27-02-2026, 12:31 PM
অষ্টম অধ্যায়
ইতালির সেই অভিশপ্ত, দমবন্ধ করা রাতের পর ক্যালেন্ডারের পাতা থেকে চারটে বছর নিঃশব্দে খসে পড়েছে। সময় হয়তো সব ক্ষত সারিয়ে দেয়, কিন্তু কিছু কিছু ক্ষত সারার পর যে দাগ রেখে যায়, তা মানুষের খোলসটাই পুরোপুরি পাল্টে দেয়। চ্যাটার্জী পরিবারেও সেই রাতের পর থেকে এক নীরব, হিমশীতল পরিবর্তন গ্রাস করেছে বাড়ির প্রতিটি দেওয়ালকে।
বিদিশা ট্রেডমিলের স্পিডটা আরও এক ধাপ বাড়িয়ে দিলেন। মেশিনের একটানা ঘড়ঘড় শব্দের সাথে তাঁর দ্রুত, নিয়ন্ত্রিত শ্বাসপ্রশ্বাসের শব্দ মিশে জিমের নিস্তব্ধতাকে চিরে দিচ্ছিল। স্পোর্টস ব্রায়ের ওপর দিয়ে ঘামের বিন্দুগুলো গড়িয়ে নামছে তাঁর সুডৌল, নির্মেদ পেটের ওপর দিয়ে। নাভির ঠিক নিচে, ট্র্যাকপ্যান্টের ইলাস্টিকের কাছে এসে সেই ঘামের বিন্দুগুলো হারিয়ে যাচ্ছে। চল্লিশ ছুঁই ছুঁই একজন নারীর শরীর এতটা টানটান, এতটা নিটোল হতে পারে, তা স্বচক্ষে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। তাঁর বাহুর পেশিতে হালকা বিভাজন, উন্মুক্ত কাঁধের হাড়ে এক অদ্ভুত কাঠিন্য, আর উদ্ধত স্তনযুগলের ওঠাপড়ায় এক বন্য প্রাণশক্তি।
বিদিশা ট্রেডমিল থেকে নেমে একটা তোয়ালে দিয়ে মুখের ঘাম মুছলেন।
সামনে জিমের বিশাল আয়নাটার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের ঘামে ভেজা প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে বিদিশার ঠোঁটের কোণে একটা বাঁকা হাসি ফুটে উঠল। ওয়ার্কআউটের পর তার শ্বাস-প্রশ্বাস এখনো দ্রুত। ঘামের বিন্দুগুলো তার ফর্সা, মসৃণ গলা বেয়ে নিচের দিকে নেমে এসে স্পোর্টস ব্রার মাঝখানের গভীর খাঁজে হারিয়ে যাচ্ছে।
ভেজা কাপড়ের ওপর দিয়ে তার উদ্ধত স্তনযুগলের আভাস স্পষ্ট। চল্লিশের কাছাকাছি বয়স হলেও বিদিশার টানটান, নির্মেদ ফিগার আর ঢলঢলে মুখশ্রী দেখলে যে কেউ নির্দ্বিধায় তাকে কুড়ি-বাইশ বছরের সদ্য তরুণী বলে ভুল করবে। মডেলদের মতো ঈর্ষণীয় ফিগার আর কোনো ক্লাসিক সিনেমার হিরোইনের মতো নিখুঁত মুখাবয়ব। সব মিলিয়ে বিদিশা এখন আগের চেয়েও বেশি মোহময়ী।
ইতালির সেই রাতের আগে তিনি ছিলেন নরম, লাজুক, আর পরনির্ভরশীল এক নারী। কিন্তু, বনগানির প্রাসাদের ওই অন্ধকার ঘরটা তাঁর পুরোনো সত্তাকে পুড়িয়ে ছাই করে দিয়েছে। সেই ছাই থেকে জন্ম নিয়েছে এক নতুন বিদিশা। তাঁর মনের গভীরতার তলায় এখন আর নরম কাদা নেই, সেখানে তৈরি হয়েছে এক ইস্পাত কঠিন সংকল্পের দুর্ভেদ্য আবরণ। তিনি বুঝেছেন, এই পৃথিবীতে দুর্বলতার কোনো ক্ষমা নেই।
ইতালির ঘটনার পর বিদিশার ভেতরের সেই নরম সত্তাটা যেন চিরতরে মরে গেছে। তার জায়গায় জন্ম নিয়েছে এক মানসিক কাঠিন্য।
তার সেই গভীর, অন্তঃসলিলা স্বভাব অবশ্য নষ্ট হয়নি। যার জন্য এই কঠিনতার ছাপ তিনি সহজে বাইরে পড়তে দেন না। কিন্তু, মনের সেই গভীরতার তলায় এখন একটা ইস্পাত-কঠিন সংকল্পের আবরণ তৈরি হয়েছে। কেউ আর তাকে আঘাত করতে পারবে না, কেউ না।
আয়না থেকে চোখ সরিয়ে একটা তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছলেন বিদিশা। চারপাশের শূন্যতা তাকে যেন রোজ গিলে খেতে আসে। তার জীবন এখন একাকীত্বে ভর্তি, আর সেই একাকীত্ব কাটানোর জন্যই তার দিনের অনেকটা সময় এই জিমে কাটে। শারীরিক কষ্টের মধ্যে দিয়ে তিনি মানসিক শূন্যতাকে ভরাট করার চেষ্টা করেন।
