26-03-2026, 07:48 PM
একাদশীর পরের দিন বিকেল বেলা মেহুল নিজের অ্যাপার্টমেন্টের ড্রয়িং রুমে বসে একটা ইংরেজি ম্যাগাজিন পড়ছিল। বাড়িতে আর কেউ নেই, মেহুল সম্পূর্ণ একা। এটাই ওর ভালো লাগে। নিরিবিলি-নিঃসঙ্গ, বেশি লোকসমাগম ওর পছন্দ নয়। এই অখন্ড নিরিবিলি, নিভৃত পরিবেশ ওকে শান্তি যোগায়। নিজের মতো করে বাঁচতে, নিজের মতো করে থাকতে দেয়। লোক যত বেশি তত অশান্তি, অশান্তি পছন্দ করে না মেহুল। তাই এমন একা থাকা।
সারা জীবন মেহুল এই গোটা পৃথিবীর কাছে শুধু এক টুকরো শান্তি চেয়ে এসেছে। একা সংসারে হয়তো পেয়েছে কিন্তু শান্তি পেল কোথায়?
অর্থবৃত্ত, ঐশ্বর্য সবকিছুই ওর আছে, আছে গর্ব করার মতো রূপবান এক স্বামী। কিন্তু একটুও সুখ নেই। এই নিভৃত অ্যাপার্টমেন্টে নিঃসঙ্গতা ভুতের মতো ভর করে আছে ওর কাঁধে। সারা দিন চাপা কষ্টে ওর ভেতরটা গুমরাতে থাকে। কারণ কি এই কষ্টের? মেহুল প্রায়ই নিজেকে প্রশ্ন করে। দিহান?
দিহান তো ওকে সবকিছুই দিয়েছে। ভালোবাসা? সেটাও। কিন্তু সেই ভালোবাসা একনিষ্ঠ ভালোবাসা নয় দিহানের ভালবাসার ভাগীদার ও একা নয়। দিহান প্রতিনিয়ত অন্য মেয়েদের সাথে শোয়। এটাই ওর কষ্টের কারণ।
প্রেমিকা যদি নিজের প্রেমিকের উপর একচ্ছত্র অধিকার প্রতিষ্ঠিত করতে নাই পারে তাহলে ভালোবাসার তাৎপর্য কোথায়, কেমন ভালোবাসা হলো এটা? মেহুল ভেবে পায় না। এদিকে কিন্তু দিহান কিছুই লুকায় নি, সব খুলে বলেছে। আর মেহুল কি এগুলো জানতো না? বিয়ের আগে থেকেই তো দিহান এমন করতো। মেহুল তো অনেকটা জেনে শুনেই ওকে বিয়ে করেছে।
সুখ দুঃখ কোনো কিছুই চিরস্থায়ী না। হুট করে আসে আবার চলেও যায়। কিন্তু মেহুলের জীবনে যেন দুঃখটা বরফের মতো জমাট বেঁধে থিতু হয়ে গেছে। যেতেই চাইছে না।
ওর কষ্ট আরো বারে যখন ও বুঝতে পারে দিহান ওরই ভাইয়ের বউয়ের সাথে পরকীয়া করছে, শুচ্ছে প্রতি নিয়ত। মেহুল কিছু করতে পারে না। কয়েক বার ভেবেছিল ওর দাভাই রিতমকে বলবে। কিন্তু হীতে বিপরীত হতে পারে। রিতম এমনিতে ঠান্ডা আর গোব্যচাড়া হয়ে থাকলেও এক বার যাকে ঘৃণা করে তার দিকে আর মুখ ফিরিয়ে তাকায় না। আর যদি রিতম সব কিছু জানার পর মধুমিতাকে তাড়িয়ে দেয়, তাহলে মেয়েটারই বা কি হবে? মেহুল তো ওর বাপের বাড়ী সম্পর্কে জানেই, মধুমিতার দাদা ওকে এক দিনের জন্যও খাওয়াবে না।
মধুমিতাকে প্রচুর পরিমাণে ভালোবাসে রিতম। মেহুল যদি বলে যে মধুমিতা পরকিয়া করছে তাও দিহানের সাথে, একথা হয়তো ও বিশ্বাসও করবে না। তাই মেহুল মধুমিতাকে বোঝাতে গিয়েছিলো। বুঝলো না।
এরপর থেকে মধুমিতা ওর দিকে কেমন যেন ঔদ্ধত্যপূর্ণ চ্যালেঞ্জ নিয়ে তাকায়। ভেতরে তখন এমন আগুন জ্বলে, যে মনে হয় মধুমিতাকে পুরিয়ে ছাই করে দেয়।
এদিকে মেহুলের হাতে যথেষ্ট প্রমাণও নেই। কি যে করে, কিভাবে যে ওদের থামায় সেটাই সারাদিন ভেবে আকুল হয় ও।
দিহান বাইরে যেমনই থাক, বাড়িতে নিপাত ভদ্রলোক। খারাপ কোনো বৈশিষ্ট্য ওর মধ্যে খুঁজে পাওয়া ভার। বাড়িতে ঢোকার আগে যেন আলাদা একটা লেবাস পড়ে আসে। যতক্ষণ বাড়িতে থাকে খুব মিষ্টি কথা বলে, মেহুলের খেয়াল রাখে, কাজে সাহায্য করে, এমনকি মাঝে মাঝে মেহুলকে রেঁধেও খাওয়ায়, তখন এত ভালো লাগে! দিহান যদি কায়মনোবাক্যে এমন থাকতো সব সময়।
আজ পাঁচটার দিকে ফিরে এলো দিহান। তারপর হাতমুখ ধুয়ে পোশাক পাল্টে এসে বসলো মেহুলের পাশে। এক হাত দিয়ে মেহুলের গলা জড়িয়ে ধরে বললো, কিগো? কি করছো?
