Posts: 175
Threads: 4
Likes Received: 600 in 131 posts
Likes Given: 94
Joined: Oct 2025
Reputation:
249
27-02-2026, 12:31 PM
(This post was last modified: 19-03-2026, 10:13 PM by RockyKabir. Edited 1 time in total. Edited 1 time in total.)
অষ্টম অধ্যায়
ইতালির সেই অভিশপ্ত, দমবন্ধ করা রাতের পর ক্যালেন্ডারের পাতা থেকে চারটে বছর নিঃশব্দে খসে পড়েছে। সময় হয়তো সব ক্ষত সারিয়ে দেয়, কিন্তু কিছু কিছু ক্ষত সারার পর যে দাগ রেখে যায়, তা মানুষের খোলসটাই পুরোপুরি পাল্টে দেয়।
চ্যাটার্জী পরিবারেও সেটাই ঘটেছে। সেই রাতের পর থেকে বাড়ির প্রতিটি সদস্যের জীবনে এক নীরব পরিবর্তন এসেছে।
বিদিশা ট্রেডমিলের স্পিডটা আরও এক ধাপ বাড়িয়ে দিলেন। মেশিনের একটানা ঘড়ঘড় শব্দের সাথে তাঁর দ্রুত, নিয়ন্ত্রিত শ্বাসপ্রশ্বাসের শব্দ মিশে জিমের নিস্তব্ধতাকে চিরে দিচ্ছিল। স্পোর্টস ব্রায়ের ওপর দিয়ে ঘামের বিন্দুগুলো গড়িয়ে নামছে তাঁর সুডৌল, নির্মেদ পেটের ওপর দিয়ে। নাভির ঠিক নিচে, ট্র্যাকপ্যান্টের ইলাস্টিকের কাছে এসে সেই ঘামের বিন্দুগুলো হারিয়ে যাচ্ছে। চল্লিশ ছুঁই ছুঁই একজন নারীর শরীর এতটা টানটান, এতটা নিটোল হতে পারে, তা স্বচক্ষে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। তাঁর বাহুর পেশিতে সূক্ষ বিভাজন, উন্মুক্ত কাঁধের হাড়ে কাঠিন্য, আর উদ্ধত স্তনযুগলের ওঠাপড়ায় এক বন্য প্রাণশক্তি যেন ফেটে পড়তে চাইছে।
বিদিশা ট্রেডমিল থেকে নেমে একটা তোয়ালে দিয়ে মুখের ঘাম মুছলেন।
সামনে জিমের বিশাল আয়নাটার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের ঘামে ভেজা প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে বিদিশার ঠোঁটের কোণে একটা বাঁকা হাসি ফুটে উঠল। ওয়ার্কআউটের পর তার শ্বাস-প্রশ্বাস এখনো দ্রুত। ঘামের বিন্দুগুলো তার ফর্সা, মসৃণ গলা বেয়ে নিচের দিকে নেমে এসে স্পোর্টস ব্রার মাঝখানের গভীর খাঁজে হারিয়ে যাচ্ছে।
ভেজা কাপড়ের ওপর দিয়ে তার উদ্ধত স্তনযুগলের আভাস স্পষ্ট। চল্লিশের কাছাকাছি বয়স হলেও বিদিশার টানটান, নির্মেদ ফিগার আর ঢলঢলে মুখশ্রী দেখলে যে কেউ নির্দ্বিধায় তাকে কুড়ি-বাইশ বছরের সদ্য তরুণী বলে ভুল করবে। মডেলদের মতো ঈর্ষণীয় ফিগার আর কোনো ক্লাসিক সিনেমার হিরোইনের মতো নিখুঁত মুখাবয়ব। সব মিলিয়ে বিদিশা এখন আগের চেয়েও বেশি মোহময়ী।
ইতালির সেই রাতের আগে তিনি ছিলেন নরম, লাজুক, আর পরনির্ভরশীল এক নারী। কিন্তু, বনগানির প্রাসাদের ওই অন্ধকার ঘরটা তাঁর পুরোনো সত্তাকে পুড়িয়ে ছাই করে দিয়েছে। সেই ছাই থেকে জন্ম নিয়েছে এক নতুন বিদিশা।
ইতালির ঘটনার পর বিদিশার ভেতরের সেই নরম সত্তাটা যেন চিরতরে মরে গেছে। তার জায়গায় জন্ম নিয়েছে এক মানসিক কাঠিন্য। তিনি বুঝেছেন, এই পৃথিবীতে দুর্বলতার কোনো ক্ষমা নেই।
তার সেই গভীর, অন্তঃসলিলা স্বভাব অবশ্য নষ্ট হয়নি। যার জন্য এই কঠিনতার ছাপ তিনি সহজে বাইরে পড়তে দেন না। তাঁর মনে এক ইস্পাত কঠিন সংকল্পের দুর্ভেদ্য আবরণ তৈরি হয়েছে। কেউ আর তাকে আঘাত করতে পারবে না, কেউ না।
আয়না থেকে চোখ সরিয়ে একটা তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছলেন বিদিশা। চারপাশের শূন্যতা তাকে যেন রোজ গিলে খেতে আসে। তার জীবন এখন একাকীত্বে ভর্তি আর সেই একাকীত্ব কাটানোর জন্যই তার দিনের অনেকটা সময় এই জিমে কাটে। শারীরিক কষ্টের মধ্যে দিয়ে তিনি মানসিক শূন্যতাকে ভরাট করার চেষ্টা করেন।
অরুণের কথা মনে পড়তেই একটা শীতল দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো বিদিশার বুক চিরে।
অরুণের সাথে তাঁর সম্পর্কটা এখন এক বরফজমাট হ্রদের মতো। ওপরটা শান্ত, কিন্তু ভেতরে কোনো প্রাণের স্পন্দন নেই। এই দূরত্বটা বিদিশা তৈরি করেননি, করেছেন অরুণ নিজেই।
একটা অদ্ভুত, অদৃশ্য অপরাধবোধ তাঁকে কুরে কুরে খায়। কিসের অপরাধবোধ, সেটা অরুণ নিজেও স্পষ্ট করে জানেন না। সেই রাতে তিনি নেশার ঘোরে অচেতন ছিলেন, কিন্তু তার পুরুষত্ব, তার স্বামী হিসেবে রক্ষাকর্তার অহংকারে একটা চিরস্থায়ী ফাটল ধরে গেছে। অরুণের সবসময় মনে হয়, তার অবচেতন মন তাকে প্রতিনিয়ত জানান দেয়, যে বিদিশা তাকে সবটা খুলে বলেনি।
কিছু একটা ভয়ংকর ঘটেছিল ওই প্রাসাদে, যা বিদিশা নিজের ভেতরে সযত্নে লুকিয়ে রেখেছে।
ওই রাতে এমন কিছু ঘটেছিল, যা তার পুরুষত্বকে, তার স্বামী হিসেবে রক্ষাকর্তার ভূমিকাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। কিন্তু সেই সত্যিকে খুঁড়ে বের করার মতো মানসিক সাহস অরুণের নেই।
তাই তিনি পালানোর পথ বেছে নিয়েছেন।
বিদিশার কাছাকাছি এলেই একটা ব্যর্থতার বোধ অরুণকে জাপটে ধরে। এখন কাজ থেকে ফিরলে অরুণ আর আগের মতো বিদিশার কাছে গিয়ে গল্প করেন না। সরাসরি নিজের স্টাডিতে চলে যান। ছুটির দিনে খুব সকালে গল্ফ খেলার নাম করে বেরিয়ে যান।
অরুণ এখন বিছানার একদম একধারে, বিদিশার দিকে পিঠ দিয়ে শুয়ে থাকেন। তাদের মাঝখানে পড়ে থাকে মাইলের পর মাইল চওড়া এক অদৃশ্য দেওয়াল।
ইতালির ঘটনার আগে অরুণ এমন আচরণ করলে বিদিশার মনে গভীর ক্ষত তৈরি হতো। তিনি হয়তো অভিমান করতেন।
কিন্তু এখন?
এখন আর তাঁর কোনো কষ্ট হয় না। অরুণের এই দূরে সরে থাকাটা তাঁকে প্রথম প্রথম সামান্য পীড়া দিলেও, এখন সেটা তাঁর মনে আর কোনো গভীর ক্ষত তৈরি করতে পারে না। তিনি বুঝতে পারেন, তাঁর ভেতর থেকে সেই দুর্বল নারী মরে গেছে। তাঁর মনোভাব এখন অনেক কঠিন, অনেক বাস্তববাদী।
এখন এটা নিয়ে তিনি আর খুব একটা মাথা ঘামান না। এখন আর তার চোখে জল আসে না। এই নির্লিপ্ততা থেকেই বিদিশা বুঝতে পারেন, তিনি আগের সেই গৃহবধূটি নেই। তার মনোভাব এখন অনেক কঠিন, বাস্তবমুখী এবং শীতল হয়ে গেছে।
অরুণ যে শূন্যস্থানটা তৈরি করেছে, তা হয়তো প্রকৃতির নিয়মেই অন্য কাউকে দিয়ে পূরণ হওয়ার অপেক্ষায় আছে।
কিন্তু যেটা তাঁকে সবচেয়ে বেশি যন্ত্রণা দেয়, যা তাঁর ইস্পাতের বর্ম ভেদ করে তাঁকে রক্তাক্ত করে, সেটা হলো তাঁর একমাত্র ছেলে অয়নের আচরণ। তার নাড়ীছেঁড়া ধন, তার একমাত্র ছেলে, এখন তাকে অত্যন্ত সন্তর্পণে, সতর্কভাবে এড়িয়ে চলে।
অয়ন... বিদিশার চোখের সামনে ছেলের মুখটা ভেসে উঠতেই তাঁর সেই নিবিড় কালো চোখে একটা বেদনা মিশ্রিত বিষাদঘন অনুভূতির সঞ্চার হলো। অয়ন তাঁর থেকে যোজন যোজন দূরে সরে গেছে। ছেলেটা তাঁকে সতর্কভাবে, প্রায় হিসেব করে এড়িয়ে চলে।
কেন?
এই প্রশ্নের উত্তর বিদিশা কোনোদিন অয়নের কাছে দাবি করেননি। তার স্বভাবসিদ্ধ অন্তর্মুখী চরিত্র তাকে বাধা দিয়েছে ছেলের কাছে জবাবদিহি চাইতে।
বিদিশা নিজের মনকে প্রবোধ দেন—অয়ন বড় হয়েছে, ওর নিজের একটা জীবন তৈরি হয়েছে। কলেজে নতুন বন্ধু-বান্ধব, নতুন পরিবেশ। কিন্তু, অয়ন কেন তাঁর সাথে এক ঘরে, একা থাকতে পর্যন্ত চায় না? কেন সে চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলে না? এই প্রশ্নগুলো রাতের অন্ধকারে বিদিশাকে কুরে কুরে খায়।
বিদিশা নিজের মনকে প্রবোধ দেয় - অয়ন বড় হয়েছে, কলেজে উঠেছে, ওর নিজের একটা আলাদা জগৎ তৈরি হয়েছে, বন্ধুবান্ধব হয়েছে, তাই হয়তো মায়ের আঁচল ছেড়ে সে দূরে থাকতে চায়। এই বয়সে ছেলেরা একটু স্বাধীনচেতা হয়, মাকে হয়তো এড়িয়ে চলে। এটা স্বাভাবিক।
কিন্তু এই যুক্তি তাঁর মাতৃসত্তাকে সান্ত্বনা দিতে পারে না।
কিন্তু... কিন্তু, অয়ন কেন তার সাথে একা এক ঘরে থাকতে চায় না?
কেন তার দৃষ্টি সবসময় মা'কে এড়িয়ে মেঝের দিকে বা অন্যদিকে ঘুরে থাকে?
এই প্রশ্নগুলো রাতের অন্ধকারে বিদিশাকে তীরের মতো বেঁধে। আজ চার মাস হলো অয়ন কলেজে ভর্তি হয়ে ডর্মে চলে গেছে। এই চার মাসে সে বাড়িতে নিজে থেকে মাত্র দুবার ফোন করেছিল।
বিদিশা ফোন ধরলেই, ওপাশ থেকে অয়নের অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত, যান্ত্রিক উত্তর "হ্যাঁ মা, ভালো আছি। ক্লাসে যাচ্ছি, রাখছি।" ব্যস, ওইটুকুই।
বিদিশা জানেন না, অয়ন মনে মনে ঠিক করে নিয়েছে আগামী চার বছর সে আর বাড়ি ফিরবে না। এই স্বেচ্ছা নির্বাসন তার নিজেরই নেওয়া এক কঠিন শাস্তি।
উনি যেটা জানেন না, সেটা হলো, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অয়নের আত্মবোধ বেড়েছে আর তার সাথে জন্ম নেওয়া এক নিষিদ্ধ, বিকৃত মনস্তত্ত্ব কীভাবে তাকে ভেতর থেকে অপরাধবোধে শেষ করে দিচ্ছে।
ছোটবেলায় শাড়ি পরা, শান্ত, স্নিগ্ধ বিদিশাকে অয়ন তার জীবনের আদর্শ নারী হিসেবে দেখত। এই সম্পর্কে কোনো কলুষতা ছিল না, ছিল এক চরম ভক্তি এবং মাতৃপ্রেম। বিদিশাও অয়নকে নিজের জগত মনে করতেন, কারণ অরুণের ব্যস্ততার মাঝে অয়নই ছিল তার একমাত্র নিঃস্বার্থ সঙ্গী।
ইতালির সেই রাত সবকিছু চুরমার করে দেয়। অয়ন প্রথমবার তার দেবীকে একজন রক্তমাংসের, কামনা-বাসনায় ঘেরা, নির্যাতিতা নারী হিসেবে আবিষ্কার করে। তার পরের ঘটনা সবার জানা।
এই নতুন অনুভূতি অয়নকে চরম অপরাধবোধে ফেলে দেয়। সে নিজেকে মায়ের থেকে গুটিয়ে নিতে শুরু করে, কারণ সে তার নিজের চোখের লোলুপতাকে ভয় পায়।
অয়ন বুঝতে পেরেছে, সে যতই বড় হচ্ছে, তার মায়ের প্রতি তার আকর্ষণ এক বিকৃত, অমোঘ রূপ নিচ্ছে। ছোটবেলা থেকেই সে মায়ের মতো একজন স্ত্রীকে কল্পনা করত। বিদিশার ওই শান্ত চোখ, অন্তঃসলিলা গভীর স্বভাব তাকে ভীষণভাবে টানত। কিন্তু ইতালির সেই রাত সবকিছু ওলটপালট করে দিয়েছে।
বনগানির হাতে তার মায়ের লাঞ্ছনা সে সহ্য করতে পারেনি। কিন্তু সেদিন রাতে সে তার মায়ের যে রূপ দেখেছিল, তা তার মস্তিষ্কে চিরকালের মতো খোদাই হয়ে গেছে। তার মায়ের আত্মত্যাগ, তেজ, সাহস, স্বাভিমান আর সর্বোপরি বনগানির সাথে চুক্তির সময় তার চোখের সেই বন্য, আদিম আগুন। আর তারপর...টাইট জিন্স আর লাল ক্রপ টপে তার মায়ের সেই উন্মুক্ত, তেজী, প্রতিশোধস্পৃহায় পাগল রূপ!