অরুণের কথা মনে পড়তেই একটা শীতল দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো বিদিশার বুক চিরে।
অরুণের সাথে তাঁর সম্পর্কটা এখন এক বরফজমাট হ্রদের মতো। ওপরটা শান্ত, কিন্তু ভেতরে কোনো প্রাণের স্পন্দন নেই। এই দূরত্বটা বিদিশা তৈরি করেননি, করেছেন অরুণ নিজেই। ইতালির সেই রাতের পর অরুণ অবচেতন মনে এক ভয়ানক অপরাধবোধে ভুগতে শুরু করেন।
একটা অদ্ভুত, অদৃশ্য অপরাধবোধ তাঁকে কুরে কুরে খায়। কিসের অপরাধবোধ, সেটা অরুণ নিজেও স্পষ্ট করে জানেন না। সেই রাতে তিনি নেশার ঘোরে অচেতন ছিলেন, কিন্তু তার পুরুষত্ব, তার স্বামী হিসেবে রক্ষাকর্তার অহংকারে একটা চিরস্থায়ী ফাটল ধরে গেছে। অরুণের সবসময় মনে হয়, তার অবচেতন মন তাকে প্রতিনিয়ত জানান দেয়, যে বিদিশা তাকে সবটা খুলে বলেনি।
কিছু একটা ভয়ংকর ঘটেছিল ওই প্রাসাদে, যা বিদিশা নিজের ভেতরে সযত্নে লুকিয়ে রেখেছে।
ওই রাতে এমন কিছু ঘটেছিল, যা তার পুরুষত্বকে, তার স্বামী হিসেবে রক্ষাকর্তার ভূমিকাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। কিন্তু সেই সত্যিকে খুঁড়ে বের করার মতো মানসিক সাহস অরুণের নেই।
তাই তিনি পালানোর পথ বেছে নিয়েছেন।
বিদিশার কাছাকাছি এলেই একটা ব্যর্থতার বোধ অরুণকে জাপটে ধরে। এখন কাজ থেকে ফিরলে অরুণ আর আগের মতো বিদিশার কাছে গিয়ে গল্প করেন না। সরাসরি নিজের স্টাডিতে চলে যান। ছুটির দিনে খুব সকালে গল্ফ খেলার নাম করে বেরিয়ে যান।
অরুণ এখন বিছানার একদম একধারে, বিদিশার দিকে পিঠ দিয়ে শুয়ে থাকেন। তাদের মাঝখানে পড়ে থাকে মাইলের পর মাইল চওড়া এক অদৃশ্য দেওয়াল।
ইতালির ঘটনার আগে অরুণ এমন আচরণ করলে বিদিশার মনে গভীর ক্ষত তৈরি হতো। তিনি অভিমান করতেন।
কিন্তু এখন?
এখন আর তাঁর কোনো কষ্ট হয় না। অরুণের এই দূরে সরে থাকাটা তাঁকে প্রথম প্রথম সামান্য পীড়া দিলেও, সেটা তাঁর মনে আর কোনো গভীর ক্ষত তৈরি করতে পারে না। তিনি বুঝতে পারেন, তাঁর ভেতর থেকে সেই দুর্বল নারী মরে গেছে। তাঁর মনোভাব এখন অনেক কঠিন, অনেক বাস্তববাদী।
এখন এটা নিয়ে তিনি আর খুব একটা মাথা ঘামান না। এখন আর তার চোখে জল আসে না। এই নির্লিপ্ততা থেকেই বিদিশা বুঝতে পারেন, তিনি আগের সেই গৃহবধূটি নেই। তার মনোভাব এখন অনেক কঠিন, বাস্তবমুখী এবং শীতল হয়ে গেছে।
অরুণ যে শূন্যস্থানটা তৈরি করেছে, তা হয়তো প্রকৃতির নিয়মেই অন্য কাউকে দিয়ে পূরণ হওয়ার অপেক্ষায় আছে।
কিন্তু যেটা তাঁকে সবচেয়ে বেশি যন্ত্রণা দেয়, যা তাঁর ইস্পাতের বর্ম ভেদ করে তাঁকে রক্তাক্ত করে, সেটা হলো তাঁর একমাত্র ছেলে অয়নের আচরণ। তার নাড়ীছেঁড়া ধন, তার একমাত্র ছেলে, এখন তাকে অত্যন্ত সন্তর্পণে, সতর্কভাবে এড়িয়ে চলে।
অয়ন... বিদিশার চোখের সামনে ছেলের মুখটা ভেসে উঠতেই তাঁর সেই নিবিড় কালো চোখে একটা বেদনা মিশ্রিত বিষাদঘন অনুভূতির সঞ্চার হলো। অয়ন তাঁর থেকে যোজন যোজন দূরে সরে গেছে। ছেলেটা তাঁকে সতর্কভাবে, প্রায় হিসেব করে এড়িয়ে চলে।
কেন?