মেহুল ম্যাগাজিনের থেকে মুখ না উঠিয়ে বলল, দেখতেই তো পারছো।
সারাদিন কেমন কাটলো?
ভালো।
এমন নিস্পৃহ উত্তর শুনে দিহান ওর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলো, এরপর এমন ভাব করলো যে ওর খুব অভিমান হয়েছে, বললো, তুমি কেমন বউ গো মিহুসোনা?
কেমন?
তোমার কথা জিজ্ঞেস করলাম যে কেমন দিন কাটলো তারতো উত্তর ঠিক মতো দিলেই না সাথে আমার দিন কেমন গেল সেটাও জিজ্ঞেস করলে না।
কেমন কেটেছে বলো?
দিহান সে কথার উত্তর না দিয়ে বললো, তুমি তো আগে এমন ছিলে না মিহু। ভার্সিটিতে যখন পড়তে তখন তো বেশ হাসিখুশি একটা মেয়ে ছিলে। এমনকি আমাদের বিয়ের পরও অনেক প্রাণবন্ত ছিলে তুমি। তাহলে এখন দিন দিন এমন ডেডবডির মতো এক্সপ্রেশনলেছ হয়ে যাচ্ছো কেন?
কোথায়? আমি তো আগের মতই আছি।
না আর আগের মতো নও। সব সময় এমন গম্ভীর থাকো।
সারাদিন যদি হি হি করে হাসি শেষে তুমি আমায় পাগল বলবে। মধুমিতা আগের মতোই গম্ভীর।
সারাদিন হাসতে বলছি না। দিহান বললো। মাঝেমধ্যে তো হাসতে পারো। সারাক্ষণ গোমরা মুখে থাকো, সবকিছুই ঠিকঠাক করছো, কাজ করছো, রাঁধছো, পরিবেশন করছো কিন্তু কেমন যেন ফরমাল সবকিছু। মেইডরা যেভাবে করে–প্রাণহীন, স্নেহ-ভালোবাসা হীন।
আমি তো মেইডই। তোমার বিনা পয়সার মেইড।
না। ভুল কথা। দিহান যেন আহত হলো। মেহুলের হাত দুটো নিজের দু হাতের মধ্যে নিয়ে বললো, তুমি আমার বউ মিহু। মাই বেটার হাফ। তুমি স্পেশাল।
তাই?
নও? ইয়ু আর স্পেশাল টু মি। আই কেয়ার ইয়ু মিহু। মেহুল নিষ্পলক চেয়ে থাকলো দিহানের চোখে। ওর শিকারি প্যান্থারের মতো চোখ দুটোয় অনাবিল কোমলতা।
বুঝবো কিভাবে?
কাছে ঘেঁসতে দেও কোথায়? সে তো তোমারই দোষ, বুঝবে কি করে যে তোমায় আমি ভালোবাসি, আদর-ইতো করতে দাও না।
আদর? ইয়ু মিন সেক্স? শুধিয়ে মেহুল বাইরে জানলার দিকে তাকালো। সবকিছু কি শরীর দিয়ে হয় দিহান? ও এমন ভাবে কথাগুলো বলছিল যেন ও দিহানের থেকে খুব দূরে। মনের কি কোনো দাম নেই?
অবশ্যই আছে আছে সোনা, মনের দাম তো আছেই কিন্তু শরীরের ভূমিকা বেশি। এখন ধর তুমি একটা মেয়ে মেয়ে তোমার হাসবেন্ড তোমার থেকে থাকে। মানে ডিস্ট্যান্স রিলেশনশিপ। তোমার ফিজিকাল কিছু নিড আছে। এখন ও তোমার কাছে আসতে পারে না, তোমাদের মধ্যে সেক্স কম হয়। তখন তুমি কি ডিসাপয়েন্টেড হবে না? অবশ্যই হবে। এটা নিয়ে কয়েকদিন আগে একটা আর্টিকেল পড়লাম। আমাদের দেশে যারা ডিস্ট্যান্স রিলেশনশিপে আছে তাদের প্রায় পঞ্চাশ শতাংশ মানুষ একজন আরেকজনের সাথে চিটিং করে। এখন আমার কথা ভালোবাসা যদি মানসিক ব্যাপার হতো তাহলে ওরা চিট করে কেন?
আমার মতে ভালোবাসার ৯০ ভাগই শারীরিক। দশ ভাগ মানসিক। ভালোবাসার মধ্যে শরীর না থাকলে, ভালোবাসা থাকে না, বুঝেছো সোনা?
তাহলে আমার অবস্থান কতটুকু দিহান? আমি যে তোমার ৯০ ভাগেই নেই? মেহুল ব্যথিত চোখে তাকালো দিহানের দিকে।
মানে?