বনগানির অণ্ডকোষে যখন বিদিশা পৈশাচিক রাগে লাথি মারছিলেন, তখন মায়ের সেই সুডৌল নিতম্ব, নির্মেদ পেট আর রাগে ফুলে ওঠা স্তনযুগ - সেই উন্মুক্ত, তেজী, লাস্যময়ী রূপ অয়ন আজও ভুলতে পারেনি।
তার আগে সে মা'কে চিরকাল কেবল আটপৌরে শাড়িতে, এক স্নিগ্ধ গৃহবধূর রূপেই দেখেছে। কিন্তু ওই রাতে সে এক রক্তমাংসের, কামনা-বাসনায় ঘেরা, ভয়ঙ্করী দেবীকে দেখেছিল।
অয়ন খুব ভালো করেই বোঝে যে এই অনুভূতিগুলো তার একান্তই নিজস্ব, যেখানে যৌনতা এবং পবিত্রতার এক বিকৃত মিশেল ঘটে গেছে।
তার কাছে তার মা এখন কোনো সাধারণ নারী নন, যার মতো স্ত্রী সে কামনা করে। তিনি এক সাক্ষাৎ দেবী। নিষিদ্ধ কামনার সঙ্গে যোগ হয়েছে ভক্তি। তার দেবীর প্রতি অয়নের মনের গভীরে জমতে থাকা এই ভক্তি দিন দিন বেড়েই চলেছে। এই ভয়ানক সত্যটা সে নিজেই নিজের কাছে স্বীকার করতে ভয় পায়। এই কামনার জন্য সে নিজের ওপর তীব্রভাবে ক্ষুব্ধ, লজ্জিত।
পাছে তার চোখের দৃষ্টি, তার শারীরিক ভাষা তার ভেতরের এই নোংরা সত্যটাকে মায়ের সামনে প্রকাশ করে দেয়, পাছে সে ধরা পড়ে যায়, সেই ভয়েই সে সচেতনভাবে সবসময় মায়ের থেকে দূরে দূরে থাকে। মায়ের সাথে একা এক ঘরে থাকলে তার দমবন্ধ হয়ে আসে, শরীরের ভেতরে একটা অদ্ভুত শিহরণ কাজ করে। যদি মা তার চোখের ভাষা পড়ে ফেলেন? যদি মা বুঝতে পারেন তার নিজের ছেলেই তাকে নিয়ে রাতে কীসব ভাবে? অয়ন জানে, সেরকম কিছু হলে নিজের মুখ সে আর কোনদিন কাউকে দেখাতে পারবে না।
বিপদ বাড়ানোর কোনো ইচ্ছে অয়নের নেই। তাই এই স্বেচ্ছা নির্বাসন।
কিন্তু মানুষের মন বড় অদ্ভুত। যে জিনিস সে নিজের থেকে দূরে ঠেলে দিতে চায়, অবচেতন মন তাকেই আঁকড়ে ধরে।
তার মানিব্যাগের একদম ভেতরের গোপন পকেটে সবসময় একটা জিনিস লুকানো থাকে। একটা ছবি। এই কথাটা পৃথিবীর আর কেউ জানে না।
বিদিশাও নয়।
ছবিটা দু'বছর আগে অরুণের অফিসেরই একটা পার্টিতে তোলা। বিদিশা একটা হালকা নীল রঙের শিফন শাড়ি পরে আছেন। শাড়ির আঁচলটা অসতর্কভাবে সামান্য সরে গেছে। ওই ছবিতে বিদিশাকে অসম্ভব, অতিপ্রাকৃত রকমের সুন্দরী দেখাচ্ছে, যেন কোন অপ্সরা। শাড়ির নেটের সূক্ষ্ম ফাঁক দিয়ে তার ফর্সা, নির্মেদ পেট আর গভীর, রহস্যময় নাভিটা স্পষ্ট উঁকি দিচ্ছে। মুখটা একটু আধ-ঘোরা।
ওই ছবিটা হলো অয়নের 'গিল্টি প্লেজার'।
হস্টেলের ঘরে যখন সে একা থাকে, চারপাশ যখন নিস্তব্ধ, তখন মাঝে মাঝে অত্যন্ত সাবধানে ও ছবিটা বার করে। একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে মায়ের ওই গভীর নাভির দিকে, তার বুকের খাঁজের দিকে।আর পরক্ষণেই তীব্র আত্মগ্লানিতে ভুগতে থাকে। অপরাধবোধ আর উত্তেজনায় কাঁপতে কাঁপতে আবার ছবিটা পকেটে ঢুকিয়ে রেখে দেয়।
বিদিশা এর কিছুই জানেন না।
কলেজে ভর্তি হওয়ার পর অয়ন নিজেকে স্পোর্টস এর মধ্যে ডুবিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে। নিজের ভেতরের এই অন্ধকার দিকটা থেকে পালাতে সে বাইরের কোলাহলকে বেছে নিয়েছে। তার সুন্দর, পুরুষালি মুখ আর জিম-করা সুঠাম চেহারার জন্য কলেজে মেয়ে মহলে তার কদর খুব। সে মাঝে মাঝে মেয়েদের সাথে ডেটেও গেছে। কিন্তু, ওই অবধিই। তার মন তৃপ্ত হয় না, কারণ অবচেতন মনে সে সবসময় ওই মেয়েগুলোর মধ্যে তার মায়ের স্নিগ্ধতা আর তেজের মিশেল খুঁজতে থাকে, যা সে কখনো পায় নি।
Posts: 175
Threads: 4
Likes Received: 600 in 131 posts
Likes Given: 94
Joined: Oct 2025
Reputation:
249
27-02-2026, 12:32 PM
(This post was last modified: 27-02-2026, 11:19 PM by RockyKabir. Edited 1 time in total. Edited 1 time in total.)
সেদিন রাতে
গভীর রাত, ডর্মের ঘরটা অন্ধকার, বাইরে কোথাও একটা কুকুর একটানা ডাকছে। রুমমেট উইকেন্ডে বাড়ি গেছে। ঘরের ভেতর থেকে একটা গোঙানির শব্দ আসছে।
হঠাৎ এক তীব্র, দমবন্ধ করা আর্তনাদ করে অয়ন ধড়মড় করে বিছানায় উঠে বসল। তার সর্বাঙ্গ ঘামে ভিজে জবজবে। বুকের ভেতর হৃৎপিণ্ডটা যেন হাতুড়ির বাড়ি মারছে। দম নিতে কষ্ট হচ্ছে।
সে হাঁপাচ্ছে, অন্ধকারে চোখ বড় বড় করে চারপাশটা বোঝার চেষ্টা করছে।
সে দু'হাত দিয়ে শক্ত করে নিজের দুই উরুর মাঝখানটা, নিজের পুরুষাঙ্গ আর অণ্ডকোষ চেপে ধরে বিছানায় বসে রইল, যেন এক অসহ্য শারীরিক যন্ত্রণা থেকে নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা করছে।
আবার সেই দুঃস্বপ্ন। ইতালির সেই ম্যানশন, সেই অভিশপ্ত রাত।
আজ বিকেলে একটা হাড্ডাহাড্ডি ফুটবল ম্যাচ ছিল। শরীর অসম্ভব ক্লান্ত থাকায় অয়ন তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়েছিল। ভেবেছিল আজ অন্তত শান্তির ঘুম হবে। কিন্তু অবচেতন মন তাকে সেখানেও ছাড়ল না।
আগে এই স্বপ্নটা সে প্রায়ই দেখত। ইদানীং কমে গিয়েছিল। কিন্তু আজ রাতের স্বপ্নটা ছিল সবথেকে ভয়াবহ, সবথেকে জীবন্ত।
সেই প্রাচীন রোমান আদলের ম্যানশন, করিডরের নিস্তব্ধতা, আর সেই স্টোররুমের দেয়ালের গর্ত।
কিন্তু আজ দৃশ্যপটটা হঠাৎই বদলে গেল।
অয়ন দেখল, সে গর্ত দিয়ে উঁকি মারছে না। সে নিজেই পড়ে আছে ওই ঘরের মেঝের ওপর। তার হাত-পা যেন কোনো অদৃশ্য শেকলে বাঁধা। সে নড়তে পারছে না।
চারদিকে ইতালিয়ান ম্যানশনের সেই পরিচিত ভ্যাপসা, দমবন্ধ করা গন্ধ। ঘাড়ের কাছে একটা তীব্র যন্ত্রণা। সে মেঝেতে চিৎ হয়ে পড়ে আছে, তার শরীর নড়াচড়া করার কোনো ক্ষমতা নেই। কে যেন তাকে একটু আগে গলা টিপে ধরেছিল।
তার চোখের সামনে সবকিছু ঝাপসা, শুধু একটা অবয়ব স্পষ্ট।
বিদিশা।
তার মা। পরনে সেই টাইট ডেনিম জিন্স আর লাল ক্রপ টপ। কিন্তু মায়ের মুখে সেই স্নিগ্ধতা নেই।
সেখানে জ্বলছে এক আদিম, পৈশাচিক ঘৃণা আর রাগ। বিদিশার চোখদুটো যেন জ্বলন্ত কয়লা।বিদিশা তার দিকে তাকিয়ে হিসহিস করে কিছু একটা বলছেন, কিন্তু শব্দগুলো অয়নের কানে পৌঁছাচ্ছে না।
অয়ন স্বপ্নে চিৎকার করে ডাকতে চেয়েছিল, "মা! আমি অয়ন! আমি বনগানি নই! আমাকে মেরো না!"
কিন্তু তার গলা দিয়ে কোনো স্বর বেরোয়নি।
বিদিশা তার দিকে ঝুঁকে এল।
তার স্তনযুগল রাগে আর উত্তেজনায় দ্রুত ওঠানামা করছে। আর তারপরই, সে শুধু দেখল, বিদিশা ধীরে ধীরে তার ডান পা-টা তুললেন।
অয়ন স্পষ্ট দেখতে পেল মায়ের সেই সুডৌল পাছা আর উরুর পেশি কীভাবে শক্ত হয়ে উঠল আঘাত করার ঠিক আগের মুহূর্তে।
আর তারপর... ধাম!
বিদিশার পায়ের বুট সজোরে এসে পড়ল মেঝেতে শুয়ে থাকা অয়নের অণ্ডকোষের ওপর।
স্বপ্নের মধ্যেই অয়নের সারা শরীর একটা তীব্র, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়ার মতো যন্ত্রণায় দুমড়ে মুচড়ে গিয়েছিল। সে বনগানি নয়, সে স্বয়ং অয়ন, আর তার মা তাকেই সেই জঘন্য শাস্তি দিচ্ছে। বিদিশা ক্রমাগত লাথি মারছিল তার পৌরুষের ওপর, তার পুরুষত্বকে যেন চিরতরে পিষে, থেঁতলে নষ্ট করে দিচ্ছিল। বিদিশার মুখে তখন এক বন্য ক্রোধ — "তুই আমাকে চাস? তুই তোর জন্মদাত্রী মাকে কামনা করিস? এই নে তোর শাস্তি!"
এই তীব্র, অমানুষিক যন্ত্রণা আর পুরুষত্বহীন হয়ে যাওয়ার এক আদিম, শীতল ভয় অয়নকে ঘুম থেকে টেনে হিঁচড়ে বাস্তবে আছড়ে ফেলল।
অন্ধকার ঘরে বসে অয়ন হাঁপাচ্ছিল। তার কপালের ঘাম চিবুক বেয়ে পড়ছে। সে এখনো তার অণ্ডকোষ চেপে ধরে আছে, যেন সত্যি সত্যিই সেখানে আঘাত লেগেছে। ভয়ের একটা হিমেল স্রোত তার শিরদাঁড়া বেয়ে নেমে গেল।
যেদিন তার মা তার এই নোংরা, নিষিদ্ধ কামনার কথা জানতে পারবেন, সেদিন মা তাকে ঠিক এভাবেই ঘৃণা করবেন, এভাবেই তার পুরুষত্বকে পদদলিত করবেন।
বিছানায় বসে অয়ন দুহাতে নিজের মুখ ঢাকল। তার আঙুলগুলো থরথর করে কাঁপছে। সে বুঝতে পারছে এই স্বপ্নের মানে কী। এটা নিছক কোনো স্বপ্ন নয়, এটা তার ভেতরের তীব্র অপরাধবোধের বহিঃপ্রকাশ।
সেদিন ও নিজের মাকে উলঙ্গ অবস্থায় বনগানির সঙ্গে বিছানায় লুকিয়ে দেখেছিল, ও নিজের মাকে কামনা করে আর তার অবচেতন মন তাকে মনে করিয়ে দিচ্ছে যে এসবের শাস্তি হলো চরম - পুরুষত্বহীনতা, খোজাকরণ। মায়ের ওই ঘৃণাপূর্ণ দৃষ্টিটাই তার সবচেয়ে বড় ভয়।
নাখুশ, বিরক্ত এবং চরম আত্মগ্লানিতে ভোগা অয়ন এর জন্য তার নিজের আসক্তিকেই দায়ী করল। সে আর এই মানসিক যন্ত্রণা নিতে পারছে না। তাকে মুক্ত হতে হবে।
সে অন্ধকারে হাতড়ে নিজের প্যান্টের পকেট থেকে মানিব্যাগটা বের করল। সেখান থেকে সন্তর্পণে বের করে আনল সেই ছবিটা।
অন্ধকারে ছবিটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু, বিদিশার সেই শান্ত, নিষ্কলুষ মুখ অয়নের স্মৃতিতে জীবন্ত।
রাগে, ঘৃণায় আর আত্মগ্লানিতে অয়নের চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়তে লাগল। সে তার নিজের আসক্তিকেই এই নারকীয় যন্ত্রণার জন্য দায়ী করল।
"কাল," অয়ন দাঁতে দাঁত চেপে ফিসফিস করে বলল, "কাল আমার প্রথম কাজ হলো এই ছবিটা পুড়িয়ে ফেলা। আমাকে বাঁচতে হবে। আমাকে এই পাগলামো থেকে বেরোতে হবে।"
সে ছবিটা দু'হাতে মুড়িয়ে নিজের বুকের কাছে চেপে ধরল, যেন ওটাকে ছাড়তেও তার বুক ফেটে যাচ্ছে।
Posts: 175
Threads: 4
Likes Received: 600 in 131 posts
Likes Given: 94
Joined: Oct 2025
Reputation:
249
27-02-2026, 12:33 PM
(This post was last modified: 28-02-2026, 10:57 PM by RockyKabir. Edited 2 times in total. Edited 2 times in total.)
