্টোদিকটা, তার পুরুষালি হাতের রুক্ষ রোমগুলো বিদিশার গলার ঠিক নিচের উন্মুক্ত, স্পর্শকাতর ত্বকের ওপর দিয়ে আলতো করে, পালকের মতো ছুঁয়ে গেল।

একটা উষ্ণ, পুরুষালি হাতের ওই অপ্রত্যাশিত করা স্পর্শ বিদিশার ঘাড়ে লাগতেই যেন একটা তীব্র বিদ্যুৎতরঙ্গ খেলে গেল। মুহূর্তের মধ্যেই তা ঘাড় থেকে শুরু করে মেরুদণ্ড বেয়ে একটা প্রবল শিহরণ নামিয়ে আনল। তার শ্বাস এক মুহূর্তের জন্য গলায় আটকে গেল। শরীরটা রিফ্লেক্স অ্যাকশনে পাথরের মতো শক্ত হয়ে উঠল।

তিনি স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। তার বুকের ভেতরটা ধড়ফড় করছে।

গলার কাছে বিক্রমের আঙুলের ওই উষ্ণ, রুক্ষ স্পর্শের অনুভূতিটা তখনো জ্বালার মতো লেগে আছে।

'এটা কোনো অ্যাক্সিডেন্ট নয়' - একজন পরিণত নারী হিসেবে বিদিশার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় বারবার তাকে জানান দিতে লাগল। বিদিশার চোখদুটো ততক্ষণে বিস্ময়ে আর চরম অস্বস্তিতে বড় বড় হয়ে গেছে। 

তার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। 

ছেলেটা তার গায়ে হাত দিল? 



একটা ছাত্র তার শিক্ষিকার কাঁধে হাত দিয়ে পিন পরাতে পারে না! এটা প্রফেশনাল আর পার্সোনাল দুই ধরনের গন্ডিরই চরম উলঙ্ঘন।

তিনি এক পা পিছিয়ে গেলেন।

"হোয়াট আর ইউ..." বিদিশা একটা ধমক দেওয়ার জন্য মুখ খুললেন। শিক্ষিকা হিসাবে তার সম্মানবোধ তীব্রভাবে আঘাত পেয়েছে।

কিন্তু বিক্রম ততক্ষণে এক পা পিছিয়ে গেছে। তার মুখে সেই নিখুঁত, নিষ্পাপ, বাধ্য স্টুডেন্টের হাসি। তার চোখে কোনো লোলুপতা নেই, বডি ল্যাঙ্গুয়েজে কোনরকম ঔদ্ধত্য নেই।

"সরি ম্যাম। পিনটা একদম খুলে বুকের কাছে পড়ে যাচ্ছিল, তাই জাস্ট আটকে দিলাম। আই হোপ ইউ ডোন্ট মাইন্ড", বিক্রম অত্যন্ত বিনীত, ভদ্র গলায় বলল। তার গলার স্বরে এমন একটা স্বাভাবিক হেল্পফুল টোন, যে বিদিশার গলার কাছে ধমকটা দলা পাকিয়ে আটকে গেল।

বিদিশা থমকে গেলেন। 

তিনি কী বলবেন? ছেলেটা তো তাকে সাহায্য করেছে। তার শাড়ির আঁচলটা সত্যিই খুলে যাচ্ছিল। সে তো কোনো খারাপ উদ্দেশ্যে হাত দেয়নি, অন্তত তার আচরণে তাই মনে হচ্ছে। তাকে যদি এখন বিদিশা ধমক দেন, তবে সেটা কি ওভার রিঅ্যাক্ট করা হবে না?

বিদিশার ভেতরের নারীসুলভ ইনস্টিংক্ট কিন্তু চিৎকার করে বলছিল 'না! এই স্পর্শটার মধ্যে একটা খারাপ উদ্দেশ্য ছিল!' 

অয়নের সেই সতর্কবাণীটা এক মুহূর্তের জন্য তার মাথায় বিদ্যুৎঝলকের মতো খেলে গেল।

কিন্তু বিদিশা জোর করে সেই চিন্তাটা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেললেন। নিজের ইগোকে রক্ষা করার জন্য তিনি নিজেকেই বোঝালেন, এটা জাস্ট একটা এক্সিডেন্ট। বিক্রম তাকে সাহায্য করেছে শুধুমাত্র।