আমাদের সম্পর্কটা কি শারীরিক? আমরা তো মাসেও সেক্স করিনা। তাই ধরে নিলাম আমাদের সম্পর্ক মানসিক। তাহলে আমি মাত্র তোমার ভালবাসার দশভাগ জুড়ে আছি বাকি নব্বই ভাগেই নেই।
মিহু.... এমনটা নয়।
তাহলে কেমন, আমাকে বোঝাও? বলে দিহানের চোখে চোখ আবার চোখ রাখলো মেহুল। গভীর সেই চাহনি। যেন মর্মবিদ্ধ হরিণীর চোখ।
দিহার নিজের দু হাতের মধ্যে মেহুলের সুন্দর মুখটাকে ধরলো। মুখ নামিয়ে আনলো ওর কমলার মত কোমল ঠোঁটে। দীর্ঘ মুহূর্তের এক চুম্বনের পর দিহান মেহুলকে ছেড়ে দিল, ফিসফিস করে বললো, আই লাভ ইউ লাইক দিস। হুয়াই ইয়ু ডোন্ট বিলিভ দিস?
এরপর ও মেহুলকে নিজের বুকের মধ্যে টেনে নেয়। অনেকক্ষণ জড়াজড়ি করে বসে থাকে ওরা। সেদিন রাতে অনেকদিন পর মেহুল ওর বরের সাথে শারীরিক সম্পর্ক আবদ্ধ হয়।
পরের দিনও বিকেলের দিকে বাড়ি ফিরে আসে দিহান। বাড়ি এসে মেহুলকে প্রস্তুত হতে বলে। মেহুল জিজ্ঞেস করে কোথায় যাবে?
ঢাকুরিয়া যাই চলো মা-বাবাকে বিজয়ার প্রণামটা করে আসি।
নাগো, এতদূর আর যেতে পারব না.
দূর কোথায়? জ্যামের জন্য সময় লাগে। এখনো পূজার ছুটি শেষ হয়নি। জ্যাম নেই। দ্রুত পৌঁছে যেতে পারবো।
দিহান জোর করছিলো। তখন মেহুলের মাথায় একটা বুদ্ধি এল, মা বাবা আজ বাড়ি নেই। রিতম আর মধুমিতা একা। এখন যদি দিহান সেখানে উপস্থিত হয় তাহলে নিজেকে কোন মতেই সামলাতে পারবে না, এটা মধুমিতাকে কাছে পাওয়ার জন্য ওর কাছে দারুন একটা সুযোগ, মধুমিতার সাথে ও কিছু একটা করবেই। মেহুল সর্তক থেকে ওদের হাতে নাতে ধরতে পারবে।
তাই ও বললো, আমাদের বাড়ি চলো। সেটা বেশ কাছে হবে। আজ আমার মা-বাবাকে প্রণামটা সেরে আসি কাল না হয়ে ঢাকুরিয়া যাবো।
দিহান কি ভাবলো জানিনা। কিন্তু এক পায়ে রাজি হয়ে গেলো। এদিকে মেহুল মনে মনে খুশি হলে নিজের পরিকল্পনা কাজ করছে দেখে।
ওদের একবার শুধু ধরতে পারুক, দিহানের ব্যবস্থা পরে করবে। মধুমিতাকে একটা শিক্ষা দিতে হবে আগে। রিতমের মতো সরল একটা মানুষকে কিভাবে ঠকায় ও? বাজে মেয়ে ছেলে একটা।
ভালো মনে করে সেদিন ওকে উপদেশ দিয়েছিলো বিনিময়ে কি অপমানটাই না করলো।
এদিকে রিতম আর মধুমিতার সম্পর্কে শীতল হাওয়া বয়ে যাচ্ছিল। সেদিনের পর মধুমিতা রিতমের সাথে তেমন একটা কথা বলছিলো না। রিতমকে কাছে ঘেষতে দিচ্ছিলো না, রাতের বেলা যোজন দূরত্ব বজায় রেখে ঘুমোচ্ছিল ।
রিতম কয়েকবার মধুমিতা কে বোঝানোর চেষ্টা করেছিল, মধুমিতা শোনেনি। এ কদিন রীতম আর বাড়ি থেকে বের হয়নি, সারাদিন বাড়িতেই থেকেছে। বাবা-মা মামার বাড়ি বেড়াতে গেছেন কাল। বাড়িতে শুধু ওরা দুজনেই। রিতম আজও সারাদিন বাড়ি ছিল। মধুমিতার পেছনে ঘুরঘুর করেছে। মধুমিতা কোন সুযোগই দিচ্ছিলো না কথা বলার। এদিকে রিতমের নিজেকে দোষী মনে হচ্ছিলো। স্থির থাকতে পারছিলো না ও।
দুপুরে খাওয়ার পর ড্রয়িং রুমে এসে বসেছিল মধুমিতা। ফোন দেখছিলো। আসলে, রিতমকে এড়িয়ে থাকার জন্য। কাল থেকে রিতম ওর পেছনে পড়ে আছে, বাচ্চা ছেলে যেমন মায়ের পেছনে ঘুরে বেড়ায় তেমন, ঘুর ঘুর করছে। মধুমিতা কোন কথা বলেনি। কথা বলবেও না। সেদিন ও যথেষ্ট কষ্ট পেয়েছে। সারাদিন অপেক্ষা করেছিলো, ফোন করেছে, মেসেজ দিয়েছে, রিতম একটারও উত্তর দেয়নি। মধুমিতার কথা বেমালুম ভুলে গেছিলো। বাড়ি ফিরেছে মদ খেয়ে, বন্ধুদের সাথে ফুর্তি করে। ঠিক করে কথাও বলতে পারছিল না সেদিন।
কতবার বলে দিয়েছিলো ওইসব বখাটে টাইপ ছেলেদের সাথে না মিশতে। রিতম একটা কথাও শোনে না। কোন গুরুত্ব দেয় না ওকে। এটাই বেশি কষ্ট দিচ্ছিলো মধুমিতাকে।
এই কষ্ট ছাই চাপা আগুনের মতো মধুমিতার ভেতরে জ্বলছিলো। পুঞ্জীভূত করছিলো ক্ষোভ। কখন যে আগ্নেয়গিরির মতো বিষ্ফোরণ ঘটে!