কয়েকদিন পরে
সকালবেলা, কলকাতার আকাশ বেশ পরিষ্কার।
বিদিশা তাঁর বিশাল, ফাঁকা ড্রয়িংরুমে বসে কফির মগে চুমুক দিচ্ছিলেন। চারদিকের নিস্তব্ধতা যেন তাঁকে গ্রাস করতে আসছিল। অরুণ আজ সকালেই মুম্বাই উড়ে গেছে একটা কনফারেন্সে। অয়ন তো সেই কবে থেকেই নেই। এই এত বড়ো বাড়িটা তাঁর কাছে এখন একটা খাঁচার মতো মনে হয়।
জিম, ডায়েট, আর নিজেকে সুন্দর রাখার এই রুটিনটা তাঁকে শারীরিকভাবে বাঁচিয়ে রেখেছে ঠিকই, কিন্তু মানসিকভাবে তিনি রোজ একটু একটু করে শূন্যতায় তলিয়ে যাচ্ছেন। তাঁর একটা উদ্দেশ্য চাই। বেঁচে থাকার একটা মানে চাই।
বিদিশার শিক্ষাগত যোগ্যতা নেহাত ফেলনা নয়। তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ম্যাথসে ফার্স্ট ক্লাস পেয়ে এম.এস.সি পাস করেছিলেন। অরুণকে বিয়ে করার পর সংসারের ঘেরাটোপে সেই পড়াশোনা আর ক্যারিয়ারের স্বপ্ন কোথায় হারিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু এখন, এই ৩৮ বছর বয়সে এসে তাঁর মনে হলো, নতুন করে শুরু করার এটাই হয়তো সঠিক সময়।
বেশ কয়েকদিন ধরেই তিনি বিভিন্ন কলেজে গেস্ট লেকচারার বা প্রফেসরের পদের জন্য খোঁজখবর নিচ্ছিলেন। অবশেষে আজ একটা সুযোগ এসেছে। শহরের অন্যতম নামকরা একটি প্রাইভেট কলেজে অঙ্কের অধ্যাপিকার একটা পদ খালি হয়েছে। বিদিশা সেখানে নিজের সিভি পাঠিয়েছিলেন। আজ তাঁর ইন্টারভিউ।
(Scene break)
কলকাতার এক অভিজাত এবং নামকরা প্রাইভেট কলেজ। বিশাল ক্যাম্পাস, ব্রিটিশ আমলের লাল ইটের বিল্ডিং, আর সারি সারি দেবদারু গাছ।
প্রিন্সিপাল মিস্টার সান্যালের অফিসটা বেশ বড়। দেওয়াল জুড়ে প্রচুর বই আর কিছু বিখ্যাত পেইন্টিং। প্রিন্সিপাল সান্যাল, একজন প্রৌঢ়, অত্যন্ত মার্জিত মানুষ, চশমার ফাঁক দিয়ে তার সামনের সোফায় বসা নারীমূর্তির দিকে বেশ কিছুক্ষণ ধরে মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন।
তার সামনে বসে আছেন বিদিশা। পরনে একটি অত্যন্ত রুচিশীল, অফ-হোয়াইট রঙের তসর সিল্কের শাড়ি। শাড়ির সাথে মানানসই স্লিভলেস ব্লাউজ। চুলগুলো একটা পরিপাটি খোঁপা করা। কোনো ভারী মেকআপ নেই, শুধু চোখের নিচে হালকা কাজল আর ঠোঁটে একটা ন্যুড শেডের লিপস্টিক। তাতেই তাকে অপরূপা লাগছে।
সবচেয়ে বড় কথা, বিদিশা এখানে নিজের বিবাহিত পরিচয় ব্যবহার করেননি। তিনি নিজের নাম রেজিস্টার করেছেন 'বিদিশা গাঙ্গুলি' হিসেবে। কেন করেছেন, তা হয়তো তিনি নিজেও মনে মনে পুরোপুরি বিশ্লেষণ করেননি। হয়তো অরুণের সাথে তার মানসিক দূরত্বের কারণেই চ্যাটার্জী পদবিটা তিনি আর এই কর্মক্ষেত্রে বইতে চাননি। হয়তো তিনি নতুন করে একটা মুক্ত বাতাসে শ্বাস নিতে চেয়েছেন।
মিস্টার সান্যাল গলা খাঁকারি দিয়ে নিজের মুগ্ধতাটা কিছুটা সামলে নিলেন।
"মিস গাঙ্গুলি...আপনার সিভি তো অসাধারণ। ইউনিভার্সিটিতে টপার ছিলেন। কিন্তু আপনাকে দেখে তো মনে হচ্ছে আপনি জাস্ট কিছুদিন আগেই হয়তো মাস্টার্স কমপ্লিট করেছেন। বয়স কত হবে? এই চব্বিশ-পঁচিশ ?"
মিস্টার সান্যাল একটু হেসে বললেন।
বিদিশা মৃদু হাসলেন। তার সেই হাসিতে একটা অদ্ভুত রহস্য লুকিয়ে রইল। তিনি প্রিন্সিপালের ভুল ভাঙালেন না। নিজের আটত্রিশ বছর বয়সের কথা উল্লেখ করার কোনো প্রয়োজন তিনি বোধ করলেন না।
"ধন্যবাদ, স্যার। আমি পড়াশোনা শেষ করার পর কিছুদিন নিজের মতো করে রিসার্চের কাজে ব্যস্ত ছিলাম। এখন মনে হলো স্টুডেন্টদের সাথে ইন্টার্যাক্ট করাটা আমার ক্যারিয়ারের জন্য ভালো হবে," বিদিশা অত্যন্ত শান্ত, পেশাদার গলায় উত্তর দিলেন।
"অবশ্যই, অবশ্যই!" মিস্টার সান্যাল বেশ উৎসাহের সাথে বললেন। তিনি মনে মনে ভাবলেন, আজকালকার জেনারেশনের ছেলেমেয়েদের কনফিডেন্স সত্যিই দেখার মতো। বড়জোর চব্বিশ-পঁচিশ বছর বয়স হবে, কিন্তু কথাবার্তায় কী গভীরতা!
"আমাদের কলেজে আমরা ইয়াং, ডায়নামিক ফ্যাকাল্টিদের সবসময় ওয়েলকাম জানাই। স্টুডেন্টরা আপনাদের সাথে অনেক বেশি রিলেট করতে পারে। আর হ্যাঁ..."
মিস্টার সান্যাল একটু ঝুঁকে এলেন।
"আমাদের এই কলেজের কালচারটা কিন্তু অন্যান্য ট্রেডিশনাল কলেজের চেয়ে একটু আলাদা। একটু বেশি ওপেন আর প্রোগ্রেসিভ। এখানে টিচার আর স্টুডেন্টদের মধ্যে ফ্রেন্ডলি রিলেশনশিপকে আমরা এনকারেজ করি।"
বিদিশা জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালেন। "ফ্রেন্ডলি রিলেশনশিপ?"
"হ্যাঁ। মানে, এখানে ধরুন ইউরোপ বা আমেরিকার কলেজের মতো কালচার। স্টুডেন্টরা অ্যাডাল্ট। ফ্যাকাল্টিরাও অ্যাডাল্ট। তাই কলেজ ক্যাম্পাসের বাইরে তাদের পার্সোনাল লাইফ নিয়ে ম্যানেজমেন্ট কোনো মাথা ঘামায় না। ইনফ্যাক্ট, এখানে স্টুডেন্ট এবং টিচারদের মধ্যে ডেটিং বা কনসেনস্যুয়াল রিলেশনশিপ বেআইনি বা রুল-ব্রেকিং হিসেবে ধরা হয় না, যতক্ষণ না সেটা অ্যাকাডেমিক ফেভারিটিজমের জন্ম দিচ্ছে। আমি জাস্ট আপনাকে আমাদের ওপেন কালচারটার একটা ধারণা দিলাম, যাতে আপনি ক্লাসে গিয়ে কোনো কালচারাল শকের সম্মুখীন না হন।"
বিদিশা শান্তভাবে মাথা নাড়লেন। "আই আন্ডারস্ট্যান্ড, স্যার। আমি আমার অ্যাকাডেমিক দায়িত্ব পালনেই বেশি ফোকাসড থাকব।"
"দ্যাটস গ্রেট! আগামী সোমবার থেকে আপনার ক্লাস শুরু। ওয়েলকাম টু আওয়ার ফ্যামিলি, মিস গাঙ্গুলি।" প্রিন্সিপাল হাত বাড়িয়ে দিলেন।
বিদিশা হাত মেলালেন। তার চোখে এক নতুন জীবনের স্পার্ক।
অফিস থেকে বেরিয়ে কলেজের করিডর দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় বিদিশা একটা গভীর স্বস্তির শ্বাস নিলেন। তাঁর জীবন এবার একটা নতুন খাতে বইবে। তিনি জানেন না, নিয়তি কত বড় এক খেলা খেলতে চলেছে তাঁর সাথে।
তিনি জানেন না, এই বিশাল কলেজেরই ফার্স্ট ইয়ারের ছাত্র অয়ন। তার নিজের ছেলে। যে তাকে এড়িয়ে চলার জন্যই এই কলেজটাকে নিজের নিরাপদ আশ্রয় বানিয়েছিল।
যে অয়ন মনে মনে ঠিক করে রেখেছে তার মায়ের ছায়াও সে আর মাড়াবে না, নিয়তি আজ তাকেই এক অদ্ভুত, বিপজ্জনক এবং উন্মুক্ত মঞ্চের দিকে ঠেলে দিচ্ছে, যেখানে বিদিশা আর কোনো রক্ষণশীল গৃহবধূ নন, বরং 'মিস বিদিশা গাঙ্গুলি'- যাকে যেকোনো পুরুষ, এমনকি কলেজের কোনো ছাত্রও, আইনিভাবে ডেট করার স্বপ্ন দেখতে পারে।
সোমবার থেকে এক নতুন খেলা শুরু হতে চলেছে।
বিদিশা করিডরের শেষে গিয়ে দাঁড়ালেন। বাইরে দুপুরের কড়া রোদ। তাঁর মনে হলো, এই রোদটা যেন তাঁর ভেতরের সমস্ত অন্ধকার, সমস্ত গ্লানি পুড়িয়ে দিচ্ছে। তিনি নতুন করে বাঁচবেন।
নিজের শর্তে।
The following 13 users Like RockyKabir's post:13 users Like RockyKabir's post
• Airjio, Ankit Roy, Atonu Barmon, b.roy, DarkPheonix101, Milf lover69, mity odin 2, Nikhl, ojjnath, Runer, Sage_69, shree189, snigdhashis
Posts: 1,011
Threads: 0
Likes Received: 906 in 580 posts
Likes Given: 1,494
Joined: Mar 2021
Reputation:
88
দারুণ দারুণ...গোগ্রাসে পড়লাম।মুগ্ধ হলাম।
•
Posts: 175
Threads: 4
Likes Received: 600 in 131 posts
Likes Given: 94
Joined: Oct 2025
Reputation:
249
(27-02-2026, 06:08 PM)Ankit Roy Wrote: দারুণ দারুণ...গোগ্রাসে পড়লাম।মুগ্ধ হলাম।
লাইক আর রেপু দিন। নয়তো, শুকনো প্রশংসার মূল্য খুব কম।
Posts: 61
Threads: 4
Likes Received: 30 in 26 posts
Likes Given: 79
Joined: May 2024
Reputation:
3
28-02-2026, 06:50 AM
(This post was last modified: 28-02-2026, 06:57 AM by mity odin 2. Edited 1 time in total. Edited 1 time in total.)
(27-02-2026, 08:12 PM)RockyKabir Wrote: লাইক আর রেপু দিন। নয়তো, শুকনো প্রশংসার মূল্য খুব কম।
Eta ekta osadharon golpo cilo
Etake Abar apni notun vabe suru korlen seta prothom tar theke aro vlo.
Apnar fan hoya galam.
•
Posts: 727
Threads: 0
Likes Received: 364 in 288 posts
Likes Given: 8,444
Joined: Aug 2024
Reputation:
25
•
Posts: 1,011
Threads: 0
Likes Received: 906 in 580 posts
Likes Given: 1,494
Joined: Mar 2021
Reputation:
88
দিলাম লাইক আর রেপু। এবার আপনার পালা।
•
Posts: 26
Threads: 0
Likes Received: 35 in 22 posts
Likes Given: 7
Joined: Sep 2024
Reputation:
0
amazing!!!! I don't waste my words... That's why It's just amazing
•
Posts: 727
Threads: 0
Likes Received: 364 in 288 posts
Likes Given: 8,444
Joined: Aug 2024
Reputation:
25
বিদিশা ছেলেকে সব ধরনের জ্ঞান দিবে। একাডেমিক থেকে শুরু করে প্রেম, যৌনতা, সব বিষয়ে।
•
Posts: 29
Threads: 0
Likes Received: 12 in 11 posts
Likes Given: 8
Joined: Oct 2024
Reputation:
0
[quote pid='6152101' dateline='1772175835']
Update please
[/quote]
•
Posts: 175
Threads: 4
Likes Received: 600 in 131 posts
Likes Given: 94
Joined: Oct 2025
Reputation:
249
04-03-2026, 02:12 PM
(This post was last modified: 06-03-2026, 04:31 AM by RockyKabir. Edited 2 times in total. Edited 2 times in total.)