এই প্রশ্নের উত্তর বিদিশা কোনোদিন অয়নের কাছে দাবি করেননি। তার স্বভাবসিদ্ধ অন্তর্মুখী চরিত্র তাকে বাধা দিয়েছে ছেলের কাছে জবাবদিহি চাইতে।
বিদিশা নিজের মনকে প্রবোধ দেন—অয়ন বড় হয়েছে, ওর নিজের একটা জীবন তৈরি হয়েছে। কলেজে নতুন বন্ধু-বান্ধব, নতুন পরিবেশ। অয়ন কেন তাঁর সাথে এক ঘরে, একা থাকতে পর্যন্ত চায় না? কেন সে চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলে না? এই প্রশ্নগুলো রাতের অন্ধকারে বিদিশাকে কুরে কুরে খায়।
বিদিশা নিজের মনকে প্রবোধ দেয় - অয়ন বড় হয়েছে, কলেজে উঠেছে, ওর নিজের একটা আলাদা জগৎ তৈরি হয়েছে, বন্ধুবান্ধব হয়েছে, তাই হয়তো মায়ের আঁচল ছেড়ে সে দূরে থাকতে চায়। এই বয়সে ছেলেরা একটু স্বাধীনচেতা হয়, মাকে হয়তো এড়িয়ে চলে। এটা স্বাভাবিক।
কিন্তু এই যুক্তি তাঁর মাতৃসত্তাকে সান্ত্বনা দিতে পারে না।
কিন্তু... কিন্তু, অয়ন কেন তার সাথে একা এক ঘরে থাকতে পর্যন্ত চায় না?
কেন তার দৃষ্টি সবসময় মা'কে এড়িয়ে মেঝের দিকে বা অন্যদিকে ঘুরে থাকে?
এই প্রশ্নগুলো রাতের অন্ধকারে বিদিশাকে তীরের মতো বেঁধে। আজ চার মাস হলো অয়ন কলেজে ভর্তি হয়ে ডর্মে চলে গেছে। এই চার মাসে সে বাড়িতে নিজে থেকে মাত্র দুবার ফোন করেছিল।
বিদিশা ফোন ধরলেই, ওপাশ থেকে অয়নের অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত, যান্ত্রিক উত্তর "হ্যাঁ মা, ভালো আছি। ক্লাসে যাচ্ছি, রাখছি।" ব্যস, ওইটুকুই।
বিদিশা জানেন না, অয়ন মনে মনে ঠিক করে নিয়েছে আগামী চার বছর সে আর বাড়ি ফিরবে না। এই স্বেচ্ছা নির্বাসন তার নিজেরই নেওয়া এক কঠিন শাস্তি।
উনি যেটা জানেন না, সেটা হলো, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অয়নের আত্মবোধ বেড়েছে আর তার সাথে জন্ম নেওয়া এক নিষিদ্ধ, বিকৃত মনস্তত্ত্ব কীভাবে তাকে ভেতর থেকে অপরাধবোধে শেষ করে দিচ্ছে।
ছোটবেলায় শাড়ি পরা, শান্ত, স্নিগ্ধ বিদিশাকে অয়ন তার জীবনের আদর্শ নারী হিসেবে দেখত। এই সম্পর্কে কোনো কলুষতা ছিল না, ছিল এক চরম ভক্তি এবং মাতৃপ্রেম। বিদিশাও অয়নকে নিজের জগত মনে করতেন, কারণ অরুণের ব্যস্ততার মাঝে অয়নই ছিল তার একমাত্র নিঃস্বার্থ সঙ্গী।
ইতালির সেই রাত সবকিছু চুরমার করে দেয়। অয়ন প্রথমবার তার দেবীকে একজন রক্তমাংসের, কামনা-বাসনায় ঘেরা, নির্যাতিতা নারী হিসেবে আবিষ্কার করে। তার পরের ঘটনা সবার জানা।
এই নতুন অনুভূতি অয়নকে চরম অপরাধবোধে ফেলে দেয়। সে নিজেকে মায়ের থেকে গুটিয়ে নিতে শুরু করে, কারণ সে তার নিজের চোখের লোলুপতাকে ভয় পায়।
অয়ন বুঝতে পেরেছে, সে যতই বড় হচ্ছে, তার মায়ের প্রতি তার আকর্ষণ এক বিকৃত, অমোঘ রূপ নিচ্ছে। ছোটবেলা থেকেই সে মায়ের মতো একজন স্ত্রীকে কল্পনা করত। বিদিশার ওই শান্ত চোখ, অন্তঃসলিলা গভীর স্বভাব তাকে ভীষণভাবে টানত। কিন্তু ইতালির সেই রাত সবকিছু ওলটপালট করে দিয়েছে।
বনগানির হাতে তার মায়ের লাঞ্ছনা সে সহ্য করতে পারেনি। কিন্তু সেদিন রাতে সে তার মায়ের যে রূপ দেখেছিল, তা তার মস্তিষ্কে চিরকালের মতো খোদাই হয়ে গেছে। তার মায়ের আত্মত্যাগ, তেজ, সাহস, স্বাভিমান আর সর্বোপরি বনগানির সাথে চুক্তির সময় তার চোখের সেই বন্য, আদিম আগুন। আর তারপর...টাইট জিন্স আর লাল ক্রপ টপে তার মায়ের সেই উন্মুক্ত, তেজী, প্রতিশোধস্পৃহায় পাগল রূপ!