এক সময়ে রিতম এসে পাশে বসলো। মধুমিতা তাকালোও না। মনোযোগ দিয়ে ফোন দেখার ভান করলো। রিতম কয়েক মুহূর্ত কাচুমুচু মুখ করে বসে থাকলো, মৃদুস্বরে ডাকলো কয়েকবার। মিতা..... এই মিতা.....।
মধুমিতা উত্তর দিল না। নিজের মনে ফোন দেখতে লাগলো। রিতম আরো কয়েকবার ডাকলো কিন্তু মধুমিতা তেমনি নিরুত্তর। একসময় মধুমিতার ফোন নিয়ে নিলো রিতম।
মধুমিতা রেগে তাকালে ওর দিকে, কি করছো কি? ফোন নিলে কেন?
তুমি আমার সাথে কথা বলছো না কেন? রিতম শান্ত কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো।
আমার ইচ্ছে। যেমন তোমার ইচ্ছে হয় দশমীর দিন ঘুরে বেড়াও। কারো কথা শোনো? কারো কথা ভাবো?এখন আমার ইচ্ছে আমি কথা বলব না।
অবুঝের মত কথা বলছ কেন, মিতা? আমার ভুল হয়ে গেছে বলছি তো।
এমন আর কত ভুল করবে বলো তো? আর কত কষ্ট পাবো আমি? কত সইবো, বল। আমার অনুভূতির কি কোন দাম নেই? বারবার ভুল করবে, এসে ন্যাকান্যাকা স্বরে সরি বলবে, আর আমি গলে যাব। কি সহজ! আর ভালো লাগেনা আমার, সত্যি বলছি। তোমার এই নাটক আমার আর ভালো লাগে না।
কিছু বললেই এক্সকিউস দেওয়া শোনাবে। তোমার হয়তো ভালোও লাগবে না। কিন্তু আমি সত্যিই সরি। আমার নিজেকে খুব অপরাধী লাগছে।
তুমি আমার কথা ভুলে গেলে কি করে সেটা বল? কি ভাবে ভুলে গেলে যে আমি বাড়িতে অপেক্ষা করছি, তোমার সাথে এক সাথে কোথাও যাবো বলে। এই ঘটনা কি এটাই বোঝায় না যে তুমি আমাকে একটুও কেয়ার করো না, তোমার জীবনে আমার একটুও দাম নেই?
না মিতা, তুমিই সবচেয়ে দামি আমার কাছে। ইউ আর দা মোস্ট প্রিসিয়াস ফিলিং ইন মাই লাইফ মিতা। দা প্রিসিয়াস পার্সন।
মিথ্যে বলো না। তোমার এই মিষ্টি কথায় আমি ভুলছি না। বেশ ভালো চাল শিখেছো বলতে হবে। কিছু একটা করে এসেই এমন ভালো ভালো কথা বলো। আমাকে ভুলিয়ে গৌর-নিতাই হয়ে যাও আবার, দু হাত তুলে ধৈধৈ করে বেড়াও। সাপের মতো ফুসছিলো মধুমিতা। ছোবলের পর ছোবল দিয়ে দিয়ে বিষে নীল করে দিচ্ছিলো রিতমকে। এগুলো আমাকে আর টাচ করে না।
তাহলে.... আহত রিতম কথা খুঁজে পাচ্ছিল না।
তুমি জানো। মধুমিতা আরেক দিকে মুখ ঘুরিয়ে নিলো।
তুমি কথা বলবে না আমার সাথে?
কথা বলে কি করবে? তোমার তো আমার দরকার নেই। বেশ ভালো নিজের মতো থাকছো, আমার সাথে কথা না বললেও তোমার চলবে।
মধুমিতা উঠে গেল সেখান থেকে। রিতম আর ডাকলো না। সাহস পেলো না বললেও ভুল হবে না। ও এমনই। বল প্রয়োগ করা শিখলো না কোনো দিন। দুর্বল রিতম।
মধুমিতা নিজের ঘরে এসে বিছানায় শুয়ে পড়লো। দেখতে দেখতে চোখ ভিজে গেল জলে। মন চাইলো ছুটে চলে যায় আবার রিতমের আছে, ওকে জাপটে ধরে। কিন্তু প্রবল আত্মসম্মানবোধ বেঁধে রাখলো ওকে। রিতম আরেকটু মানাতে পারত না? আর একটু জোরে কথা বলতে পারতো না? দরকার হলে শারীরিকভাবে জোর করতো, হাত মুচরে ধরে চোখে চোখ রেখে বলত, "তুই আমার বউ, আমার সাথে কথা বলতেই হবে তোকে।” নাহলে চুমু খেতো ঠোঁটে। তাহলেই তো ওর সব বাঁধ ভেঙে যেতো, আর রেগে থাকতে পারতো না। কেঁদে রিতমের বুক ভিজিয়ে দিতো।
এত কষ্ট কেন ওর জীবনে? কেন সবকিছু এত জটিল? ভগবান বাঁচাও। আর পারছে না, আর পারছে না।বুক জলে যাচ্ছে।
মধুমিতা নিরবে কাঁদতে লাগলো।
সারা জীবন মেহুল এই গোটা পৃথিবীর কাছে শুধু এক টুকরো শান্তি চেয়ে এসেছে। একা সংসারে হয়তো পেয়েছে কিন্তু শান্তি পেল কোথায়?