"ইটস... ইটস ফাইন", বিদিশা কোনোমতে কথাটা বলে নিজের আঁচলটা ডান হাত দিয়ে একটু টেনে নিলেন। তার গলার কাছে বিক্রমের আঙুলের ওই আলতো স্পর্শের জায়গাটা তখনো অদ্ভুতভাবে শিরশির করছে। তিনি অত্যন্ত অস্বস্তি বোধ করছেন।

"আর কোনো কাজ আছে এখানে?" বিদিশা নিজের গলার স্বরটাকে জোর করে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করলেন।

"নো ম্যাম। দ্যাটস অল। আমি লাইটিংয়ের চেঞ্জটা বলে দিচ্ছি", বিক্রম অত্যন্ত ভদ্রভাবে মাথা নাড়ল।

"ঠিক আছে। আমি অফিসে যাচ্ছি", বিদিশা আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়ালেন না। তিনি দ্রুত পায়ে অডিটোরিয়ামের মাঝের প্যাসেজ ধরে বাইরের দিকে এগোতে লাগলেন। তার হাই-হিলের খটখট শব্দটা অডিটোরিয়ামের মেঝেতে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল। তিনি বুঝতে পারছিলেন না কেন তার বুকের ভেতরটা এত দ্রুত লাফাচ্ছে।

তার এখন মনে হচ্ছে, এই ফেস্টটা যত তাড়াতাড়ি শেষ হয় ততই ভালো। এই ছেলেটার এত কাছাকাছি থাকাটা কেন যেন হঠাৎ করে তার কাছে খুব বিপজ্জনক বলে মনে হতে শুরু করেছে।

অডিটোরিয়ামের আলো-আঁধারিতে বিদিশা দেখতে পাননি যে মাথা নিচু করার সময় বিক্রমের ঠোঁটের কোণে একটা বিজয়ীর হাসি ফুটে উঠেছিল।

বিক্রমের শিকারি মন উল্লাসে ফেটে পড়ছে। সে আজ আরেকটা গন্ডি ভেঙেছে আর বিদিশা তাকে আটকাতে বা বকতে পারেননি। বিক্রম খুব ভালো করেই জানে, একবার যদি কোনো নারীর শরীর আর মনের 'পার্সোনাল স্পেস'-এ ঢুকে পড়া যায় এবং সেই নারী যদি প্রতিবাদ করতে ব্যর্থ হয়, তবে সেই যুদ্ধের অর্ধেক জয় ওখানেই হয়ে যায়।

তার বিছানো জালে এই অহংকারী মেয়েছেলেটা এখন সম্পূর্ণভাবে আটকা পড়ে গেছে।

বিদিশা অডিটোরিয়াম থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর, বিক্রম সেই অন্ধকার স্টেজের স্পটলাইটের নিচে একা দাঁড়িয়ে রইল।

সে তার ডান হাতটা, যে হাত দিয়ে সে একটু আগে বিদিশার মসৃণ ত্বক ছুঁয়েছিল, সেটা নিজের মুখের কাছে তুলে আনল।

"পারফিউমের গন্ধটা সত্যিই মারাত্মক, মিস গাঙ্গুলি", বিক্রম অন্ধকার অডিটোরিয়ামের শূন্যতায় ফিসফিস করে বলে উঠল।
[+] 13 users Like RockyKabir's post
Like Reply
#73
Darun
[+] 1 user Likes Saj890's post
Like Reply
#74
(02-04-2026, 01:38 AM)mity odin 2 Wrote: Sundor lakhoni protiti ghotona connected, erokom golpo r lakhok r prouojon ei forume, bidishar porinoti janar jonno egarly waiting. 
Thanks for writing this beautiful story and continuing it more beautifully.

বিশ্বাস করুন। আপনার রিপ্লাইটা পড়ে ভীষণ আনন্দ হল। আপনি যদি নেগেটিভ রিভিউ দিতেন তাতেও আমার কিছু যায় আসত না। আপনার রিভিউ থেকেই স্পষ্ট যে আপনি গল্পটা বিশদে পড়ছেন। একজন লেখকের কাছে এর চেয়ে বড় পাওনা আর কিছু হতে পারে না। উৎসাহ দেবার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ। এটাই আমাদের লেখা চালিয়ে যাবার পাথেয়।
Like Reply
#75
Onek din por golpo ta porlam darun egoche golpo ta.... Awasome keep it up..
Like Reply
#76
(02-04-2026, 06:27 PM)Akhilaa Wrote: Onek din por golpo ta porlam darun egoche golpo ta.... Awasome keep it up..