নবম অধ্যায়
ডর্মের ঘরটায় দমবন্ধ করা একটা নিস্তব্ধতা। শুধু অয়নের বুকের ভেতর হাতুড়ি পেটার মতো ধুকপুক শব্দটা সেই নৈঃশব্দ্যকে চিরে দিচ্ছিল। তার কপাল বেয়ে ঘামের বিন্দুগুলো চিবুকে গড়িয়ে পড়ছে। শ্বাস-প্রশ্বাস দ্রুত, যেন সে এইমাত্র একটা লম্বা দৌড় শেষ করে এসেছে।
তার ডান হাতে ধরা একটা দেশলাইয়ের কাঠি আর বাঁ হাতের কাঁপতে থাকা আঙুলগুলোর মাঝে ধরা সেই নিষিদ্ধ ছবিটা। মায়ের ছবি। শিফন শাড়িতে মোড়া, অপরূপা, মোহময়ী বিদিশা। শাড়ির নেটের সূক্ষ্ম ফাঁক দিয়ে উঁকি দেওয়া সেই ফর্সা, নির্মেদ পেট আর গভীর নাভি।
অয়ন দেশলাইয়ের কাঠিটা বাক্সে ঘষল। ফস করে একটা আওয়াজ হলো, আর পরমুহূর্তেই ছোট্ট, কমলা রঙের আগুনের শিখাটা অন্ধকার ঘরটাকে সামান্য আলোকিত করে তুলল। সালফারের উগ্র গন্ধটা অয়নের নাকে এসে ধাক্কা মারল। আগুনের শিখাটা ধীরে ধীরে কাঁপছে। অয়ন কাঠিটা ছবির কোণার দিকে এগিয়ে নিয়ে গেল।
"পুড়িয়ে ফেলব... আজ সব শেষ করে দেব, অয়ন বিড়বিড় করে নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করল।
তার দাঁতে দাঁত চাপা। চোখের দৃষ্টি স্থির। ইতালির সেই রাতের দুঃস্বপ্ন, বনগানির অণ্ডকোষে মায়ের সেই পৈশাচিক লাথি, আর নিজের পুরুষত্বহীন হয়ে যাওয়ার ভয়, একটা হিমশীতল অনুভূতি। সবকিছু এই একটা ছবির মধ্যে যেন পুঞ্জীভূত হয়ে আছে। এই ছবিটাই তার সর্বনাশের মূল, তার মনের ভেতরের জমা হওয়া পাপের প্রমাণ।
আগুনের শিখাটা ছবির কাগজের একদম কাছাকাছি চলে এসেছে। আর কয়েক মিলিমিটার, তারপরই ওই নীল শাড়ি, ওই স্নিগ্ধ অথচ আবেদনময়ী মুখ, ওই গভীর নাভি, সবটা পুড়ে কালো ছাই হয়ে যাবে।
কিন্তু অয়নের হাতটা হঠাৎ যেন জমে গেল। তার আঙুলগুলো থরথর করে কাঁপছে। আগুনের তাপ সে এবার নিজের আঙুলে অনুভব করতে পারছে। দেশলাইয়ের কাঠিটা পুড়তে পুড়তে একদম নিচের দিকে নেমে এসেছে। ছ্যাঁক করে একটা তীব্র জ্বলুনি তার তর্জনী আর বুড়ো আঙুলে ছ্যাঁকা দিল।
"আহ্!" অয়ন অস্ফুট আর্তনাদ করে কাঠিটা মেঝেতে ফেলে দিল। অন্ধকারে মেঝেতে পড়ে কাঠিটা নিভে গেল।
অয়ন হাঁপাতে হাঁপাতে বাঁ হাতে ধরা ছবিটার দিকে তাকাল। তার বুকের ভেতরটা দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছে। সে বুঝতে পারল, এক অমোঘ, নির্মম সত্য। সে এই ছবিটা পোড়াতে পারবে না। কোনোদিনও না।
এই ছবিটা পোড়ানো মানে কাগজের একটা টুকরো পোড়ানো নয়, ওর কাছে এই ছবিটা পোড়ানো মানে নিজের অস্তিত্বের একটা গভীর, অন্ধকার অংশকে চিরতরে পুড়িয়ে ফেলা। তার মায়ের প্রতি তার এই নিষিদ্ধ, গোপন আকর্ষণ, এই দেবত্ব আর কামনার বিকৃত মিশেল - এটা না চাইলেও তার জীবনের চরম সত্য। এই ছবিটা ছাড়া তার ওই একাকী, স্বেচ্ছানির্বাসিত জীবনের কোনো মানে নেই। এটার মাধ্যমেই মা তার সাথে সবসময় আছে।
ছবিটা যেন একটা চুম্বকের মতো তার সত্তাকে টেনে ধরে রেখেছে। একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে অয়ন অত্যন্ত সযত্নে, পরম মমতায় ছবিটা নিজের মানিব্যাগের সবচেয়ে গোপন পকেটে লুকিয়ে ফেলল। তার চোখদুটো অন্ধকারে এক অদ্ভুত, নিষিদ্ধ তৃপ্তি আর আত্মগ্লানিতে জ্বলজ্বল করতে লাগল।
Posts: 175
Threads: 4
Likes Received: 600 in 131 posts
Likes Given: 94
Joined: Oct 2025
Reputation:
249
04-03-2026, 02:13 PM
(This post was last modified: 06-03-2026, 04:34 AM by RockyKabir. Edited 1 time in total. Edited 1 time in total.)
সোমবার সকাল। চ্যাটার্জী বাড়ির ডাইনিং টেবিলে একটা যান্ত্রিক, শীতল পরিবেশ।
অরুণ খবরের কাগজের আড়ালে মুখ লুকিয়ে নিজের চায়ে চুমুক দিচ্ছিলেন। চামচ দিয়ে কাপের গায়ে টুংটাং শব্দ ছাড়া পুরো ঘরটায় আর কোনো আওয়াজ নেই।
বিদিশা ডাইনিং রুমে ঢুকলেন। তার পায়ের আওয়াজে অরুণ একবার কাগজের ওপর দিয়ে তাকালেন, তারপর আবার দৃষ্টি নামিয়ে নিলেন।
"আমি একটু বেরোচ্ছি," বিদিশা নিজের কফিটা হাতে নিয়ে অত্যন্ত নির্লিপ্ত, শীতল গলায় বললেন। কোথায় যাচ্ছেন, কেন যাচ্ছেন, কোনো ব্যাখ্যার প্রয়োজন তিনি বোধ করলেন না।
"হুম। গাড়িটা নিয়ে যেও। সাবধানে", অরুণ খবরের কাগজ থেকে চোখ না সরিয়েই যান্ত্রিকভাবে উত্তর দিলেন।
চার বছর আগে হয়তো এই কথোপকথন অন্যরকম হতো।
বিদিশা কফিতে একটা চুমুক দিয়ে ঘুরে দাঁড়ালেন। আজ তার বুকে আর কোনো কষ্ট হলো না। বরং তিনি একটা অদ্ভুত মুক্তি অনুভব করলেন। বেরোনোর আগে তিনি একবার নিজের ঘরের বিশাল আয়নাটার সামনে এসে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখে নিলেন। আজ তিনি আর সেই ইতালির আব্রুজ্জির ম্যানশনে নির্যাতিতা, ভয় পাওয়া, নিজেকে বলিদান দেওয়া 'ভিকটিম' নন।
আয়নার ওপারে যে নারীটি দাঁড়িয়ে আছে, সে এক স্বাধীন আত্মবিশ্বাসী নারী।
তার পরনে আজ একটি গভীর মেরুন রঙের হ্যান্ডলুম কটন সিল্কের শাড়ি। শাড়িটার পাড়ে সরু কালো সুতোর কাজ। ব্লাউজটা কালো রঙের, স্লিভলেস এবং বোট-নেক। শাড়িটা তার ছিপছিপে, টানটান ফিগারের সাথে এমনভাবে মিশে আছে যে তার শারীরিক গঠনের নিখুঁত ভাঁজগুলো শালীনতার মোড়কে আরও বেশি আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। চুলগুলো একটা পরিপাটি ফ্রেঞ্চ রোলে বাঁধা, ঘাড়ের কাছে কয়েকটা অবাধ্য চুল এসে পড়েছে। চোখে গাঢ় কাজল, আর ঠোঁটে ম্যাট ফিনিশের একটা ডার্ক চেরি লিপস্টিক। হাতে একটা সরু স্ট্র্যাপের কালো চামড়ার ঘড়ি।
সব মিলিয়ে তাকে দেখে মনে হচ্ছে এক জ্বলন্ত অথচ স্নিগ্ধ এক নারীমূর্তি। যার উত্তাপে কেউ পুড়ে যাবে না। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিদিশা নিজের পার্সটা তুলে নিলেন। আজ থেকে তার নতুন জীবন শুরু হতে চলেছে।
Posts: 175
Threads: 4
Likes Received: 600 in 131 posts
Likes Given: 94
Joined: Oct 2025
Reputation:
249
04-03-2026, 02:18 PM
(This post was last modified: 06-03-2026, 04:38 AM by RockyKabir. Edited 1 time in total. Edited 1 time in total.)
কলকাতার সেই অভিজাত কলেজের ফার্স্ট ইয়ারের ম্যাথস ক্লাস।
ক্লাস শুরু হতে তখনো কয়েক মিনিট বাকি। ফার্স্ট ইয়ারের ক্লাস মানেই একটা বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস, হরমোনের আধিক্য আর প্রচণ্ড কোলাহল। অয়ন একদম পেছনের দিকের একটা বেঞ্চে বসে আছে। তার মন আজ ক্লাসে নেই। সামনেই ইন্টার-ডিপার্টমেন্টাল ফুটবল টুর্নামেন্ট, তাই তার মাথায় এখন শুধু ছকের হিসেব আর স্পোর্টসের চিন্তা। তা ছাড়া কাল রাতের ওই স্বপ্ন আর ছবি পোড়াতে না পারার মানসিক দ্বন্দ্ব তাকে এখন ভেতর থেকে কুরে কুরে খাচ্ছে।
তার পাশের বেঞ্চে বসে থাকা রনি আর কবীর তখন কলেজের মেয়েদের নিয়ে রসালো আলোচনায় ব্যস্ত।
"ভাই, ওই ইকোনমিক্সের মেয়েটাকে দেখেছিস? কী ফিগার গুরু! জাস্ট আগুন!" রনি চোখ টিপে বলল।
কবীর হেসে বলল, "আরে ছাড় তো। আজ তো আমাদের নতুন ম্যাথস টিচার আসার কথা। প্রিন্সিপাল নাকি নিজে রিক্রুট করেছেন। শুনলাম হেভি মাল্টি-ট্যালেন্টেড।"
অয়ন এসব কথায় কান দিল না। সে নিজের ব্যাগ থেকে নোটবুকটা বের করার জন্য মাথা নিচু করে ব্যাগের চেইন খুলতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। তার এসব সস্তা রসালাপে কোনো আগ্রহ নেই।
ঠিক সেই মুহূর্তে ক্লাসের বাইরের করিডোর থেকে একটা তীক্ষ্ণ, ছন্দবদ্ধ শব্দ ভেসে এল।
খট... খট... খট...
স্টিলেটো জুতোর শব্দ। শব্দটা ক্লাসের দরজার কাছে এসে থামল। মুহূর্তের মধ্যে ক্লাসের সমস্ত কোলাহল যেন ম্যাজিকের মতো উবে গেল। পিন পড়লে শব্দ শোনা যায়, এমন একটা নিস্তব্ধতা গ্রাস করল পুরো ঘরটাকে।
অয়ন তখনো মাথা নিচু করে ব্যাগের ভেতর বই হাতড়াচ্ছে।
হঠাৎ ক্লাসের বাতাসে একটা অচেনা, মাদকতা মেশানো সুবাস ছড়িয়ে পড়ল। হালকা চন্দন আর ল্যাভেন্ডারের এক অদ্ভুত স্নিগ্ধ অথচ তীব্র গন্ধ। গন্ধটা অয়নের নাকে পৌঁছাতেই তার শরীরটা এক মুহূর্তের জন্য যেন জমে গেল। এই গন্ধটা তার বড় চেনা। বহু বছর ধরে এই গন্ধের সাথে সে পরিচিত। তার চারপাশের ছেলেদের মধ্যে হঠাৎ একটা ফিসফিসানি শুরু হলো।
"ভাই... কী হট!" রনির গলাটা বিস্ময়ে প্রায় বুজে এসেছে।
"গুরু, এ তো কোনো বলিউড হিরোইন রে! বয়স কত হবে? এই চব্বিশ-পঁচিশ?" কবীর ফিসফিস করে বলল, তার গলায় একটা স্পষ্ট লোলুপতা।
"মালটার ফিগার দেখেছিস? ওই শাড়ির ভাঁজটা দেখ... উফফ, আমার তো এখনই..." পেছনের বেঞ্চ থেকে আরেকটা ছেলের নোংরা মন্তব্য ভেসে এল।
অয়নের বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। সে দ্রুত ব্যাগ থেকে বইটা টেনে নিয়ে মাথা তুলল।
মাথা তুলতেই তার চোখের দৃষ্টি সোজা গিয়ে পড়ল ব্ল্যাকবোর্ডের সামনের ওই কাঠের পোডিয়ামের দিকে। আর তারপর... অয়নের শিরায় শিরায় বইতে থাকা রক্ত চলাচল যেন এক লহমায় পুরোপুরি থেমে গেল। তার মনে হলো সামনের পৃথিবীটা, সময়ের কাঁটাটা, সবকিছু থমকে গেছে। তার হৃদপিণ্ডটা যেন বুকের খাঁচা ভেঙে বেরিয়ে আসতে চাইছে।
পোডিয়ামের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন বিদিশা।
সেই মেরুন শাড়ি, সেই কালো স্লিভলেস ব্লাউজ। তার ফর্সা, মসৃণ হাতদুটো উন্মুক্ত। তার উন্নত, সুডৌল স্তনযুগল শাড়ির আঁচলের নিচ দিয়ে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। তার চোখেমুখে এক তীক্ষ্ণ, আত্মবিশ্বাসী আভা।
অয়নের কানে বন্ধুদের ওই লোলুপ, কামার্ত মন্তব্যগুলো তখন গলিত সীসার মতো ঢুকছে। তার বন্ধুরাই, তার ক্লাসের ছেলেরাই তার 'দেবী' মায়ের শারীরিক গঠন নিয়ে, তার বয়স নিয়ে এত নোংরা, এত নির্লজ্জভাবে আলোচনা করছে!