অর্থবৃত্ত, ঐশ্বর্য সবকিছুই ওর আছে, আছে গর্ব করার মতো রূপবান এক স্বামী। কিন্তু একটুও সুখ নেই। এই নিভৃত অ্যাপার্টমেন্টে নিঃসঙ্গতা ভুতের মতো ভর করে আছে ওর কাঁধে। সারা দিন চাপা কষ্টে ওর ভেতরটা গুমরাতে থাকে। কারণ কি এই কষ্টের? মেহুল প্রায়ই নিজেকে প্রশ্ন করে। দিহান?
দিহান তো ওকে সবকিছুই দিয়েছে। ভালোবাসা? সেটাও। কিন্তু সেই ভালোবাসা একনিষ্ঠ ভালোবাসা নয় দিহানের ভালবাসার ভাগীদার ও একা নয়। দিহান প্রতিনিয়ত অন্য মেয়েদের সাথে শোয়। এটাই ওর কষ্টের কারণ।
প্রেমিকা যদি নিজের প্রেমিকের উপর একচ্ছত্র অধিকার প্রতিষ্ঠিত করতে নাই পারে তাহলে ভালোবাসার তাৎপর্য কোথায়, কেমন ভালোবাসা হলো এটা? মেহুল ভেবে পায় না। এদিকে কিন্তু দিহান কিছুই লুকায় নি, সব খুলে বলেছে। আর মেহুল কি এগুলো জানতো না? বিয়ের আগে থেকেই তো দিহান এমন করতো। মেহুল তো অনেকটা জেনে শুনেই ওকে বিয়ে করেছে।
সুখ দুঃখ কোনো কিছুই চিরস্থায়ী না। হুট করে আসে আবার চলেও যায়। কিন্তু মেহুলের জীবনে যেন দুঃখটা বরফের মতো জমাট বেঁধে থিতু হয়ে গেছে। যেতেই চাইছে না।
ওর কষ্ট আরো বারে যখন ও বুঝতে পারে দিহান ওরই ভাইয়ের বউয়ের সাথে পরকীয়া করছে, শুচ্ছে প্রতি নিয়ত। মেহুল কিছু করতে পারে না। কয়েক বার ভেবেছিল ওর দাভাই রিতমকে বলবে। কিন্তু হীতে বিপরীত হতে পারে। রিতম এমনিতে ঠান্ডা আর গোব্যচাড়া হয়ে থাকলেও এক বার যাকে ঘৃণা করে তার দিকে আর মুখ ফিরিয়ে তাকায় না। আর যদি রিতম সব কিছু জানার পর মধুমিতাকে তাড়িয়ে দেয়, তাহলে মেয়েটারই বা কি হবে? মেহুল তো ওর বাপের বাড়ী সম্পর্কে জানেই, মধুমিতার দাদা ওকে এক দিনের জন্যও খাওয়াবে না।
মধুমিতাকে প্রচুর পরিমাণে ভালোবাসে রিতম। মেহুল যদি বলে যে মধুমিতা পরকিয়া করছে তাও দিহানের সাথে, একথা হয়তো ও বিশ্বাসও করবে না। তাই মেহুল মধুমিতাকে বোঝাতে গিয়েছিলো। বুঝলো না।
এরপর থেকে মধুমিতা ওর দিকে কেমন যেন ঔদ্ধত্যপূর্ণ চ্যালেঞ্জ নিয়ে তাকায়। ভেতরে তখন এমন আগুন জ্বলে, যে মনে হয় মধুমিতাকে পুরিয়ে ছাই করে দেয়।
এদিকে মেহুলের হাতে যথেষ্ট প্রমাণও নেই। কি যে করে, কিভাবে যে ওদের থামায় সেটাই সারাদিন ভেবে আকুল হয় ও।
দিহান বাইরে যেমনই থাক, বাড়িতে নিপাত ভদ্রলোক। খারাপ কোনো বৈশিষ্ট্য ওর মধ্যে খুঁজে পাওয়া ভার। বাড়িতে ঢোকার আগে যেন আলাদা একটা লেবাস পড়ে আসে। যতক্ষণ বাড়িতে থাকে খুব মিষ্টি কথা বলে, মেহুলের খেয়াল রাখে, কাজে সাহায্য করে, এমনকি মাঝে মাঝে মেহুলকে রেঁধেও খাওয়ায়, তখন এত ভালো লাগে! দিহান যদি কায়মনোবাক্যে এমন থাকতো সব সময়।
আজ পাঁচটার দিকে ফিরে এলো দিহান। তারপর হাতমুখ ধুয়ে পোশাক পাল্টে এসে বসলো মেহুলের পাশে। এক হাত দিয়ে মেহুলের গলা জড়িয়ে ধরে বললো, কিগো? কি করছো?