ধন্যবাদ, লাইক, রেপুটেশন পয়েন্ট আর রেটিং দিয়ে পাশে থাকুন।
[+] 1 user Likes RockyKabir's post
Like Reply
#77
Apurbo!!
[+] 1 user Likes Paul's post
Like Reply
#78
(02-04-2026, 04:28 PM)RockyKabir Wrote: বিশ্বাস করুন। আপনার রিপ্লাইটা পড়ে ভীষণ আনন্দ হল। আপনি যদি নেগেটিভ রিভিউ দিতেন তাতেও আমার কিছু যায় আসত না। আপনার রিভিউ থেকেই স্পষ্ট যে আপনি গল্পটা বিশদে পড়ছেন। একজন লেখকের কাছে এর চেয়ে বড় পাওনা আর কিছু হতে পারে না। উৎসাহ দেবার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ। এটাই আমাদের লেখা চালিয়ে যাবার পাথেয়।

ami apnaka joto dakhi to obak hoi, ato hard work diya golpo lakhar pasapashi apni sadharon pathok der koto respect dichhen . Apnar ja lakhar skills dakchi apni khub dhruto ei forumer ekjon famous lakhok hoya jaben(Jodi O mona hoi apni already hoya gachen). 

Apnar kache aktai request ai forume r baki famous lakhok der moto hothat kore lakha bondo kore hariya jaben na.Atleast kono golpo Maj rastai bondo kore deban na. 

Apni pathok der kotha vanen tai ato kichu  bollam . Jodi out of way giya kichu bola thaki nij guna khoma korben. Apnar lakha diya onno k entertain korar power ache. R apni jana thakben

With great power comes great responsibility...... 
  
Best wishes ???
[+] 1 user Likes mity odin 2's post
Like Reply
#79
Thumbs Up 
(03-04-2026, 10:16 PM)mity odin 2 Wrote: ami apnaka joto dakhi to obak hoi, ato hard work diya golpo lakhar pasapashi apni sadharon pathok der koto respect dichhen . Apnar ja lakhar skills dakchi apni khub dhruto ei forumer ekjon famous lakhok hoya jaben(Jodi O mona hoi apni already hoya gachen). 

Apnar kache aktai request ai forume r baki famous lakhok der moto hothat kore lakha bondo kore hariya jaben na.Atleast kono golpo Maj rastai bondo kore deban na. 

Apni pathok der kotha vanen tai ato kichu  bollam . Jodi out of way giya kichu bola thaki nij guna khoma korben. Apnar lakha diya onno k entertain korar power ache. R apni jana thakben

With great power comes great responsibility...... 
  
Best wishes  Namaskar
Like Reply
#80
(03-04-2026, 10:16 PM)mity odin 2 Wrote: ami apnaka joto dakhi to obak hoi, ato hard work diya golpo lakhar pasapashi apni sadharon pathok der koto respect dichhen . Apnar ja lakhar skills dakchi apni khub dhruto ei forumer ekjon famous lakhok hoya jaben(Jodi O mona hoi apni already hoya gachen). 

Apnar kache aktai request ai forume r baki famous lakhok der moto hothat kore lakha bondo kore hariya jaben na.Atleast kono golpo Maj rastai bondo kore deban na. 

Apni pathok der kotha vanen tai ato kichu  bollam . Jodi out of way giya kichu bola thaki nij guna khoma korben. Apnar lakha diya onno k entertain korar power ache. R apni jana thakben

With great power comes great responsibility...... 
  
Best wishes ???

এ বাবা, না না আমি কিছু মনে করব কেন ? আপনি ঠিকই বলেছেন লেখা মাঝপথে ফেলে দিয়ে অদৃশ্য হয়ে যাওয়া অনুচিত। 

আমি সামান্য লেখালেখি করি, কয়েক জায়গায় লেখা বেরিয়েছে, সেই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে বলতে পারি পাঠকের ফিডব্যাক সেটা নেগেটিভ হোক বা পজেটিভ, লেখকের কাছে ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। আমি মাঝপথে গল্প লেখা ছেড়ে অদৃশ্য হব না তবে মানুষের জীবনে তো এমার্জেন্সি আসতে পারে, তখন বিরতি নিতেই হবে। আরেকটা ব্যাপার হল, গল্পের প্ল্যানিং। সেজন্য আমি এক একটা পর্ব শেষ করে দু-তিন সপ্তাহের বিরতি নেব। আগামী সপ্তাহে অধ্যায় ১৭ আসার পরে গল্পের পরবর্তী পর্ব আর অধ্যায় প্ল্যান করার জন্য আমি দু সপ্তাহ বিরতি নেব।
Like Reply




Users browsing this thread: 3 Guest(s)