বনগানির অণ্ডকোষে যখন বিদিশা পৈশাচিক রাগে লাথি মারছিলেন, তখন মায়ের সেই সুডৌল নিতম্ব, নির্মেদ পেট আর রাগে ফুলে ওঠা স্তনযুগ - সেই উন্মুক্ত, তেজী, লাস্যময়ী রূপ অয়ন আজও ভুলতে পারেনি।
তার আগে সে মা'কে চিরকাল কেবল আটপৌরে শাড়িতে, এক স্নিগ্ধ গৃহবধূর রূপেই দেখেছে। কিন্তু ওই রাতে সে এক রক্তমাংসের, কামনা-বাসনায় ঘেরা, ভয়ঙ্করী দেবীকে দেখেছিল।
অয়ন খুব ভালো করেই বোঝে যে এই অনুভূতিগুলো তার একান্তই নিজস্ব, যেখানে যৌনতা এবং পবিত্রতার এক বিকৃত মিশেল ঘটে গেছে।
তার কাছে তার মা এখন কোনো সাধারণ নারী নন, যার মতো স্ত্রী সে কামনা করে। তিনি এক সাক্ষাৎ দেবী। নিষিদ্ধ কামনার সঙ্গে যোগ হয়েছে ভক্তি। তার দেবীর প্রতি অয়নের মনের গভীরে জমতে থাকা এই ভক্তি দিন দিন বেড়েই চলেছে। এই ভয়ানক সত্যটা সে নিজেই নিজের কাছে স্বীকার করতে ভয় পায়। এই কামনার জন্য সে নিজের ওপর তীব্রভাবে ক্ষুব্ধ, লজ্জিত।
পাছে তার চোখের দৃষ্টি, তার শারীরিক ভাষা তার ভেতরের এই নোংরা সত্যটাকে মায়ের সামনে প্রকাশ করে দেয়, পাছে সে ধরা পড়ে যায়, সেই ভয়েই সে সচেতনভাবে সবসময় মায়ের থেকে দূরে দূরে থাকে। মায়ের সাথে একা এক ঘরে থাকলে তার দমবন্ধ হয়ে আসে, শরীরের ভেতরে একটা অদ্ভুত শিহরণ কাজ করে। যদি মা তার চোখের ভাষা পড়ে ফেলেন? যদি মা বুঝতে পারেন তার নিজের ছেলেই তাকে নিয়ে রাতে কীসব ভাবে? অয়ন জানে, সেরকম কিছু হলে নিজের মুখ সে আর কোনদিন কাউকে দেখাতে পারবে না।
বিপদ বাড়ানোর কোনো ইচ্ছে অয়নের নেই। তাই এই স্বেচ্ছা নির্বাসন।
কিন্তু মানুষের মন বড় অদ্ভুত। যে জিনিস সে নিজের থেকে দূরে ঠেলে দিতে চায়, অবচেতন মন তাকেই আঁকড়ে ধরে।
তার মানিব্যাগের একদম ভেতরের গোপন পকেটে সবসময় একটা জিনিস লুকানো থাকে। একটা ছবি। এই কথাটা পৃথিবীর আর কেউ জানে না।
বিদিশাও নয়।
ছবিটা দু'বছর আগে অরুণের অফিসেরই একটা পার্টিতে তোলা। বিদিশা একটা হালকা নীল রঙের শিফন শাড়ি পরে আছেন। শাড়ির আঁচলটা অসতর্কভাবে সামান্য সরে গেছে। ওই ছবিতে বিদিশাকে অসম্ভব, অতিপ্রাকৃত রকমের সুন্দরী দেখাচ্ছে, যেন কোন অপ্সরা। শাড়ির নেটের সূক্ষ্ম ফাঁক দিয়ে তার ফর্সা, নির্মেদ পেট আর গভীর, রহস্যময় নাভিটা স্পষ্ট উঁকি দিচ্ছে। মুখটা একটু আধ-ঘোরা।
ওই ছবিটা হলো অয়নের 'গিল্টি প্লেজার'।
হস্টেলের ঘরে যখন সে একা থাকে, চারপাশ যখন নিস্তব্ধ, তখন মাঝে মাঝে অত্যন্ত সাবধানে ও ছবিটা বার করে। একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে মায়ের ওই গভীর নাভির দিকে, তার বুকের খাঁজের দিকে।আর পরক্ষণেই তীব্র আত্মগ্লানিতে ভুগতে থাকে। অপরাধবোধ আর উত্তেজনায় কাঁপতে কাঁপতে আবার ছবিটা পকেটে ঢুকিয়ে রেখে দেয়।
বিদিশা এর কিছুই জানেন না।
কলেজে ভর্তি হওয়ার পর অয়ন নিজেকে স্পোর্টস এর মধ্যে ডুবিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে। নিজের ভেতরের এই অন্ধকার দিকটা থেকে পালাতে সে বাইরের কোলাহলকে বেছে নিয়েছে। তার সুন্দর, পুরুষালি মুখ আর জিম-করা সুঠাম চেহারার জন্য কলেজে মেয়ে মহলে তার কদর খুব। সে মাঝে মাঝে মেয়েদের সাথে ডেটেও গেছে। কিন্তু, ওই অবধিই। তার মন তৃপ্ত হয় না, কারণ অবচেতন মনে সে সবসময় ওই মেয়েগুলোর মধ্যে তার মায়ের স্নিগ্ধতা আর তেজের মিশেল খুঁজতে থাকে, যা সে কখনো পায় নি।