মেহুল ম্যাগাজিনের থেকে মুখ না উঠিয়ে বলল, দেখতেই তো পারছো।
সারাদিন কেমন কাটলো?
ভালো।
এমন নিস্পৃহ উত্তর শুনে দিহান ওর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলো, এরপর এমন ভাব করলো যে ওর খুব অভিমান হয়েছে, বললো, তুমি কেমন বউ গো মিহুসোনা?
কেমন?
তোমার কথা জিজ্ঞেস করলাম যে কেমন দিন কাটলো তারতো উত্তর ঠিক মতো দিলেই না সাথে আমার দিন কেমন গেল সেটাও জিজ্ঞেস করলে না।
কেমন কেটেছে বলো?
দিহান সে কথার উত্তর না দিয়ে বললো, তুমি তো আগে এমন ছিলে না মিহু। ভার্সিটিতে যখন পড়তে তখন তো বেশ হাসিখুশি একটা মেয়ে ছিলে। এমনকি আমাদের বিয়ের পরও অনেক প্রাণবন্ত ছিলে তুমি। তাহলে এখন দিন দিন এমন ডেডবডির মতো এক্সপ্রেশনলেছ হয়ে যাচ্ছো কেন?
কোথায়? আমি তো আগের মতই আছি।
না আর আগের মতো নও। সব সময় এমন গম্ভীর থাকো।
সারাদিন যদি হি হি করে হাসি শেষে তুমি আমায় পাগল বলবে। মধুমিতা আগের মতোই গম্ভীর।
সারাদিন হাসতে বলছি না। দিহান বললো। মাঝেমধ্যে তো হাসতে পারো। সারাক্ষণ গোমরা মুখে থাকো, সবকিছুই ঠিকঠাক করছো, কাজ করছো, রাঁধছো, পরিবেশন করছো কিন্তু কেমন যেন ফরমাল সবকিছু। মেইডরা যেভাবে করে–প্রাণহীন, স্নেহ-ভালোবাসা হীন।
আমি তো মেইডই। তোমার বিনা পয়সার মেইড।
না। ভুল কথা। দিহান যেন আহত হলো। মেহুলের হাত দুটো নিজের দু হাতের মধ্যে নিয়ে বললো, তুমি আমার বউ মিহু। মাই বেটার হাফ। তুমি স্পেশাল।
তাই?
নও? ইয়ু আর স্পেশাল টু মি। আই কেয়ার ইয়ু মিহু। মেহুল নিষ্পলক চেয়ে থাকলো দিহানের চোখে। ওর শিকারি প্যান্থারের মতো চোখ দুটোয় অনাবিল কোমলতা।
বুঝবো কিভাবে?
কাছে ঘেঁসতে দেও কোথায়? সে তো তোমারই দোষ, বুঝবে কি করে যে তোমায় আমি ভালোবাসি, আদর-ইতো করতে দাও না।
আদর? ইয়ু মিন সেক্স? শুধিয়ে মেহুল বাইরে জানলার দিকে তাকালো। সবকিছু কি শরীর দিয়ে হয় দিহান? ও এমন ভাবে কথাগুলো বলছিল যেন ও দিহানের থেকে খুব দূরে। মনের কি কোনো দাম নেই?
অবশ্যই আছে আছে সোনা, মনের দাম তো আছেই কিন্তু শরীরের ভূমিকা বেশি। এখন ধর তুমি একটা মেয়ে মেয়ে তোমার হাসবেন্ড তোমার থেকে থাকে। মানে ডিস্ট্যান্স রিলেশনশিপ। তোমার ফিজিকাল কিছু নিড আছে। এখন ও তোমার কাছে আসতে পারে না, তোমাদের মধ্যে সেক্স কম হয়। তখন তুমি কি ডিসাপয়েন্টেড হবে না? অবশ্যই হবে। এটা নিয়ে কয়েকদিন আগে একটা আর্টিকেল পড়লাম। আমাদের দেশে যারা ডিস্ট্যান্স রিলেশনশিপে আছে তাদের প্রায় পঞ্চাশ শতাংশ মানুষ একজন আরেকজনের সাথে চিটিং করে। এখন আমার কথা ভালোবাসা যদি মানসিক ব্যাপার হতো তাহলে ওরা চিট করে কেন?
আমার মতে ভালোবাসার ৯০ ভাগই শারীরিক। দশ ভাগ মানসিক। ভালোবাসার মধ্যে শরীর না থাকলে, ভালোবাসা থাকে না, বুঝেছো সোনা?
তাহলে আমার অবস্থান কতটুকু দিহান? আমি যে তোমার ৯০ ভাগেই নেই? মেহুল ব্যথিত চোখে তাকালো দিহানের দিকে।
মানে?
আমাদের সম্পর্কটা কি শারীরিক? আমরা তো মাসেও সেক্স করিনা। তাই ধরে নিলাম আমাদের সম্পর্ক মানসিক। তাহলে আমি মাত্র তোমার ভালবাসার দশভাগ জুড়ে আছি বাকি নব্বই ভাগেই নেই।
মিহু.... এমনটা নয়।
তাহলে কেমন, আমাকে বোঝাও? বলে দিহানের চোখে চোখ আবার চোখ রাখলো মেহুল। গভীর সেই চাহনি। যেন মর্মবিদ্ধ হরিণীর চোখ।
দিহার নিজের দু হাতের মধ্যে মেহুলের সুন্দর মুখটাকে ধরলো। মুখ নামিয়ে আনলো ওর কমলার মত কোমল ঠোঁটে। দীর্ঘ মুহূর্তের এক চুম্বনের পর দিহান মেহুলকে ছেড়ে দিল, ফিসফিস করে বললো, আই লাভ ইউ লাইক দিস। হুয়াই ইয়ু ডোন্ট বিলিভ দিস?