বিদিশা ক্লাসের সবার দিকে একবার চোখ বোলালেন। তার দৃষ্টি সারি সারি বেঞ্চ পেরিয়ে একদম পেছনের বেঞ্চে এসে স্থির হলো।
মা আর ছেলের চোখাচোখি হলো।
এক মুহূর্ত। মাত্র এক ভগ্নাংশ সেকেন্ডের জন্য বিদিশার ওই নিখুঁত, সুন্দর ভ্রু-জোড়া সামান্য কুঁচকে গেল। তার চোখে একটা বিস্ময়ের ঝলক খেলে গেল। তার ছেলে, অয়ন, এই ক্লাসে?
কিন্তু পরক্ষণেই, চোখের পলক পড়ার আগেই, বিদিশার মুখটা আবার ইস্পাতের মতো কঠিন, ভাবলেশহীন হয়ে গেল। সেই বিষাদঘন চোখের দৃষ্টি এখন বরফের মতো শীতল। তিনি চোখ ফিরিয়ে নিলেন অয়নের দিক থেকে, যেন ওকে তিনি জীবনে কোনোদিনও দেখেননি।
বিদিশা ঘুরে ব্ল্যাকবোর্ডের দিকে তাকালেন। একটা সাদা চক তুলে নিয়ে অত্যন্ত সুন্দর, গোছানো হস্তাক্ষরে তিনি বোর্ডে লিখলেন:
'Miss Bidisha Ganguly'
তারপর ক্লাসের দিকে ফিরে তার সেই মায়াবী, অথচ প্রফেশনাল গলায় বললেন, "গুড মর্নিং, ক্লাস। আই অ্যাম মিস বিদিশা গাঙ্গুলি। এই সেমিস্টার থেকে আমি তোমাদের অ্যাডভান্সড ম্যাথমেটিক্স পড়াবো।"
অয়ন তখনো মূর্তির মতো বসে আছে। তার চোখের সামনে ব্ল্যাকবোর্ডে লেখা নামটা যেন জ্বলজ্বল করছে।
'মিস বিদিশা গাঙ্গুলি', চ্যাটার্জী নয়।
অয়ন বুঝতে পারল, তার মা নিজের সমস্ত পুরনো পরিচয় সম্পূর্ণ মুছে ফেলেছেন। তিনি আর অরুণের স্ত্রী নন, তিনি আর অয়নের মা নন। তিনি এখন এক স্বাধীন নারী, এই কলেজের একজন শিক্ষিকা, যাকে দেখে ক্লাসের প্রতিটি ছেলে কামনায় ফুটছে।
এই মুহূর্তে অয়নের বুকের ভেতর একটা ছোট ছেলে ডুকরে কেঁদে উঠল। তার ইচ্ছে করছিল নিজের জায়গা থেকে লাফিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে সারা ক্লাসকে চেঁচিয়ে বলতে - "উনি আমার মা! তোরা ওই নোংরা চোখে ওনার দিকে তাকাস না! চোখ নামা তোরা!"
কিন্তু সে পারল না। তার গলা দিয়ে একটা শব্দও বেরোল না। কারণ সে নিজেই তো এই সম্পর্ক থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। সে নিজেই তো নিজের মায়ের শরীরকে নিয়ে অবচেতন মনে কামনার জাল বোনে। সে নিজেই তো কাল রাতে মায়ের ছবি বুকে জড়িয়ে ঘুমিয়েছে। সে কী অধিকারে এই ছেলেদের আটকাবে?
ক্লাস চলতে লাগল। বিদিশা অত্যন্ত সাবলীলভাবে, অসাধারণ দক্ষতায় পড়াতে শুরু করলেন। তার পড়ানোর স্টাইল, তার গলার স্বর, তার ব্যক্তিত্ব—সবকিছু জাদুমন্ত্রের মতো পুরো ক্লাসকে আটকে রাখল। স্টুডেন্টদের রেসপন্স ছিল দারুণ। যে ছেলেরা একটু আগে তার রূপ নিয়ে আলোচনা করছিল, তারাও এখন মন্ত্রমুগ্ধের মতো তার অঙ্কের সমাধান দেখছে।
পরপর দুটো ঘন্টা। বিদিশা যেন একটা ঘোরের মধ্যে পড়িয়ে গেলেন। ক্লাসের শেষে যখন তিনি চকটা টেবিলে নামিয়ে রাখলেন, তার মনে একটা অদ্ভুত, গভীর তৃপ্তি আর স্বাধীনতার বোধ জন্ম নিল। আজ তিনি নিজের যোগ্যতায়, নিজের ক্ষমতায় কিছু একটা করতে পেরেছেন। এই স্বাধীন বাতাসটা তার ফুসফুসে এক নতুন জীবনের সঞ্চার করল।
অন্যদিকে, এই দুটো ঘণ্টা অয়নের কাছে ছিল এক চরম মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের মতো। একটা দমবন্ধ করা অবস্থা। তার মায়ের দিকে ছোঁড়া অন্য ছেলেদের মুগ্ধ, লোলুপ দৃষ্টি তার ভেতরে এক বন্য ঈর্ষা, এক অসহ্য রাগের জন্ম দিচ্ছিল। তার 'দেবী' মা, যার পবিত্রতা রক্ষা করার জন্য সে ইতালিতে এক রাক্ষসকে খুন করতেও পিছপা হয়নি, আজ সেই মা সাধারণ, সস্তা কিছু ছেলেদের কামনার বস্তু হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর সে নিজে, তার ছেলে হয়েও, তার প্রেমিক হয়ে ওঠার এক বিকৃত বাসনা নিয়ে, কিছুই করতে পারছে না।
ক্লাস শেষ হওয়ার বেল বাজতেই অয়ন আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা করল না। বন্ধুদের কোনো কথার উত্তর না দিয়ে, ব্যাগটা ঘাড়ে তুলে নিয়ে সে প্রায় ঊর্ধ্বশ্বাসে ক্লাস থেকে বেরিয়ে গেল নিজের এই অসহ্য রাগ, অস্বস্তি আর দমবন্ধ করা অবস্থা লুকোনোর জন্য।
ওদিকে, ক্লাস শেষ করে স্টাফরুমের দিকে হেঁটে যাচ্ছিলেন বিদিশা। তার মনে একটা খুশির ঝিলিক।
কলেজের এই খোলামেলা পরিবেশটা তাকে মুগ্ধ করছিল। চারপাশের দেওয়ালের বন্দিদশা থেকে বেরিয়ে এটা এক সম্পূর্ণ অন্য জগৎ। করিডোর দিয়ে যাওয়ার সময় তিনি লক্ষ্য করলেন, লাইব্রেরির সামনে একটা বড় জানলার পাশে দাঁড়িয়ে একজন ইয়াং পুরুষ প্রফেসর একজন আন্ডারগ্র্যাজুয়েট ছাত্রীর সাথে কফি খেতে খেতে হাসাহাসি করছেন। ছাত্রীটি খুব ক্যাজুয়ালভাবে প্রফেসরের হাতের ওপর হাত রাখল, প্রফেসরও কিছু একটা বলে হাসলেন। কেউ তাদের দিকে ফিরেও তাকাচ্ছে না, কারও কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই।
প্রিন্সিপাল সান্যালের কথাগুলো বিদিশার মনে পড়ে গেল— "এখানে স্টুডেন্ট এবং টিচারদের মধ্যে ডেটিং বা কনসেনস্যুয়াল রিলেশনশিপ বেআইনি বা রুল-ব্রেকিং হিসেবে ধরা হয় না..."
বিদিশার মনে একটা অদ্ভুত শিহরণ খেলে গেল। এ কেমন উন্মুক্ত পৃথিবী! এখানে বয়সের, পদমর্যাদার কোনো বাধা নেই। এখানে ইচ্ছে করলেই যে কেউ নতুন সম্পর্কে জড়াতে পারে। তার মতো এক ম্যাচিওর, একাকিত্বে ভোগা নারীও কি এই স্বাধীনতায় ভাগ বসাতে পারে?
এইসব ভাবতে ভাবতেই তিনি লাইব্রেরির দিকের ফাঁকা করিডোরটায় এসে পৌঁছালেন। করিডোরটা বেশ নিরিবিলি, দু-একজন স্টুডেন্ট ছাড়া কেউ নেই।
হঠাৎ একটা পরিচিত, সুঠাম অবয়ব তার পথ আগলে দাঁড়াল।
অয়ন।
তার চোখমুখ লাল, কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। তার নিঃশ্বাস দ্রুত পড়ছে। বুকের ভেতর জমে থাকা সেই বন্য ঈর্ষা, সেই রাগ আর অধিকারবোধ যেন আগ্নেয়গিরির লাভার মতো ফেটে পড়তে চাইছে।
মা আর ছেলে মুখোমুখি। ফাঁকা করিডোরে এক অদ্ভুত, ভারী নিস্তব্ধতা নেমে এল।
অয়ন কয়েক সেকেন্ড বিদিশার চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। ওই শান্ত, নিবিড় চোখদুটোয় এখন আর সেই গৃহবধূর স্নিগ্ধতা নেই, আছে এক ধারালো ব্লেডের মতো কাঠিন্য।
"তুমি... তুমি এখানে কী করছ?"
অয়ন আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। তার গলা দিয়ে বেরিয়ে আসা স্বরটা ছিল একইসাথে রাগে, অভিমানে আর একটা অদ্ভুত অধিকারবোধে জড়ানো। তার বলা 'তুমি' শব্দটার মধ্যে কোনো ছাত্রের দেওয়া সম্মান ছিল না, বরং তাতে এক চরম ব্যক্তিগত অধিকারের দাবি মিশে ছিল।
বিদিশা এক চুলও নড়লেন না। তার মুখের পেশি সামান্যতমও শিথিল হলো না। তিনি খুব শান্তভাবে, অত্যন্ত ধীরে ধীরে অয়নের চোখের দিকে তাকালেন।
অয়ন আশা করেছিল তার মা হয়তো ঘাবড়ে যাবেন, হয়তো বলবেন, "বাবা অয়ন, তুই এই কলেজে পড়িস আমি জানতাম না", অথবা হয়তো তাকে আড়ালে নিয়ে গিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করবেন।
কিন্তু না। বিদিশা যা করলেন, তা অয়নের কল্পনারও অতীত ছিল।
বিদিশা তার শাড়ির আঁচলটা বাঁ হাত দিয়ে সামান্য গুছিয়ে নিলেন। তারপর অত্যন্ত পেশাদার, হিমশীতল, কর্তৃত্ববোধ সম্পন্ন গলায়, এমন একটা স্বরে কথা বললেন, যা অয়ন তার জীবনে কোনোদিন শোনেনি।
"মিস্টার চ্যাটার্জী," বিদিশার গলা করিডোরের বাতাসে বরফের ছুরির মতো ফালাফালা করে দিল।
"ক্লাসের বাইরেও কলেজের ডেকোরাম মেনটেইন করাটা অত্যন্ত জরুরি। একজন ফ্যাকাল্টির সাথে কীভাবে কথা বলতে হয়, সেটা আশা করি আপনি জানেন।"
অয়ন চমকে উঠল। তার মনে হলো কেউ যেন তার পেটে সজোরে একটা লাথি মেরেছে।
'মিস্টার চ্যাটার্জী'! তার নিজের মা তাকে এই নামে ডাকছেন?
বিদিশা একটুও থামলেন না। তার সেই চিরাচরিত বিষাদঘন চোখে এখন এক অদ্ভুত কাঠিন্য। তিনি সোজা অয়নের চোখের দিকে তাকিয়ে, অত্যন্ত মেপে মেপে বললেন, "অ্যাকাডেমিক বিষয়ে আপনার যদি কিছু জানার থাকে, তাহলে আপনি আমার কেবিনে আসতে পারেন। কিন্তু করিডোরে এইভাবে রাস্তা আটকে দাঁড়ানোটা আমি টলারেট করব না। এক্সকিউজ মি।"
কথাগুলো বলে বিদিশা এক মুহূর্তও দাঁড়ালেন না। স্টিলেটো জুতোর খটখট শব্দ তুলে তিনি অত্যন্ত রাজকীয় ভঙ্গিতে অয়নকে পাশ কাটিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে গেলেন। তার শাড়ির আঁচলটা সামান্য উড়ে অয়নের হাতের পাশ দিয়ে ছুঁয়ে গেল। বাতাসে রেখে গেল সেই চন্দন আর ল্যাভেন্ডারের মাদকতাময় গন্ধ।
অয়ন পাথরের মূর্তির মতো করিডোরে একা দাঁড়িয়ে রইল। তার হাত-পা কাঁপছে। তার মস্তিষ্কের সমস্ত স্নায়ুগুলো যেন অসাড় হয়ে গেছে।
অয়ন বুঝতে পারল, মায়ের থেকে দূরে থাকার জন্য সে যে স্বেচ্ছা নির্বাসনের পথ বেছে নিয়েছিল, সেই পথ এখন এক ভয়ানক, বিপজ্জনক গোলকধাঁধায় পরিণত হয়েছে আর সেই গোলকধাঁধার ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছেন মিস বিদিশা গাঙ্গুলি। যার দিকে সারা ক্লাস লোলুপ দৃষ্টিতে তাকাতে পারে, যাকে ডেটিং করাটা এই ক্যাম্পাসে কোনো অপরাধই নয়। করিডরে দাঁড়িয়ে অয়ন ভীষণ একা ফিল করল।
অয়নের চোখের সামনে দিয়ে বিদিশার সেই মেরুন শাড়ি পরা ফিগারটা তখন আস্তে আস্তে করিডোরের শেষে মিলিয়ে যাচ্ছে।
Posts: 10
Threads: 0
Likes Received: 4 in 4 posts
Likes Given: 1
Joined: Oct 2025
05-03-2026, 03:41 AM
(This post was last modified: 05-03-2026, 03:43 AM by Mysterious. Edited 1 time in total. Edited 1 time in total.)
Khub bhalo egochhe
•
Posts: 175
Threads: 4
Likes Received: 600 in 131 posts
Likes Given: 94
Joined: Oct 2025
Reputation:
249
(05-03-2026, 03:41 AM)Mysterious Wrote: Khub bhalo egochhe 
লাইক আর রেপু দিন। শুকনো প্রশংসার কোন মূল্য নেই।
Posts: 175
Threads: 4
Likes Received: 600 in 131 posts
Likes Given: 94
Joined: Oct 2025
Reputation:
249
08-03-2026, 01:05 AM
(This post was last modified: 11-03-2026, 11:28 PM by RockyKabir. Edited 2 times in total. Edited 2 times in total.)