ইতালির সেই অভিশপ্ত, দমবন্ধ করা রাতের পর ক্যালেন্ডারের পাতা থেকে চারটে বছর নিঃশব্দে খসে পড়েছে। সময় হয়তো সব ক্ষত সারিয়ে দেয়, কিন্তু কিছু কিছু ক্ষত সারার পর যে দাগ রেখে যায়, তা মানুষের খোলসটাই পুরোপুরি পাল্টে দেয়। চ্যাটার্জী পরিবারেও সেই রাতের পর থেকে এক নীরব, হিমশীতল পরিবর্তন গ্রাস করেছে বাড়ির প্রতিটি দেওয়ালকে।
বিদিশা ট্রেডমিলের স্পিডটা আরও এক ধাপ বাড়িয়ে দিলেন। মেশিনের একটানা ঘড়ঘড় শব্দের সাথে তাঁর দ্রুত, নিয়ন্ত্রিত শ্বাসপ্রশ্বাসের শব্দ মিশে জিমের নিস্তব্ধতাকে চিরে দিচ্ছিল। স্পোর্টস ব্রায়ের ওপর দিয়ে ঘামের বিন্দুগুলো গড়িয়ে নামছে তাঁর সুডৌল, নির্মেদ পেটের ওপর দিয়ে। নাভির ঠিক নিচে, ট্র্যাকপ্যান্টের ইলাস্টিকের কাছে এসে সেই ঘামের বিন্দুগুলো হারিয়ে যাচ্ছে। চল্লিশ ছুঁই ছুঁই একজন নারীর শরীর এতটা টানটান, এতটা নিটোল হতে পারে, তা স্বচক্ষে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। তাঁর বাহুর পেশিতে হালকা বিভাজন, উন্মুক্ত কাঁধের হাড়ে এক অদ্ভুত কাঠিন্য, আর উদ্ধত স্তনযুগলের ওঠাপড়ায় এক বন্য প্রাণশক্তি।
বিদিশা ট্রেডমিল থেকে নেমে একটা তোয়ালে দিয়ে মুখের ঘাম মুছলেন।
সামনে জিমের বিশাল আয়নাটার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের ঘামে ভেজা প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে বিদিশার ঠোঁটের কোণে একটা বাঁকা হাসি ফুটে উঠল। ওয়ার্কআউটের পর তার শ্বাস-প্রশ্বাস এখনো দ্রুত। ঘামের বিন্দুগুলো তার ফর্সা, মসৃণ গলা বেয়ে নিচের দিকে নেমে এসে স্পোর্টস ব্রার মাঝখানের গভীর খাঁজে হারিয়ে যাচ্ছে।
ভেজা কাপড়ের ওপর দিয়ে তার উদ্ধত স্তনযুগলের আভাস স্পষ্ট। চল্লিশের কাছাকাছি বয়স হলেও বিদিশার টানটান, নির্মেদ ফিগার আর ঢলঢলে মুখশ্রী দেখলে যে কেউ নির্দ্বিধায় তাকে কুড়ি-বাইশ বছরের সদ্য তরুণী বলে ভুল করবে। মডেলদের মতো ঈর্ষণীয় ফিগার আর কোনো ক্লাসিক সিনেমার হিরোইনের মতো নিখুঁত মুখাবয়ব। সব মিলিয়ে বিদিশা এখন আগের চেয়েও বেশি মোহময়ী।
ইতালির সেই রাতের আগে তিনি ছিলেন নরম, লাজুক, আর পরনির্ভরশীল এক নারী। কিন্তু, বনগানির প্রাসাদের ওই অন্ধকার ঘরটা তাঁর পুরোনো সত্তাকে পুড়িয়ে ছাই করে দিয়েছে। সেই ছাই থেকে জন্ম নিয়েছে এক নতুন বিদিশা। তাঁর মনের গভীরতার তলায় এখন আর নরম কাদা নেই, সেখানে তৈরি হয়েছে এক ইস্পাত কঠিন সংকল্পের দুর্ভেদ্য আবরণ। তিনি বুঝেছেন, এই পৃথিবীতে দুর্বলতার কোনো ক্ষমা নেই।
ইতালির ঘটনার পর বিদিশার ভেতরের সেই নরম সত্তাটা যেন চিরতরে মরে গেছে। তার জায়গায় জন্ম নিয়েছে এক মানসিক কাঠিন্য।
তার সেই গভীর, অন্তঃসলিলা স্বভাব অবশ্য নষ্ট হয়নি। যার জন্য এই কঠিনতার ছাপ তিনি সহজে বাইরে পড়তে দেন না। কিন্তু, মনের সেই গভীরতার তলায় এখন একটা ইস্পাত-কঠিন সংকল্পের আবরণ তৈরি হয়েছে। কেউ আর তাকে আঘাত করতে পারবে না, কেউ না।