এরপর ও মেহুলকে নিজের বুকের মধ্যে টেনে নেয়। অনেকক্ষণ জড়াজড়ি করে বসে থাকে ওরা। সেদিন রাতে অনেকদিন পর মেহুল ওর বরের সাথে শারীরিক সম্পর্ক আবদ্ধ হয়।
পরের দিনও বিকেলের দিকে বাড়ি ফিরে আসে দিহান। বাড়ি এসে মেহুলকে প্রস্তুত হতে বলে। মেহুল জিজ্ঞেস করে কোথায় যাবে?
ঢাকুরিয়া যাই চলো মা-বাবাকে বিজয়ার প্রণামটা করে আসি।
নাগো, এতদূর আর যেতে পারব না.
দূর কোথায়? জ্যামের জন্য সময় লাগে। এখনো পূজার ছুটি শেষ হয়নি। জ্যাম নেই। দ্রুত পৌঁছে যেতে পারবো।
দিহান জোর করছিলো। তখন মেহুলের মাথায় একটা বুদ্ধি এল, মা বাবা আজ বাড়ি নেই। রিতম আর মধুমিতা একা। এখন যদি দিহান সেখানে উপস্থিত হয় তাহলে নিজেকে কোন মতেই সামলাতে পারবে না, এটা মধুমিতাকে কাছে পাওয়ার জন্য ওর কাছে দারুন একটা সুযোগ, মধুমিতার সাথে ও কিছু একটা করবেই। মেহুল সর্তক থেকে ওদের হাতে নাতে ধরতে পারবে।
তাই ও বললো, আমাদের বাড়ি চলো। সেটা বেশ কাছে হবে। আজ আমার মা-বাবাকে প্রণামটা সেরে আসি কাল না হয়ে ঢাকুরিয়া যাবো।
দিহান কি ভাবলো জানিনা। কিন্তু এক পায়ে রাজি হয়ে গেলো। এদিকে মেহুল মনে মনে খুশি হলে নিজের পরিকল্পনা কাজ করছে দেখে।
ওদের একবার শুধু ধরতে পারুক, দিহানের ব্যবস্থা পরে করবে। মধুমিতাকে একটা শিক্ষা দিতে হবে আগে। রিতমের মতো সরল একটা মানুষকে কিভাবে ঠকায় ও? বাজে মেয়ে ছেলে একটা।
ভালো মনে করে সেদিন ওকে উপদেশ দিয়েছিলো বিনিময়ে কি অপমানটাই না করলো।
এদিকে রিতম আর মধুমিতার সম্পর্কে শীতল হাওয়া বয়ে যাচ্ছিল। সেদিনের পর মধুমিতা রিতমের সাথে তেমন একটা কথা বলছিলো না। রিতমকে কাছে ঘেষতে দিচ্ছিলো না, রাতের বেলা যোজন দূরত্ব বজায় রেখে ঘুমোচ্ছিল ।
রিতম কয়েকবার মধুমিতা কে বোঝানোর চেষ্টা করেছিল, মধুমিতা শোনেনি। এ কদিন রীতম আর বাড়ি থেকে বের হয়নি, সারাদিন বাড়িতেই থেকেছে। বাবা-মা মামার বাড়ি বেড়াতে গেছেন কাল। বাড়িতে শুধু ওরা দুজনেই। রিতম আজও সারাদিন বাড়ি ছিল। মধুমিতার পেছনে ঘুরঘুর করেছে। মধুমিতা কোন সুযোগই দিচ্ছিলো না কথা বলার। এদিকে রিতমের নিজেকে দোষী মনে হচ্ছিলো। স্থির থাকতে পারছিলো না ও।
দুপুরে খাওয়ার পর ড্রয়িং রুমে এসে বসেছিল মধুমিতা। ফোন দেখছিলো। আসলে, রিতমকে এড়িয়ে থাকার জন্য। কাল থেকে রিতম ওর পেছনে পড়ে আছে, বাচ্চা ছেলে যেমন মায়ের পেছনে ঘুরে বেড়ায় তেমন, ঘুর ঘুর করছে। মধুমিতা কোন কথা বলেনি। কথা বলবেও না। সেদিন ও যথেষ্ট কষ্ট পেয়েছে। সারাদিন অপেক্ষা করেছিলো, ফোন করেছে, মেসেজ দিয়েছে, রিতম একটারও উত্তর দেয়নি। মধুমিতার কথা বেমালুম ভুলে গেছিলো। বাড়ি ফিরেছে মদ খেয়ে, বন্ধুদের সাথে ফুর্তি করে। ঠিক করে কথাও বলতে পারছিল না সেদিন।
কতবার বলে দিয়েছিলো ওইসব বখাটে টাইপ ছেলেদের সাথে না মিশতে। রিতম একটা কথাও শোনে না। কোন গুরুত্ব দেয় না ওকে। এটাই বেশি কষ্ট দিচ্ছিলো মধুমিতাকে।
এই কষ্ট ছাই চাপা আগুনের মতো মধুমিতার ভেতরে জ্বলছিলো। পুঞ্জীভূত করছিলো ক্ষোভ। কখন যে আগ্নেয়গিরির মতো বিষ্ফোরণ ঘটে!