দশম অধ্যায়
করিডোরে অয়নকে ওইভাবে স্তম্ভিত অবস্থায় ফেলে আসার পর বিদিশার বুকের ভেতরটা একবারের জন্য হলেও কেঁপে উঠেছিল। কিন্তু তিনি নিজের পাঁজরের সেই কাঁপুনিকে কোন প্রশ্রয় দেননি। অয়নকে করিডোরে ওইভাবে ফেলে আসাটা কি খুব কঠিন ছিল? হয়তো। কিন্তু ওই মুহূর্তটিতে বিদিশার কাছে এতদিন ধরে নিজের গড়ে তোলা বর্মটা রক্ষা করা বেশি জরুরি ছিল।
অরুণের অবহেলা আর অয়নের অকারণে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া তাকে শিখিয়েছে, কারুর উপর নির্ভর করলে এই পৃথিবীতে কেবল নিজেকেই ঠকতে হয়। করিডোর দিয়ে হাঁটার সময় বিদিশার স্টিলেটোর প্রতিটি ‘খট খট’ শব্দ সবার সামনে তার আত্মবিশ্বাসকে জানান দিচ্ছিল।
তিনি বুঝতে পারছিলেন, এখানে টিকে থাকতে হলে তার নরম হওয়া চলবে না, তাকে শক্ত, অনমনীয় হতে হবে। শাড়ির আঁচলটা কাঁধের ওপর আরেকটু শক্ত করে টেনে নিয়ে তিনি সোজা স্টাফরুমের দিকে এগিয়ে গেলেন।
স্টাফরুমের কাঁচের দরজাটা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই এক ঝলক এসির ঠান্ডা হাওয়া আর কফির কড়া গন্ধ তাকে স্বাগত জানাল। ঘরটা বেশ বড়, একটা দিকে কয়েকটা কিউবিকল করা আর মাঝখানে একটা বড় ডিম্বাকার টেবিল। বড় টেবিলটায় কয়েকজন প্রফেসর নিজেদের মধ্যে নিচু স্বরে কথা বলছিলেন। কেউ কেউ কিউবিকলে ল্যাপটপ নিয়ে কাজ করছিলেন। বিদিশা ঢুকতেই গুঞ্জনটা কয়েক সেকেন্ডের জন্য থেমে গেল।
বিদিশা লক্ষ্য করলেন টেবিলের কোণের দিকে বসা সত্তরোর্ধ্ব ইতিহাসের প্রফেসর থেকে শুরু করে মাঝবয়সী ফিজিক্সের টিচার, সবার চোখ তার ওপর স্থির। সেই চাহনিতে কোনো কদর্যতা হয়তো নেই, কিন্তু একটা তীব্র কৌতূহল আছে। চার বছর আগের বিদিশা হয়তো এই দৃষ্টিতে অস্বস্তি বোধ করতেন, শাড়ির আঁচল আরও একটু টেনে নিয়ে জড়োসড়ো হয়ে বসতেন। কিন্তু আজকের বিদিশা গাঙ্গুলি আলাদা।
“গুড মর্নিং এভরিওয়ান,” বিদিশা অত্যন্ত মার্জিতভাবে সম্ভাষণ জানালেন।
“ওহ, গুড মর্নিং মিস গাঙ্গুলি! আপনিই তো নতুন ম্যাথস ফ্যাকাল্টি?” বিদিশা ঘুরে তাকাতে হাসিমুখে বছর ত্রিশের এক যুবককে এগিয়ে আসতে দেখলেন।
"ওয়েলকাম টু দ্য ফ্যাকাল্টি লাউঞ্জ। আমি রাহুল বোস, ইংলিশ ডিপার্টমেন্ট। সান্যাল স্যার আপনার কথা বলেছিলেন”, যুবকটি একটা উষ্ণ হাসি দিয়ে নিজের পরিচয় দিলেন।
বিদিশা হাত মেলালেন। রাহুলের চোখের মণি যেন একটু বেশিই উজ্জ্বল হয়ে উঠল। “নাইস টু মিট ইউ, মিস্টার বোস।”
রাহুলের পরনে একটা নেভি ব্লু শার্ট, হাতা দুটো কনুই অবধি গোটানো। চোখে রিমলেস চশমা আর গালে হালকা ট্রিম করা দাড়ি।
“রাহুল বললেই চলবে। এখানে আমরা সবাই খুব ফ্রেন্ডলি,” রাহুল একটু ঝুঁকে এসে বলল, তার কণ্ঠে এক ধরণের প্রশ্রয়। “আপনার প্রথম ক্লাস কেমন হলো? আমাদের স্টুডেন্টরা কিন্তু বেশ... মানে, একটু বেশিই এনার্জেটিক।”
বিদিশা টেবিলের উপর ব্যাগটা রাখতে রাখতে স্মিত হাসলেন।
“ক্লাস খুব ভালো হয়েছে। স্টুডেন্টরা যথেষ্ট মনোযোগী। আমি যথেষ্ট উপভোগ করেছি।”
রাহুল কফির মেশিনটার দিকে ইশারা করল, "কফি করে দেব? ফার্স্ট ডে-র নার্ভাসনেস কাটানোর জন্য আমাদের এখানকার ব্ল্যাক কফি জাস্ট ম্যাজিকের মতো কাজ করে।"
বিদিশা সামান্য হেসে মাথা নাড়লেন, "শিওর। থ্যাঙ্ক ইউ।"
রাহুল কফি বানাতে বানাতেই আড়চোখে বিদিশার দিকে তাকালো। ততক্ষণে বিদিশা একটা চেয়ারে টেনে বসেছে।
সেটা বিদিশার চোখ এড়াল না। বিদিশার মেরুন শাড়ির স্লিভলেস ব্লাউজের নিচ দিয়ে উন্মুক্ত ফর্সা, মসৃণ হাত, তার তীক্ষ্ণ কলারবোন আর ওই বিষাদঘন চোখের গভীরতা রাহুলকে যে চুম্বকের মতো টানছে, সেটা তার শারীরিক ভাষাতেই স্পষ্ট।
কফির মগটা বিদিশার সামনে নামিয়ে রাখার সময় রাহুলের আঙুল অত্যন্ত সাবধানে, যেন ভুল করেই, বিদিশার আঙুলের ডগা সামান্য ছুঁয়ে গেল। বিদিশা হাতটা সরিয়ে নিলেন না, বরং তার মেরুদণ্ড বেয়ে এক অচেনা, প্রায় ভুলে যাওয়া শিহরণ বয়ে গেল। এই অনুভূতিটা তার কাছে মৃত ছিল। যান্ত্রিক, শীতল স্পর্শহীন জীবন কাটিয়ে অভ্যস্থ হয়ে যাওয়া বিদিশা এত বছর পর আজ এই স্টাফরুমে একজন অল্পবয়সী, আকর্ষণীয় পুরুষের চোখে নিজের জন্য মুগ্ধতা দেখতে পেলেন। সকাল থেকে দৃশ্যটা তিনি অনেকবার দেখেছেন, তবুও এখনকার ঘটনাটা তার মনে এক অচেনা তৃপ্তি এনে দিল।
অনেকদিন পর বিদিশার মনে হলো তিনি শুধু কারোর মা বা কারোর অবহেলিত স্ত্রী নন। তিনি একজন কাঙ্ক্ষিত নারী। তিনি নিজের অজান্তেই উল্টোদিকের দেওয়ালের আয়নায় একবার নিজের প্রতিবিম্ব দেখলেন।
তারপর চারপাশে তাকিয়ে লক্ষ্য করলেন, স্টাফরুমের অন্য পুরুষ কলিগরা রাহুলের এই ‘এগিয়ে যাওয়াটা’ হওয়াটাকে খুব একটা ভালো চোখে দেখছেন না।
বনগানি তার শরীরটা ছিঁড়ে খেতে চেয়েছিল, আর এখানে শিক্ষিত পুরুষরা তার সাহচর্য পাওয়ার জন্য এক ধরণের অলিখিত প্রতিযোগিতায় নামছে। বিদিশার মনে হলো, এটা একধরনের জয়।
কিছুক্ষণ পরে স্টাফরুম থেকে বেরিয়ে নিজের দ্বিতীয় ক্লাসে যখন বিদিশা ঢুকলেন, তখন তিনি আবার সম্পূর্ণ অন্য এক মানুষ। অঙ্কের জটিল সমীকরণগুলো যখন তিনি বোর্ডে চক দিয়ে একটানা সমাধান করে যাচ্ছিলেন, তার শরীরী ভাষায় এক অদ্ভুত আত্মবিশ্বাস কাজ করছিল।
তার গোটা ক্লাস জুড়ে পিনপতন নিস্তব্ধতা বিরাজ করছিল। ছাত্র-ছাত্রীরা তার পড়ানোয় মগ্ন ছিল। বিদিশা নিজের বৌদ্ধিক সত্তাকে এত বছর পর যেন আবার নতুন করে ফিরে পেলেন। এতদিন পরেও তার ধার একটুও ভোঁতা হয়নি। অবশ্য গত ক'বছর ফাঁকা সময়টায় তিনি অঙ্কের চর্চা অব্যাহত রেখেছিলেন।
বিদিশা যখন নিজের নতুন অস্তিত্ব উপভোগ করছেন, তখন অয়ন কলেজের ক্যাফেটেরিয়ার এক কোণায় পাথরের মতো বসে ছিল। তার সামনে রাখা কফির কাপটা অনেকক্ষণ আগেই ঠান্ডা হয়ে ওপরে একটা সর জমেছে, স্যান্ডউইচটা প্লেটেই পড়ে আছে। তখন দুপুরবেলা, কলেজের বিশাল ক্যাফেটেরিয়ায় থিকথিকে ভিড় আর তুমুল কোলাহল। কফির কাপের টুংটাং, সিগারেটের ধোঁয়া আর তারুণ্যের বাধভাঙা হাসিতে জায়গাটা সরগরম। কিন্তু, অয়নের মনে সেটা আঁচল কাটছিল না, তা অন্য কোথাও পড়ে ছিল।
বিদিশা চলে যাবার পর কলেজের করিডরের ওই জায়গাটায় অয়ন অনেকক্ষণ দাঁড়িয়েছিল। "মিস্টার চ্যাটার্জী..." শব্দদুটো তখন তার কানের পর্দায় তখনো হাতুড়ির মতো বাড়ি মারছে। তার নিজের মা তাকে এই নামে ডাকল!
তার কানে এখনো বিদিশার সেই শীতল ‘মিস্টার চ্যাটার্জী’ ডাকটা প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। মায়ের ঠোঁট থেকে নিজের নামের সাথে ওই পদবীটা শোনা যেন তপ্ত তেলের মতো তার কানে বিঁধছে। তার মা, যে মা তাকে খাইয়ে দিত, যার আঁচল ধরে সে বড় হয়েছে, সে আজ তাকে এক জন অপরিচিত ছাত্রের মতো উপেক্ষা করে চলে গেল!
অয়নের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল, হাতের মুঠো দুটো এতটাই শক্ত যে নখগুলো হাতের তালুতে গেঁথে গিয়ে লাল দাগ করে দিয়েছে। অপমানে, রাগে আর এক তীব্র, অধিকারহীনতার যন্ত্রণায় অয়নের চোখদুটো জ্বলতে লাগল। সে দ্রুত পায়ে ওই জায়গা থেকে সরে গেল, যেন বেশিক্ষণ দাঁড়ালে তার মাথার ভেতরের শিরাগুলো ফেটে যাবে।
“কিরে অয়ন? কোন দুনিয়ায় আছিস?” রনি তার কাঁধে একটা জোর ধাক্কা দিল।
অয়ন ধড়মড় করে উঠল। তার চোখের কোণটা সামান্য লাল। সে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, “কিছু না। মাথাটা একটু ধরেছে।”
“আরে মাথা তো সবারই ধরেছে রে ভাই! ম্যাথস ক্লাসের পর থেকে কারোর তো আর হুঁশ নেই,” কবীর এসে পাশের চেয়ারে বসল। তার চোখেমুখে উত্তেজনা।
“শুনেছিস? বিক্রম মালহোত্রা তো অলরেডি বাজি ধরেছে!”
অয়নের ভ্রু কুঁচকে গেল।
“বিক্রম মালহোত্রা? সে কে?”
“আরে বিক্রম! আমাদের কলেজের হিরো। থার্ড ইয়ারের স্পোর্টস কোটা, পলিটিক্স, আবার পড়াশোনাতেও ভালো। কলেজের সব কটা সুন্দরী মেয়ে ওর পকেটে থাকে,” রনি নিচু স্বরে বলল।
“ও বলছিল, এই ম্যাথস প্রফেসরের দেমাগ আমি এক মাসের মধ্যে ভাঙব। দেখবি আমার বাইকের পেছনে ও বসে ডিনার ডেটে যাচ্ছে।"
অয়নের হাতের মুঠি শক্ত হয়ে এল। ক্যাফেটেরিয়ার টেবিলটার ওপর তার নখগুলো ডেবে যাচ্ছিল।
“ডিনার ডেট? টিচারের সাথে? ওর সাহস তো কম নয়!”
কবীর হাসল। “আরে ভাই, এই কলেজে টিচার-স্টুডেন্ট ডেটিং কোনো ব্যাপারই না। আর বিক্রম যা দেখতে, যেকোনো মেয়েই ওর উপর ফিদা হয়ে যাবে। তা ছাড়া মিস গাঙ্গুলি তো এখনো সিঙ্গেল বলেই মনে হলো। আঙুলে কোনো আংটি নেই, সিঁথিতে সিঁদুর নেই... ওহ গড, অয়ন! তুই কি ওনার হাতটা দেখেছিস? কী মসৃণ!”
অয়নের চোয়ালের পেশিগুলো লাফাতে লাগল। তার হাতের মুঠি এতটাই শক্ত হয়ে গেল যে মনে হলো টেবিলের কোণটা সে ভেঙে ফেলবে। তার চোখের সামনে ভেসে উঠল ইতালির সেই রাত। বনগানিও তো ঠিক এইভাবেই তার মায়ের শরীরটাকে গিলে খেতে চেয়েছিল। আজ এই কলেজের একটা সাধারণ, বখে যাওয়া ছেলে সবার সামনে বসে তার দেবীতুল্য মাকে নিয়ে এই ধরনের নোংরা, কামার্ত মন্তব্য করছে!