আয়না থেকে চোখ সরিয়ে একটা তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছলেন বিদিশা। চারপাশের শূন্যতা তাকে যেন রোজ গিলে খেতে আসে। তার জীবন এখন একাকীত্বে ভর্তি, আর সেই একাকীত্ব কাটানোর জন্যই তার দিনের অনেকটা সময় এই জিমে কাটে। শারীরিক কষ্টের মধ্যে দিয়ে তিনি মানসিক শূন্যতাকে ভরাট করার চেষ্টা করেন।
অরুণের কথা মনে পড়তেই একটা শীতল দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো বিদিশার বুক চিরে।
অরুণের সাথে তাঁর সম্পর্কটা এখন এক বরফজমাট হ্রদের মতো। ওপরটা শান্ত, কিন্তু ভেতরে কোনো প্রাণের স্পন্দন নেই। এই দূরত্বটা বিদিশা তৈরি করেননি, করেছেন অরুণ নিজেই। ইতালির সেই রাতের পর অরুণ অবচেতন মনে এক ভয়ানক অপরাধবোধে ভুগতে শুরু করেন।
একটা অদ্ভুত, অদৃশ্য অপরাধবোধ তাঁকে কুরে কুরে খায়। কিসের অপরাধবোধ, সেটা অরুণ নিজেও স্পষ্ট করে জানেন না। সেই রাতে তিনি নেশার ঘোরে অচেতন ছিলেন, কিন্তু তার পুরুষত্ব, তার স্বামী হিসেবে রক্ষাকর্তার অহংকারে একটা চিরস্থায়ী ফাটল ধরে গেছে। অরুণের সবসময় মনে হয়, তার অবচেতন মন তাকে প্রতিনিয়ত জানান দেয়, যে বিদিশা তাকে সবটা খুলে বলেনি।
কিছু একটা ভয়ংকর ঘটেছিল ওই প্রাসাদে, যা বিদিশা নিজের ভেতরে সযত্নে লুকিয়ে রেখেছে।
ওই রাতে এমন কিছু ঘটেছিল, যা তার পুরুষত্বকে, তার স্বামী হিসেবে রক্ষাকর্তার ভূমিকাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। কিন্তু সেই সত্যিকে খুঁড়ে বের করার মতো মানসিক সাহস অরুণের নেই।
তাই তিনি পালানোর পথ বেছে নিয়েছেন।
বিদিশার কাছাকাছি এলেই একটা ব্যর্থতার বোধ অরুণকে জাপটে ধরে। এখন কাজ থেকে ফিরলে অরুণ আর আগের মতো বিদিশার কাছে গিয়ে গল্প করেন না। সরাসরি নিজের স্টাডিতে চলে যান। ছুটির দিনে খুব সকালে গল্ফ খেলার নাম করে বেরিয়ে যান।
অরুণ এখন বিছানার একদম একধারে, বিদিশার দিকে পিঠ দিয়ে শুয়ে থাকেন। তাদের মাঝখানে পড়ে থাকে মাইলের পর মাইল চওড়া এক অদৃশ্য দেওয়াল।
ইতালির ঘটনার আগে অরুণ এমন আচরণ করলে বিদিশার মনে গভীর ক্ষত তৈরি হতো। তিনি অভিমান করতেন।
কিন্তু এখন?
এখন আর তাঁর কোনো কষ্ট হয় না। অরুণের এই দূরে সরে থাকাটা তাঁকে প্রথম প্রথম সামান্য পীড়া দিলেও, সেটা তাঁর মনে আর কোনো গভীর ক্ষত তৈরি করতে পারে না। তিনি বুঝতে পারেন, তাঁর ভেতর থেকে সেই দুর্বল নারী মরে গেছে। তাঁর মনোভাব এখন অনেক কঠিন, অনেক বাস্তববাদী।
এখন এটা নিয়ে তিনি আর খুব একটা মাথা ঘামান না। এখন আর তার চোখে জল আসে না। এই নির্লিপ্ততা থেকেই বিদিশা বুঝতে পারেন, তিনি আগের সেই গৃহবধূটি নেই। তার মনোভাব এখন অনেক কঠিন, বাস্তবমুখী এবং শীতল হয়ে গেছে।
অরুণ যে শূন্যস্থানটা তৈরি করেছে, তা হয়তো প্রকৃতির নিয়মেই অন্য কাউকে দিয়ে পূরণ হওয়ার অপেক্ষায় আছে।
কিন্তু যেটা তাঁকে সবচেয়ে বেশি যন্ত্রণা দেয়, যা তাঁর ইস্পাতের বর্ম ভেদ করে তাঁকে রক্তাক্ত করে, সেটা হলো তাঁর একমাত্র ছেলে অয়নের আচরণ। তার নাড়ীছেঁড়া ধন, তার একমাত্র ছেলে, এখন তাকে অত্যন্ত সন্তর্পণে, সতর্কভাবে এড়িয়ে চলে।
অয়ন... বিদিশার চোখের সামনে ছেলের মুখটা ভেসে উঠতেই তাঁর সেই নিবিড় কালো চোখে একটা বেদনা মিশ্রিত বিষাদঘন অনুভূতির সঞ্চার হলো। অয়ন তাঁর থেকে যোজন যোজন দূরে সরে গেছে। ছেলেটা তাঁকে সতর্কভাবে, প্রায় হিসেব করে এড়িয়ে চলে।
কেন?