এক সময়ে রিতম এসে পাশে বসলো। মধুমিতা তাকালোও না। মনোযোগ দিয়ে ফোন দেখার ভান করলো। রিতম কয়েক মুহূর্ত কাচুমুচু মুখ করে বসে থাকলো, মৃদুস্বরে ডাকলো কয়েকবার। মিতা..... এই মিতা.....।
মধুমিতা উত্তর দিল না। নিজের মনে ফোন দেখতে লাগলো। রিতম আরো কয়েকবার ডাকলো কিন্তু মধুমিতা তেমনি নিরুত্তর। একসময় মধুমিতার ফোন নিয়ে নিলো রিতম।
মধুমিতা রেগে তাকালে ওর দিকে, কি করছো কি? ফোন নিলে কেন?
তুমি আমার সাথে কথা বলছো না কেন? রিতম শান্ত কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো।
আমার ইচ্ছে। যেমন তোমার ইচ্ছে হয় দশমীর দিন ঘুরে বেড়াও। কারো কথা শোনো? কারো কথা ভাবো?এখন আমার ইচ্ছে আমি কথা বলব না।
অবুঝের মত কথা বলছ কেন, মিতা? আমার ভুল হয়ে গেছে বলছি তো।
এমন আর কত ভুল করবে বলো তো? আর কত কষ্ট পাবো আমি? কত সইবো, বল। আমার অনুভূতির কি কোন দাম নেই? বারবার ভুল করবে, এসে ন্যাকান্যাকা স্বরে সরি বলবে, আর আমি গলে যাব। কি সহজ! আর ভালো লাগেনা আমার, সত্যি বলছি। তোমার এই নাটক আমার আর ভালো লাগে না।
কিছু বললেই এক্সকিউস দেওয়া শোনাবে। তোমার হয়তো ভালোও লাগবে না। কিন্তু আমি সত্যিই সরি। আমার নিজেকে খুব অপরাধী লাগছে।
তুমি আমার কথা ভুলে গেলে কি করে সেটা বল? কি ভাবে ভুলে গেলে যে আমি বাড়িতে অপেক্ষা করছি, তোমার সাথে এক সাথে কোথাও যাবো বলে। এই ঘটনা কি এটাই বোঝায় না যে তুমি আমাকে একটুও কেয়ার করো না, তোমার জীবনে আমার একটুও দাম নেই?
না মিতা, তুমিই সবচেয়ে দামি আমার কাছে। ইউ আর দা মোস্ট প্রিসিয়াস ফিলিং ইন মাই লাইফ মিতা। দা প্রিসিয়াস পার্সন।
মিথ্যে বলো না। তোমার এই মিষ্টি কথায় আমি ভুলছি না। বেশ ভালো চাল শিখেছো বলতে হবে। কিছু একটা করে এসেই এমন ভালো ভালো কথা বলো। আমাকে ভুলিয়ে গৌর-নিতাই হয়ে যাও আবার, দু হাত তুলে ধৈধৈ করে বেড়াও। সাপের মতো ফুসছিলো মধুমিতা। ছোবলের পর ছোবল দিয়ে দিয়ে বিষে নীল করে দিচ্ছিলো রিতমকে। এগুলো আমাকে আর টাচ করে না।
তাহলে.... আহত রিতম কথা খুঁজে পাচ্ছিল না।
তুমি জানো। মধুমিতা আরেক দিকে মুখ ঘুরিয়ে নিলো।
তুমি কথা বলবে না আমার সাথে?
কথা বলে কি করবে? তোমার তো আমার দরকার নেই। বেশ ভালো নিজের মতো থাকছো, আমার সাথে কথা না বললেও তোমার চলবে।
মধুমিতা উঠে গেল সেখান থেকে। রিতম আর ডাকলো না। সাহস পেলো না বললেও ভুল হবে না। ও এমনই। বল প্রয়োগ করা শিখলো না কোনো দিন। দুর্বল রিতম।
মধুমিতা নিজের ঘরে এসে বিছানায় শুয়ে পড়লো। দেখতে দেখতে চোখ ভিজে গেল জলে। মন চাইলো ছুটে চলে যায় আবার রিতমের আছে, ওকে জাপটে ধরে। কিন্তু প্রবল আত্মসম্মানবোধ বেঁধে রাখলো ওকে। রিতম আরেকটু মানাতে পারত না? আর একটু জোরে কথা বলতে পারতো না? দরকার হলে শারীরিকভাবে জোর করতো, হাত মুচরে ধরে চোখে চোখ রেখে বলত, "তুই আমার বউ, আমার সাথে কথা বলতেই হবে তোকে।” নাহলে চুমু খেতো ঠোঁটে। তাহলেই তো ওর সব বাঁধ ভেঙে যেতো, আর রেগে থাকতে পারতো না। কেঁদে রিতমের বুক ভিজিয়ে দিতো।
এত কষ্ট কেন ওর জীবনে? কেন সবকিছু এত জটিল? ভগবান বাঁচাও। আর পারছে না, আর পারছে না।বুক জলে যাচ্ছে।
মধুমিতা নিরবে কাঁদতে লাগলো।


![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)