অয়নের ইচ্ছে করছিল টেবিলটা উল্টে দিয়ে কবীরের কলারটা চেপে ধরে ওর ওই হাসিমুখটা ঘুষি মেরে থেঁতলে দিতে। কিন্তু সে পারল না। তার হাত-পা যেন কোনো এক অদৃশ্য শিকলে বাঁধা। সে যদি এখন মারামারি করে, তাহলে কালই গোটা কলেজে রটে যাবে যে ফার্স্ট ইয়ারের অয়ন চ্যাটার্জী নতুন ফ্যাকাল্টির জন্য পাগল। আর যদি সে সত্যি কথাটা বলে দেয় যে মিস গাঙ্গুলি তার মা, তাহলে বিদিশার নতুন তৈরি করা এই আত্মপরিচয়, এই স্বাধীনতা এক মুহূর্তের মধ্যে ধুলোয় মিশে যাবে।
অয়ন একটা ঢোঁক গিলল, তার ভেতরে যে অনুভূতিটা এখন খেলা করছে সেটার নাম ও জানে না। তার চোখদুটো রক্তবর্ণ হয়ে উঠেছে।
ও বুঝতে পারল বেশিক্ষণ এখানে বসে থাকলে ও কোন বাড়াবাড়ি করে ফেলতে পারে। সে ঝট করে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। তার চোয়াল শক্ত, কপালে একটা শিরা দপ দপ করছে।
“আমি আসছি,” বলে সে প্লেটটা ঠেলে সরিয়ে দিয়ে কোনো কথা না বলে লম্বা পায়ে ক্যাফেটেরিয়া থেকে বেরিয়ে গেল।
পেছন থেকে বন্ধুদের হাসি, চিৎকার, গল্প-গুজব তার কানে পৌঁছাল না। তার এখন কোন গন্তব্য নেই। সে জানে না সে কী করতে যাচ্ছে।
বনগানি-নিধনের রাতে কী এই বন্য সত্তাটাই জেগে উঠেছিল ?
তিন ঘন্টা পরে,
বিকেলের দিকে কলেজের ভিড় অনেকটাই পাতলা হয়ে এসেছে। বিদিশা নিজের কেবিনে বসে ল্যাপটপে কিছু লেকচার নোটস গোছাচ্ছিলেন। তার নিজস্ব কেবিন।
দরজায় একটা ছোট নেমপ্লেট— ‘মিস বিদিশা গাঙ্গুলি, লেকচারার’।
দরজায় একটা হালকা টোকা পড়ল।
"কাম ইন," স্ক্রিন থেকে চোখ না সরিয়েই বললেন বিদিশা।
দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল অয়ন। তার মুখটা থমথমে, চোখের নিচে কালশিটে পড়ার মতো একটা ক্লান্তি। সে দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ করে দিয়ে বিদিশার টেবিলের উল্টোদিকের চেয়ারটায় গিয়ে বসল।
বিদিশা তখন নিজের ডেস্কে বসে কিছু নোটস দেখছিলেন। দরজা বন্ধের শব্দে তিনি মাথা তুললেন। অয়নকে এইভাবে ভেতরে ঢুকতে দেখে এবং দরজা লক করতে দেখে তার বুকের ভেতরটা এক মুহূর্তের জন্য হলেও কেঁপে উঠল। ইতালির সেই রাতের স্মৃতি এক মুহূর্তের জন্য তার চোখে ভেসে উঠল।
কিন্তু পরক্ষণেই তিনি নিজেকে সামলে নিলেন। তিনি জানতেন, এখনই যদি তিনি দুর্বল হয়ে পড়েন, তবে তার এই চার বছরের লড়াই বৃথা যাবে।
বিদিশা ল্যাপটপটা বন্ধ করলেন। তিনি জানতেন এই আলোচনাটা আজ না হোক কাল করতেই হতো। তিনি একটু সোজা হয়ে বসলেন। তার মুখের সেই বরফের মতো শীতল ভাবটা এখন কিছুটা প্রশমিত, কিন্তু পেশাদারিত্বের দেয়ালটা তখনো অটুট।
“মিস্টার চ্যাটার্জী, দরজা লক করার মানে কী? এটা কি কোনো স্টুডেন্টের আচরণ?” বিদিশার গলা শান্ত কিন্তু অত্যন্ত তীক্ষ্ণ।
অয়ন টেবিলের সামনে এসে দাঁড়াল। সে বিদিশার চোখের দিকে সরাসরি তাকাল। সে কয়েক সেকেন্ড কোনো কথা বলতে পারল না। তার চোখে এক ধরণের অবদমিত যন্ত্রণা। তার বুকের ভেতর অনেকগুলো প্রশ্ন, অনেক অভিমান দলা পাকিয়ে আছে।
"কিছু বলবে অয়ন?" বিদিশার গলাটা শান্ত।
“মিস্টার চ্যাটার্জী? সত্যি মা? তুমি আমাকে এই নামে ডাকলে?” অয়নের গলা অভিমানে বুজে এল।
"তুমি...তুমি এখানে কেন মা? আর এই পরিচয় লুকনোর নাটকটাই বা কেন?" অয়নের গলাটা কেঁপে গেল, কিন্তু সে নিজেকে সামলে নিল।
“আর এখানে...‘মিস গাঙ্গুলি’? তুমি কি সব ভুলে গেলে? বাবার সঙ্গে তোমার সম্পর্ক নেই বলে তুমি এখানে এসে নতুন পরিচয়ে জীবন শুরু করবে? আর এই কলেজের ছেলেরা... ওরা তোমার সম্পর্কে কী সব কথা বলছে তুমি জানো? আজ ক্লাসে তোমার দিকে ছেলেরা যেভাবে তাকাচ্ছিল... ক্যাফেটেরিয়াতে তোমাকে নিয়ে যেভাবে আলোচনা হচ্ছিল... তুমি জানো আমি কতটা সাফোকেটেড ফিল করছিলাম?"
বিদিশা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তিনি টেবিলের ওপর রাখা পেপারওয়েটটা হাত দিয়ে সামান্য ঘোরাতে ঘোরাতে অয়নের চোখের দিকে তাকিয়ে শান্তভাবে বললেন, “অয়ন, চিৎকার করো না। বসো।”
অয়ন বসল না, সে দাঁড়িয়েই রইল। তার বড় বড় শ্বাস পড়ছে।
বিদিশা চেয়ার ছেড়ে উঠলেন এবং জানলার দিকে গিয়ে দাঁড়ালেন। বাইরের দেবদারু গাছগুলোর দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন, "অয়ন, তুমি চার মাস হলো এই কলেজে এসেছ। তুমি বাড়ি যাও না।তুমি কি জানো আমি ওই চার দেওয়ালের মধ্যে কতটা দমবন্ধ অনুভব করছিলাম?"
অয়ন চুপ করে রইল।
"অরুণ আমার থেকে দূরে সরে গেছে। তুমি আমাকে এড়িয়ে চলো। ওই বিশাল বাড়িতে আমি একা। আমার কি একটা নিজস্ব পরিচয়ের, একটা জীবন কাটানোর কোন অধিকার নেই?" বিদিশার গলায় এবার একটা সূক্ষ্ম, চাপা কষ্ট ফুটে উঠল।
"অধিকার আছে। কিন্তু নিজের পরিচয় মুছে ফেলে কেন? তুমি বলতে পারতে তুমি বিদিশা চ্যাটার্জী। আমার মা।"
"তাহলে কী হতো জানো?" বিদিশা অয়নের চোখের দিকে সরাসরি তাকালেন।
"প্রথম দিনেই আমি এই কলেজের সমস্ত স্টুডেন্ট আর ফ্যাকাল্টিদের চোখে একজন উনিশ বছরের ছেলের 'মা' হয়ে যেতাম। আমার ইন্টেলেক্ট, আমার যোগ্যতা—সবকিছু ওই 'মা' শব্দটার নিচে চাপা পড়ে যেত। সবাই ভাবত, একটা বয়স্কা মহিলা টাইমপাস করতে পড়াতে এসেছে। আমি সেটা চাই না, অয়ন। আমি চাই এরা আমাকে মিস গাঙ্গুলি হিসেবে চিনুক, আমার কাজ দিয়ে আমাকে সম্মান করুক। আর তাছাড়া...ইতালির সেই ঘটনার পরে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আমি নিজেকে একজন পঙ্গু নারী ছাড়া আর কিছু ভাবতে পারতাম না। তোমার বাবা...আমাকে শ্রদ্ধা করতে ভুলে গেছেন। তার কাছে আমি এখন একটা অপ্রীতিকর স্মৃতি ছাড়া আর কিছু নই।”
তিনি ঘুরে অয়নের দিকে তাকালেন।
“আমি এখানে চাকরি নিয়েছি কারণ আমি বাঁচতে চাই। আমি বিদিশা চ্যাটার্জী হয়ে নয়, বিদিশা গাঙ্গুলি হয়ে নিজের পরিচয় ফিরে পেতে চাই। আর এখানে আমার পরিচয় ফাঁস হলে আমার প্রফেশনাল ইমেজ নষ্ট হবে। তুমি কি চাও তোমার মা আবার সেই ঘরের কোণায় বসে কাঁদুক?”
বিদিশা একটু থামলেন। তার চোখদুটো যেন অয়নের মনের গভীরের অন্ধকারগুলো পড়ার চেষ্টা করল।
"তাছাড়া, তুমি নিজেই কি চাইতে যে ক্লাসের সবাই জানুক যে আমি তোমার মা? তুমি তো নিজেই আমার থেকে দূরে পালাচ্ছো। আমাদের এই সম্পর্কটা লুকোনো থাকলে তোমারও তো স্বাধীনতায় কেউ হস্তক্ষেপ করবে না, তাই না?"
অয়ন মাথা নিচু করে নিল। মায়ের এই অকাট্য যুক্তির সামনে তার কোনো উত্তর ছিল না। সে বুঝতে পারল, বিদিশা যা করেছেন, নিজের বাঁচার তাগিদেই করেছেন। সত্যিই তো সে বাড়ি থেকে একরকম পালিয়ে এসেছে, বাবা-মা দুজনকেই এড়িয়ে চলছে। মাকে সে বলতেও পারবে না কেন সে পালিয়ে এসেছে।
ধনীর দুলালি বিদিশার অগাধ পৈতৃক সম্পত্তি। তার সারাজীবনে একটা আঙুল না নাড়ালেও চলবে। অরুণ চ্যাটার্জীর রোজগারের উপর তিনি নির্ভর করেন না, তার চাকরির কোন দরকার নেই। তিনি আজ ঘর থেকে বেরিয়ে চাকরি নিয়েছেন শুধুমাত্র বাঁচার জন্য। এই মাকে সে সারাজীবন অন্তর্মুখী দেখে এসেছে।
মায়ের এই যুক্তির সামনে সে অসহায়। কিন্তু রনি, কবীর, বিক্রমদের কথা ভেবে তার বুক ফেটে যাচ্ছে। কিন্তু বিদিশা তো জানেন না তাদের লোলুপ দৃষ্টির কথা! তাকে তো এসবের মুখোমুখি হতে হয় না। তিনি জানেন না যে তার নিজের ছেলের মনের ভেতরে আজ আস্ত একটা আগ্নেয়গিরি ফুঁসছে !
“কিন্তু মা... কলেজের পরিবেশ খুব খারাপ। সবাই তোমাকে নিয়ে... নোংরা কথা বলছে”, অয়ন ফিসফিস করে বলল। শুরুতে ওর গলার যে জোরটা ছিল, সেটা হারিয়ে গেছে।
বিদিশা অয়নের কাছে এগিয়ে এলেন। তিনি অয়নের কাঁধে হাত রাখতে গিয়েও থেমে গেলেন। দূরত্ব বজায় রাখাটা জরুরি।
“অয়ন, কে কী বলছে তাতে আমার কিছু যায় আসে না। আমি জানি আমি কে। তুমি এই চার মাস বাড়ি ফেরোনি কেন, আমি জানি। তুমি বড় হয়েছ, তোমার নিজস্ব জগৎ হয়েছে। আমাকেও আমার জগৎটা তৈরি করতে দাও। আমাদের এই কলেজে পরিচয় স্রেফ টিচার আর স্টুডেন্টের। এর বাইরে আর কিছু নয়। তুমি কি আমাকে এইটুকু সহযোগিতা করবে না?”