এই প্রশ্নের উত্তর বিদিশা কোনোদিন অয়নের কাছে দাবি করেননি। তার স্বভাবসিদ্ধ অন্তর্মুখী চরিত্র তাকে বাধা দিয়েছে ছেলের কাছে জবাবদিহি চাইতে।
বিদিশা নিজের মনকে প্রবোধ দেন—অয়ন বড় হয়েছে, ওর নিজের একটা জীবন তৈরি হয়েছে। কলেজে নতুন বন্ধু-বান্ধব, নতুন পরিবেশ। অয়ন কেন তাঁর সাথে এক ঘরে, একা থাকতে পর্যন্ত চায় না? কেন সে চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলে না? এই প্রশ্নগুলো রাতের অন্ধকারে বিদিশাকে কুরে কুরে খায়।
বিদিশা নিজের মনকে প্রবোধ দেয় - অয়ন বড় হয়েছে, কলেজে উঠেছে, ওর নিজের একটা আলাদা জগৎ তৈরি হয়েছে, বন্ধুবান্ধব হয়েছে, তাই হয়তো মায়ের আঁচল ছেড়ে সে দূরে থাকতে চায়। এই বয়সে ছেলেরা একটু স্বাধীনচেতা হয়, মাকে হয়তো এড়িয়ে চলে। এটা স্বাভাবিক।
কিন্তু এই যুক্তি তাঁর মাতৃসত্তাকে সান্ত্বনা দিতে পারে না।
কিন্তু... কিন্তু, অয়ন কেন তার সাথে একা এক ঘরে থাকতে পর্যন্ত চায় না?
কেন তার দৃষ্টি সবসময় মা'কে এড়িয়ে মেঝের দিকে বা অন্যদিকে ঘুরে থাকে?
এই প্রশ্নগুলো রাতের অন্ধকারে বিদিশাকে তীরের মতো বেঁধে। আজ চার মাস হলো অয়ন কলেজে ভর্তি হয়ে ডর্মে চলে গেছে। এই চার মাসে সে বাড়িতে নিজে থেকে মাত্র দুবার ফোন করেছিল।
বিদিশা ফোন ধরলেই, ওপাশ থেকে অয়নের অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত, যান্ত্রিক উত্তর "হ্যাঁ মা, ভালো আছি। ক্লাসে যাচ্ছি, রাখছি।" ব্যস, ওইটুকুই।
বিদিশা জানেন না, অয়ন মনে মনে ঠিক করে নিয়েছে আগামী চার বছর সে আর বাড়ি ফিরবে না। এই স্বেচ্ছা নির্বাসন তার নিজেরই নেওয়া এক কঠিন শাস্তি।
উনি যেটা জানেন না, সেটা হলো, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অয়নের আত্মবোধ বেড়েছে আর তার সাথে জন্ম নেওয়া এক নিষিদ্ধ, বিকৃত মনস্তত্ত্ব কীভাবে তাকে ভেতর থেকে অপরাধবোধে শেষ করে দিচ্ছে।
ছোটবেলায় শাড়ি পরা, শান্ত, স্নিগ্ধ বিদিশাকে অয়ন তার জীবনের আদর্শ নারী হিসেবে দেখত। এই সম্পর্কে কোনো কলুষতা ছিল না, ছিল এক চরম ভক্তি এবং মাতৃপ্রেম। বিদিশাও অয়নকে নিজের জগত মনে করতেন, কারণ অরুণের ব্যস্ততার মাঝে অয়নই ছিল তার একমাত্র নিঃস্বার্থ সঙ্গী।
ইতালির সেই রাত সবকিছু চুরমার করে দেয়। অয়ন প্রথমবার তার দেবীকে একজন রক্তমাংসের, কামনা-বাসনায় ঘেরা, নির্যাতিতা নারী হিসেবে আবিষ্কার করে। তার পরের ঘটনা সবার জানা।
এই নতুন অনুভূতি অয়নকে চরম অপরাধবোধে ফেলে দেয়। সে নিজেকে মায়ের থেকে গুটিয়ে নিতে শুরু করে, কারণ সে তার নিজের চোখের লোলুপতাকে ভয় পায়।
অয়ন বুঝতে পেরেছে, সে যতই বড় হচ্ছে, তার মায়ের প্রতি তার আকর্ষণ এক বিকৃত, অমোঘ রূপ নিচ্ছে। ছোটবেলা থেকেই সে মায়ের মতো একজন স্ত্রীকে কল্পনা করত। বিদিশার ওই শান্ত চোখ, অন্তঃসলিলা গভীর স্বভাব তাকে ভীষণভাবে টানত। কিন্তু ইতালির সেই রাত সবকিছু ওলটপালট করে দিয়েছে।
বনগানির হাতে তার মায়ের লাঞ্ছনা সে সহ্য করতে পারেনি। কিন্তু সেদিন রাতে সে তার মায়ের যে রূপ দেখেছিল, তা তার মস্তিষ্কে চিরকালের মতো খোদাই হয়ে গেছে। তার মায়ের আত্মত্যাগ, তেজ, সাহস, স্বাভিমান আর সর্বোপরি বনগানির সাথে চুক্তির সময় তার চোখের সেই বন্য, আদিম আগুন। আর তারপর...টাইট জিন্স আর লাল ক্রপ টপে তার মায়ের সেই উন্মুক্ত, তেজী, প্রতিশোধস্পৃহায় পাগল রূপ!