অয়ন দীর্ঘক্ষণ চুপ করে রইল। বিদিশার এই শান্ত অথচ দৃঢ় আবেদন তার মনের ভেতরে চলা ঝড়ের গতি কমিয়ে দিল। সে বুঝতে পারল, তার মা কী চাইছেন। মায়ের জন্য সে এটুকু করতেই পারবে না ? মায়ের জন্য অয়ন সব করতে পারে।
“ঠিক আছে,” অয়ন খুব নিচু স্বরে বলল। "আমি বুঝতে পেরেছি," আমি তোমার পরিচয় কাউকে বলব না। কলেজে আমরা একে অপরের কেউ নই।..." অয়ন মুখ তুলল, তার চোখে এখন এক অদ্ভুত জেদ।
"কিন্তু, মা... কেউ যদি তোমার কোনো ক্ষতি করার চেষ্টা করে, তোমার দিকে আঙুল তোলে আমি চুপ করে থাকব না। সেটা তুমি মিস গাঙ্গুলি হও, আর যাই হও।”
বিদিশা হালকা হাসলেন।
“আমি জানি তুমি আমার রক্ষাকর্তা। কিন্তু, আমার নিজের রক্ষা আমি করতে জানি, মিস্টার চ্যাটার্জী। থ্যাঙ্ক ইউ ফর ইওর কনসার্ন। এবার আপনি আসতে পারেন।" তারপর গলা নামিয়ে বললেন, "এবার যাও, নেক্সট ক্লাসের দেরি হচ্ছে।"
অয়ন উঠে দাঁড়াল। সে বুঝতে পারল, আপাতত তাদের এই চুক্তির হিসেবেই চলতে হবে।
অয়ন দরজা খুলে বেরিয়ে গেল। তার মন এখন একটু শান্ত ঠিকই, কিন্তু বিদিশার ওই মোহময়ী রূপ আর কলেজের ‘ওপেন ডেটিং’ পলিসি তার মাথার ভেতর এক বিপজ্জনক চিন্তার বীজ বুনে দিয়ে গেল। তার উপর কবীরের কথাগুলো ওর মনে ঘুরপাক খেতে লাগল।
Posts: 175
Threads: 4
Likes Received: 600 in 131 posts
Likes Given: 94
Joined: Oct 2025
Reputation:
249
অয়ন কেবিন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর বিদিশা বেশ কিছুক্ষণ নিজের ডেস্কে স্থির হয়ে বসে রইলেন। জানলার বাইরের পড়ন্ত রোদের দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল তার বুক চিরে। অয়নের চোখের ওই তীব্র, উগ্র আবেগ তাকে ভাবাচ্ছিল।
ওটা কি শুধুই একজন ছেলের তার মায়ের প্রতি পজেসিভনেস? নাকি তার চেয়েও গভীর কিছু? বিদিশা বিষয়টা নিয়ে আর বেশি ভাবতে চাইলেন না, আজকের দিনটা তার নিজের। তিনি ব্যাগ গুছিয়ে বাড়ির পথ ধরলেন।
কলকাতার ব্যস্ত ট্র্যাফিক পেরিয়ে যখন বিদিশা গড়িয়াতে নিজের বাড়িতে পৌঁছালেন, তখন সন্ধে নেমে গেছে।
বাড়ির সদর দরজা খুলে ভেতরে পা রাখতেই কলেজের সেই গমগমে, প্রাণবন্ত পৃথিবীটা যেন এক লহমায় উধাও হয়ে গেল। চারপাশটা কেমন নিস্তব্ধ, হিমশীতল। যেন কোনো মানুষের বাড়ি নয়, একটা সাজানো গোছানো মিউজিয়াম।
রাতের খাবার খাওয়ার সময় ডাইনিং টেবিলে সেই চিরপরিচিত, দমবন্ধ করা পরিবেশ। অরুণ প্লেটের দিকে তাকিয়ে নিঃশব্দে খেয়ে চলেছেন। টিভির পর্দায় নিউজ চ্যানেলের মিউট করা দৃশ্যগুলো শুধু ঘরের নীরবতাটাকে আরও প্রকট করে তুলছে।
বিদিশা নিজের প্লেটের খাবার নাড়াচাড়া করতে করতে একবার মুখ তুলে অরুণের দিকে তাকালেন। আজ জীবনে প্রথমবার তিনি নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছেন, বাইরের পৃথিবীতে একটা সম্মানজনক পেশায় যোগ দিয়েছেন। যেকোনো স্বাভাবিক বিবাহিত সম্পর্কে স্বামী অন্তত একটা প্রশ্ন করত।
"আজ আমার প্রথম দিন ছিল কলেজে," বিদিশা নীরবতা ভেঙে অত্যন্ত শান্ত গলায় বললেন। অরুণ ভাত মাখানো হাতটা এক মুহূর্তের জন্য থামালেন। তারপর মুখ না তুলেই একটা যান্ত্রিক, নির্লিপ্ত গলায় বললেন, "ওহ। ভালো।"
ব্যস, ওইটুকুই। "কেমন কাটল?", "স্টুডেন্টরা কেমন?", "পরিবেশ কেমন?"—কোনো প্রশ্নেরই উদয় হলো না অরুণের মনে। সে আবার নিজের খাবারে মন দিল।
বিদিশার বুকের ভেতর কোনো কষ্ট হলো না। না, কোনো অভিমানও হলো না। শুধু একটা শীতল শূন্যতা গ্রাস করল তাকে। এই মানুষটির কাছে তার কোনো মূল্য নেই। তার নারীত্ব, তার মেধা, তার রূপ, সবকিছু অরুণের কাছে এখন অর্থহীন। বিদিশার হঠাৎ স্টাফরুমের সেই মুহূর্তটার কথা মনে পড়ে গেল। রাহুল বোসের চোখের ওই মুগ্ধ দৃষ্টি, তার ওই সূক্ষ্ম প্রশংসা। আর তার ঠিক বিপরীতে বসে থাকা তার নিজের স্বামী, যার কাছে সে যেন এক অদৃশ্য আসবাবপত্র মাত্র। বিদিশা নিঃশব্দে নিজের খাওয়া শেষ করে উঠে পড়লেন।
রাত এগারোটা বাজে। অরুণের স্টাডির দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। বিদিশা নিজের শোওয়ার ঘরে, বিছানার একপাশের সাইড-টেবিলে বসে ল্যাপটপ আর কিছু বইপত্র খুলে আগামীকালের লেকচার নোট তৈরি করছিলেন।
কিন্তু অঙ্কের জটিল সমীকরণগুলোর মাঝে তার মনে বারবার একটা মুখ ভেসে উঠছিল।
অয়ন।
করিডোরে অয়নের ওই রাগে লাল হয়ে থাকা মুখ, তার চোখের ওই তীক্ষ্ণ দৃষ্টি। বিদিশা যখন তাকে 'মিস্টার চ্যাটার্জী' বলে সম্বোধন করেছিলেন, তখন অয়নের চোখে যে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার যন্ত্রণা ফুটে উঠেছিল, সেটা বিদিশার মাতৃহৃদয়ে একটু হলেও আঁচড় কেটেছিল ঠিকই।
কিন্তু তাকে কঠোর হতেই হতো। অয়নকে বুঝতে হবে, সে আর ছোট নেই। হঠাৎ বাইরে একটা দমকা হাওয়া দিল। জানলার পর্দাগুলো সজোরে উড়ে এল ঘরের ভেতর। ল্যাপটপের স্ক্রিনের আলোয় বিদিশা দেখলেন, বাইরে বেশ মেঘ করে এসেছে। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই ঝমঝম করে বৃষ্টি নামল। কলকাতার ভ্যাপসা গরমের পর এই রাতের বৃষ্টি যেন এক অদ্ভুত শান্তির বার্তা নিয়ে এল।
বিদিশা চেয়ার ছেড়ে উঠলেন। ল্যাপটপটা বন্ধ করে তিনি ধীরে ধীরে গিয়ে দাঁড়ালেন ব্যালকনিতে। বৃষ্টির ছাঁট সোজা এসে পড়ল তার মুখে। তিনি চোখ বুজে ফেললেন। ঠান্ডা, ভিজে হাওয়া তার ফ্রেঞ্চ রোল করা চুলগুলোকে অবাধ্য করে তুলল। তার পরনের সেই মেরুন রঙের কটন সিল্কের শাড়িটা ক্রমশ ভিজে শরীরের সাথে সেঁটে যেতে শুরু করল। কালো স্লিভলেস ব্লাউজের ভেতর দিয়ে তার উষ্ণ, টানটান শরীরটা বৃষ্টির শীতল জলের স্পর্শে এক অদ্ভুত শিহরণে কেঁপে উঠল। ভিজে কাপড়ের আবরণ তার শরীরের নিখুঁত, পরিণত ভাঁজগুলোকে যেন আরও বেশি স্পষ্ট করে তুলছিল।
মাটির সোঁদা গন্ধ আর বৃষ্টির একটানা আওয়াজ। বিদিশা গ্রিল ধরে চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে রইলেন। তার মনে কী চলছিল, তা ওই রাতের অন্ধকারের মতোই রহস্যময়। তিনি কি অরুণের উদাসীনতার জন্য দুঃখ পাচ্ছিলেন? নাকি, রাহুল বোসের চোখের সেই প্রশংসা তার মনে কোনো সুপ্ত বাসনার জন্ম দিচ্ছিল ? নাকি, তার ছেলের ওই উগ্র দৃষ্টি কথা মনে করে অস্বস্তিতে ভুগছিলেন ?
বিদিশা শুধু বৃষ্টিতে ভিজতে লাগলেন।
অন্যদিকে, কয়েক কিলোমিটার দূরে, কলেজের ডর্মের একটা অন্ধকার ঘরে বসে ছিল অয়ন।
তার জানলার বাইরের কাঁচ বেয়েও বৃষ্টির জল গড়িয়ে পড়ছে। ঘরের ভেতর কোনো আলো নেই, শুধু স্ট্রিটলাইটের একটা ম্লান, হলুদ আভা জানলার কাঁচ ভেদ করে মেঝেতে এসে পড়েছে।
অয়ন নিজের বিছানায় চুপচাপ বসে আছে। তার বাঁ হাতে ধরা সেই শিফন শাড়ি পরা বিদিশার ছবিটা।
বাইরে তুমুল বৃষ্টি, আর অয়নের নিজের বুকের ভেতরটাও যেন যন্ত্রণার এক ভারী মেঘে ঢেকে আছে। তার চোখদুটো জ্বলছে। কিন্তু একটা অদ্ভুত বিষয় সে খেয়াল করল। জানলার ফাঁক দিয়ে আসা বৃষ্টির ছাঁট, বা তার নিজের চোখের কোণে জমে ওঠা জলের বিন্দু, কোনোকিছুই ওই ছবিটাকে ভেজাতে পারছে না। ছবিটা যেন তার ধরাছোঁয়ার বাইরে এক পবিত্র, শুষ্ক দ্বীপ। ঠিক যেমন বাস্তবে তার মা, মিস বিদিশা গাঙ্গুলি, আজ তার সমস্ত অধিকারের গণ্ডি পার করে এক ধরাছোঁয়ার বাইরের জগতে চলে গেছেন।
অয়ন একটা গভীর শ্বাস নিয়ে ছবিটা সযত্নে নিজের পকেটে রেখে দিল। তারপর ডান হাত দিয়ে নিজের মোবাইলটা তুলে নিল।
স্ক্রিনের নীল আলোটা তার ঘামে ভেজা, রুক্ষ মুখের ওপর পড়ল। সে কলেজের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটটা খুলল। তার আঙুলগুলো কাঁপছিল। সে সোজা চলে গেল 'ফ্যাকাল্টি' সেকশনে। তারপর 'ডিপার্টমেন্ট অফ ম্যাথমেটিক্স'।
স্ক্রিনটা একটু স্ক্রল করতেই তার হৃদপিণ্ডটা যেন এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল।
পর্দায় জ্বলজ্বল করছে বিদিশার একটা অত্যন্ত সুন্দর, প্রফেশনাল ছবি। পরনে একটা হালকা রঙের শাড়ি, মুখে একটা স্মিত, আত্মবিশ্বাসী হাসি।
ছবির নিচেই বড় বড় করে লেখা—
Name: Miss Bidisha Ganguly.
Designation: Lecturer, Advanced Mathematics.
অয়ন আরও একটু নিচে স্ক্রল করল। ফ্যাকাল্টিদের বেসিক প্রোফাইল ডিটেইলস দেওয়া আছে। সেখানে চোখ পড়তেই অয়নের মনে হলো কেউ যেন তার বুকের ভেতর একটা ধারালো বর্শা ঢুকিয়ে দিয়েছে।
Marital Status: Single.
'সিঙ্গেল'। শব্দটা স্ক্রিনের ওপর থেকে অয়নকে যেন উপহাস করে ভেংচি কাটছিল। কলেজের খাতায়, সমাজের চোখে তার মা এখন একজন 'সিঙ্গেল' নারী। তার নামের আগে 'মিস' শব্দটা প্রমাণ করে দিচ্ছে যে তিনি সম্পূর্ণ স্বাধীন, দায়মুক্ত।
অয়নের কানে ক্যাফেটেরিয়ায় কবীরের মুখে শোনা বিক্রম মালহোত্রার সেই নোংরা কথাগুলো আবার বাজতে শুরু করল। 'শাড়ির ভাঁজের ভেতরে লুকিয়ে থাকা আগুন... এক মাসের মধ্যে আমার বাইকের পেছনে...' এই 'সিঙ্গেল' আর 'মিস' লেখাটা অয়নকে ক্রমাগত খোঁচা মারতে লাগল। এর মানে হলো, কলেজের যেকোনো পুরুষ ফ্যাকাল্টি বা কলেজের ওই বিক্রমের মতো লোলুপ ছেলেরা, সবাই আইনত এবং সামাজিকভাবে বিদিশার দিকে এগোতে পারে। বিদিশাকে ডেট করতে পারে। তাকে বিছানায় তোলার স্বপ্ন দেখতে পারে। কারণ তিনি তো কারো স্ত্রী নন, তিনি তো এক 'সিঙ্গেল' উওম্যান।
সবাই তার দিকে হাত বাড়াতে পারে।
তার নিজেরই জন্মদাত্রী মা, যাকে সে একজন দেবীর মতো পুজো করে, রাতের অন্ধকারে নিজের কল্পনায় যার মতো একজন স্ত্রী সে কামনা করে, সেই নারী আজ সবার জন্য উন্মুক্ত।
স্ক্রিনের ওই 'সিঙ্গেল' লেখাটার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকতে থাকতে অয়নের চোয়ালের পেশিগুলো পাথরের মতো শক্ত হয়ে উঠল। সে কোনো রূপান্তর বা হঠাৎ কোনো বিস্ফোরণ ঘটাল না। সে শুধু অন্ধকারে বসে নিজের এই অসহায়তার অনুভূতিটাকে নীরবে হজম করতে লাগল।
কিন্তু, তার ভেতরের আগুনটা নিভল না, বরং ওই বৃষ্টির রাতের অন্ধকারে সেটা তুষের আগুনের মতো আরও ধিকিধিকি করে জ্বলতে শুরু করল।
Posts: 3
Threads: 0
Likes Received: 0 in 0 posts
Likes Given: 15
Joined: Feb 2026
Reputation:
-1
গল্প টা তে কি মা ছেলের সেক্স হবে? মা ছেলের সেক্স নাহলে গল্প টা খুব সুন্দর হবে। দয়া করে মা ছেলের সেক্স দেখায়েন না।
•
Posts: 26
Threads: 0
Likes Received: 35 in 22 posts
Likes Given: 7
Joined: Sep 2024
Reputation:
0
(08-03-2026, 09:25 AM)shree189 Wrote: গল্প টা তে কি মা ছেলের সেক্স হবে? মা ছেলের সেক্স নাহলে গল্প টা খুব সুন্দর হবে। দয়া করে মা ছেলের সেক্স দেখায়েন না।
Don't talk rubbish..... Ayan is a strong, determined boy, not some cuckson. He will always, in every fkn moment will stand like Himalayan range in front of her mom, when danger comes, he will protect her, and gradually the melt the heart of the cold changed mother of his. She will again feel the best feeling of being a mother, the most purest form of love....the love between a mother and son.
|