বনগানির অণ্ডকোষে যখন বিদিশা পৈশাচিক রাগে লাথি মারছিলেন, তখন মায়ের সেই সুডৌল নিতম্ব, নির্মেদ পেট আর রাগে ফুলে ওঠা স্তনযুগ - সেই উন্মুক্ত, তেজী, লাস্যময়ী রূপ অয়ন আজও ভুলতে পারেনি।
তার আগে সে মা'কে চিরকাল কেবল আটপৌরে শাড়িতে, এক স্নিগ্ধ গৃহবধূর রূপেই দেখেছে। কিন্তু ওই রাতে সে এক রক্তমাংসের, কামনা-বাসনায় ঘেরা, ভয়ঙ্করী দেবীকে দেখেছিল।
অয়ন খুব ভালো করেই বোঝে যে এই অনুভূতিগুলো তার একান্তই নিজস্ব, যেখানে যৌনতা এবং পবিত্রতার এক বিকৃত মিশেল ঘটে গেছে।
তার কাছে তার মা এখন কোনো সাধারণ নারী নন, যার মতো স্ত্রী সে কামনা করে। তিনি এক সাক্ষাৎ দেবী। নিষিদ্ধ কামনার সঙ্গে যোগ হয়েছে ভক্তি। তার দেবীর প্রতি অয়নের মনের গভীরে জমতে থাকা এই ভক্তি দিন দিন বেড়েই চলেছে। এই ভয়ানক সত্যটা সে নিজেই নিজের কাছে স্বীকার করতে ভয় পায়। এই কামনার জন্য সে নিজের ওপর তীব্রভাবে ক্ষুব্ধ, লজ্জিত।
পাছে তার চোখের দৃষ্টি, তার শারীরিক ভাষা তার ভেতরের এই নোংরা সত্যটাকে মায়ের সামনে প্রকাশ করে দেয়, পাছে সে ধরা পড়ে যায়, সেই ভয়েই সে সচেতনভাবে সবসময় মায়ের থেকে দূরে দূরে থাকে। মায়ের সাথে একা এক ঘরে থাকলে তার দমবন্ধ হয়ে আসে, শরীরের ভেতরে একটা অদ্ভুত শিহরণ কাজ করে। যদি মা তার চোখের ভাষা পড়ে ফেলেন? যদি মা বুঝতে পারেন তার নিজের ছেলেই তাকে নিয়ে রাতে কীসব ভাবে? অয়ন জানে, সেরকম কিছু হলে নিজের মুখ সে আর কোনদিন কাউকে দেখাতে পারবে না।
বিপদ বাড়ানোর কোনো ইচ্ছে অয়নের নেই। তাই এই স্বেচ্ছা নির্বাসন।
কিন্তু মানুষের মন বড় অদ্ভুত। যে জিনিস সে নিজের থেকে দূরে ঠেলে দিতে চায়, অবচেতন মন তাকেই আঁকড়ে ধরে।
তার মানিব্যাগের একদম ভেতরের গোপন পকেটে সবসময় একটা জিনিস লুকানো থাকে। একটা ছবি। এই কথাটা পৃথিবীর আর কেউ জানে না।
বিদিশাও নয়।
ছবিটা দু'বছর আগে অরুণের অফিসেরই একটা পার্টিতে তোলা। বিদিশা একটা হালকা নীল রঙের শিফন শাড়ি পরে আছেন। শাড়ির আঁচলটা অসতর্কভাবে সামান্য সরে গেছে। ওই ছবিতে বিদিশাকে অসম্ভব, অতিপ্রাকৃত রকমের সুন্দরী দেখাচ্ছে, যেন কোন অপ্সরা। শাড়ির নেটের সূক্ষ্ম ফাঁক দিয়ে তার ফর্সা, নির্মেদ পেট আর গভীর, রহস্যময় নাভিটা স্পষ্ট উঁকি দিচ্ছে। মুখটা একটু আধ-ঘোরা।
ওই ছবিটা হলো অয়নের 'গিল্টি প্লেজার'।
হস্টেলের ঘরে যখন সে একা থাকে, চারপাশ যখন নিস্তব্ধ, তখন মাঝে মাঝে অত্যন্ত সাবধানে ও ছবিটা বার করে। একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে মায়ের ওই গভীর নাভির দিকে, তার বুকের খাঁজের দিকে।আর পরক্ষণেই তীব্র আত্মগ্লানিতে ভুগতে থাকে। অপরাধবোধ আর উত্তেজনায় কাঁপতে কাঁপতে আবার ছবিটা পকেটে ঢুকিয়ে রেখে দেয়।
বিদিশা এর কিছুই জানেন না।
কলেজে ভর্তি হওয়ার পর অয়ন নিজেকে স্পোর্টস এর মধ্যে ডুবিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে। নিজের ভেতরের এই অন্ধকার দিকটা থেকে পালাতে সে বাইরের কোলাহলকে বেছে নিয়েছে। তার সুন্দর, পুরুষালি মুখ আর জিম-করা সুঠাম চেহারার জন্য কলেজে মেয়ে মহলে তার কদর খুব। সে মাঝে মাঝে মেয়েদের সাথে ডেটেও গেছে। কিন্তু, ওই অবধিই। তার মন তৃপ্ত হয় না, কারণ অবচেতন মনে সে সবসময় ওই মেয়েগুলোর মধ্যে তার মায়ের স্নিগ্ধতা আর তেজের মিশেল খুঁজতে থাকে, যা সে কখনো পায় নি।


![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)